মায়াজাতক – ১০
(১০)
হাঁটতে হাঁটতে বেশ হাঁফ লাগছে অরণ্য গুহর। একটু দাঁড়িয়ে যান। তারপর প্রাণভরে শ্বাস নিয়ে আবার শুরু করেন। প্রতিদিন ভোর সাড়ে চারটেয় উঠে মর্নিং ওয়াকে বেরিয়ে পড়েন। তারপর প্রায় চল্লিশ মিনিট হেঁটে নিয়ে পার্কের ভিতর গিয়ে বসেন। সেখানে নরম সবুজ ঘাসের ওপর সাজানো বেঞ্চের একটায় বসেন। দু-চারটে ফোয়ারা আছে। সেগুলো এখনও চালু হয়নি। সকালে আরেকটু পরে চালু হয়। কিন্তু ওগুলোর নীচে পড়ে থাকা জল ছুঁয়েই যেন ভোরের ঠান্ডা হাওয়া আসে। সেটা খানিকটা উপভোগ করেন ভদ্রলোক। তারপর যখন বাকি মর্নিং ওয়াক করতে আসা লোকজনের ভিড় বাড়তে শুরু করে উনি সেখান থেকে উঠে বাড়ি চলে আসেন। এই ফেরার সময়টা আর হেঁটে ফেরেন না। একটা ক্যাব নিয়ে নেন। কোনওদিন বাড়ির গাড়িটা ডেকে নেন। গাড়ি আসে এই পার্কের বাইরে এবং উনি ফিরে যান। কিন্তু আজকে ব্যাপারটা অন্য। আজ এখনই অল্প দুর্বল লাগছে। ইচ্ছা করছে না আর একটুও পরিশ্রম করতে। সদ্য ভাইরাল জ্বর থেকে উঠেছেন তো! এই ভাইরাল ব্যাপারটা যার যার হচ্ছে ভালোই দুর্বল করে দিচ্ছে। মোটামুটি ওষুধপত্র, ফ্রুটজুস, স্যুপ, সবকিছু নিয়মমাফিক নিয়ে সুস্থ হয়েছেন অরণ্য গুহ। কিন্তু ভিতরে খানিকটা দুর্বলতা এখনও তার আছে। যার জন্য এতটা হাঁটার ফলে একটু কষ্ট হচ্ছে এখন।
পার্কের বেঞ্চে বসে একটা জোরে একটা শ্বাস নিলেন অরণ্য গুহ। তারপর আকাশের দিকে তাকালেন। দু-একটা পাখি দেখতে পেলেন। ম্লান আলোয় চারপাশটা স্নিগ্ধ লাগছে। এই সময়টা উনি একান্তভাবে কিছু পরিকল্পনা সাজিয়ে নেন। যেগুলো আগামিদিনের এবং গোটা জীবনের পরিকল্পনা। তেমনই আজ বেশ কিছু জিনিস মনে মনে ছক কষে নিতে হবে তাকে।
এবছরের ভোটে তাঁর টিকিট পাওয়া পাক্কা। আর সে-কারণেই একটা পলিটিক্যাল হাওয়ার তোড় তাঁর চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। দুটো পার্টির দুই দলই তাঁকে নিজেদের প্রতিনিধি বানাতে তৎপর। কিন্তু তিনি তো বেশ বুদ্ধিমান লোক। বুঝে শুনে খেলা খেলেন। সমাজ প্রতিনিধি, সমাজ সেবক অনেকরকম বিশেষণ তাঁর থাকলেও সব থেকে বড় বিশেষণ হওয়া উচিত রাজনীতিবিদ! সকলের উপকার করে যিনি সমাজবিদ হয়ে উঠলেন তাঁর এই প্রতিটা সিঁড়ির পিছনের অন্ধকারে যে কতগুলো রাজনৈতিক খেলা চলেছে তা কেউ জানে না। এই মুহূর্তে যতজন রাজনীতিবিদ আছেন এ রাজ্য, তাঁদের উনি গুনে গুনে গোল দিতে পারেন। পোড়খাওয়া লোক যাকে বলে। উনি মনে মনে ঠিকই করে রেখেছেন কোন দলে যাবেন। সাধারণ মানুষ জানেও না যে অরণ্য গুহ এইবার ভোটে বড় মুখ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। দুই দলের কাছে লটারি টিকিটের মতন অরণ্য গুহার নাম। উনি যে দলে যাবেন সেই দলের পাল্লা অবশ্যই ভারী। মনে মনে ঠিক করে রেখেছেন তিনি কোন দলে যাবেন। শুধু আর একটু খেলিয়ে নিচ্ছেন দুই দলকে। যতটা পর্যন্ত খেলানো যায় ততটাই লাভ। নিজের আখের গুছিয়ে তারপরেই ঘোষণা করবেন কার দলে নাম লেখালেন।
কিন্তু এখন যেহেতু কেউ কিছু জানে না তাই খুব স্বাভাবিক একজন মানুষ হয়েই আছেন। মোটামুটি আর পাঁচটা মাস এভাবেই কাটাতে হবে তাঁকে। তারপরে ঘোষণা হবে রাজকীয় সম্মানের। তবে এখন উনি ছাপোষা সাজগোজ, কম দামি পোশাক, গাড়ির ব্যবহার না করা এসব দিয়েই চালান। খুব কমই গাড়ির ব্যবহার করেন। সাধারণ মানুষ অরণ্য গুহর আসল রূপ বা মতলব কোনওটাই না জানলেও কেউ কেউ জানে। তারা জানে মুখের মুখোশের আড়ালে আসল চেহারাটা। সেই সংখ্যাটা হাতে গুনে খুবই কম অবশ্য।
এমনই প্রয়োজনীয় বেশ কিছু কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ করে চোখ খুলে তাকান অরণ্য গুহ। ওঁর মনে হল কেউ যেন ঠিক পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু পিছন ফিরতেই কাউকে দেখলেন না। হাতের ঘড়িটা একবার উল্টে দেখে নিলেন। এখন মাত্র ৫:২০ বাজে। এই সময় এই মাঠে অন্যরা তো কেউ আসে না। এখানে সবাই মোটামুটি আসতে শুরু করে ৬টার থেকে। নিজেদের যাবতীয় দৌড়ঝাঁপ, হাঁটাহাঁটি সম্পন্ন করে এখানে এসে তারা একটু প্রকৃতির মাঝে কাটায়। এখানে একটা লাফিং ক্লাবও আছে। বেশ কয়েকজন গোল হয়ে দাঁড়িয়ে উপরের দিকে হাত তুলে মন প্রাণ খুলে হা হা করে হাসে। এটায় নাকি হার্ট ভালো থাকে।
পিছনে কাউকে না দেখতে পেয়ে অরণ্য গুহ ভাবলেন ওঁরই ভুল বোঝা হয়তো। তাই সামনে ফিরে চোখটা বন্ধ করলেন। আর ঠিক তখনই আবার তাঁর মনে হল পিছনে সত্যিই কিছু আছে। যেন একটা ফস ফস আওয়াজ হল। নিঃশ্বাসের শব্দ। অতএব পিছনে কারুর অস্তিত্ব নিশ্চয়ই আছে। এইবার পিছন ফিরতেও কাউকে দেখলেন না। কিন্তু আচমকা নিচ থেকে উপরে উঠে দাঁড়াল একটা কালো মূর্তি। মুখ থেকে পা পর্যন্ত কালো পোশাকে ঢাকা। এই ভোর বেলায় এমন অদ্ভুত পোশাকে কে উদয় হল? প্রশ্নটা অরণ্য গুহর মাথায় আসতেই সেই ব্যক্তি নিজের মুখ থেকে মুখোশ খুলে দিল।
***
‘আমাকে ডেকেছিলেন স্যার?’ দরজাটা অল্প ঠেলে বাইরে থেকে প্রশ্ন করে দ্বৈতা।
ডিসিডিডি অর্ঘ্যদীপ বর্মন একবার দেখে নেন ওকে। তারপর মাথা নেড়ে বলেন ‘হ্যাঁ। ভিতরে এসো!’
দ্বৈতা বাধ্য মেয়ের মতো ভিতরে ঢুকে এসে দাঁড়ায়। তারপর ওর স্যারের পারমিশনে বসে পড়ে উল্টোদিকের চেয়ারে। এইরকম ডাক যখন পড়ে আর এরকম এক্সপ্রেশন যখন তার স্যারের মুখে থাকে তখন নতুন কোনও কেসের গন্ধ পায় দ্বৈতা। ওর এই ক’দিনের অভিজ্ঞতায় এটুকু বিষয় বোঝা হয়ে গেছে।
বর্মন স্যার হাতের ট্যাবটা ওর দিকে ঘুরিয়ে বলেন ‘এই যে ক্রাইম প্লেস!’
দ্বৈতা দেখল একবার স্ক্রিনটা। তারপর বর্মন স্যারের দিকে তাকাল। বুঝল কেস আসছে।
‘বস্তির রাস্তার বডিটা পাওয়া গেছে। ভোর থেকে লোকাল থানার ওসি হ্যান্ডেল করছেন। কিন্তু কেসটা আমাদের কাছে এসেছে। এতক্ষণে টুকটাক মিডিয়াও চলে গেছে। তুমি কেসটা ডিল করবে। রওনা…’ কথাটা বলার আগেই বর্মন স্যারের সামনে রাখা ফোনটা বেজে ওঠে। দ্বৈতাকে অপেক্ষা করতে বলে ফোনটা ধরেন তিনি।
‘হোয়াট?’ ফোনের ওপাশের কথা শুনে রীতিমতো বিস্ময়ে ফেটে পড়েন অর্ঘ্যদীপ বর্মন। ফোনের ওপাশের বাকি কথা শুনে ফোনটা রেখে দেন। তারপর এক মুহূর্ত থেমে আবার একটা ফোন করেন ‘আমার রুমে এসো। ইটস ভেরি আর্জেন্ট।’ কথাটা বলেই ফোনটা রেখে দেন ডিসিডিডি।
দ্বৈতা এতক্ষণ ওঁকে ভালোমতো পর্যবেক্ষণ করছিল। এই ধরনের আচরণ বা অভিব্যক্তির অর্থ ও জানে। নিশ্চয়ই খুব সাংঘাতিক কোনও খবর এসেছে। অতএব খুব ইম্পর্ট্যান্ট কোনও কেস। যা ডিসিডিডিকে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। এই দ্বিতীয় ফোনকলটার অর্থও ও জানে। সেই ইম্পর্ট্যান্ট কেস হ্যান্ডেল করতে ডাক পড়েছে আরেক অফিসারের। অতএব এইবারও দ্বৈতার কপাল পুড়ল। কিন্তু কেসটা কী সেটা জানার লোভ সামলাতে পারে না ও। যদিও যেরকম হাবভাব ও দেখেছে তাতে মনে হয় আর কিছুক্ষণের মধ্যেই নিউজফিডে নিউজের লিঙ্ক চলে আসবে।
বর্মন স্যারের কপালে অল্প ভাঁজ পড়েছে। এমনিতে ভদ্রলোক বেশ ঠান্ডা স্বভাবে থাকেন। টেনশন বিশেষ হয় না। কিংবা সেটার প্রকাশ করেন না। কিন্তু সব সিচুয়েশনকে খুব ঠান্ডা মাথায় সামলান। কিন্তু এই মুহূর্তে একটু চিন্তিতই দেখাচ্ছে তাঁকে। কী যেন ভাবতে শুরু করেছেন। হঠাৎ দ্বৈতার দিকে চোখ পড়তেই বললেন ‘তুমি টিম নিয়ে বেরিয়ে পড়। কী প্রগ্রেস হল জানিও।
দ্বৈতা বুঝল ওর কাজে যাওয়ার পালা। কিন্তু কী আর প্রগ্রেস হবে? ওই তো মাতাল লোকের খুন। নির্ঘাত মদের ঠেকের রেষারেষি মাঝরাতের এই খুন ঘটাল। খুনটা যে মাঝরাতের সে বিষয়টা এমনিও চোখ বন্ধ করে বলে দেবে ও। রাতের দিকে কেউ টের পায়নি মানে গভীর রাতের কেস। আর প্রথম সকলের টনক নড়েছে ভোরে। এই দুটো পয়েন্টেই মোটামুটি সময়ের একটা আন্দাজ পাওয়া যাচ্ছে। সেসব তো ঠিক আছে। এমন কিছু বড়সড় ঘোটালা মনে হচ্ছে ওতে নেই। পাতি কেস। কিন্তু এখন যে ফোনটা এল। ওটা খুব ইম্পর্ট্যান্ট। কিন্তু কেসটা কী? দ্বৈতা এবার জিজ্ঞেস করেই বসল, ‘কী হয়েছে স্যার? এনিথিং সিরিয়াস?’
অর্ঘ্যদীপ বর্মন একটু চিন্তিত গলায় বললেন, ‘হুম! ভীষণ সিরিয়াস। ইনফ্যাক্ট যত সময় বাড়বে ততই এটা আরও সিরিয়াস হয়ে যাবে।’
দ্বৈতার ভুরু কুঁচকে যায় ‘মানে?’
‘বিখ্যাত সোশ্যালওয়ার্কার খুন হয়েছেন। অরণ্য গুহ।’
‘সেকি!’
‘কানাঘুষো শোনা যাচ্ছিল এবার নাকি পলিটিক্যাল পার্টিদের একটা দড়ি টানাটানি চলছিল ওঁকে নিয়ে। ভোটের একটা মুখ হলেও হতে পারতেন! ভদ্রলোকের যা পপুলারিটি! যে দলে যাবেন সেখানেই জেতার প্রবল সম্ভাবনা। কিন্তু এরকম কিছু হয়ে যাবে… বিশাল পলিটিক্যাল ঝড় চলবে! খুব প্রেসার আসবে আমাদের উপর। খুনিকে যত দ্রুত সম্ভব ধরতেই হবে।’
‘কখন ঘটেছে স্যার ঘটনাটা?’
‘এইতো! আজকে ভোরের ঘটনা। জানা গেছে ওই সকালের দিকে। যখন লোকের নজরে পড়েছে। এতক্ষণে মাছির মতো ছেঁকে ধরেছে নিশ্চয়ই সাংবাদিকরা! সব আপডেট এখানেই পাবে।’ কথাটা বলেই ভদ্রলোক ট্যাবে অনলাইনে একটা নিউজ চ্যানেল ওপেন করলেন। লাইভ দেখাচ্ছে সেখানে। রিপোর্টার, ক্যামেরাম্যানে ছয়লাপ! কিন্তু সবটাই একটা নির্দিষ্ট এরিয়ার মধ্যে। পার্কের ভিতরেই! কিন্তু ক্রাইম স্পট থেকে দূরে। লোকাল থানার ওসি আর তাঁর টিম চলে গেছেন।
একজন মেয়ে হাতে বুম নিয়ে ওই জায়গায় দাঁড়িয়ে জোর গলায় বলছে, ‘আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন কী পরিমাণ ভিড় এখানে। কাউকেই ক্রাইম স্পটের কাছে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। প্রতিদিনের মতো আজও উনি ভোরবেলায় এখানে এসেছিলেন কিন্তু তারপরে কী ঘটেছিল তা কেউ জানে না। জানা গেছে উনি রোজ সাড়ে চারটের সময় বাড়ি থেকে একাই বের হন প্রতিদিন যেমন রুটিন। মুর্নিং ওয়াকের পর এই পার্কে এসে বসেন। আর তারপরেই কিছু হয়। খুনি তাঁকে খুন করে ওই বেঞ্চেই ফেলে যায়। এরপর বাকিরা যখন আসে তারা প্রথমেই তাঁকে দেখতে পায় না। ওইদিকে সবাই একদম শেষে যায় বাড়ি ফেরার আগে কিছুক্ষণ বসতে। তেমনই দু’জন ৭.২০ এর সময় খেয়াল করেন বিষয়টা। আর তারপরেই পুলিশে খবর দেওয়া এবং পুলিশের এসে পড়া। আমরা আসার পরেই দেখি সব সিল করে দেওয়া হয়েছে। এত বড় ঘটনা কী করে ঘটল? কে করল এই খুন? আর কেন করল? প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এমন জনদরদি মানুষের শত্রু কে বা কারা হতে পারে? আততায়ী কি শুধুই শত্রুতা থেকে এই কাজ করল নাকি এতে রাজনৈতিক গন্ধও আছে? সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছি আমরা। পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। আপনারা থাকুন আমাদের সাথে প্রতি মুহূর্তের আপডেটের জন্য।’
খবরটা বন্ধ হতেই দরজায় নক হল। অনুমতি নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলেন দেবেশ অধিকারী। দ্বৈতা দিব্যি বুঝল এই কেস ওর ডিপার্টমেন্টের সিনিয়রের কাছে গেছে। দেবেশ অধিকারী প্রবেশ করতেই অৰ্ঘ্যদীপ দেববর্মন দ্বৈতার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তুমি টিম নিয়ে ওখানে যাও। আমাকে আপডেট দিও।’ দ্বৈতা বুঝল এটা হচ্ছে বেরিয়ে যাওয়ার সিগন্যাল। ও আর কথা না বাড়িয়ে ‘ওকে স্যার!’ বলে বেরিয়ে গেল।
(১১)
আয়নায় নিজেকে একবার দেখে সুনেত্রা। সাজ বলতে ওর আর কিছুই নেই। একটা সবুজ রঙের খুব সাধারণ কুর্তি আর সাদা লেগিন্স পরেছে। মুখের লালিত্য, জেল্লা সব হারিয়েছে। আধভিজে চুলটায় কেবল একটা ক্লিপ আটকে রেখেছে। ওর আর কিছুই ভালো লাগে না। ইচ্ছে করে এক কোণে পড়ে থাকতে। আবার কখনও ইচ্ছা করে সবকিছু ছেড়ে কোথাও চলে যেতে। কিন্তু কোথায় পালাবে ও? মানুষের থেকে জায়গার থেকে দূরে সরে থাকা যায়। কিন্তু সত্যির থেকে তো যায় না। ও জানে ওর নিস্তার নেই। ও যেখানেই যাক সত্যিটা মিথ্যে হয়ে যাবে না। তবে শুধু সত্যির জন্যই নয়। আর একটা জিনিস আছে। সেটা টান, দায়িত্ব, বাঁধন বা ভালোবাসা যে নামেই ডাকা হোক না কেন। অভীককে ছেড়ে ও কীভাবে যাবে? ও যে চিরটাকাল ওর পাশে থেকেছে। ওকে আগলে রেখেছে। ও না এভাবে জড়িয়ে থাকলে কবেই সুনেত্রা হারিয়ে যেত। শুধু ওই একজন আছে তাই সুনেত্রার পৃথিবীটা একটু শ্বাস নেয়।
‘চলো এবার যেতে হবে!’ টেবিলের উপর রাখা ফাইলটা নিতে নিতে সুনেত্রাকে একটা ডাক দিল অভীক। সুনেত্রার কানে কথাটা গেলেও ও কোনও উত্তর দেয় না। পেটের উপর ডান হাতটা রাখে। ওর খুব ভয় করছে আজ। জীবনে কোনও পরীক্ষায় এরকম ভয় লাগেনি। সেখানে চিরকালই নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে এসেছে সুনেত্রা। কিন্তু আজ নিজের প্রমাণ সে কী করে নিজে দেবে? এটা তো তার হাতেই নেই। তার শরীর যদি সাথ দেয়, ঈশ্বর যদি আশীর্বাদের হাত মাথার উপর রাখেন, আর ডাক্তারের সব প্রচেষ্টা যদি সফল হয় তবে আজকের পরীক্ষায় সুনেত্রা উত্তীর্ণ হতে পারবে। ওর মনে হয় এটাই যেন ওর জীবনের সব থেকে বড় পরীক্ষা। এর থেকে হয়তো মৃত্যুও অনেক সহজ। অভীক বুঝতে পারে সুনেত্রার মনের অবস্থা। সে নিজেও অত্যধিক চিন্তার মধ্যে রয়েছে। কিন্তু তার প্রকাশ সে নিজের স্ত্রীর সামনে করেনি। সুনেত্রার পিছনে এসে দাঁড়িয়ে একটা হাত ওর মাথার উপর রেখে বলে, ‘এত চিন্তা কোরো না। ভগবান আমাদের জন্য যা ভেবে রেখেছেন তাই হবে। আমরা আমাদের মতো সবরকম চেষ্টা করলাম। সব উপায় অবলম্বন করলাম। এখন যদি কিছু ভালো-মন্দ হয় তা জানবে সবটাই ভগবানের ইশারা! এতে তোমার বা আমার কোনও দোষ নেই।
সুনেত্রা কিছু বলে না। শুধু অভীকের বুকে মুখটা গুঁজে দেয়। ও জানে ওর করতে পারা সব প্রশ্নই শেষ! যেগুলোর উত্তর ওকে কেউ সঠিকভাবে দিতে পারল না আজ অবধি! কেন যে ভগবান ওর সাথেই এমন করল। কেন যে ওর ভবিতব্যটা এমন হল। এর উত্তর কে দেবে ওকে? সুনেত্রার ভিতরে দুশ্চিন্তাটা ওর কণ্ঠ রোধ করে রেখেছে। মনের মধ্যে আসা অন্য কথাগুলোও ও অভীককে বলতে পারছে না। যদি আজ সুনেত্রার ইচ্ছা পূর্ণ হয়ে যায়! তাহলে যে কী আনন্দ হবে ভাবতেই সুনেত্রার ভেতরটা কেঁপে উঠল একবার। আবার পরক্ষণেই মনে হল যদি আজও খারাপ কিছু হয়? আর ভাবতে পারছে না ও।
‘এত চিন্তা কোরো না। দেখা যাক কী আছে আমাদের ভাগ্যে! চলো এবার দেরি হয়ে যাচ্ছে। অ্যাপয়েন্টমেন্টের টাইমের একটু আগেই পৌঁছে যেতে চাইছি।’ অভীক সুনেত্রাকে নিজের বুকের উপর থেকে তুলল। সুনেত্রা মাথা নেড়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
***
‘টোকেন নাম্বার সেভেন! এবার আপনারা ভিতরে যাবেন। ‘ রিসেপশনের মেয়েটি আগের দিনের মতোই সুন্দর ভঙ্গিমায় কথাটা বলল। সাত নম্বর আজ সুনেত্রাদের। আগের দিন যখন টোকেন নাম্বার ধরে ডাকা হয়েছে তখন মনের মধ্যে একটা অন্যরকম অনুভূতি কাজ করছিল। আর আজকে অন্যরকম! একটা ভয়ের সাথে আশার পরিমাণও সেদিন বেশি ছিল। কিন্তু আজকের অনুভূতিতে ভয়টাই বেশি। ওর মনে হচ্ছে এই শেষ উপায় এরপর হয়তো আর কিছু করার থাকবে না। আজকে ভয়ের পরিমাণটা অনেক অনেক বেশি। হাত-পা কাঁপতে শুরু করে ওর। আর উঠে দাঁড়াতে পারছে না। অভীক ওকে ধরে ধরে নিয়ে যায় দরজাটার সামনে। আগের যে দম্পতি ভিতরে ছিল তারা বেরিয়ে আসতেই ওরা ভিতরে প্রবেশ করে। ওদের দেখেই ডাক্তার কর বুঝতে পারলেন সুনেত্রার অবস্থা। উনি জানতেন ওর প্যানিকের প্রবণতা। তাই প্রথমেই বারণ করেছিলেন বাড়িতে কোনওরকম টেস্ট কিট কিনে টেস্ট করতে। যদি কোনওভাবে কিট ভুল দেখায় তখন অন্য সমস্যা হবে। তাই আজকে চেকআপে এসেছে ওরা। চেকআপ শুরু হয় দ্রুত। আর চেকআপের মধ্য দিয়ে ধরা পড়ে আসল রেজাল্ট। সুনেত্রা বেশ কয়েকবার জিজ্ঞেস করে। ডাক্তার কিছু বলেননি। শুধু বলেছেন বাইরে গিয়ে বলবেন।
টেস্ট শেষে সুনেত্রা বেরিয়ে এসে অভীকের পাশের চেয়ারে বসে। ডাক্তার উল্টো দিকের চেয়ারে বসে বেশ কয়েকটা কাগজ নিয়ে দেখতে থাকেন। সেই কাগজগুলোকে একপাশে সরিয়ে রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘দেখুন। এটা প্রথমবার আপনাদের। অনেকক্ষেত্রেই প্রথমবারে সফলতা আসে। অনেক ক্ষেত্রে আসে না। তখন আবার চেষ্টা করতে হয়। আপনাদের কেসটা ভীষণই কমপ্লিকেটেড। এইবার সফলতা আসেনি।’
সফল হয়নি এই কথাটা শোনামাত্র সুনেত্রার পায়ের তলায় মাটি সরে গেল যেন। ও কিছু বলতে পারল না। শুধু বোবার মতন তাকিয়ে থাকল। আর চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল। মনের মধ্যে প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছে। অভীক তো এক প্রকার নিজেকে মানিয়েই নিয়েছিল। কিন্তু এই যে আবার আশার প্রদীপটা মনের মধ্যে জ্বলে উঠেছিল সেটা আজকে ওকে কষ্ট দিচ্ছে বেশি।
ডক্টর কর ওদের পরিস্থিতি বুঝতে পেরে বলেন, ‘দেখুন এতটা ভেঙে পড়ার কিছু নেই। হ্যাঁ প্রথমবার আইভিএফ সফল হয়নি। কিন্তু আপনারা চাইলে আরও ট্রাই করা যেতে পারে। এমন অনেক ক্ষেত্রে হয়েছে যে প্রথমবারের চেষ্টায় কনসিভ করেননি পেশেন্ট। কিন্তু দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় কনসিভ করেছেন। এক্ষেত্রে আপনাদের অ্যাসিওর আমি করতে পারব না। কিন্তু চেষ্টা আমি করতে পারি। তবে প্রত্যেকবারই কিন্তু বেশ বিপুল পরিমাণ খরচা আছে। এটাও আপনাদের মাথায় রাখতে হবে।’ অভীক বুঝতে পারে সুনেত্রার আর কিছু বলার বা বোঝার মতো পরিস্থিতি নেই। ও বলে, ‘আমরা একটু সময় নিয়ে ভেবেচিন্তে আপনাকে জানাব ডক্টর। কারণ ওর যা মানসিক অবস্থা, আবার কোনওভাবে আঘাত পেলে আমার মনে হয় সেটা ওর জন্য ঠিক হবে না। আমরা একটু ভাবনাচিন্তা করি তারপর আপনার সাথে যোগাযোগ করব।’
‘হ্যাঁ নিশ্চয়ই!’ ডাক্তার কর উত্তর দেন।
চেম্বারের দরজা ঠেলে বেরিয়ে এসে সুনেত্রার কী যে হল। ও এক ছুটে ক্লিনিকের কাঁচের মেন দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল। তারপর ঠাঁ ঠাঁ রোদে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল বাচ্চাদের মতো। এই প্রথম সুনেত্রা এভাবে ভাঙল। হয়তো ওর এইভাবে ভাঙার খুব দরকার ছিল! এতদিন ধরে পাহাড়প্রমাণ চাপটা মনের মধ্যে নিয়ে থাকতে থাকতে ও ভেতর ভেতরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। আজকে আর সেই পাহাড় প্রমাণচাপ সামলাতে না পেরে অঝোর ধারায় কেঁদে ফেলেছে। যদি কষ্টের বোঝা একটু কম হয়! অভীক সুনেত্রার পরিস্থিতি বুঝতে পারে। সেও এক ছুটে ক্লিনিকের মেইন দরজা টেনে খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে। সুনেত্রাকে জড়িয়ে ধরে চুপ করানোর চেষ্টা করে। আঁকড়ে ধরে, যাতে ওর এই বাচ্চার মতো কান্নার আওয়াজ আর ওই কষ্ট আর পাঁচটা লোকের হাসির খোরাক না হয়। মেন গেটের দিকে অভীক সুনেত্রাকে নিয়ে যেতে থাকে এমন সময় একজন মহিলা পেছন থেকে এসে ডাক দেন, ‘একটু জল খাবেন?’
কথাটা শুনে অভীক আর সুনেত্রা পিছন ফিরে তাকায়। দেখে নার্সের পোশাক পরা একটি মহিলা দাঁড়িয়ে আছে। প্রথম দিনও ওরা এই মহিলাকে দেখেছিল। আজকেও মহিলাটিকে ওরা দেখেছে এই বিল্ডিং থেকে ওই বিল্ডিং যেতে। অভীক তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলে, ‘থ্যাঙ্কইউ! একটু জল থাকলে দেবেন ‘
মহিলাটি হাতে ধরে রাখা জলের বোতলটা অভীকের দিকে এগিয়ে দেয়। তারপর বলে, ‘আগে একটু ওদিকে সাইডে গিয়ে ওনাকে নিয়ে বসুন। তারপর জলটা খেয়ে একটু ঠিক হয়ে নিয়ে বাড়ি যাবেন।’
অভীক মহিলার হাতের ইশারায় একপাশে দূরে একটা বেঞ্চ দেখতে পায়। বড় একটা কলকে গাছ সেটাকে ছায়া দিয়ে ঢেকে রেখেছে। সুনেত্রাকে নিয়ে সেখানে গিয়ে বসায় অভীক। তারপর ওকে একটু জল খাইয়ে বোতলটা নার্সের হাতে ফিরিয়ে দিতে দিতে আবার ধন্যবাদ জানায়, ‘থ্যাঙ্ক ইউ।’
নার্স ভদ্রমহিলাটি অল্প হাসেন, ‘না না এতে ধন্যবাদের কী আছে! ওনার এ মুহূর্তে একটু জলের প্রয়োজন ছিল। মানুষ হয়ে মানুষের এটুকু উপকার করব না!’
অভীক উঠে দাঁড়ায়, ‘এটুকুও আজকাল সব মানুষ ভাবে না। যাই হোক! আমরা এবার আসি। ওর শরীরটা বিশেষ ভালো না। বেশিক্ষণ এখানে থাকা আমাদের ঠিক হবে না।’
মহিলাটা একবার এদিক ওদিক তাকিয়ে নেয়। তারপর সুনেত্রার পাশে এসে দাঁড়িয়ে ওর কাঁধে একটা হাত রেখে বলে, ‘আমি জানি আপনার সমস্যাটা কী হয়েছে। আপনাকে দেখে কষ্ট হল তাই একটা কথা বলতে এলাম। জানি না আপনারা কথাটা কীভাবে নেবেন!’
‘কী কথা?’ ভুরু কুঁচকে যায় অভীকের।
‘কত মানুষ এখানে আসে। অনেকের ইচ্ছা পূরণ হয়। আবার অনেকের হয় না। আপনাকে দেখে আমার খুব কষ্ট হল। আমার বোনের কথা মনে পড়ে গেল। এরকম সমস্যা ওর ছিল। সব ডাক্তাররাই জবাব দিয়ে দিয়েছিল। কত বছর চেষ্টা করল সন্তানের জন্য। কিছুতেই হল না! এই ক্লিনিকেও ওকে এনেছিলাম। তাও হয় না! ও যখন একেবারে ভেঙে পড়েছিল তখন ঘটনাটা ম্যাজিক এর মত ঘটল।’
এই শেষ কথাটা শোনা মাত্রই অভীক আর সুনেত্রা মহিলার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকায়। জ্বলজ্বল করছে সুনেত্রার চোখ কৌতূহলে। কোথাও কোনও ম্যাজিক কি ঘটে আদৌ?
‘ঠিক কী বলতে চাইছেন আপনি? বুঝতে পারলাম না!’ প্রশ্নটা অভীকই করল।
মহিলা আরেকবার সতর্ক দৃষ্টিতে চারিদিক দেখে নিল। তারপর বলল, ‘আমার কথাটা ভালো করে শুনুন। প্রথমত, আমি যে আপনাদের এ বিষয়ে কথা বলছি এটা নিয়ে কারও সাথে আলোচনা করবেন না। কারণ বুঝতেই তো পারছেন এই ক্লিনিকেই আমি চাকরি করি এদের বিফলতা অন্যের সামনে বলব এটা তো ভালো দেখায় না! আমার চাকরিটা নাও তো থাকতে পারে। কিন্তু আমি যা বলব তা আপনাদেরই উপকারে লাগবে। বলবেন না প্লিজ কাউকে!’
অভীক একবার সুনেত্রার দিকে তাকায়। মহিলা ঠিক কী বলতে চাইছে তা ও বুঝতে না পারলেও ভিতর ভিতর একটা উত্তেজনা হচ্ছে সেটা জানার জন্য।
ও আশ্বাস দেয়, ‘আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আমরা এ বিষয়ে কারও সাথে আলোচনা করব না। কিন্তু বিষয়টা কী সেটা ঠিক বুঝতে পারছি না।’
মহিলা এইবার সুনেত্রার কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে সুনেত্রার পাশে বসে পড়ে। তারপর খুব ধীরে ধীরে বলে, ‘আমার বোনের এরকমই সমস্যা ছিল। এই ক্লিনিকে আইভিএফ সফল হয়নি। একবার নয় দু’বার করেছিল। কিন্তু স্যার জানিয়ে দিয়েছিলেন আমার বোনের পক্ষে মা হওয়া সম্ভব নয়। নিজের গর্ভে ও সন্তান ধারণ করতে পারবে না। তারপর একদিন কাকতালীয়ভাবে ওকে ওর স্বামী অন্য একটি ক্লিনিকে নিয়ে যায়। সেও কোনো বন্ধু মারফত জেনেছিল সেই ক্লিনিকের কথা। এই কলকাতাতেই। সেই আইভিএফ ক্লিনিকের ডাক্তার আশ্বাস দিলেন আমার বোনকে। যেখানে সবাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল সেখানে ওই ডাক্তার বললেন আমার বোনের ক্ষেত্রে মা হওয়া সম্ভব। তবে যতদূর জানি সেটা বেশ খরচসাপেক্ষ। উনি সম্পূর্ণ অন্যভাবে ট্রিটমেন্ট করেন। সেসব ডিটেলস আমি জানি না বলতেও পারবনা। আর উনি শুধু আশ্বাসই দিলেন না! আমার বোন ওখানে যাওয়ার পর মাত্র একবারের প্রচেষ্টায় গর্ভবতী হয়। ওর প্রেগন্যান্সি যখন সফল দেখাল তখন থেকে আমাদের পৃথিবীটা যেন অন্যরকম হয়ে গেল।’
‘ও…ওর কি বাচ্চা হয়ে গেছে?’ সুনেত্রা এই প্রথম মুখ খুলল। বড্ড ব্যাকুল দেখাচ্ছে ওকে।
‘হ্যাঁ ফুটফুটে একটা মেয়ে হয়েছে। এইতো চার মাস বয়স।’
কথাটা শুনে সুনেত্রার মনের মধ্যে আর আশার প্রবল ঢেউ আছড়ে পড়ল। অভীকও কথাটা শুনে বেশ অবাক হল। যেন আবার দপ করে একটা শিখা জ্বলে উঠল মনের মধ্যে।
‘কোথায় ক্লিনিকটা? আমিও যাব!’ উঠে দাঁড়িয়েছে সুনেত্রা। চোখের জল হাতের তালুতে মুছে ওই মহিলার দু’হাত ধরে বলে, ‘দয়া করে আমাকে সেখানে নিয়ে চলুন। আমি আর পারছি না।’
‘আমি নিয়ে যেতে পারব না আপনাদের। আমারও এখানে কাজ আছে। ডিউটি টাইমে কোথাও যেতে পারব না। তবে আমি আপনাদের লোকেশনটা বলে দেব।’
(১২)
ক্রাইম প্লেসে পৌঁছে গেছে দ্বৈতা। অন্য সময় মিডিয়া মাছির মতো ভন ভন করে বেড়ায়। আজকে একটাও রিপোর্টার নেই। নেই কোনও ছুটে আসা প্রশ্নবাণ। নেই ক্যামেরার ঝলকানি। কারণ সমস্ত লাইমলাইট কেড়ে নিয়েছে অরণ্য গুহ মার্ডার কেস!
বডিটাকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে দ্বৈতা। গলার দাগটা বেশ গাঢ়। রক্ত শুকিয়ে জমাট বেঁধেছে সেখানে। যেখানে যেখানে রক্ত পড়েছে সেই সব জায়গায় শুকনো দাগ রয়ে গেছে। বেশ অনেকক্ষণ হয়ে গেছে বডিটা এভাবেই এখানে পড়ে আছে। লোকাল থানার ওসি প্রাইমারি কাজগুলো সেরে রেখেছেন ঠিকই! কিন্তু দ্বৈতা একবার নিজে সব সময় ক্রাইম স্পট ভিজিট করে আনটাচড অবস্থায় সবটা দেখে নেয়। চারিদিক নিজের চোখে পর্যবেক্ষণ করে।
বডিটা গলির রাস্তার মাঝখানে পড়ে আছে। গলায় ধারালো ছুরি দিয়ে কাটার যে চিহ্ন আছে এতদিনের অভিজ্ঞতায় দ্বৈতা সেটা দেখে বুঝতে পারে যে খুনটা পিছন থেকে হয়েছে। ছুরির স্ট্রোকটা বডির গলার বাঁদিক থেকে ডানদিকে আছে। সামনে থেকে হলে সেটা বডির ডানদিক থেকে বাঁদিকে হত। হ্যাঁ খুনি বাঁ হাতিও হতে পারে। তাহলেও সামনে থেকে হলে স্ট্রোকটা বাঁদিক থেকে ডানদিকে হবে। আর পিছন থেকে হলে ডান থেকে বাঁ। কিন্তু এক্ষেত্রে খুনি বাঁহাতি নয়। কারণ সামনে থেকে হলে সেই দাগ হয় ছোট। পিছনের দিক থেকে হলে বড়। অতএব, এই দুটো ফ্যাক্টর লাগিয়ে দ্বৈতা এটুকু বুঝেছে। তবে সেটা পোস্টমর্টেমে আরও ক্লিয়ার হবে। লোকটার জামাপ্যান্টের অবস্থা শোচনীয়। রাস্তায় পড়ে ধুলো লেগেছে। তার সাথে রক্ত মিশেছে। আর হালকা মদের গন্ধও আছে। ওটাও পোস্টমর্টেমেই ধরা পড়বে যে মৃত্যুর আগে সে কতটা পেটে ঢেলেছিল। বডিটার পাশে একটা সরু লাঠি পড়ে ছিল।
দ্বৈতা অনিকেতকে ডেকে বলল কত এটা কালেক্ট করে রাখতে হবে। কাজে লাগতে পারে।’
কথাটা শুনে দ্বৈতার পাশে এসে দাঁড়াল অনিকেত। তারপর সম্মতি জানিয়ে মাথা নেড়ে বলল, ‘হ্যাঁ ম্যাম।’ অনিকেত দ্বৈতার জুনিয়র অফিসার। ওকে বেশিরভাগ কেসে অনিকেতই অ্যাসিস্ট করে।
ভিক্টিমের বডি পর্যবেক্ষণ করে উঠে দাঁড়ায় দ্বৈতা। ওর পিছন থেকে একটা পুরুষালি কণ্ঠ ভেসে আসে ‘কী বুঝছেন ম্যাডাম?’
ও পিছন ফিরে দেখে ইনি অতনু সরখেল। এই থানার ওসি। দ্বৈতা চোখে সানগ্লাসটা পরে নিয়ে উত্তর দেয়, ‘চেষ্টা করছি বোঝার। খুনটা পিছন থেকে হয়েছে।
‘সেসব তো পোস্টমর্টেমে পরিষ্কার হয়েই যাবে। কেন হয়েছে কিছু বুঝলেন?’
‘তদন্ত হোক!’
‘ওই দেখুন! আরে এটায় অত ভাবনার কিছু আছে বলে মনে হচ্ছে আপনার? কেসটা সিম্পল, ওই মদের ঠেকের রেষারেষি বুঝলেন!
‘হুঁ? সিম্পল বলছেন?’
‘তা নয় তো কী! ‘
‘এত সিম্পল যখন তাহলে মদের ঠেকে খুন হল না কেন?’
‘ওই সময় করেনি। একটু আড়ালে এসে করতে চেয়েছিল। যাতে কেউ দেখতে না পায়।’
‘হুম! মদের ঠেকের রেষারেষি যখন, মাতাল অবস্থায় হটকারিতা না করে বুদ্ধি খাটিয়েছে বলছেন? তবে মাতালদের আড্ডায় থাকলে তারও মাতাল হওয়ার প্রবল চান্স। কিন্তু এর খুনির তো তা দেখছি না। রীতিমতো গায়ের শক্তিতে মাতাল ভিক্টিমকে কাবু করে পিছন থেকে ছুরি চালিয়ে দিল! স্ট্রোকটা দেখেছেন? লাইনিংটা পারফেক্ট। আর আমার এই অ্যাসাম্পশন আর আপনার কথা যদি একসাথে মেলাতে হয় তাহলে বলতে হয় খুনি ওই মদের ঠেকের। কিন্তু সবাই মদ খেলেও সে খায়নি।’
‘এই তো! দেখেছেন কেমন হিসেব মিলে গেল। আমার কথাটা কিন্তু উড়িয়ে দেবার মত নয়। সহজ কেস কিন্তু!’
‘হুম! বেশ সিম্পল।’ হাসল দ্বৈতা।
ওসি ভদ্রলোক একটু গলা ঝেড়ে নিলেন। বুঝলেন দ্বৈতার ইঙ্গিত। একটু গম্ভীরভাবে বললেন ‘দেখুন তদন্ত করে যদি অন্য কিছু পান!’
এই শেষ কথাটা শুনে দ্বৈতা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ও জানে এই কথাটার মানে কী! আসলে গোয়েন্দা-পুলিশ বা সাধারণ গোয়েন্দারা যেভাবে রহস্যকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করে হয়তো সবকিছুর মধ্যে তারা একটা রহস্য দেখতে পায়। আর সেটা বাকিরা খুব একটা স্বাভাবিকভাবে দেখে না। সাধারণ মানুষ বা অন্য পুলিশ অফিসাররা সেটাকে নিয়ে হয়তো হালকা ব্যঙ্গ করে। দ্বৈতাও জানে এই কেসটা খুব বেশি জটিল হয়তো নয় যে ওকে সকলের কাছে একজন যোগ্য গোয়েন্দা পুলিশ হিসাবে চিহ্নিত করবে। তবে কেসটা একেবারে জলভাতও নয় অন্তত এটুকু বোঝা গেছে। আরও কিছু টুকটাক এভিডেন্স খোঁজার জন্য দ্বৈতা চতুর্দিকে চোখ ঘোরাতে থাকে। কিন্তু সেরকম কিছুই আর দেখে না।
‘অনিকেত আমি একটু ভিক্টিমের পরিবারের সাথে কথা বলব!’ কথাটা বলেই অনিকেতকে ইশারা করে দ্বৈতা। অনিকেত বুঝতে পারে এখানে রাস্তা হালকা করে ভিক্টিমের পরিবারের কাছে পৌঁছে যেতে হবে। সেই মতো এগিয়ে যায় ওরা।
ঘরটা বিশেষ বড় না। বস্তির ঘর যেমন হয় আর কী! মাঝখানে পার্টিশন দিয়ে দুটো শোয়ার ঘর করা হয়েছে একটা টিনের দরজা দিয়ে ঢুকতে সামনে একফালি জায়গা পড়ে। আর তারপরই পার্টিশনটা। এই একফালি জায়গায় এক কোণে রান্নার সরঞ্জাম। পার্টিশনের দু’দিকে দুটো ঘর। এছাড়া আর কোনও জায়গা নেই। ডানদিকের ঘরটায় একজন মহিলা বিধ্বস্ত অবস্থায় খাটের উপর হেলান দিয়ে বসে আছে। ঘরটা বস্তির হলেও তার ভিতরের আসবাব খুব একটা কম দামি নয়। বোঝা গেল এদের পরিস্থিতি খুব একটা খারাপ নয়। এই মহিলা নিশ্চয়ই ভিক্টিমের স্ত্রী! তাকে ঘিরে আরও কয়েকজন মহিলা বসে আছে। পাশেই একটা বাচ্চা ছেলে কাঁদছে। বোঝা গেল এটা ভিক্টিমের ছেলে। আর তার পাশে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ দিয়ে জল পড়ছে। কিন্তু যেভাবে কাঁদছে মনে হচ্ছে বেশ সতর্ক। পাছে ওর কান্না দেখে সবাই হাসাহাসি করে! বাঁদিকের ঘরটায় আসবাবপত্র ঠাসা। সেখানেও একটা খাট আছে। সেখানেও এই প্রতিবেশীদেরই অনেকে বসে আছে। দ্বৈতা ডানদিকের ঘরটায় ঢুকতেই মহিলাগুলো একটু ব্যস্ত হয়ে সরে দাঁড়াল। একজন একটা প্লাস্টিকের চেয়ার এগিয়ে দিল। দ্বৈতা হাত নেড়ে বলল, ‘লাগবে না!’ তারপর রতনের স্ত্রীর কাছে এসে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল, ‘রাতেরবেলায় আপনার স্বামী বাড়ি ফেরেনি যখন। আপনি খোঁজ করেননি?’
মহিলা কেমন যেন হয়ে আছে! নেতিয়ে নেতিয়েই উত্তর দিল ‘না!’ দ্বৈতা একটু গলা ঝেড়ে নিয়ে প্রশ্ন করল ‘কেন?’
এবার মহিলা কোনও উত্তর দেওয়ার আগে মেয়েটি বলল, ‘মার কথা বলতে হয়তো একটু কষ্ট হচ্ছে। আমি বলি?’
‘বেশ!’
‘বাবা তো অনেকদিন রাতে বাড়ি ফেরে না। ওই আড্ডাখানায় থেকে যায়। আমরা ভেবেছিলাম কালকেও হয়তো তাই হয়েছে। তাই আমরা আর কোনও ফোনও করিনি।’
কথাটা বলতেই মেয়েটার হাতে ধরে থাকা মোবাইলটা বেজে উঠল। তাতে হিন্দি গানের রিংটোন। বড্ড বেশি ঝম্পর ঝম্পর গান। দ্বৈতার বিরক্ত লাগে। কিন্তু কিছু বলাও যায় না এসব ক্ষেত্রে। যার মোবাইল সে নিজের ইচ্ছামতন গান রেখেছে তাতে দ্বৈতার কথা শুনে সে চেঞ্জ করবে কেন? দ্বৈতা লক্ষ্য করে মেয়েটার হাতের মোবাইলটা দামি! স্যামসাং-এর মডেল। অন্ততপক্ষে ২৫ হাজার দাম হবে ওটার। মধ্যবিত্ত সকলের কাছে ২৫ হাজারের মোবাইলটা একটু দামি। হ্যাঁ ব্যবহার অনেকেই করে কিন্তু দামি এটা অস্বীকার করতে পারে না।
দ্বৈতা প্রশ্ন করল ‘এই ফোনটা কার? ‘
মেয়েটা বলল ‘আমার!’ যে রিংটোনটা হচ্ছিল মেয়েটা ফোন কেটে সেটা বন্ধ করে দেয়।
‘কে কিনে দিয়েছে এটা?’
মেয়েটা একটু অবাকভাবে উত্তর দিল, ‘কে আবার। বাবা কিনে দিয়েছে। এ বছর বলেছিল একটা ব্লুটুথ হেডসেটও কিনে দেবে।’ কথাটা বলে মেয়েটা একটু নাক টেনে কেঁদে নিল। এইটার জন্য ওর যে একটু বেশিই দুঃখ হয়েছে তা বোঝা গেল।
দ্বৈতা প্রশ্ন করল ‘তোমার বাবা কী করতেন?
‘চায়ের দোকান আছে।’
‘আর কিছু করতেন না?’
‘না বাবার দোকানটা খুব চলতি। অনেক রোজগার হয়। এখানে তো থাকব না আমরা বেশিদিন। এটাই বলেছিল বাবা। বলেছে একটা ভালো পাড়ায় বাড়ি ভাড়া নিয়ে চলে যাব। কিন্তু দেখুন তার আগে কী সব হয়ে গেল।’ কথাটা বলে মেয়েটা আবার কেঁদে উঠল। এবার একটু বেশি জোরে কেঁদে ফেলেছে। ভালো বাড়িতে উঠে যাওয়ার দুঃখটা বেশিই চেপে ধরেছে ওকে।
‘আচ্ছা বেশ! এমন কি কোনও কথা মনে আছে যে তোমার বাবার কারও সাথে কোনও শত্রুতা ছিল বা নতুন করে হয়েছে! উনি কি এমন কোনও কথা বলেছেন?’
মেয়েটা একটু মাথা চুলকে তলিয়ে ভাবার চেষ্টা করে কিন্তু সেরকম কোনও উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না। পাশ থেকে বাচ্চাটা বলে ওঠে, ‘দিদি কিছু জানে না। দিদির বাবার সাথে বেশি কথাই বলা হয় না। বাবা ওর উপর রেগে থাকে। পড়াশুনা একদম করে না।’ কথাটা বলেই আবার কাঁদতে থাকে বাচ্চাটা। দ্বৈতা বাচ্চাটার মাথায় একটা হাত রাখে। তারপর বলে ‘তুমি কি কিছু জানো? বাবা কিছু বলেছিল?’
ছেলেটা চুপ করে মাথা নাড়ে। আর আবার কেঁদে ওঠে। বোঝা গেল ওর কষ্টটা সত্যিই খুব হচ্ছে। বাচ্চারা অভিনয় করতে পারে না। যা সত্যি তাই বলে। ওদের মুখ সকল অভিব্যক্তিকে ব্যক্ত করে দেয়। দ্বৈতার প্রশ্নে এইবার রতনের স্ত্রী বলে, ‘গতবছর ওদের মদের ঠেকে একজনের সাথে হাতাহাতি হয়েছিল। কিছু টাকার ব্যাপার নিয়ে।’
দ্বৈতা প্রশ্ন করে ‘কী রকম?’
মহিলা বলে, ‘আমি পুরো ভালোভাবে জানি না। তবে ওদের মধ্যে থেকেই একজন ওর থেকে কুড়ি হাজার টাকা ধার নিয়েছিল। ছয় মাস পরে দেবে বলে এক বছর পরেও যখন দেয়নি তখন এই ঝামেলাটা হয়।’
‘তাহলে আপনার কি মনে হয় সেই ব্যক্তি খুনি?’
‘জানি না। কে যে মেরে গেল ওকে! এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না। ওই রকম দেহটা দেখব কোনওদিন ভাবিনি। আমার সব শেষ হয়ে গেল। কথাটা বলে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল রতনের স্ত্রী। পাশ থেকে দুজন মহিলা বলল, ‘ওকে কাঁদতে দে। কেঁদে একটু হালকা হোক। নইলে যে অসুস্থ হয়ে পড়বে।’
দ্বৈতা মেয়েটাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘তোমার বাবা কোথায় আড্ডা দিত তুমি জানো?’
মেয়েটা বলে ‘রঘু কাকার বাড়ির ওখানে। একটা ভাঙা বাড়িতে।’
‘সেটা কোথায়?’
‘আমাদের এই বস্তিটার থেকে বেরোতেই ওই ডান হাতের যে বড় রাস্তাটা চলে যায় তার পরের বস্তিটা। ওটা ওখানেই ভেতরে দিকে।’
‘বুঝলাম! ওখানে কেউ চেনে জায়গাটা? ‘
‘হ্যাঁ ওই তো পাশের ঘরে আছে দেবু কাকা। ও নিয়ে যাবে আপনাকে। ‘ঠিক আছে!’ কথাটা বলে দ্বৈতা উঠে দাঁড়াল। তারপরে বলল ‘আজকে আসি। এরপর কোনও প্রয়োজন পড়লে কিন্তু আবার আসতে হবে না হলে তোমাদের ডেকে পাঠাব। আশা করি তোমরাও চাও তোমার বাবার খুনি ধরা পড়ুক।’
মেয়েটা ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে দু’বার নাক টেনে বলে ‘হ্যাঁ তা তো চাই।’ আর কথা না বাড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে ওরা। সাথে অনিকেতও বেরিয়ে আসে। দ্বৈতা ইশারা করে বলে ওই দেবু নামক লোকটিকে নিয়ে মদের ঠেকটা চিনে নেওয়া দরকার। অনিকেত ইশারা বুঝেই তাকে পাকড়াও করতে গেল।
গাড়িতে উঠে দ্বৈতা একটা নিউজ চালিয়ে দিল মোবাইলে। অরণ্য গুহ মার্ডার মিস্ট্রি! নিউজ অ্যাঙ্কার বেশ জোরে জোরে একবার কথাটা বলে অনুষ্ঠানটা শুরু করেছে।
কয়েক মিনিট সময় নিয়ে দ্বৈতা আর অনিকেত মদের ঠেকটা দেখে এসেছে। ঘটনার দিনে মদের ঠেকে সত্যিই একটা গন্ডগোল হয়েছিল। যে লোকটার কথা ভিক্টিমের স্ত্রী জানিয়েছে তার সাথেই ঝামেলা। সকলেই দেখেছিল। কিন্তু এ ভিক্টিম বেরিয়ে আসার কিছুক্ষণ পরও সেখানে ছিল। বাকিরা অবশ্য সন্দেহ প্রকাশ করছে খুনটা সে-ই করেছে। আবার লক্ষণীয় ব্যাপারটা হচ্ছে তার খোঁজও পাওয়া যাচ্ছে না। দ্বৈতা লোক লাগিয়েছে তাকে খুঁজে বের করতে। যদি কাজটা সে করে থাকে তাহলে ধরা পড়লে তার পেট থেকে কথা বার করতে ও জানে। কিন্তু যদি সে না করে থাকে তাহলে খুনটা করল কে! দ্বৈতার মনে এখনও কিন্তু প্রশ্নচিহ্ন রয়ে গেছে। এই কেসটা যতটা না দ্বৈতাকে বেগ দিচ্ছে তার থেকেও বেশি ওর মনে রহস্য জাগিয়ে তুলছে অরণ্য গুহর কেসটা। ওই কেসটার প্রতি ইন্টারেস্ট কিছুতেই ও কমাতে পারছে না। জনদরদি অরণ্য গুহর মার্ডার করল কে? তাও ওরকম কাক ভোরে! খুনের প্যাটার্নটাও বেশ অদ্ভুত! গলায় ছুরি চালানো হয়েছে এই কেসটার মতনই। কিন্তু তার ছুরি চালানো হয়েছে সামনে থেকে এবং তারপরেও বেশ কয়েকবার স্ট্যাব করা হয়েছে বুকের উপর। ক্রমাগত ছুরিটা শরীর বসানো হয়েছে আর তোলা হয়েছে! এই পরিস্থিতিটা দেখেই অনেকের সন্দেহ জাগছে এই খুন ব্যক্তিগত ক্রোধের ফল। তার মানে অরণ্য গুহর মতো এমন নিপাট ভালো মানুষের জীবনে এমন কোনও শত্রু আছে যার তার প্রতি প্রবল রাগ এবং ঘেন্না! যার ফলে সে গড়ায় গলায় ছুরি চালানোর পরেও এতবার বুকে স্ট্যাব করেছে।
‘অরণ্য গুহ লোকটাকে আপনার কেমন মনে হয়?’ অনিকেত দ্বৈতার দিকে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল। পিছনের সিটে বসে দ্বৈতাকে লক্ষ্য করছিল। ও বেশ বোঝে দ্বৈতা এই হাইপ্রোফাইল কেসটার প্রতি ইন্টারেস্টেড।
মোবাইলটা বন্ধ করে দ্বৈতা পিছনে না তাকিয়েই উত্তর দিল, ‘ভদ্রলোককে আমি সামনের থেকে দেখিনি। তবে রিসেন্ট ঘটে যাওয়া ঘটনার পর ওনার একটু ইতিহাস আর বর্তমান ঘেঁটে মেলানোর চেষ্টা করেছি। তাতে আমার যা মনে হল ভদ্রলোকের যে ইমেজ সকলের সামনে আছে তার আড়ালে অন্য কোনও একটা সত্যি আছে।’
‘কীরকম?’
‘সেটা সময় বলবে! আমি এই মুহূর্তে কিছু বলব না। তবে যার এমন নৃশংস মার্ডার হয় এবং প্যাটার্ন বলছে সেটা প্রতিশোধজনিত! তাতে তার ইতিহাসে কিছু তো এমন আছে। এটা ক্লিয়ার
‘কেসটা পুরো রাজ্যকে হিলিয়ে দিয়েছে ম্যাডাম!’
‘হ্যাঁ! এত বড় একজন সমাজসেবক বলে কথা! যতদূর জেনেছি তাতে তো মনে হল এই বছর ওঁর একটা রাজনৈতিক পদ হয়ে যেতে পারত। তাহলে কতটা হাইপ্রোফাইল কেস ভাবো! রাজ্যের মানুষকে কেন অনেকেরই বসার চেয়ারটাও টলিয়ে দিয়েছে কেসটা।’
‘উনি কেন একা একা সকালে যেতেন? ওতেই তো গন্ডগোলটা হল!’
‘একা না গেলে, পাবলিকের মাঝে সাধারণ হয়ে না মিশলে কি পাবলিকের আইওয়াশ করা যায়? না জনপ্রিয় হওয়া যায়?’ দ্বৈতা বাঁকা হাসি হেসে পিছন ঘুরে তাকাল।
‘তার মানে বলছেন এটাও একটা ট্রিক!’
‘আমি শুধু বুঝলাম উনি রাজনীতিটা বেশ ভালোই বুঝতেন। ইনফ্যাক্ট এ রাজ্যের অনেক নেতাদের থেকে তো বেশিই!’
‘কিন্তু ম্যাডাম! যদি এটা শত্রুজনিত কেস হয় তাহলে তো ওঁর প্রিকশন নেওয়া উচিত ছিল। তাও এত অসাবধানতা! উনি যা ধুরন্ধর লোক আপনি যা বলছেন! সেই অনুযায়ী তো লোকটা নিজের শত্রু চিনবে না এমন হতে পারে না!’
‘এই হিসাবটাই মিলছে না। মনে হচ্ছে উনি নিজের শত্রুকে দুর্বল ভেবেছেন! কিন্তু এমন কিসের শত্রুতা যেখানে শত্রু যে আদৌ কিছু করতে পারে এ বিষয়ে উনি ধারণা করেননি…
(১৩)
‘সমস্ত রিপোর্ট দেখলাম আমি!’ চোখের রিমলেস চশমাটা ডান হাতে খুলে নিলেন ডক্টর সিমন্তিনী দেবরায়! বয়স পঁয়ত্রিশ হয়েছে সবে। সেই তুলনায় উনি যেন আরও একটু বেশিই ইয়ং। রীতিমতো নিজেকে মেন্টেন করেন তা বোঝা যায়। একটা পিওর সিল্কের শাড়ি আর স্লিক মুক্তোর গয়না ওঁর সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এই কলকাতা শহরের একজন নামকরা ডাক্তার। ওঁর নিজস্ব আইভিএফ ক্লিনিক ‘নিউ লাইফ’ বেশ নাম করেছে। তাঁর কাছেই এই মুহূর্তে এসেছে সুনেত্রা আর অভীক
‘ডক্টর কিছু কি?’ অভীক একটু সাহস নিয়ে প্রশ্ন করল। সুনেত্রা কেমন যেন আশাবাদী দৃষ্টিতে ডাক্তার দেবরায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। সেই নার্সের বলা কথাটা ওর মনে সেদিন থেকেই গেঁথে গেছে। ওর মনে হয়েছে নিশ্চয়ই একটা ম্যাজিক হতে পারে। ওই মহিলার রেফারেন্সে ও এখানে এসেছে বলে মাত্র দু’দিনেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেয়ে গেছে। পরিচিত সোর্স তাই হয়তো তাড়াতাড়ি হয়েছে! তা না হলে এই ক্লিনিকে ডক্টর দেবরায়ের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া বেশ ঝক্কির ব্যাপার।
‘সমস্যা আপনার ওয়াইফের বেশ ভালোই আছে। এই ক্ষেত্রে কিন্তু প্রেগন্যান্সি আসার সম্ভাবনা প্রায় নেই ধরে নিতে হয়। খুব রেয়ার আইভিএফের থ্রু এই ধরনের কেসে প্রেগন্যান্সি আসে। আর তার থেকেও কম সংখ্যক প্রেগন্যান্সিতে সেটা ডেলিভারি পর্যন্ত থেকে যায়। যদিও সেই সংখ্যাটা সেই অর্থে আমার নজরে পড়া সেরকম নয়। আর ইটস ভেরি ভেরি রিস্কি। তবে আমি এরকম কেস হ্যান্ডেল করেছি। এবং আপনাদের বললে হয়তো মনে সাহস পাবে আমি সফল হয়েছি।’
এই কথাটা শুনে সুনেত্রা চোখে মুখে একটা অদ্ভুত আনন্দের দ্যুতি খেলে গেল, ‘ডক্টর? আপনি এই ধরনের কেসে সফল হয়েছেন?’ প্রশ্ন করে সুনেত্রা।
ওর ব্যাকুলতা আন্দাজ করে ডক্টর দেবরায় অল্প হাসেন। তারপর বলেন, ‘আমার কাছে এরকম এসেছিল। এছাড়াও বহু এমন জটিল আর কমপ্লিকেটেড কেস আমার কাছে আসে যেগুলোয় প্রেগন্যান্সি আসা প্রায় অসম্ভব। সেগুলোই আমি হয় আইভিএফ-এ প্রেগন্যান্সি এনেছি অথবা বিনা আইভিএফেও। ন্যাচারাল প্রসেসে। কিন্তু সেই দুই ক্ষেত্রে খরচ অত্যন্ত বেশি। তবে আপনার কেসে আইভিএফ ছাড়া কোনও গতি আমি দেখছি না। তাই আমাকে আইভিএফই করতে হবে। কিন্তু এই ট্রিটমেন্টের খরচ কিন্তু নরমাল আইভিএফের থেকে অনেক গুণ বেশি। সেটা আপনারা হ্যান্ডেল করতে পারবেন তো? দেখুন আমি শিওর করতে পারি যে এক থেকে দুইবারের প্রচেষ্টায় আপনার প্রেগন্যান্সি আসবে। আমি চেষ্টা করব প্রথমবারই সেটা সফল হওয়ার। তবে প্রেগন্যান্সি যে আসবেই এর গ্যারান্টিটা কিন্তু আমি দিতে পারি। যেহেতু এরকম কেস আমি আগে ডিল করেছি। তাই প্রসিডিওরটা আমার জানা।’
‘ডক্টর আপনি যে কথাটা বললেন। তারপরে খরচ বহন করতে পারব না এই কথাটার আমাদের কাছে কোনও মানে নেই। আমি এবং আমার স্ত্রী উভয়ই যথাসম্ভব এই চেষ্টা করব। তবে প্লিজ ডক্টর আপনি চেষ্টা করবেন যেন প্রথম ক্ষেত্রেই এই সফলতাটা আসে। না, টাকার জন্য বলছি না। তবে আমার স্ত্রীর মানসিক কন্ডিশন আপনি আশা করি বুঝতে পারছেন। এতবার অসফলতা নেওয়ার মতন মানসিকতা ওর মধ্যে আর নেই। অনেকবার ধাক্কা খেয়েছে ও। এই কারণেই আপনাকে রিকোয়েস্ট করছি।’
‘বেশ। তাহলে আপনারা যদি আমার কাছে ট্রিটমেন্টের রাজি হন তাহলে আপনাদের স্বাগত। প্রসিডিওর আমি আজ থেকে শুরু করে দেবো।’
এই প্রথম সুনেত্রা আর অভীক দু’জনের মুখে খুশির হাসি ফুটে উঠল। মনে হল যেন বহুদিন পর এত আনন্দ পেল।
‘আচ্ছা আমার ট্রিটমেন্ট প্রসিডিওরে কিন্তু কিছু বিষয় মাথায় রাখতে হবে। বিষয় বলব না যেহেতু অন্যদের থেকে একটু আলাদা। আমার মতো অনেক ক্লিনিক আছে। তারা এখনও এই প্রসেস স্টার্ট করেনি। তাই আমার এই প্রসিডিওরটা নিয়ে আমি একটু সিক্রেসি মেনটেন করি। বুঝতেই তো পারছেন সব ক্ষেত্রে তো শুধু ট্রিটমেন্টই সব কথা হয় না। অনেক সময় সেটা ব্যবসায়িক স্বার্থেও চলে আসে। আমি খুব স্পষ্ট কথা বলি। তাই আপনাকে সত্যি করে বলছি। না হলে অনেকেই আপনাকে ধোঁয়াশায় রাখবে। যেহেতু আমি আমার ট্রিটমেন্ট নিয়ে এবং প্রত্যেকটা পেশেন্টের ডিটেলস নিয়ে ভীষণভাবে সিক্রেসি মেন্টেন করি। সেগুলোকে কনফিডেন্সিয়াল রাখি। সেই কারণে সমস্ত টেস্ট, ট্রিটমেন্ট সব আমার ক্লিনিকেই হয়। টেস্ট আপনাকে এখান থেকেই করাতে হবে। মেডিসিন এখান থেকেই আমি দেব। আর আপনার পেশেন্টের যে ফাইল সেটা আমার কাছে জমা থাকবে। কারণ হঠাৎ কোনও প্রয়োজন পড়লে সেটা আমাকে হ্যান্ডেল করতে হবে। এমার্জেন্সি পারপাস। বাইরের কোনও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বা টেস্ট সেন্টারকে আমি ভরসা করব না আমার ট্রিটমেন্ট-এর ক্ষেত্রে। অনেক সময় এমন হয় তারা ভুলভাল রিপোর্ট দেয়। তখন পেশেন্ট প্যানিক করে। ট্রিটমেন্টে প্রবলেম হয়। এটা কিন্তু আপনাদের ক্ষেত্রে সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। আর সবথেকে বড় এবং ইম্পর্ট্যান্ট কথা হল আমার কাছে ট্রিটমেন্ট চলাকালীন অন্য ডক্টর কনসাল্ট করবেন না।’
এই কথাটায় অভীক একটু ভুরু কুঁচকে তাকায় ওঁর দিকে। সিমন্তিনী দেবরায় বিষয়টা খেয়াল করেছেন। ওঁর এই অভিজ্ঞতা আছে। অল্প হেসে বলেন, ‘দেখুন এটার একটা কারণ আছে। আমি যে ট্রিটমেন্টটা চালাব আপনি যদি অন্য কোথাও দেখান তিনিও আপনাকে মেডিসিন দেবেন এবং দুটো মেডিসিন একসাথে চললে কিন্তু আপনার ওয়াইফের চরম ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। দুটো প্রসিডিওর সম্পূর্ণ আলাদা। আপনারা তো অনেক জায়গায় দেখিয়েছেন। লাস্টে আমার কাছে এসেছেন। এটুকু ভরসা আমাকে করতে হবে। আর যদি সেটা না পারেন তাহলে আপনারা অন্য জায়গায় অবশ্যই যেতে পারেন। আপনাদের কেসটা কিন্তু আমি ডিল করব না। কারণ আমার কাছে যারা ট্রিটমেন্ট করায় তারা কিন্তু এই শর্ত মেনেই করায়। আমি তাদেরকে রেজাল্টের গ্যারান্টি দিই। কিন্তু আমার অবশ্যই কিছু কন্ডিশন থাকে। তবেই আমি সফল হতে পারব। আর সেটা যদি পেশেন্ট পার্টি মেন্টেন করে তাহলে আমার কাজটা সহজ হয়। এবার বলুন আপনারা কি রাজি?’
অভীককে কিছু বলতে না দিয়ে সুনেত্রা বলে, ‘হ্যাঁ আমরা সব মানব, ডক্টর। এত ডাক্তার তো দেখিয়েছি। কেউ তো এমন ভাবে বলতে পারেনি। আপনি যখন এত বড় অ্যাসিওরেন্স দিয়েছেন তখন আর কোথাও আমরা কেন যাব?’
‘আর আপনার কী মতামত মিস্টার বোস?’ সুনেত্রা অভীকের হাতটা চেপে ধরে। অভীকও মাথা নেড়ে বলে, ‘ও তো বলেই দিয়েছে যা বলার আপনি চিন্তা করবেন না। আমরা আপনার শর্ত মেনে চলব।’
ডক্টর দেবরায় অল্প হাসেন। তারপর বলেন, ‘ওয়েলকাম টু নিউ লাইফ! এখন আপনাদের আর কোনও টেনশন নেই। আপনাদের চিন্তাটা আমার উপর ছেড়ে দিন। আর সমস্তরকম ওষুধ, টেস্ট যাবতীয় কিছু এখানেই হবে। এসব কস্ট ট্রিটমেন্ট কস্টের মধ্যেই থাকবে। আপনারা ক্যাশ রেডি রাখবেন। চারটে স্টেপে কালেক্ট করা হবে। যে যে ফেজে যেমন খরচ হবে। মাকে খুব খুশি থাকতে হবে। আজ থেকেই সেই প্রসেস শুরু। একদম একটুও টেনশন বা স্ট্রেস নেওয়া যাবে না। প্রেগন্যান্সি টাইম কেয়ার বা বিফোর প্রেগন্যান্সি কেয়ার খুব ইম্পর্ট্যান্ট। আরেকটা বিষয়। আগে থেকেই সবটা জানিয়ে রাখছি। সাত থেকে আট মাসটা এইসব কেসে খুব রিস্ক থাকে। আপনারা প্রস্তুত থাকবেন। সেরকম হলে কিন্তু এমার্জেন্সি প্রিম্যাচিওর ডেলিভারি করাতে হতে পারে।। তবে তাও চিন্তার কিচ্ছু নেই।’
‘মা…ডেলিভারি…প্রেগন্যান্সি… এই শব্দগুলো কোনওদিন নিজের জন্য শুনব এই আশা একপ্রকার ছেড়েই দিয়েছিলাম ডক্টর। আপনি সেই আশা ফিরিয়ে দিলেন।’ সুনেত্রা ভীষণভাবে আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে। অভীক ওকে দেখে খুশিই হয়। ডাক্তারের দিকে ফিরে প্রশ্ন করে, ‘প্রথম পেমেন্ট কবে করতে হবে?’
‘এই তো! আমি আজ কিছু মেডিসিন দিচ্ছি। এগুলো ওকে খেতে হবে। এক সপ্তাহ পর ভিজিটে আসবেন। সেদিন ফার্স্ট পেমেন্ট কাউন্টারে করে দেবেন। ওখানে আপনাকে ক্লিয়ারলি সব ডিটেলস দিয়ে দেবে। প্রেগন্যান্সি এসে গেলে সেটা দু’মাস কন্টিনিউ করার পর সেকেন্ড পেমেন্ট। দেখতে হবে প্রেগন্যান্সি কেমন চলছে। অকারণে সেইজন্য একদম প্রথমে আমরা পেশেন্ট পার্টির থেকে সব পেমেন্ট নিই না।’
‘আচ্ছা ডক্টর!’ অভীক ভরসা ও শ্রদ্ধা মেশানো দৃষ্টিতে তাকায়।
***
‘বাদাম….ডালমুট….চিঁড়ে ভাজা…সব পাবে স…ব… এ ডালমুট…বাদাম…’ একটা হকার হাঁক দিতে দিতে খুশির পাশ দিয়ে চলে গেল। খুশি একবার তার দিকে তাকিয়ে হাত ঘড়িটা দেখে নিল। আধ ঘণ্টা হয়ে গেছে সে শিয়ালদহ স্টেশনে নেমেছে। এতক্ষণে বেশ কয়েকটা ট্রেনের নাম ওর মুখস্থ হয়ে গেছে বোর্ড দেখে দেখে। একটা বিরক্তির সুরে খুশি স্বগতোক্তি করল, ‘ধুর! মৃণালদা তো এখনও আসছে না! আমি কোথায় যাব? কিছুই তো জানি না। কাছে ফোন নেই যে ফোন করব। তাছাড়া ওর নাম্বারও তো নেই। কখন যে আসবে!’ মৃণাল ওদের গ্রামের সেই ছেলেটা যে ওকে চাকরিটা করে দিয়েছে। শেষ যেদিন খুশির সাথে দেখা করে এসেছিল সেদিন সে নিজেই বলেছিল কোন ট্রেনে খুশিকে উঠতে হবে সে ক’টায় পৌঁছবে আর কোন প্ল্যাটফর্মে খুশিকে দাঁড়াতে হবে। সেই সব অক্ষরে অক্ষরে পালন করে গেছে খুশি। শুধু মৃণালদার দেখা নেই!
‘খুশি!’ ডাকটা কানে আসতেই সজাগ হয়ে পিছন ফিরে তাকায় খুশি। হ্যাঁ ওইতো মৃণালদা আসছে। উফ্ এইবার যেন মেয়েটার ধড়ে প্রাণ এল!
‘অনেকক্ষণ দাঁড়াতে হল না রে? ইস বেচারি। একা এখানে…’
‘না না ঠিক আছে!’
‘চল চল! আর দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। চল।’ কথাটা বলে খুশির কাঁধের বড় ব্যাগটা নিজের কাঁধে চাপিয়ে নিল মৃণাল। তারপর ভিড় কাটিয়ে সুকৌশলে এগিয়ে যেতে লাগল স্টেশনের বাইরের দিকে। খুশিও তার পিছু পিছু এগোতে শুরু করল। ওরা বাইরে এসে একটু হেঁটে রাস্তার উপর আসে। মৃণাল খুশির দিকে তাকিয়ে বলে, ‘দাঁড়া একটা উবের বুক করি। ক্যাবে করে যাব। বাসে উঠে আর কষ্ট করতে হবে না। তাছাড়া সময়ও অনেক লাগবে।’
খুশি অবাক হয় মৃণালের কথা শুনে। ও জানে উবের ক্যাব কী! শহর থেকে দু’একবার ওদের গ্রামে ওই গাড়ি ও আসতে দেখেছে। রায়দের বাড়ির বড় মেয়ে এসেছিল। ওরা খুব বড়লোক। তেমনই বড়লোক ঘরে বিয়ে হয়েছে ওর। ওরা যে গাড়িতে চড়ে গ্রামে আসে সে গাড়িতে আজ খুশি চড়বে? শহরে কি এমনই হয়? এসব এলোমেলো প্রশ্ন খুশির মনে ভিড় জমাতেই ওর সামনে সেই গাড়ি এসে হাজির হয়।
‘নে উঠে আয়!’ ড্রাইভারের পাশের সিট থেকে মৃণাল বলল। ও যে কখন খুশির ব্যাগটা পিছনের সিটে রেখে সামনে গিয়ে বসেছে খেয়ালই করেনি খুশি। ও আসলে এখনও ঠিক বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না যে এটাও ওর সাথে হচ্ছে! যাই হোক সত্যি আর স্বপ্নের দোলাচল নিয়েই পিছনের সিটে উঠে বসে খুশি।
(১৪)
‘এই যে ম্যাডাম! এইটা রতনের চায়ের দোকান।’ অনিকেত দ্বৈতাকে হাত দেখিয়ে একটা গুমটি দোকানের দিকে ইশারা করে। দ্বৈতা সেদিকে তাকিয়ে দেখে সেটা বন্ধ। দোকানটা ঘিরে কেমন যেন একটা থমথমে পরিবেশ। পাশেই একটা ডিম টোস্টের দোকান। সেটা খোলা। চায়ের দোকানটা যে বেশ চলতি ছিল সেটা এই এরিয়া দেখলেই বোঝা যায়। দোকানটা বেশ জমজমাট এলাকায়। উল্টোদিকে একটা ফার্টিলিটি ক্লিনিক। তার সামনে বেশ মানুষজনের ভিড়। চায়ের দোকানটা বা এই দোকানটার কাছে শুধু এই ক্লিনিকের লোকজন আসে তা নয়। পাশেই একটা অফিস বিল্ডিং আছে। সেখান থেকেও লোকজন এখানে আসে বোঝা যায়। মোট কথা রতনের যে মোটামুটি একটা ভালো ইনকাম হয় সেটা বোঝা যায়। কিন্তু তা বলে রতনের বাড়ির ভিতরের যে দামি আসবাব আর দামি ফোন দেখে এল দ্বৈতা। সেটাও কি হিসাবে মেলে? আবার মদের ঠেকের বাকি সদস্যদের কাছ থেকেও জেনে এল রতন এই নিয়ে প্রায় পাঁচজনকে টাকা ধার দিয়েছে তাদের সমস্যায়। সেই অ্যামাউন্টটা যোগ করলে দেড় লাখ টাকা দাঁড়ায়। অতএব রতনের কাছে এমনই টাকার জোগান ছিল যে সে দামি ফোন, দামি আসবাব কেনার পরেও বাড়িতে টাকা রেখেও অন্যকে ধার দিতে পারে। সেটা কি শুধুমাত্র এই চলতি চায়ের দোকানটার জন্য? তাছাড়াও দ্বৈতা শুনেছে রতনের খাওয়া-দাওয়া বেশ ভালো। ওদের বাড়িতে সপ্তাহে প্রতিদিনই ভালো খাওয়া-দাওয়া এবং বাইরের রেস্টুরেন্টের খাবার আসে সপ্তাহে একদিন করে। তার উপরে যদি নতুন ভালো সিনেমা হয় তাহলে সেটা রতন রীতিমতন হলে গিয়ে টাকা খরচা করে দেখত। অতএব রতনের কিন্তু এলাহি ব্যাপার-স্যাপার ছিল।
উল্টোদিকের ক্লিনিকটার দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে দ্বৈতা। এখানে বহু দম্পতি এসেছে। কোনও প্রেগন্যান্ট মহিলা ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছেন। কিছু বাড়ির লোক নিচে অপেক্ষা করছে। হয়তো ভিতরে কারও ডেলিভারি হচ্ছে। এখানে কী হয় তা দ্বৈতা ছাড়াও বাকিদেরও জানা আছে। এটা একটা আইভিএফ ক্লিনিক। সন্তান হতে সমস্যা আছে যেসব দম্পতিদের তাদের কাছে এটা একটা সমস্যা সমাধানের পথ।
অনিকেত বলল, ‘এখান থেকে জানা যেতে পারে রতনের আর কোনও শত্রুর খবর আছে কি না! না হলে রতনকে হঠাৎ করে এভাবে মারল কে? ওই লোকটা যদি খুন করে থাকে তাহলে তো ওকে খুঁজে পেলেই ঝামেলা মিটে গেল। আর যদি ও না করে থাকে তাহলে তো…’
‘সেজন্যই বলছি এখান থেকে কিছু ব্লু আমরা পেতে পারি। আশপাশে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। পাশে ডিম টোস্টের দোকানের যে মালিক ছেলেটা আছে তার দিকে এগিয়ে গেল দ্বৈতা। ছেলেটা ব্যস্ত হাতে চটজলদি খাবার বানাচ্ছে। ওর দোকানে আরও একটি ছেলে আছে। সে ঝটপট প্লেটের মধ্যে নিয়ে খাবার সার্ভ করছে দাঁড়িয়ে থাকা কাস্টমারদের। দ্বৈতা গিয়ে দাঁড়াতে ছেলে দুটো একটু থতমত খেয়ে যায়। ওরা মনে হয় আন্দাজ করে নিয়েছে যে এরা পুলিশের লোক। রতনের খুনের খবরটা এতক্ষণে সকলেই প্রায় জেনে গেছে।
‘এই রতনকে চিনতে?’ দ্বৈতা ছেলেটার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে। ছেলেটা একটু তুতলিয়ে উত্তর দেয়, ‘হ্যাঁ চিনতাম। ম্যাডাম আপনি কি পুলিশের লোক? ‘
‘হ্যাঁ! আচ্ছা রতন কেমন লোক ছিল? ‘
‘এমনি ভালই ছিল।’
‘কারও সাথে কোনও ঝামেলা?’
‘না ম্যাডাম। সেরকম তো কিছু জানা নেই আমার।’
‘তোমার সাথে সম্পর্ক কেমন ছিল?’
‘আ… আমার সাথে?’ ছেলেটা ঘাবড়ে যায়। তারপর উত্তর দেয়, ‘আমার সাথে কোনও ঝুট ঝামেলা ছিল না ওর ম্যাডাম!’
‘এমন কিছু মনে আসছে যার জন্য রতন মার্ডার হতে পারে? কোনওদিনের কোনও ঘটনা?’
‘আমার তো সেরকম কিছু মনে পড়ছে না ম্যাডাম। এ…এই তো! এই দাদারাও রতনদাকে চিনত। চা খেত ওর দোকানে। এই যে এনারা ওই অফিসে কাজ করেন। আর ওই যে ওরা দু’জন নার্সিংহোমে কাজ করে। আমার দোকানেও আসে, রতনদার দোকানেও আসত।’ ছেলেটা ওর দোকানের শেডের তলায় দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজনকে দেখায়। ওর এই চিহ্নিতকরণে তারা সকলেই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। মোট পাঁচজন দাঁড়িয়ে আছে। তিনজন অফিসের এমপ্লয়ি তা বোঝা যাচ্ছে। ফর্মাল শার্ট-প্যান্ট আর গলায় আইকার্ড। বাকি দু’জন ওই নার্সিংহোমের সিকিউরিটি গার্ড।
দ্বৈতা ওদের দিকে ফিরে প্রশ্ন করে, ‘আপনারা চা খেতেন রতনের দোকানে?’ সকলেই মাথা নাড়ে। ভয়ের ছাপ চোখে-মুখে।
‘রতনকে কেমন মনে হত আপনার? কখনও দেখেছেন কারও সাথে ওর কোনও ঝামেলা হতে?’
প্রত্যেকে একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করে। কেউই কোনও উত্তর দেয় না। এদের মধ্যে অফিস এমপ্লয়ি একজন বলে, ‘ম্যাম আমরা তো ওর দোকানে জাস্ট চা খেতে এসেছি বেশ কয়েকবার। এর বাইরে সে কেমন ছিল সেটা বলতে পারব না। তবে মিশুকে লোক।’
‘খবরটা শুনেছেন নিশ্চয়ই?’
সকলের মুখ থমথমে হয়ে যায় এই প্রশ্নে। এইবার উত্তর দেয় এই ক্লিনিকের একজন, ‘খবরটা তাহলে সত্যি! ভাবতেই পারছি না। কে খুনটা করল কিছু জানা গেছে?’
‘না! এখনও কিছু জানা যায়নি। সেই চেষ্টাই চলছে।’
কথাটা বলেই দ্বৈতা ক্লিনিকটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর ভালো করে বিল্ডিংটা দেখতে লাগল। তখনই ওর চোখ আটকাল একদম সামনের দিকে একটা সিসিটিভি ক্যামেরায়। ফিরে এসে অনিকেতকে বলল, ‘এই ক্লিনিকের অথরিটির সাথে কথা বলতে হবে। লাস্ট কিছুদিনের ফুটেজ দেখতে চাই। রতনের চালচলন কেমন ছিল দেখা দরকার। আর যদি এক্সট্রা কিছু পেয়ে যাই!’
***
‘নে এবার গাড়ি থেকে নাম! আমরা এসে গেছি।’ মৃণালের কথা শুনে গাড়ির জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখে খুশি। গোটা রাস্তায় সাঁ সাঁ করে চলতে থাকে গাড়ি আর পেল্লায় বেলায় বাড়ি দেখে চোখ ধাঁধিয়ে গেছে। এইসব রাস্তায় একা পারাপার করাও বিপজ্জনক। ও তো কিছুতেই পারবে না। আর এত জটিল রাস্তা এত বড় শহর কত ফ্ল্যাট বাড়ি! একা একা কোনওদিন রাস্তা জেনে কোথাও যেতেও পারবে বলে মনে হয় না খুশির। এসব কথা যখন খুশি ভাবছিল তখনই গাড়িটা থামে। মৃণালের বলা কথা অনুযায়ী জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে খুশি দেখে সাদা রঙের দোতলা বাড়িটা। ছোট্ট আধুনিক স্টাইলে তৈরি করা বাড়ি। সামনে বিশাল বাগান। গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ায় খুশি। জায়গাটার নাম ও জানে না তবে এটুকু বুঝেছে এটা প্রপার কলকাতার কোনও এক জায়গা।
‘চল!’ খুশির দিকে তাকিয়ে বলল মৃণাল। গাড়ির ভাড়াটা মিটিয়ে খুশির ব্যাগটা কাঁধে চাপিয়ে ওর পাশে এসে দাঁড়াল। খুশি এখনও একমনে বাড়িটা দেখছে।
‘কী দেখছিস? এটা তো মালিকের একটা বাড়ি। এর থেকেও সুন্দর বাড়ি আছে ওনার। সে বাড়ি একদম সিনেমার মতো। বাংলো হয় না বাংলো। দুটো ফ্ল্যাট আছে। তুই ভালো করে কাজ কর এখানে। দেখবি নিজের একটা ফ্ল্যাট নিয়ে নিতে পারবি।’
‘আমি অতটাও ভাবি না গো। একটু ভালো ভাড়া বাড়ি পেলেই মাকে নিয়ে এসে আমার কাছে রাখব। মাকে ছাড়া থাকতে ভালো লাগে না।’
‘বেশ! সেসব হবে খন। চল এখন ভিতরে যাওয়া যাক। এখানে তোকে কিছুদিন থাকতে হবে। যতদিন না নতুন ভাড়া বাড়িটায় উঠছিস ততদিন এখানে থাকবি। তাছাড়া কিছু পেপার ওয়ার্ক কিছু ফর্মালিটিস আছে। ওগুলো কমপ্লিট হয়ে যাক।’
খুশি মনে মনে বেশ খুশিই হল। এই সুন্দর বাড়িতে ও এখন ক’দিন থাকবে! আবার মনে মনে একটু দুঃখ হল ওর মাকে যদি কাছে না রাখতে পারত! ক’টা দিন এমন সুন্দর পরিবেশে একটু থাকতে পারত! ওর মাকে ছেড়ে কোনও আনন্দই যেন সম্পূর্ণ নয় ওর কাছে। কিন্তু কী করবে? কাজ তো করতেই হবে। কাজ না করলে টাকাপয়সা না ইনকাম করলে ওর মাকে একটু সুখের মুখ দেখাবে কী করে? এত বছর মানুষটা ওর জন্য কত কষ্ট করেছে। আজকে তো ওর পালা কষ্ট করে সেগুলো সব ফিরিয়ে দেওয়ার। মায়ের কথা ভাবতে ভাবতে খুশি বাড়িটার মেন গেটের সামনে এসে দাঁড়াল। গেটটা খুলে দিল একজন দারোয়ান। মৃণালকে সে চেনে তা বোঝা গেল। খুশি আর মৃণাল প্রবেশ করল সেই গেটের ভিতরে। সুন্দর বাগান। মাঝখানে নুড়ি বিছানো রাস্তা। সেটা দিয়ে পেরিয়ে গিয়ে সামনের সাদা দোতলা বাড়িটা। দরজায় বেল দিতেই খুলল একজন মহিলা। বোঝা গেল না ইনি কে! পোশাক বেশ পরিছন্ন ও পরিপাটি। খুশিকে এক ঝলক মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে নিয়ে সে হাসিমুখে বলল, ‘স্যার আপনাদের জন্য ওয়েট করে আছেন। ভিতরে আসুন।’
এ কোনওভাবে মালিকের আন্ডারে কাজ করে বোঝা গেল।
‘ইনি হচ্ছেন রিচা ম্যাডাম। বুঝেছিস? এনজিওর অনেক কাজকর্ম উনিই দেখাশোনা করেন। ওনার আন্ডারেই সমস্ত মেয়েরা কাজ করে। স্যার এনজিওর মালিক। কিন্তু সব দরকারি জিনিসের দেখাশোনা রিচা ম্যাডামই করেন।’
‘হ্যাঁ! বুঝেছি!’ খুশি মাথা নাড়ে।
‘তুমি… আমি তোমাকে তুমিই বলছি।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়ই।’
‘তুমিও আপাতত আমার কাছেই থাকবে। তারপর যাবতীয় কাজকর্ম অন্য মেয়েদের মতন বুঝে নিলে তখন তোমার একটা কোম্পানি থেকে বাড়ি ভাড়া করে দেওয়া হবে। সেখানে থাকবে। আর প্রথম মাসের স্যালারি তোমাকে অ্যাডভান্স দেওয়া হবে। তুমি পাঠিয়ে দিও তোমার মায়ের কাছে। আর আমি শুনেছি মৃণালের কাছে সমস্ত কিছু। তুমি যাবতীয় ডিটেলস মৃণালকে দিয়ে রাখবে। ও মাসে মাসে তোমার থেকে স্যালারি নিয়ে বা কোম্পানির থেকে তোমার স্যালারির মধ্যে কিছু অংশ নিয়ে তোমার মাকে পাঠিয়ে দেবে। আর তুমি যখন নিজে সেগুলো হ্যান্ডেল করতে জেনে যাবে তারপর থেকে তুমি করবে। আপাতত প্রথমদিকে মৃণালই করে দেবে। অসুবিধা কিছু নেই।’
খুশির মনটা আনন্দে ভরে উঠল। কাজ করার আগেই হাতে মাইনে পাবে। অ্যাডভান্স মাইনে থেকে তাহলে মাকে কিছু টাকা পাঠাতে পারবে। যাক ওর জীবনের খুশির জোয়ার তবে এল বুঝি!
‘স্যার, ম্যাডাম সবাই খুব ভালো বুঝলি! এমপ্লয়িদের খুব খেয়াল রাখে। তুই শুধু কাজটা মন দিয়ে করবি। কোনওরকম কোনও ঝামেলাতে যাবি না। তাহলে দেখবি ওনারাও তোকে খুব খুশি করে দেবেন।’
‘ঝামেলা করতে যাব কেন?’ ভুরু কুঁচকে একবার তাকায় খুশি।
রিচা ম্যাডাম ওর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলেন, ‘আসলে অনেক ক্ষেত্রে হয় কী। লোকে কাজ খুঁজে আসে। কিন্তু কাজ করার সময় বলে এত কাজ করতে পারবো না। বেশি কাজ করতে পারব না! আসলে কী বলো তো। আমরা যেমন এমপ্লয়িদের দিকে, তাদের পরিবারের দিকে খেয়াল রাখব! তেমন তাদেরও তো কাজটা ঠিকঠাকভাবে করতে হবে!’
‘সেটা তো নিশ্চয়ই। কাজ তো করতে হবে। কাজ করার জন্যই তো আমরা এসেছি। তবেই তো ঠিকঠাক স্যালারি পাওয়া যায়।’
‘একদম ঠিক বলেছ। এই তো কী সুন্দর বুঝেছ তুমি! যাই হোক তোমরা দু’জনে এখানে বসো। আমি স্যারকে ডাকছি। আমার সাথেই যাবতীয় কথা তোমার হবে। কিন্তু তবুও উনি যেহেতু এনজিওর মালিক, ওনার সাথে একটু কথা বলে নাও।’ রিচা ভিতরে যেতেই খুশি মৃণালকে প্ৰশ্ন করে, ‘ওনার কি শুধুই এনজিওই আছে?’
‘না না, স্যারের অনেক বিজনেস। এইটা তো একটা এনজিও জাস্ট! এছাড়া স্যারের নিজস্ব ফার্ম আছে। অনেক কিছুরই বিজনেস। আমি এতদিন ধরে আছি স্যারের সাথে। সেজন্য কয়েকটার কথা জানি। আমিও সব জানি না। তবে তোর এত না জানলেও চলবে। তুই শুধুই এনজিওর কথা ভাব। তুই এনজিওতে কাজ করবি। বাকি কথা জেনে হবে কী তোর?
‘সেতো নিশ্চয়ই!’ খুশি আর কিছু বলে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন ভদ্রলোক নেমে আসে। তার বয়স চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ হবে। একটা সাদা রঙের পাঞ্জাবি পায়জামা পরে আছেন তিনি। খুশির দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘নমস্কার আমি অরবিন্দ মিত্র! আমি প্রত্যেক এমপ্লয়ির সাথে পার্সোনালি প্রথম দিন মিট করি। তারপর আর সেভাবে দেখা-সাক্ষাৎ হওয়ার সময় বা সুযোগ হয় না। ওয়েলকাম টু মাই ওয়ার্ল্ড! এই এনজিওতে ভালোমতো কাজকর্ম করো। নিশ্চয়ই তোমার উন্নতি হবে। আর রিচা ম্যাডামের কথা শুনে চলবে। উনিই তোমাকে যাবতীয় কাজকর্ম বুঝিয়ে দেবেন। ওর সাথেই তুমি স্টে করবে প্রাইমারিলি। তারপর কোম্পানির তরফ থেকে তোমাকে একটা রেন্টাল হাউসের ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ স্যার!’ খুশি একটা প্রণাম করে নেয় ওঁকে।
‘আরে না না থাক থাক! এর কোনও প্রয়োজন নেই। কাজটা মন দিয়ে করো তাহলেই হবে। আজ আমি আসি। আমার একটা মিটিং আছে। বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারব না। কথাটা বলে ভদ্রলোক বেরিয়ে আসতে উদ্যত হন। রিচা তাকে দরজার দিকে এগিয়ে দেয়। খুশি বুঝতে পারে বাইরে যে দুটো বড় বড় গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছিল তার মধ্যে নিশ্চয়ই একটা ওঁর। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে খুশি। যাক এবার একটু নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। রিচা দরজাটা দিয়ে এসে বলে, ‘নাও এখন তুমি কিছু খেয়ে নিয়ে রেস্ট করবে। আমি তোমার খাবারের ব্যবস্থা করি।’
খুশি মৃণালের সাথে সোফাটায় বসে। কিছুক্ষণের মধ্যে রিচা এসে হাজির হয়। মৃণাল খুশিকে নিজের মোবাইল ফোনটা দিয়ে বলে, ‘তোর মাকে ফোন করে জানিয়ে দে তুই ঠিকঠাক পৌঁছে গেছিস। আমি পরশু নাগাদ একবার গ্রামে যাব। তোর মাইনের থেকে কিছু টাকা আমি তোর মায়ের হাতে দিয়ে আসব। আর এখন আমার ফোনে তোর মায়ের সাথে কথা বলে নে।’
কথাটা শুনে খুশি প্রচণ্ড আনন্দিত হয়। মৃণালের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে ওদের তপন কাকার দোকানের ল্যান্ডলাইন নাম্বারটা ডায়াল করল। কিছুক্ষণ রিং হতে তপন কাকা ফোনটা ধরতে খুশি বলে, ‘কাকা মাকে একটু ডেকে দাও না! কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে খুশির মা ছুটে এসে ফোনটা ধরে। এই ফোনটারই অপেক্ষায় ছিল ওর মা।
‘পৌঁছে গেছিস খুশি?’
‘হ্যাঁ মা! আমি মৃণালদার ফোন থেকে ফোন করছি। ওখানে সব ঠিক আছে তো? হ্যাঁ মা আমি পৌঁছে গেছি ওই বাড়িতে। এখন খাওয়াদাওয়া করব। রেস্ট নেব, অফিসের কাজ বুঝে নিতে হবে। ওনারা খুব ভালো জানো তো আমাকে প্রথম মাসে স্যালারি অ্যাডভান্স দেবে আমি তার তার বেশিরভাগটাই তোমাকে কাল-পরশুর মধ্যে পাঠিয়ে দেব। মৃণালদার হাত দিয়ে কিছু টাকা পাঠাব। তুমি একটু ভালো করে থাকো মা। আমি ঠিক করেছি মোটামুটি কোম্পানি আমাকে ভালো ভাড়াবাড়ি যেই দেবে সাথে সাথে আমি তোমাকে এখানে নিয়ে আসব। মনে হয় তাতে এক-দেড় মাস সময় লাগতে পারে। কিন্তু তুমি চিন্তা কোরো না। আমি এখানে খুব ভালো আছি। আর তোমাকেও আমি খুব শিগগিরই আমার কাছে নিয়ে আসব। আর একমাস পরে আমি চেষ্টা করছি তোমার কাছে যাওয়ার। তোমাকে ছাড়া আমারও তো ভালো লাগছে না আমার।’
খুশির মা বুঝতে পারে মেয়ের মন খারাপ করছে। নিজের আবেগটাকে লুকিয়ে রেখে তিনি বলেন, ‘না না কষ্ট পেলে হবে না! তোর তো এটাই স্বপ্ন ছিল। বাইরে কাজ করতে যাবি। আরও বড় হবি। এই প্ৰথম প্ৰথম ক’টা দিন একটু কষ্ট হবে। একটু যেই মানিয়ে যাবে দেখবি ভালো লাগবে। আর আমার কথা ভাবিস না। আমি এখানে খুব ভালো আছি। তুই কিন্তু বেশি টাকা আমাকে পাঠাবি না। আগে নিজের জন্য বেশি করে রাখবি। যেটুকু মনে হবে সেটা পাঠাবি। আর একদম ওখানে কিন্তু কম খেয়ে দেয়ে থাকবি না। ভালো করে খাওয়াদাওয়া করবি। কাজ করতে গেলে পরিশ্রম করতে গেলে মাথা খাটাতে গেলে কিন্তু শক্তি লাগবে। আর তার জন্য ভালো খেতে হবে। তুই ভালো থাকলে জানবি তোর মা এখানে ভালো আছে। বুঝেছিস?’
‘বুঝেছি মা। তুমিও কিন্তু আমার চিন্তা করবে না। জানবে আমি এখানে ভালো আছি।’
‘আমার মেয়ে বড় হয়ে গেছে। দু’জনেই হাসাহাসি করে। আরও কিছুক্ষণ সুখ-দুঃখের কথা বলে। তারপর ফোন রেখে দেয়। খুশি মৃণালকে ফোনটা ফিরিয়ে দিয়ে বলে, ‘থ্যাঙ্ক ইউ মৃনালদা। তুমি ছিলে বলে আজ এত ভালো দিন দেখতে পাচ্ছি।’
‘আরে না রে। ওটা কোনও ব্যাপার না। গ্রামের ছেলেমেয়েদের উন্নতি হবে। দুটো কাজ হবে। এটা আমার ভালোই লাগে। তুই খেয়ে নে। মন দিয়ে কাজ করবি। আমি আজকে উঠি। কালকে আসব। তুই যে টাকাটা দিবি সেটা পরশুদিন তোর মায়ের কাছে পৌঁছে দেব। তারপর পরশুদিন তোর মায়ের সাথে ফোনে কথা বলিয়ে দেব। তুই জেনে নিবি তোর মা তোর টাকা পেয়েছে কি না।’
‘না না এভাবে বোলো না। আমি তোমাকে বিশ্বাস করি। ‘
‘আরে না না এটা তো প্রথমবার। তুইও জেনে নিবি। কাকিমার মেয়ের প্রথম মাইনে হাতে পেয়ে কেমন লাগছে তোর সাথে একটু কথা বললে বুঝতে পারবি। এখন আপাতত কিছুদিন তুই আমার ফোন থেকে বা রিচা ম্যাডামের ফোন থেকে বাড়িতে ফোন করিস। পরে তোকে ফোন কিনে দেবো তোর মাইনের টাকা দিয়ে। তখন সেটা ব্যবহার করিস। কেমন?’
‘ঠিক আছে মৃণালদা। থ্যাঙ্ক ইউ গো।’
‘এত থ্যাঙ্ক ইউ বলতে হবে না। খেয়ে দেয়ে একটু রেস্ট কর। আমি আসি। আমার কাজ আছে।’
‘আচ্ছা।’কথাটা বলতে বলতে খুশির সামনে একটা প্লেটে একটু নুডলস আর একটা কাঁচের গ্লাসে জুস নিয়ে হাজির হয় রিচা ম্যাডাম। তারপর টেবিলের সামনে রেখে বলেন, ‘এগুলো খেয়ে নাও, খেয়ে একটু রেস্ট নাও। রাত্রে আবার তোমার সাথে কথা হবে। কেমন?’
খুশি মাথা নেড়ে বলে ‘ঠিক আছে।’
মৃণাল ওর ব্যাগটা নামিয়ে দিয়ে চলে যায়। যেতে যেতে একবার পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখে নেয় খুশিকে। কি জানি ওর কী মনে হল, একটা করুণ হাসি হেসে খুশিকে বলল, ‘ভালো থাকিস রে। পরশুদিন আর কালকে আবার আসব। তারপর তোর সাথে আর সেরকম দেখা হবে কই! তুইও কাজে ব্যস্ত থাকবি আমিও কাজে ব্যস্ত থাকব। নে এখন রেস্ট নে।’ কথাটা বলে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল মৃণাল। ও চলে যেতে রিচা দরজাটা লক করে দিল।
খাবারটা খেয়ে খুশির বড্ড ঘুম পেল। রিচা ম্যাডামের দেখিয়ে দেওয়া দোতলার ঘরে ও গিয়ে নিজের ব্যাগটা রাখল। কী সুন্দর ঘরটা। পরিপাটি করে গোছানো আসবাবপত্র। কিন্তু প্রতিটাই দামি। বিছানাটা কী দারুণ। নরম গদি। তার উপর সাদা ধবধবে চাদর পাতা। মনে হল কতকাল যেন ঘুম হয়নি। ওর মনে হল এই নরম বিছানায় শুয়ে পড়লে ওর দু’চোখের পাতায় যেন জন্মের ঘুম নেমে আসবে।
‘তুমি একটু ড্রেস চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে নাও। আমি আসি। কিছু লাগলে এখানে একটা বেল আছে দরজার বাইরে, ওটা প্রেস করে দিও। আমি শুনতে পেয়ে যাব। নিচ থেকে চলে আসব।’
‘ঠিক আছে ম্যাম।’ কথাটুকু বলতেও বড্ড যেন ক্লান্ত লাগছে খুশির। অনেকটা জার্নির ফলে কি? নাকি অনেকটা টেনশনের পর একটু রিলিফ পাওয়ার জন্য ও জানে না। কিন্তু ওর খুব ঘুম পাচ্ছে। ব্যাগ থেকে জামাকাপড় বের করে বাথরুমের দিকে চলে গেল ও। রিচা ম্যাডাম ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে দরজাটা বাইরে থেকে টেনে দিল। বাথরুমে ফ্রেশ হয়ে ড্রেস চেঞ্জ করে এসে খুশি ফ্যানটা চালিয়ে বিছানাটার উপর এলিয়ে পড়ল। তারপর মনে হল যেন সেই গ্রামের বিছানা, মায়ের কোলের ধারে শুয়ে ফ্যানের ঠান্ডা হওয়া যেমন ওর মাথায় এসে পড়ছে। মনে হল যেন গ্রামের ঠান্ডা হাওয়া ওর চোখে মুখে লাগছে। চোখ দুটো বুজে এল খুশির।
