মহাদেবী – ৭
এখন তাঁরা যেখানে আছেন সেই পথ ধরে উত্তর দিকে চার থেকে পাঁচ দিনের পথ গেলে কশ্যপমীরের উপত্যকা, ঋষি কশ্যপের পুণ্যভূমি। হিমালয়ের কোলে এ যেন একটুকরো স্বর্গ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ও শোভায় এক অনুপম দেবভূমি। সহজ সরল জীবন ছিল তাঁদের, পাহাড়ি ঝরনার মতো উচ্ছ্বল, উপত্যকার মতো গভীর, পর্বতচূড়ার মতো শুভ্র ও গরীয়ান।
সেখানে কয়েক দশক আগে থেকে এক বিজাতীয় জাতি এসে বসবাস শুরু করে। তারা গান্ধার ও পারস্য অঞ্চলের মানুষ, নিজেদের পরিচয় দিয়েছিল শক বলে। তাতে অবশ্য কশ্যপমীরের বাসিন্দাদের আপত্তি ছিল না। তারা শান্ত এবং বন্ধুত্বপূর্ণ মানুষ। তারা এই বিজাতীয়দের সহজভাবেই গ্রহণ করেছিল।
ধীরে ধীরে শকদের সংখ্যা বাড়তে লাগল। তাদের আচার বিচার ভাষা পূজা উপাসনা সবই পৃথক। মূল অধিবাসীরা শঙ্কিত হলেন। সংস্কৃতির বিরোধ বড় বিরোধ, আচারের প্রভেদ বড় প্রভেদ। শকদের সঙ্গে কশ্যপমীরের আদি বাসিন্দাদের বিরোধ শুরু হল।
সভ্য সমাজে সব বিরোধেরই সুস্থ নিষ্পত্তি হয়, সব প্রভেদই একদিন অস্বচ্ছ দেখায়। কিন্তু অসভ্য শকদের উদ্দেশ্য ছিল অন্য। তাদের রক্তে শুধু একটিই অনুচ্চারিত আদেশ চলে ফিরে বেড়ায়—ছলে বলে কৌশলে অন্যজাতির ভূমি সম্পদ এবং নারী অধিগত করা। তারা বিশ্বাস করত এই ভূমিতে শুধু ওদের অধিকার, ওদের দেবতার অধিকার, ওদের সম্রাটের অধিকার।
তাই যে আশ্বিন পূর্ণিমার রাতে শকসম্রাট রুদ্রসিংহের প্রেরিত ঘাতকবাহিনী লোলুপ শ্বাপদের হিংস্রতায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিল কশ্যপমীরের আদি অধিবাসীদের উপর, সেই রাতে তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল স্থানীয় শক বাসিন্দারাও। এতদিন ধরে যারা সভ্য সুন্দর প্রতিবেশী হওয়ার অভিনয় করছিল, সেই রাতে তারাই পথ দেখিয়ে এনেছিল স্বজাতির হিংস্র তরক্ষুদের।
কবি শুয়েছিল তার প্রেয়সীর পাশে। শিশুটিও ছিল। তাদের মনে হয়তো কোনও আশঙ্কা ছিল না। হয়তো তারা আস্থা রেখেছিল শ্রীবিষ্ণুর পাদপদ্মে। ঈশ্বরের কাছে সুনিবিড় প্রার্থনায় সমপর্ণ করেছিল নিজের সুখ, শান্তি ও নিশ্চিন্ত ভবিষ্যৎ।
তাই যখন হিংস্র লোলুপ শকবাহিনী ঘিরে ধরল তাদের, অবিশ্বাস আতঙ্ক আর ভয় হতবুদ্ধি করেছিল তাদের।
তার প্রেয়সীকে তারই সামনে গণধর্ষণ করছিল ওরা। আর তাকে বাধ্য করছিল সেই দৃশ্য দেখতে। তার সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেন অসাড় হয়ে গেছিল। মাথার ভেতর জেগে উঠছিল এক অলীক শূন্যতা। তার বড় আদরের, বড় প্রেমের বিবাহিতা স্ত্রী ধর্ষিতা হতে হতে জন্তুর মতো আর্তনাদ করছিল। আর তার প্রতি আর্তনাদের সঙ্গে অশ্লীল শব্দ করে হেসে উঠছিল ওই পাশব নারকীর দল, যেন কতই না আনন্দ হচ্ছে ওদের।
সে ধর্ষিতা হতে হতেও অনেকক্ষণ চেয়েছিল ওর দিকে। ভেবেছিল এই হয়তো কোনও অলৌকিক শক্তি ভর করবে তার প্রেমিক স্বামীর মধ্যে। আকাশ থেকে বজ্রপাত হবে, শ্রীবিষ্ণু স্বয়ং নৃসিংহবতার বেশে প্রকট হবেন শ্রীমার্তণ্ডমন্দির থেকে। বিনাশ করবেন এই নারকী অসুরদের।
না। তার কিছুই হয়নি।
সেই আশ্বিন পূর্ণিমার রাতে ক্রমাগত গণধর্ষণের পর কবির চোখের সামনে ফেলে দেওয়া হয় তার প্রেয়সীর মৃতদেহ৷ সঙ্গে হিংস্র উল্লাসের শৃগালধ্বনি। আর তার পরেই মৃতা স্ত্রীর শরীরের ওপর টেনে এনে ফেলা হয় তাদের একমাত্র সন্তানকে।
অশক্ত, অসহায়, উন্মাদপ্রায় মানুষটা দেখছিল তার মৃতা স্ত্রীর দেহের ওপর পড়ে আছে তাদের একমাত্র সন্তান—তাদের সাত রাজার ধন, এক মাণিক। আর সেই অপাপবিদ্ধ শিশুর ওপর ঝুঁকে এসেছে এক অদ্ভুতদর্শন বামন। তার চোখে হিংস্র রক্তলোলুপ জিঘাংসা, আর মুখে নির্মল স্নিগ্ধ হাসি।
সেই বামন যখন তার হাতে তুলে নেয় এক বিচিত্রদর্শন শস্ত্রী, তখনও তার মুখ থেকে হাসিটি মিলিয়ে যায়নি। এমনকী যখন তার বিচিত্রদর্শন শস্ত্রীটি ধীরে ধীরে, কবির চোখের সামনে নিষ্পাপ অপাপবিদ্ধ শিশুটির কণ্ঠনালী ছেদ করে, তখনও নয়।
তার পর থেকেই কবির সামনে তার সমস্ত পৃথিবী অন্ধকার হয়ে যায়।
.
কুটিরের সামনে পুনরায় আবির্ভূত হলেন চন্দ্রগুপ্ত৷ তাঁর মুখমণ্ডল অভিব্যক্তিহীন। হনু কঠিন এবং শরীরের সমস্ত পেশী শক্ত।
তিনি বামনের কাছে এসে তাকে পরিপূর্ণভাবে নিরীক্ষণ করলেন। তারপর অনুচ্চস্বরে আদেশ করলেন, ‘সুনন্দ, এই বামনের মস্তক মুণ্ডন করো।’
এইবার চন্দ্রগুপ্তর দিকে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকাল সেই খর্বাকার জীবটি৷ তার মুখ থেকে খসে গেছে নিষ্পাপ মুখাবরণ। পরিবর্তে তার চোখ থেকে ঝরে পড়ছে জিঘাংসা আর ঘৃণার বিষদৃষ্টি। তার ওষ্ঠপ্রান্তে দুর্বোধ্য হাসি, শরীরী ভাষায় অবজ্ঞা আর ঔদ্ধত্য। হিসহিস করে সে বলে উঠল, ‘সাবধান হও চন্দ্রগুপ্ত! যদি চাও, এখনও প্রাণ নিয়ে পালাতে পারো। না হলে প্রভু পরমেশ্বর রুদ্রসিংহ কিন্তু তোমারও ওই অবস্থা করবেন যা আমরা ওই কবির করেছিলাম। তুমি তাই চাও? তুমি তোমার প্রেয়সী ধ্রুবাকে সর্বসমক্ষে লাঞ্ছিতা হতে দেখতে চাও? এখনও সময় আছে, প্রভুর শরণে এসো। প্রভু পরম দয়ালু, পরম কৃপাবান। তিনি চাইলেই তোমার জীবন দান করতে পারেন।’
চন্দ্রগুপ্ত কিছু বললেন না। কেবল তরবারিটি কোষমুক্ত করে নিষ্পৃহস্বরে বললেন, ‘সুনন্দ…’
সুনন্দ প্রস্তুত ছিল। সে বামনের মাথায় একঘটি জল ঢেলে মস্তক মুণ্ডন করা শুরু করল।
.
কুমার চন্দ্রগুপ্তর সমস্ত শরীর ফুলে উঠেছে ক্রুদ্ধ কেশরীর মতো। চোখদুখানির প্রান্ত ঈষৎ রক্তবর্ণ, হনু সুকঠিন। তাঁর হস্তধৃত উন্মুক্ত তরবারির অগ্রভাগে ঝলসে উঠছে দীপ্ত সূর্যরশ্মি।
চন্দ্রগুপ্তর জানুদেশের সামনে একটি আনতশির মুণ্ডিত মস্তক। স্বাভাবিকের চাইতে ঈষৎ বৃহৎ সেই মস্তকটিতে অতি ক্ষুদ্রাকারে বহুতর বিচিত্র লিপি অঙ্কিত।
গ্রামবাসীরা স্তম্ভিত। চন্দ্রগুপ্তর সঙ্গে আসা বিশ্বস্ত প্রহরীরা বেষ্টন করে রেখেছে সমগ্র কুটিরপ্রাঙ্গণ। এমন স্তব্ধ সঃশঙ্ক প্রহর বোধকরি এই গ্রামের ইতিহাসে পূর্বে কখনও আসেনি।
একটু পরেই কালি নেমে এলেন সেই প্রাঙ্গণে। বোধহয় এই অস্বাভাবিক নৈঃশব্দ্য শঙ্কিত করেছিল তাঁকে। তিনি এসে সমগ্র পরিস্থিতি দেখল্রন। তারপর সেই বামনের মুণ্ডিত মস্তকখানি নিরীক্ষণ করে বিস্মিতস্বরে বললেন, ‘এসব কী সম্রাট?’
চন্দ্রগুপ্ত কঠিনস্বরে বললেন, ‘এ একটি সাংকেতিক বার্তা কালি, একটি বিশিষ্ট সঙ্কেতলিপিতে লিখিত। এবং এই সঙ্কেতলিপি আমার বড় চেনা। পাটলিপুত্রর সমস্ত অতি উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী এবং রাজন্যবর্গকে এই সঙ্কেতলিপির প্রয়োগবিধি অধ্যয়ন করতে হয়। এই শিক্ষায় সুশিক্ষিত না হলে সম্রাটের ঘনিষ্ঠ শাসনবৃত্তে স্থান মেলে না।
‘গুপ্তসাম্রাজ্যের ঘনিষ্ঠ এক রাজসভাসদ এই উপায়ে বার্তাটি পাঠিয়েছিলেন সুহৃদ রুদ্রসিংহের কাছে। শুধু সেই সুহৃদ স্বপ্নেও ভাবতেও পারেননি যে তাঁর এই খর্বাকৃতি গূঢ়দূতটি কেবলমাত্র পছন্দের শস্ত্রীর লোভে এই গ্রামে এসে আমার হাতে ধৃত হবে।’
কালি আরও বিস্মিত হলেন, ‘সাঙ্কেতিক বার্তা? কী লেখা আছে এই বার্তায়?’
কুমার চন্দ্রগুপ্তর ওষ্ঠপ্রান্ত সামান্য ব্যঙ্গকুঞ্চিত হল। তিনি বললেন, ‘এখানে লেখা আছে কী করে সম্রাট রামগুপ্তকে এই পার্বত্যদেশে সপরিবার-সপার্ষদ বন্দী করতে হবে। এবং তারপরেই কীভাবে গুপ্তরাজলক্ষ্মীসহ সমগ্র গুপ্তসাম্রাজ্য রুদ্রসিংহের পদানত হবে।’
কালির মুখখানি কঠিন হল। তিনি বামনের উদ্দেশে প্রশ্ন করলেন, ‘কী রে বামন, সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত যা বলছেন সব সত্যি?’
মুখ তুলল সেই বামন। খানিক তাকাল চন্দ্রগুপ্তর দিকে। তারপর তার দৃষ্টি পড়ল কালির উপর। কালিকে দেখামাত্র তার চোখে ফুটে উঠল জিঘাংসু লোলুপ দৃষ্টি। স্খলিত কামুক স্বরে সে বলে উঠল, ‘আহা, এ কোন কামিনী? যেমন রমণীয় শরীর, তেমন অনিন্দ্যসুন্দর মুখচন্দ্রিমা। একবার আমার সঙ্গে চল রে মেয়ে। মহারাজ রুদ্রসিংহ এই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষ। তিনি পরম করুণাময়, পরম দয়ালু। তাঁকে পতিত্বে বরণ করে সুখী হবি রে মেয়ে, মহারাজ তোকে সোনা-রূপায় ভরিয়ে দেবেন…’
কালি অকস্মাৎ চন্দ্রগুপ্তর হাত থেকে তরবারিটি ছিনিয়ে নিলেন। তারপর মুহূর্তের মধ্যে একটি মসৃণ আঘাতে বামনের মুণ্ডখানি তার স্কন্ধচ্যুত করে বললেন, ‘এ জন্মে তো নয়ই, জন্মজন্মান্তরেও তোর প্রভুর স্বপ্ন পূরণ হবে না রে ক্লীব।’
ঘটনার আকস্মিকতায় প্রত্যেকে স্তম্ভিত, হতচকিত হয়ে গেলেন। কর্তিত মুণ্ডটি গড়িয়ে গড়িয়ে এসে থেমে গেল কুমার চন্দ্রগুপ্তর পায়ের কাছে। আর স্পন্দিত হতে থাকা দেহকাণ্ডটি থেকে রক্তের স্রোত পিচকিরির মতো ছিটকে এসে ভিজিয়ে দিল কুটিরপ্রাঙ্গণ।
তবে সব কিছু ছাপিয়ে ভেসে এল গ্রামপ্রধানের আতঙ্কিত আর্তনাদ, ‘ওরে নির্বোধ মেয়ে, এ কী করলি তুই! স্বয়ং কুমারের তরবারি দিয়ে…’
কুণ্ঠিতা কালি রক্তস্নাত তরবারিটি দুহাতে তুলে ধরে চন্দ্রগুপ্তর হাতে সমর্পণ করলেন। অনুনয়ের সুরে বললেন, ‘মার্জনা করবেন সম্রাট। অধীনার ক্রোধ বড় তীব্র। সাময়িক উন্মত্ততার বশে এই কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছি।’
কুমার চন্দ্রগুপ্ত তরবারিটি কোষবদ্ধ করে বললেন, ‘আপনি কোনও অপরাধ করেননি মা। এই মুণ্ডচ্ছেদ অবশ্যম্ভাবী ছিল। কেবল আমার পরিবর্তে আপনার হাতে হয়েছে, এই যা। আর ঈশ্বর যদি ইচ্ছা করেন, আমি আপনার মতো তেজস্বী নারীর পিতা হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করতে চাই।’
কালি অবনতমস্তকে কুমার চন্দ্রগুপ্তকে প্রণাম করলেন।
.
সেইদিন দ্বিপ্রহরের মধ্যেই প্রস্তুত হল কুমার চন্দ্রগুপ্তর ক্ষুদ্রবাহিনীটি। যত শীঘ্র সম্ভব তাদের ফিরে যেতে হবে সম্রাট রামগুপ্তর বিজয়শোভাযাত্রার প্রতি। ফিরে যেতে হবে আসন্ন সর্বনাশের আশঙ্কা নির্মূল করতে।
তবে তাদের সঙ্গে এইবার একজন সদস্য বেশি।
সেই কবিকে সঙ্গে নিয়েছেন চন্দ্রগুপ্ত। এই অসামান্য প্রতিভাকে উপযুক্ত সম্মান দিয়ে পাটলিপুত্রের রাজসভায় প্রতিষ্ঠিত করবেন তিনি। গ্রামপ্রধান এবং কালিকে কথা দিয়েছেন তিনি।
যাত্রা শুরুর ঠিক আগের মুহূর্তে তিনি কালিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘হয়তো কয়েকদিনের মধ্যেই আমার এক অনুজ ভ্রাতা এখানে আসবেন কালি। তাঁর নাম কুমার কচগুপ্ত। তিনি আমার পরম অনুগত। তাঁকে আপনি সর্বান্তকরণে সাহায্য করবেন, এই প্রার্থনা করি।’
কালি সম্মতির ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন। তারপর বিষণ্ণ হেসে কবির দিকে তর্জনী তুলে বললেন, ‘ওঁকে আপনার হাতে দিলাম সম্রাট। দেখবেন, উনি যেন ওঁর প্রতিভার যোগ্য সম্মান পান।’
চন্দ্রগুপ্তর ইচ্ছা হল অশ্ব হতে অবতরণ করে একবার এই অসামান্যা নারীকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। একই শরীরে এত কোমল প্রেম আর এত তেজোদৃপ্ত কাঠিন্য, এ শুধু নারীরাই পারে।
তিনি সস্নেহ হেসে বললেন, ‘চিন্তা করবেন না মা। আমি মহারাজাধিরাজ সম্রাট সমুদ্রগুপ্তর সন্তান চন্দ্রগুপ্ত, আমি প্রতিজ্ঞা করছি যে ইনি অবশ্যই এঁর প্রতিভার উপযুক্ত যশের অধিকারী হবেন। আর আপনার এতদিনের স্নেহপ্রেমচ্ছায়ার দাস হয়ে ছিলেন ইনি, তাই আমি আজ থেকে এঁর নামকরণ করলাম, কালিদাস। মহাকবি কালিদাস।’
উপত্যকার পথ ধরে অশ্বারোহীবাহিনী দ্রুত নেমে গেল সম্রাট রামগুপ্তর বিজয়শোভাযাত্রার উদ্দেশে। আর অনেক উপরে, পাহাড়ি পথের বাঁকে দাঁড়িয়ে সেই অপসৃয়মান বাহিনীর দিকে তাকিয়ে রইলেন এক শ্যামাঙ্গী নারী। তাঁর গণ্ডদেশ বেয়ে নেমে আসে জলের ধারা।
কে বলে দেবীরা কাঁদে না?
.
কয়েকদিন পরের কথা। রামগুপ্তর আদেশে শিবির সরে এসেছে কয়েক ক্রোশ উত্তরে, এক সঙ্কীর্ণ উপত্যকার মধ্যে। এতদঞ্চলের যাবতীয় জনপদের মতো এই উপত্যকাটিও অতীব সুরম্য। কোমল ও মসৃণ হরিৎবর্ণ তৃণে সমগ্র ভূমিটি আচ্ছাদিত। তার মধ্যে মাথা তুলে আছে ছোট ছোট উজ্জ্বল ফুলেদের দল। আর এই নয়নাভিরাম ভূমিটির চারিধারে অনুচ্চ পর্বতশ্রেণী। তাদের ওপরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে হিমালয়ের গরীয়ান তুষারশৃঙ্গগুলি। ঘনকৃষ্ণ রাত্রিতে যখন পূর্নিমার চন্দ্রালোক চারিদিকে এক অপার্থিব মায়াজ্যোৎস্নার অঞ্চল বিছিয়ে দেয়, তখন এই ক্ষুদ্র ভূমিখণ্ডকে সত্যই দেবতাদের রম্যভূমি বলে ভ্রম হতে থাকে।
এই উপত্যকায় প্রবেশ এবং নির্গমনের পথ একটিই। উপত্যকার অন্তিমদেশে একটি সরু গিরিখাত। চারিদিক বেষ্টন করে থাকা পর্বতশ্রেণি ওইখানে এসে উপত্যকার ভূমির সঙ্গে মিলিত হয়েছে। সভ্য সমাজের সঙ্গে যোগাযোগের পথ বা উপায় একটিই, ওই সঙ্কীর্ণ গিরিপথটি।
সম্রাট রামগুপ্তকে এই দেবভোগ্য ভূমির সন্ধান দিয়েছিল কয়েকদিন আগে তাঁর মনোরঞ্জন করে যাওয়া কিন্নরীটি। তাই তাঁরই ইচ্ছায় এখানে শিবির স্থাপন। সেই মোহময়ী নারী তাঁকে বলে গেছে এর আশেপাশেই তাদের বসতি। মহারাজ এখানে শিবিরস্থাপনা করলে সে নিত্যই উপস্থিত থাকতে পারবে মহারাজের সেবায়।
এখানে আসার পর প্রথম দুদিন উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটেনি। তৃতীয়দিন সন্ধেবেলায় রামগুপ্ত আদেশ দিলেন উন্মুক্ত আকাশের নিচে, আগুন জ্বালিয়ে আমোদ-উল্লাসের আয়োজন করতে। সঙ্গে যেন অতীব উৎকৃষ্ট মাধ্বী, পৈষ্টী, উত্তমরূপে শূলপক্ব মৃগমাংসের আয়োজন থাকে।
সূর্যস্বামী ইতস্ততভাবে প্রশ্ন করলেন, ‘আর নৃত্যগীতের কী ব্যবস্থা করব প্রভু?’
‘সে ভাবনা তোমাকে ভাবতে হবে না সেনাপতি।’ মুখের হাসিটি বিস্তৃত হল সম্রাটের, ‘কেন আগুন জ্বালাতে বলেছি জানো? সে বলে গেছে, এই আগুন দেখলে তারা নিজেরাই নাচতে নাচতে চলে আসবে, বুঝলে হে। আর আজ নাকি দুজন নয়, কমপক্ষে দশজন সুন্দরী আসছে আমাদের চিত্তবিনোদনের জন্য। হে হে হে। তুমি বরং দেখো মৃগমাংসটি ঠিক করে শূলপক্ব করা হচ্ছে কি না।’
এই বলে রামগুপ্ত তৃতীয় পাত্রটিতে চুমুক দিতে যাবেন, এমন সময় ঝড়ের মতো সেখানে প্রবেশ করলেন চন্দ্রগুপ্ত। তাঁর সর্বাঙ্গ ধূলিধূসরিত। এই প্রবল শৈত্যের মধ্যেও দরদর করে ঘামছেন তিনি। চোখমুখ অতিশয় উত্তেজিত। তিনি এসেই উচ্চৈস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘কে সেই মূর্খ, কার আদেশে শিবির সরিয়ে আনা হয়েছে এখানে?’
রামগুপ্ত প্রথমে সামান্য বিস্মিত হয়েছিলেন। কুমার সচরাচর তাঁর সামনে এমন ব্যবহার করেন না। তিনি ধমকে উঠলেন, ‘কাকে মূর্খ বলছ কুমার? নিজের ভাষা সংযত করো। আমি, আমিই বলেছি এখানে শিবিরস্থাপন করতে। কেন, তোমার আপত্তি আছে?’
রামগুপ্তর দিকে কিছুক্ষণ স্থির চোখে চেয়ে রইলেন কুমার চন্দ্রগুপ্ত। বোধকরি উদ্গত ক্রোধকে অতি কষ্টে সংবরণ করলেন। তারপর চেষ্টাকৃত শ্রদ্ধার সঙ্গে বললেন, ‘মহারাজ, আপনি কি স্বেচ্ছায়, সব কিছু অবগত হয়ে এখানে শিবির সরিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছেন?’
ভ্রুকুঞ্চন করে সম্রাট বললেন, ‘কেন, তাতে কোন মহাভারত অশুদ্ধ হয়েছে শুনি?’
‘আপনি কি জানেন আমরা কোথায় আছি?’
‘কুমার, তুমি কি সিংহাসনের অধিকার হারিয়ে হতাশায় অন্ধ হয়েছ? দেখছ না কী সুরম্য পর্বতশ্রেণীর মধ্যে…’
‘ধৃষ্টতা মার্জনা করবেন সম্রাট,’ সম্রাটের কথার মধ্যেই কথা বলে উঠলেন চন্দ্রগুপ্ত, ‘আমি না নয় হতাশায় অন্ধ, কিন্তু আপনার অমাত্যরা তো চক্ষুষ্মান। আপনার সেনাপতি তো দিব্যচক্ষুর অধিকারী। তাঁরা আপনাকে জানাননি যে এখান থেকে মাত্র দশ ক্রোশ দূরে ভীমনগর দুর্গ, আর শকাধিপতি রুদ্রসিংহ এখন সেখানে সসৈন্যে অবস্থান করছেন?
সভার মধ্যে যেন বজ্রপাত হল। সবাই চন্দ্রগুপ্তর দিকে স্তম্ভিত চোখে চেয়ে রইলেন। শিখরস্বামী বলে উঠলেন, ‘কী বলছেন কী কুমার?’
‘আমি ঠিকই বলছি মহামন্ত্রী। বিশ্বস্ত সূত্রে সংবাদ পেয়েছি রুদ্রসিংহের কাছে আমাদের এই পার্বত্যপ্রদেশে শিবিরস্থাপনার সংবাদ পৌঁছেছে। তারপরেই সে শুরু করেছেন তার চক্রান্তের জাল বোনা। সে জানে সম্মুখসমরে অজেয় গুপ্তসেনানীদের পরাভূত করা অসম্ভব। তাই সে কাপুরুষের মতো এই পন্থা বেছে নিয়েছে।’
বলেই তিনি মহামাত্য শিখরস্বামীর দিকে ফিরলেন, ‘আমি সূর্যস্বামীকে বলেছিলাম শকরাজের গতিবিধির ওপর লক্ষ্য রাখার জন্য গূঢ়পুরুষদের নিয়োগ করতে। তার কী হল?’
সূর্যস্বামী বিহ্বল চোখে এদিক-ওদিক তাকালেন। তাঁর কোমল গণ্ডদেশ ইতিমধ্যেই লজ্জায় রক্তিম। পরিবর্তে তাঁর পিতা উত্তর দিলেন, ‘সূর্য কোনও গুপ্তচর পাঠায়নি যুব…কুমার চন্দ্রগুপ্ত!’
‘কেন? আমার আদেশ অমান্য করার স্পর্ধা হল কী করে সূর্যস্বামীর?’ গর্জে উঠলেন চন্দ্রগুপ্ত। রাজসভাসদরা সামান্য কেঁপে উঠলেন সেই গর্জনে।
‘কারণ আমাদের শ্রেষ্ঠ গুপ্তচরেরা এখন মালবদেশে নিয়োজিত, কুমার।’ মাথা নীচু করে উত্তর দিলেন শিখরস্বামী।
দাঁতে দাঁত ঘষলেন চন্দ্রগুপ্ত, ‘উত্তম, অতি উত্তম। আমাদের শ্রেষ্ঠ গুপ্তচরেরা এখন পট্টমহিষীর পিতৃভূমিতে, তাঁরই পিতার গতিবিধির লক্ষ্য রাখার কাজে নিয়োজিত। তার কারণ আপনারা মনে করেন যে কন্যার সংবাদ পেয়ে উদ্বিগ্ন মালবরাজ পাটলিপুত্র আক্রমণ করতে পারেন। তাই তো?’
সভাস্থল নিস্তব্ধ।
ক্রুদ্ধ চন্দ্রগুপ্ত ভীমনাদে চিৎকার করে উঠলেন, ‘আপনাদের কোনও ধারণা আছে আপনাদের এই অবিমৃশ্যকারিতার কী চরম দণ্ড দিতে হতে পারে আমাদের? সূর্যস্বামীর এই অপরিসীম মূর্খতা আমাদের কোন ঘোর বিপদের সামনে এনে ফেলেছে?
রামগুপ্ত বিরক্ত এবং ঈষৎ স্খলিতস্বরে বললেন, ‘তুমি নিজের অধিকারের সীমা লঙ্ঘন কোরো না কুমার। কে রুদ্রসিংহ? কত ক্ষমতা ধরে সে? আমাদের সঙ্গে এই যে সুবিশাল এবং সুশিক্ষিত সৈন্যদল রয়েছে তার সামনে এই রুদ্রসিংহ আর তার সৈন্যদল এমন কী? তাদের মূষিকের মতো পিষ্ট করতে কত সময় লাগবে? আর এই সৈন্যদল চালনার জন্য সূর্যস্বামী আছে। সর্বোপরি আমি রয়েছি। তুমি কি আমার বীরত্বে সন্দেহ প্রকাশ করছ কুমার?’
‘না মহারাজ। আপনার বীরত্বে সন্দেহ করার ধৃষ্টতা আমার নেই। কিন্তু চারিদিকে চেয়ে দেখুন। আমরা এমন একটি উপত্যকার মধ্যে রয়েছি যার চারিপাশে পর্বতশিখর। সেখান হতে আমাদের লক্ষ্য করা অত্যন্ত সহজ। আপনি নিজে পাটলিপুত্রের শ্রেষ্ঠতর যুদ্ধবেত্তাদের মধ্যে একজন। আপনি জানেন রণাঙ্গনে উচ্চভূমিতে অবস্থানের কৌশলগত সুবিধাগুলি কী কী।
‘তার ওপর দেখুন, এইখান থেকে নির্গত হওয়ার একটিই পথ, ওই সঙ্কীর্ণ গিরিখাতটি। রুদ্রসিংহ যদি কোনওক্রমে ওই গিরিখাত বন্ধ করতে পারে, তাহলে সে নয়, আমরাই মূষিকের মতো এখানে পিষ্ট হব মহারাজ।’
প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যদের মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল। চন্দ্রগুপ্ত ক্রুদ্ধ সিংহের মতো পায়চারি করতে লাগলেন। ভীত এবং উৎকণ্ঠিত অমাত্যবর্গ নিশ্চুপ হয়ে বসে রইলেন। কারও মুখে কোনও কথা জোগালো না।
কিছু পর তিনি বললেন, ‘আজ এখানে আগুন জ্বালিয়ে আনন্দ উৎসবের আয়োজন কেন করা হচ্ছিল জানতে পারি?’
শিখরস্বামী যতটা সম্ভব ততটা সংক্ষিপ্ত করে সেই নৃত্যগীতপটু যুগলের কথা বললেন। ‘তাদের নৃত্যপরিবেশনা এবং সঙ্গীতপারদর্শিতায় আমরা অত্যন্ত মুগ্ধ হয়েছিলাম কুমার। তারাই আমাদের এখানে আসতে আমন্ত্রণ জানায়।’
শোনামাত্র আরও উত্তেজিত হয়ে উঠলেন কুমার চন্দ্রগুপ্ত, ‘সর্বনাশ, তারা অবশ্যই রুদ্রসিংহের প্রেরিত গুপ্তচর। আর আমরা নিতান্ত মূর্খের মতো তাদের ফাঁদে পা দিয়ে, তাদের আমন্ত্রণে এই মৃত্যুপুরীতে শিবিরস্থাপন করে, আগুন জ্বালিয়ে আমাদের আগমনসংবাদ আমরাই জানিয়েছি তাদের। অসাধারণ! অনবদ্য!’
সূর্যস্বামী ভীতস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘তার মানে…’
‘তার আর কোনও মানে নেই সূর্যস্বামী। খুব সম্ভবত রুদ্রসিংহের রুদ্রবাহিনী এই পথেই ধেয়ে আসছে আমাদের সমূলে বিনাশ করবে বলে। আজই সেই রাত্রি। হয়তো আর কিছুক্ষণ…কুমার কচ কোথায়?’
কুমার কচ হন্তদন্ত হয়ে উপস্থিত হলেন। তিনিও সংবাদ পেয়েছেন যে তাঁর প্রাণপ্রিয় জ্যেষ্ঠ ফিরে এসেছেন বটে, কিন্তু তিনি অত্যন্ত উত্তেজিত। কচের মনে ভাবনা দুর্ভাবনার বিচিত্র সব খেলা চলছিল।
চন্দ্রগুপ্ত প্রাণপ্রিয় এবং অনুগত অনুজটিকে বাইরে নিয়ে গেলেন। তারপর তাঁর কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, ‘শোনো কচ, আজ আমি তুমি এবং সমগ্র গুপ্তসাম্রাজ্য ঘোর বিপদের সম্মুখীন। যদি প্রতিরোধ করতে না পারি, তাহলে হয়তো আজ রাত্রির মধ্যেই পিতা পিতামহের স্থাপিত এই মহান সাম্রাজ্য সমূলে বিনষ্ট হবে। আমার আশঙ্কা, হয়তো আজ রাত্রির মধ্যেই রুদ্রসিংহের বাহিনী আমাদের আক্রমণ করবে। কিন্তু তুমি নিশ্চয়ই বুঝবে যে, এই অল্পসময়ের মধ্যে এই শিবির অন্যত্র সংস্থাপন করা সম্ভব নয়।
‘কিন্তু আমরা মহারাজ সমুদ্রগুপ্তর সন্তান। বিনা যুদ্ধে হার মেনে নেওয়া আমাদের রক্তে নেই।
‘তুমি এখনই তোমার বিশ্বস্ত যোদ্ধাদের একটি দল গঠন করে ভীমনগরের দিকে দ্রুত রওনা দাও। পথিমধ্যে একটি গ্রাম পড়বে। তার পথনির্দেশ এই পত্রে লিখে দিলাম। সেখানে পৌঁছে গ্রামপ্রধান এবং তাঁর কন্যা কালির সঙ্গে দেখা করবে। সেখানে কেউ যেন তোমাদের দেখে না ফেলে। কালি তোমাদের এক দুদিন লুকিয়ে থাকার ব্যবস্থা করে দেবে। তুমি সেখানে পৌঁছে পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য আমার বার্তার জন্য অপেক্ষা করবে, বুঝেছ? আমি আবারও বলছি, আমার সঙ্কেত ভিন্ন কোনও অবস্থাতেই ভীমনগর দুর্গের ভিতর প্রবেশ করার চেষ্টা করবে না। প্রচ্ছন্নভাবে থাকবে, আমার সঙ্কেতের অপেক্ষা করবে। আমার সঙ্কেত তো তুমি জানো।’
কচ ইতস্তত করলেন, তারপর বললেন, ‘কিন্তু কালি কী করে বুঝবেন আমি আপনার পক্ষ হতে প্রেরিত?’
চন্দ্রগুপ্ত মৃদু হাসলেন। বললেন, ‘তাঁকে শুধু বলবে, “আপনার দাস সুস্থ আছেন, ভালো আছেন। আপনার সন্তান আমাকে পাঠিয়েছেন মা।” আমি যেভাবে বললাম, ঠিক সেইভাবেই বলবে। দেখবে, ওখানে থাকতে তোমাদের কোনও অসুবিধা হবে না।’
কচ কিছু বুঝলেন না বটে, তবে তিনি কম কথার মানুষ। পথনির্দেশটি হস্তগত করে তিনি দ্রুত নিষ্ক্রান্ত হলেন।
.
চন্দ্রগুপ্তর আশঙ্কাই সত্যি হল। কুমার কচ প্রস্থানের কয়েক দণ্ডের মধ্যে, মধ্যরাত্রেই চারিপাশের পর্বতচূড়া ঘিরে এক এক করে মশালের আগুন দেখা দিল। নিকষ কালো রাত্রির বুক চিরে সেই অগ্নিপিণ্ডগুলি বয়ে নিয়ে এল এক অজানা অশনিসম্পাতের সঙ্কেত।
রামগুপ্ত বুঝলেন, গুপ্তরাজন্যবর্গ বুঝলেন, তাঁদের পরিবারবর্গ বুঝলেন রুদ্রসিংহের সেনাবাহিনী ঘিরে ফেলেছে তাঁদের। প্রতিটা তরবারি, ভল্ল এবং তিরের নিশানা তাঁদেরই দিকে। তাঁরা এখন শকাধিপতির সহজ শিকার বৈ আর কিছু নয়।
গুপ্ত সেনাবাহিনী প্রস্তরবৎ স্থির। তারা রণকুশল যোদ্ধৃজাতি। যে-কোনও যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি পড়ে নিতে তাদের মুহূর্তের বেশি সময় লাগে না। তারা জানে যে এই মুহূর্তে তাদের পক্ষ থেকে সামান্য আলোড়নও তাদের সামূহিক গণহত্যার দিকে চালিত করবে।
আর শক বাহিনীও জানে, নেহাত গণ্ডমূর্খ না হলে গুপ্তদের পক্ষ থেকে কেউ এই মুহূর্তে বিরোধিতা করার কথা স্বপ্নেও ভাববে না। কারণ উন্মুক্ত প্রান্তরে দাঁড়িয়ে, এই অনুচ্চ পর্বতশ্রেণীর শিখর হতে ধাবমান সূচীমুখ শরবর্ষণের সামসাসামনি হওয়া আর মৃত্যুকে বরণ করে নেওয়া একই ব্যাপার। সৈন্যের কাছে যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যু সম্মানের বটে, কিন্তু যুদ্ধজয় অনেক বেশি গৌরবের। সৈনিক যুদ্ধ করে শত্রুনিপাত করার জন্য, আত্মহত্যা করার জন্য নয়।
সম্রাটের শিবিরের মধ্যে প্রবল বাদানুবাদ চলছিল। যাঁরা যুদ্ধজীবী নন, তাঁরা প্রবলভাবে যুদ্ধের পক্ষে। যাঁরা জন্মেছেন এক হাতে কুঠার অন্য হাতে তরবারি নিয়ে, তাঁর কূটনীতির কথা তুলছেন।
সূর্যস্বামী অপদার্থ হলে কী হবে, রণনীতির প্রাথমিক জ্ঞানটুক অন্তত রাখেন। তিনি তিক্তস্বরে বললেন, ‘যে বিষয় জানেন না, বোঝেন না, সেই বিষয়ে দয়া করে মতামত দিতে যাবেন না রুদ্রপাল। এই মুহূর্তে সমুচিত উত্তর দেওয়ার প্রচেষ্টা যেআত্মহত্যার সমতুল, মসীজীবী করণিক না হলে সে কথা আপনিও বুঝতেন রুদ্রপাল।’
শিখরস্বামীর কথা শুনে রুষ্ট হয়ে উঠে দাঁড়ালেন অন্তরবানিশিক, প্রদেষ্টা, পৌরব্যবহারিক এবং সন্নিধাতারা৷ সন্নিধাতা শান্তবুদ্ধি, তীব্রস্বরে বললেন, ‘আপনি যখন এতই বোঝেন সেনাপতি মহোদয়, এখানে শিবির সংস্থাপনের পূর্বে এই আসন্ন বিপদের ব্যাপারে সম্রাটকে অবহিত করেননি কেন?’
প্রদেষ্টা দিব্যধনু বয়সে যুবক। যৌবনের রক্ত সদাসর্বদাই কিঞ্চিৎ উষ্ণ হয়। তিনি তীব্রস্বরে বললেন, ‘আমাদের চতুর সেনাপতি মহোদয়ের বুদ্ধির দৌড় তো দেখাই যাচ্ছে। এই বিপদের মধ্যে আমাদের এনে ফেলার সিদ্ধান্ত কোন মসীজীবী করণিক নিয়েছিলেন জানতে পারি?’
পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে দেখে উঠে দাঁড়ালেন দনুজদমন। প্রাজ্ঞ এই মানুষটিকে প্রত্যেকে সম্মান করেন। দনুজদমন বললেন, ‘এখন নিজেদের মধ্যে বাদানুবাদের ব্যাপৃত হওয়ার সময় নয়। এই মহাবিপদ হতে কীভাবে আমরা রক্ষা পেতে পারি, সেই উপায়ে আলোচনা হোক।’
অন্তরবানিশিক বুদ্ধদাস প্রবীণ অমাত্য। তিনি বললেন, ‘আমার মনে হয় বিপক্ষের কাছে আমাদের দূত প্রেরণ করা উচিত। অনর্থক লোকক্ষয় এড়ানোই আমাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।’
চন্দ্রগুপ্ত শিবিকায় প্রবেশ করলেন, গম্ভীরস্বরে বললেন, ‘তার আর প্রয়োজন হবে না। শকাধিপতি রুদ্রসিংহ দূতের মাধ্যমে বার্তা পাঠিয়েছেন। শকদূত শিবিকার বাইরে অপেক্ষা করছে।’
মহারাজ দূতকে ভিতরে আসতে বলার ইঙ্গিত করছিলেন বটে৷ কিন্তু তার আগেই শিখরস্বামী উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আদেশ দিন মহারাজ, এই সংবাদবাহকের সঙ্গে আমি একান্তে দেখা করে রুদ্রসিংহের প্রস্তাব শুনতে চাই।’
মহারাজ বেপথু। তিনি নির্লিপ্তসুরে বললেন, ‘তাই যান মহামন্ত্রী৷ দেখুন রুদ্রসিংহ কী চায়। যা চায়, দিয়ে এই অর্বাচীনকে বিদায় করুন।’
শিখরস্বামী প্রস্থান করতেই শিবিকার মধ্যে প্রবেশ করলেন পট্টমহিষী ধ্রুবা। উত্তেজিত এবং বিচলিতস্বরে বললেন, ‘এইভাবে এখানে আসার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী মহারাজ। কিন্তু সংবাদ পেলাম আমরা নাকি আক্রান্ত। রুদ্রসিংহের সৈন্যরা চারিদিক থেকে আমাদের ঘিরে ধরেছে। আমি আর থাকতে না পেরে উপস্থিত হলাম।’
উপস্থিত সভাসদরা উঠে দাঁড়িয়ে মহাদেবীকে অভিবাদন করলেন। তারপর সূর্যস্বামী তাঁকে পরিস্থিতি সংক্ষেপে জানালেন। ধ্রুবার মুখ ঘৃণা, বিতৃষ্ণা এবং উৎকণ্ঠায় বক্রভাব ধারণ করল। তিনি একপাশে উপবেশন করলেন।
কিছুক্ষণ পর মহামন্ত্রী শিখরস্বামী প্রায় দৌড়ে প্রবেশ করলেন শিবিরে, ‘অসম্ভব, এ অসম্ভব! এই দুরাত্মার এত বড় স্পর্ধা যে…’ বলতে বলতেই রাজমহিষীকে দেখে থেমে গেলেন তিনি। তাঁকে অভিবাদন জানিয়ে উচ্চকণ্ঠে বললেন, ‘মহারাজ, সেনাদের যুদ্ধপ্রস্তুতির আদেশ দিন। এই শর্ত মেনে নেওয়ার থেকে আত্মহত্যা করা শ্রেয়।’
রামগুপ্ত অর্ধনিমীলিত চোখে বললেন, ‘কেন মহামন্ত্রী? এমনকী শর্ত দিয়েছে রুদ্রসিংহ যে তোমার পক্ষে আত্মহত্যা করা শ্রেয় বলা মনে হচ্ছে? যাই হোক, সে শর্ত দ্রুত পালন করো আর এই উৎপাতকে অতিশীঘ্র বিদায় করো। আমি অত্যন্ত বিরক্ত হচ্ছি এবার।’
শিখরস্বামী শান্ত মস্তিষ্কের মানুষ। স্থিরবুদ্ধির কূটনীতিজ্ঞ বলে এই সসাগরা জম্বুদ্বীপে প্রসিদ্ধি আছে তাঁর। সেই তিনি প্রবল ক্রোধে ফেটে পড়লেন। মহারাজাধিরাজের সামনে উঠে দাঁড়িয়ে স্বভাববিরুদ্ধভাবে গর্জে উঠলেন গুপ্তবংশের অনেক সুখদুঃখের সঙ্গী সেই প্রাজ্ঞ মানুষটি, ‘রামগুপ্ত, এ অনর্থক বাক্বিতণ্ডার সময় নয়। শুধুমাত্র এই সাম্রাজ্যের মহামন্ত্রী বলে নয়, তোমার পিতার বয়স্য বলে নয়, গুপ্তবংশের বশংবদ ভৃত্য বলে নয়, আমি তোমার একজন শুভাকাঙ্ক্ষীরূপে বলছি, পূর্ণরূপে সজাগ হও৷ আজ আমরা যে সঙ্কটের সম্মুখীন তা শুধু গুপ্তবংশ নয়, তোমার সম্মানও ক্ষুণ্ণ করার পক্ষে যথেষ্ট।’
মহামন্ত্রী অদ্যাবধি রামগুপ্তকে প্রকাশ্যে কখনও তুমি সম্বোধন করেননি। তাই সভাসদরা সচকিত হলেন। আবেশাতুর রামগুপ্ত চোখ মেলে চাইলেন তাঁর প্রধানমন্ত্রীর দিকে।
নিজেকে সংযত করলেন শিখরস্বামী, তারপর কম্পিতস্বরে বললেন, ‘অধীনের ক্ষণিকের প্রগলভতা মার্জনা করবেন মহারাজ। কিন্তু পরিস্থিতি আজ সত্যই সঙ্গিন। আজ আপনাকে আমার কথা শুনতেই হবে, রাজকীয় সম্বোধনে নষ্ট করার মতো সময় নেই! পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত জটিল।’
রামগুপ্তর শ্লেষাত্মক কণ্ঠস্বর শোনা যায়, ‘যদি এই জটিল পরিস্থিতি সামলাতেই না পারো, তাহলে এই বিশাল সাম্রাজ্যের দায়িত্ব তোমাকে দিয়েছি কেন মহামন্ত্রী?’ রামগুপ্তের কথা জড়িয়ে আসছে। দুটি চোখ অর্ধনিমগ্ন ‘আমাকে বিরক্ত কোরো না, সাম্রাজ্যের জন্য, গুপ্তবংশের নিরাপত্তার জন্য উপযুক্ত মনে হয় এমন সিদ্ধান্তই নেবে। ওরে কে আছিস, মাধ্বীকের কলসটা এদিকে দিয়ে যা।’
মহামন্ত্রীকে উদ্ভ্রান্ত দেখাচ্ছিল। তিনি প্রাণপণে শেষ চেষ্টা করলেন, আমি আমার কর্তব্য বিষয়ে সম্যকরূপে অধিগত মহারাজ। কিন্তু…কিন্তু…এই রুদ্রসিংহ এক অত্যন্ত কুৎসিত, অত্যন্ত ইতরজনোচিত প্রস্তাব জানিয়েছে। আমরা কিছুতেই তা মেনে নিতে পারি না।’
‘তাহলে মেনে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করো। কিন্তু আমাকে বিরক্ত কোরো না। ওরে, মাধ্বীকের কলসটা যে এখনও…’
‘আপনি বোধহয় পরিস্থিতির ব্যাপারে সম্যকরূপে অবহিত নন সম্রাট। আমরা ওদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের অবস্থায় নেই। ওরা আমাদের ঘিরে রেখেছে মহারাজ। নিষ্ক্রমণের পথ নেই, আমরা এখন ওদের ক্ষমার ওপর নির্ভরশীল।’
‘আহ, বড় অর্থহীন বাগাড়ম্বর করো মহামন্ত্রী। যা বলতে চাও, স্পষ্টভাবে জানিয়ে দূর হও দেখি! আমি আপাতত শান্তিতে থাকতে চাই।’
শিখরস্বামীর উদ্ভ্রান্ত মুখ দেখে সভাসদরা আরও বিচলিত হলেন। তিনি শান্তধীরবুদ্ধির মানুষ হিসেবে সুখ্যাত। তাঁর এই অবস্থা দেখে উপস্থিত রাজন্যদের অবস্থা আরও সঙ্গিন হল।
শিখরস্বামীর অবস্থাও তদ্রুপ। তিনি নিরূপায় হয়ে মহাদেবী ধ্রুবার দিকে তাকালেন। ধ্রুবাকে দেখে মনে হল দানবপীড়িত ইন্দ্রসভার মাঝে, তিনি পাষাণ প্রতিমার মতো বসে। শিখরস্বামীকে তিনি কথা চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিলেন।
‘রুদ্রসিংহ বলেছেন, এই মুহূর্তে আমরা তাঁর তরবারির অগ্রভাগে অবস্থান করছি। চাইলেই তিনি আজ গুপ্তবংশ নির্বংশ করতে পারেন।’
‘বটে? গর্ভস্রাবটার এত সাহস?’
‘তিনি দুটি প্রস্তাব প্রেরণ করেছেন মহারাজ। এক, গুপ্তরা যদি উত্তর পশ্চিমে তাদের দাবি ত্যাগ করে, তবেই এই অবস্থা থেকে তিনি আমাদের মুক্তি দেবেন। এবং…’ এত পর্যন্ত বলে ইতস্তত করতে থাকেন শিখরস্বামী, তাঁর মুখে কথা জোগায় না।
‘আহ, থামলে কেন, বলে যাও!’ স্খলিতস্বরে বলে উঠলেন রামগুপ্ত। তাঁর কণ্ঠে নিস্পৃহ অধৈর্য।
‘এবং রুদ্রসিংহের দ্বিতীয় শর্ত হচ্ছে মহাদেবী ধ্রুবাকে তাঁর রক্ষিতা হিসাবে ভীমনগর দুর্গে প্রেরণ করতে হবে…’ বলতে বলতে স্বর থেমে গেল মহামহিমান্বিত গুপ্তসাম্রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী শিখরস্বামীর।
সভার মধ্যে যেন বিস্ফোরণ ঘটে গেল। মহাদেবী ধ্রুবা উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। তাঁর অবগুণ্ঠন এখন ভূলুণ্ঠিত। অসহ্য ক্রোধে সর্বশরীর কাঁপছে তাঁর, চোখে যেন সর্বগ্রাসী অগ্নিস্রোত। নিজের দু-কানকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না তিনি। তিনি কী শুনলেন? এই অসহনীয় অপমানও প্রাপ্য ছিল তাঁর?
অন্য সভাসদরা প্রস্তরবৎ স্তম্ভিত। মুহূর্তের মধ্যে ক্রুদ্ধ কেশরীর মতো উঠে দাঁড়ালেন চন্দ্রগুপ্ত। শরীরের পেশীগুলি ফুলে উঠেছে তাঁর।
স্বামী রামগুপ্তের দিকে ফিরে তাকান ধ্রুবাদেবী। গুপ্তসম্রাট রামগুপ্ত এখন মহামাত্য শিখরস্বামীর দিকে ভ্রু কুঞ্চিত করে চেয়ে রয়েছেন। অমাত্যদের চোখ সম্রাটের দিকে, মুখগুলি উত্তেজিত এবং গম্ভীর।
‘হুম! আর সেনাপতি শিখরস্বামী, তুমি কী বলো?’
‘মহারাজ, এই উপত্যকাটি এমন, যে শক বাহিনী আমাদের চারিদিক থেকে ঘিরে রেখেছে। পালাবার কোনও পথ নেই। এখন বিরোধিতা করতে যাওয়া আত্মহত্যার নামান্তর। কিন্তু…’
পরিস্থিতি সম্যক উপলব্ধি করতে পেরেছে সকলেই। শিবিরের অভ্যন্তরে এখন মৃত্যুর নীরবতা।
একমাত্র রামগুপ্তকেই দেখে মনে হচ্ছে তিনি কোনও কিছুতেই বিচলিত নন। হাতের ইশারায় ভৃত্যকে আরও কিছুটা সুরা আনার আদেশ দিলেন।
‘তাহলে আর কী, উত্তর আপনি নিজেই দিয়ে দিয়েছেন। আর কোনও উপায় না থাকলে, নিয়ে আসুন চুক্তিপত্র, আমি স্বাক্ষর করে দিচ্ছি।’
‘কিন্তু মহারাজ,’ বৃদ্ধ প্রধানমন্ত্রী কথা হারিয়ে ফেললেন, ‘মহাদেবী…’
‘শাস্ত্রে বলে সর্বনাশ সমুৎপন্ন হলে পণ্ডিতরা অর্ধেক ত্যাগ স্বীকার করেন। তাছাড়া মহাদেবী পতিব্রতা নারী। নিজের স্বামীর প্রাণ রক্ষা করাই তো তাঁর কর্তব্য।’
মুহূর্তের মধ্যে তরবারির কোষে হাত চলে গেল চন্দ্রগুপ্তর। অসহ্য ক্রোধে কে যেন চিৎকার করে উঠলেন অমাত্যদের মধ্যে। এর থেকে গাঢ়তর তমসাচ্ছন্ন রাত্রি কখনও এসেছে গুপ্তসাম্রাজ্যের ইতিহাসে?
প্রতিটি চোখ এখন ধ্রুবার দিকে নিবিষ্ট। ক্রোধে, অপমানে প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষমতা লোপ পেয়েছে তাঁর।
‘মহারাজ, এ ঘোর পাপাচার আপনি করতে পারেন না।’ এই প্রথম কথা বললেন চন্দ্রগুপ্ত। মনে হল যেন বহু কষ্টে কথাগুলি উচ্চারিত হল তাঁর মুখ থেকে, ‘এই অন্যায়, এই অপমান সহ্য করা আপনাকে শোভা দেয় না।’
‘আহ, তুমি চুপ করো চন্দ্র। স্বামী-স্ত্রীর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে এসো না।’
চন্দ্রগুপ্ত প্রত্যুত্তর করার আগেই মুখ খুললেন ধ্রুবা, তাঁর স্বরে যে উদগ্র অসহায় ঘৃণা প্রকাশ পেল, তার বুঝি তুলনা নেই।
‘মহারাজ, আপনি না আমার স্বামী? আপনি অগ্নি সাক্ষী করে আমাকে বিবাহ করার সময় শপথ করেছিলেন না, যে আজীবন আমায় রক্ষা করবেন?’
উঠে বসার চেষ্টা করলেন রামগুপ্ত। দুবারই পড়ে গেলেন। তৃতীয় বারের চেষ্টায় খানিকটা উঠে বসতে পারলেন। তারপর কণ্ঠস্বরে সামান্য স্নেহ মিশিয়ে বললেন, ‘প্রিয়তমা, তোমার স্ত্রীধর্ম অনুযায়ী তোমার উচিত সর্বোতভাবে নিজের পতিপরমেশ্বরের কল্যাণকামনা করা। কল্যাণী, এই তোমার ভবিতব্য। তুমি যে তোমার স্বামীর জীবনরক্ষায় নিজেকে উৎসর্গ করতে পারছ, এটাই তোমার সৌভাগ্য!’
ধ্রুবা সম্পূর্ণ মূক এবং স্থবির হয়ে গেলেন। তিনি এমন আঘাত জীবনেও পাননি। তাঁর স্বামী ক্লীব, কাপুরুষ, নীচ এসব তিনি তিনি জানতেন। কিন্তু তাঁর স্বামীটি যে এতটা অধোগামী এ তাঁর স্বপ্নেরও অগোচর ছিল।
‘স্বামী!’ ধ্রুবার কণ্ঠে অসহায় আর্তনাদ অনুরণিত হল, ‘আপনি এ কথা বলতে পারলেন? আপনি না আমার স্বামী? আমার রক্ষাকর্তা? নিজের স্ত্রীকে শত্রুর হাতে যৌনদাসীরূপে তুলে দিতে আপনার সঙ্কোচ হবে না? আপনার বিবেকে বাধবে না?’
রামগুপ্ত স্পষ্টতই বিরক্ত, ‘আহ! কেন বুঝছ না, এ ভিন্ন অন্য উপায় নেই।’
‘হ্যাঁ আছে,’ শিবিরের অন্য প্রান্ত থেকে তরবারি কোষমুক্ত করার শব্দ শোনা গেল। সকলে সভয়ে দেখলেন মহাবীর চন্দ্রগুপ্তর হাতে তাঁর ভয়াল খড়্গ, ‘মহাদেবীর অপমান মানে গুপ্তসাম্রাজ্যের অপমান, সম্রাট সমুদ্রগুপ্তর উত্তরাধিকারের অপমান। বেঁচে থাকতে এই অসম্মান আমি হতে দেব না মহারাজ।’
রামগুপ্ত সভয়ে চিৎকার করে উঠলেন, ‘কে আছো, বাঁচাও! এই দেখো, আমার ভাই আমাকে হত্যা করতে চাইছে!’
কিন্তু আর্তনাদে কেউ সাড়া দিল না। কোষমুক্ত তরবারি হাতে চন্দ্রগুপ্তকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করা আর স্বয়ং যমরাজকে স্বগৃহে নিমন্ত্রণ জানানো একই ব্যাপার।
বস্ত্রাবাসের দ্বারের কাছ থেকে কে যেন ধমকে উঠলেন, ‘চন্দ্রগুপ্ত, তুমি কি উন্মাদ হয়েছ? সিংহাসনের লোভ কি তোমাকে অন্ধ করে দিয়েছে? ভ্রাতৃহন্তা হতে চাও?’
রাজমাতা দত্তাদেবী এসে দাঁড়ালেন দুই ভ্রাতার মধ্যে। রামগুপ্ত বলে উঠলেন, ‘দেখুন রাজমাতা, দেখুন। আপনাকে বলেছিলাম না, মহাদেবী আর চন্দ্রগুপ্তের মধ্যে অবৈধ সম্পর্ক আছে? এই দেখুন তার প্রমাণ। ক্ষমতা আর নারীমাংসের লোভে কুমার উন্মাদ হয়ে গেছে। আমাকে হত্যা করতে চায় সে। ওই পাপিষ্ঠা কুলটা নারীই এর কারণ। করুক, রুদ্রসিংহ ভোগ করুক ওকে, সেই ওর উচিত শাস্তি হবে।’
মহাসর্বনাশের অনেক ওপার থেকে শ্মশানের হাহাকারের মতো এই শব্দগুলি ভেসে এল। সভাসদরা চোখ বন্ধ করলেন। এই কুবাক্য শোনার দুর্ভাগ্য যে হতে পারে, এ তাঁদের কল্পনাতেও ছিল না।
‘সাবধান, চন্দ্রগুপ্ত!’ রাজমাতা কঠিনস্বরে বললেন, ‘বিস্মৃত হয়ো না, মহারাজের বিশ্বস্ত থাকার শপথ নিয়েছ তুমি।’
তরবারি কোষবদ্ধ করলেন চন্দ্রগুপ্ত। তারপর শান্তস্বরে বললেন, ‘মা, আপনি কি জানেন যে শকাধিপতি রুদ্রসিংহ সন্ধির শর্তস্বরূপ গুপ্তবংশের রাজলক্ষ্মীকে রক্ষিতারূপে চেয়েছে? আপনি কি জানেন যে সম্রাট এই প্রস্তাবে সহমত জানিয়েছেন?’
‘এ-কথা কি সত্য, পুত্র?’ দত্তাদেবী ভ্রুকুঞ্চন করে মহারাজ রামগুপ্তর দিকে তাকালেন।
‘আমরা এখন বস্তুতপক্ষে ওদের হাতে বন্দী রাজমাতা। এই শর্ত পালিত না হলে সে আমাদের সকলকে হত্যা করবে। ধরিত্রীর বুক থেকে গুপ্তবংশের নাম মুছে যাবে। আপনি বলুন, এক্ষেত্রে আমি আর কী-ই বা করতে পারি?’ রামগুপ্তের গলায় আকুতি ফুটে উঠল।
দত্তাদেবী কিছুক্ষণ ভাবলেন। তারপর গম্ভীরমুখে বললেন, ‘গুপ্তরাজবংশের ঐতিহ্য এবং ধারাবাহিকতা রক্ষা করা আমাদের সবার প্রথম কর্তব্য। মহাদেবী আসবেন যাবেন, কিন্তু এই বংশের উত্তরাধিকার ধ্বংস হতে দেওয়া চলবে না।’
চন্দ্রগুপ্ত দীর্ঘশ্বাস টানলেন, যেন প্রবল আক্রোশে এখনই বিস্ফোরিত হবেন। কিন্তু তিনি মুখ খোলার আগেই মহাদেবী তাঁকে মাঝপথে থামিয়ে দিলেন, ‘তবে তাই হোক। আমি রুদ্রসিংহের রক্ষিতালয়ে যেতে স্বীকৃত হলাম। এমন পুরুষের অর্ধাঙ্গিনী হওয়ার থেকে, এমন বংশের কুলবধূ হওয়ার থেকে মৃত্যুও শ্রেয়।’
ঘোর অন্ধকার নেমে এসেছে চারিদিকে। চারিপাশে অন্ধ পর্বতশ্রেণী নির্বাক বিস্ময়ে দেখে যাচ্ছে করুণগম্ভীর নাটিকাখানি। শীতল বাতাসে কার যেন অসহায় দীর্ঘশ্বাস। নিভন্ত আগুনের আলোয় ভূতগ্রস্তের মতো বসে বা দাঁড়িয়ে আছে কতগুলি ছায়ামূর্তি। কতগুলি মূঢ়, ম্লান, মূক ছায়ামূর্তি।
সেই আধো অন্ধকারে পুনরায় ধ্রুবার স্বর শোনা গেল, ‘একটি মাত্র অনুরোধ আছে রাজমাতা। আশা করি গুপ্তবংশের মহাদেবীর শেষ ইচ্ছা পূর্ণ করার অনুমতি আপনি দেবেন।’
কেউ কোনও কথা বললেন না।
‘আমাকে রুদ্রসিংহের হাতে যেন কুমার চন্দ্রগুপ্ত নিজহস্তে সমর্পিত করেন। আমার এই অন্তিম কামনাটুকু রক্ষা করতে দিন।’
নিভন্ত সেই আগুন একেবারেই নির্বাপিত হল।
