ফেরা – দেবদুলাল কুণ্ডু
পিচকুড়ির ঢাল। একটা ছোট্ট স্টেশন। বোলপুর যাবার পথে এই স্টেশনটা পড়ে। সেবার শান্তিনিকেতনে গিয়েছিলাম দোল উৎসব দেখার জন্য। যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা জানেন কবিগুরুর আশ্রমে বর্তমানে আন্তরিকতার জায়গায় কীভাবে বৈভব আর জাঁকজমকতা এসেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণের টানে এখানে আজও আসে। তারপর উৎসব দ্যাখে, দূর থেকে দ্যাখে বলাই ভালো। তবুও অংশ নেয়। আমারও একবার আগ্রহ হল শান্তিনিকেতনে উৎসব দেখার। কিন্তু ভিড় ঠেলে উৎসব-মঞ্চের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারলাম না। তা নাই বা পারলাম, তাই বলে সেলফি তুলব না তাই হয়! সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুদের হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দিলাম; দ্যাখ আমি দোলে শান্তিনিকেতনে এসেছি। যাই হোক সেখান থেকে কোপাইয়ের ধারে গেলাম; ফেরার পথে টোটো করে খোয়াই ঘুরে সস্তার হোটেলে ভাত আর ডিমের ঝোল খেয়ে ফেরার ট্রেন ধরলাম। কিন্তু এই সমস্ত কাজটুকু করতে গিয়েও রাত হয়ে গেল। ট্রেনে উঠতে গিয়ে ভাবলাম, আচ্ছা এখানেই তো আমার ছোটবেলার এক বন্ধু দীপু থাকে পিচকুরির ঢাল নামে একটা স্টেশনের পাশের এক গ্রামে। আজকের রাতটা ওর ওখানে থেকে গেলেও মন্দ হয় না। আসলে হাইস্কুলে সিক্স থেকে টেন অবধি আমরা একসঙ্গে পড়েছিলাম। খুব দারুণ বন্ধুত্ব ছিল আমাদের। ও হত ফার্স্ট আর আমি সেকেন্ড। মনে আছে মাধ্যমিকে অঙ্ক পরীক্ষায় এক্সট্রা জ্যামিতি কিছুতেই হচ্ছিল না আমার। দীপু আমাকে সাহায্য না করলে একশো পেতে হত না অঙ্কে। ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলেও ওর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। একবার এসেছিলামও ওর বাড়িতে; সেও কম করে পাঁচ বছর আগে হবে। দীপু তখন সদ্য স্কুল মাস্টারিতে ঢুকেছে। ভাবলাম এবারে না জানিয়েই ঢুঁ মারব ওর বাড়িতে।
পিচকুড়ির ঢালে যখন নামলাম, তখন রাত আটটা বাজে। আমার সঙ্গে আরও গোটা চারেক লোক নামল। তারা স্থানীয় কুলি-কামিন হবে। কিন্তু দ্রুতপায়ে তারা মিলিয়ে গেল এদিক ওদিক। নামার সঙ্গে সঙ্গে ঝেঁপে বৃষ্টি এল। কী করি ভাবতে ভাবতে টিকিট কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেলাম। দীপুদের গ্রাম স্টেশন থেকে মাইল খানেক দূরে। এদিকে বৃষ্টি থামারও কোনও লক্ষণ দেখছি না। এই রাতে ওখানে কীভাবে পৌঁছাব বুঝে উঠতে পারলাম না। স্টেশন মাস্টার আমাকে জানালেন, “কী আর করবেন, রাতটা ওয়েটিং রুমে থেকে যান; ভোরে যাবেন।”
অগত্যা তাই করলাম। একটু পরে স্টেশন মাস্টার জলের বোতল আর মশার কয়েল পাঠিয়ে দিলেন। ঘরটা মোটামুটি পরিষ্কার। মাথার উপরে একটা নোংরা ও ক্লান্ত ফ্যান ক্যাচর ম্যাচর শব্দ করে ঘুরছে। আর দেওয়ালে জ্বলছে আদ্যিকালের একশো পাওয়ারের একটা বাল্ব। আমার কাছে বিছানার চাদর ছিল; বিছিয়ে নিলাম মেঝেতে। তারপর ব্যাগটা মাথার নীচে রেখে শুয়ে পড়লাম।
ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ জেগে উঠলাম এক যুবকের কণ্ঠস্বর শুনে — “দাদা, শুনছেন?”
—“ক্-কে?”
—“ভয় পাবেন না, আমি মিথিলারঞ্জন—”
—“তা আমি কী করব শুনি? দিলে তো ঘুম ভাঙিয়ে?” উঠে বসলাম আমি।
—“না ইয়ে এই ট্রেনেই নামলাম। এদিকে প্রবল বৃষ্টি। স্টেশন মাস্টার বলল আপনিও নাকি নসিবপুরে যাচ্ছেন…?”
—“যাবার তো ইচ্ছে ছিল, কিন্তু এই বৃষ্টিতে সব ভেস্তে দিল; ভাবছি কাল সকালে যাব। তা তুমি কি ওই গ্রামেই থাকো?” এবারে ভালো করে তাকালাম ছেলেটার দিকে। কুড়ি-একুশ বয়সের যুবক। পরনের ফিরোজা রঙের জিন্স কাদায় প্রায় মাখামাখি। গায়ে মব-কালারের একটা টি-শার্ট। ফরসা চেহারা। টিকালো নাক। চোখদুটো ভাসা ভাসা।
—“আজ্ঞে হ্যাঁ, ওখানেই আমার বাড়ি।”
—“দীপুকে চেনো? দীপেশ সরকার?”
—“কী যে বলেন? আমাদের বাড়ি থেকে পাচঁ মিনিটের দূরত্ব। মাস্টার মশাইয়ের কাছে আমার কথা বলবেন।”
—“তা তুমি কোথা থেকে আসছ?”
—“হাওড়া থেকে। বড়বাজারে সোনা-পট্টিতে কাজ করি।”
আমার আর ঘুম এল না। ওর সঙ্গে গালগল্প করে রাতটা কাটিয়ে দিলাম। মোবাইলে দেখলাম, ভোর পাঁচটা। আড়মোড়া ভেঙে মিথিলারঞ্জন বলল, “দাদা, একটা রিকোয়েস্ট ছিল।”
—“বলো।”
—“আসলে আমি বাড়ি ফিরতে চেয়েছিলাম এই ব্যাগটার জন্যে। এর ভেতরে মা আর দাদার ছেলেমেয়ের জন্য নতুন কাপড়-চোপড় আছে। বুঝতেই তো পারছেন পরের দোকানে কাজ করি। এই ভোরেই গাড়িতেই ফিরতে হবে সেখানে। আপনি তো আমাদের গ্রামেই যাচ্ছেন; তাই এই ব্যাগটা যদি পৌঁছে দিতেন আমার বাড়িতে।”
কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করলাম আমি; বললাম, “এত কাছে এসেও বাড়ি ফিরবে না?”
—“পরের সপ্তাহে যাব দাদা, প্লিজ—”
—“ঠিক আছে দাও।” মিনমিনে গলায় বললাম আমি। ও হাসিমুখে ব্যাগটা দিয়ে পাঁচটা পাঁচের ডাউন হাওড়া প্যাসেঞ্জার ধরল।
প্রাতঃকৃত্য সেরে ব্যাগপত্র গুছিয়ে মাটির রাস্তায় নামব বলে তৈরি হচ্ছি। এমন সময় এক পেপার ওয়ালার আবির্ভাব ঘটল। সে পেপার নিয়ে গ্রামের দিকেই যাবে; আমি একটা দৈনিকপত্র কিনলাম। তারপর এগিয়ে গিয়ে চায়ের দোকানে বসলাম, ভাবলাম চা খেয়ে নিয়ে তারপর যাব। পেপার খুললাম। পাতার পর পাতা ওলটাতে লাগলাম; চোখ আটকে গেল জেলার খবরে। এ কী — ‘গতকাল রাত আটটার ট্রেনে বর্ধমান স্টেশনে ট্রেনে চাপা পড়ে এক যুবকের মৃত্যু, প্যান্টের পকেটে মানিব্যাগ থেকে পাওয়া আই কার্ড অনুযায়ী নাম — মিথিলারঞ্জন…’ ছবিতে এই তো মব কালারের গেঞ্জি, ফিরোজা জিন্স… টিকালো নাক…। আমার হাতে ধরা মিথিলার ব্যাগের দিকে তাকালাম; এ কী করে সম্ভব…!
***
দেবদুলাল কুণ্ডু
জন্ম ১৯৭৪। শিক্ষাগত যোগ্যতা বাংলায় এম.এ, বি.এড। পেশায় শিক্ষক। আকৈশোর সাহিত্যপ্রেম। ছাত্রজীবনে কবিতা ও প্রবন্ধ দিয়ে লেখালেখির সূত্রপাত। ২০০৯ সালে ছোটদের সাহিত্য পত্রিকা ‘দোলনা’র সম্পাদনা শুরু। ওই বছরেই “গণশক্তি” সংবাদপত্রে প্রথম গল্পের প্রকাশ। তারপর থেকে ছোট ও বড়দের জন্য সমানে গল্প-ছড়া-কবিতা লিখে চলেছেন। “দেশ”, “আনন্দবাজার পত্রিকা”, “আনন্দমেলা” “সন্দেশ”, “শুকতারা”, “কিশোর ভারতী”, “সাপ্তাহিক বর্তমান”, “চিরসবুজ লেখা” প্রভৃতি পত্র-পত্রিকায় তাঁর লেখা ইতিমধ্যেই প্রকাশ পেয়েছে। ২০১৬ সালে শিশুসাহিত্য সংসদ থেকে প্রকাশিত হয়েছে ছোটদের গল্পসংকলন ‘হাতু ও বাঘা’।
