মৃচ্ছকটিক – অষ্টম অঙ্ক
মৃচ্ছকটিক – অষ্টম অঙ্ক
(তারপর হাতে ভিজে কাপড় নিয়ে ভিক্ষুর প্রবেশ
ভিক্ষু— হে অজ্ঞজন, ধর্মসঞ্চয় করো। নিজের উদরকে সংযত করো, ধ্যানরূপ পটহবাদ্যে নিত্য জাগ্রত হও। ইন্দ্রিয়ের রূপ-ধরা চতুর চোরেরা দীর্ঘদিনের সঞ্চিত পুণ্য হরণ করে ॥ ১ ॥
অধিকন্তু, এ (সংসারের) অনিত্যতা দেখে আমি একান্তভাবে ধর্মের শরণ নিয়েছি।
পাঁচজন পুরুষ (পাঁচটি ইন্দ্রিয়) এবং একজন নারীকে (অবিদ্যাকে) বধ করে যে গ্রামকে (দেহকে) রক্ষা করেছে, এবং বলহীন চণ্ডালকেও (অহঙ্কারকে) যে বধ করেছে সেই মানুষ অবশ্যই স্বর্গে যায় ॥ ২॥
মাথা কামিয়েছ, মুখ কামিয়েছ? কিন্তু মন তো কামাওনি (পরিষ্কার করনি), তাহলে আদৌ কামালে কেন? দেখ, যার মন ঠিকমতো কামানো, তার মাথা আর মুখও ঠিকমতো কামানো[৩] ॥ ৩ ॥
এই কাপড়টা গেরুয়ারঙের জলে রাঙিয়েছি। এখন রাজশ্যালকের বাগানে প্রবেশ করে পুকুরে ধুয়ে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাব। (পরিক্রমা করে তা-ই করল)
(নেপথ্যে)
শকার— ওরে দুষ্ট সন্ন্যাসী দাঁড়া, দাঁড়া।
ভিক্ষু— (দেখে, সভয়ে) আশ্চর্য! এই সেই রাজশ্যালক সংস্থানক আসছে। একজন ভিক্ষু তার কাছে দোষ করেছে বলে যেখানেই ভিক্ষু দেখে সেখানেই গরুর মতো নাকে দড়ি পরিয়ে দেয়। তাই অসহায় আমি কার শরণ নেব! অথবা প্রভু বুদ্ধই আমার শরণ।
(খড়গধারী বিটের সঙ্গে প্রবেশ করে)
শকার— দাঁড়া, দুষ্ট সন্ন্যাসী, দাঁড়া। পানশালায় আনা রাঙামুলোর মতো (মট্ করে) তোর মাথা ভাঙব। (মারতে লাগল)।
বিট— ছিনাল-পো! বৈরাগ্যে যে গেরুয়াধারণ করেছে সেই ভিক্ষুকে মারা ঠিক নয়। এ করে কী হবে। তার চেয়ে বরং সুখোপভোগ্য বাগানটি দেখো!
এখানে নিরাশ্রয়দের আশ্রয় ও আনন্দস্বরূপ এই তরুরাজি মহৎ কাজ করছে এই বনে, যে বন দুরাত্মাদের হৃদয়ের মতো অসংযত আর নতুন রাজ্যের মতো পূর্ণ বশীভূত নয় অথচ যা উপভোগে বাধা নেই ॥ ৪ ॥
ভিক্ষু— স্বাগত! প্রসন্ন হোন, উপাসক।
শকার— বন্ধু! দেখো দেখো গাল দিচ্ছে আমাকে।
বিট— কী বলছে?
শকার— আমাকে বলছে ‘উপাসক’! আমি কি নাপিত?
বিট— বুদ্ধের উপাসক বলে তোমার স্তুতি গাইছে।
শকার— বেশ তো! স্তুতি গাও, ভিক্ষু, স্তুতি গাও।
ভিক্ষু— তুমি ধন্য, তুমি পুণ্য (পবিত্র)।
শকার— বন্ধু, সে আমাকে ধন্য আর পুণ্য বলছে। আমি কি চার্বাকঃ, না ভাঁড়ার ঘর না কুম্ভকার?
বিট— ছিনাল-পো, তুমি ধন্য। তুমি পবিত্র তাই বলে তোমার প্রশংসাই করছে।
শকার— বন্ধু, তাহলে এ এখানে এসেছে কেন?
ভিক্ষু— এই গেরুয়াটা ধুতে।
শকার— ওরে দুষ্ট সন্ন্যাসী! আমার ভগ্নীপতি আমাকে সমস্ত বাগানের মধ্যে সেরা এই পুষ্পকরণ্ডক বাগানটা দিয়েছেন। যেখানে শিয়াল-কুকুরেরা জল খায়। পুরুষশ্রেষ্ঠ হয়েও আমিও এখানে স্নান করি না। আর সেখানে কিনা তুমি পুরনো কুলখরসের মতো লাল এবং কটুগন্ধি কাপড় ধুচ্ছ। এক ঘুষি মারব তোমাকে।
বিট— ছিনাল-পো! আমার মনে হয় অল্পদিন হল এ ভিক্ষু হয়েছে।
শকার— বন্ধু, তা বুঝলে কেমন করে?
বিট— এতে বুঝবার কী আছে? দেখ না— আজও চুল নেই বলে তার কপালের রঙ আগের মতোই গৌরবর্ণ, অল্প সময়ই কেটেছে বলে কাপড়ের দাগ পড়েনি। গেরুয়াপরায় এখনও সে অভ্যস্ত হয়নি। কাপড়টা লম্বা হওয়ায় তা ঢিলে হয়েছে, দেহের মাঝের অংশটা ঢেকে ফেলেছে, আর কাঁধের উপর এঁটে থাকছে না ॥ ৫॥
ভিক্ষু— উপাসক, আপনি যা বললেন তাই, আমি অল্পদিন হল সন্ন্যাস নিয়েছি। শকার— জন্মানো মাত্রই সন্ন্যাসী হলে না কেন? (মারতে লাগল)
ভিক্ষু— বুদ্ধকে নমস্কার।
বিট— এ তপস্বীকে মেরে কী লাভ। ছেড়ে দিন। চলে যাক।
শকার— একটা পরামর্শ করে নিই, ততক্ষণ থাকো।
বিট— কার সঙ্গে?
শকার— নিজের হৃদয়ের সঙ্গে।
বিট— ইস্! এখন গেল না (বেচারা)!
শকার— হে পুত্র, হে আমার হৃদয়, হে প্ৰভু; হে পুত্র! এই ভিক্ষু কি যাবে না থাকবে। (স্বগত) এ যাবেও না, থাকবেও না। (প্রকাশ্যে) বন্ধু, আমার হৃদয়ের সঙ্গে পরামর্শ করেছি আমার হৃদয় বলছে—
বিট— কী বলছে?
শকার— সে যাবেও না, থাকবেও না। নিশ্বাস নেবেও না, ফেলবেও না। এখানেই এক্ষুনি পড়ে মরুক।
ভিক্ষু— বুদ্ধকে নমস্কার করি। আমি আপনার শরণ নিচ্ছি।
বিট— এ চলে যাক্।
শকার— কিন্তু একটি শর্তে।
বিট— শর্তটা কী শুনি?
শকার— এমনভাবে কাদা ছুঁডুক যে জল ঘোলাটে না হয়। অথবা জল রাশীকৃত করে কাদায় ফেলুক।
বিট— কী মূর্খতা! মূর্খের মন ও কাজ বিকৃত, তাদের দেহ যেন শুধু শিলাখণ্ডের সমষ্টি, তারা যেন মাংসের উদ্ভিদ্। এমন মূর্খেরা পৃথিবীর বোঝার মতো।
(ভিক্ষু অভিশাপ দেবার ভঙ্গি করল)
শকার– কী বলছে?
বিট— তোমার প্রশংসা করছে।
শকার— হ্যাঁ হ্যাঁ, তা করো তা করো, প্রশংসা করো।
(ভিক্ষু তাই করে প্রস্থান করল)
বিট— ছিনালের-পো, বাগানের শোভা দেখো। ফলে ফুলে শোভিত, স্থির লতায় বেষ্টিত, রাজার আদেশে রক্ষীদের হাতে পালিত এই গাছগুলো সপত্নীক মানুষের মতোই সুখ ভোগ করছে ॥ ৭॥
শকার— বন্ধু ঠিকই বলেছে। ভূমি বহু পুষ্পে চিত্রিত, পুষ্পভারে অবনমিত তরু, তরুশিখরে লতায় লম্বমান বানরগুলো কাঁঠাল-ফলের মতো শোভা পাচ্ছে ॥ ৮॥
বিট— ছিনাল-পো, এই শিলাতলে বসো।
শকার— এই বসলাম (বিটের সঙ্গে বসল)। বন্ধু, এখনও সেই বসন্তসেনাকে মনে পড়ছে। দুর্জনের মতো হৃদয় থেকে দূর হচ্ছে না।
বিট— (স্বগত) ওইভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েও তাকে স্মরণ করছ। অথবা, স্ত্রীলোকেরা অপমান করলে কাপুরুষদের কাম বৃদ্ধি পায়। কিন্তু সৎপুরুষের তা হ্রাস পায়, হয়তো একেবারেই থাকে না ॥ ৯ ॥
শকার— বন্ধু, বহুক্ষণ হল স্থাবরক চেটকে বলেছিলাম গাড়ি নিয়ে খুব তাড়াতাড়ি আসতে। এখনও এল না। ক্ষিদে পেয়েছে কতক্ষণ হল। দুপুরে পা ফেলে চলতেই পারছি না। দেখো, দেখো—
আকাশের মাঝখানে আসা কুপিতবানরের মতো সূর্যটার দিকে তাকানোই কষ্টকর। মাটিটাও শতপুত্রকে হারিয়ে গান্ধারীর[৬] মতোই অত্যন্ত সন্তপ্ত ॥ ১০ ॥
বিট— সত্যি তাই। গরুরা ছায়ায় ঘুমিয়ে পড়ছে, তাদের মুখ থেকে তৃণের গ্রাস পড়ে যাচ্ছে। তৃষ্ণার্ত বনমৃগেরা সরোবরের উষ্ণ জল পান করছে। উত্তাপের ভয়ে লোকেরা নগরীর পথে বেরুচ্ছে না। তেতে-ওঠা মাটি ছেড়ে গাড়িটা মনে হয় দাঁড়িয়ে আছে ॥ ১১ ॥
শকার— বন্ধু! আমার মাথার উপরে সূর্যের কিরণ পড়েছে। শকুনি, খগ এবং বিহগেরা বৃক্ষশাখায় লীন হয়ে আছে। নরপুরুষ ও মানুষেরা উষ্ণ দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে গৃহ এবং আবাসে থেকে খরতাপ (খরতাপের মুহূর্তগুলো) যাপন করছে॥ ১২॥
বন্ধু,! এখনও সেই চেট এল না। নিজেকে ভোলাবার জন্যে কোনো গান গাই। (গান গাইল) আমি যা গাইলাম শুনলে?
বিট— কী আর বলব? তুমি স্বয়ং গন্ধর্ব!
শকার— গন্ধর্ব হব না কেন? হিং, জিরা, নাগরমোথা, বচের গাঁঠ এবং গুড়ে দেওয়া আদামেশানো এক সুগন্ধ ক্বাথ আমি সেবন করছি, আমার গলার স্বর মধুর হবে না কেন?॥ ১৪ ॥
বন্ধু, এখনও তো চেট এল না।
বিট— ব্যস্ত হোয়ো না। এসে পড়বে এক্ষুনি।
(তারপর গাড়িতে ক’রে বসন্তসেনা ও চেটের প্রবেশ)
চেট— ভয় হচ্ছে আমার। সূর্য মাঝ-আকাশে। রাজশ্যালক সংস্থানক হয় তো এখন ক্রুদ্ধ হয়ে আছেন। তাই তাড়াতাড়ি চালাই। চরে বলদজোড়া, চল্।
বসন্তসেনা— কী সর্বনাশ! কী সর্বনাশ! এ তো বর্ধমানকের গলা নয়। ব্যাপার কী? ক্লান্ত বলদদের ক্লান্তি থেকে বাঁচানোর জন্যে আর্য চারুদত্ত কি অন্য চালক এবং অন্য গাড়ি পাঠিয়েছেন? আমার ডানচোখ নাচছে, আমার বুক ঢিপ্ টিপ্প্ করছে। চারদিক খাঁ খাঁ করছে। সবই ওলট-পালট হয়ে গেল।
শকার— (চাকার আওয়াজ পেয়ে) বন্ধু, বন্ধু, গাড়ি এসেছে।
বিট— কেমন করে বুঝলে?
শকার— দেখছ না বন্ধু? বুড়ো শূয়োরের মতো ঘোঁৎ ঘোঁৎ শব্দ হচ্ছে।
বিট— স্থাবরক, আমার ভৃত্য, আমার পুত্র, এসেছিস বাবা?
চেট— এসেছি।
শকার— গাড়িটাও এসেছে?
চেট— নিশ্চয়।
শকার— বলদজোড়াও এসেছে!
চেট— নিশ্চয়।
শকার— আর, তুই-ও এসেছিস্?
চেট— (সহাস্যে) এসেছি, প্ৰভু।
শকার— তাহলে গাড়ি নিয়ে আয়।
চেট— কোন পথে আনব?
শকার— ভাঙা প্রাচীরের দিক দিয়ে নিয়ে আয়।
চেট— কর্তা, বলদজোড়া মরবে, গাড়িটাও ভাঙবে, আর (আপনার) ভৃত্য আমিও মরব।
শকার— ওরে, আমি রাজার শ্যালক। বলদজোড়া যদি মরে, আর একজোড়া কিনব। আর তুই মরলেও আর একজন গাড়োয়ান হবে।
চেট— এসব ঠিকই হবে। কিন্তু আমি আর আমি থাকব না।
শকার— ওরে, সব নষ্ট হোক। ওই প্রাচীরটার পথেই গাড়ি ঢোকা।
চেট— ভাঙরে, গাড়ি ভাঙ্। প্রভুর সঙ্গেই ভেঙে টুকরো হ। অন্য গাড়ি হোক। কর্তাকে গিয়ে বলব। (প্রবেশ করে) আরে ভাঙল না তো। কর্তা, এই যে এনেছি গাড়িটা।
শকার— বন্ধু, এসো। গাড়িটা দেখি দুজনে। বন্ধু, তুমিও আমার গুরু, পরম গুরু। আমি তোমাকে শ্রদ্ধেয় এমন একজন মনে করি যাকে বিশ্বাস ও সম্মানের চোখে দেখা উচিত। তাই, আমার আগে তুমিই গাড়িতে ওঠো I
বিট— তাই হোক। (উঠতে গেল)
শকার— অথবা, তুমি থাকো। এটা কি তোমার বাপের গাড়ি যে তুমি আগে উঠছ? আমিই গাড়ির মালিক, আমিই আগে গাড়িতে উঠব।
বিট— কিন্তু তুমিই তো বললে।
শকার— আমি বলে থাকলেও সৌজন্যের খাতিরে তোমার উচিত ছিল ‘তুমিই আগে ওঠো’ এ কথা বলা।
বিট— তুমি ওঠো।
শকার— এই এখন উঠছি আমি। পুত্র, স্থাবরক, চেট, গাড়িটা ঘোরা।
চেট— (গাড়ি ঘুরিয়ে) উঠুন কর্তা।
শকার— (উঠে, দেখে, শঙ্কা প্রকাশ করে দ্রুত নেমে পড়ে বিটের গলা জড়িয়ে ধরে ) বন্ধু, মরেছ, মরেছ। একটা রাক্ষসী অথবা চোর গাড়িতে বসে আছে। যদি রাক্ষসী হয় তাহলে আমরা দুজনেই অপহৃত, আর যদি চোর হয় তাহলে আমরা দুজনেই ভক্ষিত!
বিট— ভয় পেয়ো না। গরুরগাড়িতে রাক্ষস আসবে কোথা থেকে? মধ্যাহ্নসূর্যের তাপে ঝলসানো চোখে সপরিচ্ছদ স্থাবরকের ছায়া দেখে তোমার এ ভ্রান্তি হয়নি তো?
শকার— পুত্র, স্থাবরক, ভৃত্য আমার! তুমি কি জীবিত?
চেট— আজ্ঞে হ্যাঁ।
শকার— বন্ধু, গাড়িতে বসে আছে একজন স্ত্রীলোক, তুমি বরং দেখো একবার।
বিট— কী বললে? স্ত্রীলোক? বৃষ্টি-চোখে-লাগা বলদের মতো মাথা নত করে আমরা বরং শিগগিরই পথ ধরি। সমাজে গৌরবলাভই আমার প্রিয়, তাই আমার চোখ কুলবধূদর্শনে অনিচ্ছুক ॥ ১৫ ॥
বসন্তসেনা— (সবিস্ময়ে, স্বগত) এ কী! আমার চক্ষুশূল এই সেই রাজশ্যালক। তাহলে হতভাগিনী আমি সত্যিই বিপন্না। ঊষর জমিতে বোনা একমুঠো বীজের মতোই হতভাগিনী-আমার এখানে আসা নিষ্ফল। এখন কী করি?
শকার— এই বৃদ্ধ চেট ভীরু, সে গাড়ি দেখবে না। বন্ধু, তুমিই দেখো।
বিট— ক্ষতি কী! তাই হোক। তাই দেখি।
শকার— এ কী! শেয়াল উড়ছে, কাকেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। বন্ধুকে যতক্ষণে চোখ দিয়ে খাচ্ছে এবং দাঁত দিয়ে দেখছে, ততক্ষণে আমি পালাব।
বিট— (বসন্তসেনাকে দেখে সবিস্ময়ে, মনে মনে) এ কী! হরিণী কেন বাঘের অনুসরণ করছে! হায়! বেলাভূমিতে শয়ান শরচ্চন্দ্রের মতো হংসকে পরিত্যাগ করে হংসী কেন কাকের কাছে এসেছে?
(জনান্তিকে) বসন্তসেনা! এটা উচিতও নয়, তোমার যোগ্যও নয়।
আগে তাকে সগর্বে প্রত্যাখ্যান করে পরে জননীর আদেশে অর্থের লোভে—
বসন্তসেনা— না। (মাথা নাড়ল)
বিট— তা হলে মনে হয় আত্মসম্মানহীন স্বভাবগত বেশ্যাবৃত্তির জন্যেই এসেছ। আমি তো আগেই তোমাকে বলেছি, প্রিয়-অপ্রিয় সবার সঙ্গেই একরকম আচরণ করবে।
বসন্তসেনা— গাড়িবদল হওয়ায় এভাবে এসেছি, আমি শরণাগত।
বিট— ভয় পেও না, ভয় পেও না। আমি একে বোকা বানাব। (শকারের কাছে এসে) ছিনাল-পো! সত্যিই রাক্ষসীই বসে আছে বটে।
শকার— বন্ধু, বন্ধু! যদি রাক্ষসীই বসে থাকে তবে তোমাকে কেন চুরি করল না? আর যদি চোরই হয় তোমাকে তো খেয়ে ফেলল না?
বিট— এসব আলোচনা ক’রে কী হবে? যদি পর পর উদ্যান দিয়ে পায়ে হেঁটেই আমরা উজ্জয়িনী নগরীতে প্রবেশ করি তাহলে ক্ষতি কী?
শকার— তা করলে কী হবে?
বিট— তা করলে ব্যায়াম হবে, আর বলদবেচারাদেরও একটু আরাম দেওয়া হবে।
শকার— তাই হোক। স্থাবরক, চেট, গাড়ি নিয়ে যা। না না, দাঁড়া দাঁড়া। দেবতা ও ব্রাহ্মণদের সামনে পায়ে হেঁটে যাব? না, না। গাড়িতে চেপেই যাব। যাতে দূর থেকেই আমাকে দেখে বলে— ওই আমাদের প্রভু রাজশ্যালক যাচ্ছেন।
বিট— (স্বগত) বিষকে ওষুধ করা সত্যিই কঠিন![৯] যা হোক, এইভাবে বলি। (প্রকাশ্যে) ছিনালের-পো! এই বসন্তসেনা তোমার অভিসারে এসেছে। বসন্তসেনা! বালাই, বালাই।
শকার— (সহর্ষে) তা হলে সে এসেছে আমার কাছে— এক প্রবর পুরুষের কাছে, (আর-এক) বাসুদেবের কাছে।
বিট— হ্যাঁ।
শকার— তাহলে অপূর্ব ভাগ্যলক্ষ্মীকে পেয়েছি আমি। সেই সময়ে আমি তাকে রুষ্ট করেছি, এখন পায়ে পড়ে প্রসন্ন করব।
বিট— ঠিকই বলেছ।
শকার— এই আমি পায়ে পড়ছি। (এই বলে বসন্তসেনার কাছে গিয়ে) মা, জননী! আমার মিনতি শোনো— হে বিশালাক্ষী! এই আমি তোমার পায়ে পড়ছি। হে শুভ্রান্তী! তোমার পায়ের দশটি নখে আমার হস্তাঞ্জলি রাখছি। কামার্ত হয়ে আমি তোমাকে যে কষ্ট দিয়েছি তুমি তা ক্ষমা করো। হে বরগাত্রী! আমি তোমার দাস ॥ ১৮ ॥
বসন্তসেনা— (সক্রোধে) দূর হও, অশোভন কথা বলছ। (এই বলে পদাঘাত করল) শকার— আমার মা, আমার জননী, আমার মাথাটি চুম্বন করেছেন, দেবতার কাছেও যা কখনও নত হয়নি সেই মাথায় ইনি পদাঘাত করলেন, শৃগাল যেমন শবকে পদাঘাত করে তেমনি।[১০] ॥ ১৯ ॥
ওরে স্থাবরক, চেট, তুই এঁকে কোথায় পেলি?
চেট— কর্তা, গাঁয়ের গাড়িগুলোতে রাজপথ রুদ্ধ হয়েছিল। তখন চারুদত্তের বাগানবাড়িতে গাড়ি রেখে একটা গাড়ির চাকা ঠেলছিলাম, সেই সময়ে গাড়িবদল হয়ে ইনি উঠেছেন বলে মনে হচ্ছে।
শকার— সে কী, গাড়ি-বদল হয়ে এসেছে! আমার অভিসারে আসেনি তবে। তা হলে নামো, আমার গাড়ি থেকে নামো। তুমি সেই দরিত্র বণিপুত্রের অভিসারে এসেছ আর আমার বলদজোড়াকে দিয়ে নিজেকে আনিয়েছ। নেমে পড়ো, নেমে পড়ো। গর্ভদাসী! নেমে পড়ো।
বসন্তসেনা—সত্যি বলতে কি, ‘তুমি সেই চারুদত্তের অভিসারে এসেছ’ এ কথায় আমি সম্মানিত হয়েছি। এখন যা হবার হোক।
শকার— আমার যে দুটি হাতের দশনখ হল পদ্মমণ্ডলের মতো, শত চাটুবাক্যের ছলনায় যে দুটি তোমার ধর্ষণে লোলুপ সেই হাতদুটি দিয়ে আমার গাড়ি থেকে তোমার সুন্দর দেহটিকে টেনে নামাব, জটায়ু যেমন বালির স্ত্রীকে টেনে নামিয়েছিল তেমনি করে[১১] ॥ ২০ ॥
বিট— এই গুণমণ্ডিত রমণীদের কেশাকর্ষণ করতে নেই। উপবনে-জাত লতার পল্লব-ছেদ করা ঠিক নয় ॥ ২১॥
তাই তুমি থাকো, আমিই একে নামিয়ে আনি! বসন্তসেনা। নেমে এসো ॥
(বসন্তসেনা নেমে এসে একান্তে দাঁড়িয়ে রইল)
শকার— (স্বগত) আমার যে ক্রোধাগ্নি আমার কথার অবমাননা করায় জ্বলেছিল তা আজ এর পাদপ্রহারে উদ্দীপিত হয়েছে। তাই একে এখন বধ করব। ঠিক আছে। এইভাবে অগ্রসর হই। বন্ধু! বন্ধু!
যদি লম্বা পাড়ওয়ালা বহুঝুরিদার চাদর পরতে চাও এবং চুহুচুহু, চুকুচুহু চুহু করে[১২] মাংস খেয়ে তৃপ্তি পেতে চাও—
বিট— তা হলে কী?
শকার— আমার ইচ্ছেমতো কাজ করো।
বিট— বেশ করব, তবে অকাজ-কুকাজ বাদ দিয়ে।
শকার—অকাজের লেশমাত্রও নয়। রাক্ষসীও কেউ নেই (সামনে)।
বিট— বলো তা হলে।
শকার— বসন্তসেনাকে বধ করো।
বিট— (কান ঢেকে) গণিকা হয়েও গণিকাদুর্লভ প্রণয়ে আসক্তা নগরের অলঙ্কার নিরপরাধ এই তরুণী স্ত্রীকে যদি বধ করি কোন্ ভেলায় করে আমি পরলোকের নদী পার হব?[১৩] ॥ ২৩ ॥
শকার— আমি তোমাকে ভেলা দেব। তাছাড়া, এই নির্জন উদ্যানে একে বধ করবার সময় তোমাকে দেখবে কে?
বিট— পাপপুণ্যের সাক্ষী দশদিক এবং বনদেবতারা আমাকে দেখছেন, দেখছেন চন্দ্র, দীপ্তরশ্মি এই সূর্য, ধর্ম, বায়ু, গগন, অন্তরাত্মা এবং ভূমি[১৪] ॥ ২৪ ॥
শকার— তাহলে চাদর দিয়ে ঢেকে একে বধ করো।
চেট— মূর্খ, নিপাত যাও।
শকার— এই বৃদ্ধ শৃগাল অধর্মভীরু। যাক্, স্থাবরক চেটকে অনুরোধ করি। পুত্র স্থাবরক চেট, তোকে আমি সোনার বালা দেব।
চেট— আমিও পরব।
শকার— তোকে সোনার আসন গড়িয়ে দেব।
চেট— আমিও তাতে বসব।
শকার— আমি আমার সমস্ত উচ্ছিষ্ট তোকে দেব।
চেট— আমিও খাব।
শকার— সমস্ত ভৃত্যদের মধ্যে তোকেই প্রধান করব।
চেট— কর্তা, আমি তাই হব।
শকার— তাহলে আমি যা বলছি কর্।
চেট— কর্তা, সব করব, তবে ‘অকাজ’ ছাড়া।
শকার— অকাজ আদৌ নয়।
চেট— বলুন, কর্তা।
শকার—এই বসন্তসেনাকে বধ কর্।
চেট— রাগ করবেন না, কর্তা! গাড়ি বদল হওয়ায় আমি এই মাননীয়াকে এনেছি।
শকার— ওরে, নফর, তোর ওপরেও কি আমার প্রভুত্ব খাটবে না?
চেটকর্তা, আপনি আমার দেহের প্রভু, আমার চরিত্রের নয়।[১৫] প্রসন্ন হোন্, প্ৰসন্ন হোন, কর্তা! আমি সত্যই ভয় পেয়েছি।
শকার— তুই আমার চাকর হয়ে কাকে ভয় পাচ্ছিস?
চেট— পরলোককে।
শকার— ওই পরলোক বস্তুটি কী?
চেট— ভালো কাজ আর মন্দ কাজের পরিণাম।
শকার— ভালো কাজের পরিণাম কী?
চেট— এই আপনি যেমন স্বর্ণমণ্ডিত
শকার— মন্দ কাজের ফল কী?
চেট— এই আমি যেমন পরান্নভোজী হয়েছি! তাই কুকাজ আমি করব না।
শকার— ও তাহলে ওকে হত্যা করবি না তুই? (এই বলে নানাভাবে মারতে লাগল)
চেট— মারুন কর্তা, মারুন। কুকাজ আমি করব না।
যে ভাগ্যদোষে আমি গর্ভদাস হয়ে জন্মেছি, সেই ভাগ্যকে (দুর্ভাগ্যকে) আমি আর কিনব না। এই জন্যে আমি কুকাজ এড়িয়ে চলছি ॥ ২৫ ॥
বসন্তসেনা— ভদ্র, আমি আপনার শরণ নিলাম।
বিট— ছিনাল-পো! ক্ষমা করো, ক্ষমা করো।
সাবাস, স্থাবরক, সাবাস! দেখো, এই দুর্দশাগ্রস্ত দরিদ্রও পরলোকের ফল চায়, কিন্তু এর প্রভু চায় না। তাহলে এরা এক্ষুনি ধ্বংস হয় না কেন, যারা মন্দ কাজ বাড়িয়েই চলে আর ভালো কাজ চলে এড়িয়ে? ॥ ২৬ ॥
তাছাড়া—
ছিদ্রান্বেষী ভাগ্য অসমদর্শী, কারণ, এর ভাগ্যে হল দাসত্ব আর তোমার ভাগ্যে প্রভুত্ব; তোমার সম্পদ এ ভোগ করছে না, তুমিও এর হুকুম তামিল করছ না ॥ ২৭॥
শকার— (স্বগত) অধর্মভীরু এই বুড়ো শেয়ালটা। পরলোকভীরু এই গর্ভদাস। আমি রাজশ্যালক, অভিজাত পুরুষ, আমি ভয় করি কাকে? (প্রকাশ্যে) ওরে গর্ভদাস, চেট, তুই যা। নির্জন কোনো জায়গায় গিয়ে তুই বিশ্রাম কর।
চেট— আপনি যা বলেন। (বসন্তসেনার কাছে গিয়ে) এইটুকুই আমার করবার মতো ছিল।
শকার— (কোমর বেঁধে) দাঁড়াও, বসন্তসেনা। দাঁড়াও। বধ করছি তোমাকে।
বিট— ইস্! আমার সামনেই বধ করবি। (এই বলে গলা চেপে ধরল )
শকার— (মাটিতে পড়ে গেল) বন্ধু আমাকে মারল। (এই বলে মূর্ছার অভিনয় করল। চেতনা লাভ করে) সবসময় যাকে ঘি খাইয়ে মাংস খাইয়ে তাগড়া করলাম, কাজের সময় সেই কিনা শত্রুর হল! ॥ ২৮ ॥
(চিন্তা করে) ঠিক আছে। উপায় খুঁজে পেয়েছি। বুড়ো শেয়ালটা মাথা নেড়ে (বসন্তসেনাকে) ইশারা করেছিল। তাই একে বিদেয় করে বসন্তসেনাকে বধ করব। তাই হোক। (প্রকাশ্যে) আমি তোমাকে যা বলেছি, পেয়ালার মতো বড়ো বংশে জন্মে আমি সেই কুকাজ করব কেমন করে? তাকে আমার প্রতি অনুকূল করবার জন্যেই একথা বলেছিলাম।
বিট— কুলের কথা তুলে কী হবে, এ বিষয় স্বভাবই আসল। কাঁটাগাছ ভালো ক্ষেতে খুব বেড়ে ওঠে ॥ ২৯ ॥
শকার বন্ধু, তোমার সামনে এ লজ্জা করছে। আমাকে গ্রহণ করছে না। তাই তুমি যাও। স্থাবরক চেটকে আমি তাড়িয়েছি, সে চলেও গিয়েছে।
বিট—(স্বগত) আত্ম-অহংকারে আমার সামনে বসন্তসেনা এই মূর্খকে (প্রেমিকরূপে ) গ্রহণ করবে না। তাই একে একান্তেই রেখে যাই, কারণ নির্জনতাতেই প্রেম আস্বাদ্য হয়ে ওঠে। ৩০ ॥
(প্রকাশ্যে) তাই হোক। আমি যাচ্ছি।
বসন্তসেনা— (তার পরিচ্ছদের প্রান্ত আকর্ষণ করে) আমি যে বলেছি আমি আপনার শরণাগত।
বিট— বসন্তসেনা, ভয় কোরো না, ভয় কোরো না। ছিনাল-পো! বসন্তসেনা তোমার হাতে গচ্ছিত রইল।
শকার— বেশ! আমার হাতে এ গচ্ছিত হয়েই থাকুক।
বিট— সত্যি?
শকার—সত্যি।
বিট— (কিছুটা গিয়ে, স্বগত) কিন্তু আমি গেলে এই নৃশংস একে যদি বধ করে, তাই আড়ালে থেকে এর আচরণ লক্ষ করি। (একান্তে রইল)
শকার— ঠিক আছে, (এবারে) হত্যা করি একে। কিন্তু ধূর্ত-শিরোমণি এই ব্ৰাহ্মণ— এই বুড়ো শেয়ালটা যদি কোথাও লুকিয়ে থেকে (এখান থেকে) গিয়ে শেয়ালের মতো হয়েই যদি ছলনা করে! তাই একে ঠকাবার জন্যে এই করি। (ফুল তুলে নিজেকে সাজাল) বালিকা! বালিকা। বসন্তসেনা! এসো।
বিট— ওহ্ এ দেখি প্রেমিক বনে গেল! যাক, নিশ্চিন্ত হলাম। যাই। (নিষ্ক্রমণ)
শকার— সোনা দিচ্ছি, মিষ্টি কথা বলছি, পাগড়িবাঁধা মাথায় (পায়ে) পড়ছি। তবু ওগো সুদন্তী, তুমি আমাকে গ্রহণ করছ না। (হায়) মানুষ সত্যিই দুঃখময়[১৬] ॥ ৩১ ॥
বসন্তসেনা—এ বিষয়ে সন্দেহের কী আছে? (এই বলে নতমুখে ‘খলচরিত’ ইত্যাদি শ্লোক দুটি আবৃত্তি করল)
দুশ্চরিত্র! অধম! দোষদুষ্ট হয়ে এখানে কেন আমাকে অর্থের লোভ দেখাচ্ছ? সুচরিত্র শুদ্ধদেহ কমলকে ভ্রমরেরা পরিত্যাগ করে না ॥ ৩২ ॥
সৎকুলজাত চরিত্রবান পুরুষ দরিদ্র হলেও তাকে সযত্নে সেবা করা উচিত যোগ্যজনে আশ্রিত প্রেমবাসনা পণ্য নারীদের সৌন্দর্য ॥ ৩৩ ॥
তা ছাড়া,
আম্রতরুর সেবা করে এখন পলাশতরুকে গ্রহণ করতে পারব না।
শকার— বাঁদীর বেটী, দরিদ্র চারুদত্তকে করলি আমগাছ আর আমাকে বললি পলাশগাছ?
কিংশুকও করলি না[১৭]? এইভাবে আমাকে গালমন্দ দিতে দিতে তুই কিনা আজও চারুদত্তকেই স্মরণ করছিস?
বসন্তসেনা— তিনি তো আমার হৃদয়গত হয়েই আছেন, তাঁকে স্মরণ করব কেন?
শকার— আজকেই তোকে আর তোর হৃদয়গত তাকে একসঙ্গেই হত্যা করব। ওরে দরিদ্র বণিকপুত্রের প্রণয়িনী দাঁড়া, দাঁড়া।
বসন্তসেনা— বলো বলো, ওই মনোরম অক্ষরগুলো আবার বলো।
শকার— বাঁদীর ব্যাটা দরিদ্র চারুদত্ত তোকে রক্ষা করুক।
বসন্তসেনা— আমাকে দেখতে পেলে রক্ষা করবেন।
শকার— সে কি ইন্দ্র, বালিপুত্র মহেন্দ্র, রম্ভাপুত্র কালনেমি, সুবন্ধু, রাজা রুদ্র, দ্রোণ-পুত্র জটায়ু, চাণক্য, না ত্রিশঙ্কু[১৮]? ॥ ৩৪ ॥
ও কথা থাক। এঁরাও তোমাকে রক্ষা করতে পারবেন না।
ভারতযুগে চাণক্য যেমন করে সীতাকে বধ করেছিল, জটায়ু, যেমন করে . দ্রৌপদীকে বধ করেছিল তেমনি করেই আমি তোমাকে বধ করব।[১৯]
(মারতে উদ্যত হল)
বসন্তসেনা— হায় জননী! তুমি কোথায়? হায়, আর্য চারুদত্ত, অপূর্ণমনোরথ এই মানুষটি মারা পড়ল। এবারে আমি জোরে চেঁচাব। না থাক। বসন্তসেনা চেঁচাচ্ছে—এ ব্যাপারটা লজ্জারই বটে। আর্য চারুদত্তকে নমস্কার।
শকার— এখনও গর্ভদাসী সেই পাপিষ্ঠের নামই নিচ্ছে।
(কণ্ঠে পীড়ন করল) স্মরণ করো, গর্ভদাসী, স্মরণ করো।
বসন্তসেনা— আর্য চারুদত্তকে নমস্কার।
শকার— মর্ গর্ভদাসী মর্।
(কণ্ঠ পীড়ন করে হত্যার অভিনয়)
(বসন্তসেনা নিশ্চলভাবে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে গেল)
শকার— (সহর্ষে) দোষের পেটিকা, ঔদ্ধত্যের বাসভূমি, দুষ্টা এবং (চারুদত্তের
অনুরক্তা, তারই সঙ্গে বিহারের অভিপ্রায়ে আগত্য, মৃত্যুচালিতাকে (বধ করে) আমি নিজের বাহুর বীরত্ব আর কী বর্ণনা করব? নিশ্বাসরহিত হয়েও দেখি মাতা মৃতা হলেন, ভারতযুগে যেমন সীতা একান্ত মৃতা হয়েছিলেন তেমনি ॥ ৩৬ ॥
আমি তাকে চাইলেও এই গণিকা আমাকে চাইল না তাই ক্রুদ্ধ হয়ে এই নির্জন পুষ্পকরণ্ডক উদ্যানে তাকে হঠাৎ বাহুপাশে সন্ত্রস্ত করে হত্যা করছি। আমার ভাই, বাবা এবং দ্রৌপদীর মতো মা যার ছেলের এই কাজ— এই বীরত্ব দেখতে পেল না, তারা সেবাবঞ্চিত হল (অর্থাৎ আমি বীরত্ব দেখিয়ে পরিতৃপ্ত করে তাদের যে সেবা করতাম সেই সেবা থেকে তারা বঞ্চিত হল) ॥ ৩৭ ॥
যা হোক, এখন বুড়ো শেয়ালটা এসে পড়বে, একটু সরে দাঁড়াই। (তাই করল)
(চেটের সঙ্গে প্রবেশ করে)
বিট— স্থাবরক চেটকে বলে-কয়ে এনেছি। এখন ছিনাল-পোটি কোথায় দেখি। (পরিক্রমা করে তাকিয়ে) এ কী! পথের উপরেই একটা গাছ পড়েছে। পড়ন্ত গাছের চাপে একটি স্ত্রীলোক মারা গিয়েছে। ওহে পাপিষ্ঠ, এমন অকাজ কেন করলে তুমি? তোমার পতনে নিহত স্ত্রীলোক দেখে আমরাও পতিত হলাম। এ এক কুলক্ষণ। সত্যি বলতে কি, বসন্তসেনার জন্যে মনটা উৎকণ্ঠিত হয়ে আছে। দেবতারা সবদিক-দিয়ে মঙ্গল করবেন। (শকারের কাছে এসে) ছিনাল-পো, স্থাবরক চেটকে বলে-কয়ে এনেছি।
শকার— বন্ধু, স্বাগত! পুত্র স্থাবরক, তোমাকেও স্বাগত জানাচ্ছি।
চেট— হ্যাঁ।
বিট— আমার গচ্ছিত ধন ফেরত দাও।
শকার— গচ্ছিত ধন? সে আবার কেমন?
বিট— বসন্তসেনা।
শকার— চলে গিয়েছে।
বিট— কোথায়?
শকার— তোমার পিছে পিছেই।
বিট— (সবিতর্কে) না, সে তো সেদিকে যায়নি।
শকার— তুমি কোনদিক দিয়ে গেলে?
বিট— পূর্ব দিক দিয়ে।
শকার— সে-ও দক্ষিণ দিক দিয়ে গিয়েছে।
বিট— আমি দক্ষিণ দিক দিয়ে গিয়েছি।
শকার— সে-ও উত্তর দিক দিয়ে গিয়েছে
বিট— তুমি অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে কথা বলছ। আমার মন মানছে না। সত্য কথা বলো তো।
শকার— তোমার মাথা আর আমার পায়ের দিব্যি! তোমার হৃদয়কে শান্ত করো। আমি তাকে হত্যা করেছি।
বিট— (সবিষাদে) সত্যি হত্যা করেছ?
শকার— যদি আমার কথায় বিশ্বাস না হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় শ্যালকের প্রথম বীরত্ব প্রত্যক্ষ করো। (দেখাল )
বিট— হায়, হতভাগ্য আমার কী সর্বনাশ হল! (মূর্ছিত হয়ে পড়ে গেল )
শকার— হা! হা! বন্ধু দেখি মরেই গেল!
চেট— ধৈর্য ধরুন, ধৈর্য ধরুন, ভদ্র। নির্বোধের মতো ওই গাড়িটা এখানে এনে আমিই তাকে প্রথম হত্যা করেছি।
বিট— (নিজেকে সামলে নিয়ে, করুণভাবে) হায় বসন্তসেনা!
দাক্ষিণ্যের নদী বিশুষ্ক হয়ে গেল; রতি স্বদেশে যাত্রা করল। হায় অলঙ্কারের অলঙ্কাররূপিণী! হায় সুমুখী! হায় রতিরঙ্গবিলাসিনী! হায় সৌজন্যতটিনী! হায় প্রমোদসৈকতভূমি! হায়! মাদৃশ – (অধম) জনের আশ্রয়রূপিণী! হায়! সৌভাগ্যের পণ্যাবলিপূর্ণ অনঙ্গবিপণি বিনষ্ট হল!
(সাশ্রুনেত্রে) হায়, কী দুর্ভাগ্য, কী দুর্ভাগ্য! তুমি এই যে কাজটা করলে তাতে তোমার কোন অভিপ্রায় চরিতার্থ হবে? পাপের প্রতিমূর্তি তুমি নগরের শ্রীকে ভূলুণ্ঠিত করলে।
(স্বগত), ও, এই পাপী আবার এই গর্হিত কাজের অপরাধটা আমার ঘাড়ে চাপিয়ে না দেয়! যাই এখান থেকে। (পরিক্রমণ)
(শকার এসে তাকে ধরল)
বিট— পাপিষ্ঠ, আমাকে ছুঁয়ো না। তোমাকে বুঝতে আমার বাকি নেই। আমি যাচ্ছি।
শকার— ওহ্, নিজে বসন্তসেনাকে হত্যা করে আমার ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে পালাচ্ছ কোথায়? কী অসহায় অবস্থায় পড়েছি আমি
বিট— গোল্লায় যাও।
শকার— এক-শো স্বর্ণমুদ্রা দেব, এক বোড়িক শুদ্ধ কার্ষাপণ[২০] দেব তোমাকে। আমার এই অপরাধমূলক পরাক্রম সর্বধারণের হোক অর্থাৎ আমার নাম করে প্রকাশ কোরো না।
বিট— ধিক্। শুধু তোমারই হোক।
চেট— ভগবান না করুন! (শকারের হাস্য)
বিট— আনন্দ না থাকুক। হাসি ত্যাগ করো। তোমার বন্ধুত্বে ধিক যে বন্ধুত্ব অবমাননাকর এবং অসম্মানজনক। কখনও যেন তোমার মুখ দেখতে না হয়। ছিন্নধনুর মতো গুণহীন তোমাকে ত্যাগ করছি ॥ ৪১ ॥
শকার— বন্ধু, প্রসন্ন হও, প্রসন্ন হও। এসো, আমরা এই পদ্মসরোবরে নেমে ক্রীড়ামত্ত হই।
বিট— এই নগরের লোক, নিষ্প্রাণ হলেও তোমার সেবায় রত বলে আমাকে পাপী বলেই জানে। যে তুমি নারীহত্যা করেছ এবং যাকে নগরের স্ত্রীলোকেরা ভয়ে অর্ধনিমীলিত চোখে দেখে সেই তোমাকে আমি কেমন করে অনুগমন করব বলো? ।।৪২।।
(করুণভাবে) বসন্তসেনা— হে সুন্দরী! পরজন্মে তুমি আর বারনারী হোয়ো না। হে চরিত্রগুণমণ্ডিতা! তুমি সবংশে জন্ম নিও ॥ ৪৩ ॥
শকার— আমার পুষ্পকরণ্ডক জীর্ণোদ্যানে বসন্তসেনাকে হত্যা করে কোথায় পালাচ্ছ? এসো। আমার শ্যালকের কাছে (রাজার কাছে) তোমাকে জবাবদিহি করতে হবে। (এই বলে তাকে ধরল)
বিট— আহ্, থাম্ মূর্খ! (এই বলে খড়গ আকর্ষণ করল)
শকার— (সভয়ে এগিয়ে এসে) কি রে ভয় পেলি? যা, তবে।
বিট– (স্বগত)— (এখানে) থাকা উচিত হবে না। যেখানে আর্য শর্বিলক ও চন্দনক প্রভৃতিরা আছেন সেইখানে যাই। (নিষ্ক্রান্ত)
শকার— নিপাত যা। ওরে স্থাবরক বাছা! বল তো, আমি কেমন কাজ করলাম?
চেট— কর্তা! খুব খারাপ কাজ করেছেন।
শকার— ওরে চেট! কী বলছিস? অকাজ করেছি? যাক, এই করি, (নানা অলঙ্কার খুলে) আমার দেওয়া এই অলঙ্কার গ্রহণ কর। আমি যতক্ষণ প্রসাধন করব ততক্ষণ এগুলো আমার আর অন্য সময় তোর।
চেট— কর্তা, এগুলো আপনাকেই মানায়। আমার এ দিয়ে কী হবে?
শকার— তাহলে যাও। এই বলদজোড়া নিয়ে আমি যতক্ষণ না আসি ততক্ষণ আমার প্রাসাদের নতুন তৈরি চিলেকোঠায় অপেক্ষা কর।
চেট— আজ্ঞে, আপনার যা আদেশ। (প্রস্থান )
শকার— নিজেকে বাঁচানোর জন্যে বন্ধু অদৃশ্য হলেন। আর এই চেটকেও আমি নতুন তৈরি চিলেকোঠায় শিকলে বেঁধে রাখব। তাহলে ব্যাপারটা গোপন থাকবে। এখন বরং একে দেখি। এ কি সত্যিই মরেছে না আবার মারব? (দেখে) দেখি। ভালো করেই মরেছে। যা হোক, এই চাদর দিয়ে একে ঢাকি। না থাক, এটায় আবার আমার নাম লেখা। কোনো ভদ্রলোক চিনে ফেলবে। বরং ঝোড়ো হাওয়ায় জড়ো হওয়া এই শুষ্ক পাতা দিয়ে ঢাকি। (তাই করে, ভেবে) যা হোক, ঠিক আছে। এবারে আমি এইভাবে অগ্রসর হব— আমি এক্ষুনি আদালতে যাব এবং এই মর্মে একটা নালিশনামা লেখাব যে বণিক চারুদত্ত বসন্তসেনাকে আমার বাগানে এনে টাকার জন্যে একে বধ করেছে। চারুদত্তের বিনাশের জন্যে একটা নতুন চালের আশ্রয় নেব যা পবিত্র নগরীতে পাণ্ডববধের মতো দারুণ ॥ ৪৪ ॥
ঠিক আছে। যাই। (নিষ্ক্রান্ত হয়ে দেখে, সভয়ে) আরে এ তো বড়ো মুশকিল! আমি যে পথেই যাচ্ছি সেই পথেই গেরুয়ারঙে ছোপানো পরিচ্ছদ পরে ওই দুষ্ট বৌদ্ধ সন্ন্যাসী যাচ্ছে। তার নাকে ছিদ্র করে আমি তার সঙ্গে শত্রুতা করে তাকে তাড়িয়ে দিয়েছি! আমাকে দেখে হয়তো সে ফাঁস করে দেবে যে আমিই তাকে মেরেছি। কিন্তু যাব কেমন করে? (দেখে) হ্যাঁ, এই অর্ধেক ধসে পড়া ভাঙা দেয়ালটা লাফিয়ে পার হয়ে পালাই।
(বনের) মহেন্দ্র যেমন আকাশে, পাতালে এবং ‘হনুমৎ-পাহাড়ে’র চূড়ায় ছুটেছিল আমিও তেমনি প্রচণ্ড বেগে ছুটছি[২১] ॥ ৪৫ ॥ (প্ৰস্থান)
(যবনিকা কাঁপিয়ে সংবাহকের প্রবেশ)
ভিক্ষু— আমি এই ছেঁড়া কাপড়টা ধুয়েছি। কোনো শাখায় ঝুলিয়ে শুকিয়ে নেব কি? কিন্তু বানরেই তা শেষ করবে। মাটিতে রাখব? তা হলে ধুলোয় ময়লা হবে। তাহলে কোথায় মেলে শুকোব? (দেখে) দেখেছি। এখানে ঝোড়ো হাওয়ায় জড়ো হওয়া এই শুকনো পাতার রাশিতে রাখি। (তাই করে ‘বুদ্ধকে নমস্কার’। এই বলে বসল) যাক এবারে জপ করি। (‘পঞ্চজনকে যে মেরেছে’ ইত্যাদি শ্লোক উচ্চারণ করল)। অথবা কাজ নেই আমার এ স্বর্গে। যিনি দশটি সুবর্ণমুদ্রা দিয়ে জুয়াড়িদের হাত থেকে আমাকে মুক্ত করেছিলেন, বুদ্ধের উপাসিকা সেই বসন্তসেনার প্রত্যুপকার যতদিন না করতে পারছি ততদিন আমি তাঁর ক্রীতদাস বলে নিজেকে মনে করছি। (দেখে) এ কী, কী একটা এই পাতার মধ্যে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছে মনে হচ্ছে। আমার মনে হয় প্রথমে উষ্ণ হাওয়ায় তপ্ত হয়ে এবং পরে ছেঁড়া কাপড় নিড়ানো জল পড়ায় এই পাতাগুলো স্পন্দিত হচ্ছে। পালক ছড়ানো পাখির পাখার মতোই দেখছি পাতাগুলোকে ॥ ৪৬ ॥
(বসন্তসেনা সংজ্ঞালাভ করে হাত বাড়ালো)
এ কী এ কী! সুন্দর গয়নাপরা স্ত্রীলোকের দুটো হাত বেরিয়ে আসছে দেখছি! (নানাভাবে দেখে) আমি এ হাতকে চিনি। অথবা সংশয় নিরর্থক, এই হাতই আমাকে অভয় দিয়েছিল। যাক, দেখি।
(পাতা সরিয়ে দেখে চিনতে পারার অভিনয় করে
এই সেই বুদ্ধ উপাসিকা!
(বসন্তসেনা জল চাইল)
এ কী? জল চাইছে দেখছি। দিঘি তো দূরে। এখন কী করা যায়? যা হোক, এই ছেঁড়া কাপড়খানাই এর দেহে বিছিয়ে দিই। (তাই করল)
(বসন্তসেনা সংজ্ঞা লাভ করে উঠল। ভিক্ষু বস্ত্রপ্রান্ত দিয়ে তাঁকে হাওয়া করতে লাগল)
বসন্তসেনা— আর্য, আপনি কে?
ভিক্ষু— দশটি সুবর্ণমুদ্রায় যাকে কিনেছিলেন তাকে কি বুদ্ধ-উপাসিকা মনে করতে পারছেন না?
বসন্তসেনা— মনে পড়েছে। তবে আপনি যেভাবে বললেন (অর্থাৎ আপনার পরিচয় দিলেন) সেটা ঠিক নয়। আমি মরে গেলেই ভালো হত।
ভিক্ষু— বুদ্ধোপাসিকা! ব্যাপারটা কী?
বসন্তসেনা— (সখেদে) বেশ্যার যা হওয়া উচিত তাই।
ভিক্ষু— বুদ্ধোপাসিকা! আপনি এই গাছের কাছেই বেড়ে ওঠা লতা অবলম্বন করে দাঁড়ান।
(বসন্তসেনা তাই ধরে উঠলেন)
এই বিহারে আমার ধর্মভগিনী আছে। সেইখানে আপনি একটু আশ্বস্ত হয়ে তারপর বাড়ি যাবেন। তা হলে আপনি ধীরে ধীরে চলুন।
যে হাত-মুখ আর ইন্দ্রিয়ের চালনায় সংযত সেই প্রকৃত মানুষ। রাজার আদালত তার কী করতে পারে? পরলোক তার হাতের মুঠোয় স্থির হয়ে থাকে।
॥ ‘বসন্তসেনা মোটন’ নামে অষ্টম অঙ্ক সমাপ্ত ॥
—
টীকা
১. মনে ‘ধর্মাণাং’ পদটি সাধারণভাবে ধর্মীয় কর্তব্যসমূহকে না বুঝিয়ে বৌদ্ধধর্ম স্বীকৃত অষ্টাঙ্গিকমার্গকে বোঝাচ্ছে বলে মনে হয়।
২. তুলনীয় :
কৃপ্তকেশনখশ্মশ্রুঃ পাত্রী দণ্ডী কুসুম্ভবান্।
বিচরেন্নিয়তো নিত্যং সর্বক্তৃতান্যপীড়ান্ ॥
মনুসংহিতা ৬, ৫২
৩. চিত্তশুদ্ধিই ধর্মের সার এ কথাই এ অংশের প্রতিপাদ্য।
তুলনীয় :
কিং তহ দীবে কিং তহ ণিবেজ্জ কিং তহ কিজ্জই সংতহ সেব্ব।
কিং তহ তিখ তপোবন জাই মোক্খ কি লভই পাণী হাই ॥
দীপ ও নৈবেদ্যে কী হবে? মন্ত্র-সেবাতেই-বা কী হবে? তীর্থে তপোবনে গিয়েই-বা কী হবে? জলে স্নান করলেই কি মোক্ষলাভ হয়?
৪. মল্লদীক্ষিতাদি অনেকেই ‘শলাবকে’ শব্দটার সংস্কৃত রূপ ধরেছেন ‘চার্বাকঃ’। এটা কষ্টকল্পনা বলেই মনে হয়। শলাবকের সংস্কৃত রূপ হতে পারে শ্রাবকঃ। ‘শ্রাবক’ মানে যিনি ধর্মকথা শোনেন, ‘শরাবক’ মানে সরা (মৃৎপাত্র)
৫. কুলিখ = কলাই বিশেষ, কুলতি কলাই।
৬. পুরাকাহিনী থেকে উপমা দিতে গিয়ে শকার কোনো ভুল করেনি এবার,
উপমাটিও সুন্দর।
৭-৮. এখানে কিন্তু শকার আবার নিজমূর্তি ধারণ করল। শব্দব্যবহারে বৈপরীত্য ঘটিয়ে সে আবার হাস্যাসম্পদ হল।
৯. তুলনীয় :
ন বিষমমৃতীকর্তুং শক্যং প্রযত্নশতৈরপি
ত্যজতি কটুতাং ন স্বাং নিম্বঃ স্থিতোহপিপয়োদ্রদে।
গুণপরিচিতামার্যাং বাণীং ন জল্পতি দুর্জন-
শ্চিরমপি বলাঋাতে লোহে কুতঃ কনকাকৃতিঃ ॥
(দণ্ডিত হীরানন্দ্ উদ্ধৃত)
১০. বসন্তসেনাকে শৃগালের সঙ্গে তুলনা শকারী __ বটে!
১১. জটায়ু কেন বালিদয়িতায় কেশ আকর্ষণ করবে? অবশ্য, শকারের অভিধানে নেই এমন কীই-বা আছে?
১২. ধ্বন্যাত্মক শব্দগুলো হাড়চোষার এবং হাড়চিবানোর নানা শব্দের অনুকরণ।
১৩. একটা মহৎ ভাবের কথা অল্পের মধ্যে আশ্চর্য সুন্দর করে বলেছে বিট। প্রবাদবাক্য হবার মতো প্রকাশকভঙ্গিটি।
১৪. তুলনীয় :
দ্যৌভূমিরাপো হৃদয়ং চন্দ্ৰাকাগ্ন্যিমানিলাঃ।
রাত্রিঃ সন্ধ্যে চ ধর্মশ্চ বৃত্তজ্ঞাঃ সর্বদেহিনাম্ ॥ মনু ৮, ৮৬
১৫. তুলনীয় :
‘My life thou shalt command, but not my shame : (ডিউক অফ নরফোকের উক্তি)
King Richard II 1. 166–169 ১৬.
১৬. শকার নিজের দুঃখের কথা ভেবে একথা বলছে কিন্তু সে যে অন্যের দুঃখের কারণ নিজেই হচ্ছে তার বেলা?
১৭. পলাশ আর কিংশুক সমার্থক। কিন্তু ‘পলা’ শব্দটির আর একটি অর্থ রাক্ষস (যে পল অর্থাৎ কাঁচা মাংস খায়)। শকার ধরে নিল বসন্তসেনা তাকে রাক্ষস বলে গাল দিচ্ছেন। বসন্তসেনা ‘পলাশ’ কথাটি ‘নির্গন্ধ’ বা নির্গুণ অর্থে ব্যবহার করেছিলেন বলাই বাহুল্য।
১৮-১৯. শকারেরই সেই পৌরাণিক নাম বা ঘটনা ঘুলিয়ে ফেলার আশ্চর্য দক্ষতা!
২০. মনুস্মৃতির মতে কার্ষাপণ তাম্রমুদ্রা। অমরকোষে কার্ষাপণ রৌপ্যমুদ্রা বলে উল্লিখিত। পৃথ্বীধরের মতে এর মূল্য এক টাকা, বোড়িকের মূল্য বিশ-কড়ি এবং এই মুদ্রা গৌড়দেশে প্রচলিত ছিল।
২১. মহেন্দ্ৰ অন্যতম কুলপর্বত :
মহেন্দ্রো মলয়ঃ সহ্যঃ শক্তিমানূক্ষপৰ্বতঃ।
বিন্ধ্যশ্চ পরিপাত্রশ্চ সপ্তৈতে কুলপর্বতাঃ ॥
শকারের বলা উচিত ছিল : শূন্যপথে লঙ্কায় যেতে হনুমান মর্ত্য ও পাতাল এবং মহেন্দ্র পর্বতের উপর দিয়ে গেল।
