মৃত কৈটভ ১.১১
(১১)
রামানুজ পরীক্ষাগারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। চারদিকে দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে যারা চোট পেয়েছে তাদের শুশ্রূষা চলছে। তাই অতিরিক্ত আধ ঘণ্টা সময়ের বিশ্রাম ধার্য করা হয়েছে। কিন্তু রামানুজের মন চঞ্চল হয়ে উঠেছে। ওদিকে গ্রামে কী হচ্ছে তা জানার কোনো উপায় নেই। বারকয়েক মোবাইল ফোনে চেষ্টা করেছে সে। কাঞ্চনকে ফোনে ধরার চেষ্টা সে করেছিল। কিন্তু জঙ্গলের এই অঞ্চলে কোনো মোবাইলেরই নেটওয়ার্ক কাজ করছে না।
সিনহা এখন অনেকটাই শান্ত। আবার বাহিনীর সঙ্গে কথা বলার মতো মানসিক দৃঢ়তা ফিরে পেয়েছেন। ওদের সঙ্গে গিয়ে কথা বলছেন। মাঝে একবার রামানুজের সঙ্গেও কথা বলে গেছেন। দাসবাবুও কিছু চোট পেয়েছেন মাটির পাতিল টানাটানি করার সময়। পরীক্ষাগারে থাকা বিভিন্ন রকমের মেডিকেল সাপোর্টগুলো গুরুদেবই পাঠিয়েছিলেন। সেগুলো দিয়েই কারো পট্টি হচ্ছে, কাউকে পেইন কিলার দেওয়া হচ্ছে কেউ বা মলম লাগাচ্ছে।
রামানুজ সমস্ত কিছু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শূন্য দৃষ্টি নিয়ে দেখছে। কখন গুরুদেব এগিয়ে এসেছিলেন তার সামনে সে বুঝতে পারেনি, “চলুন। ফেরা যাক।”
রামানুজের সম্বিত ফিরে এল এই কথায়। সে মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করল, “ফিরে তো আবার যুদ্ধ।”
গুরুদেব হাসলেন। এ হাসি ক্লান্তির। বললেন, “কে জানে গ্রামে এখন কী হচ্ছে! জঙ্গলের এতটা ভিতরে আছি আমরা যে তা জানার কোনো সুযোগ নেই। আর যুদ্ধের কথা বলছো, তা ফিরে হবে, নাকি ফেরার পথে হবে নাকি আদৌ হবে না তাও জানি না। তবে ফিরতে হবে এখন। এটা জানি।”
রামানুজ চারদিকে একবার তাকাল। প্রায় সকলেই তৈরি। ওরা রওনা দিল গ্রামের পথে। বেলা অনেকটাই গড়িয়ে গেছে। প্রায় চার ঘণ্টার পথ। ফিরতে ফিরতে সন্ধে হয়ে যাবে। প্রায় পঞ্চাশ জনের দলটা এবার একত্রে থাকার মনস্থ করেছে। যা-ই মোকাবিলা করতে হবে একত্রে করবে ওরা।
প্রায় ঘণ্টা দেড়েক হাঁটার পর ঘটনাটা ঘটল। দলের মধ্যে গুরুদেবই কিছুটা আগে ছিলেন। এই বয়সেও তাঁর স্ফূর্তি দেখার মতো। তিনি হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন। তাঁর দেখাদেখি তাঁর আশেপাশের উপজাতি সৈন্যরাও থমকে গেল। রামানুজ এগিয়ে গেল তাঁর কাছে।
“কী হয়েছে? থামলেন কেন?”
গুরুদেব মুখে আঙুল চাপা দিয়ে চুপ থাকার ইঙ্গিত দিলেন। রামানুজ পিছনে বাকিদের নির্দেশ দিলেন। সকলে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল যে যেখানে ছিল। দ্বিতীয় ইশারা এল। সকলে এবার টার্গেট সেট করল চারপাশে।
খুব সূক্ষ্ম একটা শব্দ ভেসে আসছে। গুরুদেব জঙ্গলের মাটিতে পড়ে থাকা শুকনো পাতার দিকে তাকালেন। তারপর হাঁটু গেড়ে বসে কান পাতলেন মাটিতে। পাতাগুলো কাঁপছে। দূরে কোথাও একই কম্পাঙ্কে কাঁপছে অন্য জায়গার পাতা। একটা অদ্ভুত ঘসটানি শব্দ এগিয়ে আসছে এদিকে। ধীরে ধীরে শব্দের বেগ বাড়ছে। স্পষ্ট হচ্ছে শব্দটা। গুরুদেব উঠে দাঁড়ালেন। চোখ বন্ধ করলেন তিনি। আরও এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের সময় উপস্থিত হয়েছে। চোখ খুলে সকলের উদ্দেশে বললেন, “তৈরি থাকুন সকলে। এক দল শয়তান এগিয়ে আসছে এদিকেই।”
সকলে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল গুরুদেবের কথা শুনে। রামানুজ জিজ্ঞেস করল, “কতজন আসছে?”
গুরুদেব তাঁর দিকে এক করুণ দৃষ্টি নিয়ে তাকালেন। রামানুজ এর অর্থ বুঝতে পারল। সে বলল, “পুরো গ্রাম!”
গুরুদেব বললেন, “জানি না। তবে সংখ্যায় নিঃসন্দেহে আমাদের কয়েকগুণ বেশি।”
রামানুজ আর সময় নষ্ট না করে চিৎকার করে উঠল, “গুলি মজুদ রাখুন সকলে। এক ঝাঁক শয়তান এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে।”
গুরুদেব কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, “মাথায়, শয়তানের মৃত্যু শুধুমাত্র মস্তক ছেদনে অথবা মস্তকে গুলি করলেই সম্ভব।”
সিনহা কথাটা শুনলেন এবং ছড়িয়ে দিলেন, “ওদের মারতে হলে ঠিক মাথায় গুলি করবে সকলে। শরীরে গুলি করলেও ওদের কিছু হবে না।”
দাসবাবু বললেন, “ওদের কামড়, আঁচড় থেকে দূরে থাকবে সকলে। ওদের রক্ত যেন আমাদের দেহের রক্তের সঙ্গে না মেশে।”
গুরুদেবের হাতে একটা তরোয়াল তুলে দিল রামানুজ। নিজের পিস্তল উদ্যত করে তৈরি হল সে। সকলে একে একে তাগ করলেন নিজের অস্ত্র। কেউ অটোম্যাটিক অ্যাসল্ট রাইফেল, কারো হাতে কোল্ট পিস্তল, কারো হাতে তীর-ধনুক, বর্ষা, তরোয়াল এমনকি কারো হাতে কুঠার। আদিম ও বর্তমান সভ্যতার সমস্ত অস্ত্র মিলে রুখে দাঁড়াতে চাইছে মানবসভ্যতার উপরে ধেয়ে আসা বিপদের মোকাবিলা করার জন্য।
মিনিট পাঁচেক পর ওদের দেখা গেল। একদম শুরুতে দেখা গেল সাদা বস্ত্র পরিহিত এগারোজনকে। চোখ সঙ্কুচিত হল গুরুদেবের। দলের একজন নেই। সে-ই নিশ্চয়ই এই দলের মাথা। ধীরে ধীরে ওই এগারোজনের পিছনে ফুটে উঠতে থাকল আরও অনেক শরীর। মানব চক্ষু ১৮০ ডিগ্রি অবধি সামনের দৃশ্য দেখতে পারে। ওদের সকলের দৃশ্যপটের সম্পূর্ণ অংশজুড়ে দেখা গেল গ্রামের লোকেরা ধেয়ে আসছে এদিকে। ওদের গতি স্লথ, শরীরে মোচড় স্পষ্ট। ওরা যত এগিয়ে আসতে থাকল তত ওদের অবয়ব স্পষ্ট হতে লাগল। প্রত্যেকেই নিজের স্বাভাবিক আকারের চেয়ে বড় আকৃতি লাভ করেছে। শরীর হচ্ছে পেশীবহুল।
রামানুজ গুরুদেবকে জিজ্ঞেস করল, “জীবাণু দেহে প্রবেশ করলেও তো এক বছর সময় নেয়। এত তাড়াতাড়ি কীভাবে হচ্ছে এসব?”
গুরুদেব ঢোক গিললেন। বললেন, “মহৌষধি প্রস্তুত হয়ে গেছে। হে
ভগবান! তুমিই রক্ষা করবে এখন।”
ততক্ষণে ওরা আরও এগিয়ে এসেছে। বাহিনীর একজন বলল, “স্যর ওরা টার্গেট জোনে ঢুকে পড়েছে। আপনি অর্ডার দিন।”
রামানুজ গুরুদেবকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি নিশ্চিত তো যে ওরা আর মানুষ নয়। সম্পূর্ণ শয়তান!”
গুরুদেব এবার তাঁর বজ্রনির্ঘোষ কণ্ঠে বললেন, “পুরোপুরি শয়তান হলে আমরা কোথায় আছি তা খুঁজে বের করার মতো বুদ্ধি বা চেতনা ওদের থাকত না। তবে এটা ঠিক যে ওরা আর স্বাভাবিক মানুষ নন। আমি জানি ওখানে আমাদের বহু প্রিয় মানুষ বা পরিচিত মানুষ আছেন। কিন্তু আমি নিশ্চিত ওরা আর কোনোদিন স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন না।”
রামানুজ এই কথাটার জন্যেই অপেক্ষা করছিল। সে সিনহাকে ইশারায় নিজের নির্দেশ স্পষ্ট করল। সিনহা চিৎকার করে উঠলেন, “ফায়ার।”
কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে গর্জে উঠল সমস্ত অটোম্যাটিক অ্যাসল্ট রাইফেল। টানা গুলিবর্ষণে কেঁপে উঠল জঙ্গল। সামনে এগিয়ে আসা শয়ে শয়ে শয়তানদের শরীরে বিদ্ধ হতে থাকল গুলি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় শরীর ঝাঁঝরা হয়ে গেলেও ওরা এগোতে থাকল। সকলে আশ্চর্য হয়ে গেল। “স্টপ ফায়ারিং। বন্ধ করো।”
দু-রাউন্ড গুলিবর্ষণের পর সিনহা বন্ধ করলেন গুলি চালনা। রিলোড করা হল রাইফেলগুলো। রামানুজ ভালোভাবে লক্ষ্য করল এত গুলি বর্ষণের পর শুধুমাত্র যাদের মাথায় গুলি লেগেছিল তারাই আর কোনো নড়াচড়া না করে মাটিতে পড়ে আছে। বাকিদের শরীর দিয়ে রক্তধারা বইলেও ওরা একইভাবে স্লথ গতিতে তাদের ভয়ংকর চেহারা নিয়ে এগিয়ে আসছে।
“সিনহা শুধু মাথায় টার্গেট করতে বলো। গুলি নষ্ট হচ্ছে আমাদের।”
সিনহা সেই মতো জওয়ানদের নির্দেশ দিল, “মাথায় মাথায়।”
“স্যর, এখনও হেডশট নেবার মতো রেঞ্জে আসেনি ওরা। তাই আমরা
শুধুমাত্র গুলিবর্ষণ করছিলাম। যেগুলো র্যান্ডমলি মাথায় লেগেছে সেগুলোতেই তাই শুধু কাজ হয়েছে।”
“বেশ তৃতীয় রাউন্ড শুরু করো। হেডশট নেওয়ার মতো পজিশনে আসতে আসতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। ফায়ার।”
এবার যথাসম্ভব শরীরের উপরের দিকে তাগ করে গুলি ছোড়া হল। এবার এতে কিছুটা কাজ হল। আগেরবারের চেয়ে অধিক শয়তান ভূ-পতিত হল। স্তব্ধ হল ওদের নড়াচড়া। দু-রাউন্ড শেষে সিনহার নির্দেশে আবার বন্ধ হল গুলিবর্ষণ।
এবার একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটল।
প্রত্যেক শয়তান তার কোঁচড় থেকে বের করল একটা ছোট শিশি। দূরত্ব এখন অনেকটাই কম। গুরুদেব, রামানুজসহ সকলে দেখলেন যে ওই শিশির ভিতর আছে সবুজাভ হলুদ বর্ণের তরল। সেই তরল ওরা সকলে একসঙ্গে গলায় চালান করল। তারপরের কিছু সময় ওদের শরীরে ঘটল অদ্ভুত পরিবর্তন। এমনকি এক সময় ওরা মাটিতে বসে পড়ল। আর্তনাদ করে উঠল সকলে। অদ্ভুত প্রাণীগুলোর চিৎকারে কেঁপে উঠল জঙ্গল। জঙ্গলের প্রাণীরা যে যেখানে পারল দৌড়ে পালাবার চেষ্টা করল। বানরগুলো গাছের মাথায় জুড়ে দিল চিৎকার। জঙ্গলের শেয়ালগুলো গর্তে ঢুকে পড়ল। একটা অস্বস্তিকর ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হল।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ওদের আর্তনাদ বন্ধ হল। তাদের শিরা বরাবর দেখা গেল অদ্ভুত সবুজাভ আলোর ছটা বিদ্যুতের মতো পরিবাহিত হচ্ছে। পরমুহূর্তেই ওরা সবাই সংঘবদ্ধভাবে উঠে দাঁড়াল। ওরা আবার এগোতে শুরু করল। একই তাল একই ছন্দ, ভাঙা হাড়গোড় নিয়েও ওদের হাঁটতে কোনো অসুবিধে হচ্ছে না। এবার ওদের স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, দূরত্ব খুব বেশি হলে চল্লিশ ফুট। গুরুদেব দেখতে পেলেন যে ওদের চোখ দুটো সম্পূর্ণ সাদা নয়। প্রত্যেকের একটায় মণি বর্তমান অন্যটা সাদা।
সিনহা এবার গর্জন করলেন, “হেডশট।”
এবার হেডশট করা শুরু করল জওয়ানরা। পরপর শয়তানগুলো মাটিতে পড়তে শুরু করল। এরই মাঝে একজন সাদা বস্ত্র-পরা শয়তান, যে বারোজনের দলের অংশ ছিল সে দৌড়ে এসে এক সিপাহীর উপর লাফ দিয়ে পড়ল। এত দ্রুত ঘটল ঘটনাটা যে কেউ কিছু করতে পারল না। সিপাহী নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করলেও শয়তানের শক্তির কাছে হার মানল। তার গলায় শয়তান বসিয়ে দিল তার দাঁতের সারির আলপনা। গল গল করে রক্ত বেরোতে আরম্ভ করল। ব্যথায় কোঁকড়ে উঠল সেই সিপাহী। ঘটনার আকস্মিকতায় আশেপাশের অনেকেই বিহ্বল হয়ে গিয়েছিল। তার মধ্যে রামানুজও ছিল। সম্বিত ফিরে পেতেই নিজের কোল্ট পিস্তল চালিয়ে দিল সে। শয়তানের মাথায় লাগল বুলেট। সে মাটিতে পড়ে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই ঘটল অন্য বিস্ময়কর ঘটনা। যে সিপাহীটিকে আক্রমণ করা হয়েছিল তার দৈহিক পরিবর্তন শুরু হয়ে গেল। তার দেহের মোচড়, চোখের মণি সাদা হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটল তড়িদগতিতে। রামানুজ
একবার গুরুদেবের দিকে তাকাল। তারপর ওই সিপাহীর মাথা লক্ষ্য করে গুলি করে দিল।
এবার আর সময় নেই। সিপাহীর ভয়াবহ পরিণতির পর বাকিরাও ভয় পেয়ে গেছে। একদম কাছে চলে এসেছে ওরা। পরপর গুলি করেও মারা যাচ্ছে না আর সবাইকে। ওরা এবার ধরে ফেলবেই। উপজাতি সিপাহীরা তীর ছুড়ছে, তরোয়াল দিয়ে ভয় দেখাচ্ছে, বর্ষা ছুড়ছে এক আধজনের মাথা লক্ষ্য করে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল।
এবার রামানুজ নির্দেশ দিল, “ধীরে ধীরে পিছু হটতে থাকো সকলে, গুলি চালানো যেন বন্ধ না হয়।”
এবার ধীরে ধীরে গোটা দল এক পা এক পা করে পিছনে হাঁটতে শুরু করেছে। গুলিবর্ষণ বন্ধ হয়নি, তাতে অনেক শয়তান মারাও যাচ্ছে। কিন্তু এই বৃহৎ শয়তানের দলের সামনে পঞ্চাশজনের দল কিছুই না। তার মধ্যে সকলের হাতে বন্দুক নেই। এভাবে গুলি চালাতে থাকলে আর মিনিট দশেকই গুলি ফুরিয়ে যাবে।
এক আধটা শয়তান গতিবেগ বাড়িয়ে সামনে চলে আসছে। কখনো গুরুদেব, কখনো অন্য কেউ তরবারির আঘারে ছিন্ন করছে তার মস্তক। কিন্তু এভাবে আর বেশি সময় আটকে রাখা যাবে না ওদের। আরও মিনিট কয়েক কাটল।
এক জওয়ান বলল, “স্যর গুলি শেষ হয়ে আসছে। এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে নিশ্চিত মৃত্যু হবে আমাদের।”
অন্য আরেকজন বলল, “অর্ডার দিন স্যর।”
রামানুজের শার্ট ঘেমে ভিজে উঠেছে। জুলপি বরাবর দরদর করে ঘাম নামছে মাথা দিয়ে। কী সিদ্ধান্ত নেবে বুঝতে পারছে না সে। নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে দাঁড়িয়ে আছে সে। বাকিদেরও অবস্থা একইরকম। রামানুজ অসহায়ের মতো দৃষ্টি নিয়ে গুরুদেবের দিকে তাকাল।
গুরুদেব চুপ করে দাঁড়িয়ে পড়েছেন এক জায়গায়। তিনি কি হার স্বীকার করে ফেলেছেন। না, তিনি আবার একটা শব্দ শুনতে পেয়েছেন। ধীরে ধীরে তাঁর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। রামানুজ বুঝতে পারল না এর অর্থ। চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল, “গুরুদেব, কী করবো এখন?”
গুরুদেব মাথার উপর আঙুল দিয়ে নির্দেশ দিলেন, “রক্ষা কবচ আসছে। রক্ষা কবচ আসছে। আর চিন্তা নেই।”
রামানুজ তাঁর আঙুল অনুসরণ করে উপরের দিকে তাকালো। জঙ্গলের গাছেদের জন্যে আকাশ প্রায় দেখাই যায় না। শুধু মাঝের অংশে গোলাকৃতি আকাশ অল্প দেখা যাচ্ছে। আর সেখানেই দেখা যাচ্ছে এক ঝাঁক কালো বিন্দু।
ওদের দেখাদেখি বাকিরাও তাকালো উপরে। কিছু একটা তীব্রগতিতে এগিয়ে আসছে এদিকে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে বোঝা গেল ব্যপারটা। এক ঝাঁক ঈগল উড়ে আসছে নীচে। রুদ্ধশ্বাস গতিবেগ ওদের ডানায়।
তীক্ষ্ণ ফলার মতো ঠোঁট আর প্রকাণ্ড ডানা নিয়ে আহত সহস্র ঈগলের দল ছুটে আসছে নীচে।
গুরুদেব চিৎকার করলেন, “পিছিয়ে যাও সকলে। পিছিয়ে যাও। ওরাই শেষ করে দেবে ওদের।”
গুরুদেবের নির্দেশের পরে যে যেখানে ছিল সেখান থেকে দৌড় শুরু করল। পিছনে শয়তানের দল ধাওয়া করার চেষ্টা করলেও পারল না। শত সহস্র ঈগল পাখি নেমে এসে বাঁধা দিল তাদের। সে কী সুতীব্র সুতীক্ষ্ণ ডাক।
বুকের ভিতরে কাঁপন ধরছে সেই ডাক শুনে। এই ডাক শুনেই একদিন ভয় পেয়েছিল চোরা পথে বাংলাদেশে যেতে চাওয়া দলের ছেলেরা। আজ এই ডাক এত কাছ থেকে শুনে ভয়ে মুখ শুকিয়ে যাচ্ছে সবার। ঝাঁকে ঝাঁকে ওরা নেমে আসছে।
কী বীভৎস সেই ক্রুদ্ধ ঈগলদের প্রতিকৃতি। ওরাই এই জঙ্গলের প্রকৃত পাহারাদার। অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে যারা এই জঙ্গলে প্রবেশ করবে তাদের সেই মূল্য দিতেই হবে। প্রাণ বিসর্জন করে দিতে হবে সেই মূল্য।
দীর্ঘদেহী ঈগলের ডানার ঝাপটায় প্রায় প্রত্যেকটা শয়তান মাটিতে পড়ে গেল। আবার উঠার চেষ্টা করল তারা। ততক্ষণে ঈগলগুলো তাদের বুকে
উঠে বসেছে। শয়তানগুলোও জাপটে ধরার চেষ্টা করছে পাখিগুলোকে কিন্তু ঈগল ধরা কি এতই সহজ।
ইত্যবসরে রামানুজ সবাইকে নিয়ে অনেকটাই সুরক্ষিত দূরত্বে পৌঁছে গেছে। সেখানে দাঁড়িয়ে সমস্তটা অভিজ্ঞ চোখে একবার জরিপ করল রামানুজ। তারপর ভাবল, এটাই শেষ সুযোগ। ঈগলেরা যতক্ষণ ওদের লড়াইয়ে জড়িয়ে রাখবে সেই ফাঁকে ওদের মাথায় গুলি করে ওদের শেষ করে দেওয়াই যায়।
সে আর সময় নষ্ট না করে জওয়ানদের উদ্দেশে বলল, “ঈগলেরা ওদের ঘিরে রয়েছে। এরই মাঝে আমরা ওদের মাথা লক্ষ করে গুলি করতে থাকব। খেয়াল রেখো কোনো ঈগলের গায়ে যেন গুলি না লাগে। ওরা আমাদের সাহায্য করতে নেমে এসেছে।”
ব্যস জওয়ানেরা ভয় পেলেও ময়দান ছাড়তে নারাজ ছিল। ভারতীয় জওয়ানরা জয় ছাড়া কিছু বোঝে না। তারা তৎক্ষণাৎ পজিশন নিয়ে নিল।
আগামী আধ ঘণ্টায় উপজাতি সিপাহীরা এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখল। ঈগলদের বাঁচিয়ে রেখে ভারতীয় বাহিনী সুনিপুণ হাতে একের পর এক শয়তানদের মাথায় গুলি করতে লাগল। আধ ঘণ্টার বিপুল কর্মযজ্ঞ শেষে ওখানে আর একটা শয়তানও বেঁচে রইল না।
রামানুজসহ সকল জওয়ান দাঁড়িয়ে পড়ল। উলটোদিকে এক পাল ঈগল মৃতদেহের উপরে বসে রইল। ঈগলগুলোর ঠোঁটে রক্তের দাগ। এই দৃশ্য অভাবনীয়, দুইদিকে দুইরকম জীব। পাখি ও মানুষ। ওরা মিলিতভাবে সদ্য একটা যুদ্ধ জিতেছে।
গুরুদেব ঈগলেদের উদ্দেশ্যে প্রণাম করে বললেন, “জয় গন্দবেরুন্দার জয়।”
উপস্থিত সকলে মিলে বললেন, “জয়… জয় গন্দবেরুন্দা।” রামানুজ নিজের পিস্তলটা আকাশের দিকে তুলল। অন্যান্য জাওয়ানরাও তাই করল।
তারপর সকলে মিলে আকাশের দিকে একবার গুলি চালাল। ঈগলদের অভিবাদন জানাতেই এই উদ্যোগ।
ঈগলেরাও এরপর উড়ে গেল আকাশে। যেভাবে হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে
নেমে এসেছিল ঠিক সেভাবেই ওরা আবার উড়ে চলল দিকশূন্যপুরের দিকে। নীল আকাশে কালো কালো বিন্দুর মতো দেখা গেল ওদের।
একসময় ওরা আকাশেই কোথাও মিলিয়ে গেল। হয়ত উড়ে চলে গেল পাহাড়ের দিকে। আর দেখা গেল না ওদের।
অল্প সময়ের ঘটনা। তবু সকলের মনটা খারাপ হয়ে এল। আত্মীয় বিয়োগের মতো তিরতিরে একটা দুঃখ ছড়িয়ে পড়ল মনের মধ্যে।
কিন্তু এখানেই তো কাজ শেষ হয়নি। গ্রামে পৌঁছাতে হবে।
গুরুদেব বললেন, “দেখে তো মনে হচ্ছে গ্রামে আর কেউ বেঁচে নেই। চলুন গ্রামে চলুন।”
রামানুজ একবার অস্ফুটে বলল, “এখানে তো হেমন্তাই নেই। তিনি কোথায় কে জানে?”
সকলে গ্রামের দিকে রওনা দিলেন। ফেরার পথে পায়ের মধ্যে যাতে মৃত শয়তানদের রক্ত না লাগে তাই ওরা ঘুরে অন্যদিক দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। গ্রামে পৌঁছাতে অন্তত তিন ঘণ্টা হাঁটতে হবে ওদের।
