মহাদেবী – ২
আজকের মন্ত্রণাসভা বসেছিল দত্তাদেবীর প্রাসাদের একটি অংশে। মহাদেবী যাবতীয় গুপ্ত আলোচনা এখানেই করে থাকেন।
এই মন্ত্রণাসভায় উপস্থিত আছেন কয়েকজন বাছাই করা মানুষ। এঁরা প্রত্যেকেই দত্তাদেবীর অত্যন্ত কাছের, এবং তাঁর আনুগত্যের মানদণ্ডে সসম্মানে উত্তীর্ণ।
প্রথমজন বয়সে তরুণ। তিনি উক্তি করলেন, ‘কিন্তু মহাদেবী, সম্রাট যদি ইচ্ছা করেন যে সনাতন প্রথা ভঙ্গ করবেন, স্মৃতিশাস্ত্র অতিক্রম করবেন, সে অধিকার তাঁর আছে।’
দ্বিতীয়জন বয়সে প্রৌঢ়, তিনি মাথা নেড়ে কথাটা সমর্থন করলেন, ‘সম্রাট স্বয়ং ঈশ্বরের প্রতিভূ। তিনি শাস্ত্রেরও অগ্রবর্তী। তাঁর ইচ্ছাই নিয়ম, তাঁর ইচ্ছাই বিধান।’
দত্তাদেবী রুষ্ট হলেন। ‘কিন্তু তাঁর ইচ্ছা যদি সাম্রাজ্যের সার্বিক কল্যাণের পরিপন্থী হয়? সমাজস্থিতি বিনষ্ট করে?’
তৃতীয়জন বলশালী পুরুষ। দেখে যুদ্ধজীবী বলে মনে হয়৷ তিনি গম্ভীরস্বরে বললেন, ‘তবুও সম্রাটের ইচ্ছাই শেষ কথা মহাদেবী। তিনিই রাষ্ট্র, তিনিই ঈশ্বর। তাঁর অভিপ্রায় দেবতার অভিপ্রায়।’
দত্তাদেবী ক্ষুব্ধ মুখে বসে রইলেন।
প্রৌঢ় বললেন, ‘আপনার মনোবাসনা ব্যক্ত করুন মহাদেবী।’
দত্তাদেবী বললেন, ‘সম্রাটের মনোবাঞ্ছা কুমার চন্দ্রগুপ্তর হাতে গুপ্তসাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার সমর্পণ করা। কিন্তু আমার মতে জ্যেষ্ঠ সন্তান রামগুপ্তই সিংহাসনের যোগ্য উত্তরাধিকারী।’
উপস্থিত তিনজন চুপ করে রইলেন। তাঁরা এই প্রস্তাবের অযাথার্থ্যতা জানেন। কিন্তু গুপ্তসাম্রাজ্যের মহাদেবীকে সে কথা বোঝায় কে?
রামগুপ্ত সম্রাট সমুদ্রগুপ্তর জ্যেষ্ঠ সন্তান। শিশুকাল হতেই তিনি মাতা দত্তাদেবীর নয়নের মণি। গুপ্তসাম্রাজ্যের পট্টমহিষী তাঁর সমস্ত স্নেহ ভালোবাসা উজাড় করে দিয়েছিলেন তাঁর জ্যেষ্ঠ সন্তানের উপর। বোধকরি সেই জন্যই রামগুপ্ত ক্রমশ অলস, বিলাসী, কুটিল এবং দুশ্চরিত্র হয়ে উঠলেন। দিনের অধিকাংশ সময় সুরা এবং অন্যান্য বিলাসব্যসনে কাটে। তদুপরি তিনি স্বভাবে নিষ্ঠুর ও ক্রূর। গুরুজনদের উপহাস, মানীকে অসম্মান করে প্রভূত আনন্দ পান। রামগুপ্তকে পছন্দ করেন এমন পারিষদ রাজসভায় কমই আছেন।
কুমার চন্দ্রগুপ্ত সম্রাটের দ্বিতীয় সন্তান। স্বভাবে তিনি রামগুপ্তর সম্পূর্ণ বিপরীত। পিতার মতোই রণকুশল এবং কূটনীতিজ্ঞ। সাহসী, কুশলী, বীর এবং স্বভাবে নম্র এই কুমার পারিষদবর্গের অধিকাংশেরই প্রিয়পাত্র। ইনি সুশিক্ষিত, সুবিনয়ী এবং সুধীর।
কিন্তু মানুষের স্নেহের গতি অতি বিচিত্র। কোনও অজ্ঞাত কারণে প্রবল চরিত্রের মাতৃদেবীরা নিজেদের দুর্বল এবং অপদার্থ পুত্রদের প্রতি কিঞ্চিৎ অহৈতুকী স্নেহ পোষণ করে থাকেন। খুব সম্ভবত নিজের চরিত্রের দার্ঢ্য এবং প্রাবল্য দিয়ে অক্ষম পুত্রের অপদার্থতার শূন্যস্থান পূর্ণ করতে চান। দেখা গেল দত্তাদেবী ক্রমেই তাঁর অযোগ্য এবং অপদার্থ পুত্রটিকে নিজের শাসন-অঞ্চলের নীচে আশ্রয় দিতে শুরু করেছেন। আর ব্যক্তিত্ববান চন্দ্রগুপ্তর সঙ্গে ক্রমেই তাঁর দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। দত্তাদেবী সার্বিক, নিঃসংশয়, সাষ্টাঙ্গ আনুগত্য ছাড়া কিছু বোঝেন না৷ চন্দ্রগুপ্ত বুদ্ধিমান, যুক্তিবাদী, এবং স্পষ্টবক্তা। উচিত বুঝলে তিনি সম্রাটের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলতেও ছাড়েন না।
উপস্থিত সভ্যরা বুঝলেন, দত্তাদেবী চান সম্রাটের অবর্তমানে তিনিই গুপ্তসাম্রাজ্যের অধিশ্বরী হবেন। সেই জন্যই পাটলিপুত্রর সিংহাসনে তিনি রামগুপ্তকে চান, যাঁকে তিনি ইচ্ছেমতো চালনা করতে পারবেন। চন্দ্রগুপ্ত প্রবল ব্যক্তিত্বের অধিকারী, তিনি কারও ছায়ায় থেকে রাজ্যশাসন করার মানুষ নন। তাই সনাতন অনুশাসন তথা সমাজ সংস্থিতির প্রতি মহাদেবীর এই অকস্মাৎ অনুরাগ।
তরুণ বললেন, ‘গুপ্তবংশের নীতি আমাদের চেয়ে আপনি উত্তমরূপে অবগত আছেন দেবী। সাধারণ পরিস্থিতিতে কুমার রামগুপ্তই পরবর্তী সম্রাট হবেন। এই নিয়মের একটিই ব্যত্যয় সম্ভব। সম্রাট যদি পারিষদবর্গের উপস্থিতিতে রাজমুকুট কুমার চন্দ্রগুপ্তর হাতে তুলে দেন, একমাত্র সেক্ষেত্রেই গুপ্তসাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার মধ্যমকুমারের উপর বর্তাবে। অতএব আপনার মনোবাঞ্ছা পূরণ করার একটিই বৈধ উপায় আছে।
রাজবৈদ্য জানিয়েছেন সম্রাটের আয়ু আর দুই মাস মাত্র। যদি এই দুই মাস কুমার চন্দ্রগুপ্তকে পাটলিপুত্র হতে দূরে রাখা যায়, তাহলে কোনও বিশেষ উপায় বা পদ্ধতি অবলম্বন না করেই আপনার অভিপ্রায় পূরণ হতে পারে।’
দত্তাদেবী ভ্রুকুঞ্চন করলেন, ‘কিন্তু সে সম্ভব হবে কী উপায়ে?’
এবার মুখ খুললেন প্রৌঢ়, ‘উপায় আছে মহাদেবী। আমার কাছে সংবাদ আছে যে শকরাজ রুদ্রসিংহ শীঘ্রই মালব আক্রমণে উদ্যোগী হবেন। বর্তমানে রুদ্রসিংহের সেনানী এক দুর্ধর্ষ যোদ্ধৃবর্গে পরিণত হয়েছে। মালবরাজ চন্দ্রজ্যোতির ক্ষমতা নেই সেই আক্রমণ প্রতিহত করার।
আমাদের গুপ্তচরদের মুখে সংবাদ পেয়েছি যে আর দুই দিনের মধ্যেই মালবরাজের দূত পাটলিপুত্র এসে পৌঁছবে। মালবরাজ গুপ্তসাম্রাজ্যের সাহায্যপ্রার্থী হয়েছেন। আমাদের উচিত হবে মালবরাজের সাহায্যার্থে কুমার চন্দ্রগুপ্তর অধীনে একটি সৈন্যবাহিনী আশু প্রেরণ করা।’
দত্তাদেবী ইঙ্গিত বুঝলেন। প্রশ্ন করলেন, ‘আর সম্রাট যদি সম্মত না হন?’
যুদ্ধজীবী সামান্য হেসে বললেন, ‘তাকে সম্মত করাবার জন্য মহাদেবী স্বয়ং তো রইলেনই।’
তরুণ বললেন, ‘প্রস্তাব বিবেচনা করে দেখুন মহাদেবী। এর থেকে উত্তম সুযোগ আর পাবেন না। এই যুদ্ধের দুটি ফলাফল হতে পারে। যে করে হোক যুদ্ধ মাসাধিক কাল চলবেই। কুমার চন্দ্রগুপ্ত যদি যুদ্ধে জয়লাভ করেন, তবুও তাঁর রাজধানী প্রত্যাবর্তনের পূর্বেই সম্রাট পরলোকগমন করবেন। আর যদি পরাস্ত হন, তাহলেও তাই। তদুপরি তিনি ফিরবেন পরাজয়ের কলঙ্কটীকা সহ। সব দিক দিয়েই কুমার রামগুপ্তর সম্রাটভাগ্য একেবারে নিশ্চিন্ত।’
এতক্ষণে দত্তাদেবীর মুখে হাসি ফুটে উঠল। তিনি প্রীতস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘কবে পৌঁছচ্ছে মালবরাজের দূত?’
.
মালবরাজসিংহাসনে বসে আছেন মহারাজ চন্দ্রজ্যোতি। বয়সে প্রৌঢ় হলে কী হবে, শক্তিতে, রণকৌশলে এবং বীর্যবত্তায় তাঁর সমকক্ষ পুরুষ মালবদেশে কমই আছে। বীরত্বে, প্রজানুরঞ্জনে, পাণ্ডিত্যে তিনি আপামর মালবজনের কাছে পিতৃস্বরূপ।
আজ সেই মালবরাজ মহারাজ চন্দ্রজ্যোতির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এক তরুণ কুমার। দেহকান্তিতে, স্বাস্থ্যে, ব্যক্তিত্বের দ্যুতিতে তাঁকেই সবার আগে চোখে পড়ে। তাঁর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন মহারাজ চন্দ্রজ্যোতি, তাঁর মুখখানি কৌতুকগম্ভীর, চোখের তারায় সস্নেহ প্রশ্রয়দীপ্তি।
কুমার বোধহয় কোনও কারণে উত্তেজিত। কারণ একটু পরেই তিনি মহারাজ চন্দ্রজ্যোতির সামনে ক্রুদ্ধ এবং উদ্ধতস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি গুপ্তবংশের যুবরাজের সামরিক যোগ্যতায় সন্দেহ প্রকাশ করছেন মহারাজ? মনে রাখবেন, আমি রাজাধিরাজ শ্রীগুপ্তর উত্তরাধিকারী, রাজসূয় যজ্ঞাধিকারী সম্রাট সমুদ্রগুপ্তের বংশধর। আপনার দ্বারা বিশেষভাবে অনুরুদ্ধ হয়ে সম্রাট নিজে আমাকে পাঠিয়েছেন বর্বর শকজাতির আক্রমণ থেকে আপনাকে রক্ষা করার জন্য। আর আপনি প্রশ্ন করছেন আমি বা আমার ভ্রাতা এই কাজে সমর্থ হব কিনা?’
চন্দ্রজ্যোতি মৃদু হাসলেন৷ সেই হাসির মধ্যে অনেকখানি স্বস্তি আর বাৎসল্যও মিশে ছিল কি?
মালবাধিপতি চন্দ্রজ্যোতি শুধু একজন প্রজানুরঞ্জক রাজাই নন, একজন বীরযোদ্ধাও বটে। বহুকাল ধরে স্বীয় বলবীর্যে মধ্যভারতের এই বিস্তীর্ণ ভূভাগ শাসন করেছেন। শত্রুদের পরাস্ত করেছেন বারে বারে৷ কদাচ বিজিত পক্ষের মর্যাদার হানি করেননি। ক্রমে একদা যারা তাঁর প্রতি বিরূপ ছিল তারাও তাঁর স্নেহের শাসনে বশীভূত হয়েছে। পরাজিতপক্ষে কোনও গুণী মানুষের সন্ধান পেলে তাঁকে সম্মানসহ মালবরাজসভায় উচ্চপদে আসীন করেছেন।
কেবলমাত্র একটি শত্রুপক্ষ বাদে। শকজাতি।
শকজাতির ইতিহাস অন্ধকারাচ্ছন্ন। শুধু জানা যায় নগাধিরাজ হিমালয়ের পশ্চিমপ্রান্তে, পারস্যদেশের উত্তরার্ধের কোনও ঘন বনানীঘেরা মহাকায় এক হ্রদের তীরে তাদের বাস ছিল একদা। এরা দুর্ধর্ষ যুদ্ধপ্রিয় জাতি। এরা অশ্বারোহণে অসম্ভব পটু, ধনুর্বিদ্যায় অতিশয় ক্ষিপ্র এবং ক্রূরতায় তুলনাহীন। প্রায় অর্ধসহস্রাব্দ যাবৎ তারা জম্বুদ্বীপের উত্তর পশ্চিমার্ধ শাসন করছে৷ তাদের সঙ্গে মালবদের শত্রুতাও প্রায় শতাধিক বৎসরের অধিক হবে। চন্দ্রজ্যোতি নিজেও বয়ঃপ্রাপ্তির প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শকদমনে রত হয়েছেন। এবং স্বীয় পরাক্রম সামর্থ্যে চিরশত্রু শকদের পরাস্ত করেছেন বারে বারে, ব্যর্থ হননি কখনও। শুধু এইবার, এইবার তাঁর মনে হয়েছে যে আর বোধহয় শক্তি সামর্থ্যে তিনি শকদের সঙ্গে পেরে উঠবেন না।
তার প্রধান কারণ—শকাধিরাজ রুদ্রসিংহ!
রুদ্রসিংহের পিতা ছিলেন শকাধিপতি সত্যসিংহ। শকজাতি রণোন্মাদ যোদ্ধৃজাতি, এবং সত্যসিংহ সেই রক্তলোলুপ জাতির সার্থক নৃপতি ছিলেন। ধনুর্বিদ্যা এবং তরবারিচালনে তাঁর সমকক্ষ বীর ভারতবর্ষে কমই জন্মগ্রহণ করেছেন।
কিন্তু তিনি বীর হলে কী হবে, নির্মম নিষ্ঠুরতা এবং ধূর্ত অন্যায়যুদ্ধ তাঁর বীরত্বের কলঙ্কভূষণ ছিল।
ভারতবর্ষ চিরকালই ন্যায়যুদ্ধে এবং ধর্মযুদ্ধে বিশ্বাসী। বিশ্রামরত শত্রুশিবিরে আক্রমণ, স্ত্রী এবং শিশুদের ওপর নির্যাতন, নিরস্ত্র মানুষকে নির্বিচারে হত্যা, এসব ভারতের যুদ্ধশাস্ত্রে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। বিজিত ভারত শরণাগত হলে বিজয়ী ভারত তাকে অভয়দান করেছে। নারীজাতির সম্মানরক্ষা করেছে, শিশুদের নিজক্রোড়ে স্থান দিয়েছে।
কিন্তু শকজাতি যবন জনজাতি। ভারতীয় যুদ্ধনীতি তাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। পরাজিত শত্রুদের প্রতি তাদের নৃশংতা ভয়াবহ। তাদের রণনীতি মারি অরি পারি যে কৌশল। নির্জিত শত্রুদের সামূহিক উৎসাদন তাদের প্রধানতম বিলাস, প্রিয়তম ব্যসন। আর সেই বিলাসব্যসনের জন্য ঘৃণ্য থেকে ঘৃণ্যতম পন্থা অবলম্বন করতেও তারা পশ্চাৎপদ হয়নি কখনও।
আর সত্যসিংহ এই অপরিসীম নিষ্ঠুরতার সার্থক প্রতিভূ ছিলেন। অকস্মাৎ আক্রমণে শত্রুপক্ষের জনপদকে নির্মূলীকরণ, অগ্নিসংযোগে ফলবতী শস্যভূমির ধ্বংসসাধন, নিরীহ নিরপরাধ গ্রামবাসীর গণউৎসাদন এসবে তাঁর বিশেষ রুচি ছিল৷ শত্রুপক্ষের রক্তদর্শনে তিনি প্রীত হতেন, শত্রুর হাহাকার শ্রবণে উত্তুঙ্গ আনন্দবোধ করতেন।
রুদ্রসিংহ তাঁর পিতার অপরিসীম নৃশংসতার উত্তরাধিকার অর্জন করেছেন। আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাঁর চরিত্রের এক ঘনঘোর তমসাচ্ছন্ন দিক। তাঁর অপরিসীম, অবিরাম, অনিঃশেষ নারীলিপ্সা!
নারীসম্ভোগের ব্যাপারে রুদ্রসিংহের কুখ্যাতি প্রবাদপ্রতিম। যৌবনোন্মেষ কাল থেকেই তিনি এ ব্যাপারে সিদ্ধপুরুষ। শকরাজ্যে কথিত আছে, যদি কোনও সুন্দরী নারীর উপর কোনও প্রকারে রুদ্রসিংহের অনুরাগ জন্মায়, তাহলে যেনতেনপ্রকারেণ সেই হতভাগিনীকে অঙ্কশায়িনী না করা পর্যন্ত তাঁর শান্তি নেই।
আর এই বিষয়ে তিনি প্রকৃতই সাম্যপন্থী। ঘনিষ্ঠ মিত্রের স্ত্রী অথবা কন্যা থেকে শুরু করে নিজ স্ত্রী-কন্যার প্রিয়তম সখী, সবাইকেই সমান চক্ষে দেখেন। তাঁর বৈধ পত্নীর সংখ্যা একাদশ, অবৈধ রক্ষিতা এবং যৌনদাসীদের সংখ্যা অগণিত। যুদ্ধের পর বিজিত জাতির নারীদের প্রকাশ্য গণলাঞ্ছনা তাঁর একান্ত চিত্তবিনোদন। প্রিয়বিয়োগে কাতর নারীদের সামূহিক যৌনসম্ভোগ তাঁর প্রিয়তম ক্রীড়া। আর নিজের যৌনক্ষুধা তৃপ্ত হলে সেই হতভাগিনীদের তিনি বণ্টন করে দেন শকসৈন্যাধ্যক্ষদের মধ্যে, যেভাবে লোলুপ তরক্ষুদের সামনে নিক্ষিপ্ত করা হয় হরিণীমাংসপিণ্ড।
আর বিজিত রাজ্যের হতভাগ্য নৃপতির পত্নী ও কন্যারা?
তাঁদের তিনি পাত্র-মিত্র সমভিব্যাহারে উপভোগ করেন মাসাধিককাল ধরে। বিজিত জাতির অভিজাত নারীদের সঙ্গে তুচ্ছ বারাঙ্গনাতুল্য ব্যবহার করা, তাদের প্রকাশ্যে সামূহিক গোষ্ঠীসম্ভোগ রুদ্রসিংহের অতি প্রিয়তম যৌনক্রীড়া। তারপর সেই হতভাগিনীদের ঠাঁই হয় উচ্চপদাধিকারীদের যৌনদাসীদের মধ্যে। রুদ্রসিংহের স্পষ্ট নির্দেশ, পরাজিত জনজাতির নারীদের গর্ভ অধিকার করে সেই গর্ভে সবল সক্ষম শকপুরুষদের বীজ বপন করতে হবে। বিজিত জাতির নারীদের ধর্ষণ এবং সবলসম্ভোগে তাঁর পূর্ণ অনুমোদন তথা সোৎসাহ সমর্থন আছে।
পশ্চিম এবং উত্তর জম্বুদ্বীপ এখন রুদ্রসিংহের পদানত। তদঞ্চলের বিজিত জাতিসমূহের লাঞ্ছনার সংবাদ অতি সাহসী মানুষের মনেও ভীতিসঞ্চার করে। পুরুষরা শ্রবণমাত্রে ভীত ও ক্রুদ্ধ হন। নারীরা আতঙ্কিত হয়ে শ্রীবিষ্ণুর নাম জপতে থাকেন। নারীত্বের এমন চরম লাঞ্ছনা যেন তাঁদের সঙ্গে মরণেও না হয়।
.
চন্দ্রজ্যোতি যখন চরমুখে সংবাদ পেলেন যে রুদ্রসিংহ এবার মালব আক্রমণের উদ্যোগ নিচ্ছেন, স্বাভাবিকভাবেই বিচলিত হয়েছিলেন তিনি। এ রাজ্যের প্রজাদের তিনি সন্তানসম জ্ঞান করেন। তাঁদের ওই অবর্ণনীয় দুর্দশার সম্মুখীন হতে দিতে তিনি পারেন না। তাঁর পিতা-পিতামহের স্মৃতিবিজড়িত এই রাজ্যের পথে-ঘাটে-শ্মশানে নৃত্য করবে ওই নারকী পাপিষ্ঠের দল? ছারেখারে যাবে তাঁর জন্মভূমি? তাঁর শরীরে একবিন্দু রক্ত অবশিষ্ট থাকতে তা কখনই নয়।
তবে শুধু নিজের প্রজাবর্গের রক্ষাসাধন নয়, তাঁর আরও একটি চিন্তার কারণ ছিল। আর সেই কারণ তাঁর স্নেহপুতলি, দুচোখের মণি, রাজকন্যা ধ্রুবা।
মহারাজ চন্দ্রজ্যোতি যৌবনকাল হতে বিপত্নীক। রাজ্ঞী চন্দ্রলেখা কন্যার জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যু কোলে ঢলে পড়েন। সেই থেকে মাতৃহীনা অভাগী কন্যাটিকে একাধারে পিতা এবং মাতা হয়ে লালন করেছেন মহারাজ চন্দ্রজ্যোতি। বহু অনুরোধেও দ্বিতীয়বার দারপরিগ্রহ করেননি। শুধু তাই নয়, দাসী বা রক্ষিতা সম্ভোগেও তাঁর কোনওদিনই রুচি ছিল না। শুদ্ধচিত্ত মহারাজ চন্দ্রজ্যোতির একমাত্র ধ্যানজ্ঞানচিন্তা ছিল কন্যা ধ্রুবার সার্বিক পালনপোষণ।
তাই তিনি রুদ্রসিংহের অভিপ্রায় জ্ঞাত হওয়ামাত্র দ্বিধা করেননি। দূত পাঠিয়েছিলেন পাটলিপুত্রে, বাল্যবন্ধু এবং মহাপরাক্রান্ত সম্রাট সমুদ্রগুপ্তর কাছে। প্রাণাধিকা প্রিয়া কন্যাকে শত্রুদের হাতে লাঞ্ছিত হতে দিতে তিনি পারবেন না। তার জন্য বাল্যবন্ধুর সাহায্যপ্রার্থী হতেও তাঁর আপত্তি নেই।
তিনি জানতেন যে সম্রাট সমুদ্রগুপ্ত এখন মৃত্যুশয্যায়। যে বলদর্পী সিংহ একক ক্ষমতায় প্রায় অর্ধেক জম্বুদ্বীপ নিজ অধিগত করেছেন, তিনি দুরারোগ্য কর্কটব্যাধিতে আক্রান্ত। সসাগরা জম্বুদ্বীপের শ্রেষ্ঠ বৈদ্যরা ব্যর্থ হয়েছেন সম্রাটকে আরোগ্যের পথে নিয়ে যেতে। বহু বিচিত্রতর ঔষধ, দেশের দুর্গম অঞ্চল হতে আনা জাদুরসায়ন, বিশেষ তান্ত্রিক ক্রিয়া, কিছুই কাজে আসেনি। সম্রাট অবশেষে নিরস্ত করেছেন তাঁর রাজপরিষদবর্গকে। জীবনের শেষ ক’টা দিন তিনি শান্তিতে কাটাতে চান। ব্যথাজর্জর দেহের ক্লেশ তিনি শ্রীবিষ্ণুতে সমর্পণ করেছেন।
তবে বাল্যবন্ধুকে তিনি নিরাশ করেননি। তাঁর অজেয় সেনানীর একটি ক্ষুদ্র অথচ দুর্ধর্ষ রণকুশল অংশকে তৎক্ষণাৎ মালবের উদ্দেশে প্রেরণ করেছেন তিনি। আর তার সৈনাপত্যের ভার দিয়েছেন নিজের যোগ্যতম আত্মজকে, মধ্যমকুমার চন্দ্রগুপ্তকে।
‘যাও পুত্র। মালবরাজ চন্দ্রজ্যোতি আমার বাল্যবন্ধু শুধু নয়, বৈবাহিক সূত্রে আমাদের আত্মীয়ও বটে। তার ওপর তার মতো আত্মাভিমানী এবং স্বীয় বলবীর্যে আস্থাশীল মানুষ আমি কমই দেখেছি। সে যখন আমার সাহায্যপ্রার্থী হয়েছে, তখন কিছু গুরুতর কারণ ঘটেছে বই কী। দ্রুত মালবদেশে যাও এবং তার বিপদ দূরীভূত করো। আর শোনো, তার মতো স্থিরবুদ্ধি, প্রজাপ্রিয়, জিতেন্দ্রিয় এবং অভিজ্ঞ রাজনীতিজ্ঞ মেলা ভার। তাঁকে পিতৃতুল্য জ্ঞান কোরো, আর সেই প্রাজ্ঞ মানুষটির কাছে জীবন ও রাজনীতির পাঠ নিও।’
কুমারের চলে যাওয়ার পথে একদৃষ্টে তাকিয়েছিলেন সম্রাট। শেষবার যখন প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়, তার সঙ্গে তার দশমবর্ষীয়া কন্যাটিও ছিল। ভারি লক্ষ্মীমন্ত মেয়েটি। সম্রাট সমুদ্রগুপ্তর কোনও কন্যা নেই। মেয়েটিকে দেখে তাঁর পিতৃহৃদয় ভারি প্রসন্ন এবং তৃপ্ত হয়েছিল।
চোখ বোজেন সম্রাট। এখন কত বয়েস হবে মেয়েটির? কুমার চন্দ্রগুপ্তর থেকে কয়েক বছর কমই হবে।
যন্ত্রণায় মুখ বিকৃত হয়ে যায় মহাপরাক্রমশালী, বিক্রমকেশরী, জম্বুদীপাধিপতি রাজাধিরাজ সমুদ্রগুপ্তর। কবে ফিরবে মধ্যমকুমার?
.
মহারাজ চন্দ্রজ্যোতি অতি সমাদরে বরণ করেছিলেন কুমার চন্দ্রগুপ্তকে। শুধু চন্দ্রগুপ্ত নন, বরণ করেছিলেন কুমারের ছায়াসঙ্গী কুমার কচগুপ্তকেও।
কুমার কচগুপ্ত সম্পর্কে কুমার চন্দ্রগুপ্তর পিতৃব্যপুত্র। জ্ঞান হওয়া অবধি তিনি জ্যেষ্ঠ ব্যতীত আর কাউকে চেনেন না। বয়সে কিশোর এই কুমার প্রকৃতার্থেই কুমার চন্দ্রগুপ্তর দ্বিতীয় ছায়া। কুমার চন্দ্রগুপ্ত’ও কনিষ্ঠ ভ্রাতাটি ছাড়া চোখে অন্ধকার দেখেন। গুপ্তমহিষীরা প্রীতস্বরে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেন, ভগবান শ্রীরামচন্দ্র আর রামানুজ লক্ষ্মণ গুপ্তবংশে পুনর্বার জন্মগ্রহণ করেছেন।
কিশোর কচকে দেখে মহারাজ চন্দ্রজ্যোতির অন্তরে বোধকরি কিঞ্চিৎ স্নেহমিশ্রিত কৌতুকের উদ্ভব হয়ে থাকে। তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কুমার এই যুদ্ধের জন্য শরীরে, মনে এবং সামরিকভাবে প্রস্তুত তো?’
শোনা মাত্র জ্যা-মুক্ত ধনুর মতো উঠে দাঁড়িয়েছিলেন কুমার চন্দ্রগুপ্ত। প্রশ্ন করেছিলেন মহারাজ চন্দ্রজ্যোতি কি তাঁদের সামরিক যোগ্যতায় সন্দেহ প্রকাশ করছেন?
তরুণ ভাস্করের মতো উজ্জ্বল কন্দর্পকান্তি সেই যুবক, যাঁর দুচোখে দীপ্তিময় অহংকার ঝলসে উঠছে হীরকচূর্ণের মতো, তাঁর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন মহারাজ চন্দ্রজ্যোতি। শান্ত অথচ গম্ভীরস্বরে বললেন, ‘আপনার বা কুমার কচগুপ্তর যুদ্ধক্ষমতার প্রতি কোনও সন্দেহ পোষণ করি না কুমার। শুধু কুমার কচগুপ্তর তরুণ বয়স দেখে সামান্য চিন্তায় ছিলাম৷ তবে সেই চিন্তা দূর হয়েছে। আপনি আপাতত বিশ্রাম করুন। যথাসময়ে আমাদের আমার দেখা হবে।’
.
মালবের আকাশ রাত্রিকালে বড় স্নিগ্ধ, বড় মধুর। দিবাভাগ অসহনীয় হলে কী হবে, সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে মৃদু মধুর বাতাস বইতে থাকে পশ্চিম দিক থেকে। প্রাসাদ সংলগ্ন উদ্যান থেকে ভেসে আসে কেতকী, জুহি, বেলি প্রভৃতি পুষ্পের সুবাস। দূর কোনও গবাক্ষ থেকে ভেসে আসে গানের সুর, পূরবীর তানে গলা সাধছেন কেউ।
দুই কুমারের বাসস্থান নির্দিষ্ট হয়েছে রাজপ্রাসাদ থেকে কিছুটা দূরে, মহতী নদীর তীরস্থ একটি প্রাসাদে। মালবে বিশিষ্ট অতিথি অভ্যাগতদের আগমন ঘটলে এখানেই তাঁদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। প্রাসাদটি অনিন্দ্যসুন্দর। কুমারদের সুখ-সুবিধা পরিদর্শনের জন্য প্রহরী এবং অন্যান্য কিঙ্কর-কিঙ্করীদের নিয়োগ করা হয়েছে। দিবাভাগে কুমাররা অস্ত্রাভ্যাস করেন। দ্বিপ্রাহরিক আহারের পর অশ্বারোহণে মালবদেশ পরিদর্শনে বেরোন।
সন্ধ্যাবেলা কোনওদিন সভাগায়ক, কোনওদিন বাজিকর, বা কোনওদিন কোনও গল্পকথক আসেন কুমারদের মনোরঞ্জন করার জন্য। এঁদের মধ্যে একজনকে ভারী পছন্দ হয়েছে কুমার চন্দ্রগুপ্তর। উজ্জ্বল এবং চতুর এই যুবক একাধারে ঐন্দ্রজালিক, কথক এবং নীতিশাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত। নাম বেতালভট্ট। কুমার মনে মনে ইচ্ছা পোষণ করেন এই ঝঞ্ঝাট মিটে গেলে তিনি বেতালভট্টকে পাটলিপুত্রে সঙ্গী করে নিয়ে যাবেন।
.
সন্ধ্যাকালে প্রাসাদের উদ্যানে পদচারণা করছিলেন কুমার চন্দ্রগুপ্ত। সঙ্গী কুমার কচ। মালবে পদার্পণের পর থেকে পক্ষকাল কেটে গেছে। চারিদিক শান্তসুনিবিড়। কোথাও কোনও যুদ্ধঝঞ্ঝাটের চিহ্নমাত্র নেই। মনে মনে অধীর হয়ে উঠছিলেন চন্দ্রগুপ্ত। যে উদ্দেশে তিনি মালবে এসেছিলেন তার তো কোনও লক্ষ্মণই দেখা যাচ্ছে না৷
কুমার কচ জ্যেষ্ঠর অস্থিরতা অনুভব করতে পারছিলেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘আজ আপনাকে বড় অস্থির দেখাচ্ছে যুবরাজ। কোনও বিশেষ কারণ?’
যুবরাজ না হলেও জ্যেষ্ঠকে একান্তে এই নামেই সম্বোধন করেন কুমার কচ। চন্দ্রগুপ্ত ব্যতীত অন্য কেউ গুপ্তসাম্রাজ্যের যুবরাজ তথা সম্রাট হতে পারেন, এ তিনি বিশ্বাস করেন না।’
‘হ্যাঁ ভ্রাতা কচ। অতদূর হতে পিতৃআজ্ঞা রক্ষার্থে ছুটে এলাম। কিন্তু যুদ্ধের তো কোনও আয়োজনই দেখতে পাচ্ছি না।’
‘আমার কী মনে হয় জানেন? রুদ্রসিংহ সংবাদ পেয়েছে যে আপনি সসৈন্যে এখানে উপস্থিত। তাই সে সহসা মালব আক্রমণের সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারছে না।’
হো হো করে হেসে উঠলেন চন্দ্রগুপ্ত। তাঁর প্রতি তাঁর এই অনুগত কনিষ্ঠটির ভক্তি ও ভালোবাসা অপরিসীম৷ তাই বলে এতটা বোধহয় তিনি নিজেও কল্পনা করতে পারতেন না।
হাসি থামলে তিনি বললেন, ‘তা নয় ভ্রাতা। না আমি পিতার মতো বীর, না আমার বীরত্বের কাহিনি ভারতদেশে সুপরিব্যপ্ত। আমার চিন্তা অন্যত্র। আমাদের এখানে টেনে আনা অন্য কোনও বৃহৎ পরিকল্পনার অঙ্গ নয় তো?’
উৎসুক হলেন কচ, ‘কীরকম?’
‘মালবের দূত এসে বলেছিল যে রুদ্রসিংহের সেনানী মালবের পথে আগুয়ান হয়েছে, আমাদের সাহায্য আশু প্রয়োজন। অথচ আমরা মালবে আসার পর পক্ষকাল অতিক্রান্ত, অথচ যুদ্ধের কোনও উদ্যোগই নেই। এই যুদ্ধের আবহ কি তাহলে কোনও প্রবঞ্চনার অংশবিশেষ? কোনওভাবে কি আমাদের মালববাস দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা চলছে?’
গম্ভীর হলেন কুমার কচ, ‘যদি তা হয়ও, তাতে কার কী লাভ?’
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন চন্দ্রগুপ্ত, ‘সেই কূটব্যাসটিরই তো অর্থোদ্ধার সম্ভব হচ্ছে না প্রিয় কচ। এই অনর্থক বিলম্বের কোনও একটি কারণ তো আছে।’
কচ গম্ভীরমুখে বললেন, ‘আমার মনে হয় আপনি বড় দ্রুত কোনও সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছেন জ্যেষ্ঠ। হয়তো কালই দেখবেন যুদ্ধভেরি বেজে উঠেছে বিপুলনাদে।’
.
কুমার কচ-এর কথা অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেল। পরদিনই জানা গেল যে মালবের সীমানায় উপস্থিত হয়েছে রুদ্রসিংহের বাহিনী।
মালবরাজসভায় আপৎকালীন সভার আয়োজন করা হয়েছিল। উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী দণ্ডপানি, প্রবীণ অমাত্য বীরবাহু, সৈন্যাধিপতি জগৎস্বামী, এবং গুপ্তবংশের দুই কুমার। তর্ক-বিতর্ক চলছিল কোন পরিস্থিতিতে কী পরিকল্পনা নেওয়া হবে তাই নিয়ে।
সভা চলাকালীনই প্রতিহারী এসে নিবেদন করল যে রুদ্রসিংহের বার্তা নিয়ে শকদূত এসে উপস্থিত হয়েছে।
রুদ্রসিংহের দূত এসে দাঁড়ালে সবাই কিঞ্চিৎ নড়েচড়ে বসলেন। মহারাজ চন্দ্রজ্যোতি গম্ভীর এবং উৎকণ্ঠিত স্বরে বললেন, ‘বলো দূত, কী সমাচার এনেছ আমাদের জন্য?’
দূত যা জানালো তা মোটামুটি এরকম—
ঈশ্বরের ইচ্ছানুসারে মহারাজ রুদ্রসিংহ এই সসাগরা ধরিত্রীর একমাত্র বৈধ অধিপতিরূপে নির্বাচিত হয়েছেন। তাই ঈশ্বরানুগৃহীত মহান সম্রাট রুদ্রসিংহের আদেশানুসারে এই বিশ্বচরাচরের যাবতীয় স্থাবর ও জঙ্গম ভূসম্পত্তি, যাবতীয় জলচর, খেচর এবং ভূমিচর প্রাণী, যাবতীয় পশু প্রাণী উদ্ভিদ গুল্ম এবং ঔষধি, সবই তাঁর সম্পত্তি।
এতদসত্ত্বেও, মহামহিম শকসম্রাট অবশ্যই পরম দয়ালু ও ক্ষমাশীল, এবং শান্তির প্রতিভূও বটে। তিনি চাইলেই মুহূর্তের মধ্যে মালবদেশকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে পারেন। যেমন করেছেন উত্তরকুরু, পুরুষপুর হতে শুরু করে বায়ব্যদেশের যাবতীয় জনপদসমূহকে। তবুও তিনি অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে মালবদেশকে সামূহিক ধ্বংসের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার একটি শেষ সুযোগ করে দিতে চান৷ এ অবশ্যই তাঁর মহত্ব এবং ঔদার্যের পরিচায়ক।
তার বিনিময়ে তিনি যা চান সে অতি সামান্য অর্ঘ্য।
এক, শকাধিপতির বশ্যতা স্বীকার করে তাঁকে নিয়মিত করদান। দুই, রাজকন্যা ধ্রুবাকে তিনি নিজের দ্বাদশতম মহিষী হওয়ার মহান সম্মান অর্পণ করতে চান।
নেহাত দূত অবধ্য, নইলে সেদিনই সেই অর্বাচীনের মুণ্ডখানি স্বর্ণপাত্রে সাজিয়ে শত্রুশিবিরে পাঠাতেন মহারাজ চন্দ্রজ্যোতি। চণ্ডক্রোধে সর্বাঙ্গ কাঁপছিল তাঁর। তরবারিখানি কোষমুক্ত করে রক্তলাল চোখে হুঙ্কার দিলেন মহাক্রোধী মহারাজ চন্দ্রজ্যোতি, ‘যা রে অর্বাচীন, নিজের শিবিরে ফিরে যা। গিয়ে তোর ওই দুশ্চরিত্র লম্পট প্রভুকে গিয়ে বল অমন গর্ভস্রাবের তর্জনে ভীত হওয়ার মানুষ আমি নই। তোর প্রভুর মতো অমন প্রচুর সারমেয়কে লগুড়াঘাতে যমদ্বারে পাঠিয়েছি। প্রয়োজন হলে আবার পাঠাব।’
দূত অভিবাদন করে বিদায় নিল। তার ওষ্ঠপ্রান্তে লেগে থাকা বক্রহাস্যটি কারও দৃষ্টি এড়াল না।
নিস্তব্ধ মালবরাজসভার নৈঃশব্দ্য ভঙ্গ করে প্রথম প্রশ্ন করলেন কুমার চন্দ্রগুপ্তই, ‘অতঃপর? আমাদের কী করণীয় এই মুহূর্তে?’
উঠে দাঁড়ালেন মন্ত্রী দণ্ডপানি, ‘এই অপমানজনক সন্ধিতে সম্মত হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু রুদ্রসিংহের ওই অবাস্তব বাগাড়ম্বর অগ্রাহ্য করেও আমাদের মেনে নিতেই হবে সে আমাদের থেকে এখন বহুগুণে ক্ষমতাশালী। তার সৈন্যবাহিনীর সংখ্যাও আমাদের চেয়ে বহুগুণে অধিক। এখন এই সঙ্কট থেকে উদ্ধারের উপায় কী?’
প্রবীণ অমাত্য বীরবাহু বললেন, ‘আমার মতে আমাদের উচিত রুদ্রসিংহর শিবিরে একটি সম্মানজনক শর্ত নিয়ে দূত প্রেরণ করা। যেমন শুধুমাত্র করপ্রদান, বা রাজ্যের সামান্য অংশ দান। তাতে যদি তাঁকে এই যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত করা যায়।’
সেনাপতি জগৎস্বামী বয়সে নবীন। তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, ‘মানে? আপনি কী চাইছেন বীরবাহু? মালবদেশ ভীত কাপুরুষের মতো ওই নারীলোলুপ শক জন্তুটার কাছে আত্মসমর্পণ করবে? আমাদের মধ্যে কি পৌরুষের অভাব ঘটেছে? আমরা কি ভীরু, দুর্বল, অবলা?’
বীরবাহু কঠিনস্বরে বললেন, ‘আপনার শস্ত্রজ্ঞান অগাধ হলে কী হবে, শাস্ত্রজ্ঞানের কিছু অভাব দেখা যাচ্ছে সেনাপতি মহোদয়। শাস্ত্রে বলে সর্বনাশং সমুৎপন্নে অর্ধং ত্যজতি পণ্ডিতঃ। আমি আপনার বা মালবদেশের যোদ্ধাদের ক্ষমতাকে অসম্মান করছি না। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এ ছাড়া আর পথ নেই। শকসৈন্যবাহিনী এখন বিশাল, বিপুল। তাদের সেনানায়করাও একেকজন মহাশক্তিশালী যুদ্ধবিশারদ। তদুপরি রুদ্রসিংহের প্রধানমন্ত্রী নকুলদেবের মতো কুটিল এবং ধূর্ত কৌশলী মানুষ দ্বিতীয়টি নেই।
পরাজিত রাজ্যের অধিবাসী, বিশেষ করে তাদের নারীদের ওপর এই হিংস্র শকবাহিনী কী বর্বর অত্যাচার করে সে সংবাদ আমাদের কানে এসেছে। আমি চাই না সেই অকল্পনীয় সর্বনাশ মালবদেশের ওপর নেমে আসুক। তাই আমি সামান্য ত্যাগের বিনিময়ে বৃহত্তর ক্ষতি এড়াতে চাইছি।’
সভাস্থলের গুঞ্জন কলরবের আকার ধারণ করল। সভাস্থ রাজপুরুষেরা অমাত্য বীরবাহুর বক্তব্যের যাথার্থ্য বিচার করতে লাগলেন।
উঠে দাঁড়ালেন যুবরাজ চন্দ্রগুপ্ত, ‘অমাত্য বীরবাহু যা বলেছেন তা অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত বটে৷ কিন্তু এক্ষেত্রে আমি মহারাজের সিদ্ধান্ত সর্বান্তঃকরণে সমর্থন করি। তার পিছনে কিছু সুচিন্তিত কারণ আছে।
আমরা জানি যে বুভুক্ষু রাক্ষসের ক্ষুধাগ্নি কিছুতেই নির্বাপিত হয় না। একের পর এক সে তার শিকারকে গ্রাস করতেই থাকে। রুদ্রসিংহর প্রধান উদ্দেশ্য মালবদেশ অধিকার করা, শুধু নিয়মিত করলাভে সে সন্তুষ্ট হবে না। নইলে সে শুধুমাত্র প্রথম প্রস্তাবটিই পাঠাত, দ্বিতীয় প্রস্তাবটির মতো অসভ্য এবং অশ্লীল শর্তারোপের কথা ভাবত না। সে জানে যে মহারাজ চন্দ্রজ্যোতি প্রথম প্রস্তাব মেনে নিলেও নিতে পারেন। কিন্তু কিছুতেই দ্বিতীয়টি মানবেন না। সে যুদ্ধ চায়, মীমাংসা নয়।রুদ্রসিংহর প্রধান উদ্দেশ্য মালবদেশ দখল করা নয়, নইলে সে শুধুমাত্র প্রথম প্রস্তাব দিয়েই ক্ষান্ত হত, দ্বিতীয় প্রস্তাবটির মতো অত্যাচারী অশ্লীল এবং ইতর শর্তারোপের কথা ভাবত না। তাই এক্ষেত্রে আমাদের উচিত সর্বোতভাবে যুদ্ধঘোষণা করা।’
জগৎস্বামী উৎফুল্লস্বরে বললেন, ‘এই তো বীরের উপযুক্ত কথা। মহান গুপ্তবংশের যুবরাজের মুখে এই কথাই তো শুনতে চাই!’
বীরবাহু ভ্রুকুঞ্চন করে বললেন, ‘কিন্তু কুমার, রুদ্রসিংহের বাহিনী মালব এবং গুপ্ত বাহিনীর থেকেও তিনগুণ বেশি শক্তিশালী। সেখানে আপনি কী করে…’
হাত তুলে বীরবাহুকে নিরস্ত করলেন চন্দ্রগুপ্ত, ‘বাহিনীর আকারের সঙ্গে তার সামগ্রিক শক্তির কোনও সম্পর্ক নেই অমাত্য। শক্তি আসে কৌশল থেকে, নৈপুণ্য থেকে, দর্প থেকে, আত্মবিশ্বাস থেকে—আক্রমণকারীর আকার থেকে নয়। তাহলে তো অরণ্যে সিংহ নয়, হাতিই পশুরাজ হতো।
জেনে রাখুন অমাত্য বীরবাহু, আক্রমণকারীর নৈতিকশক্তি সর্বদাই আক্রান্তর থেকে কম হয়। তাই পরাজয়ের বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা দেখলেই তারা পিছু হটতে থাকে৷ তদুপরি শকসেনার অধিকাংশই বিজিত জাতি থেকে ধরে আনা সমর্থ পুরুষদাসদের দিয়ে তৈরি। তারা তাদের শোষণকর্তাদের জন্য প্রাণপাত করবে কেন?
মালবসৈন্যদল ক্ষুদ্র হতে পারে, কিন্তু তারা স্বাধীন দেশের স্বাধীন সৈন্য। নিজের জন্মভূমির স্বাধীনতা রক্ষার জন্য, নিজের সন্তানদের সুস্থ জীবনের জন্য, নিজের নারীদের সম্মানরক্ষার জন্য তারা প্রাণপণ সংগ্রাম করবে। জয় এবং পরাজয়ের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয় ওই জীবনপণ সংগ্রামটুকুই। আর রইল কৌশলের প্রশ্ন, তার জন্য তো আমরা রইলামই।’
