মহাদেবী – ৮
মহাদেবীর চতুর্দোলাযাত্রা চলেছে। চলেছে পাহাড়ি পাকদণ্ডী ধরে, মেঠো পথের ধুলো উড়িয়ে, খরবেগা কলস্বিনীর পাশ দিয়ে। চলেছে ভীমনগর দুর্গের দিকে।
ইতিমধ্যেই এই বার্তা ছড়িয়ে গেছে চারদিকে। দলে দলে লোক ভিড় করে দেখতে এসেছে কীভাবে গুপ্তবংশের পট্টমহিষী স্বেচ্ছায় অন্য এক রাজার রক্ষিতা হতে স্বীকৃত হয়েছেন। এই বিপুল অপমানের সাক্ষী হতে চায় তারা।
এই অঞ্চলের নারীরা পরিশ্রমী, স্বাধীনচেতা এবং স্বভাবে স্বতন্ত্রা। তারা চাইলে অযোগ্য পতির কাছ থেকে মোক্ষ নিতে পারে। তারা উচ্চস্বরে কটুবাক্য বর্ষণ করছে রুদ্রসিংহের প্রতি, সম্রাট রামগুপ্তর প্রতি এবং গুপ্ত বংশের প্রতি। নারীর অপমান নারীদের বুকে না বাজলে আর কার বুকে বাজবে?
চতুর্দোলাসারির মধ্যে সাতটি চতুর্দোলা রয়েছে। তারমধ্যে যেটি সর্বাপেক্ষা বৃহৎ সেটি মধ্যস্থলে। তাতে রয়েছেন স্বয়ং মহারানি ধ্রুবা। অন্যান্যগুলিতে তাঁর পরিচারিকা এবং কিঙ্করীরা রয়েছে। চতুর্দোলা নিয়ে চলেছে গুপ্ত সৈন্যদের একটি ক্ষুদ্র দল। তবে তারা নামেই সৈন্য। তাদের খর্ব আকৃতি আর ক্ষীণকায় দেহ দেখে বোঝা যায় যে তারা ভারবাহী সৈনিক মাত্র, গৌরবার্থে সৈন্যদলের অভিধাপ্রাপ্ত হয়েছে। তাদের পাহারা দিয়ে নিয়ে চলেছে শকপ্রহরীদের একটি শ্রেণীদল। তাদের আকার বিশাল, মুখ রুক্ষ ও কঠোর এবং প্রত্যেকে অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত। দেখলে মনে হয় যেন শুক্রাচার্যের বরে পুনর্জীবিত রাক্ষসসৈন্যের দল এগিয়ে চলেছে।
একটু পরেই গুপ্তপ্রহরীদের মধ্যে একজন গুনগুন করে গান গাইতে লাগল। সে বোধহয় পূর্বী দেশের লোক। সেই গানের ভাষা অজানা, সে সুর বিরহ, দুঃখ এবং বিষণ্ণতার সুর। শুনলে মনে হয় যেন কোনো নারী বিবাহের পর তার পিতৃগৃহ ছেড়ে, প্রেমাস্পদকে ছেড়ে অন্য দেশে যাচ্ছে। সে সুর শুনলেই মনের মধ্যে ভারি কষ্ট হতে থাকে।
আস্তে আস্তে অন্য গুপ্তপ্রহরীরাও তার সঙ্গে সুরে সুরে গান গাইতে শুরু করল। একটু পর দেখা গেল স্থানীয় জনগণ, যারা চতুর্দোলাযাত্রা দেখতে এসেছিল, তাদের মধ্যেও অনেকেই এই গান জানে, তারাও গলা মেলাল।
তার পর গুপ্তরক্ষীদের সুরে সুর মেলানো স্থানীয়রাও চতুর্দোলাযাত্রার সঙ্গে চলতে লাগল। শকসৈন্যদের দলপতি ধমকে উঠলেন, ‘এ কী, তোমরা কোথায় যাচ্ছ?’
স্থানীয়দের মধ্যে একজন আভূমিপ্রণত হয়ে বলল, ‘আমরাও ভীমনগর যাচ্ছি প্রভু। এতটা পথ একলা যাব, কোথায় কোন বিপদ ওঁৎ পেতে আছে জানি না। আপনাদের সঙ্গে গেলে একটু বলভরসা পাই।’
সেনাপ্রধান আপত্তি করলেন না। স্থানীয়রা আবার গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে শকসৈন্যদের সঙ্গে চলতে লাগল।
তাদের মধ্যে দুজন হাঁটতে হাঁটতে এসে দাঁড়াল ধ্রুবার চতুর্দোলার ঠিক পেছনের চতুর্দোলাটির পাশে। সেখান থেকে একটি হাত বেরিয়ে এসে কিছু একটা গুঁজে দিল তাদের মধ্যে একজনের হাতে। দুজনে গান গাইতে গাইতে একটু পিছিয়ে পড়ল, মন্থর হয়ে এল তাদের গতি। শেষে একটি বাঁক পেরোবার পর তাদের আর দেখা গেল না।
খানিকপর এক শকসৈন্য প্রস্রাবের বেগ সামলাতে না পেরে পথের পাশে এসে দাঁড়ালো। আর তখন সে আশ্চর্য হয়ে দেখল যে পাহাড়ের অনেক নীচে দুজন স্থানীয় লোক ঊর্ধ্বশ্বাসে নেমে যাচ্ছে পাকদণ্ডী বেয়ে। প্রথমে সে ভাবল কথাটা প্রহরী প্রধানকে জানানো যাক। কিন্তু তারপর তার মনে হল চতুর্দোলাযাত্রা ভীমনগর দুর্গে পৌঁছতে দেরি হলে মহারাজ রুদ্রসিংহ ভারি রুষ্ট হতে পারেন। আর মহাদেবী না হয় মহারাজের শয্যায় উপগত হবেন। বাকি কিঙ্করীরা? প্রহরীরা কি সেই কিঙ্করীদের ভাগ পাবেন না? মহারাজ তো বলেই দিয়েছেন যে বিজিতা নারী মাত্রই অবাধভোগ্যা। ভাবতে ভাবতেই সৈন্যটির পুরুষাঙ্গ সুদৃঢ় হয়ে ওঠে। আর সেই সুস্রোতা প্রস্রাবধারার অনেক নীচে স্থানীয় লোকদুটি মিলিয়ে যায়।
.
দুটি যুবক গ্রামের পাশের পাহাড়ি পথ বেয়ে নেমে আসছিলেন। তাঁদের পরনে স্থানীয় পোশাক। যদিও সামান্য লক্ষ্য করলে বোঝা যায় যে তাঁদের পিঙ্গলবর্ণ ত্বক, খর্বাকার নাসা এবং অনুচ্চ দৈর্ঘ্য এই অঞ্চলের স্বাভাবিক দেহাকৃতির সঙ্গে মানানসই নয়।
দুইজনকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল এক তরুণী। তরুণীর চলন স্বচ্ছন্দ। যুবক দুইজন প্রতি পদক্ষেপে সাবধানতা অবলম্বন করছিলেন। তাতে আরও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল যে, তাঁরা এই অঞ্চলের বাসিন্দা নন, পার্বত্যপথে চলাফেরা তাঁদের অভ্যাসে নেই।
পাহাড়ি পথে উপরে ওঠার থেকে নামার সময় অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। যুবক দুইজনের পাদগ্রন্থি এবং পিণ্ডিকা ক্রমেই ব্যথায় আতুর হয়ে উঠছিল। তার মধ্যেই অতি সাবধানে পা ফেলে তাঁরা এগিয়ে যাচ্ছিলেন।
একটু পর একজন প্রশ্ন করলেন, ‘ভদ্রে, আর কতদূর?’
তরুণী মুখ না ঘুরিয়ে উত্তর দিল, ‘আর সামান্যই পথ বাকি আর্য। সাবধানে আসুন। আর পথিপার্শ্বের বৃক্ষশাখাগুলির দিকে একটু লক্ষ্য রাখবেন।’
‘কেন ভদ্রে?’
‘কারণ এই উপত্যকায় ভয়ানক বিষধর সর্পের বাস। তারা প্রায়শই ওই বৃক্ষশাখা অবলম্বন করে শিকারের অপেক্ষায় থাকে। একবার দংশন করলে আর দেখতে হবে না, মুখে জল দেওয়ার সময়টুকুও পাব না।’
যুবক দুইজনের মুখে অতিদ্রুত বিস্ময় ও আতঙ্কের যে অভিব্যক্তি খেলে গেল তরুণী তা লক্ষ্য করল না। যুবক দুইজন বিড় বিড় করে কী যেন বললেন। রুদ্রসিংহ, চন্দ্রগুপ্ত নাকি নিজেদের ভাগ্য, কাকে অভিসম্পাত দিলেন ঠিক বোঝা গেল না।
একজন সাহস করে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার এই পথে যাতায়াত করতে ভয় করে না?’
তরুণী এবার ফিরে তাকাল। তারপর মিষ্ট হেসে বলল, ‘না, ওরা আমার পোষা কিনা।’
যুবক দুইজনের মুখে আর কথা জোগাল না।
খানিক পরেই বাঁদিকে একটি সুঁড়িপথ দেখা গেল। তরুণী সেই পথ ধরলেন। পথটি অতীব সংকীর্ণ। ভূমিতল শুষ্কপত্রপুষ্পে আবৃত। পথের দুধারে গুল্মলতাশোভিত বিভিন্ন বৃক্ষশাখা নত হয়ে আছে। যুবক দুজন সভয়ে একবার চাইলেন সেদিকে। তারপর ইষ্টদেব স্মরণ করে পথে পা বাড়ালেন।
.
ভীমনগর দুর্গ থেকে প্রায় পাঁচ ক্রোশ দূরে দূরে এই পার্বত্য উপত্যকা। এখান থেকে ভীমনগর দুর্গ পৌঁছবার দুটি পথ। একটি পর্বতশিরা ধরে। সেটিই প্রচলিত পথ। দ্বিতীয় পথটি সমতলভূমি ধরে। দ্বিতীয় পথে অনেক সময় বাঁচে, এক রাত্রের মধ্যেই ভীমনগর দুর্গে পৌঁছানো যায়। তবে সে পথে সমতলে পৌঁছতে গেলে এই উপত্যকা থেকে একটি অতি সংকীর্ণ, প্রায় উল্লম্ব গিরিখাত ধরে নেমে আসতে হয়। তাই সচরাচর সেই পথ কেউ নেয় না।
তরুণীকে অগ্রবর্তী করে সেই যুবক দুজন যখন গন্তব্যস্থানে পৌঁছলেন, তখন তাঁদের সমস্ত শরীর ঘর্মাক্ত। পাদুখানি থরথর কম্পমান। নিজেদের হৃদপিণ্ডের শব্দ নিজেরাই শুনতে পাচ্ছেন। জিহ্বা বেরিয়ে এসেছে গ্রীষ্মকালে সারমেয়দের ন্যায়। শুষ্ক ভূমিখণ্ড দেখামাত্র দুজনেই সেখানে লম্বমান হলেন।
কিছুক্ষণ স্থির হয়ে শুয়ে থাকার পর তাঁদের শ্বাসপ্রশ্বাস ক্রমে স্বাভাবিক হল। তারপর উঠে বসে চারিদিকে তাকিয়ে দেখলেন একটি অতীব মনোরম স্থানে এসে উপস্থিত হয়েছেন তাঁরা। পর্বতের একটি অংশ সামান্য বর্ধিত হয়ে একটি ক্ষুদ্র ভূমিখণ্ড সৃষ্টি করেছে। তার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে একটি ক্ষুদ্র স্রোতস্বিনী। আর সেই স্রোতিস্বিনীর ঠিক পাশে, ভূমিখণ্ডটির অন্তিমপ্রান্তে একটি প্রস্তরনির্মিত ঘর। তার মাথায় মাথায় শুষ্ক বল্কল ও বৃক্ষশাখার ছাউনি। এই লোকবিবর্জিত উপত্যকায় ছোট্ট কুটিরটি ভারি আশ্চর্য সুন্দর দেখাচ্ছিল।
তরুণীটি কুটিরের সামনে গিয়ে দ্বারে একটি বিশেষ ভঙ্গিতে তিনবার আঘাত করলেন।
একজন তরুণ সেই ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। তাঁর পোশাক দেখে মনে হয় তিনি এই অঞ্চলের জনজাতির কেউ একজন। আগন্তুক দুই যুবককে দেখে তাঁর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি সাগ্রহে প্রশ্ন করলেন, ‘কী সংবাদ জয়দ্রথ?’
জয়দ্রথ নামের যুবকটি একটি প্রস্তরখণ্ড তরুণের হাতে তুলে দিল। তরুণ সেই প্রস্তরখণ্ডটি ভালো করে দেখলেন। তাতে কিছু চিহ্ন আঁকা আছে। তাঁর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি বললেন, ‘অতি উত্তম, অতি উত্তম। তোমাদের কেউ পথে দেখে ফেলেনি তো?’
‘না প্রভু।’
‘জয়দ্রথ, সময় উপস্থিত হয়েছে, প্রস্তুত হও। আজ মধ্যরাত্রের মধ্যেই ভীমনগর দুর্গে পৌঁছাতে হবে। সঙ্গীরা সবাই প্রস্তুত তো?’
‘হ্যাঁ প্রভু। কিন্তু আজ মধ্যরাত্রের মধ্যে…’
‘হ্যাঁ জয়দ্রথ, আদেশ সেইরকমই।’
‘কিন্তু প্রভু, এই উপত্যকা থেকে গিরিশিরা ধরে উপরে উঠে ভীমনগরের পথ ধরতেই তো অর্ধদিবস গত হবে। মধ্যরাত্রের মধ্যে ভীমনগর দুর্গে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব।’
তরুণের মুখে ভ্রুকুটি দেখা দিল। তিনি কুটিরের বাইরে এসে কিছুক্ষণ পদচারণা করলেন। তারপর আগত তরুণীকে অতি শিষ্টাচারের সঙ্গে সম্বোধন করে বললেন, ‘অয়ি ভদ্রে…’
তরুণীটি নদীর জলে পা ডুবিয়ে বসেছিলেন। তিনি বললেন, ‘আদেশ করুন কুমার।’
কুমার বললেন, ‘আজ রাত্রের মধ্যে ভীমনগর দুর্গ পৌঁছবার কোনও উপায়…’
তরুণীটি উঠে এলেন। কুমারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আছে কুমার। কিন্তু সে পথ বড়ই কঠিন। আপনি কি পারবেন?’
এই তরুণীকে দেখামাত্র কুমারের হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়, সেই প্রথম দেখা হওয়ার দিন থেকেই। তবু তিনি এতদিন রাজকীয় গাম্ভীর্যের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে এসেছেন। কিন্তু আজকের এই প্রশ্ন তাঁর স্পর্ধাকে জাগিয়ে তুলল। তিনি গম্ভীরস্বরে বললেন, ‘আমাকে চিনলে ওই প্রশ্ন করতেন না ভদ্রে।’
তরুণী খিলখিল করে হেসে উঠল। কুমারের হৃদয় আরেকবার অতিস্পন্দিত হল।
তরুণী বলল, ‘বেশ। তবে আপনার সঙ্গীসাথীদের আহ্বান করুন। আমরা দণ্ডকালের মধ্যেই যাত্রা শুরু করতে পারি।’
‘না, এক দণ্ড নয়, আরও কিছু সময় লাগবে। জয়দ্রথ আমাদের মধ্যে গৌড়, বঙ্গ বা সমতটের কেউ আছে?’
জয়দ্রথ বলল, ‘আছে প্রভু। সাকেত, বিজয় আর মুকুন্দ। কিন্তু কেন প্রভু?’
তরুণ আদেশ দিলেন, ‘ওদের এখুনি আমার কাছে আসতে বলো, আর সঙ্গে যেন তিনটি মোটা কাপড়ের তৈরি বড় পুটিকা থাকে।’
জয়দ্রথ বিস্মিত হল। প্রশ্ন করল, ‘কেন প্রভু? কাপড়ের পুটিকা কেন? আর এমন কী কাজ আছে যা ওদের দ্বারাই হবে, আমাদের দ্বারা সম্ভব না?’
তরুণ মৃদু হেসে বললেন, ‘সব কাজ সবার জন্য নয় জয়দ্রথ। গৌড়বঙ্গের অধিবাসীরা যেমন ধূর্ত তেমন সাহসী। ওদের দেশ নদীমাতৃক দেশ, সে বড় সর্পসঙ্কুল স্থান। সেইসব অতি ভয়ানক সর্পকুলের সঙ্গে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকে ওরা। আজ ওদের সেই দক্ষতা আমার ভীষণ প্রয়োজন।’
এই বলে তিনি সেই শ্যামাঙ্গী তরুণীর দিকে ফিরলেন, ‘ভদ্রে। আপনার আরও কিছু সাহায্যের প্রয়োজন। আশা করি আমাদের নিরাশ করবেন না।’
.
সন্ধে হয়ে এসেছে প্রায়। চতুর্দোলাযাত্রা প্রায় ভীমনগর দুর্গের কাছাকাছি। একটু পরেই রাত্রি নেমে আসবে। রাত্রিকালে পাহাড়ি পথে চলাফেরা করা খুব বিপজ্জনক। পদে পদে বিপদের আশঙ্কা থাকে। কিন্তু রুদ্রসিংহের কঠিন আদেশ, রাতের মধ্যেই যেন মহাদেবী ভীমনগর দুর্গে প্রবেশ করেন। একটু আগেই দুর্গ থেকে দ্রুতগামী অশ্বে চেপে বিশেষ দূত এসেছিল। শকপ্রহরী প্রধানের কাছে রুদ্রসিংহের আদেশ শুনিয়ে গেছে।
শকপ্রহরীদের প্রধান গম্ভীরমুখে আদেশ শুনেছেন। পালন করার অঙ্গীকারও করেছেন। তিনি জানেন এই আদেশের অর্থ কী। মহারাজ আশঙ্কা করছেন যে চন্দ্রগুপ্ত বিদ্রোহী হয়ে পথিমধ্যে এই চতুর্দোলাযাত্রা আক্রমণ না করে বসেন। নিজের প্রেয়সীকে অন্যের রক্ষিতারূপে প্রেরণ করা হচ্ছে, কোনও পুরুষসিংহ তা সহ্য করতে পারে?
শকসৈন্যরা বড় বড় দণ্ডবর্তিকা জ্বেলে সেই আলোর পথ ধরে পাহাড়শ্রেণী বেয়ে নেমে আসছে ভীমনগর দুর্গের দিকে। অন্ধকার আকাশের প্রেক্ষাপটে তাদের ভারি সুন্দর দেখাচ্ছে। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে যেন চলমান স্নিগ্ধ আলোর স্রোত নেমে আসছে পাহাড়ের বুক চিরে।
অনেক নীচ থেকে সেই আলোর মিছিল দেখছিল আরও একদল লোক। তাদের গায়ে স্থানীয় গ্রাম্য পোশাক, দেহ ধূলিধূসরিত। সেই আলোর শোভাযাত্রা দেখে দলপ্রধান একটু থামলেন। তারপর বললেন, ‘তাড়াতাড়ি চল রে সবাই। যে করেই হোক মধ্যরাত্রের মধ্যেই ভীমনগর দুর্গে পৌঁছাতে হবে।’
দলের একদম শেষে তিনজন খর্বদেহ, কৃষ্ণকায় মানুষ পথ হাঁটছিল, তাদের পিঠে তিনটি বড় বড় পুটিকা। তাদের মধ্যে একজন চাপাস্বরে জিগ্যেস করল, ‘হ্যাঁ রে মুকুন্দ, কোন অষ্টকুষ্ঠীর পুত্র কুমারকে জানিয়েছে যে আমরা গৌড়বঙ্গ আর সমতটের লোক?’
মুকুন্দ উত্তর করল, ‘আর কে? ওই জয়দ্রথ।’
প্রথমজন দাঁতে দাঁত চিপে বলল, ‘শ্যালিকাপুত্রটিকে একবার হাতের কাছে পাই, যদি ওর অণ্ডদুটিকে খণ্ড খণ্ড করে শিবাভোগ না দিয়েছি তো আমার নাম বিজয় নয়।’
তৃতীয়জন সাকেত। সে বলল, ‘সত্যি বাপু আর পারি না। দেশে থাকতে একটি দুটি সাপ ধরেছি বটে। সেও নেহাত বাধ্য হয়ে। কিন্তু এই কাজ? এ আর আমার দ্বারা হবে না বাপু।’
বিজয় বলল, ‘যা বলেছিস ভাই। ভালোয় ভালো পাটলিপুত্রে ফিরে যাই একবার। তারপর সেখান থেকে অব্যাহতি নিয়ে দেশে ফিরে কৃষিকাজে মন দেব।’
মুকুন্দ মুচকি হেসে বলল, ‘আর তোর সেই প্রেয়সী, রাজলক্ষ্মী না কী যেন নাম তার? তার কী হবে?’
বিজয় উদাসস্বরে বলল, ‘সে কি আর আমার অপেক্ষায় বসে আছে রে মুকুন্দ? পাটলিপুত্র হল গুপ্তসাম্রাজ্যের রাজধানী। কত বড় বড় নাগরের বাস। দেখ, সে হয়তো ইতিমধ্যেই কারোর অঙ্কশায়িনী হয়েছে। চল চল, এখন পা চালিয়ে তাড়াতাড়ি চল তো দেখি!’
তিনজন খানিক চুপচাপ চলল। তারপর মুকুন্দ বলল, ‘তবে একটা কথা বলতেই হবে ভাই। আমাদের কুমার কিন্তু যেমন বীর, তেমন সাহসী! কতজন আর বহুদিদির জন্য এতটা করে বল?’
সাকেত বলল, ‘হ্যাঁ, সে আর বলতে? দুই কুমারই মহাদেবীকে বড়ই শ্রদ্ধা করেন।’
মুকুন্দ বলল, ‘বড় কুমারও?’
সাকেত মুচকি হেসে বলল, ‘হুঁ।’
বিজয় বলল, ‘ও, ওটাকে তোরা শ্রদ্ধা বলিস বুঝি?’
শুনে তিনজন ফিকফিক করে হাসতে লাগল। তারপর মুকুন্দ কপট রাগ দেখিয়ে বলল, ‘বাদ দে ভাই, রাজরাজড়াদের ব্যাপার, আমাদের শুনে কাজ কী? চল চল, পা চালিয়ে চল দেখি। দেরি হলে কুমার ক্রুদ্ধ হবেন।’
.
ঠিক মধ্যরাত্রের আগে চতুর্দোলাযাত্রা এসে পৌঁছাল ভীমনগর দুর্গের সামনে। শকপ্রহরী প্রধান উচ্চৈস্বরে বললেন, ‘দ্বাররক্ষক, দুর্গদ্বার উন্মুক্ত করো।’
প্রত্যুত্তরে দ্বাররক্ষী বলল, ‘সঙ্কেতবাক্য বলুন।’
সঙ্কেতবাক্য উচ্চারিত হলে ধীরে ধীরে খুলে গেল ভীমনগর দুর্গের অতি বৃহৎ দ্বার। চতুর্দোলাযাত্রা তার মধ্য দিয়ে নগরের মধ্যে অন্তর্হিত হল। দ্বারবন্ধের প্রক্রিয়া শুরু হল। মস্ত বড় সে দরজা; খুলতে যেমন সময় নেয়, বন্ধ হতেও তেমনই।
দ্বার প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে এমন সময় হঠাৎ ছুটতে ছুটতে একদল গ্রাম্য লোক সেখানে এসে উপস্থিত। তাদের বসন মলিন, সর্বাঙ্গ ধূলিধূসরিত। দলপ্রধান উচ্চৈস্বরে বলল, ‘আরে দ্বাররক্ষী থামো থামো, দরজা বন্ধ করো না। আমাদের ভেতরে যেতে দাও।’
দ্বাররক্ষী গম্ভীরস্বরে প্রশ্ন করল, ‘তোমরা কারা?’
দলপ্রধান বলল, ‘আমরা গুপ্ত শিবির থেকে এসেছি। দ্বার উন্মুক্ত করো।’
দ্বাররক্ষীর ভ্রু কুঞ্চিত হল। বলল, ‘কিন্তু তারা তো একটু আগেই ভেতরে চলে গেছে।’
‘তো আমরাও যাব।’
‘বেশ, তাহলে সঙ্কেতবাক্য বলো।’
দলপ্রধান কুপিতস্বরে বলল, ‘সঙ্কেতবাক্য? সে তো একটু আগেই প্রহরী প্রধান বলেই গেছেন।’
দ্বাররক্ষী বিরক্ত হয়ে বলল, ‘সে তো বুঝলাম। কিন্তু আমি কী করে নিশ্চিত হই যে তোমরা সেই দলের লোক কিনা?’
এবার দলপ্রধানের ধৈর্য্চ্যুতি ঘটল। সে দাঁত খিঁচিয়ে বললেন, ‘ওহে অকালকুষ্মাণ্ড, আমরা গুপ্তশিবির থেকে এসেছি, মহাদেবী ধ্রুবার প্রসাধনী আর গহনা নিয়ে। যদি তোমার জন্য মহাদেবী ধ্রুবার প্রসাধনে দেরি হয় আর সেই জন্য তাঁর মহারাজা রুদ্রসিংহের শয্যায় যেতে বিলম্ব হয়, তাহলে তোমার কপালে কী দুঃখ আছে তা জানো তো?’
দ্বাররক্ষী ইতস্তত করতে লাগল। রুদ্রসিংহের ক্রোধ বড় ভয়ঙ্কর। ক’দিন আগেই রান্নায় লবণ কম হয়েছিল বলে প্রধান পাচককে উলঙ্গ করে ক্ষুধার্ত পাহাড়ি সারমেয়দের সামনে ফেলে দিয়েছিলেন। আর সেই হতভাগ্যের স্ত্রী পুত্রকে বাধ্য করেছিলেন সেই দৃশ্য দেখতে।
দ্বাররক্ষীকে দ্বিধাগ্রস্ত দেখে একটু এগিয়ে এল দলপ্রধান। একটি পেটিকা খুলে বলল, ‘এই দেখো, এবার বিশ্বাস হল তো?’
পেটিকার দিকে তাকিয়ে দ্বাররক্ষীর চোখ ঝলসে গেল। শত শত বহুমূল্য রত্নরাজি এবং গহনা তারমধ্যে থরে থরে সাজানো। তার মধ্যে অর্ধচূড় কেয়ূর, নক্ষত্রমালা, চূড়ামণ্ডল, প্রালম্বিকা কণ্ঠহার, সবই আছে। আর আছে বিচিত্র সব রত্নশোভিত নন্দাবর্ত্য, শুক্তিমুদ্রিকা এবং স্বর্ণমধ্য কর্ণবেষ্টন।
দ্বাররক্ষী বড়ই দরিদ্র মানুষ, বেতন অতি সামান্য। একমাত্র শকসৈন্যরা যখন পররাজ্য লুণ্ঠন করে ফিরে আসে, তার থেকে সামান্য ভাগ সে পায়। সেই তার ভবিষ্যতের একমাত্র পাথেয়।
দ্বাররক্ষী এদিক-ওদিক দেখে টুক করে একটি সোনার বজ্রবেষ্টক তুলে নিয়ে শিরস্ত্রাণের মধ্যে লুকিয়ে ফেলল। তারপর গম্ভীর গলায় বলল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, যাও যাও।’
গ্রাম্য দলটি ধীরে ধীরে দরজার পেছনে অদৃশ্য হয়ে গেল।
.
রুদ্রসিংহ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন তাঁর শয্যাভবনে। পরনে পার্বত্য মেষরোম হতে প্রস্তুত বহুমূল্য পোশাক। কণ্ঠে ঝুলছে স্বর্ণনির্মিত রত্নশোভিত নক্ষত্রমালা। আঙুলের দ্বিহীরক বজ্রাঙ্গুরীয়টিকে ঘোরাতে ঘোরাতে তিনি ভাবছিলেন আজ যদি ধ্রুবা নিজেকে তাঁর কাছে নিজেকে নিঃশর্ত সমর্পণ করে তাহলে তিনি তাকে কী উপহার দেবেন। বজ্রাঙ্গুরীয়টিই যথেষ্ট? নাকি নক্ষত্রমালাখানি দান করাই সুসঙ্গত দেখায়?
ভাবতে ভাবতে অধীর হয়ে উঠলেন তিনি। স্বর্ণভৃঙ্গার থেকে আরও খানিক আরক পান করলেন। আহা, পারস্যদেশীয়রা কী পানীয়ই না আবিষ্কার করেছে। এক চুমুকেই হৃদয়ে প্রফুল্লভাব জাগ্রত হয়।
কিন্তু ধ্রুবার এসে পৌঁছতে এত দেরি হচ্ছে কেন? এতক্ষণে তো তার পৌঁছে যাওয়ার কথা। তারপর সামান্য প্রসাধন করেই তার আসার কথা। কোথাও কোনও গোলযোগ হল না তো?
ভাবতে ভাবতেই দ্বারে মৃদু করাঘাতের শব্দ শোনা গেল। রুদ্রসিংহ গম্ভীরস্বরে বললেন, ‘কে? ভেতরে এসো।’
মহাপ্রতিহার দত্তসেন এবং রুদ্রসিংহের প্রিয়তমা রক্ষিতা চম্পাবতী প্রবেশ করলেন। চম্পাবতী বললেন, ‘ওঁরা এসে গেছেন মহারাজ।’
প্রসন্ন হলেন রুদ্রসিংহ। তৃপ্তস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘ধ্রুবা এসেছে? সে প্রস্তুত তো? তাহলে তাকে এক্ষুনি নিয়ে আসা হোক এই শয্যাভবনে। আর অপেক্ষার প্রয়োজন কী?’
চম্পাবতী উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ মহারাজ, তিনি শুধু প্রস্তুতই নন, তিনি এখনই আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্য অত্যন্ত উদ্গ্রীব হয়ে উঠেছেন।’
রুদ্রসিংহ হস্তধৃত আরকের পাত্রটি এক নিঃশ্বাষে শেষ করে বললেন, ‘তাই নাকি? বেশ বেশ। আমার পৌরুষের খ্যাতি ধ্রুবার কানেও পৌঁছেছে তাহলে? তবে তাই হোক। আজ রুদ্রসিংহের শয্যায় পিষ্ট হোক গুপ্তবংশের রাজলক্ষ্মী। আর দেরি কীসের?
মহাপ্রতিহার দত্তসেন কিঞ্চিৎ ইতস্তত করলেন। তারপর করজোড়ে বললেন, ‘প্রভু, মহাদেবী ধ্রুবার একটি অনুরোধ আছে।’
মদ্যপাত্র হাতে ধমকে উঠলেন রুদ্রসিংহ, ‘মহাদেবী আবার কী? এখন থেকে ও আমার যৌনদাসী, আমার রক্ষিতা। এই যেমন চম্পাবতী, তেমনই। এবার ওকে তোমরা সবাই নাম ধরেই ডাকবে এখন থেকে। বুঝেছ?’
চম্পাবতীর মুখ সামান্য ম্লান হয়েই পুনরায় স্বাভাবিক হল। দ্রুত ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বললেন দত্তসেন। মদ্যপ রুদ্রসেনের আদেশ যার হৃদয়ঙ্গম হয় না সে শুধু মূর্খ নয়, মহামূর্খ। তারপর বললেন, ‘ধ্রুবা একটি অনুরোধ করেছেন প্রভু। তাঁর সঙ্গে তার আবাল্যসখী মন্দাকিনীও এসেছেন ভীমনগর দুর্গে। তাঁরা দুজনেই আপনার শয্যাভবনে একত্রে প্রবেশ করতে চান।’
প্রথমে চমকিত, তারপর বিস্মিত এবং পরিশেষে বড়ই পুলকিত হলেন রুদ্রসিংহ। হা হা করে হেসে উঠে বললেন, ‘বাহ্ বাহ্, ধ্রুবা বড়ই কামচতুরা দেখছি৷ প্রথম রাতেই ত্রিসঙ্গম চায়? এ তো বড়ই আমোদের বিষয়। ঠিক আছে, দুজনকেই সুসজ্জিত করে আমার শয্যাকক্ষে নিয়ে এসো তাহলে। আর হ্যাঁ, যাওয়ার সময় দুকলস মাধ্বী পাঠিয়ে দিও তো। আর দেখো, আমার শয্যাভবনের সামনে যেন কোনও পুরুষ প্রহরী না থাকে। আমি চাই না তাদের শীৎকারের শব্দ কোনও পুরুষের কর্ণগোচর হোক।’
দত্তসেনের মুখ দেখে মনে হল শেষ আদেশটা বোধহয় তাঁর মনঃপুত হয়নি। কিন্তু রুদ্রসিংহের কথার উপর কথা বলে এমন বুকের পাটা কার আছে ভীমনগর দুর্গে?
তিনি এবং চম্পাবতী, দুজনেই ধীরে ধীরে নিষ্ক্রান্ত হলেন।
.
রাত্রিভর পর্বতশিরায় অবস্থান করে শত্রুর দিকে ধনুর্বাণ লক্ষ্য করে থাকা বড় সহজ কাজ নয়। মনে মনে অত্যন্ত বিরক্ত হচ্ছিলেন নন্দকুমার৷ কিন্তু প্রভুর কর্মে বিরক্তি আসা রাষ্ট্রদ্রোহের সমান। তার ওপর প্রভুর নাম যদি রুদ্রসিংহ হয়, তাহলে তো কথাই নেই। তাই নিজের অবাধ্য মনকে বুঝিয়ে কর্তব্যকর্মে মনোনিবেশ করেছিলেন তিনি।
নন্দকুমার যুবক, উদ্যমী, এবং রুদ্রসিংহের সর্বাপেক্ষা প্রিয় সৈন্যাধ্যক্ষদের মধ্যে অন্যতম। তার থেকেও বড় ব্যাপার হচ্ছে যে নন্দকুমার মহারাজ রুদ্রসিংহকে ঈশ্বরের অবতার মনে করেন। মহারাজ রুদ্রসিংহও অবশ্য নন্দকুমারকে কম স্নেহ করেন না। যেখানেই অতিদ্রুত কর্মসাধনের প্রয়োজন পড়ে সেখানেই নন্দকুমারের ডাক পড়ে। এই করে করেই নন্দকুমারের আর বিবাহ করা হয়ে উঠল না।
তবে তাতে যে নন্দকুমার খুব দুঃখে আছেন তা নয়। রুদ্রসিংহের সমরাভিযান মানেই বিভিন্ন বয়স, আকার ও আকৃতির নারীসম্ভোগের অবাধ আনন্দযজ্ঞ। তাছাড়া লুণ্ঠিত দ্রব্যের ভাগ তো আছেই। মহারাজের কৃপাদৃষ্টি তো তার উপর অতিরিক্ত। সব মিলিয়ে নন্দকুমার মহানন্দে আছেন।
কাল যখন মহারাজ ডেকে এই অতি গোপনীয় কাজের ভার দিয়েছিলেন নন্দকুমারকে, তখন ভারি গম্ভীর দেখাচ্ছিল তাঁকে৷ তিনি সব বুঝিয়ে দেওয়ার পর বলেছিলেন, ‘একটি পুরুষও যেন না বাঁচে নন্দ, আর একটিও যৌবনবতী নারী যেন আঘাতপ্রাপ্তা না হয়।
‘যদি তারা আমার প্রস্তাব অমান্য করে, তাহলে তৎক্ষণাৎ তাদের আক্রমণ করবে। আর ওই নপুংসক রামগুপ্ত যদি আমার কথামতো ধ্রুবাকে আমার কাছে প্রেরণ করতে সম্মত হয়, তাহলে অপেক্ষা করবে যতক্ষণ না ধ্রুবা রামনগর দুর্গে পৌঁছয়। ধ্রুবা রামনগর পৌঁছানোমাত্র তোমার কাছে দূত প্রেরণ করা হবে। তার কাছ থেকে সংবাদ পেলেই গুপ্তবংশ সমূলে ধ্বংস করবে। ওদের সংগ্রহে থাকা রত্নরাজি, বন্দিনী নারী, আর রামগুপ্ত ও চন্দ্রগুপ্তর কর্তিত মুণ্ড, এ ছাড়া আর কিছুই আনার প্রয়োজন নেই। সবকিছু অগ্নিসংযোগে ধ্বংস করবে। বুঝেছ?’
সরল আদেশ, না বোঝার কিছুই নেই। সেই থেকে এই পার্বত্য উপত্যকা সঙ্গীসাথীসহ অবরোধ করে বসে আছেন নন্দকুমার। ধ্রুবা রওনা দিয়েছেন প্রায় এক দিবস হতে চলল। আশা করা যায় মহারাজের দূত এসে পৌঁছল বলে।
শত্রুপক্ষের ভাবগতিক দেখে অবশ্য ভারি হতোদ্যম হয়ে পড়ছিলেন নন্দকুমার। ছিঃ ছিঃ ছিঃ, এরা নাকি অর্ধজম্বুদ্বীপের অধিপতি সমুদ্রগুপ্তর বংশধর? প্রতিরোধের কোনও উদ্যোগই নেই? এইভাবে কেউ নিজের পট্টমহিষীকে অন্যের রক্ষিতা হওয়ার প্রস্তাবে সম্মত হয়?
আর কোথায় সেই চন্দ্রগুপ্ত? সে নাকি ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠতম বীর? মালব আক্রমণের সময় সে নাকি একাই পরাস্ত করেছিল শকসৈন্যদল? নেহাত সেই যুদ্ধে নন্দকুমার ছিলেন না, থাকলে বোঝা যেত কে কত বড় বীর, হুঃ!
ভাবতে ভাবতেই মুখব্যাদান করে জৃম্ভণ করলেন নন্দকুমার। কখন আসবে দূত?
খানিক পর নন্দকুমার ভাবলেন উঠে একটু পায়চারি করে নেওয়া যাক। একটু পরেই তো পরিশ্রমের কাজ। হাত পায়ের জড়তা ত্যাগ করা প্রয়োজন।
এই পর্বতশ্রেণীটি হিমালয়ের অন্যান্য গিরিশিখরের তুলনায় অতীব অনুচ্চ। অরণ্যাচ্ছাদিত পর্বতটিতে আরোহণ এবং সেখান হতে অবতারণ অতি সহজ। এতদঞ্চলের আধিবাসীরা প্রায়শই এখানে ফলমূলাদি এবং শুষ্ক বৃক্ষশাখার সন্ধানে আসে। তাই চলাচলের জন্য কয়েকটি পথ রয়েছে।
নন্দকুমার সেইরকমই একটি পথ ধরে পদচারণা করতে লাগলেন। বাকি সৈন্যরা একাগ্রচিত্তে ভল্ল এবং ধনুতে শরসন্ধান করে বসে আছে। এখান হতে গুপ্ত শিবিরের প্রতিটি অংশই সহজলক্ষ্য। নন্দকুমারের আদেশ পাওয়ামাত্র প্রতিটি শরে অগ্নিসংযোগ করা হবে। তারপর জ্বলন্ত শিবির হতে ব্যস্তত্রস্ত হয়ে পালাতে থাকা শত্রুদের শিকার করা তো এদের কাছে বাল্যক্রীড়া।
হাঁটতে হাঁটতে অরণ্যের সামান্য গভীরে চলে গেছিলেন নন্দকুমার। আর তখনই শব্দটি কানে এল তাঁর। নূপুরনিক্বন না?
খানিক উৎকর্ণ হয়ে শব্দটি শুনলেন তিনি, হ্যাঁ, নুপুরনিক্বনই। তার মানে নারী!
ভারি উৎসাহিত হয়ে সেই শব্দের উৎসের দিকে সন্তর্পণে হাঁটতে শুরু করলেন নন্দকুমার।
