দুর্গম দুর্গ – ১৫
পনেরো
গুণে গুণে ষাট ফুট নামল রানা রশি বেয়ে। দাঁতে কামড়ে ধরে আছে সে ইশরাতের দেয়া এক মাথায় হুক বাঁধা কঞ্চিটা। রশিতে দুইবার থাবড়া দিয়ে ইঙ্গিত করল সে মিশ্রী খানকে। দোলাতে আরম্ভ করল মিশ্রী খান রশিটা রেলিং-এর ধারে শুয়ে পড়ে। রশি ধরে ঝুলে থেকে ঘড়ির পেণ্ডুলামের মত দুলতে আরম্ভ করল রানা। ধীরে ধীরে বেড়ে চলল গতি, সেই সাথে ঝুলনের দূরত্ব। ক্রমেই এগিয়ে যাচ্ছে রানা অফিসারস্ কোয়ার্টারের দিকে। ইশরাত ছুঁড়ে দেবে একটা রশি। যে করেই হোক ধরতে হবে রানাকে সেই রশি। এরই ওপর নির্ভর করছে এখন সবকিছু।
দাঁতে দাঁত চেপে দু’হাতে ধরে আছে রানা দড়ির শেষ প্রান্ত। কিছু দেখা যাচ্ছে না। আবার চেপে এসেছে বৃষ্টি। প্রথম দিকে পাহাড়ের গা থেকে বেরিয়ে আসা একটা পাথরে বার তিনেক ঠোকর খেয়েছিল রানা, কায়দা করে সরে গেছিল সে। তখন গতি কম ছিল বলে ধাক্কাটা বিশেষ আমল দেয়নি। কিন্তু হঠাৎ খেয়াল করল ধীরে ধীরে আবার ফিরে আসছে সে পাথরটার দিকে। সর্বনাশ! এবার একবার বাড়ি খেলে ছাতু হয়ে যাবে সে। অন্ধকারে ঠিক দেখা যাচ্ছে না কিছু। আর কতদূরে আছে পাথরটা? এইবারেই কি ধাক্কা খেতে যাচ্ছে সে? বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল রানার। প্রতিবার যখনই ওদিকে যাচ্ছে, পাগলের মত হুক লাগানো কঞ্চিটা দিয়ে খুঁজছে সে ইশরাতের ছুঁড়ে দেয়া রশি। আর প্রতিবারেই যখন বিফল হয়ে ফিরে আসছে, চোখ বুজে দম বন্ধ করে প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রচণ্ড এক ধাক্কার জন্যে। পাথরটার কথা ভুলে যাবার চেষ্টা করল রানা, কিন্তু কিছুতেই আতঙ্ক গেল না মন থেকে। এই গতিতে ধাক্কা খাওয়া মানে নিশ্চিত মৃত্যু। ক্রমে কাছে এগিয়ে আসছে ওর মৃত্যু।
কিন্তু কি হয়েছে ইশরাতের? রশি কোথায়? ধরা পড়ে গেল না তো! হাত দুটো ব্যথা হয়ে গেছে রানার ঝুলে থাকতে থাকতে। আর কতক্ষণ সে পারবে এভাবে ঝুলে থাকতে? আবার সাঁ করে পার হয়ে গেল সে পাথরের দুই ফুট দূর দিয়ে। ঝিক্ করে একবার বিদ্যুৎ চমকে উঠতেই পরিষ্কার দেখতে পেল রানা পাথরটা। এই-ই শেষ চেষ্টা- বুঝল রানা পরিষ্কার। এবার রশি না পেলে ওর নিশ্চিত মৃত্যু ঠেকাতে পারবে না কেউ। প্রচণ্ড আঘাতের কথা চিন্তা করে গাল দুটো কুঁচকে গেল ওর একবার।
কঞ্চিটা বাড়াল রানা সামনের অন্ধকারে, এদিক ওদিক হাতড়াল, কিছু নেই। খোদা! হঠাৎ লাফিয়ে উঠল রানার হৃৎপিণ্ড। পেয়েছে সে রশিটা!
একটানে কাছে নিয়ে এল রানা রশিটা। শক্ত করে চেপে ধরে কমিয়ে ফেলল গতি। ধীরে ধীরে এসে ঠেকল ওর দেহটা পাথরে, ওটা পার হয়ে চলে গেল আরও ছয় সাত ফুট। ইশরাতের রশিটা কোমরে বেঁধে নিয়ে ভেজা রশি বেয়ে ধীরে ধীরে উঠে এল সে ওপরে। রেলিং পার হয়েই শুয়ে পড়ল মেঝের ওপর। হাপরের মত শ্বাস পড়ছে ওর তখন।
বিনা বাক্য ব্যয়ে ওর কোমর থেকে খুলে নিল মিশ্ৰী খান ইশরাতের পাঠানো রশিটা। লম্বা রশির দু’মাথাই রয়েছে ইশরাতের কাছে। এখন শক্ত মসৃণ কোনও একটা জিনিস দরকার যেটা পুলির কাজ করবে। একটা কামানের গায়ে পরিয়ে দিল মিশ্রী খান রশিটা, দুটো টান দিল রশি ধরে। ওদিকে ছাতের ওপর ওয়াটার ট্যাঙ্কে পানি তোলার একটা মোটা পাইপের ওপাশে টেনে গিঁট দিয়েছে ইশরাত রশির দুই মাথা।
দুই মিনিটে চলে এল ভারি ব্যাটারিটা রশিতে ঝুলতে ঝুলতে। আর দু’মিনিটে নাইট্রো, প্রাইমার এবং ডিটোনেটারের ক্যানভাস ব্যাগ পৌঁছে গেল ওপরে। এমনি সময় থেমে গেল হাতুড়ির ঘা। তড়াক করে উঠে বসল রানা। থামল কেন হাতুড়ি-পেটা? ভেঙে ফেলল ওরা দরজা? অটোমেটিক কারবাইন হাতে ঢুকে পড়েছে ভারতীয় সৈন্য?
উঠে দাঁড়াল রানা। কাঁধে তুলে নিল মিশ্ৰী খান ব্যাটারিটা। এখন আর কিছু চিন্তা করবার অবসর নেই। ওরা মরুক বাঁচুক, কাজটা সমাধা হওয়াই আসল কথা।
গুহার মধ্যে একটি প্রাণীও দেখতে পেল না ওরা। টর্চ ধরল রানা দরজার দিকে। যেমন ছিল তেমনই আছে সেটা। অটল, অনড়। মিশ্ৰী খানকে নিজের কাজ করবার হুকুম দিয়ে নেমে গেল রানা মই বেয়ে। দরজার বাইরে কারা যেন কথা বলছে। কি বলছে শুনবার জন্যে দরজায় কান লাগাতে গিয়ে চমকে উঠল রানা। অসম্ভব গরম দরজাটা। সোঁ সোঁ একটা শব্দ আসছে বাইরে থেকে। টর্চ নিভাতেই দেখতে পেল তালার কাছটায় লাল হয়ে উঠছে দরজাটা। অক্সি-অ্যাসেটিলিন টর্চ দিয়ে তালা গলাবার চেষ্টা করছে ওরা এখন। দরজাটা আর্মার্ড স্টীলের তৈরি- গলতে দেরি আছে, বুঝল রানা। এখনও অন্তত সাত মিনিট সময় আছে ওদের হাতে। উঠে এল রানা ওপরে। মিশ্রী খানকে বলল ব্যাপারটা।
‘কিচ্ছু ভাববেন না, ওস্তাদ। পাঁচ মিনিটের কাজ। ওরা পৌঁছবার দুই মিনিট আগেই কেটে পড়ব আমরা এখান থেকে।
ঠিক পাঁচ মিনিটেই কাজ শেষ করে উঠে দাঁড়াল মিশ্ৰী খান। টর্চ জ্বেলে এপাশ ওপাশ থেকে ভাল করে দেখল কিছু দেখা যাচ্ছে কিনা। তারপর সন্তুষ্টচিত্তে একটা বক সিগারেট ধরিয়ে বেসুরো শিস দিতে আরম্ভ করল।
‘হয়ে গেছে, মিশ্রী খান?’ ব্যগ্রকণ্ঠে জিজ্ঞেস করল রানা।
‘হ্যাঁ, ওস্তাদ। যে-কাজে এসেছিলাম সে-কাজ শেষ। ঠিক রাত বারোটায় সেট করে দিলাম। ওদের বাপেরও ক্ষমতা নেই এখন এটাকে বন্ধ করে। কেউ স্পর্শ না করলে বারোটায় ফাটবে- কিন্তু যদি তার আগেই কেউ ধরে তবে সঙ্গে সঙ্গে ফাটবে। এখন দেখা যাক পৈত্রিক প্রাণটা নিয়ে দেশে ফেরা যায় কিনা। আবার কি সমুদ্র দিয়ে যেতে হবে, ওস্তাদ?’
রানা কোনও জবাব দিল না। দরজায় বেশ খানিকটা ফুটো করে ফেলেছে ওরা। দ্রুত চলে এল ওরা গুহামুখের কাছে। একে একে চলে গেল অফিসারস্ কোয়ার্টারের ছাতে। রশিটা ছুরি দিয়ে কেটে একদিক ধরে টেনে সরিয়ে আনল কামানের ওপর থেকে। ব্যস। কাজ শেষ ওদের।
.
রাত বারোটা বাজতে দশ
ইশরাতের দ্বিতীয় আস্তানার বারান্দায় বসে আছে রানা। পাল্লা দিয়ে নাক ডাকাচ্ছে আলতাফ আর মিশ্রী খান গেস্টরূমে পাশাপাশি দুটো খাটে শুয়ে। রাত সোয়া বারোটায় আসবে পাকিস্তানী সাবমেরিন থেকে রেসকিউ বোট।
সান সেরে পরিষ্কার শুকনো কাপড় পরে বেশ ঝরঝরে লাগছে শরীরটা। বারান্দায় একটা আরাম কেদারায় আরাম করে শুয়ে আকাশ- পাতাল ভাবছে রানা। ব্রেনগানটা পাশেই মাটিতে রাখা। নিজেই যেচে পাহারার ভার নিয়েছে সে।
বৃষ্টি থেমে গেছে বেশ অনেকক্ষণ হয়। পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে আকাশটা। সাদা মেঘের ফাঁক দিয়ে এক-আধবার উঁকি দিয়েই আবার গা ঢাকা দিচ্ছে চাঁদ। দশ হাত দূরে আরব সাগরের ঢেউ এসে ভেঙে পড়ছে তীরে। ঢেউয়ের মাথায় সাদা ফেনা। শহরটা নিস্তব্ধ। চারদিকে একটা শান্ত সমাহিত ভাব। রানার মনের মধ্যেও কোনও উদ্বেগ নেই। কাজ ফুরিয়েছে। যে-কাজে পাঠানো হয়েছিল ওদের, সেটা সুসম্পন্ন হয়েছে। অদ্ভুত এক নির্মল আনন্দে ভরে আছে হৃদয়। কান পেতে শুনছে সে সমুদ্রের কল্লোলধ্বনি আর তরঙ্গের উচ্ছ্বাস
রানার চুলের মধ্যে প্রবেশ করল ইশরাত জাহানের নরম আঙুল। নিঃশব্দে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সে।
‘কি ভাবছ, মেজর?’
‘কিচ্ছু না। বসে বসে পাহারা দিচ্ছি।’
‘এখানে কে আসবে যে পাহারা দিচ্ছ? দু’ঘণ্টা আগেই একবার সার্চ করে গেছে। আগামী বারো ঘণ্টার মধ্যে এখানে খোঁজ করবার কথা কারও মাথায় আসবে না।’
‘তবু, সাবধানের মার নেই। তাছাড়া বসে থাকতে ভালই তো লাগছে।
‘কফি খাবে এক কাপ? পানি চড়িয়ে দিয়েছি স্টোভে। একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসল ইশরাত।
‘ব্যাপার কি, জাহান?’ অবাক হয়ে গেল রানা। ‘শাড়ি পরেছ যে?’ হাসল ইশরাত। ঝকঝক করে উঠল সুন্দর দু’পাটি দাঁত। বলল, স্পাকিস্তানেই যখন যেতে হচ্ছে তখন ছদ্মবেশের আর কি দরকার?’
খুঁটিয়ে দেখল একবার রানা ইশরাতকে। কপালে লাল টিপ পরেছে সে, কানে ছোট্ট দুটো ঝুমকো। ডান হাতে কয়েকগাছি সোনার চুড়ি, বাঁ হাতে একটা লেডিস্ ঘড়ি কালো ব্যাণ্ড দিয়ে বাঁধা। লম্বা নখে নেইল পলিশ। আঁটসাঁট করে পেঁচিয়ে পরেছে সে একটা কমলা রঙের শিফন শাড়ি। মাথার চুল পুরুষের মত করে ছাঁটা। শাড়ি ব্লাউজের সঙ্গে চুলের এই অসামঞ্জস্য বিদঘুটে দেখালেও কেন জানি ভাল লাগল রানার।
‘খারাপ লাগছে দেখতে?’ জিজ্ঞেস করল ইশরাত।
‘অপূর্ব লাগছে।’
‘কফি খাওয়াবার কথা শুনে বলছ, না সত্যিই?’
‘সত্যি।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ।’
চুপচাপ সাগরের গান শুনল কিছুক্ষণ ইশরাত, তারপর আবার জিজ্ঞেস করল, ‘আর কতক্ষণ, রানা?’
ঘড়ি দেখে জবাব দিল রানা, ‘তিন মিনিট।’
অস্থির পায়ে চলে গেল ইশরাত কফি আনতে। দুই মিনিট পর রানার হাতে কফির কাপ ধরিয়ে দিয়ে জানতে চাইল ইশরাত, ‘আর আছে এক মিনিট। ওদের জাগাবে না?’
‘কি দরকার? ঘুমাচ্ছে ঘুমাক। ভয়ানক খাটুনি গেছে ওদের ওপর দিয়ে।’ কাপে চুমুক দিয়ে বলল, ‘বাহ, দারুণ হয়েছে তো!’
ঘড়ির ওপর থেকে চোখ সরাতে পারছে না ইশরাত।
ঠিক বারোটায় কেঁপে উঠল রানার হাতে ধরা কাপ। প্রথমবার মৃদু, দুই সেকেণ্ড পর প্রচণ্ডভাবে দুলে উঠল গোটা এলাকা- তারপর পৌঁছল এসে বিস্ফোরণের আওয়াজ।
মৃদু হাসি ফুটল রানার মুখে।
***
