ডার্টি গেম – ২২
বাইশ
কন্সোলের সামনে বসার মাত্র কয়েক সেকেণ্ড পর কাদের যেন উঠে আসার পদশব্দ শুনতে পেল রানা। ঘাড় কাত করে তাকাল জানালার দিকে। মই বেয়ে ধুপধাপ করে টাওয়ারে উঠে আসছে রিভ সিম্পসন ও তার দলের লোক। এখন আর মই বেয়ে নেমে যেতে পারবে না রানা। কন্সোল থেকে না সরে বলল, ‘ল্যাটিচ্যুড ৭.৫৫৯২৮০, লংগিচ্যুড…’
রানা কথা শেষ করার আগেই দপ করে চলে গেল বিদ্যুৎ। নিভে গেছে ঘরের বাতি ও কন্সোলের আলো।
স্যাটেলাইট ফোন এখন ডেড!
মইয়ের কথা ভুলে অন্য কোন উপায়ে টাওয়ার থেকে নেমে যেতে হবে রানাকে। উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের চারপাশে তাকাল ও। নিজেকে ওর মনে হলো খাঁচায় বন্দি সিংহের মত। রিভ সিম্পসন এবং তার দলের লোক উঠে আসছে বলে মৃদু কাঁপছে টাওয়ার।
একটা জানালা দিয়ে বাইরে উঁকি দিতেই সরাসরি ব্র্যাড স্টিলের সঙ্গে চোখাচোখি হলো রানার।
বিশাল তাঁবুর বাইরে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা, চোখে নির্বিকার দৃষ্টি। কয়েক সেকেণ্ড পরস্পরকে দেখল ওরা, তারপর নিজে থেকেই চোখ সরিয়ে নিল রানা। এখন প্রতিটা সেকেণ্ড ওর জন্যে খুব জরুরি। বেরিয়ে যেতে হবে এই কম্পাউণ্ড থেকে। ছুটে গিয়ে খুলল দরজা। আর তখনই কয়েকটা বুলেটের আঘাতে ঝনঝন করে ভেঙে গেল পাশের কাঁচের জানালা। দশ সেকেণ্ডের মধ্যে প্ল্যাটফর্মে উঠে আসবে সিম্পসন ও তার লোকেরা।
শরীরে গুলি লাগতে পারে জেনেও দরজা খুলে প্ল্যাটফর্মের কোণে ডাইভ দিয়ে পড়ল রানা। ক্রল করে এগিয়ে চলল বাম দিকে। টাওয়ার কমপক্ষে তিনতলা উঁচু। ওপর থেকে নিচে রেযর ওয়াএয়ারের বেড়া দেখতে পেল রানা। একবার ওটা টপকে ঝোপঝাড়ের ভেতরে পড়লে উঠে দাঁড়িয়ে এক দৌড়ে ঢুকে পড়তে পারবে জঙ্গলের ভেতরে।
আবারও এল গুলির আওয়াজ।
ঝনঝন করে ভাঙল রানার পেছনের জানালার কাঁচ।
এখন মাত্র একটা কাজই করতে পারে রানা। আর সেটাই করল-প্ল্যাটফর্মের রেলিঙে উঠে ঝাঁপিয়ে পড়ল নিচে। তার- কাঁটার বেড়া পার হয়ে হুড়মুড় করে নামল ঘন ঝোপের ভেতরে। এ-ধরনের ঝুঁকি নিলে হাড়গোড় ভাঙবে বেশিরভাগ মানুষের, কিন্তু মাটিতে শরীর গড়িয়ে দিয়েছে রানা। হাত-পা ও পাঁজরের ব্যথায় ওর মনে হলো এইমাত্র খুন হয়ে গেছে। ঝোপে ঢুকল একরাশ গুলি। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে জঙ্গলের দিকে ঝেড়ে দৌড় দিল রানা। ওদিকে টাওয়ারের প্ল্যাটফর্মে উঠে এসেছে সিম্পসন ও তার লোকেরা। একের পর এক গুলি করছে রানাকে লক্ষ্য করে।
লোকগুলো মিলিটারি থেকে ট্রেনিং নিলে দশ ফুট যাওয়ার আগেই লাশ হয়ে যেত রানা। অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে ছুটে গিয়ে ঢুকে পড়ল জঙ্গলে। পছন্দ করুক বা না করুক, আবারও ওকে অংশ নিতে হবে ডার্টি গেমের নোংরা খেলায়।
.
বিধ্বস্ত বি-২৫ বিমানের ফিউজেলাজের ভেতরে গা ঘেঁষে বসে আছে জনি এস. ক্লার্ক ও রোযি ইয়াসিমান। সামনে জ্বলছে ছোট্ট আগুন। কমলা শিখার ওপরে জনি ঝলসে নিচ্ছে মৃত একটি পাখি। ইয়াসিমান যে চোখা ডাল দিয়ে ওকে খুন করতে চেয়েছিল, ওটা দিয়েই পাখিটাকে পিটিয়ে মেরেছে ক্লার্ক।
আগুনের ওপর থেকে ঝলসানো পাখি সরিয়ে এক কামড়ে খানিকটা মাংস খেল সে, তারপর বাকি অংশ তুলে দিল সুন্দরী মেয়েটার হাতে। সামান্য মাংস খেয়ে খিদে মেটেনি তার। মন অন্যদিকে সরানোর জন্যে বলল, ‘তোমার মত এত সুন্দরী এক মেয়ে এখানে কেন?’
‘তার বহু কারণ আছে।’ পোড়া পাখির মাংসে কামড় দিল রোযি। এ-বিষয়ে আর কিছু বলতে আগ্রহী নয়।
নিজেও চুপ করে থাকল ক্লার্ক। বলার তো আসলে কিছু নেই। পর পর দু’বার মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে ওকে। আর এবার মৃত্যু থেকে রেহাই পেতে হলে খুন করতে হবে অন্যদেরকে। আর সেটা করা এই দ্বীপে সহজ কাজ নয়। ওদের দু’জনের ব্রেসলেটের ঘড়িতে এখন বাজে রাত ০৮:০৩:০৪।
অর্থাৎ, আর মাত্র আট ঘণ্টা তিন মিনিট পর বোমার বিস্ফোরণে মরবে ওরা। মনে মনে নিজের ভাগ্যটাকে অকথ্য গালি দিচ্ছে ক্লার্ক। মুখেও সেটা উচ্চারণ করত, কিন্তু করছে না কারণ সেক্ষেত্রে ওকে হয়তো কাপুরুষ বলে ভাববে সুন্দরী মেয়েটা। সেটা তো আর হতে দেয়া যায় না।
মুখ তুলে রোযিকে দেখল ক্লার্ক। আগুনের আলোয় খুব রূপসী লাগছে মেয়েটাকে। কতই বা হবে ওর বয়স? বড়জোর পঁচিশ? কী অপূর্ব সুন্দরী, অথচ যে-কোন সময় মরবে বেচারি।
‘এটা বোধহয় জানো, যে-কোন সময়ে খুন হবে তুমি, ‘ বলল ক্লার্ক।
‘হয়তো মরতে হবে না,’ আশা ভরা গলায় বলল রোযি।
ওর সাহস দেখে বিস্মিত হয়েছে ক্লার্ক। নিজে সে বাঁচার কোন উপায় দেখছে না। সেটাই বলল, ‘বারবার ফিরেছি মৃত্যুর কবল থেকে। সবসময় ওটা ছিল খুব কাছে।’
নিজের গোড়ালির ব্রেসলেট দেখল ক্লার্ক। ‘কিন্তু এবার হয়তো আর বাঁচব না। এই বোমা শেষ করে দেবে আমাকে।
‘আমি মরার আগেও লড়তে চাই,’ বলল ইয়াসিমান।
তিক্ত হাসল ক্লার্ক। আসলে বাঁচার উপায় নেই মেয়েটার। নিজে খুব সহজে সুন্দরীকে লড়াইয়ে হারিয়ে দিয়েছে ও। দ্বীপে আছে ওর চেয়ে অনেক শক্তিশালী সব প্রতিযোগী। তারা চাইলে মাত্র একমিনিটে খতম করে দিতে পারবে রোষিকে। তার আগে হয়তো চাইবে ওকে ভোগ করতে।
না, কোনভাবে বাঁচবে না রোযি ইয়াসিমান।
‘আমাদের ভাগ্য আসলে খারাপ,’ বলল ক্লার্ক। ‘এমন নয় যে ঘুম ভেঙে দেখব সবই আসলে স্বপ্ন।’ গত চব্বিশ ঘণ্টায় অনেক বেড়ে গেছে ঘাড়ের ব্যথা। ঘাড় টিপতে লাগল সে।
‘তুমি ঠিক আছে তো?’ মিষ্টি সুরে জানতে চাইল রোযি।
‘হেলিকপ্টার থেকে ফেলে দেয়ার আগে ঘাড়ে ব্যথা পেয়েছি। রোযি, আমাদের বোধহয় উচিত নিজেদের ভেতরে প্রতিযোগিতা না করা। আমরা একসঙ্গে হামলা করতে পারি অন্যদের ওপরে। তাতে সম্ভাবনা বাড়বে আমাদের বাঁচার। শেষমেশ হয়তো খতম করে দিতে পারব ব্র্যাড স্টিলকে। সুযোগ পেলে চলে যাব দ্বীপ ছেড়ে। ….তুমি কী বলো?’
ক্লার্কের গা ঘেঁষে বসল রোযি। নরম হাতে টিপতে শুরু করেছে সঙ্গীর ঘাড়। ‘টিপে দিলে ব্যথা কি কমছে?’
চোখ বুজল ক্লার্ক। ব্যথার জায়গা ম্যাসাজ করা হচ্ছে বলে খুব আরাম লাগছে। একটু পর নিচু গলায় বলল, ‘আমার মনে হচ্ছে জীবনে আর কখনও এত ভাল ছিলাম না।’
সামনে ঝুঁকে নিচু গলায় মধু ঝরাল রোযি, ‘ব্যথা তা হলে কমছে তো?’
‘হ্যাঁ, কমছে,’ চোখ বুজে হাসল ক্লার্ক। ‘আমি বোধহয় তোমার প্রেমে পড়ে যাচ্ছি!’
সঙ্গীর পিঠ বেয়ে কোমরে নেমে এল রোযির নরম হাত। টিপে দিচ্ছে আড়ষ্ট সব পেশি। ক্লার্ক এখন কী ভাবছে, সেটা বুঝে গেছে মেয়েটা। পুরুষগুলো সবসময় একই কথা ভাবে। অবশ্য ক্লার্ক বোধহয় শুধু সেক্স নিয়ে ভাবছে না।
‘তুমি তো বলেছিলে শেষ যে মেয়েটাকে বিশ্বাস করেছিলে, তার জন্যে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল তোমাকে। আসলে কী ঘটেছিল?’
চোখের পাতা সামান্য খুলল ক্লার্ক। বোকা নয় সে। নিশ্চিত হয়ে নিল, রোযি ইয়াসিমানের আশপাশে কোন ধরনের অস্ত্র আছে কি না। যদিও ক’বার আক্রমণের সুযোগ পেয়েও হামলা করেনি মেয়েটা। বোধহয় বুঝে গেছে, একই ডুবন্ত নৌকায় বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে ওরা দু’জন।
‘আমি বাস করতাম লস এঞ্জেলেসে। আগে কখনও জায়গাটার নাম শুনেছ?’
মাথা দোলাল রোযি। ‘শুনেছি।’ ক্লার্কের শার্টের ভেতরে ঢুকে গেছে ওর হাত। কোমর আর বুকে মালিশ করছে। তাতে খুব আরাম লাগছে ক্লার্কের।
‘থাকতাম হলিউডের খুব কাছে,’ ম্যাসাজ করে দেয়ায় শিথিল হচ্ছে ক্লার্কের দেহের পেশি। ‘ওদিকের এলাকায় আমরা ছিলাম মাত্র তিনজন ড্রাগ ডিলার। প্রচুর ব্যবসা ছিল। টাকার কোন অভাব নেই। সেসময়ে পরিচয় হলো এক মেয়ের সঙ্গে। মাত্র কয়েক দিনে প্রেমে পড়ে গেলাম আমরা। পরস্পরকে নিয়ে আমরা ছিলাম খুব সন্তুষ্ট। তারপর এক রাতে হঠাৎ কাঁদতে কাঁদতে এল সে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে নাক-মুখ। ফুলে গেছে গাল ও কপাল। আমাকে বলল, আমার প্রতিযোগী ড্রাগ ডিলার বুন্স বায়িন্স ওকে ধরে নিয়ে গিয়ে খুব মেরেছে। তাতে রাগে প্রায় পাগল হয়ে গেলাম। দুটো পিস্তল হাতে নিয়ে চলে গেলাম হারামজাদাকে খুন করব বলে। আর তারপর…’
রাগে আড়ষ্ট হয়ে গেছে ক্লার্কের ঘাড়। নতুন করে ম্যাসাজ করতে লাগল রোযি ইয়াসিমান।
‘কিন্তু আসলে আমাকে ফাঁদে ফেলেছিল ওরা। মেয়েটা ছিল অন্য আরেক ড্রাগ ডিলার ডিন রলিন্সের খাস প্রেমিকা। আমি তো মাথাগরম করে খুন করে ফেললাম বায়িন্সকে। আর তাতে আমাকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেল পুলিশের লোক। আর এই সুযোগে বায়িন্স আর আমার এলাকা হাসতে হাসতে দখল করে নিল ডিন রলিন্স। যাই হোক, জেল থেকে পালিয়ে গেলাম মালোয়েশিয়ায়। কিন্তু তারপর ওখানে আবার বেইমানি করল ভয়ঙ্কর শয়তান একটা কুত্তী। আসলে, বুঝলে, আমার জীবনটাই বিশ্বাসঘাতকতার বিশাল এক করুণ কাহিনী।’ চোখ মেলে আগুনের আলোয় ফিউজেলাজে একটা লেন্স দেখতে পেল ক্লার্ক। জং ধরা সার্ডিনের একটা কৌটা তুলে নিয়ে ওটা লক্ষ্য করে ছুঁড়ল সে। ঠনাৎ করে লাগতেই ভেঙে গেল লেন্সের কাঁচ।
.
ক্লার্ক আর ইয়াসিমানের অন্তরঙ্গ দৃশ্য একটা স্ক্রিন থেকে মুছে যেতেই ওদিকে তাকাল সিওয়ার্স ও এমিলি। স্ক্রিনে এখন দেখা যাচ্ছে একরাশ সাদা ঝিরঝিরে পোকার মত কিছু। এদিকে মাসুদ রানা গ্রামে ঢুকতেই বিশাল তাঁবু থেকে বেরিয়ে গেছে স্টিল ও সিলভি। তার আগে কন্সোলের দায়িত্ব দিয়েছে মিলার কাছে।
‘মিলা, অন্য ক্যামেরা চালু করো,’ তাড়া দিল সিওয়ার্স। ‘তোমার কি কানে কিছু ঢুকছে না?’,
গরম চোখে সিওয়ার্সকে দেখে নিয়ে ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল বদলে নিল মিলা। এবারের লেন্স ক্লার্ক ও ইয়াসিমানের ওপরে চোখ রেখেছে ফিউজেলাজের ছাত থেকে। বসের ধমকের ভয়ে বাধ্য হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জেগে মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে ওদের। তার ওপরে গ্রামে এসে ঢুকেছে অপরাধীদের একজন। যেটা ওদের মনের ওপরে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। স্ক্রিনে ওরা দেখতে পেল ক্লার্কের পাশে বসে একহাতে তার ঘাড় টিপে দিচ্ছে রোযি।
‘মনে তো হয় একটু পর কাপড় খুলে সেক্স করবে ওরা,’ দাঁত বের করে হাসল সিওয়ার্স।
‘পাঁচ শ’ ডলার বাজি ধরব, ওটা করবে না এরা,’ বলল এমিলি। ‘লোকটাকে ফাঁদে ফেলেছে মেয়েটা।’
বাজি ধরে হাত মেলাল সিওয়ার্স ও এমিলি।
আবার মনোযোগ দিল স্ক্রিনে।
.
‘তুমি বরং শুয়ে একটু বিশ্রাম নাও, আমি ধীরে ধীরে ম্যাসাজ করে দিই,’ মিষ্টি কণ্ঠে বলল ইয়াসিমান। টান দিয়ে ওপরে তুলে দিল ক্লার্কের প্যান্টে গোঁজা শার্ট। ওরা জানে না, ওদের ওপরে চোখ রেখেছে আরেকটা নাইট-ভিশন লেন্স।
নিজেকে দুনিয়ার রাজা বলে মনে হচ্ছে ক্লার্কের। বুঝে গেছে, মেয়েটা আসলে চাইছে ওকে যেন আদর করে ও। এদিকে জেলের ভেতরে বছরের পর বছর মেয়েদের সঙ্গে যৌন-মিলনের সুযোগ হয়নি। এখন দারুণ হবে দেবীর মত সুন্দরী মেয়েটা ওকে সুযোগ করে দিলে। মৃত্যুর আগে এমন সুযোগ ক’জন কয়েদী তাদের জীবনে পায়!
দেরি না করে বিমানের মেঝেতে শুয়ে পড়ল ক্লার্ক। পাশে বসে তার বুকের ঘন কালো রোমে হাত বোলাতে লাগল রোযি। হাসিমুখে সহানুভূতির সুরে বলল, ‘তুমি মেয়েদেরকে একদম বিশ্বাস করো না। তবে সেজন্যে তোমাকে কোন দোষ দেব না।’
সুবোধ বালকের মত নীরবে মাথা দোলাল ক্লার্ক। মনে পড়ে গেছে তিক্ত সব অতীত। অবশ্য একটু পর বোধহয় আসবে দারুণ এক ফূর্তির সময়!
‘আমাকে ট্র্যান্সফার করতে চাইল ফোলসম জেলে। কিন্তু পালিয়ে গিয়ে ঢুকলাম মেক্সিকোতে। ওখান থেকে গেলাম মালোয়েশিয়ায়। ওখানে যখন পৌছুলাম, আমার হাতে এক পয়সাও নেই। তবে কিছু দিনের ভেতরে সুযোগ চলে এল গাঁজা বিক্রি করে বড়লোক হওয়ার।’
ক্লার্ক বলল না, এক মালোয়েশিয়ান ড্রাগ ডিলারকে পথে বসিয়ে দিয়ে নিজেই দখল করে নিয়েছিল তার এলাকা।
‘কিছু দিনের ভেতরে যেতে লাগলাম স্থানীয় মেয়েদের সঙ্গে বিছানায়। ওদের ভেতরে একজন ছিল বেশ সুন্দরী। মিষ্টি করে হাসিমুখে কথা বলত। আর জানত কীভাবে করতে হয় দুর্দান্ত সেক্স। বলতে পারো আমি ছিলাম স্বর্গে। টাকার অভাব নেই। কোন বিপদ হচ্ছে না। পছন্দমত মেয়ে পেয়ে গেছি। জীবনে আর কী চাই!’
অতীত স্মৃতি হাতড়াতে গিয়ে উদাস হয়ে গেছে ক্লার্ক। টের পাচ্ছে ওর উরু মালিশ করে দিচ্ছে রোযি। আহ্, একেই তো বলে জীবনের সত্যিকারের আনন্দ! এই সুন্দরীর উচিত ম্যাসাজ পার্লার খুলে নামকরা হয়ে ওঠা। চোখ বুজে নিজের জীবনের কাহিনী বলতে লাগল ক্লার্ক: ‘কিন্তু মেয়েটা আসলে ছিল মালোয়েশিয়ান পুলিশের চর। একদিন নিজের আস্তানায় আরাম করে শুয়ে আছি ভোরে, এমন সময় এল একদল পুলিশ অফিসার। আমার বিছানার নিচে পেয়ে গেল দশ কেজি গাঁজা। আর এর মানে বুঝতে পারো? মালোয়েশিয়ায় যে-কোন ড্রাগ কারও কাছে পাওয়া গেলে তাকে দেরি না করে দেয়া হয় মৃত্যুদণ্ড! আবারও গেলাম জেলে। আমাকে দেয়া হলো মরণের সাজা। তবে আমিও থাকলাম তক্কে তক্কে। ভাবলাম, জেলের দু’জন পুলিশ অফিসারকে পিটিয়ে অজ্ঞান করে পালিয়ে যাব। তবে এর আগেই আমাকে বিক্রি করে দিল তারা। বুঝতে পারছ কত কষ্ট পেয়েছি আমার নরম এই মনে?’
চুপ করে থাকল রোযি ইয়াসিমান।
পরক্ষণে একটু জোরে একটা ‘বিপ’ শব্দ শুনতে পেল ক্লার্ক। চোখ মেলে চট্ করে দেখল, উঠে দাঁড়িয়ে কয়েক লাফে বিমানের দরজার কাছে চলে গেছে রোযি। পরক্ষণে তীর বেগে বেরোল রাতের আঁধারে!
গোড়ালির ব্রেসলেটের ওপরে চোখ পড়ল ক্লার্কের। ডিভাইসের ভেতরে দপদপ করে জ্বলছে লাল বাতি। খুব দ্রুত কমে যাচ্ছে ওর টাইমারের সংখ্যা!
এখন আর পাঁচ সেকেণ্ড নেই ওর মরে যাওয়ার!
‘তোর মায়েরে দশবার চুদি, হারামজাদী কুত্তী মাগী!’ গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল ক্লার্ক। ‘শালার কপাল, এই খানকি মাগীও আমাকে একেবারে ঠকিয়ে দিয়েছে!’
ষাঁড়ের মত মোটা গলায় চিৎকার জুড়েছে ক্লার্ক। ওদিকে হরিণীর বেগে বিমান থেকে দূরে সরে যাচ্ছে রোযি।
‘আমাকে খুন করে ফেলেছে, শালীর মাগী! হারামজাদী, তোর মায়েরে আমার….’
বিকট শব্দে বোমা ফাটতেই চারদিকে ছিটকে গেল ভাঙা ফিউজেলাজ। আকাশে উঠেছে আগুনের কমলা শিখা।
.
কয়েক মাইল দূর থেকে বিস্ফোরণের আওয়াজ শুনতে পেল সিলভারম্যান। গার্ডেরা তাড়া করে মাসুদ রানাকে গ্রাম থেকে ভাগিয়ে দেয়ার পর পেটে কিছু দিতে খাবারের তাঁবুতে ঢুকেছে সে। প্রথম লোকটা মারা যাওয়ার পর থেকে খাওয়ার রুচি নষ্ট হয়ে গেছে তার। কিন্তু খালি পেটে ওষুধ খেলে স্টমাক ওয়াল পুড়ে যাবে বলে মুখে কিছু দিতে হবে। টেবিলে নানান প্লেটে স্তূপ করে রাখা হয়েছে গলদা চিংড়ির কাটলেট, গরুর মাংসের স্টেক, পাস্তা, নুডল্স, চাইনিয ডিশ, নানা সালাদ ও ডেয়ার্ট। কর্মচারীদেরকে সেরা খাবার দিতে দ্বিধা করে না স্টিল।
বোমার আওয়াজ শোনার পর কালো হয়ে গেছে সবার মুখ। খাবারে মন নেই কারও। টেবিলে প্লাস্টিকের প্লেট আর চামচ ফেলে রেখে উঠে পড়ল সিলভারম্যান। বুঝে গেছে, অভিশপ্ত এই দ্বীপ থেকে চলে না গেলে পাগল হয়ে যাবে সে। হতক্লান্ত দেহটাকে টেনে নিয়ে আবারও গিয়ে ঢুকল বিশাল তাঁবুর ভেতরে। হৈ-চৈ করছে এমিলি আর সিওয়ার্স।
‘বলেছি না মেয়েটা বহুৎ চালু মাল?’ সিওয়ার্সের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল এমিলি। ‘আগেও আমাদের বোকা বানিয়ে দিয়েছে। দেখার মত একটা শো!’
‘অত খুশির কিছু নেই,’ গোমড়া মুখে মানিব্যাগ থেকে পাঁচটা এক শ’ ডলারের নোট এমিলির হাতে দিল সিওয়ার্স।
‘এবার স্কোর বোর্ড দেখি!’ নোটগুলো পকেটে রেখে স্ক্রিনে ক্লার্কের ছবির ওপরে লাল একটা ক্রস চিহ্ন বসাল এমিলি।
‘এত হৈ-চৈ কিসের?’ হতাশ সুরে বলল সিলভি। মেইন স্ক্রিনে দেখতে পেল আগুনে পুড়ছে বি-২৫ বিমান। ভকভক করে আকাশে উঠছে প্রচুর কালো ধোঁয়া।
‘আরও একটা গেল;’ বিড়বিড় করল সিওয়ার্স। মানুষ মারা গেছে সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা নেই তার। মনে কষ্ট, বাজি ধরে গচ্চা গেছে পুরো পাঁচ শ’ ডলার। ‘বুম!’ করে উড়ে গেছে কালো আমেরিকান।’ হাত তুলে কালো ধোঁয়া দেখাল সে।
মিলার চেহারায় কোন প্রতিক্রিয়ার ছাপ নেই। এই শো-তে সত্যিকারের মানুষ মারা পড়ছে, বিষয়টা বহু আগেই মন থেকে মুছে গেছে তার। চাইছে নিখুঁত হোক তার কাজ, যাতে ধমক খেতে না হয় স্টিলের কাছ থেকে। সাবধানে আগুন ও ধোঁয়ার দিকে ক্যামেরার লেন্স তাক করল সে।
পরিবেশটা খুব অসহ্য মনে হলো সিলভারম্যানের। ‘যথেষ্ট হয়েছে, এবার অন্যকিছু দেখাও,’ নির্দেশ দিল সে। তিক্ত চেহারায় দেখল কর্মচারীদের।
স্ক্রিনে অন্য ফুটেজ আনল মিলা। জায়গাটা জাপানি কমাণ্ড পোস্ট। টেনেহিঁচড়ে মেক্সিকান দস্যুকে লোডিং ডকে তুলে আনছে রুপার্ট শ্যানন আর কাইতো তানাকা।
অসহায় আহত লোকটাকে লাথি-ঘুষি মারার ফাঁকে চওড়া হেসে লেন্সের দিকে তাকাচ্ছে সাইকোপ্যাথ ইংরেজ।
