Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    ভূত সমগ্র – মুহম্মদ জাফর ইকবাল

    মুহম্মদ জাফর ইকবাল এক পাতা গল্প904 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    মূর্তি

    আমি এই গল্পটি শুনেছি তরফদার সাহেবের মুখে। তরফদার সাহেবের পুরো নাম আজিজ তরফদার। তিনি আমার বাসায়। বেড়াতে এসেছিলেন আমার ছেলেবেলার বন্ধু আনিসের সাথে। আনিস একটু পাগলা গোছের, তার সাথে যারা মেশে তারাও হয়। একটু পাগলা গোছের, না হয় তার চাপে খানিকটা পাগলা গোছের হয়ে যায়। যে রাতে সে তরফদার সাহেবকে আমার বাসায় নিয়ে এলো সে রাতে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি হচ্ছিল। এরকম বৃষ্টিতে সুস্থ মানুষও খুব বাড়াবাড়ি দরকার না থাকলে ঘর থেকে বের হয় না। আনিস মাঝরাতে এই বৃষ্টি ভেঙে তরফদার সাহেবকে নিয়ে আমার বাসায় চলে এলো। দরজা খুলে তাকে দেখে আমার আঁতকে ওঠার কথা ছিল; কিন্তু আনিসকে দেখে আমি কখনো আঁতকে উঠি না। একবার সে রাত দুটোর সময় একজন কাঁপালিক সন্ন্যাসীকে নিয়ে। হাজির হয়েছিল, শুধু তাই নয় আমার কাছে গাঁজা ছিল না বলে সেই সন্ন্যাসী আমাকে তার চিমটা দিয়ে খোঁচা মারার চেষ্টা করেছিল। সেই তুলনায় আজিজ তরফদার অত্যন্ত ভদ্রমানুষ এবং মাঝরাতে ভিজে চুপসে হাজির হয়ে তার লজ্জার সীমা ছিল না। ব্যাপারটির মাঝে যে কোনো অস্বাভাবিকতা থাকতে পারে আনিস অবশ্য সেটা ধরতেই পারল না, আমাকে দেখে উল্লসিত হয়ে বলল, ইকবাল। তোর কাছে তরফদার সাহেবকে নিয়ে এসেছি।

    তরফদার সাহেব বিব্রতভাবে বললেন, আমি এত রাতে আসতে চাচ্ছিলাম না, কিন্তু আনিস কোনো কথা শুনল না।

    আমি বললাম, এটি কোনো ব্যাপারই না। আপনি মাথা ঘামাবেন না।

    আনিস বলল, তুই যে পুলিশের সাথে কুস্তি করেছিলি সেই গল্পটা বলেছিলাম তরফদার সাহেবকে। শুনে এত হাসলেন যে ভাবলাম তোকে দেখিয়ে নিয়ে যাই!

    আমি আমার জীবনে অনেক কিছুই করেছি, একটা দুইটা কাজকে বীরত্বের কাজ হিসেবেও চালিয়ে দেওয়া যায়; কিন্তু আনিস আমার সম্পর্কে কিছু বলতে হলে একজন পুলিশের সাথে হাতাহাতি করে এক রাত্রি হাজতবাসের গল্পটি দিয়ে শুরু করে। আমি একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, শুধু আমাকে দেখানোর জন্যে বৃষ্টির মাঝে উনাকে টেনে আনলি?

    আনিস দাঁত বের করে হেসে বলল, শুধু সেজন্যে আনি নি। বৃষ্টির রাতে কফি খেতে খেতে জমাট আড্ডা মারার ইচ্ছে করছে। তোর হাতের কফি একেবারে ফার্স্টক্লাস। আর তরফদার সাহেব হচ্ছে প্রাক্তন আন্ডারগ্রাউন্ড কমিউনিস্ট নেতা! এমন সব গল্প জানেন শুনলে হাঁ হয়ে যাবি।

    তরফদার সাহেব কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, আনিস বাধা দিয়ে বলল, আগেই হাঁ করে দাঁড়িয়ে গেছিস কেন। শুকনো তোয়ালে ফোয়ালে কিছু নিয়ে আয় তাড়াতাড়ি–

    আমি তোয়ালে নিয়ে ফিরে এসে দেখি তরফদার সাহেব আমার টেবিলের ওপর রাখা পাথরের মূর্তিটার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছেন, আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, কী চমৎকার হাতের কাজ! দেখে মনে হয় দক্ষিণ আমেরিকার।

    আমি মাথা নাড়লাম, হ্যাঁ, মেক্সিকো থেকে এনেছি। ইনকাদের কোন এক রাজার মূর্তি।

    তরফদার সাহেব তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছে মূর্তিটি হাত দিয়ে খুব সাবধানে স্পর্শ করলেন, দেখে মনে হলো তিনি যেন মূর্তি নয় একটি জীবন্ত মানুষকে স্পর্শ করছেন। আমি বললাম, আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে হাত দিয়ে দেখছেন এটা বেঁচে আছে কি না–

    তরফদার সাহেব চমকে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি সত্যিই তাই দেখছিলাম। মূর্তি নিয়ে একটা ঘটনা ঘটেছিল আমার জীবনে, সেই থেকে কোনো মূর্তি দেখলেই আমি হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখি—

    কী দেখেন?

    তরফদার সাহেব ইতস্তত করে বললেন, দেখি মূর্তিটা জীবন্ত কি না। আমি জানি কথাটা খুব আজগুবি শোনাচ্ছে, কিন্তু

    আনিস হাতে কিল দিয়ে বলল, বৃষ্টিরাতের জন্যে একেবারে পারফেক্ট! ইকবাল, তোর কফি চাপা তাড়াতাড়ি।

    তরফদার সাহেব দুর্বলভাবে একবার আপত্তি করার চেষ্টা করে বেশি সুবিধে করতে পারলেন না। মধ্যরাতে যখন তুমুল বর্ষণে বাইরের পৃথিবী ভেসে যাচ্ছে তখন ঘরের মাঝে কফি খেতে খেতে তরফদার সাহেব যে গল্পটি বলেছিলেন সেটি এরকম–তার নিজের ভাষাতেই বলা যাক।

    .

    আমি তখন আন্ডারগ্রাউন্ডে, পুলিশের কয়েকটা মামলা ঝুলছে। কিছু মামলা সত্যি কিছু বানানো। অনেক গ্রাম ঘুরে আমি দিনাজপুরের একটি সাঁওতাল পল্লীতে আশ্রয় নিয়েছি। পার্টি থেকে ঠিক করে দেওয়া হয়েছে কোথায় থাকব, ছোট একটা কুঁড়েঘরে থাকি, দিনের বেলা ঘর থেকে বের হই না। আমাকে দুইবেলা খাবার এনে দেয় একজন বুড়ো সাঁওতাল। কুচকুচে কালো গায়ের রং, মাথার চুল শণের মতো সাদা। অনেক বয়স মানুষটার, কিন্তু শরীর পাথরের মতো শক্ত। আমার কোনো কাজকর্ম নেই–অনেক বই নিয়ে এসেছি সেগুলো বসে বসে পড়ি। বুড়ো সাঁওতাল প্রথম যখন আমাকে দেখে মনে হয় আমার সম্পর্কে একটা অবিশ্বাস ছিল–আদিবাসী মানুষের জন্যে যেটা খুবই স্বাভাবিক। ধীরে ধীরে সেই অবিশ্বাসটা দূর হয়েছে এবং শেষের দিকে মনে হয় আমাকে সে একটু পছন্দই করা শুরু করেছিল। একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করল, সারাদিন তুমি কী পড়, বাবু?

    আমি বললাম, বই।

    কিসের বই? কী লেখা আছে বইয়ে?

    আমি হেসে বললাম, কত কী লেখা আছে সে তো বলে শেষ করা যাবে না। ইতিহাসের বই আছে, বিজ্ঞানের বই আছে, ধর্মের বই আছে–

    বুড়ো সাঁওতাল উৎসুক মুখে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে একটু এগিয়ে এসে বলল, তোমার কাছে কি পিশাচের বই আছে?

    আমি অবাক হয়ে বললাম, পিশাচ?

    হ্যাঁ।

    আমি হেসে ফেলতে যাচ্ছিলাম; কিন্তু বুড়োর চোখেমুখে বিচিত্র এক ধরনের কৌতূহলের চিহ্ন দেখে হাসি গোপন করে মুখ গম্ভীর করে জিজ্ঞেস করলাম, পিশাচের কী জানতে চাও?

    এই কেমন করে পিশাচের হাত থেকে বাঁচা যায়?

    তোমাকে কোনো পিশাচ যন্ত্রণা দিচ্ছে?

    বুড়ো একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, এখনো দিচ্ছে না, কিন্তু দেবে। আমি জানি দেবে

    তুমি কেমন করে জান?

    বুড়ো মেঝেতে পা মুড়ে বসেছিল, খানিকক্ষণ দরজা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল তারপর হাতের লাঠিটা দিয়ে খানিকক্ষণ পিঠ চুলকে বলল, পিশাচটা আমার কাছে আছে।

    আমি অবাক হয়ে বুড়োর দিকে তাকালাম। ভূতপ্রেত পিশাচের গল্প কে না শুনেছে–

    কিন্তু সব গল্পেই এই সব ভূতপ্রেত পিশাচ হঠাৎ হঠাৎ এসে দেখা দিয়ে আবার অদৃশ্য হয়ে যায়। এই প্রথম একজনকে দেখলাম যে দাবি করছে পিশাচটা তার কাছে আছে। আমি হাসি গোপন করে মুখে প্রয়োজনীয় গাম্ভীর্য ধরে রেখে বললাম, তোমার কাছে একটা পিশাচ আছে?

    হ্যাঁ।

    কী করে পিশাচটা?

    এখন কিছু করে না। দেখে তোমার মনে হবে একটা মূর্তি।

    আসলে মূর্তি না?

    না।

    তুমি কেমন করে জান?

    এটা আমাকে দিয়েছে আমার গুরু। আমার গুরু আমাকে বলেছে এটা পিশাচ।

    আমি একটু হেসে বললাম, তোমার গুরু হয়তো তোমাকে মিথ্যে কথা বলেছে।

    মিথ্যে? বুড়ো সাঁওতালটা আমার দিকে খুব অবাক হয়ে তাকাল আর তার সেই দৃষ্টির সামনে আমি কেমন যেন লজ্জা পেয়ে গেলাম। মিথ্যে বলাবলির ব্যাপারটি এরা মনে হয় এখনো শিখে ওঠে নি। আমি থতমত খেয়ে বললাম, তোমার গুরু কেমন করে জানে এটা পিশাচ?

    বুড়ো মাথা নেড়ে বলল, আমার গুরু পিশাচসিদ্ধ ছিলেন। তার গুরু আরো বড় পিশাচসিদ্ধ ছিলেন।

    পিশাচসিদ্ধ হলে কী হয় আমি জানি না, তারা কেমন করে পিশাচকে বশ করে তাও জানি না। সত্যি কথা বলতে কী পিশাচ জিনিসটা কী আমার সে সম্পর্কেও কোনো ধারণা নেই। বুড়ো সাঁওতালের কাছে আমার সেটা নিয়ে শিক্ষা শুরু হলো। সে আমাকে জানাল পিশাচ এক ধরনের অপদেবতা। অপদেবতাদের মাঝে উচ্চশ্রেণী-নিম্নশ্রেণী আছে, ভালো-খারাপ আছে, শান্ত এবং খেপাও আছে। পিশাচ সে হিসেবে খুব নিম্ন শ্রেণীর, মানুষের শুধু ক্ষতি করতে চায়। তার গুরু এরকম একটা পিশাচকে ধরে আটকে রেখেছেন। এদের আটকে রাখার নানারকম নিয়মকানুন আছে, তার একটা হচ্ছে মূর্তির মতো তৈরি করে রাখা। ব্যাপারটা সময়সাপেক্ষ এবং কঠিন, মানুষের মৃতদেহ থেকে হাড়-চামড়া নিয়ে তৈরি করতে হয়। ব্যাপারটা বিপজ্জনকও। কারণ মূর্তিটাকে ঠিক করে সংরক্ষণ করে না রাখলে পিশাচ বের হয়ে যেতে পারে।

    বুড়ো খুব একাগ্রভাবে গম্ভীর মুখে আমাকে পিশাচ সংরক্ষণের নিয়মকানুন বলে যাচ্ছিল। তার বিশ্বাস কিংবা তার গুরুর কোনোরকম অসম্মান না করে আমি সাবধানে জিজ্ঞেস করলাম, এমন কি হতে পারে না যে পিশাচটা এখন নেই, মূর্তি থেকে বের হয়ে চলে গেছে?

    বুড়ো সাঁওতাল মাথা নাড়ল, হতে পারে; কিন্তু সেটা বোঝা যায়।

    কেমন করে বোঝা যায়?

    মূর্তিটার পরিবর্তন হয়, হাত-পা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নড়ে, খুব আস্তে আস্তে-এক দুই মাস সময় লাগে। সময় সময় মুখের চেহারার পরিবর্তন হয়। বয়স বাড়ে।

    বুড়োর কথা শুনে আমার শরীর হঠাৎ কেমন জানি শিরশির করে উঠল। ব্যাপারটি দীর্ঘদিনের লালিত কুসংস্কার ছাড়া আর কিছু নয়। মানুষ চাঁদে গিয়েছে, তাদের তৈরি মহাকাশযান সৌরজগৎ পার হয়ে যাচ্ছে, এই যুগে পিশাচের গল্প বিশ্বাস করা খুব অন্যায় ব্যাপার। কিন্তু কেন জানি না গভীর অরণ্যের পাদদেশে ঝুপড়ি কুঁড়েঘরে উবু হয়ে বসে থাকা একজন বুড়ো সাঁওতালের মুখে এই পিশাচের গল্প শুনে আমার কেমন জানি ভয় করতে লাগল। আমি দুর্বল গলায় বললাম, তুমি আমাকে পিশাচটাকে দেখাতে পারবে?

    বুড়ো একটু অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল, তুমি দেখতে চাও?

    কেন, কোনো অসুবিধে আছে?

    না, অসুবিধে নাই। তবে দেখার নিয়মকানুন আছে। পিশাচটাকে রাখতে হয় মাটির নিচে, কাঠের বাক্সে, সেটাকে মন্ত্র লেখা কাপড় দিয়ে মুড়ে রাখতে হয়। তুমি যদি দেখতে চাও আমি মাটি খুঁড়ে বের করতে পারি।

    তুমি সেটা কোথায় পুঁতে রেখেছ?

    আমার বাড়ির পেছনে।

    ঠিক আছে আমি যাব, আমার তো দিনে বের হওয়া বারণ, আমি রাত্রিবেলা বের হব।

    বুড়ো মাথা নাড়ল, বলল, আমি তোমাকে সামনের পূর্ণিমায় নিয়ে যাব।

    গল্পের এই পর্যায়ে এসে তরফদার সাহেব একটু থামলেন। খানিকক্ষণ নিজের আঙুলগুলো গভীর মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করে বললেন, পূর্ণিমা আসার আগেই বুড়ো সাঁওতালটা মারা গেল। আমরা সাঁওতালদের নিয়ে কাজ করছিলাম, পার্টি থেকে নির্দেশছিল তাদের সংগঠিত করার। কিন্তু মানুষগুলো সহজ-সরল, রাজনীতির জটিল ব্যাপরগুলোও তাদের নিজেরদের মতো সহজ সরল করে বুঝে নেয়; সেটাই হলো কাল। পুলিশের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হলো। অনেক সাঁওতাল মারা গেল, তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হলো।

    আমি নিজেও বেশ কিছুদিন বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ালাম।

    বেশ কিছুদিন পর, অবস্থা একটু শান্ত হলে আমি সেই সাঁওতাল পল্লীতে ফিরে এলাম। তখন সেখানে কেউ নেই, পরিত্যক্ত একটা গ্রাম। আমার সাথে ছিল পরিচিত একটা সাঁওতাল ছেলে, তাকে নিয়ে সেই বুড়ো সাঁওতালের বাড়ি খুঁজে বের করে বাড়ির পেছনে গেলাম। অল্প কিছুদিন আগেও সেটা ছিল ঝকঝকে তকতকে, এ কয়দিনেই সেটা বুনো গাছগাছালিতে ভরে উঠেছে। আমি জায়গাটা ভালো করে লক্ষ করতেই কোনার দিকে একটা জারুলগাছের নিচে চোখ পড়ল। অনেক পাথর সেখানে ছোট একটা পিরামিডেরে মতো স্তূপ করা ছিল, পাথরগুলো সরাতেই দেখা গেল নিচে ঝুরঝুরে মাটি। মাটিগুলো সরাতেই তার নিচে পাওয়া গেল একটা ছোট কাঠের বাক্স। বাক্সটা ওপরে তুলে আনলাম, সঙ্গের সাঁওতাল ছেলেটা খুব কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে ছিল, তার ধারণা হলো বুড়ো সাঁওতালটা নিশ্চয়ই আমাকে তার গোপন সোনাদানার কথা বলে গিয়েছে, আমি সেটা বের করছি।

    কাঠের বাক্সটা যখন বের করা হয়েছে তখন সূর্য ডুবে আবছা অন্ধকার নেমে আসছে। নির্জন পরিত্যক্ত একটা পোড়াবাড়ি, গাছের নিচে রহস্যময় একটা অন্ধকার, সেখানে আমরা বিবর্ণ একটা কাঠের বাক্স নিয়ে বসে আছি, পুরো ব্যাপারটাতেই কেমন জানি একটা গা ছমছম করা ভয়ের ব্যাপার আছে। আমি আমার পকেট-ছুরিটা বের করে সাবধানে চড় দিয়ে বাক্সের ঢাকনা খুলে ফেললাম, সাথে সাথে আমার স্পষ্ট মনে হলো ভেতরে কী যেন ছটফট করে নড়ে উঠল। আমি হঠাৎ করে চমকে পেছনে সরে গেলাম, সাঁওতাল ছেলেটা শক্ত করে তার লাঠিটা ধরে দাঁড়িয়ে রইল। আমি চুপচাপ খানিকক্ষণ বাক্সের ভেতরে তাকিয়ে রইলাম, পুরনো কাপড়ে মোড়ানো কিছু একটা যত্ন করে রাখা আছে। আমি সাহস করে কাপড়ে মোড়ানো জিনিসটা তুলে আনলাম, পরিষ্কার মনে হলো হাতের মাঝে জিনিসটা আবার নড়ে উঠল। আমি সেটাকে মনের ভুল বলে গা ঝাড়া দিয়ে সরিয়ে দিলাম। তারপর সাবধানে কাপড়টা সরাতে থাকি, যখন জিনিসটার ওপর থেকে কাপড়টা সরে গেছে-ভেতর থেকে একটা অবিশ্বাস্য রকমের কুৎসিত মূর্তি উঁকি মেরেছে-তখন সাঁওতাল ছেলেটা হঠাৎ একটা অমানুষিক চিৎকার করে লাফিয়ে পেছনে সরে গেল। দূরে দাঁড়িয়ে সে আতঙ্কে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বলল, ফেলে দাও-ফেলে দাও-ওটা–

    আমি আরেকটি হলে ফেলেই দিতাম, কিন্তু এতদিনের শিক্ষাদীক্ষা রাজনৈতিক অনুশাসন বিজ্ঞানের বিশ্বাস সব মিলিয়ে নিজের ভেতরে একটা গো এসে গেল। সাঁওতাল ছেলেটার দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বললাম, কেন ফেলে দেব?

    ছুঁলে তুমি মরে যাবে। ওটা পিশাচ—

    আমি ছুঁলে মরে যাব?

    হ্যাঁ। মরে যাবে—

    আমার ভেতরে তখন একটা লোকদেখানো সাহস তৈরি হয়েছে। মূর্তিটা এক হাতে ধরে রেখে অন্য হাত সেটার কাছে নিয়ে বললাম, এই দেখ আমি এটা ছুঁইছি–

    ছেলেটা চিৎকার করে উঠল এবং আমি সেটা অগ্রাহ্য করে মূর্তিটাকে ছুঁয়ে ফেললাম। একটা মূর্তি যেরকম শক্ত, প্রাণহীন, শীতল হওয়ার কথা মূর্তিটা সেরকম নয়-এটা কেমন যেন উষ্ণ এবং ঘেঁয়ামাত্র আমার শরীর কেমন যেন চমকে উঠল, মনে হলো ভয়ংকর একটা অশুভ কাজ করে ফেলেছি। আমি অবিশ্যি সাঁওতাল ছেলেটাকে কিছুই বুঝতে দিলাম না, মুখে জোর করে হাসি ফুটিয়ে বললাম, আমি কি মরে গেছি?

    ছেলেটা তখনো অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি মূর্তিটাকে কাপড় দিয়ে জড়িয়ে বাক্সের ভেতরে রেখে বাক্সের ডালাটা বন্ধ করে দিয়ে বললাম, এখন হয়েছে?

    ছেলেটা দূরে দাঁড়িয়ে থেকে বলল, তুমি এটা কী করবে?

    আমি নিয়ে যাব।

    বাবু, নিও না। অনেক বিপদ হবে তোমার—

    হোক। আমি বাক্সটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম।

    সাঁওতাল ছেলেটা অনেক অনুনয়-বিনয় করল, কিন্তু আমি তার কথা শুনলাম না।

    .

    সে রাতে আমি বাক্সটা খুললাম না। বাসায় গিয়ে ভালো করে গোসল করে রাতে ঘুমাতে গিয়েছি। একটু পরে পরে ঘুম ভেঙে গেল-শুধু মনে হলো ঘরে বুঝি কিছু ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঘুম হলো ছাড়া ছাড়াভাবে আর একটার পর আরেকটা দুঃস্বপ্ন দেখে গেলাম। ভয়ংকর ভয়ংকর সব দুঃস্বপ্ন! চিৎকার করে জেগে উঠলাম কয়েকবার।

    ভোরবেলা দিনের আলোতে বাক্সটা খুলে ভেতরের মূর্তিটা খুব ভালো করে পরীক্ষা করলাম। নিঃসন্দেহে মূর্তিটা মানুষের দুই হাঁটুর মাঝখানে মাথা গুঁজে ওপরের দিকে তাকিয়ে আছে, একটা হাত দিয়ে নিজের দুটি হাঁটু, অন্য হাত দিয়ে মাথাটা ধরে রেখেছে। মানুষের স্বাভাবিক বসার ভঙ্গি এটা নয়। মূর্তিটা অস্বাভাবিক কুৎসিত, মানুষের মতো নাক-চোখ-মুখ সবই আছে, কিন্তু তবু মানুষের স্বাভাবিক রূপটা পায়নি। মূর্তিটা খুব বড় নয়, খুব বেশি হলে এক ফুট উঁচু হবে। এই আকারের একটা পাথরের মূর্তি যত ভারি হওয়ার কথা এটা সেরকম ভারি নয়। আবার খুব হালকাও নয়। মূর্তিটা কিসের তৈরি বলা খুব মুশকিল, মাথায় চুল রয়েছে, খুব ভালো করে লক্ষ করলে শরীরেও লোম দেখা যায়। মনে হয় কেউ বুঝি সত্যিকার একজন বিকৃত দেহের মানুষকে কোনোভাবে চেপে ছোট করে ফেলেছে। মুখের দিকে তাকালে একই সঙ্গে কেমন যেন ঘৃণা এবং ভয় হয়। আমি মূর্তিটাকে খুব ভালো করে পরীক্ষা করে আবার কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে আবার কাঠের বাক্সে বন্ধ করে ফেললাম।

    গল্পের এ পর্যায়ে এসে তরফদার আমার কাছে অনুমতি নিয়ে একটা সিগারেট ধরালেন। সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বললেন, সাঁওতাল ছেলেটার ভবিষ্যদ্বাণী যে আমার ওপর বিপদ নেমে আসবে, কথাটা পরের দিন সত্যি প্রমাণিত হলো। ঘুম থেকে উঠে দেখি পুলিশ বাসা ঘেরাও করে ফেলেছে। আগে এক-দুবার এরকম পরিস্থিতিতেও উদ্ধার পেয়েছি-এবারে পেলাম না, পুলিশ এসে আমাকে ধরে নিয়ে গেল। আমরা যারা বামপন্থী রাজনীতি করি আমাদের জন্যে দেশের আইনকানুন মমতাহীন। তাই আমি দীর্ঘদিনের জন্যে জেলে আটকা পড়ে গেলাম।

    জেলে আমি আগেও থেকেছি, খুব কষ্টের জীবন। মজার ব্যাপার হলো বড় বড় জিনিসের জন্যে লোভ হয় না, কিন্তু একটা পানের দোকান থেকে একশলা সিগারেট কিনে আগুন লাগানো একটা ঝুলন্ত দড়ি থেকে সিগারেটে আগুন ধরানোর জন্যে প্রাণ আইঢাই করতে থাকে! সারাদিন পার্টির অন্য লোকদের সাথে কথাবার্তা বলে জেলের মাঝে দিন কেটে যায়। রাত গম্ভীর হলে যখন নিজের ছোট জায়গাটাতে ঘুমাতে যাই তখন চোখে ঘুম আসে না, মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে ফুঁপিয়ে কাঁদি৷

    যাই হোক এভাবে প্রায় সাত বছর কেটে গেল। সাত বছর অনেক সময়। একাকী বসে চিন্তা করার জন্যে এরকম দীর্ঘ সময় সবাই পায় না। সাত বছরে নিজের ভেতরেও অনেক পরিবর্তন। হলো। ভাবলাম যদি ছাড়া পাই জীবনটা নতুন করে শুরু করব। পুরো দেশে পরিবর্তন নয় নিজের কাছাকাছি যদি কোনো পরিবর্তন আনতে পারি সেই যথেষ্ট। অবিশ্বাস্য ব্যাপার-ঠিক তখন জেল থেকে ছাড়া পেয়ে গেলাম।

    প্রথম বেশ কিছুদিন মুক্তির আনন্দ ভোগ করে পার্টিকে জানালাম আমি কিছুদিন সক্রিয় রাজনীতি থেকে বিশ্রাম চাই। পার্টি রাজি হলো। আমি তখন একটা কলেজে চাকরি নিয়ে মফস্বল একটা শহরে চলে এসেছি। নদীর তীরে ছবির মতোন একটা কলেজ। প্রথম কয়েক সপ্তাহ কলেজের সেক্রেটারির বাসায় থাকলাম, একটু গুছিয়ে নিয়ে ছোট একটা বাসা ভাড়া করে আমি শহর থেকে আমার জিনিসপত্র নিয়ে এলাম। জিনিসপত্র বলতে অবিশ্যি বেশির ভাগই হচ্ছে বই-ঘরের দেয়ালে সেলফ তৈরি করে। একটা একটা করে বইয়ের বাক্স খুলছি, হঠাৎ দেখি বুড়ো সাঁওতালের সেই পিশাচের বাক্স। বুকটা ধক করে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু তার বদলে আমার কৌতুক মেশানো এক ধরনের কৌতূহল হলো। আমি বাক্স খুলে মূর্তিটা বের করে আমার টেবিলের ওপর রাখলাম। সাত বছর আগে দেখেছিলাম-তখন একটা হাত দিয়ে হাঁটু দুটি ধরে রেখেছিল, অন্য হাত ছিল মাথার ওপর; এখন বিচিত্র উপায়ে দুটি হাতই নিচে নেমে এসেছে। শুধু তাই না, মাথাটা একটু নিচু হয়ে নেমে এসেছে, মুখের ভঙ্গিটা মনে হলো দুঃখী। মাথায়। কালো চুল ছিল এখন সেগুলো শণের মতো সাদা। শুধু তাই নয়, মনে হলো শরীরের চামড়া বুড়ো মানুষদের মতো কুঞ্চিত। গত সাত বছরে এই আমি যেটুকু বুড়ো হয়েছি তার থেকে অনেক বেশি বুড়ো হয়েছে মূর্তিরূপী পিশাচটা। আমি যেরকম জেলখানায় আটকা পড়েছিলাম এ পিশাচটাও সেরকম আটকা পড়েছিল তার বাক্সে। আশ্চর্য, যা বেটা পিশাচ! আজ থেকে তোকে আর বাক্সের ভেতরে থাকতে হবে না-তুই থাকবি আমার টেবিলের ওপর!

    সেই থেকে মূর্তিটা আমার টেবিলের ওপর থাকে-কেউ বেড়াতে এলে দেখে খুব অবাক হয়, কেউ ঘেন্নায় নাক সিটকায়, কেউ ভয় পায়, কিন্তু এর বেশি কিছু নয়। এভাবে আরো বছর দুয়েক কেটে গেল, এ মূর্তিটার যে একটা ভয়ের ইতিহাস ছিল সেটাও আমার মনে রইল না।

    .

    এরকম সময় একদিন আমার কাছে বেড়াতে এলো আমার কলেজ জীবনের বন্ধু ফয়েজ আলি। অনেকদিন তার সাথে দেখা নেই, লোকমুখে খবর পেয়েছি সে নাকি চা বাগানের ম্যানেজার। সে বিয়ে করেছে বলে শুনেছিলাম, যখন আমার সাথে দেখা করতে এসেছে তখন দেখতে পেলাম তার দুটি ছেলেমেয়েও আছে। ছেলেটি ছোট, বয়স দশ। মেয়েটি বড়, তার বয়স চৌদ্দ। সারাজীবন রাজনীতি করে নানা ধরনের মানুষের সাথে মিশেছি। কিন্তু এ দুজন ছেলেমেয়েকে দেখে আমি আবিষ্কার করলাম যে আমি কখনো বাচ্চাদের সাথে মিশিনি এবং তাদের সাথে কীভাবে মিশতে হয় জানি না। তাদের মানসিক পরিপক্কতা কতটুকু সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। কোনো জিনিস বোঝার ক্ষমতা তাদের বড়দের থেকে বেশি, কিন্তু জীবনের জটিলতা সম্পর্কে তারা আশ্চর্যভাবে উদাসীন। আমার আগ্রহের জন্যেই হোক আর ছেলেমেয়ে দুজনের কৌতূহলের জন্যেই হোক খুব কম সময়ের মাঝেই তাদের সাথে আমার খুব ভাব হলো। আমাদের কথাবার্তার একটা বড় অংশ দখল করে রইল আমার টেবিলে রাখা মূর্তিটা।

    ছেলেটি যার নাম কাজল, আমার বাসায় ঢোকার দশ মিনিটের মাঝে জিজ্ঞেস করেছিল, চাচা তুমি এত বিচ্ছিরি একটা মূর্তি টেবিলে সাজিয়ে রেখেছ কেন?

    আমি কিছু উত্তর দেবার আগেই মেয়েটি, যার নাম শাওন তার ভাইকে বলল, তোর কাছে এটা শুধু বিচ্ছিরি লাগছে?

    কাজল মুখ কুঁচকে উত্তর দিল, বিচ্ছিরি না তো কী?

    শাওন বলল, এটা যেটুকু বিচ্ছিরি তার থেকে অনেক বেশি আশ্চর্য। এটা এত আশ্চর্য একটা মূর্তি যে এটা যে বিচ্ছিরি তাতে কিছু আসে যায় না।

    মেয়েটার উত্তরটা আমার খুব পছন্দ হলো। আমি বললাম, তুমি ঠিকই বলেছ, মূর্তিটা খুব আশ্চর্য। সবকিছু শুনলে তোমরা আরো অবাক হয়ে যাবে।

    পৃথিবীর সব মানুষই গল্প শুনতে পছন্দ করে, ছোটরা সেটা প্রকাশ করতেও এতটুকু সংকোচ করে না, তখন তখনই দুজনেই আমাকে ধরে বসল গল্প শোনার জন্যে।

    আমি তখন তাদের এ মূর্তিটার পূর্ব ইতিহাস শোনালাম এবং দুজনেই মোটামুটি হতবাক হয়ে গেল। ছোট বাচ্চাদের গল্পে কোনোরকম কৌতূহল নেই এরকম ভান করে আমার বন্ধু ফয়েজ এবং তার স্ত্রী দুজনেই গল্পটা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনল। গল্প শেষ হবার পর ফয়েজ ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, সত্যিই এ মূর্তিটা হাত

    এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়েছেন?

    আমি মাথা নাড়লাম, হ্যাঁ সরিয়েছে। আমি জেলে যাবার আগে এটার হাত ছিল মাথার ওপরে, এখন নেমে এসেছে।

    ফয়েজের স্ত্রী শুকনো গলায় বলল, সত্যি?

    হ্যাঁ।

    তার মানে এটা সত্যিই পিশাচ?

    শাওন হো-হো করে হেসে উঠে বলল, মা তুমি সত্যিই এত বোকা। পিশাচ কোত্থেকে আসবে।

    শাওনের মা একটু লজ্জা পেয়ে বলল, তোর চাচা কি তাহলে মিথ্যা কথা বলেছে?

    মিথ্যা কথা বলবেন কেন? এ মূর্তিটা পাথরের তৈরি না-নরম একটা জিনিসের তৈরি, যেটা আস্তে আস্তে নিচে নেমে আসে-মাধ্যাকর্ষণ বলে সেটাকে।

    আর চুল? ছোট ভাই কাজল বলল, চুল যে সাদা হয়ে গেল?

    সেটা তো আরো সহজ! পৃথিবীতে কোনো পাকা রং নেই-এমন একটা জিনিস দিয়ে চুল তৈরি করেছে যেটার রং উঠে সাদা হয়ে যায়!

    আমি মেয়েটার বুদ্ধি দেখে অবাক হয়ে গেলাম। সত্যি সত্যি পুরো জিনিসটাকে এভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। ব্যাপারটাকে ভৌতিক হবার কোনো প্রয়োজন নেই। যে মানুষটি এই মূর্তিটা তৈরি করেছে সে দক্ষ কারিগর এবং অসম্ভব বুদ্ধিমান–এর বেশি কিছু নয়।

    আমার বন্ধু ফয়েজ তার ছেলেমেয়ে এবং স্ত্রীকে নিয়ে আমার এখানে সপ্তাহখানেক ছিল। সবাইকে নিয়ে সময়টা বেশ কেটেছে। যতক্ষণ বাসায় থেকেছি বাচ্চাগুলো মূর্তিটার আশপাশে ঘুরঘুর করেছে, যাবার দিন আমি শাওনকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি মূর্তিটা নিতে চাও?

    সাথে সাথে শাওনের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, কিন্তু সে নিজেকে কষ্ট করে সংবরণ করে বলল, না না চাচা, আমি চাই না।

    আমি বললাম, দেখ এটা উপহার দেবার মতো কোনো জিনিস না, তাই আমি জোর করতে পারব না। কিন্তু তুমি যদি চাও এটা নিতে পার।

    সত্যি?

    সত্যি।

    কিন্তু আপনি যে এত কষ্ট করে জোগাড় করেছেন–

    আমি মোটেও কষ্ট করে জোগাড় করি নি। কৌতূহল ছিল বলে জোগাড় করেছিলাম, এখন কৌতূহল মিটে গেছে, তুমি নিতে পার। তোমার কৌতূহল মিটে গেলে তুমি অন্য কাউকে দিয়ে দিও।

    শাওনের মা-বাবা ব্যাপারটা মোটেও পছন্দ করলেন না, কিন্তু আমি মূর্তিটাকে ভালোভাবে প্যাকেট করে ছোট একটা বাক্সে ভরে দিলাম।

    যেদিন ফয়েজ আর তার স্ত্রী-ছেলেমেয়েকে ট্রেনে তুলে দিয়ে ফিরে এলাম সেদিন এত মন খারাপ হলো বলার নয়। রাতে বিছানায় শুয়ে আমার কেমন একাকী লাগতে লাগল। শুধু মনে হতে লাগল, আমারও যদি শাওন আর কাজলের মতো একটা মেয়ে আর ছেলে থাকত!

    মাস ছয়েক পরের কথা। একদিন কলেজ থেকে বাসায় ফিরে এসে দেখি একটি চিঠি এসেছে, খামের ওপর অপরিচিত হাতে ঠিকানা লেখা। খামটা খুলে দেখি ভেতরে শাওনের লেখা ছোট একটা চিঠি। চিঠিটা পড়ে খুব মন খারাপ হয়ে গেল, কারণ এক জায়গায় লিখেছে

    ইকবাল চাচা, কেন জানি আমার মনে হচ্ছে আমি আর বাঁচব না। আমার কিছু একটা হয়েছে যেটা কোনো ডাক্তার ধরতে পারেনি। আমি দিনে দিনে দুর্বল হয়ে যাচ্ছি। দিনরাত আমার বিছানায় শুয়ে থাকতে হয়। বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমার খুব মন খারাপ হয়ে থাকে তাই আমি শুয়ে শুয়ে সবাইকে চিঠি লিখছি…

    আমি শাওনের চিঠিটা হাতে নিয়ে দীর্ঘসময় বারান্দায় বসে রইলাম। মনে হলো আমার বুকের ভেতর কিছু একটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। কী করব বুঝতে না পেরে আমি ঘরের ভেতর ছটফট করতে লাগলাম। সন্ধ্যেবেলা সেক্রেটারি সাহেবের বাসা থেকে ফোন করার চেষ্টা করলাম। চা বাগানে ফোন নেই। তাই ফোন করতে হলো আমার অন্য এক বন্ধুর কাছে, সেও পরিষ্কার করে কিছু বলতে পারল না। তবে সেও নাকি শুনেছে শাওনের ব্লাড ক্যানসারের মতো কিছু একটা হয়েছে।

    রাতে আমি দীর্ঘ সময় বিছানায় শুয়ে ছটফট করতে লাগলাম। কী করব বুঝতে পারছিলাম না। মাঝরাতে হঠাৎ থানার পেটাঘড়িতে বারোটা ঘণ্টা বাজলে আমি চমকে বিছানায় উঠে বসলাম, আমার হঠাৎ পিশাচ মূর্তিটার কথা মনে পড়ল। এটা কি হতে পারে যে সেই পিশাচটা শাওনের জীবনীশক্তিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। সত্যিই সেটা অশুভ একটা প্রেত, সত্যিই সেটা মানুষের জীবনকে ধ্বংস করে দেয়-বুড়ো সাঁওতাল প্রায় এক যুগ আগে যেটা আমাকে বলেছিল।

    আমি অতিপ্রাকৃত কোনো জিনিস বিশ্বাস করি না, কিন্তু তবুও আমি পরদিন কলেজে ছুটি চেয়ে একটি চিঠি দিয়ে ফয়েজের টি গার্ডেনের উদ্দেশে রওনা দিলাম।

    .

    টি গার্ডেনটা শহর থেকে বেশ দূরে। বাস থেকে নেমে দীর্ঘপথ রিকশা করে গিয়ে বাকিটুকু হেঁটে যেতে হলো। আমি যখন ফয়েজের বাসায় পৌঁছলাম তখন সেন্ধ্যে হয়ে গেছে। আকাশে অসংখ্য নক্ষত্র। তার অস্পষ্ট আলোতে চা বাগানের উঁচু-নিচু টিলাকে অপার্থিব জগতের একটা দৃশ্য বলে মনে হচ্ছিল। শহর থেকে দূরে নির্জন একটা টিলার ওপরে ছবির মতো বাসা। আমাকে দেখে একজন কাজের ছেলে বাসায় খবর দিতে গেল এবং কিছুক্ষণের মাঝেই ফয়েজ বের হয়ে এলো। তার চেহারায় এক ধরনের ক্লান্তি-চোখের কোণে কালি, মুখে অসহায় বিষণ্ণতা। আমাকে দেখে দুর্বলভাবে হাসার চেষ্টা করে বলল, ইকবাল, এসেছিস।

    হ্যাঁ। শাওনের শরীর ভালো নেই খবর পেয়ে মনটা খুব ছটফট করতে লাগল-ভালো হয়েছে এসেছিস। মেয়েটা তোর কথা খুব বলে।

    কী হয়েছে শাওনের?

    ফয়েজ একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, জানি না। সত্যি কথা বলতে কী কেউই জানে না। ব্লাড ক্যান্সার মনে করে কিমোথেরাপি শুরু করেছিল, মেয়েটা তখন আরো দুর্বল হয়ে গেল।

    ফয়েজ খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে আমাকে সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বলল, কেমন করে শুরু হয়েছে, ডাক্তার কী বলেছে, কী চিকিৎসা হয়েছে-সবকিছু৷ এখন বিদেশে নেওয়ার চেষ্টা করছে, ছুটি চেয়ে দরখাস্ত করেছে, কিন্তু শাওনের শরীর এত বেশি খারাপ হয়ে যাচ্ছে যে ভয় হচ্ছে বেশি দেরি না হয়ে যায়। ফয়েজের কথার মাঝে তার স্ত্রী এলো-তাকে দেখে মনে হলো এই অল্প কয়দিনেই বয়স অনেক বেড়ে গেছে। কাজলকেও দেখলাম মনমরা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার জন্যে যে চকলেটের প্যাকেটটা এনেছি সেটা খুব শখ করে খুলে একটা চকলেট বের করে হঠাৎ সেটা খাওয়ার উৎসাহ হারিয়ে ফেলল। আমি দেখলাম খুব সাবধানে একবার চোখ মুছে নিল-নিশ্চয়ই শাওনের কথা মনে পড়েছে।

    শাওন ঘুমোচ্ছিল বলে আমি তখন তাকে দেখতে গেলাম না। ফয়েজ আমাকে তাদের গেস্টরুমে নিয়ে গেল। আমি জামাকাপড় বদলে হাতমুখ ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে নিলাম। টি গার্ডেনে ম্যানেজারদের বাসাগুলো হয় খুব চমৎকার। এক সময় নিশ্চয়ই বিদেশি সাহেবরা থাকত। কারণ ঘরের মাঝে রয়েছে ফায়ার প্লেস-তাছাড়া ঘরটি বিশাল, উঁচু ছাদ, বড় জানালা। জানালা খুললেই দেখা যায় বিস্তৃত চা বাগান। আমি জানালার সামনে দাঁড়িয়ে বাইরে চা বাগানের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কুয়াশায় ঢাকা চা বাগানের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার মন গভীর বিষণ্ণতায় ডুবে যেতে লাগল।

    রাত্রে খাবার পরে আমি শাওনকে দেখতে গেলাম। সে তার ঘরে বিছানায় বালিশে হেলান দিয়ে শুয়ে ছিল, অসম্ভব শুকিয়ে গেছে, কিন্তু তবু তার চেহারায় এক ধরনের লাবণ্য রয়ে গেছে। আমাকে দেখে একটু হাসার চেষ্টা করে বলল, ইকবাল চাচা, আমি মরে যাচ্ছি!

    আমার বুকের ভেতরে ধক করে উঠল, কিন্তু আমি মুখে সেটা প্রকাশ হতে দিলাম না। সে খুব একটা মজার কথা বলেছে এরকম ভঙ্গি করে বললাম, অসুখ হলেই মানুষ যদি মরে যেত তাহলে সারা পৃথিবীতে মানুষ থাকত সাঁইত্রিশজন।

    শাওন হেসে ফেলে আবার মুখ বিষণ্ণ করে বলল, আমি কিন্তু সত্যি মরে যাব। আমি জানি।

    দূর বোকা মেয়ে! আমি গিয়ে তার মাথায় হাত রেখে বললাম, যখন তোমার বয়স হবে তিরানব্বই, তোমার সাতচিল্লশটা নাতি-নাতনি হবে-তখন তুমি মরবে, তার আগে না।

    না ইকবাল চাচা–

    আমি শাওনকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, আমি এসেছি তোমাকে ভালো করে দিতে। শাওন কেমন এক ধরনের জ্বলজ্বলে চোখে আমার দিকে তাকাল, বলল, সত্যি?

    আমার বুকটা ভেঙে যাচ্ছিল, অনেক কষ্টে মুখে হাসি ফুটিয়ে রেখে বললাম, সত্যি।

    তোমাকে ভালো করে তারপর আমি যাব।

    আমার সাথে কথা বলে সত্যি সত্যি শাওন একটু উৎফুল্ল হয়ে উঠল। শাওনকে উৎফুল্ল হতে দেখে কাজলও খুশি হয়ে উঠল। আমি শাওনের বিছানায় বসে দড়ি কাটার ম্যাজিক দেখালাম, বেকুব পাকিস্তানির গল্প বললাম, আমার ফাজিল ছাত্রদের কীর্তি শোনালাম এবং কথা বলতে বলতে হঠাৎ মনে পড়েছে এরকম ভান করে বললাম, আমার বন্ধু কোথায়?

    বন্ধু? শাওন অবাক হয়ে বলল, কোন বন্ধু?

    মনে নেই? তোমাকে যে দিয়েছিলাম-পিশাচবন্ধু!

    ও! সেই মূর্তিটা! আছে। আমার টেবিলে ছিল, জায়গা হয় না বলে নিচে নামিয়ে রেখেছে।

    কাজল বলল, কাঁচের বাক্স তৈরি করেছে আপু-দেখতে এখন আরো ভয়ানক লাগে!

    একদিন হয়েছে কী শোন–

    কাজল তখন কীভাবে তার বন্ধুদের এই মূর্তিটা দেখিয়ে ভয় দেখিয়েছিল তার গল্প বলতে শুরু করে। আমি তার গল্প শুনতে শুনতে টেবিলের কাছে নিচু হয়ে মূর্তিটা খুঁজতে থাকি। একপাশে কিছু বইয়ের আড়ালে ঢাকা পড়েছিল, বইগুলো সরাতেই আমি ভূত দেখার মতো চমকে উঠলাম, মূর্তিটা হঠাৎ যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। মুখে ক্রুর ধূর্ত একটা হাসি, ঠোঁটগুলো লাল এবং যেটা আগে কখনো লক্ষ করি নি–মুখের ভেতর কালচে সাপের মতো একটা জিব। চোখগুলো সব সময়ে আধবোজা ছিল, এখন হঠাৎ মনে হলো সেগুলো খুলে এসেছে, স্থির একটা দৃষ্টিতে সেটা তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, মূর্তিটা দেখে আমার বুকের ভেতরে হঠাৎ যেন কিছু একটা নড়ে যায়। আতঙ্কে আমার শরীর কেঁপে উঠল এবং আমি প্রায় জোর করে নিজেকে শান্ত করে উঠে দাঁড়ালাম।

    ততক্ষণে কাজলের গল্প শেষ হয়েছে, আমি যেটুকু প্রয়োজন সেটুকু হেসে বললাম, আমার বন্ধুটি ভালোই আছে তাহলে!

    শাওন কোনো কথা না বলে স্থির এক ধরনের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বললাম, মূর্তিটা আমার ঘরে নিয়ে রাখি কয়েকদিন?

    শাওন কোনো উত্তর দিল না। আমি নিচু হয়ে মূর্তিটা তুলে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসি। বুকের কাছে ধরে রেখেছিলাম বলেই কি না জানি না আমার নাকে হঠাৎ এক ধরনের চাপা দুর্গন্ধ এসে লাগে, মনে হচ্ছে এই মূর্তিটা থেকেই বের হচ্ছে।

    আমি ঘরের টেবিলে মূর্তিটা রেখে ঘুরে দাঁড়ালাম। অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি, আমার কেমন জানি ভয় ভয় করতে থাকে। আমি শেষ পর্যন্ত সাহস করে মূর্তিটার দিকে তাকালাম এবং হঠাৎ মনে হলো সেটা একটু নড়ে উঠল। আমি চমকে উঠে তীব্র দৃষ্টিতে মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। মনে হতে লাগল আবার বুঝি সেটা নড়ে উঠবে, কিন্তু সেটা আর নড়ল না-নিশ্চয়ই আমার মনের ভুল! কিন্তু যতবার আমি সেটা থেকে চোখ সরাই ততবারই মনে হয় সেটা একটু নড়ে ওঠে, খুব বেশি নয়; কিন্তু চোখে ধরা পড়ার জন্যে যথেষ্ট।

    রাত্রি এগারটার দিকে বাসার একজন মানুষ এলো আমার ঘরে ফায়ার প্লেসটি জ্বালিয়ে দিতে। আমি শুধু সিনেমায়-টিভিতে মানুষকে ফায়ার প্লেস জ্বালাতে দেখেছি সত্যি সত্যি যে এখানে কেউ ফায়ার প্লেস জ্বালাতে পারে জানতাম না। ঘরের মাঝে আগুন জ্বলছে ব্যাপারটা আমার কাছে কেন জানি অস্বাভাবিক মনে হয়। আমি একটু ইতস্তত করছিলাম, লোকটা বলল, স্যার এখানে রাত্রে অসম্ভব ঠাণ্ডা পড়ে। এটা জ্বালিয়ে দিলে আরামে ঘুমাবেন।

    আমি বললাম, এখন তো সেরকম ঠাণ্ডা নেই।

    তা নেই, কিন্তু ভোররাতের দিকে চারদিক বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।

    আমি আর আপত্তি করলাম না, লোকটা ফায়ার প্লেসটি জ্বালিয়ে দিল। সাথে সাথে সারা ঘরে আগুনের একটা নরম উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে। আমি খানিকক্ষণ জানালার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে আমার টেবিলের কাছে ফিরে এলাম, সেখানে পিশাচের মূর্তিটি অত্যন্ত ক্রুর মুখভঙ্গি করে বসে আছে।

    রাত্রে আমার ঘুমাতে ঘুমাতে খুব দেরি হয়, আজকেও সেরকমই হবে ভেবে আমি বিছানায় আধশোয়া হয়ে একটা হালকা উপন্যাস নিয়ে বসেছি রগরগে কাহিনী-ট্রেনে, বাসে পড়া যায় বলে শুরু করেছিলাম এখন শেষ করে দেব বলে ভাবলাম। দু-এক পৃষ্ঠা পড়তেই ইলেকট্রিসিটি চলে গেল, ঘরে ফায়ার প্লেস ছিল বলে ঘরে অন্ধকার নেমে না এসে এক ধরনের আধিভৌতিক আলো খেলা করতে থাকে। ফায়ার প্লেসে আগুনের শিখা নড়ছে। সেই আলোতে ঘরে বিচিত্র এক ধরনের লম্বা লম্বা ছায়া পড়ে এবং সেই ছায়া আগুনের শিখার সাথে সাথে নড়তে থাকে।

    আমি কী করব ভাবতে ভাবতে নিচে নামতেই দরজায় ফয়েজ এসে দাঁড়াল, বলল, ইকবাল, ঘুমিয়ে গেছিস?

    না। ইলেকট্রিসিটি চলে গেল।

    হ্যাঁ। আজকাল প্রায়ই চলে যাচ্ছে। আমাদের টি গার্ডেনের নিজস্ব ডায়নামো আছে, এমনিতে অসুবিধে হবার কথা নয়। তবে অনেক রাত হয়ে গেছে, আজ মনে হয় সেটা চালাবে না। এই মোমবাতিটা রাখ।

    আমি মোমবাতিটা নিয়ে ফায়ার প্লেসের উপরে রেখে বললাম, ফায়ার প্লেসের আগুনে বেশ দেখা যাচ্ছে, মোমবাতি না হলেও ক্ষতি নেই।

    তা ঠিক।

    এখন তো আমিও আছি, কিছু দরকার হলে বলিস।

    ফয়েজ নিঃশ্বাস ফেলে বলল, বলব।

    আমি বিছানায় শুয়ে আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে এক সময়ে ঘুমিয়ে গেলাম।

    কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলাম জানি না, হঠাৎ করে আমার ঘুম পুরোপুরি ভেঙে গেল। ঘুমটি কেন ভেঙেছে আমি জানি না। কিন্তু আমার সমস্ত স্নায়ু মুহূর্তে ঘুমের সমস্ত অবসাদ ঝেড়ে ফেলে একেবারে টান টান হয়ে রইল। আমার কেন জানি মনে হতে থাকে খুব অশুভ কিছু একটা ঘটছে। সেটি কী আমি জানি না। কিন্তু আমার সমস্ত চেতনা সেটার জন্যে প্রস্তুত হয়ে রইল। ফায়ার প্লেসের আগুন কমে সেখানে এখন একটা গনগনে লাল আভা, তার ম্লান আলোতে ঘরে আবছা অন্ধকার। ঘুমানোর সময় ঘরে যেরকম একটা আরামদায়ক উষ্ণতা ছিল এখন সেটা নেই, সারা ঘর হিমশীতল। আমার সমস্ত শরীর কাঁটা দিয়ে ওঠে। আমি বিছানা থেকে নামতেই নাকে একটা অস্বস্তিকর গন্ধ পেলাম, পচা রক্তের অসুস্থ একটা গন্ধ। গন্ধটা কোথা থেকে আসছে কে জানে। আমি ফায়ার প্লেসের আগুনটা একটু চাগিয়ে দিতে গেলাম, কাছেই একটা সুচালো লোহার রড রাখা ছিল, সেটা দিয়ে খুঁচিয়ে দিতেই একটা আগুনের শিখা দপ দপ করে জ্বলে উঠে ঘরে লালাভ একটা আলো জ্বলে ওঠে। আমি ঘুরে টেবিলের দিকে তাকালাম এবং হঠাৎ আমার সমস্ত শরীর জমে গেল, টেবিলে কাঁচের বাক্সটি খালি, মূর্তিটা সেখানে নেই।

    আমি আজীবন কঠিন বাস্তবতায় মানুষ হয়ে এসেছি, অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃতিক জিনিস আমি বিশ্বাস করি না। কিন্তু সেই মুহূর্তে হঠাৎ কেন জানি আমি নিঃসন্দেহ হয়ে গেলাম পিশাচটি প্রাণ পেয়ে শাওনের ঘরে গেছে। যদি আমি কিছু না করি ভয়ংকর একটা কিছু ঘটে যাবে। আমি ফায়ার প্লেসের আগুন খোঁচানোর রডটি হাতে নিয়ে ঘর থেকে পা টিপে টিপে বের হলাম।

    আমার ঘরটি একটা হলঘরের সাথে লাগানো। সাথে একটা করিডোর। আমি করিডোর ধরে হাঁটতে থাকি আর সাথে সাথে আমার নাকে আবার সেই পচা গন্ধটা এসে লাগে। আমি পা টিপে টিপে শাওনের ঘরে এলাম, সাবধানে দরজা স্পর্শ করতেই সেটা খুলে গেল, সাথে সাথে আমার নাকে বোটকা দূষিত গন্ধটি আবার এসে ধাক্কা দেয়। আমি শাওনের ঘরে এসে ঢুকলাম, ঘরটি হিমশীতল। শাওনের বিছানার কাছে একটা ব্যাটারি চার্জার লাগানো বাতি জ্বলছে, সেটা অন্ধকারকে দূর না করে আরো কেমন যেন বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি আরেকটু এগিয়ে গেলাম, মশারির কাছে গিয়ে উঁকি দিতেই আমার সমস্ত শরীর আতঙ্কে শিউরে উঠল। বিছানায় তার মাথার কাছে কুৎসিত লোমশ একজন মানুয় বসে আছে, মুখে পৈশাচিক এক ধরনের হাসি, চোখ দুটি অঙ্গারের মতো জ্বলছে। সেটি আমার দিকে ক্রুর দৃষ্টিতে তাকাল। মনে হলো সেই দৃষ্টি আমার সমস্ত শরীর ভেদ করে চলে গেল।

    আমি কী করব বুঝতে পারছিলাম না। নিজের ভেতরে একটা ভয়াবহ আতঙ্ক এসে ভর করেছে। তবুও দুই হাতে শক্ত করে লোহার রডটি নিয়ে এগিয়ে গেলাম। শাওনকে বাঁচিয়ে প্রাণীটাকে আঘাত করার মতো কিছু একটা জিনিস সম্ভবত আমার মাথায় কাজ করছিল। কিন্তু হঠাৎ হুটোপুটির মতো একটা শব্দ হলো, আমি দেখলাম প্রাণীটি সেখানে নেই। মনে হলো ঘরের মাঝে কিছু একটা ছুটোছুটি করছে, কিন্তু আমি তাকে দেখতে পাচ্ছি না। টেবিলটা নড়ে উঠল হঠাৎ, সেলফ থেকে দুটো বই নিচে এসে পড়ল, শাওনের বিছানাটা হঠাৎই কেঁপে উঠল। আমি দুই হাতে শক্ত করে লোহার রডটা ধরে রেখে দাঁড়িয়ে থাকি। যে জিনিসকে চোখে দেখা যায় না তাকে আঘাত করা যায় কি না সেটা একবারও আমার মাথায় এলো না। ঘরের দরজা হঠাৎ হুট করে খুলে গেল। সাথে সাথে ঘরের সব হুটোপুটি থেমে গেল।

    আমি শাওনের কাছে ছুটে গেলাম। তার গলার কাছে খানিকটা রক্ত, আমি তার হাত স্পর্শ করে বুকের কাছে মাথা নামিয়ে আনলাম। দেখলাম খুব ধীরে ধীরে তার বুক উঠছে-নামছে, সে নিঃশ্বাস নিচ্ছে–এখনো বেঁচে আছে শাওন।

    আমি মশারি নামিয়ে শাওনের ঘর থেকে বের হয়ে নিজের ঘরের দিকে ছুটে এলাম। দরজা খুলে ঘরে ঢুকতেই দেখি টেবিলের ওপর কাঁচের বাক্সটাতে মূর্তিটা আবার ফিরে এসেছে। আমি দুই হাতে লোহার রডটা ধরে মূর্তিটার দিকে এগিয়ে গেলাম। ফায়ার প্লেসের আগুনে স্পষ্ট দেখলাম এর মুখের পাশে রক্ত লেগে আছে, মূর্তিটা আমার দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ তার জিবটা বের করে তার মুখের রক্ত চেটে খেয়ে নেয় একবার।

    অমানুষিক আতঙ্কে আমি তখন কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছি। লোহার রডটা ওপরে তুলে আঘাত করতেই ঝন ঝন করে কাঁচের বাক্সটা ভেঙে গেল। মূর্তিটা তখন টেবিলের ওপর স্থির হয়ে বসে আছে, আমার মনে হতে থাকে এটি আসলে কোনো মূর্তি নয় এটা মূর্তিমান বিভীষিকা যেভাবেই হোক এটাকে আমার ধ্বংস করতেই হবে। আমি আবার লোহার রডটা তুলে এটাকে আঘাত করতে গেলাম। হঠাৎ মূর্তিটা টেবিল থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তার হাত বিশাল আকার নিয়ে আমার দিকে ছুটে আসে। আমি অন্ধের মতো চোখ বন্ধ করে আঘাত করলাম, ভয়ংকর একটা আর্তনাদ শুনতে পেলাম। হঠাৎ দেখি মূর্তিটা ছিটকে ফায়ার প্লেসের আগুনের মাঝে গিয়ে পড়েছে। মাংসপোড়া বিশ্রী গন্ধে ঘরটা কলুষিত হয়ে গেল। চড়চড় শব্দ করে পুড়তে থাকে মূর্তিটা। আমি দেখতে পাই তার মাঝে সেটা কিলবিল করে নড়ছে

    ফয়েজ আর তার স্ত্রী যখন নেমে এসেছে তখন ফায়ার প্লেসে মূর্তিটার বিশেষ কিছু অবশিষ্ট নেই। আমার ঘরে এসে ফয়েজ ভয় পাওয়া গলায় জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে ইকবাল?

    আমি লোহার রডটা নিচে রাখতে রাখতে বললাম, ঘরে বাদুড় কী যেন ঢুকেছিল, মারতে গিয়ে ভুল করে মূর্তিটাকে মেরে বসেছি! ছিটকে গিয়ে পড়েছে আগুনে

    ফয়েজের স্ত্রী বলল, ভালো হয়েছে পুড়েছে আপদ! কী বিশ্রী গন্ধ বের হয়েছে দেখেছ?

    আমি কোনো কথা বললাম না। ফয়েজ বলল, বিকট একটা চিৎকার শুনতে পেলাম–

    আমি হাসার চেষ্টা করে বললাম, আমি নিশ্চয়ই ভয় পেয়ে করেছি! হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে গিয়ে মাথার ঠিক নেই–

    ফয়েজের স্ত্রী বলল, শাওনকে দেখে আসি।

    আমি বললাম, হ্যাঁ এত চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে গেছে নিশ্চয়ই।

    শাওনের ঘরে গিয়ে দেখি সে বিছানায় চুপচাপ বসে আছে। আমাদের দেখে বলল,

    তোমরা এত রাতে কী করছ?

    তার মা বলল, তোকে দেখতে এলাম–

    শাওন হেসে বলল, ভালো করেছ মা। আমার কী মনে হচ্ছে। জান?

    কী?

    আমি ভালো হয়ে যাব।

    আমি বললাম, একশ বার তুমি ভালো হয়ে যাবে!

    আমি একটু বিছানা থেকে উঠি?

    ফয়েজ ভয় পাওয়া গলায় বলল, পারবি উঠতে?

    পারব বাবা।

    ফয়েজ এগিয়ে গিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল, শাওন তাকে ধরে উঠে দাঁড়াল। ফয়েজের স্ত্রী হঠাৎ এগিয়ে গিয়ে বলল, সে কী, তোর গলায় রক্ত কিসের?

    আমি তাড়াতাড়ি বললাম, মশা! নিশ্চয়ই মশা। চা বাগানের মশা রক্ত খেয়ে ঢোল হয়েছিল, শাওন নিশ্চয়ই ঘুমের মাঝে মেরে বসেছে।

    .

    তরফদার গল্প শেষ করে থামলেন, আমি আটকে থাকা একটা নিঃশ্বাস বের করে দিয়ে বললাম, তারপর শাওনের কী হলো? ভালো হয়ে গেল?

    হ্যাঁ। অনেকদিন আগের কথা, এখন বিয়ে হয়ে গেছে।

    ভালো আছে শাওন।

    তাকে কোনোদিন বলেছেন গল্পটা?

    না বলি নি। এরকম আজগুবি একটা গল্প বলার ইচ্ছে করে না।

    আনিস ঘাড় বাঁকা করে বলল, তাহলে আমাদের যে বললেন?

    তোমাদের বলেছি মাঝরাতে, যখন বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি হচ্ছে, একটা ভুতুড়ে আবহাওয়া, ভালো গল্পই ভুতুড়ে শোনায় তাই! কাল ভোরে তোমরা ভাববে, তরফদার সাহেব কী গাঁজাখুরি গল্পই না করতে পারে! কী, ভাববে না?

    আমি মাথা নাড়লাম, মনে হয় ভাবব।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleভূতের বাচ্চা সোলায়মান – মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    Next Article সায়েন্স ফিকশন সমগ্র ৫ – মুহম্মদ জাফর ইকবাল

    Related Articles

    মুহম্মদ জাফর ইকবাল

    ছোটগল্প – মুহম্মদ জাফর ইকবাল

    November 19, 2025
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল

    সাদাসিধে কথা – মুহম্মদ জাফর ইকবাল

    November 19, 2025
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল

    মেকু কাহিনী – মুহম্মদ জাফর ইকবাল

    November 19, 2025
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল

    আমার বন্ধু রাশেদ – মুহম্মদ জাফর ইকবাল

    November 19, 2025
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল

    সায়েন্স ফিকশান সমগ্র ১ – মুহম্মদ জাফর ইকবাল

    November 19, 2025
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল

    টুনটুনি ও ছোটাচ্চু – মুহম্মদ জাফর ইকবাল

    November 19, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Our Picks

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }