মহাত্মা কবীরের জীবন – ৬
ছয়
মহাত্মা কবীরের জীবনে এমন অনেক অলৌকিক ঘটনা ঘটে গেছে। তার মধ্যে দুটি ঘটনার কথা আমরা উল্লেখ করব। আমরা জানি কবীর লুই নামে এক মুসলমান কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন। এই লুই—এর জীবনকথাও বড়ো চিত্তাকর্ষক। তিনিও ছিলেন এক পরম সাধিকা। তাঁর প্রাকজীবনের ইতিহাস কৌতূহলে ভরা।
সে—সময়ে গঙ্গার ধারে নির্জন বনে এক ধার্মিক মহাপুরুষ বসবাস করতেন। একদিন সকালে তিনি আশ্রম থেকে বেরিয়ে গঙ্গায় স্নান করতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ দেখতে পেলেন কম্বলে জড়ানো কী একটা বস্তু গঙ্গার স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। তিনি বুঝতে পারলেন যে, এই বস্তুটি মৃত নয়, এর মধ্যে প্রাণস্পন্দন আছে। অসহায় এই জীবটির প্রতি দয়া জাগল ওই সাধকের মনে। তিনি কম্বল জড়ানো জীবটিকে জল থেকে তীরে এনে তুললেন। দেখলেন একটি শিশুকন্যা। স্নান সেরে তিনি শিশুকন্যাটিকে আশ্রমে নিয়ে গেলেন। ওই মহাত্মা পুরুষের যত্ন ও সেবায় মেয়েটি ধীরে ধীরে বড়ো হয়ে উঠল। মহাপুরুষ তাঁর পালিতা কন্যা হিসাবে মেয়েটির পরিচয় দিতেন। যেহেতু তিনি তাকে কম্বলে জড়ানো অবস্থায় পেয়েছিলেন, তাই তার নামকরণ করা হল লুই।
ধীরে ধীরে সেই মহাত্মা পুরুষ বৃদ্ধ হলেন। তাঁর অন্তিমকাল উপস্থিত হল। লুই তাঁকে দেখে আর্তনাদ করে কাঁদতে থাকলেন। এই নির্জন বনে তিনি কী করে একা থাকবেন? এই আশঙ্কা জাগল তরুণী লুই—এর মনের মধ্যে।
তখন মহাপুরুষ বললেন—মা, আমার মৃত্যুর পর তোমাকে আর বেশিদিন একা থাকতে হবে না। তাছাড়া তোমার কোনো বিপদ হবে না। তোমার চারপাশে গণ্ডী কাটা আছে। কিছুদিনের মধ্যে এক মহাত্মা পুরুষ এখানে আসবেন। তিনি হবেন মহাসাধক। তাঁর কাছে তুমি আশ্রয় পাবে। তবে একটি কথা, সেই মহাত্মা পুরুষের আবির্ভাব না হওয়া পর্যন্ত তুমি এ স্থান ছেড়ে অন্য কোথাও যাবে না।
অবশেষে সেই সাধকের মৃত্যু হল। লুই চোখের জলে ভেসে গেলেন। দিন গোনা শুরু হল তাঁর। যখন কোনো ব্যক্তি সেখানে আসত, লুই উৎসুক হয়ে তাঁর নাম—ঠিকানা জানতে চাইতেন। কিন্তু সেই মহাত্মা কবে আসবেন? ধীরে ধীরে লুই হতাশ ও নিরাশ হলেন।
একদিন দুজন সাধক ঘুরতে ঘুরতে সেই আশ্রমে এসে উপস্থিত হলেন। লুই তাঁদের যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করলেন। দু—পেয়ালা গরম দুধ এনে দুজনের সামনে রাখলেন। তাঁদের মধ্যে একজন পরম তৃপ্তিভরে সেই দুধ পান করলেন। অন্যজন কিন্তু দুধের পাত্র ছুঁয়েও দেখলেন না। লুই এই আশ্চর্য আচরণের কারণ জানতে চাইলেন। সাধু বললেন—আমি শব্দাহারী, আমি শুনতে পাচ্ছি আর—একজন সাধু এখানে আসছেন।
এই কথা শুনে লুই জিজ্ঞাসু চোখে চারিদিকে তাকালেন। কিন্তু কোনো মানুষকে দেখতে পেলেন না। কিছুক্ষণ পর লুই দেখলেন যে সত্যিই এক সাধু কোথা থেকে এখানে এসে হাজির হয়েছেন। লুই তখন ওই সাধুর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাঁর পরিচয় জানতে চাইলেন। সাধু উত্তরে শুধু একটিই শব্দ বললেন—কবীর।
লুই তাঁর জাত গোত্রের কথা জানতে চাইলে সাধু মৃদু হেসে আবারও কবীর শব্দটিই উচ্চারণ করেছিলেন।
লুই তাঁর ধর্মের কথা জানতে চাইলেও তিনি উত্তরে বললেন—আমি কবীর।
এবার লুই তাঁর লোকান্তরিত পালক পিতাকে স্মরণ করলেন। লুই বুঝতে পারলেন এই কবীরই হলেন তাঁর জীবনের পথপ্রদর্শক। লুই কবীরকে বললেন—মহারাজ, আমাকে দয়া করে আপনার আশ্রমে নিয়ে চলুন।
কবীর বললেন—তুমি যাবে আমার আশ্রমে? চলো, সেখানে গেলে তোমাকে কোনো পার্থিব দুঃখ—কষ্টের সামনে দাঁড়াতে হবে না। আমরা সদাসর্বদা পরমপুরুষ ঈশ্বরের নাম ভজনা করি।
কিছু কিছু কবীরপন্থী তাই বলে থাকেন যে লুই ছিলেন কবীরের শিষ্যা। কবীর নাকি বিয়েই করেননি। কবীরের একটি দোঁহাতে লুই—এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে এইভাবে—
কহত কবীর শুনছ রে লোঈ।
নহম কিসীকে, ন হমরা কোঈ।।
অর্থাৎ এই পৃথিবীতে কেউ কারও আপন নয়।
আর—একটি দোঁহাতে কবীর ধনিয়া নামের এক নারীর উল্লেখ করেছেন। কবীরের কোনো কোনো জীবনীকার ধনিয়াকে তাঁর স্ত্রী বলে তুলে ধরেছেন। এই ধনিয়ার আর—এক নাম ছিল রামজনিয়া।
আর—একটি গল্পের কথাও আমরা এখানে বলব। এই গল্পটি বিশ্লেষণ করলে আমরা বুঝতে পারব যে, কবীরকে কতভাবে ঈশ্বরের সামনে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। প্রতিটি পরীক্ষাতেই কবীর জয়যুক্ত হয়েছেন।
একবার ভগবান তাঁকে পরীক্ষা করার জন্য স্বর্গের সুন্দরী অপ্সরাকে ডেকে পাঠালেন। ভগবান বললেন—বারাণসীতে কবীরদাস নামে এক ভক্ত আছে। তুমি আজই তার কাছে চলে যাও। তোমার মোহিনী মায়া এবং রূপ—যৌবনের ডালি দিয়ে তাঁকে বশ করতে হবে।
স্বয়ং ভগবানের আদেশ পেয়ে ওই অপ্সরা নিজেকে সুন্দর সাজে সজ্জিত করে মায়াবিনী রূপ ধারণ করল। তাকে দেখে মনে হল স্বয়ং রম্ভা বুঝি শুকদেবকে সম্মোহিত করার জন্য এগিয়ে চলেছে। তার দৃষ্টি যারই ওপর পড়ে সে—ই কামবাণে বিদ্ধ হয়। কত মুনিঋষির মন টলে যায়। অপ্সরা অবশেষে পৌঁছে গেল কাশীধামে। সে তপস্যারত কবীরের কাছে গিয়ে বলল—শোনো, আমার এই নয়ন ভোলানো রূপের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকো, চোখ নামিয়ে নিও না। কত যোগী আমাকে পাবার জন্য জন্ম—জন্মান্তর ধরে তপস্যা করেছে। কাশীধামে কত পুণ্যবান আমাকে আলিঙ্গন করার জন্য চেষ্টা করেছে। তবু তারা কেউ আমাকে স্পর্শ পর্যন্ত করতে পারেনি। তুমি আমাকে উপভোগ করো, তা নাহলে তোমাকে আমি এমন অভিশাপ দেব যে তোমার সমস্ত জপতপ একেবারে নষ্ট হয়ে যাবে।
অপ্সরার সেই অনিন্দসুন্দর মায়াবিনী রূপ দেখে অথবা তার মুখ নিঃসৃত এমন বিনোদিনী বাক্য শুনে কবীরের মধ্যে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। কবীর শান্ত এবং সংযতভাবে বললেন—বলো মা, স্বর্গলোক কী অরণ্য হয়ে গেছে? স্বর্গলোকে থাকতে তোমার কী এমন অসুবিধা হচ্ছে যে তুমি মর্ত্যলোকে নেমে এসেছ? মর্ত্যেই যদি আসো তাহলে রাজপ্রাসাদে যাচ্ছ না কেন? রাজা তোমাকে যথেষ্ট সমাদর করে বরণ করে নেবেন। আমি দীন দরিদ্র দুঃখী সন্ন্যাসী। তোমাকে দেবার মতো তো আমার কিছুই নেই। অতি তুচ্ছ আমার পেশা। জপতপ, সাধন ভজন সেভাবে করতে পারি না। শুধুমাত্র ভক্তি দিয়ে যতটুকু পারি ঈশ্বরের আরাধনা করি। সবকিছুর দিক থেকে আমি তুচ্ছ। আমি জড় প্রস্তরের মতো, সুখ কী তা আমি জানি না। আমোদ প্রমোদের কোনো অনুভূতি আমাকে কখনো আকর্ষণ করে না। আমি ইন্দ্রিয়ের দাসত্ববৃত্তি করি না। আমার হৃদয়ে হরি অবস্থান করছেন, সেখানে তোমার ঠাঁই হবে না। তোমার রূপ আর তোমার চোখের দৃষ্টি বিষের মতোই পরিত্যজ্য বলে মনে হচ্ছে আমার কাছে।
অপ্সরা ভাবতেই পারেনি যে তার এই ছলনা ব্যর্থ হবে। এর আগে সে কতবার ভগবানের আদেশে বিভিন্ন মুনিঋষির জপতপ ভঙ্গ করেছে। কিন্তু কবীরের কাছে তাকে পরাস্ত হতে হল। এবার স্বয়ং ভগবানের কাছে ফিরে গেল সে। সব কথা বর্ণনা করল। ভগবান বুঝতে পারলেন এভাবে কবীরকে বিপদে ফেলার চেষ্টা করা উচিত হয়নি। ভগবান কবীরের সামনে এসে দেখা দিলেন। তাঁকে বর দিতে চাইলেন। ভগবান প্রশ্ন করলেন—কবীর তুমি কী চাও? অষ্টসিদ্ধি? নবরত্ন? নাকি সসাগরা পৃথিবীর ওপর আধিপত্য?
এইসব প্রশ্ন শুনে কবীরের মনের মধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। চোখের সামনে পরম কাঙ্ক্ষিত ঈশ্বরকে দেখে তিনি খুবই আনন্দিত হলেন। তারপর শান্ত হয়ে বললেন—হে ত্রিভুবনেশ্বর, আপনার কৃপাদৃষ্টি ছাড়া এসব কিছুই আমি চাই না। আমি এখন এক ভাববিহ্বল অবস্থায় আছি। আপনি কী বলছেন তা আমি বুঝতে পারছি না। ভালোমন্দ, ন্যায়অন্যায় সম্পর্কে কোনো জ্ঞান নেই আমার। আমার সব কিছুই তো আমি আপনার হাতে ছেড়ে দিয়েছি। এত বড়ো দান আমি গ্রহণ করব কেমন করে? ছোটো একটি পিঁপড়ে কী পাহাড়কে তুলতে পারে? তারকা কী চন্দ্রকে আবৃত করতে পারে? অন্তর্জলি দ্বারা কী সাগর সিঞ্চন সম্ভব? আমি আপনার এক দীন দরিদ্র শিষ্য, আমি বিষ আর মধুর তারতম্য বুঝতে পারি না।
কবীরের এই কথা শুনে ভগবান সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে আশীর্বাদ করলেন।
কবীরের উদারপন্থী ধর্মমত তখন ক্রমশ আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ধীরে ধীরে বাড়ছে তাঁর ভক্ত এবং অনুগতের সংখ্যা। কিছু কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ তখন কবীরকে সহ্য করতে পারছেন না। তাঁরা চেষ্টা করছেন কী করে জনসমক্ষে কবীরকে হেয় করা যায়।
গোরখ গোষ্ঠীতে লিখিত একটি কাহিনিতে লেখা আছে যে, একবার বৌদ্ধ নাথ সম্প্রদায়ের যোগী গোরখবাবা শাস্ত্র নিয়ে আলোচনা করার জন্য কবীরের কাছে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। তিনি এসেই কবীরের শক্তি পরীক্ষা করার জন্য মাটিতে একটি ত্রিশূল পুঁতে দিলেন। তারপর ত্রিশূলের একটি ফলার ওপর নিজে বসলেন। অন্য একটি ফলাতে বসার জন্য কবীরকে আহ্বান করলেন। তাঁর স্থির বিশ্বাস ছিল কবীর এই আহ্বান কখনোই রক্ষা করতে পারবেন না।
কবীর গোরখবাবার কুমতলব বুঝতে পারলেন। তিনি তাঁতের মাকু থেকে কিছুটা সুতো বের করে আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিলেন। মনে হল সুতোটার যেন কোনো শেষ নেই। সুতোটা চোখের নিমেষে দূর আকাশে উঠে গেল। কবীর সেই সুতো ধরে অনেক উঁচুতে পৌঁছে গেলেন। তারপর সেই সুতোর একপ্রান্তের ওপর বসলেন। গোরখবাবাকে বলতে লাগলেন—নাথজি, আপনার ত্রিশূল তো মাটিতে পোঁতা। ওখানে বসা মানায় না আপনার। ওখান থেকে উঠে এসে সুতোর ওপর বসুন। এই সুতো নিরালম্বু হয়ে অনন্ত আকাশে পৌঁছে গেছে। এর থেকে ভালো জায়গা পৃথিবীতে আর কোথাও নেই!
এই কথা শুনে গোরখনাথ পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হলেন। তিনি মাথা নত করে কবীরকে প্রণাম করে অবিলম্বে ওই স্থান ত্যাগ করলেন।
একবার গোরখনাথ কবীরকে প্রশ্ন করেছিলেন—কে তোমাকে সিদ্ধি দিল? কে তোমার হাতে দণ্ড কমণ্ডুল দান করল? কে তোমাকে হরিনাম শোনাল? কে দিল জপমালা?
এতগুলি প্রশ্ন শুনে কবীর মোটেই রেগে গেলেন না। তিনি একে একে শান্ত সহজভাবে সবকটি প্রশ্নের জবাব দিলেন। কবীর বললেন—স্বয়ং ব্রহ্মা আমাকে দণ্ড আর কমণ্ডলু দান করেছেন। আমায় মৃগছাল দিয়েছেন স্বয়ং শিব। গুরু আমাকে হরিনাম শুনিয়েছেন। আর বিষ্ণু দিয়েছেন জপমালা।
এই উত্তর শুনে গোরখনাথ অবাক হয়ে গেলেন! তিনি বুঝতে পারলেন যে কবীরের মধ্যে এক ভাবসত্তার উদয় হয়েছে। তবু কবীরকে আরও পরীক্ষা করা দরকার। তিনি বললেন—অণ্ডাল, মণ্ডাল আর চারি খুলি এসবের মানে জানো কী? না জানো তো ঝোলা আনো। অর্থাৎ আমাদের দলে এসে যোগ দাও।
কবীর এই কথা শুনে একটু হেসে বললেন—অণ্ডাল মানে পৃথিবী, মণ্ডাল মানে আকাশ, চারি খুলি মানে চন্দ্র, সূর্য আর দু—কান। ঝোলা আর মালার কোনো দরকার নেই আমার। আমার গুরু রামানন্দ, তাঁর মতো মহাত্মা পুরুষ পৃথিবীতে আর কেউ নেই। ফের যদি আপনি এসব কথা বলেন, তাহলে বাধ্য হয়ে আমি আপনার কান মলে দেব।
গোরখনাথ বুঝতে পারলেন এখানে থাকা আর উচিত নয়। কবীরের পাণ্ডিত্য এবং ব্যক্তিত্বের কাছে সম্পূর্ণ পরাভূত হয়েছেন তিনি। তিনি অবিলম্বে সেই স্থান ত্যাগ করলেন।
কবীরের উদ্দেশ্য ছিল সহজ সরল ভাষায় ধর্মের বিষয়গুলিকে নিরক্ষর দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কবীরের মধ্যে ছিল এক আশ্চর্য সম্মোহনী ব্যক্তিত্ব। যে মানুষ একবার তাঁর সংস্পর্শে আসতেন, তিনি বারবার তাঁর কাছে আসার চেষ্টা করতেন। তাঁর মুখনিঃসৃত বাণী শ্রবণ করলে মনে হত আমি বুঝি অমৃতবাণী শুনছি। তাই অনেকেই স্ব—ইচ্ছায় কবীরের শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন। কবীর কথায় কথায় সুন্দর সুন্দর দোঁহা বা কবিতা লিখে সাধারণের সামনে বলেছেন। এইভাবে তাঁর ভক্তসংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল।
একদিন বাড়িতে কুয়ো থেকে জল তুলছিল কবীরের মেয়ে কামালী। পিপাসার্ত এক ব্রাহ্মণ যুবক এসে তার কাছে জল চাইল। কবীর তখন বাড়ির মধ্যে বসে কয়েকজনকে ধর্ম উপদেশ দান করছিলেন। কামালী কুয়ো থেকে জল তুলে যুবকটির হাতে ঢেলে দিল। যুবকটি শীতল জল পান করে তৃষ্ণা মেটালো। তারপর অবাক চোখে কামালীর যৌবন সমৃদ্ধ তনুবাহারের দিকে তাকিয়ে থাকল। কামালীর পরিচয় জানতে চাইল ওই আগন্তুক যুবক। কামালী বুঝতে পারল সে গোঁড়া ব্রাহ্মণ সন্তান, কার হাতে জল পান করেছে তা জানতে হবে বইকি।
যুবক কামালীকে জিজ্ঞাসা করল—তোমার নাম কী? কামালী তার নাম বলতেই যুবক জানতে চাইল—তোমার বাবার নাম কী? কামালী বলল—আমার বাবার নাম কবীর। যুবক বলল তিনি কী করেন? কামালী বলল—তিনি তাঁত বোনেন। আমরা মুসলমান জোলা।
এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে যুবক খুব রেগে গেল। সে বলল—আগে কেন তুই তোর পরিচয় বলিসনি। তোর হাতে জল খেয়ে আমি জাত নষ্ট করলাম।
এই কথা বলে ওই যুবক গলায় আঙুল ঢুকিয়ে বমি করার চেষ্টা করল। সে এত রেগে গিয়েছিল যে, কবীরের সঙ্গে কথা বলতে পারল না। কবীর শান্তভাবে প্রশ্ন করলেন—আপনার এত রাগের কারণ কী?
এবার যুবক বলল—তোমার মেয়ে আমার জাত মেরে দিয়েছে। আগে জানলে তার হাতে আমি জল খেতাম না। আমি এক নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ সন্তান। আর তোমরা মুসলমান জোলা। একে ছোটো জাত, তার ওপর বিধর্মী।
এই কয়টি কথা বলে যুবক রাগী চোখে কবীরের দিকে তাকাল। এত অপমানজনক কথা শোনার পরেও কবীর কিন্তু একটুও রাগ করলেন না। কবীর যুবকটির মুখের ভাব দেখে একটুখানি শুধু হাসলেন। তারপর তাকে শিক্ষা দেবার জন্য একটি দোঁহা বললেন—
পাঁড়ে, বুঝি পিয় হু তুম পানী।
জিহি মিটিয়াকে ঘরমহঁ বৈঠে,
তামঁহ সিষ্টি সমানী।।
ছপন কোটি যাদব জহঁ ভিজে,
মুনিজন সহস অঠাসী।
পৈগ পৈগ পয়গম্বর গাড়ে,
যো সব সবি ভৌ মাটি।।
তেহি মিটিয়াকে ভাঁড়ে পাঁড়ে,
বুঝি পিয়হু তুম পানী।।
সচ্ছ কচ্ছ ঘরিয়ার বিয়ান্তে
রুধির-নীর ডাল ভরিয়া।
নদীয়া নীচ নরক বহি আবৈ,
অহু মানুষ সব মরিয়া।।
হাত ঝুরী ঝরি গূদ গরী গরি,
দুধ কহাঁতে আয়া।
সো লৈ পাঁড়ে জেবন বৈঠে,
মটিয় হি ছুতি লপায়া।।
বেদ—কিতেব ছাঁড়ি দেউ পাঁড়ে,
ঈ সব মনকে ভরসা।
কহহিঁ কবীর শুনছ পাঁড়ে,
ঈ তু স্থরে হৈ করমা।।
ওহে পাঁড়ে, বুঝেসুঝে জল খাও। তুমি যে মাটির ঘরে বসে আছ, তুমি কী জানো সেই মাটির দ্বারাই সবকিছু তৈরি হয়েছে। ছাপান্ন কোটি যাদব গলে মিশে গেছে এই মাটিতে। এই মাটিতে মিশে গেছে অষ্টাশি হাজার মুনি। এর প্রতি পদে পদে কত পয়গম্বরকে কবর দেওয়া হয়েছে। সেসব পচে মাটি হয়ে গেছে। ওহে পাঁড়ে, সেই যে মাটি, সেই মাটির ভাঁড়ে বুঝেসুঝে জল খাও। জলে কত মাছ, কচ্ছপ, ঘড়িয়াল বাচ্চা প্রসব করে। জলেতে মিশে যাচ্ছে তাদের রক্ত। নদীর জল তো নরকের নানা আবর্জনা বহে আনছে। তার মধ্যে কত মরা মানুষ পচছে হাড় থেকে ঝরে ঝরে আর মাংস থেকে চুঁয়ে চুঁয়ে যে দুধ হচ্ছে, তা কোথা থেকে আসে তুমি তা জানো কী? ওহে পাঁড়ে, তুমি সেই দুধ নিয়ে খেতে বসেছ আর মাটি নিয়ে ছোঁয়াছুঁয়ি বিচার করছ? ওহে পাঁড়ে, বেদ, কিতাব সব ছেড়ে দাও। এসবই হল তোমার কাজ।
কবীরের মুখ থেকে এই বাক্যগুলি বের হবার সঙ্গে সঙ্গে ব্রাহ্মণ সন্তান যুবকের মনে পরিবর্তন দেখা গেল। মুগ্ধ বিস্ময়ে অবাক হয়ে গেল যুবকটি। এতক্ষণ পর্যন্ত সে ভেবেছিল কবীর এক গোঁড়া, মূর্খ, নীচ মুসলমান। এখন সে আর কোনো কথা বলতে পারল না।
কবীর আবার বলতে লাগলেন—আমি মূর্খ, আমি কোনোদিন কোনো প্রতিষ্ঠানে গিয়ে শিক্ষালাভ করিনি। গুরু আমাকে আদেশ দিয়েছেন তাই আমি গুরুর কথা সকলের সামনে বলছি। ওহে যুবক, আপনি তো জানেন, জাত বিচার মানুষেরই সৃষ্টি। মানুষ নিজের স্বার্থে এই সংকীর্ণ জাল তৈরি করেছে। আবার নিজে এই জালে এমনভাবে জড়িয়ে পড়েছে যে সেখান থেকে বাইরে বের হবার পথ খুঁজে পাচ্ছে না।
ঈশ্বর বা আল্লাহ হলেন পরম প্রেমময়। তিনি পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে এবং পৃথিবীর সকল সৃষ্টিকে একইরকমভাবে আশীর্বাদ করেন। ঈশ্বর দর্শন হলে বা মনের ভেতর ভক্তিভাবনার জন্ম হলে আমরা সত্যিকারের আনন্দ লাভ করতে পারি, তখন মনের সব সংকীর্ণতা হারিয়ে যায়। দূর হয়ে যায় ভেদজ্ঞান। সঙ্গে সঙ্গে হৃদয়ে প্রকৃত আলোকশিখার উদয় হয়। সেই আলোকেই সব অন্ধকার দূরীভূত হয়। তখন বিশ্বের সমস্ত মানুষকে মনে হয় আত্মার আত্মীয়। শুধু মানুষ নয়, মনুষ্যেতর প্রাণীদেরও নিজের বলে কাছে টানতে ইচ্ছে করে। মানুষ সদাসর্বদা অজ্ঞতার জগতে পতিত। সেই বিবর থেকে আমাদের মুক্তি নিতেই হবে। কুসংস্কারের জঞ্জাল দূর করতে না পারলে আমরা পবিত্র সূর্যালোক দেখব কেমন করে? ওহে ভাই, সকলকে ভালোবাসুন, জাতধর্মের কোনো বিচার করবেন না।
কবীরের এসব কথা শুনতে শুনতে যুবকটির মনে আরও পরিবর্তন দেখা দিল। তার কেবলই মনে হল যে তার এই পঁচিশ বছরের জীবনে সে আগে কখনো এমন অমৃতকথা শোনেনি। যুবকটি বুঝতে পারল এই মুসলমান জোলার মধ্যে এক অনন্ত শক্তিসম্পন্ন মহাপুরুষ বসে আছেন। না হলে তিনি এত সহজভাবে এসব তত্ত্বকথা বলছেন কী করে? প্রতিটি কথার মধ্যে যে সত্য আছে তা একেবারে অন্তরকে বিদ্ধ করছে।
কবীর আবার বললেন—আপনার দোষ নেই। আপনি পূর্বজন্মের এবং এ জন্মের সংস্কারের বশেই এসব কথা বলছেন। আপনি এক সদগুরুর স্মরণ নিন, আপনার মনের এই ভাব বা সংস্কার সব তিনি দূর করবেন। তখন আপনি এক নতুন পথের সন্ধান পাবেন।
যুবকটি সহসা অনুভব করল কবীরের দুটি চোখের মধ্যে থেকে এক দৈবশক্তি এসে তার হৃদয়ে প্রবেশ করেছে। তার শরীর জুড়ে দেখা দিল এক তীব্র আলোড়ন। সে ছটফট করতে লাগল। কবীরের পায়ে লুটিয়ে পড়ে প্রার্থনা করতে লাগল আর বলতে লাগল—আপনি আমাকে ক্ষমা করুন প্রভু, আমি না জেনে আপনাকে অপমান করেছি। বলুন এর জন্য আমাকে কী শাস্তি ভোগ করতে হবে?
কবীর এবার সস্নেহে যুবকটিকে তুলে ধরলেন। তারপর বললেন—অত দুর্বল হলে চলবে কেমন করে? তুমি না ব্রাহ্মণ সন্তান! মনকে শক্ত করো। সৎগুরুর আশ্রয় নাও। তাহলে নিশ্চয়ই শান্তি পাবে।
যুবক এবার উদ্বিগ্ন হয়ে প্রশ্ন করল—এমন গুরু কোথায় আছেন? কবীর বললেন—সন্ধান করলে নিশ্চয়ই পাবে। যুবক বলল, অনেক সন্ধান করেছি, দেখতে দেখতে জীবনের পঁচিশটি বসন্ত কেটে গেছে। কিন্তু তেমন কোনো গুরুর সন্ধান তো আমি পাইনি। আপনি কী তাঁর সন্ধান দিতে পারেন?
কবীর হেসে বললেন—পারব। কিন্তু আমার ওপর তোমাকে সম্পূর্ণ নির্ভর করতে হবে। তুমি তা করতে পারবে তো?
কবীরের কাছ থেকে আশ্বাস পেয়ে যুবক অত্যন্ত খুশি হয়ে বলল—হ্যাঁ, পারব।
এতক্ষণে যুবকের মন শান্ত হল। সে কবীরের কাছে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ করল। তারপর বলল—আমি বুঝতে পারছি যে আপনি আমার গুরু, আপনিই আমাকে দীক্ষা দিন।
কবীর বললেন—তোমাকে আমি দীক্ষা দিতে পারি একটি শর্তে, তা হল, তুমি আগে মনকে প্রস্তুত কর। এখনও তোমার মনে কামনা—বাসনা থেকে গেছে। জাগতিক বিষয়ের প্রতি আছে অদম্য আকর্ষণ। এমন মন নিয়ে তো দীক্ষা নিতে পারবে না। তুমি বাড়িতে যাও, নিজেকে প্রশ্ন করো। তারপর সম্পূর্ণ তৈরি হয়ে আমার কাছে এসো। আমি কথা দিচ্ছি তোমাকে নিরাশ করব না।
এই কথা শুনে যুবকটি বাড়ি চলে গেল। সে রাতে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখল। এর আগে সে নানা বিষয় নিয়ে চিন্তা করছিল। রক্ষণশীল পরিবারের সন্তান। ব্রাহ্মণ বংশে তার জন্ম। এক সামান্য মুসলমান জোলার কাছে দীক্ষা নিলে সকলে কী বলবে? এসব কথা ভাবতে ভাবতে ঘুম আসেনি তার চোখের তারায়। শেষ রাতের দিকে ঘুমিয়ে পড়ল বেচারি যুবক। ভোরের দিকে স্বপ্ন দেখল যে কবীর তাকে নামমাত্র দীক্ষা দিচ্ছেন। পরে কবীরের মেয়েটির সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে তার।
সকালবেলা ঘুম ভাঙার পর যুবক ভাবল সে কবীরের কাছে যাবে। কিন্তু সত্যি সত্যি সে কী প্রস্তুত? হঠাৎ কবীরের লোক এসে তাকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গেল। কবীর বললেন, কাল রাতে তুমি যে স্বপ্ন দেখেছ তা একেবারে সত্যি। তারপর ওই যুবকের দীক্ষা এবং বিয়ের দিন স্থির করলেন। বললেন—আগামী ওইদিন আমি তোমাকে দীক্ষা দেব। আর ওইদিন ওই ক্ষণেই আমার কন্যা কামালীর সঙ্গে তোমার বিয়ে হবে।
মনের দুটি বাসনা একসঙ্গে পূর্ণ হতে চলেছে, যুবক আনন্দে কথা বলতে পারল না। কবীর একটু হেসে বললেন—মনে রেখো এসবই হচ্ছে আল্লাহর দয়াতে। তাই কখনো এমন কাজ করবে না যাতে আল্লাহ বা ভগবান কষ্ট পান। যুবকটি পরবর্তীকালে কবীরের কাছে দীক্ষা নিয়ে তাঁর গৃহশিষ্যে পরিণত হয়। কামালীকে বিয়ে করে সে সুখে—শান্তিতে ঘর—সংসার করতে থাকে।
তখন কবীরের মনে জেগেছে এক অন্য ভাবনা। এতদিন তিনি ঈশ্বর আরাধনায় মগ্ন থাকতেন। সকলের কাছে ভগবানের কথা প্রচার করতেন। এখন তাঁর মনে হচ্ছে যে তাঁর কাজ বোধহয় শেষ হয়ে এসেছে। ঈশ্বর বোধহয় তাঁকে আর বেশিদিন এই ধরাভূমিতে রাখবেন না। অন্য কোথাও অন্য কোনোখানে যেতে হবে কবীরকে।
তাই আজকাল ভক্তদের সঙ্গে কথা বলার সময় কবীর মাঝেমধ্যেই বলেন—
‘জো পহিরা সো ফাটি সি কম
ধরালো জাই।’
অর্থাৎ যে কাপড় নিত্য পরা হয় তা তো একদিন ছিঁড়বেই।
এই ক—টি সাধারণ শব্দের মধ্যে অধ্যাত্ম তত্ত্বের একটি গূঢ় বিষয় লুকিয়ে আছে। আমাদের আত্মা দেহরূপ যে বস্ত্র পরিধান করে, সেই দেহ একদিন পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যাবে।
কবীর এবার বুঝতে পারলেন যে তাঁর শেষ সময় উপস্থিত হয়েছে। তিনি কাশীধাম ত্যাগ করে মগহর নামে পাশের গ্রামে চলে গেলেন। কবীর ছিলেন এক দূরদর্শী মহাপুরুষ। তিনি আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, ওই গ্রামেই তাঁর মৃত্যু হবে। তিনি শিষ্যদেরও সেই কথা বললেন। আসলে মগহরে মৃত্যু হলে মানুষ নরকে যায়, এমনই একটা কুসংস্কার ছিল হিন্দুদের মধ্যে। কবীর সেই সংস্কারের মূলে আঘাত করতে চেয়েছিলেন। সব ধর্মের মূল সত্য বিষয়টিকে কবীর পরম শ্রদ্ধাভক্তির সঙ্গে মেনে চলতেন। আবার কোনো ধর্মের কুসংস্কারকে তিনি একেবারেই মানতেন না। মুক্তকণ্ঠে নির্ভীকভাবে সেই কুসংস্কারের অসারতা সকলের কাছে তুলে ধরতেন।
সেকালে হিন্দুরা ভাবতেন কাশীতে মৃত্যু হলে স্বর্গ লাভ হবে আর মগহরে মৃত্যু হলে গাধা হয়ে জন্মাতে হবে। মগহর হল পৌরাণিক যুগের এক বিখ্যাত স্থান। দক্ষরাজা এখানে মহাযজ্ঞ করেছিলেন। সেই যজ্ঞে তিনি শিবকে আমন্ত্রণ জানাননি। কারণ শিব সেই অর্থে উঁচুস্তরের দেবতা নন। শিবের পত্নী সতী অপমান বোধে এবং পিতার প্রতি অভিমানে দেহত্যাগ করেন। শিব তখন পত্নীশোকে বেদনাহত হয়ে যজ্ঞ পণ্ড করে দেন। শিবের অনুচররা দক্ষের মাথা কেটে ফেলে। তখন ব্রহ্মার আদেশে সেখানে একটি ছাগমুণ্ড যোগ করা হয়েছিল। শিব সেই যজ্ঞস্থলে দাঁড়িয়ে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে, শিবের প্রতি ভক্তি না নিয়ে কেউ এখানে দেহত্যাগ করলে সে সদগতি পাবে না। সে বিষ্ণুলোকে যেতে পারবে না। পরজন্মে সে হবে এক অবিশ্বাসী গাধা। এই জাতীয় কুসংস্কারে বিশ্বাস করেন না কবীর। এই পৃথিবীর সমস্ত স্থানই পরম ঈশ্বরের আশীর্বাদপূর্ণ। এখানে কোনো একটি স্থান সম্পর্কে এমন অন্ধবিশ্বাস থাকবে কেন? মগহরের এই অপবাদ দূর করার জন্যই কবীর কাশীধাম ত্যাগ করে ওই অভিশপ্ত মগহরে চলে এলেন।
কবীরের মগহর যাত্রার কথা শুনে অনেকেই তাঁকে অনুসরণ করলেন। এমনকি অনেক রাজ্যের রাজা এবং জমিদাররা পর্যন্ত মগহরে এসে উপস্থিত হলেন। কবীরের সঙ্গে ছিলেন অগণিত কবীর—ভক্ত। তাঁরাও তাঁর সঙ্গে মগহরে যেতে চাইলেন। সেকালের কাশীর রাজা বীরসিংহ দেব, রেওয়ার রাজা বাম সিংহ এবং অযোধ্যার নবাব মহমুদ্দৌলা কবীরের কাছে প্রার্থনা জানালেন যে, তাঁদেরও যেন সঙ্গে নেওয়া হয়। কবীর তাঁদের সেই প্রার্থনা মঞ্জুর করেছিলেন।
এরপরে দেখা গেল যে জনহীন মগহর এক জনাকীর্ণ নগরে পরিণত হয়েছে। প্রকাণ্ড মেলা শুরু হয়ে গেল সেখানে। কাশীধামে কবীর না থাকায় এবং কবীরের অসংখ্য ভক্ত কাশীধাম ছেড়ে চলে যাওয়ায় এই বিখ্যাত শহরটি হয়ে পড়ল শ্রীহীন।
মনে হল কাশীর সমস্ত আলোই বুঝি নিভে গেছে। চারপাশে নেমে এসেছে ঘন অন্ধকার। মগহরের নবাব বিজলী খাঁ এই বিরাট জন—সমাবেশ দেখে খুবই খুশি হলেন। তিনি সকলেরই আপ্যায়নের ব্যবস্থা করলেন। কবীর এবং তাঁর অনুগামীদের যেন কোনো অসুবিধা না হয় সেদিকে নজর রাখতে লাগলেন। তবে কাছাকাছি কোনো নদী বা জলাশয় না থাকায় পানীয় জলের সংকট দেখা দিল। এত মানুষের পানীয় জল কীভাবে জোগাড় করা হবে! মগহরের নবাব এ বিষয়ে ভেবেচিন্তে কোনো কুলকিনারা করতে পারলেন না।
মগহরের মাঝখান দিয়ে একটি নদী বয়ে গেছে। কিন্তু সেই নদীতে এক ফোঁটা জল নেই। গোটা নদীটা শুকিয়ে একেবারে খটখটে হয়ে গেছে। শোনা যায় এই নদীতে বর্ষাকালেও এক ফোঁটা জল জমে না। এটি হল পৌরাণিক যুগের এক নদী। আগে এই নদী জলে পূর্ণ ছিল। কিন্তু দক্ষযজ্ঞের সময় শিবের অভিশাপে এই নদীর সব জল শুকিয়ে যায়।
ভক্তরা কথাটা কবীরের কানে তুলে দিলেন। কবীর সঙ্গে সঙ্গে নদীর কাছে পৌঁছে গিয়ে একমনে ধ্যান করতে লাগলেন। এক অলৌকিক ঘটনা ঘটে গেল। শুকনো নদীখাতে দেখা দিল জলের ধারা। বিশাল জনতা কবীরের নামে জয়ধ্বনি করতে থাকলেন। নদীর নাম রাখা হল অমী। অমীর জল ছিল শীতল আর অমৃতের মতো মধুর। এই নদীর জল পান করে সকলে তৃষ্ণা মেটালেন।
এবার ভক্ত শিষ্যদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন কবীর। কথায় কথায় তাদের কাছে আরও কিছু তত্ত্বকথা শোনালেন। এক—একটি দোঁহার মাধ্যমে মানুষের জীবনকে সৎ শোভন, সুন্দর করার অঙ্গীকার করলেন। তাদের কাছে শেষ উপদেশ দান করা হল। কবীর একটি কুটিরের ভেতর ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। বাইরে সুবিশাল জনতা তখন দাঁড়িয়ে আছে। অনেকের চোখে লবণাক্ত অশ্রুধারা। তাঁরা বুঝতে পেরেছেন যে মহাত্মা কবীর আর বেশিদিন এই ধরাধামে থাকবেন না।
কবীর একটি দোঁহার মাধ্যমে তাঁর অন্তিম বাসনার কথা সকলের কাছে বলে গেছেন। তিনি চেয়েছিলেন কাশী এবং মগহর সম্পর্কে যেসব কুসংস্কার প্রচলিত আছে সেগুলিকে একেবারে উৎপাটিত করতে। শুধু তাই নয়, ঈশ্বরের প্রতি তাঁর বিশ্বাস যে কতখানি অটল ছিল তাও দেখাতে চেয়েছিলেন কবীর। তিনি একটি দোঁহার একেবারে শেষে বলেছেন—
কহৈ কবীর সুনহ রে
লোঈ মরতি ন ভুলই কোঈ।
ক্যা কাসী ক্যা মগহর,
উখর রাম জৌ হোঈ।।
কবীরের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, মগহরে মৃত্যু হলেও তাঁর আত্মা রামের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে। তিনি বলেছেন, জল যেমন জলের কাছে যায় এবং জলের সঙ্গে মিশে যায়, তেমনি যার হৃদয়ে রাম ছাড়া অন্য কারও অবস্থান নেই, সে কাশীতে মরলেও রামকে পাবে আর মগহরে তাঁর মৃত্যু হলেও সে রামের চরণ স্পর্শ করতে পারবে। কাশীতে মরলে যার মুক্তি ঘটে, তার কাছে রামের মাহাত্ম্য আর থাকে কোথায়? তাই কবীর মগহরের মতো একটি স্থানকে তাঁর মৃত্যুভূমি বলেই নির্বাচন করলেন। কবীর প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে অধ্যাত্ম—সাধনার ক্ষেত্রে স্থান—মাহাত্ম্য কিছুই নয়। সবথেকে বড়ো হল সাধকের ভক্তিনিষ্ঠা আর সকলের প্রতি অপরিমেয় ভালোবাসা।
কবীর কুটিরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে একটি শব্দ হল। সকলে সবিস্ময়ে দেখল যে একটি জ্যোতি কুটির থেকে বেরিয়ে আকাশের দিকে চলে গেল। বহুদিন আগে আকাশ থেকে একটি জ্যোতি এসে কবীরের গর্ভধারিণী মায়ের গর্ভে প্রবেশ করেছিল। এখন সকলে বুঝতে পারলেন যে কবীরের মহাপ্রয়াণ হয়েছে। তাঁরা সকলে একবাক্যে কবীরের নামে জয়ধ্বনি করতে থাকলেন। প্রথমে কবীরের সঙ্গে দশহাজার ভক্ত এসেছিলেন। হিন্দু—মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের অসংখ্য মানুষের সমাবেশ ঘটেছিল সেখানে। হিন্দুদের নেতা হিসাবে সসৈন্যে ছিলেন কাশীর রাজা বীর সিংহ আর মুসলমানদের নেতা হিসাবে উপস্থিত ছিলেন নবাব বিজলী খাঁ।
অমী নদীর তীরে নগরের বিশাল প্রান্তরে ছিল এক সাধুর কুঁড়ে ঘর। সেই ঘর তখন খালি পড়ে থাকায় ভক্তরা সেখানেই কবীরকে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন। কবীর সেখানে প্রবেশ করার আগেই ভক্তদের বলেছিলেন কিছু সাদা পদ্মফুল আর দু—খানি সাদা চাদর নিয়ে আসতে।
শিষ্যরা তা নিয়ে এসেছিলেন। কাশীর রাজা বীর সিংহ এসে কবীরের সামনে গিয়ে প্রণাম জানিয়ে বললেন—গুরুজী, কৃপা করে অনুমতি দিন, আপনি মহাপ্রয়াত হলে আপনার পবিত্র দেহ কাশীতে নিয়ে যাব। হিন্দুপ্রথা অনুসারে গঙ্গার তীরে আপনার দেহকে সৎকার করব।
এই কথা শুনে নবাব বিজলী খাঁ বললেন—এ কখনো হতে পারে না। আমি এই পবিত্র দেহ মুসলমান প্রথা অনুসারে কবর দেব।
কবীর বুঝতে পারলেন যে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর শিষ্যদের মধ্যে এক অনভিপ্রেত সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ দেখা দেবে। তাই তিনি তাঁর শিষ্যদের উদ্দেশে বললেন—আমার আদেশ আমার নশ্বর দেহ নিয়ে তোমরা কেউ কখনো তর্ক—বিতর্ক করবে না। আমি বলছি তোমাদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হবে। তোমাদের উভয় পক্ষেরই আশা পূর্ণ হবে। এখন দরজা বন্ধ করে তোমরা চলে যাও।
কবীরের এই কথা শোনার পর সকলে বাইরে চলে গেলেন।
গুরুর মৃত্যুর কথা শুনে সকলে অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগলেন। সব ভেদাভেদ বুঝি দূরীভূত হয়ে গেল।
এবার কুটিরের দরজা খোলা হল। সত্যি দেখা গেল কোনো পক্ষকেই নিরাশ হতে হয়নি। সাদা ধবধবে দুটি চাদর ঘরের মধ্যে পাতা আছে পাশাপাশি। দুটি চাদরে আছে কিছু সাদা পদ্মফুল, শান্তি এবং সখ্যের প্রতীক চিহ্ন হিসাবে। কিন্তু আসল মৃতদেহ কোথায়? সকলে বুঝতে পারলেন যে দিব্যশক্তির অধিকারী মহাত্মা কবীর সশরীরে স্বর্গলোকে চলে গেছেন। আর এই সঙ্গে তিনি সকলকে শিক্ষা দিয়ে গেছেন যে, ধর্মের নামে হানাহানি করতে নেই। আমরা দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে যে সংঘর্ষ বাধিয়ে ফেলি, তা করা কখনোই উচিত নয়।
তখন সকলে বিবাদের কথা ভুলে গেলেন। রাজা বীরসিংহ এবং নবাব বিজলী খাঁ প্রয়াত গুরুর নির্দেশ বুঝতে পারলেন। বুঝতে পারলেন যে এইজন্যই গুরুজি বলে গিয়েছিলেন যে তিনি কোনো পক্ষকেই নিরাশ করবেন না।
রাজা বীরসিংহ একটি চাদর এবং তার ওপরের পদ্মফুল নিয়ে কাশীধামে পৌঁছে গেলেন। যথাযোগ্য শ্রদ্ধা এবং সম্মান সহকারে সেই চাদর ও ফুল দাহ করলেন। চিতাভস্ম নিয়ে গেলেন কবীর—চেটরা বলে একটি স্থানে। সেখানে চিতাভস্ম প্রথিত করে সমাধি মন্দির তৈরি করালেন।
মগহরের নবাব বিজলি খাঁ অন্য চাদর এবং ফুল নিয়ে মগহরেই কবর দিলেন। পরবর্তীকালে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায় মিলে মগহরে একটি মঠ প্রতিষ্ঠা করেন। ইতিহাসবিদরা বলে থাকেন ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দ বা ১৫০৫ সংবদে অগ্রহায়ণের শুক্লা একাদশী তিথিতে কবীর দেহত্যাগ করেন।
ভারতীয় অধ্যাত্ম—সাধনার ইতিহাসে কবীর এক অবিস্মরণীয় চরিত্র। তিনি তাঁর জীবনব্যাপী সাধনার মাধ্যমে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য স্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন। কবীর সম্পর্কে বেশ কয়েকটি আকর গ্রন্থ রচিত হয়েছে। তার মধ্যে নাভাদাসজি ভক্তমাল গ্রন্থের কথা সবথেকে আগে উল্লেখ করতে হয়। এই গ্রন্থে তিনটি অপূর্ব পদ্যের মাধ্যমে কবীরের জীবনী বর্ণনা করেছেন। কবীরের কথা বলতে গিয়ে নাভাদাসজি বললেন—
কবীর কালী রাখী নহীঁ,
বর্ণাশ্রম ষট দরসনী।
অর্থাৎ কবীর না রেখেছেন বর্ণাশ্রম আর না রেখেছেন ষড়দর্শন।
তাহলে কীভাবে তিনি পরমপুরুষ পিতার পূজার্চনা করেছেন? কবীরের সম্বল ছিল শ্রদ্ধা, ভক্তি আর সকলের প্রতি ভালোবাসা। এইগুলির জোরেই তিনি সাধনার উচ্চমার্গে উঠতে পেরেছিলেন। সর্বজীবে সমদর্শিতার জন্যই কবীর পরমাত্মার সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন।
কবীর ছিলেন এক মহাত্মা পুরুষ, তাই মৃত্যুর অনেক আগে নিজের অমরত্বের কথা বুঝতে পেরেছিলেন। একটি দোঁহার মাধ্যমে কবীর বলেছেন—
হমনি মরৈঁ মরিহৈ সংসারা।
হুঁম কৌঁ মিলা জিয়াবনহারা।।
হরি মরিহৈ তৌ হমহুঁ মরিহৈ।
হরি ন মরৈ হুঁম কাহে ক্কো মরি হৈ।।
কহৈ কবীর মন মনহিঁ মিলাবা।
অমর ভস্ট সুখসাগর পাবা।।
অর্থাৎ একদিন সমস্ত জগৎ সংসারের বিনাশ হবে, তবু আমার কখনো মৃত্যু হবে না। আমি কখনোই জীবনহারা হব না। কারণ হরি এবং আমার মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। হরি যদি কোনোদিন মারা যায় তাহলে আমিও মরবো। আর যদি হরির মৃত্যু না হয় তাহলে আমি কেন মহা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ব? আমার মনপ্রাণ পরমাত্মা ও হরির সঙ্গে এক হয়ে গেছে। আমি আমার সবকিছু আমার প্রিয়তম হরিকে সঁপে দিয়েছি। আমি অমর হয়ে অনন্ত সুখ সাগরে ভাসমান থাকব। হে অমৃতের পুত্র, তোমরা এসো আমার কাছে, মানুষ একে অন্যকে ভালোবাসো, হিংসা কোর না, তাহলে দেখবে যে তোমাদের জীবন আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এক আনা দুঃখ কিংবা অভিশাপ কখনো তোমাদের স্পর্শ করতে পারবে না।
একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে দাঁড়িয়ে মনে হয় এ হল চিরন্তন ভারতআত্মার শাশ্বতবাণী। যে ভারত লুকিয়ে আছে হাজার বছর আগের কোনো তপোবনে, যে ভারত বেঁচে আছে হিমালয়ের কোনো এক কন্দরে বসে থাকা কোনো সাধকের অনিদ্রিত রাতের তপস্যায়, সেই ভারতবাণী মর্মরিত হয় কবীরের মতো এক মহাপুরুষের উচ্চারিত অসংখ্য দোঁহাবলিতে। কবীরের মৃত্যু নেই, যতদিন মানব সভ্যতা বেঁচে থাকবে, আমরা পরম শ্রদ্ধা সহকারে তাঁর দোঁহাগুলি উচ্চারণ এবং নতুনভাবে জীবনে বেঁচে থাকার দিশা খুঁজে নেব।
