Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026

    ভুতুড়ে ট্রেন – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026

    ব্রাহ্মণ ভূত – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    মাহমূদ গজনবীর ভারত অভিযান – এনায়েতুল্লাহ আলতামাস

    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস এক পাতা গল্প1623 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ৪.১ খুন কন্নৌজ আঘাতের পূর্বাঘাত

    ভারত অভিযান (মাহমূদ গজনবীর ভারত অভিযান) (চতুর্থ খণ্ড) / এনায়েতুল্লাহ আলতামাস / অনুবাদ – শহীদুল ইসলাম
    সুলতান মাহমুদ গজনবীর ঐতিহাসিক সিরিজ উপন্যাস।

    .

    উৎসর্গ

    বঙ্গবীর মীর নেছার আলী তিতুমীর, যিনি স্বদেশীয় জাতীয়তা, ইসলামী ইতিহাস ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখার জন্যে এবং দখলদার বেনিয়াদ ইংরেজদের বিতারণের উদ্দেশ্যে সম্পূর্ণ ঈমানী শক্তিতে বলীয়ান হয়ে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, যার ফলে ইংরেজ দখলদার গোষ্ঠী অনুভব করেছিল এ দেশকে আর বেশীদিন পদানত রাখা সম্ভব হবে না।

    –অনুবাদক

    .

    প্রকাশকের কথা

    আলহামদুলিল্লাহ! এদারায়ে কুরআন’ কর্তৃক প্রকাশিত সুলতান মাহমূদ এর ভারত অভিযান সিরিজের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড পাঠক মহলে সাড়া জাগিয়েছে। এজন্য আমরা মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি এবং পাঠক মহলকে জানাচ্ছি মোবারকবাদ। নিয়মিত বিরতি দিয়ে এর প্রতিটি খণ্ড প্রকাশের ব্যাপারে আমাদের চেষ্টার কোন ক্রটি ছিল না কিন্তু দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ও মুদ্রণ সামগ্রির উচ্চমূল্য আমাদের টুটি চেপে ধরেছে। ফলে কিছুটা বিলম্বিত হয়েছে এই সিরিজের প্রকাশনা।

    আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে মাহে রমজান ‘০৮ এর বইমেলা উপলক্ষে এই সিরিজের চতুর্থ খণ্ডটি পাঠকের হাতে তুলে দিতে পেরে সুখানুভব করছি।

    নানাবিধ সীমাবদ্ধতার পরও আমরা এ খণ্ডটি আগেরগুলোর চেয়ে আরো সুন্দর করার চেষ্টা করেছি। তবুও মুদ্রণ প্রমাদ ভুল-ত্রুটি থাকা স্বাভাবিক। বিজ্ঞমহলের কাছে যে কোন ত্রুটি সম্পর্কে আমাদের অবহিত করার বিনীত অনুরোধ রইল।

    প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ডের মতো চতুর্থ খণ্ডটিও পাঠক-পাঠিকা মহলে আদৃত হলে আমাদের সার্বিক প্রয়াস সার্থক হবে।

    -প্রকাশক

    .

    লেখকের কথা

    “মাহমূদ গজনবীর ভারত অভিযান” সিরিজের এটি চতুর্থ খণ্ড। উপমহাদেশের ইতিহাসে সুলতান মাহমূদ গজনবী সতের বার ভারত অভিযান পরিচালনাকারী মহানায়ক হিসেবে খ্যাত। সুলতান মাহমূদকে আরো খ্যাতি দিয়েছে পৌত্তলিক ভারতের অন্যতম দু’ ঐতিহাসিক মন্দির সোমনাথ ও থানেশ্বরীতে আক্রমণকারী হিসেবে। ঐসব মন্দিরের মূর্তিগুলোকে টুকরো টুকরো করে ধূলিসাৎ করে দিয়েছিলেন মাহমুদ। কিন্তু উপমহাদেশের পাঠ্যপুস্তকে এবং ইতিহাসে মাহমূদের কীর্তির চেয়ে দুষ্কৃতির চিত্রই বেশী লিখিত হয়েছে। হিন্দু ও ইংরেজদের রচিত এসব ইতিহাসে এই মহানায়কের চরিত্র যেভাবে চিত্রিত হয়েছে তাতে তার সুখ্যাতি চাপা পড়ে গেছে। মুসলিম বিদ্বেষের ভাবাদর্শে রচিত ইতিহাস এবং পরবর্তীতে সেইসব অপইতিহাসের ভিত্তিতে প্রণীত মুসলিম লেখকরাও মাহমূদের জীবনকর্ম যেভাবে উল্লেখ করেছেন তা থেকে বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের বোঝার উপায় নেই, তিনি যে প্রকৃতই একজন নিবেদিতপ্রাণ ইসলামের সৈনিক ছিলেন, ইসলামের বিধি-বিধান তিনি অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতেন। জাতিশত্রুদের প্রতিহত করে খাঁটি ইসলামী শাসন ব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও দৃঢ় করণের জন্যেই নিবেদিত ছিল তার সকল প্রয়াস। অপলেখকদের রচিত ইতিহাস পড়লে মনে হয়, সুলতান মাহমূদ ছিলেন লুটেরা, আগ্রাসী ও হিংস্র। বারবার তিনি ভারতের মন্দিরগুলোতে আক্রমণ করে সোনা-দানা, মণি-মুক্তা লুট করে গজনী নিয়ে যেতেন। ভারতের মানুষের উন্নতি কিংবা ভারত কেন্দ্রিক মুসলিম সালতানাত প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা তার কখনো ছিলো না। যদি তকালীন ভারতের নির্যাতিত মুসলমানদের সাহায্য করা এবং পৌত্তলিকতা দূর করে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দেয়ার একান্তই ইচ্ছা তার থাকতো, তবে তিনি কেন মোগলদের মতো ভারতে বসতি গেড়ে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতেন না? ইত্যাকার বহু কলঙ্ক এটে তার চরিত্রকে কলুষিত করা হয়েছে।

    মাহমূদ কেন বার বার ভারতে অভিযান চালাতেন। মন্দিরগুলো কেন তার টার্গেট ছিল? সফল বিজয়ের পড়ও কেন তাকে বার বার ফিরে যেতে হতো গজনীর ইত্যাদি বহু প্রশ্নের জবাব; ইসলামের জন্য নিবেদিত প্রাণ সৈনিক সুলতান মাহমূদকে তুলে ধরার জন্যে আমার এই প্রয়াস। নির্ভরযোগ্য দলিলাদি ও বিশুদ্ধ ইতিহাস ঘেটে আমি এই বইয়ে মাহমূদের প্রকৃত জীবন চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। প্রকৃত পক্ষে সালাহ উদ্দীন আইয়ুবীর মতোই মাহমূদকেও স্বজাতির গাদ্দার এবং বিধর্মী পৌত্তলিকদের বিরুদ্ধে একই সাথে লড়াই করতে হয়েছে। যতো বার তিনি ভারত অভিযান চালিয়েছেন, অভিযান শেষ হতে না হতেই খবর আসতো, সুযোগ সন্ধানী সাম্রাজ্যলোভী প্রতিবেশী মুসলিম শাসকরা গজনী আক্রমণ করছে। কেন্দ্রের অস্তিত্ব রক্ষার্থে বাধ্য হয়েই মাহমূদকে গজনী ফিরে যেতে হতো। একপেশে ইতিহাসে লেখা হয়েছে, সুলতান মাহমুদ সতের বার ভারত অভিযান চালিয়েছিলেন, কিন্তু একথা বলা হয়নি, হিন্দু রাজা-মহারাজারা মাহমুদকে উৎখাত করার জন্যে কত শত বার গজনীর দিকে আগ্রাসন চালিয়ে ছিল।

    সুলতান মাহমুদের বারবার ভারত অভিযান ছিল মূলত শত্রুদের দমিয়ে রাখার এক কৌশল। তিনি যদি এদের দমিয়ে রাখতে ব্যর্থ হতেন, তবে হিন্দুস্তানের পৌত্তলিকতাবাদ সাগর পাড়ি দিয়ে আরব পর্যন্ত বিস্তৃত হতো।

    মাহমূদের পিতা সুবক্তগীন তাকে অসীয়ত করে গিয়েছিলেন, “বেটা! ভারতের রাজাদের কখনও স্বস্তিতে থাকতে দিবে না। এরা গজনী সালাতানাতকে উৎখাত করে পৌত্তলিকতার সয়লাবে কাবাকেও ভাসাতে চায়। মুহাম্মদ বিন কাসিমের সময়ের মত ভারতীয় মুসলমানদেরকে হিন্দুরা জোর জবরদস্তি হিন্দু বানাচ্ছে। এদের ঈমান রক্ষার্থে তোমাকে পৌত্তলিকতার দুর্গ গুঁড়িয়ে দিতে হবে। ভারতের অগণিত নির্যাতিত বনি আদমকে আযাদ করতে হবে, তাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে হবে।”

    আলবিরুনী, ফিরিশতা, গারদিজী, উবী, বাইহাকীর মতো বিখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য ইতিহাসবিদগণ লিখেছেন, সুলতান মাহমূদ তৎকালীন সবচেয়ে বড় বুযুর্গ ও ওলী শাইখ আবুল হাসান কিরখানীর মুরীদ ছিলেন। তিনি বিজয়ী এলাকায় তার হেদায়েত মতো পুরোপুরি ইসলামী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

    তিনি নিজে কিরখানীর দরবারে যেতেন। কখনও তিনি তার পীরকে তার দরবারে ডেকে পাঠাননি। উপরন্তু তিনি ছদ্মবেশে পীর সাহেবের দরবারে গিয়ে ইসলাহ ও পরামর্শ গ্রহণ করতেন। তিনি আত্মপরিচয় গোপন করে কখনও নিজেকে সুলতানের দূত হিসেবে পরিচয় দিতেন। একবার তো আবুল হাসান কিরখানী মজলিসে বলেই ফেললেন, “আমার একথা ভাবতে ভালো লাগে যে, গজনীর সুলতানের দূত সুলতান নিজেই হয়ে থাকেন। এটা প্রকৃতই মুসলমানের আলামত।”

    মাহমূদ কুরআন, হাদীস ও দীনি ইলম প্রচারে খুবই যত্নবান ছিলেন। তার দরবারে আলেমদের যথাযথ মর্যাদা ছিল। সব সময় তার বাহিনীতে শত্রু পক্ষের চেয়ে সৈন্যবল কম হতো কিন্তু তিনি সব সময়ই বিজয়ী হতেন। বহুবার এমন হয়েছে যে, তার পরাজয় প্রায় নিশ্চিত। তখন তিনি ঘোড়া থেকে নেমে ময়দানে দু’রাকাত নামায আদায় করে মোনাজাত করতেন এবং চিৎকার করে বলতেন, “আমি বিজয়ের আশ্বাস পেয়েছি, বিজয় আমাদেরই হবে।” বাস্তবেও তাই হয়েছে।

    অনেকেই সালাহ উদ্দীন আইয়ুবী আর সুলতান মাহমূদকে একই চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যের বীর সেনানী মনে করেন। অবশ্য তাদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য একই ছিল। তাদের মাঝে শুধু ক্ষেত্র ও প্রতিপক্ষের পার্থক্য ছিল। আইয়ুবীর প্রতিপক্ষ ছিল ইহুদী ও খৃস্টশক্তি আর মাহমূদের প্রধান প্রতিপক্ষ ছিল হিন্দু পৌত্তলিক রাজন্যবর্গ। ইহুদী ও খৃস্টানরা সালাহ উদ্দীন আইয়ুবীর সেনাদের ঘায়েল করতে প্রশিক্ষিত সুন্দরী রমণী ব্যবহার করে নারী গোয়েন্দা দিয়ে আর এর বিপরীতে সুলতান মাহমূদের বিরুদ্ধে এরা ব্যবহার করতো শয়তানী যাদু। তবে ইহুদী-খৃষ্টানদের চেয়ে হিন্দুদের গোয়েন্দা তৎপরতা ছিল দুর্বল কিন্তু সুলতানের গোয়েন্দারা ছিল তৎপর ও চৌকস।

    তবে একথা বলতেই হবে, সালাহ উদ্দীন আইয়ুবীর গোয়েন্দারা যেমন দৃঢ়চিত্ত ও লক্ষ্য অর্জনে অবিচল ছিল, মাহমুদের গোয়েন্দারা ছিল নৈতিক দিক দিয়ে ততোটাই দুর্বল। এদের অনেকেই হিন্দু নারী ও যাদুর ফাঁদে আটতে যেতো। অথবা হিন্দুস্তানের মুসলিম নামের কুলাঙ্গররা এদের ধরিয়ে দিতো। তারপরও সালাহ উদ্দীন আইয়ুবীর চেয়ে সুলতান মাহমূদের গোয়েন্দা কার্যক্রম ছিল বেশি ফলদায়ক।

    ইতিহাসকে পাঠকের কাছে সুখপাঠ্য, বিশেষ করে তরুণদের কাছে হৃদয়গ্রাহী করে পরিবেশনের জন্যে গল্পের মতো করে রচনা করা হয়েছে এই গ্রন্থ। বাস্তবে এর সবটুকুই সত্যিকার ইতিহাসের নির্যাস। আশা করি আমাদের নতুন প্রজন্ম ও তরুণরা এই সিরিজ পড়ে শত্রু-মিত্রের পার্থক্য, এদের আচরণ ও স্বভাব জেনে এবং আত্মপরিচয়ে বলীয়ান হয়ে পূর্বসূরীদের পথে চলার দিশা পাবে।

    এনায়েতুল্লাহ
    লাহোর।

    .

    বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

    ৪.১ খুন কন্নৌজ আঘাতের পূর্বাঘাত

    বর্তমান গযনী শহর তিন দশক ধরে একের পর এক পরাশক্তির আগ্রাসনে পর্যুদস্ত। দখলদার রাশিয়ার কবল থেকে দীর্ঘদিন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর মুক্ত হয়ে মরার উপর খাড়ার ঘা এর মতো গৃহযুদ্ধের বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আবারো আমেরিকার আগ্রাসনের শিকার হয়েছে সুলতান মাহমূদের প্রিয় ভূমি গযনী। হয়েছে অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রের পরীক্ষাগার। বিশ্বের সবচেয়ে বেশী ক্ষতিকর বোমাগুলোর বিস্ফোরণস্থল বানানো হয়েয়ে সুলতান মাহমূদের গযনীকে। ইসলাম বিদ্বেষী ইহুদী খ্রিস্টানদের হাইড্রোসেন বোমার গবেষণাগারে পরিণত হয়েছে অমিততেজী স্বাধীন ঈমানদীপ্ত সুলতানের জন্মভূমি। শুধু গযনী নয় গোটা আফগানিস্তানের প্রতি ইঞ্চি জমি আজ বহুজাতিক বাহিনীর নিক্ষিপ্ত বোমা ও গোলার আঘাতে বিষাক্ত।

    হাজার বছরের স্থাপনা ও ইসলামী ঐতিহ্যের চিহ্নগুলো বছরের পর বছর ধরে চলে আসা যুদ্ধান্মদনায় ধ্বংসকূপের নিচে চাপা পড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে। সেই সুলতান মাহমুদের দুর্বার অভিযান আর স্বজাতি ও ইসলামকে সুউচ্চে উচ্চকিত করার সেই সোনালি দিনগুলো আজকে শুধুই স্মৃতি। মুষ্টিমেয় লোক ছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই পার্থিব স্বার্থে স্বজাতির চিহ্নিত দুশমনদের সাথে বিনাশী দোস্তিতে মত্ত। জাতির ঘাড়ে চেপে বসেছে কথিত দেশপ্রেমিকের বেশে বিদেশী বরকন্দাজ। তবে গযনীর মাটি এখনো সম্পূর্ণ ভুলে যায়নি হয়নি তার অতীত।

    এখনো গযনীর মাটিতে একদল আল্লাহর সৈনিকের পদচারণা রয়েছে। সুলতানি না থাকলেও মাহমূদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেই একদল অমিত সাহসী যোদ্ধা বিদেশী দখলদারদের বিতাড়িত করে গোটা আফগানিস্তানকে পুনর্বার

    ইসলামী পতাকার ছায়াতলে আনার জন্যে অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিচ্ছে। বিগত তিনদশক ধরেই গযনী ও সংশ্লিষ্ট এলাকার মায়েরা তাদের সন্তানদের পায়ে বেড়ি না বেঁধে আল্লাহর পথে জিহাদের জন্যে অনুপ্রেরণা যুগিয়ে যাচ্ছে। আজো শত শত কন্যা জায়া জননী তাদের পিতা স্বামী সন্তান ভাইকে ইসলামের জন্যে উৎসর্গ করছে। বিলীন হয়ে যায়নি সুলতান মাহমুদের স্মৃতি, হারিয়ে যায়নি সুলতান মাহমূদের অভিযান। একদল মর্দেমুজাহিদ নিজেদের জীবন ও দেহের তাজা খুন ঢেলে দিয়ে নতুন করে রচনা করছে ত্যাগ ও জীবন দানের নতুন ইতিহাস। ঈমান ও ইসলামকে আল্লাহর জমিনে প্রতিষ্ঠিত করার নতুন অধ্যায়।

    একজন মূর্তি সংহারীর জন্মভূমি হিসেবেই শুধু ইতিহাসে গযনী স্মরণীয় ছিল না। গযনী খ্যাতি পেয়েছিল সেখানকার অসাধারণ স্থাপত্য কীর্তি ও অসংখ্য শৈল্পিক ধাচে নির্মিত দালান কোঠা ও বড় বড় অট্টালিকার জন্যে।

    সুলতান মাহমূদ কনৌজ বিজয়ের পর হিন্দুস্তান থেকে গযনী ফিরে এসে তৎকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ নির্মাণশিল্পীদের দিয়ে গযনীতে মর্মর পাথরের একটি ঐতিহাসিক মসজিদ নির্মাণ করিয়েছিলেন। সেই সাথে মসজিদ সংলগ্ন স্থানেই গড়ে তুলেছিলেন সর্বাধুনিক কারিকুলাম ও তথ্যসমৃদ্ধ একটি বিশ্ববিদ্যালয় । সেই সময়ের সব জ্ঞান-বিজ্ঞানই এ বিশ্ববিদ্যালয়ে চর্চিত হতো।

    এ মসজিদ নির্মিত হয়েছিল মথুরা জয়ের স্মারক হিসেবে। হিন্দুস্তান অভিযানে যেসব মুজাহিদ শাহাদত বরণ করেছিল তাদের স্মৃতি হিসেবে তিনি সুউচ্চ মিনার নির্মাণ করেন। কারণ, মথুরা ভারতের হিন্দুদের কাছে এমনই পবিত্র যেমনটি মুসলমানের কাছে মক্কা মদীনা।

    মথুরা হিন্দুদের দেবতা শ্রীকৃষ্ণের জন্মভূমি। মথুরার প্রধান মন্দিরের মূর্তিগুলোকেও পবিত্র বলে মনে করা হতো।

    মসজিদ তৈরি করার জন্যে দেশ-বিদেশ থেকে নামী-দামী নির্মাণ শিল্পীদের আনা হলো। তারা সুলতান মাহমূদের কল্পনা ও ভাবনার চেয়েও বেশী সুন্দর মসজিদ নির্মাণ করে ফেলল। সুলতান মাহমূদ মসজিদের দেয়াল গাত্রের বিভিন্ন কারুকার্যে সোনা-রুপা গলিয়ে কারুকার্যকে আরো দৃষ্টিনন্দন করে তুললেন। মসজিদের ভেতরে সুদৃশ্য গালিচা বিছানো হলো। মসজিদ সংলগ্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ভাষার গ্রন্থরাজি সংগ্রহ করা হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে একটি যাদুঘরও তৈরী করা হলো। সেখানে সংরক্ষণ করা হলো বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন।

    সুলতান মাহমূদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্যে আলাদা তহবিল গড়ে তুললেন।

    মসজিদ ও বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণে সুলতানের আগ্রহ দেখে গযনীর বিত্তশালী ব্যক্তি ও সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও তাদের রুচি ও আভিজাত্যের সমন্বয়ে বহু মসজিদ, নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীর বাড়ি নির্মাণ করলেন। ফলে গযনী শহর আধুনিক স্থাপত্য শিল্প ও ইমারতে জাকজমকপূর্ণ হয়ে উঠলো। সুলতান মাহমুদ ও তার প্রিয় গযনীবাসীর এই উন্নতি এমনিতেই হয়নি। এ জন্যে তাকে একের পর এক অভিযান পরিচালনা করতে হয়েছে।

    আধুনিক গযনী গড়ে ওঠার মূলে হাজারো গযনীবাসীর জীবন যৌনব বিসর্জন দিতে হয়েছে। গযনীর হাজার হাজার মর্দেমুজাহিদদের লাশ গযনী থেকে দূরে বহু দূরে বুলন্দশহর, মথুরা, মহাবন, কনৌজের মাটিতে, গঙ্গা যমুনার স্রোতধারায় ভেসে গেছে। যমুনা গঙ্গার তীরে হাজারো মুজাহিদের লাশ কবর দিতে হয়েছে। যাদের চিহ্নও কালের স্রোতে হারিয়ে গেছে। সেইসব মর্দেমুজাহিদ হিন্দুস্তানের কুফরীর জগদ্দল পাথর থেকে সেখানকার নির্যাতিত নিপীড়িত সাধারণ মানুষদের মুক্তি দেয়ার এক অদৃশ্য বাসনা নিয়ে স্ত্রী, পুত্র, পিতামাতা আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে গযনী থেকে শত শত মাইল দূরবর্তী হিন্দুস্তান অভিযানে শরীক হয়েছিলেন। তাদের ঈমানী শক্তি, বিজয়ের জয়দীপ্ত ব্যাকুলতা, আল্লাহর বাণীকে কুফরস্তানে উচ্চকিত করার আকাঙ্ক্ষা তাদেরকে স্থির থাকতে দেয়নি। তাদের হৃদয়ে ছিল আল্লাহ্ প্রেমের আগ্নেয়গিরি। বুকের ভেতরে ছিল কুফরী নির্মূলের দাবানল। ঈমানের উত্তাপ তাদেরকে আমৃত্যু লড়াই করে যেতে অনিঃশেষ শক্তি সঞ্চার করেছিল।

    ১০১৮ সালের শেষ দিকে সুলতান মাহমূদের সৈন্যরা মথুরা থেকে বুলন্দশহর পর্যন্ত প্লাবনের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এখনো ওই অঞ্চলের মানচিত্র খুলে ধরলে তাদের দুর্ধর্ষ অভিযানের কথা বিস্ময়কর মনে হয়। এমনও হয়েছে একটি অভিযান চালাতে গিয়ে তাদেরকে প্রমত্তা গঙ্গা কয়েকবার পাড়ি দিতে হয়েছে। সমর বিশারদগণ অভিভূত হয়ে যান গযনী থেকে তিন মাসের দূরত্বে এসে এমন কঠিন ও বন্ধুর পথ অতিক্রম করে শত বেড়াজাল ডিঙিযে একের পর এক দুর্গ ও যুদ্ধে জয়লাভ করলো কিভাবে তা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কোন যুদ্ধবাজ জেনারেলের পক্ষে সম্ভব ছিলো না বলে তারা অকপটে স্বীকার করেছেন। এজন্য দরকার ছিল অস্বাভাবিক ধীশক্তির দূরদর্শী সামরিক জ্ঞান ও অলৌকিক শক্তিতে বলীয়ান কোন নেতৃত্বের। বাস্তবে এসব গুণাবলীর সমন্বয় ছিল সুলতান মাহমূদের মধ্যে। সুলতান মাহমূদ শুধু একজন সমরনায়কই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন ন্যায়পরায়ণ, খোদাভীরু শাসক। নিজেকে যিনি আল্লাহর জমিনে আল্লাহর প্রতিনিধির উর্ধ্বের মনে করতেন না।

    মথুরা ছিল সুলতান মাহমূদের জন্যে খুব মূল্যবান টার্গেট। যে কোন মূল্যে হিন্দুরা মথুরাকে সুলতানের কজা থেকে রক্ষার জন্যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলো। কিন্তু সুলতান হিন্দুদের সকল দর্প চূর্ণ করে মথুরাকে দখল করে নেন এবং হাজার হাজার বছরের প্রাচীন মূর্তি গুঁড়িয়ে দেন। মথুরার ঐতিহাসিক দেবমন্দিরে মুসলমানরা আযানের উচ্চকিত করে এবং মন্দিরকে মসজিদে রূপান্তর ঘটায়।

    মথুরা বিজয়ের পর ক্লান্ত শ্রান্ত যোদ্ধাদের খানিক বিশ্রাম দেয়ার জন্যে সুলতান সেখানে কয়েকদিন অবস্থান করেন। এই অবসরে তিনি কনৌজ অভিযানের প্রস্তুতি নেন। সেনাবাহিনীকে নতুন করে বিন্যাস করেন।

    কনৌজ সম্পর্কে গোয়েন্দারা সুলতানকে খবর দিয়েছিল, কনৌজ বিজয় সহজসাধ্য হবে না। কারণ, হিন্দুস্তানের অন্যান্য রাজা মহারাজাদের কাছে কনৌজের মহারাজা অত্যন্ত মর্যাদার অধিকারী।

    বাস্তবেও কনৌজের মহারাজা রাজ্যপাল ছিলেন বুদ্ধিমান। এ কারণে কনৌজ আক্রমণের আগে সুলতান মাহমূদ সৈন্যদের কিছুটা বিশ্রাম দিয়ে তাদের ক্লান্তি দূর করে নতুন করে সেনা কমান্ড সাজানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন। কনৌজ আক্রমণের আগেই তিনি আশপাশের এলাকায় তার গোয়েন্দাদের ছড়িয়ে দিলেন।

    তার গোয়েন্দাদের পাঠানো তথ্য মতে কনৌজের আগে আরো দুটো ছোট্ট রাজ্যের অস্তিত্ব পাওয়া গেলো। এই রাজ্য দুটোর শাসকেরা মহারাজা ছিলো না, তাদেরকে রায়বাহাদুর বলা হতো। এরা ছিল বড় রাজত্বের করদাতা ছোট সামন্তরাজা। নিজেদেরকে রাজা হিসেবে ঘোষনা দেয়ার অধিকার তাদের ছিল না। কিন্তু তারা সীমিত আকারে সৈন্য লালন পালন ও কর আদায় করতে পারতো। এই রায়দের একজন ছিলেন রায়চন্দ্র। রায়চন্দ্র ছাড়াও আরো বেশ কয়েকটি ছোট্ট রাজ্য ছিল কনৌজ রাজা রাজ্যপালের অধীন।

    সুলতান মাহমূদের স্থানীয় গোয়েন্দাদের খবরে জানা যায়, লাহোরের মহারাজা ভীমপালও এই অঞ্চলেই অবস্থান করছেন। রাজা ভীমপাল এই অঞ্চলের রাজাদেরকে সুলতানের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ করে তুলছেন এবং তাদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলতে চেষ্টা করছেন। রাজা ভীমপালের পক্ষে সুলতান মাহমূদের মুখোমুখি হওয়া সম্ভব ছিলো না। কারণ, তিনি ছিলেন সুলতানের কাছে বশ্যতা স্বীকারকারী অধীনতামূলক চুক্তিতে আবদ্ধ। ভীমপাল সুলতানের সাথে কোনরূপ যুদ্ধ না করার চুক্তি করেছিলেন এবং সুলতানের সেনাবাহিনীকে সব ধরনের সহযোগিতা করার ব্যাপারটিও চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত ছিলো।

    সুলতান মাহমূদ ভীমপালকে খুঁজে বের করে জীবিত গ্রেফতার করে নিয়ে আসার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু গোয়েন্দারা গভীর অনুসন্ধান করেও ভীমপালকে কোথাও খুঁজে পায়নি।

    মথুরা থেকে প্রায় দেড়শ মাইল দূরে গঙ্গা নদীর ডান তীরে ছিল কনৌজ শহর। আর যমুনা নদীর ডান তীরে ছিল মথুরা শহর। ফলে সুলতান মাহমুদকে উভয় নদী অতিক্রম করতে হয়েছিল। কিন্তু নিরাপদে নদী পারাপারের জন্য সুলতানকে পথের কাঁটাস্বরূপ সকল হিন্দু রায় ও ছোট্ট ছোট্ট রাজাদেরকে অস্ত্রমুক্ত করতে হয়েছিল। অন্যান্য হিন্দু রাজাদের নিরস্ত্র না করলে আশংকা ছিল এরা সবাই মিলে কনৌজ অবরোধে ব্যস্ত সুলতানের বাহিনীর উপর পেছন থেকে আক্রমণ করে বসবে। সুলতান খুব দ্রুত অভিযান চালাতে চাচ্ছিলেন, যাতে কনৌজের সৈন্যরা প্রতিরোধ ব্যবস্থা অতটা শক্তিশালী না করতে পারে।

    পথিমধ্যে যমুনা নদীর বাম পাড়ে মনুজ নামের একটি ছোট্ট দুর্গ ও রাজ্য ছিল। সে সময় এটিকে ব্রাক্ষণ দুর্গ নামেও ডাকা হতো। কনৌজ ও মনুজের মধ্যে ব্যবধান ছিল মাত্র সাতাশ মাইল। মনুজ ছিল হিন্দু রাজপুতদের আবাসস্থল। এরা ছিল স্বভাবজাত লড়াকু। এদের মেয়েরা পর্যন্ত যুদ্ধ বিগ্রহে পিছপা হতো না। মনুজের রাজপুতেরা ছিল কনৌজ রাজার খুবই বিশ্বস্ত। রাজা রাজ্যপাল মনুজের রাজপুতদের সাথে সামরিক সখ্য গড়ে তুলেছিলেন। তাদের মধ্যে পারস্পারিক সামরিক সহযোগিতা চুক্তিও বিদ্যমান ছিল।

    একদিন মনুজের কিছু অধিবাসী যমুনা নদীতে গোসল করছিল। পুরুষদের পাশাপাশি মহিলারাও নদীতে গোসল করছিল। সাধারণত তারা সকাল বেলায় গোসল সেরে নেয়াটাকে ধর্মীয় অনুসঙ্গ মনে করে। মনুজ দুর্গের অবস্থান ছিল একেবারে নদীর তীর ঘেঁষে। হঠাৎ মহিলাদের মধ্যে চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেল। তারা নদী থেকে হচড়ে পাছড়ে উঠে বাড়ীর দিকে দৌড়াতে শুরু করল। মহিলাদের আর্তচিৎকার শুনে পুরুষেরা দৌড়ে এলো। তারা মনে করল হয়তো নদীতে কোন জলহস্তি কিংবা কোন জলজ প্রাণী দেখে মহিলারা আতংকিত হয়েছে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের ভুল ভেঙ্গে গেল। তারা নদীর পানিতে স্রোতের সঙ্গে মানুষের মরদেহ ভেসে আসতে দেখতে পেল এবং নদীর পানির রংও তাদের কাছে পরিপবিতত মনে হলো।

    প্রথমে তারা মাত্র কয়েকটি মরদেহ দেখতে পেয়েছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তাদের চোখে পড়ল সারি সারি সাশ। যেনো নদীতে পানি নয় শুধু মরদেহ প্রবাহিত হচ্ছে।

    নদীর জলে স্নানরত যে ক’জন পুরোহিত ও পণ্ডিত শ্রেণীর লোক ছিল, তারা নদীতে হাঁটু গেড়ে বসে ভজন আওড়াতে শুরু করল। তারা ভয় ও আতংকে কাঁপছিল। তাদের কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছিল ভজন।

    এই অবস্থা দুর্গের দেয়ালের উপর থেকে প্রহরীরা যখন দেখতে পেল, তাদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। রাজুপুতেরা ভীতু ছিলো না। যুদ্ধ বিগ্রহে তাদের মধ্যে কোন বেশ উৎসাহী ছিল। কিন্তু এতো বিপুল সংখ্যক মানুষের মরদেহ তাদের মধ্যে আতংক সৃষ্টি করল। তারা এটিকে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে অনুমান করল।

    যে সব পুরোহিত নদী থেকে উঠে এসেছিল, তারা মন্দিরে এসে ঘণ্টা বাজাতে শুরু করল। মন্দিরের বিশেষ ঘণ্টার আওয়াজ শহরে আতংক ছড়িয়ে দিল। রাজা রায়চন্দ্রের কাছে যখন খবর পৌঁছালো, তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্যে দ্রুত দুর্গ প্রাচীরে গিয়ে দাঁড়ালেন। রাজার সাথে তার একান্ত নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও দরবারী লোকজনও দুর্গ প্রাচীরে সমবেত হলো।

    অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে রাজা তার নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও দরবারীদের উদ্দেশ্যে বললেন, তোমরা কি জানো এসব মরদেহ কোত্থেকে এসেছে?

    এসব মরদেহ মথুরা ও মহাবনের অধিবাসীদের। তোমরা কি শোনান, মুসলমানরা মথুরা ও মহাবন দখল করে ওখানকার সকল মন্দির ধ্বংস করে দিয়েছেঃ

    রাজা রায়চন্দ্র দুর্গ প্রাচীরের উপর থেকে দেখতে পেলেন, লোকজন নদীতে লাশের সারি দেখে আতংকিত হয়ে দিক বিদিক দৌড়ে পালাচ্ছে।

    আতংকিত মানুষদের দেখে রাজা রায়চন্দ্র তার সঙ্গীদের বললেন, দেখো, কাপুরুষদের কাণ্ড! নদীতে কটা মরদেহ দেখে ভয়ে নদী ছেড়ে পালাচ্ছে। এরা জানে না, এমন কাপুরুষের পরিচয় দিলে আমাদের সবার মরদেহ এভাবেই নদীতে ভেসে যাবে এবং আমাদের মেয়েরা মুসলমানদের বাঁদী দাসীতে পরিণত হবে।

    দেখতে দেখতে মন্দিরে ঘণ্টা, শিংগার ফুস্কার ও ঢাকঢোলের আওয়াজ আরো অত্যুঙ্গে উঠলো। আতংকিত মানুষেরা ঘরে বাইরে সর্বত্র ‘হরে রাম হরে কৃষ্ণ’ ধ্বনি বলে চেঁচাতে লাগলো। ভীত সন্ত্রস্থ মহিলারা ঘর ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে এলো। শহরের চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লো দ্রুত সংক্রামক এক আতংক। অবস্থা দেখে রায়চন্দ্রের নিজের চেহারাও কালো হয়ে গেল। এক পর্যায়ে রাজা বলতে বাধ্য হলেন,

    ‘বন্ধ কর এসব বাদ্য-বাজনা ও ঘন্টা বাজানো! কি সব মাতম শুরু করেছো? রাজপুতেরা কার লাশ দেখে এমন মাতম শুরু করেছে। মন্দিরের পুরোহিতদের ডেকে আমার কাছে নিয়ে এসো।‘ প্রহরীদের নির্দেশ দিলেন রায়চন্দ্র।

    নির্দেশ শুনে রায়চন্দ্রের সৈন্যরা দৌড়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যে সব ধরনের ঘণ্টা ও ঢাকঢোলের বাজনা বন্ধ হয়ে গেল। শহরে নেমে এলো নীরবতা।

    দুর্গ প্রাচীর থেকে রাজা রায়চন্দ্র নীচে নেমে জনসাধারণের সাক্ষাতের জন্যে সংরক্ষিত তার দরবারে গিয়ে বসলেন।

    কিছুক্ষণ পর রাজদরবারের দু’জন পুরোহিত এবং তাদের সঙ্গে আরো একজনকে রাজার সম্মুখে হাজির করা হলো। তৃতীয় ব্যক্তির কাপড় চোপড়সহ

    পুরো শরীর ছিল জবজবে ভেজা এবং তার অবস্থা ছিল একেবারে বিধ্বস্ত । রায়চন্দ্রকে জানানো হলো, এই লোকটিকে নদী থেকে জীবন্ত উদ্ধার করা হয়েছে। সে এক প্রস্ত কাঠ খণ্ডকে আঁকড়ে ধরে ভেসে আসছিল। রায়চন্দ্র জিজ্ঞেস করলেন, এই লোক কোথাকার? কোত্থেকে এসেছে সে?

    লোকটি ক্ষীণ কণ্ঠে বললো, এসব মরদেহ মহাবনের সৈন্যদের। আমিও মহাবনের সেনাবাহিনীর সদস্য। আমাদেরকে গোয়েন্দারা খবর দিয়েছিল, মুসলিম সৈন্যরা একের পর এক দুর্গ জয় করে আমাদের দিকে আসছে এবং তাদের গন্তব্য মথুরার দিকে।

    মহারাজা আপনি জানেন, মহাবন কী ভীষণ জঙ্গলাকীর্ণ এবং কতো দূর পর্যন্ত জঙ্গল বিস্তৃত। আমাদের মহারাজা কুয়ালচন্দ্র সকল সৈন্যদেরকে সারা জঙ্গল জুড়ে ছড়িয়ে দিলেন এবং তীরন্দাজদেরকে গাছে চড়িয়ে দিলেন। হস্তি বাহিনীকে জঙ্গলের একপাশে দাঁড় করিয়ে দিলেন। যাতে নির্দেশ পাওয়ার সাথে সাথে মুসলিম সৈন্যদের পিষে মারার জন্য অগ্রসর হতে পারে। কারণ এই জঙ্গল হয়েই মূসলমানদের অগ্রসর হওয়ার কথা ছিল।

    এমনই ছিল আমাদের রণপ্রস্তুতি; কিন্তু কি করে কি ঘটে গেল এর পরের ঘটনা আমি আপনাকে কিছুই বলতে পারবো না।

    হঠাৎ এক সময় জঙ্গলের দিকে মুসলমানদের কিছু সংখ্যক সৈন্যের উপস্থিতি দেখা গেল। আমাদের সৈন্যরা সামান্য সংখ্যক মুসলিম সৈন্য দেখে উত্তেজনায় চিৎকার শুরু করে দিল, ‘একজনকেও জীবিত ফেরত যেতে দেবো না; সবাই ঘিরে ফেলে। এদেরকে জীবন্ত ধরে নিয়ে মথুরার মন্দিরের সামনে দাহ করা হবে’; ইত্যাদি বলে আমাদের সেনারা তুমুল চিৎকার শুরু করল।

    কিন্তু দেখতে দেখতে অল্প সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেল । তিন দিক থেকেই ঝড়ের মতো ধেয়ে আসলো মুসলিম বাহিনী। তিন দিক থেকেই গোটা জঙ্গলকে ঘিরে ফেলল। যে হস্তিবাহিনীর হাতিগুলোকে মুসলমানদের পিষে মারার জন্যে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল, এগুলো আর্তচিৎকার করে দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করল। আমাদের যে সব সৈন্য গাছে চড়ে বসেছিল মুসলিম তীরন্দাজদের তীরবিদ্ধ হয়ে এরা নীচে গড়িয়ে পড়তে শুরু করল। এক পর্যায়ে আমাদের সৈন্যরা পালাতে শুরু করল। আর মুসলিম সৈন্যরা আমাদের পিছু ধাওয়া শুরু করল। ওরা গোটা জঙ্গল শত্রুমুক্ত করে অগ্রসর হচ্ছিল। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল যেন তারা জঙ্গলের সকল বৃক্ষরাজি সমূলে উপড়ে সামনে অগ্রসর হচ্ছে।

    পলায়নপর সৈন্যরা ছিল তিন দিক দিয়ে বেষ্টিত। ডানে বামে এবং সামনের দিকে বেষ্টন করে আসছিল মুসলিম বাহিনী। আমাদের সৈন্যদের পক্ষে পিছনে সরে যাওয়া ছাড়া কোন উপায় ছিল না। কিন্তু জঙ্গলের পিছন দিকে প্রবাহিত হচ্ছে যমুনা নদী। উপায়ন্তর না দেখে জীবন বাঁচাতে আমাদের সৈন্যরা দলে দলে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়তে শুরু করল। অক্ষত আহত সকল সৈন্যই যমুনা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হলো না। মুসলমান তীরন্দাজরা নদীর তীর থেকে সাতরানো সৈন্যদের উপর তীর নিক্ষেপ শুরু করল আর তীর বিদ্ধ হয়ে আমাদের সৈন্যরা নদীতে ডুবতে থাকলো

    মুসলিম সৈন্যরা আমাদের একজন যোদ্ধাকেও সাতরে ওপাড়ে উঠতে দেয়নি। যারা জীবন বাঁচাতে লম্বা ডুব দিয়েছিল। তাদের কাউকেই আর ভাসতে দেখা যায়নি। আমি একটি ভাসমান কাঠ মাথার উপর দিয়ে নিজেকে কোন মতে আড়াল করে ভাসতে ভাসতে এ পর্যন্ত এসেছি। এখানে এসে আমি তীরে পৌঁছার চেষ্টা করি। এরপর মহাবনে কি ঘটেছে আমি বলতে পারবো না। মহারাজ!

    তুমি বলতে না পারলেও আমি বলতে পারি। আমার কাছে শোন। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন রাজা রায়চন্দ্র। তোমাদের রাজা কুয়ালচন্দ্র তার স্ত্রী সন্তানসহ আত্মহত্যা করেছেন। তার সেনাবাহিনীর সকল খ্যাতি মুসলমানরা কজা করে নিয়েছে এবং গযনীর সুলতান মাহমূদ মহাবনের সকল মন্দির থেকে দেবদেবীদের প্রতিমা অপসারণ করে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ওখানকার লোকেরা এখন মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনী নয়, আযান শুনতে পাচ্ছে।

    হরে রাম, হরে রাম, সেখানে উপস্থিত দুই পুরোহিতের কষ্ঠ চিড়ে বেরিয়ে এলো। প্রধান পুরোহিত বললো, এ সব নাচ্চার লোকদের উপর ভগবান এমন গজব ফেলবেন যে, এদের মৃতদেহ শিয়াল শকুনে কাড়াকাড়ি করে খাবে। কৃষ্ণবাসুদেবের গযব থেকে এদের শিশু সন্তানেরাও রক্ষা পাবে না।

    মহারাজ! এ মুহূর্তে হরিহরি মহাদেব খুব মূল্যবান ত্যাগ চাচ্ছেন। দেবতার গযব থেকে বাঁচতে হলে আপনাকে দেবীর চরণে একজন কুমারী বলিদান করতে হবে। আমি আপনাকে হিসাব করে বলে দেবো, আপনাকে আর কি কি করতে হবে। আকাশের তারকাদের গতিপথ বদলে গেছে। আমি এখনই আপনাকে বলে দিচ্ছি। এখন পুর্ণিমা চলছে। সামনে অমাবশ্যা। সামনের সময়টা খুবই খারাপ। এখন থেকেই বিশেষ পূজাপার্বন শুরু করতে হবে । আমি আপনার ভাগ্য গুণে দেখব। ক্ষতিকর কিছু থাকলে সেটিকে সরানোর ব্যবস্থা করবো।

    মহারাজ! দেবতাদের সন্তুষ্ট করতে বিলম্ব হলে বলিদানে কালক্ষেপণ করলে দেবীরা রুষ্ট হয়ে মুসলিম সন্তান জন্মদান করতে শুরু করবেন। আমাদের দেবদেবীদের কোলকে স্নেচের সন্তান ধারণ থেকে পবিত্র রাখার জন্যে আমাদের মহাদেবের চরনে একাধিক কুমারী বলি দিতে হবে।

    পুরোহিতের কথায় রাজা রায়চন্দ্রের চেহারা থমথমে হয়ে উঠলো। চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল পুরোহিতের কথায় তিনি শুধু বিরক্তিবোধই করছেন না, রীতিমত ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। ক্ষোভে উত্তেজনায় তার দীর্ঘ গোঁফ কাঁপছিল । তিনি কঠোর দৃষ্টিতে পুরোহিতের দিকে তাকিয়ে পুরোহিতকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,

    “থামুন! আপনি কি এটা বুঝাতে চান সুলতান মাহমুদের সাথে যুদ্ধের ফায়সালা মন্দিরে হবে? কুমারী বলি দিলে কি হবে? আপনি এদেরকে ক’দিন আপনার কাছে রাখবেন এরপর বলি দিয়ে দেবেন? তাতে কি যুদ্ধ জয় হবে? আপনি কেন বলেন না, এখানকার প্রতিটি মানুষকে লড়াই করতে হবে।

    ছি! ছি! মহারাজ! পুরোহিত দু’হাতে কান ধরে বললো, একথায় আপনি ধর্মের অবমাননা করছেন। এটিতে ব্রাক্ষণদের দুর্গ। ব্রাক্ষণরা তো ভগবানের সন্তান। আমরা যা জানি, আপনি তা জানেন না। আপনি আকাশের নক্ষত্রের গতিপথ বদলাতে পারবেন না। বলিদান আপনাকে করতেই হবে।

    বলিদান! বলিদান! রাগ উপচানো কণ্ঠে স্বগতোক্তি করলেন রাজা! বলি শুধু দু’তিন জন কুমারীর হবে না, এখানকার ছোট বড় প্রতিটি মানুষই রক্ত দেবে। রাজপুতদের প্রতিটি কুমারীই জীবন বিলিয়ে দেবে।

    মনে রাখবেন পণ্ডিতজী! এই দুর্গকে লোকেরা ব্রাক্ষণদের দুর্গ বলে। এটি কিন্তু রাজপুতদের কেল্লা। রাজপুতেরা শত্রুর মোকাবেলায় একটি ভাষাই বুঝে, হয় শক্রর মৃত্যু নয়তো নিজের আত্মদান। দরকার হলে রাজপুতেরা বিজয়ের জন্যে ধর্মকেও বিসর্জন দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না।

    মহারাজ! প্রজাদের উপর একটু রহম করুন। বললো পুরোহিত। আমি যে কথা বলছি তা মেনে নিন। ধর্মকে বিসর্জন দেয়ার কথা আর মুখে আনবেন না।

    আমাদের পায়ে আর ধর্মের শিকল দিবেন না, পণ্ডিতজী! রাজধানী বেহাত হয়ে যাচ্ছে, লোকজন ক্ষুধা পিপাসায় মারা যাচ্ছে। আমাদের হাতে গড়া এই জীন সংসার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। অথচ আপনাদের মতো ধর্মীয় নেতৃবর্গ আপনাদের ঢোলই বাজাচ্ছেন। কারণ, আপনাদের কখনো রনাঙ্গনে গিয়ে শত্রুর মুখোমুখি লড়াই করতে হয় না। মন্দিরে বসে বসে আপনাদের রসনা তৃপ্তিতে কোন বেঘাত ঘটে না, আর আপনাদেরকে মিষ্টি মণ্ডা খাইয়ে দিতে এবং শরীর মর্দনের জন্যে কুমারী তরুণীরও অভাব হয় না।

    মহারাজ! মথুরার ধবংসযজ্ঞের খবর শুনে আর নদীতে ভাসমান বিপুল মরদেহের সারি দেখে আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললো পুরোহিত। আপনি বুঝতে পারছেন না, আপনি আমাকেই অসম্মান করছেন না, আপনার নিজের ধর্মের অবমাননা করছেন।

    কোন ধর্মের কথা বলছেন আপনি পণ্ডিত মহারাজ! আপনি কি সেই ধর্মের কথা বলছেন, যে ধর্মকে লাথি মেরে বুলন্দ শহরের রাজাসহ দশ হাজার হিন্দু মুসলমান হয়ে গেছে।

    হ্যাঁ, হ্যাঁ, জানি মহারাজ। তারা তাদের জীবন বাঁচানোর জন্য ধর্ম ত্যাগ করেছে। বললো পুরোহিত। ওরা সবাই ছিল কাপুরুষ। মুসলমানদের তরবারীর জোর দেখে ওদের হাতে গ্রেফতার নয়তো নিহত হওয়ার ভয়ে এরা ধর্ম ত্যাগ করেছে।

    না, আপনার কথা ঠিক নয় পণ্ডিত মহাশয়! এরা শুধু আতংক ও কাপুরুষতার জন্যে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেনি। তারা দেখে নিয়েছে, হিন্দুদের মন্দিরের বিশাল বিশাল দেব-দেবীর মূর্তি এবং ভগবানদের তারা না নিজেদের রক্ষা করতে পেরেছে, না তাদের কোন পূজারী রাজা প্রজাকে রক্ষা করতে পেরেছে।

    রাজা রায়চন্দ্র ও পুরোহিতের বাক-বিতণ্ডার সময় সেখানে রাজার কুমারী বোন শিলা এবং যুবতী কন্যা রাধা উপস্থিত ছিল। দাঁড়ানো ছিল রাজার স্ত্রী রাণী লক্ষ্মী দেবী।

    একপর্যায়ে শিলাকুমারী পুরোহিতের উদ্দেশ্যে বললো, পণ্ডিতজী মহারাজ! হিন্দুস্তানের নারীরা কি মন্দিরের অন্ধ প্রকোষ্টে পুরোহিতদের হাতে জীবন বিসর্জন দেয়ার জন্যই দুনিয়াতে এসেছে?

    এখন আর কোন কুমারীকে বলিদান করা হবে না। গুরু গম্বীর আওয়াজে বললেন রাণী লক্ষীদেবী। আপনি যদি মনে করে থাকেন, মুসলমানদের এই ধ্বংসাত্মক আক্রমন দেবদেবীদের অভিশাপ। তাহলে এই অভিশাপ আমরা মোকাবেলা করবো।

    রাণীর মুখেও রাজার কথার প্রতিধ্বনি শুনে রাগে ক্ষোভে উভয় পুরোহিত বিড় বিড় করতে করতে রাজার সম্মুখ থেকে চলে গেল। রাজা রায়চন্দ্রের বোন শিলা রাজার উদ্দেশ্যে বললো, দাদা! আপনি কি কখনো একথা ভেবেছেন গযনীর সুলতানকে যদি কোনভাবে হত্যা করা যায় তাহলে তার আক্রমণের আশংকা পুরোপুরিই শেষ হয়ে যাবে?

    শুধু এটা কেন, আমাদেরকে অনেক কিছুই ভাবতে হচ্ছে শিলা। এই আক্রমণ প্রতিরোধের সম্ভাব্য সব দিকই আমি ভেবেছি। আমরা একটা কঠিন সময় অতিক্রম করছি। মাহমূদকে হত্যা করা সহজ ব্যাপার নয়। তবুও এ বিষয়টি আমি ভেবে দেখবো। সবার আগে আমাদেরকে এখন মহারাজা কনৌজের কাছে যেতে হবে। গযনীর সুলতান মথুরায় বসে থাকবে না এবং ওখান থেকেই গযনী ফিরে যাবে না। নিশ্চয়ই সে এদিকেও অভিযান চালাবে।

    রাজা রায়চন্দ্র কনৌজ রওয়ানা হওয়ার জন্যে তার নিরাপত্তারক্ষীদের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিলেন।

    * * *

    রাজা রায়চন্দ্র, রাণীলক্ষী রেী, বোন শিলা এবং কুমারী মেয়ে রাধাকে সঙ্গে নিয়ে তখনই কনৌজের পথে রওয়ানা হলেন। রায়চন্দ্রের সাথে তার কতিপয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, উজীর এবং নিরাপত্তারক্ষী। মাত্র সাতাইশ মাইল দূরে কনৌজ। সন্ধ্যার আগেই তারা কনৌজ পৌঁছে গেলেন।

    রাতেই রাজা রায়চন্দ্র সার্বিক অবস্থা নিয়ে কনৌজ মহারাজা রাজ্যপালের সাথে আলোচনা করলেন। মহারাজ রাজ্যপাল তাকে বললেন–

    আমরা সামান্য শক্তি নিয়ে উন্মুক্ত ময়দানে মাহমূদের বিশাল বাহিনীর মোকাবেলা করতে পারবো না। মহাবন ও মথুরা থেকে যে সব লোক পালিয়ে এসেছে, তারা জানিয়েছে, উন্মুক্ত ময়দানে গযনী বাহিনীর মোকাবেলা করা অসম্ভব। আমাদের কেল্লাবন্দি হয়ে লড়াই করতে হবে। আমার আশাংকা হচ্ছে, মাহমূদ আপনাকেও অবরোধ করবে। কিন্তু তার মূল দৃষ্টি কনৌজের দিকে। সে যদি আপনাকে অবরোধ করে তাহলে পেছন থেকে আমি আক্রমণ চালিয়ে ওদের দুর্বল করে দেয়ার চেষ্টা করবো। আর যদি সে সরাসরি কল্লৌজ অবরোধ করে, তাহলে আমি আপনার কাছে আশা করবো, আপনি ওদের পিছন দিকে আক্রমণ অব্যাহত রাখবেন।

    মুনাজের রাজা রায়চন্দ্র নিজেদের ব্যর্থতার জন্যে ক্ষোভে আক্রোশে উত্তপ্ত অবস্থায় ছিলেন। সকল ঐতিহাসিকগণই একবাক্যে একথা লিখেছেন, মুনাজের রাজপুত বংশের বীরত্বগাথা ছিল সে যুগে কিংবদন্তিতুল্য। রাজপুতদের মেয়েরাও পুরুষদের মতো লড়াই করতে জানতো। তারা ছিল খুবই আত্মভিমানী বীরদপী। উন্মুক্ত ময়দানে রাজপুতদের কাবু করার ব্যাপারটি সহজসাধ্য ছিল না। ব্রাক্ষণের প্রতি রাজপুতদের কিছুটা উষ্ম ছিল। রাজা রায়চন্দ্র যে ব্রাক্ষণ পুরোহিতদের ধর্মোপদেশ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, তা ছিল পুরোহিতদের কাপুরুষতার বিপরীতে বীরত্বের বহিঃপ্রকাশ।

    ***

    রাজা রায়চন্দ্রের বোন শিলা ও কন্যা রাধা উভয়েই ছিল কুমারী এবং সুন্দরী। তাদের রূপ সৌন্দর্যের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল বহুদূর পর্যন্ত। মহারাজা রাজ্যপালের ছেলে লক্ষণ পাল। কিন্তু রায়চন্দ্র শিলার বিয়ে লাহোরের রাজা  ভীমপালের ছোট ভাই তারালোচনের সাথে ঠিক করে রেখেছিলেন। মাহমূদ গযনীর এবারের ভারত অভিযান না হলে এতো দিনে এই বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়ে যেতো।

    রাতের বেলায় রাজা রায়চন্দ্র এবং মহারাজা রাজ্যপাল রাজপ্রাসাদে যখন মাহমূদ গযনীর আক্রমণ প্রতিহত করার ব্যাপারে পরিকল্পনা আঁটছিলেন এবং তাদের মন্ত্রীবর্গও সামরিক কর্মকর্তারা আক্রমণ প্রতিরোধের পরিকল্পনা নিয়ে ব্যস্ত ছিল তখন রাজ্যপালের ছেলে লক্ষণ পাল রাজপ্রাসাদের বাগানের এক অন্ধকার কোনে দাঁড়িয়ে একজনের আগমনের অপেক্ষা করছিল। কিছুক্ষণ পর দু’জন নারী অন্ধকার ভেদ করে মূর্তির মতো সে দিকেই অগ্রসর হলো। একটু পথ গিয়ে একজন থেমে অপরজনকে বললো, আপনার জন্যে রাজকুমার অপেক্ষা করছেন। আপনি যান।

    অপরজন তার হাতে একটি মুদ্রার থলে দিয়ে বললো, কেউ যেন জানতে পারে আমি এখানে রাজকুমারের সাথে একান্তে মিলিত হতে এসেছি।

    এ ছিল রায়চন্দ্রের বোন শিলা। সে রাজমহলের এক সেবিকাকে বলে কয়ে রাজকুমারের সাথে মিলিত হওয়ার জন্যে নিভৃত্বে এখানে এসেছিলো।

    শিলা তার ভাবী লক্ষী ও ভাতিজী রাধার অজান্তে রাজকুমার লক্ষণের সাথে একান্তে মিলিত হতে আসে। তারা সবাই রাজা রায় চন্দ্রের সাথে কনৌজে এসেছিল।

    শিলাকে আসতে দেখে ধীর পায়ে এগিয়ে এলো লক্ষণ পাল। সে শিলার উদ্দেশে বললো, আমার সংশয় ছিলো তুমি আসবে কি-না? আমি কতবার মুনাজে তোমার কাছে পয়গাম পাঠিয়েছি, কিন্তু তুমি প্রতিবারই আমার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছে আমাকে তোমার পছন্দ নয়। আচ্ছা, আমার মধ্যে কি এমন ঘাটতি আছে, আমি কি তোমার পতি হওয়ার যোগ্য নই? অবশ্য আমি জানি, মহারাজা ভীমপালের ছোট ভাইয়ের সাথে তোমার বিয়ের কথা চলছে, কিন্তু তুমি তো ইচ্ছা করলে এই কথাবার্তা বন্ধ করে দিতে পারো। তুমি কি তাকেই পছন্দ কর?

    লক্ষণ! তুমি সুদর্শন যুবক তাতে সন্দেহ নেই। বিয়ের ব্যাপারে আমার নিজস্ব কোন পছন্দ নেই। তবে এটা বলতে পারি এ মুহূর্তে তোমাকে আমার মোটেও পছন্দ নয় এবং আমার বিপরীতে তোমাকে যোগ্য পাত্রও আমি মনে করছি না। কারণ, গযনীর মুসলমানরা ঝড়ের মতো ধেয়ে আসছে। মথুরা ও মহাবন ধ্বংস হয়ে গেছে। আমি হাজার হাজার মৃতদেহ নদীতে ভেসে আসতে দেখেছি। মথুরার মন্দিরগুলোতে এখন মুসলমানরা আযান দিচ্ছে। গযনীর সৈন্যরা শ্রীকৃষ্ণ ও মহাদেবের স্মৃতি নিয়ে গেছে। বুলন্দ শহরের দশ হাজার হিন্দু ইসলাম ধর্মে দীক্ষা নিয়েছে। এই সময়ে তোমার মতো রাজকুমার আমার মতো একটি নগণ্য মেয়েকে বিয়ে করার জন্যে পেরেশান হয়ে গেছে। তোমার মধ্যে কি একটুও আত্মমর্যাদাবোধ নেই? তুমি কি জান না মুসলমানরা এখন মুনাজ ও কনৌজ দখল করার প্রস্তুতি নিচ্ছে?

    আমি সবই জানি। আমি এসব ব্যাপারে বেখবর নই। কিন্তু তোমার প্রেম আমাকে পাগল করে তুলেছে। আমি যে দিন থেকে জানতে পেরেছি, ইচ্ছা করলেই তুমি বিয়ের সিদ্ধান্ত বদল করতে পারো, সে দিন থেকেই তোমাকে পাওয়ার জন্যে আমার হৃদয় ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। বললো রাজকুমার লক্ষণ পাল।

    কারো প্রতি আমার কোন আগ্রহ নেই। মহারাজা ভীমপালের ভাইয়ের প্রতিও আমার কোন টান নেই, তোমার প্রতিও আমার কোন আকর্ষণ নেই। যার সাথেই আমার বিয়ে হবে আমি তাকেই আমার সবকিছু ঢেলে দেবো।

    লক্ষণ পাল ….! আমি ব্যাপারটা ভালো ভাবেই বুঝি, আমার প্রতি আসলে তোমার কোন ভালবাসা নেই। তুমি আমার রূপ সৌন্দর্যকে ভোগ করতে চাও। কিছু দিন পর যখন আমার রূপ সৌন্দর্যে ভাটা পড়বে, তখন আমাকে দূরে ফেলে তুমি অপর কোন সুন্দরীকে ঘরে তুলবে। তোমার বাবাও বৃদ্ধ বয়সে আমার মতো এক তরুণীকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু সেই ভালোবাসার চম্পারাণী এখন কোথায়? গযনীর এক গোয়েন্দাকে নিয়ে পালাতে গিয়ে মারা পড়েছে। তুমি তো তোমার বাবার পথেই চলবে। অযথা আমার সাথে প্রেমের অভিনয় করছো কেন?

    “তাই যদি মনে করে থাকো, তাহলে আমার খবরে তুমি এখানে এসেছে কেন? জিজ্ঞেস করলো লক্ষণপাল।

    আমি এসেছি একটি শর্ত নিয়ে। এই শর্ত যদি পূরণ করতে পারো তাহলে আমি তোমার ঘরের বধু হবো। তখন যদি আমার ভাই তোমার কাছে আমাকে বিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানায় তবুও আমি তোমার কাছে চলে আসবো।

    তাই নাকি? বলো কি তোমার শর্ত? যাই বলবে তাই করে দেখিযে দেবো।’

    “গযনীর সুলতানকে মথুরায় হত্যা করতে হবে। তুমি কি তা পারবে?”

    “মথুরাতে কেন? তাকে আমি যুদ্ধের ময়দানে হত্যা করবো। তার মাথা কেটে এনে তোমার পায়ে লুটিয়ে দিবো।“

    ‘লক্ষণ! ভুলে যেয়ো না, তুমি মুনাজের এক রাজপুত মেয়ের সাথে কথা বলছো। আমাকে দাদা বলেছেন, মথুরার মন্দিরে ভারতবর্ষের সকল রাজা মহারাজা বাসুদেবের মূর্তির সামনে শপথ করেছিলেন, মাহমূদের দ্বিখণ্ডিত মাথা দেবমূর্তির পায়ে এনে ফেলে দেবে। মাহমূদের রক্তে কৃষ্ণ মূর্তিকে স্নান করাবে। কিন্তু কোথায় গেলো সেই বীরবাহাদুর রাজা মহারাজাদের শপথ! মুসলমানদের আক্রমনের মুখে সবাই শিয়ালের মতো পালিয়ে গেছে। আর রাজা হরিদত্ত তার তরবারী মাহমূদের পায়ের নীচে রেখে দিয়ে দশ হাজার প্রজাকে নিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। আর আমাদের পুরোহিতরা যে মাটির উপর কৃষ্ণমূর্তিকে বসিয়ে ছিলো সেই কৃষ্ণমূর্তির পায়ের তলার মাটি পর্যন্ত ওরা সরিয়ে ফেলেছে।

    এই মুসলমানরা সব লুটেরা। এরা মন্দিরগুলো থেকে সোনা লুটতে চায়, এ জন্য সব সময় মন্দির ধ্বংস করে’ বললো লক্ষণ।

    মাথা ঠিক করে কথা বলো লক্ষণ! বললো শিলা। ভারত মাতার সম্মান রক্ষা করতে পারে একমাত্র রাজপুতেরা । আমি সেই রাজপুতদেরই মেয়ে। যে ব্যক্তি আমার পারিবারিক শিক্ষক ছিলেন, তিনি ছিলেন একজন জ্ঞানী পণ্ডিত। আমি যখন প্রথম মুসলমানদের আক্রমণের কথা শুনলাম, তখন একদিন উস্তাদজীকে বললাম, লোকেরা বলে গযনীর মুসলমানরা লুটেরা। তারা মন্দিরগুলোর সোনাদানা লুট করার জন্যে বারবার ভারতে আক্রমণ চালায়। মুসলমানদের মথুরা দখলের খবর শোনার পর যখন তাকে বললাম, মুসলমানরা কি শুধু লুটতরাজ করতেই এসেছে? না কি তারা আমাদের এলাকাগুলো দখল করে নিতে চায়? তিনি আমাকে বললেন–

    লোকেরা ভুল বলেছে। মাহমূদ গযনী লুটেরা নয়। সে আমাদের ধর্ম ধ্বংস করে তার ধর্ম ছড়িয়ে দিতে এসেছে। তোমার মনে রাখতে হবে লুটেরাদের কোন ধর্মজ্ঞান থাকে না। মাহমূদ যদি ভারতের ধন-সম্পদ হাতিয়ে নিতে চাইতো তাহলে রাজা হরিদত্তকে দলবলসহ ইসলামে দীক্ষা দেয়ার কোন প্রয়োজন হতো না।

    আমি তাকে আরো জিজ্ঞেস করলাম, মুসলিম নারীরাও কি রাজপুত নারীদের মতো সাহসী? তিনি বললেন, নিজ ভূমি থেকে এতো দূরে এসে লড়াই করে বিজয় ছিনিয়ে নেয় যেসব যুবক, তাদের মায়েরা সাহসী না হয়ে পারে না। নিশ্চয়ই তারা সাহসী। এই দুঃসাহসী মুসলমান মায়েরা তাদের ছেলেদেরকে যুদ্ধে পাঠিয়ে গর্ববোধ করে।

    লক্ষণ! তুমি যাকে লুটেরা বলে উড়িয়ে দিচ্ছো, সে কোন সাধারণ লোক নয়। আমি নিজে তার মোকাবেলা করতে চাই, আমি দেশবাসীকে জানিয়ে দিতে চাই, রাজপুত মেয়েরাও কোন কোন পুরুষের চেয়ে বেশী সাহসী। এ মুহূর্তে আমার দরকার তোমার সহযোগিতা। তুমি যদি আমাকে সহযোগিতা

    করো, তাহলে সেনাবাহিনীর যে কোন সিপাহীকে আমি সাথে নিয়ে নেবো এবং মাহমূদ গযনীকে হত্যা করবো। এরপর যদি আমি জীবিত থাকি, তাহলে সেই সিপাহীই হবে আমার জীবন সঙ্গী ….। এখন বলল, তুমি কি মাহমূদকে হত্যার অভিযানে আমাকে সঙ্গ দেবে?

    হ্যাঁ, তোমাকে পাওয়ার জন্যে আমি তোমার সব শর্ত মানতে প্রস্তুত। বললো লক্ষণপাল।

    ভুল বলেছো। আমার জন্যে নয়, বলো, তোমার ধর্ম ও দেশের খাতিরে তুমি আমার সঙ্গ দেবে। বললো শিলা। একাজে যদি পিছ পা হও, তা হলে আমি আমার ভাতিজি রাধা তোমার বোন এমনকি কনৌজ ও মুনাজের প্রতিটি তরুণী মুসলমানদের ঘরে থাকবে এবং মুসলমানদের সন্তান জন্ম দেবে।

    ঠিক আছে শিলা! আমি মাহমূদকে হত্যা করেই তোমার সামনে দাঁড়াবো।

    মথুরায় হত্যা করতে হবে। বললো শিলা। কারণ ওখানেই যদি তাকে হত্যা করা যায়, তাহলে মুসলমানদের অগ্রাভিযান থেমে যাবে, তার সেনাবাহিনী নেতৃত্বহীন হয়ে পড়বে এবং হতোদ্যম হয়ে গযনী ফিরে যাবে।

    লক্ষণ! তুমি একজন অভিজাত ব্রাক্ষণ। আর ব্রাক্ষণদের ধর্মের প্রতি দায়িত্ব অনেক বেশী। আমার দেহে রাজপুতদের রক্ত প্রবাহিত। আমি কোন ভনিতার আশ্রয় না নিয়ে পরিষ্কার তোমাকে জানিয়ে দিচ্ছি, তুমি আমাকে যতোটা ভালোবাসো, আমি তোমাকে ততোটা ভালোবাসি না। কিন্তু আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, তুমি যদি মাহমুদকে হত্যা করতে পারো, তাহলে সারাজীবন তোমার দাসী হয়ে থাকবো।

    এ কাজ করতে গিয়ে যদি আমি মৃত্যুবরণ করি? তাহলে কি করবে? জিজ্ঞেস করলো লক্ষণ।

    তাহলে, তোমার জ্বলন্ত চিায় নিজেকে জ্বালিয়ে দেবো, বললো শিলা।

    মাহমূদকে হত্যার দৃঢ় সংকল্পে প্রতীজ্ঞাবদ্ধ হয়ে শিলা ও লক্ষণ রাজ দরবারের দিকে অগ্রসর হলো। রাজা রাজ্যপাল মুনাজের রাজা রায়চন্দ্র ও উভয় রাজ্যের সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ে মাহমূদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিকল্পনা করছিলেন বলে দারোয়ান তাদের প্রবেশে বাধা দিলো। কিন্তু বাধা অগ্রাহ্য করে শিলাকে নিয়ে দরবার কক্ষে প্রবেশ করলো লক্ষণপাল। রাজ্যপাল এই অবাঞ্চিত প্রবেশে উন্মা প্রকাশ করে তাদের বেরিয়ে যেতে বললেন।

    আপনারা যে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করছেন, আমরা সে কাজেই এসেছি। বললো লক্ষণ। অনধিকার প্রবেশের জন্যে আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আপনারা যে বিষয়টিই ভেবে থাকুন না কেন, এসব চিন্তা রেখে একটু আমাদের কথা শুনুন। আপনারা কি ভেবেছেন, মাহমূদকে মাথুরাতেই হত্যা করা যেতে পারে? তাকে হত্যা করতে পারলে তার সকল সৈন্যকেই বন্দী করা সম্ভম।

    এক আনাড়ী লক্ষণের কণ্ঠে এমন আজব কথা শুনে দরবারে উপবিষ্ট লোকেরা একে অন্যের দিকে দৃষ্টি ফেরালো। লক্ষণের কথা শুনে রাজ্যপালের ঠোঁটের কোণে ঈষৎ হাসির রেখা ফুঠে উঠলো। তিনি বললেন, না, বেটা, এ ব্যাপারটি নিয়ে আমরা কোন চিন্তা-ভাবনা করিনি। বললেন, রাজা রায়চন্দ্র একাজ করার জন্যে যেমন দু সাহসী লোক দরকার তেমনি তাকে বুদ্ধিমান ও দূরদর্শী হতে হবে।”

    এর পাশাপাশি তাকে এমন ব্যক্তিত্বও হতে হবে যে নিজের জাত শত্রু মনে করবে মাহমূদকে। বললো লক্ষণ। বেতনভোগী হত্যাকারী দিয়ে এ কাজ করানো সম্ভব নয়। বেতনভোগী কর্মচারীকে একাজে পাঠালে দেখা যাবে সে হত্যা করতে গিয়ে ওদের টোপ গিলে টাকা-পয়সা নিয়ে ইসলাম গ্রহণ করে ওদের চর হিসেবে থেকে যাবে। একাজ কোন রাজ কুমারের পক্ষেই করা সম্ভব।’

    “কে আছে এমন রাজ কুমার? জিজ্ঞাসু কণ্ঠে জানতে চাইলেন রাজ্যপাল।

    “সেই রাজ কুমার আপনার সামনেই দাঁড়ানো, বললো লক্ষণ। আমি সেই রাজকুমার …… লক্ষণপাল।

    রাজা রায়চন্দ্র লক্ষণের কাঁধে হাত রেখে বললেন, সাব্বাশ লক্ষণপাল! তুমি তোমার বাবার মাথাকে আরো উঁচু করে দিয়েছে। আজ যদি আমার কোন যুবক ছেলে থাকতো তাহলে আমিও তাকে তোমার সঙ্গে পাঠাতাম।

    লক্ষণ! সত্যিই যদি তুমি একাজ করতে পারতে তাহলে গযনীর এই কালসাপও মরতো, আমার সেনাবাহিনীর লোকগুলোর প্রাণ দিতে হতো না।’

    আপনি কি এ কাজটিকে মামুলী মনে করছেন? মহারাজ! বিস্মিত কণ্ঠে বললো এক বয়োজ্যেষ্ঠ সেনাপতি। আপনি কি ভাবছেন, রাজকুমার এখানে যেমন নির্বিঘ্নে দাঁড়িয়ে আছে এমন নির্বিঘ্নেই সে মথুরা যাবে আর মাহমূদের বুকে খঞ্জর বসিয়ে দিয়ে নিরাপদে চলে আসবে?

    মোটেও সহজ নয় এ কাজ, তা আমি জানি। কিন্তু ভারতমাতার জন্যে আমি জীবন বিলিয়ে দেয়ার শপথ নিয়েছি। বললো লক্ষণ।

    তুমি যেমন শপথ করেছো, মাহমূদও শপথ করেছে ভারতের কোন মন্দির ও রাজধানী সে অক্ষত রাখবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে মাহমূদের হাত খুবই লম্বা। আমাদের কোন কথা কোন সিদ্ধান্তই তার কাছে গোপন থাকে না। আপনারা সবাই জানেন, যে নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে আমরা সবচেয়ে বেশী নির্ভরযোগ্য ও যোগ্য মনে করতাম, রাজমহলের যে সব বিষয় রাজকুমাররা পর্যন্ত জানতে পারতো না, সে তার সব কিছুই জানতো। অথচ সে ছিল গযনী সুলতানের একজন পাকা গোয়েন্দা। বললেন রাজ্যপাল।

    আমি তা জানি। তবে এর পরও আমি তাকে হত্যা করতে যাবো। দৃঢ়তার সাথে বললো লক্ষণ। অবশ্য এ ধরনের অভিযানের কোন অভিজ্ঞতা ও ধারণা আমার নেই। আপনাদের প্রতি আমার অনুরোধ, আপনারা আমাকে বলে দিবেন, এই অভিযান আমাকে কি ভাবে চালাতে হবে? বয়স্ক সেনাপতির উদ্দেশ্য বললো লক্ষণ।

    লক্ষণের সংকল্প ও দৃঢ়তা দেখে রাজা রাজ্যপাল প্রধান সেনাপতি ও উজিরকে নির্দেশ দিলেন, তারা যেনো এই অভিযানের জন্যে লক্ষণকে প্রশিক্ষণ দেয় এবং কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে কৗেজের রাজা বললেন, ধরিত্রির সেবা ও ধর্মের কল্যাণের জন্য আমি ভগবানের নামে আমার পুত্রকে উৎসর্গ করছি।’

    পরদিন রাজার নিযুক্ত দু’জন অভিজ্ঞ সেনা কর্মকর্তা লক্ষণকে তার অভিযানের জন্যে প্রস্তুত করার জন্যে উদ্যোগ নিলো। প্রশিক্ষকদের একজক লক্ষণের উদ্দেশ্যে বললো

    লক্ষণ! তুমি একজন ডাকাত ও লুটেরার সাথে মোকাবেলা করতে যাচ্ছো, তোমার মাথা থেকে এই চিন্তা বের করে দাও। তোমাদের বুঝতে হবে মাহমূদ সত্যিকার অর্থেই একজন লড়াকু যোদ্ধা। তার বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধের একটি ভিন্ন অর্থ আছে। মাহমূদ শুধু যুদ্ধ করতে আসেনি, সাথে নিয়ে এসেছে একটি আদর্শ। তাকে সম্মুখ সমরে পরাজিত করা সহজ ব্যাপার নয়। আমাদের রাজা মহারাজারা তার দূরদর্শিতার ধারে কাছেও যেতে পারেননি। সেই সাথে তার মুখোমুখি হয়ে তাকে হত্যা করে ফেলবে, এমনটিও কেউ কল্পনা করেনি।

    তোমার একটি কথা মনে রাখতে হবে, একজন পুরুষ যতোই ধর্মানুরাগী হোক না কেন, আসলে সে তো একজন মানুষ। মানুষ হওয়ার কারণে পুরুষের মধ্যে স্বভাবতই থাকে নারীর প্রতি দুর্বলতা। তদ্রূপ মানুষ হিসেবে একজন নারীর জন্যে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা পুরুষ। তোমার লক্ষ্য অর্জনে তুমি সাধু সন্নাসী কিংবা উপজাতির বেশ ধারণ করে তুমি মথুরা যাবে।

    তোমরা বহুরূপী বেশ ধারণের অর্থ হবে তুমি বনে জঙ্গলে বসবাসকারী কোন উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর সর্দার।

    তুমি যে গোত্রের গোত্রপতির বেশ ধারণ করবে, সেই গোত্রের লোক সংখ্যা পনেরো হাজার। তুমি সেখানে গিয়ে বলবে, কনৌজের মহারাজা তোমার গোত্রের সকল মানুষকে গযনী সুলতানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে নিজের পক্ষে নিয়ে নিয়েছে। কিন্তু সর্দার হিসেবে তুমি গযনী বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে রাজি নও। গযনী বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই না করে তুমি বরং রাজা হরিদত্তের মতো গোত্রের সকল লোকজনকে নিয়ে মুসলমান হতে চাও।

    লক্ষণ! তোমাকে মনে রাখতে হবে, সরাসরি সুলতান মাহমূদ পর্যন্ত যেতে তোমাকে তার লোকেরা দেবে না। তোমাকে বলতে হবে, সুলতানের সাথে তোমার দু’টি একান্ত কথা আছে যা তুমি তার সাথে একান্তে বলতে চাও। এর পরও যদি তারা তোমাকে সুলতানের কাছে নিয়ে না যায়, তখন তুমি তাদের বলবে, গুপ্ত ঘাতকের হাতে সুলতানের নিহত হওয়ার আশংকা আছে। একথা বললে আশা করি, তারা তোমাকে সুলতানের সাথে সাক্ষাতের সুযোগ করে দেবে।

    আপনি বলে ছিলেন নারীর দুর্বলতার কথা’ একথা বলে আপনি কি বুঝাতে চাচ্ছেন? প্রশিক্ষককে জিজ্ঞেস করলো লক্ষণ।

    “তোমার সাথে অন্তত দু’জন সুন্দরী নারী থাকা দরকার। তাদেরকে তুমি নিজের স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেবে রহস্যজনক কণ্ঠে জবাব দিলো প্রশিক্ষক। “তোমার সঙ্গীনী নারীরা যদি বুদ্ধিমতী হয় তাহলে তারা সুলতানের সেনা অফিসারদেরকে একজনের বিরুদ্ধে অন্যজনকে শত্রুতে পরিণত করতে পারবে। আমি তো মনে করি, সুলতান নিজেও সুন্দরী নারীদের দেখলে বিমুগ্ধ হয়ে যেতে পারে। সুলতান নিজে যদি তোমার স্ত্রী পরিচয়দানকারী নারীদের নিজের কাছে রাখার আগ্রহ প্রকাশ করে তাহলে কৌশলে তাতে তুমি সম্মতি দেবে। তোমার সঙ্গীনীদের কাছে বিষ রাখতে হবে যাতে সুযোগ মতো তারা এই বিষ পানি বা শরবতে মিশিয়ে দিতে পারে। আমরা তোমাকে এমন দু’জন সুন্দরী তরুণী দিয়ে দেবো। তুমি তাদেরকে উপজাতীয় পোষাক পরিয়ে নেবে।

    সেনাবাহিনীর অভিজ্ঞ প্রশিক্ষক ও প্রবীণ উজির লক্ষণকে তার অভিযান সফল্যের জন্য নানা ধরনের কূটকৌশল শিখিয়ে দিতে শুরু করলো। তারা লক্ষণকে বুঝালো কি ভাবে সে সুলতান মাহমুদকে হত্যা করে সেখান থেকে পালিয়ে আসবে।

    লক্ষণ তার প্রশিক্ষকদের কাছ থেকে অভিযানের দীক্ষা নিয়ে যখন শিলার কাছে অভিজ্ঞতা বর্ণনা করলো, তখন শিলা বললো, অন্য কোন নারীর দরকার নেই। আমি তোমার সাথে থাকবো, আর আমার ভাতিজী রাধা থাকবে। শিলা রাতের বেলায় তার ভাতিজী রাধাকে তার ও লক্ষণের অভিযানের কথা জানিয়ে বললো, এই অভিযানে আমরা তোমাকে সাথে নিতে চাই।

    শিলার প্রস্তাবে রাধা মহা উৎসাহে রাজি হয়ে গেলো। এরপর তিনজন মিলে রাজা রায়চন্দ্রের কাছে উপস্থিত হলো।

    রাজা রায়চন্দ্র এই তিনজনকে একসাথে তার ঘরে প্রবেশ করতে দেখে কিছুটা বিস্মিত হলেন।

    বাবা, আমাদের এখানে তরুণীদেরকে মন্দিরে নিয়ে বলিদান করা হয়। আপনিই বলুন, এসব বলিদানের দ্বারা আসলে কি কোন উপকার হয় না? আমিও ফিসি যে বলিদান করতে যাচ্ছি, তাতে আপনার অনেক কিছু অর্জন হবে। রাধা তার বাবা রাজা রায়চন্দ্রের উদ্দেশ্যে বললো, আমাদের ছাড়া লক্ষণপালের সাথে যদি অন্য কোন নারী যায়, তাহলে তারা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তাকে ধোঁকা দিতে পারে।

    রাজা রায়চন্দ্রের বোন শিলা ও তার ভাতিজী রাধার রূপ সৌন্দর্য ছিল গোটা অঞ্চলে আলোচিত বিষয়। তাদের সাহসিকতার বিষয়টি ছিলো সবার মুখে মুখে। ছোট্ট বেলা থেকেই এই দুই তরুণী অসীম সাহসিকতার অনেক পরিচয় দিয়েছে। এরা যখন লক্ষণের সাথে সুলতান মাহমূদকে হত্যার অভিযানে যেতে চাইলো, তখন একথা শুনে কেউ অবাক হলো না। কারণ, এরা ছিলো অত্যন্ত জাত্যাভিমানী। মাহমূদকে হত্যা করার বিষয়টি তারা কর্তব্য মনে করতো। তারা উভয়ে রাজা রায়চন্দ্রকে লক্ষণপালের সাথে অভিযানে যেতে রাজি করিয়ে ফেললো।

    অভিযাত্রী তিনজনের জন্যে এমন এমন উপজাতীয় পোষাক তৈরী করা হলো, বাস্তবে এ ধরনের পোষাকধারী কোন উপজাতীয় গোত্রের অস্তিত্ব এতদঞ্চলে ছিলো না। তাদের সাথে যাওয়ার জন্যে এবং তাদের নিরাপত্তা ও সহযোগিতার জন্যে দু’জন অভিজ্ঞ সেনা কর্মকর্তাকেও সহযাত্রী হিসেবে নেয়ার সিদ্ধান্ত হলো।

    শিলা ও রাধার জন্য এমন পোষাক তৈরী করা হলো যে পোষাকে তাদের পেট পিঠ, কাঁধ ও হাতের পুরো অংশ বিবস্ত্র থাকে। হাঁটুর নীচ পর্যন্ত সবটুকু পা খোলা থাকে। তাদের পোষাকের সাথে সঙ্গতি রেখে দু’জন সৈনিকের জন্যও উপজাতীয় পোষাক তৈরী করা হলো। তাদের মাথা সম্পূর্ণ খোলা রাখা হলো । বিশেষভাবে তৈরী এই উপজাতীয় পোশাক পরার পর তাদের রূপ সৌন্দর্য এমনভাবে ফুটে উঠলো যে, কোন পুরুষের পক্ষে তাদের দিক থেকে চোখ ফেরানো মুশকিল।

    লক্ষণ পালকেও অর্ধ উলঙ্গ উপজাতীয় পোষাক পরানো হলো। তাকেও উপজাতীয় পোষাকে সুদর্শন যুবক মনে হচ্ছিল। উপজাতীয় সর্দার হিসেবে মাহমূদ গযনবীকে উপহার দেয়ার জন্যে লক্ষণকে দুটি জ্যান্ত হরিণ, দুটি বাঘের চামড়া, দুটি মৃত মানুষের মাথার খুলি এবং একটি স্বর্ণের মূর্তি দেয়া হলো। মূর্তিটির উপরের অংশ ছিল মানুষের মতো এবং নীচের অংশ ছিল ঘোড়ার দেহের মতো। তাকে বলা হলো, এই মূর্তি দেখিয়ে তুমি বলবে, আমাদের গোত্র এই মুর্তিকে পূজা করে। কিন্তু এখন আমি গোত্রের সকল লোকজনকে নিয়ে মুসলমান হতে চাই।

    রাতের প্রথম প্রহরে যার যার ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে লক্ষণের কাফেলা মাহমূদ হত্যার অভিযানে কনৌজ থেকে রওয়ানা হলো। তারা সিদ্ধান্ত নিলো মহাবনের জঙ্গলে গিয়ে তারা যমুনা নদী পার হয়ে মথুরার সীমানায় প্রবেশ করবে। কনৌজ থেকে মহাবনের জঙ্গলের দূরত্ব ছিলো প্রায় শত মাইল। তাদের খাবার দাবার সামগ্রী দুটি গাঁধার উপর বহন করা হল। তারা সিদ্ধান্ত নিল, মহাবনের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে তারা মথুরা পৌঁছবে।

    সুলতান মাহমূদ তখনো মথুরায় অবস্থান করছেন। মথুরা তার কাছে খুবই আকর্ষণীয় মনে হচ্ছিল। মথুরা ছিল অসংখ্য মন্দিরের শহর। বিজয় লাভের পর সুলতানের নির্দেশে মুসলিম সৈন্যরা মথুরার মন্দিরগুলোকে অগ্নি সংযোগ করছিলো। মথুরার প্রধান মন্দিরের আঙ্গিনায় দাঁড়িয়ে মুসলমান সৈন্যরা আযান দিয়ে জামাতে নামায আদায় করতে শুরু করেছিল। মথুরার হিন্দুরা এতোটা আত্মবিস্মৃত ছিলো না যে, তাদের চোখের সামনে তাদের দেবদেবী ও ধর্মের অবমাননা তারা নীরবে সহ্য করে নেবে। দেবদেবী ও মন্দির ধ্বংসের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে এর মধ্যেই কতিপয় হিন্দু কয়েকজন মুসলিম সৈন্যকে ধোকা দিতে আত্মহত্যা করে ফেললো। কিছু হিন্দু রাতের অন্ধকারে ধ্বংসাত্মক ঘটনাও ঘটালো। হিন্দুদের চক্রান্তের মূলোৎপাটন করতে সুলতান মাহমূদ নির্দেশ দিলেন যে, এই শহর ধ্বংস করা ছাড়া হিন্দুদের কাবু করা যাবে না। সুলতানের নির্দেশে তাই শহর ধ্বংসের কাজ শুরু হয়ে গেলো। অপর দিকে সুলতান তার সৈন্যদেরকে কন্নৌজের দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্যে প্রস্তুত করতে শুরু করলেন।

    একদিন দুপুরের দিকে সুলতানের সামনে তার সকল সেনা কর্মকর্তা, সেনাদের সাথে গযনী থেকে আসা ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও ইমাম বসা ছিলেন। সুলতান ঘোষণা করলেন–

    অচিরেই আমরা কল্লৌজের দিকে অগ্রসর হব। অভিযানের প্রস্তুতি ও অভিযান সম্পর্কে আপনাদের অবহিত করার আগেই আপনাদেরকে আমি কয়েকটি কথা বলা জরুরী মনে করছি। সকল সৈন্যকে একত্রিত করে বক্তৃতা করার সুযোগ এখানে নেই। আপনারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ অধীনস্থ সেনাদেরকে আমার প্রতিটি কথা অক্ষরে অক্ষরে পৌঁছে দেবেন। যারা খতীব ও ইমাম আছে, তারা নামাযের পর আপনাদের মুসল্লীদেরকে আমার কথাগুলো সেদেবেন। আপনারা সৈন্যদেরকে বলবেন

    চলমান যুদ্ধ আমার বা কারো কোন ব্যক্তিগত যুদ্ধ নয়। সেনাদেরও এর মধ্যে ব্যক্তিগত কোন স্বার্থ জড়িত নেই। এটা রাজ্য দখলের লড়াইও নয়। নিতান্তই আমাদের এ অভিযান আল্লাহ ও রাসূলের জন্যে নিবেদিত অভিযান। আমরা এখানে কুফরীর সেই অভিশাপ দূর করতে এসেছি, যে সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা দিয়েছেন ততক্ষণ পর্যন্ত লড়াই করো যতক্ষণ পর্যন্ত না এই কুফরীর সন্ত্রাস দূরীভূত হয়ে যায়।

    আমি যদি বারবার হিন্দুস্তানে এসে হিন্দুদের উপর চড়াও না হতাম, তাহলে সব হিন্দু মিলে এতো দিনে গযনী দখল করে কাবা দখলের জন্য অগ্রসর হতে শুরু করতো। হিন্দুরা ছাড়া ইহুদীরাও বড় আপদ হয়ে দেখা দিয়েছে। সব কিছু একসঙ্গে তো আর আমরা সামলাতে পারবো না। কিন্তু আমরা চেষ্টা করলে হিন্দুস্তান থেকে কুফরী দূরীভূত করে এটাকে ইসলামের যমীনে রূপান্তরিত করতে পারি এবং আমরা এ লক্ষ্যেই এখানে এসেছি।

    রাজত্বের পরিধি বাড়ানোর কোন সিন্স আমার নেই। আপনারা দেখেছেন, লাহোরের মহারাজাদের কয়েকবার আমরা পরাজিত করেছি। কিন্তু আমাদের রাজ্যের সীমানা আমরা লাহোর পর্যন্ত বিস্তৃত করিনি।……

    সকল সৈন্যকে এটা বুঝিয়ে দিন, আমরা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। প্রিয় মাতৃভূমি ছেড়ে এখানে এসেছি। আমরা এখানে আল্লাহর পয়গাম ও আমাদের ঈমান নিয়ে এসেছি এবং ঈমানকে লালন ও বিকাশ করছি এ জন্য তিনি আমাদের মদদ করছেন। আমার যদি সোনা দানা সহায় সম্পদের লোভ থাকতো, তাহলে বারবার এতো কষ্টকর অভিযানে আসার দরকার হতো না। একবারেই লুটতরাজ করে সোনাদানা কুক্ষিগত করে নিয়ে গিয়ে গযনীতে বসে আরাম আয়েশ করতে পারতাম। কিন্তু আপনারা দেখেছেন, প্রতিবারই আমি হিন্দুস্তানে আসি আমার জীবনের ঝুঁকিকে উপেক্ষা করে। প্রতিবারই আমার মনে হয় আমার পক্ষে আর গযনীতে জীবন্ত ফিরে যাওয়া সম্ভব হবে না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা প্রতিটি অভিযানেই আমাকে নতুন জীবন দান করেন। এতে আমার মনে হয়, হিন্দুস্তানে আত্মাহর দীন প্রতিষ্ঠার অভিযান আমরা শুরু করেছি, আল্লাহ হয়তো আমাদের হাতেই এর পূর্ণতা দেবেন।

    এ মূহুর্তে আমি জানতে পেরেছি, কনৌজে আমাকে যে কোনভাবে হত্যা করার বহু নীল নকশা তৈরী করা হয়েছে। যে কোন মুহূর্তে যে কোন জায়গায় কিংবা আমার তাঁবুতে আমি নিহত হতে পারি। কিন্তু আল্লাহর প্রতি আমার শতভাগ ভসা আছে। আমার মন সাক্ষী দিচ্ছে অন্তত হিন্দুস্তানে আমি নিহত হবো না। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত ইঙ্গিত। …..

    আমি আবারো আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, প্রতিটি সৈন্যকে বলে দিন, নফল নামায রোযা থেকে জিহাদ শ্রেয়। আপনারা জানেন, নামায অবস্থায়ও যদি কারো সামনে সাপ এসে যায় তবে নামায ছেড়ে আগে সাপ মেরে ফেলার হুকুম রয়েছে। কেউ যদি মনে করে শুধু নামায রোযা ইবাদত বন্দেগী করে সে আল্লাহকে খুশী করে ফেলবে তবে সে বড় ভ্রান্তিতে রয়েছে। হিন্দুরূপী এ সব বিষধর সাপকে হত্যা করা ছাড়া আপনাদের কারো পক্ষেই আল্লাহকে খুশী করা সব নয়।

    আপনাদেরকে মনে রাখতে হবে, হিন্দুস্তানের হিন্দুরা যদি নির্বিবাদে রাজত্ব করতে পারে তাহলে এখানকার মুসলমানরা কিছুতেই তাদের ঈমানী অস্তিত্ব নিয়ে টিকে থাকতে পারবে না। এই দেশ সব সময়ই মুসলমানদের জন্যে বধ্যভূমি হয়ে থাকবে। আপনারা সাধারণ যোদ্ধাদের বুঝিয়ে দেবেন, তোমাদের আগে এখানে যুদ্ধ করতে এসে যে সব মুসলমান যোদ্ধা শাহাদাত বরণ করেছে যাদের মৃত লাশ পর্যন্ত দেশের মাটিতে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তোমাদেরকে তাদের শাহাদাঁতের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে।

    আমি আপনাদের সতর্ক করতে চাই, হিন্দুস্তান খুবই বিভ্রান্তিকর জায়গা। এখানকার প্রতিটি মানুষ একেকটি জীবন্ত ধোকা। এখানকার মাটি মানুষ, ভূপ্রকৃতি, সব কিছুই যে কোন যোদ্ধাকে যে কোন সময় ধাঁধার মধ্যে ফেলতে পারে। আপনারা এখানকার নারীদের দেখেছেন। এদের রূপ যে কোন যোদ্ধাকে বিভ্রান্ত করতে পারে। আমাদের সৈন্যরা যাতে এখানকার নারীদের রূপসৌন্দর্যে বিভ্রান্ত না হতে পারে এ ব্যপারে প্রতিটি মুহূর্তে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। নারীর রূপজৌলুসে মত্ত কোন সেনাদল কখনো বিজয় লাভ করতে পারে না। আপনারা প্রতিটি সৈনিকের কাছে এ বার্তা পৌঁছে দিন। সিপাহী হোক আর অফিসার হোক যেই আল্লাহর নাফরমানী করবে, আমি সাথে সাথে তাকে আল্লাহর কাছে পাঠিয়ে দিবো। এমনটি হলে পুরস্কারের পরিবর্তে পরকালে তাকে আগুনে জ্বলে পুড়ে ধ্বংস হতে হবে। কেউ কোন নারী কেলেংকারী করলে তার শাস্তি হবে নির্ঘাত মৃত্যুদণ্ড।

    ইমাম ও খতীবগণকে বিদায় করে দিয়ে সুলতান মাহমূদ সেনা কমান্ডার ও সেনাপতিদের সামনে মথুরা থেকে কনৌজ পর্যন্ত মানচিত্র মেলে ধরে দেখালেন, কোন পথে তাদের যেতে হবে। চূড়ান্ত অভিযানের পরিকল্পনা করার আগেই তিনি তার বিশেষ গোয়েন্দাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য জেনে নিয়ে ছিলেন। গোয়েন্দা তথ্য ছাড়াও তিনি সেনাবাহিনীর কয়েকজন কমান্ডারকে ছদ্মবেশে কনৌজ পাঠিয়েছিলেন পথ ও পারিপার্শিক অবস্থা সরে যমীনে দেখে আসার জন্য। সেনা অফিসারদের উদ্দেশ্যে মানচিত্র দেখিয়ে সুলতান বললেন

    আমাদের গমন পথে মুনাজ নামের একটি ছোট্ট রাজ্য রয়েছে। এটি রাজপুতদের আবাসস্থল। রাজপুতেরা খুবই সাহসী ও লড়াকু জাতি। যুদ্ধ বিগ্রহে হিন্দুস্তানের অন্য কোন জনগোষ্ঠী এদের মোকাবেলা করতে পারে না। এদেরকে আগেই বাগে আনতে হবে। নয়তো আমরা যখন কনৌজ অবরোধ করবো তখন ওরা আমাদের পেরেশান করে তুলবে। তিনি আরো জানালেন, গোয়েন্দাসূত্র জানিয়েছে, লাহোরের রাজা ভিমপাল ছদ্মবেশে এই এলাকায় অবস্থান করছে। সে এই অঞ্চলের ছোট্ট বড় রাজা মহারাজাদেরকে আমাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করার জন্যে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। ভিমপালের ছোট্ট ভাইও তার সাথেই রয়েছে। ভিমপালকে জীবন্ত গ্রেফতার করতে হবে। খবর এসেছে, ভিমপালের সেনাবাহিনীও এদিকে রওয়ানা হতে যাচ্ছে। আমাদের খুবই সতর্ক থাকতে হবে।

    মথুরা বিজয়ের সপ্তম দিনে সুলতান মাহমূদ কনৌজে রওয়ানা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। যুদ্ধকালীন সরবরাহ ব্যবস্থা সফল রাখার জন্য তিনি মথুরায় কিছু সৈন্য রাখলেন এবং যারা যুদ্ধে নিজেদের বীরত্ব প্রদর্শনে আগ্রহী সেই সব উৎসাহী সৈন্যদেরকে অভিযানের প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ দিলেন।

    * * *

    এ দিকে রাত পেরিয়ে সকালের সূর্য তখন পূর্বাকাশে উঁকি দিচ্ছে। ঠিক সেই সময় কনৌজের রাজপুত্র লক্ষণ, শিলা, রাধা ও তার সহযোগী দুই সৈনিককে নিয়ে মহাবনের জঙ্গলের পাশে পৌঁছাল। তাদের প্রত্যেকের গায়ে বিশেষ ভাবে তৈরী উপজাতীয় পোষক। লক্ষণের গায়ে গোত্রপতির বিশেষ ধরনের পোশাক। মহাবনে পৌঁছাতে পথিমধ্যে তাদের দু’রাত কাটাতে হয়েছে। এই বনের মধ্যেই তৃতীয় রাতটি কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলো তারা।

    সময়টা ছিল অগ্রহায়নের শেষ ও পৌষের শুরু। প্রচণ্ড শীত। তারা এসে যে জায়গাটায় থামলো সেই জায়গাটি রাত হয়ে যাওয়ার কারণে ঠিক মতো দেখে নিতে পারেনি। যমুনা নদী এখান থেকে দূর দিয়ে প্রবাহিত হলেও এসে এখানকার বন-জঙ্গলের ভেতর দিয়ে বাঁক দিয়ে ঘুরে গেছে। জঙ্গলের ভেতরকার নদীটা অনেকটাই ঝিলের মতো। এখানে তেমন স্রোত নেই। নিথর শান্ত পানি। চারদেিক ঘনঝোঁপ ঝাড়। জঙ্গলী পশুদের মধ্যে এখানে জলহস্তিদের বেশী বসবাস। অত্যধিক শীত ও ঠান্ডার প্রকোপ না থাকলে এতোক্ষণে এদেরকে জলহস্তী গ্রাস করে ফেলতো।

    এখানে এসে লক্ষণপালের ছোট্ট দলটি রাত যাপনের জন্য একটি যুতসই জায়গা বেছে নিল। এবং সবাই টানা ভ্রমণের ক্লান্তি দূর করার জন্য বিশ্রাম নিতে বিছানো করে শুয়ে পড়লো। রাধা শিলা ও লক্ষণপাল কাছাকাছিই বিছানা করল আর তাদের সাথে আসা দুই নিরাপত্তারক্ষী একটু দূরে বিছানা করে শুলে পড়ল।

    সকাল বেলায় ওদের ঘুম ভাঙ্গার পর লক্ষণ বললো–

    এখানে নদী পাড়াপাড়ের জন্য ভাড়াটে নৌকা পাওয়া যায়। আমাদেরেকে এখনই নদী পাড় হতে হবে। আমি নদীর তীরে গিয়ে দেখি কোন নৌকার মাঝি পাওয়া যায় কি না।

    শিলা বললো, আমিও তোমার সাথে যাবে।

    তোমাকে সাথে নেয়া ঠিক হবে না ।

    ঠিক আছে তোমার সাথে যাবো না কিছু দূর গিয়ে জায়গাটা দেখে ফিরে আসবো।

    লক্ষণ ও শিলা পাশাপাশি নদীর তীরের উদ্দেশ্যে হাঁটছিলো।

    রাতের বেলায় রাতের অন্ধকারে এলাকাটার অবস্থা বোঝা সম্ভব হয়নি। সময় ৯টা।

    গোটা এলাকা জঙ্গলাকীর্ণ। ঝোঁপঝাড়, আর গাছ-গাছালীতে ঠাসা গোটা এলাকা। ভোরের আলো চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ায় তারা জায়গাটি ভালোভাবে দেখতে পেল। এলাকাটি বলতে গেলে সমতল জঙ্গল। টিলা পাহাড়ের কোন চিহ্ন তাদের নজরে পড়লো না।

    অনেকক্ষণ ধরে শিলা ও লক্ষণ পাশাপাশি হাঁটছে কিন্তু কেউই কোন কথা বলছে না। এক সময় লক্ষণকে থামিয়ে শিলা জিজ্ঞেস করলো

    তুমি নীরব কেন লক্ষণ? অত্যধিক নীরবতা আতংকের লক্ষণ! তুমি কি ভয় পাচ্ছে?

    ভয় নয় শিলা! থেমে শিলার আপাদমস্তকের দিকে একবার দৃষ্টি ফিরিয়ে বললো লক্ষণ। আমি একটা ব্যাপার নিয়ে চিন্তা করছি।

    কি নিয়ে চিন্তায় পড়েছে।

    ভাবছি তুমি এমনিতেই সুন্দর। এর উপর এই উপজাতীয় পোশাকে তোমাকে কেমন দেখাচ্ছে তা বলে বুঝাতে পারবো না। আমার প্রশিক্ষক আমাকে বলেছিলেন, মানুষ যদি তার স্বভাবজাত অবস্থায় থাকে তবে বৃদ্ধ হলেও তার স্বাস্থ্য চেহারায় এতটুকু প্রভাব পড়ে না। শরীর সম্পূর্ণ অটুট থাকে। আকর্ষণীয় দেহাবয়ব অক্ষুণ্ণ থাকে। আমার মন বলছে, আমরা যদি এই বেশে, এই ঘৃণা, হিংসা, যুদ্ধ বিগ্রহের দুনিয়া ছেড়ে এমন জঙ্গলে নিরিবিলি জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারতাম!….

    আমি কখনো কল্পনাও করিনি শিলা! তোমার চুল এতোটা রেশমী ও সুন্দর। তুমি রূপসী ঠিক, তাই বলে এমন অনিন্দ সুন্দুরী তা ধারণা করতে পারিনি। তোমার রূপের বর্ণনা দেয়ার মতো ভাষা আমি খুঁজে পাচ্ছি না।

    লক্ষণের এই কথায় শিলার মধ্যে কোন ভাবান্তর হলো না। সে যেমন ছিলো তেমনই রইলো। লক্ষণ রূপের এই যাদুকরী প্রতিমাকে তার বাহুবন্ধনে জড়িয়ে নেয়ার জন্য তার দিকে দু’হাত প্রসারিত করল। কিন্তু শিলা দু’হাত পিছনে সরে গেল।

    আবেগতাড়িত না হয়ে স্বাভাবিক হও লক্ষণ! অত্যন্ত দৃঢ় ও গম্ভীর কণ্ঠে বললো শিলা। লক্ষণ! স্মরণ করো, আমরা কোন উদ্দেশ্যে কি কাজে এখানে এসেছি। নিজের পৌরুষ ও বীরত্বের উপর নারীর রূপ সৌন্দর্যকে সাওয়ার করো না লক্ষণ। ভুলে যেয়ো না, আমরা মৃত্যুর সাথে খেলা করতে এসেছি।

    আমি আমার কর্তব্য বিস্মৃত হইনি রাজকুমারী! আমি জানি, আমরা মৃত্যুর খেলায় নেমেছি। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে, তোমার মতো অস্পরীকে নিয়ে মুসলমানরা খেলায় মেতে উঠবে।

    হঠাৎ আবেগাপ্লুত হয়ে লক্ষণ বললো–

    তোমরা এখানেই থাকো শিলা! আমি একাকী মথুরা যাবে। একাকী গিয়ে সোজা আরব বাহিনীর সেনাপতি মাহমূদকে হত্যা করবো। তোমরা এখান থেকেই ফিরে যাও। আমি একাই মরতে যাবো। কিন্তু যাবার আগে শিলা! একবার, শুধু একটি বার একটু সময়ের জন্য আমাকে জড়িয়ে ধরে। আমি ভয় পাচ্ছি শিলা! আমি আমার মুত্যুকে ভয় পাচ্ছি না, ভয় পাচ্ছি ওরা আমাকে হত্যা করে যখন রাধাকে ও তোমাকে নিয়ে যাবে সে সময়টার কথা ভেবে!

    লক্ষণ! দূর হও এখান থেকে। বুঝতে চেষ্টা করো, আমি তোমার কাছে নিজেকে বিক্রি করে দেইনি। আমি তোমার সঙ্গ দিয়েছি একটি মহান উদ্দেশ্যে। এই উদ্দেশ্য সাধিত হলে আমি নিজেই নিজেকে তোমার পায়ে সোপর্দ করবো। কিন্তু এখন নয় লক্ষণ! তুমি জানো না, একবার যদি তোমার শরীর আমার চুল ও দেহের স্পর্শ পায়, তবে তুমি সব কর্তব্য ভুলে যাবে।

    লক্ষণ! আমার চোখে তুমি গযনীর সুলতানকে দেখো, আমার চেহারায় আমার আত্মমর্যাদাবোধ দেখো। যাও লক্ষণ! নদীর তীরে গিয়ে কোন নৌকা আছে কি না তা দেখো, ভুলে গেলে চলবে না, আমাদেরকে যতো শিগগির সম্ভব নদী পার হয়ে যেতে হবে।

    শক্ত সুঠাম দেহের অধিকারী যথার্থ সুপুরুষ লক্ষণ। তার শরীরে গঠনই বলে দেয় তরবারী ও অশ্বচালনায় পারদর্শী যুবক সে। শিলার কথায় তার দেহের ঘুমন্ত পৌরুষ সচেতন হয়ে উঠলো, শিলাকে এক দৃষ্টিতে আপাদ মস্তক দেখে বললো–

    ঠিক আছে শিলা! আমি তোমাকে হতাশ করবো না। যে কোন ভাবে নৌকার ব্যবস্থা করে এখনই আসছি আমি।

    এই বলে শিলাকে পিছনে রেখে সামনের দিকে দৌড়াতে লাগলো লক্ষণ। ঠায় দাঁড়িয়ে শিলা লক্ষণের গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণের মধ্যেই গাছ-গাছালির আড়ালে হারিয়ে গেল লক্ষণ।

    হঠাৎ পেছনে কোন মানুষের পায়ের শব্দ পেল শিলা। নির্ভয়ে নিরুদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে পেছন ফিরে তাকাল শিলা। শিলা ভাবছিল এই বিজন জঙ্গলে এ সময়ে কে থাকতে পারে! মথুরা এখান থেকে বিশ পঁচিশ মাইল দূরে অবস্থিত। মুসলমান সৈন্যরা সেখানে অবস্থান করছে। কিন্তু এখানে কোন জন মানুষের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা না থাকলেও বাস্তবে একজন লোক বিস্ফারিত দৃষ্টিতে শিলার দিকে তাকিয়ে এগিয়ে আসছে। লোকটির চেহারায় কালো দাড়ি। এই এলাকার পোষাকেই লোকটি সজ্জিত। ভরাট চেহারার সবল সুঠাম দেহী একজন যুবক। লোকটি পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে একেবারে শিলার মুখোমুখি এসে দাঁড়াল।

    শিলা! আমি ভুল করছিনা তো? তুমি কি মুনাজের রাজা রায়চন্দ্রের বোন শিলা না? তুমি তো কোন উপজাতি না। এইমাত্র যে লোকটি তোমার কাছ থেকে চলে গেল সে কি লক্ষণ নয়? গতকাল থেকেই আমি চুপি চুপি তোমাদের লক্ষ্য করছি।

    আচ্ছা! তাই নাকি? তুমি কে? খুবই স্বাভাবিক কণ্ঠে জানতে চাইলো শিলা।

    লোকটি তার দাড়িতে হাত বুলিয়ে দাড়ি খুলে ফেললে একজন টগবগে যুবকের চেহারা বেরিয়ে এলো। দেখতে হুবহু লক্ষণের মতো।

    ওহ! তারালোচন! তুমি এখানে কেমন করে? অবশ্য তোমার এ সময়ে এখানেই থাকা উচিত।

    কিন্তু তোমার এখানে থাকা মোটেও উচিত হয়নি। বললো তারালোচন।

    কিছু দিন আগে আমি তোমার ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে ছিলাম, তখন তোমার সাথে দেখা হয়েছিল। আর একবার তুমি যখন তোমার ভাইয়ের সাথে লাহোর গিয়ে ছিলে তখন তোমাকে দেখেছিলাম। ক’দিন আগে মুনাজে তোমাকে না দেখলে হয়তো এই পোশাকে আমার পক্ষ্যে তোমাকে চেনা সম্ভব হতো না। এই বিজন জঙ্গরে তোমাকে কেউ দেখলে মনে করবে, কোন রাজকুমারীর প্রেতাত্মা তুমি। কিংবা কেউ মনে করবে তুমি এই জঙ্গলের রাণী।

    গতকাল থেকেই তোমাদের আমি লক্ষ করছি। তোমার হয়তো জানা আছে এখানে কি করছি আমি। আমি গযনী বাহিনীর গতিবিধি যাচাই করতে এখানে এসেছি। মহারাজা ভীমপাল এখান থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরে অবস্থান করছেন। তোমাদের সাথে রাজকুমারী রাধাকেও দেখলাম। এই বন্যপোশাক পরেছো কেন তোমরা? তোমরা কি কোথাও পালিয়ে যাচ্ছো?

    এই যুবক লাহোরের মহারাজা ভীমপালের ছোট ভাই তারালোচন পাল। শিলার সাথে তার বিয়ের কথা প্রায় পাকাপাকি হওয়ার পথেই ছিল। কিন্তু এরই মধ্যে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠায় বিয়ের কাজ বিলম্বিত হয়ে গেল।

    এদিকে সুলতান মাহমুদের কাছে ঠিকই সংবাদ পৌঁছে গেল লাহোরের মহারাজা ভীমপাল ও তার ছোট ভাই তারালোচন পাল লাহোর থেকে এসে এই এলাকার রাজা মহারাজাদেরকে সুলতানের মোকাবেলায় ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করছে।

    তারালোচন পাল ঐ কাজেই একবার মুনাজ ও কনৌজ ঘুরে এসেছে। ঘুরতে ঘুরতে একদিন তার চোখে পড়ে লক্ষণের এই ছোট কাফেলা। কাফেলাটি তার কাছে সন্দেহজনক মনে হওয়ায় এবং লোকগুলোও তার পরিচিত হওয়ায় সে এদের অভিপ্রায় বুঝার জন্য তাদের পিছু নিল। এক পর্যায়ে লক্ষণ শিলার কাছ থেকে চলে যাওয়ার সুবাদে সে শিলার মুখোমুখি হলো। তারালোচন পালের মুখোমুখি হওয়ায় শিলা মোটেও বিব্রতবোধ করলো না। বরং সে অকপটে বলে দিল কোন অভিপ্রায়ে ওরা লক্ষণের এই কাফেলায় শরীক হয়েছে এবং কেন লক্ষণকে তারা সঙ্গ দিচ্ছে।

    তোমার ভাই রায়চন্দ্র কি এখন বোন আর কন্যাকেও যুদ্ধে জড়িয়ে ফেললেনঃ রাজপুতদের কি হয়ে গেলো। তাদের আত্মমর্যাদাবোধ কি গঙ্গার পানি ধুইয়ে নিয়ে গেছে। রাজপুতেরাও কি মুসলমানদের ভয়ে এতোটা ভড়কে গেছে উমামাখা কণ্ঠে বললো তারালোচন।…..

    আমরা তো রায়চন্দ্রকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, মাহমূদ যদি তাকে পরাজিত করে ফেলে তবে আমরা নিশ্চয়ই এর প্রতিশোধ নেবো। এজন্য আমরা সৈন্যদের প্রস্তুত করে রেখেছি। আমরা এ মুহূর্তে সুলতানের মুখোমুখি হচ্ছি না এজন্য যে, যখন একের পর এক যুদ্ধ করে সে ক্লান্ত হয়ে যাবে, তার সৈন্যনা অবসন্ন হয়ে যাবে, আর লোকবল কমে যাবে তখন আমরা এক আঘাতেই তাদেরকে জব্দ করবো। অবশ্য আমরা সুলতানের সাথে চুক্তিবদ্ধ। কিন্তু এই চুক্তি ভাঙ্গার জন্যে আমরা সুযোগের অপেক্ষা করছি। তাকে হত্যা করার কোন দরকার নেই। যদি হত্যা করতেই হয়, তবে লক্ষণপাল ও তার সঙ্গী দুই সৈনিক যাবে, তোমরা এখান থেকেই বাড়ীতে ফিরে যাও।

    শিলা তারালোচনকে জানালো, তাদেকে কেউ জোর করে আনেনি। তারাই বরং লক্ষণকে উজ্জীবিত করেছে। রাধা এবং সে কি ভাবে সুলতানকে হত্যার পরিকল্পনা করেছে কি ভাবে তারা মুসলিম সৈন্যদের ধোকা দেবে সব বিস্তারিত তারালোচনকে জানাল শিলা।

    তোমাদের পরিকল্পনা বাস্তব সম্মত নয়। তোমরা যাদের ধোকা দেয়ার চিন্তা করছে তাদেরকে ধোকা দেয়া সহজ নয়। তোমরাই বরং ধোকায় পড়ে গযনী চলে যাবে এবং তোমাদেরকে নর্তকীতে পরিণত করা হবে কিংবা কোন সেনা কর্মকর্তার রক্ষিতা হয়ে থাকতে হবে।

    শিলা তারালোচনকে রাজপুত নারীদের আত্মমর্যাদাবোধের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললো, তারা কতোটা কঠোর মনোভাব নিয়ে এই অভিযানে বেরিয়েছে। কিন্তু শিলার কথায় আশ্বস্ত হতে পারলোনা তারালোচন। সে তার হবু স্ত্রীর এই ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানকে কিছুতেই সমর্থন করতে পারলো না।

    এমন কাক্ষিত এক অভিযানের মধ্য পথে অনাকাক্ষিত বাধা হয়ে দাঁড়ানোতে তারালোচনের উপর ক্ষেপে গেল শিলা। সে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে তারালোচনকে বললো, আমার যাওয়া যদি সমর্থন করতে নাই পারো, তাহলে তুমি যাও আমার স্থানে। সেই সাহস তো তোমার নেই। চোরের মতো বেশ বদল করে গহীন জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তোমরা গযনীর সাথে মৈত্রী চুক্তি করেছে। এটাও তো তোমাদের এক ধরনের কাপুরুষতা। তোমরা যদি কাপুরুষ না হও তাহলে সেনাবাহিনীকে সামনে এনে প্রকাশ্যে মাহমূদকে হুমকি দাও না কেন? বলো না কেন, আমরা আর তোমার অধীনতামূলক চুক্তি পালনে রাজী নই।…

    এদিকে মথুরার হাজার বছরের পুরনো মন্দির ধ্বংস হয়ে গেছে, ওদিকে তোমরা তোমাদের শহরে মুসলমানদের আচ্ছা করে আযান দেয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। তোমরা আযানের আওয়াজে বেশ সাচ্ছন্দেই আছে। কিন্তু পরিস্থিতি আমাকে স্বস্তিতে থাকতে দেয়নি। তোমাদের নিষ্ক্রিয়তা আমার আত্মমর্যাদাবোধ একটা কিছু করার জন্যে আমাকে ঘর ছাড়া করেছে।

    শিলার কথায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলো তারালোচন। সে বললো, আমি তোমার কথায় সায় দিতে পারছি না শিলা! যাই বলল, তুমি আমার হবু স্ত্রী। তোমার সাথে আমার বিয়ের বিষয়টি পাকাপাকি হয়ে আছে। আমি কিছুতেই তোমাকে এখান থেকে আর সামনে যেতে দেবো না।

    আমি কারো হবু বধূ নই। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললো শিলা। যে সুলতান মাহমুদকে হত্যা করতে পারবে আমি হবো তার স্ত্রী। আর সে কাজ একমাত্র লক্ষণ পালের পক্ষেই করা সম্ভব। লক্ষণ যদি সেই কাজ করতে গিয়ে নিহত হয় তবে আমি নিজেই মাহমূদকে হত্যা করবো। নয়তো রাধা সেই কাজ সমাধা করবে। তুমি জেনে রাখো, এই লুটেরার জীবন মৃত্যু এখন আমার হাতের মুঠোয়।

    হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে দাঁতে দাঁত পিষে দৃঢ় কণ্ঠে শিলা বললো–

    আমার হাত মেহেদীর রঙ্গে নয় মাহমূদের তাজা রক্তে রঙ্গিন হবে। মুনাজের কোন রাজপুত তরুনীকে কোন মুসলমান সেবাদাসীতে পরিণত করতে পারবে না। এটা তোমাদের পক্ষে সম্ভব। কারণ তোমার বাপ দাদারা মাহমূদের হাতে একের পর এক পরাজয় শিকার করে নিয়ে মাহমূদের সাথে মৈত্রী চুক্তি করেছে। আর দাসত্ব চুক্তি করে দেশের সম্পদ তোমরা মুসলমানদের হাতে তুলে দিচ্ছে।

    তোমার সাথে আমার বিয়ে ঠিক করেছিলো আমার ভাই। কিন্তু আমার সিদ্ধান্তের কথা আজ শুনে রাখো তারালোচন! তোমার মতো কাপুরুষদের আমি ঘৃণা করি। নারী সে রাজপুত হোক আর মজদুরের বংশধর হোক, নারী বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠলে সাগরেও আগুন ধরিয়ে দিতে পারে। আমার পথ ছেড়ে দাও তারালোচন! তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই, আমার সব স্বপ্নসাধ এখন লক্ষণকে ঘিরে। পৃথিবীতে সম্ভব না হলেও স্বর্গে আমাদের বিয়ে হবে। তুমি এই জঙ্গলেই ঘুরে ঘুরে সময় কাটাও।

    তুমি কি ভাবছো আমার পক্ষে এখান থেকে তোমাকে তুলে নেয়া সম্ভব নয়? ক্ষুব্ধ ভঙিতে শিলার দিকে এগিয়ে গেল তারালোচনপাল।

    তারালোচনকে এগুতে দেখে শিলা পিছনে ঘুরে দৌড়াতে লাগল। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে দৌড়ে শিলা একটি টিলার আড়ালে চলে গেল।

    তারালোচন দৌড়ে ওর পিছু পিছু গিয়ে ওকে দেখে ফেললো। তখন শিলা একটি গাছের আড়ালে দাঁড়ানো। জায়গাটি ঘন গাছ গাছালীতে ভরা। নদী এখানে জঙ্গলের ভেতরে চলে এসেছে। জায়গাটি অনেকটা ঝিলের মতো। এখানকার পানি শান্ত। কোন স্রোত বা ঢেউ নেই।

    তারানোচন পাল শিলাকে বললো, শিলা তোমাকে শেষ বারের মতো বলছি, তুমি আমার কাছে এসে পড়ো। শিলা তারালোচনকে হুমকির স্বরে বললো, সাহস থাকে তো আমাকে ধরতে এসো। মাহমূদকে খুন করার আগে আমি তোমাকেই খুন করবো। আমি স্বেচ্ছায় কখনো তোমার কাছে ধরা দেবো না। হুমকি দিয়ে শিলা উল্টো পায়ে পেছনের দিকে সরতে শুরু করল। তারালোচনপাল ঠায় দাঁড়িয়েই শিলাকে আত্মসমর্পণের জন্যে আহবান করছিল এবং বলছিলো,

    তোমার পক্ষে কাউকে হত্যা করা সম্ভব নয় শিলা! আমি কিছুতেই তোমাকে এখান থেকে পালাতে দেবো না।

    শিলা উল্টো পায়ে পিছনেই সরে যাচ্ছিল। হঠাৎ আতংকিত কণ্ঠে তরলোচন বললো, শিলা! শিলা! আর পিছনে যেয়ো না! পড়ে যাবে। যেখানে আছো সেখানেই দাঁড়াও।

    না, আমি কিছুতেই তোমার কাছে ধরা দেবো না। শিলা বুঝতে পারেনি; তারালোচন কী ভয়ংকর বিপদ থেকে তাকে সাবধান করছিল। তারালোচন চিৎকার করে বললো, শিলা! শিলা! তোমার পেছনে রাক্ষুসে কুমির।

    তখন একটি কুমির মুখ হা করে একেবারে শিলার পেছনেই দাঁড়ানো। এটি হয়তো কোন ঝুপের আড়ালে লুকিয়ে ছিল। ধীরে ধীরে কুমিরটি এগুতে লাগল। কিন্তু শিলা নির্বোধের মতো তখনো পায়ে পায়ে পিছু সরে যাচ্ছিল। আর দু’ পা পিছু হঠতেই মুখ হা করা কুমিরটি শিলাকে এক ঝটকায় মুখের ভেতরে আটকে ফেললো।

    আক্রান্ত শিলাকে কুমির ধরার সাথে সাথে শিলা এমন বিকট আর্তচিৎকার করে উঠলো যে, দূরে ঘুমিয়ে থাকা রাধা ঘুম থেকে জেগে উঠল। রাধা ঘুম থেকে জেগে দেখলো তার পাশে শিলা ও লক্ষণ কেউ নেই। অদূরে দু’জন প্রহরী তখনো বেঘুরে ঘুমাচ্ছে। রাধা তাদের জাগাল এবং তাদের নিয়ে যে দিকে চিৎকার শোনা গেলো সে দিকে দৌড়াতে লাগল।

    হঠাৎ কয়েকজনের দৌড়ানোর শব্দ শুনে তারালোচন পাল একটি ঝোঁপের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল এবং মুখে আঙুল দিয়ে বিশেষ ধরনের সাংকেতিক আওয়াজ করল।

    রাধা তার দুই সৈনিক সঙ্গীকে নিয়ে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখতে পেল, শিলা একটি কুমিরের মুখের ভেতরে তখনো গোংগাচ্ছে। তার দেহের শুধু মাথা আর একটি হাত বাইরে আছে আর বাকীটা কুমিরের মুখের ভেতরে। শিলার রেশমী চুলগুলো কুমিরের মুখের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে। হঠাৎ অজ্ঞাত স্থান থেকে দুটি তীর এসে রাধার সঙ্গী দুই সৈনিকের চোখে বিদ্ধ হলো। উভয়েই আর্তচিৎকার করে দু’হাতে চোখ ধরে মাটিতে বসে পড়ল এবং তাদের চোখে অন্ধকার নেমে এলো। তারালোচন পালের দুই সঙ্গী তার বিশেষ ইঙ্গিতে লক্ষণের সফর সঙ্গী দু’জনের চোখে তীর ছুঁড়ে তাদেরকে অন্ধ করে দিল।

    রাধা ছিলো দুই সৈনিকের আগে আগে। তাই কোন দিক থেকে তীর এসেছে তা সে দেখতে পেলো না। সে শিলার আর্তচিৎকার শুনে উকষ্ঠিত হয়ে সামনের দিকে দৌড়াচ্ছিল। কুমিরের মুখে নারীদেহের অবশিষ্টাংশ দেখে দূরেই থমকে গেল রাধা। অবস্থা দেখে তার মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো, তার চিৎকার করার ভাষাও যেন লোপ পেয়ে গেলো। ঠিক এমন সময় তার পেছনে পেছনে আসা দুই সৈনিকের আর্তচিৎকার শুনে পিছনে তাকিয়ে দেখতে পেলো তারা উভয়েই তীর বিদ্ধ হয়ে মাটিতে বসে পড়েছে। তখন আর নিজেকে সামলাতে পারলো না রাধা। দাঁড়ানো থেকে জ্ঞান হারিয়ে ঠায় লুটিয়ে পড়ল।

    রাধাকে লুটিয়ে পড়তে দেখে তারালোচন পাল রাধাকে ধরার জন্যে এগুতে চাচ্ছিল তখন তার দুই সঙ্গী এই বলে তাকে সতর্ক করলো; সাবধান রাজকুমার! মুসলমান যোদ্ধারা আসছে! আপনি ঝোঁপের আড়াল থেকে বের হবেন না। সাথে সাথে তারালোচন পাল জায়গা ছেড়ে আরো ঘন ঝোঁপ ঝাড়ের আড়ালে হারিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর গমনী বাহিনীর চার যোদ্ধা ঠিক সেই জায়গাটিতে এসে থমকে দাঁড়াল যে জায়গাটি থেকে তারালোচন পাল পালিয়ে ছিল।

    তরলোচন পালকে যদি তার দুই সঙ্গী সতর্ক না করতো তাহলে তারালোচনকে মুসলিম যোরা পাকড়াও করতে পারতো। তা করতে পারলে বিরাট কাজ হতো তাদের। তারালোচনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তারা ভীমপালের অবস্থান জেনে নিতে পারতো। অল্পের জন্য বিরাট একটি শিকার হাত ছাড়া হয়ে গেল গযনী যোদ্ধাদের।

    এরই মধ্যে গযনী যোদ্ধাদের কানে ভেসে এলো ঘোড়া হাঁকানোর শব্দ। নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে মুসলিম যোদ্ধাদের কবল থেকে প্রাণ বাঁচাতে উধশ্বাসে ঘোড়া ছুটিয়ে পালালি তালোচন পাল ও তার দুই সঙ্গী।

    গযনীর চার যোদ্ধার মধ্যে একজন ছিলো ডেপুটি সেনাপতি। আর বাকী তিনজন তার অধীনস্থ তিন কমান্ডার।

    এরা ছিলো গোয়েন্দা কাজে লিপ্ত। মথুরা থেকে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়েই তারা নদী পার হয়েছে। কনৌজ অভিযানের আগে নদী ও আশপাশের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য তারা এদিকে এসেছিল। তা ছাড়া মথুরার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যে সম্ভাব্য কয়েকটি চৌকি স্থাপনের সুবিধাজনক জায়গা নির্বাচন করার বিষয়টিও তাদের উদ্দেশ্য ছিল।

    তারা যখন নদী পেরিয়ে জঙ্গলের ভেতরের ঝিল সদৃশ নদীর অংশে পৌঁছলো, তখন তাদের নজরে পড়ল একটি অচেতন নারীদেহ। সেখান থেকে খানিকটা দূরে তাদের নজরে পড়ল একটি কুমির। কুমিরটি কিছুটা পানিতে নেমে আছে। কুমিরের মুখে একটি মানুষের হাত ঝুলছে এবং নারীর চুল সদৃশ একটি অবয়ব দেখা যাচ্ছে।

    ডেপুটি সেনাপতি কুমিরের দিকে ঘোড়া হাকাল, কিন্তু অশ্বরোহীদের দেখে জলহস্তি পানিতে ডুবে গেল। একটু দূরে পড়ে থাকা অচেতন রাধাকে দেখে সঙ্গীদেরকে ডেপুটি সেনাপতি বললো, মনে হয় অচেতন এই মহিলা কোন জঙ্গলী পরি হবে। একে ঘোড়ায় তুলে নিয়ে চলো।

    রাধাকে ঘোড়ায় তুলে নিয়ে তারা এদিক ওদিক দেখতে লাগলো, নিশ্চয় এই নারীর সাথে আরো কেউ থাকতে পারে। আশপাশে চোখ বুলালে তাদের নজরে পড়লো, দুটি মৃত দেহ। উভয়ের চোখে একটি করে তীর বিদ্ধ। একটু এগিয়ে তারা দেখতে পেলো একটি জায়গায় পাঁচটি ঘোড়া দুটি খচ্চর এবং দুটি হরিণ বাঁধা রয়েছে। সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পেলো, তিন জায়গায় তিনটি বিছানা বিছানো। সেখানে পড়ে থাকা আসবাবপত্র তল্লাশী করার পর তারা ঝোলাটির ভেতরে তরবারী, খঞ্জর এবং অসংখ্য স্বর্ণমুদ্রা পেল। ঝোলার ভেতরে তারা এমন কিছু জিনিসপত্রও পেলো যেগুলো তাদের মনে ব্যাপক জিজ্ঞাসা ও সন্দেহের জন্ম দিলো। ডেপুটি সেনাপতি ছিলেন বয়স্ক ও অভিজ্ঞ সৈনিক। তিনি অচেতন রাধাকে গভীরভাবে দেখে বললেন, এই তরুণী কোনভাবেই জঙ্গলবাসী কোন উপজাতি নয়। তিনি রাধাকে ঘোড়া থেকে নামিয়ে চোখে মুখে পানির ঝাঁপটা দিলেন এবং মাথায় কিছুটা পানি ঢেলে দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে রাধা চোখ মেলল। চোখ মেলেই সে উঠে বসে তার পাশে কে বা কারা অবস্থান করছে এ সবের দিকে না তাকিয়েই চিৎকার জুড়ে দিল শিলা! লক্ষণপাল! রাজকুমার! ডাকতে ডাকতে হঠাৎ দৌড় দিল রাধা।

    দেরি না করে ডেপুটি সেনাপতি দৌড়ে থাবা দিয়ে তাকে ধরে বললেন, তুমি কোন রাজকুমারকে ডাকছে:

    রাধা কোন কিছু চিন্তা না করেই বলে ফেললো, কনৌজের রাজকুমার লক্ষণপাল, তোমরা কি তাকে দেখেছো? এটুকু বলেই সে নীরব হয়ে গেল। অল্পক্ষণের মধ্যেই তার কথাবার্তা ও সার্বিক অবস্থা সম্পূর্ণ বদলে গেল। রাধা বলতে লাগল, আমি কনৌজের কাছের একটি উপজাতীয় গোত্রের মেয়ে। আমরা মুসলমান হওয়ার জন্য গযনী সুলতানের কাছে যাবো।

    তোমাদের গোত্রের নাম কি? জিজ্ঞেস করলেন ডেপুটি সেনাপতি। তোমাদের গ্রামটি কনৌজ থেকে কত দূর?

    এ প্রশ্নে রাধা হতবাক হয়ে গেল। এমন প্রশ্নের তাৎক্ষণিক উত্তর দেয়া তার পক্ষে সম্ভব হলো না। কারণ, তাদের প্রশিক্ষকদের কেউ একথাটি বলেনি, প্রতিটি উপজাতীয় গোত্রেরই একেকটি নাম পরিচয় থাকে। রাধা যখন নিজেকে উপজাতীয় বলে পরিচয় দিলো, তখন ডেপুটি সেনাপতি রাধার উদ্দেশ্যে বললেন,

    শোন তরুনী! আমি গযনীর বাসিন্দা। কিন্তু আমি তোমার ভাষায় কথা বলছি। তা থেকে তুমি বুঝে নিতে পারো আমি তোমাদের এলাকার নাড়ি নক্ষত্র জানি। আমি এখনই কনৌজ ও আশপাশের সমস্ত এলাকা দেখে এসেছি। আমি কনৌজের ধারে কাছে এমন কোন উপজাতি এলাকা দেখিনি যেখানে তোমার মতো সুন্দরী তরুণী থাকতে পারে।

    হঠাৎ করে রাধার মধ্যকার রাজপুতের রক্ত জেগে উঠলো। সে ডেপুটি ও সহযোদ্ধাদের হুমকি দিয়ে বললো, সাবধান! তোমরা কেউ আমাকে স্পর্শ না, আমি তোমাদের হাতে ধরা দেবো না। জীবন্ত থাকা অবস্থায় তোমাদের কেউ আমার গায়ে হাত দিতে পারবে না।

    আচমকা ডেপুটি সেনাপতি রাধার বাজু ধরে বললেন, তোমার সৌভাগ্য যে তুমি আমার হাতে ধরা পড়েছে। তুমি এতো সুন্দরী! তার উপর এমন অর্ধনগ্ন উপজাতীয় পোশাক পরেছে যাতে রূপ সৌন্দর্য আরো বেশী ফুটে উঠেছে। এ অবস্থায় এই বিজন জঙ্গলে কোন নারী লোভী পুরুষ তোমাকে পেলে তোমাকে মা-বোনের দৃষ্টিতে দেখবে না। আমি তোমাকে এই নিশ্চয়তা দিতে পারি, আমার দ্বারা তোমার কোন ক্ষতি হবে না। তুমি যদি আমাকে যাচাই করতে চাও, তাহলে আমি তোমাকে এই তিনজনের হাতে ছেড়ে দিয়ে চলে যাণে, এদেরকে তুমি ভালোভাবে চিনে নাও। আর যদি তুমি নিজের মঙ্গল চাও, তাহলে বলো: কে তুমি? কোত্থেকে এসেছে? রাজকুমার লক্ষণপাল এখন কোথায় আছে? কে এবং কোন উদ্দেশ্য তোমরা এখানে এসেছো?

    হঠাৎ রাধা তার আসবাবপত্রের দিকে ছুটে গেল।

    গযনী যোদ্ধারা তার কাণ্ড বেশ মজা করেই দেখতে লাগল। আসবাবপত্রের মধ্য থেকে সে একটি ছোট্ট কৌটা খুলল এবং সেটি থেকে হাতে কিছু একটা নিয়ে আরো দূরে চলে যাওয়ার জন্যে ছুটতে লাগলো।

    এক কমান্ডার দৌড়ে তাকে ধরে ফেলল এবং তার হাতের কোটাটি ছিনিয়ে নিয়ে ডেপুটি সেনাপতির কাছে দিল। ডেপুটি সেনাপতি সেটিকে হাতে নিয়ে রাধাকে জিজ্ঞেস করলেন, এটি বিষ নয় কি? শোন তরুনী তোমার এই দৌড় ঝাঁপ পালানোর চেষ্টা অর্থহীন। তুমি এখন আমাদের হাতে বন্দী। তোমাকে আমাদের জিজ্ঞাসার জবাব দিতেই হবে। কি ভাবে তোমার কাছ থেকে জবাব বের করতে হয় তা আমরা জানি। তবে আশা করি নিজের স্বার্থেই তুমি আমাদের প্রশ্নের উত্তর দেবে। কারণ, আমরা কখনো অসহায় কোন নারীর ক্ষতি করি না।

    ডেপুটি সেনাপতির নির্দেশে এক কমান্ডার রাধাকে তার ঘোড়ার পিঠে বসিয়ে লাগাম নিজের হাতে নিয়ে নিল। রাধাকে রাখল তার সামনে। যাতে ছুটন্ত ঘোড়া থেকে পালাতে গিয়ে সে আবার কোন দুর্ঘটনা ঘটনাননার অবকাশ না পায়।

    এ দিকে নৌকার খোঁজ করতে গিয়ে অনেকক্ষণ নদীর তীর ধরে হেঁটেও লক্ষণপাল কোন নৌকার খোঁজ পেলো না। তার চোখে পড়লো না কোন মাঝি মাল্লা। অবশেষে হতাশ হয়ে ভগ্ন মনে সে তার সঙ্গীদের কাছে ফিরে আসতে লাগল।

    লক্ষণ যখন ঝিলসদৃশ নদীর তীরের কাছে আসল তখন তার চোখে পড়ল একটি কুমির একটি আস্ত মানুষকে মুখের ভেতর থেকে উপড়ে ফেলছে। কুমিরের খাবারের রীতি হলো বড় কোন শিকার পেলে ওরা আগে সেটিকে বিশাল মুখ গহবরে আটকে মেরে ফেলে এবং মেরে সেটিকে আবার শুকনো জায়গায় উগড়ে ফেলে রাখে। কয়েকদিনে শিকারটি পচে গলে নরম হওয়ার পর ধীরে ধীরে সেটিকে সাবার করে।

    শিলাকে মুখের ভেতরে আটকে মেরে ফেলার পর কুমির পানি থেকে ডাঙ্গায় উঠে তাকে উগড়ে দিচ্ছিল। লক্ষণ পাল দূরে থেকেই দেখতে পেল, যে জিনিসটি কুমির উগড়ে ফেলছে সেটি একটি নারী দেহ। যার পরনে নারীর পোষাক এবং মাথায় দীর্ঘ চুল…. নারীদেহ দেখে তার শরীর কেঁপে উঠলো। সে ভাবতেই পারছিল না, এটি শিলার দেহ হতে পারে। বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য লক্ষণ একটি উঁচু মাটির টিবিসম ছোট্ট টিলার উপরে উঠে এদিকে তাকাল। কুমির তখন শিলাকে সম্পূর্ণ উপরে ফেলেছে। বিশাল জন্তুটার দু’পাটি দাঁতের আঘাত ছাড়া শরীরে তেমন কোন জখম নেই। অনেকটাই অক্ষত শরীর। প্রায় অক্ষত চেহারা। সে স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছে মরদেহের অবয়ব। হায় এ যে তার ই প্রেমাস্পদ শিলার মরদেহ।

    ঠিক এ সময় আরেকটি কুমির দৌড়ে এসে মরদেহটিতে হামলে পড়ল। প্রথম কুমিরটি তার শিকারে ভাগ বসানোকে সহ্য না করে প্রতিপক্ষের উপর হামলে পড়ল। আক্রান্ত কুমির শিলার একটি পা দাঁতে চেপে টানতে লাগল। তখন শিকারী কুমির তার শিকার কজায় রাখতে অপর পা ধরে ফেলল। দুই প্রতিপক্ষের টানাটানিতে মরদেহটি শূন্য সোজা হয়ে গেল এবং এক পর্যায়ে উভয় জন্তুর শক্তি প্রয়োগে তা ছিঁড়ে দুভাগ হয়ে গেল।

    অবস্থা দেখে লক্ষণের মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো। সে হাতে মাথা চেপে ধরে টিলার অপর দিকে নীচে নামাতেই তার দুই সৈনিক সাথীকে পড়ে থাকা অবস্থায় দেখতে পেলো। নিশ্চল নিথর তাদের দেহ। উভয়ের চোখে বিদ্ধ তীর।

    হতবিহ্বল অবস্থায় লক্ষণ দুই সঙ্গীর লাশের দিকে তাকিয়ে রইল। সে দৃশ্যমান ঘটনার পেছনে কি ঘটেছে কিছুই ঠিক বুঝতে পারছিল না। এ সময় তার কানে ভেসে এলো রাধার আর্তচিৎকার। লক্ষণ পাল!

    চিৎকার শুনে ভেসে আসা আওয়াজের দিকে তাকিয়ে লক্ষণ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। রাধা কয়েকজন গযনী সেনার কজায় বন্দী। কোন কিছু চিন্তা না করে নিজের জীবন বাঁচানোর জন্যে যেই লক্ষণ দৌড় দেয়ার সিদ্ধান্ত নিল তার কানে ভেসে এলো গযনী বাহিনীর ডেপুটি সেনাপতির হুমকি–

    পালানোর চেষ্টা করো না ছেলে! তুমি ঘোড়ার চেয়ে বেশী দৌড়াতে পারবে না। বাঁচতে চাও যদি পালানোর চেষ্টা না করে এ দিকে এসো।

    পরিস্থিতির ভয়াবহতা আন্দাজ করে লক্ষণ পালানোর চেষ্টা থেকে বিরত রইলো। গযনীর তিন কমান্ডার তাকেও বন্দী করে ফেললো এবং ডেপুটি সেনাপতি লক্ষণকে একটি ঘোড়ায় সওয়ার করিয়ে সবাইকে রওয়ানা হওয়ার নির্দেশ দিলো। তারা লক্ষণের জিনিসপত্রসহ তাদের ঘোড়া খচ্চর ও হরিণ দুটিও সাথে নিল।

    লক্ষণপালকে সবার পেছনে রাখা হলো। লক্ষণের পেছনে তার পাশাপাশি চলতে লাগল দলপতি ডেপুটি সেনাপতি।

    ডেপুটি সেনাপতি যেতে যেতে লক্ষণকে বললো, এই তরুণী আমাকে সবই বলে দিয়েছে। তাই তাকে আমরা সসম্মানে মথুরা নিয়ে যাচ্ছি। তুমি তার প্রতি লক্ষ রাখবে কেউ তার গায়ে হাত দেয় কিনা? কিন্তু এই তরুণীর মান সম্মান এখন তোমার হাতে। আমরা চাই তুমি যা বলবে সত্য বলবে। তুমি যদি মিথ্যা বলো, তাহলে তুমি কল্পনাও করতে পারবে না ওর সাথে কি আচরণ করা হবে। দেখো, যদি আমি এ মুহূর্তে এখানে না থাকতাম, তাহলে এই তিন যোদ্ধা ওকে এতো সম্মানে রাখতো না। নিশ্চয়ই রহস্য উদঘাটনে মারধর করতো। বলল রাজকুমার! কনৌজের রাজকুমার উপজাতীয় পোষাকে এখানে কি উদ্দেশ্যে এসেছে?

    আপনি আমাদের ছেড়ে দিলে আপনি যা চাইবেন আমরা আপনাকে সেই পরিমাণই উপঢৌকন দেবো, বললো লক্ষণপাল। আপনারা সবাই আমাদের সাথে কনৌজ চলুন। আপনাদের সবার ঘোড়াকেই আমি স্বর্ণ দিয়ে বোঝাই করে দেবো।

    আরে বোকা ছেলে! আমরা যদি পুরস্কারের লোভী হতাম তাহলে এই সুন্দরী তরুণীই ছিল আমাদের জন্যে পুরস্কারের জন্যে যথেষ্ট। তাছাড়া তোমাদের আসবাবপত্র থেকে আমরা বিপুল পরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা পেয়েছি। ইচ্ছা করলে এগুলোও আমরা চারজন ভাগ বাটোয়ারা করে নিতে পারতাম। তুমি আমাকে কনৌজ নিয়ে যেতে চাচ্ছে। আমরা তো কনৌজ থেকেই ফিরছি। আমাদেরকে তোমার কনৌজ নিয়ে যাওয়ার দরকার নেই, আমরাই আমাদের ঘোড়াগুলোকে কনৌজের সোনা দানা দিয়ে বোঝাই করে নেবো। তোমার কোন পুরুস্কারের দরকার আমাদের নেই। আমরাই বরং তোমাকে পুরস্কৃত করতে চাচ্ছি। সত্যি সত্যি তোমার পরিচয় এবং এখানে আসার উদ্দেশ্য বলে দাও এবং পুরস্কারস্বরূপ তোমার জীবন ও এই তরুণীকে নিয়ে বাড়িতে ফিরে যাও। বললো, ডেপুটি সেনাপতি।

    ডেপুটি সেনাপতির তিন সঙ্গীসহ লক্ষণ ও রাধাকে নিয়ে ছোট্ট কাফেলাটি ঘোড়ায় সওয়ার হয়েই নদী পার হলো। পথিমধ্যে তারা অনেক জঙ্গল ময়দান পেরিয়ে এলো। দিন শেষে রাতের অন্ধকার নেমে আসার পরও তাদের পথচলা বন্ধ হলো না। পথিমধ্যে দীর্ঘ ভ্রমনের ক্লান্তি দূর করার জন্যে তারা এক জায়গায় একটু বিশ্রামের জন্যে যাত্রা বিরতি করল। কিন্তু এই দীর্ঘ পথে রাধার সাথে কেউই কোন কথা বললো না। মথুরার সীমানা পর্যন্ত পৌঁছতে এই কাফেলার প্রায় অর্ধেক রাত হয়ে গেল।

    ডেপুটি সেনাপতি পথিমধ্যে লক্ষণপালের সাথে তেমন কোন কথা বলেননি। তিনি শুধু কয়েকবার বলেছিলেন, সে যেনো সত্যি ঘটনা আড়াল করার অপচেষ্টা না করে। প্রকৃত সত্য বলে দেয়। তাহলে তার ও তার সঙ্গীনীর জীবন ভিক্ষা দেয়া হবে এবং তাদের উপর কোন ধরনের অত্যাচার করা হবে না।

    জবাবে লক্ষণপাল ছেড়ে দেয়ার জন্যে তাদেরকে পুরস্কারের লোভ দেখানো ছাড়া আর কিছু বলেনি। কিন্তু মধ্য রাতের দিকে কাফেলা যখন মথুরার সীমানায় পৌঁছাল তখন লক্ষণপাল এগিয়ে গিয়ে ডেপুটি সেনাপতির হাত ধরে বিনয়ের সাথে বললো,

    আমি সত্যি কথা বলে দিচ্ছি ….. আপনি আগে আমার কথা শুনুন। আমি এই কাফেলা নিয়ে আপনাদের সুলতানকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলাম। একথা বলার পর তার আদিঅন্ত প্রস্তুতি ও পরিকল্পনাসহ পুরো ঘটনা সে ডেপুটি সেনাপতিকে জানাল। অবশ্য শিলা কিভাবে কুমিরের শিকারে পরিণত হলো এবং তার দুই সঙ্গী কাদের তীরের আঘাতে নিহত হলো এ ব্যাপারে সে কিছুই জানাতে পারলো না। লক্ষণ আরো বললো, আপনারা মনে করবেন না, আপনাদের শাস্তির ভয়ে আমি সব কথা বলে দিচ্ছি। কিংবা আমার জীবন বাঁচানোর জন্য আমি আপনাদের সব জানিয়ে দিচ্ছি। আপনার উন্নত নৈতিকতা এবং আদর্শিকতায় বিমুগ্ধ হয়ে বিবেকের তাড়নায় আমি আপনাদের কাছে সত্যি কথা বলতে বাধ্য হচ্ছি। আমি আপনাদেরকে আমাদের ছেড়ে দেয়ার বদলে বিপুল পরিমাণ উপঢৌকনের প্রস্তাব দিয়েছি। যে কোন পেশাদার সৈনিকের জন্যে এমন মোটা পুরস্কারেরর লোভ সংবরণ করা কঠিন। তাছাড়া সারা দিন কতো জঙ্গল কতত জনমানবহীন মরুময় এলাকা আমরা পেরিয়ে এসেছি। আমার আশংকা ছিলো এই তরুণীকে আপনার সৈন্যরা অক্ষত রাখবে না। কিন্তু দীর্ঘ সফরে আমি অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম, আপনি ও আপনার সঙ্গীদের কজায় এমন অনিন্দ সুন্দরী তরুণী রয়েছে ইচ্ছা করলেই যাকে আপনারা ভোগ করতে পারতেন। অথচ আপনাদের পথ চলায় মনে হয়েছে। আপনাদের সাথে যে এই তরুণী আছে এই বিষয়টি যেনো আপনারা ভুলেই গিয়েছিলেন। অথচ এমন সুন্দরী তরুণী হয়তো আপনারা গযনীতে জীবনেও দেখেননি। অপর দিকে গোটা পথ অতিক্রমের সময় আপনারা আমাদের প্রতি কোন বিরূপ আচরণ তো দূরে থাক একটি কথাও বলেননি। আমি এ থেকে বুঝে গেছি আপনাদের অব্যাহত বিজয়ের রহস্য। যাক, আমি আপনার প্রস্তাব মতো সত্য ঘটনা বলেদিলাম… এবার আপনি আপনার পুরস্কার দিন। আমি শুধু এতটুকু পুরস্কার আপনার কাছে প্রত্যাশা করছি, প্রয়োজনে আমাকে জল্লাদের হাতে তুলে দিন কিন্তু এই মেয়েটিকে নিরাপদে তার মা বাবার কাছে পাঠিয়ে দিন। …

    আপনি এই তরুনীর সাহসিকতার দিকটি দেখুন। আপনারা যদি সত্যিকার অর্থেই বীরের জাতি হয়ে থাকেন, তাহলে এক জাত্যাভিমানী পিতার আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন কন্যার সাহসিকতাকে সম্মান করুন। কারণ, এই মেয়েটি এখনো কুমারী। আবেগ ও আত্মমর্যাদাবোধের আতিশয্যে আমাকে উৎসাহিত ও উজ্জীবিত রাখার জন্যে সে এই অভিযানের সঙ্গী হয়েছিল। মূলত এ জন্য এর কোন কসূর বা অন্যায় নেই। সব কসূর আমার।

    আমি তোমাকে এই আশ্বাস দিতে পারি এই তরুণী যেমন আছে তেমনি থাকবে এবং তোমাকেও জল্লাদের তরবারীর নীচে দাঁড়াতে হবে না। বললেন ডেপুটি সেনাপতি। স্বেচ্ছায় সত্যি ঘটনা বলে দেয়ার জন্যে তোমাকে ধন্যবাদ দিচ্ছি। সেই সাথে অপরিণাম দর্শী আবেগ তাড়িত এই অভিযানের মতো বোকামীতে সম্মতি দেয়ার জন্যে তোমাদের অভিভাবকদের ধিক্কার দিচ্ছি।

    রাত পোহালে সকালেই লক্ষণপাল ও রাধাকে সুলতান মাহমূদের সামনে পেশ করা হলো। সুলতান লক্ষণপালের মুখ থেকে তার অভিযানের কথা শুনে বললেন,

    তুমি কোন অন্যায় করোনি রাজকুমার। আমরা তোমাকে জল্লাদের হাতে তুলে দেবো না। তোমার মতো সাহসী তরুণের আবেগ, স্বজাতির প্রতি মর্যাদাবোধকে আমরা সম্মান করি। মৃত্যুদণ্ড তো দূরের কথা এজন্য আমরা তোমাদের এতটুকু ভর্ৎসনাও করবো না। তোমাদের মতো আত্মর্যাদাবোধ সন্ন শক্রকে আমরা অসম্মান করি না। ….

    আমাকে হত্যার চেষ্টা করাই তোমাদের সব তৎপরতায় সর্বাধিক গুরুত্ব পাওয়া উচিত ছিল। তোমরা সেই চেষ্টা করেছে। অবশ্য একাজে তোমাদের সাফল্য ও ব্যর্থতা তোমাদের কৃষ্ণদেবী ও বসুদেবের ইচ্ছা অনিচ্ছার উপর নির্ভর করে না। আমার জীবন মৃত্যু সম্পূর্ণ আমাদের আল্লাহর ইচ্ছাধীন। আমরা সেই আল্লাহর ইবাদত করি যার পয়গাম পৌঁছাতেই আমরা এ দেশে এসেছি। আমরা এ দেশের মানুষের কাছে সেই মহান একক সত্তার পবিত্র পয়গাম পৌঁছে দিতে চাই। যিনি নিরাকার। যার সত্তা মাটি পাথর কাঠ বা ধাতবের তৈরী নিষ্প্রাণ সত্তা নয়। যিনি পানাহার করেন না। যিনি মানুষের দেয়া খাবার গ্রহণ করেন না। যার কোন স্ত্রী সন্তান নেই। যার কোন উত্তরাধিকার নেই। তিনি সর্বত্র বিরাজমান। সব কিছুর স্রষ্টা তিনি। মানুষের জীবন মৃত্যু যার ইচ্ছদীন।

    সুলতান মাহমূদ তার দুভাষীকে বললেন, এই তরুণীকে বলে দাও, সে যেন এই তরুণীর বাবাকে গিয়ে বলে, আমি মুনাজের রাজপুতদের বীরত্ব ও বাহাদুরীর অনেক গল্প শুনেছি। কিন্তু আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন কোন জাতির কোন তরুণীকে শত্রু ঘায়েল করার জন্যে অর্ধ উলঙ্গের পোষাক পরে শত্রুকে নারীর মায়াবী ফাঁদে ফেলার জন্যে চক্রান্তের খুঁটি বানাতে পারে না। এটা যেকোন মর্যাদাবোধ জাতির বীর পুরুষদের জন্যে চরম লজ্জাস্কর ….।

    আর এই তরুণীকে বলল, সে যেনো তার বাবাকে গিয়ে বলে, আমরা অচিরেই কনৌজ আসছি। আমাকে হত্যা করার জন্যে সাহস থাকলে সে যেনো আমার মুখোমুখি হয়। এই তরুণীকে আরো বলে দাও, ইচ্ছা করলে তার বাবার কাছ থেকে আনুগত্য আদায় করতে আমরা তাকে বন্দী করে রাখতে পারতাম। কিন্তু আমরা অপহরণকারী নই। আমরা লড়াকু। প্রতিপক্ষের আনুগত্য আমরা সম্মুখ সমরে শত্রুকে পরাজিত করেই আদায় করে থাকি। কোন নিরীহ লোককে অপহরণ করে কাউকে বেকায়দা ফেলে কাপুরুষের মতো আমরা শত্রুর কাছ থেকে কিছু আদায় করি না।

    দুভাষী সুলতানের কথাগুলো লক্ষণের ভাষায় লক্ষণকে বুঝিয়ে দিল। এরপর সুলতান বললেন, এই রাজকুমারকে আরো জানিয়ে দাও, এই বন্দীত্বকে পুঁজি করে আমরা তার কাছ থেকে কনৌজের কোন গোপন বা অজানা তথ্যও জানতে চাইবে না। কারণ, আমরা কনৌজের সব খবরই জানি। কনৌজের ভেতরে বাইরের সব খবরই আমাদের জানা।

    লক্ষণপাল অপলক নেত্রে সুলতানের দিকে তাকিয়ে ছিল। আর মনে মনে আতংকগ্রস্ত ছিল, না জানি সুলতান তাদের ব্যাপারে কি ফয়লাসা দেন। রাধাও অবাক বিস্ময়ে সুলতানের চেহারার দিকেই তাকিয়ে ছিল।

    সুলতান মাহমূদ দুভাষীর উদ্দেশ্যে বললেন, এদের বলে দাও, এরা যেনো তাদের বাবাকে গিয়ে বলে, যুদ্ধ ছাড়াই যাতে আমাদের হাতে দুর্গ তুলে দেয়। যুদ্ধ করে যদি আমাদের দুর্গ জয় করতে হয় তবে তাদের পরিণতি হবে শোচনীয়।

    এরপর সুলতান নির্দেশ দিলেন, এদেরকে তাদের শহরের কাছাকাছি নিরাপদ জায়গায় রেখে এসো এবং তাদের ঘোড়া ও খচ্চর তাদের সাথেই ফিরিয়ে দাও।

    আতংক ও ভীত বিহ্বল অবস্থায় লক্ষণপাল ও রাধা সুলতানের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। দুভাষী যখন তাদের মুক্তির কথা শোনালো তখন ঘটনার আকষ্মিকতায় মুক্তির উচ্ছ্বাসে লক্ষণ উঠে গিয়ে সুলতানের হাত ধরে চুমু খেল আর বিস্ফারিত নেত্রে রাধা সুলতানের সৌম্য কান্তিময় গাম্ভীর্যপূর্ণ চেহারার দিকে তাকিয়ে রইলো। যেনো রাজ্যের বিস্ময় তার চোখের সামনে অভাবনীয় সব দৃশ দেখাচ্ছে।

    ভারত অভিযান ও ৫৫

    কিছুক্ষণ পরে লক্ষণ পাল ও রাধাকে দশ বারোজন সিপাহীর প্রহরাধীনে তাদের বাড়ীতে পৌঁছে দেয়ার জন্য পাঠানো হলো। এই দলের নেতৃত্বের দায়িত্ব দেয়া হলো একজন সেনা কমান্ডারকে। দীর্ঘ সফরের পর এই সেনাদল মুনাজ দুর্গের অদূরে রাধাকে ছেড়ে দিল এবং লক্ষণকে কনৌজের কাছের একটি জায়গায় পৌঁছে দিয়ে মথুরার দিকে ফিরে আসতে লাগল।

    ব্যর্থতার গ্লানি ও এক বুক হতাশার বোঝা কাঁধে নিয়ে মুসলিম যোদ্ধাদের কবল থেকে মুক্ত হয়ে লক্ষণ গিয়ে তার বাবা কনৌজের রাজা রাজ্যপালের সম্মুখে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে সে জানাল তার সফরের ইতিবৃত্ত। সে আরো বললো–

    বাবা আমি আপনাকে নিশ্চিত করে বলতে পারি, সুলতান মাহমুদের মোকাবেলায় বিজয়ী হওয়া আপনার পক্ষে সম্ভব নয়। আপনি কোন অবস্থাতেই তাকে পরাজিত করতে পারবেন না।

    মহারাজ! আমি গযনী সুলতানে চোখের দিকে তাকিয়ে দেখেছি তার চোখে এক যাদুকরী আকর্ষণ ক্ষমতা রয়েছে। তার সেনাবাহিনীর প্রতিটি সদস্য এবং কর্মকর্তা কোন মাটির মানুষ নয়। মনে হয় এরা অন্য কোন ধাতুর তৈরী। তাদের অব্যাহত বিজয় ও সাফল্যের রহস্য শুধু যুদ্ধ পারদর্শিতা নয়। গোটা হিন্দস্তানের কোথাও এমনটি শুনিনি যে, রাধার মতো সুন্দরী শত্রুপক্ষের কোন তরুনীকে নিজের কজায় পেয়েও শত্রুপক্ষ এভাবে অক্ষত অবস্থায় সসম্মানে বাবা মার কোলে পৌঁছে দিতে পারে। সেই সাথে চরমতম শত্রু প্রতিপক্ষের রাজার ছেলেকে বাগে পেয়েও তাকে আটক করে স্বার্থোদ্ধার না করে সসম্মানে বাড়ী পৌঁছে দেয়ার চিন্তা করতে পারে।

    লক্ষণপাল যখন তার বাবা রাজ্যপালকে গযনীবাহিনীর হাতে তার ধরা পরা এবং সুলতানের কাছে নীত হয়ে আবার ফিরে আসার গোটা কাহিনী শোনালো, তা শুনে রাজ্যপালের বিস্ময়ের অবধি রইলো না। এরপর থেকে রাজ্যপালের চিন্তা ভাবনা সম্পূর্ণ বদলে গেলো। তিনি কনৌজের গোটা সোনাদানা দুর্গের বাইরে স্থানান্তরিত করার চিন্তা করলেন।

    যেই চিন্তা সেই কাজ। সেই দিবাগত রাতেই তিনি কনৌজের গোটা সোনাদানা এমনভাবে দুর্গের বাইরে স্থানান্তরের নির্দেশ দিলেন, যাতে এ ব্যাপারটি ঘুণাক্ষরেও কেউ আন্দাজ করতে না পারে।

    রাধা যখন তার ও লক্ষণপালের ধরাপড়া এবং সুলতানের কাছে নীত হয়ে মুক্তি পাওয়ার ঘটনা তার বাবার কাছে বর্ণনা করলো, তখন তার বাবা সেটিকে মোটেও বিশ্বাস করলেন না। রাধার বাবা বরং তার কথাকে পাত্তা না দিয়ে বললেন, রাজপুতেরা অবশ্যই ভগ্নি হত্যার প্রতিশোধ নেবে।

    এদিকে সুলতান মাহমূদ সেনাবাহিনীর একটি অংশকে মথুরায় রেখে বাকী সৈন্যদের কনৌজের দিকে অভিযানের নির্দেশ দিলেন। তিনি মথুরার পাশেই একটি জায়গায় যমুনা নদী পার হলেন এবং নদীর পাড় ধরে মুনাজের দিকে অগ্রসর হলেন।

    এদিকে রাজপুতেরা জীবনমরণ লড়াইয়ের জন্য পূর্ব থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সুলতানকে তার গোয়েন্দারা আগেই জানিয়ে দিয়েছিলো, মুনাজের রাজপুতদের সাথেই তাদেরকে সবচেয়ে কঠিন লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হবে। কারণ, মুনাজের প্রতিটি শিশু ও নারী গযনী যোদ্ধাদের মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleপীর ও পুলিশ – এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    Next Article দামেস্কের কারাগারে – এনায়েতুল্লাহ্ আলতামাশ

    Related Articles

    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস

    পীর ও পুলিশ – এনায়েতুল্লাহ আলতামাস

    July 16, 2025
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস

    প্রেম যুদ্ধ – এনায়েতুল্লাহ আলতামাস

    July 16, 2025
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস

    প্রেম যুদ্ধ – এনায়েতুল্লাহ আলতামাস

    July 16, 2025
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস

    কাল নাগিনী – এনায়েতুল্লাহ আলতামাস

    July 16, 2025
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস

    সিংহশাবক – এনায়েতুল্লাহ আলতামাস

    July 16, 2025
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস

    আরব কন্যার আর্তনাদ – এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ

    July 16, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026
    Our Picks

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026

    ভুতুড়ে ট্রেন – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026

    ব্রাহ্মণ ভূত – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }