ডার্টি গেম – ২৩
তেইশ
এইমাত্র কাঠের মেঝেতে বুটের খট খট শব্দ শুনতে পেয়েছে আলকারায। ওর মনে হয়েছে, যদি উঠে দাঁড়াতে পারত! সেক্ষেত্রে রানার দেয়া ছুরি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ত শ্যাননের ওপরে। কিন্তু বাস্তবে এসব আকাশ-কুসম স্বপ্নের মত। জখমী হাঁটু নিয়ে কোনভাবে লড়ে জিতে যেতে পারবে না। তবুও নিজেকে বলল, যদি পারি তো শেষ করে দেব দুই ইবলিশের একটাকে!
ডকের মেঝেতে একাধিক লোকের পদশব্দ। কমাণ্ড পোস্টের দরজার কাছে ছেঁচড়ে চলে গেল আলকারায। আওয়াজ কাছে আসতেই ছুরি হাতে তৈরি হয়ে নিল। মেক্সিকোতে মস্তানদের দলের সদস্য হিসেবে ছুরির লড়াইয়ে আগেও যোগ দিয়েছে। তাই জানে কী করতে হবে। প্ৰথম সুযোগে ছুরির ফলা ভরে দেবে কিডনির ভেতরে। ইস্পাতের ফলার দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ খোঁচা ঢুকবে হৃৎপিণ্ডে। আলকারায ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করল, যেন দরজা দিয়ে আগে ঢোকে ইংরেজ শয়তানটা। সেটা হলে ইসাবেলার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে পারবে সে।
তার জানা নেই স্টিলের সরবরাহ করা ম্যাপের কল্যাণে শ্যানন ও তানাকা আগেই জানে কোথায় লুকিয়ে আছে তাদের শিকার। আর জানে বলেই উল্টোদিকের ভাঙা দেয়ালের ফাঁক গলে ঢুকে পড়েছে তারা। শ্যানন ও তানাকা ভেবেছিল একসঙ্গে পাবে বাঙালি লোকটা আর মেক্সিকান ডাকাতকে। প্ল্যান ছিল একই ঢিলে দুই পাখি মারবে। অথচ দেখতে পেল দরজার কাছে হাঁটুভাঙা হারামি লোকটা থাকলেও রানা নেই। তাতে যেমন হতাশ হয়েছে তারা, তেমনি স্বস্তিও পেয়েছে।
মজা করার জন্যে তানাকাকে নিয়ে আবার ডকে ফিরে গেছে শ্যানন, যাতে ওদের পদশব্দ শুনতে পায় আলকারায। এবার লোকটা ভাববে গোপনে হামলা করবে ওদের ওপরে। কিন্তু পরে বোকা বনতে হবে তাকে। আর তখন লোকটাকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করবে ওরা।
তানাকাকে ইশারা করল শ্যানন, যাতে ছুটে গিয়ে দরজা পেরিয়ে ঢুকে পড়ে জাপানি দস্যু। এতে হতভম্ব হয়ে যাবে হাঁটুভাঙা মেক্সিকান ডাকাত। এদিকে পেছন থেকে এসে তার হাত থেকে ছুরি কেড়ে নেবে শ্যানন। এরপর হাসতে হাসতে লোকটাকে বের করে নিয়ে গিয়ে খতম করবে তারা।
তাদের জানা নেই, এরই ভেতরে ছেঁচড়ে এগিয়ে গিয়ে দরজার চৌকাঠ ধরে উঠে দাঁড়িয়েছে আলকারায।
ইংরেজ সঙ্গীর কথামত ঝড়ের বেগে দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল তানাকা। ছুরি দিয়ে তার কিডনি ফুটো করতে চাইল আলকারায। তবে জাপানি খুনির গতি বিদ্যুতের মত। তাকে স্পর্শ করতে পারল না ছুরির ফলা। ওদিকে পেছন থেকে এসে আলকারাযের ছুরি কেড়ে নিল শ্যানন। মুচড়ে ধরে ভেঙে দিল মেক্সিকান ডাকাতের কনুইয়ের হাড়। হাঁটুর বাটি ভাঙার সময় যে প্রচণ্ড ব্যথা পেয়েছে আলকারায, তার চেয়ে কম ব্যথা লাগল না কনুই ভেঙে যাওয়ায়। প্রায় অজ্ঞান হয়ে গেল সে।
‘বলো তো, তোমার এত অবাক হওয়ার কী আছে!’ আলকারাযের চোয়ালে হাসতে হাসতে ঘুষি মারল শ্যানন।
উপুড় হয়ে হুড়মুড় করে মেঝেতে পড়ল আলকারায। প্রায় অচেতন হলেও বুঝে গেল যে ব্যর্থ হয়েছে ওর পরিকল্পনা। এ-ও টের পেল, বাঁচতে হলে সরে যেতে হবে নিরাপদ কোথাও। ক্রল করে ক’টা ক্রেটের ওদিকে যেতে চাইল সে। কিন্তু কোমরে জোর এক লাথি মেরে তাকে মেঝেতে ফেলল শ্যানন। অসহায় যুবকের গোড়ালি চেপে ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গেল বাইরে। ‘তানাকা, একটু সাহায্য করো তো!’
আলকারাযকে ধরে নিয়ে গিয়ে লোডিং ডকে তুলল দুই খুনি। শ্যানন আগেই দেখেছে ওখানে আছে ভিডিয়ো লেন্স। মেক্সিকানটাকে বেধড়ক মার দিলে ওটার কারণে সবই দেখবে ডার্টি গেমের দর্শকেরা।
সাহায্য পাওয়ার জন্যে গলা ছেড়ে চেঁচাতে শুরু করেছে আলকারায। ওর মনের এক অংশ বলছে: মরে গেলেই তো বেঁচে যাই। আবার অন্য অংশ বলছে: সুযোগ এলে প্রতিশোধ নিবি কুত্তার বাচ্চাগুলোর ওপরে!
মাঝে মাঝে বিরতি নিয়ে ওকে পেটাতে লাগল দুই খুনি। শ্যাননের জানা আছে অচেতন না করে কীভাবে বেশি ব্যথা দেয়া যায়। ওদিকে তানাকা চাইছে আহত লোকটাকে দ্রুত খুন করতে। কিন্তু তাকে বাধা দিচ্ছে ইংরেজ সাইকোপ্যাথ। তার যুক্তি হচ্ছে, ব্যাটাকে শেষ করার আগে লুটে নিতে হবে পুরো মজা।
.
বিশাল তাঁবুর মস্ত এলইডি স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে নৃশংস দৃশ্য।
‘আলকারাযের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে,’ বিড়বিড় করে বলল সিওয়ার্স। ভুলে গেছে বাজি হেরে গচ্চা দিয়েছে অনেক টাকা। ‘এবার খুব ভয়ঙ্করভাবে লোকটাকে পিটিয়ে মারবে শ্যানন।’
‘সূর্য ওঠার আগেই বাজে একটা দিন শুরু করেছে আলকারায,’ টিটকারির সুরে বলল এমিলি। মারাত্মক পিটুনি দেখেও মেক্সিকান ডাকাতের জন্যে ওর মনে কোন করুণা এল না।
হতবাক হয়ে সিওয়ার্স 3 এমিলিকে দেখছে সিলভারম্যান। ভাবছে, এরা কি অপরাধীদেরকে মানুষ বলে ভাবছে না? মনে করছে সবই ভিডিয়ো গেম? নিজের চোখে তো দেখছে বোমার আঘাতে উড়ে যাচ্ছে আস্ত মানুষ! সিওয়ার্স বা এমিলি হয়তো এভাবে ভাবছে, জঙ্গলে যারা আছে, তারা তো মৃত্যুদণ্ড-প্রাপ্ত আসামী, তাই তারা বাঁচলেই কী আর মরলেই বা কী!
‘এরই ভেতরে লগ ইন করেছে আটাশ মিলিয়ন ভিউয়ার,’ ডিসপ্লে দেখে ঘোষণা দিল সিওয়ার্স। ‘আরও বাড়ছে আমাদের দর্শক।
কোন কথা না বলে তাঁবু থেকে বেরিয়ে এল সিলভারম্যান, আরও তিক্ত হয়ে গেছে তার মন। ছায়ায় দাঁড়িয়ে হড়হড় করে বমি করল। পেটে খাবার নেই, গলা বেয়ে উঠছে টক পানি। ভীষণ অসুস্থ লাগছে, কিন্তু সেটা কোন অসুখের জন্যে নয়। আরেক দফা বমি করে নিজের তাঁবুর দিকে চলল সে। কিন্তু একটু যেতেই দেখতে পেল পথ ‘আটকে দাঁড়িয়ে আছে রিটা।
দশ সেকেণ্ড পেরোলেও কোন কথা বলল না ওরা।
সিলভি বুঝে গেছে, ডার্টি গেমের জন্যে মনের ভেতরে কেমন বোধ করছে রিটা। আগে স্টিলের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে গিয়েছিল সে, তাই সিলভি জানে ওর মনোভাব এখন কেমন।
এদিকে সিলভি কী ভাবছে, সেটাও বুঝতে পারছে রিটা।
‘স্টিল বস্ হলেও আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু,’ তিক্ত স্বরে বলল সিলভি। ‘নিজের কাজে সে খুব দক্ষ। একজন জিনিয়াস। যে-লোক সোনার খনি পেয়ে গেছে, তার কাছে বিক্রি করছে বস্তা ভরা ধুলো।’
‘তা-ই আসলে,’ ঠাণ্ডা গলায় বলল রিটা।
শার্টের আস্তিনে মুখ মুছল ‘সিলভি।
‘সে যা খুশি করলেও তুমি একমাত্র লোক, যে কি না তার ওপরে ভরসা রেখেছিলে,’ বলল রিটা। ‘স্টিল কিন্তু তোমার কথা মন দিয়ে শোনে। মেনেও নেয় অনেক কিছু।’
‘আমার তা মনে হয় না।’ মাথা নাড়ল সিলভি।
‘সিলভি, যেভাবে হোক বন্ধ করো এই ভয়াবহ শো।’
মেয়েটা যে সঠিক কথাই বলছে, তাতে সন্দেহ নেই। স্টিলের মোকাবিলা করার জন্যে নিজেদের ভেতরে আলাপ শুরু করল সিলভি ও রিটা।
.
এদিকে নিজের ব্যক্তিগত তাঁবুতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছে স্টিল। গত দু’দিন ধরে নিপাট হয়ে আছে বিছানার চাদর। ডার্টি গেমের শো শেষ না হওয়া পর্যন্ত যে আর ঘুম হবে না, সেটা বুঝে গেছে সে।
যুদ্ধের ময়দানে জেনারেলের তাঁবুর মত তার এই টেণ্ট। অবশ্য এই তাঁবুতে আছে বিলাসবহুল সবই। চারদিকে দামি আসবাবপত্র। একদিকের দেয়াল ঘেঁষে দুর্মূল্য মদের বার। বহুক্ষণ আগে যে চেয়ারে কুঁকড়ে বসে ছিল রিটা, সেটাতে বসে সামনের ছোট্ট এলইডি স্ক্রিন দেখছে সে। ভাবার সময় যেন মনোযোগ ছুটে না যায়, সেজন্যে নিচু করে রেখেছে ডার্টি গেম শো-র সাউণ্ড। ভাবছে, চব্বিশ ঘণ্টা পার হয়ে গেছে, অথচ মারা গেছে মাত্র পাঁচজন অপরাধী। সুতরাং ওর উচিত এদেরকে লড়াইয়ে উৎসাহ জুগিয়ে দেয়া। নইলে শেষমেশ দেখা যাবে কাউকে বিজয়ী করা যাচ্ছে না। ভালভাবে শো শেষ করতে হলে আগামী ছয় ঘণ্টার ভেতরে মরতে হবে চারজনকে, নইলে দর্শকেরা বলবে তাদের সঙ্গে চিটিংবাজি করেছে ব্র্যাড স্টিল।
এলইডি স্ক্রিনের দিকে তাকাল সে। বেদম মার খেয়ে নেতিয়ে পড়েছে আলকারায। তিক্ত মনে ভাবল স্টিল, তা-ও ভাল যে শো-তে আকর্ষণ করার মত কিছু পাচ্ছে দর্শকেরা। এখন মেক্সিকান ডাকাতকে শেকল দিয়ে পেটাচ্ছে শ্যানন। ধরাশায়ী যুবকের বুক-পেটে লাথি মারছে তানাকা। অডিয়ো অফ করে রেখেছে স্টিল, তাই শুনতে হচ্ছে না আহত লোকটার করুণ আর্তনাদ। অবশ্য দর্শকেরা তো আর কালা নয়, আর্তচিৎকারে কানে তালা লেগে যাওয়ার কথা তাদের।
তাঁবুর ভেতরে রিটা ও সিলভি ঢুকতেই তাদের দিকে চোখ তুলে তাকাল স্টিল। বুঝে গেল কী ধরনের কথা বলবে এরা। মনস্থির করে নিল সে, কোনভাবেই বিরক্ত হবে না। রিটা ও সিলভির ওপর থেকে চোখ সরিয়ে আবারও মন দিল স্ক্রিনে।
‘এখানে যা করছ, সেটা চরম অন্যায়,’ জোর দিয়ে বলল রিটা। ‘প্রতিযোগীদের কাউকে কাউকে বাড়তি সুবিধা করে দিয়েছ। আহত একজনের স্ত্রীকে একটু আগে যারা খুন করল, তাদেরকেই আবার পাঠালে অসহায় লোকটাকে খুন করতে।’
একটু আগে সিলভির কাছে সবই শুনেছে রিটা।
অপরাধীদের প্রায় সবার ওপরে চরম অন্যায় করছে স্টিল।
গলা ফাটিয়ে প্রতিবাদ করতে চাইলেও রিটা বুঝে গেল, রেগে গেলে হেরে যেতে হবে ওর। তাই জোর করে নিজেকে শান্ত রাখল। ওকে প্রমাণ করে দিতে হবে, ও অন্য মেয়েদের মত বোকা নয়। চাপের মুখে কখনও দমে যাবে না।
‘তুমি এরই ভেতরে একাধিক বার প্রতিযোগীদের ব্যাপারে নাক গলিয়ে দিয়েছ,’ না চাইলেও চড়ে গেল ওর গলা।
স্ক্রিনের দিকে চেয়ে বলল স্টিল, ‘আমি যে শো তৈরি করেছি, সেটা এখন দেখছে আটাশ মিলিয়ন দর্শক। অথচ কোন নেটওঅর্ক আমার কাছ থেকে চার আনা পয়সা নিতে পারছে না।’
হতবাক হয়ে তার দিকে চেয়ে রইল রিটা ও সিলভি। তারা এতদিন যাকে চিনত, কোথায় যেন হারিয়ে গেছে সে। যাকে দেখছে, সে ভীষণ নীচ এক নিষ্ঠুর মেগালোম্যানিয়াক।
স্টিল আর তার স্ক্রিনের মাঝে এসে থামল সিলভারম্যান। ভীষণ বিষণ্ন তার চেহারা। সরাসরি তাকাল বন্ধুর চোখে। ‘ব্র্যাড, আমি এই চাপ আর নিতে পারছি না। আগেই জানতাম দ্বীপে কী ঘটবে। কিন্তু তখন বুঝিনি আমরা কতটা বাড়াবাড়ি করে বসব।’
গম্ভীর চোখে বন্ধুকে দেখল স্টিল।
যুদ্ধে পরাজিত সৈনিকের মত দেখাচ্ছে সিলভিকে। এখনও তাকে বিশ্বস্ত বন্ধু বলেই মনে হলো স্টিলের। হয়তো ঘুম দিয়ে উঠলে সবকিছু অন্য চোখে দেখবে সে।
‘ঠিক আছে, আমি তোমাদের কথা বুঝতে পেরেছি,’ বলল স্টিল। ‘সত্যি বেশ কিছু দৃশ্য ছিল খুব ভয়ঙ্কর। আর সেটা অস্বীকার করব না। কিন্তু দুনিয়ার যে-কোন উপন্যাসে এভাবে আঁকা হয়েছে নানান ধরনের চরিত্র। নাটকীয়তা তৈরির জন্যে এর দরকার আছে। এতে পাঠক বা দর্শকেরা সহজে বোঝে কারা ভাল আর কারা খারাপ।’
স্টিলের কথা শুনে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে সিলভারম্যানের। ‘ব্র্যাড, আমরা কিন্তু এখানে কোন টেলিপ্পে লিখছি না। চোখের সামনে দেখছি করুণভাবে মরছে মানুষ। আর সেসব দৃশ্য দেখে খাবারের রুচি নষ্ট হয়ে গেছে আমার।’
রাগে লালচে হলো স্টিলের মুখ। এদের কথা শুনে ধৈর্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে গেছে তার পক্ষে। চাপা স্বরে বলল, ‘বলো তো, সিলভি, দুনিয়ায় আসলে কি সত্যিকারের কিছু আছে? মুভি, নাটক, ম্যাগাযিন, দৈনিক পত্রিকা-সবই তো কোটি মানুষকে ঠকিয়ে পয়সা রোজগারের ফন্দি। দুনিয়ায় তা হলে আসল মজা মানুষ পাবে কোথায়?’
সিলভারম্যানের কণ্ঠে চরম হতাশা প্রকাশ পেল, ‘তুমি যা করছ, সেটাকে কি ফূর্তির কোন অনুষ্ঠান বলে ভাবছ? তুমি কি পাগল হয়ে গেলে, ব্র্যাড?’
তার দিকে চেয়ে হো-হো করে হেসে ফেলতে ইচ্ছে হলো স্টিলের। ডার্টি গেম শো আর হজম করতে পারছে না সিলভি। ‘সিএনএন, এবিসি, এমটিভি-এরা কিন্তু মানুষের মনরক্ষা করে লুটপাট করেছে তাদের পকেট। বিনোদনের জগৎটা এমনই।’ কাঁধ ঝাঁকাল স্টিল। ‘তাদের প্রডাক্টে সত্যিকারের কিছুই নেই। তোমার তো এতদিনে সেটা বুঝে নেয়ার কথা।’
স্টিলকে এখন বদ্ধ এক উন্মাদ বলে মনে হচ্ছে রিটা ও সিলভির। ওদের চোখে চরম অপছন্দের ছাপ। আর সেটা বুঝে আরও রেগে গেল স্টিল। তার মন চাইল লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সিলভির গালে কষে চড় দিতে। বদমাশটা আবার ওরই প্রেমিকাকে জুটিয়ে এনে তর্ক জুড়েছে! দুই গাধা-গাধী জানেও না, কতবড় শো তৈরি করে দুনিয়ার বুকে বিশাল এক ইতিহাস গড়ে তুলেছে সে!
‘তোমরা যাই করো, সবসময় মনে রেখো, জীবন কিন্তু মাত্র একটা,’ নিচু গলায় বলল স্টিল। ‘আর আগেই নির্ধারিত হয়ে গেছে ওটা। এই দ্বীপে যা ঘটছে, তার সম্পূর্ণ দায় স্রষ্টার। আর এ-ও ভেবে দেখো, আমরা কিন্তু মেরে ফেলতে পারলেও এই দশজনের একজনকে বাঁচিয়ে দিচ্ছি।’
‘আর সেজন্যে অন্যদেরকে এভাবে নির্যাতন করতে হবে?’ প্রতিবাদের সুরে বলল রিটা।
‘মস্তবড় কোন বিপদ হওয়ার আগেই এখনই এই শো বন্ধ করো,’ জোর দিয়ে বলল সিলভি।
ডানহাতের তর্জনী স্ক্রিনে তাক করল স্টিল। ‘তোমাদের কি মনে হয় গুয়াতেমালায় ইলেকট্রিক চেয়ারে বসে মরতে পারলে তাতে খুব খুশি হতো মেক্সিকান ডাকাত?’
মানসিকভাবে বিপর্যস্ত লাগছে সিলভির। জোর করে তাকাল স্ক্রিনের দিকে। লোডিং ডকের মেঝেতে কুঁকড়ে পড়ে আছে আলকারায। করুণ সুরে দয়া-প্রার্থনা করছে। ধুপধাপ সব লাথি আর ঘুষি পড়ছে তার বুক ও মুখে।
‘আমার তা-ই ধারণা,’ আড়ষ্ট কণ্ঠে বলল সিলভারম্যান।
অর্থাৎ, সিলভি এখন আর একই দলে নেই, বুঝে গেল স্টিল। প্রচণ্ড রাগের বিস্ফোরণ হলো তার মগজে। লাফ দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সে। দেহের পাশে মুঠো হয়ে গেছে দু’হাত। দাঁতে দাঁত চেপে ভাবল, রুপার্ট শ্যানন যা করছে আলকারাযের ওপরে, সিলভিকে ওভাবে শাস্তি দিতে পারলে ভাল লাগত তার।
‘অকৃতজ্ঞ শুয়োরের বাচ্চা কোথাকার!’ গর্জে উঠল স্টিল। ‘আমি তোকে দুই পয়সার টেকনিশিয়ান থেকে কোটি টাকার মালিক করে দিয়েছি! আর তুই এখন খুঁত বের করছিস. আমার শো-র? আমি সাহায্য না করলে বস্তিতে পচে মরতি! এতকিছু করে বদলে শুধু চেয়েছি সামান্য আনুগত্য, সেটাও দেখাতে পারলি না! আমার বিরুদ্ধে জোট বেঁধেছিস আমারই প্রেমিকার সঙ্গে! তোর মত অকৃতজ্ঞ আমি আর কাউকে দেখিনি!’
স্টিলের বরফ-শীতল দৃষ্টি দেখে এক পা পিছিয়ে গেছে রিটা।
প্রচণ্ড রাগে স্টিলের বুকের ভেতরে গর্জে উঠছে অচেনা এক হিংস্র পশু। অবশ্য সিলভি বা রিটার গায়ে হাত তুলবে, সে-সময়টা পেরিয়ে গেছে। চাপা স্বরে বলল স্টিল, ‘তোমরা ভাল করেই জানো, ষড়যন্ত্র করলে কী ধরনের ঝামেলায় পড়তে হবে তোমাদের। আমি আর কোন তর্কে যাব না।’
সিলভারম্যানের নাকের কাছে নিজের নাক নিল স্টিল। হিসহিস করে বলল, ‘এখনই ঠিক করো কোন্ পক্ষে থাকবে। হয় আমার পক্ষে, নইলে শো শেষ হলে তোমাকে পাঠিয়ে দেব এই দ্বীপ থেকে মেইন ল্যাণ্ডে। সেক্ষেত্রে তোমার সঙ্গে শেষ হবে আমার সব সম্পর্ক। আর তুমি যদি আমার হয়ে কাজ করো, কেইম্যান আইল্যাণ্ডে তোমার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা হবে লাখ লাখ ডলার। এটা ভুলে যেয়ো না, এই শো-র মুনাফা তোমাকে দেব বলেছি। কী করবে সেটা ভাল করে ভেবে দেখো।’
বন্ধুর সঙ্গে বেইমানি করার ইচ্ছে সিলভারম্যানের নেই। নৈতিকতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে চেয়েছিল বন্ধুকে এসব থেকে সরিয়ে নিতে, নইলে ভবিষ্যতে মস্ত বিপদে পড়বে সে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে নিজের অবস্থান থেকে সরে যাবে না ব্র্যাড। সিলভির মনে পড়ল, আগেও নানান বিপদে পিছিয়ে যায়নি ওর বন্ধু। আর আজ হুমকি দিয়েছে, তার বিরুদ্ধে কিছু করলে তার ফলাফল হবে খুব খারাপ। নিজেও সিলভারম্যান কখনও কোন দায়িত্বে অবহেলা করে না। যারা নিজের কাজ ফেলে পালিয়ে যেতে চায়, তাদেরকে ঘৃণা করে সে। তা ছাড়া, যারা লেজ গুটিয়ে পালিয়ে যেতে অভ্যস্ত, তাদের বদনাম হয়ে যায় ফিল্ম ইণ্ডাস্ট্রিতে।
না, সিলভি আর যাই হোক, বেইমান নয়। বিশেষ করে গোটা ব্যাপারটাতে যখন জড়িয়ে গেছে তার বন্ধু।
ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে মোটা অঙ্কের টাকা যাবে বলে লোভ দেখাচ্ছে স্টিল, তবে সেটা আসলে কিছুই নয়। টাকার জন্যে স্টিলের কথা মেনে আত্মাটাকে বিক্রি করতে আপত্তি আছে সিলভির। কী করবে সেটা নিয়ে দ্বিধায় পড়েছে সে। বুঝতে পারছে জবাবটা তাকে এখনই জানাতে হবে।
‘তোমার বক্তব্য আমাকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দাও,’ পাঁচ সেকেণ্ড বিরতির পর জানতে চাইল স্টিল।
‘এই শো ঠিকই শেষ করব আমি,’ বড় করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল সিলভি।
হতাশা নিয়ে ওকে দেখছে রিটা। ‘কিন্তু, সিলভি, কারও কথায় যা খুশি করলে…
তর্ক এড়াতে গিয়ে বলল সিলভারম্যান, ‘আমি পরে এ- ব্যাপারে তোমার সঙ্গে কথা বলব।’ একবার রিটাকে দেখে নিয়ে তাঁবুর দরজার দিকে চলল সে। ‘আমি স্ক্রিনগুলো দেখতে গেলাম।’.
সিলভি বেরিয়ে যেতেই সামনে বেড়ে রিটার গালে কষে চড় দিল স্টিল। তাতে টু-টু বোর রাইফেলের গুলি বেরোবার মত আওয়াজ হলো। এত জোরে মেরেছে যে হাতটা ছুটে আসতে দেখেনি রিটা। ঝিমঝিম করে উঠেছে ওর মাথা। যেন আগুন ধরে গেছে গালে। জীবনে প্রথমবারের মত কেউ হাত তুলেছে ওর গায়ে। এখন কী করবে ভেবে পেল না রিটা।
‘তোমার বোধহয় আক্কেল নেই যে গত চব্বিশ ঘণ্টা ধরে যা খুশি করে বেড়াচ্ছ?’ ছোট বাচ্চাকে শাসনের সুরে বলল স্টিল। ‘যা খুশি করবে সেটা এই দ্বীপে চলবে না। কী করতে পারবে তুমি? কীভাবে বাঁচাবে এসব খুনিদেরকে? কী লাভ হতো মেক্সিকান এক পতিতাকে বাঁচিয়ে দিলে?’
কড়া কথাগুলো শুনে দরদর করে রিটার চোখ বেয়ে গালে নেমে এল অশ্রু। ফিসফিস করে বলল ও, ‘আমি শুধু তোমাকে বিপদ থেকে বাঁচাতে চেয়েছি।’ ঘুরে একছুটে তাঁবু থেকে বেরিয়ে গেল ও।
রাগ ঝেড়ে এখন ভাল লাগছে স্টিলের। আবারও চেয়ারে বসে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। নতুন করে আবারও দারুণ জমে গেছে ডার্টি গেমের শো।
