মহাত্মা কবীরের জীবন – ২
দুই
কাছাকাছি একটি গ্রামে বাস করত নীরু জোলা আর তার স্ত্রী নীমা। গরিব মুসলমান পরিবার। ধর্মভীরু, সৎ, শোভন পথে হাঁটতে চায়। তাঁত বুনে কোনোরকমে জীবিকা নির্বাহ করে। তাদের খুবই ইচ্ছে ঘরে একটি কন্যা অথবা পুত্রসন্তান আসবে। কিন্তু কিছুতেই সেই সাধপূরণ আর হয়নি। সংসারটা বড়ো বেশি ফাঁকা বলে মনে হয় তাদের কাছে। নীরুর স্ত্রী নীমা পদ্ম তুলে বাজারে বিক্রি করে। যেহেতু কাশীতে দেবদেবীর অনেকগুলি মন্দির আছে তাই পদ্মের চাহিদা কখনো কমে না। পদ্ম বিক্রি করে কিছু পয়সা পায় সে। তাই দিয়ে কোনোমতে দু—বেলা দু—মুঠো অন্নের সংস্থান করে।
প্রতিদিনের মতো নীমা সকাল হবার সঙ্গে সঙ্গে পৌঁছে গেছে সেই পদ্মপুকুরে। এক মনে পদ্ম সংগ্রহ করছে সে। তারই পাশে একটি পদ্মের ওপর শুয়েছিল ওই সদ্যজাত শিশুটি। ঘুমিয়ে পড়েছিল বেচারি। হঠাৎ একটি পোকা কামড়ে দেয় শিশুটিকে। তীব্রভাবে কেঁদে ওঠে সে। সেই কান্নার শব্দ পৌঁছে যায় নীমার কানে। নীমা ছুটে আসে। চোখের সামনে এমন অভাবিত ঘটনা দেখে শিহরিত হয়ে ওঠে তার সমস্ত শরীর। সে মনে মনে আল্লাহর কাছে উমেদাদ করে বলে, ‘হে আল্লাহ, তোমার আশীষে আমি একটি পুত্র সন্তানকে পেয়েছি। আহা, কেউ যেন একে আমার কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে না যায়।’
সুন্দর, ফুটফুটে, অসহায় ওই শিশুটিকে দেখে নীমার মাতৃত্ববোধ উথলে ওঠে। এতদিন ধরে যে অবদমিত আশা তার মনের বিবরে কেঁদে মরছিল, এখন বুঝি তা পরিপূর্ণ হয়। ঘরে গেল সে। স্বামী নীরুকে সব কথা খুলে বলল। নীরু লোকলজ্জার ভয়ে আপত্তি তুলেছিল। শেষপর্যন্ত মাতৃস্নেহের কাছে পরাস্ত হল সে। আহা, এমন দেবশিশু, কোন সে হৃদয়হীন মা একে পদ্মবনে ফেলে দিয়ে গেছে?
তবু সব কথা চিন্তাভাবনা করতে হবে বৈকি।
নীরু শেষ প্রতিরোধের প্রাচীর তুলে বলে—শোনো, যদি কেউ এসে দাবি করে তখন কী হবে?
কথাটা শুনে কেমন যেন হয়ে যায় নীমা। এতক্ষণ তার মুখে ছিল আশার আলো, এখন সেখানে সহসা নিরাশার ঘন অন্ধকার। তবুও মনকে প্রবোধ দিয়ে সে আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলে—আমরা তো একে চুরি করে আনি নি। স্বয়ং আল্লাহ শিশুটিকে আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। তিনি হলেন পরম করুণাময়। তাঁর লীলা বোঝা আমাদের কর্ম নয়। শিশুটিকে না দেখতে পেলে এ কী আর বেঁচে থাকত?
এইভাবেই সেই ছোট্ট শিশু নতুন মা এবং বাবার সন্ধান পেল। কে জানে, এই ভাবেই বোধহয় পৃথিবীর ইতিহাসে নানা আশ্চর্য ঘটনা ঘটে যায়—বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা হয় না!
