Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026

    ভুতুড়ে ট্রেন – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026

    ব্রাহ্মণ ভূত – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    মাহমূদ গজনবীর ভারত অভিযান – এনায়েতুল্লাহ আলতামাস

    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস এক পাতা গল্প1623 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ১.৪ অভিন্ন পথের অভিযাত্রী

    অভিন্ন পথের অভিযাত্রী

    ভোর হল। রাজা জয়পালের সকল যুদ্ধ-সরঞ্জাম জ্বলে পুড়ে ভস্ম হয়ে গেল। দেড় মাইল এলাকা জুড়ে শুধু ছাই-ভস্ম আর আগুনের কুণ্ডলী। তখনও মানুষ বেঁচে যাওয়া পণ্যসামগ্রী রক্ষায় সচেষ্ট। এদিকে মুসলমান পাড়ায় শুরু হয়েছে হিন্দুদের সন্ত্রাস। মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ আর লুটতরাজ চলছে। বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করা হচ্ছে। মুসলিম নারী-পুরুষদের টেনে হেচড়ে ঘর থেকে বের করে দেয়া হচ্ছে। মহিলাদের গায়ের অলংকার কেড়ে নেয়া হচ্ছে। রাজা জয়পাল নিজেই এই নির্দেশ দিয়েছে। রাজা বলেছে, মুসলমানদের ঘরে যা পাও হাতিয়ে নাও এবং সরকারের কোষাগারে জমা কর।

    রাতে ইমরান ও তার সাথীরা পণ্ডিতের কাছ থেকে ঋষিকে ছিনিয়ে নেয়ার পর ব্যর্থ পণ্ডিত শহরের দিকে রওয়ানা হলো। শহর জ্বলছে কিন্তু সে বিষয়ে পণ্ডিতের মনে বিন্দুমাত্র ভাবনা নেই। সে সোজা মন্দিরে প্রবেশ করলো এবং একটু পরই কিছুসংখ্যক লোক নিয়ে বেরিয়ে এলো। শহরের সকল মানুষ আগুনের পাশে এসে জড়ো হয়েছে। ছেলে-বুড়ো, প্রৌঢ়-যুবা, যুবতী কিশোরী কেউ বাকি নেই। পণ্ডিত ও তার সাঙ্গ-পাঙ্গরা এই দুরবস্থার মধ্যেও খুঁটে খুঁটে দেখছিল মেয়েদের। কারণ, ঋষির শূন্যতা তাকে পূরণ করতেই হবে। হঠাৎ একটি চেহারায় দৃষ্টি আটকে গেল পণ্ডিতের। একটি কিশোরীর প্রতি ইঙ্গিত করে দূরে সরে গেল।

    একটু পরই দেখা গেল, কয়েকটি ঘোড়ার গাড়ি এসে হাজির। মন্দিরে বিশেষ গাড়ির আগমনে সসম্মানে মেয়েরা এদিক ওদিক সরে গেল। পণ্ডিতের এক লোক ঐ কিশোরীকে ধরে ফেলল, অপর একজন মেয়েটির নাকের ওপর একটি রুমাল রেখে তাকে টেনে-হেঁচড়ে গাড়িতে তুলল। অবস্থার আকস্মিকতায় ব্যাপারটি কেউ তেমন আন্দাজ করতে পারল না। পণ্ডিতের ঈশারায় দ্রুত মেয়েটিকে নিয়ে গাড়ি পৌঁছে গেল মন্দিরে। বেলা বাড়ার আগেই তাকে টিলার মন্দিরে পৌঁছে দেয়া হল। যে টিলায় আটকে রাখা হয়েছিল ঋষিকে। কিন্তু মেয়েটি চেতনানাশক পদার্থের প্রভাবে তখনও হুশ ফিরে পায়নি।

    পৌত্তলিকতাকে কখনো ধর্ম বলা যায় না। আজও বিবেকবান মানুষের কাছে তা কখনো ধর্ম নয়। অলীক কল্পনা, রেওয়াজ-রসম, মনুষ্য সৃষ্ট আনুষ্ঠানিকতা ও গোড়ামীর সমন্বিত রূপ পৌত্তলিকতা। কোনো উর্বর মস্তিষ্কের মতলববাজ এই অমানবিক কর্মগুলোকে ধর্ম হিসাবে আখ্যা দিয়ে বিশাল জনগোষ্ঠীকে বিভ্রান্তির শিকারে পরিণত করেছে। পৌত্তলিকতাবাদে আল্লাহর পবিত্র সত্তার অনুভব অসম্ভব। কথিত এ মতবাদে নিরীহ অসহায় মেয়ে এবং শিশুদের অত্যাচার উৎপীড়ন করা হয়, বিনা অপরাধে এদের হত্যা করা হয়; ধোকা, প্রতারণা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ পৌত্তলিক ধর্মের মূল ভিত্তি। পৌত্তলিক ধর্মের পণ্ডিতেরা এসব অমানবিক ও অলীক অপকর্মগুলোকে ধর্মীয় বিধান বলে সমাজে চালু করেছে আর ভক্তেরা এগুলোকেই মেনে নিয়েছে ধর্মীয় বিধান হিসেবে। এরা আল্লাহ্ তাআলার অসংখ্য মূর্তি বানিয়েছে এবং প্রতিটি বড় বড় সৃষ্টির পূজা করছে ও অসংখ্য দেব-দেবীকে একেকটা মহান সৃষ্টি এবং শক্তির অধিকারী বলে প্রচার করছে। এখনও পর্যন্ত এদের মধ্যে দেখা যায়, চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-তারা, সাপ-বিচ্ছ, পাহাড়-পর্বত, পশু-পাখি ইত্যাদির পূজা করতে।

    গজনীর শার্দুল-গোয়েন্দারা যে দক্ষতায় রাজা জয়পালের যুদ্ধ সামগ্রীতে আগুন ধরিয়ে দিল জয়পালের বাহিনী তাদের বিন্দু বিসর্গও আঁচ করতে পারলো না। জয়পাল উল্টো ভাবলো, কিশোরী বলীদানে বিলম্বের কারণে দেবতা অসন্তুষ্ট হয়ে সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে। অবশ্য সে একথাও বলেছিল, অসম্ভব নয় যে, এটা সুলতান মাহমুদের গোয়েন্দারা করেছে। কিন্তু এ অগ্নিকাণ্ড ‘দেবতার-রোষ না প্রতিপক্ষ গোয়েন্দাদের কাজ রাজা সে ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছিল না। হতাশা ও ব্যর্থতায় নিমজ্জিত রাজা ক্ষুব্ধকণ্ঠে সেনাপতিকে বলল, “পণ্ডিতকে ডাক। দেবতা চরম রুষ্ট হয়েছে। একটির বদলে দুটি মেয়েকে বলী দিতে হবে, তাড়াতাড়ি।” রাজা চেঁচিয়ে উড্রান্তের মতো বলছিল, “মুসলমানদের সব ঘর জ্বালিয়ে দাও। এদের সবকিছু লুটে নাও। আর সকল মুসলমান মেয়েকে ধরে এনে আমার সামনে হাজির করো।”

    সত্যিকার যারা আগুন লাগিয়েছিল এরা ছিল দুর্ধর্ষ, দুঃসাহসী, দূরদর্শী। জয়পালের দেবতাদের শাসন এদের উপর অচল। জয়পাল যখন অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত নিয়ে ভাবছে আর হতাশা ও মর্ম-যাতনায় ভুগছে ইত্যবসরে গোয়েন্দারা তার নাগালের বাইরে চলে গেছে।

    মুহূর্তের মধ্যে কয়েকশ মুসলমান নারী শিশুকে ধরে এনে রাজার সামনে। হাজির করা হলো। এদের অধিকাংশই ছিল সম্ভ্রান্ত মুসলিম ঘরের নারী ও শিশু। বলপূর্বক এদেরকে নিজেদের হেরেম থেকে ধরে আনা হয়। রাজা চোখ বড় বড় করে অগ্নি দৃষ্টিতে মুসলিম নারী-যুবতীদের দেখছিল। রাজার এই দৃষ্টিতে যেমন ছিল রোষ তেমনি ছিল পাশবিক উন্মত্ততা।

    মুসলিম নারীদের মধ্য থেকে একদল সুন্দরী যুবতী-কিশোরীকে রাজার সাঙ্গ-পাঙ্গরা অন্যদের ডিঙ্গিয়ে রাজার সামনে নিয়ে গেল। রাজা এদের দেখে বলল, “তোমাদের সৌভাগ্য যে তোমরা সবাই সুন্দরী। অন্যথায় তোমাদের সাথে এমন ব্যবহার করা হত, জীবনের জন্য তোমাদের জাতি একটা শিক্ষা পেত। এখন থেকে তোমরা রাজ মহলে থাকবে। তোমাদের ধর্মকে ভুলে যেতে হবে। যেদিন তোমাদের লোকেরা এসে বলবে, অগ্নিকাণ্ড কারা ঘটিয়েছে সেদিন তোমাদের ছেড়ে দেয়া হবে।” একথা বলে পৈশাচিক হাসি হাসল রাজা।

    “তোমাদের ধর্মের মতো আমাদের ধর্ম এমন ঠুনকো নয় যে, তোমাদের কথায় ভুলে যাব।” ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল এক কিশোরী।

    “এই মেয়ে! বকবকানি বন্ধ কর।” গর্জে উঠল এক মন্ত্রী। “জান, কার দরবারে তোমরা দাঁড়িয়ে কথা বলছ?”

    “তোমাদের মহারাজ আমাদের খোদা নয়।” বলল অন্য এক কিশোরী। “অসহায়, নিরপরাধ মেয়েদের উপর যে রাজা হাত উঠাতে পারে তাকে কোন মুসলিম নারী সম্মান করতে পারে না। মহারাজা! তুমি মনে রেখো, তোমার যাবতীয় জুলুম-অত্যাচার আমরা হাসি মুখেই বরণ করব। কিন্তু তোমার পরিণতি হবে ভয়াবহ। তোমাকে মৃত নয় জীবন্ত জ্বলতে হবে। তোমার কোন দেবতাই তোমাকে রক্ষা করতে পারবে না। ইতোমধ্যে তুমি দু’বার পরাজিত হয়েছে। একটি নয় হাজার কিশোরীকে দেবীর চরণে বলীদান করলেও তোমার পরাজয় বিজয়ে রূপান্তরিত হবে না। পরাজয় তোমার বিধিলিপি। তুমি আমাদের শাস্তি দিলে এরচেয়ে শতগুণ বেশি কঠিন শাস্তি তোমাকে আমাদের প্রভু দেবেন।”

    “এদের নিয়ে যাও।” নির্দেশ করল রাজা। সৈনিকেরা টেনে-হেঁচড়ে মুসলিম মেয়েদেরকে বন্দিশালায় নিয়ে গেল।

    * * *

    সুলতান মাহমূদ খোরাসান ও বোখারাকে নিজের শাসনে নিয়ে এলেন। কিন্তু গৃহযুদ্ধ বন্ধ করা সম্ভব হলো না। সে সময় বাগদাদের খেলাফতে আসীন হন কাদের বিল্লাহ আব্বাসী। ইসলামী নীতি অনুযায়ী সকল ছোট বড় রাষ্ট্র ও রাজ্য বাগদাদ খেলাফতের অধীনস্থ। সকল রাজ্য ও রাষ্ট্রপ্রধান কেন্দ্রীয় খেলাফতের ফরমান মানতে বাধ্য। কিন্তু কেন্দ্রীয় শাসকদের দুর্নীতি, আদর্শচ্যুতি এবং আঞ্চলিক শাসকদের ভোগ-বিলাসিতা ও ক্ষমতালিপ্সা খেলাফতের মধ্যে ভাঙ্গন সৃষ্টি করে এবং শাসকদের মাঝে সৃষ্টি করে পারস্পরিক বিদ্বেষ। তখন শুধু বাগদাদ খেলাফত প্রতীকী কেন্দ্ররূপে বেঁচে আছে। তবুও সুলতান সুবক্তগীন কেন্দ্রীয় খেলাফতের সাথে সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন। সুলতান মাহমুদও খেলাফতের প্রতি আনুগত্য বহাল রাখলেন। বুখারা ও খোরাসানকে গজনী শাসনের অন্তর্ভুক্ত করে সুলতান মাহমূদ কেন্দ্রীয় খলিফাঁকে লিখলেন–“আমার এলাকার মুসলমানরা গৃহযুদ্ধে যে বিপদগ্রস্ত হয়েছে সে বিপর্যয় এখনো কাটেনি। ইতিমধ্যে প্রতিবেশী ক্ষমতালিন্দুদের বিরুদ্ধে আমাকে অভ্যন্তরীণ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হয়েছে। এরা আমাদের ভূখণ্ড টুকরো টুকরো করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল আর নিজেদেরকে স্বাধীন সুলতান হিসেবে ঘোষণা করছিল। আমি তাদের কাছে বহুবার মৈত্রী ও সন্ধি প্রস্তাব পাঠিয়েছি, অমুসলিমদের ক্রীড়নক হয়ে মুসলিম জাতি নাশ থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করেছি কিন্তু আমার শান্তিপ্রস্তাব ও উদারতাকে তারা হীনমন্যতা ও দুর্বলতা মনে করেছে। এরা পরিস্থিতি এতই বিপদাপন্ন করে তুলেছিল যে, এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আমরা আপনার অনুমোদন গ্রহণ করার সুযোগও পাইনি। তাৎক্ষণিকভাবে আমাকে প্রতিরোধ-ব্যবস্থা করতে হয়েছে। দৃশ্যত আপনাকে সুসংবাদ দিচ্ছি যে, বোখারা ও খোরাসান বিদ্রোহী ও গাদ্দারদের থেকে ছিনিয়ে এনে আমি তা গজনী শাসনের অন্তর্ভুক্ত করেছি। অবশ্য একে আমি সুসংবাদ ও সাফল্য মনে করি না। মূলত এটা একটা জাতীয় দুর্ঘটনা যে, আমরা অভ্যন্তরীণ গোলযোগ ও ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে লিপ্ত। যে সমষ্টিগত শক্তি ইসলামের সুরক্ষা এবং অগ্রগতির জন্য ব্যয় করার কথা ছিল, যে শক্তি ইসলামের সীমানাকে বিস্তৃত করার জন্য ব্যয়িত হওয়া উচিত ছিল সেই অপরিমেয় সম্ভাবনাকে আমরা অভ্যন্তরীণ হানাহানিতে অপব্যয় করেছি…।

    আমি ময়দানের লোক। আমার মনে হয়, আমার জীবন রণাঙ্গনে কেটে যাবে। আমার লাশ হয়ত কোন যুদ্ধক্ষেত্রে পড়ে থাকবে। আমার ভয় হয় ভ্রাতৃঘাতী লড়াইয়ে যেন আমি নিহত না হই। এমন লড়াই সংঘাতে আমার মৃত্যু হলে আল্লাহর কাছে আমি কি জবাব দেব? আমি আমার রাজত্বের পরিধি বৃদ্ধি করতে চাই না, আমি চাই ইসলামের বিস্তৃতি। রাজমুকুট মাথায় পরে রাজা হয়ে সিংহাসনে বসার অবকাশ আমি কখন পাব! হিন্দুস্তানের অসংখ্য দেব-দেবী আমাকে তিরস্কার করছে। রাজা জয়পাল হিন্দুস্তানের সকল রাজাকে নিয়ে আমার বিরুদ্ধে সম্রায়োজন করছে। আমি যখন ওদের দিকে অগ্রসর হই তখন আমার মুসলমান ভাইয়েরা পিছন থেকে আমার পিঠে ছুরি মারে। আমার প্রতিপক্ষ হিসেবে আমার ভাই ও মুসলিমরা অভিন্ন শত্রুতে পরিণত হয়েছে…।

    আপনি কি ঘোরী, তিবরিস্তানী, সামানী ও এলিখানীদের বলতে পারেন যে, আমরা সবাই একই নবীর উম্মত? এদেরকে কি একথা শুনানো সম্ভব যে, ছোট ছোট রাজ্যগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে বিধর্মীদের মোকাবেলায় টিকে থাকা সম্ভব নয়…?

    এখানে অভ্যন্তরীণ গোলযোগ এখনো বিদ্যমান। জনাবের দু’আ ও সহযোগিতা আমার একান্ত কাম্য। গজনী সালতানাতের অর্থনৈতিক অবস্থাও ভাল নয়। আমি জানি, আমাকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা করা আপনার পক্ষেও অসম্ভব। আমি তা প্রত্যাশাও করি না। আপনি আমার জন্য দু’আ করুন, আল্লাহ পাক যেন আমাকে সহযোগিতা করেন।

    আপনার গুণমুগ্ধ
    মাহমূদ
    খাদেম
    “গজনী সালতানাত”

    সুলতান মাহমূদের পত্রের জবাবে বাগদাদের খলিফা কাদের বিল্লাহ আব্বাসী লিখলেন…

    “আপনার চিঠি পাঠান্তে দুঃখ বোধ করছি। কিন্তু আশ্চর্যান্বিত হইনি। অবশ্যই ব্যাপারটা মোটেও নতুন নয়। আমাদের শাসকদের মধ্যে ক্ষমতার নেশা মিল্লাতের ঐক্যকে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে। আজ যারা পারস্পরিক জিঘাংসায় লিপ্ত এরা ইসলাম ও মুসলমানের অমিত সম্ভাবনাকে নিজেদের হীন স্বার্থে অপাত্রে ব্যবহার করছে। আপন ভাইকে নিশ্চিহ্ন করতে এরা ইহুদী ও খৃস্টানদের সাথে মৈত্রী গড়ে তুলেছে। উম্মতে মোহাম্মদীকে নিজেদের দাস ও প্রজা বানিয়ে রাখার জন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে কেন্দ্রীয় খেলাফতের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিদের শাসনের বিরুদ্ধে অপবাদ ও মিথ্যা প্রপাগান্ডা • ছড়িয়ে গৃহযুদ্ধকে উস্কে দিচ্ছে। এটা এখন মুসলিম শাসকদের প্রধান কাজে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন থেকে আমাদের শাসকদের মধ্যে চলছে এই অপপ্রয়াস। নেতৃস্থানীয় মুসলিম ব্যক্তিবর্গ ক্ষমতার মোহে উম্মাহকে ছোট ছোট অঞ্চলে বিভক্ত করছে। আর এক অঞ্চলের মুসলমানদেরকে অপর অঞ্চলের মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলছে। ফলে খেলাফতের মানচিত্র শত ভগ্নাংশে পরিণত হয়েছে। আর এরই সুযোগ নিচ্ছে বিধর্মীরা। বিধর্মীরা আমাদের জ্বলন্ত আগুনে জ্বালানী ঢালছে। আর মুসলিম খেলাফতকে ভেঙ্গেচুরে বিনাশ করছে…।

    আমাদের শাসকবর্গ মোটেও বুঝতে চাচ্ছেন না, আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা ভেঙ্গে গেলে প্রতিটি অংশই বিধর্মীদের সহজ শিকারে পরিণত হবে। কাণ্ড থেকে শাখা ভেঙ্গে গেলে যেমন শুকিয়ে মরে যায়, তেমনি কেন্দ্রীয় খেলাফত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া মুসলিম রাজ্যগুলোও অল্পদিনের মধ্যে ইসলামী চেতনা হারিয়ে বিলীন হয়ে যাবে। এভাবে যদি একের পর এক শাখা ভাঙ্গতে থাকে তাহলে এক সময় মুসলিম খেলাফতের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়বে …।

    গৃহযুদ্ধকে সম্পূর্ণ নিঃশেষ করে দেয়ার জন্য যদি আপনাকে চূড়ান্ত যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয় সেজন্য আপনাকে অনুমতি দিচ্ছি। তবে আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে, ক্ষমতার মোহে যেন যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়েন। আপনি বিচ্ছিন্নতাপ্রবণ। জনগোষ্ঠীগুলোকে একত্র করুন। তাদেরকে ঐক্য-মৈত্রীর বাঁধনে আনতে চেষ্টা করুন। হিন্দুস্তানে মুসলমানরা দুর্বিষহ জীবন যাপন করছে। কতিপয় শাসক হিন্দু, রাজাদের ভয়ে এবং নিজেদের ভোগ ও বিলাসিতার উপকরণ আমদানী অক্ষুণ্ণ রাখার হীন স্বার্থে ইসলামী আদর্শ থেকে বিচ্ছিন্ন। আমি মনে করি, এদেরকে দমন করে হিন্দুস্তানের নির্যাতিত মুসলমানদের সাহায্যে এগিয়ে যাওয়া আপনার দায়িত্ব। তাদের ঈমান ও ইজ্জতের সুরক্ষা করা আপনার কর্তব্য। অনৈতিকতার আচ্ছা হিন্দুস্তানের দেব-মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে সেখানে ইসলামের ভিত্তি স্থাপন করা আপনারই কাজ…।

    যদি আপনার দৃষ্টি পরিচ্ছন্ন থাকে, আপনার উদ্দেশ্যে যদি কোন কলুষতা না থাকে, আল্লাহর পথে জিহাদই যদি হয় আপনার লক্ষ্য, তাহলে অবশ্যই আল্লাহর সাহায্য আপনার পদচুম্বন করবে। ক্ষমতার মোহে এবং জাগতিক স্বার্থে যারা যুদ্ধ করে দৃশ্যত বিজয়ী হলেও এ সফলতা ক্ষণিকের। স্থায়ী সাফল্য তারাই লাভ করে যারা সত্যের পথিক ও ন্যায়ের পথে চলে।”

    বাগদাদের খলিফা এই চিঠিতেই সুলতান মাহমুদকে খোরাসান, বোখারা, আফগানিস্তানসহ বিশাল ভূখণ্ডের সুলতান ঘোষণা করেন এবং তাকে ইয়ামীনুদ্দৌলা’ এবং ‘আমিনুলমিল্লাত’ অভিধায় অভিষিক্ত করেন।

    প্রখ্যাত ঐতিহাসিক মুহাম্মদ কাসেম ফেরেশতা লেখেন, রাজা জয়পালের দ্বিতীয় আক্রমণ প্রতিহত করতে এবং গৃহযুদ্ধ অবদমনে সুলতান মাহমুদের সেনাবাহিনী, জনবল ও অস্ত্রবল একেবারেই পর্যুদস্ত হয়ে পড়েছিল। ঐতিহাসিক আবু নসর মুসকাতি এবং আবুল ফজলের রচনা থেকে বোঝা যায় যে, সেই সময়ে সুলতান মাহমূদের অধীনে যে পরিমাণ দক্ষ সৈনিক, যুদ্ধ সরঞ্জাম এবং অভিজ্ঞ আলেম-উলামা ছিলেন এবং তার প্রশাসনে যে পরিমাণে অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মী বাহিনী ছিল সমকালীন কোন শাসকের এমনটি ছিল না। কিন্তু অভিজ্ঞ ও দক্ষ এসব লোকদের পারিতোষিক হিসাবে সুলতান মাহমূদকে মোটা অঙ্কের খরচ বহন করতে হতো। তিনি তার প্রতিবেশী গোলযোগপূর্ণ রাষ্ট্র এবং পৌত্তলিক ভারতের আনাচে কানাচে গোয়েন্দা বাহিনীকে যেভাবে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন এর পেছনেও তাকে বিপুল খরচ বহন করতে হতো। বস্তুত এসব কারণেই অর্থনৈতিক দুরবস্থার মুখোমুখি হয়ে পড়েন সুলতান মাহমূদ! এমন পরিস্থিতিতে প্রতিবেশী মুসলিম শাসকরা সুলতান মাহমূদের বিরুদ্ধে ঐক্য গড়ে তুলল আর অপরদিকে জয়পালের নেতৃত্বে হিন্দু রাজারা গজনী আক্রমণের প্রস্তুতি নিল। একদিকে অর্থনৈতিক টানাপোড়েন অপরদিকে অভ্যন্তরীণ ও বহিঃশত্রুর মোকাবেলায় সেনাশক্তির ঘাটতি। যারা ছিল তার মূল শক্তি এরাই হয়ে গেল প্রতিপক্ষ।

    সুলতান মাহমূদের অবস্থা যখন চতুর্মুখী আগ্রাসন ও অর্থনৈতিক দৈন্যতায় বিপর্যস্ত, সুলতানের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে আচ্ছন্ন, ঠিক এই মুহূর্তে আঁধার ভেদ করে দেখা দিল আলোর আভা …।

    চতুর্দিক থেকে গোয়েন্দা পরিবেশিত দুঃসংবাদের ঘনঘটা। রাজা জয়পাল আক্রমণ শানাচ্ছে। আমীর শ্রেণীর মধ্যে বিদ্রোহ শুরু হয়েছে। গভীর দুশ্চিন্তায় তলিয়ে গেলেন সুলতান। নিজের আসনে বসে উদাস মনে উপরের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। ইত্যবসরে প্রহরী এসে খবর দিল, দু’জন আগন্তুক সুলতানের সাথে জরুরী সাক্ষাৎ করতে চায়। এরা চিস্তানের বাসিন্দা। সুলতান তাদেরকে হাজির করতে বললেন। তারা এল। সুলতান তাদেরকে অভিনন্দন জানিয়ে কাছে ডাকলেন এবং আসার উদ্দেশ্য জানতে চাইলেন। তারা বলল, আমরা চিস্তানের বাসিন্দা। আমাদের গ্রামে সুপেয় পানির অভাব। অনেক দূর থেকে আমাদেরকে খাবার পানি বহন করতে হয়। গ্রামের সবাই মিলে আমরা একটি কূপ খননের জন্য কাজ শুরু করেছিলাম। আমাদের ধারণা মতে পানি খুব বেশি গভীরে থাকার কথা নয় এবং জমিনও খুব বেশি শক্ত হওয়ার কথা নয়। কিন্তু মাত্র তিন হাত খননের পরই আর খনন করা সম্ভব হচ্ছিল না। পাথরের চেয়েও শক্ত মাটি দেখা গেল। খোরাসান ও চিস্তানের মহামান্য সুলতান! জমিন শক্ত ও পাথুরে হওয়াতে কোন সমস্যা ছিল না। আমরা তবুও খননকার্য অব্যাহত রাখতাম। কিন্তু তিন ফুট গভীরেই এমন মাটি দেখা দিল যে, আমাদের কোদাল, শাবল কোন কাজ করছিল না। আমরা জোরে আঘাত করলে মাটি থেকে আগুনের ফুলিঙ্গ বিচ্ছুরিত হয়, কোদাল ভেঙ্গে যায়। কিন্তু পাথর ভাঙ্গে না। এটা নিছক পাথর নয়। পাথরের রঙ এমন নয়। আমাদের বিশ্বাস, এটা কোন মূল্যবান ধাতু হবে। অনেকেই বলাবলি করছে, আগেকার কোন রাজা-বাদশাহর গচ্ছিত ধন-সম্পদ এগুলো। যারা এই সমস্ত ধন-সম্পদ গচ্ছিত রেখেছে তাদের প্রেতাত্মা ও জিনদের বসবাস এখানে। গ্রামের মানুষ এসব বলাবলি করে খুব ভীতু হয়ে পড়েছে। ভয়ে কেউ ওদিক মাড়াতে চায় না। একজন বুযুর্গ ব্যক্তি আমাদের পরামর্শ দিয়েছেন সুলতানের কাছে এই খবর পৌঁছাতে। কারণ, যদি গচ্ছিত ধন-সম্পদ হয়ে থাকে তাহলে এগুলো উন্মুক্ত পড়ে রয়েছে। হেফাযত করা দরকার। আর কোন দামী ধাতু হলেও বিষয়টা সুলতানের নজরে থাকা উচিত।

    সুলতান মাহমূদ তাদের কথা শুনে ভূমি সম্পর্কে কয়েকজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি এবং কয়েকজন কমান্ডারের সাথে কিছুসংখ্যক সৈন্য দিয়ে কথিত এলাকা পরিদর্শনের জন্য পাঠিয়ে দিলেন এবং বললেন, জিন-ভূত এসব কিছুই না। আপনারা ওখানে গিয়ে আরো খনন কার্য চালিয়ে ব্যাপারটি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে আমাকে অবহিত করুন।

    কয়েকদিন পর সুলতান মাহমূদকে খবর দেয়া হল, এটি কোন গুপ্তধন নয়, এটি স্বর্ণের খনি। ভূমি থেকে মাত্র চার-পাঁচ হাত গভীরে স্বর্ণস্তর। খনন করার পর বিরাট এলাকা জুড়ে স্বর্ণখনি দেখা গেল।

    ঐতিহাসিক গারদেজী ও কাসেম ফেরেশতার মতে, সুলতান মাহমুদের শাসনামলেই ওই খনি থেকে স্বর্ণ উত্তোলন শুরু হয়। কিন্তু সুলতান মাহমুদের ইন্তেকালের পরে তার ছেলে মাসুদ যখন ক্ষমতায় আসীন হন তিনি পিতার নীতি আদর্শের পরিপন্থী কার্যক্রম শুরু করেন। তিনি নিজেকে ভারতের হিন্দু রাজাদের মতো সুলতানের পরিবর্তে রাজা ঘোষণা করেন, আরাম-আয়েশ ও ভোগ-বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে দেন। উত্তোলিত স্বর্ণখনির আয় অনৈসলামিক কর্ম, বিনোদন, সাজসজ্জা, মিনাবাজার প্রতিষ্ঠা ও খেল-তামাশায় ব্যয় করতে থাকেন। তখন এক রাতের প্রচণ্ড ভূমিকম্পে স্বর্ণখনি মাটির গভীরে হারিয়ে গেল। পরবর্তীতে বহু খনন করেও মাসুদ আর স্বর্ণখনির অস্তিত্ব খুঁজে পেলেন না।

    স্বর্ণখনি আবিষ্কৃত হবার পর মাহমূদ যখন দেখলেন, প্রকৃত পক্ষে এটি খাঁটি স্বর্ণ খনি তখন তিনি তার পীর ও মুর্শিদ আবুল হাসান খেরকানির দরবারে হাজির হলেন এবং বললেন, “আমার আব্ব জীবদ্দশায় এই স্বর্ণখনিটিকে স্বপ্নে দেখেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমি একদিন স্বপ্নে দেখলাম, একটি স্বর্ণের গাছ আমার ঘরের ছাদ ফুড়ে উপরের দিকে উঠেছে এবং এর ডালপালা অর্ধেক দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে।

    …এরপর আমার জন্ম হলো। অবশ্য এ’স্বপ্নের ব্যাখ্যা এভাবে করা হলো যে, আমার শাসনামলে গজনী সালতানাতের পরিধি বৃদ্ধি পাবে এবং দূরদূরান্ত পর্যন্ত ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়বে। এখন স্বর্ণখনি যা আবিষ্কৃত হলো সেটির অবস্থানও অনেকটা গাছের মতো। স্বর্ণের স্তর মাটির অল্প গভীরে গাছের ডালপালার মতো ছড়িয়ে রয়েছে। আমার প্রিয় পীর ও মুর্শিদ! আপনি আমাকে মেহেরবানী করে বলুন, এসবের তাৎপর্য কী?”

    “জমিনে এবং আসমানে আমাদের দৃষ্টিসীমার অগোচরে যা রয়েছে এর প্রকৃত কারণ একমাত্র আল্লাহই ভাল জানেন” বললেন, আবুল হাসান খেরকানী। “তুমি মনে মনে যা ধারণা করেছ আল্লাহ্ সেটিও জানেন। তুমি এখনও যা চিন্তা করোনি সে সম্পর্কেও আল্লাহ সম্যক অবগত। তোমার একথা অনুধাবন করা উচিত, আল্লাহ তাআলা সেইসব রাজা-বাদশাহকে এ ধরনের অলৌকিক ইশারা করে থাকেন যারা রাসূলের প্রকৃত উম্মত হয়ে থাকেন। তুমি যদি আল্লাহর রাসূলের প্রেমে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার লক্ষ্যেই জিহাদ করে থাক তাহলে যে সমস্ত লোক মুসলমান হওয়ার পরও ইসলামের প্রতি বৈরী ভাবাপন্ন এবং ক্ষমতা ও রাজত্বের লোভে মানুষের রক্ত ঝরাচ্ছে, অহেতুক খুনোখুনি করছে আর তুমি তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করে এখন অভাবে নিপতিত হয়েছ এবং তুমি শুধু আল্লাহর কাছেই সাহায্য কামনা করছ। আল্লাহ তোমার সাহায্যে এগিয়ে এসেছেন। গাছের আকৃতিতে তোমার অভাব পূরণে’মাটির ভেতর থেকে স্বর্ণখনি উন্মোচন করে দিয়েছেন।

    প্রত্যেক সুলতানেরই উচিত বৃক্ষ সদৃশ হওয়া। বৃক্ষ যেমন নিজে সূর্য-তাপ সহ্য করে মানুষকে ছায়া দেয়, মানুষ বৃক্ষের অঙ্গহানি করেও বৃক্ষের নীচে বসে । আরাম করে। শ্রান্ত-ক্লান্ত মানুষ বুক্ষ ছায়ায় বিশ্রাম নিয়ে আবার প্রাণ চঞ্চল হয়ে। ওঠে। নব উদ্যমে আবার জীবনকর্ম শুরু করে। সুলতানদের ভূমিকাও এরূপ হওয়া উচিত। বৃক্ষ মানুষের রক্ত পান করে না, জমিন থেকে খাদ্য শোষণ করে মানুষের উপকার করে। মানুষকে দেয় কিন্তু মানুষের কিছু নেয় না।… মাহমূদ! নিজেকে এরকম ঘন শাখাবিশিষ্ট বৃক্ষ মনে কর। বৃক্ষের গুণাবলী আত্মস্থ কর। বৃক্ষ যেমন মানুষের উপকার করে, মানুষ থেকে উপকৃত হয় না, মানুষ বৃক্ষ কাটে কিন্তু বৃক্ষ মানুষ কাটে না। বৃক্ষ মানুষের বহুবিধ কাজে লাগে। কেউ গাছ চিরে পালঙ্ক বানায়, কোন গাছ হয় অন্ধের হাতের যষ্টি। কোন গাছ রাজা-বাদশাহদের সিংহাসন তৈরিতে লাগে…।

    “মাহমূদ! যে সুলতান নিজেকে মানুষের শাসক মনে করে, মানুষকে মনে করে তার প্রজা। নিজেকে মনে করে মানুষের অন্নদাতা, বস্ত্রদাতা। বৃক্ষের মত গুণাবলী আত্মস্থ করতে পারে না, তাদের সিংহাসন উল্টে যেতে বেশি সময় লাগে না।

    মাহমূদ! দুটো জিনিস মানুষকে শয়তানে পরিণত করে। একটি সম্পদ অপরটি রাজত্ব বা ক্ষমতা। সেই ব্যক্তিও শয়তানে পরিণত হয়, রাজত্ব বা সম্পদ কোনটি তার নেই কিন্তু এ দু’টোর মোহে সে আচ্ছন্ন। যার মাথায় রাজত্বের মুকুট রাখা হবে, সে যদি আল্লাহর সান্নিধ্যে মাথা নত করতে না পারে তার দ্বারা মানুষের কোন উপকার হয় না। এসব শাসক মানুষের অনুকম্পা ও শ্রদ্ধা পায় না। এসব শাসক মানুষকে মানসিক ও সামাজিক সুখ-স্বস্তি দিতে ব্যর্থ হয়। তারা আল্লাহর কাছে শাস্তিযোগ্য অপরাধী বলে বিবেচিত হবে। যে শাসকদের ভোগ-বিলাসিতার বিপরীতে গণমানুষের দুঃখ-যন্ত্রণা, আহাজারি-ফরিয়াদ; কষ্ট-দুর্ভোগের কান্না রয়েছে তাদের এই দুঃখ-দুর্ভোগগুলোই আখেরাতে সাপ-বিচ্ছু হয়ে এসব অত্যাচারী শাসকদের দংশন করবে…।”

    খেরকানী আরো বলেন, “মাহমূদ! তুমি আল্লাহর সাহায্য চেয়েছ, আল্লাহ্ তোমাকে সাহায্য করেছেন। একটু চিন্তা করে দেখ, তুমি আল্লাহর কোনো নবী-রাসূল নও। আসমান থেকে অবতীর্ণ ফেরেশতাও নও, তবুও আল্লাহ্ তা’আলা জমিনের পেট চিরে স্বর্ণখনি উন্মোচন করে তোমার অর্থনৈতিক প্রয়োজন পূরণে সাহায্য করেছেন। এই স্বর্ণ তোমার নয়, সালতানাতের। এ স্বর্ণের মালিক তুমি নও, দেশ ও জনকল্যাণে তা ব্যয় করতে হবে। তুমি যদি ক্ষমতা ও অহমিকায় আল্লাহ্র এই অনুগ্রহ ও অনুকম্পাকে ভুলে যাও, ভুলে যাও তোমার প্রকৃত দায়িত্ব ও কর্তব্য, বিস্মৃত হও গণমানুষের অধিকার, তাহলে জমিন আবার তার সম্পদ লুকিয়ে ফেলবে। যা আল্লাহ্ দান করেন তা ছিনিয়ে নিতে পারেন। তাঁর অর্থবহ ইঙ্গিতকে অনুধাবন করতে সচেষ্ট হও।”

    স্বীয় পীর ও মুর্শিদ আবুল হাসান খেরকানীর কাছ থেকে দিক-নির্দেশনা গ্রহণ করে সুলতান মাহমূদ সৈন্যবাহিনীকে সুসংগঠিত করতে মনোনিবেশ করলেন। দেশের শাসন ব্যবস্থা সুচারুরূপে পরিচালনা করার জন্য প্রশাসনিক সংস্কার করলেন, তিনি রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে পরিবর্তন আনলেন। সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকায় উন্নতি পরিলক্ষিত হল। তবুও সাধারণ মানুষ তার সেনাবাহিনীতে তরুণ, যুবক ছেলেদের ভর্তি করার জন্য উৎসাহে এগিয়ে আসত। তরুণ যুবকরা সুলতান মাহমুদের সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়াকে আভিজাত্যের পরিচায়ক মনে করত।

    সরকারি ব্যবস্থাপনা ও নতুনভাবে সৈন্যবাহিনী ঢেলে সাজানোর পর মাহমুদ। রাজা জয়পালের গতিবিধি জানার অপেক্ষা করছিলেন। জয়পালের দেশ থেকে কোন সংবাদ পেতে বিলম্ব হওয়ার অর্থ ছিল, জয়পাল হয়ত পরাজয়কে বরণ করে রণে ভঙ্গ দিয়েছে। মাহমূদের এক সেনাপতি বলল, এই সুযোগে আমাদের উচিত ভারত আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়া।

    “জয়পাল দমে যাওয়ার ব্যক্তি নয়। অবশ্যই সে হামলা করবে।” বললেন সুলতান মাহমুদ। “আমি তার মধ্যে এই বিশ্বাস জন্মাতে চাই যে, ভারত আক্রমণের অভিপ্রায় আমার মোটেও নেই। এটা কি ভালো হবে না, সে তার রাজ্য ছেড়ে এসে আমাদের এলাকায় যুদ্ধে লিপ্ত হবে? আমি যদি তার অগ্রাভিযানের খবর সময় মত পাই তাহলে আমাদের ইচ্ছে মতো সুবিধাজনক জায়গায় তাকে যুদ্ধ খেলায় অবতীর্ণ হতে বাধ্য করতে পারব?”

    “এতদিনে তো লাহোর থেকে কোন না কোন খবর পৌঁছে যাওয়া উচিত ছিল। আমাদের লোকেরা গ্রেফতার হয়ে যায়নি তো?” বলল সেনাপতি।

    “আরো কিছুদিন অপেক্ষা করুন, যদি কোন খবর না আসে আমি এদিক থেকে লোক পাঠাব।” বললেন সুলতান মাহমুদ।

    লাহোর থেকে ইমরান, নিজাম, কাসেম বলখী, জগমোহন, ঋষি ও জামিলার দল রওয়ানা হয়ে গিয়েছিল। যে রাতে দুঃসাহসী গজনী কমান্ডোরা জয়পালের যুদ্ধ সামগ্রীতে অগ্নিসংযোগ করেছিল সেই রাতেই ঋষির স্থলে পণ্ডিতেরা অন্য একটি কুমারীকে জোরপূর্বক তুলে টিলার মন্দিরে নিয়ে গিয়েছিল। কিশোরীটি সংজ্ঞাহীন হয়ে যাওয়ার পর যখন সংজ্ঞা ফিরে পেল তখন সবকিছু সে অনুভব করতে পারছিল। প্রকৃত হিন্দু ঘরানার মেয়ে হওয়ার কারণে সে দেবের চরণে নিজেকে বলীদানে উৎসাহ বোধ করছিল। সে নিজে থেকেই বলছিল, ইন্দ্রা দেবীর চরণে আমাকে বলি দিয়ে দাও… মহারাজা জয়পালের কপালে আমার রক্তের তিলক পরিয়ে দাও…। আমার রক্তের ঝলকানিতে শত্রুদের অন্ধ করে দাও।

    এ সত্যি এক তেলেসমাতী কারবার। মেয়েটিকে কেন্দ্র করে তার বয়সী মেয়েরা বৃত্তাকারে অর্ধনগ্ন হয়ে নাচছে আর মেয়েটি বিশেষ এক ধরনের বাজনার তালে তালে মন্ত্রমুগ্ধের মতো নিজে বলী হওয়ার জন্যে অপেক্ষা করছে।

    কুমারীকে বলীদানের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত করার পর রাজা জয়পালকে টিলার মন্দিরে নিয়ে গেল পণ্ডিত। সাধু-সন্ন্যাসীরা রাজাকে সরস্বতি মূর্তির সামনে নিয়ে বসালো। রাজা সরস্বতাঁকে নমস্কার করলো। মন্দিরের কুমারীরা রাজার উপর ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে দিল। পণ্ডিতেরা ভজন গাইল। ঐ কুমারী মেয়েটিকে এভাবে সাজিয়ে রাজার সামনে পেশ করা হল যে, মনে হচ্ছিল মেয়েটি একটি পরী। মেয়েটি দু’হাত প্রসারিত করে রাজার উদ্দেশে বলছিল, ইন্দ্রাদেবীর চরণে আমাকে বলী দিয়ে দাও। রাজার কপালে আমার রক্তের তিলক পরিয়ে দাও।

    কুমারী পণ্ডিতের যাদুর প্রভাবে মাথা পেতে ধরল। এক পণ্ডিত রাজা জয়পালের কোষ থেকে তরবারি বের করল। নাঙ্গা তরবারি রাজার মাথার উপর দিয়ে বার কয়েক ঘুরালো এবং এক কোপে কুমারীর মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল। মন্দিরে ঘন্টা ও শঙ্খধ্বনি বেজে উঠল। সাধু পণ্ডিতেরা ভজন গাইতে শুরু করল। সরস্বতী দেবীর চরণে করজোড়ে মিনতি জানাতে লাগল। প্রধান পণ্ডিত কুমারীর রক্তে আঙ্গুল চুবিয়ে রাজার কপালে তিলক পরিয়ে দিল। রাজা এই দুর্গম টিলার উপরে মন্দিরের এসব আয়োজন প্রত্যক্ষ করার পর তার চেহারা বিজয়ের আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। মনে হল যেন রাজা গজনী জয় করে ফেলেছে। সুলতান মাহমূদ তার কাছে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। প্রফুল্ল চিত্তে মন্দির থেকে বের হয়ে রাজা কড়া নির্দেশ জারী করল, এক সপ্তাহের মধ্যে সমস্ত সৈন্যকে অভিযানের জন্য প্রস্তুত কর। রাজার নির্দেশে তার রাজ্যের সকল প্রজার গৃহ উজাড় হয়ে পড়ল। এর আগে হিন্দু প্রজারা রাজার কোষাগারে অকাতরে তাদের গচ্ছিত সম্পদ অর্পণ করেছিল। সেগুলো ভস্মীভূত হওয়ার পর পুনরায় রাজার অভিলাষ পূরণ করতে গিয়ে কৃষক প্রজাদের ঘরে এতটুকু আহারাদি অবশিষ্ট ছিল যা দিয়ে তারা মাত্র এক সপ্তাহ অতিবাহিত করতে পারে । কেননা, রাজা ও পণ্ডিতেরা হিন্দু প্রজাদের মধ্যে ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষ, মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা এমনভাবে প্রচার করেছিল যে, প্রজাদের মনে মুসলমানদের প্রতি তীব্র আক্রোশ সৃষ্টি হয়েছিল। সকল হিন্দু প্রজা রাজার আগ্রাসী অভিযানে সাহায্য করাকে ধর্মীয় দায়িত্ব বলে বিশ্বাস করত। অবশ্য ইতিপূর্বে হিন্দু গৃহিণী-মহিলারা তাদের সৌখিন অলংকারাদি রাজার কোষাগারে জমা করেছিল। সেগুলো ভস্মীভূত হওয়ার পর এখন তারা তাদের বাকী সম্পদের সিংহভাগ রাজার কোষাগারে অর্পণ করতে বাধ্য হল। অপরদিকে রাজা জয়পাল অন্যান্য হিন্দু রাজা মহারাজাদের দরবারে ধরনা দিয়ে তার যুদ্ধ-ভাণ্ডারকে স্ফীত করতে সম্ভাব্য সব রকম চেষ্টা চালাল। সবার কাছে রাজা শপথ করল, এবার সে আর পরাজিত হয়ে ফিরবে না। যে কোন মূল্যে সে গজনীকে পদানত করবেই।

    * * *

    নিজাম, কাসেম, জগমোহন, ঋষি ও জামিলাকে নিয়ে ইমরানের কাফেলা রাবী নদী পার হয়ে দ্রুত অগ্রসর হতে লাগল। ততক্ষণে তারা লাহোর থেকে বহুদূরে। ইমরান পেশাদার গোয়েন্দা, লাহোরের পথঘাট তার নখদর্পণে। প্রচলিত পথ ছেড়ে অজানা পথে কাফেলাকে নিয়ে চলল ইমরান। ঘন এক বনবীথিতে রাত পোহাল তাদের। ঋষি ঘোড়ার উপরেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। তাকে নামিয়ে আনল ইমরান। সবাইকে বলল, এখানে আমাদের বিশ্রাম নিতে হবে। সারারাত কারো ঘুমানো সম্ভব হয়নি। ঘোড়াগুলোরও বিশ্রাম দরকার। এদেরকে দানাপানি দিতে হবে। পথ আমাদের অনেক দীর্ঘ। তদুপরি আমাদের যেতে হবে লুকিয়ে ছাপিয়ে। সবাই শুয়ে পড়ল এবং অল্পক্ষণের মধ্যে ঘুমের অতলে ডুবে গেল। কিছুক্ষণ পর জামিলা ইমরানকে জাগিয়ে একটু দূরে নিয়ে গেল এবং বলল, “তুমি এই হিন্দু মেয়েটার সাথে আমাকেও নিয়ে এসেছ, আমার ভবিষ্যৎ কি হবে বল?”

    “এ মুহূর্তে আমার সামনে তোমার ভবিষ্যৎ নয়, গজনী সালতানাতের ভবিষ্যতই প্রধান বিষয়।” জবাব দিল ইমরান। গজনী পৌঁছে তোমাদের ব্যাপারে চিন্তা করব। আশা করি পথিমধ্যে এসব বিষয় তুলে আমার কর্তব্য কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করবে না।”

    “আমি বিশ্বাস করতে পারছি না আবার প্রচণ্ড ভয়ও হচ্ছে– তুমি এখন তোমার দেশের জন্য দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত আছে। অথচ তোমাকে পাওয়ার জন্যই আমি তোমাকে সাহায্য করেছি। তোমাকে পাওয়ার জন্য আমি যে অপরাধ করেছিলাম, তোমার নির্দেশ মতোই সেই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত আমি করেছি। কিন্তু এখন আমি দেখছি, ঋষির প্রতি তুমি ঝুঁকে পড়েছ, তুমি আমার থেকে অনেক দূরে সরে যেতে চাচ্ছ। নিজের জন্যেই তো তুমি ঋষিকে নিয়ে যাচ্ছ?”

    “তোমার কি এখনও চিত্তে সুখ আসেনি?” বলল ইমরান। “এখনও কি ঋষি তোমাকে প্রেতাত্মা হয়ে ভয় দেখায়? সেতো এখন সশরীরে তোমার সাথে যাচ্ছে। এখন তো আর তোমার ভয় করার কিছু নেই। অপরাধের বোঝাও নেই তোমার উপর।”

    “আমার সাথে এসব তাত্ত্বিক কথাবার্তা বলল না ইমরান।” জামিলা চোখ বন্ধ করে দৈহিক উত্তেজনায় প্রকম্পিত কণ্ঠে বলল, “আমার শরীর বিক্রিত পণ্যে পরিণত হয়েছে। আমাকে বলা হয়েছে, যদ্দিন এই শরীর আছে ততদিনই জীবন আছে, আছে দাম, আছে মান। আছে তোমার প্রতি মানুষের আগ্রহ।”

    “শোন জামিলা!” ক্ষুকণ্ঠে বলল ইমরান। “তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে, তোমার পথ আর আমার পথ ভিন্ন। তোমার কাছে আজ আমি আসল পরিচয় প্রকাশ করছি। আমি তোমাদের দেশের অধিবাসী নই, আমি গজনী সালতানাতের একজন সৈন্য। ওখানকারই অধিবাসী। আমি গজনী সেনাবাহিনীর এক পদস্থ গোয়েন্দা। আর এরা দু’জন গজনী সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা। বিগত যুদ্ধে এরা গ্রেফতার হয়ে জয়পালের প্রাসাদে অন্তরীণ হয়েছিল। এদের উদ্ধার করা ছিল আমার দায়িত্ব। আর দৈহিক রূপ-লাবণ্যের কাম-কামনায় জ্বলে পুড়ে মরছ তুমি। আমি এসবকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি। এই হিন্দু মেয়েটি ও তার ভাই স্বধর্ম ত্যাগ করেছে, আমি এদেরকে কুফরী থেকে উদ্ধার করার দায়িত্ব আমার কাঁধে তুলে নিয়েছিলাম। শোন জামিলা! তোমার একথা প্রমাণ করতে হবে যে, ইসলাম একটা মর্যাদার ধর্ম। রূপ-রমণের কথাবার্তা এখন বাদ দাও। আমরা এখন শত্রু এলাকা অতিক্রম করছি। মৃত্যু আমাদের তাড়া করছে। নিজের ধর্মের জন্য নিজেকে বিলীন ও কোরবান করার জন্য প্রস্তুত হও।”

    ইমরান আবেগে উদ্বেলিত হয়ে জামিলাকে বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করতে চাচ্ছিল। কিন্তু জামিলা মোটেও ইমরানের কথায় কর্ণপাত করল না। ইমরান কি বোঝাতে চাচ্ছে সেটা মোটেও সে বোঝার চেষ্টা করছে না। দেহ-কামনার অগ্ন্যুৎপাত শুরু হল জামিলার হৃদয়ে। জামিলার ভাবখানা এমন ছিল যে, ইমরান যা বলছে সেগুলো তার পক্ষে মোটেও বোঝা সম্ভবপর নয়। জামিলার মাথায় শুধুই তার ভূত-ভবিষ্যৎ ঘুরপাক খাচ্ছিল। তার কাছে রাজা জয়পালের রাজ্য আর গজনীর সুরক্ষা নস্যি। ইমরানকে কজা করাই মূল কথা । দীর্ঘদিন থেকে জামিলা ইমরানকে একান্তভাবে কাছে পাওয়ার জন্য ফুটন্ত কড়াইয়ের মতো উত্তপ্ত হয়ে আছে। শরীর মন আর দেহের উগ্র চাহিদাকে জামিলার পক্ষে সামাল দেওয়া মুশকিল। এতকিছুর পরও যখন দেখল, ঋষির প্রতি ইমরানের ভীষণ আগ্রহ তখন হিংসার আগুন জামিলাকে আরো বেপরোয়া করে তুলল। ইমরানের কাছ থেকে কাক্ষিত সাড়া না পেয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হল জামিলা। তার মধ্যে আবার জন্ম হল বঞ্চিতের জিঘাংসা।

    জামিলার থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে ঋষির দিকে নিবদ্ধ করল ইমরান। ঋষির কাছে গিয়ে ক্ষীণ স্বরে ডাকলো, ঋষি! ঋষি! ঋষি চোখ খুলে এদিক ওদিক দেখে ইমরানের দিকে অগ্রসর হল। ইমরানের কাছে পৌঁছে ছোট শিশুর মতো দু’হাতে গলা জড়িয়ে ধরল ঋষি। তার গলায় বুকে নিজের গণ্ডদ্বয় ও কপাল ঘষে আহ্লাদ জানাচ্ছিল সে। ইমরান সস্নেহে ঋষির মাথা ধরে তার চোখে চোখ রাখল।

    অদূরে বসে জামিলা সবই দেখছিল। আর আগ্নেয়গিরির লাভার মতো দাউদাউ করে জ্বলছিল।

    ঋষি ইমরানের গলা জড়িয়ে বিস্ময় বিস্ফোরিত নেত্রে ইমরানের কাছে জানতে চাইল, “তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলে? আমরা এখন কোথায়? আমার দাদা কোথায়? দু’টো লোক ওখানে পড়ে রয়েছে, এরা কি জীবিত?” জামিলার দিকে দৃষ্টি পড়তেই ইমরানের গলা ছেড়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল ঋষি, ‘এ মহিলাটি কে? এ তোমার বোন নয়তো? একে কোত্থেকে এনেছ?”

    তুমি সুস্থ হও। সবকিছুই বলব।’ বলল ইমরান। ইমরান ঋষিকে ধরে তার কাছেই বসিয়ে দিল এবং বলল, তোমাকে আমরা পণ্ডিতের কবল থেকে ছিনিয়ে এনেছি।’ দু’হাতে চোখ ডলে ঋষি বলল, হ্যাঁ, কিছুটা মনে পড়ছে। পণ্ডিতরা আমাকে দেবীর চরণে বলী দানের জন্য জোর করে তুলে নিয়েছিল…। আচ্ছা, ওরা এখন কোথায়? আমি কোথায়? আমি কোন স্বপ্ন দেখছি না তো?

    ‘এ মহিলার নাম জামিলা।’ বলল ইমরান। “এ যদি সাহায্য না করত তাহলে পণ্ডিত্বরা তোমাকে যে দুর্গম জায়গায় অন্তরীণ করেছিল ওখান থেকে তোমাকে উদ্ধার করা আমাদের পক্ষে কখনো সম্ভব হতো না।”

    ঋষিকে ইমরান তার অপহরণ হওয়ার ঘটনা বিস্তারিত বলল। ঋষিকে উদ্ধার করতে কিভাবে জামিলা তাকে সহযোগিতা করেছে তাও জানাল। আরো জানাল, জামিলা এক বিত্তশালী বণিকের পালিয়ে আসা স্ত্রী। এছাড়াও ঐ বণিকের আরো দুই স্ত্রী ছিল। তাকে উদ্ধার করতে সহযোগিতা করায় ঋষি জামিলাকে সশ্রদ্ধ দৃষ্টিতে দেখতে লাগল। কিন্তু পরক্ষণেই জামিলার রূপ, সৌন্দর্য ও কমনীয়তা তার মধ্যে জন্ম দিল ঈর্ষা। সে জামিলাকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে দেখতে লাগল।

    ইত্যবসরে নিজাম ও জগমোহন ঘুম থেকে জেগে ঋষিকে খুঁজতে শুরু করল। ঋষি তখন সুস্থ। জাদু ও বিষক্রিয়ার প্রভাব তার মাথায় নেই। টিলার মন্দিরে ঋষির জীবনে কি ঘটেছিল তার একবিন্দুও মনে নেই ঋষির।

    ‘বন্ধুগণ!’ বলল ইমরান। আমাদের সামনে দীর্ঘ সফর এবং বড় ভয়াবহ সেই পথ। সাথে রয়েছে অনেক স্বর্ণমুদ্রা, অলংকারাদি। যে বিজন এলাকা দিয়ে আমরা অতিক্রম করব, না আছে এখানে কোন আহার সগ্রহের ব্যবস্থা না আছে সুপেয় পানি। সাথে যা আছে এগুলোকে অবলম্বন করেই আমাদেরকে পথ চলতে হবে।

    “তুমি আমাকে বলেছিলে, ঋষিকে উদ্ধার করতে পারলে তুমি আর ফিরে যাবে না।” বলল জগমোহন। এ জন্য আমি ঘর থেকে অনেক অলংকারাদি নিয়ে এসেছি। সে কাপড়ের একটি থলে কোমর থেকে খুলে ইমরানের সামনে রাখল এবং বলল, আমাদের ঘরে যত ছিল তা ছাড়াও ঋষির ব্যবহৃত অলংকারাদিও এখানে রয়েছে।”

    জামিলাকে ইমরান বলেছিল, ঋষিকে উদ্ধার করতে পারলে সে আর শহরে ফিরবে না। এজন্য জামিলাও বণিক স্বামীর ঘর থেকে যথাসম্ভব নগদ টাকা-পয়সা, অলংকারাদি সাথে নিয়ে এসেছিল। সফরের রীতি অনুযায়ী ইমরানকেই দলনেতার দায়িত্ব অর্পণ করল নিজাম এবং বলল, এইসব সোনা-দানা, টাকা-পয়সা তোমার দায়িত্বে রাখা হল এবং আমরা গজনী পৌঁছা পর্যন্ত তোমার নির্দেশ মতই সবাই চলব।’ নিজামের সিদ্ধান্ত সবাই সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিল এবং যার কাছে যা ছিল সব ইমরানের কাছে অর্পণ করল । সোনা-দানা ও টাকা-পয়সার পরিমাণ একেবারে কম ছিল না। সবগুলো কোমরে বহন করা ছিল প্রায় অসম্ভব। এজন্য একটা পোটলা বেঁধে ইমরান টাকা-পয়সা ও সোনা-দানা নিজের কাছে রাখলো। ইমরান সফর সঙ্গী সবাইকে এই বলে সতর্ক করল, “আমাদের পথ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। শুধু যে এই সোনাদানাই ডাকাতদের আগ্রহের বস্তু তাই নয়, যে দুটি মেয়ে আমাদের সাথে রয়েছে ডাকাতদের জন্য এরাও খুব লোভনীয়।’

    অতএব ডাকাত, ছিনতাইকারী এবং রাজার গোয়েন্দাদের কাছ থেকে আত্মরক্ষার জন্য রাতে সফর করার সিদ্ধান্ত নিল ইমরান এবং দিনের বেলা লুকিয়ে-ছাপিয়ে সম্ভাব্য নিরাপদ জায়গায় বিশ্রামের মনস্থ করল।

    বেলা ডুবে গেছে। ইমরানের কাফেলা আবার রওয়ানা করল। ইমরানের পিছনে জামিলা আর জগমোহনের পেছনে ঋষি আরোহণ করল। যেতে যেতে কাসেম তার ঘোড়াটাকে পিছনে নিয়ে গেল। কাসেমের অক্ষমতা ছিল, কাসেম নিজের মাতৃভাষা ছাড়া অন্য কোন ভাষা জানত না। নিজামের অবস্থাও ছিল তাই। কিন্তু ইমরান ছিল ভিন্ন। সে হিন্দুস্তানী ভাষা মাতৃভাষার মতই অনর্গল বলতে পারত। ঋষি, জামিলা ও জগমোহনের সাথেও সে অনর্গল কথা বলতে পারত। কাসেমকে পেছনে আসতে দেখে নিজামও পেছনে চলে গেল। তারা পরস্পর কথাবার্তা শুরু করল। দু’জনের মধ্যে আলাপ-আলোচনা একটু গভীর করার লক্ষ্যে তারা ইমরান থেকে একটু দূরত্ব সৃষ্টি করে চলল।

    “আচ্ছা, তুমি কি ইমরানকে বিশ্বাস করতে পার? এই দুইটা সুন্দরী মেয়েকে সে কেন নিয়ে যাচ্ছে?” নিজামকে জিজ্ঞেস করল কাসেম। “তাছাড়া এতগুলো সোনা-দানাও কেন তুমি ওর দায়িত্বে দিয়ে দিলে? তুমি কি জান না টাকা-পয়সা ও সুন্দরী নারী মানুষের ঈমানকে নষ্ট করে দিতে পারে…! টাকা আর নারীর কি যাদুকরী ক্ষমতা…!”

    “ইমরান যদি বিশ্বাসযোগ্য না হতো তাহলে আমাদেরকে উদ্ধার না করেই সে এই হিন্দু মেয়েটিকে নিয়ে পালিয়ে যেতে পারত।” বলল নিজাম। দেখলে তো জামিলাকে সে কত কৌশলে ব্যবহার করেছে? যেহেতু এই মেয়েটি স্বামী বঞ্চিতা, এজন্য সুকৌশলে গজনী সালতানাতের পক্ষে তাকে ব্যবহার করেছে এবং তাকেও দিয়েছে স্বামী নির্যাতন থেকে মুক্তি।

    “এই দুই মেয়ের সাথে গজনী সালতানাতের লাভালাভের কি সম্পর্ক?” বলল কাসেম। “এটা ওর ভোগবাদী মানসিকতা। আর এর খরচ বহন করতে হচ্ছে সরকারি কোষাগার থেকে। তুমি যাই বল, ওর উপর আমার আস্থা নেই। তুমি কি ভেবে দেখেছ, জামিলা বিবাহিতা মেয়ে। স্বামী তালাক না দেয়া পর্যন্ত তার সাথে কারো বিবাহ বৈধ হতে পারে না! তুমি দেখো, জামিলাকে ইমরান রক্ষিতা হিসাবে রাখবে আর এই হিন্দু মেয়েটাকে মুসলমান বানিয়ে সে বিয়ে করবে।”

    “তোমার কথাবার্তায় অবিশ্বাস নয়, হিংসার গন্ধ পাওয়া যায়।” বলল নিজাম। “দোস্ত! এই মেয়েদের উপর থেকে তোমার দৃষ্টি সরিয়ে নাও। তুমি কেন ভুলে গেলে, বন্দিদশা থেকে আমাদেরকে মুক্ত করে ইমরান আমাদের কতটুকু উপকার করেছে? ইমরান আমাদেরকে মুক্ত না করলে ওই কাফেরের বন্দিশালায় আমাদেরকে মরতে হতো। মুজাহিদ যুদ্ধময়দানে শহীদ হওয়ার জন্য জন্ম নেয়। বন্দিশালায় মৃত্যুবরণ করার জন্য নয়। গজনী পৌঁছে আমাদের কর্তব্য হবে আবার সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে হিন্দুস্তানী বেঈমানদের বিরুদ্ধে জেহাদকে বেগবান করা। ইমরান কাকে রক্ষিতা রাখল আর কাকে বিয়ে করল, তাতে আমাদের কি আসে যায়!”

    “আমরা সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন অফিসার, আর ইমরান একজন সাধারণ গোয়েন্দা। আমাদের অধিকার আছে ইমরানের দোষ-ত্রুটি দেখার”। বলল কাসেম।

    “এই ভ্রমণে আমরা ইমরানকে দলনেতা নির্বাচন করেছি”। বলল নিজাম। “সে যদি কোন ভুল করে বা কোন অন্যায় করে তাহলে আমরা তাকে বাধা দিতে পারি। কিন্তু তার ব্যক্তিগত ব্যাপারে আমরা হস্তক্ষেপ করতে পারি না। আমাদের এখন লক্ষ্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নির্বিবাদে গজনীতে পৌঁছা। সুলতানকে অবহিত করা, রাজা জয়পাল গজনী আক্রমণের জন্য তোড়জোর করছে।”

    “তুমি একেবারেই হাবা”। বলল কাসেম। “এই ব্যাটা আমাদেরকে ধোকা দেবে।”

    জামিলা ইমরানের পেছনে আরোহণ করে তার কাঁধে হাত রেখে গায়ে গা মিশিয়ে বসেছে। ঘোড়ার ঝাঁকুনির সাথে সাথে বারবার ইমরানের গায়ে আঁছড়ে পড়ছে জামিলা আর আবেগ ও উত্তেজনাকর কথা বলে ইমরানকে তাতিয়ে তুলতে চাচ্ছে। ইমরান অনুভব করল, জামিলার মধ্যে কামনেশা তীব্র হয়ে উঠছে।

    “এই হিন্দু মেয়েটিকে তোমার কাছে এত ভাল লাগে কেন?” ইমরানকে জিজ্ঞেস করল জামিলা। আচ্ছা বলতো, ও কি আমার চেয়ে বেশি রূপসী?

    “জামিলা! যে কথা আমি তোমাকে বলেছি এর পুনরাবৃত্তি করতে চাই না। আমি তোমাকে বলতে চাই, একজন মুসলিম নারী এবং অমুসলিম নারীর মধ্যে পার্থক্য থাকা উচিত। এ মুহূর্তে কোন মনোদৈহিক বিনোদনে আমার কোন আকর্ষণ নেই। অবশ্য তুমি সুন্দরী, আগুনের শীষের মতো তোমার শরীর। আমার মতো অসংখ্য যুবকের দীন-ধর্ম তুমি জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ভস্ম করে দিতে পার। আমাকেও চাচ্ছ তুমি তোমার রূপের আগুনে জ্বালাতে। কিন্তু তুমি জান না, বৈষয়িক আকর্ষণ আমি অনেক আগেই নিঃশেষ করে দিয়েছি। আমার সাথীরা আমাকে দলনেতা নির্বাচন করেছে। এই সাথীদের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য আমার ব্যক্তিগত সুখ, আরাম-আয়েশ আমি উৎসর্গ করে দিয়েছি। দলনেতা একটি ছোট্ট কাফেলার হোক বা রাষ্ট্রের হোক তার ব্যক্তিগত আকাক্ষা, সুখ-আহাদ প্রাধান্য পেতে পারে না। দলনেতার কাছে শত্রু-মিত্রের সংজ্ঞাও ভিন্ন। দলনেতার দৃষ্টি থাকে তার দল ও জাতির স্বার্থের প্রতি। ব্যক্তি স্বার্থ সেখানে একেবারেই গৌণ।”

    উনি একটা পাথরের মূর্তি! ঝাঁঝাল কণ্ঠে বলল জামিলা। হিন্দুরা নিজ হাতে মূর্তি বানিয়ে এগুলোকে পূজা করে। এসব মূর্তিদের না আছে কোন জীবন, না আছে কোন অনুভূতি। তুমি কি অমন একটা কিছু!’ জামিলার কথায় ইমরান হেসে ফেলল।

    এভাবেই এগিয়ে চলল ইমরানের ছোট্ট কাফেলা। জামিলার মধ্যে হতাশাও বাড়তে লাগল। বঞ্চিত জীবনের যন্ত্রণা জামিলার মধ্যে আরও তীব্রতর হয়ে। উঠল। চলন্ত পর্থে কাসেম ইমরানের কাছ থেকে একটু দূরত্ব সৃষ্টি করে চলতে লাগল। তার দৃষ্টি নিবদ্ধ জামিলার ওপর। জামিলা যখন ওর দিকে তাকাত তখন তার চেহারায় ফুটে উঠত খুশির আভা। এসব নিয়ে ঋষির মধ্যে কোন ভাবান্তর ছিল না। ঋষি ছিল সম্পূর্ণ নিরুদ্বেগ নিশ্চিন্ত। ভবিষ্যৎ নিয়ে জগমোহনের মনেও উঁকি দেয়নি কোন সংশয়, সন্দেহ। এভাবেই তারা প্রায় অর্ধেক রাস্তা চলে এল। একদিন কাসেম, নিজাম ও জামিলাকে সাক্ষী রেখে ঋষি ও জগমোহনকে কালেমা পড়িয়ে মুসলমান করে নিল ইমরান এবং ঋষির নাম দিল রাজিয়া ও জগমোহন ধারণ করলো আব্দুল জব্বার নাম।

    একদিন ইমরানকে নিজের কাম চরিতার্থের জন্য সরাসরি আহ্বান করল জামিলা। কিন্তু তাতেও ইমরানের মধ্যে কোন ভাবান্তর হলো না। জামিলার আহ্বানে সাড়া দিতে পূর্ববৎ উদাসীন রইল ইমরান। তুমি আস্ত একটা পাথর। কামনায় উদ্বেলিত জামিলা ইমরানের পিঠে থাপ্পর দিয়ে বলল, তুমি একটা মাটির পিণ্ড। এমন জানলে কস্মিনকালেও আমি তোমার ফাঁদে পা দিতাম না।’

    ইমরানের ছোট্ট কাফেলা পেশোয়ারের পাহাড়ি অঞ্চল অতিক্রম করছে। এই এলাকা সম্বন্ধে ইমরান ছিল অভিজ্ঞ। এখানে কোথায় কি আছে, কোথায় ঘাস পাওয়া যাবে, কোথায় পাওয়া যাবে সুপেয় পানি–এর সবই ইমরানের জানা। এজন্য পাহাড়ি এলাকায় প্রবেশ করার আগেই একটা গ্রাম থেকে প্রয়োজনীয় পানাহার সামগ্রী সগ্রহ করল ইমরান এবং বলল, বন্ধুরা! তোমাদেরকে আনন্দের সাথে জানাচ্ছি যে, আমরা এখন রাজা জয়পালের সীমানা পেড়িয়ে অনেকটা নিরাপদ এলাকায় এসে পড়েছি। এখানে আমাদের গ্রেপ্তার হওয়ার কোন আশংকা নেই।

    কাফেলা থামিয়ে দিল ইমরান। তখন রাত প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে। দিনের প্রচণ্ড গরমে সবাই ক্লান্ত শ্রান্ত। এলাকাটি অত্যন্ত রুক্ষ। গাছপালা নেই, নেই কোন ছায়াতরু। দিনের বেলায় সূর্যতাপে পাহাড়ের শিলায় আগুন জ্বলতে থাকে। প্রতিটি পাথরকে মনে হয় একেকটা অগ্নিপিণ্ড। ঘোড়াগুলোকে এক পাশে বেঁধে রেখে সবাই আরামের জন্য শুয়ে পড়লো । ইমরান একটু দূরে শুইলো। সবাইকে শুইয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ জেগে রইল ইমরান। ততক্ষণে শুক্লপক্ষের চাঁদ পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। গভীর ঘুমে হারিয়ে গেল ইমরান।

    কিন্তু কাসেমের চোখে ঘুম নেই। তার বুকের ভেতর তীব্র যন্ত্রণা। জামিলার রূপ-সৌন্দর্য তাকে নেশা ধরিয়ে দিয়েছে। সাথীরা সবাই ঘুমে অচেতন। এ সময় দেখল তাকে অতিক্রম করছে একটি ছায়ামূর্তি। ক্ষীণস্বরে মাথা উঁচু করে ডাকল কাসেম, জামিলা! তার ডাকে থেমে গেল ছায়ামূর্তি। আসলেও ছায়াটি ছিল মূর্তিমান জামিলা। মুশকিল হলো, কাসেম জামিলার নাম ছাড়া তার সাথে কথা বলার মতো আর কোন কথাই জানে না। জামিলাও বুঝে না কাসেমের ভাষা। ইশারা ইঙ্গিতে জামিলাকে আহ্বান করল কাসেম। কাসেমের ইঙ্গিতে সাড়া দিল জামিলা । জামিলাকে কাছে বসিয়ে নানা অঙ্গভঙ্গি করে ইমরানের প্রতি তার ঘৃণা জামিলাকে বোঝানোর চেষ্টা করলো। আরো বোঝাতে চেষ্টা করলো, ইমরান সত্যিই ধোকাবাজ, প্রতারক। কাসেম জামিলাকে এই অনুভূতি দিতে চেষ্টা করল, ‘সোনাদানা ও টাকা-পয়সা সে ইমরানের হাতে দিয়ে ভুল করেছে।

    জামিলাকে দুহাতে জড়িয়ে নিল কাসেম। কাসেমের সান্নিধ্য পেয়ে জামিলার হতাশ হৃদয়ে আবেগের বান ডাকল। সেও নিজেকে সপে দিল কাসেমের হাতে। কাসেমের স্পর্শ, সোহাগ ও সান্নিধ্য জামিলার হৃদয় থেকে ইমরানের আকর্ষণ মুহূর্তের মধ্যে বিলীন করে দিল। ইমরানের বিপরীতে কাসেমকেই সে মনে করল ভবিষ্যৎ। কাসেম বলখী জামিলাকে জড়িয়ে ধরে একটু দূরে নিয়ে গেল এবং এক জায়গায় বসিয়ে বিড়ালের মত পা টিপে টিপে ইমরানের দিকে এগুলো। ইমরান তখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। টাকা-পয়সা ও সোনার থলেটি তার পাশে রাখা। কাসেম অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ক্ষিপ্ত পায়ে থলেটি হাতিয়ে নিল এবং দ্রুত জামিলার কাছে ফিরে আসল। সে জামিলাকে থলেটি দিয়ে তাকে টেনে নিয়ে গেল ঘোড়র কাছে। ঘোড়াগুলো এদের থেকে কিছুটা দূরে বাঁধা ছিল। দুটি ৪ ঘোড়ায় গদি এটে একটিতে সওয়ার হলো কাসেম, জামিলাকে ইশারা করলো স্ত্র অন্যটিতে সওয়ার হতে। কিন্তু জামিলা ইঙ্গিতে বোঝাল, সে সওয়ার হতে পারে ৪ না। অগত্যা নিজের সামনেই সওয়ার করাল জামিলাকে, আর অন্য ঘোড়াটির ৩ লাগাম বেঁধে নিল তার ঘোড়ার জিনের সাথে। ধীরে ধীরে চলতে শুরু করলো তারা। কিছুদূর গিয়ে কাসেম এক হাতে জামিলাকে নিজের বুকের সাথে মিলিয়ে নিল এবং ঘোড়াকে তাড়া লাগালো। ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটল ঘোড়া। নিঝুম রাতের নীরবতা ভেঙ্গে অশ্বখুরের আওয়াজ চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লো।

    সবার আগে ইমরানের ঘুম ভেঙ্গে গেল। গভীর রাতে ঘোড়ার আওয়াজ পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল। মনে হতে থাকল খুব কাছেই কেউ ঘোড়া ছুটাচ্ছে। ইমরান চোখে মুখে হাত বুলিয়ে প্রথমেই দেখল থলেটি আছে কি-না। কিন্তু নেই। ধারে কাছে তালাশ করে থলেটির কোন পাত্তা পাওয়া গেল না। ইতোমধ্যে নিজাম ও আব্দুল জব্বারও জেগে উঠল। তারা তাদের ঘোড়ার খোঁজ নিল। কিন্তু দুটি ঘোড়া নেই। এদিকে জামিলা ও কাসেম লাপাত্তা।

    “ওরা বেশিদূর যেতে পারেনি।” ইমরানের উদ্দেশে বলল নিজাম। “চলোলা এদেরকে আমরা পাকড়াও করব এবং নিজ হাতে এদের কতল করব।”

    না, এর দরকার নেই। যে মেয়েটিকে কাসেম নিয়ে গেছে প্রকৃতপক্ষে ও আমাদের কেউ নয়। সোনা-দানা ও টাকা-পয়সা যা নিয়েছে এগুলোও গজনী সালতানাতের সম্পদ নয়। এদেরকে পাকড়াও করা আমাদের দায়িত্বও নয়। বরং এদের পেছনে দৌড়ানো আমাদের কর্তব্য পরিপন্থী…। নিজাম ভাই! আমি তোমাদেরকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করেছিলাম এই জন্য যে, হতে পারত রাজা তোমাদের দুজনকে কজা করার জন্য সুন্দরী কোন ললনা লাগিয়ে দিত। নারী ও টাকা এমনি ভয়ঙ্কর জিনিস, পাথরের মতো কঠিন হৃদয়ের মানুষকেও মোমের মত জ্বালিয়ে গলিয়ে দিতে পারে। এমনটা হলে তোমরা ভুলে যেতে তোমাদের দায়িত্ব, তোমাদের জাতিত্ব, ধর্ম, নীতি, আদর্শ। ভোগ-ঐশ্বর্যের কাছে জলাঞ্জলী দিতে ঈমান, আমল। হিন্দু রাজার ক্রীড়নক হয়ে গজনী সালতানাতের জন্য মহাবিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে তোমরা।

    ধীরে ধীরে ঘোড়ার আওয়াজ ইথারে মিলিয়ে গেল। “আমার ঘুম চলে গেছে, চল আমরা অগ্রসর হতে থাকি।” বলল নিজাম।

    একটি ঘোড়ার উপর ঋষিকে এবং অন্য গোড়ার উপর জগমোহনকে সওয়ার করে ইমরান ও নিজাম দু’জনে ঘোড়ার লাগাম টেনে হেঁটে চলল। সিদ্ধান্ত নিল, তারা পর্যায়ক্রমে সওয়ার হবে।

    “ও হয়তো জামিলাকে জোর করে নিয়ে গেছে।” বলল ঋষি।

    “না, জামিলাকে জোর করে নিয়ে যাওয়ার দরকার হয়নি। বরঞ্চ বলতে পার, জামিলাই কাসেমকে নিয়ে গেছে। যাই হোক, আপদ চলে গিয়ে ভাল হয়েছে।”

    রাত পোহাল। পূর্বাকাশে উঁকি দিল লাল টকটকে সূর্য। ইত্যবসরে জামিলা ও কাসেম অনেক পথ অতিক্রম করেছে। ওরা মরণপণ ঘোড়া ছুটিয়েছে। কাসেম গজনীর সৈন্যদের নির্মিত রাস্তা ধরে এগুচ্ছিল। যে রাস্তা গজনী বাহিনী তৈরি করেছিল ভারত আক্রমণের উদ্দেশে। কাসেম যখন জয়পাল বাহিনীর কাছে গ্রেপ্তার হয়েছিল, এ পথ দিয়েই জয়পালের সৈনিকেরা তাদের নিয়ে গিয়েছিল । এই একটাই ছিল মাত্র রাস্তা। যা থেকে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল না। বেলা বেড়ে উঠার সাথে সাথে কাসেম অনুভব করল, “আমি অধী, আমি পলাতক, ফেরারী। আমার পেছনে ধাওয়া করছে ইমরান ও নিজাম।” ধরা পড়ার আশঙ্কা ও অপরাধের তাড়না কাসেমকে উদ্বিগ্ন করে তুলল। সে অভিজ্ঞ সৈনিক ও দীর্ঘ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। যে কোন কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করা এবং দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি সহ্য করা তার পক্ষে মোটেও অসম্ভব ছিল না। কিন্তু অপরাধবোধ কাসেমের সহন শক্তিকে ভেঙ্গে খান খান করে দিল। সে অনুভবই করল না যে, ঘোড়াগুলো এক নাগাড়ে দীর্ঘ সময় দৌড়াতে পারবে না। তার সফর ছিল দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল দিয়ে। বারবার বাক নিচ্ছিল পথ। কখনও চড়তে হতে পাহাড়ের উপরে, কখনও নামতে হতো পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে। বারবার হোঁচট খেতে হতে পাথরের সাথে। বহু চড়াই উৎড়াই অতিক্রম করে চলতে হচ্ছিল তাকে।

    বিরামহীন পথ চলায় ক্লান্ত হয়ে পড়ল ঘোড়া। যে ঘোড়াটায় কাসেম ও জামিলা উভয়ে আরোহণ করেছিল সেটি ঘেমে নেয়ে গিয়েছিল। হাঁ করে নিঃশ্বাস ছাড়ছিল। হঠাৎ পাথরে হোঁচট খেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল ঘোড়া। জামিলা ও কাসেম দুজন দুদিকে ছিটকে পড়লো। পেছনের ঘোড়াটি তাল সামলাতে না। পেরে কাসেমের গায়ে এসে আছড়ে পড়ল। ঘটনার আকস্মিকতায় চিৎকার দিয়ে উঠল জামিলা। কিন্তু কাসেমের অবস্থা শোচনীয়। কোন মতে নিজেকে টেনে তুলে জামিলার দিকে অগ্রসর হলো এবং জামিলাকে টেনে বসাল কাসেম। সওয়ার ঘোড়াটি কয়েকবার পা ঝাঁপটা দিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল। অপর ঘোড়াটির উপর কোন সওয়ারী না থাকায় সেটি অত দুর্বল ছিল না। কাসেম, বলখী সেই ঘোড়াটির লাগাম হাতে নিয়ে এদিক ওদিক দেখল, কোথাও ঘাস আছে কি-না। না, যে পর্যন্ত দৃষ্টি যায় শুধু পাহাড় আর পাহাড়। আর এ পাহাড়ি এলাকাটি এমন যে শুধুই পাথর। সামান্য দূর্বা ঘাসও কোথাও নেই। পানির তো প্রশ্নই ওঠে না। তখনো ধরা পরার আশঙ্কা কাসেমকে তাড়া করছে। সে মূল রাস্তা ছেড়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ভিতরের দিকে চলে গেল। জামিলাকে বগলদাবা করে কোনমতে নিয়ে বসাল একটা পাথরের উপর। কিছুক্ষণ বিশ্রাম করল উভয়ে।

    খুব বেশি সময় বিশ্রাম করতে পারেনি কাসেম। অপরাধ তাকে তাড়া করে নিয়ে চলল সামনের দিকে। জামিলাকে নিয়ে আবার সওয়ার হলো ঘোড়ায় । টাকার থলেটা জামিলা আঁকড়ে থাকল। এক হাতে জামিলা আর অন্য হাতে । ঘোড়ার লাগাম টেনে খুব জোরে তাড়া করল কাসেম।

    ইমরান ও নিজাম তাড়া করতে পারে এ আশংকায় কাসেম দীর্ঘ শ্রান্তির পরও পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে পারেনি। ধরা পড়ার ভয়ে সে মূল পথ ছেড়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে দুর্গম এলাকা দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছার জন্য আবার ঘোড়া দৌড়াতে শুরু করল। জামিলা অশ্বারোহণে অভ্যস্ত নয়। এ ধরনের দীর্ঘ পথ পরিভ্রমণের অভিজ্ঞতাও তার নেই। জামিলা ইঙ্গিতে কাসেমকে বোঝাল, ক্লান্তিকর বিরামহীন ভ্রমণে তার পশ্চাদদেশ ফুলে গেছে, উরুসন্ধি ছিলে গেছে। সারা শরীর ব্যথায় বিষ হয়ে গেছে। পেট ধরে ইঙ্গিত করল, তার পক্ষে আর এক মুহূর্ত ঘোড়ায় বসে থাকা সম্ভব নয়।

    যে স্বর্ণমুদ্রা ও রূপ সৌন্দর্যের জৌলুসে মুগ্ধ হয়ে কাসেম জামিলাকে নিয়ে কাফেলা ত্যাগ করে পালিয়ে এলো, সেই রূপ আর টাকার আকর্ষণ কাসেমের কাছে ফিকে হয়ে গেছে। কাসেম অনুভব করছে, তারও শরীরের শক্তি নিঃশেষ হয়ে আসছে। তবুও মুখে কৃত্রিম শুষ্ক হাসির রেশ টেনে জামিলাকে এক হাতে জড়িয়ে বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। কাসেম অনুভব করল, জামিলার শরীরের স্পর্শে আর আগের মত পুলক নেই। জামিলা নিষ্প্রাণ দেহের মতো। জামিলা কাসেমের আহ্বাদে শরীরটা এলিয়ে দিল কাসেমের গায়ে। জামিলার গণ্ডদেশে কাসেম ঠোঁট স্পর্শ করল, তার ঘর্মাক্ত শরীরের সবটা ভার কাসেমের উপর ছেড়ে দিল। এলো চুল কাসেমের গলায় জড়িয়ে গেল। জামিলা তার ঘাড়, গলা কাসেমের গলায় হেলিয়ে দু’হাতে উল্টোভাবে ওর গলা জড়িয়ে ধরল। কিন্তু ঘর্মাক্ত জামিলার শরীরটা কাসেমের কাছে দুর্গন্ধময় আবর্জনার মতো মনে হলো। আর জামিলার হেলিয়ে দেয়া শরীরটা কাসেমের কাছে বিরাট বোঝা অনুভূত হতে থাকল। কিছুক্ষণ পরেই কাসেম জামিলাকে ধাক্কা দিয়ে সামনে সরিয়ে দিয়ে সোজা হয়ে বসল। প্রচণ্ড খরতাপ ও পাহাড়ের অগ্নি বিচ্ছুরণের কারণে ঘামে উভয়ের কাপড় ভিজে শরীরের সাথে লেপটে গেছে।

    কাসেমের শরীর অবশ হয়ে আসছিল। দীর্ঘ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈনিক হিসেবে কষ্টকর অশ্বারোহণ তার পক্ষে এতোটা অসহনীয় ছিল না কিন্তু এই পলায়নে জিহাদের ময়দানের যে আত্মশক্তি থাকে তা নেই। যে জামিলা ছিল তার পালানোর প্রেরণা সেই জামিলার প্রতি ভালবাসার পরিবর্তে বিতৃষ্ণার উদ্রেক হলো। নিজের প্রতিও ঘৃণা জন্মাল।

    কাসেম অনুভব করল, এ ঘোড়াটিরও দম ফুরিয়ে আসছে। জিহ্বা বের করে দিয়েছে ঘোড়া। ঘন ঘন সশব্দে শ্বাস নিচ্ছে, দৌড়ের গতি শ্লথ হয়ে এসেছে। বারবার হোঁচট খাচ্ছে। যে দুটি ঘোড়া নিয়ে কাসেম পালিয়ে এসেছে, এগুলো সেনাবাহিনীর ঘোড়া নয়। সেনাবাহিনীর ঘোড়া দীর্ঘ দুর্গম পথ পাড়ি দিতে এবং পানাহার না করেও অবিরাম পাহাড় পর্বত অতিক্রমে অভ্যস্ত থাকে। এগুলো ভাড়াটে ঘোড়া। যেগুলো সাধারণত বেসামরিক লোকেরা এখানে ওখানে যাওয়ার জন্যে ভাড়ায় নিয়ে থাকে। ইমরানের কথা মতো জগমোহন এগুলোকে পাশের গ্রাম থেকে ক’জন মেহমান আনা-নেয়ার কথা বলে ভাড়া করেছিল। এগুলো দুর্গম দীর্ঘ পথ পরিভ্রমণে অভ্যস্ত নয়। তাই অবিরাম দানাপানি ও বিশ্রাম ছাড়া পাহাড়ী এলাকায় দৌড়ে চলৎশক্তি হারিয়ে ফেলেছিল ঘোড়া।

    ইমরানের পাকড়াও থেকে বাঁচার জন্য কাসেম আরো দুর্গম পথে পা বাড়াল। তালাশ করতে লাগল পাহাড়ের কোন গিরিপথ। তখন সূর্য মাথার উপরে। পাহাড়ের পাথরগুলো যেন খড়তাপে জ্বলছে। প্রচণ্ড তাপ বিকিরণ করছে পাহাড়। ঘোড়া এতোই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে যে, পাহাড়ের উঁচু নীচু বেয়ে আর এক কদম চলতে পারছে না। অগত্যা কাসেম ঘোড়া থেকে নামল। জামিলাকেও পাঁজাকোলা করে ঘোড়া থেকে নীচে নামাল। উভয়ে হাঁটতে থাকল হাত ধরাধরি করে। একটু হেঁটেই জামিলা ইশারা ইঙ্গিতে ঠোঁটে আঙ্গুল ধরে বুঝাল, পিপাসায় তার বুক শুকিয়ে যাচ্ছে, তার পক্ষে আর এক কদম হাঁটা সম্ভব নয়। কাষ্ঠ হাসি হেসে কাসেম জামিলাকে উৎসাহ দিতে চেষ্টা করল, কিন্তু তার নিজেরও যে কষ্টে বুক শুকিয়ে আসছে। শরীরটা নিজের কাছেই ভারী মনে হচ্ছে কাসেমের । ঘোড়াটা আর এগুতে পারছে না। পা হেঁচড়ে চলছে। পাহাড়ের ঢালে একটু ছায়া পড়েছে। সেখানটায় বসে পড়ল কাসেম। জামিলা কাসেমের শরীরের উপর ধপাস করে পড়ে যাওয়ার মতো করে বসে পড়লো। স্বর্ণ মুদ্রার থলেটি জামিলা এভাবে ছুঁড়ে ফেলে দিল যে, এটি ময়লার থলে মাত্র। ঘোড়াটি হাঁপাতে হাঁপাতে এদিক ওদিক করছিল।

    আবার জামিলা কাসেমকে বোঝাল, পিপাসায় তার ছাতি ফেটে যাচ্ছে। কাসেম তাকে কিছুটা বিতৃষ্ণামাখা ভাব নিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করল, কষ্ট হলেও কিছু করার নেই। এখানে কোথাও পানি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। জামিলা তাকে ইঙ্গিত করল এদিক ওদিক খুঁজে দেখতে। ক্লান্ত অবসন্ন শরীরটা কোন মতে টেনে তুলে কাসেম পানি তালাশে বেরিয়ে পড়ল। বেশ কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি করে-হতাশ হয়ে ফিরে আসল এবং জামিলার কাছে এসে অনিমেষ নেত্রে নিষ্পলক করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে তার অসহায়ত্ব তাকে বুঝাতে চাইল।

    কাসেম যতটা ভয় করছিল ইমরানকে, তার চেয়েও বেশি নির্বিকার ছিল ইমরান কাসেম ও জামিলার ব্যাপারে। ওদের পিছু ধাওয়া করার বিন্দুমাত্র আগ্রহও ইমরানের ছিল না। কাসেম ও জামিলা হারিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই ইমরানের মাথা থেকে বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল তারা।

    ইমরান ও নিজাম আব্দুল জব্বার ওঝফে জগমোহন ও রাজিয়ায় রূপান্তরিত ঋষিকে নিয়ে হেঁটে হেঁটে আসছিল। রোদের তাপ বেড়ে যাওয়ায় তারা একটি ছায়াপড়া ঢালে এসে থামল। সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা সেই ছায়ায় বিশ্রাম করল।

    বেলা ডুবে গেল। ইমরান সাথীদের নিয়ে শুকনো খাবার খেয়ে সংগৃহীত পানি থেকে সবাইকে অল্প অল্প করে পান করতে বলল। যাতে বাকী পথ অতিক্রম করতে কোন অসুবিধার মুখোমুখি না হতে হয়। সন্ধ্যার আঁধার ঘনিয়ে এলে মৃদু মন্দ বাতাসে পাহাড়ের পাথর কিছুটা ঠাণ্ডা হয়ে এল। ইমরান সাথীদের নিয়ে আবার পথ চলতে শুরু করল।

    “আমরা প্রায় এসে গেছি। কিন্তু বাকী পথ খুবই কঠিন। আমাদের ঘোড়াগুলো খুবই ক্লান্ত । এদের দৌড়ানো সম্ভব নয়। পানাহার ছাড়া বিরামহীন দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়ায় এগুলোর শক্তি প্রায় নিঃশেষ । তাছাড়া এ এলাকাটি খুব তাড়াতাড়ি অতিক্রম করার মতোও নয়। পথ খুব উঁচু নীচু আর পাথরগুলো ধারালো। খুব সতর্ক পায়ে চলতে হবে। অন্যথায় পড়ে গিয়ে পা ভাঙ্গার আশংকা রয়েছে। এখন আমাদের মূল লক্ষ্য গজনী পৌঁছা। পথে কোন তাজাদম ঘোড়া পেলে তাড়াতাড়ি পৌঁছে সুলতানকে সংবাদ দেয়া যেতো। রাস্তায় কোন সওয়ারী পেলে ওকে হত্যা করে হলেও ঘোড়া ছিনিয়ে নিতাম। এ মুহূর্তে আমার সবচেয়ে প্রয়োজন একটি তাজাম ঘোড়া।”

    “ইমরান! তোমরা না বল ইসলাম আল্লাহর ধর্ম? আল্লাহকে বল না ঘোড়াকে পানি পান করাতে?” মুচকি হেসে বলল ঋষি।

    “বলার দরকার নেই। আল্লাহ্ সবকিছুই দেখেন।” প্রত্যয়ী কণ্ঠে বলল ইমরান। “দেখবে এ ঘোড়া পিপাসার জন্যে মরবে না। তুমি বুঝতে পারোনি, আল্লাহর রহম না হলে এ পথ নিরাপদে আমরা কিছুতেই অতিক্রম করতে পারতাম না। রাজা জয়পাল কাসেম ও নিজামকে পাকড়াও করার জন্যে সারা দেশব্যাপী লোক ছড়িয়ে দিয়েছিল কিন্তু তাদের ফাঁকি দিয়ে আমরা চলে আসতে সক্ষম হয়েছি। এটা আল্লাহর বিরাট বড় রহমত। ঋষি! এখন তোমাকে আমার প্রকৃত পরিচয় দিচ্ছি। তোমরা জানতে, আমি মুলতানের অধিবাসী। আসলে আমি মুলতানের অধিবাসী নই, গজনীর বাসিন্দা। গজনী সুলতানের নিয়োগকৃত গোয়েন্দা কর্মকর্তা আমি। আর আমার দুই সাথী গজনী সেনাবাহিনীর অফিসার। বিগত যুদ্ধে এরা রাজা জয়পালের বাহিনীর কাছে গ্রেফতার হয়েছিল। আমি বন্দিদশা থেকে তাদের মুক্ত করে এনেছি এবং তোমাকেও পণ্ডিতদের আখড়া থেকে উদ্ধার করেছি। উভয় কাজ করেছি আল্লাহর ওয়াস্তে। আল্লাহ তাআলা আমাকে প্রত্যেক কাজে মদদ করেছেন। আর জামিলা ও কাসেম জৈবিক তাড়নায় অসৎ উদ্দেশ্যে সবার সোনাদানা নিয়ে পালিয়েছে। দেখবে, ওদের পরিণতি হবে ভয়াবহ। আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে কাজ করেছি। আল্লাহ্ আমাদের সাহায্য করবেনই। সবার যদি আল্লাহর প্রতি ভরসা থাকে তবে পাথর চিরেও পানি বের হওয়া কঠিন কিছু নয়।”

    বাস্তবেও পাথরের মধ্যেই পানি পেয়েছিল ইমরানের কাফেলা। তখন প্রায় রাতের দ্বিপ্রহর। পাহাড়ের গায়ে ঝিকমিক করছে চাঁদের আলো। শরীর হেলিয়ে চলছিল ঘোড়া দুটো। একটি উপত্যকায় তারা এসে পৌঁছাল। হঠাৎ থেমে গেল ঘোড়া দু’টো। লাগাম টেনেও ঘোড়া দুটোকে নাড়াতে পারল না ইমরান। ঘোড়ার দিকে তাকিয়ে দেখল, উভয়টি জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট চাটছে আর উপত্যকার সমভূমির দিকে তাকিয়ে মাথা উঁচু করে ঘাড় হেলাচ্ছে। লাগাম ছেড়ে দিল ইমরান। ছাড়া পেয়েই ঘোড়া দু’টো সমভূমির দিকে যেতে লাগল।

    ইমরান ঋষিকে বলল, ঋষি! তুমি নেমে পড়। ঋষি নামতে পারছিল না। ইমরান এগিয়ে দু’হাত বাড়িয়ে দিলে ঋষি তার কোলে ঝাঁপ দিয়ে নেমে পড়ল। অপর ঘোড়ায় সওয়ার ছিল নিজাম, সেও নেমে পড়ল। ভারমুক্ত হয়ে ময়দানের দিকে দৌড়ে পালাল ঘোড়া দু’টো। ইমরান বলল, আহ্! বেচারা পানির গন্ধ

    পেয়েছে। আমাদের মশকটা দাও। এদিকে কোথাও পানি আছে। ঘোড়ার সাথে নিজাম আর জগমোহনও দৌড়াতে লাগল। ইমরান ঋষিকে নিয়ে অনুসরণ করল তাদের। দুটি পাহাড়ের ঢালের নীচুতে গিয়ে থেমে গেল ঘোড়া। মুখ নীচু করে দীর্ঘশ্বাসে পানি পান করতে লাগল। নিজাম ও জগমোহনও ততক্ষণে ঘোড়ার কাছে চলে গেছে। জগমোহন ইমরানের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, হায় ভগবান! পানি! ইমরান তার ভগবান ডাক শুনে দূর থেকে বলল, ভগবান নয় ‘আল্লাহ’ বল। আল্লাহ্ তোমাকে পাহাড়ের মধ্যে পানির সন্ধান দিয়েছেন, ভগবান পানি দিতে পারে না। সে ঋষির দিকে তীর্যক দৃষ্টি হেনে বলল, দেখলে রাজিয়া। আল্লাহ্ ইচ্ছে করলে পাহাড়েও পানি দিতে পারেন। কিছুটা লজ্জিত হলো ঋষি। ইমরানের আল্লাহ ভরসা ও দৃঢ়তার দরুন তার প্রতি সশ্রদ্ধভক্তিতে গা ঘেঁষে হাঁটতে লাগল– সে যেন সত্যিকার পথের দিশারী এবং সফল মানুষকেই পেয়েছে।

    দূর থেকেই ইমরান দেখতে পেল পানি। চাঁদের আলো পানিতে পড়ে ঝকমক করছে। তৃষ্ণার্ত ঘোড়া পানি পান করে ঘাস খেতে শুরু করল। অথচ গোটা এলাকায় কোথাও ঘাস নেই। শুষ্ক পাথরে ঘাস জন্মাবে কি করে! কিন্তু এখানে পানি থাকায় আশপাশে বেশ লম্বা হয়ে উঠেছে ঘাস। ঘোড়া দুটো হামলে পড়ল ঘাসের ওপর। আঁজলা ভরে পানি পান করল সবাই। শীতল পানি। তীব্র তৃষ্ণা আর গরমের মধ্যে এই ঠাণ্ডা পানিকে মনে হলো জীবনের সবচেয়ে অমৃত সুধা। সবাই নবপ্রাণ ফিরে পেল যেন। ঘোড়া দুটোকে ঘাস খাওয়ার অবকাশ দিতে ইমরান একটি বড় পাথরের উপর বসে পড়ল সবাইকে নিয়ে।

    কাসেম বলখী ও জামিলা পাহাড়ের আড়ালে আড়ালে গজনী পৌঁছার জন্যে আবারো রওয়ানা হল। ক্লান্ত অবসন্ন দেহ মনে গজনী পৌঁছেই বা কি করবে এ চিন্তা কাসেমকে আরো বিপর্যস্ত করে তুলছিল। দিকভ্রান্তের মত তারা আধা দিন হেঁটেও একই জায়গায় বৃত্তাকারে ঘুরল। গজনীর দিকে মোটেও অগ্রসর হতে পারল না। এলাকাটি ছিল খুবই জটিল। পাহাড় আর ছোট ছোট টিলায় ভরা। সুস্থ মস্তিষ্কের লোক ছাড়া পরিচিত পথ ছেড়ে লক্ষ্য স্থির করাও কঠিন। কাসেমের দেহমন অতটুকু স্থির ছিল না যে, সে সঠিক পথের দিক নির্ণয় করতে পারে। ঘোড়া আর চলতে পারে না। জামিলা ও কাসেম উভয়ের অবস্থাও সঙ্গীন। দীর্ঘক্ষণ কারো মুখে কোন কথা নেই। কতক্ষণ ঘোড়া ঠায় দাঁড়িয়ে রইল সেদিকেও খেয়াল নেই কারো। সম্বিত ফিরে এলে কাসেম ঘোড়া থেকে নেমে পড়ল, জামিলাও পড়ে যাওয়ার মতো করে গড়িয়ে পড়ল ঘোড়া থেকে।

    ক্লান্ত অবসন্ন কাসেমের দু’চোখ বুজে এলো ঘুমে। তাকাতেই পারছিল না। এক পা নড়ার শক্তিও নেই দেহে। একটি চওড়া পাথরে পা টানটান করে শুয়ে পড়ল কাসেম। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাসেমের বুকটা কাঠ হয়ে গেছে। জামিলা ও ঘোড়ার দিকে তাকানোর ইচ্ছে হলো না কাসেমের। জামিলা এসে কাসেমের গায়ের উপর ঠেস দিয়ে খানিক্ষণ বসল। এরপর কাসেমের বুকের উপর মাথা

    রেখে ওকে জড়িয়ে শুয়ে পড়ল। কাসেম দুহাতে জড়িয়ে নিল জামিলাকে। জামিলাও নিজেকে সোপর্দ করে দিল কাসেমের বুকে। অবসন্ন কাসেম জামিলার সংস্পর্শে অনুভব করল উন্মাদনা। মাথা তুলে জামিলাকে ইঙ্গিতে বুঝাল, পাহাড়ের ওদিকে একটু আড়াল মতো জায়গার দিকে চলো। জামিলাই উঠে ওকে টেনে তুলল। দুজন হাত ধরাধরি করে একটি ঝোঁপের আড়ালে পাহাড়ের গর্তের মতো জায়গায় গিয়ে জীবনের শেষ সাধ মিটাতে প্রবৃত্ত হল। কামে অনুভব করল, যে জীবন থেকে সে ফেরার হয়েছে সেই জীবন আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। ভবিষ্যতের চিন্তা ও গন্তব্যে পৌঁছার কথা, ভুলে গেল তারা। দৈহিক কামনার আগুন জ্বালিয়ে ওরা পরস্পরকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।

    দীর্ঘ ঘুম শেষে কাসেম যখন চোখ মেলল তখন রাত শেষে বেলা উঠে গেছে। হকচকিয়ে উঠল কাসেম। নিজেদেরকে এভাবে পাহাড়ের কোলে অরক্ষিত অবস্থায় দেখে ঘাবড়ে গেল। দাঁড়িয়ে জায়গাটা পরখ করে দেখল, গতকাল সন্ধ্যায় তারা যেখানে ছিল সেখানেই রয়েছে। রাতের অধিকাংশ সময় চলেও অগ্রসর হতে পারেনি মোটেও। একই জায়গা বৃত্তাকারে ঘুরেছে।

    জামিলাকে ডেকে তুলল কাসেম। পরস্পরের প্রতি এরা তাকাতেও পারছিল না। আবার যাত্রা শুরু করতে চাইল কাসেম। কিন্তু ঘোড়াটি আর দেখতে পেল না। কাসেম ভাবল, ইমরান ও নিজাম হয়তো ওদের এখানে দেখে ঘোড়াটি নিয়ে গেছে। আর ওদের রেখে গেছে যাতে ক্ষুৎপিপাসায় ওরা মরুপাহাড়ে ঘুরে ঘুরে মৃত্যুবরণ করে।

    ক্ষুধার্ত পিপাসার্ত ঘোড়া খাবারের সন্ধানে হারিয়ে গেল। বহু খোঁজাখুঁজি করেও ঘোড়ার কোন চিহ্নও পেল না। হতাশ হয়ে ফিরে এলো জামিলার কাছে। ভীত শংকিত কাসেম জামিলাকে টেনে তুলে দৌড়াতে লাগল।

    কিছুক্ষণ পাথুরে উঁচুনীচু পথে দৌড়ে চলৎশক্তি হারিয়ে ফেলল জামিলা। সে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। কাসেম তাকে টেনে তুলে কাঁধে নিয়ে আবার দৌড়াতে লাগল। সোনা-মুদ্রার থলিটাও হাতে নিল। কাসেম ভাবল, ধারে কাছেই হয়তো রয়েছে ইমরান ও নিজাম। ওদের দুরবস্থা দেখলে হয়তো সোনা ও মুদ্রার থলিটা ছিনিয়ে নেবে, জামিলাকেও নিয়ে যাবে তারা। বেশিক্ষণ জামিলাকে কাঁধে নিয়ে দৌড়াতে পারল না। দীর্ঘ পথের ক্লান্তি ও ক্ষুৎপিপাসায় এমনিতেই শরীরের শক্তি নিঃশেষ হয়ে এসেছিল। তদুপরি গত রাতের পাপ ও পালানোর অপরাধবোধ কাসেমের সামনে প্রেতাত্মা হয়ে দেখা দিল।

    ক্লান্ত কাসেম আর জামিলাকে বহন করে অগ্রসর হতে পারল না। চোখে সর্ষেফুলের মতো চতুর্দিক অন্ধকার ধোঁয়াটে মনে হলো। মাথা চক্কর দিয়ে উঠল কাসেমের। কাঁধের বোঝার মতো জামিলাকে ছেড়ে দিল কাসেম। যমদূত যেন দাঁত বের করে নাচতে লাগল কাসেমের সামনে। জামিলাকে পরম মমতায় জড়িয়ে নিল বুকে। জামিলার শরীর অসাড় হয়ে গেল। জামিলা চেতনা হারিয়ে ফেলল। স্বর্ণমুদ্রার থলেটা হাত থেকে পড়ে গেল।

    খানিক্ষণ পর জামিলার হুশ ফিরতে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো কাসেম। প্রাণ ফিরে পেল সে। দু’হাতে বাজু ধরে জামিলাকে বসাল কাসেম। কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দিল।

    আবেগে উদ্বেলিত হয়ে উঠল কাসেম। স্বগতোক্তি করতে শুরু করল সে :

    “তুমি আমার ভাষা বুঝবে না জামিলা! আমরা গজনীর পথ থেকে ফেরার হইনি। আল্লাহ্র পথ থেকে পালিয়ে এসেছি। আল্লাহর পথ থেকে পালানোদের পরিণতি এটাই অবশ্যম্ভাবী। আমি ছিলাম অভিজ্ঞ সৈনিক। জীবনে বহুবার প্রচণ্ড তুষারপাত, আর লুহাওয়ায় মরু পাহাড়ে দিনের পর দিন বিরামহীন যুদ্ধ করেছি। দীর্ঘ সময় অনাহার, অনিদ্রা, ক্ষুধা-পিপাসায় কাটিয়েছি। সাথীদের অনেকেই শাহাদাৎ বরণ করেছে, আহত হয়েছে। হাত পা হারিয়েছে, নিজেও যখম হয়েছি, কিন্তু ধৈর্যচ্যুত হইনি, আজকের মতো সাহস হারাইনি, এমন অসহায় বোধ করিনি। আমার শরীরের রক্ত নিঃশেষ হয়ে গেলেও এমন বলহীন হওয়ার কথা নয়। এখন আমি জীবনীশক্তি হারিয়ে ফেলেছি। জানো, এর কারণ কি?”….উদ্বেলিত কাসেম জামিলাকে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, জান?’ কিন্তু জামিলা তার কোন কথাই বুঝেনি। ফ্যালফ্যাল করে হা করে শুধু তাকিয়ে রইল কাসেমের দিকে। কাসেমের ভাষা না বুঝলেও জামিলা অতটুকু ঠিকই বুঝল, যে শক্ত সামর্থবান যুবককে সে দেহের কামনা পূরণের অপরিমেয় আধার মনে করেছিল সেই যৌবনের ঝর্ণা এখন শুকিয়ে গেছে, প্রেমের উত্তাপ নিভে গেছে। আবারো বলতে শুরু করল কাসেম :

    “যুদ্ধ ময়দানে আমাদের দেহ নয়, আমাদের আত্মা লড়াই করতো। আমরা যুদ্ধ করতাম জাগতিক কোন লোভ-লালসার জন্যে নয় আদর্শ প্রতিষ্ঠা ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। আর এখানে আমরা পালিয়েছি দেহের কামনা আর মনের বাসনা পূরণে। আমরা আদর্শবিচ্যুত অপরাধী। তাই মাত্র দুদিনের বৈরী পরিস্থিতিতে আমি প্রাণশক্তি খুইয়ে বসেছি। নিজের শরীরটাই এখন আমার কাছে ভারী মনে হচ্ছে। তোমার রূপের জৌলুস ম্লান হয়ে গেছে, তোমাকে মনে হচ্ছে দুর্গন্ধময় একটা পচা মরদেহ।

    জামিলা! আমরা অপরাধী। পাপী। পাপীর কোন ঠিকানা নেই। দুনিয়াতে পাপীরা জীবনকে পাপাচারে ভোগ করে আর পরকালে আগুনে পুড়ে ভোগের প্রায়শ্চিত্ত করে।

    জামিলা! আমরা পথচ্যুত হয়েছি। আমাদের সাথীরা সত্যপথের উপর রয়েছে। ওই হিন্দু মেয়ে ও তার ভাই সত্যের ঠিকানা পেয়েছে। মাটির মূর্তির পূজা ছেড়ে তারা আল্লাহ্র পথের দিশা পেয়েছে। ওরা ঠিক তাদের গন্তব্যে পৌঁছবে, কিন্তু আমরা ভ্রষ্টতার শিকার। আমাদেরকে এই বিজন প্রান্তরেই মরতে হবে।”

    কাসেম বেদিশা হয়ে পড়েছিল। জীবনের করুণ পরিণতি আর অতীতের সুকীর্তি তাকে এতই বিপর্যস্ত করে তুলেছিল যে, তার আওয়াজ চড়ে গেল। জামিলা ভড়কে গেল কাসেমের উন্মাদনা দেখে। জামিলা হাত দিয়ে কাসেমের মুখ বন্ধ করতে চেষ্টা করল। বাকরুদ্ধ হয়ে কাসেম হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। জামিলাও জীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষা খুইয়ে ফেলেছে। তবুও কাসেমকে সান্ত্বনা দিতে নিজের ভাষাতেই বলতে শুরু করল :

    “কাসেম! স্থির হও। এখনও আমরা চেষ্টা করলে বাঁচতে পারব। তোমাকে সাহায্য করার সামর্থ আছে আমার। যে কোন রাজ্যে আমরা দু’জন স্বাচ্ছন্দে জীবন কাটিয়ে দিতে পারব। প্রচুর স্বর্ণমুদ্রা আমাদের হাতে রয়েছে। তুমি নিরাশ হয়ো না। আমার দিকে তাকাও। উঠ।”

    “আমি জানি না তুমি কি বলছো জামিলা! আমি কি বলি তাও বুঝতে পার না তুমি।” নিজের মত করে বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল কাসেম। জামিলাকে হাত ধরে টেনে তুলে বলল, “মৃত্যু ছাড়া আমাদের সামনে আর কোন বিকল্প নেই। এসো, মরার জন্য আরো ভাল কোন জায়গা পাওয়া যায় কি-না দেখি?”

    ইমরানের কাফেলা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে সমতল ভূমিতে চলে এসেছিল। পথিমধ্যে তারা আরো এক জায়গায় পানির সন্ধান পেয়েছিল। তাদের কাফেলার গতি ছিল মন্থর। কেননা দু’জনকে পায়দল চলতে হতো। হঠাৎ একটি ঘোড়া দেখতে পেল নিজাম। ঘোড়ার গায়ে গদি আঁটা। কিন্তু আশপাশে কোন আরোহীকে দেখা গেল না।

    ইমরানকে ডেকে বলল নিজাম, ইমরান! তুমি বলেছিলে কোন ঘোড়া পাওয়া গেলে আরোহীকে হত্যা করে হলেও ঘোড়া ছিনিয়ে নেবে। ওই দেখ! একটি ঘোড়া দেখা যাচ্ছে।

    নিজামের ইঙ্গিতে মরুভূমির দিকে তাকাল ইমরান। গদি আঁটানো একটি ঘোড়া আপন মনে ঘাস খাচ্ছে।

    “আমার দৃষ্টিভ্রম না হলে বলতে পারি ঘোড়াটি আমাদেরই।” বলল ইমরান।

    তারা একটু এগিয়ে দেখল, সত্যি ঘোড়াটি তাদেরই। যে দুটো ঘোড়া নিয়ে কাসেম পালিয়েছিল এটি সে দুটোর একটি। কিন্তু ধারে-কাছে কোথাও মানুষের অস্তিত্ব টের পাওয়া গেল না।

    ইমরান ও নিজাম তরবারী কোষমুক্ত করে নিল। কারণ, হঠাৎ কোন আড়াল থেকে তাদের উপর কাসেমের আক্রমণ করার আশংকা রয়েছে। কিন্তু আশে পাশে বহু খোঁজাখুঁজি করেও জামিলা ও কাসেমের দেখা পাওয়া গেল না। খুঁজে না পেয়ে ইমরান ও নিজাম কাসেমকে ডাকতে শুরু করল।

    “কাসেম! আড়াল থেকে বেরিয়ে এসো। অতীতের সবকিছু আমরা ভুলে যাবো। তোমাকে বন্ধুর মতোই বরণ করে নেবো। কাসেম লুকিয়ে থেকো না, আমাদের সাথে চলে এসো!”

    বহু ডাকাডাকির পরও কোন সাড়া পাওয়া গেল না।

    “ইমরান! ওদিকে দেখ। শকুন উড়ছে।” বলল নিজাম।

    বিস্তীর্ণ মাঠের কোথাও শকুনের ঝাক উড়তে দেখার মানে ওখানে কোথাও মৃতের অস্তিত্ব রয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে মৃতদেহে শকুনের আক্রমণ বহুবার দেখেছে নিজাম। ইমরানেরও রয়েছে এ অভিজ্ঞতা। কাফেলাকে দেখে ঘোড়াটি মুখ উপরে তুলে হ্রেষাব করল। কিন্তু পালাতে চেষ্টা করল না। নিজাম ধীর পায়ে এগিয়ে ঘোড়ার বাগ হাতে নিল। অমনি ইমরান এক লাফে সওয়ার হলো ঘোড়ায়। নিজামও তার পিছনে চড়ে বসল। ঘোড়াটি বেশ ফুরফুরে। বোঝা যায় পর্যাপ্ত ঘাস ও পানি খেয়েছে সে। হয়তো বিশ্রামের কাজটিও সেরে নিয়েছে ইতিমধ্যে। তারা দ্রুত অগ্রসর হল শকুনের পালের দিকে। শকুনেরা কি যেন নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে।

    কাছে গিয়ে ইমরান ও নিজাম কয়েকটি ঢিল ছুঁড়ে দিল শকুনের দিকে। ঢিল খেয়ে দূরে সরে গেল শকুনেরা। কাছে গিয়ে দেখল, দুটি লাশ অঙ্গাঙ্গী জড়িয়ে রয়েছে। মরদেহ দু’টি আর কারো নয় কাসেম ও জামিলার। শকুন দল এরই মধ্যে ওদের পেট ফেড়ে নাড়ীভুড়ি বের করে ফেলেছে। স্বর্ণ ও মুদ্রার থলেটি কাসেমের মুষ্টিবদ্ধ। ইমরান মুষ্টি খুলে থলেটি ছাড়াতে চেষ্টা করল কিন্তু কিছুতেই মুষ্টি খুলতে পারছিল না ইমরান। খুব বেশি আগে মরেনি এরা। শরীর এখনও তাজা। গা থেকে কোন দুর্গন্ধও ছড়ায়নি।

    নিজাম ইমরানের উদ্দেশে বলল, “ইমরান! রেখে দাও ওসব। এগুলো ওদের হাতেই থাক। এই সোনা আর দেহই তো এদের মৃত্যু ডেকে এনেছে। এসব ওদের কাছে থাকুক। আমাদের এ দিয়ে দরকার নেই। গজনী সালতানাতের সম্পদ নয় এগুলো। এগুলো না নিলেও আমাদের অপরাধ হবে না। হতভাগাদের আত্মা হয়তো এতে কিছুটা সান্ত্বনা পাবে। এসো। আমরা চলে যাই।” একটা দীর্ঘঃশ্বাস ছেড়ে করুণ দৃষ্টিতে একবার উভয়কে দেখে চলে এলো ইমরান। “আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বিরামহীন পলায়নে ক্ষুধা, পিপাসায় এদের মৃত্যু হয়েছে। যদি ডাকাতের আক্রমণে মরত তাহলে কাসেম অক্ষত থাকতো না, জামিলাকেও ডাকাতেরা রেখে যেত না। তাছাড়া স্বর্ণ ও মুদ্রার থলেটি এদের কাছে পাওয়া যেত না।” বলল ইমরান।

    “আহ! কি দুর্ভাগ্য এদের । আর একটু অগ্রসর হলেই পানি পেয়ে যেত এরা। এদের বাঁধনমুক্ত হয়ে ঘোড়া পানি ও ঘাসের সন্ধান পেয়েছে কিন্তু এদের ভাগ্যে পানি জুটেনি। বন্ধুরা! … এদের থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিত। এতে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণমুদ্রাও এদের জীবন রক্ষা করতে পারল না। বরং অনেক সময় টাকা ও সোনা-গয়না মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়।” ঋষিকে ইঙ্গিত করে বলল ইমরান।

    “দেখো রাজিয়া! রূপের পরিণতি দেখে নাও। রূপ সৌন্দর্ষের বড় গর্ব ছিল জামিলার। সে তার রূপের জালে আমাকেও বাঁধতে চেয়েছিল। কিন্তু জামিলার মায়াজালে ধরা দিল কাসেম। আর এই রূপ আর সোনা দানাই কাল হলো ওদের।”

    করুণ এ দৃশ্য ও ইমরানের কথায় অশ্রুসজল হয়ে উঠল রাজিয়া।

    ওদের করুণ পরিণতি পিছনে ফেলে ইমরানের কাফেলা রওয়ানা হল গজনীর দিকে। এখন তাদের একজন সওয়ার হলো কাসেমের ঘোড়ায়।

    সুলতান মাহমুদের কাছে যখন সংবাদ গেল যে, একজন মহিলাসহ লাহোর থেকে তিনজন লোক এসেছে। তারা সুলতানের সাথে দেখা করতে চায়। সুলতান হাতের কাজ রেখে তাদের ডেকে পাঠালেন। ইমরান ও নিজাম সুলতানকে সালাম দিয়ে মহলে ঢুকল। রাজিয়া ও আব্দুল জব্বারের কোন প্রয়োজন ছিল না, তাই তারা বাইরে অবস্থান করছিল।

    ইমরান বিস্তারিত রিপোর্ট দিল। বাটাণ্ডার গোয়েন্দাদের তৎপরতা এবং রাজা জয়পালের সব যুদ্ধপোকরণ পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনাও সবিস্তারে জানাল। সে এ কথাও ব্যক্ত করল, কিভাবে নিজাম ও কাসেমকে রাজার বন্দিশালা থেকে মুক্ত করে এনেছে এবং কিভাবে হিন্দু মেয়েটিকে উদ্ধার করেছে পণ্ডিতদের আখড়া থেকে।

    কাসেমের বিচ্যুতির কথা শুনে সুলতান খুব আফসোস করলেন। দুঃখে অনুতাপে সুলতানের চেহারা বিষাদময় হয়ে উঠল। :

    “নারী ও সম্পদের লিঙ্গা মুসলিম জাতিকে যেভাবে পেয়ে বসেছে তা আমাদেরকে ধ্বংস করে ছাড়বে।” বললেন সুলতান। “সম্পদ আর নারীলিগায়ই আমাদেরকে গৃহযুদ্ধে ঠেলে দিয়েছে। আচ্ছা, তোমরা কি সঠিক জানো, জয়পাল গজনী আক্রমণ করবে?”

    “মহামান্য সুলতান! এ ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত।” বলল ইমরান। “রাজার যুদ্ধ সরঞ্জাম ধ্বংস হয়ে গেলেও সেখানে রসদের ঘাটতি নেই। ইতোমধ্যে সে হয়তো ধ্বংস হওয়া সম্পদের ঘাটতি পূরণ করে ফেলেছে।”

    “তোমাদের অন্য সাথীরা ওখানে কি করছে?” জিজ্ঞেস করলেন সুলতান। “জয়পালের তৎপরতা সম্পর্কে আমার নিশ্চিত হওয়া দরকার, সে কি পরিমাণ সৈন্য নিয়ে আসছে?”

    “বাটাভার লোকদের কার্যক্রম সম্পর্কে আপনাকে বলেছি। ওরা সেখানকারই বাসিন্দা। অধিকাংশই যুবক। খুব সাহসী উদ্যমী। ওয়াইস-এর তত্ত্বাবধানে তারা তৎপরতা চালাচ্ছে। ওয়াইস আমাদের এখানকার লোক। সেখানের একটি মসজিদের ইমামতির দায়িত্ব নিয়েছে কাজের সুবিধার জন্যে। রাজার সেনাবাহিনী রওয়ানা হলেই সে বিস্তারিত সংবাদ আপনাকে জানাবে।”

    “মহামান্য সুলতান! আপনি আর কোন সংবাদের অপেক্ষা না করে প্রস্তুতি শুরু করে দিন।” বলল নিজাম। “জয়পালের সাথে আমার সরাসরি কথা হয়েছে। তার কথাবার্তা থেকে বুঝেছি, যে কোন মূল্যে সে গজনী আগ্রাসন চালাবে। সে তার সেনা অফিসারদের সাথে যেসব পরামর্শ করেছে তাও শোনার সুযোগ আমার হয়েছে। এবার সে পরাজিত নয় বিজয়ী হতে জীবনের শেষ আক্রমণের উদ্দেশে আসবে। মোকাবেলা সমান সমান নয়, দশের বিরুদ্ধে একজনের হবে এমন বিশাল হবে রাজার বাহিনী। তাই অতীতের মতো মুখোমুখি নয় গেরিলা পদ্ধতিই অবলম্বন করতে হবে আমাদের। অবশ্য রাজা এক ধরনের নির্ভাবনায় রয়েছে যে, সুলতান সুবক্তগীনের ইন্তেকালের পর সেনাবাহিনী সামাল দেয়ার মতো দক্ষ কেউ গজনী বাহিনীতে নেই। তার এই চিন্তাই আমাদের বড় এক হাতিয়ার।”

    “সৈন্য তো আমার কম ছিল না। কিন্তু বিদ্রোহ ও গৃহযুদ্ধের কারণে বহু সৈনিক বিভিন্ন উপদলে ভাগ হয়ে গেছে। যদ্দরুন আমাদের সেনাবল কমে গেছে। আমাদের সেনা অফিসারদের মধ্যে এখন ক্ষমতার লোভ দেখা দিয়েছে। ইসলামের পক্ষে জিহাদ করার যোগ্যতা আর নেই এদের। সেনা অফিসাররা যখন ক্ষমতার মসনদ দখলের পেছনে পড়ে তখন সে জাতির ধ্বংসের সুড়ং পথ সৃষ্টি হতে থাকে। স্বজাতির ধ্বংস নিজেরাই টেনে আনে।”

    তখন সুলতান মাহমূদ গজনী, বলখ ও খোরাসানের প্রশাসনিক ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাসে ব্যস্ত ছিলেন। সেই সাথে সেনাবাহিনীকে ঢেলে সাজানোর ব্যবস্থাও করছিলেন। ইত্যবসরে নিজাম ও ইমরান লাহোর থেকে জয়পালের আক্রমণের খবর নিয়ে এলো। এদের কাছ থেকে সংবাদ পাওয়ার পর সুলতান সব সেনা কর্মকর্তাকে ডেকে পরামর্শ সভায় বসলেন। সেনা কমান্ড আগেই নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছিলেন সুলতান। সেনাদের তিনি বললেন :

    “এটা নিশ্চিত যে, হিন্দুস্তানের সব রাজা-মহারাজাকে নিয়ে তৃতীয়বার গজনী আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে জয়পাল। সেনা কমান্ড আগের মতো রাজার হাতেই থাকছে। ওদের সৈন্যসংখ্যা কত সে সংবাদ নিশ্চিতভাবে পাওয়া যায়নি বটে, তবে অন্তত এক লাখের কম হবে না তা অনুমান করা যায়। লাহোরে আমাদের লোকেরা রাজার সব রসদপত্র জ্বালিয়ে দিয়েছে। এজন্য রাজার অভিযান কিছুটা বিলম্বিত হয়েছে। আপনারা নিজেদের দুর্ভাগ্যের ব্যাপারটি জানেন। সব সৈন্যকে আমরা যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে যেতে পারছি না। কারণ, সব সৈন্য বাইরে নিয়ে গেলে আমাদের ভাইয়েরা সুযোগের অসদ্ব্যবহার করে আমাদের পিঠে ছুরি বসাবে।

    এটা আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য। আপনারা কি কখনও ভেবেছেন, যদি হিন্দুদের হাতে গজনীর পতন ঘটে তবে ওইসব ক্ষমতালিলুদের অবস্থা কি হবে? শুধু তাই নয়, গজনীর পতন হলে হিন্দুরা খানায়ে কাবা পর্যন্ত পৌত্তলিক প্রভাব বিস্তার করবে। অভিজ্ঞ প্রবীণগণ আমাকে জানিয়েছেন, ভারতের হিন্দু পণ্ডিতেরা দাবী করে, পুরাকালে দজলা ফোরাত পর্যন্ত নাকি হিন্দুদের রাজত্ব বিস্তৃত ছিল। তাই তারা কা’বা পর্যন্ত রামরাজ্য বিস্তৃত করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আমাদের মনে রাখতে হবে, এরা শুধু যুদ্ধ করতে আসছে না, সাথে নিয়ে আসছে পৌত্তলিক ধর্ম আর আগ্রাসী চরিত্র। ইসলামের ধ্বংস সাধনে আমাদের প্রাণকেন্দ্রে আগ্রাসন চালাতে চায় হিন্দুরা । আপনাদেরকে শুধু সালতানাত ও নিজেদের ধনজন রক্ষার জন্যে নয় আমাদের প্রাণকেন্দ্র কাবার সুরক্ষার জন্যে মরণপণ যুদ্ধ মোকাবেলা করতে হবে। আপনাদের সুবিধা হলো, হিন্দু সেনাদের মধ্যে মুসলিম বাহিনীর প্রচণ্ড ভীতি রয়েছে। লাহোর থেকে দু’জন লোক খবর নিয়ে এসেছে। তারা জানিয়েছে, গত যুদ্ধের পর পালিয়ে বেঁচে যাওয়া রাজার সৈন্যরা দেশে ফিরে গজনী বাহিনীর আতংক ছড়িয়েছে। রাজার নতুন সৈন্যদের মধ্যে গজনী সেনাদের আতংক বিরাজ করছে।

    এছাড়াও আপনাদের আরেকটি সুবিধা হলো, আপনারা গজনীর বাইরে নিজ ভূমিতে সুবিধামতো জায়গায় ওদের মোকাবেলা করবেন। ময়দান আপনাদের মর্জি মতো হবে। গুপ্ত হামলার প্রচুর সুবিধা থাকবে আপনাদের হাতে। এছাড়াও লুমগানের বেশ কয়েকটি দুর্গকে ওদের ধোকা দেয়ার জন্য ব্যবহারের সুবিধা থাকবে আপনাদের। …

    জয়পালের বাহিনীতে অনেক হাতি থাকবে। হাতির সুবিধা অসুবিধার ব্যাপারটি ইতিমধ্যে আপনারা জেনেছেন। হাতি যেমন সুবিধাজনক, আত্মঘাতি পরিণতির জন্যে এগুলো ততোধিক মারাত্মক।

    আমরাও হাতি ব্যবহার করব কিন্তু আক্রমণাত্মক হামলায় নয় জবাবি আক্রমণে। ওদের সাথে এটা হবে আমাদের চূড়ান্ত লড়াই। পূর্বের কৌশলই অবলম্বন করতে হবে। সম্মুখ মোকাবেলা এড়িয়ে দুই প্রান্তে আক্রমণ করে দ্রুত বেরিয়ে গিয়ে ওদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করতে হবে। দুশমনদেরকে আমাদের পিছনে তাড়িয়ে এনে সুযোগ মতো খেলিয়ে খেলিয়ে হত্যা করতে হবে …।

    শত্রুবাহিনীকে কখনও দুর্বল মনে করা ঠিক হবে না। মনে রাখতে হবে, আল্লাহর অনুগ্রহে আমরা যদি বিজয়ী হই তবে পেশোয়ার পর্যন্ত ওদের পশ্চাদ্ধাবন করতে হবে এবং পেশোয়ার দখল করে নিতে হবে। আমি ওই এলাকার ভৌগোলিক মানচিত্রও আপনাদের দেখাচ্ছি। এর আগে আপনাদের মনে একথা গেথে নিতে হবে, আপনারা ইসলামের সুরক্ষার জন্যে লড়াই করছেন, এ লড়াই হক ও বাতিলের লড়াই। যে লড়াই আমাদের নবীজী (স.)-এর যুগে শুরু হয়েছিল, সেই লড়াই আজও আমাদেরকে লড়তে হচ্ছে। এমন যাতে না হয়, আমাদের হাতে ইসলাম ও মুসলমানদের অপমান হবে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের নাম ঘৃণাভরে স্মরণ করবে, তাই আমাদের শ্লোগান হবে– “হয় মৃত্যু না হয় বিজয়।”

    দীর্ঘ উজ্জীবনীমূলক বক্তব্যের পর সুলতান মানচিত্রটি সেনা অফিসারদের সামনে মেলে ধরলেন। তাদেরকে বোঝালেন কোন কোন পথ অবলম্বন করে রাতের অন্ধকারে গেরিলা আক্রমণ চালাতে হবে। সবশেষে বললেন, আগামী প্রত্যূষেই আমরা অভিযান শুরু করব। সেনাবাহিনীকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রাখুন।

    নিযোগ্য ঐতিহাসিকদের মতে, ১০০১ সালের আগস্ট মাসে মাহমূদ মাত্র ১০ হাজার সৈন্য নিয়ে জয়পালের মোকাবেলায় গজনী থেকে রওয়ানা হন। তার বাহিনীতে ছিল জয়পালের কাছ থেকে পাওয়া ৫০টি হাতি। সৈনিকদের অধিকাংশই ছিল অশ্বারোহী। পদাতিক বাহিনী বেশি ছিল না। কারণ, গজনীর নিরাপত্তা রক্ষায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সেনা রেখে যেতে হয়েছিল। মাহমুদের যুদ্ধকৌশল ছিল সম্মুখ সমরে প্রতিপক্ষকে ঠেকিয়ে রেখে গেরিলা আক্রমণে শত্রুবাহিনীকে পর্যুদস্ত করা। এজন্য পদাতিক বাহিনীর চেয়ে অশ্বারোহী বাহিনী। ছিল তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

    অনেক ঐতিহাসিক লিখেছেন, পেশোয়ারে সুলতান মাহমূদ আক্রমণ করেছিলেন, এটা সঠিক নয়। আক্রমণের সব ব্যবস্থা রাজা জয়পালের পক্ষ থেকে হয়েছিল। গজনী আক্রমণের জন্যে জয়পাল যখন রওয়ানা করে সুলতান মাহমুদ আগেভাগেই গোয়েন্দাদের মাধ্যমে সে খবর পেয়ে গজনীর বাইরে পেশোয়ারের সন্নিকটে জয়পালের মোকাবেলা করেন। এ বিষয়টিকে কুটিল ইতিহাসবেত্তারা উল্টোভাবে উপস্থাপন করেছে।

    রাজা জয়পাল ক’দিনের মধ্যে রসদ ও আসবাবের ঘাটতি পূর্ণ করে ফেলেছিল। জয়পাল খুব তাড়াতাড়ি গজনী আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সে তার জেনারেলদের বলেছিল, “যে আমার আক্রমণ প্রতিহত করেছিল সেই সুবক্তগীন মরে গেছে। এবার গজনীই হবে আমার রাজধানী। দেবতার চরণে কুমারী বলী দিয়েছি। এবার দেবতাও আমার উপর সন্তুষ্ট। দেবতা আমার সহযোগিতায় থাকবেন। বিজয় আমাদের অবশ্যম্ভাবী।”

    * * *

    এবার আগের মতো হিন্দুস্তানের অন্য রাজা-মহারাজারা সৈন্যবল বেশি দেয়নি। তাদের সন্দেহ ছিল জয়পালের বিজয়ের ব্যাপারে। এজন্য টাকা পয়সা প্রচুর দিয়েছে কিন্তু অনর্থক সেনাক্ষয় এড়ানোর জন্যে নানা অজুহাতে সেনা সাহায্য কম করেছে। তারপরও দেখা গেছে, রাজা জয়পাল যখন লাহোর থেকে গজনীর উদ্দেশে রওয়ানা হয় তখন তার সাথে ছিল বারো হাজার অশ্বারোহী, ত্রিশ হাজার পদাতিক ও তিনশ’ সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হাতি। রসদ, যুদ্ধাস্ত্র ও আহার সামগ্রী প্রায় এক বছরের সাথে নিয়েছিল রাজা। এক মাইলেরও বেশি দীর্ঘ ছিল রসদ সরঞ্জাম বোঝাই গরুর গাড়ির বহর। এছাড়া বিজয়ের পর গজনীর বণিক শ্রেণী ও ব্যবসায়ীদের বশে আনার জন্যে প্রচুর সোনাদানা-মণিমুক্তা সাথে নিয়েছিল জয়পাল।

    রাজা অভিযান শুরু করতে খুবই উদগ্রীব ছিল। তাই খুব ব্যস্ততার মধ্যেই ও অভিযানে বের হল। তার ধারণা ছিল, গজনী সুলতানের অজান্তে সে গজনীর ব্র নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়ে নিকে। জয়পাল লাহোর থেকে পেশোয়ারে পৌঁছে মাত্র একরাত সেখানে অবস্থান করে। যাতে মালবাহী গরুর গাড়ীর বহর পৌঁছে যায়। ৬ এর পরদিনই গজনীর উদ্দেশে লাহোর ত্যাগ করে পথে নামে জয়পাল।

    পেশোয়ার ত্যাগ করার সাথে সাথেই গজনীর গোয়েন্দারা সুলতানকে রাজার সামগ্রিক রণসজ্জার সংবাদ পৌঁছে দেয়। সুলতান জয়পালের সৈন্যসংখ্যা ও সামগ্রিক আয়োজনের খবর যুদ্ধ শুরুর অনেক আগেই পেয়ে গেলেন।

    পেশোয়ার ছেড়েই রাজা জয়পাল জানতে পারে, সুলতান মাহমূদ পাহাড়ী এলাকায় তাঁবু ফেলেছেন। রাজা মাহমূদের আগমন সংবাদ বিশ্বাস করতে পারছিল না। তবুও পাহাড়ী এলাকাতেই তার বাহিনীকে তাবু ফেলার নির্দেশ দেয়। আর সংবাদটির সত্যতা যাচাইয়ের জন্যে অপেক্ষা করতে থাকে। রাতে সুলতান মাহমূদের অবস্থান জানার জন্য একটি দলকে পাঠাল রাজা। কিন্তু সেই দল আর ফিরে আসতে পারল না। গজনী বাহিনী জয়পালের সাথে বোঝাঁপড়া ইতোমধ্যেই শুরু করে দিয়েছে।

    তখনও ভোর। চারদিকে আবছা অন্ধকার। এরই মধ্যে গজনীর বীর বাহিনী গেরিলা হামলা চালিয়ে জয়পাল বাহিনীর একটি বাহুর তাবু ছিন্নভিন্ন করে দেয়। কিছু সংখ্যক নিহত ও আহত হয় রাজার সৈনিক। রাজা সংবাদ পেয়ে যুদ্ধ প্রস্তুতির নির্দেশ দেয়। ততক্ষণে পূর্বাকাশে সূর্য উঠে গেছে। রণসাজে সজ্জিত হয়ে জয়পাল বাহিনী যখন সামনে বাড়ল তার বহু আগে থেকেই সুলতানের অশ্বারোহীরা তাদের স্বাগত জানাতে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ানো।

    জয়পাল তার সৈনিকদের আক্রমণ হানতে নির্দেশ দিল। হিন্দুবাহিনী হস্তিদলকে সামনে বাড়িয়ে দিল। সুলতানের সৈন্যরা হস্তিবাহিনীর মোকাবেলায় অগ্রসর হয়ে এদেরকে বিক্ষিপ্ত করতে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল এবং সুযোগ মতো হাতিগুলোকে আহত করতে তৎপর হল। একটু অগ্রসর হয়ে আবার পিছিয়ে আসা। আবার আগে বেড়ে পাশে ছড়িয়ে পড়া। এভাবে রাজার বাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলল সুলতানের সৈন্যরা। ওদিকে সুলতান মাহমূদ নিজে কিছু সংখ্যক সৈন্য নিয়ে রাজার বাহিনীর পিছনে চলে যাওয়ার চেষ্টা করলেন কিন্তু জয়পালের সৈন্যরা মাহমূদের ঘেরাও প্রচেষ্টাকে দেখে ফেলল এবং পিছনে সরতে শুরু করল।

    রাজার সৈন্যরা পিছনের দিকে মোড় নিলে সুলতান আক্রমণের নির্দেশ দিলেন। তুমুল লড়াই বেঁধে গেল। লড়াই যখন তুঙ্গে গজনী বাহিনী তখন পিছনে সরে আসতে থাকে। গজনী বাহিনী পশ্চাদপসরণ করছে দেখে হিন্দুরা তাদের ধাওয়া করে। এবার সুলতানের বাহিনী দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। এমতাবস্থায় রাজার বাহিনী দু’ভাগ হয়ে গেল। ওদের একদল পাহাড়ের দিকে অগ্রসর হল আর অপর দল পেশোয়ারের দিকে এগুতে লাগল।

    এই সুযোগে সুলতানের কিছু সৈন্য প্রতিপক্ষের মাঝে চলে এলো এবং শত্রুবাহিনীর দুই প্রান্তে জোরদার আক্রমণ চালাল। রাজা জয়পাল ছিল দু’দলের মাঝামাঝি। পতাকা ছিল জয়পালের সাথে। কয়েকজন সৈন্য ছিল পতাকার পাহারায়। সুলতানের এই ছোট্ট দলটি রাজার পতাকা ছিনিয়ে নেয়ার জন্যে ঝাণ্ডা বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, কিন্তু তাদের কারো পক্ষে আর ফিরে আসা সম্ভব হলো না। রাজার ঝাণ্ডাবাহিনী অক্ষত রয়ে গেল।

    দিনের দ্বিপ্রহর পর্যন্ত রাজার দু’অংশের সাথে তুমুল লড়াই চলল। গজনী বাহিনী এদের খেলিয়ে খেলিয়ে কচুকাটা করছিল। এদিকে রাজা চাচ্ছিল সুলতানকে এখানে ব্যস্ত রেখে সে বিরাট বাহিনীর একটি অংশ নিয়ে গজনী কজা করে নেবে। সেজন্য রাজা গজনীর দিকে অগ্রসর হতে লাগল।

    যখনি রাজা গজনীর দিকে কিছুটা অগ্রসর হলো, লুকিয়ে থাকা সুলতান বাহিনীর গেরিলাদের টার্গেটের মধ্যে এসে গেল শত্রুসেনারা। শুরু হলো শত্রুদের উপর তীর বৃষ্টি। তীরের আঘাতে রাজার সৈন্যরা মাটিতে ছিটকে পড়ে পাথরখণ্ডের মত ভূতলে গড়াতে লাগল। ত্রিশ হাজার পদাতিক সৈন্য ও ১২ হাজার অশ্বারোহী সৈন্যের বিশাল বাহিনীর মোকাবেলায় মাত্র ১০ হাজার মুসলিম অশ্বারোহী। সুলতানের সেনাবাহিনীর ক্ষয়ক্ষতিও ছিল প্রচুর, কিন্তু লড়াই ধীরে ধীরে মুসলিম বাহিনীর অনুকূলে চলে আসছিল।

    রাজা চাচ্ছিল মুসলমানরা সম্মুখ সমরে মোকাবেলা করুক। চেষ্টাও করছিল সেরূপ। তার সৈন্যদের ট্রেনিংও ছিল মুখোমুখি লড়াইয়ের। কিন্তু সুলতানের বাহিনী মুখোমুখি লড়াই এড়িয়ে বিক্ষিপ্তভাবে আকস্মিক আক্রমণ করে আবার দূরে সরে যাচ্ছিল, ব্যতিব্যস্ত করে তুলছিল হিন্দু-মুশরিকদের। সুলতান তার সুবিধামতো ময়দান নির্বাচন করে সেখানেই যুদ্ধের সূচনা করেন। রাজার ভাবনা ছিল ভিন্ন। ভেবেছিল, অতর্কিতে সে গজনী আক্রমণ করে মুসলিম বাহিনীকে নির্মূল করে ফেলবে।

    সময় যতই যাচ্ছিল রাজার বাহিনী ততই পর্যদস্ত হচ্ছিল। বিরাট সেনাবল থাকার পরও জয়পাল প্রাণপণ লড়াই করে যুদ্ধ আয়ত্তে আনতে ব্যর্থ হচ্ছিল। রাজা চাচ্ছিল যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করতে, তাতে সে বাহিনীকে নতুন করে বিন্যাসের সুযোগ পাবে, কিন্তু মুসলিম সৈনিকেরা ততক্ষণে নারায়ে তাকবীর আল্লাহু আকবার’ বলে ময়দানে নতুন উদ্দীপনা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এলোমেলো হয়ে পড়ে জয়পালের সৈন্যরা। জয়পালের যুদ্ধ বিলম্বিত করার চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

    পশ্চিম আকাশে সূর্য হেলে পড়ার পর পড়ন্ত বিকেলে সুলতান মাহমুদ পঞ্চাশটি হাতি আর দু’হাজার অশ্বারোহী নিয়ে রাজার কেন্দ্রীয় বাহিনীর পশ্চাতে তীব্র আক্রমণ করেন। জয়পালের শক্তি-কেন্দ্র ঘিরে ফেলে,দু’হাজার অশ্বারোহী। তুমুল লড়াইয়ে বহু হতাহত হলো, জয়পাল বহু চেষ্টা করেও ঘেরাও থেকে বেরিয়ে যেতে ব্যর্থ হলো। শীর্ষস্থানীয় পনেরজন কর্মকর্তাসহ গ্রেফতার হলো রাজা।

    রাজার পতনে তার বাহিনী পালাতে শুরু করে। মুসলিম সৈন্যরা তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল পেশোয়ার পর্যন্ত। হিন্দু বাহিনী শেষ পর্যন্ত গ্রেফতার এড়াতে ও জীবন বাঁচানোর জন্য যে যেভাবে পারে পলায়নে প্রবৃত্ত হল। অবস্থা এমন হল যে, রাজার বিশাল বাহিনীকে বকরীর পালের মতো অল্প ক’জন মুসলিম সৈন্য বাঘের মতো তাড়িয়ে নিল।

    সন্ধ্যার আগেই যুদ্ধ থেমে গেল। রাজা জয়পাল জীবনের চূড়ান্ত যুদ্ধেও শোচনীয়ভাবে পরাজিত হল। অবশ্য গজনী বাহিনী এ বিজয়ে জীবন ও রক্তের যে মূল্য শোধ করেছেন তা গজনীর মানুষ কখনও শোধ করতে পারেনি। দুপুরের আগেই যুদ্ধ পরিণতির দিকে গড়ায়। তখনই পাঁচ হাজারের বেশি শত্রুসৈন্যকে হত্যা করে ফেলেছিল মুসলিম সৈন্যরা।

    সুলতান তার সৈন্যদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, মুখোমুখি সংঘর্ষে যাবে না। রাজার দু’ প্রান্তে হঠাৎ করে ক’জন আক্রমণ করে আবার পালিয়ে যাবে, আবার ঘুরে এসে আক্রমণ শানাবে। এভাবে ছোট্ট ছোট্ট দলে হঠাৎ আক্রমণ করে চলে যাবে। তাতে শত্রুবাহিনী সব সময় ব্যতিব্যস্ত থাকবে, কোথা থেকে এসে প্রতিপক্ষ হামলা করে বসে, আর হামলা কীভাবে এবং কতোটা কঠিন হচ্ছে তা নির্ণয়ে ব্যস্ত থাকবে।

    এমনিতেই মুসলিম বাহিনীর আতংক বিরাজ করছিল জয়পাল শিবিরে। তদুপরি গজনী সৈন্যদের ক্ষীপ্র আক্রমণ আর আক্রমণ করে দ্রুত প্রস্থান করার ফলে পৌত্তলিকরা বুঝতেই পারলো না গজনী বাহিনীর সংখ্যা কত। প্রতিপক্ষের শক্তি সম্পর্কে প্রকৃত ধারণা ছিল না জয়পাল বাহিনীর। অপর দিকে রাজার সৈন্যসংখ্যা ও শক্তি সম্পর্কে সুলতানের প্রত্যেকটি সৈনিক ছিল অবগত। যুদ্ধ শুরুর অনেক আগেই তারা গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের সহায়তায় প্রতিপক্ষের শক্তি সামর্থ ও প্রস্তুতির পরিপূর্ণ তথ্য পেয়ে গিয়েছিল। ফলে সুলতান বাহিনীর সামনে অস্ত্রসমর্পণ করতে হলো রাজা জয়পালের।

    পেশোয়ার থেকে কিছুটা দূরে ‘মিরান্দ’ নামক স্থানে রাজা ও তার কর্মকর্তাদের হাজির করা হল সুলতানের সামনে। দোভাষির সাহায্যে শুরু হলো বন্দী ও বিজয়ীর মধ্যে সংলাপ।

    “যুদ্ধ আপনি ও আমার মধ্যে হয়েছে কিন্তু জয় পরাজয় আপনি ও আমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এ ইসলামের বিজয়। আল্লাহ তাআলা এটা প্রতিষ্ঠিত করেছেন– সত্যের মোকাবেলায় মাটি-পাথরের তৈরি দেব-দেবীদের কিছুই করার শক্তি নেই। ওরা মানুষের ভালমন্দ সংঘটনের মালিক নয়। মানুষকে আল্লাহ্ সৃষ্টি করেছেন। জন্ম-মৃত্যু জয়-পরাজয় তার ইচ্ছায়ই হয়ে থাকে। এ নিয়ে আপনার তৃতীয় আক্রমণও ব্যর্থ হলো। এবার বিজয়ের জন্যে কুমারী বলীদান করেছিলেন। আপনার কল্পিত দেবতারা হয়তো আপনাকে নিরপরাধ কুমারী হত্যার শাস্তি দিয়েছে। কুরবানী আমরাও দেই তবে কাউকে খুন করে নয়। রণাঙ্গনে আমাদের সৈনিকদের লাশগুলো দেখুন! বুঝতে পারবেন, আল্লাহর জন্যে মুসলমানরা কিভাবে নিজেদের উৎসর্গ করে। আমাদের কুরবানী আল্লাহ্ পছন্দ করেন। আপনি কি আমাদের ঈমানে বিশ্বাস করেন? আপনার পঞ্চাশ হাজারের বিশাল বাহিনীকে মাত্র ১০ হাজার অশ্বারোহী ভেড়া বানিয়ে ছেড়েছে!”

    “আপনার সাথে আমি ধর্মীয় ব্যাপার নিয়ে তর্ক করতে চাই না।” বলল রাজা। “পরাজয় আমি মেনে নিচ্ছি। আমি আপনার কাছে প্রাণভিক্ষা চাচ্ছি। সেই সাথে আপনাকে এই প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আর কোন দিন আমি আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধায়োজন করব না।”

    “হতেও পারে, চুক্তি করার পরও ধর্মীয় কর্তব্য মনে করে আপনি চুক্তি ভঙ্গ করবেন। আপনার দ্বারা এমনটা হওয়া স্বাভাবিক।” বললেন সুলতান।

    “না! এমনটি আমি কখনও করব না। এখন বলুন, সন্ধির জন্যে আপনাকে কি পরিমাণ মুক্তিপণ দিতে হবে?”

    “মুক্তিপণের মধ্যে আমি যুদ্ধে প্রাপ্ত কোন সম্পদ গণ্য করব না। কারণ এগুলো গনীমত।” বললেন সুলতান।

    রাজার বাহিনীতে ছিল বিপুল সম্পদ। আফগানদের অনুগত করতে বহু মূল্যবান মণিমুক্তা, হীরা-জহরত, স্বর্ণমুদ্রা সাথে নিয়ে এসেছিল রাজা। সেই সাথে গোটা বাহিনীর এক বছরের আহার সামগ্রী।

    ঐতিহাসিকদের মতে, কুড়িটির মতো মুক্তার হার ছিল জয়পালের কাছে। আর স্বর্ণ ছিল পাঁচমণ। একটি হীরার হারের তখনকার বাজার মূল্যে ছিল আশি হাজার দিনার।

    চুক্তি সম্পাদনে শর্ত করা হল : আড়াই লাখ দিনার ও পঞ্চাশটি সামরিক হাতির বিনিময়ে রাজাকে মুক্ত করে দেয়া হবে। পণবন্দী হিসেবে তার কর্মকর্তাদের বন্দী করে রাখা হবে।

    পেশোয়র পর্যন্ত অধিকার করে নিলেন সুলতান। খায়বর ও আশপাশের সকল পাহাড়ী এলাকায়ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করলেন।

    ঐতিহাসিকদের মতে, ৮ মহররম ৩৮২ হিজরী সনের ২৭ নভেম্বর ১০০১ খৃস্টাব্দের বৃহস্পতিবার এ চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। আর পরাজিত রাজা শোচনীয়ভাবে পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে মুক্তিপণের স্বীকৃতি দিয়ে জীবন নিয়ে ফিরে গিয়েছিল।

    অধিকৃত অঞ্চলের শাসন ব্যবস্থা পুনর্গঠনের জন্যে সুলতান কিছুদিন পেশোয়ারে কাটালেন। যখন সংবাদ এলো, গজনীর আশপাশের কুচক্রীরা চক্রান্ত করছে, তখন তিনি গজনী ফিরে গেলেন।

    হিন্দুজাতির অপরিমেয় সম্পদ ও জীবন ধ্বংস করে রাজা পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে লাহোরে প্রত্যাবর্তন করল। এমনিতেই ছিল বয়স্ক-বুড়ো। পরাজয়ের যন্ত্রণা তাকে আরো কাহিল করে তুললো। রাজমহলে ফিরেই জরুরী দরবার তলব করল রাজা। দরবারে ঘোষণা করল নিজের ব্যর্থতা আর ক্ষমতা ত্যাগের কথা। রাজা বলল, আজ থেকে আমার ছেলে আনন্দ পাল রাজা। এ কথা বলেই রাজা সিংহাসন ত্যাগ করল।

    রাজমহলেই সে সবাইকে বলল তার সাথে মহলের পার্শ্ববর্তী বাগানে যেতে। ছেলে আনন্দপাল তার সহগামী হল। যেতে যেতে রাজা ছেলের উদ্দেশ্যে বলল

    “তুমি যেভাবে ভাল মনে কর সেভাবেই রাজ্য চালাবে। এ ব্যাপারে আমার কোন পরামর্শ নেই। তবে ক’টি কথা মনে রেখো। কখনও গজনী আক্রমণে অগ্রসর হবে না। আমাদের বাহিনী মুসলিম বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে কোন দিন পেরে উঠবে না। ওরা ঐশী শক্তির বলে যুদ্ধ করে। এই শক্তি আমাদের সৈন্যদের নেই। মাহমূদকে আড়াই লক্ষ দিনার মূল্যের স্বর্ণ দিয়ে দিয়ে, না হয় তোমার উপর সে আক্রমণ করবে। আর আক্রমণ করলে পরিণতি যা পেশোয়ারে দেখে এসেছো তাই হবে। এই চুক্তির ব্যত্যয় করো না।”

    রাজা যখন রাজমহলের পার্শ্ববর্তী বাগানে উপনীত তখন সবাই এটা দেখে আশ্চর্য হলো যে ওখানে চিতা তৈরি করা হয়েছে। চিতায় কাঠের স্তূপ করে রাখা হয়েছে হিন্দু মরদেহ পোড়াতে যেভাবে রাখা হয়। কিন্তু সেদিন রাজমহলের কারো মৃত্যুর কথা কেউ জানে না। ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই বিস্ময়াভিভূত। চিতায় রাজা পৌঁছার আগেই চিতায় তেল ঢেলে দেয়া হয় এবং চিতার পাশে জ্বলন্ত মশাল হাতে এক ব্যক্তি দাঁড়ানো। আরো ক’জন লোক কোন মরদেহ সকারে অপেক্ষা করছে।

    কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই রাজা জয়পাল কাউকে কিছু না বলে চিতায় উঠে দাঁড়াল। মশালের দিকে হাত বাড়ালে লোকটি জ্বলন্ত মশাল রাজার হাতে তুলে দিল। রাজা তেলে ভেজানো কাঠের স্তূপে দাঁড়িয়ে আগুন ধরিয়ে দিলে মুহূর্তের মধ্যে আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। জয়পালের ছেলে দৌড়ে রাজাকে চিতা থেকে নামানোর জন্যে এগিয়ে গেল কিন্তু ততক্ষণে আগুনের লেলিহান শিখা গ্রাস করে ফেলেছে রাজাকে। প্রজ্জ্বলিত আগুনের পাশে যাওয়া সম্ভব হলো না আনন্দ পালের।

    কোন ঐতিহাসিকের বর্ণনায় পাওয়া যায়, জ্বলন্ত চিতায় আত্মাহুতি দেয়ার আগে রাজা ছেলে আনন্দ পালকে নির্দেশ দিয়েছিল, সে যাতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কখনও যুদ্ধ প্রস্তুতি না করে এবং সুলতান মাহমুদকে চুক্তির শর্তানুযায়ী আড়াই লাখ দিনার পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু সুলতানের সমবয়স্ক আনন্দ পাল উপদেশ উপেক্ষা করে বাবার জ্বলন্ত চিতার পাশে দাঁড়িয়েই চুক্তি ভঙ্গের ঘোষণা দিয়ে পিতার পরাজয় ও অপমৃত্যুর প্রতিশোধ গ্রহণের শপথ নিল। বলল, “গজনীবাসীকে আমি এক দিনারও দেবো না এবং বাবার প্রতিশোধ আমি নেবই।”

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleপীর ও পুলিশ – এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    Next Article দামেস্কের কারাগারে – এনায়েতুল্লাহ্ আলতামাশ

    Related Articles

    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস

    পীর ও পুলিশ – এনায়েতুল্লাহ আলতামাস

    July 16, 2025
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস

    প্রেম যুদ্ধ – এনায়েতুল্লাহ আলতামাস

    July 16, 2025
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস

    প্রেম যুদ্ধ – এনায়েতুল্লাহ আলতামাস

    July 16, 2025
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস

    কাল নাগিনী – এনায়েতুল্লাহ আলতামাস

    July 16, 2025
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস

    সিংহশাবক – এনায়েতুল্লাহ আলতামাস

    July 16, 2025
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস

    আরব কন্যার আর্তনাদ – এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ

    July 16, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026
    Our Picks

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026

    ভুতুড়ে ট্রেন – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026

    ব্রাহ্মণ ভূত – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }