ডার্টি গেম – ৩
তিন
‘এইমাত্র এসেছেন ডায়ানা এরেনো,’ ঘোষণার সুরে বলল রিটা। সে দাঁড়িয়ে আছে পাম গাছের কাছে। সোনা রোদ এসে ঝিলমিলিয়ে দিচ্ছে ওর সোনালি চুল।
‘সে জানে আমাদের স্কোর কত?’ জানতে চাইল স্টিল। মাথা দোলাল রিটা।
নেটওঅর্ক টিভির নামকরা মহিলা সাংবাদিক ডায়ানা পা রেখেছে এই দ্বীপে, আর তাই কঠোর কিছু আইন জারি করেছে স্টিল। এ-ছাড়া, হেলিকপ্টারে করে আনার সময় মহিলাকে বলা হয়নি কোথায় আছে এই দ্বীপ। ডায়ানা কথা দিয়েছে, শো শুরু হলে ওটার ওপরে লিড স্টোরি করবে। এখন এখানে এসেছে স্টিলের সাক্ষাৎকার নিতে।
‘আগামীকাল তুমি হয়ে উঠবে টপ স্টোরি,’ বলল রিটা। ‘তাঁর কিছু সাক্ষাৎকার আমি দেখেছি। তোমার কাছ থেকে কথার প্যাচে অনেক কিছুই বের করে নিতে চাইবেন তিনি।’
তারকাদের মিষ্টি কথায় মুগ্ধ হওয়ার মানুষ নয় ডায়ানা। পাক্কা সাংবাদিক। নানা দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রাইম মিনিস্টার ও বিলিয়নেয়ারদের পেটের খবর টেনে বের করে। স্টিলের শর্ত মেনে এখানে এসেছে, সুতরাং আশা করা যায় আপত্তিকর কোন প্রশ্ন তুলবে না সে।
ডায়ানার সঙ্গে দেখা হলে ডার্টি গেম শো-র কয়েদীদের নিয়ে বহু কথা জানাতে পারবে স্টিল। ওর কথায় উঠে আসবে আপত্তিকর কিছু বিষয়। আর তাতে তৈরি হবে দুনিয়াজুড়ে বিতর্ক। আর সেটাই চাইছে স্টিল। যত বেশি মানুষ এই শো-তে জড়াবে, ততই বেশি বিক্রি হবে টিকেট।
‘রুপালি জগতের মহাহারামি কুত্তী এই ডায়ানা এরেনো,’ বলল স্টিল, ‘ওর চেয়ে বেশি আলোড়ন তৈরি করতে পারবে না কেউ। আর তাই ওর সঙ্গে দেখা করার জন্যে আমি তৈরি।’
‘দেখা যাক কী বলেন তিনি,’ সোনালি চুল গুছিয়ে নিল রিটা।
‘আমাকে কেমন দেখাচ্ছে, ডার্লিং?’ হাত বাড়িয়ে ওকে বুকে টেনে নিল স্টিল। গভীরভাবে চুমু দিল ঠোঁটে। জবাবে সমান আগ্রহে চুমু ফেরত দিল মেয়েটা। যদিও অস্বস্তি বোধ করছে স্টিলের নতুন শো-র কথা ভাবতে গিয়ে।
নামকরা শোম্যানদের মত ব্যক্তিগত মেকআপম্যান আছে স্টিলের। কোথাও যাওয়ার আগে ওকে রেডি করে দেয় সে। এবার ক্যামেরার সামনে স্টিল বুঝিয়ে দেবে সবই নিয়ন্ত্রণে আছে তার। গ্রামে ডায়ানার জন্যে মাঝারি আকারের এক তাঁবু বরাদ্দ করেছে সে। ওটার ভেতরে বিলাসবহুল কোনকিছুর অভাব নেই। মহিলা সাংবাদিকের কাছে চারবেলা পৌঁছে যাবে সেভেন স্টার হোটেলের শেফের তৈরি খাবার। শ্যাম্পেন থেকে শুরু করে যে-কোন দামি মদ পাবে সে। এখন মুখ-হাত ধুয়ে হালকা নাস্তা করার পর স্টিলের জন্যে অপেক্ষা করছে। নিজের তাঁবুতে পোশাক ছেড়ে সুন্দর টমি বাহামা সিল্কের শার্ট ও কালো জিন্স পরে ডায়ানার তাঁবুতে গিয়ে ঢুকল স্টিল।
সাদা টেবিলের ওদিকের চেয়ারে বসে আছে মহিলা। স্টিল তাঁবুর ভেতরে ঢুকতেই মুখ তুলে তাকাল সে।
‘হ্যালো, ডায়ানা, আপনি এসেছেন বলে আমি খুব খুশি,’ পৌরুষদীপ্ত কণ্ঠে বলল স্টিল। মুখে আন্তরিক হাসি। বহুকাল সাংবাদিকদের সঙ্গে মিশে সে অভ্যস্ত। বেশিরভাগ মানুষ বুঝবে না আসলে আন্তরিক নয় স্টিল।
ডায়ানা এরেনো অন্য মাপের সাংবাদিক। ঠিকই বুঝে গেল খুশির ভান করছে স্টিল। প্রচুর প্রচারণা পাবে বলে তাকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে সে।
‘আপনার শো-র ওপরে রিপোর্ট করব, তাই আমিও খুশি,’ মাপা কণ্ঠে বলল ডায়ানা। তার পরনে সিল্কের সবুজ জ্যাকেট। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় পরিবেশের জন্যে ওটা উপযোগী নয়। তবে দারুণ আকর্ষণীয় দেখাবে টিভির পর্দায়। সবুজ দুই মণির সঙ্গে মিলে গেছে জ্যাকেট।
‘কেমন ছিল হেলিকপ্টার ভ্রমণ?’ দুশ্চিন্তার ভান করে বলল স্টিল। যদিও মহিলার ভালমন্দে কিছুই যায় আসে না ওর। ‘কোন কষ্ট হয়নি তো?’
‘ভ্রমণটা ছিল জঘন্য,’ সরাসরি বলল ডায়ানা। ‘পুরো সময় বেঁধে রাখা হয়েছিল আমাদের চোখ। এতে সাক্ষাৎকারের প্রশ্ন ভালভাবে গুছিয়ে নিতে পারিনি।’
‘সেজন্যে আমি সত্যিই দুঃখিত,’ মিথ্যা বলল স্টিল। ‘তবে আশা করি আপনি বুঝতে পেরেছেন, আপাতত আমরা কোথায় আছি, সেটা বড় একটা রহস্য হিসেবে রাখতে চাই।’
‘সেটা বুঝেছি,’ বলল ডায়ানা। অন্য সাংবাদিকদের আগে চমকপ্রদ সব সংবাদ প্রচার করা তার উদ্দেশ্য। আগেও কাভার করেছে স্টিলের কিছু শো। সেসব সাক্ষাৎকারে আগেই বলে দেয়া হয়েছিল, দুর্বল মানসিকতার বা হৃৎপিণ্ডে গোলমাল আছে এমন দর্শক যেন এসব শো না দেখেন। শো-তে ছিল অনৈতিক কিছু দৃশ্য। আর সেজন্যে ডার্টি গেম শো তৈরি করা হচ্ছে জানতেই আলোচনার ঝড় উঠেছে সংবাদ মাধ্যমে। সাংবাদিক মহলে আলাপ চলছে, এবারের শো-তে আন্তর্জাতিক আইন ভাঙতে যাচ্ছে ব্র্যাড স্টিল। তার শো সফল হলে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার মুনাফা করবে সে। আইন ভঙ্গের জন্যে কোন আদালত তাকে দায়ী করলে, প্রচুর টাকার বিনিময়ে নামকরা বেশ ক’জন উকিল লড়বে তার পক্ষে।
‘আসুন, সাক্ষাৎকার শুরু করার আগে সামান্য শ্যাম্পেন নিই,’ হেসে বলল স্টিল।
‘আমার কোন আপত্তি নেই।’
টেবিল থেকে নিয়ে দুটো ফুট গ্লাসে শ্যাম্পেন ঢালল ব্র্যাড। সোনালি তরলে ভরা একটা গ্লাস ডায়ানার হাতে দিয়ে টোস্ট করল। ‘আসুন, প্রার্থনা করি মঙ্গল যেন হয় বিনোদনের জগতের।’
দুই চুমুক শ্যাম্পেন নেয়ার পর শুরু হলো সাক্ষাৎকার। নিজের ইমেজ রক্ষা করতে গিয়ে দু’জনই তারা খুব সতর্ক।
‘স্টিল, আপনি তো আজকাল হলিউডে কাজ করছেন না। সেটা কেন?’
একটা ক্যামেরা তাক করা আছে স্টিলের দিকে। দ্বিতীয় ক্যামেরা দেখাবে ডায়ানার প্রতিক্রিয়া। স্টিলের অনুরোধে ব্যবহার করা হচ্ছে বাউন্স লাইট। তাতে কোমল দেখাবে তার মুখ। কয়েক বছর আগে এক সাংবাদিক শয়তানি করে কড়া আলো ফেলে স্টিলের মুখটাকে সাক্ষাৎ ইবলিশের মত করে দেখিয়েছিল। তারপর থেকে সতর্ক হয়ে গেছে সে।
‘আমি চাই দুনিয়ার মানুষ যেন দেখে সত্যিকার সব দৃশ্য। হলিউডে আপনি বাস্তব কিছু পাবেন না। শুধু হলিউডের কথাই বা বলছি কেন, ইউরোপ, এশিয়া বা অন্য যে-কোন জায়গায় ভাল কোন শো আমরা দেখি না। বাস্তব কিছু দেখাতে গেলেই নানান আইন বেঁধে ফেলে আমাদের মুখ-হাত-পা। আর তাই আমি এমন এক জায়গায় নিজের শো করছি, যেখানে আমাকে বাধা দেবে না কেউ। বলবে না যে এটা করতে পারবে, আর ওটা করতে পারবে না।’
তাঁবুর কোণে দাঁড়িয়ে স্টিলের আত্মবিশ্বাস দেখে বিস্মিত হয়েছে রিটা। অন্তর থেকে যেটা অনুভব করে, সেটাই বলছে ওর প্রেমিক। কণ্ঠে তার বিদ্রোহের সুর। নিজেও টিভির নকল সব অনুষ্ঠান দেখে বিরক্ত রিটা। বুঝে গেছে, মিথ্যা বিনোদন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি দর্শক। আর সেজন্যেই তারা ঝুঁকে গেছে ইণ্টারনেট ও অন্য সব সাইটে।
‘যেহেতু আপনার সঙ্গে বড় কোন টিভি নেটওঅর্ক নেই, তা হলে কীভাবে অনুষ্ঠান ব্রডকাস্ট করবেন ভাবছেন?’ জানতে চাইল ডায়ানা এরেনো।
‘আমি শো প্রচার করব ইন্টারনেটের ওয়েব জুড়ে। আমার দর্শক হবে গোটা দুনিয়ার মানুষ। যার একটা কমপিউটার আর ক্রেডিট কার্ড থাকবে, সে-ই দেখতে পাবে আমার নতুন শো। ওটা হবে লাইভ, আনসেন্সর্ড ও আনকাট।’
‘তা-ই? তা হলে বলুন আপনার নতুন শো-র ব্যাপারে।’
‘আমরা নানান জেলখানা থেকে দশজন দাগী অপরাধীকে সংগ্রহ করে এনেছি। আগামী কিছু দিনের ভেতরে মারা পড়ত তারা। এবার নিজেদের ভেতরে প্রতিযোগিতা করবে এরা। সেটা হবে এ-দ্বীপে। লড়াই চলবে নয়জনের মৃত্যু পর্যন্ত। আর এই প্রতিযোগিতায় যে বিজয়ী হবে, দক্ষিণ এশিয়ার কোন বন্দরে তাকে পৌঁছে দেব আমরা। সে পাবে এক সুটকেস ভরা নগদ ডলার।’
বিস্ময় নিয়ে স্টিলের দিকে তাকাল ডায়ানা। দশ কয়েদীর বিষয়ে সঠিক শুনতে পেয়েছে কি না, সেটা নিয়ে দ্বিধান্বিত মনে প্রশ্ন জাগল তার, মৃত্যু পর্যন্ত লড়তে হবে কেন? আর এসব খুনির শেষজনকেই বা কেন ছেড়ে দেয়া হবে সভ্য জগতে?
ক্যামেরার ওদিকে দাঁড়িয়ে ঢোক গিলল রিটা। চমকে গেছে স্টিলের কথা শুনে। ওর প্রেমিক আগে বলেছিল প্রতিযোগিতা হবে। তখন এটা বলেনি, লড়াই হবে মরণপণ। আর তাতে মরতে হবে নয়জনকে। যে কয়েদী প্রাণে বাঁচবে, মুক্তি দেয়া হবে তাকে।
‘অর্থাৎ নয়জন মরবে, আর প্রাণে বাঁচবে মাত্র একজন, বিস্ময় সামলে নিল ডায়ানা। ‘আর তাদের লড়াই সরাসরি সম্প্রচার করবেন আপনি। আমি কি ভুল শুনেছি?’
সাংবাদিকের গলার আপত্তির সুরটা রোমাঞ্চিত করল স্টিলকে। এর চেয়ে ভাল বিজ্ঞাপন পেত না সে।
‘আসলে, ডায়ানা, আপনার বুঝতে হবে, এই দশজন কিন্তু এমনিতেই ফাঁসি বা বৈদ্যুতিক চেয়ারে মারা যেত। ঘাগু খুনি এরা। তাদের একজন বেঁচে থাকার সুযোগ পাচ্ছে। মনে করি না এতে বড় কোন দোষ আছে।’
‘কিন্তু বিষয়টি অনৈতিক এবং বেআইনী,’ দ্বিধাহীনভাবে বলল ডায়ানা। ‘এই লাইভ হরর সিনেমা দেখাবার জন্যে কত ডলার করে নিচ্ছেন আপনি?’
‘মাত্র এক শ’ নিরানব্বুই ডলার পঁচানব্বুই সেণ্ট। টিকেট কিনলে আমার সাইটে পাবে আনলিমিটেড অ্যাক্সেস। ওদিকে শো-র আইনগত ভিত্তি তৈরি করবে আমার উকিলেরা।’
‘কিন্তু এমন শো কেন তৈরি করছেন? কেন মনে হলো মানুষ লাইভ হরর সিনেমা আগ্রহ নিয়ে দেখবে?’ মহিলার বলার ভঙ্গিতে মনে হলো সিরিয়াল কিলারের সাক্ষাৎকার নিচ্ছে সে।
সবই বুঝে গেছে স্টিল। তবে তাতে কিছুই যায়-আসে না তার। আগেও নানা বিতর্ক তৈরি করেছে। আর বিতর্ক মানেই আরও বেশি দর্শক জুটে যাওয়া।
‘আপনার মনে আছে, আমার প্রথম প্রিমিয়ার যখন গেল নেটওঅর্ক টিভিতে, হলিউডের বোকা প্রডিউসারেরা বলেছিল, আমি নাকি বদ্ধ উন্মাদ। আজ ওরা কোথায়, আর আমি কোন্ পর্যায়ে আছি?’
‘ওরা বলেছিল, অন্তর বলতে আপনার কিছু নেই,’ বলল ডায়ানা, ‘এটাও বলেছে, যারা এসব প্রোগ্রাম দেখে, তারা আসলে মানুষ নয়। প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল দ্য টাইমস- আপনি সত্যিকারের একজন নাস্তিক। রিপোর্টে সাংবাদিক আরও বলে যে…’
মহিলা সাংবাদিকের মুখের কথা কেড়ে নিল স্টিল, ‘হ্যাঁ, আমার বিরুদ্ধে বহুকিছুই সাংবাদিকেরা লিখেছে। তবে এবার যা করছি সেটা আলাদা কিছু। আশা করি সেটা বুঝতে পেরেছেন।’ মহিলা পুরনো কথা তুলছে বলে সে বিরক্ত। অবশ্য এটা ভেবে খুশি, ডায়ানা এরেনোর প্রচারণার কারণে হুড়মুড় করে বাড়বে তার শো-র দর্শক। নিজেও সেটা জানে মহিলা, সাঁই-সাঁই করে রেটিং বাড়বে তার সাক্ষাৎকারের।
স্টিলের কথা শুনে তিক্ত হয়ে গেছে ডায়ানার মন। তার বস্ তাকে এখানে পাঠিয়ে দিয়েছে রসাল রিপোর্ট পাবে বলে। সেটা হয়তো হবে, কিন্তু সৎ এক সাংবাদিক হিসেবে স্টিলের গায়ে বমি করতে ইচ্ছে হচ্ছে তার। নৈতিকতা মেনে চলা মানুষ সে। তিন ছেলেমেয়ের মা। কয়েক সেকেণ্ড পর সে খেয়াল করল, হাত থেকে মেঝেতে পড়ে গেছে নোস্।
‘আপনি তো মিলিয়নেয়ার। সত্যিকারের খুনোখুনি দেখিয়ে হয়তো হবেন বিলিয়নেয়ার। কিন্তু এসব করতে গিয়ে মনে কি কোন লজ্জা অনুভব করছেন না আপনি?’
জোর করে হাসল স্টিল। সরাসরি চোখ রেখেছে ক্যামেরার লেন্সের দিকে। ‘মানুষ যা দেখতে পছন্দ করে, আমি শুধু সেই ধরনের শো তৈরি করি। সেটা কি খুব দোষের?’
‘আপনার কথা বুঝলাম। তো আমার একটা প্রশ্নের জবাব দিন। আমার ধারণা, আপনার দর্শকেরা একই কথা ভাববে। আপনি যখন আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াবেন, নিজেকে কী দৃষ্টিতে দেখবেন?’ চড়ে গেছে ডায়ানা এরেনোর গলা।
মহিলার সঙ্গে ডার্টি গেম শো নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করবে ভেবেছিল স্টিল, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে গোপন করতে হবে বহু কিছু। ভাল হতো অন্তর খুলে কথা বলতে পারলে। যেমন দুই মেক্সিকান স্বামী ও স্ত্রী যখন প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়ার জন্যে নিজেদের ভেতরে লড়বে, কী দারুণভাবেই না দুলবে দর্শকের মন। অথবা নিজেদের ভেতরে যখন লড়বে খুনি জার্মান নাৎসি ও ধর্ষক এসএএস অফিসার-বারবার দেখানো হবে তাদের দুই দেশের পতাকা। কী দারুণই না জমবে খেলা!
‘আসলে আপনার মত সাংবাদিক ও সমালোচকদের চোখে নিজেকে বারবার ছোট হতে দেখে আমি খুব বিরক্ত। আর তাই ঘাড় থেকে নামিয়ে দিয়েছি আপনাদের হলিউড। দুনিয়ার সবার জন্যে খোলা থাকবে আমার শো। প্রতিটি নেটওঅর্ক ও শোগুলোকে কাঁচকলা দেখিয়ে ডার্টি গেম হবে সর্বকালের সেরা শো। এই বিষয়ে মনে কোন ভুল ধারণা রাখবেন না।’
ডায়ানা বুঝে গেছে রাগিয়ে দিতে পেরেছে স্টিলকে। ‘তা হলে বুকে হাত রেখে বলতে পারবেন, যা করছেন সেটা নৈতিক?’
পরের দশ মিনিট ঝড়ের বেগে চলল সাক্ষাৎকার। দু’জনই যে-যার যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চাইল পরস্পরকে। তাতে রেগে গেল দু’জনই। এরপর দশ মিনিট পর ঝট্ করে উঠে দাঁড়াল স্টিল। ল্যাপেল থেকে মাইক্রোফোন খুলে বরফের মত শীতল হাসি দিয়ে বলল, ‘আমার আর কিছু বলার নেই। ভাল লাগল আপনার সঙ্গ। ভাল থাকবেন।’ দ্রুত তাঁবু থেকে বেরিয়ে এল সে। ডায়ানাকে এখানে এনে পূরণ হয়েছে তার উদ্দেশ্য। আগেই টিভির জগতের মন্দ লোক হিসেবে প্রমাণিত ছিল সে, আর এবার হবে ইন্টারনেট জগতের দানব। ফলে এবারের শো-তে দুনিয়ার অন্যসব শো-র চেয়ে বেশি দর্শক পাবে।
তাঁবুর ভেতরে রয়ে গেছে রিটা। বুকের ভেতরে হিমবাহের চেয়ে ঠাণ্ডা লাগছে ওর। আজ স্টিল নিজের আরেকটা রূপ দেখিয়ে দিয়েছে। অবশ্য এ-ও ঠিক, এত বিরোধিতার মুখে পড়লে কারই বা মেজাজ ভাল থাকে!
নিজেকে বুঝ দিল রিটা, আর যাই হোক স্টিল তো একজন মানুষ। ওর কিছু দোষ থাকবে না, তা হবে কেন! তা ছাড়া, হয়তো খুনোখুনি এড়িয়ে যাবে। সাক্ষাৎকারে জেনে- বুঝে মিথ্যা বলেছে, যাতে বিক্রি করা যায় প্রচুর টিকেট।
রিটা ও ডায়ানার দৃষ্টি মিলিত হতে অস্বস্তিতে পড়ল ওরা।
‘যা হলো সেজন্যে আমি দুঃখিত,’ বলল রিটা। ‘আসলে খুব চাপের ভেতরে আছে স্টিল।’
‘আপনি কি জানেন, আসলে এখানে কী করছেন স্টিল?’ জানতে চাইল ডায়ানা।
এ-প্রশ্নের সহজ কোন জবাব নেই রিটার কাছে। স্টিলকে ভালবাসে সে। জানে, বাধ্য হয়ে আধুনিক দুনিয়াতেও মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখেছে বহু দেশ। দাগী আসামীরা ডাকাত, খুনি ও ধর্ষক। তাদের জন্যে সর্বনাশ হচ্ছে বহু পরিবারের। আর ডার্টি গেমের জন্যে নির্বাচিত ভয়ঙ্কর অপরাধীদের আগেই দেয়া হয়েছে মৃত্যুদণ্ড। একসময়ে রিটার মাতৃভূমি ইংল্যাণ্ডেও ছিল চরম এই রায়। সেটা বেশিকাল আগের কথাও নয়। এদিকে স্টিল চাইছে সাধারণ মানুষ যেটা দেখতে পছন্দ করে, সেটা ক্যামেরায় ধারণ করে প্রচার করতে। সেটা ন্যায্য বলে ভাবছে না ডায়ানা। তার এই সাক্ষাৎকারের আলোকে মানুষের হিংস্র ভাবটা এবার প্রকটভাবে ফুটে উঠবে।
কয়েক সেকেণ্ড চুপ করে থেকে তাঁবু ছেড়ে বেরিয়ে এল রিটা। আবার গিয়ে ঢুকল বিশাল তাঁবুতে।
নিজের চেয়ারে বসে এলইডি স্ক্রিনের দিকে চেয়ে আছে ব্র্যাড। চেহারায় অপরাধের কোন ছাপ নেই।
‘ইয়ে… ব্র্যাড…. আমরা বড় একটা ঝামেলায় পড়েছি, ‘ অস্বস্তি নিয়ে বলল এমিলি। চট করে দেখে নিল সিওয়ার্সকে।
‘ব্যাপারটা বেশ জটিল,’ মুখ খুলল সিওয়ার্স।
অনুগত দুই কর্মচারীর দিকে তাকাল স্টিল। মনে বইছে কালবৈশাখী ঝড়। বাজে কোন সংবাদ শুনলে রেগে উঠবে T
গলা পরিষ্কার করে নিচু গলায় বলল এমিলি, ‘আমাদের এক প্রতিযোগীকে হারিয়ে বসেছি আমরা।’
‘সংক্ষেপে বলো কী হয়েছে?’ থমথমে কণ্ঠে জানতে চাইল স্টিল। চেয়ার ছেড়ে চলে গেল সিওয়ার্স আর এমিলির সামনে।
‘মরোক্কোর জেলখানা থেকে সিরিয়ান যে খুনিটাকে আমরা বের করে এনেছি, এ-দেশে নামার পর আসলে বেশি বাড়াবাড়ি করছিল…’ একবার ঢোক গিলে নিয়ে চুপ করে গেল সিওয়ার্স।
‘ওর হাতে-পায়ে শেকল ছিল, তবে তার পরেও গলা টিপে মেরে ফেলেছে আমাদের এক গার্ডকে,’ কথা শেষ করল এমিলি।
‘অন্য গার্ডেরা তখন পেটাতে থাকে ওকে, বলল সিওয়ার্স, ‘পাল্টা হামলা করে হারামজাদা। তাকে ঠাণ্ডা করতে না পেরে গুলি করে একজন গার্ড। আরব লোকটার মাথায় গুলি লেগেছে। মারা গেছে সঙ্গে সঙ্গে।’
সিওয়ার্স ও এমিলির দিকে অবিশ্বাস নিয়ে তাকাল স্টিল। রাগে কাঁপছে ওর শরীর। মনে হচ্ছে কারও ওপরে গায়ের ঝাল মেটাতে না পারলে পুড়ে খাক হবে অন্তর।
এমিলি ও সিওয়ার্স তার বিশ্বস্ত কর্মচারী। নিজে অনেকের মাঝ থেকে এদের বেছে নিয়েছে স্টিল। কমপিউটার ও টেলিভিশন অনুষ্ঠানের বিষয়ে ভাল ইউনিভার্সিটি থেকে ডিগ্রি পেয়েছে এরা। বিশেষ করে সিওয়ার্স ছিল তরুণ প্রতিভাবান হ্যাকার। ওর চেয়ে বেশি কেউ জানে না ওয়েব সম্পর্কে। ওদের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়া অনুচিত, নিজেকে সতর্ক করল স্টিল। বেসুরো কণ্ঠে জানতে চাইল, ‘ওরা গুলি করে মেরে ফেলেছে আমার আরব লোকটাকে?’
এলইডি স্ক্রিনে বক্সের ভেতরে দেখা যাচ্ছে আরব লোকটার ছবি। এখন আর তার ছবি রেখে কোন লাভ হবে না। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগেই ঝরে গেছে দশজনের একজন।
‘স্কাউটকে বলো যেখান থেকে হোক যেন জোগাড় করে আরেকজন প্রতিযোগী,’ গম্ভীর কণ্ঠে বলল স্টিল।
‘ভাববেন না, বস্,’ বলল এমিলি, ‘এরই ভেতরে আরেক অপরাধীকে খুঁজে বের করেছে স্কাউট।’
‘তা-ই?’ ডানহাতে কপাল টিপতে শুরু করল স্টিল। ‘সে কে? কোথায় আছে? আগে দেখতে হবে তাকে দিয়ে আমাদের চলবে কি না।’
ফোনে কার সঙ্গে যেন কথা বলতে লাগল সিওয়ার্স।
কমপিউটার স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে রিটাকে বলল এমিলি, ‘সাক্ষাৎকার কেমন হলো?’
‘ভাল,’ রিটা কিছু বলার আগেই বলল স্টিল।
হিংস্র চেহারার এক অপরাধীর ছবি স্ক্রিনে আনল এমিলি। নিচে লেখা কী ধরনের অপরাধ করেছে লোকটা।
‘রদ্রিগো পেদ্রো। গুয়েতেমালার গুয়েতেমালার খুনি ও ধর্ষক। নির্মমভাবে খুন করেছে তেরোজন মানুষকে।
ছবি দেখে মাথা নাড়ল স্টিল। ‘গুয়েতেমালার খুনি চাই না। এরই ভেতরে পেয়েছি মেক্সিকোর দুটোকে। গোটা পৃথিবী থেকে লোক নেব, আর তাই নিয়েছিলাম একজন মুসলিম। আরব না হলেও মুসলিম হতেই হবে।’
একদিকের দেয়ালে ঝুলছে বিশাল মানচিত্র, ওখানে গিয়ে আঙুল তাক করল স্টিল। ‘আরবের না পেলে অন্য দেশের মুসলিম ধরে আনুক। সেক্ষেত্রে মুসলিমরাও শো দেখবে।’
ফোন টেবিলে রেখে স্টিলের দিকে তাকাল সিওয়ার্স। ‘স্কাউট বলছে দক্ষিণ আমেরিকায় ছয়জন মুসলিম অপরাধী পেয়েছে, যাদেরকে বিক্রি করতে রাজি জেলখানার সুপার। স্কাউট এখন তার সঙ্গে কথা বলবে।’
‘অপরাধীরা কোন দেশের? মুসলিম তো?’
‘মুসলিম তাতে সন্দেহ নেই,’ হাসল সিওয়ার্স। ‘সিরিয়ান আর ইরাকি সন্ত্রাসী দিয়ে কি আমাদের চলবে, বস্?’
‘দাম কত?’ মৃত আরব অপরাধীর ছবিটা দেখল স্টিল।
‘এখনও ঠিক করা যায়নি,’ জানাল সিওয়ার্স।
‘সবচেয়ে ভালটার ভিডিয়ো পাঠাতে বলো। তাকে নিজের
চোখে দেখতে চাই। অনলাইনে যেন যোগ্যতার প্রমাণ পাই, সেটা স্কাউটকে জানিয়ে দাও।’
