মহাত্মা কবীরের জীবন – ১
এক
এ কাহিনির সূত্রপাত আজ থেকে সাড়ে পাঁচশো বছর আগে। আমরা জানি যে—কোনো মানুষের জীবনদর্শনের ওপর সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে। তাই কবীরের জীবন এবং জীবনদর্শন সম্পর্কে জানতে হলে তাঁর সময়ে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক—সাংস্কৃতিক অবস্থা কেমন ছিল সেদিকে একবার দৃষ্টিপাত করা দরকার।
তখন ভারতে চলছে পাঠান সুলতানদের শাসন। মধ্যপ্রাচ্য থেকে এই যোদ্ধা জাতি ভারতে এসে এক বিশাল ভূখণ্ডের ওপর আধিপত্য কায়েম করেছে। সুদূর আরব থেকে অনেকটা পথ পার হয়ে মানবতাবাদের ধর্ম ইসলাম ভারতের নানা প্রান্তে উড়িয়ে দিয়েছে তার জয়পতাকা। যে হিন্দুধর্মকে আমরা বিশ্বের সনাতন ধর্ম বলে থাকি, যে ধর্মের বিভিন্ন সাধকরা একসময়ে বৌদ্ধিক সাধনায় আত্মনিমগ্ন ছিলেন, সেই ধর্মে দেখা দিয়েছে অনভিপ্রেত হানাহানি। একটি সম্প্রদায়ের মানুষ অন্য সম্প্রদায়ের মানুষকে স্বীকার করতে পারছেন না। অন্ধ কুসংস্কারে আচ্ছন্ন হয়েছে মানুষের মন। নারীর ওপর আরোপ করা হয়েছে সামাজিক বিধিনিষেধ। উচ্চবর্ণের মানুষ নিম্নবর্ণের মানুষকে নানাভাবে অত্যাচার করছেন। এই অন্তর্বিরোধ এবং সংকীর্ণতার ফলে হিন্দুধর্ম হারিয়েছে তার সুমহান গৌরব। তাই তথাকথিত অস্পৃশ্য এবং নীচ সম্প্রদায়ের মানুষ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ইসলাম ধর্মের কাছে আশ্রয় গ্রহণ করছেন। এর পাশাপাশি কিছু ইসলাম শাসক বলপ্রয়োগ করে দরিদ্র হিন্দুদের ধর্মত্যাগে বাধ্য করছেন। এইভাবে হিন্দু ধর্ম তখন এক মহাসঙ্কটের মধ্যে পড়েছে। যেহেতু ইসলাম ধর্মে কোনো বর্ণভেদ বা অস্পৃশ্যতা নেই, নেই কোনো সংকীর্ণতা, তাই অনেক হিন্দু এই ধর্মের ইতিবাচক দিকগুলির প্রতি আকর্ষণ বোধ করছেন। আবার যেহেতু হিন্দুধর্মে আছে প্রবল বর্ণবিদ্বেষ, অস্পৃশ্য হবার অপরাধে অনেক মানুষকে দিন কাটাতে হয় রুদ্ধ কারার অন্তরালে, তাই দেখা দিয়েছে চাপা বিদ্রোহ, হিন্দুধর্মের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মানুষের মনে জেগেছে নানা প্রশ্ন!
ঠিক এইসময়ে এক মহাত্মা সাধকের জন্ম হয়েছিল, তিনি হলেন রামানুজ সম্প্রদায়ের মহাগুরু বৈষ্ণব সাধক রামানন্দ। রামানন্দ ছিলেন এক আধুনিক মনস্কতার মানুষ। বিষ্ণুর উপাসক হওয়া সত্ত্বেও রামের ভক্ত ছিলেন। রামই ছিলেন তাঁর ইষ্টদেবতা। রামকে তিনি বিষ্ণুর প্রথম এবং সাক্ষাৎ অবতার বলে বিশ্বাস করতেন। রামানন্দের গ্রহণযোগ্যতা তখন এক অবিশ্বাস্য পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। অসংখ্য মানুষ তাঁকে অনুসরণ করতেন। তাঁর মুখনিঃসৃত অমৃতবাণী শ্রবণ করার জন্য মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা থাকতেন অপেক্ষাতে। এই রামানন্দ একদিন ঘুরতে ঘুরতে এলেন কাশী শহরে। তাঁকে দেখার জন্য মানুষজনের মধ্যে তীব্র আলোড়নের সৃষ্টি হল।
সব সময় রামানন্দ এক ভাবোন্মাদ অবস্থায় থাকতেন। তাঁকে দেখে মনে হত তিনি বোধহয় এই পৃথিবীর বাসিন্দা নন। তাঁর মন কোনো মহাকাশে হারিয়ে গেছে। রামানন্দ অস্পৃশ্যতা মানতেন না। প্রতিটি মানুষকে ঈশ্বরের সাক্ষাৎ প্রতিভূ বলে শ্রদ্ধা করতেন। রামানন্দ অনেক তথাকথিত নীচ মানুষকে দীক্ষা দিয়েছিলেন। আর সেইজন্য তখনকার দিনের প্রাচীন মনোভাবাপন্ন সমাজপতিরা রামানন্দকে সহ্য করতে পারতেন না। তাঁদের চোখে রামানন্দ ছিলেন এক জীবন্ত বিস্ময়!
নিশান্তিকার আলোয় রাঙা পৃথিবীতে রামানন্দ ঘুম থেকে উঠতেন। পুণ্যতোয়া জাহ্নবীতে গিয়ে অবগাহন করতেন। গতদিনের শত অপবিত্রতাকে দূর করে দিতেন। তারপর ঘাটে বসে করতেন রামনাম সংকীর্তন। দেখতে দেখতে অসংখ্য মানুষ এসে তাঁর চারপাশে ভিড় করত। সেদিনও রামানন্দ তাঁর দৈনন্দিন ক্রিয়াকলাপ শুরু করেছেন। আবেগে আপ্লুত হয়ে রামনাম সংকীর্তন করছেন। এইসময় এক ব্রাহ্মণ শিষ্য এসে পরম ভক্তিভরে গুরু রামানন্দকে প্রণাম করলেন। তারপর তাঁর পাশে এসে বসলেন। অবাক বিস্ময়ে শ্রবণ করতে লাগলেন তাঁর মুখনিঃসৃত রামনাম সংকীর্তন। সেই ব্রাহ্মণ শিষ্যের সঙ্গে তাঁর বাল্যবিধবা কন্যাটিও সেদিন গঙ্গার তীরে এসেছিল। পিতাকে অনুসরণ করে সে—ও পরম শ্রদ্ধা—ভক্তি ভরে গুরু রামানন্দকে প্রণাম করে। ক্ষণকালের জন্য ফেলে আসা দিনযাপনের শোকবিহ্বল মুহূর্তগুলির কথা মনে পড়ে যায় ওই কন্যার। এই বয়সেই তাকে কিনা স্বামীহারা হতে হয়েছে। তখনকার সমাজে বিধবাদের স্থান ছিল অন্ধকারের অভ্যন্তরে। কোনো সামাজিক কাজে তাদের স্বীকৃতি দেওয়া হত না। বলা হয় তারা সারাজীবন অভিশপ্ত হয়েই দিন কাটাবে। বেচারি কন্যা, তাকেও এইভাবে সকলের লাঞ্ছনা এবং গঞ্জনা সহ্য করতে হয়।
রামানন্দ এতক্ষণ রামনামে বিভোর ছিলেন। যখন তিনি রামনাম করেন, তখন তাঁর বাহ্যজ্ঞান বিলুপ্ত হয়। এবার তিনি পার্থিব জগতে ফিরে এলেন। চোখ দুটি খুললেন। চোখের সামনে উপবিষ্টা সেই ব্রাহ্মণ কন্যাকে দেখে তাঁর সমস্ত অন্তর কেমন যেন আলোড়িত হল। তিনি আশীর্বাদ করে বললেন—’আমি আশীর্বাদ করছি মা, অচিরেই তুমি পুত্রবতী হবে।’
গুরু রামানন্দের মুখ থেকে এই বাক্যগুলি উৎসারিত হবার সঙ্গে সঙ্গে সেই ব্রাহ্মণ শিষ্যের মনে হল সেখানে ভূকম্পন শুরু হয়েছে। তাঁর কন্যা যে বাল্যবিধবা তা হয়তো আত্মমগ্ন গুরু রামানন্দ লক্ষ করেননি। এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে বেচারি মেয়েটির মনে হল কে যেন এক লহমায় তার হৃদস্পন্দন স্তব্ধ করে দিয়েছে। ভয়ে বিস্ময়ে সে হয়ে গেল বাকহারা! তারপর দুজনেই কেঁদে লুটিয়ে পড়ল গুরুর পায়ে। তারা জানে সিদ্ধ সাধক মুখ দিয়ে যে কথা একবার উচ্চারণ করেন, সেকথা সত্য হবেই। কেউ তার সামনে প্রতিবন্ধকতার প্রাচীর তৈরি করতে পারবে না।
সবকথা শোনার পর গুরু বললেন, আমি আশীর্বাদ করছি, এই পুত্র লাভে তোমার কোনো কলঙ্ক হবে না। পুরুষ সংসর্গ ছাড়াই তুমি এমন এক পুত্র সন্তানের জননী হবে যে হবে মনের ত্রাতা। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি জগতের পরিত্রাণের জন্য এক মহাপুরুষ তোমার গর্ভে পুত্ররূপে আসবেন। তিনি প্রসূত হবেন অলৌকিকভাবে। অযোনি সম্ভূত সেই সন্তান মায়ের তালু থেকে ভূমিষ্ঠ হবে।
এই কথা শোনার পর ব্রাহ্মণ শিষ্যের মনে এক আশ্চর্য শিহরণের জন্ম হয়েছিল। দেখতে দেখতে দিন কেটে যায়। অবশেষে একদিন সত্যি সত্যি এক দেবশিশুকে প্রসব করে ওই অভিশপ্ত কন্যা। বিধবার সন্তান প্রসব—এই ব্যাপারটি নিয়ে সমাজে সৃষ্টি হবে দারুণ আলোড়ন! তারা জানে যে এর জন্য তাদের সমাজ থেকে বিতাড়িত হতে হবে। সেই মুহূর্তে আর গুরু রামানন্দের আদেশের কথা মনে পড়েনি ওই ব্রাহ্মণ শিষ্যের, তিনি ভাবলেন অচিরেই এই পুত্র সন্তানটিকে বিদায় করতে হবে। কিন্তু একে হত্যা করা উচিত হবে না, একে কোনো এক জায়গায় রেখে আসতে হবে। কিন্তু কোথায় আছে এমন একটি নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাপূর্ণ স্থান?
তখন কাশীর একটি পল্লি অঞ্চলে ছিল ‘লহর তালাও’ নামে একটি পদ্মপুকুর। সেখানে থরে থরে পদ্মফুল ফুটে থাকত। ভারি সুন্দর সেই অঞ্চলটি। মনে হত সেটি বুঝি প্রকৃতির এক খেয়ালি খেলাঘর। সদ্য—মাতা সেই বিধবা কন্যা শেষবারের মতো তাকাল তার নবজাত পুত্রটির মুখের দিকে। হু—হু করে উঠল মায়ের সমস্ত অন্তর। সে ভাবল এই জীবনে আর কখনো সন্তানের সঙ্গে দেখা হবে না তার। কিন্তু কী আর করা যায়? সমস্ত দিন অতিবাহিত করতে হবে ভয়ে ভয়ে। রাতের অন্ধকার নেমে এলে সে ওই নবজাতককে নিয়ে পৌঁছে যাবে পদ্মপুকুরের পাশে। দেখতে দেখতে সূর্য গেল অস্তাচলে। শেষ রশ্মির আলোকছটায় আলোকিত হয়ে উঠল সাঁঝের আকাশ। মেয়েটি এতক্ষণ আগলে বসেছিল। এবার সকল বন্ধন ছিন্ন করতে হবে। রাতের অন্ধকার ঘনীভূত হবার সঙ্গে সঙ্গে সে এক—পা এক—পা করে ওই শিশুটিকে নিয়ে পৌঁছে গেল পুকুরপাড়ে। এক রাশ পদ্মের মাঝে নবজাতককে শুইয়ে দিয়ে চলে এল। এতক্ষণ পর্যন্ত অবরুদ্ধ যে কান্না তার বুকের খাঁচায় বন্দি ছিল, এখন তা নীল আসমানে উড়ে যাওয়া পাখির মতো বেরিয়ে এল। সে তখন পুকুরের ধারের এক দেব মন্দিরে পৌঁছে গেল। বিগ্রহের সামনে দাঁড়িয়ে ক্রন্দনরত সুরে বলল—হে ঈশ্বর, তুমি তো জগৎ সংসারের সবকিছুর ত্রাতা। তুমি তো আমার অন্তরের বেদনা শুনতে পাচ্ছ। ঠাকুর, আমি লোকলজ্জার ভয়ে আমার শিশুপুত্রটিকে লালন—পালন করতে পারলাম না। এজন্য আমি যে কতখানি শোকাভিভূত, আশা করি তা আর খুলে বলতে হবে না তোমাকে। তুমি একে রক্ষা কোরো। আমার পাপ তুমি ক্ষমা করে দাও।
এই কথা বলে কোনোদিকে দিকপাত না করে মাথা নীচু করে কিশোরী কন্যা ফিরে এল তার গাঁয়ে। সমস্ত রাত তার চোখের তারায় ঘুম ছিল না। নাক্ষত্রিক আকাশের দিকে তাকিয়ে সে বার বার তার শিশুপুত্রের কথাই ভেবেছে। তারপর কখন ভোররাতে ঘুমিয়ে পড়েছে বেচারি কন্যা, সে খবর হয়তো আমাদের জানা নেই।
