মহাদেবী – ৫
সভাসদ, পাত্র-মিত্র-অমাত্য সমভিব্যাহারে মহারাজ রামগুপ্তর বিজয়যাত্রা চলেছে। চলেছে উত্তরাপথের দিকে। চলেছে নগর, গ্রাম, অরণ্যানী স্রোতস্বিনী প্রকম্পিত করে। দরিদ্র, করভারপীড়িত প্রজাপুঞ্জ সেই গর্বোদ্ধত বিজয়শোভাযাত্রার দিকে সভয়ে চেয়ে থাকে, আর যাত্রাদল অন্তর্হিত হলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলে, ‘অহো, কী প্রতাপ!’
শোভাযাত্রার একদম প্রথম দিকে রয়েছে সম্রাট এবং তাঁর পারিষদবর্গের শিবিকা। আড়ম্বরে, পারিপাট্যে, গৌরবে সুসজ্জিত তারা। তাদের দিক থেকে চোখ ফেরানো যায় না। মধ্যস্থলের শিবিকাগুলি মহাদেবী, রাজমাতা সহ অন্যান্য পুরনারীদের জন্য। আর শোভাযাত্রার একদম শেষে সবচাইতে ক্ষুদ্র, অনাড়ম্বর এবং বাহুল্যবর্জিত শিবিকাটি নির্দিষ্ট হয়েছে কুমার চন্দ্রগুপ্তর জন্য।
মহাদেবী ধ্রুবার চতুর্দোলার ঠিক পরেই থাকে রাজমাতা দত্তাদেবীর চতুর্দোলা। ধ্রুবা প্রয়োজন ছাড়া কারও সঙ্গেই বাক্যালাপে বিশেষ উৎসাহী নন। তিনি জানেন যে তাঁর প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি চলাফেরা দত্তাদেবী বা সম্রাটের লক্ষ্যবন্দী। তিনি জানেন যে পরিচারিকাদের সামনে কোনও অসতর্ক মুহূর্ত, কোনও আপত্তিকর উক্তি তাঁর জীবনে বৃহত্তর দুর্ভোগ এনে দিতে পারে। আর রাজমাতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শীতল বললে কম বলা হয়।
এদিকে রাজস্কন্ধাবারের মধ্যে ঘনিয়ে উঠেছে অন্য সমীকরণ। রামগুপ্ত প্রায় সারাদিনই মদ্যপানে রত থাকেন। তাঁর ঘটমান অবর্তমানে শাসনক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছেন সেনাপতি সূর্যস্বামী। তাঁর কথাই এখন রাজস্কন্ধাবারের শেষ কথা। তিনি যা পরামর্শ দেন, সম্রাট তাতেই সায় দেন। তিনি যে পথে যেতে বলেন, সম্রাট সেই পথেই হাঁটেন।
অযোগ্য পুরুষের হাতে ক্ষমতার গুরুদায়িত্ব অর্পিত হলে যা হয় তাই হতে লাগল। সূর্যস্বামী ক্ষমতার দম্ভে অন্যান্য পারিষদদের, এমনকী নিজের পিতা প্রধানমন্ত্রী শিখরস্বামীকেও অবজ্ঞা করতে শুরু করলেন। প্রৌঢ় শিখরস্বামী সবার অজানিতে শুধু নিজশিরে করাঘাত করেন আর ভাবেন কোন পাপে এই অর্বাচীনের পিতা হওয়ার দুর্ভাগ্য হল তাঁর।
যাত্রার শুরুর দিন থেকে রামগুপ্ত আরও উদ্ধত, আরও দুর্বিনীত, আরও দুঃসহ হয়ে উঠেছেন। বিশেষ করে কুমার চন্দ্রগুপ্ত যেন তাঁর দুচক্ষের বিষ। তিনি প্রতিনিয়ত সর্বসমক্ষে চন্দ্রগুপ্তকে হেয় করেন, অপমান করেন। অহোরাত্র তাঁকে মনে করিয়ে দেন যে তিনি গুপ্তসাম্রাজ্যের একজন বেতনভুক কর্মচারী বৈ আর কেউ নন। আর তাতে ক্রমাগত ইন্ধন জুগিয়ে যান সূর্যস্বামী।
সূর্যস্বামী পরশ্রীকাতর, ভীরু, এবং কুটিল। এবং যে কোনও পরশ্রীকাতর, ভীরু এবং কুটিল পুরুষ সর্বদাই কোনও প্রতিভাবান ও স্বাবলম্বী পুরুষকে ভয়মিশ্রিত ঘৃণা করে। সূর্যস্বামী চন্দ্রগুপ্তকে অত্যন্ত ভয় করতেন। এবং তার সঙ্গে অনেকটা ঈর্ষাও মিশে ছিল। তিনি জানতেন তাঁর গুপ্তসাম্রাজ্যের ভাগ্যনিয়ন্তা হয়ে ওঠার পথে একজনই বাধা হতে পারেন, কুমার চন্দ্রগুপ্ত। তিনি ক্রমাগত মিথ্যা কথা বলে সম্রাটকে কুমার চন্দ্রগুপ্তর প্রতি আরও বিদ্বিষ্ট করে তুললেন।
কিন্তু ভাগ্যলক্ষ্মী বড় স্থিরবুদ্ধির মেয়ে নন। উগ্র দম্ভ, কুটিল ঈর্ষা এসব তাঁর রুচিবিহর্গিত৷ তিনি ঈষৎ চঞ্চলা হলেন।
পাটলিপুত্র থেকে বারাণসীর পথে সাকেত পৌঁছেছে রাজশোভাযাত্রা। অনতিদূরে কান্যকুব্জ। নির্মল শারদপ্রভাত, বর্ষাবসানে তরুণ মেঘগুলি আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে নবনীখণ্ডের মতো।
রামগুপ্ত শিবিকা থেকে বেরিয়ে রথারূঢ় হয়েছেন। পরনে সযত্নে পরিহিত রাজবেশ। এই প্রভাতেই ঈষৎ টলায়মান তিনি। চোখদুটি ঢুলুঢুলু। ঠোঁটদুটি ঈষৎ শিথিল। ওষ্ঠপ্রান্তে একটি দুর্বোধ্য হাসি। রামগুপ্তর পাশে আছেন তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী সেনাপ্রধান সূর্যস্বামী।
পথপার্শ্বে প্রজাদের ভিড়। আজ মহারাজাধিরাজ দর্শন দেবেন শুনে তারা রাজসন্দর্শনে এসেছে৷ কে না জানে, রাজদর্শনে তীর্থযাত্রার সমান পুণ্যফল? ভীত, ক্লিষ্ট, দারিদ্র্যপীড়িত ভাগ্যহত প্রজাদের দল ভীতসমস্ত ভাবে পথের পাশে সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে। সম্রাটের রথের চূড়া দেখামাত্র তাঁরা ধুলায় লুটিয়ে প্রণাম জানাতে লাগল মহাপরাক্রান্ত গুপ্তসাম্রাজ্যের মহিমান্বিত সম্রাট রামগুপ্তর উদ্দেশে।
রামগুপ্ত বড় প্রসন্ন হলেন। আহা, এই তো চেয়েছিলেন তিনি। নিঃশঙ্ক, নিঃসপত্ন আনুগত্য। প্রজারা তাঁকে ভয় করবে, পারিষদবর্গ থাকবে অনুগত। আর তিনি রাজলক্ষ্মীর বরমাল্যটি নিজগলে ধারণ করে প্রবলপ্রতাপে সসাগরা ধরিত্রীর রাজচক্রবর্তী সম্রাট হয়ে বিরাজ করবেন। আহা, মধুবাতা ঋতায়তে, মধুক্ষরন্তি সিন্ধবাঃ…
একটু পরেই প্রজাদের মধ্যে কী যেন একটা চাঞ্চল্য দেখা দিল। তারা ইতিউতি তাকাচ্ছে, একে অন্যের কানে ফিসফিস করে কথা বলছে। যেন রাজসন্দর্শনের মতো মহাপুণ্যকর্মে তাদের আর মতি নেই।
রামগুপ্ত বুঝলেন না তাদের এই চঞ্চলতা কীসের। তিনি ঘাড় ঘুরিয়ে সূর্যস্বামীকে প্রশ্ন করতে যাবেন, এমন সময় একটি বেগবান অশ্ব ধূলি উড়িয়ে রামগুপ্তর রথের পাশে এসে দাঁড়াল। আর সঙ্গে সঙ্গে প্রজাদের মধ্য থেকে গগনবিদারী জয়ধ্বনি উত্থিত হল, ‘জয় কুমার চন্দ্রগুপ্তর জয়। জয় গুপ্তসাম্রাজ্যের জয়। জয় ভারতভাগ্যবিধাতার জয়।’
রামগুপ্ত তাকিয়ে দেখলেন তাঁর রথের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন কুমার চন্দ্রগুপ্ত। সূর্যের আলো তাঁর বর্মে প্রতিফলিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে। তাঁর ঋজু শরীরে, উন্নত ললাটে, উজ্জ্বল মুখমণ্ডলে প্রতিভাত হচ্ছে রাজোচিত গাম্ভীর্য। তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রভায় অন্যান্য রাজন্যবর্গকে নিতান্তই নিষ্প্রভ দেখাচ্ছে।
রামগুপ্তর মুখ ক্রোধে রক্তবর্ণ ধারণ করল। তিনি গম্ভীরমুখে সারথিতে আদেশ দিলেন দ্রুত রথচালনা করতে।
অন্য একটি শিবিকায় আরও একজনের মুখও অরুণবর্ণ ধারণ করল বটে, তবে ক্রোধে নয়। কেন, কেউ জানে না। তিনি অতি নিভৃতে নিজের চোখ থেকে ঝরে পড়া দুই ফোঁটা মুকুতাবিন্দু মুছে নিলেন। সেই বিন্দুর মধ্যে কতখানি আনন্দ আর কতখানি বেদনা মিশে ছিল সে শুধু ঈশ্বরই জানেন।
.
পত্রটি হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ সেইদিকে ভ্রুকুটিকুটিল চোখে চেয়ে রইলেন মহারাজ চন্দ্রজ্যোতি। রাজসভা শূন্য। সভাসদদের রাজকার্য হতে অনেক আগেই অব্যাহতি দিয়েছেন তিনি। তিনি ছাড়া এই রাজসভায় উপস্থিত কেবলমাত্র বীজনকার।
একটু পর প্রতিহারী এসে বিনম্রস্বরে বলল, ‘কুমারী মন্দা উপস্থিত হয়েছেন প্রভু। তাঁকে অন্দরে আসতে বলি?’
মহারাজ অনুমতি দিলে মন্দা এসে আভূমি প্রণাম করে দাঁড়ালেন। তিনি মহারাজের বয়স্য দন্তিদুর্গের কন্যা। স্বরাজ্য রক্ষা করতে গিয়ে দন্তিদুর্গ যুদ্ধক্ষেত্রে বীরগতি প্রাপ্ত হন। মন্দার মাতৃদেবী পরাশর সংহিতার বিধিবলে পুনর্বিবাহ করেন। সেই বিবাহে মহারাজ স্বয়ং উপস্থিত হয়ে নবদম্পতিকে আশীর্বাদ করেন। এবং মন্দাকে দত্তক নেন।
সেই হতে মন্দা এই রাজগৃহে রাজকুমারীর সমান যত্নে পালিতা। মহারাজ মন্দা আর ধ্রুবাকে কোনওদিন পৃথকচক্ষে দেখেননি।
মহারাজ চন্দ্রজ্যোতি ধ্রুবাকে দেখে স্নেহস্বরে বললেন, ‘কেমন আছ মা মন্দা। তোমার মাতৃদেবী কেমন আছেন?’
মন্দা শুষ্কস্বরে যথাবিহিত সম্মানের সঙ্গে বললেন, ‘আপনার আশীর্বাদে ভালো আছি মহারাজ। মা’ও ভালো আছেন।’
মন্দার নিষ্প্রাণ স্বর মহারাজের কান এড়াল না। তিনি পত্রটি মন্দার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ধ্রুবার পত্র এসেছে মন্দা। তাই তোমাকে ডাকলাম। দেখ দেখি, পত্রটি পড়ে কিছু বুঝতে পারো কিনা।’
মন্দা সাগ্রহে এগিয়ে এসে পত্রটি নিলেন। তারপর পত্রটি যে কতবার পড়লেন, কতবার গণ্ডদেশে স্পর্শ করে দেখলেন, কতবার তার সুগন্ধ নিলেন তার ইয়ত্তা নেই। কে জানত, এইভাবেও প্রাণাধিক প্রিয়সখীর স্পর্শ অনুভব করা যায়?
মহারাজ দুই সখীর প্রণয় সম্পর্কে সম্যক অবগত ছিলেন। তাঁর চোখ দুখানি বাষ্পাচ্ছন্ন হয়ে এল। তিনিও কি কন্যাবিরহে এমনই কাতর নন?
কিছুক্ষণ পর মন্দা কিঞ্চিৎ সুস্থির হলে মহারাজ কোমলস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘কী বুঝলে মা মন্দা?’
মন্দা অশ্রুগোপন করে বললেন, ‘ধ্রুবা ভালো আছে মহারাজ। মহান গুপ্তসাম্রাজ্যের পট্টমহিষী হয়ে সে সুখে আছে।’
‘আর কুমার চন্দ্রগুপ্ত?’
এইবার মন্দার চোখের জল আর শিষ্টাচারের বাধা মানল না। তাঁর দুচোখ উপচিয়ে, কপোলতল বেয়ে অনেকদিনের সঞ্চিত কষ্টের স্রোত নেমে আসতে লাগল। তিনি শুধু অস্ফুটে একবার বললেন, ‘কেবল ভালো মানুষদের সঙ্গেই কেন এমন হয় জ্যেঠ?’
মন্দা বালিকাবয়সে মহারাজকে নিজের আপন জ্যেষ্ঠপিতৃব্যরূপেই চিনতেন। বয়সকালে প্রাপ্ত শিষ্টশিক্ষা অনুযায়ী তিনি তাঁর পিতৃব্যকে মহারাজ সম্বোধনে অভ্যস্ত হলেও এই আবেগমথিত কালে সেই শিক্ষা আর তাঁর মনে রইল না।
অশ্রুমোচন করলেন মহারাজ চন্দ্রজ্যোতিও। কে বলে পুরুষ মানুষ কাঁদে না?
কিছুক্ষণ পর মহারাজ স্থির হয়ে বললেন, ‘ধ্রুবা ভালো নেই রে, মা মন্দা।’
‘কেন এ কথা বলছেন জ্যেঠ?’
‘পত্রটি ভালো করে দেখ রে মা। নীচের দিকে জলবিন্দুর ছাপ দেখতে পাচ্ছিস?’
মন্দা অত্যন্ত অভিনিবেশ সহকারে পত্রটি লক্ষ করলেন। তারপর সন্ধান পেলেন প্রায় মিলিয়ে আসা সেই অশ্রুবিন্দুছাপের।
বিষণ্ণ হাসলেন মহারাজ, ‘কন্যার অশ্রুর চিহ্ন পিতার থেকে ভালো আর কেই বা চেনে রে মা?’
মন্দা স্থির দাঁড়িয়ে রইলেন৷ দুঃখে তাঁর অন্তর বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছিল।
মহারাজ চন্দ্রজ্যোতি মৃদুস্বরে ডাকলেন, ‘হিমবন্ত।’
বীজনকার ব্যজন বন্ধ করে বললেন, ‘আদেশ প্রভু।’
‘রামগুপ্তর ওই বিজয়শোভাযাত্রা না কী, তার কী সংবাদ?’
‘প্রভু, আমার কাছে সংবাদ আছে যে সম্রাট রামগুপ্তর বিজয়শোভাযাত্রা ত্রিগর্তর পথে নগরকোটে পৌঁছবে।’
ভ্রুকুঞ্চন করলেন মহারাজা, ‘আর নগরকোট হতে রুদ্রসিংহের ভীমনগর দুর্গ কতদূর?’
‘অনধিক বিশ ক্রোশ, মহারাজ।’
‘তাহলে রামগুপ্ত তার সভাসদ, কলত্র, পরিজন, সবাইকে নিয়ে শত্রুদুর্গের দিকে যাচ্ছে ঠিক কোন উদ্দেশে?’
‘তিনি যাচ্ছেন না মহারাজ, তাঁকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।’
‘বটে? আর তাঁকে ওই শত্রুপরিবেষ্টিত অঞ্চলে নিয়ে যাওয়ার ছল তিনি বুঝতে পারছেন না কেন?’
‘কারণ তিনি মূর্খ, মহারাজ। দাম্ভিক, অবিবেচক এবং মহামূর্খ।’
মন্দা চমৎকৃত হয়ে এই বার্তালাপ শুনছিলেন। এবার প্রশ্ন না করে পারলেন না, ‘ইনি কে মহারাজ? ইতি এত সংবাদ পেলেন কোথা থেকে?’
মহারাজ চন্দ্রজ্যোতি স্নেহসিক্ত সুরে বললেন, ‘এর নাম হিমবন্ত মা, পাটলিপুত্রের গুপ্তচর বাহিনীর অন্যতম প্রধান। রামগুপ্তর প্রিয় সেনাপ্রধান সূর্যস্বামী একে পাঠিয়েছিল আমার ওপর গুপ্তচরবৃত্তির জন্য। বেচারি প্রথম রাত্রেই ধরা পড়ে যায়৷ সেইদিনই এর শিরশ্ছেদ নিশ্চিত ছিল, যদি না আমি একে প্রাণভিক্ষা দিতাম।
সেই হতে হিমবন্ত আমার ভারি অনুগত হয়ে পড়েছে। সে পাটলিপুত্রের সঠিক সংবাদ আমাকে দেয়, আর মালবের বেঠিক সংবাদ পাটলিপুত্রে প্রেরণ করে। কী হিমবন্ত, ঠিক বলছি তো?’
হিমবন্ত আভূমি প্রণত হয়ে বলে, ‘মহারাজের অশেষ কৃপা।’
মহারাজ চন্দ্রজ্যোতি বললেন, ‘আমাকে যেতে হবে মা মন্দা। আমার মন বলছে মেয়ের সামনে বিপদ আসতে চলেছে, ভয়ংকর বিপদ।’
মন্দা চোখের জল মুছলেন। তারপর দৃঢ়স্বরে বললেন, ‘আমিও আপনার সঙ্গে যাব মহারাজ, আদেশ করুন।’
.
পাটলিপুত্র নগরীর প্রবেশদ্বার চারটি। তার মধ্যে যেটি গঙ্গার ধারে, সেখানে এক প্রহরী দাঁড়িয়ে নাগরিকদের গতিবিধি পর্যালোচনা করছিল। সম্রাট সপারিষদ বিজয়যাত্রায় গেছেন। তাই স্বাভাবিকভাবেই রাজধানীর সর্বত্র কাজেকর্মে শৈথিল্য দেখা দিয়েছে।
যে প্রহরী নাগরিকদের গতিবিধি লক্ষ্য করছিলেন তিনি কোনও সামান্য ব্যক্তি নন, পাটলিপুত্রের প্রধান দৌবারিক মতিল। মগধ সাম্রাজ্যের দণ্ডপাশিক নাগদত্তর কঠোর আদেশ, পাটলিপুত্রে আগত এবং পাটলিপুত্র হতে নির্গত প্রতিটি নাগরিকের উপর যেন দৃষ্টি রাখা হয়। মহাপ্রতিহার রুদ্রদেব-এর কাছে গোপন সংবাদ আছে, গুপ্তসাম্রাজ্যের প্রভূত ক্ষতি হতে পারে এমন কোনও সংবাদ পাটলিপুত্রের বাইরে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা চলছে। তাই মতিল স্বয়ং এই দ্বারের দৌবারিক হয়েছেন।
একটু পরেই একটা কোলাহলের সংবাদ পেয়ে মতিল দেখলেন একটি রথ তাঁর দিকেই ধাবমান, আর তার সঙ্গে পথ-বালকবালিকাদের হইহই রব। মতিল আশ্চর্য হলেন দেখে যে রথের কোনও সারথি নেই, অথচ রথের গতি সাবলীল।
একটু পরেই তার কারণ বুঝতে পারলেন তিনি।
রথটি চালনা করছে এক অদ্ভুত দর্শন বামন। তাকে অবশ্য চেনেন মতিল। শুধু মতিল কেন, একে বোধকরি পাটলিপুত্রের প্রতিটি মানুষ চেনে।
এ হচ্ছে প্রাক্তন সেনাধ্যক্ষ দনুজদমনের ব্যক্তিগত ভৃত্য। ঘোরকৃষ্ণ গাত্রবর্ণ, দুই হস্তের অনধিক উচ্চতা, এবং মাথায় ঘনমেঘের মতো পুঞ্জীভূত কেশরাজির এই বামনটি পাটলিপুত্রের একটি দর্শনীয় বস্তুবিশেষ। তদুপরি কিশোরটি মূক ও বধির, এবং সম্পূর্ণরূপে দন্তহীন। দনুজদমন নাকি উত্তরদেশে তীর্থ করতে গিয়ে একে ক্রয় করেন। তবে অদ্ভুতদর্শন হলে কী হবে, বামনটি যথেষ্ট গুণী। শুনেছেন অতি অল্পদিনের মধ্যেই দনুজদমন গৃহিণীর প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছে। আর বিবিধ বাজিকরের খেলা বা মায়াজাল জানে সে। সেইজন্যই শিশুদের কাছে অতিশয় প্রিয়।
রথটি এসে থামলে মতিল হাতের সঙ্কেতে জানতে চাইলেন কী চায় সে? আর এই রথ ব্যবহারের অধিকারই বা সে পেল কী করে?
উত্তরে একটি ক্ষুদ্র লিপিকা বার করে মতিলের হাতে দিল সেই বালক। মতিল দেখলেন পত্রটি লিখেছেন দনুজদমনপত্নী।
রাজপরিষদ থেকে বিতাড়িত করলে কী হবে, সম্রাট কিন্তু তাঁর বিজয়শোভাযাত্রায় প্রাক্তন সৈন্যাধ্যক্ষকে সঙ্গী করতে ভোলেননি। বোধহয় আশঙ্কায় ছিলেন যে তাঁর অবর্তমানে অপমানিত এবং ক্ষুব্ধ দনুজদমন সেনাবাহিনীর একাংশকে সঙ্গে নিয়ে বিদ্রোহী হতে পারেন।
লিপিকাটি দৌবারিক-এর প্রতি। তাতে লেখা আছে যে এই কিশোর একটি বিশেষ পত্র নিয়ে মহারাজাধিরাজের শোভাযাত্রার দিকে যাচ্ছে৷ পত্রটি দনুজদমনপত্নী লিখেছেন তাঁর পতির উদ্দেশে। পত্রটি যত দ্রুত সম্ভব প্রাক্তন সৈন্যাধ্যক্ষর কাছে পৌঁছনো প্রয়োজন। তাই এই রথ ব্যবহারের অনুমতি তিনিই দিয়েছেন। দৌবারিক মহাশয় যেন এই কিশোরের নির্বিঘ্ন নির্গমনের ব্যবস্থা করেন।
মতিল হাতের সঙ্কেতে মূল পত্রটি দেখতে চাইলেন। যা পরিস্থিতি, তাতে কাউকে বিশ্বাস করা সম্ভব না, সে তিনি যতই প্রভাবশালী হন না কেন। কোন পত্রে কে যে কাকে কোন গূঢ় সংবাদ পাঠাতে চায় সে অনুমান করা অসম্ভব। গত মাসেই তিনজন গুপ্তচর ধরা পড়েছে পাটলিপুত্রে। প্রবল শারীরিক নিগ্রহের পরেও তারা জানায়নি যে তাদের প্রভু কে। এই জটিল এবং ঝঞ্ঝাটময় সময়ে কে যে কার অনুগত, কে যে কার সঙ্গে কোন সূত্রে সম্পর্কিত, কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। তাই প্রতিটি সংবাদ উত্তমরূপে পরীক্ষা করা আবশ্যক হয়ে পড়েছে।
কিশোরটি ঘন ঘন মাথা নেড়ে জানালো যে সে কিছুতেই মূল পত্রটি হস্তান্তর করবে না। এসব আপত্তিতে অবশ্য মতিল কোনওদিনই খুব একটা কান দেন না। তিনি কিশোরের গণ্ডদেশে একটি চপেটাঘাত করে মূল পত্রটি হস্তগত করলেন।
পত্রটি সংক্ষিপ্ত। দনুজদমনপত্নী তাঁর পতিকে জানাচ্ছেন যে তাঁদের কন্যা ভামিনী গর্ভবতী হয়েছে। আপাতত পিতৃগৃহে অবস্থান করছে সে। এই আনন্দসংবাদ দেওয়ার পাশাপাশি প্রেরক এও জানাচ্ছেন যে স্বামী যেন সম্রাটের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করেন, দ্রুত পাটলিপুত্রে ফিরে আসার জন্য। ভামিনী বড়ই পিতৃসোহাগী মেয়ে। পিতার জন্য তার বড়ই মন কেমন করছে।
অতি সাধারণ সাংসারিক পত্র, কোনও গোপন গূঢ়লেখ নয়। তাও পত্রটি বারবার পড়লেন মতিল। গোপন সংবাদ বা সঙ্কেত উদ্ধারে বিশেষ পারদর্শিতা আছে তাঁর। বহুরকমভাবে পত্রটি পরীক্ষা করলেন। কিন্তু কোনও গোপন সঙ্কেত উদ্ধার করতে পারলেন না।
এইবার কিশোরের বস্ত্রাদি পরীক্ষা করা শুরু করলেন মতিল। একইসঙ্গে রক্ষীদের আদেশ দিলেন রথটি ভালোভাবে পরীক্ষা করার জন্য।
কিন্তু নাহ, সেখানেও ব্যর্থ হতে হল তাঁকে। কোথাও কোনও গোপন সঙ্কেত নেই। অথচ তাঁর ষষ্ঠেন্দ্রিয় বলছিল কোথাও একটা অস্বাভাবিক কিছু ঘটছে।
অবশেষে এক কৌশল করলেন তিনি। কিশোরকে নতুন বস্ত্র দিলেন পরিধানের জন্য। সঙ্গে আনা চিপিটকাদি বহন করার জন্য অন্য বস্ত্রখণ্ড দিলেন। আর রথের বদলে একটি বেগবান অশ্ব দিলেন যাতে কিশোরটি আরও দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে।
কিশোর বাক্যব্যয় করল না। নিষ্পাপ অমল হাসিতে মুখমণ্ডল ভরিয়ে যাত্রা শুরু করল সে।
.
দত্তাদেবীর মুখখানি ক্রোধে থমথম করছিল। তিনি শীতল কণ্ঠে চন্দ্রগুপ্তকে প্রশ্ন করলেন, ‘শুনলাম তুমি নাকি প্রজাদের প্ররোচনা দিচ্ছ রামগুপ্তর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে? এ কথা কি সত্য?’
চন্দ্রগুপ্ত এত অবাক হয়ে গেলেন যে, প্রথমে তাঁর বাক্যস্ফূর্তি হল না।
কাল সারাদিন তিনি ব্যস্ত ছিলেন যাত্রা নির্বিঘ্ন করার কাজে। সম্রাটের শোভাযাত্রা তো আর সাধারণ্যের তীর্থযাত্রা নয়। তার প্রস্তুতিও রাজসূয় যজ্ঞায়োজনের থেকে কম কিছু নয়। প্রথমে স্থির করতে হয় শোভাযাত্রার পথ। তারপর নিশ্চিত করা হয় যে সে পথ সুনির্মিত, অনুচ্চাবচ এবং খন্দহীন। মহারাজাধিরাজের অঙ্গরক্ষকরা দেখেন সেই পথে কোনও অতর্কিত আক্রমণের আশঙ্কা আছে কিনা। যেখানে রাত্রিবাসের ব্যবস্থা করা হবে সেখানে বন্যজন্তু বা শত্রুপক্ষের আক্রমণের সম্ভাবনা আছে কি নেই। খাদ্য এবং পেয় জলের উৎস নিশ্চিত করা হয়।
চন্দ্রগুপ্ত’কে অন্য সমস্ত দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে আপাতত তাঁকে সম্রাটের প্রধান অঙ্গরক্ষকের পদ দেওয়া হয়েছে। এ যেন মহাসেনানায়ককে সাধারণ চৌরধনিক পদে নিয়োগ করা। এই প্রবল অসম্মানের কারণ সবাই জানেন, বোঝেন। কিন্তু কেউ একটি শব্দও উচ্চারণ করেন না।
চন্দ্রগুপ্ত অবশ্য কর্তব্যে অবিচল। যা দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়, তার প্রতি তিনি সম্পূর্ণ সুবিচার করেন। তাঁর অধীনে থাকা সমস্ত কর্ম সুচারুরূপে যথাসময়ে সুসম্পাদিত হয়। তাঁর কর্তব্যনিষ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনও অবকাশই তিনি কাউকে দেন না।
আজ প্রভাতে রাজমাতার আদেশ পেয়ে কিঞ্চিৎ আশ্চর্য হয়েছিলেন তিনি। বহুদিন হল তাঁর গর্ভধারিণীর সঙ্গে বার্তালাপ করেন না। রাজপ্রাসাদ থেকে তাঁকে যেন একপ্রকার অচ্ছুৎ করে রাখা হয়েছে। যেন তাঁকে বিদায় করতে পারলেই তাঁর বংশ, তাঁর পরিবার সর্বান্তকরণে সুখী হয়।
তাই চন্দ্রগুপ্ত দ্রুত এসেছেন রাজমাতার শিবিরে। এসে যথাবিহিত পাদবন্দনা করে দাঁড়িয়েছেন। প্রশ্ন করেছেন, ‘কী আদেশ রাজমাতা?’
আর তার পরেই এই অন্যায় এবং বিস্ফোরক অভিযোগ।
নিজেকে সংহত করতে কিছু সময় নিলেন চন্দ্রগুপ্ত। তারপর তিনি অপমানিত এবং ক্ষুব্ধ স্বরে বললেন, ‘আমি গুপ্তবংশের সন্তান মা, এই বংশের প্রতি আমার আনুগত্য অচল এবং অপরিবর্তনীয়৷ এ নিয়ে কোনও প্রশ্নই উঠতে পারে না। আজ অবধি আমার আচার আচরণে এর কোনও ব্যত্যয় দেখেছেন?’
‘দেখিনি, তবে শুনেছি।’
‘কী শুনেছেন মা? এমন কী সূচনা আপনার কানে এসেছে যার জন্য আপনি আমার নামে এত বড় একটি অভিযোগ উত্থাপন করেছেন?’
‘শুনেছি তুমি নাকি ইতর প্রজাসাধারণ, সামান্য সৈন্যবর্গ, সবার সঙ্গে অবাধ মেলামেশা করো? তোমার নিজের সম্মান থাকুক না থাকুক, গুপ্তবংশের গৌরবের কথাটাও কি ভুলে গেছ?’
‘ইতর জনসাধারণ বা সামান্য সৈন্যবর্গের সঙ্গে অবাধে মেলামেশা কবে থেকে রাষ্ট্রদ্রোহ বলে বিবেচিত হল মা?’
‘আমার সন্দেহ এইভাবে তুমি ওদের তোমার স্বপক্ষে সংগঠিত করছ যাতে সম্রাটের প্রতি সৈন্যবাহিনী এবং জনসাধারণের অখণ্ড আনুগত্য আর অখণ্ড না থাকে।
‘কিন্তু মা, পিতা কি জন্মাবধি আমাদের সেই শিক্ষাই দেননি? পিতার কি এই নির্দেশ ছিল না যে নিজের সুখ ও বিলাসের আগে প্রজাদের সুখ-সুবিধাকে প্রাধান্য দিতে হবে? তিনিই তো বলেছিলেন জনগণই ঈশ্বর, সম্রাট তাঁদের প্রতিভূ মাত্র।’
দত্তাদেবী পুত্রের চোখে চোখ মেলাতে পারেন না, ‘হ্যাঁ, তিনি বলেছিলেন। কিন্তু তার মানে এই নয়, যে তুমি তোমার পিতার কথা মান্য করতে গিয়ে নিজের ছায়ায় নিজের অগ্রজকে আবৃত করে ফেলবে! মনে রেখো চন্দ্র, তুমি নও, গুপ্তসাম্রাজ্যের মহারাজাধিরাজ এখন রামগুপ্ত।’
‘বেশ। তাহলে এই সাম্রাজ্যে এখন আমার কী ভূমিকা?’
‘যা তোমাকে তোমার জ্যেষ্ঠ বেছে দেবেন।’
ম্লান হাসেন চন্দ্রগুপ্ত, ‘কোন জ্যেষ্ঠর কথা বলছেন মা? যাঁর আচরণ দেখলে মনে হয় যিনি আমার অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগতই নন? যিনি আমাকে অহরহ সর্বসমক্ষে অপমানিত করেন, হেয় করেন, দলিত করেন? যিনি আমার সঙ্গে সাধারণ বাক্যালাপ অবধি করেন না? যিনি আমাকে সাধারণ অঙ্গরক্ষক করে রেখেছেন, সেই জ্যেষ্ঠর কথা বলছেন মা?’
দত্তাদেবী নীরব রইলেন।
চন্দ্রগুপ্ত বলতেই থাকলেন, ‘আর শুধু কি আমি? বাকি রাজপার্ষদরা? তাঁদের সঙ্গে কী ঔদ্ধত্য এবং দম্ভের সঙ্গে কথা বলেন সম্রাট সে সংবাদ আপনাকে কেউ দেয়নি রাজমাতা? এমনকী শিখরস্বামীর মতো প্রাজ্ঞ এবং বিচক্ষণ মহামন্ত্রীকে অবধি বৃদ্ধ এবং মূর্খ বলে উপহাস করতে ছাড়েন না তিনি।’
দত্তাদেবী অন্যদিকে তাকিয়ে রইলেন।
‘আর মহাদেবী ধ্রুবা? তাঁর প্রসঙ্গে কী বলবেন মা? আপনি তো আমাকে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু আপনি কি জানেন কী অসহ দুরবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন গুপ্তসাম্রাজ্যের মহাদেবী?’
‘চন্দ্রগুপ্ত!’ চিৎকার করে উঠলেন রাজমাতা দত্তাদেবী, ‘নিজের অগ্রজের বৈবাহিক জীবন নিয়ে কটুকথা বলার ধৃষ্টতা তোমার হল কী করে? মনে রেখো চন্দ্র, তোমাদের মধ্যে এককালে যা সম্পর্কই থাকুক না কেন, ধ্রুবা এখন মহারাজাধিরাজ রামগুপ্তর সম্পত্তি। তার সুখ স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে তুমি ব্যস্ত না হলেই আমি খুশি হব। কথাটা যেন স্মরণে থাকে।’
চন্দ্রগুপ্তর কানে ‘সম্পত্তি’ শব্দটি বড় কটু শোনাল। তিনি কিছু বললেন না, রাজমাতাকে প্রণাম করে ধীরে ধীরে নিষ্ক্রান্ত হলেন।
.
দৌবারিকপ্রধান মতিল নিজের কপালে সজোর করাঘাত করলেন। স্ত্রীজাতির পেটে যে কোনও গোপন কথা থাকে না, এই আপ্তবাক্যটি তাঁর স্মরণে রাখা উচিত ছিল। এখন যে কী করে এই ঝঞ্ঝাট সামাল দেবেন তার কোনও উপায় তাঁর বুদ্ধিতে আসছে না।
মন্ত্রগুপ্তি হচ্ছে রাজপুরুষদের প্রধানতম চরিত্রভূষণ। খুব সম্ভবত তাঁদের আচার সংহিতার প্রথম বাক্যটিই হচ্ছে ‘যাহা যাহা দেখিবেন, জানিবেন এবং শুনিবেন, কদাচ ঘুণাক্ষরেও কোথাও প্রকাশ করিবেন না। প্রকাশ করিলেই মরিবেন।’ আর মতিল সেই আপ্তবাক্যটিই লঙ্ঘন করে বসে আছেন।
মতিলের স্ত্রী অপালা হচ্ছেন দনুজদমনকন্যা ভামিনীর প্রিয়সখী। দুজনে একই সঙ্গে খেলাধুলা করে বড় হয়েছেন। মতিল তাই খেলাচ্ছলেই ভামিনীর গর্ভাধানের সংবাদটা বলে ফেলেছিলেন অপালাকে। বলেই বুঝেছিলেন যে কাজটা উচিত হয়নি। এই তথ্য কোনও গতিকে রাষ্ট্র হলে প্রকাশ পেয়ে যাবে যে পাটলিপুত্র থেকে প্রেরিত সমস্ত সংবাদ পরীক্ষা এবং নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এমনকী উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীদের পারিবারিক সংবাদও। সে গুপ্তসাম্রাজ্যের পক্ষে গৌরবের কথা হবে না।
তাই তৎক্ষণাৎ স্ত্রীকে দিয়ে গৃহদেবতা পরিহাসকেশবের নামে শপথ করিয়েছিলেন এ কথা যেন ঘুণাক্ষরেও প্রকাশ না পায়। অপালা কথা দিয়েছিলেন, এ কথা ঘুণাক্ষরেও প্রকাশ পাবে না।
অপালা অক্ষরে অক্ষরে তাঁর কথা রেখেছেন। যাঁকেই প্রিয়সখীর গর্ভাধানের সংবাদ দিয়েছেন, তাঁকে দিয়ে অবশ্যই প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছেন, ‘দেখো, কথাটা যেন ঘুণাক্ষরেও প্রকাশ না পায়।’
