মহাদেবী – ৩
পরদিন প্রভাতে শকবাহিনীর সঙ্গে মালব ও গুপ্ত যৌথবাহিনীর প্রত্যক্ষ সংগ্রাম শুরু হল।
শকবাহিনীর রণকৌশল অত্যন্ত উন্নতমানের। তদুপরি তাদের হাতে আছে পারস্য এবং গান্ধারদেশের বহু বিচিত্র অস্ত্রসমূহ। তাদের ব্যূহের অগ্রভাগ রক্ষা করছেন সেনাপতি হস্তীবর্মণ। ইনি বয়সে প্রবীণ এবং বিচক্ষণ সেনানায়ক রূপে বিখ্যাত। দুইপক্ষ রক্ষা করছেন মহাবীর উগ্রসেন ও নাগদন্ত৷ এঁরা সার্থকনামা। উগ্রসেনের আগ্রাসী হিংস্রতা ইতিমধ্যেই প্রবাদে পরিণত হয়েছে। আর নাগদন্তর মতো ধূর্ত এবং বিষবুদ্ধির সেনানায়ক বিরল। আর একটু দূরে উপস্থিত আছেন রুদ্রসিংহ স্বয়ং।
মালববাহিনীর দুইপার্শ্বভাগ রক্ষা করছেন যথাক্রমে সেনাপ্রধান জগৎস্বামী এবং কুমার চন্দ্রগুপ্ত। আর অগ্রভাগ রক্ষা করছেন মহারাজ চন্দ্রজ্যোতি স্বয়ং৷ তিনি তাঁর বহুযুদ্ধের সঙ্গী, ঐরাবততুল্য মহাগজ নীলরাজের উপর আসীন।
যুদ্ধ শুরু হতেই চন্দ্রগুপ্ত হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, ‘জয় মহাকাল, হর হর মহাদেব!’ সঙ্গে সঙ্গে মালব ও গুপ্তসৈন্যরা সগর্জনে তার প্রতিধ্বনি করল। উত্তরে শকসৈন্যরাও মহাঘোররবে হুঙ্কার দিয়ে উঠল, ‘জয় সর্বশক্তিমান রুদ্রসিংহের জয়!’
জ্যা-মুক্ত তিরের মতো শত্রুদের দিকে ধেয়ে গেলেন চন্দ্রগুপ্ত। আর তাঁর ঠিক পিছনে কুমার কচ। অশ্বারূঢ় চন্দ্রগুপ্তর অব্যর্থ শরচালনায় একের পর এক প্রতিপক্ষ ধরাশায়ী হতে থাকল। কুমার কচ অসিচালনায় অতিরথ। তদুপরি তিনি সব্যসাচী, দুই হাতেই অসিচালনায় দক্ষ। তিনি হুতাশনের মতো শত্রুসৈন্যদল দগ্ধ করতে থাকলেন। তাঁদের অনুগামী গুপ্তসৈন্যদল বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তারা আকারে খর্বকায় হলে কী হবে, ক্ষিপ্রতায় ক্রুদ্ধ সর্পের মতো দ্রুত, অস্ত্রচালনায় অনায়াসদক্ষ এবং চাতুর্যে শৃগালের মতো ধূর্ত।
অন্যদিকে জগৎস্বামী হুহুঙ্কারে উগ্রসেনের সঙ্গে মহাযুদ্ধে রত হলেন। উগ্রসেন অভিজ্ঞ বটে, কিন্তু জগৎস্বামী তারুণ্যের তেজে পরিপূর্ণ। তদুপরি তিনি সংগ্রাম করছেন নিজের মাতৃভূমির সম্মানরক্ষার্থে। উগ্রসেন তাঁর শতেক উগ্রতাতেও জগৎস্বামীর আগ্রাসী যুদ্ধ সহ্য করতে পারলেন না৷ তিনি পশ্চাদপসরণ করতে বাধ্য হলেন।
মধ্যস্থলে মহারাজ চন্দ্রজ্যোতি এবং হস্তীবর্মণ মরণপণ সংগ্রামে রত ছিলেন। উভয়েই একাধিকবার রণস্থলে একে অন্যের সম্মুখীন হয়েছেন। একে অন্যের দুর্বলতা সম্পর্কে সম্যকরূপে অবগত। কেউই কারওর ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারলেন না।
যুদ্ধ করতে করতেই চন্দ্রগুপ্ত আশ্চর্য হয়ে দেখছিলেন এক তরুণ মালবসেনানায়কের যুদ্ধবিক্রম। তাঁর শরীর বেতসদণ্ডের মতো ঋজু অথচ নমনীয়। সারা শরীর কৃষ্ণবর্ণের বস্ত্রে আচ্ছাদিত। যুদ্ধক্ষেত্রে সেই তরুণ অশ্বচালনা করছিলেন কালান্তক হুতাশনের মতো। আহা, কী অনায়াস যুদ্ধকৌশল, কী অপ্রমেয় রণনৈপুণ্য! তাঁর ক্ষিপ্র গতি, অনায়াস অস্ত্র চালনা, অব্যর্থ শরসন্ধান সবই অত্যুৎকৃষ্ট। যেমন বাড়বানল দহন করেছিল খাণ্ডববন, তেমনই তিনি ধ্বংস করছিলেন শকসৈন্যের একাংশ।
তবে শুধু চন্দ্রগুপ্ত নন, সেই সেনানায়ককে লক্ষ্য করছিলেন আরও একজন। শকাধিপতি রুদ্রসিংহ। গভীর অভিনিবেশ সহকারে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণের পর তাঁর মুখে এক দুর্বোধ্য হাসি ফুটে উঠল। তিনি তাঁর পার্শ্বসহচরকে বললেন, ‘কে এই সেনাধ্যক্ষ অভিরাম? আমাদের শ্রেষ্ঠ গুপ্তচরদের নিয়োজিত করো এর প্রকৃত পরিচয় জানতে। সংবাদগ্রহণে ব্যর্থ হলে তাদের শূলে দাও। সঠিক সংবাদ আনলে পুরস্কৃত করো। এর প্রকৃত পরিচয় আমার চাই, যে-কোনও মূল্যে।’
যুদ্ধ কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী হল না। যুবরাজ চন্দ্রগুপ্তর অসাধারণ যুদ্ধকৌশলের জন্যই হোক, বা মালবসৈন্যের মরণপণ সংগ্রামের জন্যই হোক, শকসৈন্য দু-দিনেই রণে ভঙ্গ দিল। যুবরাজ চন্দ্রগুপ্তর বলবীর্যের পরিচয় পেয়ে মুগ্ধ হয়ে গেলেন মালবরাজ চন্দ্রজ্যোতি। একা তাঁর বলদর্পেই ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল শকসৈন্যবাহিনীর আক্রমণ৷ আর প্রাথমিক জয়ের গন্ধ পেয়ে মালবসৈন্য দ্বিগুণ উৎসাহে আক্রমণ করল শকবাহিনীকে। দ্বিতীয় দিনের দিবাবসানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হল।
.
মালবদেশে সপ্তদিবসের জন্য রাষ্ট্রীয় উৎসব ঘোষিত হয়েছে। দেশের সর্বত্র আনন্দের এবং স্বস্তির আবহ। আর রাজপ্রাসাদে তো মহোৎসবের উচ্ছ্বাস চলছে। পান ভোজনের বিরাম নেই। দেশের শ্রেষ্ঠ সঙ্গীতজ্ঞ এবং নর্তকীদের আহ্বান করা হয়েছে যুদ্ধজয়ী বীরদের মনোরঞ্জনের জন্য। সেনাপতি জগৎস্বামী বিজয় ঘোষণার পরদিন থেকে সেই যে দেবী ধান্যেশ্বরীর সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছেন, তাঁর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। বাকিদের অবস্থাও তদ্রুপ।
বিজয়োৎসব উদ্যাপনের এক সন্ধ্যা। চারিদিকে দীয়তাং ভুজ্যতাং চলছে। এমন সময় সুযোগ বুঝে বিষয়টা মহারাজ চন্দ্রজ্যোতির সামনে উত্থাপন করেই ফেললেন চন্দ্রগুপ্ত, ‘কে এই অসামান্য সেনানায়ক মহারাজ? এমন সেনানায়ক তো যে-কোনও বাহিনীর জন্য সম্পদ। এঁর যুদ্ধকুশলতায় আমি চমৎকৃত, মুগ্ধ৷ তাঁর সঙ্গে আলাপিত হতে চাই।’
মহারাজ চন্দ্রজ্যোতি মৃদু হাসলেন, তারপর বললেন, ‘আসুন আমার সঙ্গে।’
.
মালব রাজপ্রাসাদ প্রস্তরনির্মিত। অলঙ্করণশোভার বাহুল্যমাত্র নেই। দৈর্ঘ্যে প্রস্থেও সাধারণ। এই দেশের রাজপরিবার চিরকালই ব্যক্তিগত সুখসুবিধার থেকে প্রজানুরঞ্জনকে প্রাধান্য দিয়ে এসেছেন। তাই রাজৈশ্বর্যের অহৈতুকী প্রদর্শনে তাঁদের কোনওদিনই রুচি ছিল না।
সেই নাতিবৃহৎ প্রাসাদের অলিন্দ পেরিয়ে, একাধিক প্রাঙ্গণ অতিক্রম করে, প্রশস্ত গলিপথ দিয়ে একটি উদ্যানে এসে উপস্থিত হলেন দুইজনে। উদ্যানটি বড়ই মনোরম। কেতকী, যূথি, চম্পক প্রভৃতি পুষ্পগন্ধে চারিদিক আমোদিত। পূর্ণচন্দ্রের আলোয় প্রস্ফুটিত সেই ক্ষুদ্র বনখণ্ডটিকে স্বর্গের পারিজাত বন বলে ভুল হতে পারে।
উদ্যানের মধ্যস্থলে একটি সরোবর। সরোবরের ধারে একটি নাতিবৃহৎ আম্রবৃক্ষ। বৃক্ষটির সানুদেশে একটি বেদী। তার উপর বসে দুইটি অবয়ব নিভৃত আলোচনায় মগ্ন ছিল। মহারাজ চন্দ্রজ্যোতি সেখানে উপস্থিত হয়ে মৃদু শব্দ করলেন। দুইজনে সচকিত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে অভিবাদন করলেন৷ চন্দ্রালোকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল তাঁদের কমনীয় মুখ দুখানি। চন্দ্রগুপ্ত দেখলেন তাঁর সামনে অসামান্যা সুন্দরী দুই নারী!
চন্দ্রজ্যোতি কোমলস্বরে বললেন, ‘মা ধ্রুবা, যুবরাজ চন্দ্রগুপ্ত যুদ্ধক্ষেত্রে তোমার পারঙ্গম দেখে অত্যন্ত প্রীত হয়েছেন। তিনি তোমার সঙ্গে আলাপ করতে সবিশেষ উৎসাহিত। তাই তাঁকে এখানে নিয়ে এলাম।’
চন্দ্রগুপ্ত বজ্রাহত হয়ে গেলেন। এই অসামান্যা সুন্দরী নারীই সেই দুর্ধর্ষ রণকুশল সেনানায়ক? হা ঈশ্বর!
রাজকুমারী ধ্রুবা সামান্য ঝুঁকে বললেন, ‘শাস্ত্রে বলে বিপদের দিনেই প্রকৃত বন্ধুর পরিচয় পাওয়া যায়। কুমার চন্দ্রগুপ্ত, মালবদেশের মহাসঙ্কটের দিনে গুপ্তবংশের এই সাহায্য আমাদের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।’
চন্দ্রগুপ্ত মেধাবী এবং বাকপটু। কিন্তু তাঁর মুখে কথা সরল না। তিনি স্তম্ভিত হয়ে এই লাবণ্যসুধাকে দেখছিলেন। এই দীর্ঘাঙ্গী, সুতন্বীই সেই দুর্ধর্ষ তরুণ যোদ্ধা? আহা, বিধাতা কী রূপই না দিয়েছেন এই তিলোত্তমাকে। পদ্মদলসদৃশ আঁখিদুটিতে, উদ্ধত মরালগ্রীবায়, আজানুলম্বিত মৃণালবাহুতে মনে হচ্ছে যেন এক আশ্চর্য স্থিরবিদ্যুৎ পুঞ্জীভূত হয়ে আছেন তাঁর সামনে।
.
চন্দ্রগুপ্ত ধন্যবাদের প্রত্যুত্তরে কী যেন একটা বলতে গেলেন, কিন্তু তাঁর কথা জড়িয়ে গেল। অর্থহীন কিছু শব্দসমষ্টি বলে, বাক্য অর্ধসমাপ্ত রেখে, সামান্য কথার খেই হারিয়ে, তিনি শেষে কাশতে লাগলেন। বোধহয় ধন্যবাদের উত্তরে কিছু প্রতিধন্যবাদের প্রয়াস করছিলেন। কিন্তু অপ্রস্তুত এবং অপরিণত কিশোর প্রেমার্থীর প্রথম প্রেম নিবেদনের মতো তাঁর দ্বিধাজড়িত বাক্য কারও বোধগম্য হল না।
যুবরাজ চন্দ্রগুপ্তকে কাশতে দেখে চন্দ্রজ্যোতি উদ্বিগ্ন হলেন। বললেন, ‘আপনি কি অসুস্থ বোধ করছেন যুবরাজ? বিশ্রাম করবেন?’ বলতে বলতেই তাঁর ইশারায় দুইজন রক্ষী কাছে এসে দাঁড়াল। তাঁদের সঙ্গে দুইজনে প্রাসাদের ভেতরে চলে গেলেন।
অন্য তরুণীটি রাজকন্যা ধ্রুবাকে ঠেলা মেরে বললেন, ‘কী সখী, শাস্ত্রবচন মনে আছে তো? পূর্বরাগের প্রথম লক্ষণ নাকি বিপ্রলম্ভ, আর তারও প্রথম ভাগ নাকি সাক্ষাৎ দর্শন।’
ধ্রুবা অতি চেষ্টাকৃত গাম্ভীর্যের সঙ্গে বললেন, ‘কথা হচ্ছিল আমাদের আসন্ন বনভোজনের পরিকল্পনা নিয়ে। এর মধ্যে তুই পূর্বরাগ কোথায় খুঁজে পেলি মন্দা?’
মন্দা চতুর ও ছদ্মবিনয়ের সঙ্গে বললেন, ‘হে বরবর্ণিনী, হে সুন্দরীশ্রেষ্ঠা মালবসৌভ্যাগিনী, বনভোজনে কুমার চন্দ্রগুপ্তকে আমন্ত্রণ জানানোর অনুমতি প্রার্থনা করছি।’
ধ্রুবা বিব্রতস্বরে বললেন, ‘আহা, আবার ওঁকে কেন? কুমারের হয়তো যুদ্ধের ক্লান্তি দূর হয়নি। এই অবস্থায় ওঁকে বিব্রত করা কি ঠিক হবে?’
মন্দা ভারি বুঝদারের মতো মাথা নেড়ে বললেন, ‘আহা, সেই জন্যই তো ওঁকে আমন্ত্রণ জানানো। আমি তো আপনার সান্নিধ্য ব্যতীত ওঁর ক্লান্তি অপনোদনের আর কোনও উপায়ই খুঁজে পাচ্ছি না।’
ধ্রুবার গণ্ডদেশদুটি রক্তিম হয়ে উঠল, ‘আহ, কী হচ্ছে মন্দা!’
মন্দা হো হো করে হেসে উঠলেন, ‘যুবরাজ তো দেখি প্রথম দর্শনেই পর্যুদস্ত একেবারে! এমন মদনবাণ হানতে কোথায় শিখলি ভাই? আমাকেও একটু শিখিয়ে দে না।’
ধ্রুবা ছদ্মকোপে বললেন, ‘আহ, প্রগলভতা বন্ধ কর মন্দা। দেখছিস উনি সুস্থ নেই…’
মন্দা মুচকি হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ জানি। প্রেমজ্বর।’
ধ্রুবা এবার নিজেও হেসে ফেললেন, ‘ধুর পাগলি। তোর মুখে কিছু আটকায় না। চল, এবার ভিতরে চল। অনেক রাত হল।’
.
কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল মন্দার মনস্কামনার প্রতি প্রজাপতি ব্রহ্মার সস্নেহ সম্মতি আছে। মহারাজ চন্দ্রজ্যোতি যুদ্ধজয়ের পর যুবরাজ চন্দ্রগুপ্তকে আরও কিছুদিন মালবদেশে অবস্থিতির অনুরোধ জানালেন। যুবরাজ প্রথমে না না করছিলেন বটে, কিন্তু শেষাবধি সম্মত হলেন। যদিও প্রাসাদের কর্ণময় প্রাচীরগুলি জানে সেই নেতি নেতি ভাবের মধ্যে কতখানি চেষ্টাকৃত অভিনয় লুকিয়ে ছিল। তার অন্যতম কারণ ছিল রাজকুমারীর উদ্যোগে আয়োজিত বনভোজনে যোগদানের জন্য মন্দার সাদর আমন্ত্রণ।
পূর্ণিমার সন্ধ্যায় যখন কুমার চন্দ্রগুপ্ত এবং কুমার কচ দুজনে সেই উদ্যানে এসে উপস্থিত হলেন, তখন মালবের শ্রেষ্ঠ সঙ্গীতজ্ঞ কেদার মিশ্র ইমন কল্যাণে আলাপ শুরু করেছেন। ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকজন সম্ভ্রান্তবংশীয় যুবক-যুবতীরা উপস্থিত হয়েছেন সেখানে।
মন্দা সাদরে অভ্যর্থনা করে নিয়ে এলেন তাঁদের। ধ্রুবার ডানপাশের আসনটি আগে থেকেই শূন্য রাখা ছিল। মন্দা সযতনে কুমার চন্দ্রগুপ্তকে সেখানে অধিষ্ঠিত করলেন।
কুমার কচ নির্নিমেষে সেদিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর দুই কর যুক্ত করে মাথায় ঠেকালেন, অস্ফুটে বললেন, ‘জয় সম্রাট চন্দ্রগুপ্তর জয়, জয় মহাদেবী ধ্রুবস্বামিনীর জয়।’
মন্দা বললেন, ‘কিছু বললেন কুমার?’
কচ বললেন, ‘কিছু না। বলছিলাম যে আপনার ষড়যন্ত্র, ইয়ে, মানে ব্যবস্থাপনা অতুলনীয়।’
মন্দা মুখ টিপে হাসলেন, কিছু বলল না।
এদিকে কেদার মিশ্রের আলাপ তখন বিস্তার লাভ করেছে। অসহ জ্যোৎস্নার মাদকতায় মিশে যাচ্ছে দয়িত মিলনের জন্য প্রিয়ার আকুতি। বৃক্ষপত্রের অন্তরালে পূর্ণচন্দ্র উদ্ভাসিত। পুষ্পরাজির সুমধুর গন্ধে চারিদিক আমোদিত। মহার্ঘ পৈষ্ঠী ও মাধ্বীর রসেরও কিছু বিস্তার ঘটেছে শ্রোতৃবর্গের মনে। কেদার মিশ্র গাইছেন ‘মে গৌরবর্ণম্ হর্য, কৃষ্ণত্বকম্ দেহি মে। যদি মম প্রিয়সঙ্গ দদাতি তর্হি অহং রাত্রৌ সহ একঃ ভবিতুম।’ আমার গৌরবর্ণ হরণ করে দয়িতের কৃষ্ণবর্ণ দান করো, যাতে আমি রাত্রির অন্ধকারে মিশে যেতে পারি। আবিষ্ট শ্রোতারা গানের তালে তালে মাথা দোলাচ্ছেন। আর কুমার চন্দ্রগুপ্ত আড়ে আড়ে একবার ধ্রুবার তপ্তগৌরবর্ণ এবং নিজের তাপদগ্ধ কৃষ্ণবর্ণের দিকে তাকাচ্ছেন।
একটু পরে গানের তাল দ্রুত হল। কেদার মিশ্র গাইছেন, ‘রাত্রৌ যদা চন্দ্র প্রকাশতে, মম শরীরং প্রজ্জ্বলিতং ভবতি তদা। অহম বদামি তর্হি এতত বীথিং মা ভ্রমতু, আগচ্ছতু। প্রিয়ম যদা আগত্য প্রকাশয়সি, তস্মিন রাত্রৌ তং শরীরৈ সহ মিলিষ্যসি।’ এই চন্দ্রজোছনায় আমার সমস্ত অঙ্গ জ্বলে যায়, আমি তাকে মিনতি করি আজ এসো না আমার কুটিরে। যেদিন আমার দয়িত আসবে মিলনের জন্য, সেদিন এসো, হে সোম, সেদিন এসো।
শ্রোতাদের রক্তে লাগে দোলা, বুকের মধ্যে মাতন। তরুণ-তরুণীরা উঠে দাঁড়িয়ে সমবেত নৃত্য শুরু করলেন। মন্দা জোর করে ধ্রুবা এবং চন্দ্রগুপ্তকে নিয়ে এলেন তার মধ্যস্থানে। বীণার ঝঙ্কার আরও উদ্ধত, তালবাদ্য আরও অহঙ্কারী, মোহনবংশী আরও উচ্চকিত হয়ে উঠল। সমবেত যুবক-যুবতীরাও গাইতে লাগলেন, ত্বমেব বন্ধুশ্চ সখা ত্বমেব। শরীরে শরীর আরও ঘন হয়ে এল, নয়নে নয়ান। আঙুলে আঙুল ছুঁয়ে গেল, হৃদয়ে হৃদয়।
একটু পরেই গান বন্ধ হতে তরুণ-তরুণীরা থেমে গেলেন। ধ্রুবা তাঁর ঘূর্ণনবেগ সামলাতে না পেরে পড়ে যাচ্ছিলেন, কুমার চন্দ্রগুপ্ত এক হাতে তাঁর দেবদুর্লভ কটিদেশ ধারণ করে তাঁকে সেই পতন থেকে রক্ষা করলেন। ধ্রুবা নিমেষমাত্র চন্দ্রগুপ্তর দিকে তাকালেন। তারপর লজ্জায় দুই হাতে নিজের মুখ ঢাকলেন।
.
ধ্রুবা এবং মন্দার ঐকান্তিক আগ্রহে কুমার কচ-এর দ্বিপ্রাহরিক আহারের ব্যবস্থা হল ধ্রুবার অন্তর্মহলে। রাজকুমারীর অন্তর্মহলে পুরুষ প্রবেশ নিষেধ, স্বয়ং মহারাজকেও অগ্রিম সংবাদ পাঠিয়ে তবে আসতে হয়। কিন্তু কুমার কচ মহাবীর এবং ধুরন্ধর অসিধারী হলে কী হবে, বয়সে প্রায় কিশোর বললেই চলে। ধ্রুবা পিতামাতার একমাত্র সন্তান, তাঁর অতৃপ্ত জ্যেষ্ঠাস্নেহ এই বীর অথচ সরল কিশোরটির ওপর অবিরল ধারায় বর্ষিত হতে লাগল।
কুমার কচ-এরও কোনও সহোদরা নেই। তিনি অতি অল্পদিনের মধ্যে ধ্রুবাকে নিজের অগ্রজার আসনে অধিষ্ঠিত করলেন। স্নেহের ক্ষুধা বড় ক্ষুধা। সে কেবলই ভালোবাসার কাঙাল মানুষকে মায়ার বাঁধনে বেঁধে চলে। আর সে বাঁধনের টান এড়ায় এমন সাধ্য কার?
কুমার কচ সাগ্রহে এবং সগৌরবে রাজকুমারী ধ্রুবার স্নেহের শিকলে বাঁধা পড়লেন।
কুমার প্রভাতের শারীরিক ব্যায়ামাদি এবং শস্ত্রচর্চা করেই ছুটে আসতেন ধ্রুবার অন্তর্মহলে। তাঁর একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়াল ধ্রুবার সামনে কুমার চন্দ্রগুপ্তর গৌরবগাথা কীর্তন করা। এবং তাতে এক অন্ধ অগ্রজভক্ত কিশোরের মনঃকল্পনাও মিশে থাকত অনেকটা। কুমার চন্দ্রগুপ্তর যে পরিমাণ শত্রুনিপাতের কাহিনি কচ বর্ণনা করতেন, সেসব সত্যি হতে গেলে চন্দ্রগুপ্তর বয়স অর্ধশতাব্দীর কিঞ্চিৎ অধিক হতে হয়। কিন্তু তাতে কুমার কচ-এর উৎসাহের বিন্দুমাত্র ঘাটতি হলে তো! উপরন্তু তাঁর ভাষ্য শুনে মনে হত নেহাত ঘোর কলিকাল না হলে চন্দ্রগুপ্তর মতো দিগ্বিজয়ী বীর অনায়াসে দৈত্যদানবাদি বধ করে ইন্দ্রত্ব প্রাপ্ত হতেন। আর শচীর পদ অলঙ্কৃত করার জন্য যে সুরনারীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যেত, সে কথাটাও কচ বেশ স্পষ্ট করেই বুঝিয়ে দিতেন। ধ্রুবা কিছু বলতেন না। শুধু মুখ টিপে হাসতেন।
কুমার চন্দ্রগুপ্ত প্রায়শই মালবরাজসভায় আসা শুরু করলেন, পিতার আদেশানুসারে মহারাজ চন্দ্রজ্যোতির কাছ থেকে রাজকার্য শিক্ষার বাসনায়। এদিকে রাজকুমারী ধ্রুবা রাজ্যশাসনের বেশ কিছু বিষয়ে মহারাজ চন্দ্রজ্যোতির একান্ত সহায়। ফলে রাজ্যশাসন বিষয়ে পরামর্শ আদানপ্রদানের ব্যাপারে দুজনের প্রায়ই দেখা হতে লাগল। এবং কিছুদিনের মধ্যেই অভিজ্ঞ সভাসদরা বুঝলেন, এই দুই তরুণ-তরুণী শুধু শাসন-পরামর্শ নয়, একে অন্যকে আরও অনেক কিছু দান করে বসেছেন।
যিনি প্রবীণ তিনি উপদেশ দিয়ে থাকেন যে ঘৃত এবং অগ্নি কখনই একত্রে রাখা উচিত নয়। কিন্তু যিনি প্রাজ্ঞ তিনি জানেন ও ছাড়া সমাজ সংস্থিতি রক্ষা হয় না।
গুপ্তসৈন্যদের মালব আগমনের পর মাসাধিককাল গত হয়েছে। জ্যৈষ্ঠের শেষ প্রায়। গুপ্তচরেরা সংবাদ এনেছে শকসৈন্য ফিরে গেছে নিজেদের দেশে। আশু তাদের থেকে কোনও বিপদের সম্ভাবনা নেই। মালবরাজ চন্দ্রজ্যোতি কুমারকে কার্তিনীতিক, নৈমিত্তিক এবং মোহুর্তিক, এই তিন প্রকার গুপ্তচরবাহিনীর পার্থক্য বোঝাচ্ছিলেন। সেনাপতি জগৎস্বামী, মন্ত্রী দণ্ডপানি এবং ধ্রুবাও উপস্থিত ছিলেন। একটু দূরে সমাহর্তা, সন্নিধাতা এবং দণ্ডপাল অপেক্ষা করছেন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য। এমন সময় প্রতিহারী এসে জানাল গুপ্তমন্ত্রীমণ্ডলীর বিশেষ দূত এসে পৌঁছেছে। মালবরাজ চন্দ্রজ্যোতি এবং কুমার চন্দ্রগুপ্তর আশু সাক্ষাৎ চান।
কুমার চন্দ্রগুপ্তর মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল। আসার সময় পিতাকে মৃত্যুশয্যায় দেখে এসেছেন। দূত কোনও অমঙ্গলসংবাদ নিয়ে আসেনি তো? উদ্বিগ্ন হলেন ধ্রুবাও। মালবরাজ শশব্যস্ত হয়ে আদেশ দিলেন দূতকে এখনই সভায় উপস্থিত হওয়ার।
সর্বাঙ্গ ধূলিধূসরিত দূত এসে প্রণাম করে জানাল সম্রাট সমুদ্রগুপ্তর শেষ দিন আসন্ন। তিনি জেনে সুখী হয়েছেন যে তাঁর মধ্যমপুত্র গুপ্তবংশের গরিমা অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছে। তিনি বাল্যবন্ধু তথা মালবরাজের সর্বাঙ্গীণ কুশল কামনা করেন। আপাতত তাঁর ইচ্ছা ধরাধাম ত্যাগের পূর্বে একবার তাঁর প্রিয়তম পুত্রের মুখচন্দ্রমা দর্শন করার। কুমার চন্দ্রগুপ্ত যেন পত্রপাঠ সসৈন্যে পাটলিপুত্র প্রত্যাবর্তন করেন।
চন্দ্রগুপ্ত মহারাজকে প্রণাম জানিয়ে দ্রুত কক্ষ হতে নিষ্কাষিত হলেন। তাঁকে যাত্রার উদ্যোগ করতে হবে। ধ্রুবার মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল।
.
চারিদিকে যাত্রার উদ্যোগ শুরু হয়ে গেছে। গুপ্তসৈন্যরা মাসাধিককাল ঘরছাড়া। তারা মহা উৎসাহে, মহা সমারোহে যাত্রার আয়োজন করতে লাগল। শুধু যুবরাজ চন্দ্রগুপ্ত পাংশুমুখে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। কঠিন কঠোর কর্তব্য একদিকে, আর একদিকে হৃদয়ের টান। এর দুইয়ের মাঝে পিষ্ট হতে লাগলেন তিনি।
কচগুপ্ত দ্বিধায় পড়লেন। নিজের দেশ ছেড়ে থাকা যায় না। আবার এই মাতৃরূপিণী জ্যেষ্ঠাকে ছেড়ে যেতেও মন চাইছে না। জ্যেষ্ঠভ্রাতার শুষ্ক বিষণ্ণ মুখ তাকেও ভারি পীড়া দিতে লাগল।
পরদিন আহারের সময় কচ দেখলেন রাজকুমারীর মুখ ভার। মন্দা সচরাচর হাস্যকৌতুকে মাতিয়ে রাখেন। তাঁরও মুখে হাসি নেই। আজ আর হাসি গল্প আলোচনা কিছুই হল না। কচ চুপচাপ আহার করতে লাগলেন।
আহার শেষে ধ্রুবা প্রশ্ন করলেন, ‘কবে যাত্রা শুরু করবে ভাই?’
কচ উত্তর দিলেন, ‘রাজপণ্ডিত বলেছেন পরশু দ্বিপ্রহর যাত্রা শুরুর পক্ষে উত্তম সময়।’
‘তোমাদের প্রস্তুতি শেষ? যা যা সঙ্গে এনেছিলে মনে করে নিয়েছ তো? কিছু ফেলে যাচ্ছ না তো?’
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন কচ। কী ফেলে যাচ্ছেন, সে যদি মুখ ফুটে বলতে পারতেন।
খানিক পর রাজকুমারী সজলচক্ষে জিজ্ঞাসা করে ফেললেন, ‘ভাই কচ, দেশে ফিরে এই অভাগিনী জ্যেষ্ঠাকে ভুলে যাবে না তো? মাঝে মাঝে পত্র দিও। আর যদি কখনও এমন বিপদে পড়ি, আমাকে উদ্ধার করতে আসবে তো ভাই?’
কচগুপ্ত এই সদ্যলব্ধ অগ্রজাকে ছেড়ে যাওয়ার কষ্টে ম্রিয়মাণ হয়েই ছিলেন। তাঁর চক্ষুদুখানি জ্বালা করে উঠল। তিনি বললেন, ‘কথা দিলাম দিদি। তোমার বিপদের দিনে আর কেউ তোমার পাশে থাকুক না থাকুক, কুমার কচগুপ্ত অবশ্যই থাকবে।’
ধ্রুবা কিছু বললেন না। শুধু তাঁর রক্তবর্ণের উত্তরীয়টির প্রান্তখানি ছিঁড়ে কুমার কচের মণিবন্ধে বেঁধে দিলেন। একফোঁটা তপ্ত অশ্রু এসে পড়ল তার উপর।
.
সারারাত কুমার কচের ঘুম এল না। তিনি এপাশ-ওপাশ করতে লাগলেন। নিদ্রার মধ্যে রাজকুমারী ধ্রুবার ছলছল নয়ন কেবলই তাঁকে পীড়া দিতে লাগল। কী উপায়ে তাঁকে ছেড়ে যেতে না হয়, অথচ পাটলিপুত্র যাত্রাও সুসম্পন্ন হয় সে কথাই আকাশ পাতাল ভাবতে লাগলেন।
শেষরাতে ঘুম থেকে উঠে বাইরে বেরোতে যাবেন, দেখলেন কুমার চন্দ্রগুপ্ত অলিন্দে দাঁড়িয়ে একাগ্র এবং উদাস দৃষ্টিতে মালবরাজপ্রাসাদের দিকে তাকিয়ে আছেন। জন্মাবধি তিনি অগ্রজকে এমন বিস্রস্ত, এমন উদাস, এমন বিষণ্ণ দেখেননি।
কুমার কচ সন্তর্পণে শুয়ে পড়লেন। একটি পরিকল্পনা তাঁর মাথায় এসেছে। আজই তা প্রয়োগের প্রকৃষ্ট দিন।
.
পরদিন প্রভাতে কুমার কচ যখন মালবরাজসভায় প্রবেশ করলেন, তখন মহারাজ চন্দ্রজ্যোতি অতিথিদের বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। শৌল্কিক এবং গৌল্মিকরা তাঁকে ঘিরে বসে আছেন। সন্নিধাতা বসে আছেন হিসাবরক্ষকদের নিয়ে, সঙ্গে রাজকোষের সমতাপত্র। মহারাজের আদেশ, বিদায় অভ্যর্থনা রাজকীয় হওয়া চাই। আর সঙ্গে যাওয়া চাই প্রচুর উপঢৌকন, বিপদকালে মালবদেশকে সাহায্যের প্রতিদানস্বরূপ।
কুমার কচকে দেখে তিনি রাজকার্য স্থগিত রাখলেন। এই অসমসাহসী কিশোরটিকে অত্যন্ত স্নেহ করেন তিনি। সস্নেহে প্রশ্ন করলেন, ‘রাজকুমার কচ যে, সব কুশল তো? যাত্রাপ্রস্তুতি সম্পূর্ণ?
কুমার কচগুপ্ত তাঁর কিশোর বয়সের পক্ষে যতটা গম্ভীর হওয়া সম্ভব ততটা গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘সব কুশল মঙ্গল মহারাজ। আপনার সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা ছিল মহারাজ।’
বলুন কুমার কচ।
কচ আরও গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘একান্তে।’
মহারাজ চন্দ্রজ্যোতির মুখে স্নেহমিশ্রিত কৌতুকের হাসি দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল। তিনি স্নেহার্দ্রস্বরে বললেন, ‘এখানে যাঁরা আছেন তাঁরা প্রত্যেকেই আমার অত্যন্ত বিশ্বস্ত কুমার কচ। আপনি আপনার বক্তব্য নির্দ্বিধায় এঁদের সামনে বলতে পারেন।’
কচ গম্ভীরমুখে বললেন, ‘মহারাজ, গুপ্তবংশ সদ্য এক মহাবিপদ থেকে মালবদেশকে উদ্ধার করেছে। সেই অধিকারে আমি আপনার কাছে কিছু চাইতে এসেছি।’
‘বলুন কুমার। সম্ভব হলে অবশ্যই তা পূরণ করা হবে।’
‘আমি গুপ্তসাম্রাজ্যের ভাবী সম্রাটের জন্য রাজকুমারী ধ্রুবার পাণিপ্রার্থনা করতে এসেছি।’
সভাস্থ পারিষদবর্গ চমকিত হলেন। মালবরাজকুমারী গুপ্তবংশের পট্টমহিষী হবেন এ তো সমগ্র মালবদেশের জন্য গৌরবের কথা। কিন্তু সে প্রস্তাব তো স্বয়ং সম্রাট সমুদ্রগুপ্তর কাছ থেকে আসার কথা।
চন্দ্রজ্যোতিও যথেষ্ট বিব্রত হলেন। কন্যা বাল্যবন্ধুর পুত্রবধূ হবেন, এ তো তাঁর জন্যও বড় আনন্দ এবং স্বস্তির সংবাদ। কুমার কচ নিতান্তই ছেলেমানুষ। তাঁর কথায় এতবড় সম্মতি দেন কী করে?
কচ গম্ভীরমুখে বললেন, ‘মনে হচ্ছে মহারাজ কিঞ্চিৎ দ্বিধায় আছেন। দ্বিধার কারণ জানতে পারি কি?’
মহারাজ সস্মিতমুখে বললেন, ‘আপনার অনুরোধ আমার বিশেষ আনন্দের কারণ কুমার। কিন্তু আশা করি বুঝবেন যে, এই প্রস্তাব যদি স্বয়ং সম্রাট সমুদ্রগুপ্তর কাছ হতে আসত…’
কচ বোধহয় বুঝলেন মহারাজের দ্বিধার কারণ। তিনি কোষ হতে তরবারি উন্মুক্ত করে বললেন, ‘আপনার দ্বিধার কারণ অনিস্বীকার্য মহারাজ। কিন্তু আমি গুপ্তরাজবংশের কুমার। আমার প্রতিশ্রুতি মানে সমগ্র গুপ্তবংশের প্রতিশ্রুতি। আমি এই তরবারি স্পর্শ করে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে রাজকুমারী ধ্রুবা অবশ্যই গুপ্তবংশের মহাদেবী হবেন। শুধু তাই নয়, আমি চাই রাজকুমারী ধ্রুবা আমাদের সঙ্গে পাটলিপুত্রে প্রত্যুদগমন করুন। তিনি আমাকে নিজের ভ্রাতা বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। আমি ইতিমধ্যেই তাঁকে আমার বহুঠাকুরানির পদে আসীন করেছি। তাঁর সম্মান এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষার দায় একমাত্র আমার।’
অত্যধিক হর্ষ এবং উল্লাস কখনও কখনও মানুষকে মূক করে দেয়। মহারাজ চন্দ্রজ্যোতি আনন্দস্তম্ভিত হয়ে বসে রইলেন। সভাসদরা সাধু সাধু রবে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তুললেন।
.
পাটলিপুত্র পৌঁছতে এখনও অনেক পথ বাকি। বিশাল সৈন্যবাহিনীর দল নিয়ে যুবরাজ চন্দ্রগুপ্ত ফিরে চলেছেন পাটলিপুত্র। পথশ্রমে বিশ্রান্ত হওয়ার পরিবর্তে সবার মুখে পরিতৃপ্তির হাসি। তার একটি কারণ যদি হয় বহুদিন পর পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাতের আনন্দ, দ্বিতীয়টি হচ্ছে তাঁদের সঙ্গে চলেছেন গুপ্তসাম্রাজ্যের ভাবী মহিষী, মালবরাজকন্যা ধ্রুবা।
ইতিমধ্যেই চন্দ্রগুপ্তর ঘনিষ্ঠ সেনানায়কদের মধ্যে রাজকুমারীকে প্রীত করার জন্য প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। ধ্রুবার মুখ থেকে বাক্য স্খলিত হলেই হল, মুহূর্তের মধ্যে কেউ না কেউ তাঁর আকাঙ্ক্ষিত বস্তুটি এনে উপস্থিত করে। মাঝে মাঝে সেই আগ্রহের আধিক্য দেখে ধ্রুবা খিলখিলিয়ে হাসতে থাকেন।
গুপ্তবাহিনী মালব থেকে পাটলিপুত্র পৌঁছবার সংক্ষিপ্ততম পথটি ধরেই চলেছে। এ পথ ভুজপাল থেকে শুরু করে জাবালিপুর হয়ে বিন্ধ্যাচল পেরিয়ে পাটলিপুত্র পৌঁছয়। অরণ্যের মধ্য দিয়ে বিস্তীর্ণ সে পথ যেমন মনোরম, তেমনই নয়নমুগ্ধকর।
ধ্রুবা তাঁর সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে, সর্বেন্দ্রিয় দিয়ে এই যাত্রা উপভোগ করছিলেন। এই গহীন বনরাজি, এই আদিম মহাদ্রুমসারি, বনজ পুষ্পের সুগন্ধ, সুমিষ্ট ঝরনার জল সবই বড় নতুন লাগে তাঁর। প্রতি রাত্রিতেই গহন বনমাঝে শিবির স্থাপনা হয়। শিকার করে আনা বন্যকুক্কুট এবং শূকর শূলপক্ব করে আহার করা হয়। সঙ্গে থাকে শালপাতায় আনা বনজ মধু। তার অতুলনীয় মনোমুগ্ধকর স্বাদে ধ্রুবা মুগ্ধ হয়ে যান।
এই অঞ্চলের বনবাসী জনজাতি বহুদিন যাবৎ গুপ্তবংশের অধীন করদ জাতি। এরা বনজ এবং খনিজ সম্পদ সরবরাহের বিনিময়ে ভূমি তথা জল-জঙ্গলের উপর নিজেদের অধিকার নিশ্চিত করতে পেরেছে। তারাও চায় গুপ্তসাম্রাজ্যের ভাবী মহারাজ্ঞীকে প্রীত করতে। তাই স্থানে স্থানে বনমণ্ডলের মণ্ডলপতির স্ত্রী-কন্যারা ধ্রুবাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন তাঁদের কুটিরে রাত্রিবাস করতে। আর ধ্রুবার কাছেও এই অভিজ্ঞতা নতুন। তিনিও সানন্দে তাদের আতিথ্য স্বীকার করছেন। তিনি অনায়াসে মণ্ডলপতির স্ত্রী-কন্যাদের সঙ্গে সই পাতাচ্ছেন, তাঁদের বেশ ধারণ করছেন, তাঁদের পাকশালে গিয়ে রান্না করছেন, তাঁদের সঙ্গে রাত্রির বহ্ন্যুৎসব ও সমবেত নৃত্যগীত এবং পানভোজনে অংশ নিচ্ছেন। এসব তাঁর কাছেও এক নতুন অভিজ্ঞতা।
আর এসবই দুচোখ ভরে দেখছেন একজন, কুমার চন্দ্রগুপ্ত। তাঁর চোখে অখণ্ড ভারতসাম্রাজ্ঞীর ছবি ফুটে উঠছে। তিনি ঠিক ধ্রুবার মতো। কোমল, শান্ত, হাস্যোজ্জ্বল। এই নদীবিধৌত শস্যশ্যামলা ভূমির অধিশ্বরী তিনি। তিনি শাকম্ভরী, যুদ্ধনিপুণা, বরদপ্রিয়া। তাঁর আশিসে ইন্দ্রদেব যথাযথ বারিবর্ষণ করেন, গাভীগণ দুগ্ধবতী হয়। তিনি রাজসূয়যজ্ঞস্থলে অগ্নিতে পুরোডাশ, অপূপ, চরু এবং বপা অর্পণ করেন। আর এই সসাগরা জম্বুদ্বীপ স্নেহে, প্রেমে, ঔদার্য্যে তাঁর বশীভূত হয়।
আর এই অমূল্য স্ত্রীরত্ন, নিজ পুরুষাকারে অর্জিত এই স্ত্রীরত্ন সঙ্গে নিয়ে এসেছেন যুবরাজ চন্দ্রগুপ্ত। উদ্দেশ্য এই যে অর্ধজম্বুদ্বীপবিজেতা সম্রাট সমুদ্রগুপ্ত যেন তাঁর ভাবী বধূর সঙ্গে শেষ সাক্ষাৎটুকু করে যেতে পারেন।
তবে শুধু শেষ সাক্ষাৎই নয়, যুবরাজ চন্দ্রগুপ্তর অন্য একটি উদ্দেশ্যও ছিল।
গুপ্তরাজসভার রাজন্যরা জানেন যে মহারাজ সমুদ্রগুপ্ত তাঁর উত্তরাধিকারীরূপে যুবরাজ চন্দ্রগুপ্তকেই নির্বাচিত করেছেন। কিন্তু চন্দ্রগুপ্ত সম্রাটের প্রথম সন্তান নন। তাই সম্রাট সমুদ্রগুপ্তর অবর্তমানে গুপ্তসাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার অর্পিত হওয়ার কথা তাঁর প্রথম পুত্র রামগুপ্তর ওপর।
অথচ সমস্ত গুপ্তসাম্রাজ্য জানে, গুপ্তরাজসভার রাজন্যবর্গ জানেন, এমনকী পাটলিপুত্রের রাজপ্রাসাদের প্রাচীরগুলি অবধি জানে যে রামগুপ্ত অপদার্থ, রামগুপ্ত কুটিল, রামগুপ্ত ইন্দ্রিয়াসক্ত এবং রাজ্যশাসনের পক্ষে সর্বাংশে অযোগ্য।
তাহলে উপায়?
উপায় একটিই। মৃতপ্রায় সম্রাট যদি রাজন্যবর্গের উপস্থিতিতে রাজমুকুট চন্দ্রগুপ্তর হাতে সমর্পণ করেন, তবেই চন্দ্রগুপ্তকে গুপ্তসাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী বলে ঘোষণা করা হবে।
আর যুবরাজ চন্দ্রগুপ্ত চাইছেন তাঁর পিতা যেন রাজ্যের ভাবী রাজমহিষীকেও দেখে যেতে পারেন। তিনি তাঁর পিতাকে অতি উত্তমরূপে চেনেন।
.
বিন্ধ্যাচলের পথে একটি অতিবৃহৎ অরণ্যজনপদে শিবির স্থাপিত হয়েছে গুপ্তবাহিনীর। চরেরা এসে সংবাদ দিয়েছে এ নাকি দেবী বিন্ধ্যবাসিনী পর্ণশবরীর আরাধনাস্থল। দেবী পর্ণশবরী এখানে ব্যাধ, পুলিন্দ এবং শবরদের আরাধ্যা দেবীরূপে পূজিতা হন।
ধ্রুবা গেছেন দেবী বিন্ধ্যবাসিনীর মন্দিরে পূজার্পণ করতে। সঙ্গে একশ একটি ছাগ। দেবী বিন্ধ্যবাসিনী রুধিরপ্রিয়া। তাঁর সন্তুষ্টিবিধানের জন্য ছাগবলি বিশেষভাবে সুপ্রযুক্ত।
এমন সময় কুমার চন্দ্রগুপ্তর কাছে দুজন ক্লান্ত বিধ্বস্ত মানুষ এসে উপস্থিত হল। তারা গুপ্তসাম্রাজ্যের দূত।
.
ধ্রুবা পূজার্পণাদি সাঙ্গ করে শিবিরে প্রত্যাবর্তন করে দেখলেন যে অকস্মাৎ শিবিরের পরিস্থিতি গম্ভীর হয়ে উঠেছে। কুমার চন্দ্রগুপ্ত অস্থিরভাবে পদচারণা করছেন।
ধ্রুবা বিহ্বল হয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘কী ব্যাপার কুমার। আপনাকে এত অস্থির দেখাচ্ছে কেন?’
কুমার যা বললেন শুনে ধ্রুবার উদ্বেগ বহুগুণে বর্ধিত হল।
গুপ্তসাম্রাজ্যের দূত এসেছে। সঙ্গে নিয়ে এসেছে গভীর দুঃসংবাদ। বৃদ্ধ রাজা কোনওমতে শেষ নিঃশ্বাসটুকু ধরে রেখেছেন। চন্দ্রগুপ্তকে এই মুহূর্তেই রাজার সম্মুখে উপস্থিত থাকতে হবে।
ধ্রুবার হাতদুটি নিজের করতলে দৃঢভাবে ধরলেন চন্দ্রগুপ্ত, ‘আমাকে যেতেই হবে ধ্রুবা, এখনই যেতে হবে। আর সময় নেই। বিশ্বাস করো, তোমাকে এভাবে একাকী ছেড়ে যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা আমার নেই। কিন্তু পিতার অন্তিম সময় উপস্থিত। তুমি তো জানো, পিতার মৃত্যুর পূর্বে তাঁর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, আমাদের দুজনের ভবিষ্যতের জন্যই প্রয়োজনীয়। চিন্তা কোরো না, তোমার সুরক্ষার জন্য কচকে রেখে গেলাম। শীঘ্রই আমাদের দেখা হবে।’
ধূলিধূসরিত দূর দিগন্তে মিলিয়ে গেল চন্দ্রগুপ্তর বেগবান অশ্বটি। সেদিকে কিছুক্ষণ নির্নিমেষ তাকিয়ে থেকে সবার অলক্ষ্যে চোখের জল মুছলেন ধ্রুবা। তারপর কুমার কচকে ডেকে বললেন যাত্রা শুরু করতে। নিজেকে প্রবোধ দিলেন, তিনি মহান গুপ্তসাম্রাজ্যের ভাবী পট্টমহিষী। প্রিয় বিরহে এত উদাসীন হওয়া কি তাঁর শোভা পায়? তাছাড়া, কচ তাঁকে জানিয়েছেন এখান থেকে পাটলিপুত্র আর মাত্র চারটি দিনের পথ। খুব শীঘ্রই নিজের প্রিয়তমের সঙ্গে সাক্ষাৎ হতে চলেছে। আর তার পরেই দুজনের সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।
