প্রস্তাবনা
কবীরের দোঁহাবলি মধ্যযুগীয় হিন্দি সাহিত্যের এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন। এই দোঁহাগুলির মাধ্যমে কবীর দর্শন এবং মানবজীবনের দুরূহ বিষয়গুলির ওপর আলোকপাত করেছেন। মধ্যযুগীয় হিন্দি সাহিত্যে ভক্তিবাদ একটি বিশিষ্ট স্থান দখল করেছে। মধ্যযুগের একাধিক হিন্দি কবি ভক্তিকাব্য রচনা করে অসংখ্য পাঠক—পাঠিকার প্রশংসা অর্জন করেছেন। তাঁদের কাব্যধারায় নির্গুণ এবং স্বগুণ এই দুটি রূপের প্রকাশ দেখা যায়। আচার্য রামচন্দ্র শুক্ল ‘হিন্দি সাহিত্যের ইতিহাস’ শীর্ষক বইতে এই জাতীয় ভক্তিকাব্যের ওপর গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন মুসলমান সাম্রাজ্য যখন ব্যাপকভাবে স্থাপিত হয়ে যায় তখন নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ—বিগ্রহের পাশাপাশি রাজত্বগুলির অস্তিত্বও শেষ হয়ে যায়। এই গভীর রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে হিন্দু জনসম্প্রদায় দীর্ঘকাল হতাশাচ্ছন্ন হয়ে থাকে। নিজের পৌরুষের প্রতি হতাশাগ্রস্ত জাতির জন্য ঈশ্বরের করুণা ও ভক্তির প্রতি নির্ভরশীল হওয়া ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো পথ খোলা থাকে না সম্ভবত।
তাঁর মতে এইজন্যই বোধহয় ভক্তিকাব্যের এত পরিব্যাপ্তি চোখে পড়ে। অবশ্য অন্যান্য গবেষকরা এই বিষয়টি স্বীকার করেন নি। যেমন আচার্য হাজারীপ্রসাদ দ্বিবেদীর মন্তব্য হল— মানুষ তার মনের মাধুরী মিশিয়ে ঈশ্বরের আরাধনা করেছে এবং এইভাবেই ভক্তিকাব্যের জন্ম হয়েছে।
এই কথা কটি মনে রেখে আমরা জ্ঞানাশ্রয়ী শাখার অন্যতম কবি কবীরের কথা আলোচনা করব। কবীর তাঁর অসংখ্য দোঁহার মধ্যে নিজের দার্শনিক অভিব্যক্তিকে সহজ সরল শব্দবন্ধে গ্রন্থিত করে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। তাই আজও আমরা যথেষ্ট উৎসাহের সঙ্গে তাঁর এই দোঁহাগুলি পাঠ করে থাকি।
ভক্তমালের রচয়িতা নাভাদাস কবীরের সংস্কারবাদী দৃষ্টি এবং বিরোধী চিন্তা ও প্রথাগত বিচারধারা স্পষ্ট বর্ণনা করেছেন। এই গ্রন্থটি ১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দে লিখিত হয়েছে বলে ধরা হয়। নাভাদাস তাঁর ষটপদীতে কবীরকে রামানন্দের অন্যতম শিষ্য হিসাবে উল্লেখ করেছেন। কবীরের বাণী তখনকার দিনে অনেক মানুষকেই প্রভাবিত করেছিল। যেমন শিখ সম্প্রদায়ের ধর্মগ্রন্থ ‘গ্রন্থসাহেব’—এ তাঁর বাণীর কিছু অংশ সংকলিত আছে। গুরু নানকজির রচনায় কবীরের জাত এবং তাঁর রচনার সংকেতও পাওয়া যায়। এখানে বলা হয়েছে যে, কবীর জোলা পরিবারে লালিত পালিত হয়েছিলেন।
স্বয়ং তুকারামও তাঁর লেখায় কবীরের উল্লেখ করেছেন। পাশ্চাত্য লেখকদের মধ্যে মৈকালিফ, উইলসন, ফহরক খুহর নানা আলোচনা করেছেন কবীরের। দোঁহা নিয়ে গবেষণা করেছেন ড. ভান্ডারকার, ড. রামকুমার ভার্মা, আচার্য হাজারীপ্রসাদ ত্রিবেদী, বাবু শ্যামসুন্দর দাস, ড. রামপ্রসাদ ত্রিপাঠী, ড. বড়ঙ্কল প্রমুখ। ড. শ্যামসুন্দর দাস বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কবীরের দোঁহার বিচার করেছেন।
এই ক—টি কথা মনে রেখে আমরা কবীরের দোঁহার ওপর আলোকপাত করব। তবে এখানে একটি কথা মনে রাখতে হবে। তা হল কবীর কিন্তু জীবনে কখনো অক্ষরজ্ঞান লাভ করার কোনো সুযোগ পাননি। তিনি পুস্তকের বিদ্যায় বিশ্বাস করতেন না। প্রভুত অভিজ্ঞতা সম্পন্ন হওয়ায় তিনি ছিলেন অগাধ জ্ঞানের অধিকারী। সৎসঙ্গ, মনীষীবিদ্যা, পণ্ডিতদের সঙ্গে আলাপচারিতা এবং নিজের ঈশ্বরীয় অনুভবের মাধ্যমে তিনি যে বৌদ্ধিক চেতনা অর্জন করেছিলেন তা কেতাবি জ্ঞানের থেকেও উচ্চতর। ব্যবহারিক দৃষ্টিতেও তা ছিল যথেষ্ট উপযোগী। কবীরের ছিলেন না কোনো শিক্ষাগুরু। কিন্তু তাঁর দীক্ষাগুরু কে? অনেকেই মনীষী স্বামী রামানন্দকে কবীরের গুরু বলে মানতে অস্বীকার করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ সমীক্ষক এবং কবীরের দোঁহার অধ্যয়নকারীরা স্বামী রামানন্দকেই তাঁর মন্ত্রগুরু হিসাবে মেনে নিয়েছেন।
কবীর তাঁর চিন্তাধারা প্রচার করার জন্য কোনো পন্থ, মতবাদী, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের প্রবর্তন করেছিলেন? যাঁরা কবীরের চিন্তাধারায় প্রভাবিত হতেন বা যারা তাঁর কাছে আসতেন তাদের ওপর স্বাভাবিকভাবেই কবীরের প্রভাব পড়ত। তাঁদের মধ্যে ধর্মদাস এবং সুরত গোপাল বিশেষ প্রসিদ্ধ। তাঁরা কবীরের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে তাঁর চিন্তাধারা প্রচার করেন। কবীরের মৃত্যুর পর ধর্মদাস ছত্তিশগড়ে কবীরপন্থীদের শাখা সঞ্চালক হয়েছিলেন। সুরত গোপাল কাজি শাখার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে সমস্ত উত্তর—পূর্ব ভারতে কবীরপন্থীদের অসংখ্য মতাবলম্বীরা ছড়িয়ে পড়েন।
কবীর তাঁর দোঁহাবলির মাধ্যমে সমাজে পরিব্যাপ্ত দুরাচার, শঠ, কপটতা, অন্ধ বিশ্বাস এবং মূর্খ মৌলবাদের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তাঁর মতো এমন বিরোধিতা আগে তো কেউ করতে পারেননি, পরেও কেউ করেননি। কবীরের নিজের আচরণ এবং আত্মগরিমার ওপর পূর্ণ বিশ্বাস ছিল। তাই বোধহয় তিনি এত সাহসের সঙ্গে নির্ভীকভাবে সমস্ত ধার্মিক ভণ্ডামির বিরুদ্ধে তীব্র আঘাত করতে পেরেছেন। কবীরের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে নৈতিকতা, স্পষ্টবাদিতা, সাহস এবং দৃঢ়তা ভীষণভাবে পরিলক্ষিত হয়। এর পাশাপাশি তাঁর মধ্যে ছিল বিনয়, সরলতা, পরদুঃখকাতরতা, বৈরাগ্য এবং সকল মানুষের প্রতি সমভাবাপন্নতা। হিন্দু এবং মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের অসংখ্য মানুষ তাঁর অনুগামী হয়েছেন। কবীর কখনো আপোষবাদী মনোভাবে বিশ্বাস করতেন না। নিজের নির্ধারিত সিদ্ধান্তে দৃঢ়তার সঙ্গে অটল থাকাই হল এক মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তির ভূষণ। কবীর এই মর্যাদায় বিশ্বাস করতেন। তাই তিনি বলেছেন—
হম ঘর জাল্যা আপনা লিয়া মুরাথা
জাল্যোঁ দাশ যো চলে হামারি সাথ
অর্থাৎ আমি আমার নিজের ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছি। অর্থাৎ ত্যাগ করে এসেছি এবং একটি সম্পর্ক নিয়ে এগিয়ে চলেছি। আমার সঙ্গে সেই চলতে পারে যে নিজের ঘর সংসার ছাড়তে পারে। অর্থাৎ যে স্বার্থত্যাগ করার ক্ষমতা রাখতে পারে।
কবীরের দোঁহাগুলি পাঠ করলে একটি পরস্পর বিরোধী দিক আমাদের কাছে পরিস্ফুটিত হয়। তাঁর প্রখর তেজস্বী অন্ধবিশ্বাস বিরোধী প্রথা, বিধ্বংসী সমাজ সংস্কারকের চেতনা আবার বিনীত সন্ত ভক্ত জ্ঞানী মনীষী পরোপকারী ও মানবতাবাদী চেতনা—এই দুটি রূপের মধ্যে কবীর এক সামঞ্জস্য প্রকাশ করতে পেরেছিলেন। শাস্ত্র বিরোধিতাকে খণ্ডন করার সময়ে তিনি হতেন উগ্র ও সুতীক্ষ্ন। কোনো দীনহীন অসহায় মানুষকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে তিনি দয়ালু হয়ে উঠতেন। তিনি তাঁর দোঁহার মাধ্যমে ক্রোধ, লোভ, মদ, মাৎসর্য ও ঈর্ষা থেকে নিজেদের রক্ষা করার কথা বলতেন।
কবীর জনসাধারণকে উপদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে ছোটো ছোটো বাক্যবন্ধের ওপর নির্ভর করতেন। কবীরের মুখে মুখে বলা এইসব দোঁহাগুলি পরবর্তীকালে কবীরপন্থী ভক্তরা ‘বীজক’ নামক গ্রন্থে সংকলিত করেন। কবীরের ‘বীজক’ তিন ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগকে বলে শাস্বী। যেখানে নীতিকথামূলক কবিতা আছে। দ্বিতীয়টি হল পদ। অর্থাৎ ভজন বা ঈশ্বর ভাবনা এবং তৃতীয়টি হল রৈমনি বা ভক্তিগীতি। কোন কোন বাণী সংকলনে ভজনকে স্থান দেওয়া হয়েছে? অধ্যাপক উইলসন অনেক পরিশ্রম করে কবীরের আটটি গ্রন্থের হিসেব দিয়েছেন। ওয়েসকট বিরাশিটি গ্রন্থের স্বীকৃতি দিয়েছেন। মিশ্র বন্ধুরা বলেন কবীর পঁচাত্তরটি গ্রন্থের রচয়িতা। আবার আর—এক গবেষক ঊনচল্লিশটি গ্রন্থের প্রাধান্য দিয়েছেন। সংখ্যার এই বিভিন্নতায় প্রমাণিত হয় কবীর সত্যি সত্যি কী ধরনের সাহিত্যসম্ভার সৃষ্টি করেছেন যা আজও যথেষ্ট বিতর্কের মধ্যে আছে। আমাদের দুর্ভাগ্য যে কবীরের সাহিত্য সৃষ্টির সমগ্র রূপরেখাটি এখনও আমাদের কাছে পরিস্ফুটিত হয়নি।
কবীরের গীতিকথনমূলক কবিতা অর্থাৎ সংগীতে আছে উপদেশ, গীতিকথা, গুরু মহিমা, কীর্তন ভাবনা, জ্ঞান সাবধানবাণী। কাব্যের দিক থেকে এই জাতীয় কবিতা এবং সংগীত বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আমরা জানি এগুলির মূল্য অপরিসীম। কারণ এইসব দোঁহাগুলি বংশ পরম্পরায় শ্রুত হতে হতে মানুষের মনে স্থায়ী ছাপ রেখে যায়।
এই কটি কথা মনে রেখে আমরা কবীরের নির্বাচিত কিছু দোঁহার ওপর বিশ্লেষণাত্মক আলোকপাতের চেষ্টা করব।
