Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    রুদ্রসমগ্র – রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

    January 8, 2026

    রান্না খাদ্য পুষ্টি – সিদ্দিকা কবীর

    January 8, 2026

    শহর খুলনার আদি পর্ব – আবুল কালাম সামসুদ্দিন

    January 8, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    মাধবীরা কেউ নেই – কোয়েল তালুকদার

    কোয়েল তালুকদার এক পাতা গল্প41 Mins Read0

    মাধবীরা কেউ নেই ( কাব্যগ্রন্থ) – কোয়েল তালুকদার

    প্রথম প্রকাশ – ২০২৫ ইং

    উৎসর্গপত্র

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের
    আমার প্রাণপ্রিয় সহপাঠী বন্ধুদের প্রতি—

    যাদের সঙ্গে কাটানো প্রতিটি ক্লাস,
    প্রতিটি আড্ডা, প্রতিটি তর্ক ও হাসি
    আমার চিন্তা, মনন ও যাপনের ভাষা গড়ে দিয়েছে।

    শব্দের নৌকায় ভেসে চলার পথে
    তোমরাই ছিলে ঢেউ, দিগন্ত ও বাতাস—
    কেউ প্রশ্নে তীক্ষ্ণ, কেউ ব্যখ্যায় গভীর,
    কেউ বা নিছক ভালোবাসায় অনন্ত।

    এই বইয়ের প্রতিটি পাতায়
    আমাদের যৌবনের কোরিডোর,
    নীলক্ষেতের দুপুর,
    টিএসসির সন্ধ্যা,
    আর জ্ঞান–পিপাসু হৃদয়ের গোপন স্বপ্নেরা ছড়িয়ে আছে।

    তাই এই গ্রন্থ—
    আমাদের বন্ধুত্বের নিকষিত অক্ষরে
    তোমাদের নামেই উৎসর্গ করলাম,
    ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা ও স্মৃতির অমলিন ঋণে।বন্ধুত্বেরএই অক্ষয় আলোয়, তোমরাই আমার উৎসর্গের প্রথম ও শেষ ঠিকানা। সময় বদলায়, স্মৃতি ধূসর হয় না— তোমাদের নামেই আমার সকল শব্দের জয়যাত্রা।

    ১. মাধবীরা কেউ নেই

    আজ সময় বহুদূর, পথ ঘুরে গেছে অন্যখানে,
    কিন্তু স্মৃতির দরজায় ডাক দেয় পরিচিত মুখ।
    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, তুমি হৃদয়ের অনিঃশেষ ঠিকানা,
    ফেলে আসা দিনগুলোতেই জমে আছে জীবনের সুখ।

    মাধবীরা কেউ নেই আর,
    এই ক্যাম্পাসের ফুল–ঝরা শাখায়
    সোঁদা গন্ধে ভরে ওঠা দুপুরগুলো
    এখন নীরব বৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে।

    নীলক্ষেতের মোড়ে আর
    বেলায়েত–নেয়ামুলদের ছায়া পড়ে না,
    টিএসসির কোলাহলমুখর চত্বরে
    হামিদা, বীনা, পান্নার হাসির ঢেউ ওঠে না।
    বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা অপেক্ষাগুলো
    ঝরে গেছে বাতাসে, অচেনা ইশারায়।

    আকাশের তারা–ভেজা সন্ধ্যায়
    লুসি–চাঁপা–রীনারা আর ঝলমল করে না,
    ইকবাল, মুসা, কাওসার, আলো, মোশারফের কণ্ঠস্বর মিশে গেছে দূর আড্ডার ধূলায়।
    নীলা হারিয়ে গেছে নীলাঞ্জনার নীলিমায়,
    শাহিন আর মিলন–ভাইয়ের ঘর করা গল্পে
    কেবল ভালোবাসা , আর মায়া ।

    বাবলু, সুজন, বাহার, এনামুল, আফাজ, দেলোয়ার, নেয়ামুল হক —
    মধুর ক্যান্টিনের ঠিকানা ভুলে গেছে,
    ভবতোষেরা কবে যে পাড়ি দিয়েছে
    মনে নেই, ডায়েরির পাতাতেও না।

    হেনা স্যার চলে গেছেন,
    হলুদ রোদের ওপারে— না ফেরার দেশে,
    দুলু, খলিল, সালাম, মনজুর, খুকুমণি
    পদাবলীর ক্লাসঘরের দেয়ালে
    শুধু এখন অশ্রু–জমা নীরবতা।

    মনজু, হক, তালেব, ডেইজী, টনি, তুসী, রানু, হাসি, বেলা, বিলু, লাভলী, মিনু, আকন্দ, মাহেলা, রাণী, কামরুল, ইফফাত, হাস্না, বেবী, শাকিলা—
    অভিধানের পেছনের শব্দের মতো উধাও,
    নাসিমা, রুবি, লাকী, চন্দ্রাবতী , প্রভাতী—
    কবিতার লাইনের ফাঁকে শুধু
    নিঃশব্দ বিরামচিহ্ন।
    আরও মনে পড়ে আবছা মুখ – পারভীন, শিরীন, জুলিয়ানা আর জ্যোৎস্নাভূক রাত্রিতে জ্যোৎস্নার কথা, রক পাথরের ফাঁকে নাজমুলকে।
    লাইব্রেরির বারান্দায় শরৎ আর নেই,
    বিকেলের গল্প আর আঁচ করে না
    লিটন, নওশের, রবি, শাহ আলম, শাহ আলমগীর। মণি, নাহার, শিশির, অশোক—
    সবাই অনেক দূরের স্বপ্ন,
    কুয়াশা ছড়ানো নাম, মুছে–যাওয়া মুখ।

    মধুর ক্যান্টিনে আর চায়ের ঝড়ে
    কোনো বিপ্লব আঁচল তোলে না,
    ঝড়গুলো চুপসে গেছে কাপে–কাপে,
    ক্যাম্পাস শামসুর রাহমানের কবিতার পঙ্‌ক্তির মতো
    ফাঁকা শোকসভা, শব্দহীন শূন্যতা।

    নিঃসঙ্গ রোদদুরে দাঁড়িয়ে আজ
    চোখ মেলেই দেখি—
    মাধবীর লতা আছে,
    কিন্তু মাধবীরা কেউই নেই।

    ২. যক্ষ–প্রিয়া

    হে প্রিয়তমা, অলকা নগরীর চূড়ায় আজও কি তোমার দীপশিখা রাতকে চুম্বন করে?
    নির্বাসনের ধুলোয় ঢেকে থাকা এই বুকে
    তোমার স্মৃতি এক সোনালি চন্দন–চূর্ন,
    প্রতিটি শ্বাসে তার সৌরভ জাগায়
    ঘুমন্ত কামদেবকে।

    তোমার কেশভারে মেঘেরা বাসা বাঁধে—
    ঘন কালো, আর্দ্র, চঞ্চল,
    যেন বর্ষার নিশ্বাসে ভিজে থাকা এক অদৃশ্য প্রণয়–পত্র।

    তোমার অধর— পাকা বিম্বফলের রঙে,
    যেন সন্ধ্যার লজ্জায় রাঙানো রসাল অনুরাগ; আমি তাকে ছোঁয়ার আগেই
    দিগন্তের বাতাস ঈর্ষায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

    তোমার স্তনের উপত্যকায়
    মালতী–লতা ঘুমাতে চায়,
    নরম বাঁকে বাঁকে খুঁজে নেয়
    ভালোবাসার আশ্রয়;
    সেই বক্রতা বুকে ধারণ করলে
    পৃথিবীও ভুলে যায় তার অভিকর্ষ।

    হে অদূর–দূরত্বের প্রিয়া,
    যদি মেঘদূত তোমার দুয়ারে কড়া নাড়ে,
    তুমি কি তার গায়ে আঙুল বুলিয়ে বলবে—
    “এ মেঘও আমার স্বামীর মতোই ব্যাকুল”?
    তার বুকে লেখা বর্ষার নীল অভিলাষে
    তুমি কি চিনতে পারবে
    তোমায় ঘিরে থাকা আমার বঞ্চিত আলিঙ্গন?

    যদি জানতে আমায়—
    তুমি বৃষ্টিকে বরণ করতে না,
    তুমি বৃষ্টিতে আমি-কে বরণ করতে,
    মেঘের ছদ্মবেশ ভেদ করে
    আমাকে পরাতে তোমার
    অচেতন হৃদয়ের মালা।

    আমি অপেক্ষায়—
    তুমি অলকায়, আমি নির্বাসনে,
    তার মাঝখানে শুধু আকাশ, আর সেই আকাশ ভরাট— তোমার জন্য আমার
    অপরিমেয় শৃঙ্গার–তৃষ্ণায়।

    প্রিয়া,
    তুমি থাকলে অলকা স্বর্গ,
    না থাকলে রামগিরির অরণ্যও মরুভূমি।
    হৃদয় পাঠালাম মেঘের কাঁধে,
    চুম্বন পাঠালাম মেঘের জলে—
    তুমি গ্রহণ করো,
    আর মেঘকে ফিরিয়ে দিও
    তোমার নিশ্বাসের উষ্ণ উত্তরে।

    ৩. সবুজে লুকানো নিমন্ত্রণ

    একদিন গাঢ় সবুজ রঙের শাড়ি পরে
    হিজল বনের পাশে এসে তুমি দাঁড়িও।
    তোমার শরীরে তখন কুহকী সবুজের ছায়া,
    দেখে মনে হবে— এ তো বনেরই এক অধ্যায়,
    ডালপালার গোপন কবিতা, পাতার নীরব ভাষা।

    তুমি লুকিয়ে থাকবে সেখানে পাতার রঙে,
    সবাই দেখবে শুধু দিগন্তজোড়া হরিৎ বন,
    দল বেঁধে উড়ে যাওয়া পাখির ডানা,
    হিজলের শিকড় ছুঁয়ে থাকা নরম মাটি,
    ঝরা পাতার উপর নির্ঝঞ্ঝাট আলো–অন্ধকারের খেলা।
    কেউ জানবে না, তোমার নিঃশ্বাস মেশানো আছে
    বনের হাওয়ার ভাঁজে, পাতার ফাঁকে,
    শিশির বিন্দুর নিস্তব্ধ আঙুলের ডগায়।

    সবাই দেখবে সবুজ পাতা—
    কিন্তু আমি জানব,
    সেখানে তুমি দাঁড়িয়ে,
    নিবিড় অরণ্যের মতোই গম্ভীর,
    গোপন অথচ গভীর এক উপস্থিতি…

    ঠিক তখনই আমি সবুজ প্রজাপতি হয়ে উড়ে যাব।
    তোমার চোখের কোণে হয়ত এক ঝলক ঝিলিক,
    কেউ বোঝার আগে,
    আমি গিয়ে পড়ব তোমার আঁচলের নীচে।
    আঁচলের ভাঁজে তখন পাতার ঝিরঝির শব্দ,
    আর তার ভেতরে আমার ডানার কম্পনে
    এক ক্ষুদ্র মধুর দুনিয়া জেগে উঠবে।

    আমি ঘুরে বেড়াব সেখানে,
    দেখব চির হরিৎময় আর এক স্বপ্নের জগৎ—
    যেখানে বনের রং কখনও ফিকে হয় না,
    যেখানে আলো শব্দ হয়ে নামে,
    আর শব্দ রূপ নিয়ে ভাসে বাতাসে।
    হিজলের পাতায় লেখা থাকবে অব্যক্ত প্রেমের বর্ণমালা,
    আর তোমার আঁচলে উড়বে বনেরই গোপন পতাকা।

    “নয়ন আমার রূপের পুরে
    সাধ মিটায়ে বেড়ায় ঘুরে,
    শ্রবণ আমার গভীর সুরে হয়েছে মগন।”
    তুমি কি তখনও শুনতে পাবে,
    আমার ডানার ডাকে জন্ম নেওয়া সুর?

    “জগতে আনন্দ যজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ—”
    সেই নিমন্ত্রণ নিয়েই তো উড়ি,
    এই বন, এই প্রেম, এই স্বপ্ন—
    সবই এক আনন্দময় আহ্বান,
    সবই এক অনন্ত সবুজের বৈরাগ্যহীন যাত্রা।

    হয়ত ফিরব না আর কোনদিন আকাশে,
    হয়ত রয়ে যাব তোমার আঁচলের ছায়ায়—
    বন হয়ে, পাতা হয়ে, প্রজাপতি হয়ে,
    অথবা এক অদৃশ্য নীরব প্রেম হয়ে—
    যা সবুজের শরীরে লেখা থাকে,
    অথচ গাঢ় ভালবাসার মতোই গভীর দেখা যায় কেবল হৃদয়ে…

    ৪. তুমি থাকলে কোলাহল

    তুমি থাকলে কোলাহলেরও কণ্ঠে সুর ফোটে,
    তুমি না থাকলে নীরবতার ভাঁজে ভাঁজে ব্যথা জমে।
    তুমি থাকলে পৃথিবী কথারা ফুল হয়ে ঝরে,
    তুমি না থাকলে মন বিষণ্ণ কোনো সন্ধ্যার মতো ঢলে পড়ে।

    তোমার পায়ের শব্দে আনন্দ-ভৈরবী বেজে ওঠে
    ধুলোমাখা পথের বুকেও, অচেনা মোড়ের প্রাঙ্গণে।

    তুমি আর কখনো ফিরবে না—জেনেও,
    আমি দৌড়ে যাই পথের দিকে,
    মনে হয় এই বুঝি ডাকছো তুমি,
    এই বুঝি আবার উঠবে সেই সুর।

    কিন্তু গিয়ে দেখি—
    পথের দীর্ঘশ্বাসে জমে আছে শুধু নির্জনতা,
    আর তার বুকভরা কান্নায়
    শব্দহীন ক্রন্দন নেমে এসেছে ধুলোয়।

    দেখি—পথের ওপর নীরবতা’রা কাঁদছে,
    আর আমি দাঁড়িয়ে শুনছি
    এক বিষণ্ণ ভৈরবীর অন্তিম রাগিণী,
    যা শুধু কাঁদতেই জানে— ফিরতে নয়।

    ৫. অম্লান

    তোমাকে পাশে নিয়ে যে সন্ধ্যা দেখি,
    যে রাতের গম্ভীর বিস্ময় ছুঁয়ে থাকি—
    বিমুগ্ধ প্রণয়ের নিঃশব্দ আর্তি
    চোখের পাতায় ফুঠে ওঠে ধীরে।

    চোখের উপর চোখ রেখে আমি বুঝে নিই—
    এই ক্লান্ত, ক্লেদাক্ত শহরের বুকে
    আমাদের প্রেমের রং আজও অম্লান,
    ধুলোর ভিড়েও যা ম্লান হয় না।

    কোলাহল থেমে গেলে,
    শহরের ক্লান্তিরা ঘুমোলে,
    ধোঁয়া-ভেজা আকাশ যখন নিশ্চুপ—
    ভালোবাসা তখনও রয়ে যায় জাগ্রত,
    জীর্ণতাহীন আলো হয়ে,
    অবিনশ্বর স্পর্শ হয়ে,
    অনন্তের মতো নির্মল।

    এই শহর ক্লান্ত হতে পারে,
    আমরা নই—
    কারণ আমাদের প্রেমই একমাত্র বাতিঘর,
    যা কোনো রাত নিভিয়ে দিতে পারে না,
    কোনো ক্লান্তি মুছে দিতে পারে না।

    ৬. দেবযানীর জন্য একটি রাত

    তোমাকে নিয়ে হাঁটতে ইচ্ছে করে।
    শহরের দিকে নয়, শহরের ভেতর দিয়ে—
    অসংখ্য রাস্তার নাম ভুলে,
    শুধু পদচিহ্ন মনে রেখে।

    তুমি পরবে সাদা জামদানি,
    মীরপুরের তাঁতের শান্ত আলো জড়ানো।
    শাড়ি থেকে ভাসবে মাড়ের কড়া গন্ধ—
    শহর থামবে না,
    কিন্তু মুহূর্তের জন্য নিঃশ্বাস নেবে।

    তুমি বলবে, তুমি কারো মতো নও।
    নীরা নও, মাধবীলতাও নও,
    সুনন্দা, রূপা— কোনও গল্পের ছাঁচে ঢালা নও।
    আমি বলব—
    তুমি দেবযানী হয়ে ওঠো আজ,
    নামহীন শহরের জন্য একটি নতুন নাম।

    তারপর আমরা ট্রেনে উঠে পড়ব,
    গন্তব্য ছাড়া, সময় ছাড়া, ভয় ছাড়া।
    ট্রেন আমাদের নামিয়ে দেবে
    দূরের কোনও স্টেশনের নীরবে—
    যেখানে আলোরও শব্দ নেই।

    আমলকীর বনে শ্রাবণ মেঘ নেমে আসবে,
    ধূপ–ছায়ার ভিজে যাওয়া গন্ধে
    রাত আরও গভীর হবে।
    আমরা ভিজব।
    শহরের ধুলো, মনের ভার,
    সব ধুয়ে যাবে—
    শুধু প্রেমটা ভিজবে না,
    আরও উজ্জ্বল হবে,
    ভেজা কাগজে না–মোছা কালির মতো।

    সকাল এলে
    আমরা হয় রেললাইটার পাশে বসে থাকব,
    অথবা ফিরব অন্য কেউ হয়ে—
    এই শহর আর আগের মতো আমাদের ডাকবে না।
    কারণ আমরা তখন
    শ্রাবণের জলে লেখা একটি নীরব গল্প,
    মাড়ের গন্ধে শুরু,
    বৃষ্টির সাক্ষ্যে সম্পূর্ণ।

    ৭. শকুন বিষয়ক কবিতা

    আমার দেশে আকাশটা আর নীল নয়,
    ডানা ঝাপটায় কালো ছায়ার মিছিল।
    সূর্য ওঠে, তবু ভোর জ্বলে না—
    আলো কেড়ে নেয় ঠোঁট-তীক্ষ্ণ শকুনদল।

    গাছের ডালে এখন বসে থাকে হিসেব,
    হাড় গোনে, মাংসের ভাগ মাপে।
    মাঠে আর ফসলের ঘ্রাণ নেই—
    লালসার গন্ধে পচে ওঠে প্রতিটি বাতাস।

    নদীর স্রোতেও ভেসে আসে পালক,
    পানির বুকে ক্ষুধার বৃত্ত আঁকে,
    জল আর শীতল করে না পা—
    জলেও শিকার খোঁজে লোভী চোখ।

    দেশের মানচিত্রে এখন নখের দাগ,
    খচিত ক্ষতের মতো সীমানা।
    মায়ের বুকেও জমে ওঠে ভয়—
    স্নেহের বদলে রক্তের হিসাব।

    কিন্তু শোনো, শকুনের আহ্বান শেষ সত্য নয়—
    মাটির গভীরে এখনো বীজ ঘুমিয়ে আছে।
    একদিন ঠিক ঝড় উঠবে গর্বের ডাকে,
    পালকের অন্ধকার ছিঁড়ে বের হবে নতুন ভোর।

    সেদিন আকাশ আর দখলে থাকবে না ঠোঁটের,
    ডানা ঝাপটাবে স্বাধীনতার পাখি,
    শকুনের শহর পুড়ে ছাই হবে বাতাসে—
    আর আমার দেশ আবার বাঁচবে মানুষের নিঃশ্বাসে।

    – ঢাকা
    ডিসেম্বর ২০২৫ ইং

    ৮. সন্ধ্যার গান

    এই নীরব বাতাসে ভেসে আসে অচেনা মধুর সুর,
    তোমার ডাকে জেগে ওঠে হৃদয়—স্বপ্নে জাগে নূতন নূপুর।
    কেন যে এমন স্পর্শে মন হয় কুসুমের মতো নরম,
    তোমার ছায়ায় দাঁড়িয়ে দেখি জীবন কত আলোভরম।

    বন্ধু, তুমি এলে বলেই আজ সন্ধ্যাটা হয়ে উঠেছে গান,
    রংধনুর সাত রঙ মিশে যেন ছুঁয়ে দিলো প্রাণ।

    ৯. মা

    মা চলে গেছে—আজ এক যুগেরও উপরে,
    তবু বুকে জমে আছে শিশির ভেজা ডাক, “মা”।

    খুব ইচ্ছে করে,
    তোমার পাশে বসে
    আরও একটুখানি সকাল ছুঁয়ে নিতে,
    এক প্রহর তোমার কোলের আঁচলে বাঁধা পড়ে থাকতে।
    সেই ছোট্ট আমি হয়ে,
    খালি পায়ে উঠোন মাড়াই—
    স্কুলব্যাগের চাইতেও মায়াবী
    দুটো চোখে তোমাকেই রাখি।

    তুমি আমার অগোছালো বইগুলো
    আলতো হাতে গুছিয়ে দাও,
    মলাটে লুকোনো মাঙ্গলিক স্পর্শ ছুঁয়ে দাও,
    সাদা পাতার গায়ে লিখে দাও,
    ভয় পাস না, পড়া হয়ে যাবে।

    চুলে চিরুনির শব্দ নামে ঝিরঝির বাতাসের মতো,
    তুমি আঙুলে আঙুলে মাথার চুল বুলাও,
    আমি আয়নায় দেখি—
    আমার মাথার ভেতর
    একটা ছোট্ট আকাশের নীচে তুমি দাঁড়িয়ে।

    তুমি আমার কপালে আঁচল ছোঁয়াও,
    স্কুলপথের রোদটাকেও
    মায়ের ছায়া মনে হয়।
    আমি হাঁটি,
    তুমি চেয়ে থাকো দরজার ফাঁকে—
    যেন তোমার দৃষ্টি-দড়ি ধরে
    আমি হারিয়ে না যাই।

    আজ সেই প্রহর নেই,
    বই গুছিয়ে দেবার হাত নেই,
    চুল আঁচড়ে দেবার বাতাস নেই…
    তবু আমার প্রতিটি সকালের ভেতর
    একটা ছোট ছেলে এখনও স্কুলে যায়,
    আর তার ব্যাগের ভেতরে
    সবচেয়ে ভারী বইয়ের নাম— “মা।”

    যদি আর একবার
    ফেরার টিকিট পেতাম শৈশবে,
    আমি কিছুই চাইতাম না,
    শুধু বলতাম—
    “মা, স্কুলে যাবার আগে
    আর একটিবার চুলটা আঁচড়ে দাও।”

    ১০. পোড়া বাড়িটা

    ধানমন্ডি ৩২-এর ভাঙা পোড়াবাড়িটা
    আজও দাঁড়িয়ে থাকে—
    শূন্য এক প্রহরীর মতো,
    যার চোখে জমে আছে ইতিহাসের কালো ধুলো,
    নিঃশব্দ আর্তনাদ, আর ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা স্মৃতির আগুন।

    দেয়ালগুলো ভেঙে গেছে,
    কিন্তু ক্ষতের মতো টিকে আছে গুলির দাগ—
    সেই দাগে লুকিয়ে থাকে
    একদিনের আতঙ্ক, একদিনের বিদ্রোহ,
    একদিনের হাহাকার, যেখানে
    মানুষের চিৎকার ছাপিয়ে উঠেছিল অন্যায়ের গর্জন।

    জানালার ভাঙা কাচে
    এখনো নাকি বিকেলের শেষ আলো এসে পড়ে,
    যেন কেউ দরজায় কড়া নাড়বে—
    যেন কেউ ফিরে আসবে…
    কিন্তু কেউ আসে না, আসেও না আর।
    ইতিহাসের ফেরার পথ থাকে না কখনো।

    বাড়িটির প্রতিটি ইটে
    আছে একেকটি অশ্রুবিন্দু,
    প্রতিটি সিঁড়িতেই রয়েছে
    অপূর্ণ স্বপ্নের ছায়া।
    রাত হলে বাতাস যখন ফিসফিস করে,
    মনে হয়—
    সেই দিনগুলোর নিঃশ্বাস
    আজও ঘুরে বেড়ায় ভাঙা বারান্দায়।

    ধানমন্ডি ৩২-এর পোড়াবাড়ি—
    তুমি শুধু একটা বাড়ি নও,
    তুমি এক জাতির বুকের ক্ষত,
    এক রক্তাক্ত দীর্ঘশ্বাস,
    যেখানে দাঁড়ালে মনে হয়
    মাটি পর্যন্ত কেঁদে উঠছে
    কেউ হারিয়ে যাওয়া সেই প্রভাতের জন্য।

    তোমার ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে
    আমরা শিখি—
    ইতিহাস কখনো ভাঙে না,
    ভাঙে শুধু দেয়াল;
    স্মৃতি, ত্যাগ আর ক্ষরণের ব্যথা
    চিরদিন বেঁচে থাকে
    তোমার মতোই নিঃশব্দ,
    কিন্তু অমর এক পোড়াবাড়ির ভস্মে।

    ~ ঢাকা
    ডিসেম্বর ২০২৫ ইং

    ১১. বত্রিশ নম্বর বাড়ি

    বত্রিশ নম্বর শুধু ইট-সুরকির ঘর নয়,
    এ ইতিহাসের শিকড়—
    স্বপ্নে রাঙানো এক জাতির আত্মা।

    সেই দেয়ালে আছে রক্তের দাগ,
    অশ্রুর লোনাজল,
    স্বাধীনতার ডাক।

    যেখানে এক কণ্ঠস্বর গর্জে উঠেছিল—
    “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম!”
    যেখানে জন্মেছিল আমাদের
    অস্তিত্বের ঘোষণা।

    আজ যদি হাতুড়ি উঠে, উঠে বুলডোজার –
    সে যদি স্মৃতির বুক চিরে দেয়,
    তবে ভাঙবে শুধু দেয়াল নয়—
    ভাঙবে বাঙালির চেতনাও।

    বত্রিশ নম্বর ভাঙা মানে
    ইতিহাসকে হত্যা করা,
    রক্তের দামে পাওয়া স্বাধীনতাকে মুছে ফেলা।

    না, আমরা মানি না এ অপমান—
    এ শুধু বঙ্গবন্ধুর বাড়ি নয়,
    এ আমাদের হৃদয়,
    আমাদের জাতির প্রাণ।

    এসো স্লোগান তুলি –

    বত্রিশ নম্বর ভাঙতে দেবো না,
    ইতিহাসের দেয়াল কাঁপতে দেবো না।

    এ ঘর মানে স্বাধীনতার গান,
    বঙ্গবন্ধুর রক্তে লেখা অবিচল মান।

    বাড়ি ভাঙা মানে স্বপ্ন হত্যা,
    বাঙালির হৃদয়ে জ্বলে প্রতিবাদের অগ্নি-শিখা।

    রুখে দাঁড়াও, বলো সবে
    বত্রিশ নম্বর চিরদিন রবে।

    ———————————
    স্বাধীনতা বিরোধীরা যখন আস্ফালন করছিল ৩২ নং বাড়ি ভেঙে ফেলবে, সেই
    অস্থির সময়ে এই কবিতাটি লেখা হয়েছিল।
    ঢাকা – ২০২৫ ইং

    ১২. মধুকর

    পুরুষকে তুমি কী ভেবেছো—
    শুধুই কি মধুকর, ফুলে–ফুলে যার অবাধ বিচরণ?
    না, তুমি স্বৈরিণী নও, ময়ুরাক্ষীও নও,
    তুমি প্রেমেরই প্রেয়সী— নিছক কোনো উপাধি-নয়ন।

    আমি চাইলেই স্ত্রৈণ হতে পারি না,
    আর তুমি?— চাইলেও স্বৈরিণীর মুখোশ পরে নিতে পারো না।
    স্ত্রৈণ কিংবা স্বৈরিণী— শব্দের কোলাহল ছাড়িয়ে
    আমরা আসলে এক প্রেম–বুভূক্ষু যুগল,
    যার রক্তে কেবল ভালোবাসার উল্লাস বোনা।

    যে প্রেম দেহে উৎসব তোলে,
    স্বর্গে কিংবা নরকে— সবখানে যার মহোৎসব,
    সেই প্রেমই আমাদের ধর্ম, আমাদের ক্ষুধা, আমাদের বাসনা—
    দেহহীন, দেহময়, স্বর্গীয়, নরকীয়—
    তবু প্রেমই চরম, প্রেমই শাশ্বত সব।

    ১৩. তিনটি এলিজি

    ১
    কত অন্ধকারে বসে থেকেছি আলোহীন,
    কত করুণার চাওয়া ফিরিয়ে এসেছে নিজের দু’হাতে-
    তবুও চলছি অন্ধকারেই আলো খোঁজার পথের দিকে, কিছু পেতে জীবনের পাতে।
    ২
    বিস্মৃতির ধুলোমাখা কিছু মায়ামুখের কথা
    এখনও পড়ে মনে-
    অলক্ষ্যে অশ্রুকণা হয়ে লুকিয়ে আছে তারা
    আমার আঁখিকোণে।
    ৩
    বয়সের ভারে ন্যুব্জ হওয়ার আগেই কোনও এক তারাভরা রাতে আকাশের সবগুলো তারার মাঝে যেন ঘুমিয়ে পড়তে পারি। এমন ঘুম যেন হয়, সে ঘুম যেন আর না ভাঙ্গে।

    ১৪. সুরভি-মোহিনী

    তব অলক-লতায় মকরন্দের কোমল ছায়া,
    মদন-মোহনী চক্ষে জ‍্যোতির্ময়ী বৃষ্টি—স্নিগ্ধ শ্রাবণম্।

    তব হাস্যে মিশে যায় রতি-রঙ্গীন সুধা,
    অধর-পুটে বিম্ব-ফল-এর রাগ,
    বায়ুতে উড়ে ভাসে সুরভি-চন্দন-এর সুগভীর মাধুর্য।

    তব পদ-নূপুরে নর্তন করে রাগিণী-লহরী,
    মোর চিত্তে জাগে মন্মথ-অনল,
    স্পর্শ-কামনায় কম্পিত হয় মোর প্রাণ-তরঙ্গম্।

    চরণে ধরণী গায় মিলন-মন্ত্র,
    দেহ-মেঘে নেমে আসে আনন্দ-বিদ্যুৎ,
    নিমেষেই জড়িয়ে ধরি—অর্দ্ধ-চন্দ্র আলিঙ্গনম্।

    তোমা বিনা ক্ষণগুলি ক্লান্ত-শূন্যম্,
    তোমা সহ সন্ধ্যাগুলি কাম-কলিকায় পূর্ণ,
    যেন রতি-উৎসব-এ সুরা ঢালা রজনী।

    হে মোর প্রিয়ন্তী, হে শৃঙ্গার-লক্ষ্মী,
    তব স্নানে আমি কৃষ্ণ-নীল পদ্মম্—
    খুঁজি কেবল মিলন-সাম্রাজ‍্য,
    যেখানে প্রেমই উপাসনা,
    দৃষ্টি-স্পর্শ-স্মৃতিই—চির মধুর-বন্দনম্।

    ১৫. একদিন

    একদিন খুব মন খারাপ হবে, মেঘে ঢেকে যাবে আকাশ,
    অথচ চোখে বৃষ্টি নেমে আসবে না।

    তোমার মুখোমুখি এসে দাঁড়ানোর সেই ক্ষণে—
    শব্দহীন দুঃখের ডানা ভাঙা পাখির মতো,
    জমে থাকা দীর্ঘ নীরবতা হয়তো হঠাৎ কেঁদে উঠবে।

    তখন পৃথিবী অচেনা লাগবে,
    প্রতিটি রাস্তা ভুল ঠিকানার দিকে নিয়ে যাবে ,
    সব পরিচিত আলো ম্লান হয়ে প্রশ্নবোধক তারার মতো জ্বলবে।

    একদিন সমস্ত কিছু ফুরোবার আগেই
    আমিও কবিতার শেষ লাইনের মতো হারিয়ে যাব—
    হবো অনুচ্চারিত, অথচ অনুভূত।

    আর সেদিন হয়তো কেউ কাঁদবে না,
    তবু কারও চোখের কোণে জমে থাকবে আমার কান্না,

    আমি থাকব না,
    শুধু থেকে যাবে একফোঁটা নোনা জলের স্মৃতি, বেদনার, ভালোবাসার, নীরবতার।

    ১৬. রাধা–কৃষ্ণের পদাবলী

    যমুনা-নীল জল দুলে দুলে,
    নিকুঞ্জে মাদকী রাত,
    কদম্ব-ছায়ায় রাধা দাঁড়ায়—
    অলকে জাগে পরাগী বাত।

    শ্যামের মুরলী লুকায় কুঞ্জে,
    সুর নামে গোপন বীথি,
    রাধার বক্ষে সুরের স্পর্শে
    মদন আঁকে মৃদু লিখি।

    অধর-রঙে কৃষ্ণ হাসিয়া চায়,
    চোখে চায় চির-ধরা,
    রাধা কাঁপে ক্ষণিক লাজে—
    দেহে ঢেউ, মনে জোয়ার-ভরা।

    চন্দনের টিকা আঙুলের ডগায়,
    রাধা রাখে শ্যামের গায়ে,
    রেখা খুঁজি রতি-লিখনে—
    শ্যাম ভাসে সেই লিখা চায়ে।

    কৃষ্ণ ধরিয়া রাধার কর-তল,
    ধীরে টানে কাছে বুকে,
    হৃদয়-কমল খুলে খুলে যায়,
    শ্বাসে শ্বাসে অমৃত ঝুকে।

    কুঞ্জ-লতার মর্মর-ডাক শোনে,
    মুঞ্জরী লাজুক পাতে,
    দুটি ছায়া এক ছায়া হয়—
    মিলন গাঢ় নিশীথ রাতে।

    রাধা বলে— “এমনি কেন শ্যাম,”
    স্বর ভিজে অভিমানী,
    কৃষ্ণ বলে— “লীলা প্রেম-নদী,
    তুমি তার কূল-ধরা বাণী।”

    আলুথালু কেশে কৃষ্ণ ছুঁয়ে যায়,
    রাধা গলে নত চোখে,
    রস-লীলার মধুর বন্ধনে
    জগত ভুলে মগন সুখে।

    যমুনা-তীরে যুগল মিলনে,
    রতি-সুধা নিকুঞ্জ ভরা,
    দেহ মিলে, সত্তা মিলে—
    শৃঙ্গারে অমর প্রেম ধরা।

    ১৭. মহাশূন্যে তোমার পদশব্দ

    বহু সহস্রকাল ধরে কতো জনপদ,
    কতো জনপথ পেরিয়ে ধুলোয় লিখেছ নাম—
    সেই তুমি আসলে যখন ক্লান্তিহীন পায়ে,
    আমি তখন হারিয়ে গেছি অন্য আকাশে।

    যে পার্থিবে, যে পর্ণকুটিরে
    তুমি একদিন পাতা–ঢাকা স্বপ্নের মতো দাঁড়ালে,
    সেখানে মাটি তখনও উষ্ণ,
    কিন্তু বাতাসে আমার নিঃশ্বাস নেই।

    তুমি অপলক চেয়ে রইলে—
    ক্লান্তিও নেই, প্রশ্নও নেই, শুধু এক দীর্ঘ খোঁজ,
    তোমার চোখে হাজার বছরের পরিযায়ীর ম্লান দিঘি,
    স্থির, অথচ অনিঃশেষ যাত্রার ঢেউয়ে আহত।

    ডাকো নি, তবুও তোমার নীরবতা ডাকছিল,
    তবুও তোমার ছায়া হেঁটে গেল শূন্য উঠোনে,
    পাঠ করল দেয়ালে লেপ্টে থাকা পুরোনো স্মৃতি,
    যেখানে আমি নেই, কেবল থাকার প্রতিধ্বনি আছে।

    আমাকে খুঁজতে থাকলে তুমি
    অপার্থিবের অন্ধকারে—
    যেখানে আলোও কাঁদে নীল শিখায়,
    যেখানে পথও থেমে গেছে শোকের শিলায়।

    আমি কি শুনতে পাই তোমার পদশব্দ?
    হয়তো পাই—
    কারন দুঃখ কখনও দেহ চায় না,
    দুঃখ শুধু দূরের পায়ের শব্দে চিনে নেয় প্রিয়।

    তুমি হেঁটে গেলে—
    অন্ধকারেই, যেখানে আমি আর নেই,
    কিন্তু তোমার খোঁজের শব্দ
    আমার অস্তিত্বেও রেখে গেল এক মর্মরিত নাম।

    আর আমি, ধুলো নয়, আলোও নয়,
    শুধু এক অনন্ত অপেক্ষার শূন্যতা—
    যেখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে
    তুমিও হয়তো একদিন আর থাকবে না…

    ১৮. মহাপ্রস্থানের পথে

    চোখ মেলেছি—
    শুধু তোমাকেই দেখব বলে,
    অথচ এ ভোরের আলোয়, শ্রাবণের বাতাসে,
    তুমি নেই… তুমি নেই…
    দৃষ্টি জুড়ে শুধু দীর্ঘ নিঃশ্বাসের নীল।

    মহাপ্রস্থানের ডাকে পা বাড়ালাম,
    বাঁকে বাঁকে পথ—
    ধুলোয় আঁকা স্মৃতির রেখা,
    নীরবতার গহ্বর, বেদনার দিকচিহ্ন,
    পেরিয়ে যাচ্ছি একা, অনাদিকালের সুরে
    বাজে যাত্রার মৃদঙ্গধ্বনি।

    তোমাকে রেখে যাচ্ছি…
    হৃদয়ের প্রদীপে তেল ফুরায়,
    তবু বাতি নিভে না—
    দুশ্চিন্তার ছায়া কাঁধে ভর করে আসে,
    আমাকে ছাড়া তুমি তো ভালো থাকো না,
    তাই দিব্যি দিয়ে গেলাম—
    হাস্যকল্লোলে ক্ষুধা ভুলবে না,
    নিদ্রাহীন রাতের পাগলামি করো না,
    খেয়ো, ঘুমোও, যত্নে থেকো,
    ভালোবাসা যেন উন্মাদনার আগুনে না ঝরে।

    যে পথে আমি যাচ্ছি—
    সে পথ আমারও অচেনা,
    সেখানে কি যমুনার শীতল জল?
    কুসুমপুরের আগুন কি ঝরে আঙিনা জুড়ে?
    থাকে কি আমাদের পুরনো উঠোনের মাটির ঘ্রাণ?
    অলকানন্দার গুচ্ছ ছায়া—
    থাকে কি আঙিনার কোণে, শৈশবের দোল খাওয়া ঝাড়ে?

    আমি চিনি না সে দেশ,
    কিন্তু জানি—
    নদী থাকবে, তীরও থাকবে,
    আর থাকবে তোমার জন্য এক প্রতীক্ষার রাগিণী—
    অলকানন্দার ছায়াতলে,
    অচেনা নক্ষত্রের বুকে,
    আমি দাঁড়িয়ে থাকব একা,
    মিলনের তানপুরা বাজিয়ে।

    তুমি এসো… এসো পরকালেই,
    লক্ষ লক্ষ তারা দীপ জ্বেলে দেবে,
    জোনাক-সারি আলোর অলংকারে
    বিহঙ্গ-পথে সাজবে অভিসারের রথ,
    সেখানকার গন্ধবাতাস তোমায়
    ঠিকই পায়ের চিহ্ন চিনিয়ে আনবে—
    আমারই কাছে, আমারই কাছে।

    ইহকাল স্রোতের মতো ভেসে গেছে,
    ফুলঝুরি শোকও ঝরে যায় ম্লান,
    তবু পরকাল রয়ে গেছে—
    মিলনের শাশ্বত মঞ্চ,
    যেখানে প্রেম মৃত্যুর পরেও
    পথ চেনে, সুর চেনে, আপন চেনে।

    সেখানেই দেখা হবে…
    সেই অনন্ত উঠোনে—
    যেখানে বিদায়ের পরেও
    ভালোবাসার পায়েরচিহ্ন মুছে যায় না,
    গান থামে না, অপেক্ষা ফুরায় না।

    ১৯. দীপ্ত করো

    তোমার নীল নয়নে শ্রাবণ মেঘের বিদ্যুৎ ঝলক—
    সে ঝলক ভাঙা কাঁচে প্রতিফলিত হয়,
    এবং অসংখ্য কোণ তৈরি করে আলোকোজ্জ্বল করে ,
    যেন তোমার দৃষ্টির ভিতরেই জন্ম নেয় এক বহুবর্ণী বৃষ্টিপাত,
    যেখানে জল, আগুন, আকাশ— একসাথে বসতি স্থাপন করে।

    কণ্ঠে তোমার মধুমঞ্জরির মালা—
    একটি পুষ্প, আবার একটি শব্দ, আবার একটি দরোজা,
    যেখান দিয়ে তোমার উচ্চারণ ঘরের বাহির হলে বাতাসজুড়ে জন্ম নেয় সংগীতের বহুভুজ।
    তোমার দেহলতা পদ্মদামের লাবণ্যে
    প্রসারিত— সুশৃঙ্খল নয়,
    বরং স্তরে স্তরে সাজানো রূপচিত্র;
    প্রতিটি অঙ্গ একটি আলাদা বৈশিষ্ট্য ,
    প্রতিটি অঙ্গ অজানা ভাষায় লাবণ্যের ব্যাকরণ লেখে;
    সেখানে কোমলতা কেবল অনুভূতি নয়,
    কোমলতা একটি ত্রিমাত্রিক স্থাপনা,
    যার ভিতর বসা যায়,
    যাকে স্পর্শ করলে শব্দ ধ্বনিত হয়।

    তোমার শরীর অমল ধবল জ্যোৎস্নায় স্নাত,
    কেবল আলো নয়,
    এ এক আলোর ঘনত্ব;
    শুভ্রতা এখানে রঙ নয়—
    শুভ্রতা এক প্রকার নির্বাক দীপ্তির স্থাপত্য,
    যেখানে রাতও আলোয় ছাপ ফেলতে আসে,
    কিন্তু আলোই তাকে আবরণ করে রাখে।

    চোখের পাতায় নাগকেশরের স্পর্শ—
    এই স্পর্শ সরলরেখা নয়,
    একবার ছোঁয়া, আবার সুবাস, আবার স্মৃতির ধার,
    যে ছোঁয়া তোমার চোখ বন্ধ করলেও
    জগৎ খোলা রাখে।

    হে আমার প্রিয়ন্তী,
    তোমার কেশ কুন্তলের গন্ধে
    এই ঘর শুধু মদির নয়,
    এই ঘর গন্ধে ঘনীভূত;
    সুবাস এখানে বাষ্প নয়—
    সুবাস এখানে দেয়ালের মতো দাঁড়ায়,
    ছাদের মতো ভাসে,
    তাকের ভিতর লুকায়,
    আবার প্রদীপের শিখায় নীরবে নৃত্য করে।

    তুমি প্রবেশ করলে ঘরের মধ্যেই
    আরো একটি ঘর তৈরি হয়—
    সব মিলিয়ে তোমার উপস্থিতি এক অপূর্ব দ্যোতনা সৃষ্টি করে,

    তোমাকে ছুঁলে ভাবনা ছড়িয়ে পড়ে
    পিকাসোর রেখা আর নক্ষত্রের দূরত্ব ঘনিয়ে,
    আর প্রতিটি ঘনমুহূর্তের ভিতর
    তুমি আমাকে দীপ্ত করো,
    যা আমাকে আলোকস্তম্ভের মতো দাঁড় করায়
    আমারই ভেতরের বহুমাত্রায়,
    যেন তোমারই আলো, সুবাস, স্পর্শ—
    আমার অস্তিত্বটিকে দীপ্ত করে তোলে,
    যা ভাঙে না, ছড়ায় না—
    শুধু ক্রমশ অধিকতর দীপ্ত ঘন হয়।

    ২০. বন্ধু তুমি স্বামী তুমি

    ( কবিতাটি আমার স্ত্রীর বয়ানে লেখা।)

    শিলিগুড়ি থেকে সেভক পাহাড়—
    মেঘ-লাগা চুলের মতো বাঁক নিয়ে উঠে যায় পথ।
    হলুদ ট্যাক্সির ভেতর আমি,
    দু’ধারে দু’টুকরো নিশ্চিন্ততা—
    একপাশে স্বামীর প্রশান্ত নিঃশ্বাস,
    আরেক পাশে বন্ধু শিশির রায়ের চেনা হাসি।

    আঁকাবাঁকা পাহাড়ি ঘূর্ণিতে গাড়ি উঠছে,
    চাকার নিচে যেন বাজে এক নিরব রাগিণী।
    নিচে গাঢ় সবুজ গিরিখাত, গভীর খাদ—
    তবু বুকের ভেতর একফোঁটাও কাঁপন নেই।
    কারণ আমার দু’হাতে ধরা দু’টি ভরসা,
    দুই ভিন্ন সুরে গাঁথা এক অটুট বন্ধন।
    এই দুই মানুষ মিলেই আমার পাহাড়ের সাহস।

    সেভকের চূড়ায় যখন পৌঁছাই,
    হাওয়ায় ভেসে আসে ধূপ আর সিঁদুরের গন্ধ—
    পুরনো মাটির কাছে ফেরা এক আদি আহ্বান।
    কালীর মন্দিরে পা রাখতেই মনে হয়,
    মা ডাকছেন— ভয়হীনতার পুরস্কার নিতে।
    কালো পাথরের প্রতিমার চোখে জ্বলে নীরব দহন,
    সেই দহনে নেই শঙ্কা, আছে পরম আশ্বাস।

    তারপর তিস্তার ব্রিজে দাঁড়াই তিনজনেই—
    লোহার কাঠামোর ফাঁক দিয়ে নদী বইছে নীল আত্মায়,
    স্রোতের গর্জনে মিশে আছে পাহাড়ের প্রাচীন গল্প।
    জল নয়, যেন এক চলমান কবিতা—
    অক্ষরহীন, সীমাহীন, অবিরত।
    দেখি দূরে দূরে ঢেউয়ের চকিত রোদ-চুম্বন,
    শুনতে পাই জলের অন্তরমিল,
    যেখানে প্রতিটি শব্দ মানে ‘ভরসা’, ‘ভালোবাসা’, ‘সঙ্গ’।

    বন্ধু আঙুল বাড়িয়ে দেখায় নদীর রূপ,
    স্বামী নীরব চোখে দেখে আমার মুখের আলো—
    ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমিও বুঝতে শিখি:
    সঙ্গ মানে শুধু পাশে থাকা নয়,
    সঙ্গ মানে ভয়কে ভাষা দিতে না-দেওয়া,
    ভালো লাগাকে স্মৃতি করে বাঁচিয়ে রাখা।

    সন্ধে নেমে এলে তিস্তা হয়ে ওঠে স্তব্ধ দরিয়া,
    আকাশে ম্লান কমলা রঙ, জলে তার প্রতিচ্ছায়া—
    আমি দেখি, আর মনের ভেতর জমে ওঠে অনিন্দ্য পঙক্তিমালা:

    ‘পাহাড় বাঁক নিলেও জীবন ভেঙে পড়ে না,
    যদি হাতে থাকে প্রেম, আর পাশে থাকে ভরসা।’

    ব্রিজ থেকে যখন ফিরি,
    চেতনায় থেকে যায় জলের শীতল স্পর্শ,
    মনের গহনে পাহাড়ি পথের মিছিল,
    আর সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে বাজতে থাকে—
    দু’ধারে দাঁড়ানো ভালোবাসা আর বন্ধুত্বের যুগল ধ্বনি,
    যে ধ্বনি আমায় শিখিয়েছিল,
    পৃথিবীর গভীরতম খাদও ভয় দেখাতে পারে না
    যদি মানুষ দু’টি থাকে—
    একজন স্বামী, একজন বন্ধু—
    আর তাদের মাঝখানে থাকে একটি নির্ভীক আমি।

    ২১. দেহান্তরের আগুন

    নয়নে নয়ন রেখে দেখলাম তোমায়,
    তুমি মৃদু হেসে বললে— “অন্তরে দেখো”।

    অন্তরে অন্তর ছুঁয়ে ভালোবাসতে চাইলাম,
    তুমি নরম স্বরে জানালে— “বুকে তুলে নাও”।

    বুকে বুক রাখতেই শীতের সকাল আগুনে রূপ নিল,
    দুই হৃদয়ের সীমানা পেরিয়ে জ্বলে উঠল আকুল উষ্ণতা।

    সেই আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে গেল
    দেহ থেকে দেহান্তরে,
    রক্তে রক্তে, নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে।

    তুমি জ্বললে, আমাকেও জ্বালালে,
    পুড়ে গেলাম দু’জনে একই ভস্মের স্পর্শে,
    একই উন্মাদ আলোর অনলে।

    ছাই-ভস্মে মিশে দেহ দুটি এখন
    ছিন্ন তুলোর মতো হালকা—
    আকাশের নীল প্রান্তে উড়ে বেড়ায় স্বচ্ছন্দ,
    দেহ নেই, তবুও প্রেম রয়ে যায় অনন্ত ছন্দে।

    দহন শেষে জন্ম নেয় নতুন ভালোবাসা—
    পোড়া ডানায় ভর করে উড়ন্ত, মুক্ত, চিরন্তন।

    ২২. নীল অপরাজিতা

    ইতিহাস বয়ে চলে
    গৌরব আর কলঙ্কের ছায়া জড়িয়ে,
    কাল থেকে কালান্তরে।
    সীমান্তের শহর মেহেরপুরের কোল ঘেঁষে
    দাঁড়িয়ে আছে আমঝুপি।
    মোঘল সেনাপতির বিজয়রথ ছুটেছে এখানে,
    ভাস্কর পণ্ডিতের বর্গীদল ধুলি উড়িয়েছে,
    নবাব আলীবর্দ্দীর মৃগয়ায় স্মৃতি রয়েছে,
    পলাশীর পরাজয়ের নীল-নকশাও এখানে লেখা হয়েছে।
    এক হেমন্তের সকালে
    কাজলা নদীর তীরে গিয়েছিলাম নীলকুঠি দেখতে,
    সাথে ছিল জেসমিন,
    মেহেরপুর থেকে আধাপাকা পথে রিকসা বয়ে চলছিল।
    রাস্তার দু’পাশে নীল অপরাজিতার ঝাড়,
    জেসমিনের নীল সালোয়ার কামিজ,
    আমার নীল টি-শার্ট,
    মাথার উপর নীল আকাশ —
    সব মিলিয়ে এক মুহূর্তের নীল মহিমা।
    সে বলেছিল —
    “কেমন যেন এই নীল, কেমন বিষাদময়,
    এত নির্জন! মনে হচ্ছে কেউ আছে কেউ নেই।”
    আমি শুনলাম, কিন্তু বুঝতে দেরি হয়ে গেল,
    মুহূর্তে উত্তর দিতে পারিনি।
    তার আফসোসের কথা রইল।
    আমরা হেঁটেছি কাজলা নদীর ধুলি পথে,
    দেখেছি স্থির, স্বচ্ছ জল,
    নীলকুঠির ভগ্ন কুঠিরের পলেস্তারা,
    লতাগুল্মের বিষণ্ণ সবুজ।
    মন ভালো লাগছিল না;
    শত বছর আগে কৃষকের করুণ হাহাকার
    কানে বাজছিল।
    বছর কেটে গেছে,
    কাজলা নদীর ধুলি এখনও উড়ে,
    নীল অপরাজিতা এখনও ফুটে,
    হেমন্তের রোদ্দুর আলো ছড়ায়।
    মুহূর্তগুলো লুপ্ত হয়,
    জেসমিনের মতো কেউ পাশে নেই,
    কোনও দিন আর দেখা যায় না
    ক্ষণিকা এই জীবনে,
    যেমন নীল অপরাজিতার মতো
    ফুটে ঝরে যায়।

    ২৩. একটিই মুখ

    যেখানেই যাই, যত দূরেই যাই,
    যাই না আমি কোনো অন্তরীক্ষে,
    নক্ষত্রের নির্বাক মিছিলে কিংবা
    গ্যালাক্সির ঘূর্ণিজালেও নয়—
    কিংবা ধুলো হয়ে পড়ে থাকি
    এই পৃথিবীরই বুকের ’পরে।

    সমুদ্রের ফেনিল দীর্ঘশ্বাসে,
    পথের বাঁকে অচেনা শহরের
    হলুদ বাতির কম্পমান দোলায়,
    বৃষ্টিভেজা গলির নির্জন ভাষায়—
    সর্বত্রই মিশে থাকে এক প্রতীক্ষা,
    এক অব্যক্ত নাম, এক গভীর মুখ।

    একটি মুখের দিকেই চেয়ে থাকি,
    একটিই মুখ বারবার ভেসে ওঠে
    মনের অগোচর জলসীমায়;
    যেন সমস্ত দিগন্ত, সমস্ত পথ
    তারই দিকে ধাবমান এক নদী।

    তার মুখের নিঝুম ছায়াপাত
    নেমে আসে ধীরে ধীরে—
    রাত্রির পাখির মৃদু ডানার মতো,
    নিস্তব্ধ শিশিরের পতনের মতো;
    এসে পড়ে আমারই মুখের উপরে,
    আর আমার মুখ হারিয়ে যেতে থাকে
    তারই অববাহিকার ছায়ায়।

    চোখের পাতা বন্ধ করলেই
    সে মুখ আরো স্পষ্ট হয়—
    আলো ও আঁধারের সীমাহীন পরতে
    একমাত্র মানচিত্র হয়ে জেগে থাকে।

    আমি আয়নায় তাকাই না আর—
    কারণ প্রতিফলনে এখন
    আমার মুখও তারই মুখেরই অনুবাদ।

    যেখানে সময় থেমে থাকে,
    যেখানে ভাষা নিরর্থক হয়ে যায়,
    যেখানে পৃথিবী নিজেই ছায়া—
    সেখানেও শুধু একটি সত্য জেগে থাকে :
    একটিই মুখ, একটিই মুখ, একটিই মুখ।

    ২৪. অস্তরাগের আগুন

    নীহারিকা-রাঙা এক অস্তরাগের সাঁঝে
    তুমি এসো ধীরে—মৃদু পায়ে, গোধূলির কাঁধ ছুঁয়ে।
    ধান-ধূপের ধোঁয়া উঠবে আকাশের বুক বেয়ে,
    প্রদীপের আলো নরম হয়ে জড়িয়ে ধরবে আমাদের ছায়া।

    তারার বাতি একে একে জ্বলে উঠবে
    তোমার চোখের উষ্ণ আবেশে—
    সেই আলোয় আমার অন্তর হবে রঙিন,
    তোমার সুরভিতে কেঁপে উঠবে নিশীথের নিঃশ্বাস।

    তারপর দু’জন জ্বলব আগুনের মতো—
    রাতভর শরীরের ভিতর বয়ে যাবে
    গোপন তরঙ্গের অগ্নি-রূপী স্রোত,
    কেউ আসবে না নেভাতে, কেউ থামাবে না।

    বর্বর আদিম সেই অনলে
    ছাই হয়ে যাবে সব সীমানা, সব লাজ-লজ্জা—
    তখন তুমি আমার, আমি তোমার,
    শুধুই মিলনের জ্যোৎস্না ও উত্তাপের উর্বর রাত্রি।

    সেই রাতের শেষে
    ভোরের নরম আলোয়
    আমাদের দেহে থাকবে শুধু
    শৃঙ্গারের ধূপ-জ্বলা গন্ধ
    আর নিঃশেষ হওয়া আগুনের পরম তৃপ্তি।

    ২৫. বিজয়ের ডিসেম্বর

    ডিসেম্বর…
    শীতের কুয়াশা ভেদ করে আসে
    রক্তে লেখা লাল ভোর।
    এক সাগর অশ্রু,
    লাখো প্রাণের বিনিময়ে
    জন্ম নেয় এক স্বাধীন দেশ—
    সবুজের বুকে লাল সূর্যের ঘোর।

    মুক্তির ডাক উঠেছিল ৭১–এ—
    জয় বাংলা!
    সে ডাক ছিল বজ্রকণ্ঠ,
    সে ডাক ছিল অগ্নিশপথ।
    কৃষক, ছাত্র, শ্রমিক—
    সবার শিরায় জেগে উঠেছিল
    স্বাধীনতার রক্তিম রথ।

    মুক্তিযোদ্ধা…
    তোমাদের হাতে অস্ত্র ছিল,
    হৃদয়ে ছিল দেশ,
    চোখে ছিল মুক্তির আগুন,
    পায়ে ছিল কাদামাখা পথ।
    তবু থামেনি তোমাদের পদযাত্রা,
    ভয় ভেঙে এগিয়ে গেছে বুক—
    মায়ের মুক্তির জন্য
    জীবন ছিল তোমাদের ব্রত।

    মা কেঁদেছে…
    বধূ জ্বেলেছে দীপ,
    শিশু বুক চেপে কাটিয়েছে
    নির্ঘুম রাত।
    আর বীরেরা?
    জল–জঙ্গলে গড়ে তুলেছে
    মুক্তির দুর্জয় দুর্গ,
    নদীর স্রোতেও ভেসে উঠেছে
    রণগানের মাত।

    তারপর—
    ১৬ ডিসেম্বর।
    পতন হলো শত্রুর অহংকার,
    নিঃশেষ হলো অন্ধকার।
    আকাশে উড়ল বিজয়ের পতাকা,
    মুঠো খুলে দেশ দাঁড়াল গৌরবে—
    রক্তস্নাত বাংলাদেশ,
    অদম্য, অনন্য, দুর্বার!

    শহীদ…
    তোমরা ঘুমিয়ে আছ মাটির বুকে,
    তবু জেগে আছ প্রতিটি নিশ্বাসে।
    তোমাদের রক্তে আঁকা মানচিত্র
    রবে চিরকাল বাংলার আকাশে।
    যতবার পতাকা দোলে—
    ততবার মনে পড়ে,
    এ দেশ তোমাদের ত্যাগে কেনা,
    এ বিজয় তোমাদের ভালোবাসা।

    ডিসেম্বর শুধু মাস নয়—
    এটি গৌরবের গান,
    ত্যাগের মহাকাব্য,
    স্বাধীনতার অমর ধ্বনি।
    যেখানে বীরের রক্ত সোনা ফলায়,
    স্বপ্ন নতুন ভোর আনে অবিরত বাণী।

    মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ—
    তোমাদেরই ঋণে
    আমরা পেয়েছি স্বাধীন প্রাণ,
    স্বাধীন ভাষা,
    স্বাধীনতাই আমাদের পরিচয়,
    তোমাদের ত্যাগই আমাদের অহংকার।

    জয় বাংলা! জয় স্বাধীনতা!
    জয় লাখো শহীদের আত্মদান!

    ২৬. স্বপ্ন-আলোক

    কবরের মতো নীরব ঘর,
    চারদিকে গহিন অন্ধকার—
    আমি শুধু শুয়ে আছি,
    চোখের ভেতর ঘুরছে অদেখা শূন্যতার ছায়া।

    হঠাৎ দূর-দূরান্তে জ্বলে ওঠে
    একটি ছোট্ট আলোকবিন্দু—
    যেন দিগন্তের ওপার থেকে
    কারও নরম পায়ের শব্দ ভেসে আসে।

    আলো ধীরে ধীরে কাছে আসে,
    আমি তাকিয়ে দেখি—
    একটি মেয়ে,
    অচেনা অথচ অদ্ভুতভাবে পরিচিত,
    মায়াবতীর মতো, আবার নয়ও।

    সে কিছু বলে না,
    শুধু তার আলোটা পাশে রেখে
    নম্র ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে
    আমার বুকের ওপর
    তার কপালটি রাখে।

    সেই ছোঁয়া—
    ঠান্ডা, নিস্তব্ধ, অথচ
    অদ্ভুত উষ্ণ কোনো আশ্বাসের মতো।
    সে ফিসফিস করে—
    “স্পর্শটুকু মনে রেখো,
    ভুলে যেয়ো না কখনো…”

    হঠাৎ সমস্ত ঘর
    আলো-অন্ধকারে ভেঙে পড়ে—
    আমি জেগে উঠি,
    কিন্তু তার কণ্ঠ এখনো বাজে
    বুকের গভীর কোনো অন্ধ কোণে।

    কোন মেয়ে ছিল সে?
    স্বপ্নের?
    নাকি কোনো পূর্বজন্মের ব্যথা?

    শুধু জানি—
    তার রেখে যাওয়া স্পর্শটি
    আজও ধুকধুক করে
    মায়াবী আলোর মতো।

    ২৬. বিজয় একাত্তর

    ডিসেম্বর আসে শিশিরের বুকে রক্তে লেখা লাল ইতিহাস,
    হিমেল হাওয়ায় ভেসে আসে মুক্তির বারুদ–ভেজা নিঃশ্বাস।
    মাটির ঘ্রাণে জেগে ওঠে স্মৃতি, জাগ্রত হয় বিজয়ের ধ্বনি—
    এই দেশ, এই পতাকা, এই ভোর— শহীদেরই অমর বাণী।

    বাংলার কৃষক, ছাত্র, শ্রমিক— সবার রক্তের মিলনে,
    স্বাধীনতার বীজ অঙ্কুরিত হয় ৭১–এর উত্তাল ক্ষণে।
    ঘরে ঘরে আগুন, বুকে বুকে শোক— তবু দৃঢ় ছিল প্রাণ,
    মুক্তির শপথে কেঁপে উঠেছিল প্রতিটি হৃৎপিণ্ডের গান।

    ওরা এসেছিল খালি হাতে— হৃদয়ে অসীম সাহস,
    চোখে ঘৃণার বিরুদ্ধে দ্রোহ, শিরায় স্বাধীনতার স্পন্দন উচ্ছ্বাস।
    রাইফেলের নলে ছিল না শুধু যুদ্ধ— ছিল মাতৃভূমির দাবি,
    প্রতিটি গুলি বলেছিল— “বাংলা কারও গোলাম হবে নাবি!”

    পথ ছিল দুর্গম— পাহাড়সম ভাঙা স্বপ্নের ভার,
    জীবন ছিল বাজি— দেশ ছিল ধ্যান, যুদ্ধ ছিল অভিমান–প্রাচীরের তার।
    কাদা–জলে ভিজেছে দেহ, ক্ষুধায় কেঁদেছে ভোরের পাখি,
    তবু পিছু হটেনি পা— এগিয়ে গেছে শহীদের কাফেলায় রাখি।

    কোথাও মা কেঁদেছে নীরবে, কোথাও বধূ রেখেছে দীপ,
    কোথাও শিশু ঘুমিয়েছে ভয় বুকে— তবু অপেক্ষা ছিল গভীর।
    বীরেরা ফিরবে— দেশের আলোর মুকুট আনবে হাতে,
    বিজয় আসবে— শত্রুর পতন লিখবে শেষ রাতের প্রান্তে।

    জলজঙ্গলে পাকিয়েছে যুদ্ধ, নদী দিয়েছে মুক্তির পথ,
    শাল–বন আর ধানক্ষেতে শোনা গেছে রণহুঙ্কারের শপথ।
    মরা গাঙের বুকেও জেগেছে স্রোত, হাজারো রক্তের ডাকে,
    বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছে লড়াইয়ে— বুকের গভীর মাটিকে আঁকে।

    শহীদের লাশে মাঠ লাল ছিল, আকাশে ছিল আগুন–দাগ,
    তবু ছাই ভেদ করে উঠেছে শস্য, রাত ভেদ করে হয়েছে জাগ।
    ১৬ ডিসেম্বর এলো একদিন— পতন হলো পরাজয়ের রাত,
    বিজয়ের বুকে উঠল দেশ— অশ্রু মুছে ধরল স্বাধীনতার হাত।

    লাখো শহীদের ঋণ মাথায় নিয়ে আমরা হাঁটি বিজয়ের পথে,
    ওদের রক্তে লেখা মানচিত্র আঁকা— আমাদের প্রতিটি শপথে।
    ওরা ঘুমিয়েছে মাটির নিচে— আমরা জেগে আছি আলোয়,
    ওদের ত্যাগে যাপন করি গৌরব— পতাকার ছায়ায় ও ছলোয়।

    ও বীর মুক্তিযোদ্ধা, তোমাদের নাম হৃদয়ে অম্লান হয়ে রবে,
    প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তোমাদের বীরগাথা অমর কাব্যে কবে।
    ডিসেম্বর শুধু মাস নয়— এটি রক্তে কেনা অহংকারের গাঁথা,
    বিজয় মানে শুধু জয় নয়— এটি শহীদের অক্ষয় আত্মত্যাগের ভাষা।

    আজও যখন পতাকা দোলে বিজয়ের সুউচ্চ মিনারে,
    প্রতিটি লাল সূর্য মনে করায়— ওরা বেঁচে আছে দেশের প্রাণধারে।
    বাংলাদেশ চিরজাগরুক থাক— শহীদের রক্তে লেখা গান,
    মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকুক— ধর্ম, বিভেদ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অনন্ত মহান।

    জয় বাংলা — জয় স্বাধীনতা — জয় শহীদের আত্মদান।

    ২৭. বিজয় আসে

    ডিসেম্বর আসে রক্ত–গৌরবে, বিজয়ের রঙে রাঙিয়ে,
    স্বাধীন পতাকা দোলে বাতাসে শহীদের নাম জাগিয়ে।
    লাখো প্রাণের দাম দিয়ে কেনা এই সবুজের প্রান্তর,
    যেথায় মাটির প্রতিটি কণায় মিশে আছে ভোরের মন্ত্র।

    পথে পথে আজও শোনা যায় ধ্বনি, বাঁশির বেজে ওঠা সুর—
    “জয় বাংলা” স্লোগান আকাশ ছোঁয়, ভাঙে শত্রুর সকল দূর।
    কাঁধে রাইফেল, বুকে দৃঢ় শপথ, মুখে আগুন-গাঁথা গান,
    মুক্তিযোদ্ধারা জ্বালিয়েছিল আলো— অন্ধকারে মহান।

    তাদের পায়ে ছিল ভাঙা বুট, গায়ে মলিন শীতের রাত,
    তবু চোখে ছিল সূর্যের দীপ্তি, মুঠোতে ছিল দেশ–দায়িত্বের হাত।
    জল–জঙ্গল আর নদীর বুকেই রচিত সংগ্রামের ইতিহাস,
    যুদ্ধের ধোঁয়া, কান্না আর আগুন— শেষে বিজয়ের নিশ্বাস।

    শহীদের কবর ঘুমায় নীরবে, তবু ওরা ঘুমায় না,
    যতদিন রবে স্বাধীন বাংলাদেশ— ততদিন ওরা বাঁচে জানা–অজানায়।
    রক্তে ভেজা শস্য হাসে মাঠে, নতুন প্রজন্ম গায়,
    মুক্তির লাল সূর্য চির অমলিন— অনন্ত আলো ছড়ায়।

    ও বীর মুক্তিযোদ্ধা, ও শহীদ ভাই, তোমাদেরই ঋণে,
    আমরা পেয়েছি স্বপ্নের দেশ— লাল–সবুজের গর্ব–মীনে।
    ডিসেম্বরের বিজয় শুধু মাস নয়— এক অমর অনুভব,
    ত্যাগ–সংগ্রাম–স্বাধীনতার— এক মহাকাব্যিক স্তব।

    ২৮. চাঁপাগন্ধ দিনের প্রতিশ্রুতি

    এইসব অন্ধকার দিন পেরিয়ে,
    নিবিড় তিমির রাত্রির গভীরতা ভেদ করে
    একদিন ঠিকই দেখা হবে —
    চাঁপাগন্ধ ভরা কোনো বসন্ত সকালে,
    যখন বাতাসে রোদ ঝরে পড়ে
    প্রেমের প্রথম চুম্বনের মতো।

    তখনই তুমি খোঁপায় বেঁধে দেবে নিশি-চন্দনের সুবাস,
    আমার কাঁধে রেখে দেবে ক্লান্ত দিনের স্বপ্ন,
    আর আমি নিঃশব্দ স্থানু হয়ে
    গ্রহণ করব তোমার চোখের পার্থিব সব আনন্দ,
    শূন্য হাওয়ায় দুলতে থাকা
    স্বপ্ন-বাসর সাজানো অনন্ত শান্তি।

    সেই অপার্থিব সাক্ষাৎ-মুহূর্তে—
    আমাদের মাঝখানের সব দূরত্ব ভেসে যাবে,
    সব বেদনা নরম হয়ে গলে যাবে
    জোনাকির মতো নিঃশব্দ আলোর ভিতর।
    তোমার হাতের উষ্ণতা হয়ে উঠবে
    আমার সমস্ত দিনের দিগন্ত,
    আর তোমার হাসির ভিতরেই খুঁজে পাব
    এক জীবনের আশ্রয়।

    বসন্তের সেই গোপন সকালে
    যখন প্রথমবার তোমাকে স্পর্শ করব—
    মনে হবে, অন্ধকার ভেঙে
    সমস্ত পৃথিবী শুধু আমাদের জন্যই
    আলো হয়ে ফুটে উঠেছে।

    ২৯. তুমি আমার সর্বস্ব

    আমার সমস্ত তৃপ্তি–অতৃপ্তির কেন্দ্র তুমি,
    আমার প্রেমের দীপশিখা আর অপ্রেমের নীরবতা—
    সবই তোমাকে ঘিরে শ্বাস নেয়, জ্বলে, বেঁচে থাকে।

    অপূর্ণ সুখের সাঁঝবাতাসে তুমি ছুঁয়ে দাও মনে,
    তৃষ্ণার গোপন নদীতে তুমি জোয়ারের আলো,
    আমার উম্মাদনার প্রতিটি অগ্নিশিখায়
    তোমারই নাম ধ্বনিত হয় গোপনে–প্রকাশ্যে।

    চৈতন্যে তুমি, অবচৈতন্যে তুমি,
    অন্তরের অন্তরতমে লুকিয়ে থাকা এক নিত্য দীপ।
    তোমাকে ছাড়া কোনো পথ নেই, কোনো দূরত্ব নেই—
    তোমাকে ছেড়ে আমি কখনোই বহুদূরে যাই না,
    যত দূরেই যাই, তুমি থেকে যাও আমার ভেতরের আকাশ হয়ে।

    তুমি আমার অনন্তের একমাত্র ঠিকানা।

    ৩০. দহনময় সমর্পণ

    নি:সঙ্গ নাভির নিবিড় গহিনে ডুবে
    দেখি নিসর্গ— নরম পুষ্পবৃন্তে কেঁপে ওঠে আলো,
    দেখি তৃণভূমি— দোলায়িত শরীরের সবুজ স্পর্শ,
    দেখি অরণ্য— দু’হাতে ধরা উষ্ণ ছায়ার মতো।

    অরণ্যের গন্ধ আমি মুঠোয় ভরি—
    মায়ার টান ছিঁড়ে যায়, যতিচিহ্ন উল্টে ফেলে সময়;
    হঠাৎ ঠোঁটের স্পর্শে জেগে ওঠে প্রেম
    আর প্রেমের নিচে দাউ দাউ করে জ্বলে বহ্নিশিখা।

    তার পর্দা সরিয়ে নিই— শেষ আলোটুকু
    ছিনিয়ে আনার উন্মাদ তৃষ্ণায় কেঁপে ওঠে দেহ,
    নিঃশেষ হয়ে আসে স্বেদ কণিকা—
    তবু আরো, আরো চাই—
    কারণ শৃঙ্গার তো এমনই—
    জ্বালা আর জলের
    এক নিঃশব্দ, দহনময় সমর্পণ।

    ৩১. মায়ার টান

    তার প্রাণের কথা ভেসে আসে হঠাৎ—
    বাতাসে ভাসমান কোনো অনুচ্চারিত শব্দের মতো।
    মায়াবী কাজল চোখ দুটো
    অন্ধকারের ভেতরেও নিজের আলো নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে—
    যেন স্মৃতির ভিজে জানালায় জমে থাকা কুয়াশা।

    বহুদিনের চেনা গন্ধ
    ঘুরে বেড়ায় ঘরের কোণে কোণে,
    বালিশে লেগে থাকা সুগন্ধি
    হঠাৎই খুলে দেয় দরজা—
    যার ওপারে সময় থেমে থাকে
    তোমার অনুপস্থিতির নরম অথচ তীক্ষ্ণ স্পর্শ হয়ে।

    গল্প বলা অজস্র রাতেরা
    এখনো চাঁদের আলোয় পাতার মতো কাঁপে।
    অস্পষ্ট ডাকনামগুলো
    কখনো ভোঁতা ছুরির মতো,
    কখনো জলরেখার মতো নরম হয়ে
    মনে পড়ে, হারিয়ে যায়, আবার ফিরে আসে।

    সবকিছু আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখে—
    কেউ যেন অদৃশ্য সুতো ছুড়ে দিয়েছে
    আমার শ্বাস-প্রশ্বাসের ভেতরে,
    যা টানলেই শুধু
    তোমার দিকে ঝুঁকে পড়ে
    পুরো দিন, রাত, শরীর, স্মৃতি, মন।

    সবই তোমার মায়ার টানে—
    এক অদৃশ্য কেন্দ্রের চারদিকে
    আমার প্রতিটি অনুভব
    নক্ষত্রের মতো ঘুরে ঘুরে
    অবশেষে এসে থামে
    তোমারই গোপন আকর্ষণে।

    ৩২. মায়াবতী

    তপ্ত দুপুর হোক, পরন্ত বিকেল হোক, কিংবা সন্ধ্যার আড়াল—
    আমি দরজায় কড়া না দিতেই নীরব স্নিগ্ধতায় খুলে যায় কপাট,
    একজন মায়াবতী দাঁড়িয়ে থাকে ঠিক ওপারে,
    যেন আমার ফেরা তার প্রতিদিনের নিশ্চিত প্রত্যাশা।

    আমাকে এক মুহূর্তও থামতে হয় না—
    টেবিলে সাজানো থাকে উষ্ণ খাবার,
    বিছানা থাকে ধোওয়া রোদের গন্ধে পরিপাটি,
    ফুলদানিতে ঝরে পড়তে থাকে অদৃশ্য সুবাসের মায়া।
    শোবার ঘরে মশারি নামানোর ছোট্ট কাজটুকুও
    তার অদেখা হাতে নিজে থেকেই নেমে আসে।

    তবু আশ্চর্য—
    শুক্লপক্ষের রুপালি জোৎস্নায়
    আমি কোনোদিন তাকে এনে দিইনি
    একটি রজনীগন্ধার ক্ষুদ্র শাখাও,
    দিইনি নীলকণ্ঠ পাখির কোনো আশীর্বাদী পালক।

    মায়ার এত ঋণ নিয়ে বেঁচে থাকা
    কখনো কখনো চাঁদের আলোতেও লজ্জা দেয়।

    ৩৩. উপেক্ষিতা

    ভোরের অস্ফুট আলোয় একদিন
    ইনবক্সে এসে থেমেছিল একটি বার্তা—
    “সুপ্রভাত আপনাকে,
    ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছি,
    এড করে নেবেন?”

    নতুন করে কাউকে জুড়ে নেওয়ার
    ইচ্ছেগুলো তখন শুকনো পাতা,
    তবুও অবশেষে
    একজন মানুষ ঢুকে পড়ল বন্ধুত্বের তালিকায়।

    তারপর প্রতিদিন ভোরে
    ঝরে পড়ত শুভেচ্ছার শিশির—
    সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা,
    রাত্রির নরম গোধূলি পর্যন্ত।

    ফরোয়ার্ড করা সেই শুভেচ্ছাগুলো
    দেখতেই ইচ্ছে হতো না—
    সময়ের অভাবে, ক্লান্ত হৃদয়ে,
    জীবন থেকে যে গান হারিয়ে গিয়েছিল বহু আগেই।

    তবুও সে পাঠাত সুরের দোলা—
    “তুমি চেয়েছিলে জানতে…”
    “জীবনে যদি দীপ জ্বালাতে না পারো…”
    “আমারে তুমি অশেষ করেছ…”
    অসংখ্য গানের লিঙ্ক,
    যার কোনোটিই আর শোনার সময় হয়নি আমার।

    একদিন হঠাৎ দেখি—
    সব সুর থেমে গেছে।
    সকালের সুপ্রভাত নেই,
    নেই রাত্রির শান্ত শুভেচ্ছা,
    নেই কোনো গান, কোনো কণ্ঠ।

    জানতেও ইচ্ছে হলো না—
    কেন থেমে গেল তার শব্দের সেতার।
    তবুও, মানুষের মন তো কখনও কখনও
    পদ্মপাতার মতো কোমল হয়,
    কৌতূহলের হাওয়ায় ভিজে ওঠে।

    চলে গেলাম তার প্রোফাইলে—
    দেখলাম, ফুলে ফুলে ভরে আছে দেয়াল,
    বন্ধুরা রেখে গেছে কান্নার ঝর্ণাধারা।
    নীরব বিদায়ে ভেসে যাচ্ছে মেয়ে মানুষটি—
    যাকে আমি কত উপেক্ষা করেছি নির্দ্বিধায়।

    খারাপ লাগল খুব,
    চোখও চিকচিক করল অজান্তে।
    জগতে এমন নিঃশব্দ প্রস্থান
    এতটা কাছে থেকেও অচেনা থাকে!

    জানি, সে আর কোনো কমেন্ট দেখবে না—
    তবুও ছোট্ট করে লিখলাম—

    “ওপারে তুমি ভালো থেকো—
    Rest in Peace.”

    ৩৪. আমি আসব

    নীলিমার নীরব আকাশ ভেদ করে
    যেদিন আকুল হয়ে বইবে বসন্ত বাতাস,
    পথের ধুলোয় জমে থাকা পুরোনো মনখারাপ উড়ে যাবে হাওয়ায়,
    সবুজ বৃক্ষরাজির পল্লব তখন ঝিরি ঝিরি করে দুলে উঠবে—
    ঠিক যেন প্রকৃতি নিজেই তোমার নামে উচ্চারণ করছে
    কোনও গোপন, মধুর, দূরাগত আহ্বান।

    যেদিন পূর্ণিমা রাতের ধূসর ছায়া
    নেমে আসবে পদ্মপুকুরের নীল জলের উপরে,
    তারার আলো গায়ে মেখে জেগে থাকবে জলরেখা,
    চাঁদের রূপালি দোলায় ভেসে উঠবে অগণন স্মৃতি;
    সেই মায়াময় রাতে তুমি যদি দরজার সামনে
    এক মুহূর্ত স্থির হয়ে শোনো—
    হৃদয়ের গভীর থেকে ভেসে আসবে আমার পদধ্বনি।

    সেদিন, সেই দিনেই, সেই শিউলি-সুগন্ধি রাত্রিতে
    আমি আসব তোমার কাছে—
    হাজার বছরের অন্ধকার রাত্রির পর হলেও,
    অপেক্ষার সমস্ত ক্লান্তি, সমস্ত ব্যথা,
    সমস্ত নিঃসঙ্গতা ভেঙে আমি আসব।
    কারণ প্রেমের পথে সময় কখনও অন্তরায় নয়;
    প্রেম শুধু পথ চেনে, আলো চেনে, চেনা মুখের আকুলতা চেনে।

    তুমি থাকলেই বসন্ত ফিরে আসে,
    তুমি ডাকলেই পূর্ণিমা জ্বলে ওঠে আবার—
    আর আমি?
    তোমার সব অপেক্ষার গভীরে
    নিঃশব্দে, নিবিড় বিশ্বাসে
    অবশেষে পৌঁছে যাই।

    ৩৫. অপেক্ষার বসন্তরাত

    যেদিন আকুল হয়ে বইবে বসন্তের নরম বাতাস,
    ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির দুলে উঠবে মৃদু স্পর্শে,
    যেদিন সবুজ বৃক্ষরাজির পল্লব ঝিরিঝিরি মন্ত্রে
    গেয়ে উঠবে নীরব কোনো প্রাচীন সুর—
    সেদিন পৃথিবী জুড়ে এক অদৃশ্য আলো নেমে আসবে।

    যেদিন পূর্ণিমা রাতের ধূসর ছায়া
    নেমে আসবে পদ্মপুকুরের স্থির জলে,
    চাঁদ যেন মুগ্ধ হয়ে হাত রাখবে জলের কপালে,
    মাছেরা থেমে যাবে—
    শুধু জলের ভেতর সেই আলো দোল খেয়ে উঠবে।

    সেদিন সেই দিনে, সেই রাত্রির হৃদয়ভরা নিস্তব্ধতায়
    আমি আসব তোমার কাছে।
    হাজার বছরের অন্ধকার রাত্রির পর হলেও
    পথ খুঁজে নেব তোমার জানালার ঠিকানায়,
    ঝরা পাতার মতো নিঃশব্দ পায়ে
    দাঁড়াব তোমার দরজার সামনে।

    তুমি হয়তো বুঝতেও পারবে না—
    কোনো পুরোনো জীবনের ডাক,
    কোনো অব্যক্ত প্রতিশ্রুতির আলো
    আমাকে টেনে আনবে তোমার দিকে।

    একা বসন্তরাতের মতোই নরম,
    পূর্ণিমার ছায়ার মতোই স্নিগ্ধ হয়ে
    আমি আবারো ফিরে আসব—
    তোমার কাছে,
    তোমার অনন্ত প্রতীক্ষার গভীরতায়।

    ৩৬. অলৌকিক আলো

    মনে হয়—
    জগতের সকল অন্ধকার
    দিয়ে তোমাকেই ঢেকে রাখি আমি,
    নিভে যাওয়া প্রদীপের মতো
    তোমাকে আঁধারের মাঝে লুকিয়ে রাখি।

    তবু তুমি—
    কখন যে শত সহস্র আলোকবর্তিকা হয়ে
    অদৃশ্য কোনো শক্তিতে
    অন্ধকার ভেদ করে জ্বলে ওঠো—
    আমি টের পাই না।

    মুহূর্তেই তখন
    আমার সব নীরব ঘর
    অলৌকিক আলোয় ভেসে ওঠে,
    ছায়ারা ফেলে যায় দুঃখের ভার,
    আর তুমি দাঁড়াও
    আমার সমস্ত অন্ধকারের
    অমর দীপশিখা হয়ে।

    ৩৭. চেনা গন্ধ

    তার প্রাণের সব কথা জাগে,
    মায়াবী সেই কাজল চোখ—
    নিভৃত ক্ষণে হঠাৎ এসে
    মনকে করে নীরব শোক।

    বহুদিনের চেনা গন্ধ
    ঘুরে ফিরে ভাসে মনে,
    বালিশভরা সুগন্ধির ধোঁয়া
    জাগায় স্মৃতি গোপন সনে।

    গল্প বলা অজস্র রাত্রি,
    হাসি-কান্নার অসংখ্য ঢেউ,
    অস্পষ্ট কত ডাকনামে
    হৃদয় আজও ডুবে রয় সে-ই।

    কত কী যে আষ্টেপৃষ্ঠে
    বাঁধে আমাকে প্রতি ক্ষণে,
    কতভাবে যে জড়িয়ে ধরে
    প্রাণের গভীর আদরে।

    সবই যেন তোমার টানে,
    তোমার নীরব মায়ার ছোঁয়া—
    তোমার জন্যই জেগে থাকে
    আমার অন্তর, হদয়-রোয়া।

    ৩৮. মা, তুমি জান্নাতের পথে গেছ

    মা, তুমি আর ঘরের আলোয় দাঁড়াও না,
    কিন্তু ফজরের আজানে এখনো তোমার কণ্ঠ মিশে সাড়া দেয়।
    মোনাজাতের হাত যখন তুলতে যাই,
    তোমার আঙুলগুলো অদৃশ্য হয়ে এসে
    আমার আঙুলে জড়িয়ে যায়,
    শিখিয়ে দেয়— কীভাবে চাইতে হয় আল্লাহর কাছে।

    তুমি পরপারের পথিক—
    যে পথের শেষ নেই আঁধারে,
    শেষ আছে কেবল নূরে, রহমতে, মাগফিরাতে।
    আমি বিশ্বাস করি—
    মৃত্যু কোনো বিচ্ছেদ নয়,
    এটা রবের ডাকে ফিরে যাওয়া,
    এটা জান্নাতের দরজায় গিয়ে কড়া নাড়া।

    মা, তোমার কপালের সিজদার দাগ
    মাটি মুছে ফেলতে পারেনি,
    ফিরেশতারা তাকে নিয়ে গেছে
    বরকতের আলোকণায়।

    যে চোখ আমাকে ঘুম পাড়াতো শৈশবে,
    সে চোখ আজ কবরে নরম আলো হয়ে জ্বলে—
    মুনকার-নাকিরের প্রশ্নেও
    শান্ত উত্তর খুঁজে পায় রবের তাওফিকে।

    মা, তোমার জন্য আজও বিছাই ফুল নয়—
    বিছাই আয়াত, দুরুদ, দোয়ার পাপড়ি।
    “রাব্বির হামহুমা কামা রব্বায়ানি সগিরা”
    এই এক আয়াতের ডানায় ভর করে
    প্রতিদিন তোমার কবর পর্যন্ত পৌঁছে যায়
    আমার ভালোবাসার সালাম।

    কত ঈদ কেটেছে তোমার হাসিতে,
    এখন ঈদ আসে তোমার স্মৃতিতে।
    সেহরির থালায় তোমার ছোঁয়া নেই—
    কিন্তু রমজানের বরকত যখন নামে,
    মনে হয় তুমি অন্য জগতের রোজাদার,
    ইফতারের সময় নূরের পেয়ালা হাতে
    আমার জন্য দোয়া পাঠাও।

    মা, তুমি কোরআনের তিলাওয়াতে ছিলে নদীর মতো,
    ধীর, গভীর, অবিরাম।
    আমি হয়তো সব শব্দ শিখিনি তোমার মতো,
    কিন্তু তোমার শেখানো বিসমিল্লাহর সুর
    আজও আমার প্রতিটি কাজে প্রথম লাইন।

    যখন রাত দ্বিধায় ভেঙে পড়ে,
    তোমার উপদেশ ফিরে আসে—
    “আল্লাহ যা নেন, তার চেয়ে উত্তম কিছু দেন,
    ধৈর্যই মুমিনের শক্তি।”

    মা, তুমি কবরে কিন্তু একা নও,
    তোমার সাথে আছে—
    আমল, তাসবিহ, দান-সাদাকার ফসল,
    আর সন্তানদের পাঠানো দোয়ার সওগাত।

    আমি জানি মা,
    কবর এখন তোমার জন্য বাগান—
    আখেরাতের বাগানের এক টুকরো শান্ত জমিন।
    তুমি ঘুমাও সেখানে
    রবের দয়ার চাদরে,
    ভোরের নরম শিশিরে।

    মা, তোমার বিছানার পাশে আর বসি না,
    বসি জায়নামাজে—
    তোমার জন্য চাই ক্ষমা, রহমত, উচ্চ মাকাম,
    প্রভুর কাছে বলি—
    “হে আল্লাহ, যিনি আমাকে দুনিয়ায় মা দিয়েছিলেন,
    তাঁকে আখেরাতে জান্নাত দিন।”

    তুমি চলে গেছ,
    কিন্তু তোমার ছায়া যায়নি—
    কারণ মায়ের ছায়া কখনো মাটিতে পড়ে না,
    পড়ে সন্তানের হৃদয়ে।

    মা, কিয়ামতের ময়দানে
    তুমি যখন দাঁড়াবে—
    আমি চাই তোমার নামের সাথে লেখা থাকুক:
    “ধৈর্যশীল বান্দা, ক্ষমাপ্রাপ্ত আত্মা,
    জান্নাতের সম্মানিত অতিথি।”

    আর আমি সেখানে, দূরের এক সারিতে দাঁড়িয়ে,
    দেখব—
    আমার মা ডাকছেন না আমাকে আর—
    ফিরেশতারা ডাকছেন তাঁকে,
    রবের পক্ষ থেকে বলছেন—
    “প্রবেশ করো, শান্তির জান্নাতে…
    যা প্রস্তুত করা হয়েছে তোমার মতো মায়েদের জন্য।”

    মা, তুমি সত্যিই গেছ—
    দূরে নয়, হারিয়ে নয়,
    তুমি গেছ রবের কাছে,
    আর রবের কাছে যাওয়াই তো
    সব ফেরার চেয়েও উত্তম ফেরা।

    ৩৯. মা, তুমি আলো হয়ে আছ

    মা, তুমি চলে গেছ—
    কিন্তু কি সত্যি চলে যাওয়া যায় কখনও?
    তোমার পায়ের ধুলোর গন্ধ এখনও
    ভোরের বাতাসে মিশে ঘরে ফেরে,
    ডেকে বলে— “বাছা, একটু উঠে আয়।”

    তুমি পরপারে, আমি এই পারে,
    কিন্তু মাঝখানে তো নদী নেই আর—
    শুধু মায়ার সেতু,
    যেখানে প্রতিদিন সন্ধ্যায় দাঁড়িয়ে
    আমি তোমার দিকে চেয়ে থাকি।
    তুমি হাত নাড়ো কি না দেখি না—
    তবুও বুক ভরে যায়,
    মনে হয় তুমি দেখছ আমাকে।

    তোমার শাড়ির আঁচল আজ নেই কাঁধে,
    কিন্তু তার ছায়া পড়ে আমার হৃদয়ে—
    যখন জীবন রোদে পুড়ে খসখসে হয়,
    তুমি শীতল মেঘ হয়ে নেমে আসো।

    মা, তোমার কথা আজ নীরব,
    তবু প্রতিটি প্রার্থনায়, প্রতিটি দোয়ার ধ্বনিতে
    তুমি উচ্চারিত হও— আগের চেয়েও বড়ো।

    তুমি ঘুমিয়ে নেই,
    তুমি হারিয়ে যাওনি,
    তুমি শুধু অন্য আকাশে উঠে গেছ
    আর সেখান থেকে আলো ছড়াচ্ছ
    আমার পথের উপর।

    যে পথ শিশুকালে তুমি ধরে দিয়েছিলে হাত,
    আজও সেই হাত ধরে রেখেছ— অদৃশ্য হয়ে,
    আমাকে ফেলে না দিয়ে,
    আমাকে ভুলে না গিয়ে।

    মা, তুমি স্বশরীরে নেই বলে
    চোখে জল আসে—
    কিন্তু তুমি হৃদয়ে আছ বলে
    চোখ মুছে ফেলেও হাসি ফোটে।

    কারণ,
    মা কখনও মুছে যায় না,
    মা শুধু আলো হয়ে থাকে—
    চিরকাল… পরম যত্নে।

    ৪০. মা রাবেয়া খাতুন

    মা,
    তোমার নাম রাবেয়া খাতুন—
    শুধু একটি নাম নয়,
    এটা ছিল আমার জীবনের প্রথম পাঠশালা।

    তুমি যার কাছে বেতন নাওনি,
    তারাই তোমার কাছে শিখেছে—
    অক্ষর, স্বপ্ন আর মানুষ হওয়ার বর্ণমালা।
    গ্রামের মাটির স্কুলঘরে
    চকের ধুলোর গন্ধে মিশে আছে
    তোমার নিঃস্বার্থ কণ্ঠের ধ্বনি—
    “শেখো, জানো, বড়ো হয়ে ওঠো—
    জীবনই সবচেয়ে বড়ো পরীক্ষা।”

    শাড়ির আঁচলে বাঁধা ছিল বইয়ের ভার,
    কিন্তু তোমার কাঁধে ভার ছিল না—
    দানের মতোই ছিল শিক্ষা,
    নিঃশব্দে বিলিয়ে দেওয়া এক সদকায়ে জারিয়া।

    মা,
    তোমার ক্লাসে শুধু পড়া পড়ানো হতো না,
    সেখানে শেখানো হতো—
    সত্য কথা বলা,
    ছোটকে স্নেহ,
    বড়োকে সম্মান,
    আর প্রতিরাতে রবের কাছে ফিরে যাওয়া।

    তারপর একদিন,
    আল্লাহ ডাক দিলেন,
    তুমি প্রস্তুত হলে—
    হাজারো শিশুর দোয়ায় উত্তীর্ণ হয়ে
    হজ্জের সাদা ইহরামে জীবন লিখে
    চলে গেছিলে কাবার ছায়ায়।

    হাজারো মানুষের ভিড়ে
    একজন তুমি,
    তবু আল্লাহর কাছে
    তুমি ছিলে অদ্বিতীয় এক প্রার্থনাকারিণী।
    লাব্বাইক ধ্বনির স্রোতে ভেসে
    তুমি ধুয়ে এসেছিলে
    নিজের আত্মা নয় শুধু,
    আমাদের পুরো পরিবারের ভাগ্য।

    সেই হাত,
    যে হাতে চক ছিল—
    তাতে জড়িয়েছিল তাসবিহও।
    সেই কপাল,
    যে কপালে সিজদার নরম দাগ ছিল—
    সে কপাল স্পর্শ করেছিল
    বাইতুল্লাহর পবিত্র সালামের হাওয়া।

    মা,
    তুমি চলে যাওয়ার পর
    স্কুলঘর হয়তো রঙ হারিয়েছে,
    ক্লাসঘর হয়তো নীরব…
    কিন্তু তোমার পড়ানো প্রতিটি অক্ষর
    আকাশে পাখি হয়ে উড়ে বেড়ায়,
    তোমার আমল হয়ে জমা হয়
    রবের খাতায়।

    মা,
    তুমি এই দুনিয়ার স্কুলে ছিলে অবৈতনিক,
    কিন্তু আখেরাতের দরবারে
    তুমি আজ মূল্যবান—
    কারণ তুমি শুধু শিক্ষক ছিলে না,
    ছিলে আল্লাহর এক দয়ার দূত,
    যে দয়া দিয়ে মানুষ গড়ত।

    আজ যখন জায়নামাজে বসি,
    তখন মনে হয়—
    তুমি আমার সামনে নেই,
    কিন্তু তোমার মাকামের দিকে তাকিয়ে
    ফিরেশতারা হাসেন,
    আর আল্লাহ বলেন—
    “বান্দা রাবেয়া, তুমি শিখিয়েছ আমার পথ,
    আমি আজ তোমাকে দিচ্ছি চিরশান্তির গৃহ।”

    মা,
    যারা তোমাকে মা ডাকেনি,
    তারাও তোমাকে মন থেকে মা জানে—
    কারণ দুনিয়ায় কিছু মা থাকেন
    যারা সবার মা হয়ে ওঠেন।

    তুমি গেছ, তবু আছ—
    রহমতের মেঘ হয়ে,
    শিক্ষার আলো হয়ে,
    হজ্জের পবিত্র স্মৃতি হয়ে,
    আর দোয়ার কবুল দরজায়
    এক উজ্জ্বল মিনার হয়ে।

    মা রাবেয়া খাতুন,
    তুমি শুধু পরপারে যাওনি,
    তুমি পৌঁছে গেছ
    আমার ঈমানের গোপন শক্তি হয়ে,
    আর আমাদের দোয়াগুলোকে ডানা দিয়ে
    চিরদিন আল্লাহর কাছে পৌঁছে দেওয়ার
    এক পবিত্র ঠিকানা হয়ে।

    ৪১. কলাভবনের দিনগুলো

    কলাভবনের পুরনো সিঁড়ি বেয়ে উঠতাম প্রতিদিন,
    নরেন্দ্র বিশ্বাস স্যারের ক্লাসে জমে থাকত বিকেলের রোদ–ঘ্রাণ।
    নাট্য স্বরে কথপোকথন , আলোচনার দীর্ঘ ঢেউ,
    বন্ধুর কণ্ঠে ভেসে আসত হাসি, আর তর্কের গান।

    লাইব্রেরি চত্বর ছিল নীরবতার সবুজ জগৎ,
    বইয়ের পাতায় ঘুমিয়ে থাকত ইতিহাসের নীল নদ।
    কখনো ক্লান্ত দুপুরে ঘাসে বসে ভাবনার আড্ডা,
    জ্ঞান আর স্বপ্ন মিলেমিশে বুনত নতুন শুরু–পদ।

    টিএসসির মেঝেতে পায়ের ছন্দ ছিল স্বাধীন,
    চায়ের কাপে সাহিত্য, প্রেম, রাজনীতির মিশেল কথা।
    কত সন্ধ্যা কেটে গেছে ব্যান্ডের সুরে আর ভিড়ে,
    বন্ধুত্বের টানেই বুঝি হৃদয়ের সত্য প্রার্থনা।

    বটতলার ছায়ায় বেজে উঠত জীবনের আলাপন,
    কবিতা আর স্মৃতিরা ওখানেই হয়েছিল জাগ্রত।
    পলাশ ঝরা দুপুর, কিংবা রাতজাগা ক্যাম্পাস হাঁটা,
    সহপাঠীদের চোখেই খুঁজতাম নিজের প্রতিচ্ছবি দীর্ঘপথ।

    আজ সময় বহুদূর, পথ ঘুরে গেছে অন্যখানে,
    কিন্তু স্মৃতির দরজায় ডাক দেয় পরিচিত মুখ।
    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, তুমি হৃদয়ের অনিঃশেষ ঠিকানা,
    ফেলে আসা দিনগুলোতেই জমে আছে জীবনের সুখ।

    ৪২. অপেক্ষার হাহাকার

    এখনও রাস্তায় হাঁটলে হঠাৎ মনে পড়ে যায়—
    কেউ একজন আসবে বলেছিল,
    কিন্তু আসেনি কখনো।

    চলে আসে সেইসব দিন,
    যেদিন তার জন্য সাজিয়েছিলাম
    অগণিত ছোট ছোট আয়োজন;
    পুরোনো চিঠির ভাঁজে ভাঁজে
    লুকিয়ে রাখা কবিতা,
    সুন্দরতম শব্দমালা,
    মুগ্ধ করা কয়েকটি মুহূর্ত,
    হৃৎস্পন্দনের নিবিড় অনুরণন—
    সব উঠে আসে একসাথে।

    বুকের ভেতর কেমন এক হাহাকার,
    ঠিক কষ্ট বলা যায় না,
    কেমন যেন এক অচেনা ভার।
    সবার চোখ এড়িয়ে
    একলা রাতে
    বালিশে মুখ গুঁজে থাকতে ইচ্ছে করে।

    মনে হয়, হাতের সব কাজ ফেলে
    স্টেশনের সেই কাঠের বেঞ্চটায় গিয়ে বসি—
    শূন্য সন্ধ্যার মতো।
    মনে হয়, বসন্তের ঝরে যাওয়া পাতার উপর
    মর্মর শব্দ তুলে
    হেঁটে হেঁটে
    দূরে— আরও দূরে—
    চলে যাই,
    যেখানে কেউ অপেক্ষা করে না,
    তবুও হৃদয়ের প্রতিটি ধ্বনি
    কারও জন্য অপেক্ষায় থাকে।

    ৪৩. বৃষ্টি-ভেজা প্রতীক্ষা

    আমার চোখ এখনও তাকিয়ে থাকে
    সেই পথের দিকে—
    যে পথে লতা-গুল্ম, শিশিরধোয়া ঘাস
    চূর্ণ হয়ে আছে তোমার পদচিহ্নের নিচে।
    তারপর একদিন আকাশ ভরেছে মেঘে,
    ঝরেছে নিরন্তর জল,
    পথের সব রেখা ভেসে গেছে
    কাদার ঢেউয়ের অনুতাপে।
    তবুও মেঘের নিচে
    সেই কাদামাখা পথে
    কেউ আর ফেরেনি—
    একজনও না।
    এত জল, এত অন্ধকার মেঘ—
    ভিজে ভিজে আমি হাঁটি একাই,
    হৃদয়ের ভেতর জেগে ওঠে
    জলধারার মতো দীর্ঘ প্রতীক্ষা।
    হায়, আমার এই বৃষ্টি-ভেজা নিঃসঙ্গ ভালোবাসা
    অনুভব করল না কেউ—
    দেখল না কেউ—
    শুধু আকাশ নেমে এসে
    আমার কাঁধে রাখল
    তার অনন্ত সান্ত্বনার হাত।

    ৪৪. গ্রহণ করেছি যত

    প্রত্যন্ত ভোরের দোরগোড়ায়,
    অলস কুয়াশার ভেতর দিয়ে
    আদরের শেষ আলোটুকু ক্ষীণ হয়ে আসে—
    সে তখন অর্ধনিদ্রায় ভেসে যায়,
    কোমল নিঃশ্বাসের ঢেউয়ে
    ঘুম আর জাগরণের মাঝেকার
    এক বিস্মৃত অন্দরে হারিয়ে পড়ে।

    আমি থাকি নিঃশব্দে।
    এমন এক নীরবতা যেখানে
    আমার নিশ্চিন্ত মুখের ওপর
    সময় নিজের হাত রেখে
    সান্ত্বনার আদেশ লিখে যায়।
    দূর থেকে ভেসে আসে
    রাগ-ভৈরবীর অস্পষ্ট সুর—
    যেন আকাশের শিরায় শিরায়
    ভোরের আলো জেগে ওঠার চেষ্টা করছে।
    শিউলির গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে
    নাকে নয়—মনের চারপাশে।

    এই ক্ষুদ্র, ভঙ্গুর, অনামা মুহূর্তটাই
    তার পরম প্রাপ্তি—
    আমার মুখের প্রশান্তি দেখে
    তার সমগ্র ভেতরের জগৎ
    নীরবে পুনর্বিন্যাসিত হয়।
    সব গ্লানি ঝরে পড়ে,
    সব আক্ষেপ ম্লান হয়,
    চাওয়া-পাওয়ার সব রেখা
    এক অনন্ত সাদা জায়গায় বিলীন হয়ে যায়।

    সুখ কেউ খুঁজে ফেরে
    ধনদৌলতের অগণিত আলোয়,
    কেউ আবার খুঁজে পায় এমনই কোনও ক্ষণে—
    যেখানে ভোরের রঙ জানে না
    তার নিজস্ব নাম,
    শিউলি জানে না সে কোথা থেকে ঝরেছে,
    আর মুখের উপর রাখা শান্তি
    নিজেই হয়ে ওঠে এক অদ্ভুত, বিমূর্ত,
    অবর্ণনীয় প্রাপ্তি।

    ৪৫. মায়ামুখের স্মৃতি

    বিস্মৃতির ধুলোমাখা কত মুখ
    এখনও ঘুম ভাঙায় আমার অন্তরে—
    নরম কোনো নিশ্বাসের মতো
    ভেসে আসে তাদের অবয়ব,
    অপরাহ্নের আলোয় ধূলিকণার মতোই
    ঝলসে উঠে মিলিয়ে যায়।

    তাদের ডাক নিঃশব্দ,
    তবু আমার বুকের গভীরতলে
    হালকা শিহরণ তোলে—
    যেন বহুদিন আগে রাখা
    একটি ভেজা চিঠির গন্ধ
    হঠাৎ ফিরে পায় জীবন।

    অলক্ষ্যে লুকিয়ে থাকা অশ্রুগুলো
    জানালার ধারে শিশিরের মতো জমে থাকে,
    চোখের কোণে নরম ভেজা ঝিলিক—
    তারা বলে দেয়,
    ভুলে যাইনি আমি,
    ভুলে যাওয়া তো কোনোদিনই পারিনি।

    কিছু মুখের স্মৃতি
    বাতাসেও বিলীন হয় না—
    সে মুখগুলো ফিরে আসে
    রাত্রির নিঃশব্দতার ভেতর দিয়ে,
    স্বপ্নের কোমল আলো হয়ে,
    স্মৃতির অদৃশ্য মায়াজাল বুনে।

    আর আমি—
    অঁচল ভেজা সেই নরম আলোয়
    চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুনি
    সেই পুরোনো মায়ামুখদের
    নীরব ডাক—
    যারা হারিয়েও
    ফিরে আসে অশ্রুকণার ছদ্মবেশে।

    ৪৬. নীরব অন্তরালের কবিতা

    মানুষ আসে—
    মুঠোভরা উষ্ণতা নিয়ে,
    কিছু স্বপ্ন, কিছু আলো,
    কিছু রোদের মতো হাসি সঙ্গে করে।

    তারপর একদিন হঠাৎ
    সময়ের কুণ্ডলী খুলে যায়—
    অচেনা এক দরজায়
    কাকে যেন ডেকে নেয় অদৃশ্য কোনো পথ।

    জীর্ণ জীবনের মলিন পোশাকে
    সে ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়
    নীরব এক অন্তরালে,
    যেখানে শব্দ নেই, কোলাহল নেই,
    রয়ে যায় শুধু অসীম নিস্তব্ধতা।

    হায়! মানুষ কোথায় যে চলে যায়—
    কোন দূরতম পরপারের আহ্বানে
    কোন অদ্ভুত স্বর্গ-ছায়ায়
    লীন হয়ে যায় তার দগ্ধ দিনরাত্রি।

    আমরা শুধু দেখি
    তার হাঁটার শেষ রেখাটি—
    যার পরে আর কোনো পায়ের ধ্বনি নেই,
    কোনো ফিরে আসা নেই,
    শুধু স্মৃতির দোলাচলে
    অল্প কিছু আলো আর বেদনা বেঁচে থাকে।

    মানুষ আসে, আবার চলে যায়—
    অতঃপর থাকে না কিছুই,
    থেকে যায় শুধু প্রশ্নভরা বাতাস—
    আর আমাদের দু’চোখ ভরা
    অচেনা এক শূন্যতার নীল।

    ৪৭. সায়াহ্নে

    কত পথের ধুলো মেখে,
    কত ক্লান্তির সিঁড়ি বেয়ে
    যখন শেষমেশ তোমার দরজায় এসে দাঁড়ালাম—
    দেখলে কি, আমার শ্বাস কত ক্ষীণ,
    আমার সময় কত সামান্য?

    জীবন যেন এক দগ্ধ প্রদীপ,
    যার আলো এখনো ক্ষীণ সুরে কাঁপছে—
    এই অল্প ক্ষণের ভিতর
    কীভাবে বুঝাই তোমায়
    আমার ভালোবাসার দীর্ঘ নদী,
    যার উৎস অচেনা, যার স্রোত অনিঃশেষ?

    আমি জানি, এই ক্ষণস্থায়ী মুহূর্তে
    হৃদয়ের সব রঙ দেখানো যায় না—
    তবু তোমার চোখের গভীরে
    আমার সমস্ত না-বলা ভালোবাসা
    ধরে রাখতে চাই এক ফোঁটা নিঃশ্বাসে।

    যদি সময় খুব কম হয়,
    তবে আমার প্রেমকে সময় দিও—
    তোমার মায়ার স্পর্শে
    হয়তো সে দীর্ঘ হয়ে উঠবে,
    হয়তো আমার সংক্ষিপ্ত জীবন
    তোমার নিঃশব্দ আলিঙ্গনে
    চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।

    ৪৮. কুসুমপুরের কিশোরের স্বপ্নগাথা

    কুসুমপুরে রুক্ষ বসন্তদিনে,
    ঘুঘুডাকা নীরব অপরাহ্নে
    এক কিশোর বসে থাকত পুকুরপাড়ে—
    অকারণ, অথচ গভীর কোনো ডাকে।
    সে জানত না তখনই
    তার পথ বাঁক নেবে দূর শহরের দিকে,
    ধুলি–ধূসর ঢাকা তাকে ডেকে নেবে
    অপরিচিত মানুষের ভিড়ে।
    শত আশাভঙ্গের বেদনা
    জীবনের বিবর্ণ পৃষ্ঠায় জমে ওঠার পর
    সে লিখতে শুরু করে
    গল্প, কাব্য, আর ভাঙা দিনের মায়া।
    এখনও সে হাঁটে পৃথিবীর
    কণ্টকাকীর্ণ পথে,
    স্বপ্নভরা এক ঝুলি কাঁধে—
    যেন পথই তার সঙ্গী,
    আর সঙ্গী তার সৃষ্ট চরিত্রেরা—
    কমলিকা, অদিতি, মেহেরজান, রেবেকা,
    রোহিত ও রঞ্জন—
    সবাই মিলে তার একান্ত ভুবন।
    সে ভাবে—
    এই দেশের মানুষ
    স্বচ্ছতোয়া নদীর জলের মতো
    প্রীতিময় হবে পরস্পরে,
    চিরহরিৎ অরণ্যের মতো
    মুক্ত মনে বেঁচে থাকবে,
    লাবণ্যঘেরা দিগন্তের মতো
    উদারতায় ভরবে দিন,
    পাখিডাকা কুসুমপুরের মতোই
    সারল্যের আলোয় ভাসবে জীবন।
    আর সে—
    স্বপ্নের কিশোর—
    এখনও হারায় না পথ,
    শুধু স্বপ্ন দেখে যায়
    নিঃশব্দ এক দৃপ্ত ভবিষ্যতের।

    ৪৯. হেমন্তের জনারণ্যে

    আজ অনেকটা হঠাৎই দেখা হয়ে গেল দু’জনের,
    শহরের পিচঢালা পথে, নিস্তব্ধ ল্যাম্পপোস্টের তলে—
    যেখানে ভিড় থেকেও আলাদা ছিল এক টুকরো নির্জনতা।

    আলো–আঁধারের মগ্ন সীমায় তোমাকে দেখলাম—
    ঠোঁট শুষ্ক, দীর্ঘদিন যেখানে চুমুর আল্পনা আঁকা হয়নি,
    বুকের আঁচল বিবর্ণ, সুগন্ধিহীন এক শীতল বিষাদের মতো—
    মনে হলো, এ বুকে কত কাল কোনো আলিঙ্গনের শব্দ ঝরে পড়েনি।

    আজ আর তোমার হাত ধরা হলো না,
    মেহেদিহীন নখগুলোও যেন অচেনা হয়ে গেছে পথে—
    হাঁটছিলাম এলোমেলো দুই সমান্তরাল নীরবতা হয়ে,
    এভাবে তো হাঁটে না কোনো প্রেমিক–প্রেমিকা…

    তবু আমি বারবার খুঁজে নিচ্ছিলাম তোমার চোখ—
    সেই কাজলবেষ্টিত দীঘির গভীরতা আর নেই,
    এখন সেখানে জলপড়া পাথরের কালচে নিস্তেজ আভা—
    যে চোখকে কোনোদিন দুঃখ কিংবা অনাদরে ছুঁইতে দেইনি,
    সেই তুমিই আজ ক্লান্ত, দীনহীনা, অভাগিনীর ছায়া হয়ে দাঁড়ালে।

    পথেরা আজ লক্ষ্য করল না তোমার বিষণ্নতার পদধ্বনি,
    অথচ এই শহরই তো একসময় আমাদের ভালোবাসার সাক্ষী ছিল—
    পার্কের পাখির ডাকে লেগে আছে কত চুমুর ইতিহাস,
    বনের কাকাতুয়ার ডানায় জমে আছে কত আলিঙ্গনের গোধূলি।

    আজ সে সবই ফিরে ফিরে আসে— নষ্ট নস্টালজিয়ার মতো।

    কোনো কথা না বলে,
    কোনো চুমু, কোনো আলিঙ্গন না রেখে—
    এই হেমন্তের বিষাদসন্ধ্যায়,
    জনারণ্যের অন্তরালে তুমি মিলিয়ে গেলে,
    আর আমি দাঁড়িয়ে রইলাম— তোমার ফেলে যাওয়া বাতাসে।

    ৫০. এপিটাফ

    এখানে নক্ষত্রের মতো নিভে-না-যাওয়া শান্তিতে
    শুয়ে আছেন কোয়েল তালুকদার—
    কার্তিকের সোনালি আলোয় জন্ম,
    যমুনা-পারের পলিমাটির আশীর্বাদে বড় হওয়া এক আত্মা।

    মা রাবেয়া খাতুন—হৃদয়ে মানচিত্রের বিস্তার,
    পিতা হারুন অর রশিদ তালুকদার—মাটি ও মানুষের স্থির প্রতীক।

    তিনি চেয়েছিলেন কবি হতে;
    হতে পারেননি—
    তবু তাঁর জীবনই হয়ে রইল
    এক অসমাপ্ত, দীপ্ত, চিরজাগরুক কবিতা।

    যে বাতাস এই ফলকের ওপর এসে থামে,
    সে যেন এখনো বলে—
    “স্বপ্ন মরে না;
    শুধু নতুন আলোয় ফিরে আসে।”

    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleঅ্যালগোরিদম বনাম অন্তর – মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    Next Article চণ্ডরাজার বলি – সঞ্জয় ভট্টাচার্য

    Related Articles

    কোয়েল তালুকদার

    দাঁড়াও সময় (কাব্যগ্রন্থ) – কোয়েল তালুকদার

    January 6, 2026
    কোয়েল তালুকদার

    শুক্লপক্ষের তারা – কোয়েল তালুকদার

    August 3, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অসম্পূর্ণ বই
    আয়মান সাদিক
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    রুদ্রসমগ্র – রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

    January 8, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    রুদ্রসমগ্র – রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

    January 8, 2026
    Our Picks

    রুদ্রসমগ্র – রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

    January 8, 2026

    রান্না খাদ্য পুষ্টি – সিদ্দিকা কবীর

    January 8, 2026

    শহর খুলনার আদি পর্ব – আবুল কালাম সামসুদ্দিন

    January 8, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }