Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    মহাত্মা কবীর : জীবন ও দোঁহাবলি – পৃথ্বীরাজ সেন

    পৃথ্বীরাজ সেন এক পাতা গল্প164 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    মহাত্মা কবীরের জীবন – ৫

    পাঁচ

    ইদানীং কবীর আরও বেশি করে শাস্ত্র আলোচনায় মেতে উঠছেন। সমস্ত দিন কেটে যাচ্ছে ধ্যানমগ্ন তন্ময়তার মধ্যে। সাংসারিক জীবনের প্রতি বিন্দুমাত্র আকর্ষণ নেই তাঁর। কবীর জেনেছেন যে এই পৃথিবীর সবকিছুই নশ্বর, একমাত্র ঈশ্বরই হলেন এক অবিনশ্বর সত্তা। তাই আমাদের উচিত ক্ষণস্থায়ী জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ঈশ্বর—আরাধনায় নিবেদন করা।

    সেদিন ধর্ম আলোচনা সেরে বাড়ি ফিরতে তাঁর অনেক রাত হয়ে গেল। কবীর দেখলেন দরজা বন্ধ। বেশ বুঝতে পারলেন তিনি, বাড়ির সকলে এখন নিদ্রামগ্ন। অনেকক্ষণ দরজায় কড়া নাড়লেন কবীর। ভিতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ এল না। কী আর করবেন? ধীরে ধীরে গঙ্গার তীরে চলে গেলেন তিনি। এই জায়গাটি তাঁর খুবই পছন্দের। সামনে দিয়ে বহে চলেছে স্রোতস্বিনী জাহ্নবী। কবীর সেখানে বসে বাকি রাতটুকু কাটিয়ে দিলেন আপনমনে ঈশ্বরচিন্তা করে। তাঁর কেবলই মনে হল, ঈশ্বর বুঝি স্বয়ং তাঁর কাছে এসে দেখা দিয়েছেন। এখন এমনই এক অদ্ভুত অনুভূতি হয় মহাসাধক কবীরের। যখন তখন মনটা হঠাৎ কোথায় যেন হারিয়ে যায়। বেশ কিছুক্ষণ ভাবসমাধিতে নিমগ্ন অবস্থায় থাকেন তিনি। আবার পার্থিব জগতে ফিরে আসেন।

    সকাল হল, কবীর বাড়িতে এলেন। স্ত্রী লুই নানা কারণে তাঁর ওপর বেশ রেগে ছিলেন। রাগ করারই কথা! এমন স্বামীকে কোনো স্ত্রী কী পছন্দ করতে পারে যে স্বামী সংসারের কোনো বিষয়েই মাথা ঘামান না? একা হাতে সংসারের সব কাজ করতে হয় বেচারি লুইকে। সহেলিরা তার সঙ্গে নানারকম গল্পগুজব করে। অনেকে বলে তিনি নাকি কবীরকে সংসারে ধরে রাখতে পারছেন না। তার এমন রূপ আর যৌবন আছে, অথচ কবীর সন্ন্যাসী হয়ে ঘুরে বেড়ান কেন?

    লুই কবীরকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন—কাল সারারাত তুমি কোথায় ছিলে? কেন তুমি ঠিক সময়ে বাড়িতে আসো না? সংসারের কোনো কাজ তুমি করো না কেন? কীভাবে সংসার চলে তা কী একবার ভেবে দেখেছ?

    কবীর এসব কথা শুনে বিন্দুমাত্র রাগ করলেন না। কবীর জানেন ধৈর্য্য এবং স্থৈর্য ছাড়া আমরা জীবনের কোনো কাজে সফল হতে পারি না। তিনি বললেন, গতকাল রাতে আমি বাড়ি এসেছিলাম। অনেক ডাকাডাকি করেও কারও সাড়া না পেয়ে চলে গেছি। গঙ্গার ধারে বসে একা মনে পরম করুণাঘন ঈশ্বরের সাধনা করছিলাম। তাঁকে সবসময় ডাকো, তিনিই তোমার সংসার সমুদ্রের হাল ধরবেন।

    এই কথা বলে কবীর একটি দোঁহা উচ্চারণ করলেন—

    দীন দয়াল ভরোসে তেরে
    যত পরবারু চরাইয়া বেড়ে।।

    অর্থাৎ, হে দীন দয়াল, তোমার ওপরই ভরসা। আমার সব পরিবারকে তোমার নৌকায় চড়িয়ে দিলাম।

    এহেন স্বামীর সঙ্গে কী ঝগড়া করা যায়? হয়তো লুই বুঝতে পেরেছিলেন যে, কবীর হলেন এক অন্য জগতের বাসিন্দা। তাকে আমরা সংসারের রুদ্ধ কারার চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ রাখতে পারব কী করে?

    ইদানীং মাঝেমধ্যে পিতা নীরুও কবীরের কাজে খুবই দুঃখবোধ করেন। তিনি বুঝতে পারেন যে কবীর কোনো সাধারণ মানুষ নন, কিন্তু সংসারের কিছু কিছু কাজ তো করা দরকার। কবীর হাটে যান না, তাঁতে হাত দেন না। সংসারের জন্য কোনো আয় করেন না। এইভাবে কি দিন চলে?

    পিতার কাছে বকুনি খেয়ে কবীর হয়তো কোনোসময় আনমনে তাঁতঘরে প্রবেশ করেন। কিন্তু মনটা কোথায় যেন চলে যায়। কিন্তু তিনি কর্মবিমুখ বা অলস প্রকৃতির ছিলেন না। তিনি জানতেন তাঁর ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব ভালোভাবে পালন করতেই হবে। সংসারের সমস্ত কাজকর্ম পালন করার পাশাপাশি আমরা ঈশ্বর আরাধনায় মগ্ন হয়ে থাকতে পারি।

    কবীর ধর্মের মধ্যে কোনো সাম্প্রদায়িকতাকে কখনো প্রশ্রয় দিতেন না। ধর্মকে তিনি এক বহতা স্রোতস্বিনীর সঙ্গে তুলনা করেছেন। সেকালের ধর্মগুরুরা নানাভাবে মানুষকে প্রতারণা করতেন। ধর্ম নিয়ে ছিনিমিনি খেলতেন। কবীর সেখানে গিয়ে রুখে দাঁড়াতেন। ভবিষ্যতে কী হবে তা তিনি ভেবে দেখতেন না। তাই মাঝেমধ্যে তাঁকে নানা তর্কবিতর্কের মধ্যে পড়তে হত। কোথাও কোথাও আটকে পড়তেন তিনি। আবার ফিরে এসে তাঁতঘরে ঢুকে তাঁত বুনতেন। কাপড় নিয়ে হাটে যেতেন। এর পাশাপাশি সদা—সর্বদা ঈশ্বরচিন্তায় নিমগ্ন থাকত যুবক কবীরের মন।

    দেখতে দেখতে বেশ কয়েকটা বছর কেটে গেল। কবীর এবার বুঝতে পারলেন ঈশ্বর সাধনার জন্য একজন সৎগুরুর প্রয়োজন। কিন্তু এমন গুরু তিনি কোথায় পাবেন? কবীর তো পাঠশালায় যাবার সৌভাগ্য অর্জন করেননি। তিনি ছিলেন একেবারে নিরক্ষর। কিন্তু তাঁর মধ্যে এমন একটা জ্ঞানসত্তার জাগরণ ঘটে গিয়েছিল যে, তিনি পৃথিবীর যে—কোনো বিষয় বুঝতে পারতেন। দুরূহ দার্শনিক ব্যাখ্যা তাঁর কাছে সহজ সরল হয়ে যেত। হয়তো জন্ম জন্মান্তরের তপস্যার ফলে এমন প্রাজ্ঞ হয়ে উঠেছিলেন মহাত্মা কবীর। তিনি অনেকদিন ধরে যথেষ্ট পরিশ্রম করে নাথ বিদ্যার গুপ্ত যোগক্রিয়া আত্মস্থ করেছিলেন। তবে কবীর কিন্তু যোগবাদে বিশ্বাস করতেন না। তাঁর কেবলই মনে হত এইসব হঠযোগীরা নানাভাবে মানুষকে বিভ্রান্ত করেন। ধর্মের সঙ্গে তারা এক রহস্যতন্ময়তাকে জুড়ে দেন। নিজেদের ভাবেন ঈশ্বরের সার্থক প্রতিমূর্তি। কবীর ভালোবাসতেন ভক্তিবাদ। তিনি জানতেন আমরা চোখের জলে দেবতার চরণ ধুয়ে দিতে পারি। তবেই দেবতা আমাদের ওপর প্রসন্ন হবেন। কবীর বিশ্বাস করতেন যে, ঈশ্বর আরাধনার জন্য যোগবাদ এবং ভক্তিবাদের সার্থক সমন্বয় প্রয়োজন। একে অন্যের পরিপুরক হয়ে উঠলে তবেই আমরা ঈশ্বরকে লাভ করতে পারব। যোগের দ্বারা দেহ এবং মনকে সংযত করতে না পারলে ভক্তিবাদকে উপলব্ধি করা সম্ভব হবে না। ভক্তিতে হৃদয়কে বিগলিত করে তুলতে হবে। চিত্তকে করতে হবে আপ্লুত। তবেই তো পরম করুণাঘন ঈশ্বরের সঙ্গে আমরা মেতে উঠব অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায়।

    নিজের শক্তিতে অগাধ বিশ্বাস ছিল কবীরের। তা সত্ত্বেও তিনি গুরুর প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করতে পারলেন না। ভারতের অধ্যাত্ম চেতনে গুরুবাদকে আমরা যথেষ্ট শ্রদ্ধা ও সম্মান করে থাকি। যুগে—যুগান্তরে, কালে—কালান্তরে কত সাধক গুরুর সন্ধানে ঘর ছেড়েছেন। অরণ্য অভ্যন্তরে গিয়ে কঠিন কঠোর তপস্যায় রত হয়েছেন। পৌঁছে গেছেন মগ্ন মৈনাকের কাছে। উপযুক্ত গুরু না থাকলে শিষ্যের দেহ ও মনের পূর্ণ পরিস্ফুটন ঘটে না। কিন্তু এখন কোথায় এমন এক গুরু পাওয়া যায়? ঘুরতে ঘুরতে কবীর কখনো চলে যেতেন কোনো এক হিন্দু সন্ন্যাসীর আখড়ায়। কখনো বা মুসলমান ফকিরের আশ্রমে পৌঁছে যেতেন। কোনো সাধু সন্ন্যাসী অথবা ফকিরকে দেখলেই ভাবতেন ইনিই হয়তো আমার পূর্বজন্মের গুরু। কিন্তু কেউই কবীরকে শিষ্য হিসাবে বরণ করতে চাইতেন না। হিন্দু সন্ন্যাসীরা বলতেন, তুই মুসলমান। তুই জোলার ঘরে মানুষ হয়েছিস। তোর মুখে ধর্ম, ঈশ্বরলাভ এসব কথা মানায় না। এসব ভাবনা ছেড়ে দিয়ে তুই তাঁত বুনে সংসার চালা। তুই আবার সাধনার কী বুঝিস?

    মুসলমান ফকিররা বলতেন, তুই তো প্রায়ই হিন্দুদের সঙ্গে গিয়ে তাদের ধর্ম নিয়ে আলোচনা করিস। আমাদের চোখে তুই একটা বিধর্মী কাফের ছাড়া আর কেউ নোস। তুই আল্লাকে উপাসনা করার যোগ্য নোস।

    এসব কথা শুনে কবীর মনে মনে খুবই কষ্ট পেতেন। ঈশ্বর, আল্লা—এসব তো একই সত্তার বিভিন্ন নাম। তাহলে মানুষে মানুষে এত দ্বন্দ্ব কেন? আহত মনে কবীর এসব কথাই ভাবতেন। এসব অপমানের কোনো প্রতিবাদ তিনি করতেন না। সব অপমান মাথায় পেতে নিয়ে নীরবে চলে আসতেন। তবু কবীরের মন থেকে আশা কখনোই চলে যায়নি। এমনই বিশ্বাস ছিল তাঁর। তিনি জানতেন একদিন এই অন্ধকার পথের শেষে উজ্জ্বল দীপশিখার সন্ধান তিনি পাবেন। কিন্তু সেদিন কবে আসবে? তখন কবীর হয়তো কেমন অসহায় হয়ে উঠেছেন। কেবল—ই ভাবছেন— হে ঈশ্বর, তুমি বলে দাও তোমার চরণে ঠাঁই কবে পাব? দেখতে দেখতে আমার জীবন থেকে একটির পর একটি বসন্ত চলে যাচ্ছে। মানুষ কী চিরকালের জন্য এই পৃথিবীতে আসে?

    সেবার কবীর শুনলেন কাশীধামে এক মহাশক্তিমান বৈষ্ণব সাধক এসেছেন। তিনি নাকি ধর্মে ধর্মে, মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ করেন না। তাঁর নাম রামানন্দ, তিনি বৈষ্ণব হলেও রামের পরম উপাসক। রামকে তিনি ব্রহ্মের পূর্ণ অবতার হিসাবে স্বীকার করেন। কবীর এই কথা শুনে মনে মনে ঠিক করে ফেললেন ওই মহাসাধক রামানন্দের কাছে গিয়েই তিনি দীক্ষা নেবেন। কিন্তু ভয় হল, সমস্ত সাধু এবং ফকিররা যেমন তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, রামানন্দও কী সেইভাবেই তাঁকে সরিয়ে দেবেন? নাকি তিনি পরম স্নেহভরে তাঁকে বুকে টেনে নেবেন!

    এসব কথা ভাবতে ভাবতে কবীরের রাতে ঘুম হয় না। শেষপর্যন্ত তিনি পৌঁছে গেলেন রামানন্দের আশ্রমে। অত্যন্ত কুণ্ঠার সঙ্গে গুরুর কাছে তাঁর মনের সব কথা নিবেদন করলেন। সাধক রামানন্দ মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ করতেন না। তিনি ছিলেন প্রগতিপন্থী মহাসাধক। কিন্তু তাঁর শিষ্যরা কবীরের পূর্ব পরিচয় জানতেন। তাঁরা সকলে মিলে রামানন্দের সামনে এসে দাঁড়ালেন। আপত্তি তুলে তাঁরা বললেন এক মূর্খ মুসলমানকে যদি বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষা দেওয়া হয় তাহলে বৈষ্ণব ধর্মের অকল্যাণ হবে। যে ধর্মের মহান পরম্পরা অনেক সাধকের জীবনব্যাপী সাধনার মাধ্যমে তৈরি হয়েছে, সেই ধর্মকে এইভাবে কলুষিত করা উচিত নয়। শুধু তাই নয়, এছাড়া অনেকে বলেছিলেন যে, কবীর এক মুসলমান জোলা হয়ে যদি হিন্দু সাধকের কাছে দীক্ষা নেন, তাহলে তাঁর ওপর নানা ধরনের অন্যায় অত্যাচার হবে। একজন বৈষ্ণব সাধক হিসাবে রামানন্দ কিন্তু এসব দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে থাকতে চেষ্টা করতেন। তাঁর কাছে পৃথিবীর সবকিছুই ছিল রামের আধারে ভরা। কিন্তু তিনি তাঁর প্রধান শিষ্যদের কথা ভেবে কবীরকে দীক্ষা দিতে রাজী হলেন না। অথচ ধর্মসাধনার প্রতি কবীরের মনের মধ্যে যে গভীর নিষ্ঠা ছিল তা রামানন্দ উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাঁর মনে তখন জেগেছে নানা প্রশ্ন। তিনি বারবার ঈশ্বরের শরণাপন্ন হচ্ছেন। এমনভাবে এক অসহায় মানুষকে কি দূরে ঠেলে রাখা উচিত? কবীরকে দীক্ষাদান করা সম্ভব হল না, রামানন্দের এই সিদ্ধান্ত শুনে কবীর খুবই কষ্ট পেয়েছিলেন। মনে মনে তিনি রামানন্দকেই তাঁর গুরু বলে মেনে নিলেন। তখন থেকে চোখ বন্ধ করে তিনি রামানন্দের কথাই চিন্তা করতেন।

    বাড়ি ফিরে আসার পর কবীরের মনোবেদনা আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেল। তবুও হতাশ হলেন না, তিনি ছিলেন ইতিবাচক মনের মানুষ, তাঁর কেবলই মনে হল একদিন রামানন্দের ওই হৃদয় গলে যাবে। সেদিন তিনি কবীরকে আর প্রত্যাখ্যান করতে পারবেন না। রামানন্দকে দেখামাত্র কবীরের মনে হয়েছিল, এই মহান ব্যক্তিই হলেন তাঁর জন্ম—জন্মান্তরের সৎগুরু। এর কাছেই সবকিছু নীরবে নিবেদন করতে হবে। রামানন্দের হাত ধরেই পৌঁছোতে হবে সেই ঈপ্সিত তীর্থে যেখানে পরম করুণাঘন ঈশ্বর বা আল্লাহর অবস্থান। রামানন্দের জীবনধারা তিনি লক্ষ করেছেন। তিনি পরম বিস্ময়ভরে তাকিয়ে থেকেছেন ওই মহাত্মা মানুষটির মুখের দিকে। যে মানুষ এমন সদাচারী তিনি একদিন না একদিন আমার ওপর সদয় হবেন। শিষ্যদের কাছে তিনি যেসব উপদেশ দান করেন তাও একমনে শ্রবণ করেছেন মহাত্মা কবীর। প্রতিটি উপদেশের মধ্যে জীবনকে পরিশুদ্ধ করার কথাই বলা হয়ে থাকে। পরিদৃশ্যমান এই পৃথিবীতে তুমি এসেছ কয়েকদিনের জন্য, ঈশ্বর তোমার ওপর এক গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেছেন, তোমার উচিত একমনে সেই দায়িত্ব পালন করা। এসব কথা শুনতে শুনতে কবীরের সমস্ত স্নায়ুমণ্ডলী জুড়ে এক আশ্চর্য শিহরনের জন্ম হয়। কবীর চোখ বন্ধ করেন, তাঁর কেবলই মনে হয় তাঁর মন—আকাশে বুঝি হাজার সূর্যের আলো জ্বলে উঠছে।

    রামানন্দ সবসময় রামনাম জপ করেন। রামের কীর্তি—কাহিনি সকলের কাছে তুলে ধরেন। রাম—কীর্তনের সময়ে তাঁর চোখ থেকে লবণাক্ত অশ্রুধারা নির্গত হয়। রামানন্দ একদিকে পরম জ্ঞানী, পৃথিবীর সমস্ত শাস্ত্রে তাঁর অধিকার। অন্যদিকে তিনি একনিষ্ঠ ভক্ত। কবীর বুঝতে পেরেছিলেন এমন জ্ঞানী এবং ভক্ত মানুষই তাঁকে সঠিক পথের সন্ধান দিতে পারবেন।

    রামানন্দ প্রতিদিন ব্রাহ্ম মুহূর্তে স্নান করতে যেতেন। তখন তিনি অবস্থান করছেন কাশীধামে। কবীর একদিন এক ভয়ংকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। স্থির করলেন যে করে হোক রামানন্দের কাছে নিজেকে একেবারে নিবেদন করতে হবে। সমস্ত রাত জেগে কাটিয়ে দিলেন। ভোর হবার আগেই পায়ে পায়ে পৌঁছে গেলেন গঙ্গার ঘাটে। সিঁড়িতে শুয়ে থাকলেন তিনি।

    রামানন্দ তখন আপনমনে রামগান করতে করতে এগিয়ে চলেছেন পবিত্র ভাগীরথীর দিকে। তখনও চারদিকে ঘন অন্ধকার। একটু একটু করে পূবের আকাশ ফরসা হতে শুরু করেছে। প্রভাতের প্রথম পাখির গান শোনা যাচ্ছে। নিশান্তিকার আলো বিদায় নিচ্ছে ভালোবাসার পৃথিবী থেকে। সহসা রামানন্দ চমকে উঠলেন, বেশ বুঝতে পারলেন তিনি, কাপড় মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকা একজন মানুষের গায়ে তাঁর পা লেগে গেছে। তাঁর মুখ দিয়ে ছুটে এল স্বতঃস্ফূর্ত দুটি শব্দ ‘রাম রাম’। তারপর ‘রাম রাম’ জপ করতে করতে গঙ্গার দিকে এগিয়ে গেলেন রামানন্দ।

    কবীর বোধহয় এই অলৌকিক মুহূর্তের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি ভাবলেন দীক্ষাদানের সময় গুরু যে মন্ত্র দান করতেন, তাঁকে আজ পরোক্ষভাবে স্পর্শ করে সেই মন্ত্র বোধহয় দান করলেন স্বামী রামানন্দ। তখন থেকেই তিনি মনেপ্রাণে রামানন্দের বাহক এবং শিষ্য হয়ে উঠলেন। কবীর স্থির করলেন এখন থেকে জীবনের বাকি দিনগুলি রামনাম করেই অতিবাহিত করবেন। রামের মহিমা এবং রামের কীর্তির কথা সকলের কাছে প্রচার করবেন।

    সংসারধর্ম পালনের পাশাপাশি কবীর তখন কপালে তিলক কেটে রামগানে মগ্ন হয়েছেন। হিন্দু এবং মুসলমান সমাজের কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ তাঁর এই আচরণ দেখে একেবারে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। হিন্দুর কাছে তিনি ছিলেন অস্পৃশ্য জোলা মুসলমান আর মুসলমানের কাছে তিনি ছিলেন কাফের হিন্দু ঘেঁষা এক শত্রু। নীরু এবং নীমা কবীরের এই আচরণ দেখে খুবই বিচলিত হয়ে পড়লেন। তাঁরা সাংসারিক মানুষ। তাঁরা জানেন সংসারের মধ্যেই বসবাস করতে হয়। কবীরের এই আচরণের প্রতিবাদ নানাদিক থেকে আসছে। কথাটা যদি দেশের শাসকের কানে পৌঁছে যায়, তাহলে সর্বনাশ। তাই তাঁরা স্থির করলেন যে করেই হোক কবীরের মন পাল্টাতে হবে। কিন্তু কবীর যেভাবে একমনে রামের সাধনা করে চলেছেন, তিনি কী কারও কথা শুনবেন? তবু চেষ্টা তো করতেই হবে।

    সময় এবং সুযোগ পেলে তাঁরা কবীরের সঙ্গে এ বিষয়ে নানা আলোচনা করেন। মা—বাবা কবীরকে বোঝাবার চেষ্টা করেন কিন্তু কবীর তখন একেবারে অন্য জগতের বাসিন্দা হয়ে গেছেন। কবীর কথা বলেন, কিন্তু মা—বাবা বুঝতে পারেন যে সেই কথা বলার সঙ্গে মনের কোনো সংযোগ নেই। রামভাবে আচ্ছন্ন হয়ে আছেন তাঁদের পালিতপুত্র।

    হিন্দু সমাজের সকলে একবাক্যে বলতে থাকল সাধক গুরু রামানন্দকেই এই ব্যাপারে দায়বদ্ধ করা উচিত। কারণ রামানন্দ যদি কবীরের প্রতি করুণাবর্ষণ না করতেন, তাহলে কবীর কী রামসাধক হয়ে উঠতে পারতেন? রামানন্দের জীবনধারায় কখনো কোনো কলঙ্ক স্পর্শ করেনি। ভোরের আকাশের মতোই পরিষ্কার তাঁর দেহ মন। তাহলে? জীবনের উপান্তে দাঁড়িয়ে তিনি এমন একটি নিন্দার্হ কাজ করলেন কেন?

    এই কথাগুলো শেষপর্যন্ত রামানন্দের কানে পৌঁছে গেল। রামানন্দ অবাক হলেন। জ্ঞানত তিনি কখনো কোনো অন্যায় কাজ করেননি। যদিও মুসলমান জোলার ঘরে পালিত কবীরকে তিনি যথেষ্ট স্নেহ করতেন, কিন্তু প্রধান শিষ্যদের মুখ চেয়ে কবীরকে দীক্ষা দেননি। কবীরকে তিনি ডেকে পাঠালেন। কবীর রামানন্দের আশ্রমে উপস্থিত হলেন। দেখলেন গুরু একটি পর্দাঘেরা জায়গায় বসে পুজোর আয়োজন করছেন। তাঁর কাছে পুজোর বিভিন্ন উপকরণ আছে, তবু কী একটা জিনিসের অভাব তিনি অনুভব করছেন। তাই পূজা অর্চনা শুরু করতে পারছেন না তিনি। অথচ জিনিসটি কী রামানন্দ তা বুঝতে পারছেন না!

    পর্দার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা দিব্যজ্ঞানী কবীর বুঝতে পারলেন যে রামানন্দের কোন বস্তুটি দরকার। গুরুকে বলে দিলেন—স্বামীজি, আপনি ইষ্টদেবতাকে তুলসীপত্র নিবেদন করতে ভুলে গেছেন।

    কবীরের মুখ থেকে এই কথাগুলি শুনে আশ্চর্য হলেন পরমগুরু রামানন্দ। তিনি বুঝতে পারলেন কবীরকে হয়তো এক মুসলমান জোলার ঘরে লালিত পালিত হতে হয়েছে, কিন্তু কবীর এক দিব্যজ্ঞানী। ভারতের ধর্মজগৎকে নানাভাবে সেবা করার জন্যই বোধহয় কবীরের আগমন! অনেকদিন আগের কথা মনে পড়ে গেল রামানন্দের। তিনিই একদিন ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন কবীরের জন্ম সম্পর্কে। এক ব্রাহ্মণ বিধবার গর্ভে জন্ম হবে ওই দিব্যপুরুষের—একথাও বলেছিলেন। শেষপর্যন্ত কবীর এই ধরাধামে এসেছেন মানবতাবাদের মূর্ত প্রতীক হয়ে। তারপর একে একে রামানন্দ তাঁর দিব্যজ্ঞানে কবীরের বিষয়ে অনেক কথা জানতে পারলেন। জানতে পারলেন যে কবীর কীভাবে মুসলমান জোলা নীরু আর নীমার পরিবারে মানুষ হয়েছেন, এখন হয়েছেন তাঁর একনিষ্ঠ সেবক ও শিষ্য!

    এসব কথা সর্বজন সমক্ষে বলতে পারলেন না স্বামী রামানন্দ। পুজো শেষ হল। তিনি দেখলেন তখনও কবীর পর্দার পাশে একমনে রামের ধ্যান করে চলেছেন। রামানন্দকে দেখে কবীরের ধ্যান ভেঙে গেল। রামানন্দ কবীরকে শান্ত কণ্ঠস্বরে বললেন—আচ্ছা কবীর, তুমি আমার কাছে একবার দীক্ষা নিতে এসেছিলে, কিন্তু আমি তো তোমাকে দীক্ষা দিইনি। তাহলে তুমি কেন সবার কাছে বলে বেড়াচ্ছ যে তুমি আমার শিষ্য?

    তখন কবীর তাঁকে সব কথা খুলে বললেন। সেকথা শুনে রামানন্দ বলেছিলেন, কিন্তু গুরুর বিনা অনুমতিতে এভাবে কী কোনো গুরু—শিষ্য সম্বন্ধ স্থাপিত হতে পারে?

    কবীর বললেন—কেন পারে না? সেদিন ভোরে আমার দেহটি আপনার পায়ে ঠেকে গিয়েছিল। আপনি ‘রাম রাম’ শব্দ দু—বার উচ্চারণ করেছিলেন। আমাকে দীক্ষা দিলে আপনি আমার কর্ণকূহরে এই দুটি শব্দই তো উচ্চারণ করতেন। এর থেকে ভালো মন্ত্র আর কী কিছু হতে পারে প্রভু?

    কবীরের এহেন ভক্তির আতিশয্য দেখে স্বামী রামানন্দ আরও একবার অবাক হলেন। তিনি মনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব দূরে ঠেলে সরিয়ে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি কবীরকে তাঁর শিষ্য বলে ঘোষণা করলেন।

    এতদিন ধরে কবীর কত অনিদ্রিত রাত কাটিয়েছেন। কত আশঙ্কাপূর্ণ প্রহর কেটে গেছে। শেষপর্যন্ত পরম করুণাঘন ঈশ্বর তাঁর মনের বাসনা পূর্ণ করেছেন। কবীরের চোখে এল আনন্দের অশ্রু। ঈশ্বরের করুণা নেমে এসেছে গুরুর মাধ্যমে। মাটিতে লুটিয়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম জানালেন গুরুর চরণে। এরপর গুরুদেব বেশ কয়েকটি উপদেশ দিয়েছিলেন কবীরকে। তিনি বলেছিলেন— ঈশ্বর সাকার আবার নিরাকার। তাঁকে যখন যে যেভাবে ডাকে, তাকে সেইভাবেই তিনি কৃপা করেন। সংস্কার এবং বিধিমতে তাঁর উপাসনা করলেও তিনি সন্তুষ্ট হন। আবার যদি আমরা তাঁর চরণতলে ভক্তির নৈবেদ্য নিবেদন করি, তাহলেও তাঁর সান্নিধ্য লাভ করা যায়। যার যেমনভাবে ভালো লাগে, সে সেইভাবেই ঈশ্বরের সাধনা করতে পারে। এই ব্যাপারে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এটিই হল বৈষ্ণব ধর্মের মূল কথা। আর বৈষ্ণব ধর্মের আর—একটি সার কথা হল ঈশ্বর এক। তিনি এক পুরুষ, ভক্তই হচ্ছে প্রকৃতি। পত্নী যেমন পতিকে ভালোবাসে, সেইভাবে স্ত্রীরূপে ভক্ত প্রকৃতিগতভাবে ঈশ্বরের পূজা করে। ঈশ্বরের সেবার মাধ্যমেই সে তার জীবনের পরম পরিপূর্ণতা খুঁজে পায়। শেষে একদিন ঈশ্বরের মধ্যেই সে লীন হয়ে যায়। পতিপরায়ণা পত্নীর মতো ভক্ত তার সমস্ত মনপ্রাণ, ত্যাগ, তিতিক্ষা, অনুভূতি, ভালোবাসা, প্রেরণা ঈশ্বরের কাছে নিবেদন করে। সে একেবারে আত্মহারা হয়ে যায়। অপার অনন্ত আনন্দ লাভ করে।

    রামানন্দের মুখ—নিঃসৃত এই অমৃতবাণীগুলি শ্রবণ করার সঙ্গে সঙ্গে কবীরের সমস্ত মনপ্রাণ একেবারে শান্ত হয়ে গেল। কবীর ধর্মের গূঢ়তত্ত্বকে অনুভব করতে পারলেন। রামানন্দ আরও বলেছিলেন—কবীর তুমি একমনে রামনাম জপ করে যাও। তুমি সংসারে থেকেই ধর্ম সাধনায় নিজেকে নিয়োগ করবে। কাজকর্মে কখনো ফাঁকি দেবে না। তারই ফাঁকে যে সময় পাবে, ঈশ্বর আরাধনা করবে। এর ফলে ধীরে ধীরে আধ্যাত্মিক উন্নতি ঘটবে তোমার। তুমি এমন এক জগতে প্রবেশের ছাড়পত্র পাবে, যে জগতে দেখবে শুধুই আলোর উৎসার। অন্ধকার সেখানে কখনো প্রবেশ করতে পারে না।

    এইভাবে রামানন্দ তাঁর প্রিয় শিষ্যকে আরও বেশি জ্ঞানী এবং প্রাজ্ঞ করে তুললেন। এসব কথা শোনার পর কবীরের নিরাসক্ত মন সংসারের প্রতি আরও নির্লিপ্ত হয় পড়ল। তাঁর সমগ্র আত্মার মধ্যে তখন এক আশ্চর্য জাগরণ ঘটে গেছে। তিনি সংসারের খাওয়া—পরার জন্য যেটুকু কাজ করা দরকার, শুধু সেটুকু কাজই করতেন। কোনো বৈষয়িক বিষয়ের প্রতি তাঁর বিন্দুমাত্র আকর্ষণ কখনোই ছিল না। এখন তিনি আরও বেশি করে ত্যাগী হয়ে উঠলেন। কখনো জীবনে সামান্য বিনোদন চাইতেন না তিনি। তাঁর মা, বাবা, স্ত্রী কত দুঃখ করতেন, কত কান্নাকাটি করতেন, কিন্তু কবীর ছিলেন এক নির্বিকার মানুষ। কবীর বুঝতে পেরেছিলেন দু—দিনের এই সংসারে ঈশ্বরানুভূতিই হল পরম সত্য। ঈশ্বরের জন্য সব কিছুকে অনায়াসে অস্বীকার করা যায়, কিন্তু অন্য কোনো কিছুর জন্য ঈশ্বরকে অস্বীকার করা যায় না।

    কবীর তখন নিরন্তর রামনাম জপ করে চলেছেন। আর এইভাবে তাঁর চেতনার মধ্যে এক দৈবী শক্তির আগমন ঘটে গেল। কবীর অবশেষে সাধনার সেই উচ্চস্তরে পৌঁছোতে পেরেছিলেন, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে রামনামই এক ও অভিন্ন। তাই একজন ভক্ত যে দেবতার নাম স্মরণ করবেন, সেই দেবতার শক্তির কিছুটা পরিমাণ তাঁর মধ্যে সঞ্চারিত হবে। দৈব শক্তি সঞ্চারিত হবার সঙ্গে সঙ্গে আত্মশক্তি বেড়ে গেল মহাত্মা কবীরের। ঈশ্বর বিশ্বাসের সঙ্গে বেড়ে গেল আত্মবিশ্বাস। গুরুর মহিমা উপলব্ধি করার পর কবীর অনুভব করলেন যে, এই বিষয়টি সকলের কাছে ব্যাখ্যা করা দরকার। নিরক্ষর মানুষেরা শাস্ত্রের গভীরে তত্ত্বজ্ঞান উপলব্ধি করতে পারবেন না। তাই তাঁদের কাছে এই বিষয়গুলিকে পৌঁছে দেবার জন্য কবীর ছোটো ছোটো দোঁহা রচনা করতে শুরু করলেন। এক একটি দোঁহার মাধ্যমে তিনি আধ্যাত্মিক জগতের এক—একটি বিষয়কে বিশ্লেষণ করেছেন। এই দোঁহাগুলি শুনলে মনে হয়, এদের মধ্যে এক আশ্চর্য রহস্য লুকিয়ে আছে, প্রতিটি শব্দকে কবীর ব্যবহার করেছেন সচেতনভাবে। ধীরে ধীরে এই দোঁহাগুলি মানুষের মধ্যে যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা লাভ করল।

    তখন কবীরের নাম আশেপাশে গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তাঁর কাছে শিষ্য হবার মতো আশা প্রকাশ করেছেন। কবীর এবার স্থির করলেন যে ধর্মপ্রচারের জন্য তঁকে এবার এই গ্রাম ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে হবে। কিন্তু সংসারের এই বন্ধন তিনি ছিন্ন করবেন কেমন করে? কবীর বুঝতে পেরেছিলেন যে, সৎগুরুর সাহায্য ছাড়া আমরা ইষ্ট দর্শন করতে পারি না। সৎগুরুর দর্শন ছাড়া জন্ম—জন্মান্তরের সংস্কার কখনো চিরকালের মতো দূরীভূত হয় না। এই সংস্কার চলে না গেলে ঈশ্বর দর্শন সম্ভব নয়।

    তখনও কবীর কিন্তু সংসারধর্ম পালন করা থেকে নিজেকে বিরত করেননি। তাঁকে রোজ জীবিকার জন্য তাঁত বুনতে হত। বোনা কাপড় নিয়ে বাজারে যেতে হত। তাই থেকে যা উপার্জন হত তাতেই কোনোরকমে দিন কেটে যেত। কোনো কোনো সময় তিনি আবার অর্জিত অর্থের কিছুটা এক দরিদ্র ভক্তের হাতে তুলে দিতেন। দীন—দুঃখী মানুষের প্রতি ছিল তাঁর সীমাহীন ভালোবাসা ও করুণা। কোনো প্রার্থীকে তিনি কখনো বিমুখ করতেন না। অনেক সময় নিজে অনাহারে থেকে অতিথির সেবা করে গেছেন। এভাবেই কবীর হয়ে উঠলেন আতিথ্য এবং করুণার জ্বলন্ত প্রতীক।

    একদিন কবীর বাজারে বসে কাপড় বিক্রি করছিলেন। এক গরিব ব্রাহ্মণ সেখানে এলেন। তিনি তাঁর লজ্জা নিবারণের জন্য একখানি বস্ত্র ভিক্ষা করলেন। কবীরের কাছে তখন একটি মাত্র কাপড় ছিল। কবীর সেই কাপড়টি অর্ধেক করে ব্রাহ্মণকে দিতে চাইলেন। কিন্তু ব্রাহ্মণ পুরো একখানি থান চাইলেন। কবীর কোনো কথা না বলে পুরো থানটিই ব্রাহ্মণকে দিয়ে দিলেন। তাঁর কাছে এখন আর কোনো কাপড় নেই। তিনি কী বিক্রি করবেন? কীভাবে পয়সা আয় করবেন? কিছু পয়সা বাড়িতে না দিলে রান্না হবে না। শূন্য হাতে কী করে তিনি বাড়ি ফিরবেন? এসব কথা ভাবতে ভাবতে আর বাড়িতে গেলেন না। বাজারের মধ্যে এক কোণে লুকিয়ে বসে থাকলেন। বাড়িতে কোনো খবর দিলেন না। এইভাবে দেখতে দেখতে পরপর তিনদিন কেটে গেল। বাড়ির লোকেরা তখন অনাহারের মধ্যে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। সকলের মনে জেগেছে নানা উদ্বেগ। কবীর গেলেন কোথায়?

    এইসময় এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল। কবীরের অনুপস্থিতির তৃতীয় দিনে পরিচিত একটি মানুষ গোরুর গাড়ি বোঝাই করে নানা খাদ্যসামগ্রী নিয়ে কবীরের বাড়িতে এসে হাজির হলেন। এমন ঘটনা দেখে কবীরের মা নীমা একেবারে অবাক হয়ে গেলেন। তিনি জানেন কবীর কখনো এত খাদ্যসামগ্রী পাঠাতে পারবেন না। তিনি আরও জানেন যে কবীর কখনো কারও কাছ থেকে অহেতুক দান গ্রহণ করেন না। এই ব্যাপারে কবীরের প্রচণ্ড আত্মমর্যাদা আছে! নীমা সেই লোকটিকে জিজ্ঞাসা করলেন—এসব জিনিস কে পাঠিয়েছেন?

    লোকটি বলল, কোনো এক রাজা বিশ্বনাথ দর্শন করতে এসেছিলেন। তিনি তোমার ছেলে কবীরের কথা শুনেছেন। তাই এইসব খাদ্যসামগ্রী পাঠিয়ে দিয়েছেন। তিনি তোমার ছেলেকে অনেক করে বলার পরে তবে সে রাজি হয়েছে। তোমার ছেলে একটু পরেই এখানে এসে পড়বে।

    এই বলে লোকটি চলে গেল। মা নীমা লোকটির কথা বিশ্বাস করলেন। এই খবর পৌঁছে গেল লুকিয়ে থাকা কবীরের কাছে। সব শুনে কবীর আরও একবার অবাক হলেন। কোনো রাজার সঙ্গে তাঁর কখনোই দেখা হয়নি। কেউ তাঁকে এভাবে অনুরোধও করেনি। কবীর বুঝতে পারলেন এ হল পরমেশ্বরের লীলা। তিনি বোধহয় নানাভাবে ভক্তকে পরীক্ষা করেন। যাতে কবীরের পরিবারবর্গ অনাহারে মৃত্যুমুখে পতিত না হন, তাই তিনি নিজেই উদ্যোগী হয়ে খাদ্যসামগ্রী পাঠিয়ে দিয়েছেন। তিনি বুঝতে পারলেন ঈশ্বর সবসময়ে তাঁর ভক্তের পাশেই থাকেন। এই কথা ভাবতে ভাবতে তাঁর ঈশ্বরভক্তি আরও বেড়ে গেল।

    তিনি বাড়ি ফিরে ভক্তদের নিয়ে মহোৎসবের আয়োজন করলেন। সেই মহোৎসবে বহু লোকের হাতে প্রসাদ তুলে দিলেন। এইভাবে সমস্ত খাদ্যসামগ্রী খরচ হয়ে গেল। তাতে কবীর বিন্দুমাত্র দুঃখিত হননি। এতজনকে তিনি ঠিকভাবে খাবার দিতে পেরেছেন, একথা ভাবতেই তাঁর মনে অপার আনন্দ দেখা দিল। তিনি বললেন, ঈশ্বর যে খাদ্যসামগ্রী দয়া করে দিয়েছেন, তাতে শুধু আমার একার অধিকার থাকবে কেন? তাতে সকলের সমান অধিকার আছে। যতক্ষণ থাকবে, যে আসবে, সে—ই খাদ্যের অংশ পাবে।

    এই মহোৎসবের কথা কাশীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। যাঁরা এতদিন কবীরকে ঈশ্বরের অবতার বলে স্বীকার করতে রাজি ছিলেন না, তাঁদের মনোভাবে পরিবর্তন ঘটে গেল। তাঁরা বুঝতে পারলেন যে কবীর হলেন ঈশ্বরের অনুগৃহিত এক মহাসাধক। তাঁর সংস্পর্শে জীবনের সমস্ত অন্ধকার কেটে যায়। কবীরের মধ্যে যে দানশীলতা আছে তারও প্রশংসা করতে লাগলেন সকলে। কবীরের এই প্রশংসার কথা শুনে কিছু স্বার্থান্বেষী ব্রাহ্মণ সমাজপতি ও সন্ন্যাসী অত্যন্ত রেগে গেলেন। তাঁরা বুঝতে পারলেন অবিলম্বে কবীরের বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধকতার প্রাচীর তুলতে হবে। না হলে তাঁদের জীবিকা এবং জীবন ধারণ করা অসম্ভব হয়ে উঠবে। তাঁরা জানতেন কবীরের ঘরে আর কোনো খাদ্যসামগ্রী নেই। তাই তাঁরা কবীরকে অপমান করার জন্য দলবদ্ধভাবে তাঁর বাড়ির সামনে পৌঁছে গেলেন। তাঁরা বললেন—আমাদের দাবি যদি না মানো তাহলে ব্রাহ্মণদের আগে শূদ্রদের খাওয়ানোর অপরাধে তোমাকে কাশী থেকে বের করে দেবো।

    কবীর ভাবতে পারেননি যে তাঁর আচরণে ব্রাহ্মণরা এইভাবে তাঁকে অপমান করার জন্য ছুটে আসবেন। ব্রাহ্মণরা তখন কবীরের বাড়ি ঘেরাও করেছেন।

    কবীর কিন্তু এসব বিক্ষুব্ধ ব্রাহ্মণদের দেখে এক মুহূর্তের জন্যও বিচলিত হননি। তিনি তাঁদের কাছে গিয়ে পরম শ্রদ্ধাভরে প্রণাম নিবেদন করলেন। তাঁরা কেন এখানে এসেছেন সেই কারণটা জেনে নিলেন।

    কিন্তু ঘরে তো চাল, ডাল কিছুই নেই। কী করে এতজন অভুক্ত ব্রাহ্মণের মুখে অন্ন তুলে দেবেন তিনি? এসব কথা ভাবতে ভাবতে কবীর হয়তো একটু চিন্তাচ্ছন্ন হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর মুখমণ্ডলে বিরক্তি অথবা দুশ্চিন্তার কোনো চিহ্ন ফুটে ওঠেনি। তিনি শান্তকণ্ঠে বললেন, আপনারা দয়া করে একটু অপেক্ষা করুন, আমি এখুনি আসছি।

    খাদ্য সংগ্রহের নাম করে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলেন মহাত্মা কবীর। তিনি বেরিয়ে যাবার পর দেখা গেল কেশব বানজারা নামে এক ধনী ব্যবসায়ী মজুরদের মাথায় বস্তা বস্তা আটা, ময়দা, চাল, চিনি চাপিয়ে কবীরের বাড়িতে এসে দিয়ে গেলেন। এইসব খাদ্যসামগ্রী অপেক্ষমান ব্রাহ্মণদের সামনে রাখা হল। কবীরের অনুপস্থিতিতে ব্রাহ্মণরা নিজেরাই ঠিক করে নিলেন যে তাঁরা সিধা হিসাবে আড়াই সের করে চাল, চিনি আর—এক চিড়া করে পান পাবেন।

    কবীর এসবের কিছুই জানতেন না। তিনি তখন ব্রাহ্মণদের ভয়ে বাড়ি থেকে দূরে গিয়ে একটি গাছের আড়ালে লুকিয়ে বসেছিলেন। সেখানে কে একজন ব্রাহ্মণের বেশে কবীরের কাছে এসে বললেন—তুমি এখানে লুকিয়ে আছো কেন? তুমি কী জানো না তোমার বাড়িতে ব্রাহ্মণদের ভালো রকমের সিধা দেওয়া হচ্ছে।

    কবীর বুঝতে পারলেন যে, পরম করুণাঘন ঈশ্বর তাঁকে আরও একবার অপমানের হাত থেকে বাঁচালেন। ঈশ্বর যে এইভাবে সর্বদা তাঁর পাশে পাশে থাকবেন, সেই উপলব্ধিই হল মহাত্মা কবীরের। তিনি বাড়িতে ফিরে গেলেন। ব্রাহ্মণরা মনোমতো সিধা পেয়ে দু—হাত তুলে কবীরকে আশীর্বাদ করতে করতে চলে গেলেন।

    এইসব ঘটনার কথা চারপাশে প্রচারিত হতে লাগল। কবীরের ভক্তসংখ্যা বেড়ে গেল। সকলে বুঝতে পারলেন যে কবীর হলেন ঈশ্বর অনুগৃহীত এক মহাপুরুষ। তখন কবীর তাঁত বোনার কাজ একেবারে ছেড়ে দিয়েছেন। তাঁর দিন কাটছে শুধুমাত্র রামের নাম জপ করে। এর পাশাপাশি তিনি অসংখ্য ভক্তকে উপদেশ দেওয়া শুরু করলেন। কীভাবে আমরা জীবনের সমুদ্রের ওপারে পৌঁছে যাব সেকথা বলতে লাগলেন। কবীর সহজ সরল উদাহরণের মাধ্যমে ধর্মের গূঢ় তত্ত্বকথা সকলের সামনে শোনাতেন। যখন কবীর ধর্ম আলোচনা করতেন, তখন তাঁর সমস্ত শরীর দিয়ে এক অলৌকিক আভা প্রকাশিত হত।

    একবার এক ভক্ত কবীরের কাছে এসে জানতে চেয়েছিলেন, আচ্ছা ঈশ্বর কোথায় অবস্থান করেন?

    কবীর বললেন—ঈশ্বর কোনো বস্তু বা স্থানের মধ্যে সংকীর্ণভাবে আবদ্ধ হয়ে নেই। তিনি এই বিশ্বজগতের সর্বত্র বিরাজমান। পৃথিবীর সমস্ত নরনারী তাঁর অপার করুণা লাভ করে থাকেন।

    এই কথা বলেই কবীর একটি সুন্দর দোঁহা উচ্চারণ করেছিলেন। এই দোঁহার মাধ্যমে তিনি ঈশ্বরের মহিমার কথা প্রচার করেন।

    কবীর বলেছিলেন—

    মৈ তে তেরে পাসসেঁ।
    নামৈ দেবল, নামৈ মসজিদ,
    না কাবে কৈলা সমে।
    না তো কৌন ক্রিয়া কর্মমেঁ,
    নহী যোগ বৈরাগসে।
    খোঁতী হোয় ও তুরতৈ মিলিহৌ,
    গল তরঙ্গী অসলমেঁ।
    কহৈঁ কবীর, শুনো ভাই সাধো সব স্বাসোরী শ্বাসমে।।

    ওরে বান্দা, আমাকে কোথায় খুঁজে বেড়াচ্ছিস? আমি তো সদাসর্বদা তোর পাশে পাশেই আছি। আমি দেউল অথবা মন্দিরে থাকি না, মসজিদ, কাবা কিংবা কৈলাসে আমার অবস্থান নেই। আমি কোনো আনুষ্ঠানিক ক্রিয়াকর্মে বিশ্বাস করি না। যোগ, বৈরাগ্যের প্রতি আমার কোনো আকর্ষণ নেই। যদি তুই সত্যি সত্যি আমার সন্ধান পেতে চাস, তাহলে একপলকের খোঁজাতেই পেয়ে যাবি। কবীর বলেন—ভাই সাধু, তিনি আছেন সব জীবের প্রাণে।

    ভারতের সাধক—সাধিকারা যুগে যুগান্তরে, কালে কালান্তরে একথাই বারবার উচ্চারণ করেছেন। গীতাতে শ্রীকৃষ্ণ ভক্তিযোগকেই শ্রেষ্ঠযোগ বলে বর্ণনা করেছেন। অর্জুন একদা শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন—যাঁরা কর্মযোগে তৎপর হয়ে ভক্তি সহকারে আপনার উপাসনা করেন, তাঁরাই অধিক যোগী নাকি যাঁরা অক্ষর অব্যক্ত পরমাত্মার উপাসনা করেন তাঁরাই অধিক যোগী?

    ভক্তের মুখ থেকে উচ্চারিত এই প্রশ্ন শুনে মৃদু হেসে শ্রীকৃষ্ণ জবাব দিয়েছিলেন—যাঁরা আমাতে মন আবিষ্ট করে আমাতে নিত্য যুক্ত হয়ে এবং আমাতে শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধা রেখে উপাসনা করেন, আমার মতে তাঁরাই হলেন শ্রেষ্ঠ যোগী।

    কবীর কিন্তু ঠিক এইভাবেই ঈশ্বর আরাধনা করে গেছেন। কবীর জানতেন যোগের সঙ্গে জ্ঞানের প্রয়োজন, আর জ্ঞানের সঙ্গে ভক্তির সংযোগ দরকার। এই ত্রিবিধ সাধনায় সফল হলে আমরা ঈশ্বরের অশেষ অনুগ্রহ লাভ করতে পারব। কবীরের অন্তরে ছিল দিব্যজ্ঞানের প্রজ্জ্বলিত আগুনশিখা, কবীর কিন্তু সেই জ্ঞানের কথা সর্বজনসমক্ষে প্রকাশ করতে চাইতেন না। তিনি সকলের মধ্যে মিলে মিশে ঈশ্বরের আরাধনা করতে চাইতেন। তাঁর মধ্যে ছিল ভক্তির উচ্ছ্বসিত প্রবাহ। সেই ভক্তিরসকে তিনি সকলের মধ্যে সঞ্চারণ করার চেষ্টা করে গেছেন।

    কবীর প্রায়শই বলতেন শুধুমাত্র যোগ—সাধনার দ্বারা ঈশ্বরপ্রাপ্তি কখনোই সম্ভব নয়। যোগের সঙ্গে জ্ঞানের সংমিশ্রণ ঘটাতে হবে। শুধু শারীরিক সংযম আর শমদমের দ্বারা আমরা কখনো পরম সত্যকে উপলব্ধি করতে পারব না। যে পরমাত্মা বা পরম ব্রহ্ম এই স্থল—জল—অন্তরীক্ষে বিরাজমান, তাঁকে শুধুমাত্র যোগের দ্বারা অনুভব করা সম্ভব হয় না। যা শুধু আত্মগম্য, তা কখনোই শরীর দ্বারা লভ্য নয়। যথার্থ আত্মজ্ঞান হলে তবেই আমরা ঈশ্বরের অনুভূতি লাভ করতে পারব।

    এইজন্য যেসব যোগী গৃহত্যাগ করে সন্ন্যাসী হয়ে উপযুক্ত আত্মজ্ঞান ছাড়া ঈশ্বরকে লাভ করতে চান, কবীর তাঁদের বারবার ধিক্কার দিয়েছেন। কবীরের মতে এইভাবে শরীরকে কষ্ট দিয়ে কখনো ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভ করা যায় না। তিনি বলেছেন—

    মন না রগাঁয়ে রগাঁয়ে যোগী কাপড়া
    আসন মারি মন্দিরমে বৈঠে,
    ব্রহ্মনাশি পূজন লাগে পথরা।।

    অর্থাৎ হে যোগী, তুই মন না রাঙিয়ে কাপড় রাঙালি? মন্দিরে আসন পেতে বসলি? ব্রহ্মাকে ছেড়ে পাথরকে পূজা করতে লাগলি? হিন্দু—মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের লোকেরাই ধর্ম সম্পর্কে কোনো জ্ঞান অর্জন করতে পারে না। তাদের কাছে ধর্ম কতকগুলি অনর্থক অনুষ্ঠানের সমাহার। এইসব মানুষের সমালোচনা করতেন কবীর। এঁরা নানাভাবে ধর্মের বাতাবরণকে কলুষিত করছেন, এমন কথা প্রায়শই ঘোষণা করতেন। ধর্ম সম্পর্কে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ উদার। তিনি জানতেন এক ধর্মের সঙ্গে অন্য ধর্মের কোনো বিবাদ বা বিতর্ক নেই। কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের পটভূমি তৈরি করেন আর এভাবেই নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করে থাকেন।

    একটি দোঁহায় মুসলমানদের আজান দেওয়ার ব্যাপারে কবীর মন্তব্য করেছিলেন—

    না জানৈ সাহব কৈসা হৈ।
    মুল্লা হোকর বাংলা জো দেবৈ
    ক্যা তেরা সাহব বহরা হৈ।।
    কীড়ীকে পগ নেবর রাজে,
    সো কী সাবে শুনতা হৈ।

    অর্থাৎ জানি না তোর প্রভু কীরকম। মোল্লা হয়ে যে আজান দিস, তোর প্রভু কী কালা? ক্ষুদ্র কীটের পায়ে নুপূর বাজে তাও তিনি শুনতে পান।

    অনেকে নানাভাবে ভক্তিরসে প্রাবল্য দেখিয়ে মানুষকে ভয় দেখান। অনেকে নিজেকে ঈশ্বরের সার্থক প্রতিস্পর্ধী হিসাবে ঘোষণা করেন। অনেকে যোগের মর্মকথা না জেনে গৃহত্যাগ করে সন্ন্যাস জীবনের সন্ধানে অরণ্য অভ্যন্তরে চলে যান। এঁদের উদ্দেশ করে কবীর বলেছেন— ওরে যোগী, কান ফুটো করলি, জটা রাখলি আর দাড়ি রেখে হয়ে গেলি ছাগল। জঙ্গলে গিয়ে ধুনি জ্বাললি। কামকে দমন করে ছ্যাচড়া হলি, গীতা পড়ে পড়ে হলি মিথ্যাবাদী। কবীর বলছে, শোনরে সাধুভাই, তোকে ধরে নিয়ে গিয়ে যমরাজ দরজায় রাখবে।

    প্রকৃত জ্ঞানের অভাব যাদের মধ্যে আছে, তারা এইসব বাহ্যিক আচরণ করে নিজেকে সকলের কাছে মহান করে দেখাতে চায়। ঈশ্বরের প্রতি অবিশ্বাস থাকলে তবেই আমরা এইসব সংস্কারের প্রতি আকর্ষণ বোধ করি। ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস রাখতে হবে, পৃথিবীর সর্বত্র ঈশ্বরের অধিষ্ঠান আছে এমন কথা মনে প্রাণে মনে করতে হবে।

    হিন্দু—মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মৌলবাদী কিছু মানুষ কবীরের এই সর্বধর্ম সমন্বয়ের বাণীকে মন থেকে মানতে পারলেন না। তাঁদের কাছে কবীর তখন এক জীবন্ত বিপদস্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তাই তাঁরা সেকালের পাঠান বাদশাকে সবকিছু জানালেন। এই বাদশা তখন দিল্লি থেকে কাশীতে এসেছিলেন। তিনি মন দিয়ে সব অভিযোগ শুনলেন।

    অবশ্য এই বাদশা ছিলেন মহাত্মা কবীরের পরম ভক্ত। তিনি হলেন সিকন্দর লোদি। কবীরের অলৌকিক অভিযাত্রার কথা তাঁর কানে পৌঁছে গেছে। বেশ কিছুদিন ধরেই তিনি এক ভয়ংকর অসুখে ভুগছিলেন। সারা গায়ে তাঁরা চাকা চাকা ফোস্কা হয়ে গেছে। সবসময় গভীর জ্বালা অনুভব করেন তিনি। শাসনকাজে আর মন দিতে পারেন না। অনেক মুসলমান হেকিম এবং হিন্দুদের বৈদ্যদের ডাকিয়ে এনেছেন। কেউ তাঁর এই শারীরিক যন্ত্রণার উপশম ঘটাতে পারেননি। শেষপর্যন্ত কাশীতে এসে কবীরের দৈবশক্তির ওপর নির্ভর করলেন ওই বাদশা।

    কবীর অনায়াসেই সারিয়ে দিলেন বাদশার এই দূরারোগ্য ব্যাধি। তাই কবীরের কাছে বাদশা হলেন ঋণী। তবে সমস্ত দেশের অধিপতি হিসাবে তাঁকে প্রজাদের ওইসব অভিযোগের কথা শুনতে হবে বৈকি। তার ওপর তাঁর পীর শেখ তকি কবীরের ওপর ঈর্ষান্বিত হয়েছেন। তিনিও বিচারের জন্য চাপ দিচ্ছেন। কাশীর একদল ব্রাহ্মণ সম্প্রদায় বারবার এই দাবি তুলছেন। মোল্লারাও যোগ দিয়েছেন তাঁদের সঙ্গে। সব মিলিয়ে পরিবেশ ও পরিস্থিতি তখন জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠছে।

    কবীরকে সর্বজনসমক্ষে ডেকে পাঠানো হল। কবীর গিয়ে দেখলেন শহরের অনেক লোভী পুরোহিত আর মোল্লারা সেখানে পৌঁছে গেছেন। বেশ কিছু মানুষ উৎসুক চিত্তে বসে আছেন। তাঁদের মধ্যে এমন অনেকে ছিলেন যাঁরা কবীরকে এক চলিষ্ণু ভগবান বলে মনে করতেন। কবীর এসে দৃঢ় আত্মবিশ্বাস আর ঈশ্বর বিশ্বাসের সঙ্গে সকলের সব অভিযোগ অস্বীকার করলেন। বাদশা চাপে পড়ে বাধ্য হয়ে কবীরকে মৃত্যুদণ্ড দান করেছিলেন। বাদশা জানতেন কবীর অলৌকিক শক্তির অধিকারী। পৃথিবীর কোনো শত্রু তাঁকে হত্যা করতে পারবে না।

    আর ঠিক এমন ঘটনাই ঘটে গেল। পরপর তিনবার তিনভাবে কবীরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার চেষ্টা করা হল। কিন্তু তিনবারই সব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়ে গেল। একবার কবীরকে হাত—পা বেঁধে একটি ঘরে পুরে দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হল। দাউ—দাউ করে জ্বলে উঠল আগুন শিখা। ঘরের সব কিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেল, কিন্তু মহাত্মা কবীর পদ্মাসনে বসে থাকলেন অক্ষত দেহে।

    এরপর হাত—পা বেঁধে কবীরকে গঙ্গার জলে ফেলে দেওয়া হয়। জলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে কবীরের হাত—পায়ের বাঁধন খুলে যায়। অলৌকিক শক্তিবলে তিনি জলের উপর ভাসতে থাকেন।

    বাদশাহ তখন রন্ডিজ নামে এক পাগলা হাতিকে কবীরের সামনে ছেড়ে দিয়েছিলেন। সেই ভয়ংকর পাগলা হাতি কবীরকে পদদলিত করতে পারল না। কবীরকে দেখে সেই হাতি ভয়ে উল্টো দিকে ছুটতে থাকে।

    পরপর তিনবার এই অলৌকিক ঘটনা দেখে মোল্লা এবং পুরোহিতরা একেবারে অবাক হয়ে গেলেন। বাদশাহ বুঝতে পারলেন যে কবীর হলেন এক অনন্ত শক্তির অধিকারী। কবীর এক সিদ্ধপুরুষ। বাদশাহ দিল্লি যাবার সময় কবীরকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কবীর এই প্রস্তাবে রাজি হলেন। বাদশাহ তাঁর সব থেকে সুন্দর হাতিটি কবীরের বাহন হিসাবে নির্দিষ্ট করেন। কবীর সমেত সৈন্যসামন্ত, আমীর, ওমরাহদের নিয়ে বাদশা চলেছেন দিল্লি অভিমুখে।

    যাবার পথে প্রয়াগে ত্রিবেণীর তীরে শিবির স্থাপন করা হল। সেদিন দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর কবীর সকলের সামনে দাঁড়িয়ে ধর্মোপদেশ দান করছিলেন। স্বয়ং সুলতান সেখানে এসে পৌঁছোলেন। শিবির স্থাপিত হয়েছিল গঙ্গার ঠিক ধারেই। বাদশা অবাক হয়ে কবীরের মুখ নিঃসৃত অমৃতবাণী শ্রবণ করছিলেন।

    এইসময় দেখা গেল গঙ্গার জলে একটি শিশুর মৃতদেহ পশ্চিম থেকে পূর্বদিকে ভেসে আসছে। সুলতানের পীর শেখ তকি এর আগে মহাযোগী কবীরের আধ্যাত্মিক শক্তির পরিচয় পেয়েছেন। তিনি কবীরকে এক মহান সাধকের স্বীকৃতি দিয়েছেন। কিন্তু তখনও শেখ তকির মনে কিছু দ্বিধা—দ্বন্দ্ব এবং সংশয় ছিল। আর ছিল কবীরের প্রতি এক গোপন ঈর্ষা। এতদিন পর্যন্ত তিনিই ছিলেন মুসলিম অধ্যাত্ম—জগতের এক নক্ষত্র, এখন কবীর এসে তাঁকে সেই জনপ্রিয়তা থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। এই বিষয়টি শেখ তকি ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারেননি। তিনি ভাবলেন, এই সুযোগে সর্বজনসমক্ষে কবীরকে অপমান করতে হবে। তকি সুলতানকে বললেন—জাঁহাপনা, কবীর সাহেব যদি গঙ্গায় ভেসে আসা এই মৃত শিশুটির দেহে প্রাণের সঞ্চারণ করতে পারেন, তাহলে আমি নির্দ্বিধায় তাঁকে মহাযোগী হিসাবে মেনে নেব।

    এই কথা শুনে কবীর মৃদু হাসলেন। তিনি হাত তুলে গঙ্গার দিকে তাকালেন। ভেসে আসা শিশুটিকে নিজের দিকে আকর্ষণ করলেন। কী আশ্চর্য, মৃত শিশু তাঁর ঈশারার অর্থ বুঝতে পেরে গতি পরিবর্তন করে কবীরের দিকে আসতে থাকল। গঙ্গার তীরে কবীর যেখানে বসেছিলেন তার ঠিক নীচে এসে থেমে গেল। স্থির হয়ে জলের ওপর ভেসে থাকল সে।

    কবীর তখন গঙ্গার তীরের ওপর পদ্মাসনে বসে ধ্যানমগ্ন হলেন। পরম করুণাঘন ঈশ্বর বা আল্লাহর কাছে নিজের সর্বস্ব নিবেদন করলেন। কিছুক্ষণ বাদে ধ্যান ভেঙে গেল। তিনি শিশুটির দিকে তাকিয়ে বললেন—এই মৃতদেহে আবার আত্মার অধিষ্ঠান হোক।

    কবীর এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটে গেল। কবীরের ডান হাতের তালু থেকে একটি তীব্র জ্যোতি ঠিকরে বেরিয়ে এল। সেই জ্যোতি শিশুটির মৃতদেহে প্রবেশ করল। সঙ্গে সঙ্গে মৃত শিশুটি চোখ মেলে তাকাল। গঙ্গার জল থেকে উঠে এসে কবীরের পায়ে নিজেকে নিবেদন করল।

    চোখের সামনে এমন এক অভাবিত ঘটনা দেখে উপস্থিত সকলে একেবারে হতবাক হয়ে গেলেন। সুলতান এবং শেখ তকিও কম অবাক হলেন না। তাঁরা বুঝতে পারলেন যে কবীরের মধ্যে অলৌকিক শক্তি এবং ক্ষমতা আছে। সুলতান বললেন—সাবাস কবীর সাহেব, আপনি তো কামাল করে দিলেন।

    একথা শুনে কবীর সাহেব শান্তভাবে উচ্চারণ করলেন—সুলতান, আপনি যখন কামাল শব্দটি উচ্চারণ করেছেন, তখন এই শিশুর নাম হোক কামাল।

    কামাল শব্দটির অর্থ হল অসাধ্য সাধন। এবার সুলতান সিকন্দর শাহ শিশু কামালের পূর্বজন্মের কথা জানতে আগ্রহী হয়ে উঠলেন। কবীর তখন শিশুটিকে ঈশারায় তা বলতে বললেন। শিশু নিজেই তার পূর্বজন্মের বৃত্তান্ত বিবৃত করতে লাগল। কবীর জানতেন এই শিশুটি অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন।

    শিশু কামাল বলতে লাগল—কয়েক বছর আগে উত্তরাখণ্ডে এক ব্রাহ্মণ পরিবারে আমার জন্ম হয়। আমার একটি বোনও ছিল। পূর্বজন্মের সংস্কারবশে আমরা একটু বড়ো হয়ে হিমালয়ে তপস্যা করতে গিয়েছিলাম। আমাদের জপে তুষ্ট হয়ে মহাত্মা কবীর আমাদের দর্শন দিয়েছিলেন। আমরা তখন তাঁর কাছে আত্মজ্ঞান লাভ করার প্রার্থনা করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন একদিন আমাদের মনোবাসনা পূর্ণ হবে। তার অল্পদিন পরেই আমাদের মৃত্যু হয়। আমাদের মৃতদেহ গঙ্গার জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমার বোনের মৃতদেহ কোথায় গেছে তা আমি জানি না। আর আমার ভাগ্যে যে ঘটনা ঘটল তা তো আপনারা নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছেন। কামাল সকলকে বুঝিয়ে দিল একমাত্র মহাত্মা কবীরের আশীর্বাদের ফলেই পূর্বজন্মের সব ঘটনা তাঁর মনে এসেছে। এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করে আরও একবার লজ্জিত হলেন শেখ তকি। তিনি যে এখনও কবীরের প্রতি সন্দেহ এবং বিদ্বেষ পোষণ করছেন, একথা ভেবে তাঁর সমস্ত মনে জাগল নিদারুণ ঘৃণা। নিজেকে ধিক্কার দিতে চাইলেন তিনি। কবীরের মতো এক মহাত্মা পুরুষের সংস্পর্শে আসার ফলে তাঁর জীবনের সমস্ত অন্ধকার দূরীভূত হয়েছে, একথা মনে হল তখন শেখ তকির। তিনি বুঝতে পারলেন যে, কবীর একজন সাধারণ সাধু নন। যোগসাধনার দ্বারা কবীর এমন এক আধ্যাত্মিক শক্তি লাভ করেছেন যার দ্বারা যে—কোনো অলৌকিক কাজ চোখের নিমেষে সমাধা করতে পারেন। পরবর্তীকালে কামাল কবীরের এক বিখ্যাত শিষ্য হয়ে ওঠে। অনেকে আবার এই কামালকে কবীরের ঔরসজাত পুত্র বলে মনে করেন। তবে সাধু সমাজে গুরুকে আধ্যাত্মিক পিতা হিসাবে স্বীকার করা হয়, সেই হিসাবে আমরা কামালকে কবীরের পুত্র বলতে পারি।

    কবীর সম্পর্কে আর—একটি গল্প প্রচলিত আছে। রাজধানী দিল্লির দরবারে সিকন্দর লোদি বসে আছেন। শেখ তকি বিষণ্ণ মনে সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। কিছুদিন আগে তাঁর সাত—আট বছরের এক শিশুকন্যার মৃত্যু হয়েছে। তাকে কবরও দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনার কথা মনে হলে শেখ তকির মন শোকাচ্ছন্ন হয়ে যায়। একথা ভেবে তকির চোখে জল আসে।

    দরবারে ঢুকে তিনি কবীরের উদ্দেশে, সুলতানের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন— কয়েকদিন আগে আমাদের দিল্লি আসার সময় কবীর সাহেব গঙ্গায় ভেসে আসা এক মৃত শিশুর শরীরে প্রাণ সঞ্চার করেছিলেন। কিন্তু তাতে তাঁর খুব একটা কৃতিত্ব আছে বলে আমার মনে হয় না। কারণ অনেকক্ষেত্রে মানুষকে মৃত বলে ঘোষণা করার পরেও তার প্রাণ মাথার খুলির মধ্যে এক জায়গায় ঢুকে থাকে। পরে সেই মৃতদেহে পচন শুরু হবার আগে যে—কোনো সময় সেই প্রাণ আপনা থেকে বেরিয়ে এসে শরীরের সর্বত্র সঞ্চারিত হয়। তাই হয়তো জলে ভেসে আসা মৃতদেহটিকে জাগিয়ে তোলা সম্ভব হয়েছিল। মৃতদেহটিকে পুড়িয়ে দেওয়া হয়নি। সেটি কবর দেওয়া হয়নি। জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল মাত্র। তাই জলে থাকায় মাথার খুলি থেকে প্রাণ বেরিয়ে আসার সুযোগ পেয়েছিল।

    কিন্তু আমার মেয়েটিকে যদি কবীর সাহেব বাঁচিয়ে তুলতে পারেন, তাহলে আমি তাঁর অলৌকিক শক্তিকে অকুণ্ঠভাবে স্বীকার করব। এমনকি আমি সানন্দে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করব। শুধু তাই নয়, সারাজীবন ধরে তাঁর মহিমা প্রচার করব।

    শেখ তকির কথা বলা শেষ হয়ে গেল। সভা—ঘরে হাজির সকলে তখন উন্মুখ হয়ে কবীরের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁদের মনে জেগেছে নানা প্রশ্ন। সত্যিই কী কবীর এক সিদ্ধপুরুষ? তিনি কী শেখ তকির অনুরোধ রক্ষা করতে পারবেন?

    শেখ তকির কথা শুনে কবীর সাহেব কেমন যেন হয়ে গেলেন। বেশ কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে তিনি কী সব ভাবতে লাগলেন। তারপর চোখ খুললেন। শেখ তকিকে তাঁর কন্যার কবরের কাছে নিয়ে যেতে বললেন। শেখ তকি খুব খাতিরযত্ন করে কবীরকে সেই কবরখানায় নিয়ে গেলেন। কবীর সাহেব সেখানে গিয়ে কবরের মুখ খুলে দিতে বললেন। এই বিষয়টি দ্রুত চারিদিকে প্রচারিত হয়ে গেছে। দলে দলে উৎসুক জনতা এসে হাজির হয়েছেন সেখানে। তাঁরা নিজের চোখে কবীরের অলৌকিক ক্ষমতা প্রত্যক্ষ করতে চান।

    কবরের মুখ খোলা হল। কবীর শবটির দিকে তাকিয়ে জোর গলায় বললেন, ওগো শেখ তকির কন্যা, উঠে এসো তো মা।

    এইভাবে পরপর তিন বার নাম ধরে ডাকলেন তিনি। কিন্তু কোথাও কিছু হল না। শবের মধ্যে প্রাণের কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। কবীরের অলৌকিক শক্তির জন্য যেসব জনতা এসে ভিড় করেছিল, তাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল অসন্তোষ, শেখ তকি হতাশ হলেন। সুলতান ভাবলেন শেখ তকি ঠিক কথাই বলেছেন। গঙ্গার জলের ধাক্কায় মৃত শিশুটির দেহে প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। এতে কবীরের কোনো হাতযশ নেই। কবীর মিথ্যাই নিজেকে চলমান অবতার বলে ঘোষণা করে থাকেন।

    এমন সময় কবীর শেষবারের মতো বলে উঠলেন, উঠে বোসো তো মা কবীরের কন্যা।

    এই কটি কথা কবীরের মুখ থেকে নির্গত হবার সঙ্গে সঙ্গে কবরের মধ্যে সহজ মানুষের মতোই উঠে বসলো সে। সেই শিশুকন্যা কবর থেকে বেরিয়ে এসে কবীরের পায়ে লুটিয়ে পড়ল। সে বলল—কবীরই তার বাবা, সারাজীবন ধরে কবীরকেই সে তার পিতা বলে ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছে।

    চোখের সামনে এমন এক অভাবিত ঘটনা দেখে শেখ তকি একেবারে আত্মহারা হয়ে গেলেন। তিনি যে মনে মনে কবীরকে ঈর্ষা করেন, সে কথা ভেবেই অনুশোচনা হল তাঁর। তিনি তাঁর অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করতে লাগলেন। এইভাবে কামাল এবং কামালি দুজনেই কবীরের পুত্র—কন্যা হিসাবে প্রচারিত হয়েছেন। আমরা জানি না এর মধ্যে কোন গল্পটি আসল এবং কোন গল্পটি কল্পনার জারক রসে সঞ্জীবিত হয়েছে।

    অনেকে বলে থাকেন তাঁরা হলেন কবীরের পরম প্রিয় শিষ্য এবং শিষ্যা। তবে অলৌকিকভাবে এদের দেহে প্রাণ সঞ্চারের ঘটনার কথা কবীরপন্থী জীবনীকাররা সকলেই স্বীকার করেছেন। কবীরের অলৌকিক জীবন সম্পর্কে যেসব গ্রন্থ লেখা হয়েছে সেখানে যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে এই দুটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যান্য সাধুরাও কামাল—কামালির এই আশ্চর্য জীবন ফিরে পাওয়ার কাহিনি নানাভাবে বর্ণনা করেছেন। এই বিশ্লেষণগুলি পড়লে মনে হয় কবীর হয়তো এমন এক মহাশক্তির অধিকারী ছিলেন যার দ্বারা তিনি মৃত্যুকে পর্যন্ত অতিক্রম করতে পেরেছিলেন।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleআমাদের তুমুল হৈ-হল্লা – পূর্ণেন্দু পত্রী
    Next Article কৃষ্ণসাধিকা মীরাবাঈ – পৃথ্বীরাজ সেন

    Related Articles

    পৃথ্বীরাজ সেন

    আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ২ (অনুবাদ : নচিকেতা ঘোষ)

    September 16, 2025
    পৃথ্বীরাজ সেন

    আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ৩ (অনুবাদ : পৃথ্বীরাজ সেন)

    September 16, 2025
    পৃথ্বীরাজ সেন

    আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ৪ (অনুবাদ : পৃথ্বীরাজ সেন)

    September 16, 2025
    পৃথ্বীরাজ সেন

    অষ্টাদশ পুরাণ সমগ্র – পৃথ্বীরাজ সেন সম্পাদিত

    September 16, 2025
    পৃথ্বীরাজ সেন

    জেমস বন্ড সমগ্র – ইয়ান ফ্লেমিং

    September 16, 2025
    পৃথ্বীরাজ সেন

    বাংলার মাতৃসাধনা – পৃথ্বীরাজ সেন

    September 16, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Our Picks

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }