মহাদেবী – ৯
একটু পরেই যখন সেই গ্রাম্যদলটি হাঁপাতে হাঁপাতে রুদ্রসিংহের শয্যাভবনের সামনে উপস্থিত হল, তার কিছু আগেই মহাদেবী ধ্রুবা এবং মন্দা সেখানে প্রবেশ করেছেন। শয্যাভবনের দ্বারে কিঙ্করীরা আর দত্তসেন দাঁড়িয়ে ছিলেন। দত্তসেন মহারাজ রুদ্রসিংহের আদেশটুকু পালন করেছেন বটে, কিন্তু পুরোপুরি নয়। অন্যান্য পুরুষ প্রহরীরা আশেপাশেই একটু আড়ালে লুকিয়ে আছে।
এই গ্রাম্যদলটি শয্যাভবনের সামনে এসে দাঁড়াতে দত্তসেনের ভ্রু দুখানি কুঞ্চিত হল। তিনি জলদগম্ভীরস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘কে তোমরা? এখানে কী করছ?’
দলপ্রধান বিগলিত হেসে বলল, ‘প্রণাম হই প্রহরী মশাই, আমরা গুপ্তশিবির হতে মহারানির প্রসাধনী ও গহনা নিয়ে এসেছি।’
মহাপ্রতিহার দত্তসেনের ধাতু হল ক্ষিপ্তধাতু, তিনি অতি অল্পতেই বড় ক্রুদ্ধ হন। তিনি গম্ভীরস্বরে বললেন, ‘আমি প্রহরী নই।’
দলপ্রধান ইতস্তত করে বলল, ‘তাহলে কি আপনি কিঙ্কর?’
উত্তেজিত হলেই দত্তসেনের কথা আটকে যায়। তিনি গর্জে উঠলেন, ‘আআআআআমি কি…কি…কিঙ্কর নই। আমি হলাম মহা…মহা…মহা…’
দলপ্রধান মহাবিস্ময়ে বলল, ‘আপনি মহাকিঙ্কর? কী সর্বনাশ!’
দত্তসেন ঘোর উত্তেজিত হয়ে ক্রুদ্ধস্বরে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন। তার আগেই পাশ থেকে কিঙ্করীপ্রধানা চম্পাবতী ধমকে উঠলেন, ‘কাকে কী বলছ বাছা! জানো উনি কে? উনি মহাপ্রতিহার দত্তসেন।’
কথাটা শুনেই গ্রাম্যদল প্রধানের চোখমুখের ভাষা পালটে গেল। সে সাগ্রহে বলে উঠল, ‘আপনিই সেই মহাবল দত্তসেন যাঁর বীরত্বের কাহিনি চারণের দল সমগ্র জম্বুদ্বীপে পথেঘাটে গেয়ে বেড়ায়? আপনিই সেই অতিরথ মহাবীর যিনি একত্রে গাণ্ডীবধন্বা ফাল্গুনী আর গদাধারী ভীমের সমকক্ষ? আপনিই সেই দত্তসেন, কূটবুদ্ধিতে যাঁর প্রতিস্পর্ধা একমাত্র বাসুদেব কৃষ্ণর সঙ্গে? যিনি জ্ঞানে ব্যাসদেব, চরিত্রে হরিশ্চন্দ্র এবং যুদ্ধে স্বয়ং বৃত্রধারী ইন্দ্র, আপনিই তিনি? ওরে তোরা কে আছিস…প্রণাম কর, প্রণাম কর। আজ তোদের জীবনযৌবন সফল হল, দশদিশি নির্দ্বন্দ্ব হল…’
গ্রাম্যদলের প্রত্যেকে তৎক্ষণাৎ দত্তসেনের চরণে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত হল।
ক্ষিপ্তধাতুর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এ ধাতু সহজেই রুষ্ট এবং সহজেই তুষ্ট হয়। দত্তসেন খর্বকায়, দত্তসেন স্থূল, দত্তসেনের মস্তকে মস্ত বড় ইন্দ্রলুপ্ত এবং দত্তসেনের গাত্রবর্ণ ঘোরকৃষ্ণ। তদুপরি দত্তসেন জীবনে কোনওদিন যুদ্ধ তো করেনইনি, এমনকী তিনি ভীমনগরের বাইরে কোনওদিন পা-ই রাখেননি।
কিন্তু এমন প্রশস্তিতে স্বয়ং ব্রহ্মাও অভিভূত হন, দত্তসেন তো মানুষ। তিনি উদাত্ত কণ্ঠে বললেন, ‘আহা, থাক থাক। কল্যাণ হোক, সুমতি হোক, সৌভাগ্য হোক। তা বাছারা এখানে কী মনে করে?’
দলপ্রধান প্রণাম করে উঠে দুহাতে ভক্তিভরে চোখের জল মুছল। তারপর কটিবন্ধের আড়াল হতে ধীরেসুস্থে একটি দীর্ঘকায় তরবারি বের করে দত্তসেনের গলায় ধরে বলল, ‘তারপর মহাপ্রতিহার মশাই, দয়া করে শয্যাভবনের দ্বারটি উন্মুক্ত করুন তো দেখি। ওই জারজ কামুকটার ধর্ষনেচ্ছা জন্মের মতো মিটিয়ে দিয়ে যাই!’
মহা আতঙ্কিত দত্তসেন প্রশ্ন করলেন, ‘ক্কে তুমি? ক্কে তুমি? ক্কে তুমি?’
তরুণটি একগাল হেসে ভারি বিনীতভাবে বলল, ‘অধমের নাম কচ, কুমার কচগুপ্ত।’
.
একটি বাঁক পেরিয়েই তাকে দেখতে পেলেন নন্দকুমার। একটি অতিবৃহৎ দেবদারু বৃক্ষের নীচে বসে আছে সে। দুই পা সামনের দিকে প্রসারিত। কেশরাজি অবিন্যস্ত ও বিস্রস্ত। মুখখানি অন্যদিকে ফিরানো। প্রথম দর্শনে মনে হয়ে দেহে যেন প্রাণ নেই।
ধীরে ধীরে তার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন নন্দকুমার। তরবারি কোষমুক্ত করে তার অগ্রভাগ দিয়ে মেয়েটির মুখ নিজের দিকে ফেরালেন।
আহা, কী অনিন্দ্যসুন্দর মুখখানি। জীবনে কম নারী ভোগ করেননি নন্দকুমার। কিন্তু এমন কমনীয় সৌন্দর্য কমই দেখেছেন তিনি। এই জোছনার আলোছায়ায় মনে হচ্ছে যেন কোনও শাপভ্রষ্ট অপ্সরা নেমে এসেছেন মর্ত্যলোকে।
নন্দকুমার গম্ভীরস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কে কন্যা? এই পর্বতারণ্যে একাকী কী করছ?’
মেয়েটি খানিকক্ষণ অবাক চোখে তাকিয়ে রইল নন্দকুমারের দিকে। তারপর ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল, ‘আমি মগধের এক বড় অভাগিনী নারী, আর্য। আমাকে উদ্ধার করুন।’
নন্দকুমার চমকিত হলেন। প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি এখানে এলে কী করে?’
মেয়েটি যা জানালো তা এইরকম।
এই অভাগিনী হল পট্টমহিষী ধ্রুবার একান্ত সহচরী। রুদ্রসিংহের বাহিনী গুপ্তশিবির ঘিরে ধরামাত্র সেখানে প্রবল গোলযোগ এবং অন্তর্বিরোধ শুরু হয়ে গেছে। ধ্রুবাকে রুদ্রসিংহের হাতে সমর্পণের সিদ্ধান্ত নিতেই ক্ষুব্ধ চন্দ্রগুপ্ত তরবারি হাতে সম্রাট রামগুপ্তর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। ফলত দুজনেই এখন মারাত্মকভাবে আহত। অবস্থা বুঝে সেনাপতি সূর্যস্বামী এবং মহামাত্য শিখরস্বামী পলাতক। সম্রাটের সঙ্গে আসা সেনাবাহিনী বিক্ষুব্ধ এবং বিদ্রোহী হয়েছে৷ প্রাক্তন সেনাপ্রধান দনুজদমন দায়িত্ব নিতে গিয়ে বিদ্রোহী সেনাদের হাতে নিহত। অন্যান্য অমাত্যরা হয় বন্দী, নয়তো আহত হয়েছেন।
গুপ্তসেনাদের অনেকেই রুদ্রসিংহের বাহিনীতে যোগ দিতে চায়। এমন অবস্থায় এই কন্যা এবং তার সহচরীরা গুপ্তশিবিরে আর নিজেদের নিরাপদ বোধ করছে না। তাই তারা অতি সঙ্গোপনে পালিয়ে এসেছে এই অরণ্যে। আর্য কি তাদের কোনওভাবে নিরাপদে পাটলিপুত্রে প্রত্যাগমন করতে সাহায্য করতে পারেন? অবশ্য তার জন্য আর্য উপযুক্ত পারিশ্রমিক পাবেন। ধ্রুবা এবং রাজমাতা দত্তাদেবীর অধিকাংশ গহনা তারই কাছে গচ্ছিত থাকত। সেসব বহুমূল্য রত্নরাজি সঙ্গে নিয়ে এসেছে সে। তার অর্ধাংশ সে সাহায্যের মূল্যস্বরূপ আর্যর করকমলে সমর্পণ করতে ইচ্ছুক। আর্য কি সেসব রত্নরাজি নিজের চোখে একবার দেখতে চান?
নন্দকুমারের মনে হল এমন সুমধুর সংবাদ বহুদিন তাঁর কর্ণগোচর হয়নি। তিনি আকর্ণবিস্তৃত হেসে বললেন, ‘সে তো বটেই সে তো বটেই। তা কোথায় আছে সেই রত্নসম্ভার? আর তোমার বাকি সঙ্গিনীরাই বা কোথায়? তাদের সঙ্গেও একবার দেখা করতে হয় তো।’
মেয়েটি উঠে বসে বলল, ‘আসুন আর্য।’
.
মহাদেবী ধ্রুবা সলজ্জপদে শয্যাভবনে প্রবেশ করেই স্বহস্তে দ্বারটি বন্ধ করলেন। তবে তিনি একা নন, সঙ্গে আরেক অবগুণ্ঠিতা নারী। ধ্রুবা রুদ্রসিংহের দিকে আনতশ্রদ্ধ অভিবাদন করে বললেন, ‘মহাবীর রুদ্রসিংহকে দাসী ধ্রুবার প্রণাম।’
রুদ্রসিংহ প্রসন্নস্বরে বললেন, ‘এসো ধ্রুবা এসো। এই যে তুমি স্বেচ্ছায় এসেছ, এতে আমি অত্যন্ত প্রীত হয়েছি। তোমার মতো বীরাঙ্গনাকে অঙ্কশায়িনী করার ইচ্ছা আমার বহুদিনের। সেই মালবদেশের অবরোধের সময় তোমার যুদ্ধকৌশল আমাকে বড় মুগ্ধ করেছিল। তখন থেকেই বড় সাধ ছিল তোমাতে উপগত হওয়ার। সে যাই হোক, তোমার সঙ্গে ওটি কে?’
ধ্রুবা ব্রীড়ানত স্বরে বললেন, ‘আজ্ঞে, এ আমার বাল্যসখী মন্দা, নাথ। আপনার বীরত্বের বহু কাহিনি শৈশব থেকেই আমাদের মন জয় করেছে। তাই মন্দাও এসেছে আমার সঙ্গে, সেও আমার সাথে আপনার চরণের দাসী হতে চায়।’
রুদ্রসিংহ হা-হা করে হেসে বললেন, ‘বাহ্ বাহ্, অতি চমৎকার! তোমাদের দেখে অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছি। আশা করি তোমাদের দুজনকেই শয্যায় তৃপ্ত করতে পারব। এসো, এবার অবগুণ্ঠনখানি খোলো দেখি!’
ধ্রুবা অবগুণ্ঠন খুলে মহারাজের দিকে তাকিয়ে একটি সলজ্জ হাসি উপহার দিলেন। কিন্তু মন্দা অবগুণ্ঠন খুললেন না। তার বদলে মহারাজের পায়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত হলেন।
ধ্রুবা অবাক হলেন তারপর ক্ষুব্ধস্বরে বললেন, ‘একী মন্দা, এ কেমন আচরণ? মহারাজের শ্রীচরণবন্দনায় প্রথম অধিকার আমার। তুমি কোন বিবেচনায় সেই অধিকার খর্ব করলে? তুমি না আমার সখী! তুমি কি আমার প্রতিস্পর্ধি হতে চাইছ? আমার পূর্বে মহারাজের অঙ্কশায়িনী হতে চাইছ? মনে রেখো, আমি কখনোই তা হতে দেব না।’
রুদ্রসিংহ বললেন, ‘আহা থাক না, আজ আবার কলহ কেন?’
ধ্রুবা উত্তেজিতস্বরে বললেন, ‘কলহের কারণ আছে মহারাজ। এই নারী আমার বাল্যসখী। আমার সঙ্গে প্রতিপালিত হয়েছে, মালব রাজকোষের অন্নে পরিপুষ্ট হয়েছে। এর সমস্ত পালনপোষণ করেছেন আমার পিতা চন্দ্রজ্যোতি। আর আজকে সে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে আমার আগে আপনার অঙ্কশায়িনী হতে চায়? এ কখনোই হতে পারে না।’
বলতে বলতেই ধ্রুবা ঝাঁপিয়ে পড়লেন সেই অবগুণ্ঠিতার উপর। তারপর দুইজনে পথকুক্কুরীর মতো একে অন্যকে আক্রমণ করতে লাগলেন।
রুদ্রসিংহ এই দুই কলহরতা নারীদের দেখে হাসতে হাসতে বললেন, ‘আহা…বড় আনন্দের দিন। আজ যদি ওই হতভাগ্য রামগুপ্ত আর চন্দ্রজ্যোতি এখানে থাকত, তবে তারা দেখত তাদের স্ত্রী এবং কন্যা আমার অঙ্কশায়িনী হওয়ার জন্য কীরকম ব্যাকুল ও উদ্গ্রীব হয়ে আছে। এসো, তোমরা এই অনর্থক কলহ বন্ধ করে একে একে আমার শয্যায় এসো দেখি। আমি একরাত্রে দুজনকেই তৃপ্ত করতে সমর্থ।’
বলতে বলতেই রুদ্রসিংহ দুজনের হাত ধরে পৃথক করতে গেলেন। আর ঠিক তখনই ধ্রুবা একটানে ছিঁড়ে ফেললেন অবগুণ্ঠিতা নারীটির বস্ত্রাবরণ, খসে পড়ল তাঁর কায়াবন্ধ ও অন্তরীয়। রুদ্রসিংহ সচকিত হয়ে দেখলেন, তাঁর সামনে মন্দা নয়, দাঁড়িয়ে আছেন গুপ্তবংশের গৌরব, মহাপরাক্রমশালী কুমার চন্দ্রগুপ্ত!
.
খানিক পথ যাওয়ার পর নন্দকুমার বুঝতে পারলেন যে তিনি ক্রমেই আরও ঘন অরণ্যের মধ্যে প্রবিষ্ট হচ্ছে। পথটি প্রথমে নীচের দিকে কিছুটা গিয়ে পুনরায় ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। কন্যাটিও মাঝেমধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে নিবিড় বনানীর মধ্যে। কিছুক্ষণ তাকে দেখতে না পেলেই একবার হাঁক দেন তিনি। মেয়েটি সাড়া দিয়ে তাকে পথ চিনিয়ে দেয়।
এইভাবে বেশ কিছুক্ষণ গেল। হঠাৎ কোথা থেকে একখণ্ড মেঘ এসে ঢেকে ফেলল সপ্তমীর চাঁদ৷ অরণ্যে নেমে এল ঘন অন্ধকার।
নন্দকুমারের কেমন যেন অস্বস্তি হতে লাগল। চারিদিকের এই নিশ্চুপ অন্ধকার, বাতাসে পাতার মর্মরধ্বনি, সবই বড় অদ্ভুত মনে হতে লাগল তাঁর৷ তিনি একবার মৃদুস্বরে মেয়েটিকে ডাকলেন।
এই প্রথমবার কোনও উত্তর এল না।
নন্দকুমার বীর এবং সাহসী পুরুষ। তবু তাঁর ভয় করতে লাগল। তিনি এবার একটু উচ্চস্বরে ডাকলেন মেয়েটিকে। তখনই তাঁর খেয়াল হল যে তিনি মেয়েটির নাম জানেন না।
নন্দকুমার ভাবছিলেন তিনি ফিরে যাবেন কি না। আর ঠিক তখনই একটি ক্ষীণ শিসের শব্দ শুনতে পেলেন তিনি। তারপর আরও শিসের শব্দ।
নন্দকুমারের মাথার মধ্যে বিপদের ঘণ্টি বেজে উঠল। লোভের বশবর্তী হয়ে মস্ত বড় ছলনার শিকার হয়েছেন তিনি। তাঁকে দ্রুত নিজের সঙ্গীদের কাছে ফিরতে হবে। এখনই!
তিনি পালাবার জন্য দ্রুত ফিরতেই একটি তরবারির অগ্রভাগ ঠেকল তাঁর কণ্ঠদেশে। কে যেন কৌতুকের সুরে বলে উঠল, ‘আহা, অত উতলা হচ্ছেন কেন ভদ্র। এই তো সবে মিলিত হতে এলেন। কিছু আলাপ পরিচয় হোক। তারপর, রুদ্রসিংহ কী আদেশ দিয়ে এখানে পাঠিয়েছে আপনাকে?’
.
দত্তসেনের কণ্ঠে তরবারি দেখেই কিঙ্করীটি আর্তনাদ করতে করতে পালিয়েছিল। দত্তসেন বোধহয় সাহায্যের আশায় ছিলেন। কিন্তু কচগুপ্তর উদ্যত তরবারি তার আর সুযোগ দিল না। সাহায্য এসে পৌঁছবার পূর্বে তাঁর সাধের মস্তকটি ভূমিতলে অবলুণ্ঠিত হতে লাগল।
রক্তস্নাত তরবারিটিকে মাথার উপর ঘুরিয়ে কুমার কচ সগর্জনে বললেন, ‘জয় মহামায়া, জয় ভদ্রকালী। ওরে তোরা তোদের অসি কোষমুক্ত কর। আজ শকরক্তে এই ভীমনগরের মৃত্তিকা স্নান করাব, এই পাপভূমির লজ্জামোচন করব। জয় সম্রাট সমুদ্রগুপ্তের জয়, জয় কুমার চন্দ্রগুপ্তের জয়।’
অন্যান্য প্রহরীরা এই আকস্মিক আক্রমণে হতচকিত হয়ে গেছিল বটে। তবে দ্রুতই সম্বিৎ ফিরে পেল তারা। আর তৎক্ষণাৎ ভীমরবে দৌড়ে আসতে লাগল গুপ্তসৈন্যদের দিকে। ক্ষুদ্র গুপ্তসৈন্যদলটি মরণপণ সংগ্রামে রত হল শকদের সঙ্গে।
গুপ্তরা খর্বকায় হলে কী হবে, তাদের রণকৌশল অতি সুনিপুণ। তারা প্রাণপণে লড়ে চলল শকপ্রহরীদের সঙ্গে। কিন্তু শকপ্রহরীরা একে আকারে প্রকারে গুপ্তসৈন্যদের দ্বিগুণ, তদুপরি তারা সংখ্যায় অধিক। প্রথম দলটি ভূমিশয্যা নেওয়ার পরেই গুপ্তসৈন্যরা দেখল শকদের দ্বিতীয় দলটিও তাদের দিকে ধাবমান।
ঠিক সেই সময় জয়দ্রথ চিৎকার করে উঠল, ‘সাকেত, বিজয়, মুকুন্দ।’
তিন ক্ষীণকায় বঙ্গপুঙ্গব এতক্ষণ কয়েকটি বৃহদাকৃতির প্রস্তরের আড়ালে লুকিয়েছিল। জয়দ্রথের আহ্বান শুনে উঠে দাঁড়াল তারা। আর আগুয়ান শকসৈনিকদের দিকে তাদের বয়ে আনা পুটিকাগুলি মুখ খুলে ছুড়ে দিল।
প্রথমে শকসৈন্যরা বোঝেনি কী উড়ে এল তাদের দিকে। তারপর তারা শিউরে উঠে দেখল তাদের চারিদিক ঘিরে ঘোর কৃষ্ণবর্ণ বিষাক্ত পার্বত্যসর্পের দল! এতক্ষণ বন্দী হয়ে থাকা সর্পকুল তাদের ক্রোধফণা মেলে দাঁড়াল অগ্রবর্তী শকসৈন্যদের দিকে। তারপর তারা প্রথমেই যাদের সামনে পেল তাদের উপর ঢেলে দিতে লাগল নিজেদের উগ্রবিষ।
শকসৈন্যরা এই বিষধর ভুজগকুল বড় উত্তমরূপে চেনে। তারা আর্তনাদ করতে করতে দ্রুত সৈন্যাবাসের দিকে ধাবিত হল।
জয়দ্রথ বলল, ‘প্রভু এবার তো শয্যা ভবনের দ্বার উন্মুক্ত করতে হবে। নইলে শত্রুসৈন্যদল এসে পড়লে তো…’
দুজনেই দৌড়ে গেলেন শয্যাভবনের দিকে। কিন্তু সেই বিশাল দ্বার শত ধাক্কাতেও বিন্দুমাত্র চ্যুত হল না।
.
নন্দকুমার উদ্বিগ্নক্রোধিতস্বরে বললেন, ‘কে তুমি? কোন সাহসে আমার পথরোধ করেছ? তুমি জানো আমি কে?’
অজানা স্বরের কৌতুক আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল, ‘জানি বৈ কী। আপনি নন্দকুমার। রুদ্রসিংহ নামক ওই অপোগণ্ডটির পোষ্য সারমেয় বিশেষ।’
সঙ্গে সঙ্গে কারা যেন খিলখিল করে হেসে উঠল। নন্দকুমার আরও উত্তেজিত হয়ে উঠলেন, ‘বাচালতা কোরো না পথিক। তুমি যেই হও, পথ ছাড়ো। রুদ্রসিংহের সেনানীকে দ্বন্দ্বে আহ্বান করার স্পর্ধা কোরো না।’
‘আর যদি না ছাড়ি?’
‘তাহলে জেনে রাখো যে মহারাজ রুদ্রসিংহের দক্ষতম ঘাতকদল এই মুহূর্তে ওই পর্বতচূড়ায় তীক্ষ্ণাগ্র ভল্ল ও ধনুর্বাণ হাতে আমার সঙ্কেতের অপেক্ষায় আছে। তোমাকে মুহূর্তের মধ্যে ছিন্নভিন্ন করতে তাদের মুহূর্তের অধিক সময় লাগবে না।’
কণ্ঠস্বরে ছদ্মহতাশা প্রকাশ পেল, ‘তাই বলো। তোমার একার সামর্থ্য নেই আমাকে পরাস্ত করার। সঙ্গী যবনদলের অপেক্ষায় আছ।
এবার চরম ক্ষোভে ফেটে পড়লেন নন্দকুমার। চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘তোমার এত স্পর্ধা যে তুমি স্বয়ং নন্দকুমারকে ভীতিপ্রদর্শন করো? সাহস থাকলে প্রকাশ করো নিজেকে। আর কোথায় সেই ছলনাময়ী নারী? দেখি কোন রণ্ডার এত সাহস হয় যে নন্দকুমারকে বিপদে ফেলে!’
সঙ্গে সঙ্গে নন্দকুমারকে ঘিরে একটি বৃত্ত জুড়ে খর্বক্ষুদ্র দণ্ডদীপিকাদল জ্বলে উঠল। নন্দকুমার ভীতভাবে দেখলেন যে তাঁকে ঘিরে কয়েকজন শস্ত্রধারী ভয়ানকদর্শন সৈন্য দাঁড়িয়ে। আর তাঁর ঠিক সামনে একজন রাজবেশধারী প্রৌঢ়। সেই প্রৌঢ়রই তরবারির অগ্রভাগ তাঁর কণ্ঠস্থাপিত।
নন্দকুমার ভীতভাবে বললেন, ‘কে আপনি?’
প্রৌঢ় সামান্য হেসে বললেন, ‘যাক, তুমি থেকে আপনিতে উন্নীত হয়েছ দেখে ভারি প্রসন্ন হলাম হে। গুরুজনদের সম্মান প্রদর্শন তো ভারতের শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা, কী বলো?
সে যাই হোক, তোমার প্রশ্নের উত্তরে অবনত মস্তকে জানাই যে অধমের নাম চন্দ্রজ্যোতি। আপাতত মালবদেশ শাসনের দায়িত্বে আছি৷ বিশ্বস্তসূত্রে সংবাদ পেলাম তোমরা নাকি এতদঞ্চলে আমার জামাতৃদেবের সঙ্গে সসৈন্যে সাক্ষাৎ করতে এসেছ। তাই ভাবলাম তোমাদের সঙ্গে একবার আলাপ করেই যাই। কিন্তু আমার সঙ্গে পরিচিত হয়ে তোমাকে তেমন সুখী বলে মনে হচ্ছে না, কেন বলো তো?’
নন্দকুমার বিস্ফারিত চোখে মহারাজ চন্দ্রজ্যোতির দিকে চেয়ে রইলেন। তাঁর মুখে কোনও শব্দ স্ফুট হল না।
চন্দ্রজ্যোতি ছদ্মউদ্বেগের সঙ্গে বললেন, ‘তবে একটি কথা। যে কন্যাটির কাতর আহ্বানে তুমি নিজের মস্তকটি এখানে দান করতে এসেছ, তিনি আমার কন্যাসমা, নাম মন্দা। তাঁকে রণ্ডা সম্বোধন করে ভালো করোনি হে। তোমার অশ্লীল কুবাক্যে তিনি সামান্য কুপিতা হয়েছেন। কী রে মন্দা, কিছু বল মা।’
নন্দকুমারের হস্তপদ শিথিল হয়েই গেছিল। তাই যখন তিনি দেখলেন যে মহারাজ চন্দ্রজ্যোতির পেছন হতে মন্দা নামের সেই মোহময়ী নারী একটি বিচিত্রদর্শন খড়্গহস্তে আবির্ভূতা হলেন, তখন তিনি কিছু বলার সুযোগ পেলেন না। এমনকী যখন সেই মহাখড়্গ তাঁর মস্তকটি স্কন্ধচ্যুত করল, তখনও না।
.
চন্দ্রগুপ্ত আর রুদ্রসিংহ মহাঘোররবে মল্লযুদ্ধে ব্যপৃত হলেন।
চন্দ্রগুপ্ত বলশালী এবং বয়সে অপেক্ষাকৃত তরুণ। তিনি মল্লযুদ্ধ শিক্ষা করেছেন পাটলিপুত্রর শ্রেষ্ঠ মল্লবিদ চাণুরের কাছে৷ প্রবল মুষ্ট্যাঘাত এবং জরাসন্ধি কীলক প্রয়োগে তিনি রুদ্রসিংহকে ব্যতিব্যস্ত করে তুললেন।
রুদ্রসিংহ একে মহাকায়, তদুপরি মল্লযুদ্ধে অতিরথ। তিনি চন্দ্রগুপ্তর প্রাথমিক আক্রমণ অনায়াসে সহ্য করে প্রতি আক্রমণে রত হলেন৷ চন্দ্রগুপ্ত বুঝলেন যে প্রতিপক্ষ তাঁর থেকে বহুগুণে উত্তম। হয়তো তরবারি সঙ্গে থাকলে তিনি উপযুক্ত উত্তর দিতে পারতেন। কিন্তু নারীবেশ ধারণ করতে গিয়ে তিনি তরবারিটি রেখে আসতে বাধ্য হয়েছেন।
কিছুক্ষণের মধ্যে ধ্রুবার আতঙ্কিত চোখের সামনে রুদ্রসিংহ ভূপাতিত করলেন চন্দ্রগুপ্তকে। চন্দ্রগুপ্ত মুহূর্তের জন্য জ্ঞান হারালেন।
রুদ্রসিংহ এবার ধ্রুবার দিকে ফিরলেন। তাঁর চোখে লোলুপতার পরিবর্তে ফুটে উঠেছে মত্ত জিঘাংসা। কোনও সাধারণ নারী হলে এই দানবীয় রুদ্ররূপ দেখামাত্র ভয়েই অর্ধমৃতা হতেন। কিন্তু ধ্রুবা নিজেও একজন দক্ষ সমরকুশল যোদ্ধৃনারী। মহাক্রোধে রুদ্রসিংহের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন ধ্রুবা। অস্ত্র বলতে তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী খর্ব ছুরিকাখানি। তাঁর প্রথম আঘাতেই রুদ্রসিংহের বাহুতে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হল। রুদ্রসিংহ ধ্রুবাকে হাত বাড়িয়ে ধরতে গেলেন। কিন্তু ধ্রুবা সুকৌশলে এড়িয়ে গিয়ে রুদ্রসিংহের জানুতে ছুরিকাঘাত করলেন।
কিন্তু এইসব ছোটখাটো রক্তপাত রুদ্রসিংহের কাছে কিছুই না। তদুপরি তিনি ক্রোধোন্মত্ত অবস্থায় আছেন। তিনি চুলের মুঠি ধরে ধ্রুবাকে শয্যায় উপর আছড়ে ফেললেন। তারপর উগ্রস্বরে বললেন, ‘স্তব্ধ হ রে কুলটা। আগে তোর প্রেমাস্পদকে হত্যা করি, তারপর দেখি তোর যৌবনজ্বালা কতদূর বর্ধিত হয়েছে। আজ শুধু আমি নয়, ভীমনগর দুর্গের প্রতিটি শকসৈন্য ভোগ করবে তোকে।’ বলতে বলতেই রুদ্রসিংহ সামান্য নীচু হয়ে ধ্রুবার কঞ্চুলিকাটি ছিঁড়ে নিলেন, তারপর সেটি ছুড়ে দিলেন কক্ষের একপাশে।
ধ্রুবা প্রাণপণে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন বটে, কিন্তু রুদ্রসিংহের বিপুল শক্তির সামনে তিনি প্রকৃতই অসহায়। রুদ্রসিংহের একটি চপেটাঘাত তাঁকে প্রায় অচেতন করে দিল। ধ্রুবা বুঝতে পারলেন, রুদ্রসিংহ এবার তাঁর নীবিবন্ধে হাত দিয়েছেন। আর বোধহয় কয়েক মুহূর্ত, তারপরেই তাঁর বরতনু সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে পড়বে এই রাক্ষসের সামনে…
ঠিক সেইসময় পেছন থেকে একটি বস্ত্রখণ্ড এসে চেপে বসল রুদ্রসিংহের গলার উপর। ধ্রুবা সবিস্ময়ে দেখলেন তাঁর ছিন্ন কঞ্চুলিকাটি!
রুদ্রসিংহ মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন। ধ্রুবা এবার আর ভুল করলেন না। ছুরিকাটি তাঁর ডানহাতের সামনেই পড়ে ছিল। হাতখানি মুক্ত হতেই তিনি ছুরিকাটি তুলে সজোরে রুদ্রসিংহের বাম চোখে প্রোথিত করে দিলেন!
মরণান্তিক আর্তনাদ করে উঠলেন রুদ্রসিংহ। আর চন্দ্রগুপ্ত চিৎকার করে উঠলেন, ‘ধ্রুবা…আবার…’
ধ্রুবা আর দেরি করলেন না। এবার ছুরিকাটি খুলে নিয়ে প্রোথিত করে দিলেন রুদ্রসিংহের ডান চোখেও!
উঠে দাঁড়ালেন রুদ্রসিংহ। এক ঝটকায় ছুড়ে ফেললেন চন্দ্রগুপ্তকে৷ তারপর অত বড় শরীরটা মাটিতে পড়ে আহত পশুর মতো আর্তচিৎকার করতে থাকল।
চন্দ্রগুপ্ত নিজের উত্তরীয় এবং কায়াবন্ধটি ধ্রুবার দিকে ছুড়ে দিলেন। তারপর বললেন, ‘নিজেকে আবৃত করুন মহাদেবী। আর শয্যাভবনের দ্বার উন্মুক্ত করুন। ভয় নেই, কচ ওখানেই আছে।’
.
কচ, জয়দ্রথ এবং অন্যান্যরা শতচেষ্টাতেও ভবনের দরজা উন্মুক্ত করতে পারলেন না। এদিকে শকসৈন্যরা এসে পড়েছে প্রায়। ওই শোনা যায় তাদের ভীমকলরব।
জয়দ্রথ বললেন, ‘প্রভু, এবার উপায়?’
কচগুপ্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছিলেন। তিনি জগজ্জয়ী মহাবীর সমুদ্রগুপ্তর পরিবারের সন্তান। মরতে বা মারতে ভীত হন না। কিন্তু আপাতত জ্যেষ্ঠ এবং মহাদেবীকে উদ্ধার করা আশুকর্তব্য।
খানিকক্ষণ দরজায় কান পেতে কী যেন শুনলেন কচ। কই, কোনও যুদ্ধহুঙ্কারের শব্দ তো শোনা যায় না। তাহলে কি সব কিছু পরিকল্পিতরূপে সুসম্পন্ন হয়নি? জ্যেষ্ঠ কি সক্ষম হননি রুদ্রসিংহের নিধনে? আর মহাদেবী? তাঁর কী হল?
কচগুপ্তর করতল ঘর্মাক্ত হয়ে উঠল। তিনি উত্তেজনা এবং উদ্বেগে অধীর হয়ে উন্মত্তের মতো পদাঘাত করতে গেলেন শয্যাভবনের দ্বারে।
কিন্তু তার আগেই হঠাৎ শয্যাভবনের দ্বার উন্মুক্ত হয়ে গেল। কচ এবং তাঁর সঙ্গীরা সচকিত হয়ে দেখলেন সেখানে এসে দাঁড়িয়েছেন মহাদেবী ধ্রুবা। তাঁর অঙ্গবেশ বিস্রস্ত, চুল উড়ছে ক্ষুব্ধ সর্পিণীর মতো। তাঁর দুচোখে আগুন, আর তাঁর ওষ্ঠপ্রান্তে রক্ত!
আর তাঁর ঠিক পিছনে আর্তনাদরত রুদ্রসিংহের চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে নিয়ে আসছেন চন্দ্রগুপ্ত। মনে হচ্ছে যেন কোনও অতিকায় মহাষণ্ড শিকার করে তাকে আকর্ষণ করে আনছেন অরণ্যাধিপতি মৃগরাজ। রুদ্রসিংহের সমস্ত মুখমণ্ডল রক্তাক্ত। তাঁর মুখ থেকে পাশব আর্তচিৎকার ভেসে আসছে। তিনি চেষ্টা করছেন চন্দ্রগুপ্তর জানু ধরে তার গতি ধীর করার। কিন্তু রণোন্মত্ত রক্তপিপাসু কেশরীকে প্রতিহত করে এমন সাধ্য কার?
কুমার চন্দ্রগুপ্তকে দেখে ভীত হলেন কচ। আজন্মকাল ধরে যে জ্যেষ্ঠকে দেখে এসেছেন কচ, তাঁর সঙ্গে এই চন্দ্রগুপ্তর কোনও সাযুজ্য নেই। এই কালভৈরবসদৃশ কালক্রোধী, মহাউন্মত্ত চন্দ্রগুপ্তকে কখনও দেখেননি তিনি। কচের সমস্ত হাত পা যেন স্তম্ভিত হয়ে গেল।
তবে এই স্তম্ভন সাময়িক। কচকে দেখামাত্র তাঁর নাম ধরে চিৎকার করে উঠলেন চন্দ্রগুপ্ত। আর তৎক্ষণাৎ কচের হাতে পায়ে সাড় ফিরে এল। এই আহ্বানের অর্থ জানেন কচ। মুহূর্তের মধ্যে নিজের তরবারিটি ছুড়ে দিলেন চন্দ্রগুপ্তের হাতে। চন্দ্রগুপ্ত সেই তরবারি হাতে নিয়ে হুঙ্কার দিলেন, ‘জয় মহামায়া, জয় ভদ্রাকালী।’ বলেই রুদ্রসিংহকে ছুড়ে ফেললেন সবার সামনে। আর তারপর এক কোপে কেটে ফেললেন রুদ্রসিংহের মাথা।
রুদ্রসিংহের দেহকাণ্ডটি ধড়ফড় করতে লাগল। মুণ্ডটি গড়িয়ে এল সোপানের দিকে। কচগুপ্ত টেনে নিলেন জয়দ্রথর হাতের ভল্লটি। তারপর রুদ্রসিংহের মস্তকটি সেই ভল্লাগ্রে গ্রথিত করে এগিয়ে গেলেন আগুয়ান শকসৈন্যদের সামনে। হুঙ্কার দিয়ে বললেন, ‘আয় তোরা, আয়। দেখি কার সাহস আছে কুমার চন্দ্রগুপ্তর সেনানীর সামনে এসে দাঁড়াবার!’
ধাবমান শকসৈন্যরা থমকে গেল। তারপর ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল তারা।
.
মহারাজ চন্দ্রজ্যোতি যখন তাঁর সৈন্যবাহিনী নিয়ে গুপ্তশিবিরে প্রবেশ করলেন তখন শেষরাত্রি। রামগুপ্ত এবং তাঁর পারিষদবর্গ তখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না যে কোন অলৌকিক মন্ত্রবলে এই মহাবিপদ হতে উদ্ধার পেয়েছেন তাঁরা।
শ্বশুরের সঙ্গে এই প্রথম সাক্ষাৎ হল রামগুপ্তর। আর সে সাক্ষাৎ মোটেও সুখের হল না। রামগুপ্ত জীবনে এমন সুতীব্র ভর্ৎসনার মুখোমুখি হননি। তাঁর প্রতি এমন কঠোর পরুষ বাক্য যে কেউ প্রয়োগ করতে পারে, সে তাঁর কল্পনার অতীত ছিল।
‘আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে যে প্রয়াত সম্রাট সমুদ্রগুপ্তর মহান উত্তরাধিকার এমন একজন অপদার্থ, কাণ্ডজ্ঞানহীন এবং স্বার্থপর মানুষের উপর বর্তেছে। আমি এও জানি না আমার কোন পূর্বজন্মকৃত পাপের ফলে এমন কাপুরুষ ও নপুংসক মানুষের সঙ্গে আমার একমাত্র কন্যার বিবাহ সম্পন্ন হল।’
রামগুপ্ত এমনিতেই লজ্জা এবং অসম্মানের গ্লানিতে পীড়িত ছিলেন। মহারাজ চন্দ্রজ্যোতি সঠিক সময়ে উপস্থিত না হলে যে কী হত সে কথা ভাবতেও হৃৎকম্প হচ্ছে তাঁর৷ তাই এই প্রবল ভর্ৎসনার কোনও উত্তরই দিতে পারলেন না তিনি।
শিখরস্বামী বললেন, ‘আপনি শান্ত হোন রাজন। নিজের জামাতা তথা গুপ্তসাম্রাজ্যের সম্রাটের প্রতি এমন অশোভন বাক্য প্রয়োগ অত্যন্ত অনুচিত।’
‘কেন মহামাত্য? অনুচিত কেন? আমি তো চাইনি রামগুপ্তর সঙ্গে ধ্রুবার পরিণয় হোক। আমি তো কুমার চন্দ্রগুপ্তকে আমার জামাতারূপে চেয়েছিলাম। আমার কন্যারও তাই মনোবাসনা ছিল। আপনারা কোন স্পর্ধায় তার অনুমতি না নিয়ে তার সঙ্গে অন্য একজনের বিবাহ সম্পন্ন করলেন?’
শিখরস্বামী বোঝাতে সচেষ্ট হন, ‘যেহেতু কুমার কচ প্রতিজ্ঞা করেছিলেন…’
‘কুমার কচ-এর প্রতিজ্ঞাই বড় হল? আর আমার কন্যার ইচ্ছার কোনও মূল্য নেই?’
‘আপনার কন্যাও তো এই বিবাহে তাঁর অসম্মতি জানাতে পারতেন।’
‘বাহবা মহামাত্য, বলিহারি জানাই আপনার বুদ্ধিকে। কী অসাধারণ কথাই না শোনালেন। আমার কন্যা বিবাহের জন্য সেই সুদূর মালব হতে পাটলিপুত্র এসে দেখল তার জন্য অন্য পতি নির্দিষ্ট হয়েছে। তারপর সে এই বিবাহ প্রত্যাখ্যান করে আবার মালবে ফিরে যাবে। লোকে বলবে, ওই দেখো, মহারাজ চন্দ্রজ্যোতির দুর্ভাগা কন্যা। বিবাহের জন্য মহা আড়ম্বর করে গেছিল সেই সুদূর মগধে। আর তারপর তাকে পাটলিপুত্রর রাজপরিবার প্রত্যাখান করেছে বলে অনূঢ়া অবস্থায় পিতৃগৃহে প্রত্যাবর্তন করে এসেছে।’
‘বিশ্বাস করুন মহারাজ, আমরা তা চাইনি বলেই…’
‘চাননি বলেই তাকে অন্য আরেকজনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করে দিলেন তাই তো? শুধু আপনাদের ওই প্রতিজ্ঞারক্ষা নামক প্রহসনের জন্য তাকে আজীবন এই বিপুল অসম্মানের বোঝা বহন করে যেতে হবে, তাই চেয়েছিলেন আপনারা? নিজের সম্মানরক্ষার জন্য, নিজের পিতার সম্মানরক্ষার জন্য, নিজের পিতৃবংশের সম্মানরক্ষার জন্য নিজেকে পাটলিপুত্রের অহংকারের যূপকাষ্ঠে বলি দিয়েছে সে।’
দত্তাদেবী এতক্ষণ সব কথা শুনছিলেন। এবার কঠিনস্বরে বললেন, ‘আপনার অধিকারের সীমা লঙ্ঘন করবেন না মহারাজ। মনে রাখবেন, গুপ্তবংশের কাছে আপনার অনেক ঋণ আছে।’
‘আছে নয় রাজমাতা, ছিল। আজ কয়েক প্রহর পূর্বে আপনাদের সবংশে উদ্ধার করে সেই ঋণ পরিশোধ করেছি। নইলে এতক্ষণে আপনাদের মৃতদেহ জ্বলন্ত অঙ্গার হয়ে পড়ে থাকত এখানে। আর আপনাদের যুবতী ও তরুণী নারীদের যৌনদাসী করার জন্য ভীমনগর দুর্গে নিয়ে যাওয়া হত।’
দত্তাদেবী থমকে যান। এর থেকে রূঢ়তর সত্য আর হয় না।
‘আর তারপর আমি জানতে পারলাম মহান সমুদ্রগুপ্তর সন্তান, গুপ্তবংশের সম্রাট, মহাবীরোত্তম বীরশিরোমণি শ্রীযুক্ত রামগুপ্ত নিজের প্রাণ বাঁচাবার জন্য নিজের ধর্মপত্নীকে অন্য এক দস্যুর হাতে রক্ষিতারূপে তুলে দিতে স্বীকৃত হয়েছেন। যেন আমার কন্যা তাঁর স্থাবর সম্পত্তি, ইচ্ছে করলেই তিনি তাকে দান করতে পারেন। আমার স্নেহের পুত্তলি যেন বহুভোগ্যা নারী, ইচ্ছেমতো তাকে ভোগ করা যায়, ইচ্ছেমতো তাকে অন্য কারও ভোগ্যবস্তুরূপে প্রেরণ করা যায়, তাই না রাজমাতা?’
অসহ্য ক্রোধে সর্বাঙ্গ কাঁপছিল মহারাজ চন্দ্রজ্যোতির। মন্দা পিছন হতে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন, ‘শান্ত হোন জ্যেঠ। শুনেছি ধ্রুবা একা যায়নি সেই রাক্ষসের কাছে। কুমার চন্দ্রগুপ্তও তার সঙ্গে ছিলেন। এবং খুব সম্ভবত কুমার কচ-ও। তাঁরা থাকতে ধ্রুবার কোনও বিপদ হতে পারে না জ্যেঠ।’
‘সেই আশাতেই আছি রে মা’, কন্যার অমঙ্গল আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন পিতৃহৃদয় আর বাধ মানল না। অবিরল অশ্রুবারিতে ভেসে যেতে লাগল মালবরাজ চন্দ্রজ্যোতির প্রশস্ত বুকখানি, ‘একবার ফিরে পাই আমার ধ্রুবাকে, আমি তাকে জোর করে হোক, হাতে পায়ে ধরে হোক, যে করেই হোক মালবে নিয়ে যাব। সে থাকবে আমার কাছে সারাজীবন, কোথাও পাঠাব না তাকে। আমার আর কিছু চাই না রে মা, শুধু আমার মেয়েকে যেন সুস্থ ফিরে পাই।’
গুপ্তরাজপুরুষেরা নতমস্তকে নির্বাক নিস্তব্ধ বসে রইলেন। একা রামগুপ্ত নন, অপরাধী তো তাঁরা প্রত্যেকে।
তবে বেশিক্ষণ নয়। একটু পরেই কে যেন ছুটতে ছুটতে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ল সভার মধ্যে। প্রহরীরা শশব্যস্ত হয়ে তাকে তুলে ধরল। সূর্যস্বামী এতক্ষণ ম্রিয়মাণ হয়ে এককোণে বসে ছিলেন। আগন্তুককে দেখেই লাফিয়ে উঠলেন, ‘আরে এ যে জয়দ্রথ, কুমার কচের দেহরক্ষী। কী সংবাদ এনেছ জয়দ্রথ?’
জয়দ্রথ শায়িত অবস্থাতেই হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘ভীমনগর দুর্গের পতন হয়েছে। কুমার চন্দ্রগুপ্তর সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধে রুদ্রসিংহ নিহত। কুমার, মহাদেবী এবং প্রভু কচগুপ্ত সুস্থ আছেন। আমার আনন্দে মরে যেতে ইচ্ছা করছে প্রভু…’ বলেই হাসিমুখে জ্ঞান হারালো জয়দ্রথ।
