রানা! সাবধান!! – ৬
ছয়
মাথা গুঁজে পড়ে আছে রানা ঘাসের ওপর। ঠিক এই জায়গায় গার্ড থাকতে পারে কল্পনাও করতে পারেনি সে। হাওয়াটা উল্টোদিকে বইছে বলে সিগারেটের গন্ধও আসেনি নাকে। বুকে হেঁটে এগোচ্ছিল রানা অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে- পাঁচ হাতের মধ্যে চলে আসার পর হঠাৎ চোখে পড়েছে ওর সিগারেটের আগুন। জোনাকীর মত জ্বলছে-নিভছে। পাথর হয়ে জমে গেছে সে। তিন মিনিট ধরে মুখ গুঁজে পড়ে আছে সে মাটিতে- দেরি হয়ে যাচ্ছে, অথচ নড়বার নাম নেই গার্ডটার। একমনে সিগারেট ফুঁকছে সে, আর ডাইনে-বাঁয়ে চাইছে, পাছে ডিউটি সার্জেন্টের কাছে ধরা পড়ে যায়। ভাগ্যিস পিছন ফিরে চাইছে না সে!
টর্চ না জ্বালালে অবশ্য অন্ধকারের মধ্যে কালো পোশাক পরা রানাকে দেখতে পাবে না সে পিছন ফিরলেও- কিন্তু সরছে না কেন ব্যাটা। রানার দশ গজ পিছনে দুই নম্বর দেয়াল। দেয়ালের ওপাশে ফ্লাড লাইট জ্বেলে দুর্ভেদ্য করা হয়েছে দুই দেয়ালের মাঝের ফাঁকা জায়গাটা। আর টেলিভিশন ওয়াচ- টাওয়ারের মাথায় বসানো সার্চলাইটটা সতর্ক দৃষ্টি রেখেছে দেয়ালের এপাশটায়। যে-কোন মুহূর্তে আলো এসে পড়তে পারে রানার ওপর। এখন ছুটাছুটি করছে ওটা পাওয়ার হাউসের দিকটায়।
দূরে হুইস্লের শব্দ শোনা গেল। চঞ্চল হয়ে উঠল গার্ডটা। কষে দু’তিনটে সুখ টান দিয়ে ফেলে দিল সিগারেট, খ্যাক্-থু করে থুথু ফেলে আগুনটা মাড়িয়ে চলে গেল সে হুইস্লের শব্দ লক্ষ্য করে। স্টেনগানটা কাঁধে ঝুলছে মাটির দিকে মুখ করে।
আবার এগোল রানা বুকে হেঁটে। তরল পদার্থ ভর্তি একটা ড্রাম ঠেলে নিয়ে চলেছে সে আগে আগে। আর দেরি করা চলে না। তিন মিনিট পিছিয়ে পড়েছে সে নির্ধারিত সময় থেকে। অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিল্ডিং-এর অফিস, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ আর রেডিও রূম বাঁয়ে রেখে এগিয়ে গেল রানা অন্ধকার ছায়ায় ছায়ায়। গন্তব্যস্থলে এসে পৌঁছেচে সে। এই বাড়ির পিছনেই কোথাও আছে সেই ভেন্টিলেটার।
বেশিক্ষণ খুঁজতে হলো না। দেয়ালের গায়ে বসানো আছে আণ্ডারগ্রাউণ্ড কামরার ইনটেক ভেন্টিলেটার গ্রিল। পেয়ে গেল রানা। হুড লাগানো পেন্সিল টর্চ জ্বেলে নম্বর মিলিয়ে দেখল ঠিকই আছে। কোমরে জড়ানো লম্বা রাবার টিউবটা খুলল সে এবার ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে। তারপর টিউবের একমাথা ঢুকিয়ে দিল গ্রিলের ফাঁক দিয়ে- ধীরে ধীরে নামিয়ে দিল সেটা নিচের কামরায়। কয়েক ইঞ্চি বাকি থাকতে ড্রামটা কোলে তুলে নিয়ে ওটার গায়ে বসানো একটা ছোট্ট কলের মুখে লাগাল রাবার টিউবের মুখ। এবার কলটা খুলে দিতেই কলকল করে পাইপ বেয়ে নিচের দিকে রওনা হলো ড্রামের তরল পদার্থ।
দু’মিনিট লাগবে ড্রাম খালি হতে। রানার মনটা ফিরে গেল সেই ছোট্ট ঘরে, যেখানে ডক্টর আবদুল্লাহ্ ফৈয়াজ প্রবেশ করতেই নেমে এসেছিল সমাধির মত নিস্তব্ধতা। শায়লা ঠকিয়েছে ওকে…
বজ্রাহতের মত দাঁড়িয়ে ছিল রানা। সাদেক খানকে নিয়ে যাওয়াই প্রায় অসম্ভব ব্যাপার- তার ওপর একটি নারী এবং একটি পঙ্গ] যদি জোটে তাহলে এক পা-ও এগোতে পারবে না সে। ভয়ানক রাগ হলো ওর শায়লার ওপর। কিন্তু কিছু বলার আগেই কথা বলে উঠলেন ডক্টর ফৈয়াজ।
‘এখানে দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক হচ্ছে না। ক্যাপ্টেন খান্নাকে এইদিকেই আসতে দেখলাম।
স্টেরিলাইজার অফ করে দিল শায়লা। বলল, ‘দুই-একটা জায়গায় সামান্য একটু আঘাত ছাড়া শারীরিক আর কোন ক্ষতি হয়নি মিস্টার মাসুদ রানার। কিন্তু ওঁর রেস্ট দরকার, আব্বাজী। তোমার ট্রিটমেন্ট শুরু হওয়ার আগে ভালমত বিশ্রাম দিতে হবে ওঁকে।
‘কিন্তু এদের যে এদিকে তাড়া খুব, শায়লা,’ বললেন বদ্ধ। ‘এই ভদ্রলোকের অ্যামনেশিয়া দুদিনের মধ্যে দূর করবার হুকুম দেয়া হয়েছে আমাকে। তা ঠিক আছে। ওষুধ খাইয়ে ঘণ্টা কয়েক ঘুম পাড়িয়ে রাখো–আমি না হয় একটু বেশি রাতে আমার ট্রিটমেন্ট শুরু করব।’
‘আপনি আসুন আমার সঙ্গে,’ বলল শায়লা রানার উদ্দেশে।
একটা করিডর ধরে কিছুদূর গিয়ে লিফটের দিকে এগোল শায়লা। দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেল রানা ওর পাশে। বলল, ‘অসম্ভব, শায়লা। ভারতীয় এলাকা থেকে…
চেয়ারটা ঘুরিয়ে লিফটে উঠে পড়লেন ডক্টর ফৈয়াজ। ‘চারতলায় কয়েকটা রোগী দেখতে যাব আমি।’
লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে যেতেই কিছু বলতে যাচ্ছিল রানা, মাথা নেড়ে নিষেধ করল শায়লা। রানা বুঝল লিফটেও মাইক্রোফোন আছে। লিফট থেকে বেরিয়ে চাপা গলায় বললেন বদ্ধ, ‘খাঁচায় পোরা জন্তুর মত আছি আমরা এখানে। সর্বক্ষণ নজর রেখেছে আমাদের ওপর সন্তোষ আর খান্না। এখানে মাইক্রোফোন, ওখানে ক্যামেরা, অসহ্য…’
‘আর দেরি নেই, আব্বাজী। রানা কথা দিয়েছে। আমরা পালিয়ে যাব এখান থেকে।’
‘আমার কথায় বিশেষ ভরসা কোরো না, শায়লা,’ বলল রানা।
‘কিন্তু তুমি কথা দিয়েছ…’
‘দিয়েছি। বলেছি চেষ্টা করব। চেষ্টায় আর সাফল্যে অনেক তফাৎ। তাছাড়া তোমার আব্বার এই অবস্থার কথা আমি জানতাম না।’
একটা ঘরে এসে পৌঁছল ওরা। মাইক্রোফোন নেই এই ঘরে। দরজা বন্ধ করে দিল শায়লা ভেতর থেকে। ডক্টর ফৈয়াজও এসেছেন ঘরের মধ্যে।
‘আমি এই পাগলি মেয়েটাকে অনেক বুঝিয়েছি, মিস্টার রানা,’ বললেন বদ্ধ ধীর কণ্ঠে। ‘আমার এই অবস্থায় আমাকে সাথে নিলে তোমাদের সবাইকে আমি মস্ত বিপদে ফেলব। তারচেয়ে আমাকে রেখে তোমরা চলে যাও…’
‘না। অসম্ভব!’ বাধা দিল শায়লা। দৃঢ় সঙ্কল্প তার কণ্ঠে। ‘তোমাকে ছেড়ে যাব না আমি। পৃথিবীতে তোমাকে ছাড়া আর কি আছে আমার? তোমাকে ছেড়ে যাব- কোথায় যাব?’
‘কিন্তু, শায়লা, ব্যাপারটার সম্ভাব্যতার দিকটাও বিচার করে দেখতে হবে। তুমি বুঝতে পারছ না, কিন্তু আমি পারছি। আমাকে নিয়ে তোমরা মহা সঙ্কটে পড়বে। পদে পদে বাধার সৃষ্টি হবে আমাকে সাথে নিলে।
রানার দিকে ফিরল শায়লা। বলল, ‘রানা। তুমি যদি তোমার কথা না রাখো, তাহলে সাদেক খানের ব্যাপারে কোনও সাহায্য করব না আমি।
‘কিন্তু আমি করব,’ বললেন বদ্ধ।
‘আমি খান্নাকে জানিয়ে দেব সবকিছু!’ জেদ ধরল শায়লা।
‘ছিঃ। এই কথা মুখেও আনতে হয় না, মা। যার কাছ থেকে একবার উপকার পাওয়া যায় তার অমঙ্গলের কথা মুখে আনা তো দূরের কথা, মনে আনাও পাপ!’
চুপচাপ বাপ-বেটির তর্ক শুনছে রানা। দুইজনেরই মনের ভাব উপলব্ধি করতে পারছে সে। যদি এটা কোন বিশেষ অ্যাসাইনমেন্ট না হত, যে কাজে এসেছে সেটা ভণ্ডুল হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা না থাকত,তাহলে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করত না রানা। কিন্তু আর দ্বিধায় সময় নেই। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল সে।
‘ঠিক আছে,’ বলল শায়লা এবার রানার দিকে চেয়ে। ‘তাহলে আমাদের দু’জনকেই রেখে চলে যাও তুমি। মৃত্যুই হোক আমাদের। তবু তোমাকে সাহায্য করব আমরা।’
‘বাজে বোকো না, শায়লা,’ বলল রানা শাসনের ভঙ্গিতে। ‘আমি দুঃখিত, তোমাদের এখানে ফেলে রেখে চলে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তোমাকে কথা দিয়েছি- আমার কথা আমি রক্ষা করব। সবাই মিলে বিপদের মুখে ঝাঁপিয়ে পড়লে ভয় খেয়ে পিছিয়েও যেতে পারে বিপদ।
আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল শায়লার মুখ। খুশি আর রাখতে পারছে না সে ধরে।
‘দেখলে, আব্বাজী? আমি জানতাম! আমি আগেই বলেছিলাম না তোমাকে, বিপদ দেখে পিছিয়ে যাবার মানুষ ও নয়? বলেছিলাম না, রাজি হবে? তুমি মিছেই দ্বিধা-সঙ্কোচ করছিলে।
‘তবে একটা কথা আগেই পরিষ্কার হয়ে যাওয়া দরকার,’ বলল রানা, ‘যে, আমাদের ধরা পড়বার সম্ভাবনা শতকরা নিরানব্বই ভাগ। ইণ্ডিয়ান সিক্রেট সার্ভিসের কাছে আমার সত্যিকার পরিচয় এবং উদ্দেশ্য গোপন নেই। কেন ওরা আমাকে নিরাপদে ক্লিনিক পর্যন্ত পৌঁছবার সুযোগ দিয়েছে তা বলতে পারব না….
‘তোমার স্মৃতি-বিভ্রাট যে ভান, সেকথা জানে ওরা?’ জিজ্ঞেস করলেন বদ্ধ।
‘জানে। সন্তোষের বোকামিতে টের পেয়ে গেছি আমি। হায়দ্রাবাদে হেলিকপ্টারে উঠেই ও প্রকাশ করে দিয়েছে যে ও আমার পরিচয় এবং রোগ সম্বন্ধে ওয়াকেফহাল।
‘কিন্তু তা কি করে হয়? ও তো ক্লিনিক থেকে গিয়েছিল পরশু সকালে। খবর তো পৌঁছেচে গতকাল সন্ধ্যায়,’ বললেন বদ্ধ।
‘তার মানে আগে থেকেই জানত সে আমার কথা। পাইলটের কাছে আমার নাম শুনেই বুঝতে পেরেছে সবকিছু। অর্থাৎ এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কেটে পড়তে হবে আমাদের। সম্ভব হলে আজই রাতে।’
‘ঠিক আছে। আমি এক কাজ করি, খান্না আর সন্তোষকে বলিগু তোমাকে বারো ঘণ্টার জন্যে ঘুমপাড়িয়ে রাখছি আমি, কাল ট্রিটমেন্ট শুরু করা হবে। এর ফলে অনেকটা নিশ্চিন্ত থাকবে ওরা। শায়লাকে বুঝিয়ে দাও কি কি করতে হবে আমাদের। আমি ঘণ্টা খানেকের মধ্যে ফিরে আসবার চেষ্টা করব।’ রানার দিকে কয়েক সেকেণ্ড গভীর দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন ডক্টর ফৈয়াজ, তারপর হুইল চেয়ার ঘুরিয়ে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে।
‘বিছানায় উঠে পড়ো। তোমাকে নজরবন্দী রাখার জন্যে হয়তো অন্য কোন ডাক্তারকেও পাঠাতে পারে সন্তোষ পরীক্ষার ছলে,’ বলল শায়লা।
‘সন্তোষ লোকটা দেখছি মোটেই সন্তোষজনক নয়।’ বিছানায় শুয়ে পড়ল রানা। কম্বল দিয়ে ঢেকে দিল শায়লা ওর গলা পর্যন্ত। ‘উফ! পিঠটা বিছানায় ঠেকিয়ে কী আরাম যে লাগছে! ইচ্ছে করছে একঘুমে চব্বিশ ঘণ্টা পার করে দিই।
‘চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে অনেক ধকল গেছে তোমার উপর দিয়ে। যাক, এবার প্ল্যানটা বলো।
‘প্রথমে আমাদের সাদেক খানকে বের করে আনতে হবে ওয়ার্ড থেকে।’
‘তাতে অসুবিধে হবে না। প্রথম দিকে কড়া পাহারার ব্যবস্থা ছিল। এখন ওর প্রয়োজনীয়তা প্রায় নিঃশেষ হয়েছে বলে গার্ড থাকে না সঙ্গে। আব্বাজীর যখন ইচ্ছে ওকে ল্যাবরেটরিতে আনতে পারেন পরীক্ষার জন্যে।
‘আজ রাতে ওকে আনা সম্ভব হবে?’
একটু চিন্তা করে বলল শায়লা, ‘আনা যাবে। ওর খাবারের সঙ্গে একটু ওষুধ মিশিয়ে দেব যাতে পেট ব্যথা আরম্ভ হয়। ওয়ার্ড সুপারিন্টেণ্ডেণ্ট হয় আব্বাজীকে, নয় আমাকে ডেকে পাঠাবে। আমি ল্যাবরেটরির সার্জারিতে নিয়ে আসতে বলব ওকে। সাথে অবশ্য দু’জন মেল নার্স থাকবে, ওদেরকে ওয়ার্ডে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া যাবে।’
‘বেশ। সার্জারিতে নিয়ে ঘুমের ওষুধ পুশ করে ঘুম পাড়িয়ে রাখবে তুমি ওকে। এবার দ্বিতীয় কাজ হচ্ছে কম্পিউটারটা নষ্ট করে দেয়া। ওটা নষ্ট করে দিয়ে হেলিকপ্টারে করে চলে যাব আমরা নরসাপুর। এখন বলো, কম্পিউটার ধ্বংস করবার কি উপায়।’
‘সেটা অসম্ভব,’ মাথা নাড়ল শায়লা। ‘মাটির তলায় একটা ঘরে রাখা হয়েছে সেটাকে। একটা মাত্র পথ আছে ওই ঘরে ঢুকবার- আর সেখানে চব্বিশ ঘণ্টা পাহারা দিচ্ছে ছয়জন গার্ড। ওখানে যেতে হলে দুটো পাস্ দরকার। তিনটে স্টীলের দরজা পেরিয়ে তারপর সেই ঘর। শেষের দরজাটায় চাবি লাগালেই চালু হয়ে যায় টেলিভিশন ক্যামেরা। কম্পিউটার নষ্ট করবার কোন উপায় নেই।
‘ঘরটা কি রকম?’
‘কংক্রিটের দেয়াল। ফায়ারপ্রুফ। বোমা মারলেও ওর কোন ক্ষতি করা যাবে না।’ শায়লার হাতের ঘড়ির মধ্যে থেকে শব্দ এল পিপ্ পিপ্। উঠে দাঁড়াল সে। ‘আমাকে যেতে হবে এখন।
‘যত শিগগির পারো ফিরে এসো।’
‘আসব। তোমার জন্যে খাবার পাঠিয়ে দিচ্ছি আমি এক্ষুণি গিয়ে।’
‘যাবার আগে কম্পিউটার রূমের একটা মোটামুটি নক্সা এঁকে দিয়ে যাও। ঘরের কোনখানটায় কিভাবে রাখা আছে ওটা দেখতে চাই আমি।
দ্রুত কয়েকটা আঁচড় কেটে এঁকে দিল শায়লা নক্সা। বলল, ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিল্ডিং-এর নিচে এই কম্পিউটার রূম ‘
‘চারকোণা ওই জিনিসটা কি আঁকলে?’
‘ভেন্টিলেশন শ্যাফট্। ওই জায়গা দিয়ে বাইরের খোলা বাতাস টেনে আনা হয় ভিতরে।’
‘বাতাসটা কি ফিলটার্ড হয়ে আসে?’
‘না। এবার উঠতে হবে আমাকে। তুমি খেয়ে নিয়ে শুয়ে থাকো ঘুমের ভান করে।
‘তাড়াতাড়ি এসো। আমাদের হাতে একমাত্র অস্ত্র সময়।
বিশ মিনিট মন দিয়ে দেখল রানা শায়লার আঁকা নক্সাটা। বার কয়েক ভুরু কুঁচকাল, তারপর মৃদু হাসি ফুটে উঠল ওর মুখে। কাগজটা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে বাথরূমে ফেলে চেন টেনে দিল সে। সমাধান হয়ে গেছে সমস্যার।
খাওয়া-দাওয়া সেরে নিল রানা বিছানায় শুয়েই। অর্ডারলি ট্রে-টা নিয়ে বেরিয়ে গেল। ভবিষ্যতের কথা ভেবে সত্যিই ভয় পেল রানা এবার। শায়লাকে এভাবে কথাটা দিয়ে কি ঠিক করল সে? এত বড় দায়িত্ব নিল সে মাথার ওপর, অথচ ক্ষমতা তার কতটুকু? একজন স্ত্রীলোক আর একজন পঙ্গু বদ্ধকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়ার অধিকার সে পেল কোত্থেকে? ওরই ভরসায় এত বড় ঝুঁকি নিচ্ছে ওরা- বাধা দেয়া কি উচিত ছিল না ওর? কিন্তু না নিয়েই বা উপায় কি? ওদেরকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ফেলে রেখে পালাবেই বা সে কি করে? তার চেয়ে চেষ্টা করে যদি সফল না হয় সেটাও বরং ভাল।
আস্তে করে দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলেন ডক্টর ফৈয়াজ। বিছানার পাশে নিয়ে এলেন ওঁর হুইল চেয়ার।
‘পারলে কিছু প্ল্যান বের করতে?’ জিজ্ঞেস করলেন বদ্ধ।
‘আগে আমার কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দিন। কম্পিউটারটা আমরা যদি ধ্বংস করে দিয়ে যাই তাহলে ওরা কি আবার একটা বানাতে পারবে?’
‘মনে হয় না। ক্যালিব্রেশন চার্টে ভুল ফিগার বসিয়ে রেখেছি আমি। আমাকে ছাড়া…’
‘কবীর চৌধুরীকে যেসব চার্ট দিয়েছেন সেগুলো?’
‘সেগুলো ঠিক আছে। কিন্তু সম্পূর্ণ নেই। শেষের অংশটুকু আমার কাছেই আছে।’
‘ওকে ঠিক চার্টটা দিয়েছেন কেন?’ জিজ্ঞেস করল রানা।
‘কারণ ওকে ফাঁকি দেয়া সম্ভব ছিল না। এমন প্রতিভাবান লোক আমি খুব কমই দেখেছি। নিজে সে ফিজিক্সের লোক, অথচ প্রত্যেকটা সাবজেক্টে ওর অপরিসীম জ্ঞান। ওর চোখে ধুলো দেয়া কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। তাছাড়া ও আমাকে বলেছে, এই যন্ত্র তৈরি হলে পর ভারত যেন তার সাহায্যে নিজের হীন মনোবৃত্তি চরিতার্থ করতে না পারে সেদিকে সে নজর রাখবে। কম্পিউটার তৈরি হয়ে গেলে ওটা নষ্ট করে দিয়ে কেবল চার্টগুলো নিয়ে সে চলে যাবে ভারত থেকে। মানুষের বৃহত্তর কল্যাণের কাজে ব্যবহার করবে সে যন্ত্রটা।’
‘ওর কথায় বিশ্বাস করেছেন আপনি?’
‘বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্নই উঠতে পারে না, রানা। ওর কথামত কাজ না করে উপায় ছিল না আমার। অত্যন্ত ক্ষমতাশালী লোক ও এখানকার। কর্নেল বটব্যাল পর্যন্ত ওর ভয়ে থরহরিকম্প। ওর মুখের এক কথায় জেল থেকে ছেড়ে দিয়েছে আমাকে ভারত সরকার। ওরই উদ্ভাবিত পন্থায় রিসার্চ করেছি আমি। ওকে ভুল চার্ট ধরিয়ে দিয়ে গোঁজামিল দেয়া আমার সাধ্যের বাইরে ছিল। কিন্তু চিন্তা কোরো না। শেষের অংশটুকু লুকানো আছে আমার কাছে। আজই যদি পালিয়ে যেতে পারি আমরা, যন্ত্রটা তৈরি করা কারও পক্ষেই সম্ভব হবে না আর।’
‘এই কম্পিউটারটা নষ্ট হয়ে গেলে এবং সাদেক খান বা আপনি হাত ছাড়া হয়ে গেলে আরেকটা মেশিন তৈরি করতে পারবে না ওরা?’
‘না। কিন্তু কম্পিউটার নষ্ট করা সহজ হবে না।
‘আমার মাথায় একটা প্ল্যান এসেছে। আপনাদের ল্যাবরেটরিতে নিশ্চয়ই ডাই-এথিল ইথার আছে?
‘আছে। কিন্তু ওটা দিয়ে কি হবে?’ আশ্চর্য হলেন বদ্ধ।
‘ধরুন, ভেন্টিলেটার গ্রিল দিয়ে যদি ছাড়ি ওটা ঘরের মধ্যে?’
বিস্মিত দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন বদ্ধ রানার মুখের দিকে। তারপর ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল ওঁর নির্যাতিত শীর্ণ মুখে।
‘বুঝেছি! তুমি জানলে কি করে? বাতাসের সঙ্গে মিশলে ভয়ঙ্কর জিনিস হয়ে দাঁড়ায় ডাই-এথিল ইথার। শ্যাফট দিয়ে যদি ঘরের মধ্যে ফেলা যায় তাহলে বাতাসের সঙ্গে মিশে পুরো ঘরটাই একটা ভয়ঙ্কর বোমায় পরিণত হবে। একটু আগুন বা স্ফুলিঙ্গ পেলেই ফাটবে সেই বোমা। ঠিক বলেছ। আমেরিকার একটা ছয়তলা গবেষণাগার এই রকম একটা অ্যাক্সিডেন্টে ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল ফিফটি সিক্সে। কিন্তু ডিটোনেট করবে কি করে, আগুন পাবে কোথায়?’
‘আগুনের ব্যবস্থা আপনাকে করতে হবে। কম্পিউটারটায় কোথাও শর্ট সার্কিট করে দিয়ে স্পার্কের ব্যবস্থা করা যায় না?’
‘আজ রাতেই কি ফাটাতে চাও?’
মাথা ঝাঁকাল রানা। ভুরু কুঁচকে চিন্তা করলেন বদ্ধ কিছুক্ষণ, তারপর বললেন, ‘কঠিন হবে। রাত ন’টার পরই করিডরের মেইন সুইচ-বোর্ড থেকে ওই ঘরের কানেকশন অফ করে দেয়া হয়। তাতে অবশ্য অসুবিধে হবে না। ইমার্জেন্সী জেনারেটার আছে এখানে। যদি কোনও কারণে মেইন সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যায়, সঙ্গে সঙ্গে চালু হয়ে যায় ইমার্জেন্সী জেনারেটার। অটোমেটিক। কয়েকটা জরুরী জায়গায় আপনা-আপনি ইমার্জেন্সী কারেন্ট চালু হয়ে যায়। যেমন ধরো, অপারেশন থিয়েটার, ল্যাবরেটরি, ইলেকট্রনিক্স রূম, দেয়ালের ওপাশের ফ্লাড লাইট এবং ভয়ঙ্কর ওয়ার্ডগুলোতে মেইন জেনারেটার বন্ধ হবার সঙ্গে সঙ্গেই ইমার্জেন্সী জেনারেটার এসে টেক-ওভার করে। কিন্তু অন্যান্য সমস্ত জায়গায় একটা প্লাগ মেইন পয়েন্ট থেকে খুলে ইমার্জেন্সী পয়েন্টে লাগালে পরে সাপ্লাই পেতে পারে। আমি এক কাজ করব। কোন এক ছুতোয় ওই ঘরে ঢুকব আজ। কোন একটা ছোট-খাট সাধারণ ইলেকট্রিক যন্ত্রে শর্ট সার্কিট করে দিয়ে ওটা ইমার্জেন্সী লাইনে প্লাগ লাগিয়ে রেখে আসব। ওরা যখন করিডরের মেইন সুইচটা অফ করে দেবে ইমার্জেন্সী লাইনটা খোলাই থাকবে। তুমি যদি কোন কৌশলে মেইন পাওয়ার লাইনটা ফিউজ করে দিতে পার, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে চালু হয়ে যাবে ইমার্জেন্সী জেনারেটার।’
‘এবং সঙ্গে সঙ্গে ঘরের মধ্যে স্পার্ক হবে। এই তো?’ হেসে ফেলল রানা বদ্ধ বৈজ্ঞানিকের পেটে-পেটে বত্রিশ প্যাঁচ দেখে। ডক্টর ফৈয়াজও হাসলেন তাঁর শিশুসুলভ হাসি। ‘কিন্তু মেইন লাইনটা ফিউজ করতে কি বিশেষ বেগ পেতে হবে?’
‘মোটেও না,’ বললেন বৈজ্ঞানিক। ‘আমি সহজ কৌশল বাতলে দেব। আমাদের এই প্ল্যানের আরও একটা সুবিধা আছে। কম্পিউটার রুমটা ঠিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ব্লকের নিচে। ওটার মধ্যে যদি বোমা ফাটাও, এই দ্বীপের টেলিফোন আর রেডিও লিঙ্ক বিধ্বস্ত হয়ে যাচ্ছে সাথে সাথে।’
চলে গেলেন বদ্ধ বৈজ্ঞানিক। বিছানায় চিৎ হয়ে শবাসনে শুয়ে মন থেকে সমস্ত চিন্তা আর উদ্বেগ দূর করে দিল রানা। সমস্ত দেহ ঢিল করে দিয়ে বিশ্রাম নিল সে দশ মিনিট। তার সমস্ত শক্তি আর বুদ্ধি কাজে লাগবে আজ রাতে- বিশ্রাম দরকার।
ঠিক সাড়ে আটটার সময় এল শায়লা।
‘আমাকে এখুনি যেতে হবে। কয়েকটা খবর দিতে এলাম, আব্বা খান্নাকে বলেছেন তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছেন বারো ঘণ্টার জন্যে।’ রানার মাথার কাছে বিছানার ধারে বসে পড়ল শায়লা। হাত চালিয়ে দিল চুলের মধ্যে।
‘আর সব ব্যবস্থা ঠিক আছে?’ জিজ্ঞেস করল রানা।
‘ভাল খারাপ দুই রকম খবরই আছে। সাদেক খানের ব্যাপারে গোলমাল হবে না কিছু। কবীর চৌধুরীর গাড়িটা যখন খুশি ব্যবহার করবার জন্যে অনুরোধ করে গেছে সে আব্বাজীকে। সবাইকে বলে দিয়ে গেছে যেন কেউ কোনও বাধা সৃষ্টি না করে। গত কয়েকদিন যাবত আমরা প্রায়ই সে গাড়িতে করে সারাদিনের খাটুনির পর হাওয়া খেতে যাচ্ছি।
‘কে চালাচ্ছে?’
‘আমিই। সার্জারির সামনে এনে রেখে দিয়েছি আমি গাড়িটা। ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে সাদেক খানকে কম্বল মুড়ে তুলে দেব গাড়ির পিছনে। গাড়ি নিয়ে আজও যদি হাওয়া খেতে যাই, কারও কোন সন্দেহ করবার কারণ নেই।’
‘গুড। কম্পিউটার রূমের ব্যাপারটা কতদূর?’
‘আব্বাজী এখন কাজ করছেন ওখানে। কপাল ভাল, সন্তোষ মুখার্জী আবার সন্ধ্যার দিকে কি একটা জরুরী ব্যাপারে হায়দ্রাবাদ চলে গেছে।
‘চমৎকার! একমাত্র ওর ভয়ই করছিলাম আমি। তোমার আব্বার সঙ্গে কম্পিউটার রূমে ওই ব্যাটা ঢুকে পড়লে অসুবিধে হত।’
‘আর দুঃসংবাদ হচ্ছে–হেলিকপ্টারে করে গেছে সে। ওটা ব্যবহার করতে পারছি না আমরা।’
একটু দমে গেল রানা কিন্তু সে-ভাবটা প্রকাশ করল না সে। শুধু শুধু মেয়েটাকে ঘাবড়ে দেয়ার কোন মানে হয় না। বলল, ‘ওটা পেলে সুবিধা হত অনেক। কিন্তু কি আর করা। এই দ্বীপ থেকে পালাবার আর কি রাস্তা আছে?
‘লঞ্চ আছে দুটো, আর একটা স্পীড বোট। বড় লঞ্চটায় করে খাবারদাবার, বাজার-মাছ-ডিম ইত্যাদি আসে। ছোট লঞ্চ আর স্পীড বোটে করে পাহারা দেয়া হয় দ্বীপের চারপাশ।’
‘গার্ড আছে?’
‘ঠিক বলতে পারব না। রাতের বেলা ওদিকে যাইনি কখনও।
‘ঠিক আছে। গার্ড যদি থাকে তাহলে তার কপাল খারাপ বলতে হবে,’ বলল রানা। ‘কিন্তু বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত গার্ড ছুটবে ল্যাবরেটরির দিকে। তার আগেই এরিয়া থেকে বেরিয়ে যেতে হবে তোমাদের। নইলে আটকা পড়ে যাবে ওদের মধ্যে। আমি তোমাদের সাথে দেখা করব জেটির কাছে। এখন আমার দরকার কিছু কালো জামা-কাপড়।’
‘ওসব জোগাড় করে রেখেছে আব্বাজী। এমন কি একটা মেল নার্সের সীলমোহর করা আইডেন্টিটি কার্ড পর্যন্ত।’
‘ইথারের ব্যবস্থা হয়েছে?’
‘আমি একটু আগে একটা ড্রাম আর কিছু পাইপ রেখে এসেছি ক্লিনিকের সাত নম্বর ওয়ার্ডের পেছনে একটা ঝোপের মধ্যে। ইথারটা আস্তে আস্তে ছেড়ো যাতে ভেপোরাইজড হতে সময় না নেয়।’
‘দরজার ফাঁক দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে বাইরে বেরোবে না তো? তাহলে গার্ডগুলো…’
‘না। কামরাটা এয়ারটাইট। এবার চলি আমি। ঠিক সাড়ে দশটার সময় বেরোবে তুমি এই ঘর থেকে। প্যাসেজের শেষ মাথায় জানালাটার গরাদ নেই। জানালার পাশেই পানি তুলবার পাইপ পাবে। ওটা বেয়ে অনায়াসে নেমে যেতে পারবে নিচে। সাড়ে দশটা থেকে এগারোটার মধ্যে কোন গার্ড থাকে না ওখানে। খুব সাবধান, রানা! আমাদের কাজগুলো আমরা করছি- কিন্তু সবকিছু নির্ভর করছে এখন তোমার ওপর। চলি। হঠাৎ রানার কপালে চুমো খেলো শায়লা। মাথাটা বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে থাকল কয়েক সেকেণ্ড, তারপর ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। ‘আব্বা কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না আমাদের সঙ্গে যেতে, পাছে আমাদের কাঁধের বোঝা হয়ে দাঁড়ান সেই ভেবে- সেজন্যে তখন তোমাদের সঙ্গে ওই রকম অভিনয় করতে হয়েছিল। রাগ করোনি তো, রানা?’
‘না।’
চলে গেল শায়লা। ঠিক সোয়া-দশটায় প্রেজ্ঞার মত নিঃশব্দে হুইল চেয়ারের চাকা ঘুরিয়ে ঘরে ঢুকলেন ডক্টর আবদুল্লাহ্ ফৈয়াজ। চোখ বন্ধ করে পড়ে ছিল রানা। হঠাৎ চোখ খুলতেই দেখল একাগ্র দৃষ্টিতে ওর দিকে চেয়ে বসে আছেন বদ্ধ বৈজ্ঞানিক।
‘সব ঠিক আছে?’ জিজ্ঞেস করল রানা।
‘সাদেক খানকে গাড়িতে তুলে নেয়া হয়েছে।’
‘ও যে খোয়া গেছে সেটা কতক্ষণে বুঝতে পারবে এরা?’
‘বুঝতে পারবে না। নয়টার সময় শিফট্ চেঞ্জ হয় নার্সদের। একজন মহিলা নার্সকে হঠাৎ আক্রমণ করে খুন করায় রাতে ওর ওয়ার্ডে কেউ যায় না। ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয় বলে যাবার দরকারও পড়ে না।
‘কখন রওনা হচ্ছেন আপনারা?’
‘এখান থেকে নিচে নেমেই। ঘণ্টা খানেক কোন খোঁজ পড়বে না আমাদের।’
‘আপনাদের অনুসরণ করবে না তো কেউ?’
‘না। কম্পিউটার রূমের একটা ইলেকট্রিক ড্রিলিং মেশিন শর্ট সার্কিট করে রেখে ইমার্জেন্সী লাইনে প্লাগ লাগিয়ে দিয়ে এসেছি। যেই ইমার্জেন্সী জেনারেটার চালু হবে অমনি স্পার্ক হবে একটা। আর এই জিনিসটা দিয়ে, কাপড়ের ভিতর থেকে একটা পুঁটুলি বের করলেন বদ্ধ, ‘মেইন লাইন ফিউজ করে দিতে পারবে।’
একটা নাইলন কর্ডের রীল। সুতোর একমাথায় তামার একটা রড বাঁধা। পিঠের কাছ থেকে একটা কালো পুলওভার আর গাঢ় ছাই রঙের প্যান্ট বের করে দিলেন বদ্ধ। শীর্ণহাতে রানার হাত ধরে বললেন, ‘খোদা তোমার সহায় হোন।
বেরিয়ে গেলেন ডক্টর ফৈয়াজ।
দশ মিনিটের মধ্যে বিছানা ছেড়ে উঠে তৈরি হয়ে নিল রানা। ঠিক সাড়ে দশটায় দরজা দিয়ে বাইরে মুখ বাড়িয়ে করিডরটা দেখল সে। ফাঁকা। নিঃশব্দ পায়ে চলে এল শেষ মাথার কাছে। নেমে এল পাইপ বেয়ে।
প্রেতাত্মার মত মিশে গেল সে অন্ধকারে।
.
ড্রাম খালি হতেই কলের মুখ থেকে রাবারের পাইপটা খুলে ভেন্টিলেটার গ্রিলের ভিতর ঢুকিয়ে দিল রানা। কোল থেকে নামিয়ে দিল ড্রামটা। এবার পাওয়ার হাউসের দিকে যেতে হবে। আবার বুকে হেঁটে এগোল রানা। দুশো গজ দূরে পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন প্ল্যান্ট। তারের বেড়া দিয়ে ঘেরা। কিন্তু আসলে ওর মধ্যে কোন প্রয়োজন নেই রানার। যতটা সম্ভব দূরে সরে যেতে চায় সে কম্পিউটার রূম থেকে।
সাবধানে এগোল রানা চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি ফেলে। কিন্তু সার্চলাইটের ভয় সর্বক্ষণ রয়েই যাচ্ছে। কোন নির্দিষ্ট গতিতে বা নির্দিষ্ট পথ ধরে ঘুরছে না আলোটা। যে-কোন জায়গায় যে-কোন সময় দপ করে জ্বলে উঠতে পারে সার্চলাইট। এখন এই অবস্থায় ধরা পড়ে গেলে সব শেষ হয়ে যাবে।
পাওয়ার হাউসের দশ গজের মধ্যে চলে এল রানা। হাই টেনশন তারগুলোর নিচে এসে পড়েছে সে। শুয়ে শুয়েই রীল থেকে বেশ খানিকটা সুতো বের করল রানা তামার রডটা হাতে ধরে রেখে। তারপর হাঁটু গেড়ে বসে ছুঁড়ে দিল রীলটা ওপর দিকে। তারগুলোর ওপর দিয়ে গিয়ে মাটিতে পড়ল সেটা। সন্তর্পণে চাইল রানা চারপাশে। হামাগুড়ি দিয়ে হাতড়ে হাতড়ে মাটি থেকে কুড়িয়ে নিল সে রীলটা, তামার রড ওখানেই ফেলে রেখে। হাতে গ্লাভস পরে নিল এবার। সুতো ধরে ধীরে ধীরে টান দিতেই দুলতে দুলতে উঠতে আরম্ভ করল তামার রড ওপর দিকে। আর খানিকটা বাকি আছে তারের কাছে পৌঁছতে।
হঠাৎ একটা প্রচণ্ড গগন-বিদারী চিৎকার শুনে হাত থেকে ছুটে যাচ্ছিল রানার সুতোটা। চেয়ে দেখল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ব্লকের দিক থেকে ছুটে আসছে ওর দিকে দুইজন গার্ড। পরমুহূর্তেই দপ করে জ্বলে উঠল সার্চলাইট। দিনের মত পরিষ্কার আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে গেল জায়গাটা। সুতো ধরে দাঁড়িয়ে আছে রানা। ছুটে আসছে গার্ড দু’জন।
জোরে টান দিল রানা সুতো ধরে। তামার রডটা দুটো তার স্পর্শ করতেই কড়াৎ করে শব্দ হলো একটা, নীলচে-সাদা আলো জ্বলে উঠল তারে। যেমন জ্বলে উঠেছিল তেমনি দপ করে নিভে গেল সার্চলাইট। পরমুহূর্তে স্নানভাবে জ্বলে উঠল আবার ইমার্জেন্সী জেনারেটার চালু হতেই।
কেঁপে উঠল দ্বীপটা। ভূমিকম্প হচ্ছে যেন। চুরমার হয়ে আকাশের দিকে উঠে গেল গোটা অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ব্লক। হুমমুড় করে একটা অংশ পড়ল গার্ড দু’জনের ওপর। মিশে গেল ওরা মাটির সাথে। প্রাণপণে ছুটল রানা মেইন গেটের দিকে। অন্ধকার একটা জায়গায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল পাঁচ মিনিট।
হৈ-চৈ হুলস্থুল পড়ে গেছে চারদিকে। ব্যারাক থেকে ছুটে আসছে একদল সৈন্য। সাইরেন বাজাতে বাজাতে এগিয়ে আসছে ট্রাক, জীপ। দমকলের ঘণ্টাও শুনতে পেল রানা।
মেইন গেটটা হাঁ করে খোলা। অন্ধকারে ভিড়ের হট্টগোলের মধ্যে দিয়ে নিরাপদে বেরিয়ে এল রানা বাইরে। রাস্তার ঠিক মাঝখান দিয়ে দৌড় দিল জেটির দিকে। গাড়িটা দেখতে পেল সে জেটির কাছে। ছুটে এল শায়লা।
‘তোমার কোথাও লাগেনি তো?’
‘না।’
‘জেটিতে স্পীড বোটটা আছে রানা। ওটা স্টার্ট দেয়ার জোগাড় করেছিল ওরা, কিন্তু বিস্ফোরণের শব্দ শুনে দৌড়ে চলে গেছে ল্যাবরেটরির দিকে।’
‘বেশ। সাদেক খানকে এই বোটে তুলে ফেল টেনে-টুনে। আমি আসছি এক্ষুণি।’
‘কোথায় যাচ্ছ?’ জিজ্ঞেস করল শায়লা।
‘ওই যে লঞ্চটা দাঁড়িয়ে আছে ওটাকে খতম করে দেব। তাহলে সঙ্গে সঙ্গে পিছু নিতে পারবে না ওরা।’ কথাটা শেষ হবার আগেই ছুটে চলে গেল রানা।
ডিস্ট্রিবিউটারটা টেনে ছিঁড়ে পানিতে ফেলে দিল সে। তারপর একখানা হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে দুটো বড় গর্ত সৃষ্টি করল পেট্রল ট্যাঙ্কের গায়ে। ফিরে আসবার আগে লঞ্চের ডেকের ওপর থেকে দেয়াল ঘেরা এলাকাটার দিকে একবার চাইল রানা। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে সেখানে।
লাফিয়ে নিচে নামল রানা। দৌড়ে চলে এল স্পীড বোটের কাছে। সাদেক খানকে বোটে ওঠাবার চেষ্টা করছে শায়লা। ডক্টর ফৈয়াজ সাহায্য করবার চেষ্টা করছেন সাধ্যমত। রানা পায়ের দিকটা ধরল। সাদেক খানকে উঠিয়ে ডক্টর ফৈয়াজকে কোলে তুলে নিল রানা, যত্নের সঙ্গে বসিয়ে দিল বোটের মাঝখানে। হুইল চেয়ারটা ভাঁজ করে রানার হাতে দিল শায়লা।
‘একটা জিনিস রয়ে গেছে গাড়িতে,’ ছুটল শায়লা।
‘জলদি এসো,’ বলেই স্টার্টার বাটন টিপে দিল রানা। গর্জন করে উঠল এইটিন হর্স পাওয়ার এভিনরুড এঞ্জিন। অল্পক্ষণেই একটা মেডিকেল কিট আর খাবারের প্যাকেট নিয়ে ফিরে এল শায়লা। ‘গুড, দরকার হতে পারে,’ বলল রানা উৎসাহিত কণ্ঠে।
শায়লা উঠে বসতেই রশি খুলে দিয়ে বোট ছেড়ে দিল রানা। সোজা পশ্চিম দিকে চলল বোট আঁধার কেটে। চুপচাপ কয়েক সেকেণ্ড মুক্তির আনন্দ উপভোগ করল ওরা। হেসে উঠল শায়লা। ‘আম্বালার সেই মড়ার খাটিয়ায় করে পালাবার কথা মনে পড়ছে। কোনদিকে চলেছি আমরা, রানা?’
‘ইলোর। বোটটা পানিতে ডুবিয়ে রেখে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলে যাব ছ’মাইল। ইলোর পৌঁছে কারও গাড়ি চুরি করে যেতে হবে আমাদের রাজামুন্দ্রি। ওখান থেকে জেলে নৌকায় করে মাছ ধরতে ধরতে গোদাবরী নদী বেয়ে চলে যাব নরসাপুর। ভোরের আগে রাজামুন্দ্রিতে পৌঁছতে পারলে হয়তো ওদের চোখে ধুলো দেয়া সম্ভব হতে পারে।
অনেকক্ষণ কাটল চুপচাপ। ছ’মাইল দূরে চলে এসেছে স্পীড বোট দ্বীপ থেকে। ‘আর মাইল খানেক গেলেই পৌঁছে যাবে ঘাটে। হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে যাওয়ায় জিজ্ঞেস করল রানা, ‘দ্বীপের মধ্যে আগুন দেখে কি বাইরে থেকে সাহায্য করতে আসবে লোকজন?’
‘না। নিষিদ্ধ এলাকা ওটা। এমন কি ইলোরের পুলিস পর্যন্ত কাছে এগোবার সাহস পাবে না অনুমতি ছাড়া। রেডিও মারফত আগে অনুমতি নিতে হবে,’ বললেন ডক্টর ফৈয়াজ।
‘রেডিও রূমের যে অবস্থা হয়েছে তাতে সে সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না,’ হাসল রানা। আবিশ্বাস ফিরে আসছে ওর। খুশি হয়ে উঠছে সে নিজের ওপর।
ঠিক এমনি সময় তিনজনই একসাথে চমকে উঠে চাইল ওরা আকাশের দিকে। এঞ্জিনের শব্দ। পুরু মেঘ জমেছে আকাশে। একটা জায়গা শুধু অপেক্ষাকৃত ফর্সা দেখাচ্ছে কৃষ্ণপক্ষের ম্লান চাঁদের আলোয়। ঠিক সেইখানেই দেখা গেল হেলিকপ্টারটা। দ্বীপের দিক থেকে সোজা এগিয়ে আসছে স্পীড বোটের দিকে।
