মৃত কৈটভ ১.১২
(১২)
সন্ধে হয়ে গেছে। আবার চাক চাক কুয়াশা জমতে শুরু করেছে। পাখিরা বাড়ি ফিরেছে অনেকক্ষণ হল। জঙ্গল থেকে সকলে বের হল ধীরে ধীরে। গ্রাম নাকি শুনশান শ্মশান হঠাৎ করে বোঝা যাচ্ছে না।
আজ কারো ঘরে আলো জ্বলছে না। গ্রামের মাঝখানে মন্দির অবস্থিত। রোজ সেখানে বড় একটা প্রদীপ জ্বালানো হয়। আর সেখানে প্রদীপ আছে, তাতে আলো নেই। গ্রামের ঘরদোর সমস্ত খোলা। গৃহস্থরা যেন হঠাৎ এক বেলাতেই বোবা হয়ে গেছেন।
ধীরে ধীরে গ্রামের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে দলটা। একটা কুকুর অব্দি আজ গ্রামে নেই। ওরা কি কাউকে রেহাই দেয়নি!
জওয়ানরা চারদিকে খুঁজে চলেছে। কিন্তু প্রাণের চিহ্ন অব্দি নেই। মন্দিরের ভিতরে গ্রামের দেবতা থাকেন ভেবে ওদিকে আর কেউ প্রবেশ করে না। ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে খুঁজতে থাকেন সকলে।
গুরুদেব বললেন, “আবাসনে আলাদা সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকে। আমাদের আগে ওদিকেই যাওয়া উচিত। ওখানে অনেক প্রয়োজনীয় ওষুধ, গবেষণাপত্র রয়েছে। অনেক বাচ্চা ওখানে থাকে। আমরা জঙ্গলে কোনো বাচ্চা দেখিনি। চলুন সকলে।”
জওয়ানদের নিয়ে সবচেয়ে আগে আবাসনেই পৌঁছাল রামানুজ। সেখানেও যে হানা দিয়েছিল শয়তানেরা তা আবাসনের হত কুৎসিত অবস্থা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। দরজা জানালা ভেঙে ফেলেছে ওরা। ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে লাল রক্তের দাগ। ভাঙচুর হয়েছে পরীক্ষাগার থেকে শুরু করে শ্রেণিকক্ষ সর্বত্র।
গুরুদেব চিৎকার করলেন, “কে আছো এখানে? কেউ কি নেই আমার আবাসনে?”
গুরুদেব এবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। তাঁর এতদিনের সাধের আবাসনের এই পরিণতি তিনি মেনে নিতে পারছেন না। গুরুদেব হন্তদন্ত হয়ে ছুটে চলেছেন আবাসনের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত। পিছনে রামানুজ, সিনহা, দাসবাবু এবং অন্যান্য জওয়ানরা। আবাসনের উপজাতি সিপাহীরাও চারদিক খুঁজে চলেছে। ছাত্রদের আবাসন পেরিয়ে ছাত্রীদের আবাসনের দিকে এগোলেন গুরুদেব।
“কেউ আছো? আমি তোমাদের গুরুদেব, আমি এসে গেছি। কেউ আছো?”
গুরুদেব উদভ্রান্তের মতো চিৎকার করতে করতে এগোচ্ছিলেন। আর তখনই একটা দরজা ভিতর থেকে খোলার শব্দ হল। সকলে থেমে দাঁড়িয়ে পড়লেন। বন্দুক তাগ করা হল দরজার দিকে। সামনে কী আছে কোনো ধারণা নেই।
দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল আর সবাইকে অবাক করে ভিতর থেকে বাচ্চারা বেরিয়ে আসতে লাগল। গুরুদেব এতগুলো বাচ্চাকে এই ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে দেখে আনন্দে হাঁটু গেরে মাটিতে বসে পড়লেন।
সমস্ত বাচ্চারা বেরিয়ে এসে গুরুদেবের বুকে জড়িয়ে ধরল। গুরুদেব পুরো গ্রাম হারিয়ে ফেলেছেন ঠিকই, কিন্তু নতুন প্রজন্মকে রক্ষা করা গেছে। নিজের বুক দিয়ে আগলে ধরেছেন বাচ্চাগুলোকে। চোখে তাঁর আনন্দাশ্রু। এই দৃশ্য দেখে এতক্ষণ ধরে ক্লান্ত অবসন্ন সকলের চোখে জল চলে এল।
আহা, কী সুন্দর দৃশ্য। বাচ্চারা সবাই একে একে বেরিয়ে আসছে দরজার ভিতর থেকে। রামানুজ একটা বাচ্চা মেয়েকে কোলে তুলে নিল। তার গালে আদর করে চুমু খেল। সারাদিনের সমস্ত চিন্তা-ভাবনা যেন কেটে গেল মুহূর্তে।
সব বাচ্চা বেরিয়ে এলে পর সকলে দরজার দিকে তাকাল। এবার বেরিয়ে এল একজন যুবতী। গুরুদেবের মুখ দিয়ে বেরলো, “দুর্গা!
দুর্গার পিছন পিছন বেরিয়ে এল বারোজন যুবক। সকলের পরিহিত সাদা বস্ত্র। ওরা এগিয়ে এল।
গুরুদেব রামানুজের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ওদেরই আমরা বাছাই করেছিলাম পরবর্তীবার জঙ্গলে পাঠানোর জন্য।”
রামানুজ বুঝতে পারল ওরা কারা। দুর্গা এগিয়ে এসে গুরুদেবকে প্রণাম করল।
বারো সদস্যের মধ্যে এক যুবক বললেন, “এই আবাসনের সমস্ত কিছু ধ্বংস হয়ে গিয়েছে গুরুদেব। আমরা বিভিন্ন রকম বুদ্ধি করে বাচ্চাদের এখানে এনে লুকিয়ে রেখেছিলাম। কিছু ওষুধও আমরা বাঁচাতে পেরেছি।”
দুর্গা হতাশভাবে বললেন, “গ্রামের কিছুই আর অবশিষ্ট নেই গুরুদেব। কিছুই অবশিষ্ট নেই। আমাদের এত বছরের সংগ্রাম শেষ হয়ে গেল।”
গুরুদেব উঠে দাঁড়িয়ে দুর্গাকে বুকে জড়িয়ে বললেন, “বোকা মেয়ে! এত সহজে হারবো নাকি আমরা? সমস্ত শয়তানদের আমরা শেষ করে দিয়েছি।”
এই কথা শুনে দুর্গার মুখ উজ্জ্বল হল। কিন্তু ঠিক তক্ষুনি একজন সিপাহী দৌড়াতে দৌড়াতে সেখানে উপস্থিত হল। সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “মন্দিরে চলুন গুরুদেব। মন্দিরে চলুন। অনর্থ হয়ে গিয়েছে।”
কথাটা শেষ করা মাত্রই সকলে বিপদের গন্ধ পেয়ে ছুটল মন্দিরের দিকে। কিছু জওয়ান বাচ্চাদের দায়িত্বে আবাসনে থাকল।
মন্দিরে পৌঁছে যে দৃশ্য দেখল সবাই তাতে সকলে বোবা হয়ে গেল। মন্দিরের সামনে এগিয়ে এসেছিল সকলে। আর এসেই চোখ বন্ধ করে ফেলল রামানুজ।
বাকিদের মুখ থেকেও বেরিয়ে এল দুঃখ মিশ্রিত হতাশার শব্দ। কিন্তু সম্পূর্ণ শব্দ কারো মুখ থেকেই বেরোলো না।
মন্দির প্রাঙ্গণে পোঁতা একটা ত্রিশূলের মাথায় শয়তানগুলো গেঁথে রেখেছে হেমন্তাইয়ের মাথাটা। হেমন্তাইকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে তারা। গ্রামের ক্রিয়াদি সম্পন্ন হয় না যাকে ছাড়া, সেই একমাত্র হেমন্তাইয়ের মৃত্যু ঘটেছে।
যে কয়েকজন গ্রামের মানুষ বেঁচে ওখানে দাঁড়িয়ে আছেন তাদের মাথায় এই দৃশ্য আর আকাশ ভেঙে পড়া একই কথা।
গ্রামে জওয়ানদের ফেরার খবর পেয়েছিল কাঞ্চন। দাসবাবু গ্রামে ঢুকেই তাকে ফোন করেছিলেন। কাঞ্চন ছুটে এসেছে সকলের সঙ্গে দেখা করতে। আর এসেই সকলকে এভাবে মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে অবাক হল। এগিয়ে গেল মন্দিরের একেবারে সামনে।
আর এগিয়েই নিজের পিতার কর্তিত মস্তক দেখতে পেল সে।
মাটিতে বসে গেল কাঞ্চন। দুর্গা তাকে দেখতে পেয়েছে। আজকে আর কোনো বাঁধা নেই। সে এগিয়ে গেল তার দিকে। জড়িয়ে ধরল তাকে। কাঞ্চনের বাহ্য বোধশক্তি আর কিছুই যেন বাকি নেই। সে দুর্গার বুকে মাথা রেখে ডুকরে উঠল।
বারোজন যুবক দাঁড়িয়ে আছে। সকলেরই চোখে জল। কেউ এগিয়ে যেতে পারছে না। কারো সাহস নেই মন্দির প্রাঙ্গণে উঠে আরও কাছ থেকে
দৃশ্যটা দেখার। তাদের একজন গুরুদেবের সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “গুরুদেব হেমন্তাই ছাড়া এই চক্র তো অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আর তো কখনো আমাদের ক্রিয়া সম্পাদিত হবে না।”
গুরুদেব অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। যুবক আবার জিজ্ঞেস করল, “গুরুদেব! হেমন্তাই তো আর কখনো কেউ হতে পারবে না। উপায়?”
গুরুদেব এবার নেহাত বাধ্য হয়ে উত্তর দিলেন, “বিকল্প ব্যবস্থা আছে। কঠিন ব্যবস্থা, কিন্তু আছে। কিন্তু আমার এতকালের সঙ্গীকে ফেরানোর তো আর কোনো ব্যবস্থা নেই।”
রামানুজ শত চেষ্টা করেও নিজেকে সামলাতে পারছিল না। গুরুদেবের এই কথার তার চোখেও জল চলে এল। সত্যিই তো, আর তো বৃদ্ধ হেমন্তাই ফিরে আসবেন না। আর তো কখনো উদয়পুরের কল্যাণ সাগরে তার থেকে কাহিনি শোনা হবে না।
ঝরঝর করে জল পড়ছে ওদের সকলের চোখ দিয়ে।
কিন্তু একসময় রামানুজ নিজেকে সংযত করে ফেলল। সকলে জড়বৎ দাঁড়িয়ে দুঃখবিলাস করলে বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। দায়িত্ব এখনও শেষ হয়নি। সে এগিয়ে গেল মন্দিরের দিকে। আজকে তাকে কেউ আটকালো না। সে সোজা গিয়ে দাঁড়াল ত্রিশূলটার সামনে।
প্রায় তার মাথা অব্দি উচ্চতার ত্রিশূলে গাঁtha আছে হেমন্তাইয়ের মাথা। যেন হেমন্তাই দাঁড়িয়ে আছেন তার সামনে, যেন তার দেহ ত্রিশূল দিয়ে তৈরি। হেমন্তাইকে পিছনে ফেলে রামানুজ ভিতরে প্রবেশ করল।
খুব বড় না হলেও মাঝারি আকারের গর্ভগৃহ। মন্দিরের ভিতরে গন্দবেরুন্দার মূর্তি প্রতিষ্ঠিত। জঙ্গলের মন্দিরে যে মূর্তি প্রতিষ্ঠিত তারই সংক্ষিপ্ত সংস্করণ এই মূর্তি। দেবতার মূর্তির পাশে লাল রক্ত দিয়ে দেওয়ালে কিছু লেখা আছে।
ভাষাটা সম্ভবত ককবরক। রামানুজ তার পকেট থেকে মোবাইল বের করে ছবি তুলে বাইরে এল।
“গুরুদেব ভিতরে কিছু একটা লেখা রয়েছে, সম্ভবত ককবরক ভাষায়।
আপনি একটু দেখুন।”
গুরুদেব বিহ্বল হয়ে ছিলেন। বহুদিনের বন্ধু হেমন্তাইয়ের মৃত্যু তাঁকে গভীর শোক দিয়েছে। রামানুজের ডাকে তিনি এগিয়ে এলেন সামনে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে ছবিটা দেখে লেখাটা পড়লেন।
রামানুজ জিজ্ঞেস করল, “কী লেখা আছে বলুন আমাদের?”
গুরুদেবের ঠোঁট কাঁপছিল। রামানুজ তাঁকে ধরে ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “গুরুদেব বলুন।”
গুরুদেবের সম্বিত ফিরল। তিনি বললেন, “লেখা আছে, মানবসভ্যতা সাবধান। কৈটভ ফিরেছে লোকালয়ে। তাঁর অস্ত্র মৃত-কৈটভ।”
রামানুজেরা যখন বর্তমানে গ্রামের মধ্যে শোকে মূহ্যমান ঠিক তখনই জঙ্গলে দেবতার মূর্তি চুরি করছিল কৈটভ। সে জানে এই যাত্রায় গুরুদেব আর রামানুজ মিলে তার সমস্ত কিছু ধ্বংস করে দিয়েছে।
কিন্তু এই সৈন্য আবার তৈরি করা শুধু সময়ের অপেক্ষা। এবার আর একদিনের প্রস্তুতি নিয়ে নয়, সে ফিরবে বহুদিনের সুপরিকল্পিত আয়োজন নিয়ে। আজকের পরাজয়ও তার কাছে সামগ্রিক জয়লাভের প্রথম সিঁড়ি।
কৈটভের হাতের কাচের বয়ামে জ্বলজ্বল করছে সবুজাভ হলুদ রঙের মৃত কৈটভ। তাঁর সামনে চন্দনময় হয়ে বসে আছেন বিষ্ণুর অবতার, স্বয়ং গন্দবেরুন্দা।
খুব শীঘ্রই আবার কৈটভ ফিরবে। এবার আরও ভয়ানক হবে পরিণতি। মানবসভ্যতার হাতে আর অল্প সময় বাকি। ততদিন বেঁচে থাকুক মানবসভ্যতা।
***
