মহাদেবী – ১
মধ্যগ্রীষ্মের নিদাঘখর দ্বিপ্রহর। মার্তণ্ডদেব যেন সহস্র অগ্নিজিহ্বা দিয়ে এই ধরিত্রীকে দহন করতে উদ্যত হয়েছেন। পথঘাট জনশূন্য। আকাশে কোনও পাখি নেই। বৃক্ষরাজি ম্রিয়মাণ, তৃণদল হরিদ্রাভ বর্ণ। ওই দূর পর্বতের দিকে তাকালে মনে হয় সামনের দৃশ্যাবলী যেন ছায়াচিত্রের মতো কেঁপে কেঁপে উঠছে। কোথাও কোনও আনন্দ নেই, প্রাণের সাড়া নেই, জীবনের স্পন্দন নেই।
এই পার্বত্য প্রদেশের আবহাওয়া বড়ই চরমভাবাপন্ন। দিবাভাগ যেমন নিষ্করুণ, রাত্রি তেমনই নির্মম। দিবাবসানের সঙ্গে সঙ্গে নির্জন শৈত্য ঘিরে ধরে এই ভূভাগকে৷ সতর্ক হাওয়ার দল প্রেতচ্ছায়ার মতো নেমে আসে পাহাড়ের খাঁজে৷ আর সেই শীতল প্রস্তরখণ্ড ঘিরে ক্রমাগত পাক খেতে থাকে। মনে হয় যেন কোনও উপবাসী নারী এক বিন্দু জলের আশায় ক্রমাগত লেহন করে চলেছে শীতল পাথুরে মেঝে।
মানুষটি যে পথ ধরে হেঁটে আসছিল সে পথে একটিও নদী বা প্রস্রবণ নেই। তার সঙ্গে থাকা মশকটি নিঃশেষিত হয়েছে পূর্বদিনেই। যেটুকু খাদ্যসামগ্রী নিয়ে সে পালাতে পেরেছিল তা কবেই উদরসাৎ হয়েছে৷ অন্ন তার কাছে বোধকরি গতজন্মের স্মৃতি। এই শুষ্ক, ফলহীন, খাদ্যহীন, নির্জলা পথে হেঁটে আসতে আসতে তার মনে হচ্ছিল বুকখানি এবার ফেটে যাবে বোধহয়।
অথচ তাকে যেতেই হবে। যে করেই হোক তাকে বেঁচে থাকতেই হবে। পৌঁছতে হবে সভ্য সমাজে। মালব, জাবালী, কুরু, অবন্তী, মৎস, সর্বত্র জানাতে হবে কী পাশবিক সন্ত্রাস নেমে এসেছে এই জম্বুদ্বীপের বুকে! নেমে এসেছে এক মূর্তিমান নৃশংস দানবের রূপ ধরে। তার আদিম নৃশংসতার, তার নারকী অত্যাচারের, তার পাশবিক হিংস্রতার অন্ত নেই।
খানিক পথ পেরিয়ে মানুষটি টলতে বসে পড়ল পথের ধারে৷ পা আর চলে না, শরীরে আর বিন্দুমাত্র শক্তি অবশিষ্ট নেই। দীর্ঘ দুইদিন ধরে অভুক্ত সে। মশকটিতে একবিন্দু জল অবশিষ্ট নেই।
জম্বুদ্বীপের উত্তর পশ্চিম অঞ্চল জুড়ে শকাধিপত্যের কালো মেঘ ঘনিয়ে এসেছিল বহুকাল আগে। গান্ধার, পুরুষপুর, পারস্য প্রভৃতি ভূভাগ তাদের অধীনস্থ ছিল। সেই বিজাতীয় শকবংশের একটি শাখা সৌরাষ্ট্র, উত্তর মালব, সিন্ধু থেকে শুরু করে মথুরা এবং উত্তরকুরুর বেশ কিছু পার্বত্য অঞ্চল নিজ অধীনে আনে।
তাতে সাধারণ মানুষের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষের এক আশ্চর্য উদাসীন সহ্যশক্তি আছে। তাদের চোখের উপর দিয়ে কত শত মহান সাম্রাজ্যের উত্থান ঘটল। কত শত অত্যুজ্জ্বল রাজবংশের গরিমা পলকে ধুলায় মিলিয়ে গেল। কত বীরত্বের আস্ফালন, কত অস্ত্রশস্ত্রের ঝনঝনানি, কত স্পর্ধার উচ্চারণ, চোখের নিমিষে উধাও হল নিকষ মায়ারাত্রির মধ্যে। কিন্তু ভারতের মানুষের সহজ স্বাভাবিক শান্ত লয়ে বয়ে যাওয়া জীবনযাত্রার কোনও পরিবর্তন হল না। তারা লড়তেও যায় না, কাটতেও যায় না, শুধু বসে বসে সবকিছু নির্মোহ চোখে নিরীক্ষণ করতে থাকে। তারা জানে বিধাতার সবথেকে বড় প্রসাদ—বেঁচে থাকা।
কিন্তু এইবার তাদের শান্ত জীবনতরঙ্গে যে অতি বৃহৎ ঝঞ্ঝাবাত্যার সৃষ্টি হয়েছে, তার বুঝি তুলনা নেই।
মানুষটি হাঁটতে হাঁটতে একবার আকাশের দিকে তাকায়। দেব দিবাকর যেন মহারুদ্ররূপ ধারণ করে এই পৃথিবী সংহারে উদ্যত হয়েছেন। আকাশ জুড়ে চলছে প্রলয়বহ্নির উদ্দণ্ড তাণ্ডব।
চোখ নীচে নামিয়ে নেয় সে। জল নেই? একবিন্দু জল নেই কোথাও? এই তবে শেষ? তার চোখের সামনে তার সন্তানের মুণ্ডচ্ছেদ, তার প্রিয়তমা স্ত্রীর সম্ভ্রমহানির কোনও প্রতিশোধই নিতে পারবে না সে?
এতক্ষণে তার মৃতদেহ পথের পাশে পড়ে থাকার কথা। কিন্তু সে কোনও সাধারণ মানুষ নয়, কশ্যপমীরের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি সে। তাকে বেঁচে থাকতেই হবে এই নৃশসংতার কাহিনি পৃথিবীকে জানানোর জন্য।
কিছুটা এগোনোর পর আর পারল না সে৷ তার চোখের সামনে পৃথিবী অন্ধকার হয়ে এল। মৃত মানুষের মতো তার শরীরটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
.
মেয়েটি উছল ঝরনার মতোই হেঁটে আসছিল পাহাড়ি পথ ধরে। তার পায়ে চঞ্চলতা, গলায় গান, মনে উচ্ছ্বাস। সঙ্গীত তার আত্মার বিশ্রাম, অন্তরের আনন্দ।
এই ক্ষুদ্র পার্বত্যগ্রামটির উত্তরদিকে, উপত্যকার পিছনে একটি ক্ষুদ্র প্রস্রবণ আছে৷ তার জল ভারি সুমিষ্ট। লোকে বলে তার স্বাদ নাকি অমৃততুল্য। সেই প্রস্রবণের একবিন্দু জল মুখে গেলে নাকি মুমূর্ষুও বেঁচে ওঠে, এমনই জাদু তার। অথচ সেখানে কেউ যায় না।
লোকপ্রবাদ, সেখানে নাকি বিষধর সর্পের ভয়ানক উৎপাত। আর তাদের বিষের প্রতিষেধক শ্রেষ্ঠতর ভিষগদেরও অজানা। কিন্তু কোন এক আশ্চর্য উপায়ে সে নিয়তই সেখানে যায়। এবং একা নয়, নিয়ে যায় তার সঙ্গীসাথীদেরও। লোকে বলে সর্প বশীকরণের কোনও গোপনবিদ্যা জানে এই মেয়ে। শুধু সর্প কেন, এই পার্বত্যদেশের পশুপাখিদের বশ করার সমস্ত কৌশল করায়ত্ত তার। সে যখন ওই উপত্যকায় যায়, তখন সেই ভয়ানক সর্পকুল কেন, যাবতীয় হিংস্র পশুরা পর্যন্ত চিত্রার্পিতের মতো তাকে ঘিরে শুয়ে থাকে! যেন এই কিশোরীর পোষ্য তারা।
সেই প্রস্রবণে গিয়ে সে হাতে তুলে নেয় বাঁশি। আর মুহূর্তের মধ্যে পাহাড়ের আকাশে বাতাসে ভাসতে থাকে সেই মনকেমনিয়া বাঁশির সুর৷ সুরের তরঙ্গে থরে থরে কাঁপতে থাকে আকাশের চাঁদ, ঈষৎ উষ্ণ হয়ে ওঠে গৃহস্থের চুল্লিতে রাখা সফেন দুগ্ধ। শিশুদের নিদুলিসঙ্গীতের সঙ্গে মিশে যায় ঝিমঝিম মায়াজোৎস্নার অমৃতস্রোত। এই ক্ষুদ্র বসতির যুবক-যুবতীদের রক্তে জাগে মাতন।
কাল ছিল বৈশাখী পূর্ণিমা। সে ও তার সঙ্গীসাথীরা প্রদীপ আর পায়সান্ন নিয়ে গিয়েছিল গ্রামের প্রান্তস্থিত অশ্বত্থ বৃক্ষের মূলে। আজ নাকি সিদ্ধার্থ গৌতম তাদেরই মতো কোনও এক গ্রাম্যবালিকার হাতে প্রস্তুত পায়েস খেয়ে বুদ্ধত্ব অর্জন করেছিলেন, ভগবান তথাগত হয়ে উঠেছিলেন৷ সেই থেকে তাদের বসতির সকল কিশোরী-তরুণীর দল বনজোছনার হরিৎ অন্ধকারে পূজা উৎসর্গ করে আসে সেই মহামানবের প্রতি।
গতরাত্রির সেই ভক্তিবিন্দু যেন এই প্রখর বৈশাখী দ্বিপ্রহরেও তার সমস্ত শরীর জুড়ে ছড়িয়ে আছে। সেই আনন্দ, বুদ্ধের চরণে সেই সমর্পণ, সে কি ভোলা যায়?
পথের বাঁক ঘুরেই অবশ্য তার সেই আবেশ নিমেষে অন্তর্হিত হল। পথের মধ্যে শায়িত আছে একটি মনুষ্যশরীর। তার শালপ্রাংশু দেহ ধুলায় ধূসরিত। পোশাক ছিন্নবিচ্ছিন্ন, ক্ষতবিক্ষত নগ্নপদদুখানি থেকে রক্তধারা এসে মিশে যাচ্ছে পথধুলায়। শরীরে প্রাণ আছে কি নেই বোঝা যায় না।
মেয়েটি দৌড়ে গেল সেখানে। মানুষটা বেঁচে আছে তো?
.
প্রায়ান্ধকার কক্ষটিতে উপস্থিত আছেন দুইজন মানুষ। কক্ষের অন্য প্রান্তে দীপদানে একটি দীপ জ্বলছে৷ তার আলোয় অন্ধকারে দুইজনের ছায়া দুলছে দেওয়ালের গায়ে৷ লক্ষ করলে বোঝা যায় যে, এটি কোনও সম্পন্ন গৃহস্থের কক্ষ। দেওয়ালে কয়েকজন রাজপুরুষের চিত্র। বাতায়নে দুলছে বহুমূল্য চীনাংশুক। মেঝেটি মহার্ঘ কুতপে আবৃত।
ঘরের মধ্যস্থানে রাখা আছে একটি অনুচ্চ চতুষ্পদী কাষ্ঠাধার। তার ওপর একটি স্বর্ণনির্মিত সুদৃশ্য কলস। আর তার দুইপাশে দু’খানি বহুমূল্য রত্নখচিত ভৃঙ্গার।
কাষ্ঠাধারের দুইপাশে দুইজন মানুষ উপাধান অবলম্বন করে অর্ধশায়িত হয়ে সুগন্ধি তাম্বাকু সেবন করছিলেন। সেই সুমিষ্ট অথচ তীব্র তাম্বাকুধূমে ঘরের বাতাস অস্বচ্ছ ও ভারী হয়ে উঠেছে। আর সেই অস্বচ্ছ নীরবতা ভঙ্গ করে একজন প্রশ্ন করলেন, ‘এই তাহলে আপনার পরিকল্পনা, মিত্র?’
প্রশ্নটি যিনি করলেন বোধকরি তিনিই গৃহস্বামী। তাঁর শালপ্রাংশু মহাভুজ শরীরের দিকে দৃকপাতমাত্রে শ্রদ্ধার উদ্রেক হয়। প্রশস্ত বক্ষে, বলদৃপ্ত বাহুতে, সুউন্নত স্কন্ধে বিপুল বলের আভাস৷ বর্ণ গৌর, কেশগুচ্ছ কুঞ্চিত, গুম্ফখানি সুপুষ্ট, এবং চক্ষুদুটি শীতল ও ক্রূর।
শ্রোতা মানুষটি সামান্য কেশে নিলেন। তিনি বোধকরি এই দেশের অতিথি। কারণ যে পরিমাণ শীতবস্ত্র তিনি অঙ্গে জড়িয়ে রেখেছেন তাতে প্রতীয়মান হয় যে তিনি উষ্ণ প্রদেশের মানুষ। বস্তুতপক্ষে এই শুষ্ক ও শীতল পার্বত্য আবহাওয়া তাঁর সহ্য হচ্ছে না। তিনি বহুবার ভেবেছেন যে কালই প্রভাতে এই পার্বত্য আবাস ছেড়ে নেমে যাবেন সমতলে। চুলোয় যাক তাঁর এতদিনের সাধের পরিকল্পনা। এ অত্যাচার তো আর সহ্য হয় না!
কিন্তু তিনি জানেন যে সে সম্ভব নয়। তাঁর সামনে এখন আর কোনও দ্বিতীয় পথ নেই, নান্যঃ পন্থা বিদ্যতেহনায়। যে পথে নেমেছেন সে পথে একবার পা দিলে ফিরবার উপায় থাকে না।
শ্রোতা তাঁর সম্মুখস্থ স্বর্ণভৃঙ্গারটি তুলে চুমুক দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে এক কবোষ্ণ ও কোমল আবেশ তাঁর কণ্ঠদেশ হতে পাকস্থলীর দিকে নামতে লাগল। আহঃ, বড় ভালো, বড় সুন্দর এই দ্রাক্ষা, তৃপ্ত আবেশে চোখ বুজলেন তিনি। স্বার্থ ছাড়া আর দ্বিতীয় যে কারণটির জন্য তিনি বারবার এই পার্বত্য দুর্গে ফিরে ফিরে আসেন, সেটি হচ্ছে পারস্যদেশাগত এই সুগন্ধী দ্রাক্ষারস।
পারস্য এক সুপ্রাচীন মহান দেশ। এই জম্বুদ্বীপের বৈদিক অগ্নি-উপাসকরাই নাকি বহু সহস্র বর্ষ পূর্বে বসতি স্থাপন করেছিল সেখানে। তদবধি অগ্নি-উপাসনা সে দেশের প্রধান ধর্ম। আর সেই পারস্য দেশের উত্তরার্ধে এক আশ্চর্য জনজাতি বাস করে, দেবসেনাপতি কার্তিকেয়র বাহন ময়ূর যাদের প্রধান উপাস্য। এই কার্তিক জনজাতি নাকি সেই উপত্যকায় এমন এক আশ্চর্য বহুবিচিত্রবর্ণ ফুলের চাষ করে, যার সুগন্ধে বহুদূর পর্যন্ত বসতির পর বসতি আবিষ্ট হয়ে থাকে। সেই সুগন্ধি ফুলের রেণু অত্যুৎকৃষ্ট দ্রাক্ষারসে জারিত হয়ে এমন মধুর সর্বনাশীর রূপ ধারণ করে। তবে বেদনার বিষয় এই যে, কুরুর পূর্বে এই অসামান্য দ্রাক্ষারসটি আনা যায় না, আর্দ্র আবহাওয়া নষ্ট হয়ে যায়।
শ্রোতাটি চোখ বন্ধ করে কিছু মৃদু আবেশ উপভোগ করে বললেন, ‘এই আপনার সুবর্ণ সুযোগ মহারাজ। এ সুযোগ হেলায় হারাবেন না।’
গৃহস্বামী ভ্রুকুঞ্চন করে বললেন, ‘আপনি বলছেন গুপ্তসাম্রাজ্য আশু পতনের সম্মুখীন। কারণ গুপ্তসম্রাট সমুদ্রগুপ্ত মৃত্যুশয্যায় এবং তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্রটি একটি অকালকুষ্মাণ্ড বিশেষ।’
‘যথার্থ।’
‘তাহলে তো সমুদ্রগুপ্ত ধরাধাম ত্যাগ করা মাত্র আমাদের পাটলিপুত্র আক্রমণ করা উচিত।’
‘আজ্ঞে না মহারাজ। ওই দুর্মতি যেন আপনার না হয়। মনে রাখবেন, গুপ্তসেনা এখন অপরাজেয়। রণকৌশলে আর শৌর্যে তাদের সম্মুখীন হওয়া আর পরাজয়কে সাদরে আমন্ত্রণ করে আনা একই ব্যাপার।’
‘আপনি কি আমাদের শক্তিসামর্থ্যে সন্দেহ প্রকাশ করছেন মিত্র?’ ভ্রুকুঞ্চন করলেন গৃহস্বামী।’
‘আজ্ঞে না মহারাজ, অধমের প্রগলভতা মার্জনা করবেন। হতে পারে আপনার সৈন্যবাহিনী শৌর্যবীর্যে মাগধী সেনাদের থেকে কিঞ্চিৎ বেশিই প্রবল। কিন্তু তারা পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ, সমতলের উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় যুদ্ধ করার জন্য উপযুক্ত নয়। তদুপরি স্বক্ষেত্রে কুক্কুরীও বাঘিনীবিশেষ। মগধে প্রবেশ করে অজেয় গুপ্তবাহিনীকে পরাস্ত করা শুধু কঠিনই নয়, অসম্ভব বটে। তাছাড়া আরও একটি কারণ আছে৷ আর সেইটিই মুখ্য।’
‘কী?’
‘সম্রাট সমুদ্রগুপ্তর জ্যেষ্ঠ সন্তানটি অপদার্থ হলে কী হবে, তাঁর মধ্যমপুত্রটি সাহসে শৌর্যে আর বুদ্ধিমত্তায় সম্রাটের যোগ্য উত্তরসূরি। ইতিমধ্যেই রাজ্যশাসনের বিভিন্ন বিষয়ে সম্রাট তাঁর মধ্যমপুত্রটির ওপর নির্ভর করতে শুরু করেছেন। এমনকী ঘনিষ্ঠদের কাছে এই ইচ্ছেও ব্যক্ত করেছেন যে তাঁর মৃত্যুর পর মধ্যমপুত্র চন্দ্রগুপ্তকেই তিনি গুপ্তসম্রাটের পদে আসীন দেখতে চান। আর তাই যদি হয়…’
গৃহস্বামীর স্বরে হিসহিসিয়ে উঠল হিংস্র রাজরোষ, ‘সেই তথ্য জানার জন্য তো আপনার পদদ্বয়ে অপরিমিত স্বর্ণমুদ্রা উৎসর্গ করিনি মিত্র। এই অঘটন কী করে আটকানো যাবে আর কীভাবে পাটলিপুত্র আমার অধীনে আসবে সেই পরিকল্পনাটি জানান।’
শ্রোতা মানুষটি দ্রাক্ষারসে নিজ ভৃঙ্গারটি পূর্ণ করে নিলেন। তারপর বললেন, ‘ধীরে মহারাজ, ধীরে৷ উত্তেজনা মানুষের বুদ্ধিকে ভ্রষ্ট করে। আপনাকে হতাশার বাণী শোনাব বলে তো এখানে আসিনি। আর আপনার স্বার্থপূরণের সঙ্গে আমার স্বার্থসিদ্ধিও যে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তা বিস্মরণ হননি আশা করি। এবার শান্ত হয়ে আমার পরিকল্পনাটি শুনুন।
গুপ্তরাজবংশের একটি প্রথা আছে। সচরাচর সম্রাটের মহাপ্রয়াণের পর তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্রই রাজত্বের উত্তরাধিকারী হন। কিন্তু এই নিয়মের একটি ব্যত্যয় আছে। সম্রাট চাইলে জ্যেষ্ঠ পুত্র ব্যতীত নিজের মনোনীত অন্য কাউকে পরবর্তী সম্রাটরূপে নির্বাচিত করে যেতে পারেন। কিন্তু সেই নির্বাচন তখনই বৈধ হবে যখন সম্রাট নিজে বরিষ্ঠ সভাসদদের সামনে সেই নির্বাচিত ভাগ্যবানের হাতে নিজের রাজমুকুটটি তুলে দেবেন। যদি কোনও কারণে তা সম্ভব না হয়, সেক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠ পুত্রই প্রথানুযায়ী সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারীরূপে গণ্য হবেন।’
গৃহস্বামী কিঞ্চিৎ ভ্রুকুটি কুটিল চোখে বক্তব্যটি প্রণিধান করলেন। তারপর বললেন, ‘আপনার বক্তব্যের মধ্যে কিছু গূঢ়ার্থের সন্ধান পাচ্ছি মিত্র। বিস্তারিত ব্যাখ্যা করবেন কি?’
শ্রোতা এবার একটু উঠে বসলেন। ভৃঙ্গারটি হাতে ধরে বললেন, ‘রাজবৈদ্য আমার ঘনিষ্ঠ স্বজন। তিনি জনান্তিকে আমাকে জানিয়েছেন যে সম্রাটের আয়ু বড়জোর আর দুই মাস মাত্র। এই দুই মাস যদি কোনওগতিকে কুমার চন্দ্রগুপ্তকে পাটলিপুত্র হতে দূরে সরিয়ে রাখা যায়, তাহলেই পরিকল্পনার প্রথমার্ধ সফল। কুমার চন্দ্রগুপ্তর অনুপস্থিতিতে সম্রাট পরলোকগমন করলে প্রথানুযায়ী কুমার রামগুপ্তই সম্রাট হবেন। সেক্ষেত্রে পরিকল্পনার দ্বিতীয় ভাগ বাস্তবায়িত করা আমাদের পক্ষে অনেক সহজ হবে।’
‘আর চন্দ্রগুপ্তকে কোন কূটকৌশল দ্বিমাসাধিককাল পাটলিপুত্র হতে দূরে সরিয়ে রাখবেন শুনি?’
‘উপায় আছে সম্রাট। একটিই উপায় আছে। মন দিয়ে শুনুন।
মালবের ওপর আপনার লক্ষ্য বহুদিনের। এই মালব এককালে গুপ্তদের করদ রাজ্য ছিল। ক্রমে দুই রাজবংশের মধ্যে বন্ধুতার সম্পর্ক স্থাপিত হয়। মালবরাজ চন্দ্রজ্যোতি এবং সম্রাট সমুদ্রগুপ্ত একই গুরুকুলে শিক্ষাগ্রহণ করেন। তাঁদের বাল্যবন্ধুত্ব ক্রমে গভীর রূপ ধারণ করে। সেই বন্ধুত্ব অদ্যাবধি অটুট। এমনকী চন্দ্রজ্যোতি বিবাহও করেন সমুদ্রগুপ্তর এক অতিদূর সম্পর্কের আত্নীয়া চন্দ্রলেখাকে।
সম্রাট সমুদ্রগুপ্ত ভগিনীর বিবাহের যৌতুকরূপে মালবদেশকে করমুক্ত রাজ্য ঘোষণা করেন। তাতে দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্ব আরও বর্ধিত হয়। সম্রাট যতবার উজ্জয়িনীতে অবসর বিনোদনে গেছেন, ততবার মালবরাজ চন্দ্রজ্যোতি সম্রাটের প্রিয় বয়স্যরূপে আমন্ত্রণ পেয়ে এসেছেন। সেই অবসর বিনোদন ছিল দুই সমবয়সি সহপাঠীর বয়সকালের স্মৃতিমন্থন।
আপনি মালব আক্রমণের বার্তা পাঠান। বর্তমানে আপনার সৈন্যবাহিনীকে যদি কেউ প্রতিহত করতে পারে সে হল সম্রাট সমুদ্রগুপ্তর অধীন গুপ্তসেনানী। মালবের এই দুর্দিনে সম্রাট চুপ করে বসে থাকতে পারবেন না। তিনি নিজে না এলেও, অবশ্যই কুমার চন্দ্রগুপ্তকে পাঠাবেন। আপনার উদ্দেশ্য হবে আক্রমণের উদ্যোগ, অভিনয় ইত্যাদিতে চন্দ্রগুপ্তকে মালবে ব্যস্ত রাখা। ইত্যবসরে সম্রাট পরলোকগমন করলে কুমার রামগুপ্তই হবেন পরবর্তী সম্রাট।’
‘বুঝলাম। কিন্তু তার পর? পাটলিপুত্র আমার অধিকারে আসবে কী করে সেইটি বলুন।’
অতিথি মহোদয় খুক খুক করে হাসলেন। তারপর বললেন, ‘সেইটি পরে জানাব মহারাজ। কারণ সেটি বাস্তবায়িত করতে গেলে চতুরঙ্গের অন্য অনেক অঙ্গ ব্যবস্থাপিত করতে হবে। তার জন্য সময় প্রয়োজন। সময় হলেই আপনার কাছে দূত প্রেরিত হবে।’
গৃহস্বামী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি জানতেন যে এই উত্তরই পাবেন। এই ব্রাহ্মণবটুর ধূর্ততা তুলনাহীন। ইনি কখনই নিজের পরিকল্পনা সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করবেন না। তিনি চান এই ক্রীড়ার সমস্ত সূত্রগুলি নিজের কুক্ষিগত করে রাখতে, যাতে ক্রীড়নকদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতেই থাকে।
‘উত্তম, আপনার কথাই থাক তাহলে। তবে এইবার আমার একটি শর্ত আছে।’
‘বলুন মহারাজ।’
‘আশঙ্কা করছি যে রামগুপ্তর সিংহাসনারোহন খুব একটা নির্বিঘ্ন হবে না। নির্বিঘ্ন হওয়ার কথাও নয়। ইতিমধ্যে নিশ্চয়ই সভাসদদের একাংশ চন্দ্রগুপ্তর প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েছেন। চাণক্য বলেন এমত পরিস্থিতিতে রাজন্য ও রাজসভাসদরা ক্রুদ্ধবর্গ, ভীতবর্গ, লুব্ধবর্গ এবং মানীবর্গ—এই চার বর্গে বিভাজিত হন।’
‘আপনার বক্তব্য যথাযথ, রাজন।’
‘আমার কাছে সংবাদ আছে যে পাটলিপুত্রের সমাহর্তা দিবোদাস ক্রমেই কুমার চন্দ্রগুপ্তর বিশেষ আস্থাভাজন হয়ে উঠেছেন। তিনি বোধকরি ক্রুদ্ধবর্গেই পড়বেন। তদুপরি পাটলিপুত্রের গুপ্তচরদের প্রসিদ্ধি প্রবাদপ্রতিম। তাদের কপটিক, উদাস্থিত, গৃহপতিব্যঞ্জন, বৈদেহক, প্রতিটি বিভাগই সুনিপুণ এবং সুসংহত। আমার আশঙ্কা এই হট্টগোলের সময়ে প্রতিটি ক্ষমতাশালী রাজপুরুষ তাঁদের অনুরক্ত গুপ্তবাহিনীকে নিজ নিজ স্বার্থরক্ষার কার্যে নিয়োজিত করবেন।’
অতিথি মৃদু হাসলেন। এই না হলে এত বড় সাম্রাজ্যের রাজন। আগত পরিস্থিতির সঠিক মূল্যায়ন করেছেন গৃহস্বামী।
‘ফলে আমি এমত অবস্থায় আপনার ঘনিষ্ঠ গুপ্তপুরুষদের ওপর ভরসা করতে পারছি না। কে কখন উভয়বেতনচারী হয়ে পড়বে তার কী নিশ্চয়তা?’
মাথা নাড়লেন অতিথি। কথাটা মিথ্যা নয়।
‘তাই আমি আপনার গূঢ়লেখ আমার কাছে আনানোর জন্য নিজস্ব দূতের ব্যবস্থা করেছি। আপনি শুধুমাত্র তার মাধ্যমেই আপনার পরবর্তী সংবাদ প্রেরণ করবেন।’
অথিতির ভ্রু কুঞ্চিত হল। তিনি বললেন, ‘কে সেই দূত?’
গৃহস্বামী স্বর উঁচু করে কাকে যেন আদেশ দিলেন। একটু পরেই একটি অদ্ভুতদর্শন মানুষ এসে প্রণাম করে দাঁড়াল।
অতিথি দেখলেন আগন্তুকের গাত্রবর্ণ কৃষ্ণ, আকৃতিতে বামন, মস্তকটি অস্বাভাবিক বৃহৎ এবং দর্শনীয় হচ্ছে তার কেশরাজি। মনে হয় কে যেন পুঞ্জীভূত মেঘরাশি তার মাথায় কুঞ্চিত কেশদামরূপে সাজিয়ে দিয়েছে।
গৃহস্বামী বললেন, ‘আমি একে আপনার সঙ্গে দিচ্ছি মিত্র। একে পাটলিপুত্র নিয়ে যান। বলবেন তীর্থ করতে এসে একে ক্রয় করেছেন।’
অতিথি সামান্য বিরসবদনে আগন্তুককে প্রশ্ন করলেন, ‘কী নাম তোমার?’
আগন্তুকের হয়ে গৃহস্বামী উত্তর দিলেন, ‘ও জন্মাবধি মূক, মিত্র। মূক ও বধির। ওর কোনও নাম নেই, কারণ ওর নামের কোনও প্রয়োজন নেই।’
কিশোরটি একগাল হাসল। অতিথি দেখলেন তার মুখগহ্বর সম্পূর্ণরূপে দন্তহীন!
অতিথি আশ্চর্য হলেন, ‘এই মূক ও বধির বটুর ওপর আপনি এত বড় দায়িত্ব অর্পণ করতে চলেছেন?’
‘তার কারণ আছে মিত্র।
তুমি তো জানো কয়েক বৎসর পূর্বে আমি শাকল জয় করি। আমার সৈন্যবাহিনী অন্য অনেকের সঙ্গে একেও তুলে এনেছিল দাসরূপে বিক্রয়ের জন্য। পরে দেখা যায় এই কিশোর মূক ও বধির, তাকে কেউ ক্রয় করতে ইচ্ছুক হয়নি। বালকটি অনাহারে মারাই যেত, যদি না আমার এক উপপত্নী দয়াপরবশ হয়ে একে স্থান দিতেন।
পরে দেখা যায় বালকটির কয়েকটি গুণ আছে। এ অতিশয় বাধ্য এবং প্রভুভক্ত। প্রয়োজন হলে প্রাণত্যাগ করবে, কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। ছুরিকাচালনে অতিশয় দক্ষ, দ্রুত স্থানপরিবর্তনে পটু, অনাহারে বহুদিন প্রাণধারণ করতে পারে, এবং অকুস্থল থেকে দ্রুত অদৃশ্য হতে এর জুড়ি নেই।’
‘কিশোরের গূঢ়কর্মের পারদর্শিতা সম্যকরূপে প্রণিধান হল মহারাজ। কিন্তু এই অতীব গম্ভীর গুরুদায়িত্ব একে অর্পণের কোনও বিশেষ কারণ?’
‘কারণ আছে মিত্র।
এই কিশোরের একটি বিশেষত্ব আছে। এর কেশরাজি অস্বাভাবিক দ্রুতহারে বর্ধিত হয়। বস্তুত পক্ষে প্রায় প্রতি পক্ষকালেই এর কেশকর্তনের প্রয়োজন হয়। কারণ সম্পূর্ণ মুণ্ডিত মস্তক থেকে এই ঘনকেশী অবস্থায় আসতে এই কিশোরের ঠিক এক পক্ষকাল প্রয়োজন হয়৷’
অতিথি সপ্রশ্ন চোখে গৃহস্বামীর দিকে চেয়ে রইলেন।
‘আপনি একে নিয়ে যান মিত্র। আপনার পরিকল্পনার দ্বিতীয় ভাগ আপনি এর মাধ্যমেই আমাকে প্রেরণ করবেন; এবং স্বহস্তে।’
আশ্চর্য হওয়ার চরম সীমায় পৌঁছে গেছেন অতিথি। তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘কিন্তু…কীভাবে?’
গৃহস্বামী অত্যন্ত নীচু স্বরে তাঁর পরিকল্পনা ব্যক্ত করলেন৷ শুনতে শুনতে অতিথির মুখে হাসি ফুটে উঠল।’
.
দত্তাদেবী কঠিনস্বরে বললেন, ‘সনাতন ভারতের স্মৃতিশাস্ত্রের নিয়ম হল সম্রাটের প্রয়াণ হলে জ্যেষ্ঠপুত্র সিংহাসনে আসীন হবেন। আমি বেঁচে থাকতে সেই নিয়মের ব্যত্যয় হতে দিতে পারি না। তাতে সম্রাটের ইচ্ছাপূরণ না হলে না হবে।’
দত্তাদেবী গুপ্তসাম্রাজ্যের পট্টমহিষী, মহাদেবী। কিশোরীকালে যখন পিতৃগৃহ হতে সমুদ্রগুপ্তর ঘরনি হতে আসেন, তখন তিনি ষোড়শবর্ষীয়া। ক্রমে সমুদ্রগুপ্ত এই সসাগরা জম্বুদ্বীপের অপরাজেয় সম্রাট হয়ে উঠলেন। সেই সঙ্গে দত্তাদেবীও ভীরু কিশোরীর খোলস ছেড়ে হয়ে উঠলেন দোর্দণ্ডপ্রতাপী পট্টমহিষী। সমুদ্রগুপ্ত সহজ মানুষ নন। তাঁর ক্ষাত্রতেজ কিঞ্চিৎ অধিক ছিল। তাঁর ক্রোধদীপ্তি প্রজ্জ্বলিত হলে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যান্য মুখ্য সভাসদরাও ভীত হতেন। সেই অবস্থায় একমাত্র পট্টমহিষী দত্তাদেবীই পারতেন তাঁর রুদ্ররূপের সম্মুখীন হতে।
সম্রাটের সেই দাপট আর নেই। কিন্তু সিংহ না থাকলে কী হবে, সিংহিকা আছেন। কাঠিন্যে, ক্রূরবুদ্ধিতে, এবং প্রভাবে দত্তাদেবী সম্রাটের থেকে কোনও অংশে কম নন।
