ডার্টি গেম – ৫
পাঁচ
দু’পায়ে বেড়ি ও হাতে হ্যাণ্ডকাফ নিয়ে প্রাইভেট গাল্ফ্স্ট্রিম জি৫৫০ জেট বিমানের সিটে বসে আছে মাসুদ রানা। ওকে পাহারা দিচ্ছে চারজন রেণ্ট-আ-গার্ড। আটজন যাত্রীবাহী বিমানে পাইলট ছাড়া ওরা আছে পাঁচজন। ওকে কোথায় নেয়া হচ্ছে, সে-ব্যাপারে কোন ধারণা নেই রানার। কারাগার থেকে বেরোবার সময় বুঝে গেছে, আপাতত মুক্তি পাবে না ও।
গার্ডদের কাছে শুনেছে, কারা যেন অভিনয় করাবার জন্যে আরব খুনি হাতিম আল-রহিমের অডিশন নিত, কিন্তু সে খুন হওয়ায় একই কাজের জন্যে মনোনীত করা হয়েছে রানাকে। অ্যান্টেনাসহ ভিডিয়ো ক্যামেরা আর এসইউভির স্যাটেলাইট ডিশ দেখে ও বুঝে গেছে, দূর থেকে লড়াই দেখেছে কেউ।
এয়ারপোর্টে ওকে তোলা হলো বিমানে। গার্ডেরা জানাল, রেস্টরুমে গিয়ে যেন হাত-মুখ ধুয়ে নেয় রানা। সর্বক্ষণ বিআর ১৮ অ্যাসল্ট রাইফেলের নল ওর ওপরে তাক করে রাখল চার গার্ড। রেস্টরুম থেকে বেরিয়ে সিটে ফেরার পর কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে নিল রানা। জেগে উঠে জানালা দিয়ে দেখল আকাশের কোথায় আছে সূর্য। ওর ভুল না হলে বিমান আছে পাপুয়া নিউ গিনির উত্তর উপকূলে এইটেপ শহরের কাছে। তারপর একসময়ে ব্যক্তিগত সরু এক এয়ারস্ট্রিপে নেমে পড়ল জেট বিমান। ওটা স্থির হতেই বড় এক হ্যাঙার থেকে ওদের দিকে এল এক লোক। সিভিলিয়ান হলেও তার পরনে কমব্যাট ফেটিগ। লালচে চেহারা দেখে তাকে আমেরিকান বলে মনে হলো রানার। দৈর্ঘ্যে সে ছ’ফুটের বেশি। তারের মত টানটান দেহ। কোমরের হোলস্টারে অটোমেটিক পিস্তল। বিমানের দরজা খুলে যেতেই গার্ডদের ইশারা করল সে। কড়া চোখে দেখল রানাকে।
রানার মনে প্রশ্ন জাগল, এই লোক কি সিকিউরিটি চিফ? সেক্ষেত্রে কার হয়ে কাজ করে সে?
রানা এখনও জানে না লোকটার নাম রিভ সিম্পসন। বয়স পঁয়ত্রিশ। আগে চাকরি করত নিউ ইয়র্ক পুলিশে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের বদনাম ছিল তার। বন্দিদের পিটিয়ে আহত করেছিল বলে পুলিশবাহিনী থেকে বের করে দেয়া হয় তাকে। এরপর চালু করেছে প্রাইভেট সিকিউরিটি ফার্ম। কিছু দিনের ভেতরে প্রচার হয়ে গেল, ক্লায়েন্টের জন্যে বড় কোন অপরাধ করতে দ্বিধা করে না সিম্পসন। বছরদুয়েক আগে ফ্লোরিডায় কিউবান মাফিয়ার সঙ্গে গোলমাল হওয়ায় তাকে ভাড়া করেছিল ব্র্যাড স্টিল। একরাতে তার কাছ থেকে চাঁদা নিতে এসে খুন হলো মাফিয়ার দু’জন মস্তান। উধাও হলো আরও দুই কিউবান যুবক। এরপর ব্র্যাডকে ঘাঁটাতে আসেনি কিউবান মাফিয়া। হাজার হাজার ডলার খরচ করে সিম্পসনের সেবা গ্রহণ করছে স্টিল।
কিছু দিন পর এক গাড়ির নিচে চাপা পড়ে মরল ব্র্যাডের, প্রতিদ্বন্দ্বী এক প্রডিউসার। চালককে গ্রেফতার করতে পারল না পুলিশ। স্টিলের মতই একই ধরনের শো তৈরি করবে বলে ভেবেছিল আরেক প্রযোজক। টেস্ নদীর ভাটিতে পাওয়া গেল তার লাশ।
আসলে দামি ক্লায়েন্টের জন্যে বেআইনী যে-কোন কাজ করতে আপত্তি নেই সিম্পসনের। ভাল করেই জানে, দুনিয়ায় সবচেয়ে জরুরি জিনিস হচ্ছে টাকা। আর সেটা স্টিল খরচ করলে তার কাজ কেন করে দেবে না সে!
‘নেমে এসো,’ হ্যাঙারের দিকে ইশারা করল সিম্পসন।
তাকে অপছন্দ করছে রানা। পিঠে এক গার্ডের অস্ত্রের নলের খোঁচা খেয়ে সিম্পসনের পিছু নিল ও।
.
ওদিকে হ্যাঙারের ভেতরে জমে গেছে নাটক।
পেছনের দেয়ালের ব্র্যাকেটে হাত-পায়ের শেকল আটকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে নয়জন প্রতিযোগীকে। একটু দূরে তাদেরকে পাহারা দিচ্ছে বারোজন সশস্ত্র গার্ড। নানান ভাষায় প্রতিবাদ করছে দাগী আসামীরা। তাদের কেউ কেউ বেশি গালাগালি করলে তাদের কাঁধে নামছে অস্ত্রের বাঁট।
দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে গালি দিচ্ছে জাপানি খুনি কাইতো তানাকা। তার কাঁধে অ্যাসল্ট রাইফেলের বাঁট নামাতে গিয়ে মুখে গোটা সাতেক ঘুষি আর পাছায় জোর এক লাথি খেয়ে ছিটকে দূরের মেঝেতে পড়ল এক গার্ড। তানাকার বয়স বড়জোর আটাশ। চিকন হলেও শক্তপোক্ত দেহ। উচ্চতা সাড়ে পাঁচ ফুট হলেও ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক ইয়াকুযা লড়াকু সে। কুং-ফুতে ডাবল ব্ল্যাক বেল্ট। তলোয়ার, ছোরা ও পিস্তল ব্যবহারে ওস্তাদ। এরই মধ্যে খুন করেছে বিশজন মানুষকে। তাদের আটজন আবার মহিলা।
হ্যাঙারে ঢুকে কয়েদীদের ডান গোড়ালিতে একটা করে ব্রেসলেট দেখতে পেল রানা। ইলেকট্রনিক জিনিসটার ভেতরে আছে মাইক্রোচিপ্স্ ও এলইডি স্ক্রিন। ওর গোড়ালিতেও একই জিনিস আটকে দেবে এরা, ভাবল ও।
হ্যাঙারে আছে প্রাইভেট বেল জেটরেঞ্জার চপার। মডেল দেখে চিনতে পারল রানা। ২০৬বি-৩। পাইলটকে বাদ দিলে সবমিলিয়ে ওটা বহন করবে পাঁচজন যাত্রী। যান্ত্রিক ফড়িঙের পাশে দাঁড়িয়ে আছে দু’জন-বছর তিরিশেকের সুপুরুষ এক লোক, অন্যজন অপূর্ব সুন্দরী এক মেয়ে।
রানা জানে না, আসার পথে ফোন করে সিম্পসনকে শান্ত করেছে পৌরুষদীপ্ত লোকটা। সে এতই ব্যস্ত, জরুরি কিছু কথা তাকে বলতে পারেনি তার সঙ্গিনী।
নারী সাংবাদিক ডায়ানার সাক্ষাৎকার প্রকাশ হতেই গোটা দুনিয়া জুড়ে শুরু হয়েছে ডার্টি গেম শো-র বিশ্রী প্রচারণা। ওটা যে বড়দের শো সেটা বুঝে গেছে সবাই। অথচ ব্র্যাড বলেছিল সামলে নেবে সব। ওর প্রেমিক এবার কী করবে, সেটা দেখার জন্যে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছে রিটা। আশা করছে, কোন ধরনের অন্যায়ে নিজেকে জড়াবে না ব্র্যাড।
ক্রিমিনালদের জন্যে উপযুক্ত পোশাক দেয়ার কাজ নিয়েছে রিটা। এখানে এসেছে সেজন্যে। আগে কখনও নিজের চোখে কোন খুনিকে দেখেনি। তবে হ্যাঙারে ঢুকে ভয়ে শুকিয়ে গেছে ওর বুক।
রাশান দানব ম্যানইয়া লোপাতিনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় চমকে গেল রিটা। হাত-পায়ের শেকল ছেঁড়ার জন্যে টানাহেঁচড়া করছে দৈত্য। গলার গভীর থেকে বেরোচ্ছে চাপা গর্জন। স্বর্ণকারের চোখে তাকে দেখছে স্টিল। লোপাতিনের পরনে ছেঁড়া সাদা শার্ট ও কারাগারের সবুজ প্যান্ট। চারকোনা মাথা ঘুরিয়ে লোভী চোখে বারবার দেখছে রিটাকে।
আনমনে বড় করে ঢোক গিলল রিটা।
প্রেমিকা আতঙ্কিত সেটা বুঝে জানতে চাইল স্টিল, ‘ওকে দেখে কী বুঝলে?’
‘আমি ওর ধারেকাছে যেতে চাই না।’ খসখস করে প্যাডে কয়েকটা শব্দ লিখল রিটা। ‘এর কোন পোশাক লাগবে না।’
একই কথা প্রযোজ্য বেশিরভাগ ক্রিমিনালের ক্ষেত্রে। এরা এসেছে মরণপণ লড়াই করতে। আর তাদের হিংস্রতা দেখার জন্যেই টিকেট কেটে শো দেখবে কোটি কোটি মানুষ।
ডেরেক স্লাইডারের সামনে থামল স্টিল আর রিটা। জার্মান নাৎসির বয়স হবে পঞ্চাশ। চোখের ধূসর মণির মতই একই রঙের ছেঁটে রাখা মাথার চুল। পরনে আস্তিন ছাড়া গেঞ্জি। বাইসেপে মিলিটারি উল্কি। লোকটার বয়স হলেও দেহে আছে প্রচণ্ড শক্তি। বাবা-মা ডেরেক স্লাইডার নাম দিলেও কারাগার কর্তৃপক্ষ তাকে ডাকত নাৎসি বা কসাই বলে। যখন মিলিটারি কমাণ্ডার ছিল সে, এরিয়ান জাতির না হলে প্রথম সুযোগে গোপনে নিধন করেছে অন্য জাতির বৃদ্ধ- বৃদ্ধা-যুবক-যুবতী ও শিশু—রেহাই ছিল না কারও। তার দাদা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের চিফ। ছোটবেলায় তার কাছে স্নাইডার শুনেছে ভয়ঙ্কর সব গল্প। সারাজীবন আফসোস করেছে, কেন জন্মাতে পারল না হিটলারের সময়ে।
স্টিল বা রিটার দিকে তাকাল না নাৎসি, সম্পূর্ণ মনোযোগ মেক্সিকান স্বামী-স্ত্রী আর দুই কৃষ্ণাঙ্গের ওপরে।
‘অ্যাই, তুমি নিজেকে খুব বড় কিছু ভাবো, তাই না?’ স্টিলের উদ্দেশে বলল ইসাবেলা আলকারায। ‘আমার কিন্তু মনে হচ্ছে তুমি আসলে নর্দমার নোংরা একটা কেঁচো!’
জবাবে মৃদু হাসল স্টিল। মেয়েটাকে পাশ কাটাবার আগে একবার দেখল ওর স্বামীকে। লোকটার নাম আলেক্যান্দ্রো আলকারায। স্বামী-স্ত্রী মিলে গুয়েতেমালায় দোকানি ও পেট্রল স্টেশন কর্মচারীদের কাছ থেকে লুটপাট করত টাকা। বাধা এলে দ্বিধা করত না গুলি করতে। এদের চোখে নগ্ন আতঙ্ক দেখে মনে মনে হাসল স্টিল। বুঝে গেছে, একবার লড়াই শুরু হলে সবচেয়ে আগে মরবে এরা।
‘তুমি নিজেকে খুব সুন্দরী মনে করো, তা-ই না?’ রিটার দিকে তাকাল ইসাবেলা, ‘অথচ তুমি আসলে নোংরা কেঁচোটার পোষা পতিতা!’
‘ওকে ভুলেও পাত্তা দিয়ো না,’ রিটাকে বলল স্টিল।
আগের জায়গায় রয়ে গেছে রিটা। অপছন্দ করেছে স্বামী-স্ত্রীর জুটি। তাদের প্রতি ওর মনে রইল না সামান্যতম করুণা।
সুন্দরী এক কৃষ্ণাঙ্গিনীর সামনে থেমেছে স্টিল। মেয়েটার নাম রোযি ইয়াসিমান। দুনিয়ায় যেসব কৃষ্ণাঙ্গিনী সুপার মডেল আছে, রূপের দিক থেকে তাদের চেয়ে কম নয় সে। কফি রঙের ত্বক মাখনের মত মসৃণ। দীর্ঘ আঁখি পল্লব খুব সুন্দর। হীরার মত জ্বলজ্বল করছে খয়েরি মণি। কাঁধে যত্নহীন কোঁকড়া চুল। রোযিকে দেখলে দু’বার ঘুরে দেখবে যে-কেউ। আলাদা কোন পরিবেশে ওকে দেখলে মুগ্ধ হতো স্টিল। এখন খুনির শীতল চোখে তাকে দেখছে যুবতী।
দক্ষিণ আফ্রিকার দারিদ্র্যপীড়িত এলাকা থেকে এলেও তুখোড় মগজ মেয়েটার। কিশোরী বয়সে বুঝে গেছে কীভাবে ব্যবহার করতে হবে স্রষ্টাদত্ত রূপ। দৈহিক প্রেমের ফাঁদে ফেলে নানান সুবিধা নিত ধনীদের কাছ থেকে। তারপর প্রাণে বাঁচতে দিত না তাদের কাউকে।
রোযি ইয়াসিমানের মুখ থেকে সরে তার বুকে স্থির হলো স্টিলের চোখ। মেয়েটার পরনে ট্যাঙ্ক টপের ওপরে জেলখানার ময়লা পুরনো সাদা শার্ট।
‘খুলে নাও এর শার্ট,’ রিটাকে জানাল স্টিল। ‘মনে রাখবে আমরা আছি শো বিযনেসে।’
শুনতে খারাপ লাগলেও কথা যৌক্তিক। শার্ট খুলে নিলে রোযি ইয়াসিমানকে আরও আকর্ষণীয় দেখাবে। এক এক করে তার শার্টের বোতাম খুলল রিটা। বাধা দিল না রোযি। নিষ্পলক চোখে দেখছে রিটাকে।
রিটার মনে হলো, চোখের দৃষ্টি দিয়ে ওকে পটাতে চাইছে মেয়েটা।
সামনে বেড়ে অন্যান্য বন্দির ওপরে চোখ বোলাল স্টিল। ‘আরে, নতুন ক্রিমিনাল কোথায়? ওই যে বাঙালি লোকটা?’
‘এখানে,’ হাতের ক্লিপবোর্ডে রাখা কাগজে টিক চিহ্ন দিল সিম্পসন। ‘এইমাত্র পায়ে লাগিয়ে দেয়া হয়েছে ব্রেসলেট।’
পাশ কাটাবার সময় ইংরেজ খুনি রুপার্ট শ্যাননকে দেখল স্টিল। জবাবে বড় বড় দাঁত বের করে হাসল প্রাক্তন এসএএস মেজর। তার দেহ গ্র্যানিট পাথরের মত নিরেট। চৌকো চোয়াল বলছে সে ভয়ঙ্কর জেদী ও আক্রমণাত্মক। মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা। লালচে চোখদুটো সাইকোপ্যাথের।
তার পাশের শেকলে আছে আফ্রিকান-আমেরিকান ড্রাগ ডিলার জনি এস. ক্লার্ক। সুদর্শন, বুদ্ধিমান ও সতর্ক এক কৃষ্ণাঙ্গ অপরাধী। লস এঞ্জেলেসের মানুষ। ওখানে কয়েকটা খুন করে পালিয়ে গিয়েছিল মালোয়েশিয়ায়। কিন্তু ওখানে ড্রাগের কারবার করার সময় ধরা পড়েছে পুলিশের হাতে। সে-দেশের আইন অনুযায়ী ফাঁসির রায় হয়েছে তার।
‘তোমাকে কোথা থেকে এনেছে?’ ফিসফিস করে শ্যাননের কাছে জানতে চাইল ক্লার্ক।
কঠোর চোখে ওকে দেখল প্রাক্তন মেজর। ‘ফালতু কথা বন্ধ করো। তোমাকে দেখে এমনিতেই বিরক্তি লাগছে।’
‘এত বিরক্তির কারণ কী?’
জবাবে বাঁকা হাসল শ্যানন। কালো লোকটাকে খুন করতে ভাল লাগবে তার।
‘রুপার্ট শ্যানন এসেছে ইংল্যাণ্ড থেকে,’ ক্লিপবোর্ড থেকে মুখ তুলে বলল সিম্পসন। ‘আগে ছিল এসএএস ফোর্সে। তিনবার গেছে রুয়াণ্ডায় মিশনে। খুন করেছে সবমিলিয়ে একুশজনকে। ধর্ষণ করেছে নয়জন মেয়েকে। তার ভেতরে তিনজন ছিল পাঁচ বছরের নিচের শিশু। চরম নির্যাতন করেছে প্রত্যেককে।’ প্রশংসার চোখে প্রাক্তন মেজরকে দেখল সে। ‘আশা করি ভালভাবেই লড়বে সে!’
‘ওর সঙ্গে আমার আগেও ফোনে কথা হয়েছে,’ বলল স্টিল।
ফ্যাকাসে হয়ে গেছে জনি এস. ক্লার্কের মুখ। নিচু গলায় বলল শ্যাননকে, ‘তুমি কি পাগল নাকি? তোমার সমস্যাটা কী? ‘
‘কেলেকুত্তা, গলায় পাড়া দিয়ে আমি তোকে খুন করব,’ শীতল হাসল শ্যানন।
অন্যদিকে তাকাল ক্লার্ক। তার চোখ আটকে গেল রোযি ইয়াসিমানের ওপরে। কথাগুলো শুনতে পেয়েছে যুবতী। তার চোখে ভয় দেখল ক্লার্ক। ওর মতই মানুষ খুন করেছে মেয়েটা, তবে সেটা করেছে প্রয়োজনে, ফূর্তির জন্যে নয়। পরস্পরের দিকে কয়েক সেকেণ্ড চেয়ে রইল ওরা।
এদিকে গোড়ালিতে ব্রেসলেট আটকে দেয়ার পর ওটা খেয়াল করে দেখেছে রানা। ওর বুঝতে দেরি হয়নি, জিনিসটার ভেতরে আছে জিপিএস, ঘড়ি ও বিস্ফোরক। ব্রেসলেট থেকে একটু বেরিয়ে আছে লাল একটা ট্যাব। ওটা বোধহয় কাজ করবে গ্রেনেডের পিনের মত। ফেটে যাওয়ার আগেই প্রথম সুযোগে ডিসআর্ম করতে হবে বোমা, ভাবল রানা।
এই ব্রেসলেট স্টেট-অভ-দি-আর্ট। ভেতরে আছে সি- ফোর আর অ্যান্টি-টেম্পারিং মাইক্রোচিপ্স্।
রানাকে সামনে রেখে এক ইতালিয়ানকে পাশ কাটাল দুই গার্ড। ইতালিয়ানের বয়স চল্লিশ। মাথার পনি টেইল করা চুল কালো হলেও পেকে গেছে দাড়ি। দুই গার্ডের উদ্দেশে নিচু স্বরে বলল সে, ‘চাবি দিয়ে দে, ভাই! আমাকে ছেড়ে দে! বদলে তোদের মেলা টাকা দেব! যা চাস্, তা-ই দেব!’
তাকে পাত্তা না দিয়ে রানাকে নিয়ে এগোল গার্ডেরা। ঝড়ের বেগে কথা বলে এনযো বিয়াঞ্চি। বেশিরভাগ সময় তার মেজাজ থাকে তিরিক্ষি। আর সেজন্যেই স্ত্রী, শ্বশুর আর শাশুড়িকে গুলি করে মেরেছে সে। তাদেরকে বাঁচাতে এসেছিল প্রতিবেশীরা। তারাও মরেছে বিয়াঞ্চির গুলি খেয়ে। গণহত্যা করার আগে, পুরনো ফিয়াট গাড়ি বিক্রি করত। আদালত থেকে ফাঁসির রায় হওয়ায় পত্রিকাগুলো তার নাম দিয়েছিল ঝোড়ো মুখের খুনি।
অন্যদের চেয়ে একটু দূরে দেয়ালের স্টিলের ব্র্যাকেটে রানার শেকল আটকে দিল একজন গার্ড। সেটা দেখে এগিয়ে এল স্টিল। ‘হাই! আমি ব্র্যাড স্টিল। টিভি শো প্রডিউসার।’
‘তা-ই?’ সহজ সুরে বলল রানা।
‘তুমি বোধহয় আগেও আমার নাম শুনেছ?’
‘আমি খুব একটা টিভি দেখি না,’ বলল রানা। গত বারো ঘণ্টার ঘটনাগুলো নিয়ে ভাবছে। কারাগারে ভেবেছিল ওকে খুন করবে এল সালভেদারিয়ান মিলিটারির সদস্যরা। কিন্তু পরে ভাবল এসবের পেছনে আছে সিআইএ। কারাগারে তারাই এনেছে অ্যান্টেনাসহ হাই-টেক ভিডিয়ো ক্যামেরা, যাতে ওর মৃত্যুর ভিডিয়ো করা যায়।
ক্যামেরাম্যান ও তার সহযোগী আসার কিছুক্ষণ পর এল কয়েকজন সশস্ত্র লোক। ওকে নিয়ে তোলা হলো বিমানে।
আর এখন এ-দ্বীপে এসে ওর মনে হচ্ছে, এসবের পেছনে আছে দামি পোশাক পরা ব্র্যাড স্টিল নামের লোকটা। খুনিদের রহস্যময় কোন রিয়েলিটি শো তৈরি করবে সে।
একটা ফোল্ডিং চেয়ার ওকে এগিয়ে দিল স্টিল। ‘বোসো।’
ভিডিয়ো তুলতে এসেছে এক ক্যামেরাম্যান। রানা চেয়ারে বসতেই ঝনঝন আওয়াজ তুলল ওর পায়ের শেকল।
স্টিলের পাশে থামল রিটা। অন্য খুনিদেরকে যেমন সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখেছে, সেভাবেই দেখছে রানাকে। কলম দিয়ে খসখস করে কী যেন লিখল নোটপ্যাডে।
‘আমরা তোমাদেরকে এক দ্বীপে নেব,’ বলল স্টিল। ‘ওখানে পরের ত্রিশ ঘণ্টায় একে অপরকে খুন করবে তোমরা। শেষে বাঁচবে মাত্র একজন। আর তাকে দেয়া হবে সুটকেস ভরা ডলার। দক্ষিণ-পুব এশিয়ার কোন দেশে আত্মগোপন করার সুযোগ পাবে সে। তোমাদের কেমন লাগছে আমার প্রস্তাব?’
‘এর সঙ্গে টিভি শো-র কিসের সম্পর্ক?’ জানতে চাইল রানা।
‘টিভি নয়, ইন্টারনেট। ওয়েব-এ কোটি কোটি মানুষ দেখবে তোমাদের দশজনের মরণপণ লড়াই।’
ব্র্যাড স্টিলের দিকে চেয়ে রানার মনে হচ্ছে, এইমাত্র শুনেছে মানসিক এক রোগীর প্রলাপ।
রেপুটেশন শিটের জন্যে সিম্পসনের দিকে তাকাল স্টিল। তার হাতে ক্লিপবোর্ড ধরিয়ে দিল সিকিউরিটি চিফ। পৃষ্ঠা উল্টে দশম পাতায় এসে থামল প্রযোজক। কাগজে আছে তিনটে প্যারাগ্রাফ। হতাশা নিয়ে মাথা নাড়ল সে। ‘ব্যস? আর কিছুই নেই? নাম মাসুদ রানা। বাংলাদেশি। বড় কয়েকটি ড্রাগ কারখানা উড়িয়ে দিয়েছে। হামলা করে খতম করে দিয়েছে এল সালভেদরের প্রাইম মিনিস্টারের ভাগ্নেসহ কয়েকজন ড্রাগ লর্ডকে। গোটা মিলিটারিকে লেলিয়ে দেয়া হয়েছিল এর পেছনে। জঙ্গলে তার হাতে খুন হয়েছে নয়জন সৈনিক ও অফিসার। ফুরিয়ে গিয়েছিল অস্ত্রের গুলি। শেষ দু’জনকে খতম করেছে বুবি ট্র্যাপ তৈরি করে। জঙ্গলে বুকে আর উরুতে গুলি লাগলে প্রচুর রক্তক্ষরণে জ্ঞান হারায়। তারপর তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় টপ প্রায়োরিটি জেলখানা সোনসোনেটে। প্রাইম মিনিস্টারের নির্দেশে কোর্টে তোলা হয়নি এর কেস। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই সুপ্রিম কোর্ট থেকে রায় দেয়া হয়েছে-এর ফাঁসি হবে তিন মাস পর। এরপর থেকে কারাগারে ছিল।’ রানার দিকে তাকাল স্টিল। ‘আর কোন অন্যায় করোনি তুমি?’
চুপ করে থাকল রানা।
‘অন্যদের মত এরও ভাল বায়োগ্রাফি চাই,’ আনমনে বলল স্টিল। রানার দিকে তাকাল। ‘এল সালভেদরে কী করছিলে?’
‘গায়ের ত্বক ট্যান করছিলাম,’ বলল রানা।
‘ড্রাগের কারখানাগুলো কেন উড়িয়ে দিলে?’
‘ওগুলোর কারণে গায়ে রোদ পড়ছিল না।’
‘আগে কী ধরনের কাজ করতে?’
‘ইনটেরিয়ার ডেকোরেটরের কাজ।’
বিরক্ত হলো স্টিল। ‘আগে কোথায় ছিলে?’
‘সাইবেরিয়া,’ গম্ভীর চেহারায় স্টিলকে দেখল রানা।
‘সাইবেরিয়া? ওখানে কেন?’
‘ছয় প্রেমিকা সঙ্গে নিয়ে বরফে ভরা এক পুকুরে নেমে ফূর্তি করছিলাম।’
বিরক্তির মাত্রা বাড়ল স্টিলের। ঘাড় কাত করে দেখল রিটাকে। ‘এর নতুন অটোগ্রাফি চাই। আগে ছিল টেক্সাসে। আগুন ধরিয়ে দিয়েছে এক এতিমখানায়। ফলে খুন হয়ে গেছে বিশজন ছেলেমেয়ে। বোমা মেরে উড়িয়ে দিয়েছে দুটো ব্যাপটিস্ট চার্চ। বহু দিন ধরেই তাকে খুঁজছে এফবিআই…’
ঝড়ের বেগে বলছে সে, আর নোট নিচ্ছে রিটা।
‘দক্ষিণ আমেরিকায় উড়িয়ে দিয়েছে পঙ্গু ও অটিসটিক বাচ্চাদের এক ক্লিনিক। বিস্ফোরণে মরেছে চোদ্দজন মহিলা ও বত্রিশজন বাচ্চা। আরও যা মাথায় আসে, লেখো, রিটা।’
বিস্মিত চোখে প্রেমিককে দেখছে মেয়েটা। ওর চোখ গিয়ে পড়ল রানার চোখে। মনে মনে রিটা বুঝে গেল, এত নিষ্পাপ দৃষ্টির কেউ জেনে-বুঝে কোন অন্যায় করতে পারবে না।
ব্র্যাড স্টিলের প্রেমিকা বোকা নয়, টের পেয়ে গেছে রানা। ওর নকল জীবনী লিখতে হবে জেনে দ্বিধায় পড়েছে মেয়েটা। তার চোখ ও আড়ষ্ট কাঁধ অনেক কিছুই বলে দিল ওকে।
প্রযোজকের দিকে তাকাল রানা। ‘জানি না তুমি আসলে কে বা কী চাও। তবে তোমার বোধহয় উচিত হচ্ছে না আগুন নিয়ে খেলা।’
‘তোমাকে লড়াইয়ে জিততে হবে এমন নয়,’ জবাবে বলল স্টিল, ‘তবে তোমরা সবাই খেলবে আমার তৈরি নিয়মে।’
রানার সামনে থেকে সরে হ্যাঙারের দরজার কাছে মঞ্চে গিয়ে উঠল স্টিল। প্রতিযোগিতার দশজনকে দেখা হয়ে গেছে তার। সবাই তৈরি ডার্টি গেম শো-র জন্যে। নিজের প্রোগ্রামে পৃথিবীর নৃশংস ক’জন খুনি জড় করে খুশি হয়ে উঠেছে সে। এবার বক্তৃতা দিল, ‘খুনি, ডাকাত ও ধর্ষকেরা-তোমরা চরম সব অপরাধে জড়িত। তাই নানান দেশের আদালত থেকে তোমাদেরকে দেয়া হয়েছে মৃত্যুদণ্ড।’ তাকে ঠিকভাবে ক্যামেরায় দেখাচ্ছে কি না, সেটা নিশ্চিত হলো সে।
‘মর্, চুদির ভাই!’ জার্মান ভাষায় গালি দিল নাৎসি। তার ফলে তার হাঁটুর ওপরে খটাস্ করে নামল এক গার্ডের ব্যাটন।
‘মুখ সামলে,’ বলল স্টিল। হেসে তাকাল গার্ডের দিকে। ‘সাবধান, খেলার সময় এরা যেন লাফ-ঝাঁপ দিতে পারে।’
নাৎসির কাছ থেকে শিক্ষা নেয়নি ইতালিয়ান খুনি এনযো বিয়াঞ্চি। ‘চুদি তোর মা-রে! মর্, শালা, কুত্তার বাচ্চা!’
তার পেটে গেঁথে গেল এক গার্ডের লোহার ব্যাটন।
অপরাধীদের ভেতরে উঠেছে প্রতিবাদের গুঞ্জন।
‘বস্, আগে পেট ভরে খেতে তো দেবেন, নাকি?’ বলল ক্লার্ক। ‘লড়তে গেলে তো শক্তি লাগে, ঠিক কি না?’ সহমতের জন্যে এদিক-ওদিক তাকাল। অন্তত একটু পানি তো দেবেন। গতকাল থেকে সামান্য পানিও পাইনি আমরা।’
হ্যাঙারের ভেতরে হৈ-চৈ করে উঠল বেশ কয়েকজন।
চুপ করে আছে দক্ষিণ আফ্রিকান সুন্দরী আর এসএএস-এর প্রাক্তন অফিসার। মেয়েটাকে ভীত মনে হলো রানার। অন্যদের দেখছে ইংরেজ খুনি। চোখাচোখি হতেই পিস্তলের মত রানার বুকে তর্জনী তাক করে চোখ টিপল সে।
‘একবার দ্বীপে গেলে আকাশ থেকে পাবে পানি, খাবার ও অস্ত্র,’ বলল স্টিল। ‘যে আগে যাবে ব্যাগের কাছে, সে পাবে।’
‘এ-কথা কি সত্য?’ শ্যাননের দিকে তাকাল ক্লার্ক। জবাবে নিষ্ঠুর হাসল শ্যানন। হতাশ হয়ে আফ্রিকান সুন্দরী রোযির দিকে তাকাল ক্লার্ক। ওকে একবার দেখে নিয়ে লাজুক দৃষ্টি নিচু করে নিল মেয়েটা।
‘তোমার তো এসব করার কোন অধিকারই নেই, কেঁচোর বাচ্চা!’ চেঁচিয়ে উঠে বলল ইসাবেলা। হ্যাণ্ড কাফ্ড্ হাতদুটো স্বামীর দিকে বাড়াল সে। মিশে গেল দু’জনের বাহুর উল্কি।
দাঁত বের করে হাসল স্টিল। ‘আমরা পেয়েছি সত্যিকারের দুই প্রেমিক-প্রেমিকা। ওদের লড়াই হলে দারুণ জমবে শো। তবে দু’জনের মধ্যে লড়াই হলে বাঁচবে মাত্র একজন!’
স্টিলের মুখে থুতু ছিটাল ইসাবেলা। ঝড়ের বেগে গালি দিচ্ছে স্প্যানিশ ভাষায়। চুলের মুঠি ধরে ওকে পিছিয়ে নিল একজন গার্ড। তার হাতের ব্যাটনের বাড়ি পড়ল ইসাবেলার গলায়। ব্যথা পেয়ে চুপ হয়ে গেল মেয়েটা।
শার্টের আস্তিন দিয়ে মুখের থুতু মুছল স্টিল। নরম সুরে বলল, ‘যেভাবে মুখ ছোটাও, আশা করি পালিয়ে যাওয়ার সময় সেভাবে ছুটবে। কারণ, আমার ধারণা আগে খুন হবে তুমি।’
রাগে লাল হয়ে গেছে ইসাবেলার স্বামী আলকারাযের মুখ। কর্কশ সুরে বলল সে, ‘ওকে ছেড়ে দিন!’
‘সেটা আর সম্ভব নয়।’ হাসল স্টিল। ‘তোমাদেরকে মন দিয়ে খেলতে হবে।’ আর কারও কথা শুনতে ইচ্ছে হচ্ছে না তার। রিটাকে বলল, ‘চলো, এবার যাওয়া যাক।’ চোখের ইশারা করল সিম্পসনকে। ‘ওদেরকে রওনা করিয়ে দাও।’
হ্যাঙার থেকে বেরিয়ে স্বস্তির শ্বাস ফেলল রিটা।
ওদিকে বসের হয়ে সিম্পসন জানাল, ‘আমার কথা মন দিয়ে শুনবে। ব্রেসলেটে আছে বিশ আউন্স প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ। তোমরা নিজেরা না লড়লে ফাটিয়ে দেয়া হবে সেটা। ছোট কোন বাড়ি উড়িয়ে দেয়ার জন্যে ওটা যথেষ্ট। তোমাদের কানে ঢুকেছে আমার কথা?’
প্রতিযোগীদের দেখছে রানা ও শ্যানন। ওরা ছাড়া অন্যরা চট্ করে তাকাল যার যার গোড়ালির দিকে।
শ্যাননের ধারণা, লড়াইয়ের শুরুতেই খুন হবে মেক্সিকান স্বামী-স্ত্রী। তার আগে তাদেরকে নিয়ে একটু মজা করবে সে। লড়তে পারবে না দক্ষিণ আফ্রিকান সুন্দরী মেয়েটাও। রাশান দানব আকারে বিশাল হলেও বোকা। এদিকে বয়স হয়েছে নাৎসির। লড়াই করে জিততে পারবে না সে। আর নিজের বউ ও শ্বশুর-শাশুড়িকে খুন করলেও সত্যিকার যুদ্ধে তিন মিনিটও টিকতে পারবে না ইতালিয়ান বাচাল। বিপদ আসতে পারে জাপানি লড়াকু ও ড্রাগ ডিলার কালো লোকটার তরফ থেকে। যদিও অ্যাকিউরিয়ামের মাছের মত তাদেরকে খুন করতে পারবে শ্যানন। তো বাকি থাকল বাংলাদেশি যুবক। তার অতীত খুব রহস্যময়। এসএএস ফোর্সের অফিসারদের কাছ থেকে তার সম্পর্কে বহু কিছুই শুনেছে সে। খুব সতর্ক থাকতে হবে তার বিষয়ে।
পরস্পরের দিকে চেয়ে আছে শ্যানন ও রানা।
ভাবভঙ্গি থেকে রানা বুঝে গেছে, আগে ব্রিটিশ স্পেশাল ফোর্সে ছিল এই লোক। প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়ে এখন মজা পাচ্ছে। দৃষ্টি বলছে সে একজন ভয়ঙ্কর সাইকোপ্যাথ।
‘ত্রিশ ঘণ্টা পর ফাটবে বোমা,’ বলল সিম্পসন, ‘সেটা না চাইলে সময়ের আগে খুন করবে পরস্পরকে।’
সিকিউরিটি চিফের মুখে হাসি দেখে রানা বুঝে গেল, স্যাডিস্ট লোকটা এবার বলবে ব্রেসলেটের লাল ট্যাবের কথা। সিম্পসন যে পাকা হারামি, সেটা বুঝে গেছে ও।
‘মাত্র দু’ভাবে তোমরা ফাটাতে পারবে ব্রেসলেটের বোমা,’ বলল সিম্পসন। ‘প্রথম উপায়, লাল ট্যাব খুলে নেয়া। তা হলে দশ সেকেণ্ড পর বিস্ফোরিত হবে বোমা। বুম!’
আবারও সবার চোখ গেল গোড়ালির ব্রেসলেটের ওপরে।
‘দুই, ব্রেসলেট খুলতে চাইলে বা কোন তার নাড়াচাড়া করলে তা হলে ফাটবে বোমা। তোমাদেরকে সহজ এক খেলার জন্যে ধরে আনা হয়েছে। হয় খুন করবে, অথবা খুন হবে।’
কথাগুলো শুনে ভাবছে রানা, জিপিএস-এর কথা এড়িয়ে গেছে সিম্পসন। শ্যানন আর ও ছাড়া অন্যরা বোধহয় জানে না, এই খেলায় জিপিএস-এর মাধ্যমে ওদের প্রতিটি পদক্ষেপ দেখবে স্টিলের লোক। রানা আর কিছু ভাবার আগেই দেখল, গোড়ালির ব্রেসলেটের ডিজিটাল এলসিডি প্যানেলে ফুটে উঠেছে তারিখ ও লাল কিছু সংখ্যা- সোমবার, ৩০:০০:০০।
অর্থাৎ, যে-কোন সময়ে শুরু হবে প্রতিযোগিতা।
মুখ তুলে রানা দেখল, এক গার্ডের দিকে ইশারা করছে সিকিউরিটি চিফ। লোকটার হাতের ল্যাপটপে বিশেষ কোন কোড দিয়ে কিবোর্ডে এন্টার টিপল সে। টিট করে আওয়াজ হলো রানার ব্রেসলেটে। অন্যরা চেয়ে আছে নিজেদের গোড়ালির দিকে। এলসিডি ডিসপ্লেতে দেখা গেল-সোমবার, ২৯:৫৯:৫৯।
চমকে গিয়ে স্প্যানিশ গালি দিচ্ছে আলেক্যান্দ্রো আর ওর স্ত্রী ইসাবেলা। কর্কশ গলায় জার্মান ভাষায় অভিশাপ দিল নাৎসি। ঝুঁকে গেল সে। মনে হলো টেনে গোড়ালি থেকে ছিঁড়ে আনবে ব্রেসলেট। ল্যাংড়া ঘোড়ার মত একই জায়গায় ঘুরছে ইতালিয়ান খুনি এনযো বিয়াঞ্চি। এত দ্রুত কথা বলছে যে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। বিকট গলায় চিৎকার জুড়েছে রাশান দানব লোপাতিন। কিন্তু জিভের তিনভাগের একভাগ কাটা পড়েছে বলে একটা কথাও স্পষ্ট নয়। সুন্দরী রোযিকে দেখলে যে-কেউ ভাববে, রাতে গাড়ির জ্বলন্ত হেডলাইটের সামনে পড়ে থমকে গেছে কোন হরিণী। গোড়ালির কাছ থেকে শরীরের অন্য অংশ সরাতে চাইছে জনি এস. ক্লার্ক। ভয় নিয়ে দেখছে ব্রেসলেট, যেন ওটা জীবন্ত কোন গোখরা সাপ।
অন্যদের প্রতিক্রিয়া দেখে মৃদু হাসছে শ্যানন।
রানাও দেখছে সবাইকে। ব্রেসলেট টানা-হেঁচড়া করলে বিস্ফোরিত হবে, আর সে কাজই করছে কয়েকজন। এখন কী করা উচিত সেটা ভাবল রানা। যে-কারও বোমা ফেটে গেলে নিজে খুন হবে ও।
একই কথা ভেবে গার্ডদের হাতের ইশারা করল সিম্পসন।
ব্যাটন হাতে বন্দিদের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল গার্ডেরা। বোমা ফাটার আগেই কয়েক সেকেণ্ডের হামলায় উত্তেজিত খুনিদেরকে ঠাণ্ডা করে দিল তারা। ব্যাটন দিয়ে এত জোরে মারছে না যে গুরুতরভাবে আহত হবে কেউ। গার্ডরা জানে, এদের সুস্থ দেহে পৌঁছে দিতে হবে দ্বীপে। আর তারপর শুরু হবে ভয়ঙ্কর এক মরণখেলা–দ্য ডার্টি গেম শো।
