মহাদেবী – ৬
পরদিন প্রভাতে যখন মতিল কর্মস্থলের পথে যাত্রা করছেন, তখন প্রথমে দেখা পেলেন পণ্ডিত দেবশর্মার। তিনি হেঁকে বললেন, ‘ওহে মতিল, সংবাদ শুনেছ তো? দনুজদমনের কন্যা নাকি গর্ভবতী? তাহলে তো ওঁকে একবার সংবাদটা পাঠাতে হয়।’
মতিল বিচলিত হলেও মনের ভাব যথাসম্ভব গোপন রেখে বিগলিতস্বরে বললেন, ‘তাই নাকি! তাহলে তো কিছু একটা করতেই হয় পণ্ডিত মহাশয়। দেখি কী করা যায়।’
আরও খানিক যাওয়ার পর দেখলেন বৈদ্যশ্রেষ্ঠ সুষেণ হন্তদন্ত হয়ে এদিকেই আসছেন। মতিলকে দেখে বললেন, ‘শুনেছেন কাণ্ড! দনুজদমনের কন্যা নাকি গর্ভবতী। এদিকে সেনাধ্যক্ষ তো দেশে নেই। যাই, গিয়ে দেখি ওঁদের কোনও সাহায্যের প্রয়োজন আছে কিনা।’
মতিলের গলা শুকিয়ে গেল। তিনি কোনওক্রমে হেঁ হেঁ করতে করতে দ্রুত হাঁটতে লাগলেন। কর্মস্থলের কাছাকাছি এসে দেখলেন বৃদ্ধা জাবালী একটি যষ্টি অবলম্বন করে ধীরে ধীরে হেঁটে আসছেন। জাবালী হলেন পাটলিপুত্রের সর্বাধিক জনপ্রিয় ধাত্রী। কথিত আছে পাটলিপুত্রর অর্ধেক বাসিন্দা নাকি এঁর ক্রোড়েই পৃথিবীর আলো দেখেছেন। মতিলকে দেখে বৃদ্ধা দন্তহীন মুখে একগাল হেসে বললেন, ‘শুনেছ বাছা মতিল, ভামিনী নাকি…’
মতিল দেখলেন তিনি আর হাঁটছেন না, রাজভবনের দিকে দৌড়চ্ছেন।
.
রুদ্রদেব আর নাগদত্ত যে রোষকষায়িত লোচনে মতিলের দিকে চেয়ে আছেন, তাতে সত্যযুগ হলে এতক্ষণে মতিলের ভস্মাস্থি গঙ্গায় বিসর্জন হয়ে যাওয়ার কথা। নেহাত ঘোর কলিযুগ বলেই মতিল ভারি ম্রিয়মাণ এবং অপ্রস্তুত অবস্থায় তাঁদের সামনে বসে আছেন।
নাগদত্ত অপ্রসন্নস্বরে বললেন, ‘কাল কী কী হয়েছিল সব বিশদে বর্ণনা করুন।’
মতিল পুরো কাহিনিটি বিবৃত করলেন।
‘পত্রে কিছু ছিল না? কোনও গোপন সংবাদ?’
‘না প্রভু।’
‘শব্দের কোনও বিশেষ ক্রম? বর্ণের কোনও বিশেষ সংস্থাপন? প্রথম অক্ষরগুলি জুড়ে কোনও নির্দিষ্ট সঙ্কেত?’
‘দেখেছি প্রভু। আপত্তিকর কিছুই পাইনি।’
‘ওই কিশোরের সঙ্গে যা যা ছিল সব বিশদে পরীক্ষা করেছেন?’
‘হ্যাঁ প্রভু। তাকে একটি নূতন বস্ত্র দিয়ে তার পরিহিত বস্ত্রটি পরীক্ষা করিয়েছি। রথের বদলে তাকে একটি দ্রুতগামী অশ্ব দিয়েছি। রথটিও বিস্তারিত ভাবে নিরীক্ষণের ব্যবস্থা করেছি, কিন্তু কিছুই পাইনি।’
‘হুম, এই কিশোরকে এত পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পরীক্ষার কারণ?’
‘আজ্ঞে সম্রাটের বিজয়শোভাযাত্রা যেদিন যাত্রাশুরু করে, তার ঠিক আগেরদিন রাজসভায় তীর্থযাত্রার ফলাফল, কীসে কীসে পুণ্যলাভ হয়, কোন কোন তীর্থে কবে কবে যাত্রা প্রশস্ত, সে নিয়ে কয়েকজন উচ্চপদস্থ সভাসদ আলোচনা করছিলেন। তাঁদের মধ্যে কে যেন বললেন, রথারূঢ় বামন দেখলে নাকি পুনর্জন্ম হয় না। কে বলেছিলেন স্মরণে নেই। তবে কথাটা মনে থেকে গেছিল।’
‘বটে? আর তাই তোমার কাল মনে হল যে ওই কিশোরের মাধ্যমে কোনও গোপন সংবাদ প্রেরণ করা হচ্ছে?’ এবার রুদ্রদেব প্রশ্ন করলেন।
‘শুধু তাই নয় প্রভু। তার সঙ্গে থাকা সামগ্রীর মধ্যে আমি এইটি পেয়েছিলাম।’ বলে একটি শস্ত্রী বার করলেন মতিল।
‘কী বিশেষত্ব আছে এই শস্ত্রীতে?’ শস্ত্রীটি হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে প্রশ্ন করলেন নাগদত্ত।
‘ক্ষৌরকার্য করার জন্য ব্যবহৃত হয় প্রভু। মস্তক মুণ্ডনের সময়…’
‘সে জানি মতিল’ কঠিনস্বরে বললেন রুদ্রদেব, ‘কিন্তু এর বিশেষত্ব কী সেটাই জানতে চাইছি।’
‘এ ধরনের শস্ত্রী এতদ অঞ্চলে ক্ষৌরকার্যে ব্যবহৃত হয় না প্রভু। এই বালকের আছে এল কী করে? আর এই শস্ত্রী নিয়ে সে করেই বা কী?’
‘হুম। প্রশ্নটি জটিল কিন্তু আপাতগ্রাহ্য। আপাতত গাত্রোত্থান করো দেখি। একবার দেবী ভামিনীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আসি৷ দনুজদমন আমাদের অনেক উপকার করেছেন। একবার তো সংবাদ নিতেই হয়।’
.
দনুজদমন ঘরনি সর্বমঙ্গলার মতো সার্থকনাম্নী রমণী অধিক পাওয়া যায় না। রূপে গুণে দয়ায় দাক্ষিণ্যে ইনি সত্যিই সর্বমঙ্গলা, প্রকৃতই মাতৃমূর্তি।
তিনজন রাজপদাধিকারীকে সহাস্যে অভ্যর্থনা জানালেন তিনি। এঁদের তিনি দেবরতুল্য স্নেহ করেন। তাঁর স্বামীর সঙ্গে এঁরা বহুবার তাঁর ভবনে এসেছেন।
তিনজনেই সম্মান প্রদর্শনপূর্বক ভামিনীর শরীর স্বাস্থ্যের ব্যাপারে সংবাদ নিলেন। কোনও অসুবিধা হলে তাঁদের তৎক্ষণাৎ জানাতে বললেন।
কথায় কথায় নাগদত্ত বড় সুকৌশলে সেই বামনের প্রসঙ্গ তুললেন। সর্বমঙ্গলা প্রসন্নস্বরে জানালেন এমন কর্মঠ এবং বুদ্ধিমান দাস তিনি ইতিপূর্বে পাননি। মূক ও বধির হলে কী হবে, সর্বমঙ্গলার কখন কী চাই সে যেন আগেই বুঝতে পারত। তাকে ভারি ভরসা করেন তিনি। তাই অন্য কারও অবর্তমানে তার হাত দিয়েই স্বামীর প্রতি একটি পত্র পাঠিয়েছেন সর্বমঙ্গলা।
নাগদত্ত শস্ত্রীটি বার করে বললেন, ‘সে সংবাদ জানি দেবী। যাত্রার সময় কোনওভাবে এটি বেচারির সঞ্চয় থেকে মাটিতে পড়ে যায়৷ আমরা কুড়িয়ে পেয়ে প্রত্যর্পণ করতে এসেছি।’
সর্বমঙ্গলা সরল চরিত্রের মানুষ। ক্ষৌরকার্যে ব্যবহৃত একটি সাধারণ শস্ত্রী প্রত্যর্পণ করতে যে তিনজন উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীর একত্রে আসা যে অতি বিরল ঘটনা, সে সন্দেহ তাঁর মনে একবারও উদিত হল না। তিনি শস্ত্রীটি হাতে নিয়ে সস্নেহে বললেন, ‘আহা রে, বেচারা। এবার সে মস্তক মুণ্ডন করবে কী করে?’
তিনজন চোখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। নাগদত্ত প্রশ্ন করলেন, ‘মস্তক মুণ্ডন কেন দেবী? তার মাথায় তো শুনেছি ঘন কেশরাজি বর্তমান।’
সর্বমঙ্গলা বললেন, ‘সে এক আশ্চর্য কাণ্ড। এই কিশোরের কেশবৃদ্ধির হার অস্বাভাবিক দ্রুত। একবার কেশকর্তনের পর পক্ষকালের মধ্যেই তার মাথা আবার ঘন কেশরাজিতে ভরে যায়। তাই প্রতি অমাবস্যার দিন সে নিজেই তার মস্তক মুণ্ডন করে নেয়। আর এই হচ্ছে তার প্রিয় শস্ত্রী।’
রুদ্রদেব সতর্কস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘এই শস্ত্রী তো মগধ অঞ্চলের ক্ষৌরকাররা ব্যবহার করেন না। এই কিশোর এই শস্ত্রী পেল কোথা থেকে?’
সর্বমঙ্গলা বললেন, ‘সে তো জানি না ভাই। যিনি ওকে দিয়েছেন, তিনি বলতে পারবেন।’
নাগদত্তর ভ্রু কুঞ্চিত হল, ‘এ কিশোর আপনাদের ক্রীতদাস নয়? আমি তো শুনেছিলাম আর্য দনুজদমন হিমালয়ে তীর্থ করতে গিয়ে একে ক্রয় করে এনেছিলেন।’
‘না না৷ এই কিশোরকে আমার স্বামী ক্রয় করেননি। স্বামী যখন হিমালয়ে তীর্থযাত্রায় গেছিলেন, সেই সময় আরেকজন তাঁর সঙ্গী হয়েছিলেন। শুনেছি মাঝে তিনি দলবিচ্ছিন্ন হয়ে পক্ষকালের জন্য অন্য কোথাও চলে যান। আবার ফিরে আসেন এই কিশোরকে সঙ্গে নিয়ে। বলেন ফেরার সময় এই কিশোরকে তার পিতামাতার কাছ থেকে কয়েক কাষায়পণের বিনিময়ে ক্রয় করে এনেছেন। তিনি একে আমাদের দিয়েছিলেন আপাতত তাঁর ভবনে নতুন কোনও দাস রাখার ব্যবস্থা নেই বলে।’
তিনজনে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন।
সর্বমঙ্গলা বলে চললেন, ‘গত অমাবস্যা থেকে এ নিজের প্রভুর ভবনেই ছিল। গতকালই আমি একে চেয়ে আনি, সংবাদ পাঠানোর জন্য।’
তিনজনে প্রায় একইসঙ্গে প্রশ্ন করলেন, ‘কে তিনি? কে এই বালকের প্রকৃত প্রভু?
সেইদিনই রুদ্রদেব অতি সন্তর্পণে একটি অত্যন্ত সুশিক্ষিত পারাবত উড়িয়ে দিলেন আকাশে৷ তার নখরের মধ্যে একটি ক্ষুদ্র পত্র।
.
অবশেষে দীর্ঘযাত্রার পর হিমালয়ের পাদদেশে এক অপূর্ব শোভামণ্ডিত উপত্যকার মধ্যে উপস্থিত হয়েছে বিজয়যাত্রা। কুসুমাস্তীর্ণ গহীন উপত্যকাটি দেখলে স্বর্গের অমরাবতী বললে ভ্রম হয়। চারিদিকে বিস্তৃত হরিৎ তৃণভূমি। তার শোভা দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। দূরদিগন্তে নগাধিরাজ হিমালয়ের বিভিন্ন হিমাবৃত শৃঙ্গশ্রেণী চলে গেছে সমুদ্রের তরঙ্গমালার মতো। আর সেখান থেকে উৎপত্তি হয়েছে এক খরস্রোতা কল্লোলিনীর। এই উপত্যকার পাশ দিয়েই মহাকলধ্বনি সমারোহে বয়ে চলেছে সেই নদী।
মহাদেবী ধ্রুবাও যেন এই সুরম্য পরিবেশে এসে কিঞ্চিৎ সহজ হয়েছেন। এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ান, আপন খেয়ালে গান করেন, নদীর জলে পা ডুবিয়ে কিশোরীর মতো উচ্ছ্বাসে ভেসে যান।
তবে কখনই একা থাকেন না। সঙ্গে থাকে পরিচারিকা আর কিঙ্করীর দল। আর বেশ কিছুটা দূরে থাকে একদল প্রশিক্ষিত সৈন্য। যতই নিরাপদ স্থান হোক, গুপ্তবংশের পটমহিষী বলে কথা, তাঁর নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিশ্ছিদ্র রাখতে হবে বৈ কি!
চন্দ্রগুপ্ত শিবিরে অনুপস্থিত। কয়েকদিন পূর্বেই তিনি একটি ছোট সৈন্যদল নিয়ে গেছেন আশেপাশের কিছু অঞ্চল ঘুরে দেখবেন বলে। ফিরবেন কয়েকদিন পর। অনুগত ভ্রাতা কচকে নিজের দায়িত্ব দিয়ে বলে গেছেন চারিদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে। কচগুপ্ত প্রশ্ন করেছিলেন এত সতর্কতার প্রয়োজন কী। চন্দ্রগুপ্ত কোনও উত্তর দেননি। বেগবান অশ্বে আরোহন করে দ্রুত উধাও হয়েছেন।
একদিন সম্রাট রামগুপ্ত বস্ত্রাবাসের মধ্যে বসে পাত্র-মিত্র সমভিব্যহারে প্রমোদে মত্ত, এমন সময় প্রহরী এসে সংবাদ দিল, ‘প্রভু, দুইজন স্থানীয় প্রজা আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়। আদেশ হলে তাদের নিয়ে আসি প্রভু?’
প্রভুর আদেশে এক নারী এবং এক পুরুষ এসে আভূমি প্রণাম করেন দাঁড়াল। পোশাকে-আশাকে বোঝাই যায় যে, এরা এই অঞ্চলের বাসিন্দা৷ পুরুষটি গৌরবর্ণ এবং কৃশকায়। তাঁর চোখেমুখে সর্বদাই একটা কৌতুকের ভাব খেলা করছে। পুরুষটির হাতে একটি বিদেশি বাদ্যযন্ত্র।
আর নারীটি?
তার দিকেই নিষ্পলকে তাকিয়েছিলেন রামগুপ্ত। এ কি মানবী নাকি দেবী রতি স্বয়ং? আহা, নারী এত কমনীয়, এত মনোলোভা, এত সুন্দরীও হয়?
জানা গেল, এরা এই অঞ্চলের এক বিশেষ উপজাতি মানুষ। বিভিন্ন উৎসবে সমাবেশে নেচে গেয়ে আনন্দ দেওয়াই এদের পেশা। বংশানুক্রমে এরা এই কাজ করে এসেছে। এত বড় সৈন্যাবাস দেখে তারা ভেবেছে এখানে এলে তাদের হয়তো কিছু উপার্জন হবে। মহারাজ আদেশ করলে তারা নিজেদের গায়ন এবং নৃত্যশৈলী পরিবেশন করতে ইচ্ছুক। আর পুরুষটি সঙ্গে এনেছে অতি উৎকৃষ্ট গঞ্জিকার একটি নাতিবৃহৎ পেটিকা৷ এই অঞ্চলের গঞ্জিকা অতীব উত্তম।
সেদিন অনেক রাত অবধি নাচ গান মদ্য এবং গঞ্জিকাসেবনের আসর বসল রামগুপ্তর শিবিরে৷ উৎসব শেষ হলে রামগুপ্ত নারীটিকে নিয়ে বস্ত্রাবাসের দ্বার রুদ্ধ করলেন। আর পুরুষটি অন্ধকারের মধ্যে কোথাও গেল কেউই লক্ষ করলেন না।
ভোররাত্রির সময় সমগ্র সেনাশিবির যখন ঘুমে অচেতন, তখন রামগুপ্তর বস্ত্রাবাস থেকে বেরিয়ে এল সেই নারী। অপর পুরুষটি কাছেই ছিল। সে সাগ্রহে এসে প্রশ্ন করল, ‘কী রে, কেমন আছিস? সব ঠিকঠাক হয়েছে তো? গর্ভস্রাবটা তৃপ্ত হয়েছে তো?’
নারীটি ফিক করে হেসে বলল, ‘ধুর, কিচ্ছু পারে না। বিষ ঢালবে কি, ফণা তুলে দাঁড়াতে পারলে তো। তবে কাজের কাজটা হয়েছে। কালই শিবির উঠে যাচ্ছে যেখানে যেতে বলেছি, সেখানে। মহারাজ এবার আমাদের পুরস্কারে ভরিয়ে দেবেন গো!’
দুজনেই চাপাস্বরে হাসাহাসি করল কিছুক্ষণ। তারপর শিবিরের একদম পিছনের অংশ দিয়ে বেরিয়ে আধো অন্ধকারে মিশে গেল তারা।
.
চন্দ্রগুপ্ত যেখানে এসে পৌঁছলেন সে আরও উত্তরে। এই পথ ধরে চলতে থাকলে কয়েকদিনের মধ্যেই পুণ্যভূমি কশ্যপমীরে উপনীত হওয়া যায়। পশ্চিমে এই পথ পৌঁছেছে শাকল ও গান্ধার।
স্থানটি অতি মনোরম পার্বত্য অঞ্চল। চন্দ্রগুপ্ত যে গ্রামে আশ্রয় নিয়েছেন সেটিকে প্রথম দৃষ্টিতে পটচিত্রে অঙ্কিত কোনও সুরভূমি বলে ভ্রম হয়। নগাধিরাজ হিমালয়ের ক্রোড়ে লুকিয়ে থাকা এই জনপদ প্রকৃতই মনোহারিণী।
কিন্তু চন্দ্রগুপ্তর মনে শান্তি নেই। এমন মনোহারী প্রকৃতি সন্দর্শনেও তাঁর রুচি নেই। তিনি যেন ভূতগ্রস্ত। যেখানেই যান কেবলই সেখানকার ক্ষৌরকারদের সঙ্গে কথা বলেন, আর একটি পত্র বার করে তাতে অঙ্কিত একটি শস্ত্রীর ছবি দেখান। কিন্তু কেউই কিছু বলতে পারে না। এইভাবে এক একটি করে অসফল দিনের শেষ হয় আর চন্দ্রগুপ্তর মুখে চিন্তার ঘন মেঘ আরও গাঢ় হয়।
একদিন প্রভাতে তিনি নিজের ক্ষুদ্র শিবিরে বসে ছিলেন। কপালে চিন্তার ভ্রুকুটি, মুখখানি গম্ভীর৷ এমন সময় একজন সহচর এসে বলল, ‘প্রভু, এই গ্রামের মণ্ডলপ্রধান আপনার দর্শনাভিলাষী।’
চন্দ্রগুপ্ত সম্মতি জানাতেই এক প্রৌঢ় সামনে এসে প্রণাম করে দাঁড়ালেন, ‘অহো, কী সৌভাগ্য আমাদের। কুমার চন্দ্রগুপ্ত স্বয়ং এই গ্রামে পদার্পণ করেছেন। ধন্য হল আমাদের এই গ্রাম, ধন্য হল আমাদের জন্মভূমি।’
চন্দ্রগুপ্ত প্রতি নমস্কার করে তাঁকে বসতে বললেন। প্রৌঢ়ের সঙ্গে একটি তরুণীও এসেছিল। এই অঞ্চলের মানুষের স্বাভাবিক গাত্রবর্ণ গৌর। কিন্তু এই তরুণী সামান্য শ্যামাঙ্গী। ঈশ্বর যেন পৃথিবীর সমস্ত রূপ ঢেলে দিয়েছেন এই মেয়ের শরীরে৷ এমন স্নিগ্ধ, এমন কমনীয় সৌন্দর্য কমই দেখেছেন চন্দ্রগুপ্ত। অথচ সেই স্নিগ্ধতার মধ্যেও কোথাও যেন এক শান্ত কিন্তু ক্ষুরধার দার্ঢ্য লুকিয়ে আছে৷ তার সঙ্গে প্রৌঢ় পরিচয় করিয়ে দিলেন, ‘আমার কন্যা, কালি।’
নামকরণের সার্থকতা প্রমাণিত হল। চন্দ্রগুপ্ত স্নেহমিশ্রিত সুরে বললেন, ‘আসন গ্রহণ করুন মা।’
চন্দ্রগুপ্ত সমস্ত অপরিচিতা নারীকে মাতৃসম্বোধন করেন। কালি নামের সেই কন্যা প্রতিপ্রণাম করে বললেন, ‘সসাগরা অখণ্ড জম্বুদ্বীপের অধিপতি, গুপ্তসাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠতম সম্রাট, সর্বরাজোচ্ছেত্তা বিক্রমাদিত্য চন্দ্রগুপ্তকে কালির প্রণাম।’
চন্দ্রগুপ্ত অপ্রস্তুত হলেন। তিনি সম্রাট নন, কুমার মাত্র। সম্রাটের অঙ্গরক্ষক দলের প্রধান৷ প্রৌঢ় বিব্রতস্বরে বললেন, ‘এই অর্বাচীন বালিকার কথায় কান দেবেন না প্রভু। এর অভ্যাস আছে অকস্মাৎ এরকম অযথা অসংলগ্ন কথা বলার। আমি সর্বান্তকরণে ক্ষমাপ্রার্থী।’
চন্দ্রগুপ্ত হেসে ফেললেন। ‘ঠিক আছে প্রধান। অত লজ্জিত হওয়ার কিছু হয়নি।’
প্রধান বিব্রতস্বরে বললেন, ‘কী করে যে এই অবাধ্য মেয়ের বিয়ে দেব কে জানে। একে তো যত্রতত্র অদ্ভুত অদ্ভুত সব কথা বলে বেড়ায়। তার উপর যত হিংস্র বন্যজন্তুর সঙ্গে এর প্রীতি। সে তরক্ষু হোক বা বিষধর সর্প।’
‘বটে?’ চমৎকৃত হলেন চন্দ্রগুপ্ত, ‘কীরকম?’
‘এই গ্রামের ঠিক বাইরে একটি ছোট উপত্যকা আছে। সেখানে একটি সুমিষ্ট জলের ঝরনাও আছে। কিন্তু সেই উপত্যকায় ভয়ানক সব বিষধর সর্পের বাস। ভয়ে এই গ্রামের কেউই সে অঞ্চলে যায় না। কিন্তু এই অবাধ্য মেয়ে সে কথা শুনলে তো।’
আশ্চর্য হলেন চন্দ্রগুপ্ত, ‘এরকম প্রতিভা তো সচরাচর দেখা যায় না। এই শ্যামবর্ণা সুন্দরী আপনার ঘর আলো করলেন কীভাবে?’
‘আমি কর্মসূত্রে বহুকাল বঙ্গদেশে ছিলাম প্রভু। একটি বৌদ্ধবিহারে দ্বারপালের কাজ করতাম। সেখানে এক ভিক্ষুণী ছিলেন, তাঁর নাম ছিল প্রজ্ঞা। তিনি মুণ্ডমালাতন্ত্র এবং বারাহীতন্ত্রে সিদ্ধা ডাকিনী ছিলেন।
তিনি এই অর্ধশিক্ষিত বর্বরের মধ্যে কী দেখেছিলেন আজও জানি না। তাঁর সঙ্গে আমার প্রণয় হয়। একদিন ঘোর বর্ষার রাত্রিতে আমরা সেই বিহার ছেড়ে পলায়ন করি। প্রজ্ঞা তখন গর্ভবতী।
কালির জন্মের কয়েকদিনের মধ্যে আমার স্ত্রী মারা যান। আমার কন্যা একেবারে তার মায়ের অবিকল প্রতিকৃতি। তিনিই মেয়ের নাম রেখেছিলেন, কালি।’
চন্দ্রগুপ্তর বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। যাক, কেউ তো অন্তত পেরেছিল তার প্রেয়সীকে নিতে পালিয়ে যেতে। এই দরিদ্র প্রৌঢ়ের মুখে ভালোবাসার যে অমিত ঐশ্বর্য ঝলমল করছে, তিনি বোধহয় কোনওদিনই তার ভাগীদার হতে পারবেন না।
কালি দৃঢ়স্বরে বললেন, ‘আমার কথা কখনও মিথ্যা হয় না সম্রাট। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, আপনি অচিরেই এই ভারতভূমির অপ্রতিহত অধিপতি হবেন। এর অন্যথা হবে না, হবে না, হবে না।’
চন্দ্রগুপ্ত ম্লান হাসলেন। তারপর গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘সে কথা থাক। আপাতত আমাকে জানান সম্প্রতি আপনাদের গ্রামে বা এই অঞ্চলে কোনও অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছে?’
.
প্রধানের ক্ষুদ্র কুটিরে যখন চন্দ্রগুপ্ত এবং অন্যান্যরা এসে পৌঁছলেন, তখন সুনীল দ্বিপ্রহর। সুস্পষ্ট আকাশের বুকে মাথা তুলে আছে নগাধিরাজ হিমালয়ের তুষারাবৃত শৃঙ্গগুলি। পাহাড়ের অনেক নীচে এক নাম না জানা খরস্রোতা নদী বয়ে চলেছে। পথের ধারে কত না পুষ্পেপত্রে শোভিত বৃক্ষ ও গুল্মের দল। আজন্মকাল গাঙ্গেয় উপত্যকায় মানুষ চন্দ্রগুপ্তর চোখে এসবই বড় নূতন, বড় আশ্চর্য ঠেকে।
কুটিরের দাওয়াতে বসে একজন তরুণ কুমার। তাঁর সামনে একটি তালিপত্র খোলা। সেখানে খাগের কলম দিয়ে তিনি কী যেন লিখছেন। তাঁর দেহখানি সুগঠিত ও কমনীয়। কুঞ্চিত কেশরাশি নেমে এসেছে স্কন্ধাবধি৷
চন্দ্রগুপ্ত সামনে এসে স্মিতস্বরে বললেন, ‘মিত্র, কেমন আছেন?’
যুবকটি চন্দ্রগুপ্তর দিকে তাকালেন৷ চোখদুখানি নিষ্প্রাণ উদাস হলে কী হবে, অমন মায়াবী চোখ পুরুষ মানুষের কমই হয়। কিন্তু সে দৃষ্টিতে কোনও বোধ নেই, ভাষা নেই, প্রাণের সাড়া নেই।
প্রধান চুপিচুপি বললেন, ‘কালি যখন একে গ্রামের বাইরে খুঁজে পায় তখন ও প্রায় মরেই গেছে। কালি কোনওমতে চেঁচামেচি করে লোক জড়ো করে ওকে গ্রামের মধ্যে নিয়ে আসে। তারপর আমরা বহু কষ্ট করে বাঁচিয়ে তুলেছি একে। কিন্তু এর স্মৃতিভ্রংশ হয়েছে। এখানে আসার আগে এ কোথায় থাকত, কী করত, পিতৃপরিচয়, সংসার পরিবার কিছুই মনে করতে পারছে না। শুধু একটি জিনিসই পারে।’
বলে সেই তালিপত্রটির দিকে ইঙ্গিত করলেন প্রধান।
চন্দ্রগুপ্ত সামান্য নীচু হয়ে তালিপত্রটি তুলে নিলেন। দেখলেন সেখানে অনিন্দ্যসুন্দর হস্তাক্ষরে লেখা আছে এই কটি পংক্তি,
.
‘কশ্চিৎ কান্তাবিরহগুরুণা স্বাধিকারপ্রমত্তঃ
শাপেনাস্তংগমিতমহিমা বর্ষভোগ্যেণ ভর্তুঃ।
যক্ষশ্চক্রে জনকতনয়াস্নানপুণ্যোদকেষু
স্নিগ্ধচ্ছায়াতরুষু বসতিং রামগির্যাশ্রমেষু।।
তস্মিন্নদ্রৌ কতিচিদবলাবিপ্রযুক্তঃ স কামী
নীত্বা মাসান্ কনকবলয়ভ্রংশরিক্তপ্রকোষ্ঠঃ
আষাঢ়স্য প্রথমদিবসে মেঘমাশ্লিষ্টসানুং
বপ্রক্রীড়াপরিণতগজপ্রেক্ষণীয়ং দদর্শ।।
.
চন্দ্রগুপ্তর অন্তস্তল যেন এক অসহ্য স্নিগ্ধ আগুনে জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যেতে লাগল। মনে হতে লাগল তিনিই যেন সেই বিরহী যক্ষ যাঁর গহীন দুঃখের গাথা এই স্মৃতিভ্রষ্ট ক্ষণজন্মা কবি আগুন এবং জলের আখরে লিখে চলেছেন। যাবতীয় অপ্রাপ্তির বেদনা, ব্যর্থ প্রেমের কষ্ট, ফুরিয়ে যাওয়া স্বপ্নের ছাই তাঁর দুই গণ্ডদেশ বেয়ে অবারিতধারায় নেমে আসতে লাগল। আহা রে জীবন, তিনি কিছুই পেলেন না। তাঁর কিছুই হল না।
বাকিরা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মহাকঠোর, মহাকর্তব্যনিষ্ঠ মহাসংগ্রামী প্রতাপী বীর চন্দ্রগুপ্তর হৃদয়েও যে এমন অন্তঃসলিলা প্রেমের ফল্গুধারা বইছে, কে জানত সে কথা?
.
সেইদিন রাত্রিবেলা গ্রামের কামারশালার বাইরে বসে দুই গ্রামবাসীর মধ্যে ভারি বিদগ্ধ আলোচনা জমে উঠেছিল। সঙ্গে উৎকৃষ্ট সধূম গঞ্জিকা। গঞ্জিকাসেবনে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি, বিশ্লেষণী শক্তি, অনুসন্ধিৎসা এবং জ্ঞানপিপাসা বহুগুণে বর্ধিত হয়। সেই নিবিড় জ্ঞানচর্চার আলোতে ঋদ্ধ হচ্ছিল দুয়েকটি পাহাড়ি সারমেয়।
হারীত হচ্ছে এই কামারশালার কর্তা। সে কলিকায় একটি টান দিয়ে বলল, ‘বল দেখি সুনন্দ, সম্রাট রামগুপ্ত এখন কী করছেন?’
সুনন্দ হচ্ছে গ্রামের ক্ষৌরকার। সে অর্ধনিমীলিত নয়নে বলল, ‘তিনি কি আর আমাদের মতো রে হারীত? দেখ গিয়ে, রাত নামতেই তিনি হয়তো যবের মণ্ড আর কন্দসিদ্ধ খেয়ে নাক ডেকে ঘুমোচ্ছেন।’
কথাটা নানাভাবে বিচার করে দেখল হারীত। তারপর সিদ্ধান্তে এল, বক্তব্যটি যথাযথ এবং যুক্তিসঙ্গত বটে। আরও একটা টান মেরে কলিকাটি ফিরিয়ে দিয়ে বলল, ‘আর কুমার চন্দ্রগুপ্ত?’
সুনন্দ অভিজ্ঞ গঞ্জিকাসেবী। সে বেশ একটা বড় কলকেয় টান মেরে বলল, ‘তিনি বোধহয় এখনও অন্য কোনও গ্রামে ক্ষৌরকার সন্ধান করে বেড়াচ্ছেন।’
হারীতের এই কথাটাও বেশ মনে ধরল। তবে কি না শাস্ত্রে বলেছে তদবিদ্ধি প্রণিপাতেন, পরিপ্রশ্নেন সেবয়া। তার মনে এই কূট প্রশ্নের উদয় হল—‘আচ্ছা, রাজা মহারাজাদের তো শুনেছি অনেক কিছু সংগ্রহ করার বাতিক আছে। চন্দ্রগুপ্ত কি ক্ষৌরকার সংগ্রহ করতে চাইছেন? পাটলিপুত্রে কি ক্ষৌরকারের খুব অভাব?’
সুনন্দ ভারী ভাবনায় পড়ল। তাকে যদি চন্দ্রগুপ্ত সংগ্রহ করে নিয়ে যান, তাহলে তার পরিবারের রক্ষণাবেক্ষণ করবে কে?
চিন্তাটা বেশ ঘনিয়ে আসার আগেই দুজন চমকে উঠল সারমেয়র গর্জনে। সেই শব্দ চারিদিকে প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠে চূর্ণ করে দিল রাত্রির নিঃস্তব্ধতা।
দুজনেই সতর্ক হল। এরা চেঁচায় কেন?
একটু পরেই তার কারণটি পরিস্ফুট হল। অন্ধকারের মধ্য থেকে একটি খর্বাকৃতি মানুষ বেরিয়ে এসে সুস্পষ্ট স্বরে বলল, ‘আপনাদের একজন তো ক্ষৌরকার, আরেকজন লৌহকার। আমার পছন্দমতো একটি শস্ত্রী বানিয়ে দিতে পারেন? যে পরিমাণ অর্থ চান দিতে পারি।’
.
এই পার্বত্য অঞ্চলের প্রভাত বড় স্নিগ্ধ, বড় নির্মল, বড় পবিত্র। দেব দিবাকর উদিত হলেই দিনের প্রথম অরুণাংশু ছুঁয়ে ফেলে ওই গম্ভীর পর্বতচূড়ার শিখর। সেদিকে তাকালে মনে হয় যেন পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে শতসহস্র স্বর্ণধারার স্রোত।
গত রাত্রি এই কুটিরেই অতিবাহিত করেছেন চন্দ্রগুপ্ত। বাসনা ছিল কবির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ আলাপের। সে বাসনা অবশ্য তাঁর সামান্যই পূর্ণ হয়েছে। এই আশ্চর্য মানুষটির কবিত্বশক্তির পরিচয় পেয়ে অভিভূত হয়ে গেছেন তিনি। দেবী সরস্বতী যেন স্বয়ং বাস করেন মানুষটির ওষ্ঠাগ্রে। শুধু রমণীয় ভাষা নয়, সুললিত ছন্দ নয়, এঁর রচিত প্রতিটি পদের মাধুর্য তার হৃদয়গ্রাহী সরলতায়। প্রতিটি শব্দের উচ্চারণ, ধ্বনির মাধুর্য যেন মনের অন্তস্তল ছুঁয়ে যায়।
কিন্তু কী তাঁর পরিচয়, তাঁর দেশ কোথায়, তিনি কোন জাতির লোক, কে তাঁর পিতা-মাতা এ বিষয়ে তিনি সম্পূর্ণ নীরব। তাঁর কিছুই মনে নেই। কে যেন সর্বগ্রাসী মহাশূন্যতা দিয়ে তাঁর স্মৃতির একটি বৃহৎ অংশ মুছে দিয়েছে।
কুটিরের বাইরে এসে মুগ্ধ হয়ে গেলেন চন্দ্রগুপ্ত। আহা, কী অনুপম শোভা। এই সুবিশাল মহত্বের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর মনে এক অনির্বচনীয় ভাব জেগে উঠল। তিনি পূর্বাস্য হয়ে প্রণাম করলেন, ওঁ দিবাকুসুম শঙ্কাশং, কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিম…
কিন্তু কুমারের মন্ত্রোচ্চারণ সম্পূর্ণ হল না। একটু পরেই ক্ষুদ্র কুটিরের সামনে মহা কোলাহল উপস্থিত হল। কুমার তাকিয়ে দেখলেন গ্রামের কিছু বাসিন্দা একটি অদ্ভুতদর্শন বামনকে ধরে এদিকেই আসছে।
চন্দ্রগুপ্ত প্রশ্ন করলেন, ‘কী ব্যাপার, এত কোলাহল কীসের?’
একজন গ্রামবাসী এগিয়ে এসে প্রণাম জানিয়ে বলল, ‘প্রণাম প্রভু। আমি সুনন্দ, এই গ্রামের নরসুন্দর। কয়েকদিন পূর্বেই আপনি আমার কুটিরে পদার্পণ করেছিলেন, একটি শস্ত্রীর চিত্র নিয়ে, মনে পড়ে?’
চন্দ্রগুপ্ত মাথা নাড়লেন। মনে পড়ে বৈ কি।
দ্বিতীয়জন এগিয়ে এসে প্রণাম জানাল, ‘প্রভু, অধমের নাম হারীত। আমি এই গ্রামের লৌহকার।
গতকাল রাত্রির সময় আমি ও সুনন্দ আমার কুটিরের বাইরে বসে বিবিধ বিষয়ে আলাপ আলোচনা করছিলাম। তখন এই বামন এসে প্রশ্ন করে আমি তার পছন্দের আকৃতির একটি শস্ত্রী প্রস্তুত করে দিতে পারি কিনা। তার জন্য সে আমাদের ইচ্ছেমতো অর্থ প্রদান করতে সক্ষম।
আমি সমর্থন জানাতেই সে একটি চিত্র দেখায় আমাদের। আর সুনন্দ দেখে সেই শস্ত্রীর আকৃতি আপনার প্রদর্শিত শস্ত্রীর আকারের একেবারে অবিকল প্রতিকৃতি! তৎক্ষণাৎ আমরা একে কৌশলে ও বলপ্রয়োগ করে স্ববশে আনি। তারপর আপনার কাছে এনেছি। এবার আপনার যা ইচ্ছা বিধান হয় করুন।’
চন্দ্রগুপ্ত সেই বালককে পরিপূর্ণভাবে নিরীক্ষণ করলেন। তারপর তাঁর হনুদেশ কঠোর হয়ে উঠল।
একে অতি উত্তমরূপে চিনেছেন তিনি। এর কথাই রুদ্রদেব উল্লেখ করেছিলেন তাঁর পত্রে।
চন্দ্রগুপ্ত বামনের মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন। তারপর শান্তস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘রুদ্রসিংকে কোন গোপন সংবাদ দিতে গিয়েছিলিস?’
প্রশ্নটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে বামনের শরীর একবার শক্ত হয়েই পুনরায় স্বাভাবিক হল। তার মুখে একটি অমলিন হাসি। যেন সে চন্দ্রগুপ্তর বক্তব্যের কিছুই বুঝতে পারছে না।
চন্দ্রগুপ্ত সজোরে একটি চপেটাঘাত করলেন। বামন মাটিতে ছিটকে পড়েই একটি দুর্বোধ্য আঁ আঁ স্বরে চিৎকার করে উঠল।
হারীত উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল, ‘এ অভিনয় করছে প্রভু। এ কথা বলতে পারে। আমি স্পষ্ট শুনেছি।’
চন্দ্রগুপ্ত ধীরেসুস্থে বামনের চুলের মুঠি ধরে দাঁড় করালেন। তারপর শান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘আবার প্রশ্ন করছি, কার কাছে কোন গোপন সংবাদ নিয়ে যাচ্ছিলিস তুই?’
বামনটি স্থির চোখে চন্দ্রগুপ্তর দিকে তাকালো। চন্দ্রগুপ্ত দেখলেন সেই চোখে আর যাই থাকুক, ভয় নেই।
চন্দ্রগুপ্ত আবার প্রশ্ন করতে যাবেন, এমন সময় কে যেন তাঁর পিছন থেকে আর্তনাদ করে উঠল, ‘কে ও! আবার এসেছে? আবার এসেছে কেন ও?’
চন্দ্রগুপ্ত দ্রুত ফিরে তাকালেন। দেখলেন কুটিরের প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে আছেন সেই কবি। তাঁর দৃষ্টি বিস্ফারিত। দু’চোখে ভয়। সর্বাঙ্গ থরথর করে কাঁপছে। ধীরে ধীরে কম্পিত হাতখানি তুলে সেই বামনকে নির্দেশ করে বললেন, ‘ও কেন এসেছে এখানে? আবার কাকে মারবে ও? কার ঘর ধ্বংস করবে?’
বলতে বলতেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন তিনি।
.
এমন উত্তেজক দ্বিপ্রহর বোধহয় আগে কখনও আসেনি এই পার্বত্য জনপদের জীবনে। সমস্ত গ্রাম ভেঙে পড়েছে প্রধানের কুটির প্রাঙ্গণে। প্রাঙ্গণের মধ্যস্থলে একটি বৃহৎ প্রস্তরের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে বামনকে। কুটিরের মধ্যে এক কোণে শুশ্রূষা চলছে কবির। কালি তাঁর মাথাটি নিজের কোলে নিয়ে মাথায় অতি স্নেহে শীতল জলের পট্টি লেপন করে মৃদুমন্দ বীজন করছেন। চন্দ্রগুপ্ত কিছু প্রাথমিক চিকিৎসা প্রয়োগ করেছেন কবির শারীরিক অবস্থা সুস্থির করতে, এ তাঁর সামরিক শিক্ষার অন্তর্গত। প্রধান গেছেন পাশের গ্রাম থেকে স্থানীয় বৈদ্যকে ডেকে আনতে।
কালির কোলে শায়িত কবিকে দেখে নিজের অজান্তেই শরীর শক্ত হয়ে যাচ্ছিল চন্দ্রগুপ্তর। এই পৃথিবীর বুকে আর কত অমানুষিক নৃশংস অত্যাচার নামিয়ে আনবে রুদ্রসিংহ আর তার পোষা শ্বাপদের দল?
বামনকে দেখা মাত্র অজ্ঞান হয়ে গেছিলেন কবি। তাঁকে দ্রুত কুটিরের মধ্যে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রাথমিক শুশ্রূষা করেন চন্দ্রগুপ্তই। কিছুক্ষণ পরেই তাতে সাড়া দেন তিনি। আর অস্ফুটে বিবৃত করতে থাকেন এক নৃশংস নরসংহারের কথা।
