ডার্টি গেম – ৩৫
পঁয়ত্রিশ
ক্যানিয়নের যেদিক দিয়ে উঠে গেছে রুপার্ট শ্যানন, একই পথ অনুসরণ করে উঠে এল রানা। রক্তাক্ত শরীরের জায়গায় জায়গায় তীব্র ব্যথা। বারবার নিজেকে বলছে, খুঁজে নিতে হবে শ্যানন আর স্টিলকে। চুকিয়ে দিতে হবে ওদের পাওনা।
অধিত্যকায় উঠে মাত্র একমাইল দূরে ওয়েদার টাওয়ার দেখতে পেল রানা। ওর মনে কোন সন্দেহ থাকল না যে ওখানেই নেয়া হয়েছে শ্যাননকে। চট করে টাইমার দেখে নিল রানা। হাতে আছে মাত্র কয়েক মিনিট, তারপর বিস্ফোরিত হবে প্লাস্টিক বম।
আহত দেহে পাঁচ মিনিটে স্টিলের কমপাউণ্ডে পৌঁছে যেতে পারবে বলে ভাবছে রানা। শরীর থেকে ঝরঝর করে ঝরছে রক্ত। দ্রুত হাঁটতে লাগল ও। কখনও কখনও হালকা দৌড়ে এগোচ্ছে। একটু পর ঢুকে পড়ল জঙ্গলে। টাইমারে নয় মিনিট থাকতেই পৌঁছে গেল স্টিলের তাঁবুর গ্রামের গেটে। তখনই শুনতে পেল বিআর ১৮ অ্যাসল্ট রাইফেলের একঝাঁক গুলির আওয়াজ। আধ মিনিট আগেও প্রধান গেটের কাছে ছিল দু’জন তরুণ গার্ড, তবে গোলাগুলির আওয়াজে ভয় পেয়ে ছুটে জঙ্গলে পালিয়ে গেছে তারা। এখন গুলি হচ্ছে থেমে থেমে। কোন বাধা ছাড়াই খোলা গেট পেরিয়ে কম্পাউণ্ডে ঢুকে পড়ল রানা। বিশাল তাঁবুর ভেতর থেকে শুনতে পেল ক’জনের আর্তচিৎকার।
বোধহয় ওখানেই গুলি করছে রুপার্ট শ্যানন।
দুর্বল শরীরেও মস্তবড় তাঁবুটার দিকে ছুটল রানা। একটু দূরে দেখতে পেল তাঁবুর প্রবেশ-পথে এক টেকনিশিয়ান। আর তখনই পেছন থেকে তাকে ফুটো করে দিল একটা গুলি। দৌড়ে গিয়ে তাঁবুতে ঢুকল তরুণ দুই গার্ড। পরক্ষণে গুলির আওয়াজ হতেই করুণ চিৎকার শুনতে পেল রানা। ওর বুঝতে দেরি হলো না, শ্যাননের রাইফেলের গুলিতে খুন হয়ে গেছে গার্ডেরা।
শ্যাননের অকথ্য গালি ভেসে এল রানার কানে। একটু পর পর এক বা একাধিক মানুষকে গুলি করছে সাইকো লোকটা।
একটা জিপের পাশে পড়ে আছে দু’জন গার্ড। তাদের একজনের পাশে বিআর ১৮ অ্যাসল্ট রাইফেল। কয়েক পা এগিয়ে অস্ত্রটা তুলে নিতে চাইল রানা, তবে তখনই ওর থুতনির নিচে ধুপ করে লাগল বুটের ডগা। ছিটকে মাটিতে পড়ে গেল রানা।
আচমকা এসে হামলা করেছে রিভ সিম্পসন। ঝুঁকে রানার দু’চোখের মাঝে তাক করল নাইন এমএম সেমিঅটোমেটিক সিগসাওয়ার পিস্তল। চাপা স্বরে বলল, ‘শালা, শেষমেশ তোকে পেলাম! একদম নড়বি না!’
কম্পাউণ্ডে রানাকে দেখে বিস্মিত হয়েছে লোকটা। তার ধারণা ছিল প্রতিযোগিতার শেষ দিকে খুন হয়েছে রানা। কিন্তু এখন যখন দেখা যাচ্ছে দিব্বি বেঁচে আছে বাঙালি লোকটা, তো সিম্পসনের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে তাকে খতম করে দেয়া। অবশ্য গুলি করলে মস্তবড় ঝুঁকি নিতে হবে তাকে। হয়তো আওয়াজ পেয়ে তার ওপরে হামলা করবে রুপার্ট শ্যানন। সেটা এড়াতে চাইছে সিম্পসন। বিশেষ করে ইংরেজ সাইকোর হাতে যখন আছে অ্যাসল্ট রাইফেল।
এখন কী করবে সেটা ভাবতে শুরু করেছে সিম্পসন, এমন সময় একটা তাঁবুর ওদিক থেকে এল ব্র্যাড স্টিল। গুলি আর আর্তনাদ শুরু হতেই ভেবেছে সিম্পসনকে ফেলে পালিয়ে যাবে সে। কিন্তু তখন তার মনে হয়েছে, যেহেতু বেইমানি করেছে ব্রিটিশ সাইকোর সঙ্গে, তাই সে যখন বুঝবে বড় তাঁবুতে স্টিল নেই, তখনই বেরিয়ে এসে খুঁজতে শুরু করবে তাকে-সুতরাং শ্যাননের হাত থেকে বাঁচাতে কাউকে না কাউকে চাই পাহারাদার হিসেবে।
উঠানে পড়ে আছে রানা। তার দিকে পিস্তল তাক করে রেখেছে সিম্পসন। বাঙালি যুবককে দেখে তিক্ত হয়ে গেল স্টিলের মন। ভাবল, এই শালা আসলে গু-র চেয়েও আঠাল। যেন পণ করেছে কোনভাবেই আর মরবে না!
‘ভাল একটা শো উপহার দেয়ায় তোমাকে অনেক ধন্যবাদ,’ খুশি-খুশি স্বরে রানাকে বলল স্টিল।
‘এই শো এখনও শেষ হয়নি,’ আধশোয়া হয়ে বসল রানা। টপটপ করে ওর মুখ থেকে বুকে পড়ছে রক্ত।
বিশাল তাঁবু থেকে এল গুলি ও আর্তচিৎকার। রানাকে গুলি করলে সেই আওয়াজে বেরিয়ে আসবে শ্যানন। চট্ করে সিম্পসনের দিকে তাকাল স্টিল। ‘চলো, রওনা হই। একে ঠিকই শেষ করে দেবে শ্যানন।’
রানার মুখের দিকে পিস্তল তাক করে রেখেছে সিম্পসন। বারবার মনে হচ্ছে তার, শালাকে খতম করে দিয়ে যাই।
‘জিপের সামনে অপেক্ষা করুন,’ স্টিলকে বলল সে। ‘আমি এক্ষুণি আসছি।’
জিপের দিকে ব্র্যাড স্টিল পা বাড়াতেই ঘাড় কাত করে তাকে দেখল রানা। নিচু গলায় বলল, ‘তোমার মরতে হবে আমার হাতে।’
রানাকে পাত্তা না দিয়ে জিপের দিকে চলল স্টিল। সিম্পসনের চোখে তাকাল রানা। ‘তুমিও বাঁচবে না।’
‘শালা, তোর মাথাটা সত্যিই গেছে,’ হেসে ফেলল সিম্পসন। কথাটা মাত্র শেষ করেছে, এমন সময় হাতের ঝাপটা দিয়ে পিস্তলের নল অন্যদিকে সরিয়ে দিল রানা। অন্যহাতে লোকটার দু’হাঁটু ধরে টান দিয়েছে সামনের দিকে। পা ভাঁজ হয়ে যেতেই মাটিতে কাত হয়ে পড়ল সিকিউরিটি চিফ। হাত থেকে খসে গেছে পিস্তল। পরের সেকেণ্ডে হাত বাড়িয়ে তুলে নিতে চাইল অস্ত্রটা। কিন্তু ক্ষিপ্র বাঘের মত তার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল রানা। ওর গায়ের জোর এখনও সিম্পসনের চেয়ে খুব বেশি কম নয়। লোকটার হাত থেকে কেড়ে নিল সিগ সাওয়ার পিস্তলটা। পরক্ষণে পর পর তিনটে গুলি গেঁথে দিল সিম্পসনের বুকে।
গুলির আওয়াজে ঘুরে তাকাল ব্র্যাড স্টিল। ভীষণ ভয় চেপে বসল তার মনে। ঝেড়ে দৌড় দিল জিপের দিকে।
ঝট্ করে মুখ তুলে তাকে দেখল রানা। লাফ দিয়ে জিপে উঠে ইঞ্জিন চালু করে রওনা হয়ে গেল স্টিল।
এদিকে বিশাল তাঁবুর ভেতরে আবারও গর্জে উঠেছে আগ্নেয়াস্ত্র।
রানা বুঝে গেল, শ্যাননকে শেষ করা এখন খুব জরুরি। সুতরাং আপাতত পিছু নিতে পারবে না প্রযোজক স্টিলের।
.
বিশাল তাঁবুর ভেতরে সিওয়ার্সের লাশের দিকে চেয়ে আছে রুপার্ট শ্যানন, ভাবছে আসলে কোথায় লুকিয়ে আছে ব্র্যাড স্টিল?
হঠাৎ বাইরে গুলির আওয়াজ শুনে তাঁবুর পেছনে চলে গেল সে। অন্ধকার এক জায়গায় নজর পড়তেই সরু হয়ে গেল তার চোখ। তাঁবুর কোণে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রিটা! ভয়ে বিকৃত হয়ে গেছে ওর মুখ। বুঝে গেছে, যে-কোন সময়ে অন্যদের মত এবার খুন হবে। ভয় পেলেও বুঝে গেছে, কখনও জীবন ভিক্ষা চাইবে না রুপার্ট শ্যাননের কাছে। অন্যায় শো-তে যোগ দিয়েছে বলে বিবেকের কাছে চিরকালের জন্যে অপরাধী হয়ে গেছে ও। তাই ধরে নিয়েছে, পাপে জড়িত ছিল বলে মৃত্যু এখন ওর প্রাপ্য। আর সেটা মেনেও নেবে মুখ বুজে।
সুন্দরী মেয়েটাকে দেখে হেসে ফেলল শ্যানন। চিনে গেছে রিটা আসলে কে। সত্যি যদি কেউ জানে কোথায় গেছে স্টিল, তো সে এ-ই মেয়ে! এবার তার কাছ থেকে সবই জেনে নেবে শ্যানন। নোংরা হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে এগোল রিটার দিকে।
বারকয়েক চোখ পিটপিট করল রিটা। ওর দৃষ্টি শ্যাননের পেছনে। কেউ যে তাঁবুতে এসে ঢুকেছে, সেটা বুঝে গেল ইংরেজ সাইকো। ঝট্ করে ঘুরে দাঁড়াতে চাইল সে, কিন্তু তার আগেই মেরুদণ্ডে ঠেকে গেল শীতল ধাতব কিছু। ওটা নিশ্চয়ই কোন আগ্নেয়াস্ত্র!
পাথরের মূর্তি হয়ে গেছে শ্যানন। ওর পেছনের লোকটা বোধহয় কোন গার্ড বা সিকিউরিটি চিফ সিম্পসন। স্টিলের দলের গার্ড বা তাদের বস্ আসলে অদক্ষ, কাজেই ধৈর্য ধরলে পরে প্রথম সুযোগে শেষ করে দিতে পারবে লোকটাকে।
শ্যাননের হাত থেকে বিআর ১৮ রাইফেল কেড়ে নিয়ে দূরে ছুঁড়ে ফেলল রানা। চাপা স্বরে বলল, ‘বসে পড়ো।’
রানার হাতের ধাক্কা খেয়ে স্টিলের চেয়ারে বসতে বাধ্য হলো শ্যানন। চোখের কোণে রানাকে দেখে চুনের মত সাদা হয়ে গেছে তার মুখ। ভেবে পাচ্ছে না ফেলে আসা লাশ আবার কীভাবে জিন্দা হলো। ‘তোমার সঙ্গে আমার আসলে কোন শত্ৰুতা নেই,’ নিচু গলায় বলল সে। অজান্তে চোখ গেল তাঁবুতে তার খুন করা লাশগুলোর ওপরে। আত্মসমর্থন করল শ্যানন, ‘আমি কিন্তু এসব করতে ভলান্টিয়ার হইনি। এদের আসলে যা প্রাপ্য, সেটাই পেয়েছে তারা। আমি তো আসলে তোমার সঙ্গে লড়তেও চাইনি। আমাদেরকে যা করতে বলা হয়েছে, সেটার দায় আসলে ব্র্যাড স্টিল আর তার দলের লোকের। আমার কথা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছ?’
‘এবার বাজে কথা বাদ দাও,’ গুডগুড করে উঠল রানার গম্ভীর কণ্ঠ। সরাসরি শ্যাননের কপালে তাক করল সিম্পসনের পিস্তলের নল।
‘আমি কিন্তু কোন মিথ্যা কথা বলছি না। যা করার সেটা করেছে…’
ইংরেজ সাইকোর কপালে ঘামের বিন্দু ফুটতে দেখছে রানা। ভীষণ ভয় তার চোখে। ‘ভাই, রানা, বিশ্বাস করো, আসলে বাধ্য হয়ে আমাকে এসব করতে হয়েছে।’
‘তা-ই?’ তিক্ত হাসল রানা।
‘হ্যাঁ, আর ভাল লাগছে যে সব নোংরামি শেষমেশ খতম হয়ে গেছে।’
‘নোংরামি এখনও আসলে শেষ হয়নি,’ মাথা নাড়ল রানা, ‘তুমি ওটার বড় অংশ। আর সেটা এবার শেষ করে দিচ্ছি।’ সিম্পসনের পিস্তলের প্রতিটি গুলি শ্যাননের বুকে গেঁথে দিল ও।
স্টিলের আরামদায়ক চেয়ার থেকে কাত হয়ে কার্পেটে মোড়া মেঝেতে ধুপ করে পড়ল ইংরেজ সাইকোপ্যাথের লাশ।
