মহাত্মা কবীরের জীবন – ৩
তিন
রামানন্দের সেই ব্রাহ্মণ শিষ্য ইতিমধ্যেই মেয়েকে নিয়ে কাশী ত্যাগ করে অন্য কোথাও চলে গেছেন। কাশীর পরিবেশ আর ভালো লাগল না তার। সব সময় চোখের সামনে শোকাভিভূতা মেয়ের মুখখানি দেখেন তিনি। কৃতকর্মের জন্য মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। আর ওদিকে মুসলমান জোলার ঘরে ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে ওই শিশুটি।
একদিন নীরু আর নীমা এক আশ্চর্য স্বপ্ন দেখল। দেখল ওই শিশুটি এক দিব্য জ্যোতির্ময় পুরুষে পরিণত হয়েছে। সে বলছে গত জন্মে তোমরা আমাকে অনেক সেবা করেছিলে। তাই আমি এবার এসেছি তোমাদের ঘরে তোমাদের ছেলে হয়ে। আমি এবার তোমাদের মোক্ষলাভের ব্যবস্থা করব। আর পার্থিব কষ্ট ভোগ করতে হবে না তোমাদের।
এই হল মহাত্মা কবীরের জন্ম কাহিনি। তবে অনেক ভাষ্যকার আবার একটু অন্যভাবে এ কথা বর্ণনা করেছেন। কিন্তু মহাত্মা কবীর যে মুসলমান জোলা পরিবারেই মানুষ হয়েছিলেন এ বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।
এবার আমরা আর—একটি কাহিনি শুনে নেব। সেখানে লেখা আছে, একদিন গুরু রামানন্দের শিষ্য গোঁসাই অষ্টানন্দ দেখলেন যে, আকাশ থেকে এক দিব্যজ্যোতি ধীরে ধীরে নীচের দিকে নেমে আসছে। সেই জ্যোতি ওই লহর তালাও—তে মিলিয়ে গেল। সেই জ্যোতিতে চারপাশ হয়ে উঠল আলোকিত। চোখের সামনে এমন অভাবিত ঘটনা দেখে অষ্টানন্দ একেবারে অবাক হয়ে গেলেন। ক্ষণকালের জন্য তাঁর মনে হল, কে বুঝি তাঁর হৃদস্পন্দন স্তব্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে গুরুদেবের কাছে গিয়ে সব ঘটনা খুলে বললেন। সব শুনে রামানন্দ বললেন—এই আলোক সাধারণ কোনো আলো নয়। কোনো এক মহাপুরুষের আত্মা ওই দিব্যজ্যোতি রূপ ধারণ করেছে। সেই আত্মা অতি শীঘ্রই মর্ত্যলোকে এক মানবশিশু হিসাবে জন্ম নেবেন। তারপর রামানন্দ ধ্যানযোগে বুঝতে পারলেন যে, লহর তালাও পদ্মবনে এক দৈবশিশু শুয়ে আছেন। এই শিশুর শরীর থেকে উদ্ভাসিত আলোক রেখায় চারপাশ এমন আলোকিত হয়ে উঠেছে।
এই গল্পের বাকি অংশ আগে বর্ণিত ঘটনার মতো একেবারেই একরকম। এবার আমরা আবার প্রথম কাহিনিতে ফিরে যাই। স্বপ্ন ভেঙে গেল নীরু আর নীমার। তারা বুঝতে পারল যে এই শিশুটির মধ্যে অলৌকিক এক ক্ষমতা লুকিয়ে আছে। পরম আদরের সঙ্গে তাকে লালন—পালন করতে থাকল জোলা দম্পতি।
এবার শিশুটির নামকরণ করতে হবে। মুসলমানদের প্রচলিত প্রথা অনুসারে একজন কাজি এসে নামকরণ করেন। কাজিসাহেব এসে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরান খুললেন। যে নাম শিশুর রাখা হবে সেই নামের যেন উল্লেখ থাকে ওই কোরানে। তখন এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটে গেল। ধর্মপ্রাণ কাজিসাহেব সভায় দুঃখ করলেন যে, কোরানের যে পাতাই তিনি বের করছেন সেখানে কবীর, আকবর, কিবরা, কিবকিয়া ছাড়া আর কোনো নামের উল্লেখ নেই। এই চারটি নামের অর্থই এক। এই শব্দগুলির অর্থ হল ঈশ্বর অর্থাৎ আল্লা এবং অন্য অর্থ হল মহৎ।
চোখের সামনে এমন অভাবিত ঘটনা ঘটতে দেখে বৃদ্ধ কাজিসাহেব খুবই অবাক হয়ে গেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে এই শিশুটির মধ্যে এক আশ্চর্য ঐশী শক্তি লুকিয়ে আছে। আবার তিনি কোরানের পাতাগুলি ওলটালেন। কি আশ্চর্য, চারটি নামই বারবার ভেসে উঠছে। দীর্ঘদিন ধরে এই পদে তিনি আসীন আছেন। এর আগে তিনি কত শিশুর নামকরণ করেছেন। কিন্তু কখনো তাঁকে এমন অবস্থার সামনে পড়তে হয়নি। যে নাম ঈশ্বরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, সেই নাম কী কোনো মানুষের ক্ষেত্রে রাখা যায়?
কাজিসাহেব এই ঘটনায় অত্যন্ত বিব্রত হয়েছিলেন। তিনি শিশুর নামকরণ না করে বিরক্ত হয়ে সেই স্থান পরিত্যাগ করলেন। এই ঘটনার কথা ধীরে ধীরে গ্রামের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল। এই কথা শুনে অন্যান্য কাজিরা এলেন নীরু জোলার বাড়িতে। তাঁরাও কোরানের পাতা খুলে উপযুক্ত নাম বাছতে থাকলেন। তাঁদের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে গেল। তাঁদের চোখও কোরানের সমস্ত পাতাতেই সেই চারটি নামই মাত্র দেখতে পেল। আগের কাজির মতো এই কাজিরাও এমন ঘটনা দেখে খুবই অবাক হলেন। তাঁরা ভাবলেন ওই শিশুটির মধ্যে নিশ্চয়ই কিছু অশুভ লক্ষণ লুকিয়ে আছে। তাঁদের কেউ কেউ আবার সন্দেহ প্রকাশ করে বললেন যে, এই শিশুটিকে বাঁচিয়ে রাখা উচিত হবে না। কারণ বড় হলে এই শিশুটি নিজেকে আল্লার প্রতিস্পর্ধী হিসাবে ঘোষণা করবে। হয়তো ইসলাম ধর্মকে বিপন্ন করার চেষ্টা করবে। ধর্মকে বাঁচাতে হলে এই শিশুকে অবিলম্বে বিনাশ করা উচিত।
কাজিরা নীরুকে ডেকে ভালো করে এই কথাটা বুঝিয়ে দিলেন। কাজিরা বললেন, আমাদের জীবনের চেয়েও ধর্ম অনেক বড়ো। ধর্মকে বাঁচাতে হলে এই শিশুকে অবিলম্বে বলি দিতে হবে। তাতে তুমি স্বর্গ লাভ করবে।
নীরু ছিল এক অশিক্ষিত ও সহজ সরল স্বভাবের মানুষ। তার মনেও ছিল ধর্মের প্রতি গোঁড়া ভাব। নিজের কোনো বিচারবুদ্ধি তার ছিল না। সে কাজিদের কথাকেই অভ্রান্ত বলে মেনে নিল। সঙ্গে সঙ্গে নীরু একটি ছোরা নিয়ে এসে শিশুর বুকে বসিয়ে দিল। যে নীমা মাতৃস্নেহে শিশুটিকে বড়ো করে তুলেছিল, সে—ও মুখ বন্ধ করে থাকতে বাধ্য হল। এতদিন পর্যন্ত ওই শিশুটির ওপর তার অপত্য স্নেহ শ্রাবণ—বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ছিল, কিন্তু তা বলে তো সে আর অধর্মের কাজ করতে পারে না!
কিন্তু সেখানেও এক অলৌকিক ঘটনা ঘটে গেল। নীরু তার গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে ছুরিটা শিশুর দেহে বসিয়ে দিয়েছে, কিন্তু তাতে শিশুর কিছুই হল না। সামান্যতম ক্ষতেরও সৃষ্টি হল না তার ছোট্ট কোমল দেহে। এক ফোঁটা রক্তও নির্গত হল না। এমন ঘটনা দেখে উপস্থিত সকলে আরও একবার অবাক হয়ে গেল।
সকলকে অবাক করে দিয়ে সেই শিশু উচ্চারণ করল এক দোঁহা, যে দোঁহা শুধুমাত্র কোনো প্রাজ্ঞ ধর্মগুরুই বলতে পারেন। সেই দোঁহার অর্থ হল রক্ত মাংস দিয়ে গড়া নয় আমার এই দেহ, এ হচ্ছে বিশুদ্ধ আলো।
উপস্থিত কাজিরা এমন ঘটনা দেখে আরও একবার হতবাক হয়ে গেলেন। তাঁদের সমস্ত বিচারবুদ্ধি একেবারে লোপ পেয়ে গেল। তাঁরা বুঝতে পারলেন এই শিশুটিকে কোনোভাবে হত্যা করা সম্ভব নয়। এক ঐশ্বরিক শক্তি সর্বদা তাকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। এই শিশুটির মধ্যে লুকিয়ে আছেন ভবিষ্যতের এক মহাপুরুষ। হয়তো স্বয়ং আল্লা কোনো এক নির্দিষ্ট কাজের দায়িত্ব দিয়ে তাকে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। তখন সব কাজিরা একযোগে এই শিশুটির নামকরণ করলেন কবীর!
