ডার্টি গেম – ২৯
ঊনত্রিশ
জলপ্রপাত থেকে তৈরি নদী প্রাগৈতিহাসিক গুহায় ঢুকে একটু পর হয়ে গেছে অগভীর খর জলস্রোত। গুহাটা আসলে আগ্নেয় লাভার সুড়ঙ্গ, যেখানে কখনও প্রবেশ করেনি সূর্যের রশ্মি।
সাবধানে সাঁতরে এগিয়ে চলেছে রানা। অন্ধকারে অভ্যস্ত হয়ে গেছে ওর চোখ। ধারণা করছে সামনে কোথাও ওকে অ্যাম্বুশ করবে ইংরেজ কমাণ্ডো শ্যানন। যেহেতু ওর নিজের হাতে ছোরা আছে, তাই রানা ধরে নিয়েছে তার হাতেও আছে ধারাল সেই ম্যাচেটি। অ্যালিগেটরের মত শুধু চোখদুটো ভাসিয়ে রেখে চুপচাপ সাঁতরে চলেছে ও। কখনও কখনও জলমগ্ন পাথরে লেগে ছড়ে যাচ্ছে বুকের ত্বক। অবশ্য অ্যাড্রেনালিনের স্রোতের কারণে সহজেই সহ্য করতে পারছে সেই ব্যথা।
গুহার গভীরে কুচকুচে কালো অন্ধকার। পেছনে পড়ে গেছে জলপ্রপাতের আওয়াজ। চারপাশে এখন জলস্রোতের প্রশান্তিময় মৃদু ছল-ছলাৎ শব্দ। এটা বোধহয় ভয়ঙ্কর কোন ঝড় আসার আগের শেষ সময়টা, ভাবছে রানা। ওর মণি- তারা বিস্ফারিত হওয়ায় দেখতে পাচ্ছে আবছা সব আকার।
চোখের কোণে ড্যাবডেবে দুটো চোখ দেখে সোজা হয়ে বোলো নাইফ চালাল রানা। তাতে সুড়ঙ্গ ভরে গেল তীক্ষ্ণ আর্তনাদে। হঠাৎ রানা ভেসে ওঠায় চারদিকের দেয়াল ও ছাত থেকে উড়াল দিয়েছে শত শত ভ্যাম্পায়ার বাদুড়। সুড়ঙ্গে এখন শুধু ওগুলোর তীক্ষ্ণ বিশ্রী আর্তনাদ।
কালো ডানার বাদুড়গুলোকে শান্ত করতে আবারও ডুব দিল রানা। কিছুক্ষণ পর দম ফুরিয়ে যেতেই মাথা তুলল পেরিস্কোপের মত। আবারও সামনের দিক দেখে নিয়ে সাঁতরে চলল।
একটু পর একদিকে বাঁক নিল নদী। সামনে সাদা আলো। চারপাশে চোখ বুলিয়ে ওদিকে এগোল রানা।
আশপাশে নেই রুপার্ট শ্যানন।
ক্রমে আলোকিত হচ্ছে গুহার সামনের দিক। বাইরে উজ্জ্বল সূর্যের আলোক। সুড়ঙ্গ থেকে বেরোবার আগে রোদে চোখ অভ্যস্ত করে নিল রানা। বুঝে গেছে, সুড়ঙ্গ থেকে বেরোলে প্রথম সুযোগে হামলা করবে ইংরেজ সাইকো।
তবে সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে কোথাও তাকে দেখতে পেল না রানা। ওর মনে হলো, এমন হতে পারে যে বেকায়দাভাবে পাথরে পড়ে মারা গেছে শ্যানন। কিন্তু কোথাও পাথরের ওপরে রক্ত বা ছেঁড়া কোন কাপড় দেখেনি বলে চিন্তাটা বাতিল করে দিল রানা। শ্যানন অচেতন হয়ে পুকুরে ডুবে গেছে সেটাও বিশ্বাসযোগ্য নয়। কোথাও ছিল না তার লাশ। তা ছাড়া, সে স্পেশাল ফোর্সের মেজর। তার মত প্রশিক্ষিত অফিসার সাধারণ মানুষের মত চট্ করে মারা পড়ে না। বিস্মিত হওয়ার বিষয় হচ্ছে, যেহেতু সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে রানাকে অ্যাম্বুশ করা ছিল তার সেরা সুযোগ, তা হলে সেটা করল না কেন সে?
এর বড় একটা কারণ বোধহয় এটা-পালিয়ে যেতে ব্যস্ত ছিল শ্যানন। কিন্তু সেক্ষেত্রে রানাকে মোকাবিলা না করে ত্রিশ ঘণ্টা পেরোবার পর বোমা বিস্ফোরণে মৃত্যু বেছে নিতে চেয়েছে সে?
কেন যেন তা সম্ভব বলে মনে হলো না রানার। শ্যানন একজন কাপুরুষ, তবে নির্বোধ তো নয় যে বুঝবে না রানা মারা গেলেই মুক্তি পাবে সে!
পাথুরে ক্যানিয়নের ভেতরে সাঁতরে এগিয়ে চলেছে রানা। সামনে পড়ল ছোট কিছু জলপ্রপাত। হুড়মুড় করে নদীর পানি নেমে যাচ্ছে প্রাকৃতিক পাথুরে এক কোলিসিয়ামে। দৃশ্যটা এতই সুন্দর যে জুড়িয়ে যায় চোখ। অবশ্য এসব দেখার মত সময় এখন রানার নেই। ক্যানিয়নে কোথাও ঘাপটি মেরে লুকিয়ে আছে শ্যানন। প্রথম সুযোগে হামলা করবে ওর ওপরে।
ঊরু পানি ভেঙে সিঁড়ির মত ধাপ বেয়ে নেমে চলেছে রানা। একবার চোখ তুলে দেখতে পেল, বড় এক বোল্ডারের ওপর থেকে ওর দিকে চেয়ে আছে একটা ক্যামেরা। রেগে গেলেও নিজেকে সামলে নিল রানা। ক্যামেরার মাধ্যমে বোধহয় ব্র্যাড স্টিলের মতই একই দৃশ্য দেখছে বিসিআই অফিসের সবাই।
ওর বস্, প্রিয় বন্ধুরা এবং সোহানার কথা ভেবে নতুন করে মনে উদ্যম ফিরে পেল রানা। মনে মনে নিজেকে বলল, আমি মরে গেলে চলবে না।
রানার জানা নেই, স্টেডিয়ামের মত জায়গাটা কাভার করতে সিলভারম্যান চারপাশে রেখেছে অন্তত চল্লিশটা ক্যামেরা। এলাকাটা এতই অপরূপ, স্টিল চেয়েছে শেষ লড়াই, যেন হয় ওখানে। সেক্ষেত্রে অতুলনীয় সব দৃশ্য দেখতে পাবে দর্শকেরা।
.
বিশাল তাঁবুর মেইন স্ক্রিনে রানাকে তুলে আনল সিলভারম্যান। ‘আমরা ওদেরকে পেয়ে গেছি! পাথুরে ক্যানিয়নে প্রচুর অ্যাঙ্গেল পাব!’
বড় করে দম নিল স্টিল। বুঝতে পারছে পাহাড়ি কার্নিশ থেকে ঝাঁপ দিয়ে দিব্বি ক্যানিয়নে হাজির হয়ে গেছে শ্যানন। ঝুঁকি নিলেও আসলে বোকা নয় সে।
‘একটা কাজ করো, ওখানে যেতে বলো লাইভ ইউনিটকে। এদিকে আমার প্রিয় প্রতিযোগী এখন কোথায়?’
জিপিএস ব্যবহার করে ক্যানিয়নের কোঅর্ডিনেট্স্ খুঁজে নিল সিওয়ার্স। সিম্পসনের পাশে থেমে নিচু গলায় কী যেন বলল স্টিল। কান পেতেও কথাগুলো শুনতে পেল না সিলভি। মাথা দুলিয়ে তাঁবু ছেড়ে বেরিয়ে গেল সিকিউরিটি চিফ।
স্টিল ও সিম্পসন নিচু গলায় কথা বলেছে, সেটা দেখেছে রিটা। সিলভারম্যানের মতই ওর মনে হচ্ছে, এবার আরও বড় কোন অপরাধে জড়িয়ে যাবে ব্র্যাড। তবে যেহেতু তার কাছে কিছু জিজ্ঞেস করে কোন লাভ হবে না, তাই চুপ করে আছে রিটা।
হয়তো আবারও ভয়ঙ্কর সব দৃশ্য দেখতে হবে, তবুও কী ঘটবে সেটা দেখার জন্যে তাঁবুতে রয়ে গেল ও। এখানে রয়ে যাওয়ার আরও একটা বড় কারণ হচ্ছে, কিছুক্ষণের ভেতরে রুপার্ট শ্যাননের বিরুদ্ধে লড়বে মাসুদ রানা। আর সেজন্যে মনে মনে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছে রিটা, যাতে প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হতে পারে বাঙালি যুবক।
.
চুপ করে যার যার চেয়ারে বসে আছে বিসিআই এজেন্টরা।
‘ওই যে রানা!’ সুড়ঙ্গ থেকে প্রিয় বন্ধু বেরোতেই গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠল সোহেল। ‘ও সুস্থ আছে!’
‘আমরা ওকে যত দ্রুত সম্ভব ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করছি,’ ওরা স্পিকারে শুনতে পেল রাহাত খানের কণ্ঠ। ‘আমাদের নেভির গাইডেড মিসাইল ফ্রিগেট বিএনএস উমর ফারুক এখন নিউ যিল্যাণ্ড থেকে ফেরার পথে আছে পাপুয়া নিউ গিনির সাগরে।’
রানার দিকে চেয়ে আছে সোহানা। ওর প্রিয় মানুষটার চোখদুটো এখন খুব কঠোর। সরাসরি ক্যামেরার দিকে চেয়ে কোমল হলো দৃষ্টি। হয়তো ভাবছে বস্, সোহানা বা বন্ধুদের কথা। কেন যেন খুব কান্না পেল সোহানার।
.
পাথুরে কোলিসিয়ামের দিকে উড়ে চলেছে স্টিলের একটি ছোট হেলিকপ্টার।
ক্যানিয়নের ভেতরে যান্ত্রিক ফড়িঙের বিকট গর্জন শুনতে পেয়ে মুখ তুলে তাকাল রানা। দ্রুত নেমে আসছে যন্ত্রটা। পাখায় লেগে ঝিলিক দিচ্ছে সোনালি রোদ। হঠাৎ খুলে গেল হেলিকপ্টারের দরজা। ছুঁড়ে দেয়া হলো একটা কালো ব্যাগ। ওটার ওপরে ভেসে উঠল ছোট একটা প্যারাশ্যুট। রানার কাছ থেকে অন্তত দেড় শ’ গজ দূরে ব্যাগ নিয়ে নামবে ওটা। সঙ্গে আছে হলদে-সবুজ ধোঁয়ার ফ্লেয়ার। রানা বুঝে গেল, কী ঘটতে চলেছে এবার। ওর বিরুদ্ধে লড়াই করে জিতে যাওয়ার জন্যে সাহায্য করা হচ্ছে রুপার্ট শ্যাননকে।
তীরবেগে ব্যাগের দিকে ছুটল রানা। তবে পাথুরে জমিতে দ্রুত দৌড়াতে পারছে না। বুঝে গেছে, ব্যাগের অনেক কাছে আছে শ্যানন। তার জিপিএস সিগনাল পাচ্ছে বলে বরাবরের মত তাকে রসদ জুগিয়ে দিচ্ছে ব্র্যাড স্টিল। ব্যাগের ভেতরে কী আছে জানা নেই রানার, তবে ওর মন বলছে ওটার ভেতরে থাকবে আধুনিক কোন অস্ত্র।
প্যারাশুটে ভর করে মস্ত এক বোল্ডারের ওদিকে গিয়ে নামল ব্যাগ। জায়গাটা থেকে আকাশে ভুস ভুস্ করে উঠছে হলদে-সবুজ মেঘ। মাত্র তিন সেকেণ্ড পর রানা দেখতে পেল, অপদেবতার মত ওখানে পৌঁছে গেছে রুপার্ট শ্যানন। রোদে চকচক করছে ভেজা সাদা দেহ। রানার হাতে যেমন বোলো নাইফ, ঠিক তেমনি তার হাতে রয়ে গেছে ম্যাচেটি। ব্যাগ দেখে মুখে ফুটে উঠেছে হাসি। ম্যাচেটি পাথুরে মাটিতে রেখে টান দিয়ে ব্যাগের জিপার খুলল সে। ভেতরে হাত ভরে জিনিসটা বের করে এক কান থেকে আরেক কানে গেল তার হাসি। চট্ করে একবার তাকাল বিশ ফুট দূরের ক্যামেরার দিকে। অস্ত্রটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে লেন্সের দিকে চেয়ে চোখ টিপল। এখন আর ম্যাচেটি লাগবে না তার।
এইমাত্র পৌঁছে দেয়া হয়েছে নলকাটা বারো গেজের শটগান ও পুরো এক বাক্স কার্তুজ!
