মায়াজাতক – ১
(১)
ট্রেন থেকে নেমে অন্ধকারের মধ্যেই এগিয়ে গেল বিপ্লব। গ্রাম্য স্টেশন। রাত বারোটা বাজতেই শুনশান। আলো ওই প্লাটফর্ম চত্বরেই সীমাবদ্ধ। অতএব, রাস্তায় উঠলেই ভরসা চাঁদের আলো আর মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইট। এই রাস্তাটায় যে ল্যাম্পপোস্ট একেবারেই নেই তা নয়। আছে হাতে গোনা কিছু। তবে তাদের সবকটায় আলো নেই। বেশ কিছুমাস আগেই নতুন লাইট লাগানো হয়েছিল এই স্টেশন থেকে নেমে বাঁদিকের রাস্তার মুখটায়। কিন্তু একমাস হল সেটা বিগড়েছে। এ অঞ্চলের মাথার নজরদারি কম তা তো স্পষ্ট। কিন্তু এলাকাবাসীদেরও যে খুব গরজ আছে তা নয়। কেউ এ বিষয়ে আবেদনও করেনি আর মাথাও একটু চোখ ঘুরিয়ে দেখেনি। সে যাই হোক! মোদ্দা কথা হলো গিয়ে এই রাস্তায় আলো নেই এবং তা নিয়ে বিশেষ কারো মাথাব্যাথাও নেই।
বিপ্লব সেই পথটাই ধরল। সপ্তাহের ছ’টা দিন ডিউটি করার পর শনিবার রাত ন’টা পঁয়ত্রিশের লোকালটা ধরে ওর গন্তব্য স্টেশনে নামে যখন, রাত তখন প্রায় এগারোটা দশ কি পনেরো হয়ে যায়। আজ আবার ট্রেনটা ভালোই টাইমে ঢুকিয়ে দিয়েছে। একদম ঘড়ি ধরে এগারোটা সাত কখনও কখনও বিপ্লব অবশ্য সপ্তাহান্তে বাড়ি ফেরে না। অফিসের কাছে ভাড়া বাড়িটাতে থাকে। ওই বাড়িতেই ও সপ্তাহের বাকি দিনগুলো থাকে। সেই সময়গুলো লাভের বেশ ভালোই রোজগার হয়। সেই জন্যই ছয়দিন টানা কাজ করার পরেও ফেরা যায় না। গত সপ্তাহে এমনই একটা জরুরি কাজ এসে পড়েছিল যার ফলে দু’সপ্তাহ পর বাড়ি ফিরছে বিপ্লব। তাই এই সপ্তাহে শুক্রবার ফিরে যাচ্ছে। শনিবারটা ছুটি নিয়েছে। শনি-রবি এখানে কাটিয়ে সোমবার ভোরবেলায় ফিরবে। এইবার আসার সময় সবার জন্যই জিনিসপত্র কিনে এনেছে। ভালো রোজগার হলে মাঝে মধ্যে একটু এমন কেনাকাটা করে আজকাল বিপ্লব। এতে বাড়ির লোকজনও খুশি হয়। তবে প্রতিবেশীদের একটু গাত্রদাহ হয়। বিপ্লবের এই চাকরি আর বাড়তি ইনকাম যে ওদের গরিবের সংসারে হাল ফিরিয়েছে, গ্রামের আর পাঁচজনের চেয়ে একটু বেশিই উন্নত হয়েছে। এই বিষয়টা সবাই ঠিক নিতে পারছে না। কিছু বছর আগেও যাদের টিনের চালা ছিল তাদের এখন একতলা পাকা বাড়ি, টিভি, ফ্রিজ, দামি খাট, আলমারি! কে জানে কোন আলাদীনের প্রদীপ হাতে পেল!
পিঠের ব্যাগটা একবার ঠিক করে নিয়ে জামাকাপড়ের প্যাকেটগুলো দু’হাতে ভালো করে জাপটে ধরে পথটার দিকে এগিয়ে গেল বিপ্লব। এই রাস্তায় আলো আছে কি নেই বা গ্রামের অন্য কোনও রাস্তাতেও আলো আছে কি নেই বিপ্লবেরও আর পাঁচজনের মতো বিশেষ মাথাব্যথা নেই। আসলে এই গ্রামটা বিপ্লবের জন্মস্থান হলেও ওর আর এখানে থাকতে ভালো লাগে না। কলকাতার ঝাঁ চকচকে জীবনযাত্রা ওর এখন বেশ পছন্দের। ওর ইচ্ছে আর কয়েকটা বছর পর মোটামুটি একটু ভালো টাকা জমিয়ে কলকাতাতে একটা ছোট দেখে ফ্ল্যাট কিনবে যেখানে ওর মা-বাবা স্ত্রী আর মেয়েকে নিয়ে চলে যাবে এই গ্রাম ছেড়ে। বলতে গেলে এই গ্রামের সাথে চিরতরে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে বিপ্লব কলকাতার মতো বড় শহরে নতুন করে সংসার পাতবে। এই স্বপ্ন নিয়ে ও সপ্তাহের সোম থেকে শনি কাজ করার পরেও এক্সট্রা কিছু কাজ করে।
গলিটার মুখ থেকে ডান হাতে বাঁক নিতে একটু থমকে দাঁড়াল বিপ্লব। মনে হল ওর পিছন পিছন একটা পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। চারপাশ একেবারেই শুনশান। এই রাতের দিকে ট্রেনে যে বেশি ভিড় হয় এই গ্রাম্য স্টেশনে তা নয়। ফলে বিপ্লব এখন মোটামুটি একাই বললে চলে। ও ছাড়াও যে দু’জন নেমেছিল তারা অন্যদিকের রাস্তা ধরে হাঁটা লাগিয়েছিল। সুতরাং বিপ্লবের ধারণা অনুযায়ী এই মুহূর্তে তার পিছনে কারও থাকার কথা নয়। পায়ের শব্দ শুনতেই একটু সজাগ হয়ে উঠল বিপ্লব। চোর ছ্যাঁচোড় হবে কি? অবশ্য বলা যায় না! এইসব আধা মফস্বলে চুরি তো লেগেই থাকে। তার মধ্যে বিপ্লব যে শহর কলকাতায় ভালো মাইনের চাকরি করে তা এ গ্রামের কারও অজানা নয়। হাতে বেশ অনেক টাকার জিনিসপত্রও রয়েছে। ব্যাগেও কিছু টাকা রয়েছে যা সংসার খরচের জন্য দিতে হবে বাড়িতে। সেগুলো সব ছিনতাই করার মতলব নেই তো কারও? কথাটা মাথায় আসতেই নিজের ব্যাগপত্র আর একটু শক্ত করে ধরে জোর পায়ে হাঁটা লাগাল বিপ্লব। কিন্তু তার সাথে সাথে ও বুঝতে পারল পিছনে যে আছে সেও পায়ের বেগ বাড়িয়েছে। একবার পিছন ফিরে দেখে নিল বিপ্লব। ঠিক বোঝা যাচ্ছে না অন্ধকারে কিছুই। তবে কেউ যে একটা আছে কারও যে অস্তিত্ব আছে তা বেশ বোঝা যাচ্ছে। বিপ্লব এবার আর দ্রুত পায়ে হাঁটতে নয় ছুটতে শুরু করল। যতটা পারে জোর দিয়ে ছুটে ওকে পৌঁছে যেতে হবে বড় রাস্তায়। যেখানে গেলে একটু আলো পাওয়া যেতে পারে। যদিও সেখানেও লোকজনের উপস্থিতি শূন্য। এসব জায়গায় ঝুপ করে সন্ধে নামে। রাতও ঘনিয়ে আসে তাড়াতাড়ি। ফলে আদৌ যে কেউ জেগে বসে থাকবে সে আশা করাই বৃথা।
বিপ্লবকে লক্ষ্য করে তার পিছনে থাকা ব্যক্তিও এবার ছুটতে শুরু করেছে। এমন সময় হঠাৎ বিপ্লবের মনে হল সে আর টাল সামলাতে পারছে না। বড় রাস্তায় ওঠার মুখে কিসে যেন একটা হোঁচট খেয়ে রাস্তার পাশেই আছড়ে পড়ল সে। হাতে ধরে রাখা জামাকাপড়ের প্যাকেটগুলো ছিটকে গেল যত্রতত্র। আর ব্যাগটা ডান হাত থেকে গলিয়ে পাশেই পড়ে গেল। প্রচণ্ড ভয়ে সে উপুড় থেকে সোজা হল। তারপর একটু একটু করে ঘষে ঘষে বড় রাস্তায় ওঠার চেষ্টা করতে লাগল। হ্যাঁ এখানে অবশ্য অল্প আলো আছে। তাতেই বিপ্লব বুঝতে পারল। ওর পিছনে থাকা সেই আততায়ী ওর একদম কাছে এসে পড়েছে। কিন্তু এই আততায়ী যে কে, তা বোঝার বিন্দুমাত্র উপায় নেই। তবে এ যে এই গ্রামের কেউ নয় তা বিলক্ষণ বুঝতে পারছে বিপ্লব। তার পরনে কালো রঙের একটা টুপি দেওয়া জ্যাকেট। পায়ে কালো ট্রাকশ্যুটের প্যান্ট। হাত দুটো গ্লাভসে ঢাকা মুখটা হুডির আড়ালে। এমনকি মুখে সার্জিক্যাল মাস্ক। চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে না ঠিক করে। বিপ্লবের অত মাথা ঘামাবার সময় নেই এখন। এই ব্যক্তি কে আর কেন তার পিছনে এটাই এখন সবথেকে বড় প্রশ্ন বিপ্লবের জীবনে। এ তো গ্রামের কেউ নয়। এই পোশাক-আশাক একেবারে শহুরে। তাহলে কি শহর থেকে কেউ এল? কলকাতা থেকে কেউ বিপ্লবকে ধাওয়া করতে করতে বিপ্লবের গ্রাম অবধি পৌঁছে গেল আর ও টের পেল না? কিন্তু কেন? কী ওই ব্যক্তির উদ্দেশ্য? তাছাড়া সে যখন এসেছে নিশ্চয়ই এই ট্রেনেই এসেছে! তার মানে সে জানে যে বিপ্লব শনিবার রাতে এই লোকালটা ধরেই বাড়ি ফেরে। সে কি বিপ্লবের সম্পর্কে সব জানে? অগুন্তি প্রশ্ন বিপ্লবের মাথায় হুড়মুড় করে ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল। সেই অজস্র প্রশ্নের জাল ছিন্ন করে একটা প্রশ্নই ওর গলা দিয়ে বেরিয়ে এল ‘কে তুমি?’
আততায়ী কোনও উত্তর দিল না। শুধু পকেট থেকে একটা কিছু বের করল। বড় রাস্তার আলোয় তার ফলা ঝিলিক দিয়ে উঠতেই বুঝতে আর বাকি রইল না সেটা কী! আর আততায়ীর উদ্দেশ্যও বিপ্লবের কাছে আর অজানা রইল না। সে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘আমাকে ছেড়ে দাও! আমাকে কেন মারবে? আমি কী ক্ষতি করেছি তোমার? আমার ব্যাগে কিছু টাকা আছে। সেগুলো নিয়ে নাও। আমাকে ছেড়ে দাও। কে তুমি? বলছ না কেন?’
বিপ্লবের এতগুলো প্রশ্নতে যেন কোনও ভ্রুক্ষেপই নেই আততায়ীর। সে আরও এক পা এগিয়ে এল বিপ্লবের দিকে। এখন সে একদম বিপ্লবের কাছে। এইবার সে আরেকটু ঝুঁকে এসে কলারটা চেপে ধরল বিপ্লবের। বিপ্লব তার হাত ধরে ছাড়ানোর চেষ্টা করলে নিজেকে। কিন্তু পারল না। কী শক্ত মুঠি! আরেকটু কিছু বলতে যাচ্ছিল বিপ্লব। হয়তো ওর বাঁচার শেষ আর্তিটুকু করতে চাইছিল। কিন্তু তার আগেই আততায়ী ডান হাতে ধরে থাকা ধারালো ছুরিটা বিপ্লবের গলার এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত স্পর্শ করে দিয়ে বেরিয়ে গেল। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এল সেখান থেকে। বিপ্লব তার গলাটা দুই হাতে চেপে ধরে ছটফট করতে থাকে। যেন সে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করছে! নাকি গলার যন্ত্রণাটা কমানোর চেষ্টা করছে। আরও অনেক কিছু বলতে চাইছিল বিপ্লব। কথা তো দূর, যন্ত্রণার আর্তনাদটুকুও করতে পারল না ঠিক করে। শুধু মুখটা বারবার হাঁ হয়ে খাবি খাচ্ছিল। কিন্তু একটা শব্দ মুখ দিয়ে উচ্চারণ হল না গোঙানি ছাড়া।
আততায়ী সোজা হয়ে কয়েক পা পিছিয়ে এল। তার জোরে জোরে নিশ্বাস পড়ছে। যেন কিছুর একটা উত্তেজনা তার শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি বাড়িয়ে দিয়েছে। কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে বিপ্লবের ছটফটানি দেখল। তারপর একটু শান্ত হল। পকেটে থাকা একটা রুমাল দিয়ে ছুরিটাকে ভালো করে মুছে রুমাল সহ ছুরিটা আবার পকেটে ঢুকিয়ে নিয়ে হাঁটা দিল ফেলে আসা পথের দিকে। আর অন্ধকারে মিলিয়ে গেল নিমেষে। বিপ্লবের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে কিন্তু বিস্ফারিত চোখে সে শুধুমাত্র আততায়ীর মিলিয়ে যাওয়াটুকুই দেখতে পেল। তার মুখ বা পরিচয় কোনওটাই তার আর জানা হল না।
হুইসেল দিয়ে স্টেশনে ঢুকল এখান থেকে শিয়ালদহ যাওয়ার এই রাতের শেষ ট্রেনটা। এগারোটা সতেরোয় সময়। ঢুকল এগারোটা কুড়িতে। স্টেশন চত্বর ফাঁকা। কেবল একটি মানুষ উঠল সেই ট্রেনে। জনমানবহীন কম্পার্টমেন্টে ধীরে সুস্থে গিয়ে বসল একটা জানলার ধারে। ট্রেনটা চলতে শুরু করতেই ফুরফুরে ঠান্ডা হাওয়া এসে ঝাপটা মারল তার দিকে। একটা জোরে শ্বাস নিয়ে সে চোখ বন্ধ করে শরীরটা এলিয়ে দিল পিছনে। যেন পরম শান্তি ছড়িয়ে গেছে তার সারা শরীরে ও মনে।
(২)
কলিং বেলের শব্দ হতেই রান্নাঘর থেকে বেরিয়েই হলঘরের ঘড়িটার দিকে তাকালেন অপর্ণা দেবী। সকাল পৌনে সাতটা। নাহ এখন পেপারওয়ালা বা দুধওয়ালার আসার সময় হয়নি। বরং তার আসার সময় হয়েছে যার জন্য তিনি রান্নাঘরে বিনা চিনির গ্রিন টি বানাচ্ছিলেন। তাঁর মেয়ে। দ্বৈতা। দরজাটা খুলতেই ঘরে ঢুকে এসে ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ল সে। পরনে ট্রাকস্যুট। রোজ এই সময় সে জগিং করে ফেরে। কাকভোরে একাই বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়। তারপর নিজের পছন্দমতো দিকে চক্কর কেটে বাড়ি ফেরে।
‘হল তোর জগিং?’ একটু বিরক্তির স্বরেই প্রশ্ন করলেন অপর্ণা দেবী। তারপর উত্তরের প্রত্যাশা না করেই রান্নাঘরে ঢুকে গেলেন। আর ঠিক চার সেকেন্ড পরে এক কাপ গ্রিন টি টেবিলের উপর রেখে বললেন, ‘কতবার বলেছি ওই কাকভোরে একা বেরোবি না। রাস্তাঘাট ফাঁকা থাকে। আজকাল দিনকাল ভালো যাচ্ছে না। একা মেয়ে চলল ড্যাং ড্যাং করে। কত কিছু বিপদ আপদ হতে পারে। চিন্তায় মাথা খারাপ হয়ে যায় আমার।’
এতক্ষণ গ্রিন-টিতে চুমুক দিচ্ছিল দ্বৈতা। এই ডায়লগগুলো ওর চেনা। শুনতে শুনতে রীতিমতো মুখস্থ হয়ে গেছে। এমনকি এইসব কথা যে কোনদিকে এগোচ্ছে তাও বেশ বুঝতে পারছে। অল্প হেসে বলে ‘মা। তুমি কি সত্যিই আমার একা বেরনো নিয়ে চিন্তিত? নাকি…’
‘কী নাকি? সব মায়েরই চিন্তা হয়! তুমি পুলিশ বলে কি তোমার মায়ের চিন্তা হবে না?’
এইবার জোরে হেসে ওঠে দ্বৈতা, ‘তোমার মেয়ের অন্যদের সুরক্ষা দেওয়া কাজ, রহস্য সমাধানের কাজ। সে নিজে ভয়ে বাড়িতে বসে থাকলে তো হয়েই গেল!’ কথাটা বলতে বলতেই আবার কলিং বেল বেজে উঠল। ‘ওই! চলে এসেছে! এবার আর দেখে কে!’ কথাটা বলে গট গট করে শোবার ঘরের দিকে চলে গেলেন অপর্ণা দেবী।
দ্বৈতা দরজা খুলতেই দেখে পেপারওয়ালা ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে। ওকে দেখতেই একটা সিপাহি স্টাইলে সেলাম ঠুকে পেপারটা হাতে এগিয়ে দেয় ‘ম্যাডাম দিদি এই নিন।’
দ্বৈতা ওর এই কাণ্ড দেখে বহুবার বকা দিয়ে বলেছে, ‘এসব করিস কেন?’
ছেলেটা হেসে উত্তর দেয়, ‘আমার বেশ গর্ব হয় ম্যাডাম দিদি। তুমি কত বড় পুলিশ। আমি তোমার বাড়িতে পেপার দিই। হেব্বি লাগে ব্যাপারটা।’
এখন আর দ্বৈতা কিছু বলে না। ও বুঝেছে এ অভ্যাস পাল্টাবে না। তাই হাসিমুখে পেপারটা নিয়ে নেয়। তারপর পেপারটা খুলে প্রতিদিন ডাইনিং টেবিলে বসে কুড়ি মিনিট ধরে পুরোটা পড়ে। আজও তাই করছে।
‘বলি সারাদিন খুনজখমের খবরে চোখ বোলালে হবে?’ অপর্ণা দেবী আবার বেরিয়ে এসেছেন ঘর থেকে।
‘হুঁ? তা কী দেখব খবরের কাগজে খবর ছাড়া? পাত্রপাত্রীর বিজ্ঞাপন?’
‘হ্যাঁ সেটাও তো কাজের জিনিস নাকি! কিন্তু সেই কাজটাও তোমার মাকেই করতে হবে!’
‘তাই বলি! আজ তো আসল টপিকে ঢুকলে না। সাইড দিয়ে বেরিয়ে গেলে। এখন এলে আসল টপিকে।’ পেপারে চোখ বোলাতে বোলাতে কথাটা বলল দ্বৈতা।
‘তা আর কী করব বলতে পারিস? আমি চোখ বোজার আগে তোর একটা ভালো বিয়ে দিয়ে একটা সুন্দর পরিবার দেখে নাতিনাতনির মুখ দেখে যাব এইটুকু তো আশা! সেটাও পূরণ করবি না তুই?’
‘মা! কতবার বলেছি তোমাকে। আমি কেরিয়ার নিয়ে ভাবতে চাই। এটাই ভালো আছি। সবার জীবনে বিয়ে বাচ্চা, সংসার প্রায়োরিটি হয় না। ওসব পরে হলেও চলবে।’ পেপার থেকে মুখ তোলে দ্বৈতা।
‘পরে? একত্রিশ হয়ে গেছে তোর। খেয়াল আছে? এরপর বাচ্চা হতে কত সমস্যা হয় জানিস?’
‘মা প্লিজ… এ কীসব ভুলভাল টপিক নিয়ে শুরু করলে সকাল সকাল। আমাকে ডিপার্টমেন্টে যেতে হবে। তুমি আর দেরি করিও না প্লিজ!’
‘আমার পর তোর কী হবে? তোর বাবা যা কেয়ারলেস! দেখ না এখনও কেমন ঘুমোচ্ছে! আর দাদা তো বিদেশে পড়ে আছে। নিজের বিয়ে নিয়েই হুঁশ নেই। সে দেবে তোর বিয়ে! কেউ ভাববে না তোর বিয়ে নিয়ে!’
‘মা তুমিও বা এত ভাবছ কেন? এই বেশ আছি। ওরাও সেটা বোঝে!’
‘সেই! আমি আর ভাবছি কেন? ভেবেই বা কী লাভ? তোর মতো এই খুনে ধরা মেয়েকে আর কে বিয়ে করবে! যা খুশি কর! ধুর! আমার ভাললাগে না আর!’ রেগে রান্নাঘরে ঢুকে গেলেন অপর্ণা দেবী।
দ্বৈতা একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে পেপারে মন দিল। ও জানে আজকের মতো এই টপিক থামল। আবার কাল নতুনভাবে শুরু হবে। দ্বৈতার মনে হয় ওর মা পারলে স্বপ্নেও ওর বিয়ে দিয়ে দেয়। কোনও বিয়েবাড়ি বা অনুষ্ঠান বাড়িতে গিয়ে এমনভাবে ছেলে খোঁজার প্রচেষ্টা চালায় যে দ্বৈতার মনে হয় ধরিত্রী ভাগ হয়ে যাক ও প্রবেশ করবে এবার। শুধু ও নয়, ওর বাবা আর দাদাও সামনে থাকলে লজ্জায় পড়ে এবং সুযোগ বুঝে কেটে পড়ে। ওর দাদাও বোঝে বোনের বিয়ে হলেই তার টার্ন। মাত্র দু’বছরের বড় যেহেতু তাই এখন একটু রেহাই পাচ্ছে বিয়ে থেকে। পঁয়ত্রিশ পার করলে আর দেখতে হবে না। সেই জন্যই লক্ষ্মণরেখার মতো বোনকে বিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা সেও করে না। সে জানে বোন যথেষ্ট ম্যাচিওর। ওর সময় হলে ও ঠিক সেই সিদ্ধান্ত নেবে। এমনকি সে নিজেও তাই। আর দ্বৈতার বাবা মেয়ের স্বাধীনতায় বা সিদ্ধান্তে কোনওদিন হস্তক্ষেপ করেননি। আজও তাই করতে চান না। তাঁর বক্তব্য, মেয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো হলে ঠিক সেদিন বলবে। দ্বৈতার চিন্তা তাই ওর মাকে নিয়েই। তবে ও মায়ের দিকটাও বোঝে। তাই কায়দা করে মাকে ম্যানেজ করে।
(৩)
লালকালির পেনটা দিয়ে একটা খাতায় লেখা উত্তরগুলো নিজের মতো ঠিক করে নিচ্ছে সুনেত্রা। কয়েকটায় রাইট চিহ্ন কয়েকটায় কাটা তার বাইরেও কিছু মিস করে যাওয়া উত্তর লিখে দিচ্ছে খসখস করে। বাঁ হাতের তিনটে আঙুল দিয়ে ধরে আছে কপালটা।
‘কী রে কিছু হয়েছে?’ এক বান্ডিল খাতা টেবিলের উপর রেখে সুনেত্রাকে এক ঝলক দেখে নিয়ে প্রশ্ন করল রোহিনি।
‘সেরকম কিছু না। ওই মাথাটা বড্ড ধরেছে। আজ তুমি আমার পরের ক্লাসটা নিয়ে নেবে রোহিনিদি?’ রোহিনির দিকে তাকিয়ে অল্প হাসার বিফল চেষ্টা করে সুনেত্রা।
‘থার্ড তো? হ্যাঁ নিয়ে নেব আমার তো থার্ড পিরিয়ড অফ! অসুবিধা হবে না!’
‘আমি তোমার ফোর্থ পিরিয়ডটা নিয়ে নেব। এই ক্লাসের টাইমটা একটু রেস্ট নিই। ঠিক হয়ে যাবে!’
‘আরে অত ভাবছিস কেন? চুপ করে বস এখানে। আমি পরপর দুটো নিয়ে নেব। আর দীপালিদিকে বলছি তোর জন্য একটা চা বানিয়ে দিতে।’
‘আমি ঠিক হয়ে যাব…’
‘আবার কথা! বলছি না তুই চুপ করে এখানেই বসে থাকবি।’ কথাটা বলেই সুনেত্রার পাশে বসে ভালো করে ওকে একবার দেখে নিল। তারপর ভুরু কুঁচকে প্রশ্ন করল ‘ঠিক কী হয়েছে বলতো তোর? শুধুই শরীর খারাপ?’
‘হ্যাঁ ওই আর কী! জাস্ট একটু মাথাটা যন্ত্রণা করছে। তুমি ঠিকই বলেছ। গরম চা খেলে ঠিক হয়ে যাবে! আমিই আমি দিপালিদিকে দিয়ে আনিয়ে নিচ্ছি।’ কথাটা বলেই হাতে ধরে থাকা খাতাটা বন্ধ করল সুনেত্রা। ক্লাস নাইনের ফিজিক্যাল সায়েন্সের স্টুডেন্টদের কিছু খাতা দেখছিল। কিন্তু মনটা ঠিক খাতা দেখায় ছিল না। মাথাটা ধরে বেশ কিছুক্ষণ বসে ছিল সে। এতটাই মাথাযন্ত্রণা করছে যে চোখ খুলে ভালো করে তাকাতে ইচ্ছা করছিল না কিছুক্ষণ আগে। সুনেত্রা সেন এই ‘সরযূ দেবী বালিকা বিদ্যালয়’-এর একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট টিচার। উঁচু ক্লাসের ‘ফিজিক্স ম্যাম’ আর ছোট ক্লাসের ‘ফিজিক্যাল সায়েন্স ম্যাম’ এই দুটো পরিচয়ই এখানে ওর সবচেয়ে বড় পরিচয়।
‘আমার কাছে একটা ওষুধ আছে মাথা যন্ত্রণার। খাবি?’
‘না গো! আমি খেয়েছি এইমাত্র। তুমি চিন্তা করো না রোহিনিদি। এটা তো আমার নিত্য সঙ্গী। সাইনাসের যন্ত্রণা মনে হয় মৃত্যুদিন অব্দি আমায় ভোগাবে।’
‘দোষ কি শুধু সাইনাসের?’ রোহিনি অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাল সুনেত্রার দিকে। যেন ও ওর এতক্ষণের সন্দেহকে মান্যতা দিয়ে অনেক কিছু ধরে ফেলেছে। সুনেত্রা রোহিণীর প্রশ্নে একটু চুপ করে রইল। মাথা থেকে হাতটা নামিয়ে রোহিণীর দিকে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সেই দৃষ্টিতে কোনও রাগ বা বিরক্তি নেই। বরং অসহায়তা আছে। রোহিনি সুনেত্রার ডান কাঁধে একটা হাত রেখে বলল, ‘বাড়িতে কি আবার সেই একই প্রবলেম?’
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সুনেত্রা। তারপর বলল ‘হ্যাঁ!’
‘সমস্যাটা ঠিক কী তোর ইন-ল’স দের?’
‘আমি! ওদের সমস্যা তো চিরকালই আমি।’
‘আগের মতোই কালও সারারাত ঘুমোসনি নিশ্চয়ই?’ কথার সুর এবার নরম থেকে চরমে উঠল।
‘হুম!’ দু’দিকে মাথা নাড়ে সুনেত্রা।
‘বুঝতেই পেরেছি। এই জন্যই তোর সাইনাসটা চাগাড় দিয়েছে আর চোখ-মুখের ওরকম অবস্থা! সারারাত না ঘুমোলে তোর শরীরটার কী হবে বুঝতে পারছিস? তুই বাইরে আসিস প্রতিদিন। স্কুলে ক্লাস নিতে হয়। তারপর এতটা মেন্টাল প্রেসার! তার ওপর রাত জাগলে আর রাত জেগে জেগে কাঁদলে শরীরটা ঠিক রাখতে পারবি? অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়বি তো! তখন ভালো লাগবে?’ দাঁতে দাঁত চিপে কথাগুলো বলে চলল রোহিনি। টিচার্স রুমটা মোটামুটি ফাঁকা হলেও দূরের দিকে দু’জন কলিগ বসে আছে। সবার সাথে সব কথার আলোচনা চলে না। সবাই
সবার সব সমস্যা বোঝেও না। ফলে যারা সমমনস্ক হয় তাদের কয়েকজনের
ছোট ছোট বন্ধুত্বের দল গড়ে ওঠে। সুনেত্রা, রোহিনি আর পুবালিরও তেমনই একটা দল তৈরি হয়েছে। ওরা নিজেদের মধ্যে নিজেদের সুখ-দুঃখ সব শেয়ার করে। এই ছোট ছোট দলের নমুনা ছাত্রজীবন থেকে কর্মজীবন সর্বত্রই থাকে। সব দপ্তরেই থাকে। এখানেও আছে। তাই রোহিনি যতটা সম্ভব রাগ হলেও নিজেকে সংযত রেখে ধীরে কথাগুলো বলছে।
সুনেত্রা ওর কথা যেন শুনেও ঠিক শোনেনি। কিংবা সেই এক কথা সে শুনেও জানে কোনও লাভ নেই তাই সেদিকে বিশেষ কান না দিয়ে প্রশ্ন করল, ‘আমার সাথেই কেন এমন হল বলতো?’
‘বোকার মতন প্রশ্ন করিস না। এমন ঘটনা আজকাল খুব কমন হয়ে গেছে।’
‘মানছি। কিন্তু আমার সাথে…’
‘তুই শুধু তোর কথা বলছিস! তোদের বলেছিলাম আমার ননদের জায়ের প্রবলেমের কথা। ওরা কী করল? তোর মতো ভেঙে পড়ে নিজের ক্ষতি করেনি কিন্তু। ওদেরও তো এই সুখ হয়নি। সাত বছর চেষ্টা করার পরেও যখন কোন ইস্যু হয়নি ওরা কিন্তু একটা বাচ্চাকে অ্যাডপ্ট করল। এই গত সপ্তাহের কথা। তুই জানিস ওরা কত খুশি হয়েছে। অনেক ঝক্কি করে নিয়ম-নীতি মেনে সবরকম আইনি পথ পেরিয়ে বাচ্চাটাকে যখন পেল সে আনন্দ চোখে দেখার মতো।’ একটু থামল রোহিনি। তারপর সুনেত্রার মাথায় একটা হাত রেখে শান্ত গলায় বলল ‘আরও কতরকম দিক খোলা আছে তো!’
‘তুমি তো জানো রোহিনিদি! এরা কেমন ফ্যামিলি? ভীষণ কনজারভেটেড। অ্যাডপশনের কথা শুনলেই রেগে যাবে। ওরা নিজেদের বংশের সন্তান চায়। তাছাড়া শুধু ওদেরকে দোষ দিই কী করে? খুব কষ্ট হয় জানো! এটা ভাবলে যে আমি আমার সন্তানকে জন্ম দিতে পারব না খুব কষ্ট হয়! যখন এগুলো মাথায় আসে না! তখন মনে হয় কী করলাম আমি? কী এমন খারাপ কাজ করেছি যার শাস্তি পাচ্ছি! সব তো পেলাম কিন্তু ওই সুখটাই পেলাম না। আমি তো আমার সন্তানকে আমার শরীরের মধ্যে ধারণ করে প্রতি মুহূর্তে অনুভব করতে চাই। যদি বলো তার মাঝে কষ্ট আছে তবে সেই কষ্টটাও আমি পেতে চাই। অনেকে তো বলে প্রসব যন্ত্রণা খুব সাংঘাতিক, কেউ বলে সিজারের কষ্ট নাকি সারা জীবন ভোগায়। আমার কিছু যায় আসে না রোহিনিদি। আমি নিজে আমার সন্তানকে এই পৃথিবীর আলো দেখাতে চাই এইটুকু চাওয়া কি আমার খুব অন্যায়? ‘
‘বুঝতে পেরেছি। তুই যতটুকু বা অ্যাডপশনের কথা ভেবেছিলি! সেই ভাবনা-চিন্তাটাকেও তোর শ্বশুরবাড়ির লোকজন পাল্টে দিয়েছে। তবে হ্যাঁ সুনেত্রা। তুই অন্যায় কিছু বলিস না। এমনুটা তো প্রত্যেকটা মেয়েই চাই। প্রত্যেকে না চাইলেও বেশিরভাগই এটা চায়। আচ্ছা ছাড়, বাদ দে। তুই বাড়িতে ভালো করে আলোচনা করে ডক্টর কনসাল্ট কর। দ্যাখ কিছু না কিছু ওয়ে আউট ঠিক বেরিয়ে যাবে। আজকাল তো কত ব্যবস্থা হয়েছে।’
‘তিন বছর ধরে চেষ্টা করেছি রোহিনিদি। আমার হাজব্যান্ড ডাক্তারের কাছে অনেক ডাক্তারের কাছেই নিয়ে গেল। কিন্তু তাঁরা সকলেই স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন। কোনওভাবেই আমার পক্ষে কনসিভ করা সম্ভব নয়। বাড়ির লোকজন তো এবার আমাকে কেমন যেন সহ্য করতে পারছে না! আমার বর নয়! তবে আমার শ্বশুর-শাশুড়ি যেন প্রতি মুহূর্তে বুঝিয়ে দিচ্ছে আমার কোথাও একটা কমতি আছে। ওঁদের ছেলের দোষ থাকলে কিন্তু এটা হত না। কিন্তু আমার দোষ আছে। খানিকটা আমাকে যেন ঝেড়ে ফেলতে পারলেই বাঁচে।’
‘সত্যিই আমার জাস্ট কিছু বলার নেই তোর শ্বশুরবাড়ির সম্পর্কে। আরে বাবা মানুষের শরীরে সমস্যা হতেই পারে। আর এটা তো কোনও মেয়েরই হাতে থাকে না। তুই এত ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ছিলিস। একটা সরকারি চাকরি করিস। তুই সংসারের জন্য কত ভাবনা-চিন্তা করিস। ওঁদের জন্য কত ভাবনা-চিন্তা করিস। এগুলোর কোনও মানে নেই? শুধু তুই কনসিভ করতে পারবি না এইটুকুই তোর পরিচয় হয়ে গেল ওই বাড়িতে?’
‘আমি আর পারছি না। আমি এসব কিছু নিয়ে ভাবতে পারছি না।’ মুখটা দু’হাতে ঢেকে ফেলে সুনেত্রা।
‘কী হয়েছে তোর? এভরিথিং অলরাইট?’ পুবালি এসে একটু চিন্তিত হয়েই সুনেত্রার পাশে বসল। রোহিনি আর সুনেত্রা একই স্ট্রিমের হলেও পুবালি এই স্কুলের সকলের কাছেই ইংলিশ ম্যাম।
‘কিচ্ছু ঠিক নেই। সেই এক প্রবলেম।’ রোহিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর বলে ‘তোরা বস। আমি দীপালি দিকে চা দিয়ে যেতে বলি ওর জন্য। আর সুনেত্রা তুই রেস্ট নে। আমি দুটো ক্লাস পরপর করে নেব।’ কথাটা বলেই বেরিয়ে যায় রোহিনি।
‘আবার বাড়িতে তোর কনসিভ করা নিয়ে প্রবলেম?’ ভুরু কুঁচকে প্ৰশ্ন করে পুবালি।
‘হুম!’ ক্লান্তভাবে উত্তর দেয় সুনেত্রা। ওর শরীর-মন দুই-ই যেন ভীষণরকম ক্লান্ত!
‘তোকে একটা কথা বলব সুনেত্রা?’ কী যেন একটা ভেবে প্রশ্নটা করে পুবালি।
(৪)
‘কে প্রথম দেখেছিল?’ ভিড়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন ওসি তরফদার। পুরো নাম নির্মল তরফদার। বয়স পঞ্চান্ন পেরিয়েছে। সকাল সকাল থানায় খবর এসেছিল স্টেশনের কাছাকাছি একটা লাশ পাওয়া গেছে। খবরটা সকালে পৌঁছলেও তিনি একটু গড়িমসি করে ফেলেছেন আর কী! যথারীতি বেলা এগারোটা বেজে গেছে। এসেই পরখ করে নিয়েছেন বডিটা। এত বছরের অভিজ্ঞ চোখ কি আর ভুল পরীক্ষা করবে? বুঝে গেছেন গতকাল রাতের ঘটনা। নৃশংস খুন! চুরি ছিনতাইয়ের এর কেস যে নয় তা তো পাশের প্যাকেটগুলো দেখেই বোঝা যাচ্ছে। এই বিষয়টা অবশ্য বোঝা যেত না যদি প্যাকেটগুলো আরেকটু দূরে পড়ে থাকত। কাছে পড়েছে তাই রক্ত লেগে গেছে। ফলে আর কেউ তুলে নিয়ে যায়নি। নইলে এতক্ষণে ওর একটিও পড়ে থাকত না।
‘আ…আমি স্যার!’ একটা ঢোক গিলে ভিড়ের মধ্যে থেকে উত্তর দিল বছর কুড়ি-বাইশের একটা ছেলে। রোগাটে চেহারা। জামার হাতা দিয়ে বারবার ঘাম মুছছে। বেশ ক্লান্ত লাগছে ওকে।
‘খোলসা করে বল পুরো ঘটনাটা।’
‘স্যার! আমি রোজকার মতো আজও ভোর সাড়ে পাঁচটার ট্রেন ধরতে যাচ্ছিলাম। যাওয়ার পথে এইখানে আসতেই…’ একটু থামে ছেলেটা। তারপর বলে ‘আমি দেখে প্রথমে বুঝতে পারিনি স্যার। ভেবেছিলাম কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে। অজ্ঞান হয়ে গেছে হয়তো। কাছে আসতেই দেখি… খুন হয়েছে। আমি চিৎকার করে উঠি।’
‘তখন স্যার আমরা আসতেছিলাম। ওর অমন চিল্লানো শুনে আমরা ছুটে এলাম!’ দু’জন মাঝবয়সি মহিলা ছেলেটার কথার সূত্র ধরে নিজেদের বক্তব্য রাখল।
‘তোমরাও কি ওই ট্রেন ধরতে যাচ্ছিলে?’
‘হ্যাঁ ছ্যার! কলকেতায় ক্যাজে যাই তো! আজ আর যাওয়া হল নে!’
‘হুম্!’ মহিলার কথায় যেন সম্মতি দিয়ে মাথা নাড়লেন ওসি তরফদার। তারপর বডিটার দিকে এগিয়ে গেলেন। বডি এবার নিয়ে যাওয়া হবে ময়নাতদন্তে। তার আগে আরেকবার চোখ বুলিয়ে নিলেন তিনি।
‘কী বুঝছেন স্যার?’পিছনে কনস্টেবল রমাকান্ত বোস। বয়স খুব বেশি না হলেও নামটা তার আদ্যিকালের। চেহারার ছিপছিপে রোগাটে ধরন দেখে সবাই ভাবে এই লোক কী করে পুলিশে চাকরি করে।!
‘খুনটা রাতেই হয়েছে তা তো দেখেই বোঝা যাচ্ছে। খুনের অস্ত্র ছুরিই মনে হচ্ছে। আর মন হচ্ছে খুনির এর ওপর খুব রাগ ছিল। ছিনতাই করার জন্য তো মারেনি বোঝাই যাচ্ছে।’ ওসি তরফদার একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন। রমাকান্তও পিছু নিল।
‘তাহলে স্যার এ গ্রামেরই কেউ করেছে বলছেন?’
‘তার মানে এ গ্রামে কারও ওর ওপর সেই লেভেলে রাগ ছিল! আবার তার জানাও আছে বিপ্লব কবে কবে আর কখন বাড়ি ফেরে! ওত পেতে বসেছিল অন্ধকারে! ও আসতেই কাম খতম! কিন্তু সেটাও জোর দিয়ে বলতে পারছি কই! এ গ্রামে তো এমন আগে ঘটেনি।’
‘বাইরের কেউ এসে খুন করতে পারে স্যার?’ মাথা চুলকে প্রশ্ন করে রমাকান্ত।
‘হুম একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না সম্ভাবনাটা।’
‘কিন্তু বাইরের কেউ এখান অবধি এসে খুন করবে? না না স্যার আমার তো তাই মনে হয় না। সেরকম হলে তো বাইরেই কোথাও খুন করতে পারত। এ গ্রামে এসে করতে যাবে কেন?’
ওসি তরফদার অল্প হাসেন। তারপর বলেন, ‘খুনির খুন করার জায়গা সে নিজে বাছে। তার সুবিধামতো। এমন কত কেস শুনেছি আগে। যাই হোক। ওর বাড়িতে যেতে হবে একবার। তারপর সেই অনুযায়ী তল্লাশি করতে হবে। মার্ডার ওয়েপনটা পাওয়া গেলে বা স্ট্রং মোটিভ পাওয়া গেলে কেস উঠে যাবে।’
***
কঞ্চি দিয়ে বানানো বেড়ার দরজাটা খোলাই আছে। ওই বেড়ার দরজা পেরিয়ে একটা মাটির নিকোনো উঠোন। আর তার পরেই একতলা ছিমছাম পাকা বাড়িটা। রং করা হয়নি এখনও। তবে সিমেন্টের পরত পড়েছে। এই গ্রামে পাকা বাড়ি নেই তা নয়! তবে সেই সংখ্যাটা গুনে বলা সম্ভব। দরজার বাইরে ভিতরে সর্বত্র লোকের ভিড়। বিপদের সময় পাশে দাঁড়াবে যারা তারাই তো প্রতিবেশী শুভাকাঙ্ক্ষী! তবে এখানে চিত্রটা একটু আলাদা। দাঁড়িয়েছে অনেকেই এসে। কিন্তু সবাই যে দুঃখ পেয়েছে তা নয়! কেউ কেউ এসেছে নিজেদের কৌতূহল নিবারণে। অল্প সময়েই ভালো চাকরি করে ওদের সকলের থেকে পরিস্থিতি ভালো করেছে। কারও টাকা মেরে বড়লোক হল না-কি আর সেই গুন্ডাদের চক্করে পড়ে প্রাণ হারাল কি না সেটা বুঝতে। ওদের পাশ কাটিয়ে যেতে গেলে কানাঘুষো সেসব সমালোচনা ভেসে আসে।
ওসি তরফদার বেড়ার দরজাটার সামনে দাঁড়ালেন। লোকজনদের পাশ কাটিয়ে উঠোন পেরিয়ে এগিয়ে গেলেন বাড়িটার দিকে। একফালি বারান্দায় মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে এক বছর বাষট্টির ভদ্রলোক। ঘরের ভিতর থেকে মহিলা কণ্ঠস্বরের কান্নার আওয়াজ। সাথে একটি বাচ্চা মেয়ের। বাড়ির লোকজনের সবাইকে ওখানে যেতে দেওয়া হয়নি। বিপ্লবের বাবাকে এক প্রতিবেশী নিয়ে গেছিল। কয়েক মুহূর্ত শনাক্ত করিয়েই ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে। বিপ্লবের স্ত্রী খবরটা পাওয়ামাত্র জ্ঞান হারিয়েছে। তারপর থেকে এতক্ষণ অবধি বার চারেক জ্ঞান ফিরেছে এবং আবার জ্ঞান হারিয়েছে। ওসি তরফদার ভিতরে ঢুকলেন। বিপ্লবের স্ত্রীর জ্ঞান নেই। ওর শাশুড়ি কেঁদে চলেছেন। আর সাথে বাচ্চা মেয়েটাও। ওসি বুঝলেন ওঁদের পক্ষে এই মুহূর্তে উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। তাই বিপ্লবের বাবাকেই প্রাইমারি কয়েকটা প্রশ্ন করে আপাতত চলে যেতে হবে। ওসিকে দেখে একটা প্লাস্টিকের চেয়ার এগিয়ে দিল একজন।
‘আপনার ছেলের সাথে এখানের কারও কোনও শত্রুতা ছিল?’ চেয়ারে বসে একটু গলা ঝেড়ে প্রশ্ন করেন ওসি তরফদার।
‘হ্যাঁ? শত্তুর? সে তো সবাই শত্রুর! কেও ভালো চায় না সার!’ হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলেন ভদ্রলোক।
‘অমন কতা বলতে পারলে গা? তোমাদের বাড়িতে কোতায় আমরা সব এলাম। এই বেপদের দিনে! আর তোমরা কি না…’ একজন মহিলা রীতিমতো রে রে করে তেড়ে এলেন।
‘আহ্! ওঁর মনের অবস্থা কি এখন ঠিক আছে?’ ওসি তরফদারের ধমক শুনে চমকে গেছে মহিলা। ভয়ে দু’পা পিছিয়ে গেছে।
রমাকান্তও সুযোগ বুঝে আরও খানিক ভয়টা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘বেশি কথা বলার ইচ্ছে হলে আপনাকেই প্রশ্ন করুক স্যার! উত্তরগুলো দিয়ে দিন।’
‘না না আ…মি তো…’ মহিলা পালাতে যাচ্ছিল। ওসি তরফদার একটা ধমক দিয়ে বলেন, ‘এক পা-ও কেউ এখান থেকে নড়বে না। আমি যতক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করছি এখানেই সবাই থাকবে।’
মহিলা একা নয়, এবার বাকিরাও ভয়ে একটু সিঁটিয়ে যায়। এতক্ষণ যে সমালোচনার গুনগুন শব্দ হচ্ছিল সেটা মুহূর্তে থেমে যায়। থমথমে হয়ে যায় পরিবেশটা।
ওসি আবার বিপ্লবের বাবার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেন, ‘সবাই শত্ৰু বলছেন কেন?’
ভদ্রলোক একটু কান্না থামিয়ে ধরা গলায় বললেন, ‘ওর ভালো কাজ। শওরে থাকে। রোজগের ভালো। তায় ঘরটা পাকা করল। এসব সইতে পারে না ওরা। কত কতা বলেচে। জোচ্চুরি ট্যাকা! আজ বিপ্লবটা চলে গেল! কে অ্যাতো বড় খেতিটা করলে…’ আবার কান্নায় ভেঙে পড়লেন ভদ্রলোক।
‘আপনার ছেলে কী কাজ করত কলকাতায়?’
‘একটা হাসপাতালে কাজ করত সার!’
‘কোন হাসপাতাল?’
‘সেইটে জানি নে সার। বউমা জানে। মেয়েটা তো পড়ে আছে জ্ঞান হারিয়ে।’
‘হাসপাতালে ঠিক কী কাজ করত জানা আছে?’
ভদ্রলোক উত্তরে দু’পাশে মাথা নাড়ে।
‘কত বছর করছে এই কাজ?’
‘কলকেতায় কাজ করে তা দশ বছর হবে। আগে ওই পাহারাদারের কাজ করত। তিন বছর এই হাসপাতালের কাজে লেগেছে।’
‘বুঝলাম! সিকিউরিটি গার্ড ছিল। কোথায় সেটা জানেন?’
‘না সার। বলত একটা কোম্পানিতে।’
ওসি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। বুঝলেন ইনি বিশেষ কিছুই জানেন না। প্রশ্ন ঘুরিয়ে বললেন, ‘আপনার কি কাউকে সন্দেহ হয়? কে খুন করতে পারে বলে আপনার মনে হয়?’
‘আমি কিচু জানি নে সার! আপনেরা কিছু করেন। আমার বিলুর খুনিকে ধরেন। আপনেরা সব পারেন সার!’ কথাটা বলেই ওসি তরফদারের পায়ে লুটিয়ে পড়লেন বয়স্ক লোকটা।
‘আহ্! কী করছেন! উঠুন। এরকম করবেন না। এখানে কারও সাথে বা ওর কাজের জায়গায় কারও সাথে ঝামেলা ছিল কি না যদি মনে পড়ে জানাবেন।’ উঠে দাঁড়ালেন ওসি।
এই শেষ কথাটা শুনে ভদ্রলোক একটু তাকালেন ওসির দিকে। তারপর ভিড়ের মধ্যে একটা বছর তিরিশের ছেলেকে দেখিয়ে বললেন ‘ওই হারুর সাতে একবার হয়চিল সার।’
বিপ্লবের বাবার অঙ্গুলিনির্দেশ দেখে ওসি তাকাতেই দেখেন একটা ছেলে এবার পালাবার উপক্রম করছে। ওসির নির্দেশে রমাকান্ত একলাফে গিয়ে ব্যাটার ঘাড় ধরে টেনে আনে।
‘পালাচ্ছিলে কেন?’
ওসির গম্ভীর গলার প্রশ্নে একবার চমকে ওঠে ছেলেটা। তারপর ঢোক গিলে বলে, ‘ভয় পেয়েচিলাম সার। কিন্তু বিশ্বেস করেন আমি কিছু করিনি। এ বুড়ো যা পারচে তাই বলচে! আমি দিব্যি খেয়ে বলতে পারি সার। আমি কিচু করিনি।’
‘মিছে কতা কইবি না হারু! তুই মারপিট করিসনি বিলুর সাথে?’
‘হ্যাঁ হয়েচিল সার! তা বলে খুন আমি করিনি।’ কাঁচুমাচু মুখে ওসির পায়ে পড়ে যায় হারু।
‘কী নিয়ে ঝামেলা ছিল?’
‘দশটি হাজার টাকা চেয়েছিলাম। তা কিছুতেই দিলে না। তাই একটু হাতাহাতি… ওর অনেক টাকা তাও দিলে না।’
‘অনেক টাকা…’ কথাটা বিড়বিড় করে ওসি একবার বাড়িটার দিকে তাকালেন।
***
‘আসব স্যার?’ ঊর্ধ্বতন অফিসার অর্ঘ্যদীপ বর্মনের ঘরের দরজার বাইরে থেকে পারমিশন চায় দ্বৈতা।
দরজার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে মাথা নেড়ে তিনি বলেন, ‘এসো এসো ইয়ং লেডি!’ বয়স পঞ্চান্ন পার হয়েছে। অপরাধীদের জন্য তিনি ব্রাস আর ডিপার্টমেন্টের কাছে সবথেকে শক্তিশালী স্তম্ভ। তবে দেখতে রাশভারী হলেও লোকটা স্বভাবে বেশ মজার। তাই কাজের সূত্রে কেউ একটু বকাঝকা খেলেও কাজের বাইরে তাকে ভালো কথা বলতেও কার্পণ্য করেন না তিনি। এককথায় মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ দুই-ই বেশ ভালো বজায় রেখেছেন ভদ্রলোক।
হাসিমুখে ভিতরে প্রবেশ করে দ্বৈতা। এখন সে শুধু দ্বৈতা নয়। হোমিসাইড ডিপার্টমেন্টের একজন দায়িত্ববান গোয়েন্দা পুলিশ! অফিসার সান্যাল! দ্বৈতা সান্যাল এই ডিপার্টমেন্টে জয়েন করেছে তিন বছর হয়েছে। তবে নিজের কৃতিত্ব বা বুদ্ধির পরিচয় দেখানোর মতো সুযোগ সে এখনও পায়নি। আসলে ডিপার্টমেন্টে আসা ক্রিটিকাল এবং ইম্পর্ট্যান্ট কেসগুলো চলে যায় ওর থেকে বেশি অভিজ্ঞ সিনিয়রের কাছে। দ্বৈতার এটাই আফশোস। ও চায় একটা টাফ কেস ডিল করতে। কিন্তু সে গুড়ে তো বালি!
‘আরে দাঁড়িয়ে কেন। বোসো!’
‘থ্যাংঙ্ক ইউ স্যার!’ দ্বৈতা বর্মন স্যারের উল্টো দিকের চেয়ারে বসে পড়ে। তারপর নিজের হাতের ফাইলটা দিয়ে দেয়। কিছু কেস রিলেটেড ডকুমেন্টস ওর দেওয়ার ছিল।
‘কনগ্র্যাচুলেশন। খিদিরপুরের কেসটায় তোমাদের টিম বেশ ভালো লিড দিয়েছে।’ হাতে ধরে রাখা ফাইলের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে দ্বৈতার দিকে একঝলক তাকিয়ে নেন তিনি। বেশ বুঝতে পারেন যে মেয়েটা কিন্তু এই প্রশংসায় বিশেষ খুশি হয়নি! আসলে এই কেসটায় দ্বৈতার মনে হয়েছিল ওর কপাল খুলেছে। এতদিনে একটা জটিল কেস ওর ঝুলিতে এসে পড়েছে। কিন্তু কোথায় কী! ভালোই এগোচ্ছিল কিন্তু মাঝখান থেকে কেসটা পুরো একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে নারকোটিক্স ডিপার্টমেন্টের এন্ট্রি হয়ে গেল! ব্যস! দ্বৈতার আশা আংশিক পূরণ হয়েই চ্যাপ্টার ক্লোজড হয়ে গেল।
‘থ্যাংঙ্ক ইউ স্যার!’দ্বৈতা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই বর্মন স্যার বলে উঠলেন, ‘আমার একটা ভিসি আছে এখন। তোমাদের সাথে তারপর মিটিং।’
এই কথার অর্থ দ্বৈতা বোঝে। এই মুহূর্তে ওঁর ভিসিতে মিটিং যখন আছে তখন বিদায় হওয়ার হালকা আভাস বলতে যা বোঝায় ওটিই দিলেন আর কী!
