নির্বাচিত দোঁহা
জল মে কুম্ভ, কুম্ভ মে জল হ্যায়,
বাহির ভিতর পানি।
ফুটা কুম্ভ জল জলহি সমনো,
য়হু তত কথো গিয়ানী।।
ব্যাখ্যা : কবীর ছিলেন এক ভক্তিবাদী মহাসাধক। তাঁর ঈশ্বরানুধ্যানে ভক্তিবাদের সঙ্গে নাথতন্ত্রের যোগবাদের সংমিশ্রণ চোখে পড়ে। এই দ্বিবিধ সত্তার সার্থক উন্মোচন ঘটেছে কবীরের একাধিক দোঁহায়, এইসব দোঁহাকে রহস্যবাদী দোঁহা বলা হয়। যে রহস্যবাদের জন্য কবীর বুদ্ধিজীবী মহলে খ্যাতি এবং যশ অর্জন করেছিলেন। সেই রহস্যবাদের প্রচ্ছন্ন এবং প্রত্যক্ষ বহিঃপ্রকাশ এই শব্দবন্ধের মূল আকর্ষণ। এই দোঁহার মাধ্যমে কবীর বলতে চেয়েছেন যে, মায়ার জন্যেই পরমাত্মা অর্থাৎ ঈশ্বরের নাম এবং রূপের অস্তিত্ব অনুভূত হয়। মানুষ হল মায়াবদ্ধ জীব। মায়ার অঞ্জন চোখে রেখে সে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড প্রত্যক্ষ করে। মায়ার দ্বারা আচ্ছন্ন জীব বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি আসক্তিবোধ প্রকাশ করে। যদি আমরা একবার এই মায়ার বাঁধন থেকে মুক্তি পাই তাহলে আত্মা ও পরমাত্মার মধ্যে সাযুজ্য সংস্থাপিত হবে।
আত্মা এবং পরমাত্মা হল এক মহান শক্তির দুটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এদের মাঝে আছে মায়ার পর্দা। তাই আমরা আত্মা এবং পরমাত্মাকে পৃথক সত্তা বলে জ্ঞান করি। নিরন্তর উপাসনা এবং বুদ্ধি জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে যদি একবার মায়ার এই অলীক বন্ধন ছিন্ন হয়ে যায় তাহলে দুটি ভাগ এক হয়ে যাবে।
এই দোঁহাকে কবীর একটি ব্যবহারিক উদাহরণ সহযোগে ওই দুর্জ্ঞেয় রহস্যবাদকে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন—কলসীর ভেতরের জল আর বাইরের জল একই। যেহেতু কলসীর মধ্যে একটি পাতলা আবরণ আছে তাই দুটি জলের মিলন ঘটছে না। ঠিক এইভাবে মায়া ব্রহ্মের ওই স্বরূপের মধ্যে বিভাজন রেখা সৃষ্টি করে। কলসী ভেঙে গেলে দুটি জল মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। তখন আর তাদের পৃথক সত্তা থাকে না। মায়ার আবরণ ভেঙে গেলে আত্মা এবং পরমাত্মার মধ্যে কাঙ্ক্ষিত মিলন সংঘটিত হয়। এইভাবে কবীর তাঁর অদ্বৈতবাদকে রহস্যবাদের আধারে উন্মোচিত করেছেন।
হরি হরি ম্যায় তো হম হুঁমরি হ্যায়!
হরি ন মরৈ হম কাহে কো মরি হ্যায়।।
এই দোঁহাটিও কবীরের রহস্যবাদী চিন্তনদ্বারা প্রসূত। এই দোঁহার মাধ্যমে কবীর বোঝাতে চেয়েছেন যে, কখন কীভাবে আত্মা ও পরমাত্মার মধ্যে ঘনিষ্ঠ মিলন ঘটে। তখন একটির বিনাশ ঘটলে অপরটিরও বিনাশ ঘটে যায়। একটির অস্তিত্বের মধ্যে অন্যটির অস্তিত্ব সার্থক স্ফুরণ সৃজনাত্মক হয়ে ওঠে। কবীর বলেছেন হরির মৃত্যু মানে তাঁর মৃত্যু। অর্থাৎ তাঁতে এবং হরিতে কোনো বিভেদ নেই। হরি অর্থাৎ ঈশ্বরের বেঁচে থাকার অর্থ আমাদেরও বেঁচে থাকা। ঈশ্বরের সঙ্গে নিজের সমস্ত সত্তাকে একীভূত করার এই চিন্তনের মধ্যেই রহস্যবাদ প্রকাশিত হয়ে থাকে।
লালী মেরে লালকা, জিত দেখৌ তিত লাল,
লালী দেখন ম্যায় গঈ, ম্যায় ভী তো হোঈ লাল।।
এই দোঁহার মাধ্যমে কবীর ঈশ্বরের অপার মহিমার কথা আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। কবীর অনুভব করতেন যে, স্থল—জল—অন্তরীক্ষ সর্বত্র ঈশ্বর বিদ্যমান! তিনি বলেছেন ঈশ্বরের উপস্থিতি সবদিকে। আমরা যেদিকেই তাকাব সেদিকেই ঈশ্বরকে দেখতে পাব। সর্বত্র বিরাজমান এই ঈশ্বরকে প্রত্যক্ষ করতে করতে কবীর কখন যেন তাঁর অংশ হয়ে গেছেন। ঈশ্বরের ব্যক্তিত্বে লীন হয়ে গেছে তাঁর সমস্ত সত্তা। এখন আর তিনি ঈশ্বরের থেকে নিজেকে ভিন্ন করতে পারবেন না।
নিন্দক নিয়রে রাখিয়ে, আঁগন কুটী দ্বায়।
বিন পানি সাবুন বিনা, নির্মল করে সুভাষ।।
কবীর এই দোঁহায় বলেছেন যে নিন্দুককে কখনো দূরে সরিয়ে রাখতে নেই। তাকে বাড়িতে আশ্রয় দিতে হয়। কারণ সমালোচক না থাকলে তোমার দোষত্রুটি কে ধরবে? পৃথিবীতে কোনো মানুষ ত্রুটিমুক্ত হয়ে বেঁচে থাকতে পারে না। সকলের মধ্যেই কিছু না কিছু দোষ—ত্রুটি থাকবেই। তাই আমাদের উচিত সেই দোষগুলিকে পরিশুদ্ধ করা। এখানে কবীর একটি ব্যবহারিক উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, জল এবং সাবান ছাড়া যেমন জামাকাপড় পরিষ্কার হয় না, নিন্দুক এবং সমালোচক ছাড়া তেমনি আমাদের ত্রুটিগুলিও উৎপাটিত হয় না। তাই আমরা আমাদের স্বার্থেই নিন্দুক এবং সমালোচকদের কাছে ডেকে নেব। লোকলজ্জার ভয়ে তাদের দূরে সরিয়ে দেব না।
সন্তো রাহ দোউ হম দীঠা।
হিন্দু তুছক হটা নহিঁ মাঝৈ,
স্বাদ সবনকো মীঠা।।
হিন্দু বরত একাদসি সাধৈ,
দুধ সিংঘাড়া সেতী।
অনকো ত্যাগৈ মন নহি হটকৈ,
পারন করৈ সগোতী।।
রোজা তুরক নমার গুজারৈ,
বিসমিল বাঁগ পুকারৈ।
উনকো ভিস্ত কহাঁ তে হোই হ্যায়,
সাঁঝে মুরগি মারৈ।।
হিন্দু দয়া মেহরকো তুরূকন,
দোনোঁ ঘট্ সোঁ ত্যাগী।
বৈ হলাল বৈ ঘটকা মারৈ
আগি দুনৌ ঘর লাগী।।
হিন্দু তুরূক কী এক রাহ হ্যায়,
সতগুরু হহৈ বতাঈ।
কহহি কবীর সুনো হো সন্তো,
রাম ন ক হৈউ খোদাঈ।।
কবীর যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন সমগ্র উত্তর ভারতে হিন্দু এবং মুসলমান এই দুই ধর্মেরই প্রভাব ছিল। তিনি ওই দুটি ধর্মের ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দিকগুলিকে ভালোভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। এই দুই ধর্মের যেসব মধ্যযুগীয় কুসংস্কার আছে সেগুলির বিরূপ সমালোচনা করেছেন। এই দীর্ঘ দোঁহার মাধ্যমে কবীরের সেই সমালোচনাই প্রকাশ পেয়েছে। তিনি বলেছেন— আমি দুটি পথ দেখেছি। একটি পথ হিন্দুরা অনুসরণ করে, অন্যপথে মুসলমানরা গমন করে। এই দুটি ধর্মমত শেষপর্যন্ত একই গন্তব্যে গিয়ে মিশে গেছে। হিন্দুরা একাদশীর দিন ভাত খায় না, দুধ এবং সিঙ্গারা খেয়ে থাকে। আর এদিকে মুসলমানরা রোজার মাসে সারাদিন উপোস করে সন্ধ্যাবেলা খাওয়া দাওয়া করে। সন্ধ্যাবেলা মুরগি মারলে তারা স্বর্গে যাবে কীভাবে? হিন্দু এবং মুসলমান উভয় মানুষের মন থেকে দয়া, মায়া, ভক্তি, করুণা, ভালোবাসা লুপ্ত হয়ে গেছে। সেইসব মানুষের বেঁচে থাকা উচিত নয়। এদের ঘরে যেন আগুন লাগে। মুসলমানরা পোচ মেরে পশু হত্যা করে। আর হিন্দুরা এক ঝটকা মেরে হত্যা করে। কেউই রাম বা খোদাকে চায় না।
এই দোঁহাটি পড়লে আমরা বুঝতে পারি যে কবীর ছিলেন সর্বধর্ম সমন্বয়ের শাশ্বত প্রতীক। তিনি চেয়েছিলেন হিন্দু এবং মুসলমান ধর্মের মধ্যে যেসমস্ত অন্ধকার দিক আছে সেগুলি যেন চিরতরে বিনষ্ট হয়। এই দুটি ধর্ম আবার যেন তাদের স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
হরি রস পীয়া জানিয়ে,
কবহুঁ ন জায় ঘুমার,
ম্যায় মনতা ঘুমত ফিরৈ,
নাহী তন কী সার।।
সন্ত কবি সুফী মতবাদের দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। একসময় ভারতবর্ষের অনেক দরদি বা মরমী সাধক সাধিকা সুফী মতবাদকে আত্মস্থ করেছিলেন। সুফী মতবাদের মধ্যে চিরন্তন মানবিকতার জয়গান গাওয়া হয়েছে। এই ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কবীর একাধিক মনে রাখার মতো দোঁহা রচনা করেন। এই দোঁহাটি সুফী মতবাদের দ্বারা প্রভাবিত। সুফী চিন্তায় প্রেমের মধ্যে নেশাই প্রধান। এই দোঁহায় কবীর অনায়াসে বলেছেন, ঈশ্বর চিন্তারূপী রস একবার পান করলে অন্য কোনো নেশা আর মনে ধরে না। এইভাবেই তিনি ঈশ্বরভক্তিকে এক নেশার সঙ্গে তুলনা করেছেন।
পানি হি তে হিম ভয়া,
হিম হি গয়া বিলায়।
কবিরা কো থা সোইভয়া,
অব কুছ কহা ন জায়।।
এই দোঁহার মাধ্যমে কবীর আত্মা এবং পরমাত্মার মধ্যে যোগসূত্রতা রচনা করেছেন। কবীর বলেছেন, জল থেকে বরফ হয় আবার বরফ গলে জল হয়ে যায়। এই প্রাকৃতিক ঘটনা নিরন্তর চলতেই থাকে। এই ধারাবাহিকতার মধ্যে এক দার্শনিক সত্তা এবং দার্শনিক সত্য লুকিয়ে আছে। এই পদ্ধতিতেই আত্মা শরীররূপ ধারণ করে। আবার শরীর ছেড়ে পরমাত্মায় বিলীন হয়ে যায়। কবীর বলেছেন, এটি হল তাঁর জীবনব্যাপী সাধনার অনুভূতি। এছাড়া অধিক কোনো কিছু জ্ঞান আর তাঁর দরকার নেই।
সমঝৈ তো ঘরমে রহৈ,
পরদা পলক লগায়।
তেরা সাহিব তুজ্ঝমেঁ,
অনত কহুঁ মত জায়।।
কবীর বলেছেন, তুমি যদি মনে করো ঈশ্বর তোমার মধ্যে আছেন, তাহলে তুমি চোখের পাতারূপী পর্দা টাঙিয়ে ঈশ্বরের ভজনা করতে। তাহলে তুমি তাকে ঠিক পেয়ে যাবে। কবি ছিলেন এক ভক্তিবাদী মহাসাধক। তিনি বিশ্বাস করতেন ভক্তিবাদের অশ্রু দিয়ে ঈশ্বরের চরণ বন্দনা করলে ঈশ্বর সদা—সর্বদা প্রসন্ন হন। এই দোঁহার মধ্যে কবীরের ভক্তিবাদী চিন্তার প্রকাশ ঘটেছে।
জাকো রাইখ সাঈয়াঁ,
মারিন সক্কৈ কোয়।
বাল ন বাঁকা করি সকৈ,
জো জ্যা বৈরী হোয়।।
কবীরের বিশ্বাস ঈশ্বর যার রক্ষক তাকে কেউ কোনোদিন হত্যা করতে পারবে না। যদি সারা পৃথিবীর সমস্ত মানুষ সেই লোকটির বিরোধিতা করে, তাহলেও তার কিছু হবে না। কারণ তাঁর সঙ্গে ঈশ্বরের অপার করুণা বিরাজমান আছে। কবীর ঈশ্বরের প্রতি কতখানি অনুরক্ত ছিলেন তার প্রমাণ আছে এই দোঁহাটির মধ্যে।
সমদৃষ্টি সতগুরু কিয়া,
মেট ভরম বিকার।
জহঁ দেখেই তইঁ এক হা,
সাহেব কা দীদার।।
এই দোঁহায় কবীর তাঁর সৎগুরুর করুণার কথা উচ্চারণ করেছেন। কবীর বলেছেন—গুরু তাঁকে সমদৃষ্টি প্রদান করেছেন। যেহেতু গুরু ছিলেন সমস্ত সাম্প্রদায়িক হানাহানির ঊর্ধ্বে, তাই পৃথিবীর সকল মানুষকে তিনি একই চোখে দেখতেন। তাঁর কাছে ধনী—দরিদ্র, উঁচু—নীচু, নারী—পুরুষ কোনো বিভেদ ছিল না। এই দৃষ্টিলাভের ফলে মনের সমস্ত ভ্রম কেটে যায়। বিকারের অবসান ঘটে। মানুষকে আমরা কেন মিছামিছি ছোটো এবং বড়ো এই দুটি ভাগে ভাগ করব। আমরা যেদিকে তাকাব সেদিকেই ঈশ্বরকে দেখতে পাব। কবীরের মনের ঘরে ঈশ্বর এবং মানুষ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
আতম অনুভব জ্ঞানকী,
জো কোঈ পূছে বাত।
সো গূঁগা গুড খাইকৈ,
কহৈ কোনো মুখ স্বাদ।।
কবীরদাস বলেছেন—মানুষ আত্ম—সাক্ষাৎকারের জ্ঞান লাভ করেছে, সেই মানুষের কাছে আর অন্য কোনো জ্ঞানের প্রয়োজন নেই। মানুষের মধ্যে অসীম শক্তি লুকিয়ে আছে। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য মানুষ তার এই অন্তর্নিহিত শক্তির পরিব্যাপ্তি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। যখন মানুষের মধ্যে এই উপলব্ধি হবে তখন মানুষ যে—কোনো কঠিন কাজ সহজেই সুসম্পন্ন করতে পারবে। তবে কী শক্তিকে আমরা শুধুমাত্র অনুভব করতে পারি, শব্দ দ্বারা ব্যাখ্যা করতে পারি না! বোবা মানুষ যেমন মিষ্টি খেয়ে মিষ্টির স্বাদ নিজে উপলব্ধি করে অথচ কাউকে তার মনের আনন্দের কথা বলতে পারে না, ঈশ্বরের সঙ্গে মিলিত হবার পর একজন ভক্তিবাদী মানুষও সেই অনুভূতির কথা অন্যের কাছে প্রকাশ করতে পারবে না।
কবীরের দোঁহার বৈশিষ্ট্য হল তিনি দৈনন্দিন দিন—যাপনের নানা জনপ্রিয় ঘটনা বিবৃত করে দর্শনের এক—একটি দিককে উদ্ভাসিত করেছেন। এই দোঁহার মধ্যে তাঁর এই মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়।
হীর রূপ সতনাম হ্যায়,
নীর রূপ ব্যবহার।
হংস রূপ কোঈ সাধু হ্যায়,
ততকা ছাননহার।।
হাঁস যেমন জল থেকে দুধকে আলাদা করতে পারে, সংসারে থেকে এক জ্ঞানী পুরুষ সেইভাবে সংসারের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে ঈশ্বরের আরাধনা করতে পারেন। কবীর বলেছেন, ঈশ্বরের নাম হল দুধের মতো। আর, মানুষের ব্যবহার হল জলের মতো। মানুষ মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ থাকে। ঈশ্বরের করুণা উপলব্ধি করতে পারে না। বিষয়—আশয়ের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি প্রকাশ করে। হংসরূপী কোনো সাধু যখন সাংসারিক মায়া, মমতার বন্ধন থেকে ঈশ্বরজ্ঞানকে পৃথক করেন, তখন তাঁর মন অনাস্বাদিত আনন্দে প্লাবিত হয়। তিনি উপলব্ধি করেন যে এই পৃথিবীতে ঈশ্বরের মহিমা অপার এবং অমর।
জৈসে জলহি তরঙ্গ তরঙ্গিনী,
অ্যায়সে হম দিখলা বহিঁগো।
কহৈ কবির স্বামী সুখ সাগর,
হসসি হংস মিলবাহিঁগে।।
কবীরদাস সেইসব মানুষকে অত্যন্ত সুখী এবং সমৃদ্ধ বলে মনে করেন। যারা নিজের অস্তিত্বকে সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে অন্য এক অস্তিত্বের অংশ হয়ে যায়। দর্শনশাস্ত্রের এই গূঢ় বিষয়টিকে কবীর ব্যবহারিক উদাহরণ সহযোগে পরিস্ফুটিত করেছেন। তিনি বলেছেন, সমুদ্রের তরঙ্গ সমুদ্রের বুকে সৃষ্টি হয়ে আবার সমুদ্রে মিশে যায়। প্রভুভক্তিরূপী সাগরের সঙ্গে মিলিত হয়েও আমরা এইভাবে আনন্দিত হয়ে উঠি। ঈশ্বরের প্রতি কতখানি আনুগত্য, প্রেম, ভক্তি এবং ভালোবাসা থাকলে তবে এমন অনুধ্যান তা সহজেই অনুমেয়।
কবির তেজ আনন্দ কা
মানো ঊগী সূরজ সেনি।
পতি সঙ্গ জাগী সুন্দরী
কৌতুক দীখা তেনি।।
কবীর নানাভাবে সুফী মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। সুফীপন্থীরা জগৎ সংসার সৃষ্টি সম্পর্কে নিজস্ব ধারণা এবং উপলব্ধির কথা বারে বারে ব্যক্ত করেছেন। এই বিষয়ে কবীর সমমত প্রকাশ করেছেন। তবে সুফীরা মোক্ষ সংক্রান্ত যে বিচারধারায় বিশ্বাসী ছিলেন, কবীর তার সবকটিকে অবশ্য পালনীয় বলে মনে করেননি। সুফীরা নৈতিক আচরণের ওপর জোর দিতেন। তাঁরা বলতেন—শরীর এবং মন সম্পূর্ণ পবিত্র না হলে ঈশ্বর—অনুধ্যান সম্ভব নয়। এই দোঁহাতে সুফী মতবাদের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। আবার অনেকে বলে থাকেন, এই দোঁহার মধ্যে দিয়ে কবীর তাঁর বৈষ্ণব ভাবনার কথাই পরিস্ফুটিত করেছেন। বৈষ্ণবরাও শরীর এবং মনের শুদ্ধতাকে ঈশ্বরানুভূতির একান্ত প্রয়োজনীয় অংশ হিসাবেই মনে করে থাকেন।
কবির বাদল প্রেমকা,
হম পর বরসা আই,
অন্তর ভোগী আত্মা,
হরী ভঙ্গ বনরাই।।
কবীরের দার্শনিক চিন্তাধারার ওপর প্রেম এবং ভক্তিবাদের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছিল। এই দোঁহাতে সেই প্রভাবের কথাই বলা হয়েছে। কবীর বলেছেন, প্রেমের বাদলধারা আমাদের ওপর বর্ষিত হলে ভোগী মানুষের অন্তঃস্থলে বনরাজির মতো হরি বিরাজ করতে থাকেন। অর্থাৎ হরি প্রেমময়। তিনি এক আনন্দঘন সত্তা। তাঁর কাছে গেলে কোনো মানুষ আর নিরানন্দ অবস্থায় থাকতে পারে না।
কহৈঁ কবির হরি দরস দিখায়ো।
হমহিঁ বুলাবো কী তুম চল আয়ো।।
কবীরদাস বলেছেন, আমাদের ঈশ্বরের দর্শন দাও। ঈশ্বরকে দেখতে না পেলে জীবন বৃথা। তাই তাঁর একান্ত প্রার্থনা—হে প্রভু, তুমি আমার ওপর দয়া এবং করুণা বর্ষণ করো। আমি যেন অন্তত একবার তোমাকে চোখের সামনে দেখতে পাই।
হমারে রাম রহিম করিম
কেসো অলহ রাম সতি সোঈ।
বিসমিল মোটি বিসম্ভর একৈ,
ঔর ন দূজা কোঈ।।
এই দোঁহার মধ্যে সুফীতত্ত্বের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। কবীর হিন্দু এবং মুসলমান ধর্মের মধ্যে ব্রহ্ম ঐক্য স্থাপনের কথা বারবার বলে গেছেন। তাই তিনি ভারতীয় ব্রহ্মবাদের ভিত্তিতে রাম, রহিম, বিসমিল, বিশ্বম্ভরকে এক ও অভিন্ন বলে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন—এঁরা হলেন ব্রহ্মের বিভিন্ন রূপ, এঁদের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই।
নৈনা নীরুর লাইয়া,
রহট বসৈ নিস জাম
পাপিহা জিঁউ পিব পিব করৌ
কবরে মিলহুতো রাম।।
কবীরের এই দোঁহাটির মধ্যে আধ্যাত্মিক প্রেমের কথা বিবৃত হয়েছে। এই দোঁহাটি পাঠ করলে আমরা বুঝতে পারি কবীরের চোখে রাম ছিলেন এক পরম পুরুষ। পিউকাঁহা পাখি যেমন সবসময় পিব পিব করে, ঠিক সেইরকমভাবে কবীর তাঁর প্রিয়তম রামের নাম জপ করে চলেছেন। কবীরের স্থির বিশ্বাস একদিন তিনি রামচন্দ্রের সাক্ষাৎ পাবেন।
গুরুপ্রেম কা অঙ্ক পঢ়ায়দিয়া
অবপয়নে কো কুছ নহিঁ বাকি।
এই দোঁহার মধ্যে কবীরের ভক্তিরস প্রকাশিত হয়েছে। কবীর বিশ্বাস করেন জীবনে গুরু পরম আদর্শস্থানীয় ব্যক্তি। সৎগুরুর সন্ধান পেলে আমরা জীবন—সমুদ্রকে অতিক্রম করতে পারব। যে ব্যক্তি এমন গুরুর সন্ধান পেয়েছেন, তাঁর আর অন্য কিছুর প্রয়োজন নেই। মনে করতে হবে যে সেই ব্যক্তির সব অধ্যয়ন শেষ হয়ে গেছে। কবীর সবকিছুর ওপরে গুরুপ্রেমকে স্থান দিয়েছেন।
হরি মেরা পীব মাই,
হরি মেরা পীব
হরি বিন রহিন
সকৈ মেরা জীব।।
এই দোঁহাটির মধ্যে সুফীবাদের প্রচ্ছন্ন প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এখানে কবীর সুফীভাবে উজ্জীবিত হয়ে প্রেম এবং দাম্পত্য সংযুক্তির কথা ঘোষণা করেছেন। সুফীবাদীরা মনে করেন প্রেমের চরম প্রকাশ ঘটে দাম্পত্য জীবনে। স্বামী এবং স্ত্রীর পারস্পরিক ভালোবাসা আনুগত্যের মাধ্যমে সংসারসমুদ্র পার হয়ে যান। এখানে সাধক এবং পরমাত্মা সম্পর্ক স্বামী—স্ত্রীর মতো। সুফীদের এই মতবাদকে অনুসরণ করে কবীরও রামের সঙ্গে হরির সঙ্গে স্বামী—স্ত্রীর সম্পর্ক স্থাপন করেন। এই দোঁহাটির মাধ্যমে কবীর তাঁর সুফীকেন্দ্রিক মতবাদকেই ব্যক্ত করেছেন।
অল্লা রাম কী কম নহীঁ
তহাঁ কবির রহা ল্যৌ লায়।।
কবীর দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করেছেন যে, হিন্দু এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের অনেকে একে অন্যের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য তাঁরা সাম্প্রদায়িক সংহতিকে নষ্ট করেছেন। ভবিষ্যতে যাতে দেশে এমন সংঘর্ষের ঘটনা না ঘটে তাই কবীর রাম ও রহিমের নামকে একীভূত করতে চাইছেন। তিনি নাম রহিত নিরাকার ব্রহ্মকেই তাঁর জীবনের উপাস্য বলেই মনে করেন।
গুরু চরণ লাগি হম বিনবতা,
পুছত কহু জীউ পাইয়া।
কবন কাজি জগ উপজৈ,
বিনসৈ কহু মোহি সমঝাইয়া।।
এই দোঁহার দর্পণে প্রতিফলিত হয়েছে কবীরের জ্ঞান চর্চার বিভিন্ন দিক। কবীর তাঁর গুরুর কাছে আবেদন করেছেন—হে গুরু, আপনি অনুগ্রহ করে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অপার রহস্যের কথা আমার কাছে বিবৃত করুন। গুরুর চরণ ধরে অতি বিনয়ের সঙ্গে কবীর বলছেন—হে প্রভু, আমাকে বলুন এ জীবন আমি কীভাবে পেলাম। এই জীবনরহস্য আমি উপলব্ধি করতে পারছি না। তাই সদাসর্বদা আমার মনে নানা আশঙ্কার জন্ম হচ্ছে। হে প্রভু, আপনি আমাকে এই ঝড়—ঝঞ্ঝার রাতে নিরাপদ আশ্রয় দিন।
হম সব মাঁহি সকল হম মাঁহী,
হম হেঁ ঔর দূসরা নাহীঁ।
তিন লোক মে হমারা পসারা,
আবাগমন সব খেল হমারা।
ঘট দরশন কহিয়ত ভেখা,
হমহী অতীত রূপ নহী দেখা।
হম স্ত্রী আপ কবির কহাবা,
হম হী অপনা আপ লখাবা।
কবীর বলছেন—আত্মা এবং পরমাত্মার মধ্যে যখন কাঙ্ক্ষিত মিলন ঘটে তখন সাধকের এমন এক উপলব্ধি হয়। তখন তিনি বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সব কিছুর মধ্যে নিজেকে এবং নিজের মধ্যে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সবকিছুকে প্রত্যক্ষ করেন। তিনি আর গার্হস্থ্য জীবনের প্রতি সামান্যতম মোহ বা ভালোবাসা প্রদর্শন করতে পারেন না। সাধারণ গৃহস্থ মানুষ অবশ্য এই সাধকের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে না পেরে তাঁকে উন্মাদ বলে মনে করেন। হায়, এইসব মানুষেরা কী করে সাধনার গূঢ় তত্ত্বগুলিকে অনুধাবন করবেন!
কবির জাগ্যা হী চাহিয়ে।
কেয়া গৃহ কেয়া বৈরাগ্য।।
কবীর ছিলেন এক বৈরাগী। কিন্তু বৈরাগী হওয়া সত্ত্বেও তিনি সংসারত্যাগী ছিলেন না। ঈশ্বরের সাধন ভজন করার জন্য তিনি অরণ্য অভ্যন্তরে প্রবেশ করেননি অথবা পর্বতের কোনো গুহার মধ্যেও নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। তিনি নিজ পরিশ্রমে অর্জিত অর্থের দ্বারা কায়ক্লেশে জীবিকা নির্বাহ করতেন। সংসারের মধ্যে থেকেও তিনি সংসারের সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েননি। তিনি মনে করতেন, সংসারেই থাকো আর সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাস ধর্ম অবলম্বন করো, জ্ঞান থেকে কখনো নিজেকে বঞ্চিত কোরো না।
পাহন পূজৈ হরি মিলেঁ
তো ম্যায় পূজুঁ পহার।
কবীর মূর্তিপূজার বিরোধী ছিলেন। একাধিক দোঁহার মাধ্যমে তিনি পৌত্তলিকতাবাদকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেছেন। তিনি বলেছেন—যদি পাথর পুজো করলে আমরা ঈশ্বরের সান্নিধ্য পাই, তাহলে আমি পাহাড় পুজো করব। পাথর খণ্ডের থেকে পাহাড় অনেক বড়ো। পাহাড় পুজো করলে অনেক তাড়াতাড়ি আমরা ঈশ্বরকে অনুভব করতে পারব। এইভাবে তিনি যুক্তিতর্ক দিয়ে মূর্তিপূজার বিরোধিতা করেছেন।
জাকে মুঁহ মাথা নহী,
নাহীঁ রূপ অরূপ,
পুহুপ বাস তেঁ পাতরা,
অ্যায়সা তত্ত্ব অনূপ।।
এই দোঁহার মাধ্যমে কবীর ব্রহ্মের স্বরূপ ব্যাখ্যা করেছেন। যেহেতু তিনি ছিলেন মূর্তিপূজার বিরোধী তাই তাঁর কাছে ব্রহ্মই হলেন অবিনশ্বর সত্তা। হিন্দুধর্মের মধ্যে নানা ধরনের কুসংস্কার ঢুকে গিয়েছিল। এর ফলে সনাতন হিন্দুধর্মের গৌরব এবং মাহাত্ম্য অনেকাংশে খর্ব হয়। কবীর তাই তাঁর মনের দুঃখ—ব্যথার কথা প্রকাশ করেছেন। কবীর ছিলেন একেশ্বরবাদী। ব্রহ্মের প্রতিই ছিল তাঁর প্রগাঢ় ভক্তি এবং ভালোবাসা। তিনি বলেছেন—আমার ব্রহ্মের কোনো রূপ নেই, দেহ নেই। ফুলের মধ্যে যেভাবে সুগন্ধের অবস্থান, সেভাবেই সর্বত্র ব্রহ্মের অবস্থান। তাঁকে অনুভব করতে হলে যথেষ্ট অনুভবী এবং জ্ঞান হওয়া দরকার।
কাঁকর পাথর জোরি কে,
মসজিদ লঈ চিনায়।
তা চরি মুল্লা বাঁগ দে,
বহরা হুয়া খুদায়।।
কবীরদাস তাঁর একাধিক দোঁহায় হিন্দুধর্মের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা এবং আড়ম্বরের তীব্র সমালোচনা করেছেন। মুসলমান ধর্মের মধ্যেও বেশ কিছু কুসংস্কার ঢুকে গেছে। যদি আমরা এই দুটি ধর্মকে কুসংস্কারের অন্ধকার থেকে উদ্ধার করতে না পারি তাহলে ভবিষ্যতে এই দুটি ধর্মের খুব দুর্দিন ঘনিয়ে আসবে। অধ্যাত্ম মানবতাবাদী সাধক হিসাবে কবীর এই দুটি ধর্মের বিভিন্ন দুর্বলতাকে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেছেন, মুসলমানরা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে আজান দেয়। তাঁর প্রশ্ন তোমাদের আল্লা কী একেবারে কালা হয়ে গেছেন যে তাঁকে শোনাবার জন্য মসজিদে এত জোরে আজান দিতে হবে?
সাখী আঁখী জ্ঞান কী,
সমুঝি দেখু মন মাঁহি,
বিন সাখী সংসার কা,
মগরা ছুটত নাঁহি।।
‘সাখী’ শব্দের অর্থ হল মহাপুরুষদের আপ্তবাক্য। কবীরের মন্তব্য—আমরা যখন অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে আলোর দিকে এগিয়ে যাই তখন এই সাখীই আমাদের পথ দেখায়। মহাপুরুষদের মুখনিঃসৃত অমৃতবাণী অনুসরণ করলে জীবনে আর পদস্খলনের সম্ভাবনা থাকে না।
বূরা বংস কবির কা,
উপজিয়ো পূত কমাল।
হরি কা সুমরিন ছাঁড়ি কে,
ভরি লৈ আয়া মাল।।
প্রাচীনকালের কবিরা তাঁদের একাধিক কবিতায় বংশ পরিচয়, পিতামাতার নাম ইত্যাদি বলতেন। অনেকে সরাসরি তা বর্ণনা করতেন। অনেকে আবার হেঁয়ালির আশ্রয় নিতেন। সন্ত কবি তাঁর এই দোঁহায় বংশের কিছুটা পরিচয় আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। কবীরের জীবনীকাররা বলে থাকেন তিনি ছিলেন বিবাহিত এবং লুই হলেন তাঁর স্ত্রী। কামাল ও নিহাল নামে তাঁর দুটি ছেলে এবং কামালী ও নিহালী নামে দুটি মেয়ে ছিল। এই দোঁহার মাধ্যমে কবীর জানাচ্ছেন তাঁর বংশ ছিল অত্যন্ত দরিদ্র। কামাল নামে তাঁর একটি ছেলে হয়। এই ছেলে ঈশ্বর ভজনা ছেড়ে শুধুমাত্র অর্থ উপার্জনের দিকে মন দিয়েছিল।
নহী কো ঊঁচা
নহী কো নীচা।
জাকা প্যন্ড তাহী
কা সীঁচা।।
জেতু বাঁমনী জায়া,
তৈ থনে বাট হৈব কাহেন আয়া
তহৈ কবীর অধির নহিঁ কোঈ,
সো আধিম জা মুখ রাম ন হোঈ।।
এই কবিতায় কবীর জাতপাতের দ্বন্দ্বে দীন সমাজকে তীব্রভাষায় আক্রমণ করেছেন। কবীর বিশ্বাস করেন মানুষে মানুষে কোনো প্রভেদ নেই। এক দল আহাম্মক সমাজপতি নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এমন জাত বিভাজনের ব্যবস্থা করেছেন। উঁচু—নীচু জাতের প্রকাশ মানুষের দ্বারা সৃষ্ট। মানুষের সমাজে সে—ই অধম যে মুখে রাম নাম করে না।
দেখ্যা হ্যায় তো কস কহুঁ,
কহুঁ তৌ কা পতিয়ায়।
গুঁগে কেরী সরকার,
খায়ে ঔ বৈঠা মুসকায়।।
কবীর ছিলেন এক রহস্যবাদী দার্শনিক। রহস্যবাদী হওয়ার প্রাথমিক শর্ত হল আস্তিক হওয়া। কবীর ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন। নাস্তিকদের শূন্যকেও তিনি ব্রহ্মরূপে দেখতেন। তাঁর আস্তিক্য চিরাচরিত বিশ্বাসের ওপর নির্ভর না করে প্রত্যক্ষ অনুভূতির ওপর নির্ভরশীল ছিল।
এই দোঁহাতে কবীর ঘোষণা করেছেন, আমি ঈশ্বরকে দেখেছি কিন্তু তাঁর বর্ণনা দেব কেমন করে? আমার শব্দের ভাণ্ডার এত পরিপূর্ণ নয় যে আমি ঈশ্বরের অপার রূপের বর্ণনা করব। বোবা মানুষ মিষ্টি বা শর্করা খেলেও তার স্বাদ অন্যকে বোঝাতে পারে না। তেমনি কবীর তাঁর ঈশ্বরের দর্শন হলেও তাঁর রূপের বিবরণ দিতে অক্ষম।
মেরা মুঝমে কছু নহী,
জো কছু হ্যায় সো তেরা,
তেরা তুঝকো সৌঁপতা,
কেয়া লাগে হ্যায় মেরা।
কবীরদাস মনে করতেন মায়া হল ব্রহ্মের সঙ্গে মিলনের পথে সবথেকে বড়ো অন্তরায়। এই মায়া আছে বলেই আমরা আমাদের অভীষ্ট ঈশ্বরকে দেখতে পাই না। এই মায়ার বাঁধন ভেঙে বেরিয়ে আসার জন্য সকলকে উপদেশ দিয়েছেন তিনি। তিনি বলেছেন—আমার নিজের বলতে কিছু নেই, আমার যা কিছু আছে তার সবই হল সেই পরম শক্তিশালী ঈশ্বরের। তাঁর দেওয়া জিনিস আমার কাছে গচ্ছিত ছিল। আমি আবার তাঁকে আমার এইসব জিনিস ফেরৎ দেব। এতে আমার অসুবিধে কোথায়?
বন্ধ করি দৃষ্টি কো
ফেরি অন্দর করৈ,
ঘট কপাট গুরুদেব খোলৈ।
কহত কবীর তু দেখ সংসার মে,
গুরুদেব সমান কোঈ নাহি তোলৈ।।
কবীরদাসের মতো গুরুর বর্ণনা কোনো কবি করেছেন বলে আমাদের জানা নেই। তিনি তাঁর অসংখ্য দোঁহার মাধ্যমে গুরুর প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিবেদন করেছেন। তিনি বলেছেন—দু—চোখ বন্ধ করে একবার নিজের অন্তরের দিকে তাকাও, তাহলে দেখবে মনের দরজা খুলে ঈশ্বর তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন। কবীর বলেছেন, একবার সংসারের দিকে তাকিয়ে দ্যাখো, সংসারের সর্বত্র গুরুদেবের চিহ্ন বিরাজ করছে। তাই আমাদের সকলের উচিত গুরুর সঙ্গে একীভূত হওয়া। তা না হলে সংসার অনলে সদাসর্বদা আমাদের দহনদগ্ধ হতে হবে।
রাম বিন তন কী তাপ ন জ্যাঈ
জলকী অগিন উঠি অধিকাঈ।
তুমু জলনিধি ম্যায় জল কর মীনা
জল মে রহে জলহিঁ বিন ছীনা।।
তুমু পিঞ্জরা ম্যায় সুবনা তোরা,
দরসন দেহু ভাগ বড় মোরা।
তু মু মতগুর ম্যায় নৌতম চেলা,
কহৈ কবীর রাম রমূঁ অকেলা।
রহস্যবাদী মহান দার্শনিক কবীর এই দোঁহায় রামভক্তিকে প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, রামের সঙ্গে তার জন্ম—জন্মান্তরের সম্পর্ক। প্রতি মুহূর্তে তিনি রামের সঙ্গে নৈকট্য বোধ করেন। কবীরের বক্তব্য—রামের সঙ্গলাভ করার সুযোগ না থাকলে তাঁর দেহের তাপ মেটে না। তাঁর কাছে রাম জলের মতো। তিনি হলেন সেই জলের মাছ, জল ছাড়া যেমন মাছের জীবন বাঁচে না, রামনাম ছাড়া কবীরের জীবনও অনর্থক। রাম যদি হন পাখির খাঁচা, তাহলে তিনি সেই খাঁচার পাখি। রাম তাঁর জন্ম জন্মান্তরের চলিষ্ণু ঈশ্বর। তিনি হলেন রামের দাসানুদাস। সদাসর্বদা তিনি নির্জনে বসে রামের আরাধনা করতে চান।
আসম কিয়ে পবন দিঢ়ে দিঢ় রহু রে,
মন কা মৈল ছাঁড়ি দে বৌরে,
কেয়া সীঁ গী মুদ্রা চমকায়ে,
কেয়া বিভুতি সব অঙ্গ লগায়ে,
সো হিন্দু সো মুসলমান,
জিসকা দূর রহৈ ঈমান।।
সো ব্রহ্ম জো কথৈ গিয়াঁন,
কাজি সো জানে রহমাঁন
কহৈ কবীর কহু আন কীজৈ,
রাম নাম জপি লাহা নীজৈ।।
কবীর ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার বিরোধী ছিলেন। তিনি সেই ধর্মের প্রচারক ছিলেন যে ধর্ম আমাদের সৎ, শোভন এবং সুন্দর জীবনের অভিসারী করে তোলে। কবীর তাঁর একাধিক দোঁহায় যথেষ্ট কঠোর ভাষায় ধার্মিক, গোঁড়ামি এবং সাম্প্রদায়িকতার নিন্দা করেছেন। এই সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি হিন্দুধর্ম এবং মুসলমান ধর্মের নানা কুসংস্কারকে প্রবলভাবে আঘাত করেছেন। কবীরের বিশ্বাস মানুষ যদি অন্তরে সৎ, শোভন এবং সুন্দর হয় তাহলে তাকে কোনো ধর্মের ভেক বা পোশাক পরতে হয় না। এই দোঁহার মাধ্যমে কবীর তাঁর এই চিরন্তন ভাবনাটিকে প্রকাশ করেছেন।
দিন কো রোজা রখত হ্যায়,
রাত হনত হ্যায় গায়,
ইয়হে তে খুন হে বন্দগী,
কৈসে খুসি খুদায়।।
মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের নানা ত্রুটি—বিচ্যুতি কবীরকে ব্যথাতুর করে তুলত। তিনি বলেছেন, মুসলমানরা সারাদিন রোজা পালন করে। রাতে পেট ভরে খায়। এমন আচরণ করলে কি আল্লাহ সত্যি খুব খুশি হন?
মূঢ় মুড়ায়ে হরি মিলৈ,
সব কোউ লেই মুড়াই।
বার-বার কে মুড়নে,
ভেড় ন বৈকুণ্ঠ জাই।।
হিন্দু ধর্মের নানা কু—সংস্কার কবীরকে দুঃখ দিত। কবীর বুঝতে পেরেছিলেন কীভাবে কিছু লোভী পণ্ডিত এবং ব্রাহ্মণদের ষড়যন্ত্রে সনাতন হিন্দুধর্ম কলুষিত হয়ে পড়ছে। তিনি মাথা নেড়া করা সন্ন্যাসীদের বিরোধিতা করেছেন। তিনি মনে করেন—এ হল এক ধরনের ধর্মীয় ভণ্ডামি। এই ভন্ডামির সমালোচনা করতে বিন্দুমাত্র চিন্তা করেননি কবীর। কবীর বলেছেন, অনেকে মনে করে থাকেন মাথা নেড়া করলেই বুঝি ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভ করা যায়। তাই যদি হত বার বার মাথা মুড়িয়ে ভেড়া কেন বৈকুণ্ঠে যেতে পারে না? কবীরের বিশ্বাস এইভাবে মাথা নেড়া করলে আমরা কোনো কিছুই লাভ করতে পারি না।
হমারে কৈসে লোহূ,
তুমহারে কৈসে দূধ।
তুমহ কৈসে ব্রাহ্মণ পাঁড়ে,
হম কৈসে সূদ।।
কবীরদাস জাতপাতের ঊর্ধ্বে বিচরণ করতে ভালোবাসতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, জাতিভেদ প্রথা হল মানুষের সৃষ্টি। বর্ণের কারণে এক জাতির মানুষ অন্য জাতির মানুষকে নানাভাবে অপমান করে। এমনটি হওয়া কখনোই উচিত নয়। কারণ এই পৃথিবীতে আমরা সকলে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের সন্তান। ব্রাহ্মণরা শূদ্রদের দূরে সরিয়ে রাখে। কিন্তু ব্রাহ্মণের রক্ত আর শূদ্রের রক্তের মধ্যে কোনো মৌলিক পার্থক্য আছে কি? সকলেরই রক্তের রং লাল। ব্রাহ্মণের রক্ত আর দুধের রং যদি শূদ্রের রক্ত আর দুধের থেকে আলাদা না হয় তাহলে ব্রাহ্মণ আর শূদ্রে ভেদাভেদ কেন?
কবীর ছিলেন সমাজ—সচেতক এক মহাপুরুষ। তাঁর ভাবনার সঙ্গে তিনি তাঁর সাম্যবাদী সমাজভাবনাকে মিলিয়ে দিয়েছিলেন। এই দোঁহাটি পড়লে আমরা তাঁর সেই প্রগতিপন্থী মনোভাবের পরিচয় পেয়ে থাকি।
বৈসনো ভয়া তো কেয়া ভয়া,
বূমা নঁহী বিবেক।
ছাপা তিলক বনাই করি,
দগধ্যা লোক অনেক।।
বৈষ্ণবরাও কবীরের সমালোচনার শিকার হয়েছিলেন। বৈষ্ণবদের মধ্যে অনেক মিথ্যা আড়ম্বর দেখতে পাওয়া যায়, যা কোনোমতেই কাম্য নয়। বিষ্ণুর উপাসকেরা কেন নিজেদের সবার সামনে জাহির করবেন? কবীর এই দোঁহার মাধ্যমে ওই বৈষ্ণবদের আনুষ্ঠানিকতার বিরোধিতা করেছেন। তিনি বলেছেন, বৈষ্ণব হলেই কি মানুষ ভালো হয়? তিনি অনেক বৈষ্ণবকে দেখেছেন যাদের বিবেক বলে কিছু নেই। কপালে তিলক কেটে তারা অনেক মানুষের ক্ষতি সাধন করে। এইসব ছদ্ম—বৈষ্ণবদের থেকে দূরে থাকতে হবে বলেই কবীরের অভিমত।
তীরথ বরত সব বেলহী,
সব জগ মেল্যা ছাই।
কবীর মূল নিকন্দিয়া
কৌন হলাহল খাই।।
মন মথুরা দিল দ্বারিকা,
কাবা কাশী জাঁন।
দসবাঁ দ্বারা দেহুরা তামৈঁ
জ্যোতি পিছাঁন।।
তীর্থ, ব্রত এইসব আচার অনুষ্ঠানের তীব্র বিরোধী ছিলেন মহাত্মা কবীর। তিনি তীব্রভাবে এই বিষয়ের সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, অনেকে সকলের সামনে নিজেকে শুদ্ধ এবং সৎ দেখাবার জন্য তীর্থ ভ্রমণ করে, দানধ্যান করে। এতে কোনো লাভ হয় না। তাঁর মতে, মানুষের মনই হল দ্বারকা, কাবা, কাশী অথবা মথুরা। তাই পুণ্য অর্জনের জন্য অন্য কোথাও যাবার দরকার নেই। সকল মানুষকে ভালোবাসলে এবং ঈশ্বরকে আরাধনা করলে মানুষ তীর্থে যাবার পুণ্য অর্জন করতে পারবে।
জলে জিউ প্যারা মাছরি,
লোভী প্যারা দাম।
মাতা প্যারা বাল্কা,
ভক্ত পিয়ারা নাম।।
ভক্তের কাছে ভগবান হলেন অতি প্রিয় বস্তু। ভক্ত ভগবানকে কতটা ভালোবাসে তার একটি পরিচয় কবীর আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। মাছ যেমন জলকে ভালোবাসে এবং লোভী মানুষ যেমন অর্থ—সম্পদ, যশ ও প্রতিষ্ঠাকে ভালোবাসে, মা যেমন সন্তানকে ভালোবাসে, ঠিক সেভাবেই ভক্ত তাঁর প্রভুকে ভালোবাসেন। ভক্তের এই ভালোবাসার মধ্যে লুকিয়ে আছে মাছের জলের—প্রেম, লোভীর অর্থ—প্রেম, মায়ের সন্তান—প্রেমের মতো আন্তরিক প্রেম।
মোরি চুনরি মে পরি
গয়ো দাগা পিয়া,
পাঁচ তত্ত কৈ বনি চুনারিয়া
সোলহ সৈ বন্ধু লাগৈ জিয়া।
ইয়হ চুনরি মোরে মৈকেতে
আয়ি সসুরেমে মনুয়া খোয় দিয়া।
মলি—মলি ধোই দাগা না ছুটে
জ্ঞানকো সাবুন লাগ পিয়া।
কহত কবীর দাগা তব ছুটিই
জব সাহব আপনার লিয়া।
আমার চুনরি অর্থাৎ ওড়না। শরীরের তাপ লেগে গেছে। অর্থাৎ আমার শরীর এখন কামনা বাসনার দ্বারা দাগী হয়ে গেছে। এই শরীরে পাঁচটি তত্ত্ব লুকিয়ে আছে। ভারতীয় দর্শনশাস্ত্রে বলা হয়েছে যে আকাশ, জল, আগুন, হাওয়া এবং পৃথিবী—এই পাঁচটি বস্তুই আমাদের শরীর। আমাদের শরীর নানা মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ। আমরা মায়ের বাড়ি, বাবার বাড়ি, শ্বশুর বাড়ির দিক থেকেও নানা বন্ধনে নিজেদের বেঁধে ফেলি। চুনরিরূপী শরীর থেকে জ্ঞানরূপী সাবানের স্পর্শেও ওই দাগ যায় না। তাই কবীরদাস বলেছেন যখন ঈশ্বর সত্যি সত্যি আমাদের তাঁর কাছে ডেকে নেবেন তখন আমাদের শরীর শুদ্ধ হবে। তখন আমরা মায়ার সংসার থেকে মুক্তিলাভ করতে পারব।
পিয়া চাহে প্রেমরস,
রাধা চাহৈ মান।
এক ম্যানমে দো খড়গা,
দেখা সুনা ন কান।।
দোঁহার মাধ্যমে কবীর বলেছেন যে ঈশ্বরভক্তি এবং ব্যক্তিস্বার্থের পুর্তি একই সঙ্গে সম্ভব নয়। কেউ যদি মনে করে থাকেন যে তিনি সাংসারিক সমস্ত আনন্দ—বিনোদন ভোগ করবেন আবার ঈশ্বরেরও প্রার্থনা করবেন, তাহলে তাঁর ঈশ্বর—প্রার্থনা সফল হবে না। নিজের গর্ব, অহংকার থাকলে কখনোই আমরা ঈশ্বরের চরণ আশ্রয় করতে পারব না। একটি খাপের মধ্যে যেমন একসঙ্গে দুটি তরোয়াল রাখা যায় না, ঠিক তেমনভাবেই ঈশ্বরভক্তি ও স্বার্থপরতাকে একইসঙ্গে রাখা সম্ভব নয়। কবীর বলেছেন, এমন ঘটনা তিনি কখনো দেখেননি বা শোনেননি।
মালা তো করমে ফিরৈ,
জীৎ ফিরৈ মুখ মাহিঁ।
মনবাঁ তো দশ দিসি ফিরৈ,
ইহয় তো সুমিরন নাহিঁ।।
এই দোঁহার মাধ্যমে কবীর একটি শাশ্বত সত্যকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, অনেক মানুষ সবসময়ে মালা জপ করেন। এইভাবে তিনি তাঁর ঈশ্বর—সান্নিধ্য সকলের কাছে তুলে ধরেন। কিন্তু মালা—জপা সকলেই ঈশ্বরপ্রেমী নন, তাঁদের মধ্যেও অনেক ভণ্ড ও প্রতারক লুকিয়ে আছেন। তিনি বলেছেন, মালা—জপা যোগীরা হাতে মালা জপে আর মনে অন্যের অনিষ্ট করার কথা চিন্তা করে। অর্থাৎ আমি একরকম কাজ করব আর মনে অন্যরকম ভাবব এমনটি কখনো করা উচিত নয়। এইসব মানুষের মন দু—দিকে দৌড়োয়। এটি মোটেই সুলক্ষণ নয়।
মেরা তেরা মনুষাঁ কৈস
এক হোই রে।
ম্যায় কহতা হোঁ আঁখিন দেখি,
তূ কহতা কাগজ কী লেখী।।
ম্যায় কহতা সুরঝাবনহারী,
তূ রাখ্যো অরুঝাই রে।
ম্যায় কহতা তু জাগত রহিয়ো,
তু রহতা হ্যায় সোই রে।।
কবীরদাস তাঁর এই পদে বলেছেন যে আত্মজ্ঞানে জ্ঞানী ব্যক্তিরা বিষয়জালে জড়িয়ে পড়েন না। সাধারণ মানুষ কামনা বাসনার দ্বারা প্রতি মুহূর্তে প্রলোভিত হয়। কবীর তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা এই দোঁহাতে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন—আমি অনেক কিছু আমার চোখে দেখেছি। আমি দেখেছি অনেকে পুঁথিপড়া বিদ্যে আউড়ে যায়। অনেকে আবার জীবনযুদ্ধে পরাস্ত হয়। সাধারণ মানুষ কিন্তু এইসব ঝড়ঝঞ্ঝা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে। কবীরের অনুরোধ, মানুষ যেন সদাসর্বদা ঈশ্বরের অভিসারী হয়ে ওঠেন, বাসনা কামনার বিবর থেকে মুক্ত হয়ে পরম পিতার সন্ধান করেন। তাহলেই তিনি আত্মজ্ঞানে বলীয়ান হয়ে উঠতে পারবেন।
মালা ফেরত জুগ গয়া,
গয়া না মনকা ফের।
করকা মনকা ডারি কৈ,
মনকা মনকা ফের।।
কবীরদাস ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান এবং ব্রত ইত্যাদির বিরোধী ছিলেন। হিন্দু বা মুসলমান ধর্মে এই জাতীয় নানা আড়ম্বর দেখতে পাওয়া যায়। তিনি দুই ধর্মের এই কুসংস্কারগুলির বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন। অগ্নিবর্ষী শব্দবাণে সেগুলিকে বিদ্ধ করেছেন। কবীর বলেছেন, মনের মলিনতা কাটাবার জন্য মানুষ মারা যাবে। মালা জপতে জপতেই তার জীবন শেষ হয়ে যায়, তবুও তার মনের সেই মলিনতা কখনো যায় না। কবীরের বিশ্বাস এইভাবে শুধুমাত্র জপ করে মানুষ তার ঈপ্সিত পথে পৌঁছোতে পারে না। তাই কবীরের বক্তব্য হাতে মালা—জপা ছেড়ে দিয়ে মনের পরিবর্তন করা দরকার। তবেই আমরা আমাদের জীবনের কাঙ্ক্ষিত সত্যের সন্ধান পাব। তখন আর আমাদের এইসব আনুষ্ঠানিকতার দিকে মন দিতে হবে না।
নৈনোঁ কী করি কোঠরী,
পুতলী পলঁগ বিছায়,
পলকোঁ কী চিক ডারিকৈ,
পিয়েগো লিয়া রিঝায়।।
নিজের অন্তরে কীভাবে কবীর ঈশ্বরকে স্থান দেবেন, এই দোঁহাতে তিনি সেই কথা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, চোখ দুটিকে করবেন কুটির, চোখের তারাকে বিছানা। দু—চোখের পাতা দিয়ে তৈরি করবেন দেওয়াল। এমন এক নিরাপদ স্থানে তিনি তাঁর ঈশ্বরকে এনে বসাবেন এবং একমনে তাঁর আরাধনা করবেন।
ঈশ্বরের প্রতি ভালোবাসা কতখানি পরিব্যাপ্ত হলে তবে এমন কথা বলা যায়, এই দোঁহাটি পড়লে আমরা তা বুঝতে পারি।
হরিসে জনি তূ হেত কর,
কর হরিজনসে হেত।
মাল মুকুল হরি দেত হ্যায়,
হরি হরিজন হরি হী দেত।।
এই দোঁহায় কবীর মানুষকে প্রেম করার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন তুমি যদি সর্বহারা মানুষের সঙ্গে সখ্যের সম্পর্ক স্থাপন করো তাহলে তোমাকে আর ঈশ্বর আরাধনা করতে হবে না। কারণ এইসব হরিজনদের মধ্যেই হরির অবস্থান। তুমি নিরন্নের মুখে অন্ন তুলে দাও। যার মাথায় ছাদ নেই সেখানে ছাদের ব্যবস্থা করো। যারা সমাজে অস্পৃশ্য তাদের পাশে পৌঁছে যাও। তাহলে দেখবে তুমি একদিন হরির পদ স্পর্শ করতে পেরেছ। হরিজনের সেবা করলেই হরিকে পাওয়া যায়।
এই দোঁহার মাধ্যমে কবীর তাঁর সমাজ—সচেতক মনের পরিচয় দিয়েছেন।
প্রীতমকো পতিয়াঁ লিখুঁ
জো কহুঁ হোয় বিদেস।।
তনমে মনমে নৈন মে,
তাকো কহা সঁদেস।।
একজন প্রেমিক তার বিদেশবাসী প্রেমিককে চিঠি লেখে। চোখের জলে লেখা সেই চিঠিতে সে তার বিরহ ব্যথার কথা বারবার ঘোষণা করে। প্রেমিক আবার কবে আসবে এ প্রশ্ন সে করে। কিন্তু কবীর বলছেন, তিনি কেন শুধু শুধু তাঁর রামকে চিঠি লিখবেন? শ্রীরাম তো তাঁর শরীরের সর্বত্র অবস্থান করছেন। তিনি চোখ খুললে স্থল—জল—অন্তরীক্ষে রামের মুখচ্ছবি দেখতে পান। রামের সঙ্গে কখনো তাঁর বিরহ রচিত হয় না। তাই কখনো তাঁকে চিঠি লিখতে হবে না।
সাধু গাঁঠি ন বাঁধঈ,
উদর সমাতা লেয়।
আগে পিছে হরি খাড়ে,
জব মাঁগৈ তব দেয়।।
কবীর বলেছেন, সৎ মানুষ কখনো অতিরিক্ত কিছু গ্রহণ করেন না। যতটুকু তাঁর প্রয়োজন তিনি ততটুকু খাদ্য গ্রহণ করেন। এই দোঁহার মাধ্যমে তিনি পরিষ্কারভাবে বলেছেন যে, একজন সত্যিকারের সুখী মানুষের অতিরিক্ত লোভের প্রয়োজন নেই। এই পৃথিবীতে ভগবান সকলের জন্য উপযুক্ত খাদ্য ও বস্ত্রের ব্যবস্থা রেখেছেন। লোভী মানুষ সেই বিষয়টিকে নষ্ট করে দেয়। তাই কবীরের উপদেশ—আমরা যেন অতিরিক্ত কোনো কিছুর প্রতি লোভ না করি। এইসব মানুষের ওপর সদাসর্বদা ঈশ্বরের আশিস বর্ষিত হয়।
নিরমল ভয়া তো কেয়া ভয়া,
নিরমল মাঁগৈ ঠোর।
মল নিরমলতেঁ রহিত হ্যায়,
তে সাধু কোই ঔর।।
কিছু মানুষ নানা ধরনের পাপ কাজে নিজেকে নিযুক্ত করে। কিছু মানুষ স্বচ্ছ ও পাপ—রহিত হয়। এঁরাই হলেন সাক্ষাৎ ভগবান। পৃথিবীতে এমন মানুষের সংখ্যা যত বাড়বে, পৃথিবীটা ততটাই এক বাসভূমি হিসাবে বিবেচিত হবে।
ইয়হ তন বিষকী বৈলরী,
গুরু অমৃত কী খান।
সীস দিয়ে জো গুরু মিলৈ,
তৌ ভি সস্তা জান।।
কবীর বলছেন মানুষের দেহ হল বিষের লতা। আর ঈশ্বর হলেন অমৃতের খনি। পৃথিবীতে যিনি একবার উপযুক্ত গুরুর সন্ধান পেয়েছেন, তাঁর মতো ভাগ্যবান আর কেউ নেই। গুরুই হলেন সর্বশ্রেষ্ঠ, গুরুর ওপর আর কেউ কখনো থাকতে পারেন না। এটি হল কবীরের আন্তরিক অভিজ্ঞান।
ক্যায়া মুখ লৈ বিনতি করৌ,
লাজ আবত হ্যায় মোঁহি।
তুম দেখতে ঔন্ডুন করো,
কৈসে ভাঁবৌ তোহি।।
হে প্রভু! আমি কোন মুখে আপনার কাছে প্রার্থনা করব? আমি কীভাবে আপনার কাছে আমার মনোগত বাসনা নিবেদন করব? আপনার চোখের সামনে একটির পর একটি অন্যায় কাজ করেছি। এই কাজগুলো আপনি সমর্থন করবেন না তা আমি জানি।
এই দোঁহার মাধ্যমে কবীর ঈশ্বরের কাছে অকপট স্বীকারোক্তি করেছেন। জীবন ও জীবিকার স্বার্থে প্রত্যেক মানুষকে কিছু না কিছু পাপ কাজ করতে হয়। কিন্তু ঈশ্বর কি তার জন্য আমাদের শাস্তি দেন? আবেগাপ্লুত কণ্ঠস্বরে কবীর এই প্রশ্নের উত্তর অন্বেষণ করেছেন।
উততে কোই ন বাহুরা,
জাসে বুঝূঁ ধায়।
ইততেঁ সবহী জাত হ্যায়,
ভার লদায় লদায়।।
কবীর বলেছেন স্বর্গ থেকে কেউ এই পৃথিবীতে আসে না। স্বর্গ বলে কোনো অস্তিত্ব এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে নেই। ইচ্ছা করলে আমরাই আমাদের সুকৃতির দ্বারা পৃথিবীর বুকে এক টুকরো স্বর্গ রচনা করতে পারি।
কহতা তো বহুত নিলা,
গহতা মিলা ন কোই।
সো কহতা বহি জান দে,
জো নহিঁ গহতা হোই।।
পৃথিবীতে অনেকেই অনেক বড়ো বড়ো কথা বলে থাকে। নানাভাবে নিজেকে জাহির করে। অহংকারের স্পর্ধিত পদচিহ্ন আঁকে। আবার কিছু মানুষ আছে যারা কেবল নীরবে, নিভৃতে কাজ করে যায়। কবীরের অভিমত হল আমাদের উচিত ওইসব প্রচার—বিমুখ মানুষদের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো। তাদের কাজে সহযোগিতা করা। আর যেসব মানুষ অহংকারী তাদের সংশ্রব এড়িয়ে চলা।
বৃচ্ছ কবহুঁ নহিঁ ফল তখৈঁ,
নদী ন সঞ্চৈ নীর।
পারমার থেকে কারণে,
সাধু ন ধরা সরীর।।
পৃথিবীতে সাধু অর্থাৎ পুরুষ শ্রেণির মানুষ কেন আবির্ভূত হন? কবীর এই দোঁহার মাধ্যমে তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন গাছ কখনো তার ফল নিজে খায় না। নদী কী তার জল নিজে ব্যবহার করে? গাছ তার ফল সকলকে দেয়, নদী তার জল সকলকে দেয়। আর এইভাবেই পুণ্য মানুষেরা তাঁদের জীবনব্যাপী সাধনলব্ধ ফলাফল সকলের হাতে নির্দ্বিধায় তুলে দেন। এইভাবেই তিনি একজন পবিত্র সৎ মানুষের বিচার করেছেন।
কবীরা নৌবত আপনি,
দিন দস লহু বজায়।
ইয়হ পুর পট্টন ইয়হ গলি,
বহুরি ন দেখৌ আয়।।
কবীর বলেছেন, এ জীবন বড়োই ছোটো। তাই এই জীবনে সমস্ত অভিজ্ঞতা লাভ করতে হবে। এরপর তিনি বলেন—সংক্ষিপ্ত সময়সীমার জন্য পৃথিবীতে এসেছ। একদিন তোমায় এই সাধের পৃথিবী ছেড়ে অন্য কোথাও অন্য কোনো লোকে চলে যেতে হবে। পরে হয়তো আর কখনো তুমি এই বসুন্ধরাতে জন্মগ্রহণ করার সুযোগ পাবে না।
এই দোঁহার মাধ্যমে কবীর সব মানুষকে কর্মমুখর হতে বলেছেন। কর্মই জীবন এবং জীবনই কর্ম—এমন কথাই তিনি বলেছেন।
অনগড়িয়া দেবা,
কৌন করৈ তেরি সেবা।
গাঢ়ৈ দেব কো সব কোঈ পূজৈ,
নিত হী লাবৈ সেবা।।
কবীরদাস নিজে একটি বিশেষ ধার্মিক চেতনার অনুগামী ছিলেন। সেই চেতনায় পৌত্তলিকতাকে বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। কবীর নিরাকার ব্রহ্মের সাধনা করতেন। কবীর বিশ্বাস করতেন যে তাঁর ঈশ্বর স্থল—জল—অন্তরীক্ষ সর্বত্রই বিরাজমান। আমরা যেমন বাতাসকে দেখতে পাই না, কিন্তু বাতাস যে আছে তা অনুভব করতে পারি। সেইভাবে কবীরের ঈশ্বরকেও আমরা আমাদের উপলব্ধির মধ্যে আনতে পারি। এইভাবে কবীর তাঁর দার্শনিক অভিব্যক্তির কথা এই দোঁহার মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।
জৈসা অন-জল খাইয়ে,
তৈসা হী মন হোয়।
জৈসা পানি পিজিয়ে,
তৈসী বানী সোয়।।
মানুষ যেমন খাদ্য গ্রহণ করে তার মনোভাব তেমনই হয়। যে মানুষ মাংসাশী হয় তার মনে হিংসা আছে। যে মানুষ নিরামিশাষী তার মন কোমল হয়। আবার যে মানুষের যেমন মুখের ভাষা, সেই ভাষা শুনলে আমরা বুঝতে পারি যে সেই মানুষ কোন অঞ্চলের বাসিন্দা। কবীর বলেছেন, প্রত্যেক অঞ্চলের একটি আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।
মাঁগন মরণ সমান হ্যায়,
মত কোই মাঁগৌ ভিখ।
মাঁগন সে মরণা ভলা,
ইরহ সতগুরু কী সিঙ্ঘ।।
এই দোঁহায় কবীর বলেছেন ভিক্ষে করা এবং মৃত্যু একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। তিনি বলেছেন—কখনো ভিক্ষা করবে না। অল্প আহার করবে, পরিমিত পোশাক পরবে। কখনো অতিরিক্ত উচ্চাশা করবে না। অহংকারী হবে না। এটি হল কবীরের একটি সমাজ—সচেতক দোঁহা। এই দোঁহাটি লিখে কবীর প্রমাণ করেছেন যে, তিনি শুধুমাত্র অধ্যাত্ম—সাধক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সমাজ—সংস্কারকও।
কহত কবীর সমনাশী
রাম মিলৈ অবিনাশী।।
কবীরের রামনাম তাঁর গুরু রামানন্দের রামের থেকে ভিন্ন। রামানন্দ যে রামের উপাসনা করেন তিনি হলেন বিষ্ণুর অবতার এবং দশরথের পুত্র। পিতৃসত্য পালনের জন্য সেই রাম চৌদ্দ বছর বনবাসী হয়েছিলেন। আর কবীরের রাম হলেন নিরাকার ও অবিনাশী। কবীরের রামের কোনো অবয়ব নেই, কবীরের রাম সর্বত্র বিরাজমান।
এই দোঁহা লিখে কবীর ব্রহ্মের সঙ্গে রামের একীকরণ করেছেন।
অরে ইন দূহন রাইন পাঈ।
হিন্দু অপনৌ করৈ
বড়াঈ গাগর ছুবন ন দৈঈ।।
কবীর মানুষকেই শ্রেষ্ঠ বলেছেন, কবীর বলেছেন মানুষের মধ্যে কোনো বিভেদ থাকা উচিত নয়। মনুষ্যেতর প্রাণী অনেক ত্যাগ ও তিতিক্ষার পর মানুষ হিসাবে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়। মানুষ হল ঈশ্বরের সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। মানুষের চেতনা আছে, স্মৃতি আছে, বোধ আছে, বিদ্যা আছে। তাই মানুষের উচিত একে অন্যকে ভালোবাসা। তাহলেই আমরা এক সুন্দর শোভন পৃথিবীর স্বপ্নকে সফল করতে পারব।
মাটি এক ভেদ ধরি নানী
সব মে ব্রহ্ম সমানা।
কহৈ কবীর ভিস্ত ছিট কাঈ
দোজগ হী মনভানা।
এই দোঁহাতে কবীর ধর্মের বিভিন্নতাকে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন পৃথিবীর সমস্ত মানুষ এক ও অভিন্ন। আমরা সবাই একই ব্রহ্ম থেকে সৃষ্টি হয়েছি। তাহলে কেন আমরা পরস্পর হানাহানি করব? মৃত্যুর পর সব মানুষ একই ব্রহ্মে বিলীন হয়ে যাবে। তাই আমাদের উচিত সমস্ত ধর্মের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করা। তবেই আমরা এক আদর্শ পৃথিবীর স্বপ্নকে সফল করতে পারব।
তেরা সাঁঈ তুঝ মে, জ্যিঁউ পুহুপনাম বাস।
কস্তুরী কা মিরগ ক্যিঁউ, ফিরি ফিরি টুটে ঘাস।।
মানুষ ঈশ্বরকে পাওয়ার জন্য এখানে সেখানে পাগলের মতো খুঁজে মরে। অথচ সে জানে না যে ঈশ্বর তার মধ্যেই অবস্থান করেন। এই দোঁহায় কবীর সেই কথাই বলেছেন। তিনি বলেছেন, তোমার ঈশ্বর তোমার মধ্যেই (তেরা সাঁঈ তুঝ মে) রয়েছেন। তাঁকে পাওয়ার জন্য মন্দিরে, মসজিদে বা গির্জায় যেতে হবে না। কস্তুরী মৃগ (কস্তুরী কা মিরগ) তার দেহের সুবাসস্থান খুঁজে পাবার জন্য অরণ্যে ঘাসে ঘাসে মুখ দিয়ে ফেরে অথচ সে জানে না সুগন্ধী কস্তুরী তার দেহের মধ্যেই রয়েছে। ফুলের মধ্যেই যেমন সুগন্ধ (জিঁউ পুহুপনাম বাস) থাকে, তেমনি মানুষের মধ্যেও সুগন্ধরূপী ঈশ্বর অবস্থান করেন।
কথনী মিঠি খাঁড়—সী করনী বিষকী লোয়।
কথনী তজি করনী ক’রে, তো বিষ মে অমৃত হোয়।।
কবীরদাস বলছেন, এমন কিছু মানুষ আছে যারা মুখে খুব মিষ্টি কথা (কথনী মিঠি খাঁড়—সী) বলে কিন্তু কর্মক্ষেত্রে তারা বিষের থেকেও জ্বালাময় (বিষ কী লোয়) কাজ করে। যেসব মানুষ মুখে কথা না বলে কাজ করে (কথনী তজি করণী ক’রে) তাদের কাজ বিষের মতো জ্বালাময় হলেও তা অমৃত সমান।
আঁতধা ঘড়া ন জল মে ডুবে, সুধা সুভর ভরিয়া।
জাকৌ ইয়হ জগ ঘিন করি ঢলৈ, না প্রসাদি নিস্তারিয়া।।
মায়ার প্রভাব থেকে মানুষকে মুক্ত থাকার জন্য কবীর মানুষকে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলছেন, সংসার বিমুখ হয়ে থাকতে পারলেই মায়ার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা যায়। কলসীর মুখ উলটো করে জলে ডোবালে ডোবে না, কিন্তু ওই কলসীই আবার সোজা করে জলে ডোবালে ডুবে যায়। এইভাবে মানুষ সংসারে আসক্ত হলে মায়ার সমুদ্রে ডুবে যায়। কিন্তু সংসার—বিমুখ হয়ে থাকতে পারলে মায়ার বন্ধন থেকে সে মুক্ত থাকতে পারে।
জৌগী গোরখ গোরখ করেরে, হিন্দু রাম নাম উচ্চরৈ।
মুসলমান কহৈ এক খুদাঈ কবীর কা স্বামী ঘট—ঘট রহা সমাঈ।।
কবীর যেমন তাঁর ব্রহ্মকে সর্বব্যাপী বলে বর্ণনা করেছেন, তেমনি আবার তাঁর ব্রহ্মের স্বরূপ বর্ণনা করতেও পারছেন না। তিনি বলছেন যোগীরা ‘গোরখ গোরখ’ করে, হিন্দুরা ‘রাম রাম’ করে আর মুসলমানরা সদাই খোদার নাম ডাকে। ব্রহ্ম সর্বব্যাপী হওয়ায় তিনি তাঁদের সবার মধ্যেই অবস্থান করেন।
মোহি আগ্যা দঈ দয়াল, দয়া করি কাহুকূঁ সমঝাই।
কহত কবির ম্যায় কহি—কহি হারয়ো, অব মোহি দোস না লাই।।
কবীরদাস তাঁর রচনায় সকল ধর্মের, সম্প্রদায়ের আচার—অনুষ্ঠানের ত্রুটির নিন্দা করেছেন। তিনি সব ধর্মের গ্রহণযোগ্য বিষয়গুলি গ্রহণ করতে মানুষকে পরামর্শ দিয়েছেন। আর পরিশেষে কবীরদাস বলছেন তিনি এটা নিজের ইচ্ছায় করেননি। ঈশ্বরের প্রেরণায় তিনি মানুষকে এই পথে চলতে বলছেন।
বড়া দুয়া তো কেয়া হুয়া, জৈসে পেড় খজুর।
পন্থী কো ছায়ী নহী, ফল লাগৈ অতি দূর।।
সন্ত কবীর তাঁর এই দোঁহায় সেইসব মানুষদের উদ্দেশে সৎ পরামর্শ দিচ্ছেন, যাঁরা জীবনে বড়ো হবার বাসনা রাখেন। তিনি বলছেন, জীবনে উন্নতি করা, বড়ো হওয়া ভালো জিনিস, তাই বলে খেজুর গাছের মতো বড়ো হয়ে লাভ নেই। প্রকৃতিতে দেখা যায়, খেজুর গাছ বড়ো হয়, অনেক লম্বা হয়। অথচ মানুষের কোনো উপকারে আসে না। শুষ্ক মরুভূমির প্রান্তরে এই গাছ মানুষকে একটুও ছায়া দেয় না। এই গাছ অতি লম্বা হওয়ায়, এর ফলও থাকে অনেক দূরে, নাগালের বাইরে। তাই বড়ো হলেও এ গাছ মানুষের উপকারে লাগে না। সেজন্য তিনি বলেছেন, খেজুর গাছের মতো বড়ো হয়ে কোনো লাভ নেই।
মাটি কহৈ কুন্থার কো, তু কেয়া রূঁদে মোহিঁ।
ইকো দিন অ্যায়সা হোয়েগা, ম্যায় রূদুঁগি তোহিঁ।।
কুমোর মাটি নিয়ে কাজ করে। তাকে প্রতিদিন নানা রকমের মাটির পাত্র তৈরি করার জন্য মাটি দলতে, মাখতে হয়। সেজন্য কুমোর হয়তো মনে করে সে যেভাবে মাটিকে ব্যবহার করবে, সেভাবে তাকে ব্যবহৃত হতে হবে। কুমোরের এই ধারণা ভ্রান্ত প্রমাণ করার জন্য কবীরদাস বলেছেন, কুমোরই চিরকাল দলে যাবে না, এমন একদিন আসবে যেদিন মাটিও কুমোরকে দলবে, মাখবে (ম্যায় রদুঁগি তোহিঁ)। অর্থাৎ কিনা কাজ এক তরফা নয়, দু—তরফা।
ভাব ভগতি বিসবাস বিনু, কটৈ ন সঁসৈ মূল।
কহৈ কবীর হরি ভগতি বিনু, মুক্তি নঁহী রে মূল।।
কবীরদাস ভক্তিকেই প্রাপ্তির মূল পথ বলে মনে করতেন। তাই তিনি বলছেন, মানুষের মনে যদি ভক্তি (ভগতি) না থাকে তাহলে মনের মলিনতা কাটে না। তিনি বলছেন, হরির প্রতি ভক্তি প্রদর্শন ভিন্ন মুক্তি নেই।
ভলী-ভঈ জু ভৈ পড়য়া, গঈ দশা সব ভুল।
পালা গলি পাঁনী ভয়া, ঢুলি মিলিয়া উস কূল।।
এই দোঁহায় কবীরের ঈশ্বর ভক্তির আত্ম—নিবেদিত রূপ প্রকাশ পেয়েছে। সমুদ্রের বুকে এক বিন্দু জল পড়লে যেমন সেই জল সমুদ্রে মিশে যায়, ঈশ্বরে আত্মনিবেদিত মানুষের অবস্থাও অনেকটা সেই রকম হয়।
না ইহু মানস না ইহু দেঊ, না ইহু জাতি কহাবৈ সেউ।
না ইহু জোগী না অবধূতা, না ইহু মাঈ ন কাহু পূতা।।
অর্থাৎ তিনি বলছেন এই দেহের মালিক সেই পরমাত্মা ঈশ্বর। আত্মা ও পরমাত্মা দুয়েরই মালিক তিনি।
ভজি নারদাদি সুকাদি বন্দিত চরণ পধা ভামিনী।
ভজি ভজিসিঁ ভূষণ পিয়া মনোহর দো দেব সিরোবনী।।
বুধি নাভি চন্দন চরচিকা তন রিদা মন্দির ভীতরা।
রাম রাজসি নৈন বাণী সুজান সুন্দর সুন্দরা।।
বহু পাপ পরবত ছৈদনা ভৌ জাপি দুরপি নিবারণা
কহৈ কবীর গোবিন্দ ভজি পরমানন্দ বন্দিত কারণা।।
কবীর ভক্ত মানুষ। তাই তিনি তাঁর উপাস্যের মধ্যে সংসারের যাবতীয় গুণ অবলোকন করেন। তাঁর ভগবান সংবেদনশীল, করুণাময় ও তিন লোকের অধীশ্বর। তাই কবীর তাঁর বন্দনা করেন। এই বন্দনা সাকার ব্রহ্মের উপাসনাকারী ভক্তদের উপাসনার মধ্যে পড়ে। কবি তুলসীদাসও এই একই শব্দাবলির ব্যবহারযোগ্য থাকার ব্রহ্মের বন্দনা করেছেন।
জব মৈঁ থা তব হরি নহিঁ, অব হরি হ্যায় হাম নহিঁ।
প্রেম গলি অতি সাঁকরী, তামেঁ দোন সমাহিঁ।।
কবীরদাস বলছেন, ঈশ্বরভক্তি এবং বিষয়—বাসনা একই সঙ্গে চলতে পারে না। তিনি বলেছেন, ‘জব মৈ থা’ অর্থাৎ মানুষ যখন নিজের বিষয়চিন্তা নিয়ে ব্যস্ত, তখন ঈশ্বর তার থেকে অনেক দূরে (তব হরি নহীঁ) অবস্থান করেন। আবার যখন মানুষের মনে ঈশ্বরের প্রাধান্য (অব হরি হ্যায় হাম নহিঁ) তখন বিষয় বাসনার স্থান অতি দূরে। তিনি বলেছেন, প্রেমের পথ অতি সংকীর্ণ (সাঁকরী) এবং সংকীর্ণ প্রেমের পথে একই সঙ্গে দুজনের অবস্থান সম্ভব নয়।
ইয়ে দুনিয়া দুঈ রোজ কী, মত কর যা সে হেত।
গুরু চরণো সে লাগিয়ে, জো পূরণ সুখ দেত।।
কবীরদাস বলছেন, মায়া বড়ো বিষম বস্তু। এই পৃথিবীতে মানুষের আগমন সামান্য কয়েক দিনের (দুঈ রোজ কী) জন্য। তাই এই পৃথিবীর প্রেম বা মায়ার বাঁধনে (যা সে হেত) নিজেকে বেঁধে ফেলো না। তার চেয়ে গুরুর ভজনা করো। গুরুর পায়ে মাথা ঠেকিয়ে (চরণো সে লাগিয়ে) পড়ে থাকো। গুরুই মানুষকে পরিপূর্ণ সুখ (পূরণ সুখ) দিতে পারেন।
জো তোকোঁ কাঁটা বুধৈ, তাহি বোবতু ফুল।
তোহি ফুল হ্যায়, ওয়া তো হ্যায় তিরসুল।।
এই দোঁহায় কবীরদাস বলছেন, সৎ মানুষের উচিত সদাচরণ করা। যে তোমার গায়ে কাঁটা ফোটাবে (কাঁটা বুধৈ), অর্থাৎ তোমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবে, তার সঙ্গে তোমাকেও যে খারাপ ব্যবহার করতে হবে তা কিন্তু নয়। তোমার গায়ে কাঁটা ফোটালেও তুমি তার দিকে ফুল এগিয়ে দাও। তোমার ফুলের বিনিময়ে তুমি ফুলই পাবে আর তার কাঁটার বিনিময়ে সে পাবে তিরসুল অর্থাৎ ত্রিশূল।
মোকো কহাঁ ঢুঁঢ়ৈ বন্দে,
ম্যায় তো তেরে পাসমে।
না ম্যায় বকরি না ম্যায় ভেড়ী
না ম্যায় ছুরী গঁড়াসমে।
নহি খালমে নহি পৌঁছমে।
না হাডডি না মাসমেঁ।
না ম্যায় দেবল না ম্যায় মসজিদে
না কাবে কৈলাশমে।
না তৌ কৌ নোঁ ক্রিয়া কার্যমে
নহি জোগ বৈরাগমে।।
খোঁজী হোয় তুরতে মিলিহোঁ
পল ভরকী তলাসমে।
ম্যায় তো বহিঁ সহরকে বাহর
মেরী পুরী মবাসমে।।
কহে কবীর শুনো ভাই সাধো,
সব সাসোঁকি সাঁসমে।।
কবীরদাস তাঁর এই পদে মানুষের কাছে ঈশ্বরের বিকাশ বাতলে দিয়েছেন। মানুষ ভাবে ঈশ্বর বুঝি এমন কোনো গোপন স্থানে অবস্থান করেন, যেখানে মানুষের যাওয়া সম্ভব নয়। মানুষ থেকে তিনি অনেক দূরে অবস্থান করেন। মানুষের এমন ধারণা ভুল বলেই তিনি পদের শুরুতে বলেছেন। ওহে আমার ভক্ত শিষ্য (বন্দে) আমাকে তুমি খোঁজো কেন, আমি তো তোমার কাছেই আছি। আমি ছাগলও (বকরি) নই, আবার ভেড়াও নই, খাপে পোরা ছুরিও নই। মানুষের দেহের চামড়া (খালমে), হাড়, মাংসে আমাকে পাবে না। মন্দির, মসজিদ বা কৈলাসেও আমার দেখা পাবে না। আমাকে পাওয়ার জন্য অত দৌড়—ঝাঁপের প্রয়োজন নেই। আমাকে পাবে সাংসারিক মায়ার বন্ধনের বাইরে। মানুষের হৃদয় নামের নগরীতে অবস্থান। শারীরিক কামনা সংযম করলেই আমাকে পাওয়া যায়।
ইয়হ সব সুধী বন্দগী, বিরথা পঞ্চ নমাজ।
সাঁচে মারে ঝুঁঠি পয়ি, কাজি করৈ অকাজ।।
অসৎ পুরোহিত, গোঁসাই থেকে যেমন তিনি সমাজের সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে দিয়েছেন, তেমনি কাজি ও মোল্লাদের থেকেও মানুষকে সতর্ক করতে ভোলেননি। তিনি বলছেন, ওই পাঁচবার নামাজ পড়া, কুর্নিশ করা বৃথা। মিথ্যে মিথ্যে সাধারণ মানুষকে দিয়ে এসব করিয়ে কাজি ও মোল্লারা সুখ ভোগ করে। সুতরাং তাদের কথার ফাঁদে পোড়ো না।
বে দিন কব আবৈঁগে মাই।
জা কারণ হম দেহধরী হ্যায়, মিলিবৌ অঙ্গ লগাই।।
হৌ জাঁনু বে হিল মিল খেলুঁ, তনমন প্রাণ সমাই।
য়া কামনা করৌ পরি—পূরণ, সমরথ হৌ রাম রাই।।
মাঁহি উদাসী মাধব চাহৈঁ, চিতবত রৈ ন বিহাই।
সেজ হমারি—সংঘ বই হ্যায়, জব সেঁ ঊ তব ঘাই।।
বহু অরদাস দাস কী সুনিয়ে, তন কী তপন বুঝাই।
কহৈ কবীর মিলৈ জৈ মাঈ, মিলি করি মঙ্গল গাই।।
কবীরদাস তাঁর এই পদে প্রিয়ের সঙ্গে মিলনের বাসনা প্রকাশ করেছেন। তাঁর প্রিয় শ্রীরাম। তিনি প্রিয়ের সঙ্গে মিলিত হতে আগ্রহী। তাঁর ব্যাকুলতা এই কবিতার ছত্রে ছত্রে প্রকাশ পেয়েছে। বিরহ বেদনায় আতুর, অত্যন্ত ব্যাকুল এই কবি জানতে চাইছেন, সেদিন কবে আসবে, যেদিন তিনি তাঁর প্রেমিকের সঙ্গে মিলিত হবার সুযোগ পাবেন!
কবীর মায়া পাপিনী, ফন্দ লৈ বৈধী হাটি।
সব জগতা ফঁদে পড়য়া, গয়া কবীরা কাটি।।
এই অংশেও কবীরদাস সেই মায়ার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, মায়া অতি পাপিনী। এই মায়া মানুষকে ধরবে বলে ফাঁদ পেতে বসে আছে। সব মানুষ এই মায়ার ফাঁদে পড়ে মারা যায়। সর্বস্বান্ত হয়। তবে কবীরকে মায়ার ফাঁদে জড়িয়ে তার ক্ষতি করা সম্ভব নয়। কারণ তিনি তো মায়ার ফাঁদ কেটে বেরিয়ে তাঁর প্রিয় রামের সঙ্গে মিলিত হয়েছেন।
অবধূ নিরঞ্জন জাল পসারী।
স্বর্গ পতলাল জীব মৃত মণ্ডল, তীন লোক বিস্তারা।
ব্রহ্ম, বিষ্ণু, সিব প্রকট কিয়ো হ্যায়, তায় দিয়ো সিরও ভারা।।
ঠাঁও ঠাঁও তীরথ বৃত থাগ্যো, গৈনে কো সংসারী
মায়া মোহ কঠিন বিস্তারা, আপু ভয়ো করতারা।।
সতগুরু সবদ কো চীহ্নত নাহীঁ, কৈসৌঁ হোয় উবারা।
জারি—ভূঁজি কোহলা করি ডাকে, ফিরি ফিরি—লৈ অবতারা।।
অমর লোক জহাঁ পুরুষ বিরাজৈ, তিনকা মৃঁদা দ্বারা।
জিন সাহেব মে ভয়ে নিরাঞ্জন সে তৌ পুরুষ হ্যায় নিয়া।।
কঠিন কাল তো বাঁচা চাহো, গঁহো সবদ টকসারা।
কহৈ কবীর অমর কর রাখৌ, মানি সবদ হমারা।।
এই পদে কবীরদাস নিরঞ্জনকে স্পষ্টরূপে মায়া বলে বর্ণনা করেননি। তবে এটিকে মায়ার সমান বলে উল্লেখ করেছেন। মায়ার মতো নিরঞ্জনও গোটা পৃথিবীকে ভ্রমের মধ্যে রেখে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার চেষ্টা করে। তাই তাঁর মত হল, এটিকে মায়া বলে মনে করা উচিত।
রাম ভজৈ সো জানিয়ে, জাকৈ আতুর নাহিঁ।
মত সন্তোষ লিয়ে রহৈ, ধীজ মন মাঁহি।।
জন কো কাম ক্রোধ ব্যাধো নহী, ত্রিষ্ণা ন জারৈ।
প্রফুল্লিত আনন্দ মে, গোব্যন্দ গুণ গাবৈ।।
কবীরদাস বলছেন, মায়ার বাঁধন থেকে মুক্তির সব থেকে বড়ো উপায় হল ঈশ্বরভক্তি। ভক্তির সাহায্যেই ঋষি, মুনি, দিগম্বর, যোগীরা মায়ার প্রভাব মুক্ত থেকে ঈশ্বরসাধনা করে যেতে পেরেছিলেন। এই ঈশ্বরভক্তির জন্যই কাম ক্রোধ, লোভ ইত্যাদি মায়ার সহচরদের বিনাশ ঘটে। মায়ামুক্ত হয়ে ভক্ত নিশ্চিন্তে ঈশ্বর বন্দনা করতে পারে।
মায়া ছায়া একসি, বিরলা জানৈ কোয়
ভগতকে পাছে ফিরৈ অনমুখ ভাগৈ সোয়।।
প্রকৃতি থেকে উদাহরণ টেনে এনে কবীরদাস মানুষকে বোঝাতে চাইছেন মায়া বড়ো বিষম বস্তু। একমাত্র ছায়ার মাধ্যমেই মায়ার বিষমতা প্রকাশ করা যায়। যে মানুষ মায়া অর্থাৎ সংসার থেকে দূরে সরে যেতে চায়, ছায়ার মতো মায়া তার পিছু পিছু ফেরে। আর যে মানুষ আগ বাড়িয়ে মায়ার বাঁধনে পড়তে চায়, ছায়ার মতো তার কাছ থেকে দূরে সরে যায়। তার পক্ষে আর মায়ার বাঁধনে বাঁধাপড়া হয়ে ওঠে না।
সন্তো ঠোখা কাঁসো কহিয়ে
গুণ যো নির্গুণ, নির্গুণ যো গুণ
বাট ছাঁড়ি কিউঁ কহিয়ে।।
ভক্তি যুগের কবিদের মধ্যে দুটি ধারা বিদ্যমান ছিল—একটি সগুণ সম্প্রদায়, অপরটি নির্গুণ সম্প্রদায়। এই দুই মতাবলম্বীদের মধ্যে মতান্তরজনিত বিরোধও দেখা দিত মাঝে মাঝে। কবীরদাস মনে করতেন, আসলে এই সগুণ নির্গুণ বিরোধ কিছুই নয়। দুটিই মূলত এক। সেই চিন্তাধারা থেকে তিনি এই কথা লেখেন।
কেয়া জপ কেয়া তপ কেয়া সংযম কেয়া বরত কেয়া অত্থান।
জব লগি জুক্তি ন জানিয়ে, ভাব ভক্তি ভগবান।।
তিনি যেমন ঈশ্বর—ভক্তির কথা বলছেন, তেমনই আবার নানা আচার অনুষ্ঠান বিষয়ে মানুষকে সতর্ক করে দিয়েছেন। তিনি বলছেন, ঈশ্বরের প্রতি ভক্তিমার্গে মিলিত হবার জন্য জপতপ, সংযম, ব্রত পালনের প্রয়োজন নেই। মানুষকে ঈশ্বরের কাছে পৌঁছোবার জন্য কারোর সাহায্য, কোনো আচার অনুষ্ঠানের সাহায্য নিতে তিনি রাজি নন।
পায়া পকড়তা প্রেম কা, সারী কিয়া সরীর।
সতগুরু দাও রুইয়া, খেলৈ দাস কবীর।।
কবীরের গুরু কবীরকে প্রেম—ভক্ত হবার আদেশ দিয়েছিলেন। সেই আদেশের সমর্থনে তিনি যে যুক্তি দেখিয়েছিলেন কবীর তা—ই এই দোঁহার মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।
জো তুম দেখো সো ইয়হু নাঁহী, ইয়হ পদ অগম অগোচর মাঁহী।
কহৈ কবীর জো অম্বর জানৈ, তাহী সুঁ মেরা মন মানৈঁ।।
কবীরদাস সৃষ্টিকে অত্যন্ত রহস্যময় বলে মনে করতেন। এবং এই সৃষ্টির মূলে কোনো অদৃশ্য শক্তির ক্ষমতার আভাস তিনি দেখতে পেতেন। তিনি বলছেন, এই যে দৃশ্যমান বাস্তবে নামরূপী সংসার, এটি কোনো অদৃশ্য শক্তির দ্বারা পরিচালিত।
জাতি পাঁতি পুঁছে নহিঁ কোঈ।
হরি কা ভজৈ সো হরি কা হোঈ।।
কবীরদাস মানুষের জাতপাতে বিশ্বাস করতেন না। ভক্তিযুগে তিনি যে সম্প্রদায়ের কবি ছিলেন, সেই সম্প্রদায়ের মানুষ জাতপাতের বিচারে বিশ্বাস করতেন না। মানুষের মধ্যে কোনো রকমের বিভেদ মেনে নিতে পারতেন না। তাঁদের চোখে, যে ঈশ্বরের ভজনা করে, সে—ই ঈশ্বরের ভক্ত। তাই তিনি বলেছেন, জাতপাত (জাত পাঁতি) জানতে চেয়ো না (পুছে নহিঁ কোঈ)। যে হরি অর্থাৎ ঈশ্বরের ভজনা করে, সে—ই ঈশ্বরের আপনজন হয়ে যায় (হরি কা হোঈ)।
সুখিয়া সব সংসার হ্যায়, খায়ৈ অরূ সোবৈ।
দুখিয়া দাস কবীর হ্যায়, জাগৈ অরূ রোদৈ।।
এই সংসারে অর্থাৎ পৃথিবীতে তারাই সুখী (সুখিয়া), যারা সারা দিন খায় দায় আর ঘুমিয়ে বেড়ায়। আর দুঃখী কবীরদাসের মতো কিছু মানুষ, যারা সুখী মানুষের হাল দেখে জেগে জেগে কেবল কাঁদে (জাগৈ অর রোবৈ)। এই পৃথিবীতে কবীরদাসের মতো মানুষের সুখ নেই।
সভি রসায়ন হম করি, নহিঁ নাম সম কোয়।
রঞ্জক ঘটমে সঞ্চয়ে, সব তন কঞ্চন হোয়।।
কবীরদাস তাঁর এই দোঁহায় ঈশ্বরের মাহাত্ম্যই প্রচার করেছেন। তিনি বলেছেন, সব (সভী) ধরনের ওষুধপত্র (রসায়ন) ইত্যাদি আমি খেয়েছি (করি)। খেয়েও এমন কোনো ফল পাইনি, যে ফল পেয়েছি ঈশ্বরের (সম) নাম করে। তিনি আরও বলেছেন, এই ঈশ্বরের নামরূপী পদার্থ (রসায়ন) অতি সামান্য (রঞ্জক) পরিমাণেই শরীরে (ঘটমে) প্রবেশ করলে সে শরীর সোনার (কাঞ্চন) মতো মহা মূল্যবান হয়ে ওঠে (হোয়)। তাঁর বিচারে ঈশ্বরের নামের ওপর আর কিছু থাকতে পারে না।
পোথী পয়ি পয়ি জগ মুবা, পণ্ডিত ভয়া ন কোই।
একৈ আখর প্রেম কা, পয়ৈ মো পণ্ডিত হোই।।
এই দোঁহায় কবীরদাস প্রেমের জয়গান গেয়েছেন। তিনি বলেছেন সারা দুনিয়ার পুঁথি পাঠ (পোথী পয়ি পয়ি জগ মুবা) করলেই পণ্ডিত হওয়া যায় না। পণ্ডিত বা জ্ঞানী হতে গেলে একটা শব্দের সঙ্গে পরিচিত হলেই হয় (একৈ আখর) এবং সেই শব্দটি হল প্রেম। প্রেম অর্থাৎ ঈশ্বরপ্রেম, মানবপ্রেম। তাঁর চিন্তায় প্রেমের স্থান সবার ওপরে।
দুর্বলকো ন সতাইয়ে, জাকী মোটি হ্যায়
বিনা জীব কী স্বাস সে, লোহ ভসম হৈব জায়।।
তিনি বলেছেন, দুর্বল মানুষকে কষ্ট দেওয়া (সতাইয়ে) উচিত নয়। কারণ, দুর্বল মানুষের অভিশাপ অত্যন্ত শক্তিশালী (মোটি)। দুর্বল মানুষের অভিশাপ যে কতটা শক্তিশালী সেটা বোঝাতে গিয়ে তিনি বলছেন, কামারের হাপরের হাওয়া (বিনা জীব কী স্বাস সে) যেমন লোহা গলিয়ে দেয়, তেমনি দুর্বল অসহায় মানুষের ক্রোধও সব কিছু ভস্ম করে দেয়। তাই তিনি বলেছেন, দুর্বল মানুষের ওপর নিরর্থক অত্যাচার কোরো না।
দান দিয়ে ধন না ঘটে, নদী ন ঘটে নীর।
আপনি আঁখো দেখিয়ে, য়োঁ কথি কহৈ কবীর।।
এই দোঁহায় কবীরদাস মানুষকে উদার হতে বলেছেন। তিনি বলছেন, দান করলে ধন কমে যায় না (দান দিয়ে ধন না ঘটে)। প্রকৃতি থেকে নিজের এই কথার সমর্থনে উদাহরণ টেনে বলেছেন, যেমন নদীর জল নদী কারুকেই দিতে কার্পণ্য করে না। কার্পণ্য করে না বলেই নদীর জলেও ঘাটতি পড়ে না (নদী না ঘটে নীর)। শুধু প্রকৃতিতে কেন, নিজের চোখের দিকেও তাকিয়ে দেখুন (আপনি আঁখো দেখিয়ে), সেখানেও জলের কোনো অভাব নেই। তাই তাঁর উপদেশ, দান করো, দান করলে কোনো ক্ষতি হয় না।
সাধু অ্যায়সা চাহিয়ে, জৈসা সুপ সুভায়।
সার সার কো গহি রহৈ, যোথা দেহ উড়ায়।।
সৎ সাধু কেমন হওয়া উচিত, এই দোঁহায় কবীর সেই কথাই বলেছেন। সাধু মানুষ কেবল সার জিনিসই গ্রহণ করবেন। অসার অপ্রয়োজনীয়গুলো ত্যাগ করবেন।
পানি কেরা বুদবুদা, অস মানুষ কী জাতি।
দেখত হি ছিপি জায়েগা, জিঁউ তারা পরভাতি।।
কবীরদাস বলছেন, মানুষ জাতির জীবন জলের বুদবুদের মতো! বড়ো ক্ষণস্থায়ী এই জীবন। প্রভাতে (পরভাতি) আকাশের তারা যেমন একবার দেখা দিয়েই মিলিয়ে যায় (দেখত হি ছিপি জায়েগা), তেমন মানুষের ক্ষণস্থায়ী জীবনও উদয়ের সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে যায়।
নেহ নিভায়ে হি বনে, সোচে বনে ন আন।
তন দে, মন দে, সীস দে, নেহ ন দীজৈ জান।।
এই দোঁহায় সন্ত কবীর প্রেমের মাহাত্ম্য প্রচার করেছেন। তিনি বলেছেন, নেহ অর্থাৎ প্রেম দিলেই প্রেম পাওয়া যায়। প্রেম পাবার জন্য ভাবনার শিকার হলে চলবে না। দেহ, মন, মাথা সবই বিসর্জন দেওয়া যায়। কিন্তু প্রেমকে কখনো বিসর্জন দেওয়া যায় না।
মেরা মুঝে মে কুছ নহি, জো কুছ হ্যায় সো তোর।
তেরা তুঝকো সৌঁপতে, কেয়া লাগৈগা মোর।।
তাঁর কথা হল, আমার নিজের বলতে কিছু নেই। (মেরা মুঝে মে কুছ নহি)। আমার যা কিছু ‘সো তোর’ অর্থাৎ আপনারই। এখানে আপনি বলতে তিনি প্রভু ঈশ্বরকে বলছেন। আমার সবকিছু আপনার হওয়ায় আপনার কাছে আমার সবকিছু বিসর্জন দিতে আমার কখনো বাধবে না।
গুরু গোবিন্দ দোউ খড়ে, কাকে লাগৌঁ পাঁয়।
বলিহারী গুরু আপনে, জিন গোবিন্দ দিয়ো বতায়।।
কবীরদাসের মতে গুরু এবং গোবিন্দের (ভগবানের) মধ্যে গুরু শ্রেষ্ঠ। সাধারণ মানুষ দ্বন্দ্বে পড়ে যায়, গুরু এবং ভগবানের মধ্যে কাকে যে আগে প্রণাম করবে (কাকে লাগৌঁ পাঁয়)। মানুষের মনে এমন দ্বন্দ্ব হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু তাঁর কথা হল, মানুষের উচিত এই দ্বন্দ্ব ভুলে গুরুকেই শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করে তাঁর পদতলে মাথা নত করা। কারণ, গুরুই ঈশ্বরের সঙ্গে (গোবিন্দ দিয়ো বতায়) আমাদের মেলবন্ধন ঘটিয়ে দেন। সেজন্য তিনিই শ্রেষ্ঠ।
কবীর গুরুকী ভক্তি করুঁ তজি বিষয়া রস চৌজ।
বার বার নহিঁ পাহি হৈ, মানুষ জনম কী মৌজ।।
কবীর বলছেন, গুরুভক্তির মধ্যে যত আনন্দ, অত আনন্দ বিষয়—বাসনা পূর্তির মধ্যেও নেই। তিনি বলছেন, বিষয়—বাসনা ত্যাগ করে (বিষয়া রস চৌজ) আমি যদি নিরন্তর গুরুর ভজনা করে যাই, তাহলে আমি সুখ লাভ করব। এই আনন্দ সুখ থেকে আমি বঞ্চিত হতে চাই না। মনুষ্য জন্মের আনন্দ তো বার বার মেলে না।
তিনকা কবহুঁ ন নিদিয়ে, জো পাঁয়ন তর হোয়।
কবহুঁ উড়ি আঁখিন পরৈ, পির ঘনেরি হোয়।।
কোন ক্ষুদ্র জিনিসকেই অবহেলা করা উচিত নয়। তিনকা অর্থাৎ খড়কুটো বলে পায়ের নীচে (পাঁয়ন তর) চাপা দিয়ে অবহেলা ভরে চলে যাওয়া উচিত নয়। যে—কোনো সময় উড়ে চোখের ওপর পড়ে খুবই কষ্টের (পির ঘনেরি) কারণ ঘটাতে পারে। এখানে খড়কুটো উদাহরণ মাত্র। আসলে তিনি মানুষকেই বোঝাতে চেয়েছেন। বলতে চেয়েছেন যে, কোনো মানুষকেই তুচ্ছ জ্ঞান করা উচিত নয়।
দুখ মে সুমিরণ সব করেঁ, সুখ মেঁ করৈ ন কোয়।
জো সুখ মে সুমিরণ করৈ, তো দুখ কাহে হোয়।।
দুঃখের সময়ে সবাই ঈশ্বরের কথা স্মরণ করে। বার বার ঈশ্বরকে ডাকে। তাঁকে পাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। কিন্তু সুখের সময়ে তাদের মধ্যে এ ব্যাকুলতা দেখা যায় না। সুখের সময়ে তারা ঈশ্বরের কথা ভাবে না। ঈশ্বরকে আমলই দেয় না। তা এমন মানুষ ঈশ্বরকে স্মরণ করে কী পেতে পারে? কবীর বলছেন তারাই ঈশ্বরকে পায়, যারা সুখের সময়ে, আনন্দের সময়েও ঈশ্বরকে স্মরণ করে। তাঁকে কাছে পাবার জন্য আকুল হয়।
ইহ মন সকতী ইহ মন সবি।
ইহ মন পাঁচ তত্ত্বোঁ কা জীব।।
ইহ মন জে উনমন রহৈ।
তো তীন লোক কী মাতা কহৈ।।
নাথপন্থীদের ভাষা ও প্রকাশভঙ্গিও কবীরদাসকে প্রভাবিত করেছিল। এই প্রভাবের প্রমাণ বহন করে উপরোক্ত কাব্য অংশটি। একালে বিশেষজ্ঞের মতে এই পদটির রচয়িতা কবীরদাস আবার একশ্রেণির বিশেষজ্ঞের মতে এই পদটির রচয়িতা গোরখনাথ। নাথপন্থীরা শিবের উপাসক ছিলেন। তাঁরা শিবকেই প্রধান বলে জানতেন। শরীর, মন, শক্তি সবকিছুই শিবের দান বলে মনে করতেন।
পূজা করূঁ ন নমাজ গুজারূঁ।
এক নিরাকার হিরদয় নমসকারাঁ।।
কবীরের ব্রহ্ম প্রধানত নিরাকার। তবু মাঝে মাঝে তাঁর ব্রহ্ম আকার রূপে তাঁর সামনে উপস্থিত হয়েছেন। তবে প্রধানত অব্যক্ত রূপে তাঁর ব্রহ্ম সামনে উপস্থিত হওয়ায় কবীর তাঁকে মনে মনে নমস্কার করেন। তিনি স্থির করে উঠতে পারেন না যে, তাঁর দেবতা হিন্দু দেবদেবীর মতো, না কী মুসলমানদের খোদার মতো! তার চেয়ে তিনি এক নিরাকারকে মনে মনে বন্দনা করতে চান, নমস্কার করতে চান। মনে করেন সেটা করলেই তাঁর উচিত কাজ করা হবে।
পৃথ্বী কা গুণ পানি সীখা, পানি জেদ মিলাব হিঁগে।
সেজ পবন মিলি পবন সবদ মিলি, সহজ সমাধি লগাবহিঁগৈ।।
কবীরদাস ব্রহ্মকে এই সৃষ্টির সূত্র বলে মনে করতেন। সাংখ্যরা বলতেন সৃষ্টির মূল কারণ সত্য ত্রিগুণাত্মক প্রকৃতি। এই প্রকৃতির বিকাশের সঙ্গেই সৃষ্টির বিকাশের স্বার্থ জড়িয়ে। কবীরের ভাবনায় যে এই চিন্তা প্রভাব ফেলেছিল, তার প্রমাণ বহন করে এই অংশ।
মায়া দুঈ ভাঁতি, দেখী ঠোক বজায়।
এক গহাবৈ রাম পৈ, এক নরক লৈ জায়।।
কবীরদাস মায়াকে দুই রূপে দেখেছেন। তাঁর মতে, মায়ার একটি রূপ আত্মাকে ব্রহ্মের সঙ্গে মিলিত করে, আর—একটি রূপ মানুষকে ব্রহ্মের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়।
আগম বেলি অকাম ফল, অন ব্যাবর কা দূর।
সসা সীঁঈ কী ধনু হড়ী, রমৈ ঝাঁজ কা পূত।।
এই অংশে কবীরদাস বলতে চেয়েছেন যে মায়ার রূপ বিচিত্র। এই মায়া সৎ এবং অসৎ। তার এই দুই রূপ মানুষকে ধর্ম এবং অধর্ম এই দুইয়ের মধ্যে লীন করে রাখে। মায়ার রূপ কাল্পনিক হওয়ার কারণে অনির্বচনীয়!
মায়া তজুঁ তজী নহিঁ জাই।
ফির ফির মায়া মোয় লিপটাই।
মায়া আদর মায়া মান, মায়া নহী তঁহা ব্রহ্ম গিয়ান।
মায়া রস মায়া কর জান, মায়া কারনি তজৈ পরান।।
মায়া জপ—তপ মায়া জোগ, মায়া বাঁধী সহ বীলোগ।
মায়া জল—থল, মায়া অকাস, মায়া ব্যাপী রহী চহুঁ পাস।।
মায়া মাতা মায়া পিতা অস্তরী সুতা।
মায়া মারি করৈ বৌহার, কহৈ কবীরা মেরে রাম আধার।।
এই পদের মাধ্যমে কবীরদাস বোঝাতে চাইছেন যে, মায়া খুবই খারাপ। মায়ার বাঁধনে বাঁধা পড়লে মুক্তি নেই। তিনি বলছেন, মায়াকে ত্যাগ করলেও মায়া তোমাকে ত্যাগ করবে না। মায়া ঠিক ফিরে ফিরে এসে তোমাকে জড়িয়ে ধরবে। এই মায়ার রূপ বহু এবং এর বিস্তার সর্বত্র। বাবা, মা, স্ত্রী, পুত্র এরা সবাই মায়ার এক—একটা রূপ। তাই তিনি বলছেন, এসব ত্যাগ করে রাম নাম ভজনা করো।
মায়া মহা ঠগিনি হম জানী
তিরগুণ ফাঁস লিয়ে কর জৌলে বোলে মধুরী বাণী।।
কবীরদাস বলছেন, মায়া দূরাচারী নারীর মতো। সমাজে মোহিনী নারী যেমন পুরুষকে মোহপাশে আবদ্ধ করে তাকে পথভ্রষ্ট করে, তেমনি ভাবে পথভ্রষ্ট করে মায়া। সুতরাং মায়ার বাঁধনে যাতে না পড়তে হয়, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
করী সূতা কেয়া করৈ, গুণ গোবিন্দ কে গাই।
তেরে সিরপর জম খড়ী, খরচ কদৈকা খায়।।
এই দোঁহায় কবীর সাংসারিক মোহ মায়ায় আবদ্ধ মানুষদের সতর্ক করে দিচ্ছেন। তিনি বলছেন, সূতা কেটে কী হবে, তার চেয়ে গুরুর গান গাও। গুরুর গান গাইলে জীবনে অনেক আনন্দ পাবে।
গোধন, গজধন, বাজিধন, ঔর রুনধন, খাল।
জব আবৈ সন্তোষ ধন, সব ধন ধূরি সমান।।
তিনি বলেছেন, মনের শান্তির মতো শ্রেষ্ঠ সম্পদ আর কিছু নেই (জব আবৈ সন্তোষ ধন)। মানুষ মানবিক সম্পত্তির অধিকারী হয়। সেইসব সম্পত্তির মধ্যে ধনরত্ন (রতন ধন), গোরু, হাতি, ঘোড়া, (গোধন, গজধন, বাজিধন) ইত্যাদি সবই পড়ে। কিন্তু মানুষ একবার মানসিক প্রসন্নতার অধিকারী হলে অন্য যাবতীয় সম্পদ ধুলোর মতো (ধূরি সমান) মাটিতে মিশে যায়। সেসব সম্পদের আর কোনো মূল্য থাকে না।
সাঁঈ ইতনা দীজিয়ে, জা মে কুটুম্ব সমায়।
ম্যায় ভি ভূখা না রহুঁ, সাধু ন ভুখা জায়।।
প্রভুর কাছে কবীরদাসের আবেদন, হে প্রভু আমার এবং আত্মীয় পরিজনের (জা মে কুটুম্ব সমায়) ভরণ পোষণের উপযুক্ত আহার বিহারের ব্যবস্থা করে দাও। আমি নিজে অভুক্ত থাকতে চাই না (ম্যায় ভী ভুখা ন রহুঁ সাধু ন ভূখা জায়), চাই না, কোনো সজ্জন ব্যক্তিও অনাহারে থাকুন।
কবীর গর্ব ন কিজিয়ে, কাল গহে কর কেস।
না জানৈ কিত মারিহৈ, কেয়া ঘর কেয়া পরদেস।।
কবীরদাস বলছেন, গর্ব কোরো না। গর্ব করা খুব খারাপ। একবার মৃত্যুর কবলে (কাল গহে) পড়লে দুঃখের আর শেষ থাকবে না। কীভাবে যে মৃত্যু তোমাকে শেষ করে (মারি হৈ) দেবে, তা তুমি জানো না। তখন কোথাও গিয়েও কোনোভাবে নিস্তার পাবে না। গর্ব মানুষকে শেষ করে দেয়। তা মৃত্যুর থেকেও ভয়ংকর।
অ্যায়সা কোঈ না মিলা, হমকো দে উপদেশ।
ভবসাগর মে বুড়তা কর গহি কাড়ৈ কেস।।
এই দোঁহায় কবীরদাস বলছেন, হে প্রভু আজ পর্যন্ত আমাকে উপদেশ দেবার মতো কারোকে পেলাম না। চিন্তার সাগরে (ভব সাগর) ডুব দিয়ে শুধু আমার ক্লেশ (কেস) বাড়ল।
প্রেম ছিপায়া না ছিপৈ, জা ঘট পরঘট হোয়।
জো পৈ মুখ বোলৈ নহীঁ, নৈন দেত হ্যায় রোয়।।
প্রেম এমনই জিনিস যে, লুকোতে চাইলেও লুকিয়ে রাখা যায় না (ছিপায়া না ছিপৈ)। এই প্রেম হৃদয়ের মাধ্যমে (ঘট পরঘট হোয়) প্রকাশ হয়ে পড়ে। যদিও (জো পৈ) মানুষ লোকলজ্জার ভয়ে মুখে প্রেম প্রকাশ করে না তবু তার দুটো চোখ অশ্রুজলের মাধ্যমে (নৈন দেত হ্যায় রোয়) তা প্রকাশ করে দেয়। এখানে এই প্রেম বলতে তিনি ঈশ্বর প্রেমের কথা বলেছেন।
সব ধরতি কাগজ করুঁ, লেখনি সব বনরায়।
সাত সমুদ্র কী মসি করুঁ, গুরু গুণ লিখা ন জায়।।
গুরু কেন শ্রেষ্ঠ, গুরু কেন মানুষের একমাত্র আরাধ্য, কবি কবীরদাস তাঁর এই দোঁহায় সে কথাই বলেছেন। তিনি বলেছেন, গুরুর গুণের কথা লিখে শেষ করা যায় না। যারা দুনিয়াটাকে (সব ধরতি) যদি কাগজ করা হয়, এবং বন—জঙ্গলকে যদি কলম করা হয় ও সেই সঙ্গে সাত সমুদ্রের জলকে যদি কালি (সাত সমুদ্র কী মসি করুঁ) রূপ ব্যবহার করে লিখতে বসা হয়, তাহলেও গুরুর গুণের কথা সম্পূর্ণ হবে না।
কাল করৈ সো আজ কর, আজ করৈ সো অবব।
পল মেঁ পরল হোয়গি, বহুরি করৈগা কব।।
অলস হয়ো না—এই দোঁহায় কবীরদাস মানুষের উদ্দেশে এই উপদেশ প্রদান করেন। তিনি বলেন, যে কাজটা কাল করব বলে ঠিক কর, সে কাজটা আজই করো। আর যে কাজটা আজ করব বলে ঠিক করেছ, সেটা এখনই (অব্ব) করে ফেল। যে—কোনো মুহূর্তে প্রলয় (পরল) ঘটে যেতে পারে। তাই যদি হয়, তাহলে কাজ করবে কখন। সুতরাং আজ করবো, কাল করবো বলে কাজ ফেলে রেখো না।
কবীর গর্ব ন কিজিয়ে, কল গহে কর কেস।
না জানে কিত মারিহৈ, কেয়া ঘর কেয়া পরদেশ।।
কবীরদাস বলছেন, এ জীবনে গর্ব কোরো না। গর্ব বড়ো বিষম বস্তু। (কল গহে) অর্থাৎ একবার মৃত্যুর খপ্পরে পড়লে আর বাঁচার রাস্তা নেই। তখন কোথায় দেশ কোথায় বিদেশ, সব সমান। তাই কোনো কিছুর জন্য গর্ব না করে সোজা পথে জীবন যাপন করে যাও।
জাতি না পুছো সাধকী, পুছ লিজিয়ে জ্ঞান।
মোল করো তরবার কা, পড়া রহন দো ম্যান।।
যিনি সাধক মানুষ, তাঁর জাত জানার চেষ্টা কোরো না। জাত—পাতের দ্বন্দ্বে দীর্ণ ভারতীয় সমাজের উদ্দেশে তাঁর আবেদন, সঠিক মানুষদের জাত জানতে চেয়ো না। মানুষের পরিচয় জাতে নয়। তাঁর পরিচয় জ্ঞানে, কর্মে। তা সে মানুষ সাধকই হোন, আর সাধারণ গৃহস্থ। তিনি তাই বিশেষ করে সাধকদের উদাহরণ দিয়ে বলছেন, তাঁদের জানতে না চেয়ে, তাঁদের জ্ঞান জানার চেষ্টা করো। যেমন তরোয়ালের খাপের থেকে তরোয়াল মূল্যবান, তেমনি মানুষের জাতের থেকে মানুষের জ্ঞান বেশি মূল্যবান। অস্ত্রের ধারটাই আসল, খাপটা নয়।
পণ্ডিত জন মাতে পঢ়ি পুরাণ, জ্যোগী মাতে জোগ ধ্যান।
সন্ন্যাসী মাতে অহমমেব, তপসী মাতে তপ কে ফের।।
সমকালীন পরিস্থিতি দেখে কবীর বুঝতে পেরেছিলেন মানুষ মাত্রেই এই ধর্মচারীদের চক্করে পড়ে ধর্মের স্বাভাবিক রূপকে ভুলে গেছে। তাই লোক— কল্যাণের জন্য লোক, সমাজ ও ধর্মের মধ্যে পরিব্যাপ্ত মিথ্যা আড়ম্বরের অন্যতম প্রচারক হলেন পণ্ডিত ও মোল্লা। তাই তিনি কারোকে মানতেন না।
পকরি জীউ আন্যা দেহ বিনাসী, মাটী কো বিসমিল কিয়া।
জ্যোতি সরূপ অনাহত লাগৌ, কহ হলালু কিউঁ কিয়া।।
কবীর কোথাও কোথাও আত্মাকে অমর বলে বর্ণনা করেছেন, আবার কোথাও ব্রহ্মের সমান আনন্দ স্বরূপ। ব্রহ্ম আনন্দ স্বরূপ। তাই আত্মাও আনন্দ স্বরূপ। সেই সঙ্গে আত্মা ব্রহ্মের ন্যায় অনাদি ও সনাতন। তাই এমন আত্মাকে খুন করা যায় না। সেজন্য মুসলমানদের জীব হত্যার বিরোধিতা করে তিনি এই পদ লেখেন।
খণ্ডিত মূল বিনাস, কহৌ কিম বিগতহ কীজৈ।
জ্যিউ জল যে প্রতিবিম্ব, তিউঁ সকল রামহিঁ জানীজৈদ।।
কবীর বেদান্ত মতকে অনুসরণ করেছিলেন। তার আর—এক প্রমাণ হল প্রতিবিম্ববাদ অদ্বৈতবাদেরই সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সৃষ্টি ব্রহ্মেরই প্রতিবিম্ব এবং বিম্ব সত্য নয়।
ভাব ভগতি বিস্বাস বিন, কটৈ ন সমৈ মূল।
কবীরদাস মনে করতেন ভক্তি ছাড়া মায়াজনিত সংশয়ের দুঃখ দূর হয় না। এবং ভক্তি ছাড়া কোনো প্রকার মুক্তি নেই। তাঁর এই দোঁহায় সেই ভাবনাই প্রকাশ পেয়েছে।
জিস মরনৈঁ থৈঁ জ্যা ডরৈ, সো মেরে আনন্দ।
কব মরি হুঁ কব দেখি হুঁ, পূরণ পরমানন্দ।।
প্রিয় প্রেম বিরহে মানুষের মরণের অবস্থা হলেও সে তো মরতে পারে না। কারণ এই অবস্থায় মৃত্যু তো অবধারিত নয়। বিরহ বেদনায় আকুল হয়েও কেবল মৃত্যু কামনা করে। এই দোঁহায় কবীরের নিজের সেরকম মনোদশাই প্রকাশ লাভ করেছে।
বামরি সুখ নাঁ রৈনি সুখ, না সুখ, না সুখ মুগিনে মাঁহি।
কবীর বিছুটয়া রাম সুঁ, নাঁ সুখ ধূপ ন ছাঁহি।।
এই দোঁহায় রামের প্রতি কবীরের প্রেম বিরহ প্রকাশ পেয়েছে। শ্রীকৃষ্ণের বাঁশির শব্দ শুনে রাধা যেমন উতলা হয়ে উঠতেন, তেমনি রামবিহীন কবীরের জীবন অত্যন্ত অস্থির হয়ে উঠেছে। তিনি বলছেন, রামের অভাবে তাঁর মোটেই শান্তি নেই।
ভগতি নারদী মগন সরীরাঁ,
ইনি বিধি ভব তিরি কহৈ কবীরা।
কবীরদাস তাঁর রচনায় অনেক স্থানে নারদীয়া ভক্তির উল্লেখ করেছেন। এটি তার অন্যতম। নারদীয়া ভক্তিতে ভাব সাধনের দ্বারাই ভাব সাধন করা হয়েছে। প্রেম এবং আসক্তি দুটোই এক, নিরাকার।
কবীর নৌবতি আপনি, দিন দাস লেহু বাজাই।
এ পুর পাটন এ গলি, বহুরি ন দেখে আই।।
লৌকিক আচরণ হিতকারী মনে করে কবীরদাস এই দোঁহায় লৌকিক আচরণের উপকারিতার কথা বলছেন। তিনি বলছেন, রাম নামের উপাসনা ভিন্ন লৌকিক জীবনে শান্তি নেই।
মাঁহি উদাসী মাখৌ চাহৌ, চিতবন রৈনি বিহাই
সেজ হমারী স্যংঘ ভঙ্গ হ্যায়, জব সোঁউ তব খাই।।
সাধকের যখন উদ্বেগের অবস্থা হয়, তখন তার কিছুই ভালো লাগে না। এই দোঁহায় সেই কথাই বলা হয়েছে। তিনি বলেন, উদ্বেগের অবস্থায় আনন্দের বিষয়ও তাঁর কাছে উদ্বেগের বস্তু হয়ে ওঠে।
মিঠি মিঠি মায়া, তজী নহিঁ জাঈ।
অগ্যানী পুরুষ কো, ভোলি খাঈ।
তিনি বলছেন, এই মায়ার রূপ বড়ো মধুর। এই মধুর রূপের মোহে পড়লে ছেড়ে আসা সম্ভব নয়। অজ্ঞ (অগ্যানী) মানুষকে ছলে বলে ভুলিয়ে মায়া শেষ করে ছাড়ে। তাই কবীরদাস বলছেন, মায়ার সংস্পর্শে যাওয়া উচিত নয়।
নট বহুরূপ খেলৈ সব জানৈ, কলা করৈ গুণ ঠাকুর মানে।
আ খেলৈ সবহী ঘট মাঁহী, দুসরা কে লেখে কছু নাঁহী।
ডাকে গুণ সোঈ পৈ জানৈ, ঔর কো জানৈ পারঅয়ানে।।
তিনি বলছেন, মায়াকে ঘিরে যা কিছু সবই মিথ্যা। অভিনেতার অভিনয়ের রহস্যের কিছুই যেমন জানা যায় না, তেমনই মায়ার সব কিছুই রহস্যময়, অনির্বচনীয়, মায়ার রহস্য কেবল ব্রহ্মই জানেন। আর কেউ নয়।
জ্যো দরপন দেখ্যা চাহিয়ে, তো দরপন মাজত রহিয়ে।
জব দরপন লাগৈ কোঈ, তব দরসন কিয়া ন জাঈ।।
তিনি বলছেন মায়া অজ্ঞানতার আর—এক রূপ। আয়নার ওপর ধুলো ময়লা পড়লে যেমন আয়নায় মুখ দেখা যায় না, তেমনি আত্মার ওপর মায়ারূপী পর্দা পড়লে পরমাত্মা দর্শন অর্থাৎ আত্মজ্ঞান লাভ হয় না। তাই তিনি ওই কথা বললেন।
গোরখ-রাম একী নহিঁ উহবাঁ, ন বঁহা বেদ বিচারা।
হরিহর ব্রহ্ম ন শিব-শক্তি, না বহ তিরথ-আচারা।।
মায় বাগ গুরু জাকে নাঁহী, সো থৌঁ দূজা কী অকেলা।
কহহিঁ কবীর জ্যো অবকী বুঝৈ, সোঈ গুরূ হম চেলা।।
নাথপন্থীদের আবার অবধূতও বলা হত। অবধূতদের অন্তিম লক্ষ্য হল যুক্তি। তাঁরা দ্বৈত—অদ্বৈতবাদের দ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত। কবীরদাসকেও এই ভাবনা প্রভাবিত করেছিল। তিনিও এই ভাবনা থেকে মুক্ত ছিলেন। তাঁর কবিতায় সেটাই প্রকাশ পেয়েছে।
কবীর তাঁর এই পদ্যে নিরঞ্জনকে মহা ঠগ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর চোখে নিরঞ্জনেরা খুবই ভ্রষ্ট। কবীরের এমন ধারণা হবার পেছনে কারণ এটাই যে, তাঁর আমলে এসে নিরঞ্জনী শব্দের ব্যবহার করা হয়েছিল। অনেকের মতে নিরঞ্জন—মত নাথপন্থীদেরই একটি উপ—সম্প্রদায়ের। নিরঞ্জনকে পাবার জন্য শূন্যের ধ্যান প্রয়োজন। যেটা হঠযোগেরই নামান্তর। তিনি সাধকের নিরঞ্জনদের মিথ্যাচার থেকে বাঁচাবার জন্য সতর্ক করে দিয়ে উপরোক্ত পদ লেখেন।
সেখ সবেরী বাহিরা, কেয়া হজ কাবৈ জাঈ।
জাকা দিল সাবু নহীঁ, তাকৌ কহাঁ খুদায়।।
কবীরদাস এই কাব্যখণ্ডে মুসলমানদের বাহ্য আড়ম্বরের নিন্দা করেছেন। তিনি মুসলমান ধর্মের ত্রুটির দিকগুলোর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলছেন, মুসলমান মানুষগণ যেন এগুলি সম্পর্কে অবহিত থাকেন। তিনি বলেন, মানুষ একই সঙ্গে হজ করে, কাবা গমন করে, সে—ই আবার কী করে গো—হত্যা করে তা তাঁর বোধগম্য হয় না।
অবধূ গগন মণ্ডল কর কীজৈ।
অমৃত ঝরৈ সদা সুখ উপজে, বংক নালি রস পীজৈ।।
মূল বাঁধি সর-গগন-সমানা, সুষমন যৌঁতন লাগী।
কাম-ক্রোধ দোর ভয়া পলীতা, তহাঁ জোগঁনী জী।।
মনবা জাই করীবে বৈঠা, মগন ভয়া রমি লাগা।
কহৈ কবীর জিয় সৎসা নাহীঁ, সবদ অনাহদ বাগা।।
সন্ত কবীরের উপর হঠযোগ সাধনার প্রভাব পড়েছিল। এই পদ প্রমাণ বহন করে। তিনি বলছেন হঠযোগের মাধ্যমে সাধক আত্মাকে শূন্যে এবং শূন্যকে আত্মার মধ্যে মিলিয়ে দেয়। এই সময় তার অন্তর, বাহির দুটিই শূন্য হয়ে ওঠে। আসলে কিন্তু তার এই শূন্যতা অন্তরে পূর্ণতারই নামান্তর এবং বাইরেও সে পূর্ণ হয়ে ওঠে।
কহৌ ভইয়া অম্বর কাহূঁ লাগা। কোঈ জানেগা জানন হার সভাগা।
অম্বর দীসৈ কেতা তারা, কৌন চতুর অ্যায়সা চিতহন হারা।
স্বাভাবিক মনুষ্য—প্রবৃত্তি অনুযায়ী কবীরের মনেও সৃষ্টিকে দেখে তার রহস্য জানার ইচ্ছা হয়েছিল। সেই বাসনাই এই অংশে প্রকাশিত হয়েছে। এখানে তিনি সেই কৌতূহলই প্রকাশ করেছেন।
কৈসে বহু কঞ্চন কে ভূষণ, য়ে কহি গালি তব গিগেঁ।
অ্যায়সে হমলোক বেদ কে বিছুরে, সুন্নহি মাঁহি সমাহিঁগে।।
কবীরদাস বেদান্তের চিন্তাভাবনা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। বেদান্তের একটি অতি জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত বিবর্তনবাদ দ্বারাও তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন। এই বিবর্তনবাদে বলা হয় যে মূল রূপে কোনো প্রকার পরিবর্তন ছাড়াই বাহ্য স্বরূপ পরিবর্তন ঘটানো হয়। উপরোক্ত লাইন দুটি তারই প্রমাণ বহন করে।
মায়া কী মল জহ জাল্যা, জনক কামিনী লাগি।
কহুঁ কৌ বিধি রাখিয়ে, রূঈ লপেটী তাগি।।
কবীরদাস মায়ার বন্ধন মুক্ত হবার জন্য মায়ার বিষমতা সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করে দিচ্ছেন। তিনি বলছেন, আগুন যেমন একবার তুলোকে জড়িয়ে ধরলে আর ছাড়তে চায় না, তেমনই মায়াও যাকে একবার জড়িয়ে ধরে তাকে সহজে ছাড়ে না। তাই তিনি মায়ার প্রভাব থেকে দূরে থাকতে বলছেন।
বাজীগর ডঙ্ক বজাঈ, সব খলক তাসে আঈ।
বাজীগর স্বাগুঁ তকেলা, অপনে রঙ্গঁ রমৈ অকেলা।।
এই অংশে তিনি বলতে চাইছেন, বাজিগর ডঙ্কা বাজিয়ে তার খেলা দেখায়। এই খেলা দেখার জন্য সারা পৃথিবীর মানুষ একজোট হয়। তারপর একসময় আবার জাদুকর মানুষের চোখের সামনে থেকে খেলা সরিয়ে নেয়। আবার নিজের রঙে নিজেকে রাঙিয়ে নেয়।
কবীর মায়া পাপিনী হরি মূঁ করৈ হরাম।
মুখ কড়িয়ালী কুমতি কী, কহন ন দেঈ রাম।।
কবীরদাস বলছেন মায়া পাপিনী। সে মানুষের জিভকে ব্রহ্মের সঙ্গে মিলিত হবার সুযোগ দিতে রাজি নয়। কারণ, ব্রহ্মের সঙ্গে জিভের মিলন ঘটে গেলে কেউ মায়ার নাম করবে না। তাই সে সব সময় জিভ ও ব্রহ্মের মিলনে বাধা সৃষ্টি করে।
দুই দুই লোচন দেখা, হম হরি বিনু অউ রূপ দেখা।
নৈন রহে রঁগুলাই, সাব বেগম কহনু ন জাঈ।।
কবীরদাস বলছেন, এই যে রহস্যময় পৃথিবী, আমি এই পৃথিবীকে আমার দু—চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টা করেছি। কিন্তু হরি ছাড়া আর কিছুই আমি দেখতে পাইনি। আমার দুটি চোখ তাঁর প্রেমে মত্ত। এ ছাড়া কিছু আমার দ্বারা বলা সম্ভব নয়।
মায়া তজুঁ তজী নহিঁ জাই।
ফির ফির মায়া মোয় লিপটাই।।
মায়া আদর মায়া মান, মায়া নহী তঁহা ব্রহ্ম গিয়ান।
মায়া রস মায়া করজান, মায়া কারনি তজৈ পরান।।
মায়া জপ—তপ মায়া জ্যোগ, মায়া বাঁধী সহ বী লোগ।
মায়া জল—থল, মায়া অকাস, মায়া ব্যাপী রহী চহুঁ পাম।।
মায়া মাতা মায়া পিতা অস্তরী সুতা।
মায়া মারি করৈ বৌহায়, কহৈ কবীরা মেরে রাম আধার।।
এই পদের মাধ্যমে কবীরদাস বোঝাতে চাইছেন যে, মায়া খুবই খারাপ। মায়ার বাঁধনে বাঁধা পড়লে মুক্তি নেই। তিনি বলছেন, মায়াকে ত্যাগ করলেও মায়া তোমাকে ত্যাগ করবে না। মায়া ঠিক ফিরে ফিরে এসে তোমাকে জড়িয়ে ধরবে। এই মায়ার রূপ বহু এবং এর বিস্তার সর্বত্র। বাবা, মা, স্ত্রী, পুত্র এরা সবাই মায়ার এক—একটা রূপ। তাই তিনি বলছেন, এসব ত্যাগ করে রাম নাম ভজনা করো।
আঁষড়িয়া ঝাঁই পড়ী, পনথ নিহারি নিহারি।
জীভড়িয়াঁ ছাল্যা পড়য়া রাম পুকারি-পুকারি।।
কবীরদাস তাঁর এই দোঁহায় অত্যন্ত বিরহ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলছেন, প্রভু শ্রীরামের বিরহে তিনি ব্যাকুল। প্রভুর পথ চেয়ে তাঁর চোখে ছানি পড়ে গেল। এবং রামের নাম উচ্চারণ করে করে তাঁর জিভ ছড়ে গেল। তবু তিনি রাম নাম ছাড়তে আগ্রহী নন। কারণ, তিনি যে রামের প্রেমে ব্যাকুল।
ইয়হু অ্যায়সা সংসার হ্যায়, জৈসা সেঁবল ফুল।
দিনদসকে বৌহার কৌ, ঝুবৈ রংগন ভুল।।
কবীরদাস এই দোঁহায় আবার সেই সংসারের অসারতার কথাই বলেছেন। তিনি বলছেন, এই সংসার শিমূল (সেঁবল) ফুলের মতো। শিমূলফুলের যেমন রূপ আছে, সংসারেও তেমনি রূপ আছে, আকর্ষণ, চটক আছে, কিন্তু মধুহীন শিমূলফুলের মতো সংসারের মধ্যে কোনো রস নেই। সুতরাং সংসারের মোহের মধ্যে পোড়ো না।
চলতে কত টেয়ে টেয়ে।
অস্থি চর্ম বিষ্ঠা কে মূদেঁ দূর গন্ধাই কে বেয়ে।।
রাম ন জপহুঁ কৌন ভ্রম ভুলে তুমতে কাল ন দূরে।
অনেক জতন কর ইহ তন রাখহু রহৈ অবস্থা দূরে।।
আপন কিয়া কছু ন হোবৈ কেয়া কো করৈ পরানী।
জানি ভলাবৈ মতি গুরু ভেঁটো একৌ নাম বখানী।।
বলুবা কে ঘরুআ মে বসতে ফুলবত দেহ অয়ানে।
কহু কবীর জিহ রাম ন চেত্যো বুড়ে বহুত সয়ানে।।
কবীরদাস মনে করতেন ভক্তিই শ্রেষ্ঠ। ভক্তি ভিন্ন হরি দর্শন সম্ভব নয়। যারা রাম নাম জপ করে না, তারা সোজা পথে জীবন অতিবাহিত করতে পারে না। তাদের ভালো হয় না। বহু জ্ঞানী মানুষ রামের বন্দনা না করায় বিপদে পড়ে নিজের জীবন নষ্ট করে ফেলে। তাই তিনি বলেন ভাবভক্তিই শ্রেষ্ঠ।
বিরহ ভুবংগম তন বসৈ, মন্দ্রন লাগৈ কোয়।
রাম বিয়োগী না জিয়ৈ, তো বৌরা হোয়।।
কবীরদাস বলছেন, বিরহ যখন ভয়ংকর রূপ ধারণ করে তখন এমনই হয়। বিরহ বিষধর সাপের কামড়ের মতো। বিষধর সাপ একবার ছোবল মারলে যেমন সে বিষ কোনো মন্ত্রবলে নামানো যায় না, তেমনি যে একবার রাম বিরহে পাগল হয়ে ওঠে, কোনোভাবেই তার পাগলামি দমন করা যায় না।
নৈনা অন্তুরি—আব তুঁ, জিঁউ হী নৈন ঋপেঊ।
না হোঁ দেখৌ ঔর কূঁ, ন তুঝ দেখন দেউঁ।।
ভগবানের প্রতি আন্তরিক প্রেম থেকে কবীরদাস এই কথা বলছেন। তিনি বলছেন, তাঁর মন চায় ঈশ্বরকে তাঁর দু—চোখের মধ্যে বন্ধ করে নিরন্তর তাঁকেই দেখেন, যাতে কবীরকে আর কারোকে দেখতে না হয় এবং অন্য কেউও ঈশ্বরকে দেখতে না পায়।
সো জ্যোগী জাকে মন মে মুদ্রা।
রাত দিবস ন করহ নিদ্রা।।
মন মে আসন মন মে রহনা, মন কা জপ তপ মনমু কহনা।
মন মে ঋরা, মন মে সীংগী, অনহদ মাদ বজাবৈঁ রঁগী।
পঞ্চ পরজারি ভসন কর ঝুকা, কহৈ কবীর সো লহসৈ লূকা।।
কবীর বর্ণিত যোগীদের অবধূতের স্বরূপের বর্ণনা নাথপন্থীদের যোগীদের স্বরূপের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়। যোগীরা কুণ্ডল, কিঙ্গরী, মেঘলা, সীঙ্গী, পৈতে, ঠঁধারী, রুদ্রাক্ষ, আন্ধারী, খপ্পর ও ঝোলা নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। কবীর যোগীদের এই সমস্ত উপকরণের বর্ণনা দিয়েছেন। কিন্তু তিনি মনে করেন প্রকৃত যোগী এই সমস্ত বাহ্য আড়ম্বর গ্রহণ না করে, এগুলোকে মনের মধ্যে স্থান দেয়।
ভারি কহুঁ তো বহু ডরাউঁ, হল্কা কহুঁ তো ঝুঠ।
ম্যাঁয় কেয়া জানো রাম, কৌন নয়নোঁ কবহুঁ নাদীবৈ।।
এই দোঁহায় কবীরদাস শ্রীরামের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন। তিনি বলছেন, শ্রীরামকে ভারি বলতে তাঁর খুবই ভয় করে (বহু ডরাউঁ)। আবার তাঁকে হাল্কা বললেও মিথ্যে বলা হয়। আসলে শ্রীরাম যে কেমন, তা তিনি কী করে বলবেন (ম্যাঁয় কেয়া জানো) কারণ, তিনি তো কোনোদিন শ্রীরামকে নিজের চোখে দেখেননি।
কবীরের দোঁহাবলি
হিন্দি আধ্যাত্মিক সাহিত্যের উজ্জ্বল নিদর্শন
মহাত্মা কবীর সেই অর্থে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভ করেননি, কিন্তু তাঁর লেখা দোঁহাবলির মধ্যে যে দার্শনিক অভিজ্ঞান লুকিয়ে আছে তা প্রতি মুহূর্তে আমাদের অবাক করে দেয়। কবীর সুফী ধর্মবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। এই ধর্মবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল সর্বধর্ম সমন্বয়ের মতবাদকে প্রতিষ্ঠা করা। মধ্যযুগীয় ভারতবর্ষের অনেক বিশিষ্ট সাধক সুফী মতবাদকে অনুসরণ করে জীবনব্যাপী সাধনা করে গেছেন। তাঁরা চেয়েছিলেন ভারতবর্ষের বুকে হিন্দু এবং মুসলমান সংস্কৃতির মিলন। বাস্তববাদী মানুষ হিসাবে তাঁরা অনুভব করতে পেরেছিলেন যে ভারতের মতো একটি উপমহাদেশে সর্বধর্ম সমন্বয়ের বাণী প্রচার করতে হবে। এখানে যদি কোনো একটি বিশেষ ধর্মের জয়গান গাওয়া হয়, তাহলে ভারতীয়ত্ব বোধ বলতে আর কিছু থাকবে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ ভারত সংস্কৃতির প্রতি সশ্রদ্ধ দৃষ্টি মেলে দেন। কারণ এই সংস্কৃতি সম্পূর্ণভাবে ধর্মনিরপেক্ষ। তাই বোধহয় ভারতবর্ষের হাজার হাজার বছর ধরে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ সুখে শান্তিতে বসবাস করতে পেরেছেন। প্রতীচ্য দেশের ইতিহাসবিদরা ভারতবর্ষকে বিশ্বের এক মিনি সংস্করণ বলে থাকেন। শুধুমাত্র প্রাকৃতিক বৈচিত্রের কারণেই যে এমন বলা হয় তা নয়, পৃথিবীর সব দেশের মানুষকে ভারতমাতা সাদরে গ্রহণ করেছেন। ভাগ্য অন্বেষণে নানাধর্ম, নানাভাষা, নানা সংস্কৃতির মানুষ পা রেখেছেন। ধীরে ধীরে তাঁরা ভারত সভ্যতার এক অঙ্গ হয়ে গেছেন। এদেশে আসার সময়ে তাঁরা সযত্নে বহন করে এনেছেন নিজেদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির উজ্জ্বল দিকচিহ্নগুলিকে। দীর্ঘদিন ভারতে বসবাস করতে করতে তাঁরা ভারতীয় সংস্কৃতিকে অঙ্গীকরণের মাধ্যমে গ্রহণ করেছেন। এর পাশাপাশি নিজস্ব সংস্কৃতির দিকচিহ্নগুলি ভারত সংস্কৃতির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন। আর এইভাবেই ভারতীয় সংস্কৃতি দশদিগন্তে পরিব্যাপ্ত হতে পেরেছে।
মধ্যযুগীয় ভারত—সভ্যতার উজ্জ্বল দীপশিখা সমেত এইসব মহাপুরুষেরা বিরাজ করছেন। তাঁদের কেউ মহাত্মা কবীরের মতো তাৎক্ষণিক দোঁহা লিখে নিজেদের আধ্যাত্মিক মতবাদ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ আবার সংগীত রচনা করে সর্বধর্ম সমন্বয়ের বাণী সকলের কাছে পৌঁছে দেবার চেষ্টা করেছেন। অনেকে ছবি এঁকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গুরুত্ব এবং প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়েছেন। তাঁদের সকলের সমবেত প্রসারে মধ্যযুগে ভারত—সংস্কৃতি সম্পূর্ণভাবে আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠে। এই ভাবে ভারত সংস্কৃতির যে প্লাবন পরিলক্ষিত হয় তা আমাদের একেবারে অবাক করে দেয়!
এই কটি কথা মনে রেখে আমরা হিন্দি সাহিত্যে কবীরের দোঁহাবলির যে অবস্থান এবং গুরুত্ব সে বিষয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করব।
এই বিষয়ে বলতে হলে প্রথমেই ঐতিহাসিকদের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। আমরা জানি যে—কোনো দেশের সংস্কৃতিতে সেই দেশের সমকালীন রাজনৈতিক চিন্তন বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে। তাই যখন আমরা কবীরের দোঁহাবলি বিষয়ে আলোচনা করব তখন সেই সময়কার ভারত—সংস্কৃতি কেমন ছিল সেই বিষয়ে দু—চার কথা বলা প্রয়োজন। আগে আমরা মধ্যযুগে ভারতের রাজনৈতিক অবস্থান কেমন ছিল সেই বিষয়ে দু—চার কথা বলে নিই।
তখন ভারতবর্ষ নানা খণ্ডরাজ্যে বিভক্ত ছিল। এক রাজ্যের সঙ্গে অন্য রাজ্যের সৎভাব বজায় ছিল না। প্রত্যেক রাজাই আত্ম—অহমিকা বোধে ভুগতেন, তাই দেখা দিত ব্যক্তিত্বের সংঘাত। রাজনৈতিক অস্থিরতার ছাপ পড়ত রাজনৈতিক অভিযাত্রায়। সব মিলিয়ে মধ্যযুগের ভারত অন্ধকারে সমাচ্ছন্ন ছিল। তারই মধ্যে হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো দু—একজন মহান ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটে। তাঁরা বিচ্ছিন্নভাবে ভারত সংস্কৃতির পুনরুদ্ধারে ব্রতী হয়েছিলেন। তাঁদের চেষ্টায় মধ্যযুগীয় ভারত—ইতিহাসে মনে রাখার মতো কয়েকটি ঘটনা ঘটে যায়। এই তালিকাতে আমরা অবশ্যই মহাত্মা কবীরের নাম রাখব। তিনি একক প্রচেষ্টায় অসংখ্য দোঁহা লিখে মানুষকে সৎপথে পরিচালিত করার চেষ্টা করেছিলেন। মহাত্মা কবীর হয়ে উঠেছিলেন এক আন্দোলনের প্রবক্তা। তিনি রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিতে চাননি, আধিপত্য বিস্তারে তাঁর মন ছিল না, তিনি চেয়েছিলেন মানুষের মনকে শুদ্ধ করতে। মানুষ যে অমৃতের পুত্র সেই কথা বোঝাতে। মহাত্মা কবীরের এই মহৎ প্রয়াস যে অনেকাংশে সফল এবং ফলপ্রসূ হয়েছিল তা বলা যায়। আজও উত্তর ভারতের গ্রামে—গঞ্জে অসংখ্য মানুষ পরম শ্রদ্ধাভক্তি সহকারে তাঁর দোঁহা পাঠ করেন। হয়তো তাঁরা সকলে ওই দোঁহার অন্তর্নিহিত অর্থ অনুধাবন করতে পারেন না, কিন্তু এই দোঁহার মধ্যে আলোকিত জীবনের কথা বলা হয়েছে এই বিষয়টি তাঁরা বুঝতে পারেন। তাঁদের জীবনে নানা ঝড়ঝঞ্ঝা আসে, চলার পথে দেখা দেয় নানা বিপদ, তাঁরা সেই বিপদের মোকাবিলা করেন। হয়ে ওঠেন আর—একটু বেশি আত্মবিশ্বাসী। এই দোঁহাগুলি পরোক্ষভাবে তাঁদের চরিত্র গঠন করে। আমাদের স্থির বিশ্বাস বৈদ্যুতিন যন্ত্রের প্রবল জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও কবীরের দোঁহার গ্রহণযোগ্যতা আগামী দিনে এতটুকু কমবে না। হয়তো এই প্রজন্মের তরুণ—তরুণীরা তাঁকে সেভাবে আবিষ্কার করতে ইচ্ছুক নন, কিন্তু একদিন আবার কবীরের দোঁহার পুনর্মূল্যায়ন হবে। নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষিত করা হবে তাঁর অসংখ্য দোঁহাকে। নতুন যুগের গবেষক দেখাবেন কীভাবে কবীর অধ্যাত্ম চেতনা এবং সামাজিক মননকে সংমিশ্রিত করেছিলেন। আর এভাবেই কবীরের প্রচেষ্টায় হিন্দি অধ্যাত্ম সাহিত্যের এক নতুন দিগন্তের দুয়ার উন্মোচিত হবে।
কবীরের দোঁহার মধ্যে যে আধ্যাত্মিকতা লুকিয়ে আছে তার বিচার বিশ্লেষণ করতে হলে হিন্দি সাহিত্যের রূপরেখাটি মেনে নেওয়া দরকার। আমরা জানি সাহিত্যের যে—কোনো আন্দোলন দীর্ঘ ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলশ্রুতি। কবীর যে এমন মানসিকতাসম্পন্ন হয়ে উঠলেন তার অন্তরালে আছে হিন্দি কবিতা এবং হিন্দি সাহিত্যের পরিশুদ্ধ পরিমণ্ডল, যদিও হিন্দি সাহিত্যের উদ্ভব এবং বিকাশের সময়সীমা খুব একটা পুরোনো নয়, কিন্তু সেই স্বল্প সময়সীমার মধ্যে একাধিক কবি হিন্দি ভাষায় কাব্য রচনা করে স্মরণীয় হয়েছেন। তাঁরা সহজ—সরল জীবনবোধে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। তাঁদের লেখনীর মধ্যে এক ধরনের দার্শনিক চিন্তার স্ফুরণ চোখে পড়ে। কবীর হয়তো অজ্ঞাতসারে এইসব পূর্বসূরীদের দ্বারা অল্পবিস্তর প্রভাবিত হয়েছিলেন। তাঁর মনন এবং মানসিকতায় এসব কবিদের ছাপ পড়েছিল। তা না হলে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও কবীর কীভাবে এমন দার্শনিক তত্ত্ব সমৃদ্ধ দোঁহা লিখলেন! যাঁরা কবীরের অলৌকিকতায় বিশ্বাসী তাঁরা জোর গলায় বলেন এসবই হল মহাশক্তিমান পরম স্রষ্টার একান্ত আশীর্বাদ। আবার যাঁরা তার্কিক বোধবুদ্ধির অধিকারী, যাঁরা মনে করেন পৃথিবীর সমস্ত ঘটনার অন্তরালে আছে ধারাবাহিক পারম্পর্য, তাঁরা বলেন কবীরের মননে অজ্ঞাতসারে পূর্ববর্তী কবিদের চেতন সংবাহিত হয়েছিল। তাঁদেরই আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে কবীর কলম ধরেছিলেন। তাই তথাকথিত শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও তিনি এমন মনমাতানো দোঁহা লিখতে সক্ষম হয়েছিলেন।
কবীরের এই কবি মানসিকতার উন্মোচনে আসুন আমরা সংক্ষেপে হিন্দি সাহিত্য জগতের কথা শুনে নিই। আমরা দেখি এভাবে বিভিন্ন সময়ে হিন্দি সাহিত্যের বিখ্যাত কবীরা তাঁদের শাশ্বত কবিতার মাধ্যমে মানুষের জীবনকে উন্নত করার চেষ্টা করেছেন।
কবীরপন্থী নির্গুণ ধারার সাহিত্য সাধকেরা বৈরাগ্য ভাবনার ওপর বেশি জোর দিয়েছেন। তাঁরা সাংসারিক যে—কোনো বিষয়ের প্রতি সম্পূর্ণ নির্লিপ্তি প্রদর্শন করেছেন। তাঁরা জানেন জাগতিক কোনো বিষয় চিরকাল একইরকম থাকতে পারে না। তাই তাঁরা ঐশ্বরিক নশ্বরতার সন্ধান করেছেন। তাঁরা বিশ্বাস করতেন যোগমার্গ এবং ভক্তিমার্গে বৈরাগ্যের প্রবেশ এবং সাধনা সম্ভব। সন্তেরা এই দুটি পন্থাই পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন। তাই বৈরাগ্য ছিল তাঁদের অভীষ্ট সাধনা। এর পাশাপাশি তাঁদের শাস্ত্র ভাবনাতে মত এবং পন্থার প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। তাঁরা ভক্তির শাস্ত্রীয় দিকটি অন্বেষণ করতে গিয়ে গীতা, ভাগবতের আশ্রয় নিয়েছিলেন। আশ্রয় নিয়েছেন নারদীয় ভক্তিসূত্রের। এছাড়া বৈষ্ণব এবং শৈবশাস্ত্রের সঙ্গেও তাঁদের নিগূঢ় যোগসূত্রতা ছিল। কবীরপন্থীরা প্রেমভক্তি বা ভাবভক্তি কিংবা নারদীয় ভক্তির কথা সেভাবে উল্লেখ করেননি। কিন্তু তাঁরা নিরাকার, নিরঞ্জন, অলক্ষ রাম ভাবনার কথা বলেছেন। তাই কবীরের এই নিরাকারী রামকে ব্যাপক পরিপ্রেক্ষিতে জানবার জন্য ভক্তিতত্ত্বকে উপলব্ধি করতে হবে। ভক্তিতত্ত্ব সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান আহরণ করা সম্ভব না হলে আমরা রামের সর্বশক্তিমান এবং সর্বব্যাপক রূপটি বুঝতে পারব না।
কবীরপন্থীদের যোগসাধনা এবং ভক্তিসাধনা বিচার করে আমরা একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি। আমরা অনায়াসে বলতে পারি যে তাঁরা সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক মতাবলম্বী ছিলেন না। তৎকালীন সমাজে যে শাস্ত্র—বিরোধিতার জন্ম হয়েছিল, তা দেখে কবীরপন্থীরা মনে প্রাণে দুঃখ পেতেন। তখনকার রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তাঁদের মন আকাশকে ঘন মেঘে সমাচ্ছন্ন করেছিল। তাঁরা এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাবার জন্য ভক্তিবাদকে আশ্রয় করেছিলেন। কবীরের মতো নানক, রুইদাস, দাদু বা মনুকদাসও সংকীর্ণতার বিরোধিতা করে গেছেন। কবীর এমনই স্পষ্টবাদী উগ্র স্বভাবের সন্ত ছিলেন যে, তিনি এই শাস্ত্র বিরোধিতার প্রতিবাদ করতে গিয়ে শুধুমাত্র নিষেধই করেননি, তিনি তাঁর কলমকে তরবারির মতো শাণিত করেছেন। কবীরের ওজস্বী বাণীতে নৈতিকতার সঙ্গে দৃঢ়তার বহিঃপ্রকাশ থাকত। তাই শ্রোতারা সচকিত এবং আতঙ্কিত হয়ে পড়তেন।
সে যুগের সমাজে মৌলবাদকে ধ্বংস করার জন্য কবীর আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেন। বাহ্য আড়ম্বরের বিরুদ্ধে কঠোর শব্দ প্রয়োগ করেন। অন্যধারায় সন্ত রুইদাস এবং নানক কর্মকাণ্ডের মিথ্যা আড়ম্বরকে পরিত্যাগ করতে বলেছেন। তবে তাঁদের ভাষা অনেক সংযত। তাঁরা প্রতিবাদ না করে মিথ্যা আড়ম্বরের প্রতি নিষেধবাণী ঘোষণা করেছেন। তাঁরা স্বীকার করেছেন যে ঈশ্বরপ্রাপ্তির জন্য ভক্তি তত্ত্ব, প্রেম সমতা প্রভৃতি ভাবের সমন্বয় থাকা দরকার। তাঁদের সকলের সমবেত প্রয়াসে মধ্যযুগে সমগ্র ভারত জুড়ে এক সামাজিক বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল। পরবর্তীকালে এই বিপ্লবের প্রভাব এবং প্রতিপত্তি অক্ষুণ্ণ থাকে।
নির্গুণ ধারার অনুকূল সন্তেরা জীবনব্যাপী সাধনা করেছেন। তাঁদের মধ্যে একটি সমন্বয়ের দৃষ্টি পরিলক্ষিত হয়। ধর্ম, দর্শন, উপাসনা, আচার, বিচার সবকিছুর মধ্যে তাঁরা সংযোগমূলক সমন্বয় করতে চেয়েছিলেন। তাঁরা চেয়েছিলেন এই সমন্বয় যেন সমাজে বসবাসকারী সমস্ত মানুষের প্রতি প্রযুক্ত হয়। কবীর, নানক, দাদু প্রভৃতি সন্তরা ছিলেন মানবতাবাদী দার্শনিক। তাঁরা শুধু নিজেদের স্বীকৃতি অর্জনের জন্য সাধনা করেননি অথবা নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার জন্য কঠিন কঠোর অনুশাসনের সাহায্য নেননি, তাঁরা চেয়েছিলেন তাঁদের সাধনলব্ধ ফল যেন সমাজের একেবারে নিম্নবর্গ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। আজ আমরা সর্বধর্ম সমন্বয়ের কথা বলে থাকি, ভাবতে অবাক লাগে আজ থেকে অনেক বছর আগে মধ্যযুগের সন্ত কবীরা এই সর্বধর্ম সমন্বয়ের ডাক দিয়েছিলেন। তাঁরা যথেষ্ট চিন্তাভাবনা করে এই সর্বধর্ম সমন্বয়ের প্রকাশ করেন। দর্শনের ক্ষেত্রে তাঁরা শঙ্করের অদ্বৈত সাধনাকে গ্রহণ করেছিলেন। নাথ এবং সিদ্ধ সম্প্রদায়ের বাণীতে যেসব তত্ত্ব পাওয়া যায় তা কিন্তু কোনো সংকীর্ণ মতবাদ দ্বারা আচ্ছন্ন ছিল না। সন্তরা মানবতাবাদী দৃষ্টির অধিকারী ছিলেন। তাঁদের ছিল নিজস্ব স্বাধীন চিন্তা, অনুভব এবং আচরিত সত্য। তাঁরা সদা সর্বদা সৎচরিত্রকে বজায় রেখেছেন। পরদুঃখে কাতর হতেন, সকলকে করুণা এবং প্রেম নিবেদন করতেন। ভক্তি এবং বিনয় ছিল তাঁদের জীবনের আদর্শ। প্রায় সমস্ত সন্তই ছিলেন সৎজীবী কিন্তু শুধুমাত্র নিজের পরিবার ও পরিজনের ভরণ পোষণের কথা চিন্তা করতেন না। সারা পৃথিবীর সমস্ত মানুষই হলেন তাঁদের পরিবারের অন্তর্গত। এইভাবেই তাঁরা তাঁদের মানসিক দৃষ্টিকোণকে সংকীর্ণ করে রাখেননি।
উত্তর ভারতে ভক্তিবাদকে সর্বসাধারণের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন স্বামী রামানন্দ এবং তাঁর শিষ্য কবীর। কবীর অনুভব করেছিলেন যে শাস্ত্রনিষ্ঠার সঙ্গে সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা যুক্ত হয়, শাস্ত্র এবং সম্প্রদায়ের মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করে কোনো লাভ নেই। তাহলে আমরা সকলের কাছে পৌঁছোতে পারব না। কবীর বিশ্বাস করতেন যে, ভক্তির দুটি বড়ো প্রতিবন্ধকতাই হল শাস্ত্র এবং সম্প্রদায়। তিনি তাঁর ধারণাকে বা চিন্তাভাবনাকে তাই সহজ—সরল ভাষায় প্রকাশ করেন।
কবীর জাতি, বর্ণ, ধর্ম, সম্প্রদায় এবং মতবাদের শৃঙ্খল থেকে নিজেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। ব্যক্তিগত সাধনার সঙ্গে সমষ্টিগত সাধনার মিশ্রণে এমন এক সর্বাত্মক মতবাদের জন্ম দিয়েছিলেন যা সমাজের সকল শ্রেণির মানুষকে আকর্ষণ করে। ধর্মের উপদেশ দান, সন্তদের জীবিকা বা ব্যবসা ছিল না। জীবিকার জন্য তাঁরা অন্য কোনো পন্থা অবলম্বন করতেন। অনেকে আবার পারিবারিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। যেমন কবীর তন্তুবায়ের কাজ করতেন। রুইদাস জুতো সেলাই করতেন, রামদেব ছিলেন পেশায় একজন দর্জি। এই জাতীয় কায়িক পরিশ্রমের জন্য তাঁদের মনে কোনো হীনমন্যতার জন্ম হত না। তাঁরা সারা জীবন ধরে এমন এক মতবাদ বা ধর্ম সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠার কথা চিন্তা করেছেন যা চিরন্তন ভারত—সভ্যতার প্রতিভূ হতে পারে। সন্তদের আচরিত ধর্মকে আমরা এক শাশ্বত ও চিরকালীন সত্য বলে বলতে পারি। এই সত্য যুগে—যুগান্তরে, কালে—কালান্তরে ভারত আত্মার সঙ্গে একীভূত হয়ে বিরাজ করেছে, এই সত্য অবলম্বন করে ভারতবাসীরা আত্মিক ভাবনায় পরমানন্দে সুখ লাভ করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তাই আমরা কবীর এবং তাঁর মতো অন্য সমন্বয়কারী সাধকদের কথা সদা সর্বদা শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করব।
হিন্দি সাহিত্যের উদ্ভব এবং ক্রমবিকাশ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে হলে প্রাকৃত ভাষা এবং অপভ্রংশ ভাষাগুলির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা উচিত। অপভ্রংশ শব্দের উৎপত্তি এবং জৈন লেখকদের অপভ্রংশ রচনার সঙ্গে হিন্দির সম্পর্ক স্থাপন করার চেষ্টা পরিলক্ষিত হয়, অপভ্রংশ থেকেই হিন্দি ভাষার উদ্ভব হয়েছে বলে অনেক ভাষাবিদ মনে করেন। প্রাকৃতিক শেষ পর্যায়ের অপভ্রংশ অবস্থা থেকেই হিন্দি সাহিত্যের আবির্ভাব। সেই সময়ে অপভ্রংশের অনেকগুলি রূপ ছিল। সপ্তম, অষ্টম শতাব্দী থেকেই গদ্য রচনা শুরু হয়েছিল। সাহিত্যের দৃষ্টিতে বদ্ধ যে রচনা দেখতে পাওয়া যায় সেগুলি ‘দোঁহা’ হিসাবে পরিচিত। তার বিষয়বস্তুতে ধর্মের ইতিকথা এবং উপদেশই ছিল প্রধান। রাজাদের আশ্রিত কবি এবং চারণেরা নীতিকথা, শৃঙ্গার, সৌর্য, পরাক্রম প্রভৃতি বিষয়ে অসংখ্য দোঁহা বা ছোটো ছোটো কবিতা রচনা করেছেন। এই রচনা পরম্পরা পরবর্তীকালে সৌরসেনী অপভ্রংশ বা প্রাকৃতাভাষ হিন্দিতে কিছুদিন চলতে থাকে। পুরোনো অপভ্রংশ এবং অর্থ দেশী ভাষার ব্যবহারও বাড়তে থাকে। বিদ্যাপতি এই ভাষাকে দেশজ ভাষা বলে ব্যাখ্যা করেছেন। এই ভাষার জন্য হিন্দি শব্দের প্রচলন হয় এবং কোন দেশ থেকে শুরু হল সেই বিষয়টি এখনও পর্যন্ত আমরা জানতে পারিনি। তবে একথা অবশ্যই বলা যায় যে, শুরুতে বিদেশী মুসলমানরাই হিন্দি শব্দের প্রথম প্রয়োগ করেছিলেন। এই শব্দের সাহায্যেই তাঁরা ভারতীয় ভাষাকে বোঝাতে চাইতেন।
কালক্রমে আজ হিন্দি ভারতের এক বিশাল ভূখণ্ডে মানুষের কথ্য এবং সাহিত্য—ভাষা হিসাবে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে। রাজস্থান এবং হরিয়ানা রাজ্যের পশ্চিম সীমা থেকে বিহারের পূর্ব সীমান্ত পর্যন্ত এবং উত্তরপ্রদেশ ও হিমাচল প্রদেশের পূর্ব সীমান্ত থেকে মধ্য প্রদেশের দক্ষিণ সীমানা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের সাহিত্যের ভাষাকে আমরা হিন্দি বলে থাকি। তবে এইসব প্রদেশে অনেক আঞ্চলিক কথ্য ভাষাও প্রচলিত আছে। সকল ভাষার শাস্ত্রীয় গঠন কিন্তু এক ধরনের নয়। সাহিত্যেও একই ধরনের বাচনরীতি অনুসৃত হয় না। কিন্তু বিদ্বান ব্যক্তিরা এই বিস্তৃত অঞ্চলের সাহিত্যকর্মের সঙ্গে ব্যবহৃত ভাষা বা ভাষাগুলিকেই হিন্দি বলে আসছেন। হিন্দি সাহিত্যের ইতিহাসে হিন্দি শব্দটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহার করা হয়। যে সুবিশাল ভূখণ্ডটিকে বর্তমানে হিন্দি ভাষাভাষী রাজ্য হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে তার কোনো একটির নাম নির্ধারণ করা খুব একটা সহজ নয়। তবে এর প্রধান অংশকে মধ্যদেশ বলা হয়ে থাকে।
হিন্দি সাহিত্যের ইতিহাসের রচয়িতারা অপভ্রংশ ভাষার সাহিত্যকে হিন্দিভাষার পূর্ববর্তী রূপ হিসাবে গ্রহণ করেছেন। তাঁরা বিচার বিবেচনা করে বলেছেন যে হিন্দি সাহিত্যে আদিকালের সূচনা হয়েছিল প্রায় ১০০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে। পরবর্তী ৫০০ বছর ধরে ছিল এই আদিকালের পটভূমি। যেহেতু অপভ্রংশ ভাষা থেকেই হিন্দির উৎপত্তি, তাই আদিকালের রচিত সাহিত্যের ভাষাও ছিল প্রায় অপভ্রংশ ভাষারই কাছাকাছি। ধীরে ধীরে কাব্যের বর্ণনীয় বিষয় এবং গ্রহণযোগ্যতায় পরিবর্তন আসে। ভাষাতেও সেই পরিবর্তনের ছাপ পড়ে। ভাষার অপভ্রংশে ব্যাকরণগত ব্যবহার কমে যায়। হিন্দির নিজস্ব রূপেরই বিকাশ লক্ষ করা যায়। ১৫০০ খ্রিস্টাব্দে পৌঁছোনোর পরেই হিন্দি ভাষা তার নিজস্বরূপ গ্রহণ করে। তখন থেকেই অপভ্রংশ রূপটি রচিত হতে থাকে। আমরা যখন কবীরের দোঁহা সম্পর্কে আলোচনা করব, তখন হিন্দি সাহিত্যের অধিকার বিষয়ে দু—একটি কথা জেনে নিতে হবে।
হিন্দিভাষার সাহিত্যের রূপ যেভাবে বিকশিত হয়েছিল তার বীজ দশম শতাব্দীতে পরিলক্ষিত হয়। পরিশীলিত অপভ্রংশ রূপ দশম শতাব্দীর পরে কথ্য ভাষায় লিখিত সাহিত্যে পাওয়া যায়। হিন্দি সাহিত্যের ইতিহাসের লেখকরা হিন্দি সাহিত্যের আদিকাল হিসাবে ১০৫০ তম সংবাদ বা ৯৯৯ খ্রিস্টাব্দকে চিহ্নিত করেছেন।
এই সময়ে একাধিক হিন্দি কবীর রচনা পরিলক্ষিত হয়। অপভ্রংশের শ্রেষ্ঠ কবি হলেন স্বয়ম্ভু। তিনি অসংখ্য কবিতা লিখে হিন্দি সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন। স্বয়ম্ভু ছিলেন মান্যক্ষেত্রের এক প্রভাবশালী রাজা। মহামন্ত্রী ছিলেন তাঁর সভাকবি। তিনি নিজেকে আল্লা বলে চিহ্নিত করেছেন।
দশম শতাব্দীতে জৈন কবি ‘আল্লার কর্ণামৃত’ নামে এক চরিত্রকাব্য রচনা করেন। তার পাশাপাশি আরও বেশ কিছু জৈন কবিকে আমরা দেখেছি।
খ্রিস্টীয় নবম—দশম শতাব্দীতে মৎস্যেন্দ্রনাথ এবং গোরক্ষনাথ ছিলেন সিদ্ধ কবি। তাঁদের চুরাশি সিদ্ধদের অন্যতম হিসাবে মান্যতা দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে তাঁরা শিবের অবতার রূপে প্রসিদ্ধি অর্জন করেন। গোরক্ষনাথ অত্যন্ত শক্তিশালী ধার্মিক নেতা ছিলেন। তিনি কট্টরভিত্তিক নাথ সম্প্রদায় সংগঠন করেছিলেন। পরবর্তীকালে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে এই সম্প্রদায়ের অসংখ্য মানুষ বসবাস করতে শুরু করেন। তাঁরা তাঁদের সঙ্গে নাথ সম্প্রদায়ের ভাষা এবং সাহিত্যকে বহন করেছিলেন। নাথপন্থীদের কিংবদন্তি থেকে গোরক্ষনাথ সম্পর্কে অনেক কথা জানতে পারা যায়। তিনি বহু জৈন এবং যোগ সম্প্রদায়কে ভেঙে বারোপন্থী শাখা স্থাপন করেন। এই বারোপন্থী যোগমার্গে জলন্ধর এবং বিরচকের মতো কাপালিকরাও ছিলেন। ছিলেন জৈন, বৈষ্ণব এবং শাক্ত সাধকেরা, ‘বর্ণ রত্নাকর’ নামে চতুর্দশ শতাব্দীর এক মৈথিলী গ্রন্থে ৮৪ জন সিদ্ধপুরুষের নাম দেওয়া হয়েছে, অনেক সিদ্ধপুরুষ বজ্রজানিশ ধারার সিদ্ধদের সঙ্গে ছিলেন অভিন্ন।
নাথ সম্প্রদায়ের সৃষ্ট সাহিত্য হিন্দি সাহিত্যের প্রাথমিক পর্বকে আলোকে উদ্ভাসিত করেছে। গোরক্ষনাথের সময়ে যে কখন ছিল তা নিয়ে বিদ্বানদের মধ্যে বিতর্ক আছে। কেউ বলে থাকেন তিনি ছিলেন প্রথম বা দ্বিতীয় শতাব্দীর মানুষ। অনেকে বলে থাকেন তাঁর জন্ম হয়েছিল অষ্টম বা দশম শতাব্দীর মধ্যে। কেউ আবার তাঁকে দ্বাদশ থেকে চতুর্দশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী কোনো সময়ের মানুষ বলে চিহ্নিত করেন। যে—সমস্ত সম্প্রদায়কে গোরক্ষনাথ নিজে তাঁর বারোপন্থী শাখায় সম্মিলিত করেছিলেন তাঁদের প্রবর্তকদের সঙ্গে বিভিন্ন প্রবাদ ও প্রবচনে গোরক্ষনাথকে সম্মিলিত করার ফলেই এমন বিতর্কের অবতারণা হয়। দশম শতাব্দীর বিখ্যাত কাশ্মীরি আচার্যও তাঁর তন্ত্রলোকে মৎসেন্দ্রনাথের বর্ণনা করেছেন। তাতেই প্রমাণিত হয় যে, মৎসেন্দ্রনাথ দশম শতাব্দীর আগেই অবতরণ করেছিলেন। তিব্বতী পরম্পরায় আবার তাঁকে দশম শতাব্দীর গুরু হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেহেতু গোরক্ষনাথ ছিলেন মৎসেন্দ্রনাথের শিষ্য তাই তিনি ওই সময়েই পৃথিবীতে এসেছেন বলে মনে করা হয়। হিন্দিতে গোরক্ষনাথের নামে প্রচলিত অসংখ্য পদ দেখতে পাওয়া যায়। বেশ কিছু আবার সংস্কৃত ভাষায় লেখা। অনেকে মনে করে থাকেন গোরক্ষনাথ একদল কবীর অলংকারী উপাধি। আসল গোরক্ষনাথ হয়তো তাঁদের মধ্যে আদিকবি হিসাবে চিহ্নিত।
গোরক্ষনাথের নামে যে—সকল পদগুলি পাওয়া গিয়েছে তাদের তাত্ত্বিক এবং আধ্যাত্মিক মৌলত্ব খুব একটা কম নয়। তার মধ্যে কিছু কিছু পদ আবার প্রাচীন, আবার কিছু পদে কবীরের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কোনো কোনো পদে আবার নানকের নামও পাওয়া যায়। দাদু ও রঙ্গনাথের নামেও বেশ কিছু পদ পাওয়া গেছে। কিছু পদে লোকগাথার প্রত্যক্ষ প্রভাবও লক্ষ করা যায়। কিছু কিছু পদ চারণগীতি হিসাবে ব্যবহৃত হয়। আবার কিছু পদ অনুভূতিলব্ধ শাশ্বত জ্ঞানের প্রতীকস্বরূপ জনসাধারণের মধ্যে প্রচলিত ছিল। গোরক্ষনাথের পদে বিভিন্ন যোগীদের উপদেশ বর্ণিত হয়েছে। এই পদগুলির মধ্যে একটি ভক্তিমূলক ভাবধারা দেখতে পাওয়া যায়। প্রতিটি পদের সঙ্গে একটি করে নীতিকথা সংযুক্ত হয়েছে। আবার অনেক পদ আছে যা বিশ্লেষণ করলে আমরা পদকর্তার অনুভূতির কথাটিও জানতে পারি। গোরক্ষনাথের পদ থেকেই হিন্দি সাহিত্যে আধ্যাত্মিক সাহিত্যধারার সূচনা হয়।
প্রাচীন সিদ্ধদের নামে বেশ কিছু হিন্দি রচনা পাওয়া গেছে যা নাথ সিদ্ধদের বাণী বা বচন হিসাবে প্রকাশিত হয়েছে। এঁদের মধ্যে অজয় পাল, গোপী চন্দ্র, জলন্ধী, কাকগী, চর্বকনাথ, চৌরঙ্গীনাথ, সিদ্ধনাথ, মহেন্দ্রনাথ, মকরসিদ্ধ, প্রভৃতি প্রাচীন বাকসিদ্ধদের বাণী আছে। কিছু কিছু বাণীর ভাষা এবং শৈলী সন্দেহজনক। কিন্তু বেশির ভাগ বাণী এবং ভাষা বিশ্লেষণ করলে আমরা বুঝতে পারি সেগুলি দশম শতাব্দী কালের রচনা।
যাঁরা হিন্দি সাহিত্যের বিষয় নিয়ে গবেষণা করে থাকেন তাঁরা এই জাতীয় পদগুলির ব্যাকরণগত বৈশিষ্ট্য এবং কাব্যিক রসধারার ওপর নানাভাবে আলোকপাত করেছেন। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতে আমরা গোরক্ষনাথের পদ সম্পর্কে অনেক কথা জানতে পেরেছি।
এই প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে যে, গোরক্ষনাথের পরবর্তী ধারায় হিন্দিতে ভক্তিকালের শুভ সূচনা হয়। ভক্তিবাদের প্রাবল্য দেখা গিয়েছিল কবীরের দোঁহার মধ্যে। কবীর অবশ্য স্বসৃষ্ট ধারার পথিক হয়ে তাঁর দোঁহাতে জ্ঞানমার্গ এবং ভক্তিমার্গ—এর আশ্চর্য সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন। তাই কালের যাত্রাপথ অতিক্রম করে আজও আমরা পরম বিস্ময়ে ঔৎসুক্যের সঙ্গে তার দোঁহাগুলি পাঠ করে থাকি।
ভক্তি মানুষের এক জন্মগত প্রবণতা। এই ভক্তি ব্যক্তির বিশ্বাস এবং ঈশ্বরের অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে। অন্তরের মধ্যে নিহিত ভক্তিবাদ বা শ্রদ্ধার ভাবকে যখন আমরা আমার থেকে অধিক শক্তিশালী ব্যক্তির প্রতি ব্যক্ত করি তখন তাকে লৌকিক শ্রদ্ধা বলা হয়। আর যখন সেই শ্রদ্ধা কোনো অলৌকিক অদৃশ্য শক্তির প্রতি নিবেদিত হয় তখন তাকে ভক্তি বলা হয়। ভারতীয় আধ্যাত্মিক চিন্তনের রূপটিকে ঈশ্বরের উপাসনাস্বরূপ হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। ভক্তি হল আরাধনার প্রেরণা। আমরা ঈশ্বরকে উপলব্ধি করার জন্য তাঁর পুজো করে থাকি। এই পুজোর অন্যতম বিষয় হল ভক্তিভাব। মানুষ তার সীমিত ক্ষমতাবলে এই বিশ্বের পালন বা রক্ষা করতে সমর্থ হয়। তাই মানুষকেই তাঁর থেকে অধিক শক্তিশালী কোনো এক পরম পুরুষের সন্ধান করতে হয়। এই সন্ধান করতে করতেই মানুষ এক বিরাট সত্তার কথা ঘোষণা করে। এই সত্তা দৃশ্যমান জগতের আবির্ভাব, স্থিতি এবং সংহারের উপলক্ষ বা কারণ। এই চিন্তার থেকেই আত্মিক শ্রদ্ধার উদয় হয়। দার্শনিক সত্তায় এই শক্তিকে ব্রহ্ম শব্দের মাধ্যমে উল্লেখ করা যেতে পারে। আবার অন্যত্র তাঁকে ‘ঈশ্বর’ বলা হয়েছে। এই ব্রহ্ম নিত্য, শুদ্ধ, বুদ্ধিসম্পন্ন। তিনি উচ্চ স্বভাব সম্পন্ন। তিনি সর্বশক্তিমান এবং সর্বব্যাপক। তাঁকে আমরা এমন এক অপরিবর্তনীয় সত্তা হিসাবে ঘোষণা করব যিনি স্থল—জল—অন্তরীক্ষে বিদ্যমান। তাঁর গতিপ্রকৃতি সদা—সর্বদা আমরা আমাদের হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে ভক্তি এবং বিশ্বাস নিবেদন করি। ধর্ম এবং সম্প্রদায়ের নিজস্ব ধারণা অনুসারে ঈশ্বরের বিভিন্ন নামের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সর্বশক্তিমান এবং সর্বত্রব্যাপী ঈশ্বর এক এবং অভিন্ন। তাঁকে আমরা যে নামেই ডাকি না কেন, কেউ ডাকলেই তিনি সাড়া দেবেন।
ভারতীয় ইতিহাসের মধ্যকালে ঈশ্বরভক্তি বিষয়ক কাব্য এবং সাহিত্য ধারার আবির্ভাব ঘটে যায়। হিন্দি ভক্ত কবীরা পরম্পরাগতভাবে চলে আসা ঈশ্বর ভক্তির বিকশিত ভাবধারাটি সশ্রদ্ধ চিত্তে গ্রহণ করেছিলেন। বিশ্বের সব থেকে প্রাচীন গ্রন্থ ঋকবেদের পাতায় পাতায় ঈশ্বরভক্তির একটি অবিস্মরণীয় রূপ পরিলক্ষিত হয়। কোনো কোনো বিদ্বান ব্যক্তি মনে করেন যে পরবর্তীকালে সংস্কৃত হিন্দি অথবা অন্যান্য ভারতীয় ভাষায় ভক্তি ভাবনাধারার সেই রূপটি যথাযথভাবে পাওয়া যায় না। তাঁরা বলে থাকেন বৈদিক যুগে রাগাশ্রিত ভক্তি ভাবধারার উদ্ভব হয়নি। তখনকার দিনের বিশিষ্ট ঋষিমুনিরা বিশ্ব সংসারের রহস্য জানার জন্য কর্ম এবং জ্ঞানের তুলনামূলক আলোচনায় ব্রতী হতেন। তাঁরা মনে করতেন খ্রিস্টান, ইসলাম, সুফী মতবাদ অন্যান্য সেমেটিক ধর্মের ভক্তির যে ধারণা স্বীকৃত হয়েছে ভারতীয় ভক্তি সাধনার সেইটি হল উপাস্য রূপ। এই বিচারধারা প্রচারে অনেক বিদেশী বিদ্বান ব্যক্তিও যুক্ত ছিলেন। তবে পরবর্তীকালে তাঁদের মতবাদকে খণ্ডন করা হয়েছে। কিন্তু ভারতীয় বিদ্বান ব্যক্তি মধ্যকালীন ভক্তিভাব ধারার প্রেমতত্ত্বের আধারটির সঙ্গে সেমেটিক ধর্মের স্বদেশতার কথা ঘোষণা করেছেন। কিন্তু এই ধারণা আমরা সর্বজন স্বীকৃত হিসাবে মানবো না। বহু ভারতীয় জ্ঞানী এই মতবাদকে খণ্ডন করেছেন। তাঁরা একের পর এক প্রামাণ্য বিষয়কে তুল ধরেছেন। আজ ওইসব মতবাদকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। আজ আমরা অনায়াসে বলতে পারি যে, ভারতীয় ভক্তিসত্তার বিকাশ ভারতীয় মতবাদের প্রভাবেই ঘটেছিল। পাশ্চাত্য মনীষী গোয়েবেলসও কৃষ্ণকে যীশুখ্রিস্টের রূপান্তর বলে ঘোষণা করেছেন। জর্জ অরওয়েল তাঁর প্রবন্ধে এই ভ্রান্ত ধারণার উল্লেখ করেছেন। এইভাবে তাঁরা যীশুখ্রিস্টের মহিমাকে প্রচার করতে চেয়েছেন। প্রাচীন ভারতীয় বিচারধারা অনুসারে আমরা কখনোই এই কথাটিকে সত্যি বলে মানবো না।
আমাদের বৈদিক সাহিত্যের পাতায় পাতায় ভক্তিরসধারা আশ্রিত অসংখ্য কবিতা দেখতে পাওয়া যায়। বেদগ্রন্থে এমন কিছু শ্লোক আছে যেগুলি নির্গুণ, নিরাকার ব্রহ্মের বর্ণনাস্বরূপ রচিত হয়েছে। ঈশ্বরের আরাধনা, উপাসনা এবং বন্দনা করার জন্যই এগুলির রচনা। তাই আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি ঋকবেদ হল ভারতীয় ভক্তিভাবের আদি উৎস। ঋকবেদের কিছু মন্ত্রে মানুষ এবং দেবতার মধ্যে নিবিড় প্রেম এবং মৈত্রীর ভাবেরও কল্পনা করা হয়েছে। বৈদিক কালের উপাস্য দেবদেবীর নামের কোনো সীমা নেই। কিন্তু অনেক নামেই এক ঈশ্বরের ভক্তির নির্দেশ আছে। বেদগ্রন্থে দার্শনিক, আধ্যাত্মিক এবং আধিভৌতিক প্রভৃতির চিন্তাধারা দেখতে পাওয়া যায়। এই চিন্তাধারার মধ্যে ভক্তিবাদের বীজ নিহিত আছে একথা অনায়াসে বলা যেতে পারে।
মনীষীরা বৈদিক সাহিত্যের এই ভক্তিবাদের পরবর্তী ৯টি রূপের বীজ খোঁজার চেষ্টা করে থাকেন। ভাগবতেও এই বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা করা হয়েছে। ঈশ্বরকে কখনো আমরা পিতা অথবা মাতা হিসাবে শ্রদ্ধা করি, কখনো ঈশ্বর বন্ধু বা সখা হিসাবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ান। বিষ্ণুর সর্বব্যাপিতা, সর্বশক্তি সত্তা এবং সৃষ্টি ও রক্ষাকর্তা হিসাবে অসংখ্য মন্ত্র রচিত হয়েছে। যদি আমরা ঋকবেদ থেকে শুধুমাত্র ভক্তি বিষয়ক মতগুলিকে আলাদাভাবে চয়ন করি, তাহলে তার সংখ্যাটা হবে বিশাল। এই ভক্তিবাদের মধ্যে একদিকে নির্গুণ ঈশ্বরের অবতারণা করা হয়েছে, অন্যদিকে আছে সগুণ ভক্তিবাদ।
ব্রাহ্মণ গ্রন্থে কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রেও ভক্তির বিধান পরিলক্ষিত হয়। ঐতরেয় এবং শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে এই ভক্তিকেই সর্বোচ্চ স্থানে উন্নীত করা হয়েছে। বিভিন্ন উপনিষদেও এই প্রসঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা আছে।
উপনিষদের কাল থেকে আমরা যদি সামনের দিকে এগিয়ে যাই তাহলে দেখব ভক্তির বিভিন্ন রূপ পরিলক্ষিত হচ্ছে। অবতারবাদের কল্পনা করার পর ভক্তির নানান উপাস্য দেবতার সৃষ্টি হয়েছে। ভক্তির ক্ষেত্রে পরবর্তী সাহিত্যে নাম, জপ, ব্রত, উপাসনা প্রভৃতি বিষয়ের বর্ণনা দেখতে পাওয়া যায়। উপনিষদের পরে ভক্তির প্রবল ধারা ভাগবতধর্ম হিসাবে প্রবাহিত। মহাভারতের কালে নারায়ণ শাশ্বত ভাগবত প্রপঞ্চ, সিদ্ধভক্ত ইত্যাদি নামে নানা ভক্তি সম্প্রদায়ের কাছে প্রচলিত হয়েছিল। তাঁদের উপাস্য দেবতায় মূল ভক্তিভাবনা অক্ষুণ্ণ থেকেছে।
কুশান এবং বুদ্ধযুগে ভাগবত ধর্মের বিভিন্ন ধারার বিকাশ ঘটে। গবেষকদের মতানুসারে লোকে বিষ্ণু এবং তাঁর মহাযোগী অচ্যুত শব্দে পুরুষ ও অনিরুদ্ধের উপাসনা করেছেন। শাক্য সম্প্রদায় কৃষ্ণকে নারায়ণ রূপে উপাসনা করতেন। পাঞ্চজন্য তত্ত্বের অনুসারীরা বাসুদেব, শভর্ষণ, প্রদ্যুম্নের এবং অনিরুদ্ধ রূপের চতুষ্কর বিষ্ণুর উপাসক, মহাভারতের শাশ্বতদের বর্ণনা আছে। এই অংশকে অবশ্য প্রক্ষিপ্ত বলে গণ্য করা হয়। মহাভারতের এই উপাখ্যান বিশ্বকে শোনানো হয়েছিল। তাই আমরা বলতে পারি, ভারতের ভক্তি ভাবনার যে ধারা বৈদিককালে প্রভাবিত হয়েছিল তা মহাভারতের কাল পর্যন্ত সতত প্রবহমান ছিল।
ভাবগত ধর্মের প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ঈশ্বরের অবতার রূপের ধারণা করা হল। সাধক—সাধিকারা মনে করলেন যে ঈশ্বর হলেন সৎ গুণের আধার। ঈশ্বরের মধ্যে যে ছ’টি গুণ আছে সেগুলি হল যথাক্রমে—জ্ঞান, বল, ঐশ্বর্য, বীর্য, শক্তি এবং তেজ। এই প্রতিটি গুণের আবার আলাদা একটি মাত্রা বা দ্যোতনা আছে। এখানে জ্ঞান অর্থে সেই পারমার্থিক জ্ঞানকে বোঝানো হয়েছে যা আমাদের চিত্তকে শুদ্ধ করে এবং আত্মাকে করে আলোকে উদ্ভাসিত। বল অর্থে সেই অসীম বলের কথাই বলা হয়েছে। যার দ্বারা আমরা রিপু দমন করতে পারি। ঐশ্বর্য অর্থে কিন্তু কোনো বৈষয়িক ঐশ্বর্যের কথা বলা হয়নি। পৃথিবীর মানুষ এক অনন্ত ঐশ্বর্য নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু তার দুর্ভাগ্য যে সে এই ঐশ্বর্য সম্পর্কে মোটেই অবগত নয়। এখানে সেই ঐশ্বর্যের কথাই তুলে ধরা হয়েছে। বীর্য বলতে অমিত শক্তির আধারকে চিহ্নিত করা হয়েছে। শক্তি অর্থে সেই সদর্থক এবং ইতিবাচক শক্তির কথা বলা হয়েছে। যার দ্বারা মানুষ অশুভকে দমন করতে পারবে। তেজ হল সূর্য—সদৃশ্য প্রচণ্ডতা এবং উগ্রতা। যার দ্বারা মানুষ তার সমস্ত কলুষতাকে দূর করতে পারে!
অবতারবাদের এই কল্পনাকে পুরাণগুলি বেশ ব্যাপকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এক্ষেত্রে আমরা অবশ্যই আলাদাভাবে ভাগবৎ পুরাণের কথা বলব। দশ অবতারের বর্ণনায় ভক্তিবাদের দীপ্ত বহিঃপ্রকাশ পরিলক্ষিত হয়। অবতাররূপী ভগবানকে যখন থেকে আমরা এই রূপে প্রত্যক্ষ করি তখন ভক্তির একটি সগুণ আকার আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়, মধ্যকালীন ভক্তকবীরা রামকৃষ্ণের অবতার রূপের বিষয়ে একাধিক ‘মিথ’ রচনা করেছেন। নির্গুণ ধারার কবীরা অবশ্য ঈশ্বরের এই অবতারতত্ত্বকে অস্বীকার করাকে স্বীকার করেছেন। কিন্তু তাঁরা ভক্তিরস থেকে প্রেম ও অনুরাগ জাতীয় প্রণোদনাকে বাদ দিতে পারেননি। এটি সগুণ—নির্গুণ বিভেদের ওপরে অবস্থিত এক সর্বজনস্বীকৃত ভক্তির পথ।
ভাগবত পুরাণের পাতায় পাতায় ভক্তিবাদের উৎপত্তি এবং ক্রমবিকাশ সম্পর্কে নানা পদ রচিত হয়েছে। একটি পদ পড়লে আমরা ভক্তির উৎপত্তি ও বিকাশের সংকেত জানতে পারি। একটি প্রচলিত কিংবদন্তি সূত্রে ভক্তির উৎপত্তি দক্ষিণ ভারতে হয়েছে বলে বলা হয়। ক্রমশ তা উত্তর ভারতে বিকশিত হতে থাকে। আবার অনেকে বলে থাকেন এইভাবে ভক্তিবাদকে কোনো একটি অঞ্চলের আঞ্চলিক অভীধায় অভিষিক্ত করে লাভ নেই। এক সময়ে সমগ্র ভারতবর্ষের সর্বত্র ভক্তিবাদের বিচ্ছুরণ চোখে পড়েছিল। ভারতের সমস্ত প্রান্তে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভক্তিবাদ বিকশিত হয়েছিল।
এই প্রসঙ্গে আমরা দক্ষিণ ভারতের আলবার সম্প্রদায়ের কথা আলাদাভাবে বলব। তাঁদের সময়কাল দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে নবম শতাব্দী পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত। আবার অনেকে মনে করে থাকেন যীশুখ্রিস্টের জন্মের আড়াইশো বছর আগে আলবার সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে। প্রাথমিকভাবে আলবার বিষ্ণুর গদা, শঙ্খ এবং চক্রের অবতার ছিলেন। আলবাররা বংশানুক্রমিকভাবে ভক্তি—সাহিত্য রচনা করেছেন। এই সম্প্রদায়ের শেষ ভক্ত হলেন তিরুপানি।
আলবারের পরে আলবারের এক দত্তক—পুত্রী হলেন অন্দাল। তাঁর ভক্তিগীতি প্রেমপূর্ণ ভক্তিরসে পরিপ্লাবিত। এই ভক্তিকে আমরা বৈষ্ণব কান্তাভাব বলতে পারি। আলবার শব্দের ব্যাকরণগত অর্থ হল ‘ঈশ্বরীয় জ্ঞানের মূল তত্ত্বে উপনীত হওয়া’। আলবার সম্প্রদায়ের মধ্যে নানা বর্ণ এবং নানা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মানুষ আছেন। আলবারদের গ্রন্থকে তামিল দেশের মানুষ বেদের সমান পূজ্য বলে মনে করেন। ভগবান যীশুখ্রিস্টের জন্মের কয়েক শতাব্দী আগে থেকেই এই দক্ষিণ ভারতের বেশ কিছু মানুষের মনে বিষ্ণুভক্তির প্রেমজ্ঞ জ্ঞানের উদ্ভব ঘটে। তাঁদের ভক্তিবাদের মধ্যে দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য এবং কান্তা এই চারটি ভাব প্রধান। প্রেমলক্ষণযুক্ত ভক্তি—ভাবনার উদয় বহিরাগতদের প্রভাবে হয়েছে বলে যাঁরা মনে করেন, তাঁদের এই বিশ্বাস একেবারেই ভ্রান্ত এবং ভিত্তিহীন।
দশম শতাব্দী থেকে ভক্তিরস ও শাস্ত্রকে নানাভাবে বিচার—বিশ্লেষণ করা শুরু হল। আদি শঙ্করাচার্য তাঁর অদ্বৈত সিদ্ধান্তের সঙ্গে সঙ্গে ‘জ্ঞানমার্গের আশ্রয় ভিন্ন মোক্ষলাভ সম্ভব নয়’ বলে এক মতবাদ প্রচার করতে শুরু করলেন। এই সময়ে জ্ঞানমূলক প্রচারের ফলে ভক্তিমার্গে বিচরণকারী মানুষেরা কিছুটা আহত হয়েছিলেন। কিন্তু জ্ঞানমার্গের ধারণা কি ভক্তিমার্গের বিপরীত? শঙ্করাচার্যের বিচারধারাকে স্বীকার করেন না, পরবর্তীকালে এমন অনেকে ভক্তির জন্য নতুন পথের সন্ধান করেন। এই তালিকাতে আছেন রামানুজাচার্য, নিম্বার্কাচার্য, মধ্বাচার্য বিষ্ণুস্বামী এবং বল্লভাচার্য। তাঁদের বিশেষত্ব হল তাঁরা অদ্বৈতবাদী বিচার ‘ব্রহ্ম সত্য ও জগৎ মিথ্যা’ নামক বিষয়টিকে কখনো স্বীকার করেননি। তাঁরা নিজেদের বিশ্বাসকে যুক্তিপূর্ণ চিন্তাভাবনার দ্বারা বিশ্লেষিত করেছিলেন। স্বীয় স্বীয় ক্ষেত্রে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা এবং সাধনা করে গেছেন। তাঁদের সকলের সমবেত প্রতিষ্ঠায় ভক্তিবাদ এক নতুন প্রতীতি। তাঁদের মতবাদ বিশিষ্টাদ্বৈত, দ্বৈতাদ্বৈত, শুদ্ধাদ্বৈত প্রভৃতি নানা নামে ব্যক্ত হয়।
ভক্তিবাদের ব্যাপক প্রচলন এবং প্রবর্তনে এই সব প্রাতঃস্মরণীয় আচার্যদের অবদানের কথা আমরা কখনো ভুলতে পারব না। তাঁরা বিষ্ণুর অবতার হিসাবে রামকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। শ্রীবিষ্ণু হলেন ভক্তির উপাস্য দেবতা। মধ্যকালে সংস্কৃত এবং অন্যান্য ভারতীয় ভাষায় ভক্তি ও ভাবনার এক নতুন রূপ পরিলক্ষিত হয়। এই আচার্যদের সমবেত প্রয়াসের এই ধারাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তাঁরা ভক্তিকে শাস্ত্রীয় মর্যাদা দান করেন। ভক্তিবাদ এতদিন পর্যন্ত কিছুমাত্র বুদ্ধিজীবীর একান্ত আশ্রয়স্থল বলে পরিগণিত হয়েছিল। এঁদের সমবেত প্রয়াসে ভক্তিবাদ সর্বসাধারণের কাছে সহজলভ্য হয়ে ওঠে।
এই প্রসঙ্গে একান্ত ভক্তিবাদী সাধকের কথা বলব। যেমন রামানুজাচার্য রামতত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। রামানন্দ রামচন্দ্রকে আরও ব্যাপক অর্থে প্রয়োগ করেন। জাতিগত ভেদাভেদ দূর করার জন্য আচার্য রামানন্দ ভক্তিবাদের প্রচলন করেন। হিন্দি কবিদের মধ্যে তুলসীদাস হলেন এক অত্যন্ত শক্তিশালী কবি, তাঁর অমর লেখনীর মাধমে রামচন্দ্রের জীবনকথা উত্তর ভারতের অসংখ্য মানুষের মধ্যে পৌঁছে গেছে। বিষ্ণুভক্তির ক্ষেত্রে নির্বাক, মধ্বাচার্য, বিষ্ণুস্বামী, বল্লভাচার্য, কৃষ্ণচৈতন্য, হিত হরিবংশ, হরিদাস প্রমুখ যে প্রয়াসে ব্রতী হয়েছিলেন তার ফলে কৃষ্ণভক্তির ব্যাপকতা লাভ করে।
ভক্তির যে স্রোত বেদ, ব্রাহ্মণ, উপনিষদ, মহাভারত এবং পুরাণ প্রভৃতি গ্রন্থে শুরু এবং পরিপুষ্ট হয়েছিল, বংশানুক্রমে তা ছিল সতত প্রবহমান। ভক্ত কবীরা বিষ্ণুর উপাসনা না করে নির্গুণ নিরাকার ঈশ্বরের উপাসক ছিলেন। হিন্দি, গুজরাটি ও মারাঠাদের মধ্যে এই ধরনের অনেক ভক্ত—কবির সন্ধান পাওয়া গেছে। নাথ এবং সিদ্ধ সন্ত সম্প্রদায়ের অনেকেও নির্গুণ ভক্তির দিকেই তাঁদের প্রবণতা লক্ষ করেছেন। এই প্রসঙ্গে আমরা কবীর, নানক, দাদু, রজ্জব, রুইদাস এবং মলুকদাসের কথাও বলব। তাঁরা সকলেই নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে নির্গুণ ভক্তিবাদের বিচার বিশ্লেষণ করেছেন। আমরা সাধারণত তাঁদের সন্ত নামে চিহ্নিত করে থাকি।
মহারাষ্ট্রে আবার ভক্তির ক্ষেত্রে সগুণ এবং নির্গুণ ধারাটি প্রচলিত ছিল। জ্ঞানেশ্বর, নামদেব, তুকারাম প্রমুখের রচনায় তার পরিচয় পাওয়া যায়।
বৈষ্ণব—ভক্তির প্রতিষ্ঠাতা হলেন আচার্যরা। বৈষ্ণব—ভক্তির আচার্যদের সময়কাল দশম থেকে ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত। রামানুজাচার্য হলেন আচার্যদের গুরু। পরবর্তীকালে নিম্বার্কাচার্য, বিষ্ণুস্বামী, মাধবাচার্য এবং বল্লভাচার্যের জন্ম হয়। এঁরা ছাড়াও আরও অনেকে এই ভক্তিবাদকে যথেষ্ট পরিপ্লাবিত এবং উন্মত্ত করেছেন।
আচার্য রামানুজ অবতাররূপে রামকে নিজের বিষ্ণুভক্তির উপাস্যদেব হিসাবে স্বীকার করেন। তাঁর মতে, পুরুষোত্তম ব্রহ্ম সগুণ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ। ভক্তদের অনুগ্রহ করার জন্য তিনি পঞ্চরূপ ধারণ করেছিলেন। পঞ্চরূপের মধ্যে অন্যতম হলেন রাম। ভক্তির মাধ্যমেই যে মুক্তি সম্ভব তা রামানুজাচার্য বিশ্বাস করতেন। হিন্দি সাহিত্যের বৈষ্ণব—কবিদের মধ্যে গোস্বামী তুলসীদাস এই মতবাদের দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। দার্শনিক স্তরে এই মতবাদকে বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ বলা হয়। আর এই সম্প্রদায়ভুক্ত সকলকে বলা হয় ‘শ্রীসম্প্রদায়’—এর মানুষ।
আচার্য মধ্বা দক্ষিণ ভারতের বেলিগ্রাম নামক অঞ্চলে দ্বাদশ শতাব্দীতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনিও ছিলেন ভক্তিবাদের এক অনন্য সাধক। বেদান্ত শাস্ত্রে বিশেষ পারদর্শিতা ছিল তাঁর। সন্ন্যাস গ্রহণের পর তাঁর নামকরণ হয় আনন্দতীর্থ। তিনি উত্তর—ভারত ভ্রমণের সময়ে বদ্রিকাশ্রমে এসেছিলেন। বেদব্যাসের কাছ থেকে তিনটি শালগ্রামের মূর্তি লাভ করেন। শিষ্যদের সুবিধার জন্য তিনি সেখানে আটটি মন্দির স্থাপন করেন। মধ্বাচার্য অদ্বৈতবাদের বিরোধী ছিলেন। তাঁর দার্শনিক মতবাদ ছিল দ্বৈতবাদ। তিনি বিশ্বাস করতেন ভগবান বিষ্ণু অষ্টগুণ সম্পন্ন। এই জগৎ সত্য, ঈশ্বর ও জীবের মধ্যে ভেদ, জীব ও জীবের মধ্যে ভেদ এবং জড় ও জীবের মধ্যে ভেদ এক বাস্তবিক সত্য। মধ্বাচার্যের সম্প্রদায়কে ব্রহ্ম—সম্প্রদায় বলা হয়।
ভারতের ইতিহাসে শ্রীবিষ্ণুস্বামী নামে তিনজন আচার্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। তাঁদের মধ্যে কাকে সঠিক আচার্যের স্থান দেওয়া হবে সেটি এখনও নির্ণয় করা যায়নি। ‘সর্বজ্ঞ সূক্তে’র রচনাকারী অনেকে রুদ্র—সম্প্রদায়ের আচার্যকে বিষ্ণুস্বামী বলে থাকেন। তাঁর সময় নির্ণয় করা কিছুটা কঠিন। তিনি বলেছেন ঈশ্বর সচ্চিদানন্দ স্বরূপে বিরাজ করেন। তিনি আপন আনন্দ—স্বরূপা চেতনার সঙ্গে বিজড়িত। মায়া তাঁরই অধীনে ক্রিয়াশীল থাকে। বিষ্ণুস্বামীর মতে ঈশ্বরের প্রধান অবতার হলেন নৃসিংহ অবতার।
শ্রীনিম্বার্কাচার্যের সময়কালও আজ পর্যন্ত নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। নিম্বার্ক সম্প্রদায় তাঁকে সৃষ্টির আদিপর্বে আবির্ভূত হয়েছিলেন বলে মনে করে। এই সম্প্রদায়ের দার্শনিক মতবাদ হল ভেদাভেদবাদ।
শ্রীনিম্বার্কাচার্য মনে করেন জীব অবস্থাভেদে ব্রহ্ম থেকে পৃথক। আবার তেমনি অভিন্ন ভাবও আছে। এই সম্প্রদায়ের সকলে রাধাকৃষ্ণের যুগল—মূর্তির উপাসনা করে থাকেন। ব্রজমণ্ডলে এই উপাসনার প্রচার আছে। নিম্বার্ক সম্প্রদায়ের অনেক কবিই ব্রজভাষায় অসাধারণ সমস্ত পদ এবং কাব্য রচনা করেছেন।
শ্রীবল্লভাচার্য রায়পুর জেলার চম্পারণে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর সমস্ত জীবন উত্তর ভারতের কাশী, প্রয়াগ এবং ব্রজমণ্ডলে অতিবাহিত হয়েছে। তিনি অত্যন্ত তেজস্বী এক ব্যক্তি হিসাবে প্রসিদ্ধি অর্জন করেছিলেন। এমনকি সম্রাট আকবর পর্যন্ত তাঁর জ্ঞান—গরিমার দ্বারা প্রভাবিত হন।
বল্লভাচার্য সম্প্রদায় এখন স্বতন্ত্র একটি সম্প্রদায় হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছে। এক সময় বিষ্ণুস্বামী সম্প্রদায়ের সঙ্গে এই সম্প্রদায়ের বিশেষ সম্পর্ক ছিল।
দার্শনিক দৃষ্টিভক্তির এই সম্প্রদায়ের মতবাদকে শুদ্ধাদ্বৈত বলা হয়ে থাকে। এই মতবাদ অনুসারে বলা হয় ব্রহ্ম মায়া থেকে সর্বদাই বিচ্ছিন্ন। ব্রহ্ম তাঁর অভেদ শক্তির দ্বারা সৎ, চেতনা শক্তির দ্বারা চিৎ এবং আনন্দস্বরূপ শক্তির দ্বারা আনন্দের উৎপত্তি করেছেন। ব্রহ্ম সত্য এবং নিত্য। তাঁর উৎপত্তি বা জন্ম হয় না। জীব হল এক অনুবৎ প্রাণী, তার তিনটি প্রকারভেদ। শুদ্ধ জীব, সংসারী জীব এবং মুক্ত জীব।
শুদ্ধাদ্বৈত দর্শন অনুসারে ঈশ্বরের যখন রমণ করার আকাঙ্ক্ষা জাগে তখন তিনি তাঁর নিজের আনন্দ প্রভৃতি গুণের অংশকে তিরোহিত করে জীবরূপ ধারণ করেন। ভগবানের ইচ্ছা হওয়াটাই একমাত্র কারণ, মায়ার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। নিজের মতবাদকে প্রতিপন্ন করার জন্য আচার্য একাধিক মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন।
বল্লভ সম্প্রদায়ের প্রচার এবং প্রসারের ক্ষেত্রে বল্লভাচার্যের পুত্র গোস্বামী বিঠল নাথের যোগদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সেইসময় মোঘল শাসকের ওপরে তাঁর যথেষ্ট প্রভাব ও প্রতিপত্তি ছিল। ব্রজমণ্ডলে বৈষ্ণব ধর্মের রক্ষার জন্য তিনি অনেক সাহসিকতাপূর্ণ কাজ করেছেন। উত্তর ভারত থেকে গুজরাট, রাজস্থান প্রভৃতি অঞ্চলে বল্লভ—সম্প্রদায় স্থাপন করা ছিল তাঁর এক অনন্য কীর্তি।
এই দার্শনিক এবং তাত্ত্বিক ভাবধারাকে অনুসরণ করে মধ্যযুগীয় হিন্দি সাহিত্যের উদ্ভব এবং বিকাশ চোখে পড়ে। মধ্যযুগীয় হিন্দি ভক্তিকাব্য সম্পর্কে বিদ্বান ব্যক্তিরা নানাসময়ে নানা ধরনের মন্তব্য করেছেন। মধ্যযুগীয় হিন্দি কাব্যে নির্গুণ এবং সগুণ দুটি ধারার বহিঃপ্রকাশ লক্ষ করা যায়। মনে প্রশ্ন জাগে, কেন এইভাবে হিন্দি আধ্যাত্মিক—সাহিত্য এই ধারামুখী হয়ে উঠেছিল! অনেকে বলে থাকেন তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্যই এমনটি হয়েছে।
আচার্য রামচন্দ্র শুক্ল তাঁর ‘হিন্দি সাহিত্যের ইতিহাস’ গ্রন্থে ভক্তিকাল সম্পর্কে একটি উল্লেখযোগ্য মতবাদ ব্যক্ত করেছেন। অবশ্য তাঁর মতবাদকে সামগ্রিকভাবে সত্য বলে স্বীকার করা যায় না। আচার্য হাজারীপ্রসাদ দ্বিবেদী, আচার্য শুক্লর মতবাদকে খণ্ডন করেছেন। আচার্য দ্বিবেদী পরিষ্কারভাবে বলেছেন যে, মধ্যযুগীয় রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে হিন্দি জনসম্প্রদায় হতাশায় আচ্ছন্ন হয়। তখন তারা এক ঐশী শক্তির সন্ধানে আত্মনিয়োগ করে।
শুক্ল আবার মন্তব্য করেছেন কর্মের অভাবে হিন্দুরা অপঙ্গপঙ্গু, জ্ঞানের অভাবে অন্ধ এবং ভক্তির অভাবে হৃদয়হীন এবং মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে। তাই ভক্তিবাদী পুনরুজ্জীবন চোখে পড়ে।
মধ্যযুগের হিন্দি সাহিত্যের সবথেকে বড়ো বৈশিষ্ট্য হল বিভেদ—ভাবনার, দৃশ্যপটকে মুছে ফেলার সার্বিক প্রয়াস। সে—যুগের বাস্তববাদী কবীরা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, হিন্দু এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে সখ্যের সম্পর্ক বজায় রাখা দরকার।
ইতিমধ্যে নাথপন্থীরা হৃদয়ের পক্ষপাতশূন্য সাধারণ অন্তঃসাধনার সন্ধান করে গেছেন। কিন্তু তাতে মানুষের আত্মা তৃপ্ত হতে পারেনি। মহারাষ্ট্রের প্রসিদ্ধ ভক্ত নামদেব এই সময় ভক্তিমার্গের আশ্বাস দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে উত্তর ভারতে নির্গুণ পন্থা নামে ভক্তির প্রচলন শুরু হয়। একথা অনায়াসে বলা যেতে পারে যে, কবীর একাধারে নিরাকার ঐশ্বর্যের উপাসনার জন্য ভারতীয় বেদান্তের মত গ্রহণ করেছিলেন। আবার নিরাকার ইশ্বরের ভক্তির জন্য মুসলমান সুফীবাদের প্রেমতত্ত্বকে মেনে নিয়েছিলেন। এই দুই—এর সংমিশ্রণে তৈরি হয় তাঁর নির্গুণ পন্থা।
কবীর এবং অন্য নির্গুণপন্থী সাধকেরা অন্তর্সাধনার ক্ষেত্রে রাগাত্মিকা ভক্তির প্রাবল্যকে স্বীকার করেছেন। তাঁরা ভক্তির সঙ্গে জ্ঞানকে যুক্ত করেছেন। তবে কর্মের ব্যাপারে নাথপন্থীদের অনুসরণ করেছেন। ঈশ্বরের ধর্ম স্বরূপকে কবীর এক অনন্য মাহাত্ম্য দিয়েছেন। ঈশ্বরীয় ধর্মভাবনার স্বভাবেই যে সব রমণীয় অভিব্যক্তির প্রকাশ ঘটে, তা জনসাধারণকে নানা বিপদ থেকে রক্ষা করে— এটাই ছিল মহাত্মা কবীরের আন্তরিক অভিজ্ঞান। কবীরদাস, স্বামী রামানন্দের শিষ্য হয়ে ভারতীয় অদ্বৈতবাদের সাধারণ বিচারধারা গ্রহণ করেন। সুফীদের চিরাচরিত কিছু আচার—আচরণ এবং বৈষ্ণবদের অহিংসাও নিষ্ঠার সঙ্গে গ্রহণ করেন। তাই কবীর প্রবর্তিত নির্গুণবাদের একদিকে যেমন অদ্বৈতবাদের প্রকাশ পরিলক্ষিত হয় তেমন কোথাও কোথাও শ্রুত হয় সুফীবাদের প্রেমতত্ত্বের কথা। কখনো কবীর পয়গম্বরদের কঠোর ঈশ্বরবাদকে অনুসরণ করেছেন, কোথাও আবার অহিংসাবাদের আশ্রয় নিয়েছেন।
এইভাবেই কবীর নির্গুণ কাব্যধারাকে নানাভাবে বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন করে তুলেছেন। কবীরের দোঁহার আধ্যাত্মিক অন্বেষণে নির্গুণ কাব্যধারার উৎস এবং ক্রমবিকাশের ওপর আলোকপাত করা দরকার। নির্গুণ ভক্তিবাদের উৎপত্তি বিষয়ে এমন কোনো মতপার্থক্য চোখে পড়ে না। ভক্তিক সূত্র বৈদিক ভাষ্যেই খুঁজে পাবার পর আমরা নির্গুণ ভক্তির উৎসটি পেয়ে যাই। কিন্তু প্রধান কথা হল উৎপত্তি নয়, কীভাবে নির্গুণ কাব্যধারা বিকশিত হল সেই বিষয়টি বিচার করা। অনেকেই বলে থাকেন মধ্যকালীন নির্গুণ বিকাশের সঙ্গে বৌদ্ধধর্মের বজ্রযান এবং সহজযান শাখাকে সংযুক্ত করতে হবে। তা না হলে ক্রমবিকাশের এই ধারাটি উপলব্ধি করা সম্ভব হবে না। একসময় ভারতবর্ষের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সহজযান সিদ্ধ পুরুষদের প্রভাব এবং প্রতিপত্তি যথেষ্ট অক্ষুণ্ণ ছিল। তাঁরা সপ্তম শতাব্দী থেকে শুরু করে পরবর্তী ৫০০ বছর ধরে ওই আধিপত্য বজায় রেখেছিলেন। এই সিদ্ধপুরুষদের সঙ্গে যোগ দিলেন নাথপন্থী সাধক—সাধিকারা। দশম এবং একাদশ শতকে তাঁরাই হয়ে উঠলেন ভারতবর্ষের প্রধান উপাস্য সম্প্রদায়। সিদ্ধ পুরুষদের এবং নাথপন্থীদের ভক্তিবাদ সম্পর্কিত বেশ কিছু রচনা হিন্দির নির্গুণ কাব্যধারাকে পরিপুষ্ট এবং সংশ্লিষ্ট করে।
সিদ্ধপুরুষ নাথপন্থীদের অপভ্রংশ, মিশ্রিত রচনা থেকে হিন্দি নির্গুণ রস— সাহিত্যের সৃষ্টি হয়েছে বলে অনেক ভাষাবিদ মনে করেন। আবার অনেকে এই মতবাদকে স্বীকার করতে চান না। এই তালিকায় রাহুল সাংকৃত্যায়ন, হাজারীপ্রসাদ দ্বিবেদী, পরশুরাম চতুর্বিদী, ডা. ধর্মবীর ভারতীর নাম উল্লেখযোগ্য। তাঁরা বলেছেন ভারতীয় সমাজে যে নির্গুণ সন্ত কবিদের প্রভাব— প্রতিপত্তি ছিল, তাঁরাই প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে হিন্দি নির্গুণ কাব্যধারাকে সমৃদ্ধ করেছেন।
নির্গুণ কাব্যধারার প্রধান প্রবক্তা হিসাবে আমরা অবশ্যই সন্ত কবীরের নাম করব। তিনি তাঁর বাণীর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্বের ভাবনাকে উজ্জীবিত করতে পেরেছিলেন। শুধু তাই নয়, কবীর নিম্নবর্গের মানুষের মধ্যে আত্মগৌরব—ভাবের উন্মেষ ঘটান। যে সমস্ত মানুষেরা অবচেতনার অন্ধকারে দিন কাটাতে বাধ্য হতেন তিনি তাঁদের মধ্যে এক নতুন জীবন—দিশার প্রবর্তন করেন। কবীরের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ প্রভাবে সমাজের একেবারে প্রান্তিক শ্রেণির মানুষরা মূলস্রোতে ফিরে আসার মতো সাহস এবং সামর্থ অর্জন করেছিলেন। এইভাবে কবীর তাঁর সামাজিক কর্তব্য সাধন করেন। তাঁর দোঁহাগুলিকে অনুসরণ করে অনেক প্রান্তিক মানুষ ভক্তিমার্গের উচ্চতম সোপানে পা—রাখার মতো দুঃসাহস অর্জন করেন। কবীর নিজেই এমন একটি নির্গুণপন্থা স্থাপন করেন। অনেককে তিনি প্রভাবিতও করেন। নানা সন্ত কবীরা কবীরের ধারাকে অনুসরণ করতে থাকেন। তাঁরা নির্গুণ, নিরাকার ঈশ্বরের ভজনা করতেন। তাঁদের ভক্তিকে নির্গুণবাদের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত বলে গণ্য করা হয়। তাঁরা অবতার এবং মূর্তির পূজাকে অস্বীকার করতেন। বহু দেবদেবীর আরাধনা ত্যাগ করে ঈশ্বরের পূজার বাহ্যিক আচরণকে বর্জন করতেন। তাঁরা নির্গুণ নিরাকার ঈশ্বরকে সাত্ত্বিকভাবে অর্চনা করতেন।
এই সন্ত কবীরা নানা কবিতায় তাঁদের দার্শনিক মতবাদকে প্রকাশ করেন। আচার আচরণের শুদ্ধতার ওপর জোর দিয়েই এই কবিতাগুলি লেখা হয়েছিল। এই কবীরা মানুষের সার্বিক, আত্মিক উন্নয়নের কথা বলতেন। তাঁরা বিশ্বাস করতেন আড়ম্বর এবং অনাবশ্যক কর্মকাণ্ডগুলিকে বর্জন করতে হবে। আত্মগরিমার প্রভাবকে ক্ষুন্ন করতে হবে। তাঁরা নিম্নবর্গের জনগণকে উন্নত করে তোলার ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় কাজ করে গেছেন। তাই আমরা সংক্ষেপে তাঁদের সমাজসংস্কারক বা ধর্মসংস্কারক বলতে পারি।
নির্গুণ ধারাতে এমন কিছু কবি ও সন্ত যুক্ত হয়েছেন যাঁরা সহজ প্রেমগাথা লিখে আমাদের সাহিত্যকে আরও উৎকৃষ্ট করে তুলেছেন। এইসব সাধক কবীরা লৌকিক প্রেমের প্রেক্ষাপটে যে প্রেমতত্ত্বের আভাস দিয়েছেন সেখানে প্রিয়তম ঈশ্বরের সঙ্গে ভক্তের মিলনবাসনা পরিস্ফুটিত হয়েছে। উত্তরপ্রদেশের পূর্বাঞ্চলে এবং মগধ প্রদেশের বংশ—পরম্পরাগতভাবে প্রচলিত প্রেমকাহিনি গুলির কথা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। এই কাহিনিগুলি অবশ্য অনেকসময়ে বাস্তবতাকে বর্জন করেছে। অনেক সময়ে আশ্রয়দাতা রাজা বা সম্রাটের প্রশংসা করেছে। তা সত্ত্বেও এই কাহিনিগুলির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনস্বীকার্য।
এইভাবে নির্গুণ কাব্যধারা নিজেকে নানা দিকে পরিব্যাপ্ত করল। সুফীদের অধ্যাত্ম—রহস্যবাদের পাশাপাশি মানব—মানবীর চিরন্তন প্রেম এবং ভালোবাসার উৎস অন্বেষণ করা— কত বিচিত্র পথেই এই ধারা প্রবাহিত হয়েছে!
নির্গুণ ধারায় ভক্তি—দর্শনের যে রূপ পরিস্ফুটিত হয়েছে সেই বিষয়টিও আলোচনা করা উচিত। নির্গুণ ভক্তি—সাহিত্যের অধ্যয়নকারীরা নির্গুণ সন্ত কবিদের রচনায় ইসলামের একেশ্বরবাদের সন্ধান করেছেন। এর পাশাপাশি তাঁরা বৌদ্ধদের শূন্যবাদকেও প্রাধান্য দিয়েছেন। কথাপ্রসঙ্গে শঙ্করাচার্যের অদ্বৈতবাদের আলোচনা করেছেন। শৈবদের অদ্বৈতবাদ অথবা রামানন্দীয় বিশিষ্টাদ্বৈতবাদের কথা প্রমুখ নির্গুণ সন্ত কবিদের রচনায় শোনা গেছে। সুফীদের প্রেম—সাধনার মধ্যে যে রহস্য লুকিয়ে আছে তা অন্বেষণ করেছেন কবীর এবং অন্যান্য সাধক কবীরা। বৈষ্ণব ভক্তির অনুরাগবাদ অথবা যোগ প্রতিপালিত হঠযোগ সাধনমার্গ ইত্যাদি তত্ত্বের সন্ধান আছে তাঁদের দোঁহার মধ্যে।
ঈশ্বরীয় সত্তা সম্পর্কে অদ্বৈতবাদে যে কথা বলা হয়েছে তাকে অনেক সন্ত কবি অনুসরণ করেন। আবার সুফী মতে যে একেশ্বরবাদের জয়গান করা হয়েছে, সে—কথাও অনেক কবি বলেছেন। তাই আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে, নির্গুণ কাব্যধারার কবীরা অদ্বৈত মতবাদকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। কিন্তু এই অদ্বৈতদর্শন শঙ্করাচার্যের প্রবর্তিত দর্শন থেকে কিছুটা আলাদা। তাই আমরা এই দর্শন বিচার করতে গেলে সুফী মতবাদকেও স্বীকার করব। যদি অদ্বৈত বেদান্ত দ্বারা প্রতিপাদিত অদ্বৈত দৃষ্টিকোণকে সন্ত কাব্যের মেরুদণ্ড বলে ধরে নেওয়া হয়, তাহলে স্বীকার করতে হবে সেখানে জ্ঞানমার্গেরও প্রদর্শন আছে। জ্ঞান ছাড়া মোক্ষলাভ হয় না— শঙ্করাচার্যের এই সিদ্ধান্তকে স্বীকার করলে সন্ত কবিদের মতকে জ্ঞানাশ্রিত মত বলে স্বীকৃতি দিতে হয়। কিন্তু যে সকল নির্গুণবাদী ছিলেন শাস্ত্রবিমুখ এবং তথাকথিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে যাঁদের কোনো যোগসূত্র ছিল না তাঁরা কি এইভাবে চিন্তা করতে পারতেন? জ্ঞানার্জনের জন্য শাস্ত্র অধ্যয়ন করা অনিবার্য বলে এই সন্তরা শাস্ত্র অধ্যয়ন করে সময় নষ্ট করার পক্ষপাতী ছিলেন না। তাঁরা সোপার্জিত আধ্যাত্মিক চেতনার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। এই অনুপ্রেরণা তাঁদের মধ্যে এমন এক উপলব্ধির জন্ম দিয়েছিল যার সাহায্যে তাঁরা সৎ এবং অসৎ বস্তুর বিচার করতে পারতেন। তাই শঙ্করাচার্যের অদ্বৈতবাদই যে তাঁদের কাব্য রচনার একমাত্র সহায়ক তত্ত্ব একথা বলা উচিত নয়। অদ্বৈতবাদের জ্ঞানমূলক স্বীকৃতিকে সন্তকবীরা সহজভাবে অস্বীকার করেছেন। তাঁদের ঈশ্বরীয় সত্তায় এবং চিন্তায় প্রেম, ভক্তি এবং অন্যান্য মানবিক গুণের বহিঃপ্রকাশ চোখে পড়ে। তাঁরা বিশ্বাস করতেন অনুভূতির বাহ্যজ্ঞানকে। তাঁরা শুধুমাত্র পুঁথি পাঠ করে বিদ্বান হতে চাইতেন না।
নির্গুণ ধারার সন্তরা যে ভক্তি প্রতিপাদন করেছেন তার মূলধারা অন্বেষণ করতে গিয়ে আমরা বিভিন্ন মতবাদের সম্মুখীন হব। ভারতবর্ষের বুকে নানা সম্প্রদায় স্বীয় স্বীয় ধর্ম মতবাদকে কেন্দ্র করে জীবনচর্চা করেছেন। তাঁদের নিজস্ব দার্শনিক মতবাদ ছিল। ছিল উপাসনা পদ্ধতি। কবীর প্রমুখ সন্তদের সময়কার ধার্মিক এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা উচিত। সেই সময়ে সারা দেশে রাজনৈতিক ক্রান্তি দেখা দিয়েছিল এ বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। শঙ্করাচার্য এবং তাঁর পরবর্তী বৈষ্ণব আচার্যদের প্রভাবে অদ্বৈত—মতবাদের দার্শনিক ক্ষেত্র পরিব্যাপ্ত হয়। শৈব এবং শাক্ত মতাবলম্বীরা তখন আগের থেকে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। বৌদ্ধ মত তখন ক্রমশ ধ্বংসের পথে এগিয়ে চলেছে। কিন্তু সিদ্ধ এবং নাথ সম্প্রদায়রা তাঁদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি বজায় রেখেছেন। দক্ষিণ ভারতের আলবার নামে এক নতুন ভক্ত সম্প্রদায়ের উদ্ভব চোখে পড়েছে। এইভাবে নানা ধরনের ধার্মিক মতবাদ তখন ভারতের জনচিত্তকে আলোড়িত করেছিল।
এরই প্রভাবে নির্গুণ ধারার সন্ত কবিরা নতুন পথের প্রবর্তক হলেন। তাঁরা সগুণ ঈশ্বরের আরাধনার উপদেশ দিলেন। তাঁদের যে জীবন—অন্বেষার কথা আমরা শুনে থাকি তা শুদ্ধ এবং অনাবিল। তাঁরা কোনো একটি নির্দিষ্ট দার্শনিক মতবাদের দ্বারা সেইভাবে প্রভাবিত হননি। বিভিন্ন দর্শনচিন্তার সার্থক রূপায়ন ঘটে গিয়েছিল তাঁদের মতবাদের মধ্যে। সন্তদের ঈশ্বর নির্গুণ নিরাকার এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু তার মধ্যে দয়া—দাক্ষিণ্যের অভাব ছিল না। অর্থাৎ এই ঈশ্বরকে তাঁরা পরম দয়ালু হিসাবেই চিহ্নিত করেছিলেন। ব্রহ্মা ঈশ্বর অথবা রামের স্বরূপ সত্ত্বা এবং সর্বশক্তিমান হলেও তিনি কিন্তু কোনো অবতার ছিলেন না। সংসারে তিনি বারবার আগমন করেছেন। মানুষকে ঈশ্বরভক্তির পথে নিয়ে গেছেন। মানুষের জীবনে এনেছেন অকৃপণ ভগবৎকৃপা। সন্তদের ভক্তিসাধনাতে অষ্টাঙ্গ যোগের আধিপত্য আছে, কিন্তু এই যোগ কোনো শাস্ত্রীয় জড়তাতে পরিপূর্ণ নয়। এখানে প্রায়শ্চিত্ত সাধনা, আসন প্রাণায়াম এবং সমাধি করতে হত। আচারনিষ্ঠা এবং মনোনিবেশ ছিল এই জাতীয় যোগ সাধনার প্রধান উদ্দেশ্য। এই যোগ নাথ সম্প্রদায়ের পরম্পরা থেকে আগত। ভক্তির সঙ্গে তাকে সমন্বিত করা হয়েছিল। এই যোগসাধনাকে সফল করার জন্য কুণ্ডলিনী—যোগের প্রচলন ছিল। প্রসঙ্গত আমরা চক্রকমল, মুদ্রা, ধ্যান, সুরতি, নিরতির কথা বলব।
সন্ত কবিরা আবার বৈষ্ণব রস—সাহিত্যের দ্বারাও প্রভাবিত হয়েছিলেন। এখানে অদ্বৈতভাব এবং ভক্তিভাব পাশাপাশি বহমান ছিল। বিষ্ণুর উপাসক অথবা অবতাররূপী ঈশ্বরের উপাসক পাশাপাশি বসে ঈশ্বরের আরাধনা করতেন। যদিও কবীর বৈষ্ণবজনদের রামের সমক্ষে রেখে বলেছিলেন—
মেরো সঙ্গী দোঈ জনাঁ,
এক বৈষ্ণোঁ এক রাম।
ও হৈঁ দাতা মুকতিকা,
ও সুমিরাওয়ে নাম।।
অর্থাৎ আমার সঙ্গী দুজন, একজন বিষ্ণু এবং অন্যজন রাম। তাঁরাই মুক্তিদাতা এবং তাঁরাই স্মরণযোগ্য নাম।
এই দোঁহাটি পাঠ করলে আমরা বুঝতে পারি কবীর রাম এবং বিষ্ণুকে একইভাবে শ্রদ্ধা এবং ভক্তি প্রদর্শন করেছেন। তাঁর চোখে রাম এবং বিষ্ণুর মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না।
***
