মহাদেবী – ১০
রামগুপ্ত একবার চতুর্দিকে তাকালেন। তারপর উদাত্ত গম্ভীর স্বরে শুরু করলেন, ‘আজ গুপ্তসাম্রাজ্যের ইতিহাসে এক মহান দিন। শকাধিপতি রুদ্রসিংহর এই পরাজয় গুপ্তবংশের গরিমা এবং সম্মানকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। আজ এই পুণ্যলগ্নে আমি ঘোষণা করছি কাল প্রাতে যেন মহাবিষ্ণুপূজার আয়োজন করা হয়।’
চন্দ্রগুপ্ত এগিয়ে এসে গম্ভীরস্বরে বললেন, ‘তার পূর্বে আমার কিছু নিবেদন আছে।’
‘বলুন কুমার।’
চন্দ্রগুপ্ত একবার সভাস্থ প্রত্যেকের ওপর চোখ বুলিয়ে নিলেন। প্রত্যেকে স্বস্থানে অধিষ্ঠিত, একমাত্র মহাদেবী ধ্রুবা ব্যতীত। গুপ্তমহাদেবী, পট্টমহারানি ধ্রুবা সভার একপ্রান্তে বসে থাকা পিতার ক্রোড়ে গিয়ে সেই যে মুখ লুকিয়েছেন, তারপর থেকে তাঁর আর সাড়াশব্দ নেই।
‘গত দুদিনের ঘটনায় আমরা প্রত্যেকেই বিপর্যস্ত, আহত এবং প্রভূত বিচলিত। মহাক্ষমতাশালী, অর্ধজম্বুদীপের অধিপতি গুপ্তবংশের ওপর যে এমন আঘাত নেমে আসতে পারে, সে আমাদের কল্পনারও অগোচর ছিল। অথচ সেই আপাতসম্ভব ঘটনাটিই ঘটেছে৷ কিন্তু কীভাবে? কোন মন্ত্রবলে ওই বর্বর শকদস্যুর এত বড় স্পর্ধা হল গুপ্তসাম্রাজ্যের ওপর এত বড় আক্রমণ চালাবার?
এখন সেই কাহিনিই বলব।
আমরা সবাই জানি, বা অন্তত স্বীকার করি যে সম্রাট সমুদ্রগুপ্তর অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই পাটলিপুত্রের রাজপ্রাসাদে রাজ ক্ষমতা অধিকারের জন্য বিভিন্ন শক্তি সক্রিয় হয়ে ওঠে। রাজপারিষদবর্গের অনেকেই অনুমান করেছিলেন যে সম্রাট আমাকেই তাঁর উত্তরাধিকারীরূপে মনোনীত করেছেন। কিন্তু কেউ কেউ হয়তো অন্য বাসনা পোষণ করেছিলেন।’
সভাস্থল নিস্তব্ধ। অস্বস্তি এড়াতে রামগুপ্ত বলে উঠলেন, ‘তুমি কী ইঙ্গিত করছ ভ্রাতা? আমি তোমাকে ষড়যন্ত্র করে সিংহাসন হতে বঞ্চিত করেছি?’
চন্দ্রগুপ্ত হাত তুলে স্তব্ধ করলেন জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে, ‘আজ অবধি আপনার সব কথা বিনা প্রশ্নে শুনে এসেছি জ্যেষ্ঠ। কিন্তু আজ নয়। আজ আমার বলার দিন। আজ আমাকে এক রহস্যের আবরণ উন্মোচন করতেই হবে।
‘আমার মনে হয়েছিল যে পিতার অন্তিম সময়কালে আমাকে মালবে প্রেরণ করা এক বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। কেউ কেউ চাননি আমি পিতার মৃত্যুকালীন সময়ে তাঁর কাছে উপস্থিত থাকি। এমনকী পরে ঘটনাপর্ব বিচার করে, এবং বেশ কিছু সূত্র বিশ্লেষণ করে বুঝতে পারি যে ঠিক ওই সময়েই রুদ্রসিংহের মালব আক্রমণও এক অভিনয় ছিল। যাতে পিতা তাঁর বাল্যবন্ধুর চরম সঙ্কটে আমাকেই প্রেরণ করেন।
‘তারপর কী কী ঘটে তার বিশদ বিবরণ অপ্রয়োজনীয়। কেবল আমার মনে ক্রমেই এই চিন্তা দৃঢ়তর হতে থাকে, কোথাও কোনও এক অতি বৃহৎ ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হচ্ছে।
‘পূর্বতন সম্রাটের রাজত্বের সময়ে বেশ কিছু রাজপুরুষের সঙ্গে আমার গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়। সে প্রণয় প্রথম থেকেই প্রচ্ছন্ন ছিল, কারণ রাজনীতির গতিপ্রকৃতি অতি বিচিত্র। আমার ভাগ্যবিপর্যয়ের পরেও তাঁরা আমার সঙ্গ ছাড়েননি, সে আমার পরম সৌভাগ্য।
‘পক্ষকাল পূর্বে তাঁদেরই একজন একটি অতি সুশিক্ষিত পারাবতের মাধ্যমে আমাকে একটি বার্তা প্রেরণ করেন। কীভাবে সেই পারাবত আমাদের চলমান বিজয়শোভাযাত্রার সন্ধান পেল তার বিশদ বিবরণে যাচ্ছি না। সেই বার্তায় একটি শঙ্কর কথা লিখেছিলেন আমার বিশ্বস্ত সেই রাজপুরুষ। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন একটি অদ্ভুতদর্শন মূক ও বধির বামনের মাধ্যমে কোনও গোপন সংবাদ পাটলিপুত্রের বাইরে প্রেরণ করা হচ্ছে। তবে বহিরঙ্গে সে একটি অতি নিরীহ পত্র বহন করছিল। সেই পত্রে কিছু বিশেষ সাংসারিক বার্তা ছিল।’
উঠে দাঁড়ালেন দনুজদমন, ‘কুমার কি সেই মূক ও বধির বামনের কথা বলছেন যে আপাতত আমার গৃহভৃত্যরূপে নিযুক্ত?’
‘হ্যাঁ। তার কাছ হতে অবশ্য সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায়নি। শুধু একটি বিশেষ শস্ত্রী উদ্ধার হয়, যা মগধের ক্ষৌরকারদের ব্যবহৃত শস্ত্রী হতে সম্পূর্ণ ভিন্ন।’
বিচলিত হলেন দনুজদমন, ‘মগধে অপ্রচলিত শস্ত্রী সঙ্গে রাখা তো তো কোনও অপরাধ নয় কুমার। আর সে যদি আমার কোনও পারিবারিক বার্তা নিয়েই আসে, তাহলে সে গেল কোথায়?’
‘রহু ধৈর্যং প্রাজ্ঞ সেনাপতি মহোদয়। সব বলছি।
‘আমার উদ্দেশ্যে প্রেরিত সেই বার্তায় সেই বামন কিশোরের আরও একটি বিশেষত্বর কথা উল্লেখ করা ছিল। তার কেশরাজি অতি ঘন এবং বৃহদাকার। এবং তার বৃদ্ধির হারও অস্বাভাবিক দ্রুত। ফলত সেই বামনকে প্রতি পক্ষকালে একবার নিজের মস্তক সম্পূর্ণভাবে মুণ্ডন করতে হয়।’
আবারও উঠে দাঁড়ালেন দনুজদমন, ‘এও তো কোনও অপরাধ নয় কুমার।’
‘না, আপাতদৃষ্টিতে নয়। কিন্তু গণনা করে দেখলাম যে বেগবান অশ্ব তাকে দেওয়া হয়, তাতে তার বহু পূর্বেই আমাদের শিবিরে পৌঁছে যাওয়ার কথা। অথচ তার কোনও চিহ্নমাত্র নেই। তাহলে সে গেল কোথায়?
‘আমি অন্যভাবে অনুসন্ধানে ব্যপৃত হই। অনুমান করেছিলাম সেই বামন পূর্বী ভারতের বাসিন্দা নয়। এও জানা যায় যে, দনুজদমন হিমালয়ে তীর্থ করতে এসে এই বামনকে পান।
‘অনুমান করি ওই বিশেষ শস্ত্রীটি এই অঞ্চলের হবে। আমি ত্রিগর্ত এবং নাগরকোটের গ্রামে গ্রামে বিভিন্ন ক্ষৌরকারদের কাছে ঘুরতে থাকি ওই বিশেষভাবে প্রস্তুত শস্ত্রীটির বিবরণ নিয়ে। আর কয়েকদিন আগেই এক অদ্ভুত পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে সেই বামনের সন্ধান পাই, আর মা ভদ্রকালীর কৃপায় আমার সামনে সমস্ত রহস্য উন্মুক্ত হয়।
‘তার পূর্বে, বলুন তো দনুজদমন, এই মূক ও বধির বামনকে আপনি কোথায় পেয়েছিলেন?’
দনুজদমনকে এখন স্পষ্টতই বিভ্রান্ত দেখাচ্ছিল। তিনি বিচলিতস্বরে বললেন, ‘আআআমি এনেছিলাম বটে। কিন্তু আমি এর প্রকৃত প্রভু নই। আমার তীর্থযাত্রার সঙ্গী এই বামনকে ক্রয় করে আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। কিন্তু কুমার এখনও স্পষ্ট হল না অকস্মাৎ আমার গৃহভৃত্যটি আপনার কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল কেন?’
‘কারণ এই বামন প্রকৃতপক্ষে রুদ্রসিংহের চর। কুটিল, নৃশংস এবং মহাধূর্ত এই বামনটি শকগুপ্তচরবাহিনীর দ্বারা বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত। আর যে বিশ্বাসঘাতক রাজপুরুষ গুপ্তবংশের সামূহিক সর্বনাশসাধনে গোপনে রুদ্রসিংহের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে রত হয়েছিলেন, তিনিই সেই চরকে এনে আপনার হাতে সমর্পণ করেন।’
দ্বারের কাছ হতে মহা কোলাহল উপস্থিত হল। কেউ বোধহয় গোপনে সভাকক্ষ ত্যাগের উদ্যোগ করছিলেন। কচগুপ্ত উচ্চৈস্বরে বললেন, ‘মুকুন্দ, বিজয়, দেখো কেউ যেন পালাতে না পারে।’
সবার দৃষ্টি ঘুরে গেল সভাদ্বারের দিকে। সেখানে দুই প্রহরীর হাতে বন্দি হয়ে ক্রোধে ফুঁসছেন গুপ্তসাম্রাজ্যের অনেক উত্থান পতনের সাক্ষী, সম্রাট সমুদ্রগুপ্তর প্রিয়তম বয়স্য, মহামাত্য শিখরস্বামী।
চন্দ্রগুপ্ত ধীরপায়ে এগিয়ে এলেন শিখরস্বামীর দিকে। তারপর শান্তস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘এই বিশ্বাসঘাতকতার বিনিময়ে রুদ্রসিংহ কী দিতে চেয়েছিলেন মহামাত্য? অতুল ঐশ্বর্য? রাজ্যপাট? গুপ্তসাম্রাজ্যের নিঃসপত্ন অধিকার?
ফুঁসে উঠলেন শিখরস্বামী, ‘কী প্রমাণ আছে আপনার কাছে কুমার? বিনা দোষে আমাকে অভিযুক্ত করছেন কেন? এতদিন নিঃস্বার্থভাবে রাজসেবার এই পুরস্কার?’
তীব্র ব্যঙ্গের হাসি হাসলেন চন্দ্রগুপ্ত, ‘আপনার প্রমাণ চাই? এই দেখুন।’ বলেই সভার অন্ধকার কোণে দাঁড়িয়ে থাকা কার দিকে যেন ইঙ্গিত করলেন তিনি।
একটু পরেই সে অন্ধকার কোণ থেকে গোলমতো কী যেন একটা গড়িয়ে এল। সভাস্থ সকলে শিউরে উঠে দেখলেন, একটি কর্তিত মুণ্ড। আর তার মুণ্ডিত মস্তক জুড়ে অতি ক্ষুদ্র অক্ষরে কী যেন লেখা!
চন্দ্রগুপ্ত কঠিনস্বরে বললেন, ‘কী মহামাত্য, চিনতে পারেন এ মুণ্ড কার? আর তার মাথায় কার হস্তাক্ষরে কী লেখা?’
শিখরস্বামীর মাথা নুইয়ে এল। বাকিরা বজ্রাহত বৃক্ষকাণ্ডের মতো বসে রইলেন।
মহারাজ চন্দ্রজ্যোতি বিহ্বলস্বরে বললেন, ‘এসব কী হচ্ছে কুমার? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।’
চন্দ্রগুপ্ত বললেন, ‘এই বামন ছিল রুদ্রসিংহের একান্ত অনুগত দাস। তার মতো অত্যন্ত চতুর, হিংস্র, এবং নিষ্ঠুর চরিত্রের মানুষ দ্বিতীয়টি হয় না। সে মূকও নয়, বধিরও নয়। আমি নিজে তার প্রমাণ পেয়েছি।
‘এই বামনের একটি আশ্চর্যরকম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর কেশরাজি অস্বাভাবিক দ্রুতহারে বর্ধিত হয়। আর সেই বৈশিষ্ট্যকে কী সুচতুরভাবে নিজেদের কার্যসিদ্ধির জন্য ব্যবহার করেছিলেন রুদ্রসিংহ এবং তাঁর সঙ্গী শিখরস্বামী সে কথা আমরা পরে শুনব।
‘শিখরস্বামী চেয়েছিলেন গুপ্তসম্রাটকে প্রভাবিত করে তাঁকে এবং তাঁর পারিষদবর্গকে সপরিবারে ভীমনগর দুর্গে এনে বন্দী করতে। এ কাজে তাঁর সহায় ছিলেন তাঁর পুত্র সূর্যস্বামী। কিন্তু দিনক্ষণ সহ সেই পরিকল্পনাটি তিনি রুদ্রসিংহকে জানাবেন কী করে? তিনি বিচক্ষণ মানুষ। অনুমান করেছিলেন যে আমার অনুগত রাজপুরুষ এবং গুপ্তচরবাহিনী বেঁচে থাকতে কোনও সন্দেহজনক সংবাদ পাটলিপুত্রের বাইরে যেতে দেবে না।
‘আমার ধারণা রুদ্রসিংহও তাইই অনুমান করেছিলেন। তাই তিনি তাঁর প্রিয়তম ভৃত্যকে শিখরস্বামীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন। তাকে মূক ও বধির সাজানো হয়েছিল যাতে তার কথা শুনে লোকে অনুমান না করতে পারে যে কোন জাতির লোক।
‘উপযুক্ত সময় যখন এল, তখন শিখরস্বামী পরিকল্পনা মতো বামনের মস্তক মুণ্ডন করলেন। মুণ্ডিত মস্তকের ওপর স্বহস্তে সাঙ্কেতিক শব্দ ব্যবহার করে পরিকল্পনাটি লিখলেন। পক্ষকাল তাকে নিজের কাছে রাখলেন যাতে কেউ তার মুণ্ডিত মস্তক দেখতে না পায়। তারপর তার কেশরাজি পূর্বাবস্থায় ফিরে গেলে তাকে পুনরায় পাঠিয়ে দিলেন দনুজদমনের গৃহে। আর কাহিনির বাকিটা তো আমরা এখন জানিই।
‘কিন্তু কুমার’, আবার মুখ খুললেন দনুজদমন, ‘একটি কূট প্রশ্ন তো রয়ে গেল। সেই বামন যদি কথা বলতেই পারে, তাহলে তার মুণ্ডিত মস্তকে বার্তা লিপিবদ্ধ করে পাঠাবার প্রয়োজন কী? সে তো বার্তাটি মুখে মুখেই দিতে পারত।’
‘আপনার কাছে এই প্রশ্ন আশা করিনি মাননীয় দনুজদমন। আপনি বহুদিন যাবৎ গুপ্তসাম্রাজ্যের সেনাধ্যক্ষ পদ অলঙ্কৃত করেছেন। গুপ্তচরবৃত্তি সম্পর্কে আপনার জ্ঞান আমাদের কারও চাইতে কম নয়।
গূঢ়লেখ প্রেরণের মূল বিষয় হচ্ছে বার্তার অভ্রান্ততা। দূত যে বার্তাটি দিচ্ছে সেটি যে সঠিক তার প্রমাণ কী? হতে পারে ইতিমধ্যেই তার আনুগত্য পরিবর্তিত হয়ে গেছে, সে এখন উভয়বেতনচারী। সে যে তার নতুন প্রভুর আজ্ঞার বশবর্তী হয়ে পুরাতন প্রভুর কাছে ভুল সংবাদ বহন করে আনছে না তার নিশ্চয়তা কী?
রুদ্রসিংহ তাঁর প্রতি প্রেরিত বার্তার অভ্রান্ততা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন। তাই এত সতর্কতা। বার্তাটি ওই বামনের দ্বারা আনীত হতে হবে, এবং শিখরস্বামীর হস্তাক্ষরে লিখিত হতে হবে, এই দুটি শর্ত একত্রে পালিত হলে তবেই রুদ্রসিংহ নিঃসন্দেহ হবেন যে গূঢ়লেখটি সঠিক ও অভ্রান্ত।
‘তবে আরেকজনের কাছে আমি ঋণী। ঈশ্বরের অশেষ কৃপায় এক অসামান্য কবিপ্রতিভার সন্ধান পেয়েছি আমি। ইনি কশ্যপমীরের অধিবাসী। শকদের কশ্যপমীর অভিযানের সময় স্ত্রী সন্তান হারিয়ে কোনওমতে মৃতপ্রায় অবস্থায় নাগরকোটের এক পার্বত্য গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছতে পারেন। তিনিই চিনতে পেরেছিলেন নিরীহ, মূক ও বধির মুখাবরণের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা এই কুৎসিত মানুষটিকে।’
সভাসদেরা ঘুরে তাকালেন অন্ধকার কোণটির দিকে। সেখানে মলিন বেশধারী এক অপূর্বকান্তি যুবক দাঁড়িয়ে। তাঁর ভাবলেশহীন মুখে কোনও প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা গেল না।
রামগুপ্ত একবার চতুর্দিকে তাকালেন। তারপর শুষ্ক ওষ্ঠ লেহন করে গম্ভীর স্বরে বললেন, ‘কুমার চন্দ্রগুপ্ত যে কাহিনি বিবৃত করলেন, তার যাথার্থ্য নিরূপণের প্রয়োজন আছে। বিনা প্রমাণে আমি গুপ্তবংশের এতদিনের অনুগত অমাত্যকে শাস্তি দিতে পারি না। আপাতত বিজয় উৎসব উদ্যাপন করা যাক। আজ গুপ্তসাম্রাজ্যের ইতিহাসে এক মহান দিন। শকাধিপতি রুদ্রসিংহর এই পরাজয় গুপ্তবংশের গরিমা এবং…’
‘স্তব্ধ হোন সম্রাট!’ চন্দ্রগুপ্ত হাত তুলে বলে উঠলেন, ‘আপনার মুখে গুপ্তবংশের গরিমার কথা মানায় না। আপনি শুধুমাত্র নিজের প্রাণরক্ষার্থে গুপ্তবংশের সম্রাজ্ঞী, পট্টমহিষী ধ্রুবাকে শত্রুর অঙ্কশায়িনী হওয়ার প্রস্তাবে সম্মত হয়েছিলেন। এই ঘোর অপমান, এই ঘোর অসম্মান যিনি মেনে নিতে পারেন, তাঁকে গুপ্তসম্রাটরূপে মেনে নিতে আমি অপারগ।’
রামগুপ্ত পুনর্বার জিহ্বা দিয়ে নিজের শুষ্ক ওষ্ঠ লেহন করেন। চারিদিকে গুপ্তরাজপরিষদের রাজন্যবর্গ। তাঁদের মুখ কঠিন। যেন অলঙ্ঘ্য নিয়তির মতো তাঁরা নিষ্পলকে দেখে চলেছেন এই নাটিকাখানি।
রামগুপ্ত অশনি সঙ্কেতটি বুঝলেন। ছল করে সম্রাট হওয়ার পর থেকে যে ভয় তিনি পাচ্ছিলেন, অবশেষে তাই ঘটতে চলেছে। কুমার চন্দ্রগুপ্ত বিদ্রোহী হয়েছেন!
আর সভাসদরা যদি কুমারকে বাধা না দেন, তার একটিই অর্থ হয়। তিনি সিংহাসনে থাকতে পারেন বটে, কিন্তু রাজশাসনের নৈতিক ক্ষমতা হারিয়েছেন। তবুও তিনি মরিয়া হয়ে শেষ চেষ্টা করলেন, ‘আমি মহারাজাধিরাজ রামগুপ্ত…’ বলতে বলতে রামগুপ্তর স্বর কেঁপে গেল।
‘না জ্যেষ্ঠ,’ এইবার শোনা যায় তরুণ কচগুপ্তর দৃঢ়, অনমনীয় স্বর, ‘আপনি গুপ্তসাম্রাজ্যের মহারাজাধিরাজ হওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছেন। যিনি বিনা যুদ্ধে সাম্রাজ্যের গৃহলক্ষ্মীকে শত্রুশিবিরে রক্ষিতারূপে প্রেরণ করতে পারেন, তিনি নিজের রাজত্ব রক্ষা করবেন কী করে? প্রজাপালন করবেন কী করে? আমি আপনার রাজশাসনের অধিকার অস্বীকার করছি।’
পারিষদদল মূক, স্তব্ধবাক!
কুমার চন্দ্রগুপ্ত চারিদিকে তাকালেন একবার। যেন বুঝে নিতে চাইলেন পরিস্থিতি। শেষে তিনি তাকালেন মহাদেবী ধ্রুবার জ্বলন্ত চোখদুটির দিকে। তারপর নিজ তরবারি কোষমুক্ত করে মন্দ্রস্বরে বললন, ‘মহারাজাধিরাজ সমুদ্রগুপ্তের শেষ ইচ্ছানুসারে আমি, কুমার চন্দ্রগুপ্ত, নিজেকে গুপ্তসাম্রাজ্যের অধীশ্বর ঘোষণা করছি। কেউ যদি আমার বিরোধিতা করতে চান, তো আসুন। আমাকে পরাস্ত করুন।’
কোষমুক্ত অসিহাতে দীপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইলেন কুমার চন্দ্রগুপ্ত। মনে হল যেন দক্ষসভায় উপস্থিত হয়েছেন স্বয়ং রুদ্র। পরক্ষণেই কুমার কচ এসে দাঁড়ালেন তাঁর পাশে, যেন রুদ্রের পাশে বজ্রধারী ইন্দ্র। তারপর একে একে তাঁদের সেনানীদল উন্মুক্ত অসিহস্তে ঘিরে দাঁড়াল তাঁদের।
বলাবাহুল্য, কেউই অগ্রসর হল না। বোঝা গেল যে কেউ অগ্রসর হতে চায়ও না। পারিষদদল জেনে গেছেন যে রামগুপ্তকে আর মহারাজাধিরাজ বলে স্বীকার করার অর্থ হয় না।
দনুজদমন এগিয়ে এলেন। বিষণ্ণকণ্ঠে বললেন, ‘নিয়তির কী পরিহাস। মহারাজ সমুদ্রগুপ্তর শেষ ইচ্ছা পূর্ণ হল বটে, তবে সে যে এইভাবে ঘটবে সে আমার কল্পনার বাইরে ছিল। মহারাজ সমুদ্রগুপ্ত নিজের উত্তরাধিকারী চিনে নিতে ভুল করেননি। কিন্তু কেবলমাত্র আমাদেরই পাহাড়প্রমাণ মূর্খতার পরিচয়ে গুপ্ত বংশকে আজ এই ভয়ানক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হল।’
বলতে বলতেই তিনি কুমার চন্দ্রগুপ্তর সামনে এসে দাঁড়ালেন। তারপর করজোড়ে, নতমস্তকে বললেন, ‘জয় মহাজারাধিরাজ চন্দ্রগুপ্তের জয়!’
মুহূর্তের মধ্যে চন্দ্রগুপ্তের জয়জয়কারে সভা পরিপূর্ণ হয়ে উঠল। নিয়তির বিধান কী বিচিত্র। কয়েক দণ্ড পূর্বেই যারা রামগুপ্তকে সম্রাট বলে মেনে নিয়েছিল, এখন তারাই নতুন সম্রাটের নামে জয়ধ্বনি দিচ্ছে।
এগিয়ে এলেন রাজপুরোহিত। চন্দ্রগুপ্তর ললাটে এঁকে দিলেন রাজতিলক। তারপর ঘোষণা করলেন, ‘মহারাজের বিধিমতো অভিষেক হবে পাটলিপুত্র পৌঁছে। এখন সম্রাট আদেশ দিন, এই সভা পরিষদ ভঙ্গ করা হোক।’
এতক্ষণ দত্তাদেবী সভার এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এবার তিনি মুখ খুললেন, ‘বেশ, পরিষদসভার ইচ্ছেই তাহলে শিরোধার্য করলাম। সেক্ষেত্রে আমি, আমার পুত্র রামগুপ্ত এবং পুত্রবধূ ধ্রুবা, আমরা পাটলিপুত্রে ফিরে যেতে অস্বীকার করছি। নবাভিষিক্ত সম্রাটের কাছে আমার অনুরোধ, যেন এই ভীমনগর দুর্গের দায়িত্বভার রামগুপ্তর হাতে সমর্পণ করা হয়। আর আমাদের জীবিকানির্বাহর জন্য এই পার্বত্যপ্রদেশের কর যেন রামগুপ্তর জন্য নির্দিষ্ট করা হয়। আশা করি নবনিযুক্ত সম্রাট তাঁর জ্যেষ্ঠ এবং তাঁর ভ্রাতৃবধূর জন্য….
‘না!’ সমগ্র সভা সচকিত হয়ে উঠল মহাদেবী ধ্রুবার তীক্ষ্ণ চিৎকারে, ‘আমি রামগুপ্ত এবং রাজমাতা দত্তাদেবীর সঙ্গে একমত হতে অস্বীকৃত হচ্ছি। আমি এই নপুংসক স্বামী আর তাঁর মাতার সঙ্গে আমার জীবন অতিবাহিত করতে পারব না। আমার ভবিষ্যৎ আমি নিজেই নির্ধারণ করতে পারব। আমি চাই আমাকে সেই অধিকার দেওয়া হোক।
মহারানি দত্তাদেবী এগিয়ে এলেন, ‘নির্লজ্জা নারী, এ কী বলছিস তুই? স্বামীহীন স্বৈরিণী জীবন কাটাতে চাস? এই ছিল তোর মনে? এই তোর ধর্ম?’
ধ্রুবা তাঁর দিকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ‘যে স্বামী নিজস্ত্রীকে বিনা দ্বিধায় শত্রুর রক্ষিতাগারে প্রেরণ করতে পারে, তার ধর্মসঙ্গী হতে আমার ঘৃণাবোধ হয়।’ বলতে বলতেই তিনি অন্যান্য সভাসদদের দিকে ফিরলেন, ‘পাটলিপুত্র আজ এক অযোগ্য শাসকের অক্ষম শাসন ব্যবস্থা উচ্ছেদ করতে সমর্থ হয়েছে। কিন্তু এখানেই পাটলিপুত্রের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। এই ভাগ্যহীনা নারীর ন্যায় বিচারও পাটলিপুত্রকেই করতে হবে। আমি সিংহাসনে বসে ওই থাকা ভীরু কাপুরুষটির ধর্মপত্নীত্বের দায়ভার বহন করতে অস্বীকৃত হচ্ছি।’ বলতে বলতে গভীর শ্বাস নিলেন মহাদেবী, মহাবীরাঙ্গনা ধ্রুবা, ‘উপস্থিত রাজন্যবর্গ এবং রাজপুরোহিতের কাছে আমি অবিলম্বে এক ধর্ম পরিষদ আহ্বানের দাবি জানাচ্ছি। রামগুপ্তের হাত থেকে আমি “মোক্ষ” চাই।’
সমগ্র পরিষদ বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ল। রামগুপ্ত নিজের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে দেখলেন তাঁর পা অবশ হয়ে এসেছে।
রাজপুরোহিত করজোড়ে বললেন, ‘দেবী, আপনার ক্ষোভের কারণ অতি সঙ্গত। কিন্তু ধর্ম-বিবাহ কখনোই অসম্পাদিত করা যায় না। অমোক্ষ হি ধর্মবিবাহম! শাস্ত্রে এর অনুমতি নেই মা, এ হতে পারে না।’
ধ্রুবা দীপ্তস্বরে বললেন, ‘অবশ্যই হতে পারে। আমি নবনির্বাচিত সম্রাটের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করছি, যেন এই মুহূর্তেই এক ধর্ম-পরিষদ আহ্বান করা হয়। রাজপুরোহিতের তুলনায় শাস্ত্রজ্ঞান আর কার বেশি আছে? তিনিই না-হয় ন্যায়বিচারক হোন। আত্মপক্ষ সমর্থনে আমি নিজেই কথা বলব। গুপ্ত সাম্রাজ্য আমার স্ত্রীধন, আমার সম্মান, মর্যাদা সমস্ত কিছু কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু পিতা-মাতার থেকে পাওয়া শাস্ত্র ও ধর্মজ্ঞান এখনও আমার সম্পদ।’
চন্দ্রগুপ্ত গম্ভীর স্বরে বললেন, ‘মহাদেবী ধ্রুবার অনুরোধে আমি রাজপুরোহিতের নেতৃত্বে এক ধর্ম পরিষদের আহ্বান জানাচ্ছি। মহাদেবীর আবেদনের বিষয়ে এই পরিষদ সিদ্ধান্ত নেবে।’
বিস্ময়াভিভূত রাজন্যবৃন্দ আবার বসে পড়লেন। ধর্মপরিষদ শুরু হল।
রাজপুরোহিত বলেন, ‘দেবী, স্পষ্ট জেনে রাখুন, দুর্ভিক্ষ, রাষ্ট্রবিপ্লব, বা রাজদ্বারেও ধর্মবিবাহবন্ধন ছিন্ন করা যায় না। শাস্ত্রানুমতে আপনি নিজের স্বামীর কাছ থেকে মোক্ষ চাইতে পারেন না।’
ধ্রুবার ঠোঁটে ব্যঙ্গের হাসি খেলে গেল, তিক্তস্বরে বললেন, ‘স্বামী! সত্যই তাঁকে এই সম্বোধনে ডাকা যায়?’
রাজেন্দ্রানীপ্রতিম আভিজাত্যে তিনি হেঁটে গিয়ে রামগুপ্তের সামনে দাঁড়ালেন,’ ‘জিগ্যেস করুন এঁকে, যখন আমি শকরাজের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য এঁর কাছে অনুরোধ, না না, অনুরোধ না, ভিক্ষা জানাই, বলি যে অগ্নিসাক্ষী রেখে বিবাহ করার সময় তিনি আমাকে রক্ষা করার অঙ্গীকার করেছিলেন, তখন ইনি কী বলেছিলেন?’
সভায় সূচীপতনতুল্য স্তব্ধতা।
ধ্রুবা পরিষদের দিকে ফিরলেন, ‘উত্তর আপনারা সকলেই জানেন!’
ধ্রুবা আবার বলতে শুরু করেন। এবারে তিনি নারদ, পরাশর ও চাণক্যের শাস্ত্র তুলে উপমা দিতে শুরু করলেন। কোন কোন শর্তাবলির নিরিখে এক নারী, তার ধর্ম বিবাহ থেকে মোক্ষ লাভ করতে পারে। রাজপুরোহিত তাঁর প্রতিটি কথার সমর্থনে মাথা নেড়ে সম্মতি-জ্ঞাপন করতে লাগলেন।
বক্তব্যের শেষদিকে এসে ধ্রুবার উচ্চকিত স্বর সভার প্রতিটি কোণে অনুরণিত হতে লাগল, ‘রামগুপ্ত নামের এই ব্যক্তি বিবাহের সমস্ত প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেছে। আমার চূড়ান্ত সম্মানহানির কারণ হয়েছে। এবং সর্বোপরি, সর্বোপরি…’ বলতে বলতে একটি অতি দীর্ঘশ্বাস নেন ধ্রুবা, যেন সমস্ত মানসিক শক্তি সংহত করছেন। তারপর সুতীব্র স্বরে বললেন, ‘সর্বোপরি এই ব্যক্তি একজন নপুংসক, আচার্য চাণক্য যে কারণটিকে মোক্ষ লাভের চূড়ান্ত কারণ বলে নির্দেশ করেছেন। অতএব আমি এই হীনবীর্য, ক্লীব, কাপুরুষটির ধর্মবন্ধন থেকে মোক্ষ চাইছি।’
দত্তাদেবী জ্যা-মুক্ত তিরের মতো ছিটকে উঠলেন, ‘স্তব্ধ হ রে কুলটা নারী, আমার পুত্রকে নপুংসক বলিস তুই? এত সাহস?’
নিদারুণ ঘৃণা নিয়ে নিজের শ্বশ্রুমাতার দিকে তাকিয়ে থাকেন ধ্রুবা। তারপর নিজের স্বরে অনেকখানি করুণা মিশ্রিত করে বলেন, ‘আমাকে নয় রাজমাতা, এই প্রশ্ন নিজের পুত্রকে করুন।’
এত মানসিক বিড়ম্বনার মধ্যে পড়ে বিভ্রান্ত হয়ে গেছিলেন রামগুপ্ত। তদুপরি অনেকক্ষণ হয়ে গেল মদিরার পাত্র হস্তগত হয়নি তাঁর৷ কোথায় কখন কী বলা উচিত সেই বোধ তাঁর চিরকালই কম ছিল। ধ্রুবার শেষ বাক্যটি তাঁর ধৈর্যচ্যুতি ঘটাল। লাফিয়ে উঠলেন তিনি, ‘নির্লজ্জা নারী! তোকে না আমি বলেছিলাম এ কথা কাউকে না জানাতে, অথচ তুই…দেখুন মা দেখুন, কোন অবাধ্য নারীর সঙ্গে আপনারা আমার বিবাহ…’ বলতে বলতে কথা থেমে যায় রামগুপ্তর। এ কী বলে ফেললেন তিনি?
সভায় শীতল নীরবতা। ধ্রুবার ওষ্ঠপ্রান্তে ব্যঙ্গের হাসি খেলে যায়। তিনি রাজপুরোহিত এবং দনুজদমনের দিকে ফিরে বলে ওঠেন, ‘আপনারা স্বকর্ণেই শুনে নিলেন। এইবার এই ধর্ম পরিষদের কাছে আমি ন্যায় বিচার আশা করি।’
রাজপুরোহিত উঠে দাঁড়ালেন, ‘ধ্রুবস্বামিনীর সমস্ত কথা শোনার পরে, আমি তাঁর সমর্থন জানাচ্ছি। তিনি তাঁর পতি রামগুপ্তের থেকে মোক্ষ পাওয়ার অধিকারী।’
রাজপুরোহিত দনুজদমনের দিকে তাকাতে, তিনিও মাথা নেড়ে সহমত জানালেন। চন্দ্রগুপ্ত এতক্ষণ কিছু বলেননি। এবার ঘোষণা করলেন, ‘দেবী ধ্রুবস্বামিনীকে রামগুপ্তের পত্নীত্ব থেকে মোক্ষ দেওয়া হল। তিনি এখন স্বাধীন, যাঁকে ইচ্ছা পতিত্বে বরণ করতে পারেন।’
সমগ্র সভা সমর্থনের কলস্বরে সভা পরিপূর্ণ হয়ে উঠল। শুধু ধ্রুবস্বামিনীকে ছাড়া।
এতক্ষণ ধরে এই মানসিক টানাপোড়েন তাঁকে অন্তর থেকে রিক্ত করে তুলেছে। হঠাৎ মনে হল তাঁর জগৎ যেন মহাশূন্যে মিলিয়ে গেছে৷ এক অসীম ক্লান্তিতে ছেয়ে যাচ্ছে তাঁর অস্তিত্ব, চৈতন্য। যেন এই জীবন থেকে তাঁর আর কিছু পাওয়ার নেই, কোনওদিনই পাওয়ার কিছু ছিল না।
বিমূঢ়স্তম্ভিত অবস্থায় এতক্ষণ বসেছিলেন রামগুপ্ত। একটু আগেই কী ঘটে গেল সে এখনও মাথায় ঢোকেনি তাঁর। কী বলে ফেললেন তিনি? কী ঘোষণা করলেন রাজপুরোহিত? এক লহমায় সব কিছু হারিয়ে গেল তাঁর জীবন থেকে? সাম্রাজ্য, সম্মান, স্ত্রী সব? তাঁর খেলার পুতুল? তাঁর অবহেলার অহঙ্কার?
আচমকা সম্বিৎ ফিরল রামগুপ্তর। নিজের অসি কোষমুক্ত করলেন তিনি, ‘না না, আপনারা এ কাজ করতে পারেন না। আমি গুপ্তবংশের সম্রাট শ্রীরামগুপ্ত। আমাকে এইভাবে সিংহাসনচ্যুত করা যাবে না। আমার সাম্রাজ্য, আমার স্ত্রী, আমার সবকিছু এইভাবে আপনারা ছিনিয়ে নিতে পারেন না।’ বলতেই বলতেই তিনি উন্মুক্ত তরবারি হাতে ছুটে গেলেন চন্দ্রগুপ্তর দিকে।
সভার সকলে সচকিত হয়ে উঠল। এই বুঝি একটা অঘটন ঘটে যায়! চন্দ্রগুপ্ত হাত দিলেন তাঁর অসিকোষে, যেন এখনই মুক্ত করবেন তাঁর ক্ষুরধার খড়্গ৷ কিন্তু তাঁর মুখচোখে দ্বিধার ভাব স্পষ্ট! শেষ পর্যন্ত কি ভ্রাতৃঘাতী হবেন তিনি?
কিন্তু রামগুপ্তর ভাগ্য তাঁকে তাঁর লক্ষ্য অবধি পৌঁছতে দিল না। তার আগেই ঝলসে উঠল কচগুপ্তর তরবারি। আর মুহূর্তের মধ্যে রামগুপ্তের মুণ্ডহীন শরীর লুটিয়ে পড়ল ভীমনগরের রাজসভার শীতল মেঝেতে।
সভা স্তব্ধ৷ ধ্রুবাদেবী জ্ঞান হারালেন৷ সভা জুড়ে শুধু একটাই শব্দ গুঞ্জরিত হল, দত্তাদেবীর আর্তচিৎকার!
.
গুপ্তবিজয়যাত্রা পাটলিপুত্রে ফিরে এসেছে প্রায় এক মাস হল। আজ কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের চতুর্দশী। কাল পূর্ণিমা। নবনির্বাচিত সম্রাটের অভিষেক সম্পন্ন হবে কাল, এই পুণ্য তিথিতে। যথাবিহিত ধর্মীয় আচার এবং উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। উৎসব অবশ্য অনেকদিন ধরেই চলছে। মাসাধিককাল পাটলিপুত্রের ঘরে ঘরে অরন্ধনের আদেশ ছিল, প্রজাসাধারণ রাজপ্রাসাদে অন্নগ্রহণ করেছেন।
শীতকাল আগতপ্রায়। বাতাসে তারই আগমনমূর্ছনা। পাটলিপুত্রের পথঘাট ভরে গেছে ঝরাপাতার দীর্ঘশ্বাস আর রিক্তবৃক্ষশাখার বৈধব্যে। সন্ধ্যার বিষণ্ণ বাতাস দ্রুত নেমে আসছে পাটলিপুত্রের শরীর জুড়ে।
রাজপ্রাসাদের ঠিক বহির্দ্বারের কাছে, একটি দ্বিতল আবাসন, প্রধানসড়কের পাশেই। তারই দ্বিতলে বাতায়নের পাশে বসেছিল একটি স্থির, নিষ্কম্প, কৃশকায় শরীর।
কালের নিয়মে ত্রিশটি দিন হলে কী হবে, এই ক’দিনেই ধ্রুবার মনের বয়েস বেড়ে গেছে প্রায় এক দশক। তাঁর এই প্রেতিনীবেশ দেখলে কঠিন পাষাণেরও হৃদয় দ্রব হয়। সেই দেবদুর্লভ কেশরাজি আজ নিষ্প্রাণ পাটতন্তুতুল্য। চোখের কোণে অনিদ্রাজড়িত কালিমা। পরনে অতি সাধারণ কাপাসবস্ত্র। আহারে মন নেই, প্রসাধনে রুচি নেই, এই ধ্রুবাকে দেখে মহাদেবী নয়, যোগিনী বলে ভ্রম হয়।
ভীমনগর দুর্গের সেই ভীমরাত্রির পর অনেক কিছু ঘটে গেছে ধ্রুবার জীবনে। তিনি মোক্ষলাভ করেছেন তাঁর নীচ, ক্লীব, কাপুরুষ পতির দাসত্ব থেকে। গুপ্তধর্মপরিষদ তাঁকে মহাসম্মানে স্বাধীন দেবীরূপে মান্যতা দিয়েছে। তিনি পারতেন তাঁর পিতৃগৃহে সগৌরবে প্রত্যাবর্তন করতে। স্নেহময় পিতার ক্রোড়ে আশ্রয় নিতে।
কিন্তু যাননি ধ্রুবা। গুপ্তবিজয়দলের সঙ্গে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন পাটলিপুত্রেই। কেন? কেউ জানে না। অথচ রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করেননি তিনি। প্রাসাদের বহির্দ্বারের কাছে এই আবাসনে স্থান নিয়েছেন।
মালবরাজ চন্দ্রজ্যোতিও রয়ে গেছেন পাটলিপুত্রেই। তিনি কন্যাঅন্তপ্রাণ। সাধের স্নেহপুত্তলিটির বিন্দুমাত্র অমর্যাদা সহ্য করেন না। তিনিও কঠিন সংকল্প করেছেন ধ্রুবাকে মালবে নিয়ে যাবেন বলে। অবুঝ পিতা এবং জেদি মেয়ের মধ্যে পিষ্ট হতে হতে মন্দার অবস্থা সঙ্গিন।
চতুর্দশীর জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে বিশ্বচরাচর। তারই মধ্যে রাজপ্রাসাদের উদ্যানে দুজন নিম্নস্বরে কথা বলছিলেন। এক কিশোর, আর এক যুবতী। কিশোর প্রশ্ন করলেন, ‘কী করা যায় দিদি? আজই তো অভিষেক।’
যুবতী বিষণ্ণস্বরে বললেন, ‘জানি না ভাই। ধ্রুবার সংকল্প বড় কঠিন। সে যখন একবার প্রতিজ্ঞা করেছে এই পাটলিপুত্রেই সে নিঃসঙ্গ শেষ জীবন অতিবাহিত করবে, তখন তাকে সেই প্রতিজ্ঞা থেকে চ্যুত করা ভারি কঠিন, প্রায় অসম্ভব বললেই চলে।’
‘তাহলে উপায়?’
‘উপায় একটিই। মহারাজ চন্দ্রগুপ্ত যদি একবার নিজে গিয়ে অনুরোধ করেন।’
‘কিন্তু, কিন্তু ভ্রাতা তো এখন আর কুমার নন। তিনি সম্রাট। তাঁর পক্ষে মহাদেবীর কাছে গিয়ে ক্ষমাপ্রার্থী হওয়া তো অসম্ভব। রাজমর্যাদা বলেও তো একটি বস্তু আছে।’
এরপর দুজনে কিছু গোপন আলোচনা হল। তারপর দুজনেই নিজের নিজের পথ ধরলেন।
চন্দ্রগুপ্ত রাজসজ্জায় সজ্জিত হচ্ছিলেন। তাঁর রাজ্যাভিষেকের আর কয়েক দণ্ড বাকি। কাল প্রভাত থেকে এই সসাগরা জম্বুদীপের অধীশ্বর হবেন তিনি। অথচ তাঁর মুখে হাসি নেই, চলনে প্রাণের সাড়া নেই, হৃদয়ে উৎসাহ নেই। স্বয়ংক্রিয় প্রাণহীন যন্ত্রের মতো অঙ্গবেশ ধারণ করছিলেন তিনি।
এমন সময় কক্ষে প্রবেশ করলেন মন্দাকিনী। তাঁকে দেখে চন্দ্রগুপ্তর চোখ দুখানি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সাগ্রহে প্রশ্ন করলেন, ‘মন্দা, তিনি কেমন আছেন? তাঁর কাছ থেকে কোনও সংবাদ এসেছে? তিনি কি রাজপ্রাসাদে ফিরে আসতে সম্মত হয়েছেন?’
মন্দার ওষ্ঠে একটি করুণ হাসি খেলে গেল, ‘কোন অধিকারে সে ফিরে আসবে মহারাজ?’
‘কেন? পূর্বতন সম্রাটের পত্নী রূপে। সেই অধিকার তাঁর আছে।’
‘ভুল করছেন সম্রাট। পূর্বতন সম্রাটের মৃত্যুর আগেই সে মোক্ষ লাভ করেছিল, বিবাহবন্ধন ছিন্ন করেছিল। সে বিবাহসূত্রেও গুপ্তবংশের কেউ না।’
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন মহাবীর চন্দ্রগুপ্ত। তারপর ধীর, অতি ধীরস্বরে বলেন, ‘জানি মন্দা। তবে কী জানো তো, বৃথা আশা মরতে মরতেও মরে না। আমি চাই সে ফিরে আসুক। যে ঘোর অন্যায় এই রাজপ্রাসাদ তার সঙ্গে করেছে, তার প্রায়শ্চিত্ত করার সুযোগ সে আমাদের দিক।’
‘কেন সে ফিরে আসবে মহারাজ? কোন অধিকারে? নিজের দুঃস্বপ্নের স্থানে কেন ফিরে আসবে সে? আপনি নিজেও জানেন, শুধুমাত্র পত্র-প্রেরণই যথেষ্ট নয়। আপনাকে তার কাছে যেতে হবে মহারাজ। তার বুকে যে অভিমানের পাহাড় জমেছে, আপনাকেই সে পাহাড় অতিক্রম করতে হবে।’
মৃদু হাসলেন চন্দ্রগুপ্ত। বড় ম্লান, বড় বেদনাবিধুর সেই হাসি। ‘কেন যাই না জানো মন্দা? না, রাজমর্যাদার দোহাই আমি দেব না। জানি বিশ্বাস করবে না, তবু বলি এই দুঃসাহসী চন্দ্রগুপ্ত, জীবনমৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করে রাখা চন্দ্রগুপ্ত ভয় পায়, মহাদেবী ধ্রুবার সম্মুখীন হতে ভয় পায় সে।’
মন্দার চোখ ছলছল করে ওঠে। মিনতির সুরে বলেন, ‘জানি মহারাজ, আপনার অবস্থাও বুঝি। তবু বলি, এখান থেকে মুক্তির উপায় এখনও রয়েছে। তবে, সময় চলে গেলে বোধহয় তাও আর পাবেন না। আসুন আমার সঙ্গে।’
ধ্রুবা নিজের কক্ষে একা বসেছিলেন। দীপখানি নিভু নিভু প্রায়। পরিচারিকাদের আজ অব্যাহতি দিয়েছেন। আজ নতুন সম্রাটের অভিষেক, যাক ওরা, অভিষেকে অংশ নিক।
একটু পরেই ধীরে ধীরে এক ছায়ামূর্তি দেখা দিল ঘরের মধ্যে।
ধ্রুবা সেদিকে তাকালেন না। শুধু শুষ্কস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘কে, কুমার কচ? সবকিছু কুশলমঙ্গল তো? মহারাজের রাজ্যাভিষেক সুসম্পন্ন হয়েছে তো? এখানে কী মনে করে? মহারাজ উপঢৌকন পাঠিয়েছেন?’
কুমার কচ ধীরে ধীরে নতমস্তকে ধ্রুবার কাছে এসে দাঁড়ালেন, ‘মহাদেবী…’
‘আমি গুপ্তবংশের পট্টমহিষী নই কুমার, আমাকে ওই নামে সম্বোধন করবেন না।’
‘দেবী…’
‘আমি দেবী নই কুমার। এক সামান্যা নারী।’
‘রাজকুমারী…’
‘আমি মালবদেশ স্বেচ্ছায় ত্যাগ করেছি কুমার। আমি রাজকুমারীও নই।’
কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন কুমার কচ। তারপর খুব নরম সুরে ডাকলেন, ‘দিদি।’
ধ্রুবা চুপ করে থাকলেন। তারপর দু-হাতে মুখ চাপা দিলেন। উদ্গত কান্নার স্রোতে তাঁর দেহখানি ফুলে ফুলে উঠতে লাগল।
কুমার কচ ধ্রুবার পায়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসলেন। তারপর নিজের ডানহাতটি এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এই দেখো। কথা দিয়েছিলাম না, তোমার বিপদের দিনে আর কেউ না আসুক, আমি আসব।’
ধ্রুবা দেখলেন কুমারের হাতে তাঁর বেঁধে দেওয়া সেই রক্তবর্ণের অঞ্চলপ্রান্তটি।
‘যদি একদিনের জন্যও আমাকে নিজের ভাই বলে মেনে থাকো দিদি, তাহলে আমার কথাটা শোনো। একটিবার আমার সঙ্গে চলো দিদি। জীবনে তোমার কাছে আর কিচ্ছুটি চাইব না। মনে করো কুমার কচ নয়, এক ভাই তার দিদির কাছে কিছু ভিক্ষা চাইছে।’
ধ্রুবা চোখের জল মুছে বললেন, ‘কোথায়?’
আবার সেই পাটলিপুত্র রাজপ্রাসাদের উদ্যান। দুটি ছায়ামূর্তি, একজন মালঞ্চবেদীতে, আর একজন হাঁটু গেড়ে প্রথম ছায়ামূর্তির কাছে বসে।
আকাশ পূর্ণচন্দ্রমার আলোয় উদ্ভাসিত। চারিদিক সুগন্ধি ফুলের সুবাসে আমোদিত। একটি রাতচরা পাখি টি টি টি করে ডেকে গেল। একটু পরেই রাজ্যাভিষেকের আয়োজন শুরু হবে। দূর থেকে তার হট্টগোলের শব্দ ভেসে আসছে।
চন্দ্রগুপ্ত বললেন, ‘ধ্রুবা, আমাকে ক্ষমা করতে পারো না? মনে করো না, আমরা সেই মালব রাজপ্রাসাদের উদ্যানে দাঁড়িয়ে রয়েছি, আর আমি তোমার কাছে বিদায় জানাতে এসেছি। মধ্যবর্তী সময়টুকু নিজের স্মৃতি থেকে মুছে ফেলতে পারো না তুমি?’
ধ্রুবার গলা কেঁপে যায়, ‘আপনার করুণা চাই না মহারাজ।’
‘করুণা?’ ম্লান হাসলেন চন্দ্রগুপ্ত। ‘করুণা তো আমাকে করা উচিত ধ্রুবা। যেদিন থেকে আমি তোমাকে হারিয়েছি, সেইদিন থেকে দুর্ভাগ্য আমার নিত্যসঙ্গী। তুমিই আমার নিয়তি ধ্রুবা, আমার রাজলক্ষ্মী। আমার শ্রী!’
‘আমি তাই হতে পারি?’ তিক্ত হাসলেন ধ্রুবা, ‘আমি অন্যপূর্বা। নিজ ইচ্ছায় স্বামীর কাছ হতে মোক্ষপ্রাপ্ত এক ভাগ্যবিড়ম্বিতা স্বৈরিণী নারী। আমার কাছে কী আশা করেন মহারাজ?’
দু-হাতের তালুতে ধ্রুবার মুখখানি তুলে ধরলেন চন্দ্রগুপ্ত, ‘যে অতীত শুধু কষ্ট দেয় তার ছায়া আমাদের মধ্যে আসতে দিও না ধ্রুবা। তুমিই আমার নিয়তি, গুপ্তবংশের ভবিষ্যৎ, গুপ্তসাম্রাজ্যের মহাদেবী। আমরা দুজনে মিলে গুপ্ত সাম্রাজ্য শাসন করব। এইই আমাদের ভবিতব্য। জম্বুদ্বীপের ভবিষ্যৎকে এগিয়ে নিয়ে যাবে আমাদের সন্তান।’
মহারাজ চন্দ্রগুপ্তের সেই রাজ্যাভিষেক শত বছর পাটলিপুত্রের স্মৃতিতে অমলিন ছিল। মহারাজ বিক্রমাদিত্য চন্দ্রগুপ্ত সেই রাত্রিতেই মহাদেবী ধ্রুবাকে বিবাহ করেন। আর তারপর বহুবছর দুজনে শাসন করেন সমগ্র জম্বুদ্বীপ। তাঁদের এই বীরত্ব, ত্যাগ এবং প্রেমের কাহিনি ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে।
সমাপ্ত
