মৃত কৈটভ ১.১০
(১০)
আজ সেই অমাবস্যার রাত। আজকে রাতেই সম্পন্ন হবে বারো বছর অন্তর পালন করা বিধি। গ্রামবাসীরা একে একে নিজের কুঁড়ে ঘড় ছেড়ে বেরিয়ে আসতে লাগল। রাত তখন তিনটে। রামানুজ, সিনহা, দাসবাবু, অজিত, কাঞ্চন সকলে গ্রামের বাইরের সড়কের উপর এক কোনে আস্তানা গেড়েছে। আজ রাত্রে ঠিক কী হয় দেখার আগ্রহ সকলের। কাঞ্চন বাদে এই দৃশ্য আর কেউ আগে দেখেনি। তাছাড়া এই জঙ্গলের ভবিষ্যৎ কোনদিকে যাবে সেইদিকে একটা আভাস আজকে মিললেও মিলতে পারে।
গ্রামের ঠিক মাঝখানের অংশটায় একটা অগ্নিকুণ্ড জ্বলছে। অগ্নিকুণ্ডের সামনে আসনে বসে আসেন এই গ্রামের হেমন্তাই। হেমন্তাই শুভ্র সাদা বসনে তিনি যজ্ঞ কুণ্ডের আগুনে ঘৃতাহুতি দিচ্ছেন। ঠিক সামনেই রয়েছে এই গ্রামের আরাধ্য দেবতার মন্দির। একে একে গ্রামবাসী এসে জড়ো হতে শুরু করল। একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে ওরা এবার সমগ্র পূজা পদ্ধতির প্রয়োগ দেখবেন।
হেমন্তাই তার সামনে পোঁতা বিভিন্ন গাছের ডালের পুজো শুরু করেছেন। দু-জন সহকারী রয়েছে হেমন্তাইয়ের পাশে। রামানুজ ওদের চিনতে পারল। ওরাই একদিন তার উপর চড়াও হয়েছিল হেমন্তাইকে বাঁচাতে। একজন মাঝে মাঝে শিঙার মতো দেখতে একটা বাদ্যযন্ত্রে ফুঁ দিচ্ছে। ফলে তা থেকে জোরালো শব্দ বেরুচ্ছে। অপর সহকারী একইরকম দেখতে আরেকটি যন্ত্রে ফুঁ দিচ্ছে, তা থেকে আগুনের শিখা বেরুচ্ছে। এর মাঝেই হেমন্তাই তার নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার গাছেদের পূজার্চনা করছে। পূজোপকরণে রয়েছে ঘি, মধু, দুধ, ফল, বনজ ফুল এবং বিভিন্ন প্রকার গাছের ডাল।
কিছু সময় পর গ্রামের অন্য প্রান্ত থেকে কিছু মানুষ এসে উপস্থিত হল। তাদের বেশভূষা সৈনিকদের মতো। ওদের হাতে রয়েছে অস্ত্র শস্ত্র। কার হাতে কুঠার, কারো হাতে তীর ধনুক, কারো হাতে ধারালো অস্ত্রাদি। ওরা জঙ্গলের দিকে মুখে করে এবং অস্ত্র তাগ করে দাঁড়িয়ে রইল। ওদের উদ্দেশ্য ঠিক কী, কাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে ওরা উপস্থিত তা বোঝা গেল না। ওরা আসতেই গ্রামবাসী কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। ওরা যে আবাসন থেকে এসেছে তা বোঝা যাচ্ছে। কারণ ওদের সমস্ত বিদ্যাশিক্ষা ওখানেই হয়, আর ওরা এসেছেও আবাসনের দিক থেকেই।
কাঞ্চন বলল, “কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা চলে আসবে। তারপর যুদ্ধ শুরু হবে। বাবা ইতিমধ্যে নির্যাস থেকে সৃষ্ট সেই বায়ুগন্ধী পদার্থ ব্যবহার করেছেন।”
সড়কের এপারেও ভেসে আসছে সেই পদার্থের মিষ্টতা। সিনহা বললেন, “সাধারণ মানুষ এই গন্ধ শুঁকলে কোনো অসুবিধে হয় না তো?”
কাঞ্চন হাসল। হেসে বলল, “আমাদের গ্রামের সবাই কিন্তু সাধারণ মানুষ। এটা শুধু ওই মনুষ্যরূপী জানোয়ারদের ডাকার জন্যই। ওরাই শুধু এতে আকৃষ্ট হয়। এতে রক্তের গন্ধ আছে। কিন্তু আমি আপনি সেটা পাবো না। শুধুমাত্র ওরাই এই গন্ধ শুঁকতে সক্ষম। তাই তো এর নাম বায়ুগন্ধী।”
রামানুজ তারিফের সুরে বলল, “তোমাদের গ্রামের আবিষ্কারগুলো মারাত্মক। বহির্বিশ্বে কোটি টাকায় বিক্রি হতে পারে পেটেন্ট।”
কাঞ্চন বলল, “এগুলো সবই মানবসভ্যতার দান। এত হাজার হাজার বছরের পরিশ্রম, অধ্যাবসায়ের ফল। টাকা দিয়ে এর মূল্য হবে না দাদা। গ্রামের লোক কোনোদিন এই ফর্মুলাগুলো বিক্রি করবে না।”
রামানুজ বলল, “তা ঠিক।”
প্রতীক্ষা চলতে লাগল কখন জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসবে শয়তানের দল। গ্রামবাসী অপেক্ষা করছে। সিপাহীরা জঙ্গলের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। ওরা পরে আছে বাঘের ছাল কাটা পোশাক। মাথায় ওদের মুকুট। কপালে রঙিন তিলক। গালেও বিভিন্ন রঙিন আঁকাবুকি।
ওরা অধীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি ওদের সজাগ। হেমন্তাই এক পাশে বসে অপেক্ষা করছেন কখন ওরা আসবে।
ওরা এলেই তিনি মন্দিরের ভিতরে ঢুকে পড়বেন। আজ হেমন্তাইকে দেখলে সাধারণ অন্যদিনের হেমন্তাই মানুষটার সঙ্গে পার্থক্য বোঝা যাবে।
আজ তিনি রুদ্র তেজে তেজিয়ান। সাদা শুভ্র বস্ত্রে পরিহিত তার চোখ দুটো যেন জ্বলন্ত ভাটা।
গ্রামের পক্ষে যা অকল্যাণকর সমস্ত কিছু মুছে দিতে তিনি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
আজ তিনি কারো পিতা নন, কারো সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি শুধু গ্রামের অভিভাবক।
এই বিপুল আয়োজনের ধারক ও বাহক তিনি। আজকের দিনটাই তাঁর হেমন্তাই হবার শেষ রাত। তারপর সিংহাসনে বসবেন অন্য কেউ।
আজ রাতেই তাঁর সমস্ত তেজ তিনি ঢালতে চাইছেন গ্রামের মঙ্গলের জন্য।
প্রয়োজনে আজ নিজে হাতে তরবারি নিয়ে মাঠে নামতেও রাজি তিনি। তার পূর্বসূরিরা বহুবার এই কাজ করে দেখিয়েছেন, আজ তার পালা।
তিনি অপেক্ষায় আছেন, কখন ওরা আসবে।
কিন্তু অপেক্ষা দীর্ঘায়িত হতে থাকল। সড়কের উপর সকলে পায়চারি করছে, সিগরেট খেয়ে সময় কাটাচ্ছে।
চোখে একটু ঘুম ঘুম ভাবও চলে আসছে অনেকের। গ্রামবাসীরাও অপেক্ষায়। অপেক্ষায় উপজাতি সিপাহীরা। কিন্তু আজ কিছুই ঘটল না।
প্রায় ভোর সাড়ে পাঁচটা বেজে গেল। কিন্তু কেউ এল না। হেমন্তাই এবার চিন্তায় পড়লেন। এরকম তো আগে কখনো ঘটেনি।
ওরা কি জঙ্গলে পথ হারিয়েছে? নাকি বায়ুগন্ধী পদার্থ তার কার্যে বিফল হচ্ছে?
এক সময় দেখা গেল আবাসনের গুরুদেব ছুটে এসেছেন। ওখানে একটা জটলা তৈরি হয়েছে। রামানুজ একটা সিগরেট খাচ্ছিল।
এবার তার ধৈর্য জবাব দিয়ে দিল। সে সিগরেটটা নিভিয়ে সোজা হাঁটা লাগাল গ্রামের দিকে।
পিছন থেকে বাকিরা ডাকল, “স্যর, স্যর… ক্রিয়া চলাকালীন গ্রামে ঢুকবেন না।”
কাজ হল না। রামানুজ কোনো কথা না বলে সোজা হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে হাজির হল হেমন্তাই আর গুরুদেবের সামনে।
সকলের মুখ থমথমে। রামানুজ জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?”
হেমন্তাই চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন। কোনো অজানা আশঙ্কায় তার মন আকুল হয়ে আছে এই মুহূর্তে।
রামানুজকে উত্তরটা দিলেন গুরুদেব, “জঙ্গলে কোনো মানুষ হাঁটাহাঁটি করলে আমরা সেটা আবাসন থেকে বুঝতে পারি। বিভিন্ন জায়গায় আমরা নজরদারি রেখেছি। অধিকাংশই অডিও মাধ্যমের সাহায্যে। আমরা শব্দ শুনে হাঁটাচলা ইত্যাদি বুঝতে পারি। আমরা সেখানকার কম্পাঙ্ক দেখে বুঝতে পারছি যে সেখানে কিছু প্রাণী হাঁটাচলা করছে। এগুলো সাধারণ পশুর হাঁটাচলা থেকে ভিন্ন।
রামানুজ জিজ্ঞেস করল, “কোনো ভিডিও মাধ্যম নেই?”
গুরুদেব বারকয়েক তাকালেন হেমন্তাইয়ের দিকে। হেমন্তাইয়ের চোখের দৃষ্টি দেখে কিছুই বোঝা গেল না। রামানুজ পরিস্থিতি বুঝে বলল, “আপনি নিশ্চিন্তে বলুন।
আমি এই গ্রামের সমস্ত কিছুই জানি। আর আমরা আপনাদের সাহায্য করতে চাই। আপনি নির্দ্বিধায় বলুন।”
গুরুদেব পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পেরে বললেন, “আগে ছিল না। বর্তমানে টেকনোলজি উন্নত হবার পর আমরা সি সি টিভি বসিয়েছিলাম। তাই ভিডিও দেখার ব্যবস্থা আছে একটা। তবে সেটা জঙ্গলের এক কিলোমিটারের কাছাকাছি অঞ্চলে লাগানো আছে।
“সেখানে কী দেখতে পেয়েছেন? যাদের আসার কথা এখানে সেই জানোয়ার বা শয়তানগুলোকেই কি দেখেছেন?”
গুরুদেব মাথা নাড়লেন। বললেন, “হ্যাঁ তারাই। তবে বর্ধিত আকারে এবং এই অভিমুখে ওরা আসছে না। ইতস্তত ঘোরাঘুরি করছে।”
“এখন কি তাদের আর কোনোভাবে ট্র্যাক করা যাচ্ছে?”
গুরুদেব হতাশভাবে মাথা নাড়লেন।
রামানুজ বলল, “বর্ধিত আকারের কোনো কারণ?”
এবার হেমন্তাই বললেন, “সাধারণভাবে আকার বৃদ্ধি ঘটার কোনো কারণ নেই। যদি না কেউ এরকম কোনো কিছু তৈরি করে থাকে সেখানে, যা ওদের বর্ধিত আকারের জন্য দায়ী।”
রামানুজ জিজ্ঞেস করল, “আর কোনো আশঙ্কা?”
হেমন্তাই গুরুদেবের দিকে তাকালেন। গুরুদেবের মুখ চোখ কালো হয়ে এসেছে। রামানুজ আবার জিজ্ঞেস করল, “আর কী সম্ভাবনা থাকতে পারে?”
এবার গুরুদেব বাধ্য হয়ে মুখ খুললেন, “যদি বারোজনের কেউ বা সকলে মিলে জীবাণু বিধ্বংসী কোনো ওষুধ তৈরি করে ফেলে এবং তার ব্যবহারের ফলে ওদের চেতনা ফিরে আসে তবে তা বিধ্বংসী ডেকে আনতে পারে। যদি ওদের চেতনা আর জান্তব শক্তি দুইই একইসঙ্গে কার্যকরী থাকে তাহলে ওরা প্রায় অজেয় হয়ে যাবে। আর এটা এই কারণে বলছি কারণ দেবতার শরীর থেকে যে নির্যাস বের হয় তা দিয়ে সঠিক গবেষণার মাধ্যমে তৈরি করা যায় না এরকম অসামান্য বস্তু কমই আছে। আমাদের কল্পনাতেও যা সম্ভব নয় সেরকম বস্তু তৈরি করা যায় এই তরল জেলি পদার্থের মাধ্যমে। এমনকি কেউ চাইলে অমর হবার মহৌষধি তৈরি করতে পারে এগুলো দিয়ে।”
রামানুজ বিস্মিত হয়ে গেল এসব শুনে। জিজ্ঞেস করল, “এসব কি ওই বারোজন জানে?”
গুরুদেব রেগে গেলেন, “কী বলছেন আপনি? ওরা আমার আবাসনের সেরা বারোজন। সঠিক গবেষণাসহ সমস্ত বিদ্যা ওদের করায়ত্ত। ওদের আগে কত শত পরীক্ষা হয়েছে, তাদের বেশ কিছু সফল। বৃষ্টি আহ্বায়ক পদার্থের কাজ তো আপনি নিজেই দেখলেন। ওরা সব পারে। এখন ওরা যদি ভালোর পরিবর্তে মন্দের বশে চলে যায়…”
গুরুদেব কথাটা শেষ করলেন না। শুধু একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেললেন।
হেমন্তাই বললেন, “যদি ওরা সামনে দিয়ে না বেরিয়ে বাংলাদেশের দিকে বের হয় এবং ছড়িয়ে পড়ে তবে সমস্ত কিছু শেষ হয়ে যাবে। ওদের শরীরে যা বিষ আছে তা অকল্পনীয়। এক বছরে একটা মানুষ সম্পূর্ণ বোধবুদ্ধিহীন শয়তানে পরিণত হয় ওদের আঁচড়, কামড় বা সংস্পর্শ সমস্ত কিছু ক্ষতিকর।
রামানুজ ওদের ভরসা দিয়ে বলল, “এরকম কিছুই হবে না। আমাদের জঙ্গলে ঢুকতে দিন। প্রয়োজনে আপনাদের মধ্যে যারা অস্ত্রবিদ্যায় পটু তাদেরও আমাদের সঙ্গে দিন।”
“কিন্তু…”
গুরুদেব কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। তাকে হেমন্তাই হাত তুলে বাধা দিলেন, “এখন একজোট হয়ে কাজ করাতেই আমাদের মঙ্গল। সরকারি সিপাহী আর আমাদের সিপাহীরা একত্রে হানা দিক। ওদের খুঁজে খুঁজে হত্যা করাটাই এখন আসল কাজ।
আসেপাশে কিছু গ্রামবাসীও কথাবার্তা শুনছিল। সরকারি অফিসারেরা সকলে জঙ্গলে ঢুকবে জানতে পেরে একটা গুঞ্জন উঠল। রামানুজ সকলের উদ্দেশে বলল-
“এই জঙ্গলের ভাগ্য আমার হাতের উপর। আমি যদি দেখি সত্যিই এই জঙ্গল সরকারের হাতে গেলে গ্রামের তো বটেই সমস্ত মানব সভ্যতার উপর বিপদের ছায়া নেমে আসবে, আমি নিশ্চয়ই এই সিদ্ধান্ত নেবো না। আপনারা আমাকে বিশ্বাস করুন। এই মুহূর্তে ওই শয়তানদের হত্যা করাটাই আসল কাজ। নইলে এতদিনের সমস্তকিছু নষ্ট হয়ে যাবে।”
কথাটা বলেই সে গুরুদেব আর হেমন্তাইয়ের দিকে হাত বাড়াল। গ্রামবাসীদের দিকে একবার তাকিয়ে হেমন্তাই সেই হাত ধরল।
গুরুদেবও সেই হাত ধরতে দেরি করল না। রামানুজ চিৎকার করে উঠল, “জয় গন্দবেরুন্দা নৃসিংহদেব।”
এই চিৎকারে কাজ হল। গ্রামের সকলের মুখে তৃপ্তি হাসি ফুটে উঠল। পরক্ষণেই গর্জে উঠল তারা, “জয় গন্দবেরুন্দা নৃসিংহদেব। জয় গন্দবেরুন্দা
নৃসিংহদেব।”
রামানুজ ছুটল সড়কের কাছে। দাসবাবুরা কেউ গ্রামে প্রবেশ করেননি। ওখানে গিয়ে সে সিনহাকে বলল, “ফোর্সকে বলুন চলে আসতে। আমরা এখন জঙ্গলে ঢুকছি।”
বাকি ওখানে যা যা কথা হল তা সংক্ষেপে সবাইকে বুঝিয়ে দিল সে। সকলেই গ্রামে প্রবেশ করতে উদ্যত হলেন।
তখনই কাঞ্চন বলল, “আমি যাবো না জঙ্গলে। আমি বরং বাংলোতে থাকি। আমার ইচ্ছে নেই আর এসবে সরাসরি ঢোকার।”
রামানুজ এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত রাখল। কাঞ্চন ফিরে বাংলোর পথে এগোলো। বাকিরা গ্রামের ভিতরে ঢুকে পড়ল।
বাহিনী আসতে কুড়ি মিনিট সময় লাগল মাত্র। ততক্ষণে সকলেই তৈরি হয়ে গেছে। ঠিক হল হেমন্তাই গ্রামেই থাকবেন।
গুরুদেবসহ সকল উপজাতি সিপাহিরা জঙ্গলে ঢুকবেন রামানুজদের সঙ্গে।
হেমন্তাই জঙ্গলে ঢোকার আগে রামানুজের কাছে এল।
“ভাবিনি কখনো একযোগে কাজ করব এভাবে। দেবতা যা করেন ভালোর জন্যেই করেন। আপনার কাছে শুধু একটাই আর্জি, সেদিন বাবা হিসেবে যা যা বলেছিলাম সমস্তটাই ছিল আমার সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে। আমি থাকি বা না থাকি, আপনি কিন্তু আমার কাঞ্চনের একটা ভালো ব্যবস্থা করে দেবেন। সে এই গ্রামে থাকার ছেলে নয়। আপনি কথাটা দিন।”
রামানুজ এই মুহূর্তে আর অন্য কিছু ভাবার অবস্থায় ছিল না। এতদিনের চেষ্টায় জঙ্গলে ঢোকার সুযোগ সে পেয়েছে।
এখন ভিতরে ঢুকে কী পরিস্থিতি আছে জঙ্গলের, কীভাবে সমস্যার সমাধান করতে হবে এসবই তার মাথায় ঘুরছে।
তবুও সে হেমন্তাইয়ের কথাটা মন দিয়ে শুনল। তাঁর হাতে নিজের হাত রেখে বলল, “কাঞ্চনের একটা ব্যবস্থা না দেখে আমি শহর ছাড়ব না। আপাতত জঙ্গল থেকে বেঁচে ফিরি, তারপর সব হবে।”
হেমন্তাই মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি দিলেন। রামানুজ সিনহার দিকে এগিয়ে গেল। সিনহা সহ সকলে তখন মাথায় হেলমেট পরছেন।
প্রত্যেকটা হেলমেটে লাগানো আছে একটা টর্চ। রামানুজও সেরকম একটা হেলমেট পরে নিলো।
সিনহা কমান্ড দিল, “আমাদের কাছে খবর আছে জঙ্গলে কিছু মানুষ সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত। যদি এরকম কোনো মানুষ আমাদের সামনে আসে তাহলে তাকে শুট করার আগে তার পরিস্থিতি একবার বোঝার চেষ্টা করবে। যদি দেখা যায় সে আত্মসমর্পণ করছে তাহলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে রেসকিউ করবে এবং হাসপাতালে পাঠাবার ব্যবস্থা করবে। আর যদি সে আক্রমণ করতে আসে তাহলে ঠিক মাথার মাঝখানে বা কপালে গুলি করবে। আমরা জানতে পেরেছি একমাত্র সেখানে গুলি করলেই ওদের মৃত্যু সুনিশ্চিত হবে। আর একটা কথা, ওদের দাঁতের কামড় বা নখের আঁচড় শরীরে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে জঙ্গল ত্যাগ করবে এবং হাসপাতালে মুভ করবে। জঙ্গলে আমরা কোনো সময় আলাদা হয়ে যেতে পারি। কিন্তু অর্ডারের কোনো অন্যথা হবে না। ক্লিয়ার?”
সমবেতভাবে বাহিনী জানালো,
“ক্লিয়ার স্যর।”
“গ্রেট। ফোর্স এগিয়ে চলো। জয় মা ভবানী।”
আবার সমবেত গর্জন, “জয় মা ভবানী।”
সকলে জঙ্গলের পথে পা বাড়ালেন। হেমন্তাই সেই দৃশ্য দেখছিলেন। যতক্ষণ তাদের দেখা গেল তিনি ওখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
তারপর ওরা জঙ্গলের ভিতরে অদৃশ্য হয়ে গেলে তিনি গ্রামবাসীদের উদ্দেশে বললেন, “প্রায় সকাল হয়ে গেছে বটে, কিন্তু আপনারা ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে থাকুন। ওরা যদি কোনো কারণে গ্রামে চলে আসে তাহলে খুব সমস্যা হয়ে যাবে। ঘর থেকে না বেরোনোই মঙ্গল।”
গ্রামবাসীরা আর দেরি করল না। প্রত্যেকে নিজের নিজের ঘরে ঢুকে গেল। হেমন্তাইও ধীরে ধীরে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন।
দু-জন শিষ্য তার সঙ্গে রইলো। হেমন্তাই ঘরে ঢুকলে ওরা বাইরে পাহারা দিতে লাগল।
ওদিকে জঙ্গলে তোলপাড় চলছে। পুরো বাহিনী সমস্ত জঙ্গল তছনছ করতে করতে এগোচ্ছে।
অমাবস্যার রাতের নীরব নিস্তব্ধ জঙ্গলের শান্তি হঠাৎই ভঙ্গ হয়েছে। চারদিকে টর্চের আলোকের বলয় ছোটাছুটি করছে।
ছোটো খাটো লতা গুল্ম সমস্তকিছু বেয়নেটের ধারালো ফলার আঘাতে কচুকাটা হচ্ছে। জঙ্গলের প্রথম দিকের অধিকাংশ অঞ্চল পুড়ে আছে।
গতকাল জঙ্গল জুড়ে যে বিস্ফোরণ ঘটেছে তার দাগ বহন করছে জঙ্গল। সকলেই প্রায় ছুটছে সামনের দিকে।
সকলের গন্তব্য জঙ্গলের সেই অংশের দিকে যেখানে মন্দির এবং পরীক্ষাগার আছে।
গুরুদেবের বয়স মন্দ নয়। ষাটোর্ধ্ব তো হবেনই। তবু তিনি যে গতিতে ছুটছেন হাতে একটা তলোয়ার নিয়ে সেই গতিতে দাসবাবু আর সিনহা ছুটতে পারছেন না।
জঙ্গলের একটা অংশে গিয়ে সকলের মনে হল এভাবে একমুখীভাবে ছুটলে জঙ্গলের বহু অংশ খোঁজা যাবে না বা খুঁজতে সময় লাগবে।
এটা বোঝা মাত্র রামানুজ সিনহাকে জানালেন। সিনহা তৎক্ষণাৎ সকলকে বললেন,
“তিন ভাগে ভাগ হয়ে যাও সবাই। প্রতিভাগে গ্রামের লোক থাকুন যাতে আমাদের মন্দিরে পৌঁছাতে অসুবিধে না হয়। নিজেদের মধ্যে এক বা দেড় কিলোমিটার দূরত্ব বজায় রেখে একটা অর্ধ গোলক তৈরি করুন। তাতে অন্তত আমরা এখন যতটা জঙ্গল কভার করছি তার চারগুণ বেশি কভার করতে পারব।
সঙ্গে সঙ্গে ডান দিক ও বাঁ-দিক বরাবর ফোর্স আলাদা হয়ে গেল। মাঝের বাহিনীতে গুরুদেব আর রামানুজ রইল।
সিনহা গেলেন ডানদিকে, দাসবাবু গেলেন বাঁ-দিকে। সঙ্গে গ্রামের আবাসনের সিপাহিরা তিনভাগে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল।
সমস্ত জঙ্গল খুঁজে কিছুই পাওয়া গেল না। ভোরের আলো ফুটতে সময় লাগল, কিন্তু একসময় সেই আলো প্রকাশিত হল।
এই দিনের বেলাতেও কুয়াশায় ঢেকে আছে চারদিক। প্রায় কিছুই দেখা যায় না। তাছাড়া ঘন জঙ্গলের ভিতরে আলো প্রায় পৌঁছায় না।
ফলে খোঁজ করা আরও বেশি কঠিন হয়ে পড়ছে। জঙ্গলের প্রথম এক কিলোমিটার পেরিয়েছে অনেকক্ষণ হল।
দ্রুতগতিতে জঙ্গলের একেবারে গভীরে প্রবেশ করতে লাগল ওরা।
ওদিকে বেলা বেড়ে চলেছে। কিন্তু গ্রাম আজ অদ্ভুত শুনশান।
কেউ ঘর ছেড়ে বেরুচ্ছে না। তাপমাত্রা আজ মাত্র ৫ ডিগ্রি। রাতে চাঁদ ছিল না, আজ সকাল থেকে সূর্যের দেখা নেই।
কুয়াশার ঘন চাদরে শুধু গ্রাম নয়, পুরো আগরতলা ঢাকা। পাহাড়ি অঞ্চলে এই কুয়াশা বরং অধিক ঘন।
হেমন্তাই সেই যে ভোরে এসে ঘরের মধ্যে বসেছেন এখনও ওঠেননি। ধ্যান করছেন তিনি। দেবতার ধ্যান। গন্দবেরুন্দার ধ্যান।
প্রায় তিন ঘণ্টা কেটে গেছে। তিনি ধ্যান থেকে ওঠেননি। এক মনে তিনি গ্রামের মঙ্গলের জন্য নিজের আসনে উপবিষ্ট হয়ে সাধনা করে চলেছেন।
ঘর অল্প আলোকিত। এই ঠান্ডার মধ্যেও তার গায়ে শুধুমাত্র এক খণ্ড শ্বেত বস্ত্র।
ঠিক তখনই তিনি ডাকটা শুনতে পেলেন।
“হেমন্তাই, হেমন্তাই।”
হেমন্তাই প্রথমে বুঝতে পারলেন না। ভাবলেন তার শিষ্যদের কেউ প্রয়োজনে ডাকছে। কিন্তু ওরা তো তার ধ্যানের সময় বিরক্ত করে না!
কোনো জরুরি দরকার নিশ্চয়ই। তিনি গলা ছেড়ে হাঁক পারলেন, “কী দরকার?”‘
উত্তর এল না। বরং আবার ডাকটা ভেসে এল।
“হেমন্তাই হেমন্তাই।”
এবার হেমন্তাই একটু বিস্মিত হলেন। গন্দবেরুন্দাকে প্রণাম করে উঠে পড়লেন ধ্যান থেকে। গ্রামের জরুরিকালীন অবস্থা চলছে। ব্যাপারটা গিয়ে
না দেখলেই নয়। দরজা খুলে দিলেন তিনি।
বাইরে ঘন কুয়াশা। কাউকেই দেখা গেল না। ঘরের বাইরে ছাউনি দেওয়া দাওয়া রয়েছে। দাওয়ায় এসে দাঁড়ালেন তিনি।
বললেন, “কে? কই তোরা?”
ঘন কুয়াশায় এক হাত দূরের কিছুও দেখা যাচ্ছে না। শিষ্যদের দেখতে পাচ্ছেন না তিনি। কোনো উত্তর পাওয়া গেল না।
তিনি আবার ডাকলেন, “কোথায় তোরা? কুয়াশায় দেখতে পাচ্ছি না।”
এবার ধীরে ধীরে কুয়াশার ঘন পরদা ভেদ করে উপস্থিত হল এক সৌম্য মূর্তি।
মুন্ডিত মস্তক সেই ব্যক্তিকে দেখে হেমন্তাই প্রথমে চিনতে পারলেন না।
কিন্তু সেই ব্যক্তি কুয়াশা ভেদ করে যত কাছে এলেন হেমন্তাইয়ের শিরদাঁড়া বেয়ে বরফগলা জল বইতে লাগল।
সাদা আলখাল্লা পরা পেশীবহুল গড়নের অধিকারী ব্যক্তি যখন হাত দু’টো পিছনে মুড়ে এসে সামনে দাঁড়ালেন ততক্ষণে হেমন্তাই নিশ্চিত হয়ে গেছেন যে তার সামনে স্বয়ং যম এসে দাঁড়িয়েছেন।
তাঁর মুখ থেকে ছিটকে বেরোলো, “কৈটভ।”
হেমন্তাই চিনতে পেরেছেন কৈটভকে। ওর অভিষেক তো তিনিই করেছিলেন, আজ থেকে বারো বছর আগে।
তারও আগে তিনি আবাসনে প্রথম দেখেছিলেন কৈটভকে। অসাধারণ মেধার অধিকারী ছিল সেই কিশোর। মুখে বিরাজ করতো অদ্ভুত কান্তি।
এরকম কোনো বিদ্যা বাকি ছিল না যা সে চর্চা করেনি। অস্ত্রবিদ্যা, শাস্ত্রবিদ্যা, চিকিৎসা বিদ্যা সমস্ততেই সে ছিল সেরার সেরা।
শক্তি হোক বা বুদ্ধি, সবেতেই সকলকে ছাপিয়ে গিয়েছিল ওই বছরগুলোতে।
এখন তাঁকে বারো বছরের জঙ্গলবাসের পর একেবারে সুস্থ অবস্থায় নিজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হেমন্তাই অনেক কিছু বুঝে গেলেন।
তিনি জানেন একজন মানুষ কখন ওই পরীক্ষাগার থেকে সুস্থ অবস্থায় বেরিয়ে আসতে পারেন।
কৈটভ তার শান্ত সমাহিত কণ্ঠে বলল, “প্রণাম নেবেন হেমন্তাই।”
হেমন্তাইয়ের গলা শুকিয়ে এসেছে। মানবসভ্যতার উপর আগত আসন্ন
বিপদের কথা ভেবেই তার বুকটা মুচড়ে উঠছে। তবুও নিজেকে যথাসম্ভব সংযত করে বললেন, “ভালো থেকো।”
কৈটভ বলল, “ভালো আছি হেমন্তাই। আপনাকে একটা খবর জানাতে এলাম।”
হেমন্তাই বললেন, “জীবাণু বিধ্বংসী মহৌষধি তৈরি হয়ে গেছে, তাই না।”
কৈটভ হাসল। শান্ত অমায়িক হাসি। হেসে বলল, “সবই আপনাদের আশীর্বাদ। আপনারা আমার শিক্ষার ব্যবস্থা না করলে এই বিরল সৃষ্টি সম্ভব হতো না।”
হেমন্তাই শুকনো হাসলেন। বললেন, “সৃষ্টি তাও শুধু মহৌষধি হয়নি, সঙ্গে অন্য কিছুরও সৃষ্টি হয়েছে। চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি। শয়তানের মৃত্যুর জন্য এই মহৌষধি তৈরির চেষ্টা করেছিলাম আমরা। কিন্তু মহৌষধ তো নিজেই শয়তানের সৃষ্টি করে ফেলল।”
কড়া ভর্তসনা শুনেও কৈটভের কোনো হেল দোল হল না। সে তার অমায়িক হাসি বজায় রেখে বলল, “আমরা অনেক তো মানব সভ্যতার জন্য বলিদান দিলাম। এবার মানব সভ্যতা আমাদের কিছু ফিরিয়ে দিক।”
“ধিক্কার জানাই তোমার এই ভাবনাকে।”
মাটিতে বার কয়েক থুতু ছিটিয়ে দিলেন হেমন্তাই।
“আসুন হেমন্তাই, আপনাকে একটা দৃশ্য দেখাই।
হেমন্তাই এগিয়ে গেলেন কৈটভের দেখানো পথে। কুয়াশা ভেদ করে তার চোখের সামনে ফুটে উঠল এক অকল্পনীয় ভয়ংকর দৃশ্য। এগারোজন উপজাতি যুবক দাঁড়িয়ে। তাদের কেউই পুরোপুরি শয়তানে পরিণত হয়ে যায়নি। প্রত্যেকের এক চোখে মণি বর্তমান অন্য চোখ সম্পূর্ণ সাদা। শরীরের হাড় ভাঙা। মুখে বিকট অভিব্যক্তি ও গোঙানি। হেমন্তাই চোখে ভয় নিয়ে তাকালেন কৈটভের দিকে। কৈটভ তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল।
“আবার তাকান সামনের দিকে।”
কৈটভের নির্দেশে হেমন্তাই আবার তাকালেন। এবার এগারোজনের সঙ্গে যোগ হয়েছে আরও দু-জন। তাঁর দুই শিষ্য বর্তমানে পরিণত হয়েছে শয়তানে।
তবে সম্পূর্ণ শয়তান নয়, আধা। চোখ দেখলেই বোঝা যাচ্ছে। হেমন্তাই বিস্ময়ে ফিরে তাকালেন কৈটভের দিকে। জিজ্ঞেস করলেন, “এত কম সময়ে?”
এবার বিকট শব্দ করে হেসে উঠল কৈটভ। বলল, “সবই মৃত-কৈটভের মহিমা হেমন্তাই।”
“মৃত কৈটভ?”
কৈটভ তার বস্ত্রের ভিতর থেকে বের করে আনলো ছোট কাচের কৌটোটা।
হেমন্তাইয়ের চোখের সামনে এখন জ্বল জ্বল করছে সবুজাভ হলুদ পদার্থটা। পদার্থের ভিতরে মাঝে মাঝেই ছুটে চলেছে বিদ্যুৎ।
এক অদ্ভুত সুন্দর বর্ণছটায় আলোকিত হয়ে উঠল চারদিক।
“এই মহৌষধির নাম মৃত ‘কৈটভ’?”
হেমন্তাই হাত বাড়াল। কৈটভ তৎক্ষনাৎ কৌটোটা দূরে সরিয়ে নিল। “উহু, এ বস্তুতে সাধারণ মানুষের হাত দেবার অধিকার নেই। দুঃখিত।
হেমন্তাই বাড়ানো হাত ফিরিয়ে আনলেন। এত এত বছরে কাঙ্ক্ষিত বস্তুটিকে হঠাৎ এত কাছে দেখতে পেয়ে তিনি নিজের উত্তেজনার বশেই হাতটা বাড়িয়েছিলেন। বেশ বিব্রত বোধ করলেন এখন।
কৈটভ বলল, “এই বস্তুতে শুধু আমাদের অধিকার থাকবে। আমাদের মতো আধা মানুষ আধা শয়তানদের।”
“হুম। এবার তোমার লক্ষ্য কী?”
হেমন্তাই বুঝে নিতে চাইছেন কৈটভের অভিপ্রায়। কৈটভ বলে চলল, “সোজা লক্ষ্য, পৃথিবীতে আমাদের রাজত্ব। ধীরে ধীরে আমরা ছড়িয়ে পড়তে চাই সম্পূর্ণ পৃথিবীতে। প্রথমে ত্রিপুরা, তারপর উত্তর পূর্ব ভারতের বাকি ছয় রাজ্য, তারপর পশ্চিমবঙ্গ এবং এভাবেই সম্পূর্ণ ভারতবর্ষ। এভাবেই একদিন পৃথিবীর দখল। মানুষকে চেতনাহীন শয়তানে পরিণত করাই লক্ষ্য।”
হেমন্তাই শব্দ করে হাসলেন এবার। কৈটভের কপালে ভাঁজ সৃষ্টি হল।
“বহু মানুষ ইতিমধ্যে তাতেই পরিণত হয়ে আছে। নতুন কিছু বলছো না তুমি। হ্যাঁ, তবে এইটুকু বলতে পারি তুমি যে একক রাজত্বের স্বপ্ন দেখছো তা কখনো পূর্ণ হবে না। এ অসম্ভব। একটা গ্রামকে তুমি নিজের কব্জায় নিতেই পারো। কিন্তু এসব পৃথিবী বিজয়ের কথা কাউকে বলো না। লোকে হাসবে।
কৈটভ এবার বেশ রূঢ়ভাবে বলল,
“আপনারা মানুষেরা ক্ষমতা কুক্ষিগত করার নেশায় বুঁদ থাকেন। তাই এরকম সাম্রাজ্য শুধু কল্পনাতেই সম্ভব হয়। আমাদের ক্ষেত্রে তা হবে না। তাকিয়ে দেখুন বাইরে, এই এগারোজন আমার অধীনে আছে। ওদের প্রত্যেকের কাছে আছে মৃত কৈটভ। প্রতি চব্বিশ ঘণ্টায় ওরা নিজেদের পরিমাণ অনুসারে মৃত কৈটভ শরীরে প্রবেশ করাবে। তাতে ওরা আজীবন এভাবেই থাকবে। আর এই যে নতুন দু-জন যুক্ত হল, তারা আমার অধীনে নেই। ওদের মধ্যে যারা ওদের রক্ত খেয়েছিল ওরা তাদের অধীনেই থাকবে। ওর রাজা সেই যে তার শরীরে বিষ পৌঁছে দিয়েছে। এভাবে আবার আপনার শিষ্যরা যখন নতুন শিকার ধরবে, ওদের রাজা বা গুরু যাই বলুন হবে সেই শিষ্য। চেইন সিস্টেম। বহির্বিশ্বের কর্পোরেটের এই সিস্টেমটাতে কখনো চির ধরবে না। জানেনই তো, কত শত বছর ধরে কীভাবে লাইফ ইন্সিওরেন্স কোম্পানির এই মডেলটা কোটি কোটি মানুষকে উপার্জনের পথ দেখিয়ে চলেছে। যদি গোদা বাংলায় বলি তাহলে আমার মডেলটাও এরকম।”
হেমন্তাই বুঝতে পারল মানুষের বুদ্ধি আর শয়তানের শক্তি একত্রে মিলিত হয়েছে কৈটভের মধ্যে।
কৈটভের সেনানি যে এভাবে বেড়েই চলবে তাতে কোনো অনিশ্চয়তা নেই। তবুও একটা কথা হেমন্তাই না বলে পারলেন না, “ফর্মুলাটা নিশ্চয়ই আর কেউ জানে না। সেটা তুমিও নিজের কুক্ষিগত করেই রাখবে, যেভাবে মানুষ করে রাখে। তফাত কিছুই নেই।”
কৈটভ বুঝল হেমন্তাইয়ের সঙ্গে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। সে সরাসরি বলল, “আমাদের সাম্রাজ্যের পথে একমাত্র বাধা আপনি। তাই আপনার মৃত্যু আমার এখানে আসার একমাত্র উদ্দেশ্য।”
হেমন্তাই তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন। উত্তর দিলেন না। বরং শরীরের সমস্ত শক্তি জড়ো করে চিৎকার করে উঠলেন,
“জয় গন্দবেরু…
শেষ করতে পারলেন না উচ্চারণ। তার আগেই কৈটভের হাতের পিছনে লুকানো তরোয়াল গর্জে উঠল। ভূ-লুষ্ঠিত হয়ে পড়ল হেমন্তাইয়ের মস্তক।
ধর কাঁপতে লাগল। চারদিকে রক্ত ছড়িয়ে পড়ল। ধর কয়েক মুহূর্তের মধ্যে মাটিতে পড়ে গেল, কাটা গলা দিয়ে রক্ত স্রোত বইতে লাগল।
অল্প সময়ের অপেক্ষা। তারপর আর মাটিতে রক্তের ফোঁটা ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট রইল না।
তেরোজন শয়তান তাদের উদরপূর্তি করে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল।
ওদিকে রামানুজরা এখনও জঙ্গলে। ওরা জানে না গ্রামে ঠিক কী ঘটেছে। জঙ্গল দিয়ে হাঁটছে ওরা কয়েক ঘণ্টা হয়েছে।
এখনও গন্তব্যে পৌঁছায়নি ওরা। গুরুদেবসহ প্রায় সকলেই ক্লান্ত। রামানুজ জিজ্ঞেস করল, “আর কতক্ষণ?”
প্রশ্ন শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে গুরুদেব আঙুল নির্দেশ করল। রামানুজ সেই বরাবর তাকিয়ে দেখতে পেল একটা মন্দিরের চূড়া।
খুব বড় নয়। মাঝারি আকারের। তবুও জঙ্গলের যে অংশে এখন ওরা দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে মন্দিরের কিছুটা দেখা যাচ্ছে।
লাল পাথরে তৈরি মন্দিরটি দেখামাত্র যেন সকলের ক্লান্তি কেটে গেল। সকলে নতুন উদ্যমে ছুটতে লাগলেন সেদিকে।
মন্দির জঙ্গলের ভিতরে দেখা যাচ্ছিল বটে, কিন্তু পাহাড়ি এলাকায় যা দূর থেকে দেখা যায় তাতে পৌঁছাতে আরও কিছুটা সময় লাগে।
আরও প্রায় মিনিট চল্লিশ হাঁটার পর ওরা সেখানে পৌঁছাল।
রামানুজ প্রথমেই সাবধান করে দিল, “সকলে টার্গেট রেঞ্জ ধরে ধরে এগোবে। আমরা এখনও জানি না এখানে কেউ আছে কি নেই। সম্পূর্ণ কনফার্মেশন এলে তবেই আমরা অস্ত্র নামাবো। প্রথমে সম্পূর্ণ জায়গাটা ভালো করে সার্চ করো।”
বাহিনীর অফিসারেরা তো বটেই গ্রামের উপজাতি সৈনিকরাও খুব সাবধানে এগোলো।
রাইফেল, তির ধনুক, তরোয়াল, বর্ষা যার হাতে যেই অস্ত্র ছিল সেই অস্ত্র নিয়ে এগোতে থাকে ওরা।
এরই মাঝে দ্বিতীয় ও তৃতীয় দলও পৌঁছে গেল। কৌণিক দূরত্বের হিসেবে আর এসেছে সকলে।
তাই সকলেই প্রায় সমান সময়ে পৌঁছেছে একই জায়গায়। তিনদিক দিয়ে ঘেরাও করে এগোতে থাকে সবাই।
দিনের বেলা হলেও এদিকে আলো কম। তবুও এখন একেবারে অন্ধকার নয় জায়গাটা। দেখা যাচ্ছে। খুব ধীরে ধীরে এগোচ্ছে সকলে।
প্রথমেই কারাগারের অংশ দেখতে পেল সকলে। প্রত্যেকটা কারাগারের দরজা খোলা রয়েছে। খোলা তালাগুলো পড়ে আছে সামনে।
গুরুদেব সাবধানবাণী দিলেন, “কেউ কোনো বস্তু ছুঁয়ে দেখবে না।” ইশারায় সকলকে নির্দেশ পৌঁছে দিল রামানুজ।
তৎক্ষনাৎ বাহিনী কমান্ডাররা সকলের দিকে গ্লাভস ছুড়ে দিল। ওদের ব্যাগে বিভিন্ন আপৎকালীন সামগ্রী রাখা থাকে।
সকলেই সেই প্লাস্টিক গ্লাভস পরে নিলেন। কারাগারের ভিতরে কেউ নেই। পর পর কয়েকটা ঘর আছে। সেখানে খুব সতর্কভাবে একদল ঢুকল।
কেউ বা ঢুকল পরীক্ষাগারে। রামানুজ, সিনহা, গুরুদেবসহ কয়েকজন ঢুকলেন মন্দিরে।
লাল পাথরের মন্দিরের ছাদ অনেক উঁচুতে। আর তার প্রায় সবটাই গন্দবেরুন্দাদেবের বিশালাকৃতির জন্য। এই প্রথম রামানুজ দেবতা দর্শন করছে।
এ এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা তার কাছে। এই বিশালাকৃতি দেব খোলসের সামনে অতিশয় ক্ষুদ্র দেখাচ্ছে ওদের সবাইকে। রামানুজ মুগ্ধ হয়ে দেবতার দিকে তাকিয়ে আছে।
বিষ্ণুর এক রূপের অংশকে এভাবে সরাসরি সে দেখবে কখনো কল্পনাই করতে পারেনি।
যে কোনো নাস্তিককে যদি সামনে আনা হয় এই রূপ দেখে সে মোহিত হয়ে আস্তিকে পরিণত হবে।
অবশ্য নাস্তিকের চেয়ে বড় আস্তিক কে-ই বা হতে পারে। ঈগলাকৃতি দুটো মস্তক দেখে ভয় জাগে বটে, তবে দেবতা যেভাবে বসে আছেন মন্দিরে তাতে দেবতার প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রমে মাথা নত হয়ে আসে।
আর তাছাড়া তার শরীর নিঃসৃত পদার্থের ঔজ্জ্বল্য এতটাই যে চোখে প্রায় ধাঁধা লাগার জোগাড়। দাসবাবু একটু দেরিতে ঢুকেছিলেন মন্দিরে।
কিছুক্ষণ মুগ্ধ হয়ে দেবদর্শনের পর বললেন, “কী অসাধারণ মূর্তি! মূর্তি কেন বলছি, এ তো স্বয়ং দেবতার খোলস। হাত জোর করে প্রণাম করলেন তিনি।”
গুরুদেব ঢোকার পর থেকেই বুকের কাছে হাত নিয়ে প্রণাম করে আছেন।
সবার উদ্দেশে বললেন, “দেবতার গৃহে বেশি সময় থাকা উচিত হবে না। দেবতার তেজ আমরা সহ্য করতে পারব না। চলুন বেরিয়ে যাই। আর তাছাড়া…”
গুরুদেব আর কিছু বললেন না। মন্দির থেকে বেরিয়ে গেলেন। রামানুজ আরেকবার গন্দবেরুন্দা নৃসিংহ দেবতাকে দেখে বেরিয়ে এল বাইরে।
সিপাহীরা বিভিন্ন ঘর থেকে বেরিয়ে জানাল, “এখানে কেউ নেই। আমরা তন্ন তন্ন করে খুঁজেছি চারদিকে। সমস্ত এলাকা খালি।”
সকলে দাঁড়িয়ে আছে জঙ্গলের ভিতরে এক আদিম বসতিতে। কোনোদিন একদিনের জন্যেও এই বসতির মানুষেরা একেবারে পরিত্যাগ করেনি এই বসতি।
এই বসতিতে সকলের অলক্ষ্যে ঘটত এক প্রায় অপরিচিত দেবতার পুজো, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষা চলতো অবিরত, আশেপাশের জমি জানান দিচ্ছে এখানে চাষবাসও হতো, কারাগার চিৎকার করে বলছে বন্দিদের কথা।
আর আজকে যখন বহির্বিশ্বের কিছু লোক শেষ পর্যন্ত খোঁজ পেল এই বসতির, তখন এই বসতির মূল বসবাসকারীরা এই স্থান পরিত্যাগ করে অন্যত্র চলে গেছে।
গুরুদেব ম্লান মুখে বললেন, “জানি না ওরা এখন কোথায়? তবে কোনো সংকেতই শুভ নয়। গ্রামবাসীরা সম্পূর্ণ একা রয়েছে। আমরা ভেবেছিলাম ওরা জঙ্গলেই রয়েছে। কিন্তু এখন আমার মন বলছে ওরা লোকালয়ের দিকে চলে গেছে। ওখানে আমরা পর্যাপ্ত পাহারার ব্যবস্থা রাখিনি।”
সিনহা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “কী মনে হয় আপনার, কেন ওরা ক্রিয়ায় সাড়া দিল না। কেন-ই বা ওরা এই জায়গা সম্পূর্ণ ত্যাগ করে অন্যত্র চলে গেল?”
গুরুদেব বললেন, “একবার আমাকে পরীক্ষাগারে নিয়ে চলুন।” রামানুজ, গুরুদেবসহ কয়েকজন পরীক্ষাগারে উপস্থিত হল।
পরীক্ষাগারে নানান বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি, খাঁচায় মরা বানর, গিনিপিগ ইত্যাদি দেখতে দেখতে সকলে পৌঁছালো ফ্রিজারটার পাশে।
সকলেই এরকম একটা বীভৎস পরীক্ষাগার দেখে মনে মনে ভয় পাচ্ছিল।
কোথাও ফর্মালিনে ডোবানো রয়েছে সাপের বা ব্যাঙের দেহাবশেষ, কোথাও জঙ্গলের বিভিন্ন গাছ-গাছালির উপর পরীক্ষা করে তা একত্রে এক কোনে জমা করা রয়েছে।
এ যেন এক আদিম পরীক্ষাগার যেখানে ভালোভাবে খোঁজ করলে দেখা মিলবে অনেক হারিয়ে যাওয়া প্রাণীর। পরীক্ষাগারের আলমারিতে রাশিরাশি কাগজপত্র।
নিশ্চয়ই সমস্ত পরীক্ষা নিরীক্ষার ফর্মুলা লেখা রয়েছে তাতে। কোনো অংশে এই পরীক্ষাগার কোনো গুপ্তধনের চেয়ে কম নয়।
সঠিক ব্যক্তি যদি এর সন্ধান পায় সে এই পরীক্ষাগারের সমস্ত ফলাফল বিক্রি করে পৃথিবীর ধনী মানুষ হয়ে যেতে পারবে।
গুরুদেব ফ্রিজারটাকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলেন। ফ্রিজারের ভিতরে এখনও বেশ কিছুছোট ছোট কাচের জার বা বয়ামে রয়েছে বিভিন্ন রঙের বাহারি তরল পদার্থ।
গুরুদেব মাটিতে কিছু একটা দেখতে পেলেন। একটা সিরিঞ্জ। সেটা গ্লাভস-পরা অবস্থায় তুলে দেখলেন তিনি। সিরিঞ্জের ভিতরে অল্প তরল বাকি আছে। ফ্রিজারে রাখা তরলগুলোর দিকে আবার তাকালেন তিনি।
রামানুজ জিজ্ঞেস করল, “কিছু বুঝতে পারছেন?”
গুরুদেব খুব মনোযোগ দিয়ে সিরিঞ্জের তরলটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “আমার অনুমান যদি খুব ভুল না হয় তবে বিগত কয়েকদিনের মধ্যে একটা নতুন ওষুধ তৈরি হয়েছে এই পরীক্ষাগারে। হয়তো সেই ওষুধের ক্রিয়াতেই এই সমস্ত কিছু ঘটছে।”
রামানুজ জিজ্ঞেস করল, “কী ওষুধ হতে পারে এটা?”
গুরুদেব সিরিঞ্জটার দিকে তাকিয়ে আনমনেই বললেন, “এখানে যত ওষুধ তৈরি হয়েছে সব ক-টাই জীবানুর এন্টি ডোট বানাতে গিয়ে তৈরি হয়ে গেছে। কোনোটাকেই প্রাধান্য দিয়ে বানানো হয়নি। বিভিন্ন ডিস্টিলেশন বা বিভিন্ন পদার্থের সঙ্গে বিক্রিয়ায় সেগুলো তৈরি হয়েছে। এবারেও হয়ত সেই এন্টি ডোট তৈরি করতে গিয়েই নতুন কিছু তৈরি হয়ে গেছে।”
গুরুদেবের হাত থেকে সিরিঞ্জটা রামানুজ নিল। তারপর সেটা দেখতে দেখতে সে বলল, “আর যদি সেই এন্টি ডোটটাই তৈরি হয়ে থাকে।”
গুরুদেব এই কথাটা শোনামাত্র চোখ বড় বড় করলেন। এই কথাটা তো তাঁর মাথাতেও আসেনি।
আসলে এত বছরের পর বছর কেটে গেছে, সেই এন্টি ডোট তৈরি হয়নি।
এবারে যে সেটাও তৈরি হতে পারে তা তাঁর কাছে একেবারে অকল্পনীয়। তাঁর মুখ থেকে বেরোলো, “মহৌষধি!”
তৎক্ষনাৎ বাইরে একটা প্রকাণ্ড শব্দ হল। সকলে চমকে উঠলেন। সিনহা সিপাহীদের বললেন, “কীসের শব্দ গিয়ে দেখো।”
রামানুজের চোখ তখনও গুরুদেবের উপর নিবদ্ধ। গুরুদেব রামানুজের কথায় যতটা অবাক হয়েছিলেন এবার এই শব্দ শুনে ততটাই ভয় পেলেন।
রামানুজ তাঁর হাত ধরে ফেলল, নইলে হয়ত তিনি পড়েই যেতেন। জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে গুরুদেব? এটা কীসের শব্দ?”
গুরুদেব ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “পরীক্ষাগারে গুরু অবস্থায় চন্দন রাখা আছে। কয়েক বস্তা চন্দন থাকবে স্টোর রুমে। এক্ষুনি সেগুলো জলে মেশাতে হবে। সকলে হাত লাগাও।”
গুরুদেব রামানুজের হাত ঝটকায় ছাড়িয়ে নিজেই পরীক্ষাগারের স্টোর রুমের দিকে দৌড় দিলেন। রামানুজ বুঝতে পারল না।
সে বাহিনীর কয়েকজনকে বলল, “তিনি যা করতে চাইছেন তাই করো।”
গুরুদেব স্টোর রুমের মুখে থমকে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন, “গন্দবেরুন্দা জাগছেন। গন্দবেরুন্দা জাগছেন। বারো বছরে একবার জেগে ওঠেন তিনি। এক্ষুনি তাঁকে শান্ত করতে হবে। নইলে কী হবে আমরা কেউ জানি না।”
উপস্থিত সকলের চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল। কী বলছেন গুরুদেব! দেবতা জাগছেন?
সকলে পরীক্ষাগারের দরজার কাছে এসে জমায়েত হলেন। বাইরে সিপাহীরা যারা মন্দিরের দিকে গিয়েছিল তাদের দেখা যাচ্ছে। তারা সশস্ত্র বাহিনী।
তবুও তারা কোনো অজ্ঞাত কারণে পিছিয়ে আসছে। কেউ বা দৌড়ে বেরিয়ে এসে ছিটকে পড়ছে বাইরে। শব্দটা বেড়েই চলেছে।
মনে হচ্ছে কেউ যেন জোরে জোরে নিজের পা মাটিতে আছড়াচ্ছে।
“কী হয়েছে? তোমরা ভয় পাচ্ছো কেন?”, সিনহা চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলেন।
“কী আছে ভিতরে?”
বাহিনীর অনেকে আঙুল উঁচিয়ে উপরের দিকে কিছু একটা দেখাল বটে। কিন্তু মুখ দিয়ে ওদের শব্দ বেরুল না।
সিনহা তাঁর পাশে দাঁড়ানো একজন সৈনিকের অটোমেটিক অস্ত্রটা প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে বাইরে বেরোলো। রামানুজ দৌড়ে পৌঁছাল দরজার কাছে।
কিন্তু সিনহা ততক্ষণে বেরিয়ে গেছেন। দরজার মুখে দাঁড়ানো কয়েকজনকে রামানুজ বলল, “ভিতরে গুরুদেব আছেন। তিনি যা করতে চাইছেন সে কাজে তোমরা তাঁকে সাহায্য করো। যাও ক্যুইক।”
রামানুজ জানে এখন শক্তি দিয়ে নয় বুদ্ধি দিয়েই পরিস্থিতি আয়ত্তে আনতে হবে।
গুরুদেব যা বলেছেন সেই কথাটা রামানুজ বাইরের পরিস্থিতি দেখার আগেই বিশ্বাস করে ফেলেছেন।
ওদিকে বাইরে সিনহা এগিয়ে চলেছেন। উপজাতি সিপাহীসহ সরকারি স্পেশাল ফোর্স বাহিনী অবধি এবার পিছিয়ে আসছে।
শুধু সিনহা নিজের জেদে ভর করে এগিয়ে চলেছেন।
ওদিকে গুরুদেব অন্যান্যদের সহায়তায় বড় বড় মাটির পাতিলে চন্দনের গুঁড়ো মেশাচ্ছেন। পাতিলগুলো পরীক্ষাগারেই রাখা ছিল।
বড় বড় কার্টন খুলে বস্তা বের করে তার থেকে সাদা চন্দন গুঁড়ো ঢালছেন পাতিলে। জলে গুলে সেগুলোকে গাঢ় করছেন।
দাসবাবু ঢুকেছিলেন। এই কাণ্ড কারখানা দেখে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “কী হবে এই চন্দন দিয়ে?”
কোনো উত্তর আসেনি গুরুদেবের কাছ থেকে। তিনি এখন শুধুমাত্র নিজের কাজটা মন দিয়ে করে চলেছেন।
ওদিকে সিনহা প্রায় মন্দিরের দরজায় সামনে চলে এসেছেন। সেখানে এখন আর কেউ নেই, তিনি সম্পূর্ণ একা।
বাকি সিপাহীরা সকলেই প্রায় পরীক্ষাগারের মুখে বা কারাগারের সামনে গিয়ে ভিড় করেছেন।
মন্দিরে প্রবেশ করার দরজার সামনে গিয়ে সিনহা থমকে দাঁড়ালেন। তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
তিনি যা আন্দাজ করে এখানে এসেছিলেন তার থেকে বিশাল ও ভয়াবহ বস্তু দেখে ফেলেছেন তিনি।
তার হাতের অটোম্যাটিক অস্ত্র খসে মাটিতে পড়তে গেল।
সিনহা দেখলেন, একটু আগে যে গন্দবেরুন্দা নৃসিংহদেবের খোলস মূর্তিটিকে তিনি নির্জীব অবস্থায় বসে থাকতে দেখে গিয়েছিলেন, সেই মূর্তিটি এখন বসা অবস্থাতেই তাঁর পদযুগল মাটি থেকে উপরে উঠিয়ে আবার সজোরে মাটিতে ফেলছেন।
তার ফলে চারদিকে ধুলো ছড়িয়ে পড়ছে। শব্দ হচ্ছে মারাত্মক জোরে।
সিনহা দেখলেন, ধীরে ধীরে দেবতার ঈগলরূপী মাথা দুটো নড়ে উঠছে। সিনহা জড়বত দাঁড়িয়ে পড়েছেন।
এক জীবনের সমস্ত নাস্তিকতা এই দৃশ্য দেখার পর দূর হয়ে গেছে তার। ধীরে ধীরে তার হাত বুকের কাছে উঠে এল।
গন্দবেরুন্দা নৃসিংদেবের প্রতি হাত জোর করে তিনি সেখানেই জড়বৎ দাঁড়িয়ে রইলেন। দেবতা স্বস্থানে বসে ধীরে ধীরে সজীব হচ্ছেন।
বিশালাকৃতি মস্তকদ্বয়ে প্রাণ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। ধীরে ধীরে চোখের ঝাপসা অবস্থা কেটে গিয়ে প্রকৃত ঈগলের চোখের মতো স্ফটিক স্বচ্ছ, তীক্ষ্ণ, ক্ষুরধার দৃষ্টির জন্ম হচ্ছে সেখানে।
দেবতার জন্ম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছেন সিনহা।
রামানুজ ছুটে পরীক্ষাগারের একদম ভিতরে ঢুকলেন যেখানে গুরুদেব বিশালাকার মাটির পাতিলে চন্দন মেশাচ্ছিলেন।
“আপনার কাজ কতটা? বাইরের অবস্থা ভালো নয়।”
গুরুদেব একটা বস্তার মুখ কাটতে কাটতে বললেন, “দেবতা সম্ভবত এখনও আসনেই বসে আছেন। তিনি বসা অবস্থাতেই এই চন্দন তাঁর দেহে ঢালতে হবে।”
“কিন্তু কীভাবে? তাঁর উচ্চতা তো অনেক।”
“উপায় আছে। আপনি ওদের সঙ্গে এগোন। মন্দিরের ঠিক পিছনে সিঁড়ি আছে। এই নিন চাবি। একটা একটা করে পাতিল নিয়ে উপরে উঠুন। ঠিক উপর থেকে দেবতার মাথা অর্থাৎ ঈগলের মাথা দুটো দেখতে পাবেন। দেখার পর পাতিল উলটো করে চন্দন গোলা জল ফেলতে থাকুন।”
গুরুদেব নিজের কোচর থেকে একটা চাবি বের করে দিলেন এবং উপস্থিত বাকিদের নিয়ে এগোতে বললেন।
রামানুজ সময় নষ্ট না করে উপস্থিত সকলকে বলল, “চলো। আর নষ্ট করার মতো সময় নেই।”
পরীক্ষাগারের দরজার সামনে পৌঁছে চিৎকার করে সকলকে সরে যেতে বলল সে। পাতিল নিয়ে বেরিয়ে যাবার সময় দাসবাবুকে বলল, “মন্দিরের পিছনে একেকটা পাতিল নিয়ে আসুন। সাবধানে আনবেন। প্রয়োজনে বাইরের সিপাহীদের ডাকুন।”
রামানুজ দৌড়ে পৌঁছাল মন্দিরের পিছনে। সেখানে সত্যিই একটা সিঁড়িঘর রয়েছে। তাতে একটা বড় আকারের তালা ঝুলছে। সে চাবিটা দিয়ে সেই তালা খোলার চেষ্টা করল। চাবিটাও আকারে বড়। প্রতিদিন ব্যবহারও হয় না এই চাবি। তাই খুলতে সময় লাগল। ততক্ষণে প্রথম পাতিলটা পৌঁছে গেছে গোটা দশেক সিপাহী। রামানুজও ওদের সঙ্গে পাতিলের মাথায় ধরল। সে দেখল পাতিলের মাঝখানে রয়েছে ঘন চন্দনের গোলা। ধীরে ধীরে উপরে উঠতে লাগল ওরা।
বাইরে দাসবাবুর তত্ত্বাবধানে আরও পাতিল আসতে লাগল। সকলেই ধীরে ধীরে উপর উঠতে লাগলেন। এত বড় মাটির পাতিল নিয়ে উপর ওঠা খুবই শক্ত ব্যাপার। সকলেরই অসুবিধে হচ্ছিল। কিন্তু এই মুহূর্তে আরাম করে নষ্ট করার মতো একদম সময় নেই। ওরা শত কষ্ট করে হলেও উপরে উঠতে লাগল।
মন্দিরের অভ্যন্তরে ততক্ষণে গন্দবেরুন্দা দেবতার দুই মাথাই সচল হয়েছে। লোহার গড়ন শরীরে ধীরে ধীরে ভাঁজের সৃষ্টি হচ্ছে। পেশীবহুল শরীরটায় সঙ্কোচন প্রসারণ লক্ষ করা যাচ্ছে। সিনহা সেখানে সম্মোহিতের মতো দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর সমস্ত সত্ত্বা কাঁপছে। দেবতা ধীরে ধীরে শ্বাস ফেলছেন তাঁর দুই ঈগল মস্তক দিয়ে। ঠোঁট দিয়ে শব্দ করছেন দেবতা। সে এক সুতীব্র চিৎকার। দেবতার এক ঠোঁট দিয়ে বেরোচ্ছে আগুন, অন্য ঠোঁট দিয়ে ঠান্ডা ধোঁয়া। তাঁর কোমরের অংশে জীবনের স্পর্শ পৌঁছালেই তিনি উঠে দাঁড়াবেন। তাঁর সৃষ্ট পৃথিবীতে তিনি আবার হাঁটবেন। দুষ্টের ধ্বংস করবেন তিনি, করবেন ধর্মের প্রতিষ্ঠা। কিন্তু তাঁর ভয়াবহ মোহময় রূপ দেখে সকলের যা অবস্থা হবে, তা ভাবলেও শরীর ঘেমে উঠছে।
আর কয়েক মুহূর্তের অপেক্ষা তারপরেই দেবতার সমস্ত সত্ত্বার জাগরণ ঘটবে। সিনহা দেখলেন দেবতার কোমরের পেশীগুলো এখন সম্পূর্ণ। তিনি
উঠে দাঁড়াবেন। তিনি প্রথম যে পদক্ষেপ নেবেন, সেই দূরত্বেই আছেন সিনহা। ওই পদক্ষেপেই তিনি মাটির সঙ্গে সম্পূর্ণ মিশে যাবেন।
সিনহা চোখ বন্ধ করলেন। তাঁর মুখ দিয়ে বেরুল, “জয় গন্দবেরুন্দা।”
আর ঠিক তখনই মন্দিরের উপর থেকে প্রথম পাতিলটা উলটে দিল রামানুজ ও তার সাহায্যকারীরা। চন্দন গোলা জল সোজা গিয়ে পড়ল দেবতার ডানদিকের মস্তকে। নেমে এল দ্বিতীয় পাতিল। সেটা গিয়ে পড়ল দ্বিতীয় মস্তকে। এবার একে একে পড়তে লাগল প্রত্যেকটা পাতিল। দেবতার আকারের সামনে বিশালাকার মাটির পাতিলগুলোকে ক্ষুদ্র লাগছিল। একের পর একটা পাতিল সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল আর গিয়ে পড়তে লাগল দেবতার উপর। এভাবে অনেকগুলো পাতিল দেবতার দেহে পড়ল।
সিনহা চোখ মেলে তাকালেন। দেখলেন দেবতার দেহ বর্তমানে শুধু চন্দনময়। চন্দনের সুন্দর সুবাসে মন্দির প্রাঙ্গণ ম ম করছে। দেবতার দেহ নিঃসৃত অদ্ভুত পদার্থ অবধি ঢাকা পড়েছে চন্দনের প্রলেপে।
এবার একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটল। ধীরে ধীরে আবার দেবতার শরীর আড়ষ্ট হতে শুরু করল। গন্দবেরুন্দা দেবের দেহে যে সঙ্কোচন প্রসারণ লক্ষ করা গিয়েছিল তা ধীরে ধীরে স্থির হতে লাগল। ঈগল মস্তকের হুঙ্কার বন্ধ হল। বন্ধ হল পা আছড়ানো। ঈগল চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মুছে গিয়ে ফিরে এল খোলসের স্থিতধী ঝাপসা দৃষ্টি। এ যে কী দৃশ্য যারা দেখেনি তারা কোনোদিন কল্পনাও করতে পারবে না।
ধীরে ধীরে দেবতা আবার শান্ত হলেন। চারদিকে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে এল। দেবতা আবার বারো বছর পর জেগে উঠবেন। বারো বছরের জন্য ঘুমে তলিয়ে গেলেন গন্দবেরুন্দা।
তারপর সিপাহীদের মধ্যে দেখা গেল এক বন্য উচ্ছাস। উপজাতি সিপাহী, সরকারি বাহিনী সকলে মিলে হাতে হাত ধরে নাচতে আরম্ভ করল ওরা। এই অতিমানবিক পরিস্থিতি কাটিয়ে বেঁচে থাকার আনন্দে মশগুল হল ওরা। সকলে একে অপরের হাত ধরাধরি করে নাচতে থাকল। বাইরে
যারা অক্লান্তভাবে একটা চেইন সিস্টেম বানিয়ে মাটির পাতিলগুলো এগিয়ে দিচ্ছিলেন তারাও যোগ দিলেন এই নৃত্যে। দাসবাবু শার্টের হাত গুটিয়ে কাজ করাচ্ছিলেন। তিনি দৌড়ে এলেন সিনহা সাহেবের কাছে। সিনহা আনন্দে তাঁকে জড়িয়ে কেঁদে ফেললেন। দাসবাবুরও চোখে জল- আনন্দাশ্রু।
মন্দিরের সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নামল রামানুজ। পথে সিপাহীদের সঙ্গে অল্প নাচতেও হল। তবু সে জানে এখন কার কাছে পৌঁছাতে হবে। সে দৌড়ে পরীক্ষাগারে গুরুদেবের সামনে হাজির হল। ততক্ষণে গুরুদেব বুঝে গেছেন যে দেবতা শান্ত হয়েছে। রামানুজকে কাছে পেয়ে জড়িয়ে ধরলেন তিনি। “আমরা পেরেছি গুরুদেব। আমরা পেরেছি।”
গুরুদেব কিচ্ছু বললেন না। শুধু রামানুজকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর চোখ থেকে জল গড়িয়ে রামানুজের কাঁধে পড়তে লাগল।
