রানা! সাবধান!! – ১২
বারো
একলাফে দেয়ালের গায়ে সেঁটে গেল রানা। হঠাৎ এক অবর্ণনীয় ভয়ে ঘাড়ের কাছে মাথার চুলগুলো খাড়া হয়ে গেছে ওর। হিম হয়ে গেছে বুকের ভিতরটা। ঝিক্ করে বিদ্যুৎ চমকে উঠল আকাশে।
কেউ নেই লম্বা করিডরে। সামলে নিল রানা নিজেকে। এখন ভয় পেলে চলবে না। প্রথম দরকার শায়লা এবং ডক্টর ফৈয়াজের নিরাপত্তা। দরজার কাছে চলে এল সে দেয়ালের গায়ে সেঁটে থেকে। ঘরে ঢুকেই দরজা ভিড়িয়ে দিল। ভিতর থেকে দরজা লাগাবার কোন উপায় নেই।
‘কি হলো, রানা! আলো নিভে গেল কেন?’ জিজ্ঞেস করল শায়লা। ‘ললিতা ফিরে এসেছে দ্বীপে। গার্ডগুলোকে মেরে ফেলেছে সে, বাকি সবাইকে অজ্ঞান করে রেখে পাগলদের ছেড়ে দিয়েছে। এখন খুঁজে বের করে খুন করবে আমাকে। অন্ধকারেও টের পেল রানা আঁতকে উঠল শায়লা। ‘ভয় পেয়ো না। এই অন্ধকারে আমাদের চেয়ে ওর নিজের বিপদের সম্ভাবনা কম নয়। যে-কোনও পাগল ওকেও আক্রমণ করে বসতে পারে। আমাকে বেরোতে হবে।’
‘কিন্তু ওর কাছে পিস্তল আছে, তুমি তো নিরস্ত্র, রানা,’ বললেন ডক্টর ফৈয়াজ।
‘এই অন্ধকারে পিস্তল থাকা না থাকা সমান কথা,’ বলল রানা। এমন সময় হঠাৎ চিৎকার করে উঠল সাদেক খান। ওর কথা ভুলেই গিয়েছিল রানা। জিজ্ঞেস করল, ‘ওর ওষুধ ঠিক কোনখানে পাওয়া যাবে বলুন, চেষ্টা করে দেখি।
‘ওষুধে কোনও কাজ হবে না, রানা। ব্রেন হেমোরেজ। মারা যাচ্ছে লোকটা। এক্ষুণি অপারেশন করতে পারলে হয়তো বাঁচানো যেত- কিন্তু…’ কথাটা আর শেষ করলেন না তিনি। বুঝে নিল রানা, অন্ধকারে কিছুই সম্ভব নয় এখন। কাজেই মরতে দিতে হবে ওকে। এখন দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করবার ব্যবস্থা করেই বেরোতে হবে ওকে।
দুটো বেড টেনে দরজার কাছে নিয়ে এল রানা।
‘কি করছ?’ জিজ্ঞেস করল শায়লা ভীত কণ্ঠে।
মট করে একটা কাঠের চেয়ারের পায়া ভাঙল রানা। ‘এইটা ধরো। আমি বেরিয়ে গেলে খাট দুটো ঠেলে চাপিয়ে দেবে দরজার গায়ে। যদি কেউ ভেতরে ঢুকবার চেষ্টা করে, এটা ব্যবহার করতে দ্বিধা করবে না।’ আরেকটা পায়া ভেঙে হাতে নিয়ে সামনে পা বাড়াল রানা।
‘কিন্তু তুমি কোথায় যাচ্ছ, রানা?’
‘ললিতাকে খুঁজে বের করতে হবে। নইলে…’ খিল খিল করে হেসে উঠল কেউ দরজার বাইরে। দুড়দুড় করে দৌড় দিল কে যেন দরজার সামনে দিয়ে। খামচে ধরল শায়লা রানার জামা। ‘নইলে সকালে কোনও সাহায্য পৌঁছানোর আগেই মেরে ফেলবে ও আমাদের অতি সহজে।
বেরিয়ে গেল রানা নিঃশব্দে। ঠাণ্ডা একটা দমকা হাওয়া লাগল ওর চোখে-মুখে। কড়াৎ করে বাজ পড়ল কাছেই কোথাও। নেমে এল রানা নিচে। করিডরের শেষ মাথায় পৌঁছেই বুঝল ভুল হয়ে গেছে। দরজা বন্ধ ঝিক করে বিদ্যুৎ চমকে উঠল। লম্বা করিডরটা ফাঁকা। ছুটে চলে এল রানা এপাশে।
দ্বিতীয় গেটের কাছাকাছি এসেই বিদ্যুতের আলোয় ভেজা পায়ের ছাপ চোখে পড়ল রানার। বাম ধারের প্যাসেজ ধরে চলে গেছে পদচিহ্ন। চেয়ারের ভাঙা পা-টা শক্ত করে ধরে এগোল রানা বিড়ালের মত নিঃশব্দ গতিতে।
সূচীভেদ্য অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না সামনে। প্যাসেজের শেষ মাথায় ধাক্কা খেল রানা একটা সুইং-ডোরের সাথে। রান্না ঘর। হঠাৎ তীক্ষ্ণ কণ্ঠে ‘ই…ই…হ্’ বলে চিৎকার করে উঠল কেউ ঘরের মধ্যে। আন্দাজের ওপর পায়া চালাল রানা। খুব সম্ভব ঘাড়ের ওপর লাগল বাড়িটা। দড়াম করে মাটিতে পড়ল ভারি কোন বস্তু। বিদ্যুতের আলোর জন্যে কয়েক সেকেণ্ড অপেক্ষা করল রানা কয়েক পা ডাইনে সরে। চমকে উঠল বিদ্যুৎ। সেই আলোয় দেখল রানা ভীত দৃষ্টিতে চেয়ে আছে ওর দিকে এক বদ্ধ। সারা মুখে আধ ইঞ্চি লম্বা খোঁচা খোঁচা পাকা দাড়ি। রান্না ঘরে ঢুকে টিন খুলে ময়দা খাচ্ছিল। রানাকে দেখতে পেয়ে ধড়মড় করে উঠেই দৌড় দিল সে ঘর থেকে বেরিয়ে প্যাসেজ দিয়ে।
‘টাশশ!’
সুইং-ডোর ঠেলে বেরোতে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল রানা। গগন বিদারী চিৎকার করে মুখ থুবড়ে পড়ে গেছে পাগলটা
জানালা টপকে বেরিয়ে গেল রানা রান্নাঘর থেকে। বৃষ্টির ছাঁট বিঁধছে এসে চোখে। পেছন দিয়ে ঘুরে যেতে হবে। দৌড়ে চলে এল সে সামনের গাড়ি বারান্দায়। আবার চমকে উঠল বিদ্যুৎ। কিছুই দেখতে পেল না রানা, কিন্তু পাছে ওকে কেউ দেখতে পেয়ে থাকে তাই ভেবে লাফিয়ে সরে গেল কয়েক হাত।
‘টাশশ্!’
ছিটে এসে চুনসুরকি লাগল রানার চোখে-মুখে। মৃদু হাসি ফুটে উঠল ওর ঠোঁটে। দেখতে পেয়েছে রানা কোথায় আছে ললিতা। দৌড়ে এগিয়ে গিয়ে দরজার আড়ালে দাঁড়াল রানা। কিন্তু কোথায় ললিতা? কয়েক সেকেণ্ড পর বিদ্যুৎ চমকে উঠতেই ভেজা পায়ের ছাপ ছাড়া কিছুই দেখতে পেল না সে। সার্জারি ওয়ার্ডের দিকে চলে গেছে পায়ের চিহ্ন। ছুটল রানা সেদিকে।
কড়াৎ করে বাজ পড়ল আবার। একটা থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে পড়ল রানা। অর্ধেকটা আকাশ চিরে ঝলসে উঠল বিদ্যুৎ। সেই আলোয় পরিষ্কার দেখতে পেল সে ললিতার বীভৎস মুখটা। ব্যাণ্ডেজ করা বাম হাতটা ঝুলছে গলায় বাঁধা পিং থেকে। সার্জারির কাঁচ ভাঙা জানালা দিয়ে বাইরের দিকে চেয়ে খুঁজছে সে রানাকে।
আস্তে করে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল রানা। পাশের ঘরেই ললিতা। ঘরের মাঝামাঝি আসতেই তীক্ষ্ণ নারীকন্ঠের বিজয় উল্লাসধ্বনি শুনতে পেল রানা। আবছা মত কি যেন ছুটে আসছে ওর দিকে। মাথা নিচু করতেই ঝনঝন করে একরাশ ছুরি কাঁচি লাগল গিয়ে পিছনের দেয়ালে।
একলাফে আলমারির আড়ালে সরে গেল রানা, সেঁটে গেল দেয়ালের সঙ্গে। ওপাশের জানালার কাছে সরে এসেছে ললিতা। বিদ্যুতের আলোয় পরিষ্কার দেখতে পেল রানা ওকে। ললিতাও দেখল রানাকে।
একটা গুলি এসে বিঁধল আলমারিতে রানার মাথার কয়েক ইঞ্চি ওপরে। লাফ দিয়ে সরে গেল রানা। একটা বেড প্যান ঠেকল পায়ে, নিচু হয়ে তুলেই ছুঁড়ে মারল সেটা জানালার দিকে।
ততক্ষণে সরে গেছে ললিতা জানালা থেকে। এবার রানা যে দরজা দিয়ে ঢুকেছে সেই দরজা দিয়ে একটা হাত এগিয়ে এল কয়েক ইঞ্চি, দেয়ালের সাথে সেঁটে থেকেই সরে গেল রানা অল্প কিছুদূর।
‘টাশশ!’
সাথে সাথেই ছুঁড়ল রানা চেয়ারের পায়া। খটাং করে লাগল গিয়ে পায়াটা পিস্তলের গায়ে। ছুটে চলে গেল সেটা ললিতার হাত থেকে খসে শান বাঁধানো মেঝের ওপর দিয়ে গড়িয়ে।
লাফিয়ে চলে এল রানা দরজার কাছে। রানা ভেবেছিল পিস্তলটা উদ্ধার করবার চেষ্টা করবে ললিতা, কিন্তু তা না করে এক লাফে নেমে গেল সার্জারির বারান্দা থেকে, প্রাণপণে ছুটছে সে মাঠের মধ্যে দিয়ে। দৌড় দিল রানা পিছন পিছন।
অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ব্লকের দিকে চলেছে ললিতা। হাওয়া আর বৃষ্টির বেগে কিছু দেখতে তো পাচ্ছেই না, শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে রানার। হঠাৎ একটা পাথরে পা বেধে পড়ে গেল। কপালটা ঠুকে গেল আরেকটা পাথরে। মাথাটা এদিক-ওদিক ঝাঁকিয়ে উঠে বসল রানী। ঠিক সেই সময়ই চোখে পড়ল ধ্বংসস্তূপের মধ্যে থেকে একটা দশ ইঞ্চি ইঁট তুলেছে ললিতা ওর মাথা লক্ষ্য করে। রক্ত বরফ করা একটা অমানুষিক চিৎকার দিয়ে ছুঁড়ল সে ইঁটটা। চট করে সরেই ডাইভ দিল রানা ললিতার দিকে। মাথাটা গিয়ে লাগল ললিতার পেটে। হুড়মুড় করে পড়ল দু’জন মাটিতে। গড়িয়ে চলে এল বৃষ্টির পানি জমা একটা অপেক্ষাকৃত নিচু গতমত জায়গায়। আ র্য হয়ে গৈল রানা ললিতার শক্তি দেখে। কিছুতেই ধরে রাখতে পারছে না সে তাকে। ভিজে, কাদা মেখে পিচ্ছিল হয়ে গেছে ললিতার দেহ সিঙি মাছের মত। নিচে পড়েছিল ললিতা। দাঁত বসিয়ে দিল সে রানার বুকে। ধরে রাখতে পারল না রানা, পিছলে সরে গিয়ে আছড়ে-পাছড়ে উঠে গেল সে গর্ত থেকে। রানাও ছুটল পিছন পিছন, কিন্তু পা পিছলে পড়ে গেল আবার।
দ্বীপের একটা ফাটল বরাবর একটা পোড়া বাড়ির দিকে দৌড়ে চলে গেল ললিতা। রানাও গেল পিছন পিছন, কিন্তু বাড়ির মধ্যে দেখতে পেল না কাউকে। অন্য কোথাও চলে গেছে ললিতা।
ইমার্জেন্সী জেনারেটারটা চালু করা যায় কিনা চেষ্টা করে দেখবে ভাবল রানা। আলো হলে খুঁজে বের করা যেতে পারে ওকে। কিন্তু ঘরের ভেতর ঢুকেই টের পেল রানা চালু আছে জেনারেটার। অন্য কোথাও থেকে সার্কিটটা নষ্ট করেছে ললিতা। এই অন্ধকারে সেটা খুঁজে বের করা অসম্ভব।
জেনারেটার ঘর থেকে বেরোতে গিয়েই থমকে দাঁড়াল রানা। তিনজন লোক দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে। পাগল। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভূতের মত দাঁড়িয়ে আছে ওরা রানার পথ বন্ধ করে, আর সামনে পিছনে দুলছে।
একটু হকচকিয়ে গেল রানা, কি করবে ঠিক করে উঠতে পারল না। আক্রমন্ত্রক মেজাজে নেই ওরা এখন, কিন্তু জোর খাটাতে গেলেই খেপে উঠতে পারে। ধীরে ধীরে পিছিয়ে এল সে, তারপর ভেজা পুলওভারটা গা থেকে খুলে ফেলল। চেয়ে দেখল, নিজেদের মধ্যে কি কথা বলছে ওরা বিড় বিড় করে। জেনারেটার টারমিনালের ওপর ফেলল রানা ভেজা পুলওভার। ছ্যাঁৎ করে শব্দ হলো একটা, স্পার্ক হলো কয়েকটা, সেই সঙ্গে ধোঁয়ার সাথে একটা পোড়া-গন্ধ ছুটল। ভয়ানক চিৎকার করে সাথে সাথেই লাফিয়ে সরে গেল পাগলগুলো- তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রাণপণে ছুটল উল্টো দিকে।
বেরিয়ে এল রানা। কোথায় গেল ললিতা? ভয় পেয়ে পালাল, না অন্য কোনও মতলব আঁটছে সে? আচ্ছা, কিসে করে এসেছে ললিতা? লঞ্চে? আবার লঞ্চে করে পালাবার চেষ্টা করছে না তো সে? ছুটল রানা জেটির দিকে।
গেটের কাছে আরেকটা সেন্ট্রির মৃতদেহ দেখল রানা। ল্যাবরেটরি এরিয়া থেকে বেরিয়ে দৌড় দিল সে। কিছুতেই ওকে পালাতে দেয়া চলবে না।
বিদ্যুৎ চমকে উঠতেই দেখতে পেল রানা লঞ্চ। জেটিতে লেকের পারে প্রকাণ্ড ফুয়েল ট্যাঙ্কের একটা পায়ের সাথে বাঁধা আছে সেটা। চারফুট উঁচু ঢেউয়ের মাথায় নাচানাচি করছে কাগজের নৌকোর মত।
হঠাৎ কাছেই একটা ধস্তাধস্তির শব্দে একটা থামের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল রানা। আবার একবার গোটা আকাশ চিরে দিয়ে ত্রিশূলের মত বিদ্যুৎ বয়ে গেল এপাশ থেকে ওপাশে। সেই আলোয় দেখল রানা প্রকাণ্ড চেহারার একজন দাড়িওয়ালা উলঙ্গ লোক পেটের উপর চেপে বসে দুই হাতে টিপে ধরেছে ললিতার গলা। বদ্ধ পাগল একজন। হঠাৎ আক্রমণ করে অর্ধনগ্ন করে ফেলেছে ললিতাকে। শাড়ি ব্লাউজের কিছু কিছু অংশ চোখে পড়ল রানার। ছটফট করছে ললিতা চিৎ হয়ে মাটিতে পড়ে।
ছুটে গিয়ে ধাঁই করে এক লাথি মারল রানা পাগলটার পাঁজরের ওপর। কোঁক করে শব্দ বেরোল ওর মুখ থেকে, কিন্তু নড়ল না। আবার মারল রানা। এইবার ললিতাকে ছেড়ে উঠে দাঁড়াল পাগলটা। একহাতে ধরে ফেলল রানাকে। পাগলের গায়ে অসম্ভব শক্তি, জানে রানা, কিন্তু কতখানি জানা ছিল না ওর।
হাঁটু দিয়ে মারল রানা ওর তলপেটে। ঘোঁৎ করে শব্দ করল কিন্তু হাত আলগা করল না সে। এক হ্যাঁচকা টানে মাটিতে ফেলে দিল রানাকে। মাটিতে পড়েই পা চালাল রানা। পাগলটাও পড়ল ওর পাশে, পড়েই টিপে ধরল রানার গলা। প্রথমে একহাতে, তারপর বুকের উপর উঠে বসে দুই হাতে। বাইরের দিক থেকে লোকটার দুই কনুই ধরে জোরে চাপ দিল রানা। ‘আউ…শ’ বলে ছেড়ে দিল সে রানার গলা। এবার হাত মুঠো করে মাঝের আঙুলটা আধ ইঞ্চি সামনে বাড়িয়ে রেখে মারল রানা লোকটার থুতনির নিচের নার্ভ সেন্টারে। পাগলরা ব্যথা কম পায়, কিন্তু এই আঘাত সহ্য করা মুশকিল। ভয় পেল এবার লোকটা, উঠে দাঁড়াল রানাকে ছেড়ে। শুয়ে শুয়েই লাথি চালাল রানা ওর ঊরুর পিছনের নার্ভ সেন্টারে। রানা উঠে বসবার আগেই ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড় দিল লোকটা ঝড়-বৃষ্টি তুচ্ছ করে।
কোথায় ললিতা? আবছা মত দেখতে পৈল লোহার মই বেয়ে ট্যাঙ্কের ওপর উঠে যাচ্ছে ললিতা। প্রকাণ্ড একটা নিশাচর বাদুড়ের মত লাগছে ওকে দেখতে। মই বেয়ে উঠতে আরম্ভ করল রানা। চল্লিশ ফুট উঠবার আগেই দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল ললিতা। একটা গোল প্ল্যাটফরম আছে প্ৰকাণ্ড ফুয়েল ট্যাঙ্কটাকে ঘিরে। সাবধানে এগোল সে
একটা বাঁক ঘুরতেই দেখতে পেল রানা লেকের দিকে মুখ করে চুপচাপ রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে ললিতা বটব্যাল। বিদ্যুৎ চমকে উঠল ওর বীভৎস মুখ দেখে। করুণা হলো রানার। সত্যিই অপূর্ব সুন্দরী ছিল সে এক সময়। উদ্দাম হাওয়ায় ভেজা চুলগুলো উড়ছে ললিতার। সাবধানে এগোল রানা, আঘাত না করে কোনমতে বন্দী করতে চায় সে ওকে।
রানা কাছে আসতেই ঝট করে ফিরল ললিতা রানার দিকে।
‘ভেবেছ ধরে ফেলেছ আমাকে, না?’ হাসল ললিতা। ‘তোমাকে এইখানে নিয়ে এসেছি কেন জানো?’ মুখের কাছে ডান হাত নিয়ে কি যেন করছে ললিতা।
বিস্ময়ে বিস্ফারিত হয়ে গেল রানার চোখ। ললিতার হাতে একটা হ্যাণ্ড গ্রেনেড।
এবার খিল খিল করে উন্মাদিনীর মত হেসে উঠল ললিতা। হাসি আর থামতেই চায় না। অনেক কষ্টে সামলে নিয়ে বলল, ‘মরতে আমাকে হতই–নিজের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে গিয়ে দেশের অনেক ক্ষতি করেছি আমি। কিন্তু এইভাবে মরতে বড় আনন্দ হচ্ছে আমার রানা। বিশেষ করে যখন নিজের সাথে তোমাকেও শেষ করে দিয়ে যেতে পারছি, তখন এ আনন্দের তুলনা নেই।’
দাঁত দিয়ে কামড়ে পিন খসিয়ে ফেলল ললিতা। চেপে ধরল গ্রেনেডটা নিজের পেটের ওপর। আঁতকে উঠে পিছিয়ে গেল রানা এক পা। কিন্তু দু’জনের দূরত্ব এতই কম যে নির্ঘাত মৃত্যু ঘটবে ওর বোমাটা ফাটলে দৈবক্রমে সঙ্গে সঙ্গে যদি মৃত্যু না-ও হয়, দুই মিনিটের মধ্যে পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে ওদের দেহ হাজার হাজার গ্যালন তেল ভর্তি ট্যাঙ্কে আগুন ধরে গিয়ে।
চিন্তা করবার সময় নেই। ঝাঁপিয়ে পড়ল রানা নিচে। কতখানি পানি আছে কে জানে! পাথরের ওপর পড়ে মাথাটা চৌচির হয়ে যাবে না তো?
ফাটল হ্যাণ্ড গ্রেনেড। রানা তখন পানির তলায়। ওপরে ভেসে উঠবার আগেই আগুন দেখতে পেল রানা। চারপাশে আলো। মাথা তুলে দেখল দাউ দাউ করে জ্বলছে ফুয়েল ট্যাঙ্ক। কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যেই খসে পড়ল ট্যাঙ্কের এক অংশ। তেল পড়ছে লেকে, দ্রুত এগিয়ে আসছে আগুন রানার দিকে।
উত্তাল ঢেউয়ের সাথে যুদ্ধ করে প্রাণপণে সাঁতার কেটে পালাচ্ছে রানা ওই নরকের আগুন থেকে। হঠাৎ মনে পড়ল লঞ্চটার কথা। এগোবার চেষ্টা করল সে লঞ্চটার দিকে, কিন্তু প্রবল স্রোত টেনে নিয়ে যেতে চাইছে ওকে লেকের মাঝখানে।
গার্ডদের ব্যারাকগুলোতেও ধরে গেছে আগুন। চারদিকে আগুন ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাচ্ছে না রানা। ক্রমে ছড়িয়ে পড়ছে আগুন সমস্ত দ্বীপে। পানির ওপর দিয়ে এগিয়ে আসছে আগুন তা-থৈ তা-থৈ উদ্বাহু নৃত্য করতে করতে। হঠাৎ রানা দেখতে পেল চোখের সামনে চড়াৎ করে দু’ফাঁক হয়ে গেল দ্বীপটা। কাত হয়ে পড়ে গেল ফুয়েল ট্যাঙ্কটা মাটিতে।
হেরে যাচ্ছে রানা ঢেউয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে। ক্রমেই চলে যাচ্ছে সে স্রোতের টানে। হাত দুটো ভারি হয়ে এল, চোখে ঝাপসা দেখছে সে এখন। অনেকদূর সরে এসেছে সে দ্বীপ থেকে। উত্তাল তরঙ্গ, ঝড়বৃষ্টি আর স্রোতের সঙ্গে যুদ্ধ করে দ্বীপে পৌঁছতে পারবে না সে কিছুতেই। আরও একবার দু’বার চেষ্টা করল রানা সামনে এগোবার। তারপর জ্ঞান হারাল কয়েক সেকেণ্ডের জন্যে। ছয় সাত হাত পানির নিচে চলে গিয়েছিল সে, প্রাণপণ চেষ্টায় উঠে এল আবার ওপরে। বাতাসের অভাবে বুকের ছাতি ফাটবার উপক্রম হয়েছে। উপরে উঠেই হাঁ করে শ্বাস নেবার চেষ্টা করল রানা। একরাশ পানি ঢুকল মুখের ভিতর। ফুসফুসে চলে গেল খানিকটা। প্রবল বেগে কেশে উঠল সে। আবার তলিয়ে গেল বড় একটা ঢেউয়ের তলায়। আবার উঠল। আধমাইল সরে এসেছে সে জ্বলন্ত দ্বীপ থেকে।
হঠাৎ বিদ্যুতের আলোয় চোখ পড়ল ওর লঞ্চের ওপর। চমকে উঠল রানা। দশ গজ দূর দিয়ে ভেসে চলে যাচ্ছে লঞ্চটা। রশি পুড়ে যাওয়ায় ছুটে এসেছে সেটা। রূপকথার ফ্লাইং ডাচম্যানের জাহাজের মত জনশূন্য লঞ্চটা ভেসে বেড়াচ্ছে যেন সমুদ্রে। একাকী, নিঃসঙ্গ।
নতুন প্রাণের সঞ্চার হলো রানার মধ্যে আশার আলো দেখতে পেয়ে। ডুব সাঁতার দিয়ে এগোল সে লঞ্চটার দিকে। তিন মিনিট চেষ্টার পর লঞ্চের দড়িটা ধরতে পারল। ওটা ধরে ঝুলে বিশ্রাম নিল আধ মিনিট, তারপর উঠে এল ওপরে।
পনেরো মিনিটের মধ্যে দ্বীপের জেটিতে এসে পৌঁছল লঞ্চ। একটা খুঁটির সঙ্গে লঞ্চের দড়ি শক্ত করে বেঁধে ছুটল সে ওয়ার্ডগুলোর দিকে। গার্ডদের ব্যারাক ভস্ম হয়ে গেছে। অসম্ভব তাপ লাগছে রানার চোখে-মুখে। ছড়িয়ে পড়ছে আগুনটা দ্বীপের চারদিকে। কোনও দিকে ভ্রূক্ষেপ না করে ছুটে চলল রানা। আগুনে একটা সুবিধা হয়েছে, দেখা যাচ্ছে সবকিছু পরিষ্কার। তিন ফুট ফাঁক হয়ে গেছে দ্বীপের ফাটলটা। সেটা টপকে আবার ছুটল সে প্রাণপণে। প্রথম গেটটা পেরোতেই চড়চড় করে আরেকটা ফাটল সৃষ্টি হলো গেটের বাইরে। ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখল রানা সাপের মত এঁকেবেঁকে দ্বীপ জুড়ে সৃষ্টি হচ্ছে আরেকটা মৃত্যু গহ্বর।
দোতলায় উঠেই ধাক্কা দিল রানা দরজায়।
‘দরজা খোলো, শায়লা! আমি রানা।’
রানাকে দেখে ঝাঁপিয়ে পড়ল শায়লা ওর বুকের ওপর।
‘আমি…আমি মনে করেছিলাম খুন করেছে তোমাকে ওই মেয়েলোকটা।’
‘কি হয়েছে রানা? দুলছে কেন দ্বীপটা? আগুন লাগল কি করে? ডক্টর ফৈয়াজ এসে একটা হাত ধরলেন রানার। তিনিও কল্পনা করতে পারেননি আবার দেখতে পাবেন রানাকে।
‘জলদি চলুন। যে-কোন মুহূর্তে তলিয়ে যেতে পারে দ্বীপটা। লঞ্চ আছে জেটিতে। সব কথা পরে শুনবেন। সাদেক খানের অবস্থা কি?’
‘মারা গেছে কিছুক্ষণ আগে।
‘বাঁচা গেল। ওকে নিয়ে মুশকিলই হত। চলো, শায়লা, দৌড়াতে হবে আমাদের।
তিনফুট ফাঁকটা এখন ছয়ফুটে দাঁড়িয়েছে। ভিতরে গভীর অন্ধকার। প্রথমে ডাক্তার ফৈয়াজকে নিয়ে লাফ দিল রানা, তারপর শায়লার ছুঁড়ে দেয়া হুইল চেয়ারটা ধরে নামিয়ে রেখে আবার টপকে এসে শায়লাকে নিয়ে লাফিয়ে পার হয়ে গেল গহ্বরটা।
লঞ্চে উঠেই শায়লা বলল, ‘এবার কোনদিকে?’
দড়ি খুলে দিয়েই এঞ্জিন স্টার্ট দিল রানা। বলল, ‘লেক থেকে একটা সরু নদী বেরিয়ে পড়েছে গিয়ে ভারত সাগরে। ওই পথে চলে যাব আমরা। মোগলতুররা পেরোলেই নরসাপুর। ওখানে অপেক্ষা করছে আমাদের জন্যে একটা সাবমেরিন। এই ঝড়ের রাতে আজ আর হেলিকপ্টারের ভয় নেই।’
হাসল শায়লা। ডক্টর ফৈয়াজকে কেবিনে শুইয়ে দিয়ে ফিরে এসে একটা হাত রাখল সে রানার কাঁধে। গাল ঠেকিয়ে গিজগিজে দাড়ি দিয়ে ঘষে দিল রানা হাতটা।
‘অ্যাই, শয়তান।’ পিছন থেকে রানার মাথাটা জড়িয়ে ধরল শায়লা ওর বুকের মধ্যে। ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে সে রানার চুলে।
দ্বীপটার পুব পাশে পৌঁছতেই অষ্পষ্ট আলোয় একজন মানুষের চেহারা দেখতে পেল রানা। সার্চ লাইট জ্বালতেই কবীর চৌধুরীকে পরিষ্কার দেখতে পেল ওরা। তীরে দাঁড়িয়ে চেয়ে রয়েছে সে ওদের দিকে। লঞ্চটার মুখ ঘুরিয়ে দিল রানা দ্বীপের দিকে।
কিন্তু ঘাট থেকে পঞ্চাশ গজ দূরে থাকতেই প্রচণ্ড একটা শব্দে কানে তালা লেগে গেল রানার। মহাপ্রলয় হচ্ছে যেন ওঙ্কার দ্বীপে। হুড়মুড় করে ধসে যাচ্ছে দ্বীপটা।
কোলায়ের লেকের বুকে প্রকাণ্ড কয়েকটা ঢেউ তুলে তলিয়ে গেল ওঙ্কার দ্বীপ। সেই সঙ্গে তলিয়ে গেল কবীর চৌধুরী। আধঘণ্টা ধরে এদিক ওদিক সার্চ লাইট ফেলে খুঁজল রানা কবীর চৌধুরীকে। পাওয়া গেল না।
সোজা পুব দিকে ছুটল এবার লঞ্চ ওঙ্কার দ্বীপের ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নকে পিছনে ফেলে।
***
