ডার্টি গেম – ৪
চার
পাপুয়া নিউ গিনি থেকে হাজারো মাইল দূরে পাহাড়ি পথে ওপরদিকে ছুটে চলেছে এক এসইউভি, ছাতে শক্তিশালী স্যাটেলাইট ডিশ। গাড়ি ড্রাইভ করছে বনি মার্সেলের পরিচিত এক লোক। ক্যামেরাম্যান হিসেবে পেছনের সিটে আছে তার সঙ্গী। বনি মার্সেল চাইলেই দুনিয়ার নানান অংশে হাজির হতে পারবে না, তাই এদের দু’জনকে ভাড়া করেছে সে। এখন এসইউভি নিয়ে এল সালভেদরের সোনসোনেট কারাগারের দিকে উঠে চলেছে এরা। জেলারের সঙ্গে এরই ভেতরে আলাপ করেছে স্কাউট। অন্য কারাগারে কয়েকজন কয়েদীকে খুন করেছে বলে এই কারাগারে সরিয়ে আনা হয়েছিল ভয়ঙ্কর খুনি হাতিম আল-রহিমকে। তিন লাখ ডলারের বিনিময়ে তাকে বিক্রি করতে রাজি আছে জেল সুপার।
পুরনো দুর্গ সোনসোনেট থেকে চোখে পড়ে দিগন্ত বিস্তৃত সুনীল প্রশান্ত মহাসাগর। বেশিরভাগ সময় উঁচু পর্বতের ওপরে ধূসর মেঘের ভেলায় লুকিয়ে থাকে আঠারো শ’ সালে তৈরি এই কারাগার। ওটার চারপাশে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ। কারাগারের দু’মাইল দূর থেকে নাকে আসে শ্যাওলা ও পয়োবর্জ্যের দুর্গন্ধ। প্রায় পচা কাঠের ফটকের সামনে এসইউভি থামতে খুলে গেল ফটক। ড্রাইভার ও ক্যামেরাম্যানের কাগজপত্র মন দিয়ে দেখতে গেল না গার্ডেরা। হাতের ইশারায় জানিয়ে দিল গাড়ি নিয়ে ভেতরে ঢুকতে পারে তারা।
ড্রাইভার ও ক্যামেরাম্যান দু’জনই এল সালভেদারিয়ান। ভেতরের উঠনে থেমে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল তারা। তাদের সামনে এসে থামল একজন গার্ড। হাতের ইশারায় দেখিয়ে দিল কোথায় আছে ওয়ার্ডেনের অফিস।
পরের দশ মিনিটে জেলারের অফিসে স্থির হলো অপরাধীর জন্যে দরদাম। ঠোঁট থেকে কালো চুরুট নামিয়ে হলদে দাঁত বের করে হাসল জেলার। তার কোঁচকানো ইউনিফর্ম ঢেকে দিয়েছে বিশাল ভুঁড়ি। গা থেকে এল ঘামের বোটকা টকটক গন্ধ। মুখভরা খোঁচা-খোঁচা দাড়ি তার। অতিরিক্ত মদ্যপান করে আপেলের মত লাল করে তুলেছে আলুর মত নাক। মাথার ওপরে চেপে বসা ক্যাপ ঠিক করে নিয়ে ইন্টারকমের রিসিভার তুলে কাকে যেন নির্দেশ দিল সৈ। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘চলুন, দেখা যাক আপনাদের পছন্দ হয় কি না!’
দুর্গের ভেতরে সারি সারি পাথুরে প্রকোষ্ঠ। বন্দিদের কখনও ব্যায়াম করাতে নেয়া হয় না উঠনে। জায়গাটা যেন পাতালপুরী। দেয়ালের গায়ে সবজেটে শেওলা। নানান দিকে সরু করিডর। কোন কোনটা নেমে গেছে বেসমেন্টে। পাথরের করিডরে খট খট শব্দ তুলছে জেলারের বুটের হিল। বেসমেন্টে নামতেই নাকে এল কাঁচা পায়খানা ও প্রস্রাবের কটু দুর্গন্ধ। খুব নিচু এই তলার ছাত। ওপরতলার পাইপ নেমে এসেছে এখানে। জয়েন্ট বেয়ে চুইয়ে নামছে মলমূত্র ভরা দূষিত পানি।
অন্ধকারাচ্ছন্ন এক করিডর ধরে এগোল জেলার। তার পিছু নিয়ে হাঁটছে এসইউভির ড্রাইভার ও ক্যামেরাম্যান। বিশ গজ যেতেই সামনে পড়ল পুরু লোহার ছোট এক দরজা। এপাশে দু’জন গার্ড। হাতে এলজি বুলেট ভরা শটগান।। দরজার নিচে ফুড স্লট থেকে আসছে হলদেটে আলো। গার্ডদেরকে গেট খুলতে হাতের ইশারা করল জেলার।
ক্যাঁচকোঁচ শব্দে খুলল জং-ধরা ছোট গেট। ওদিকে ত্রিশ ফুট বাই ত্রিশ ফুটের বড় সেল। ওপরে একদিকের সরু এক জানালা দিয়ে আসছে রোদ। এককোণে লোহার শিকের তৈরি খাঁচা আপাতত খালি। কামরার একদিকে ছাতের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশালদেহী এক ইরাকি আরব।
‘হাতিম!’ জোর গলায় তাকে ডাকল জেলার।
ধীরে ধীরে মুখ নিচু করে তাকে দেখল হাতিম আল- রহিম। গলায় লোহার কলারের সঙ্গে পুরু শেকল। ওটার শেষমাথা তালা মেরে আটকে দেয়া হয়েছে দেয়ালের লোহার প্লেটে। সবমিলিয়ে দশ ফুট হাঁটতে পারবে আরব লোকটা।
‘সত্যিকারের এক জানোয়ার,’ বলল জেলার।
হাতিম আল-রহিমের পরনে শার্ট নেই। সারাশরীর বড় বড় কালো রোমে ভরা। মানুষের চেয়ে ভালুকের সঙ্গেই যেন তার বেশি মিল। হাতে-পায়ে থোকা থোকা পেশি। খাঁচায় বন্দি বাঘের চোখে জেলারের দিকে চেয়ে আছে সে।
‘ডেসেও প্রোবারলো,’ জানাল ড্রাইভার।
পরীক্ষা না করে তারা কিনবে না এই বন্দিকে।
দুর্গন্ধ ভরা চুরুট মুখ থেকে নামাল জেলার। চেহারায় পুরনো গাড়ির সেলসম্যানের মত বিরক্তির ছাপ। ভাবটা এমন যে: কিনলে কেনো, নইলে ভাগো। কয় পয়সাই বা দেবে!
‘ভাল দেখে একটা আরব ধরে আন!’ গার্ডদের দিকে চেয়ে খেঁকিয়ে উঠল সে। ‘মুসলিমগুলোর মধ্যে মজিদ আল- কবিরকে আনলে ভাল। এক কাজ কর, দুটো নিয়ে আয়। কবিরের পাশের সেলে আছে মাসুদ রানা। ওটা আরব না হলেও চোখ দেখলে মনে হয় ব্যাটা আসলে ক্ষুধার্ত সিংহ।’
করিডরে বেরিয়ে সরু প্যাসেজে ঢুকল দুই গার্ড। কিছুক্ষণ পর পৌঁছে গেল ডানজনের মত এক জায়গায়। একের পর এক সেল পার হয়ে থামল একটি কুঠুরির সামনে। হাতিমের ঘরের চারভাগের একভাগ হবে এই কুঠরি। ভেতরে একা আছে মজিদ আল-কবির। ঘোলা চোখে গার্ডদের দিকে তাকাল সে।
শিকের দরজা খুলল এক গার্ড। তার সঙ্গী দু’হাতে বাগিয়ে ধরেছে গুলি ভরা শটগান।
‘অ্যাই, মজিদ! বেরিয়ে আয়!’
তিক্ত চেহারায় উঠে দাঁড়াল প্রকাণ্ডদেহী মজিদ। জেলারের তলব মানেই খারাপ খবর। আজই হয়তো ফাঁসি হবে তার। তবুও বলা যায় না, সুযোগ হয়তো আসবে ভেগে যাওয়ার।
অস্ত্রের মুখে সেল থেকে বেরোল মজিদ আল-কবির। যে গার্ড দরজা খুলে দিয়েছে, সে খুলল পাশের কুঠরির দরজা। এবারের কামরা বেশ বড়, ভেতরে অন্তত দশজন কয়েদী।
‘বেরিয়ে আয়, মাসুদ রানা,’ হুঙ্কার ছাড়ল গার্ডদের একজন, ‘জেলার তোকেও ডেকেছেন।’
ছোট্ট জানালার সামনে আছে মাসুদ রানা। ওদিক থেকে আসছে হলদে রোদ। নিজের ভাগের রুটির গুঁড়ো কয়েকটা চড়ই পাখিকে খাওয়াচ্ছে বাঙালি যুবক। মাথার দীর্ঘ চুল এলোমেলো। মুখে খোঁচা-খোঁচা দাড়ি। ভাবলেশহীন চেহারায় দরজার দিকে এল সে। কবিরের মতই বুঝে গেছে, মন্দ কোন সংবাদ দেবে জেলার। করিডরে বেরোতেই ওদের দু’জনকে সামনে রেখে পিছু নিল অস্ত্র হাতে দুই গার্ড।
ধীরপায়ে হাঁটছে মাসুদ রানা। ওর মনে পড়েছে কয়েক মাস আগের বিপজ্জনক এক মিশনের কথা।
ওটার নাম ছিল অপারেশন ব্ল্যাক লিস্ট। এ-বিষয়ে ওর কাছ থেকে জেনে ছোট এক বই লিখেছিল বাংলাদেশি এক লেখক। তারপর থেকে নাকি তাকে খুব ত্যক্ত করছে তার পাঠকেরা। তাই শেষমেশ উপায় না দেখে যোগাযোগ করেছিল ওর সঙ্গে। ফোনে অনুনয় করেছে, ‘স্যর, এত প্রশ্নের জবাব দিতে না পেরে আমি তো প্রায় পাগল হয়ে যাচ্ছি! প্লিয, আমাকে কি একটু সময় দেবেন? আমি শুধু জানতে চাই, ব্ল্যাক লিস্ট আপনার হাতে এলে তারপর কী হলো? ড্রাগসের চালান কি বন্ধ হয়েছে দেশে আসা? গ্রেফতার করা গেছে মাফিয়ার সেসব ক্রিমিনালদেরকে?’
গোপন কথা ফোনে বলতে চায়নি রানা। তাই জানিয়ে দিয়েছে, লেখক যেন ওর বাড়িতে এসে দেখা করেন।
পরদিন সকাল নয়টায় গুলশান এক-এ রানার বাড়িতে এল লেখক। তাকে ড্রয়িংরুমে বসিয়ে সংক্ষেপে ব্ল্যাক লিস্ট মিশন সম্পর্কে জরুরি আরও কিছু তথ্য দিয়েছে রানা। সোনসোনেট কারাগারের করিডর ধরে হাঁটতে হাঁটতে পরিষ্কার মনে পড়ল ওর নিজের বলা কথা: ‘যেদিন ব্ল্যাক লিস্ট হাতে এল, সেদিনই স্পেন থেকে ফিরে এসেছি বাংলাদেশে। আর এর পরদিন বিসিআই ও বিএসএস-এর দুই চিফ মিলে গড়লেন একটি চৌকশ টিম। আমরা টিমের সবাই ভেবেছিলাম এবার ঝাঁপিয়ে পড়ব ড্রাগ লর্ডদের ওপরে। কিন্তু বাস্তবে কাজে নামতে গিয়ে দেখা গেল, মাত্র দু’দিনে উবে গেছে ড্রাগের চেনা-অচেনা সব রুট। এদিকে অপরাধীদের কারও হদিস নেই।’ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছে রানা, ‘আমাদের ধারণা, মোরেলিকে যখন খুন করল এলিনা পার্কারসন, এর একটু পর আমার তৈরি তুষার ধস খুঁড়ে উঠে এসেছিল মেয়েটা। মাফিয়া দলে নিজের আসন পোক্ত করতে গিয়ে ফোনে সতর্ক করেছে মাফিয়া কমিশনকে। আর তাই ঝুঁকি না নিয়ে আণ্ডারওঅর্ল্ডে চলে গেছে মাফিয়ার সঙ্গে জড়িত প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ লোক।’
লেখককে আরও কিছু তথ্য দিয়েছে রানা।
মাফিয়া ডনদের সবাই ড্রাগ ব্যবসা করে না। সুতরাং যারা নোংরা এ-ব্যবসায় নেই, তাদের কারও কাছ থেকে হয়তো আবারও পাওয়া যাবে ড্রাগ লর্ডদের বিষয়ে দরকারি তথ্য ও প্রমাণ। আপাতত আর কিছুই করার নেই। মেনে নিতে হচ্ছে, মাফিয়ার কবল থেকে আপাতত রেহাই পাবে না কেউ।
এর পরের পাঁচ দিনে দু’বার ঢাকার মগবাজার ও বনানীতে হামলা হলো রানার ওপরে। বসের নির্দেশে আত্মগোপনে যেতে হলো ওর। পরের দিনগুলো ছিল খুব নিরানন্দ। চিরকাল মুক্ত বিহঙ্গের মত থেকেছে যে মানুষ, তার তো ভাল লাগার কথা নয় বন্দি জীবন। খাঁচার বাঘের মত অস্থির হয়ে গেল ও।
সপ্তম দিনে মেজর জেনারেল (অব.) রাহাত খানের কাছ থেকে এল ফোন। খিলগাঁর একতলা সেফ হাউস ছেড়ে নানান এলাকার জ্যামে কয়েকটা সিএনজি বদলে মতিঝিলে বিসিআই অফিসে হাজির হলো রানা। সকাল এগারোটায় নিজের রুমে বসে আছে, এমন সময় ইন্টারকমে ডাকলেন বস্।
সপ্তম তলায় উঠে বসের সুন্দরী নতুন রিসেপশনিস্ট ললিতা সান্যালকে উড়ন্ত চুমু উপহার দিয়ে বিসিআই চিফের ঘরে ঢুকে পড়ল রানা। হাতের ইশারায় সামনের চেয়ারে ওকে বসতে ইশারা করলেন তিনি।
রানা দেখল টিপটিপ করে লাফ দিচ্ছে বসের কপালের পাশের নীলচে শিরা। ও বসতেই বললেন তিনি, ‘তুমি ব্ল্যাক লিস্ট মিশনে যাওয়ার আগে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিয়েছ সিআইএ এজেন্ট জন মিউলারকে। আর তখনই তোমাকে শেষ করে দেবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিআইএ চিফ। এত দিন মাফিয়া দলের বিষয়ে তথ্য পাবে ভেবে চুপ করে ছিল সে। তবে মাফিয়ার বড় নেতারা ডুব দিতেই এখন হন্যে হয়ে তোমাকে খুঁজতে শুরু করেছে তার এজেন্টরা। ফলে তুমি এখন দুনিয়ার কোথাও নিরাপদ নও।’
‘আমি, স্যর, সতর্ক আছি,’ বলল রানা।
‘এই তো ক’দিন আগে মগবাজারে তোমার ওপরে হামলা করল পিসিআই এজেন্টরা। তারা মারা গেলেও আবার কেউ না কেউ তোমাকে খুন করতে চাইবে। ফাণ্ড নেই বলে কিছু দিন পর হাল ছেড়ে দেবে পিসিআই কর্মকর্তারা। কিন্তু সিআইএর হাত তো অনেক লম্বা। তোমার ওপরে বনানীতে দ্বিতীয় যে হামলা, ওটা ছিল তাদেরই। এভাবে কত দিন তুমি নিজেকে বাঁচাতে পারবে?’
চুপ করে থাকল রানা।
‘আজ ভোরে আমাকে একটা প্রস্তাব দিয়েছেন আমেরিকার ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির চিফ লুকাস ম্যাকগিল।’ বাক্স থেকে নিয়ে ঠোঁটে পুরু এক কালো চুরুট ঝোলালেন রাহাত খান। রানার উপহার দেয়া রনসন লাইটার দিয়ে জ্বেলে নিলেন ওটা। বুক ভরে টেনে ছাতের দিকে পাঠালেন নীলচে ধোঁয়া। ‘তুমি রাজি হলে আমি তাঁর কথায় সম্মতি দেব। তার আগে শুনে নাও তোমাকে কী করতে হবে।
‘তুমি রাজি হলে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের মাধ্যমে সিআইএ চিফকে নিরস্ত করবেন ডিআইএ চিফ। সেক্ষেত্রে তোমার বিরুদ্ধে হুলিয়া তুলে নেবে সিআইএ। তাতে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে তুমি।’ গম্ভীর দৃষ্টিতে রানাকে দেখছেন বিসিআই চিফ। ‘নতুন এই মিশনে তোমার যাওয়ার আরেকটা জরুরি কারণ আছে।’ চুপ হয়ে গেছেন তিনি।
কথা গুছিয়ে নিচ্ছেন বস্। অপেক্ষা করল রানা।
কিছুক্ষণ পর বললেন বিসিআই চিফ, ‘ডিআইএ চিফ যা চাইছেন, সেটা আমাদের দেশের জন্যেও মঙ্গলকর।’
‘আমাকে আসলে কী করতে হবে, স্যর?’ বলল রানা।
‘ডিআইএর মিশন নিয়ে যাবে এল সালভেদরে,’ বললেন (অব.) মেজর জেনারেল, ‘ধ্বংস করবে হেরোইন, পাউডার কোকেন, ক্র্যাক কোকেন, মেথ, এলএসডি আর এমডিএমএ তৈরি করার বড় কিছু কারখানা। সম্ভব হলে ধরে সাগরতীরে পৌঁছে দেবে তিন ড্রাগ লর্ডকে। সেক্ষেত্রে তাদেরকে লঞ্চে তুলে নিজেদের দেশে নেবে ডিআইএর দুই এজেন্ট। এদিকে আমাদের কাছে তথ্য আছে, এল সালভেদরের যে ড্রাগ দক্ষিণ-পুব এশিয়ায় আসে, এর বড় এক অংশ ঢুকছে বাংলাদেশে। এই একই কথা বলেছেন ডিআইএ চিফ। তুমি এল সালভেদরে কারখানাগুলো উড়িয়ে দিলে এবং ড্রাগ লর্ডদেরকে ধরতে পারলে ড্রাগের চালান অর্ধেকের বেশি কমে যাবে বাংলাদেশ ও আমেরিকায়।’
‘ডিআইএর এজেন্টরা নিজেরা এই কাজটা করছে না কেন, স্যর?’ জানতে চাইল রানা।
‘চেষ্টা তারা করেছে,’ বললেন রাহাত খান। ‘গত ছয় মাসে এল সালভেদরের গভীর জঙ্গলে কারখানা ধ্বংস করতে গিয়ে মারা গেছে তাদের তিনজন এজেন্ট।’
‘এখন আশা করছে তাদের কাজ আমি একাই পারব?’
‘সেটা তারা ভাবছে না,’ রানাকে দেখলেন চিফ। মুখে বললেন না ডিআইএ এজেন্ট তো আর বিসিআই-এর কিংবদন্তী মাসুদ রানা নয়! ‘তারা তোমাকে সব ধরনের তথ্য ও অস্ত্র দেবে। তাদের হাতে মারা গেছে এল সালভেদরের প্রাইম মিনিস্টারের ভাগ্নের মাফিয়া দলের ক’জন। তার ওপর মিলিটারি থেকে সরাসরি সাহায্য পাচ্ছে ড্রাগ লর্ডেরা। তাই সে-দেশে ঢুকে নতুন কোন আন্তর্জাতিক বদনাম চাইছে না তারা। …এখন তুমি কী বলো, রানা? যাবে এল সালভেদরে? ডিআইএ চিফ কথা দিয়েছেন, তুমি গ্রেফতার হলে তোমাকে ওখান থেকে বের করে আনবেন তিনি। আমাদেরও চোখ থাকবে এল সালভেদারিয়ান সরকারের ওপরে।’
‘আমি যেতে রাজি, স্যর,’ দ্বিধা না করেই বলেছে রানা। ‘গুড,’ বললেন বিসিআই চিফ। ‘তা হলে ডিআইএ চিফকে জানিয়ে দেব যে তুমি যাচ্ছ। সেক্ষেত্রে আজ রাতেই বিমানে চেপে কয়েক দেশ ঘুরে পৌঁছুবে মেক্সিকোয়। একবার সেখানে গেলে ওখান থেকে তোমাকে এল সালভেদরে পৌঁছে দেবে ডিআইএর বোট।’
সরাসরি রানার চোখে তাকালেন রাহাত খান। ‘আরেকটা কথা, রানা। তোমার মিশন শেষ হলে সরাসরি ফিরে আসবে বাংলাদেশে। তখন তোমার নেতৃত্বে গড়া হবে ছোট একটা টিম।’ চুরুটে টান দিয়ে কী যেন ভাবছেন বস্। একটু পর বললেন, ‘তুমি তো জানো, বাংলাদেশের মানুষের ওপর খুব বাজে প্রভাব ফেলেছে লাখ লাখ বাস্তুহারা রোহিঙ্গা। ইয়াবার মত ভয়ঙ্কর সব ড্রাগ এদের মাধ্যমে ছড়িয়ে যাচ্ছে গোটা দেশে। চরমভাবে আসক্ত হচ্ছে বাঙালি ছেলেমেয়েরা। মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে ধসে যাচ্ছে হাজারো পরিবার। অথচ আমাদের সরকারের উচিত ছিল বহু আগে রোহিঙ্গাদের অন্যায়-অনাচারকে রুখে দেয়া।’
খুক-খুক করে কাশলেন চিফ। রানার চোখে আবারও স্থির হলো তাঁর কঠোর চোখ। ‘গত কয়েক বছরে প্রায় দশ লাখ রোহিঙ্গা ঢুকেছে দক্ষিণ-পুবের জেলাগুলোতে। এরা প্রায় সবাই নাক পর্যন্ত ডুবিয়ে রেখেছে ইয়াবার মত ভয়ঙ্কর সব ড্রাগ চোরাচালানে। বিশেষ করে এখানে বসে মায়ানমারের কাঁচা রসদ পেয়ে ইয়াবার কারখানা করেছে এরা। জোগানদারদের প্রশ্রয় পেয়ে যা খুশি করছে। অথচ আন্তর্জাতিক দু’চোখা নীতির কারণে আমাদের সরকার এদেরকে মায়ানমারে ঘাড় ধরে ফেরত পাঠাতে পারবে না। ফলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের লাখ লাখ মানুষ। সুতরাং রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে যারা ক্ষতিকর কিছু এ- দেশে পাচার করছে, এবার মায়ানমারে ঢুকে তাদের শিকড় উপড়ে দেবে তোমরা।’
‘তার মানে, স্যর, ড্রাগ তৈরির রসদ যেন রোহিঙ্গাদের কাছে না আসে, সেটা আমরা নিশ্চিত করব,’ বলল রানা।
মাথা দোলালেন বিসিআই চিফ। ‘তুমি ফিরলে সরকারি কিছু এজেন্সির চিফসহ বিস্তারিত আলাপ করব আমরা।’
টেবিল থেকে লাল একটা ফাইল নিলেন তিনি। অর্থাৎ, তুমি এবার যেতে পারো।
সোনসোনেট কারাগারের করিডর ধরে হাঁটতে হাঁটতে বাস্তবে ফিরে এল রানা। মুখে ফুটল তিক্ত একটুকরো হাসি।
বড় চারটে ড্রাগের কারখানা ধ্বংস করে দিয়েছে ও। তৃতীয় দিনে এক মিটিঙের খবর পেয়ে সেখানে হামলা করে শেষ করেছে প্রাইম মিনিস্টারের ভাগ্নেসহ চার ড্রাগ লর্ডকে। কিন্তু এরপর মাথায় ভেঙে পড়ল আস্ত আকাশ। ওর পেছনে লেলিয়ে দেয়া হলো এল সালভেদারিয়ান মিলিটারিকে। জঙ্গলে রানার হাতে খুন হলো নয়জন সৈনিক ও অফিসার। আগেই ফুরিয়ে গিয়েছিল ওর অস্ত্রের গুলি। শেষ দু’জনকে খতম করেছে বুবি ট্র্যাপ তৈরি করে। এদিকে বুকে ও উরুতে দুটো গুলি। প্রচুর রক্তক্ষরণে একসময় হারিয়ে গেল চেতনা। জ্ঞান ফিরতে নিজেকে দেখল জঘন্য কারাগার সোনসোনেটের হাসপাতালে। সুস্থ হওয়ার আগেই কর্তৃপক্ষ জানাল, প্রাইম মিনিস্টারের নির্দেশে আদালতে উঠবে না ওর কেস। আসামীর আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই সুপ্রিম কোর্ট থেকে রায় ঘোষিত হলো- দেশের চরম শত্রু বিদেশি লোক মাসুদ রানাকে ফাঁসি দেয়া হবে তিন মাস পর। এরপর থেকে রানা আছে এই কারাগারে। ডিআইএ থেকে কোন সাহায্য আসেনি। এমন কী তাদের তরফ থেকে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি কেউ। ক’দিন আগে শুনেছিল, এল সালভেদারিয়ান সরকারের কাছে বাংলাদেশ সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে অনুরোধ করা হয়েছিল, যেন তাদের হাতে তুলে দেয়া হয় রানাকে। তবে তাতে কোন সাড়া দেয়নি এল সালভেদরের সরকার।
পিঠে শটগানের নলের খোঁচা খেয়ে হাঁটার গতি বাড়াল রানা। মিনিটখানেক পর পৌঁছে গেল হাতিম আল-রহিমের সেলের সামনে। পিঠে ধাক্কা দিয়ে কামরার ভেতরে ঠেলে দেয়া হলো ওকে। বিশালদেহী আরবের দিকে চেয়ে ওর মনে হলো, শেকল দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে ভীষণ হিংস্র এক জলহস্তি। আগে কখনও তাকে দেখেনি রানা। তার সম্পর্কে কিছু শোনেওনি। অবশ্য কারও কিছু বলতে হবে তা নয়, লোকটার চোখে-মুখে নীচতা দেখেই যা বোঝার বুঝে গেছে ও।
জেল সুপারের দিকে তাকাল রানা। হলদে দাঁত বের করে ওর দিকে চেয়ে হাসছে লোকটা। এক ক্যামেরাম্যান ব্যস্ত হয়ে ভিডিয়ো তুলছে রহিমের।
‘আমাকে এখানে আনা হয়েছে কেন?’ ইংরেজিতে বলল রানা।
‘লড়ে জেতার জন্যে,’ বলল ওয়ার্ডেন।
চুপ করে থাকল রানা।
‘লড়াই শুরু করো!’ চেঁচিয়ে উঠে নির্দেশ দিল জেলার।
মজিদ আল-কবিরকে কিছুই বলতে হলো না, স্বজাতি হাতিম আল-রহিমের ওপরে ক্ষুধার্ত বাঘের মত ঝাঁপিয়ে পড়ল সে। হাত তুলে তার আক্রমণ ঠেকাল পাহাড়ের মত উঁচু আল-রহিম। ডান হাঁটু তুলে প্রচণ্ড এক গুঁতো দিল মজিদের বুকে। তার মারে এত জোর, ভুস্ করে বুক থেকে বাতাস বেরিয়ে গেল মজিদের। সে পিছিয়ে আসার আগেই বামহাতে খপ্ করে তার মুখ চেপে ধরল হাতিম। ডানহাতে শত্রুর নাকের ওপরে বসাল প্রচণ্ড এক ঘুষি। পরের মাত্র দশ সেকেণ্ডে আলুর ভর্তা হয়ে গেল মজিদের মুখ। ভারসাম্য রাখতে না পেরে ধুপ করে মেঝেতে পড়ল সে।
সিগার মুখে নিয়ে উৎসাহের সঙ্গে মারামারি দেখছে জেল সুপার। কিন্তু চট্ করেই শেষ হয়ে গেছে লড়াই। পরের পাঁচ সেকেণ্ডে মজিদের পাশে বসে তার ঘাড় মটকে দিল হাতিম আল-রহিম। উঠে দাঁড়িয়ে গায়ের জোরে এক লাথি মেরে কয়েক ফুট দূরে ছিটকে ফেলল লাশটা। এবার রানার দিকে ঘুরে তাকাল হাতিম। কয়েক পা এগোল সে, তবে শেকলের কারণে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারল না রানার ওপরে।
হাতিমের দিকে চেয়ে আছে রানা। নিজে থেকে আক্রমণ করার কোন আগ্রহ নেই ওর।
অধৈর্য হয়ে উঠল কারাগারের সুপার। পকেট থেকে একটা চাবি নিয়ে ছুঁড়ে দিল হাতিমের দিকে। খপ্ করে চাবিটা ধরল আরব খুনি। তার সময় লাগল না গলার কলারের তালা খুলে নিতে। আবার তাকাল সে রানার দিকে। এবার বুকের ভেতর থেকে বেরোল ঘড়ঘড়ে গর্জন। পরক্ষণে বাংলাদেশি কয়েদীর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল সে।
বিদ্যুদ্বেগে বারকয়েক মার্শাল আর্টের কিছু কৌশল কাজে লাগাল রানা। তাতে সময় নিয়েছে বড়জোর সাত সেকেণ্ড। মড়াৎ করে ভেঙে গেছে হাতিমের পাঁজরের তিনটে হাড়। তার একটা গেঁথে গেছে ফুসফুসে। চুরমার হয়েছে হাতিমের বাম চোয়ালের হাড়। নাক এখন নেই। বিশাল রেডউড গাছের মত দড়াম করে মেঝেতে পড়ল হাতিম আল-রহিম। এই পতনে থরথর করে কেঁপে গেল গোটা ঘর।
নির্বিকার চেহারায় জেল সুপারের দিকে তাকাল রানা। ওর শ্বাস-প্রশ্বাস এখনও একদম স্বাভাবিক। নিচু গলায় বলল রানা, ‘আমি কি এবার যেতে পারি?’
হতবাক হয়ে ওকে দেখছে স্কাউটের প্রতিনিধি।
রানার চেহারা যুম করে ডার্টি গেম শো-র প্রযোজকের কাছে ভিডিয়ো পাঠাল ক্যামেরাম্যান।
.
এলইডি স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে মাসুদ রানাকে। এইমাত্র যে লড়াই দেখেছে স্টিল, তাতে চমকে না গিয়ে পারেনি সে। স্যাটেলাইট ফোনে জানতে চাইল, ‘এই লোক আসলে কে? কোথা থেকে এসেছে?’
‘এই লোক কি আরব?’ জানতে চাইল এমিলি।
‘না, সে আরব নয়,’ বলল স্কাউটের প্রতিনিধি, ‘আমাদের আরব এখন মৃত্যুযাত্রী।’ জেলারের দিকে তাকাল সে। ‘এই লোক আসলে কোথাকার?
নিচু গলায় কী যেন বলল জেলার।
শুনতে পেল না এমিলি।
সিওয়ার্সের দিকে তাকাল স্টিল। ‘এর খোঁজ নাও।’
বস্ নিজে থেকে কিছু বলার আগেই এল সালভেদারিয়ান পুলিশ ডিপার্টমেন্টের কমপিউটার ডেটাবেস-এ ঢুকে পড়েছে হ্যাকার সিওয়ার্স। কয়েক সেকেণ্ড পর বলল, ‘এর নামে যা আছে, ডাউনলোড করেছি। সে একজন বাংলাদেশি খুনি। এল সালভেদরের প্রাইম মিনিস্টারের ভাগ্নে আর কয়েকজন ড্রাগ লর্ডকে খুন করেছে। ধ্বংস করে দিয়েছে ড্রাগের কারখানা। তার হাতে মরেছে সবমিলিয়ে আঠারোজন লোক। তাদের ক’জন আবার মিলিটারি পার্সোনেল। তাকে ধরতে সাহায্য নেয়া হয়েছে এল সালভেদারিয়ান মিলিটারির। সুপ্রিম কোর্টের কয়েক মাস আগের এক রায় অনুযায়ী সাত দিন পর ফাঁসি হবে তার। যদিও যাদেরকে খুন করেছে, তাদের সবাই ছিল ড্রাগ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। ‘
‘অর্থাৎ, সে একজন ভাল মানুষ?’ ভুরু কুঁচকে ফেলল স্টিল। ‘তা হলে তো আমাদের চলবে না!’
‘তার ওপর এই লোক মুসলিম হলেও আরব নয়,’ বলল এমিলি। ‘বস্, আপনি না একজন আরব ক্রিমিনাল চাইছেন?’
‘আরব আর চাই না, মাসুদ রানার মারামারির দক্ষতা দেখে তাকেই আমার ভাল লেগেছে।’
তর্ক করার সাহস নেই এমিলির। বহু কিছু শিখেছে বসের কাছ থেকে। মনে স্বপ্ন, একদিন নিজে তৈরি করবে রিয়েলিটি শো। ‘তা হলে, বস্, আমরা কি ওকে কিনব?’
তরুণেরা যেভাবে ঝকঝকে নতুন ফেরারি গাড়ি দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়, সে-দৃষ্টিতে রানাকে দেখছে স্টিল। নিচু স্বরে বলল সে, ‘হ্যাঁ, আমার ওকেই চাই!’
