মৃত কৈটভ ১.৪
(8)
গতকাল বাংলোয় আসার পর থেকে এখনও অব্দি বেরোয়নি রামানুজ। দিল্লিতে গতকাল রাতেই কথা হয়েছে। কথা হয়েছে স্থানীয় পুলিশের সঙ্গেও।
এস পি রাকেশ সিনহা নিজে সরেজমিনে সাহায্য করবেন কথা দিয়েছেন। আজ সকাল থেকেই রামানুজের মেজাজটা বেশ ফুরফুরে হয়ে আছে।
নিজের ফরেস্ট অফিসারের ইউনিফর্ম পরে বসে আছে সে। সামনে যতদূর চোখ যাচ্ছে সবুজের সমারোহ।
ত্রিপুরাকে যে পার্বত্য রানি বলা হয়, সে কথা যে মিথ্যে নয় একদিনে বুঝে গেছে রামানুজ।
বড়মুড়া পাহাড় রেঞ্জটা দিনে দিনে আরও ভালো করে দেখতে হবে। খুব সুন্দর এই অঞ্চল।
তবে সমস্যা একটাই, মোবাইলের নেটওয়ার্ক সবসময় সমানভাবে থাকে না। ফলে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে অসুবিধা হচ্ছে।
বাংলোর বাইরে ব্রেকফাস্ট টেবিলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানেই বসে আছে রামানুজ। দাসবাবুও চলে এলেন কিছুক্ষণের মধ্যেই।
ভদ্রলোককে আসা ইস্তক ফর্মাল পোশাকেই দেখে আসছে রামানুজ। এত ফর্মালিটির মধ্যে থাকলে আসল কাজের ইনফরমেশন পেতে অনেক সময় দেরি হয়।
তাই রামানুজ আজ কিছুটা হালকা চালেই কথা শুরু করে।
“গুড মর্নিং দাসদা।”
বসের মুখে দাদা শব্দ শুনে দাসবাবু কিঞ্চিৎ সংকুচিতই হয়ে গেলেন। বললেন, “গুড মর্নিং স্যর।”
“অফ ডিউটি আমাকে রামানুজ বলতে পারেন, অসুবিধা নেই।” রামানুজ যতই আন্তরিকভাবে বলুক না কেন, দাসবাবু লজ্জায় জিভ কাটলেন।
বললেন, “তা হয় না স্যর। আচ্ছা গতকাল খাবার দাবার ঠিক লেগেছে তো?”
“দারুণ হয়েছিল। পাঁঠার ঝোলটা মুখে লেগে আছে।”
“হ্যাঁ স্যর। এই অঞ্চলে কচি পাঁঠাই পাওয়া যায়। শুধু এখানে নয় পুরো ত্রিপুরাতেই। এখানে খাসির চল নেই বিশেষ।”
“বাহ! তাহলে মাঝে মাঝেই এই ব্যবস্থাটা হোক। আর শুনুন, সারাদিন মানে বাড়িতে থাকলেও যে আপনাকে এরকম ফর্মাল পোশাকে আমার সামনে ঘুরতে হবে তার মানে নেই। অফিস আওয়ারের বাইরে আপনি স্বচ্ছন্দে বাড়ির পোশাক পরতে পারেন। আর এই কথাটাও যদি অনুরোধ করে বলছি মনে করেন তবে ভুল করবেন।”
বলেই একটা কড়া চাহুনি দিল রামানুজ। তাতে দাসবাবু ঢোক গিললেন। দাসবাবুর চেহারা দেখে রামানুজ হাসি আটকাতে পারল না।
হেসে উঠল দু-জনেই।
ব্রেক ফাস্ট চলে এল। বেতের ঝুড়ি ভর্তি ডিম টোস্ট, সবড়ি কলা, গ্রীন টি, ক্রিমক্রেকার বিস্কুট। ডিম টোস্টটার স্বাদই আলাদা।
সত্যি রাধামাধবের রান্নার হাত দারুণ!
চা খেতে খেতে দাসবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “আজকের প্ল্যান অফ অ্যাকশান কী স্যর?”
রামানুজ মোবাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে বলল, “কিছু না। যাবো গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথা বলবো। এটুকুই।”
দাসবাবু কিন্তু রামানুজের এই উত্তরে সন্তুষ্ট হলেন না। গতকাল তিনি যা ট্রেইলার দেখেছেন তারপর থেকে ভয়ে আছেন যে সম্পূর্ণ চলচ্চিত্র ঠিক কেমন হতে চলেছে।
কিছুক্ষণের মধ্যে ওরা বাংলো থেকে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল।
“অজিতদাও বাংলোয় থাকছেন নাকি।” গাড়িতে উঠে জিজ্ঞেস করল রামানুজ।
“হ্যাঁ, ওকেও থাকতে বলেছি নীচের ঘরে। আপনার কখন গাড়ির দরকার পড়ে তো বলা যায় না।”
রামানুজ খুশি হল। বলল, “ভালো করেছেন।”
মূল রাস্তা থেকে ডানদিকে মোড় নিয়ে গ্রামে ঢুকতে হল। এত বড় গাড়ি গ্রামের ভিতরে ঢোকা-মাত্র গ্রামবাসীরা যে যা কাজ করছিলেন তা থামিয়ে দিল।
গাড়িটার দিকেই ওদের দৃষ্টি সন্নিবদ্ধ হল। রামানুজ সেসবকে বিশেষ পাত্তা না দিয়ে গাড়ি থেকে নামল।
আজ তার কাঁধে একটা রাইফেলও আছে। সেটা সে গাড়ি থেকে নামার সময় কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়েছে।
পরনেও খাঁটি কেমোফ্লাজ ফরেস্ট অফিসারের ইউনিফর্ম। এই বেশে তাকে দেখে গ্রামবাসীদের কৌতূহল হলেও ভয়ে কেউ এগিয়ে এল না।
সে তার নিজের মতো গ্রামের এ মাথা ও মাথা হেঁটে দেখতে লাগল। পিছন পিছন দাসবাবু হাঁটতে লাগলেন।
রামানুজ দেখল গ্রামের ঠিক মাঝখানে অর্থাৎ নাভিস্থলে রয়েছে এক মন্দির।
উচ্চতায় বড় জোর কুড়ি-পঁচিশ ফুট উঁচু, তাতেও একটা ছোট চূড়া বর্তমান।
সম্পূর্ণ মন্দিরটা একটা বট বা অশ্বত্থ গাছের নীচে অবস্থিত। বট বৃক্ষটাই মন্দিরটার আচ্ছাদন। মন্দিরের সামনে একটা ছোট প্রাঙ্গণ। মন্দিরের রঙ লাল, এমনকি মন্দির প্রাঙ্গণের মেঝে থেকে শুরু করে সমস্তটাই লাল রঙের।
মন্দিরের দিকে এগিয়ে গেল রামানুজ।
মন্দিরের গেট পেরিয়ে প্রাঙ্গণে ঢুকতে যাবে এরকম সময়ে কেউ একজন পিছন থেকে নির্দেশ দিল, “ভিতরে ঢুকবেন না।”
রামানুজ থেমে গেল। পিছনে ফিরে তাকাল। তাকিয়ে দেখল সেখানে দাঁড়িয়ে আছে গতকালের মোড়ল-স্থানীয় লোকটা।
হঠাৎ করে দেখলে তাকে হিন্দি চলচ্চিত্রের ভিলেন ডেনি সাহেবের মতো দেখতে লাগে। শরীরটাও একইরকম পেটানো। সে এদিকেই এগিয়ে এল।
তারপর আবার বলল, “আপনি মন্দিরে প্রবেশ করবেন না।”
রামানুজ রোদ-চশমা নামিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেন?”
লোকটা যারপরনাই রুষ্ট হয়ে বলল, “আপনি গ্রামের কেউ নন। আমাদের গ্রামবাসী তথা আমাদের জাতের উপজাতি ভিন্ন আমরা দেবতার মুখ কাউকে দেখতে দিতে পারি না।”
রামানুজ কথাটা হাসিতে উড়াবার কথা ভেবেও সংযত থাকল। হাজার হোক ডিউটিতে আছে এখন।
বলল, “স্বাধীন ভারতের গণতান্ত্রিক অধিকারের মধ্যে এই দেবতা দর্শন পড়ে না?”
লোকটা কথাটার উত্তর না দিয়ে বলল, “আপনার কাজের অংশ নিশ্চয়ই এটা নয়। কারো ধর্মানুভূতিতে আঘাত করার কাজ ভারত সরকার বা ভারতের সংবিধান করে বলে আমি জানি না।”
রোদ-চশমাটা পুনরায় পরে ফেলল রামানুজ। ধর্মানুভূতির উপর কথা চলে না ভারতবর্ষে। এই একটা জায়গায় সবার হাত পা বাঁধা।
সে বলল, “ঠিক আছে। সে না হয় না-ই বা দেখলাম। কিন্তু জঙ্গলটা তো দেখতে হবে। জঙ্গল পরিষ্কারও করতে হবে। সরকার তরফে এইটুকু করতে পারি?”
শেষের কথাগুলো যে ব্যাঙ্গাত্মক তা একটা বাচ্চাও বুঝতে পারবে। মোড়ল আজ নিজেকে সংযত করে ফেলেছে গতকালের অভিজ্ঞতার পর।
এই অফিসার যে আর যা-ই হোক বাকিদের মতো নয় বা একে যে ভয় দেখিয়ে কিছু করা যাবে না তা সে বুঝে গেছে।
সে বলল, “জঙ্গলে ঢুকবেন না স্যর। তাতে আপনারই অমঙ্গল হবে।”
রামানুজ হাত দেখিয়ে থামাল তাকে, “এটা কি হুমকি? তাও অন ডিউটি অফিসারকে?”
“না স্যর, এটা আপনার খেয়াল রেখেই বললাম। আপনি আমাদের গ্রামে অতিথির মতো। আপনি আমাদের গ্রামের বিষয়ে কিছুই জানেন না। সে জায়গায় আপনাকে হুমকি দেওয়া আমার সাজে না। আপনি নিশ্চয়ই আপনার ঊর্ধ্বতনের আদেশ মোতাবেক আপনার কাজ করতে এখানে এসেছেন। স্থানীয় হিসেবে আমার দায়িত্ব আপনাকে সাহায্য করা। জঙ্গলে আপনাকে ঢুকতে দিলে, না আপনার সাহায্য হবে না আমাদের। তাই বারণ করছি।”
মোড়ল থামলে রামানুজ গদগদ হয়ে বলল, “উফ দারুণ! এই না হলে আতিথেয়তা! আপনি যে আমার কথা এভাবে ভেবেছেন ভেবেই আপ্লুত হচ্ছি। কিন্তু আমাকে যে আমার কাজ করতেই হবে।”
লোকটা এবার অনুনয় করতে শুরু করল, “স্যর এই কাজটা করবেন না। অনর্থ হয়ে যাবে। কেউ বাঁচবো না আমরা।”
“তোমাদের কিছু হবে না। আমরা তোমাদের গ্রাম নেবো না। বরং তোমরা এখানে অনেক কর্মসংস্থান পাবে।”
আপনির সহবত ছেড়ে এবার রামানুজ তুমিতে চলে এল। তার আর এসব কুসংস্কার ভালো লাগছিল না। কিন্তু লোকটা নাছোড়বান্দা।
রামানুজ একটু জঙ্গলের দিকে মুখ করে হাঁটতেই লোকটা দৌড়ে সামনে চলে এল।
হাত জোড় করে বলল, “স্যর, জঙ্গলে যাবেন না। বিপদ আছে।”
“আরে মশাই আমাদের জঙ্গল নিয়েই কাজ। পশুপাখি কিছু এলে এই বন্দুক দিয়েই ঠান্ডা করে দেবো। কই দাসবাবু চলুন। একটু ভিতর থেকে ঘুরে আসি।”
লোকটা এবার উপায়ান্তর না-পেয়ে রামানুজের পা ধরে ফেলল। গ্রামবাসীরাও পিছু পিছু আসছিল। ওরা এই দৃশ্য দেখে আঁতকে উঠল।
কয়েকজন স্বাস্থ্যবান উপজাতি গ্রামবাসী মন্দিরের পাশেই একটা কুঁড়ে ঘরের ভিতর প্রবেশ করল তৎক্ষণাৎ।
“আপনি ভিতর যাবেন না স্যর। অনর্থ হয়ে যাবে। আমাকে ক্ষমা করবেন, কিন্তু আমি আপনাকে জঙ্গলের ভিতরে যেতে দিতে পারি না।”
রামানুজ দেখল এত আজব সমস্যা। লোকটা পাগল নাকি! জঙ্গলে এরকম কী আছে যার জন্য এত তামাশা করছে লোকটা।
এতে করে তার কৌতূহল আর জেদ আরও বেড়ে যাচ্ছিল। সে লোকটাকে দুই হাত দিয়ে টেনে উঠাবার চেষ্টা করে।
“আপনি পা ছাড়ুন আমার। উঠুন আপনি। এসব কী করছেন! সরকারি কাজে এভাবে বাঁধা দেবেন না। এবার কিন্তু আমি আপনাকে গ্রেফতার করতে বাধ্য হবো।”
“দয়া করে যাবেন না জঙ্গলে। দেবতা রুষ্ট হবেন। আমাদের মানবসভ্যতার বিনাশ হয়ে যাবে।”
“কী আবোলতাবোল বলছেন। দাসবাবু ওকে তুলুন। নইলে আমি গুলি চালাতে বাধ্য হবো।”
দাসবাবু এসে মোড়লকে অনেক অনুনয় বিনয় করে তোলার চেষ্টা করলেও তিনি অনড় থাকলেন। রামানুজের পা ধরে বসে রইলেন মাটিতে।
রামানুজ এবার বাধ্য হল কাঁধ থেকে রাইফেল হাতে নিতে। মোড়লের দিকে তাগ করে বলল, “আপনি উঠবেন নাকি আমি আপনাকে ঘায়েল করবো?”
“যা ইচ্ছে করুন, আমি আপনাকে জঙ্গলে যেতে দেবো না।”
এদিকে মোড়লের উপর এভাবে বন্দুক তাগ করতে দেখে কয়েকজন শক্ত সামর্থ উপজাতি, যারা একটা কুঁড়ে ঘরের ভিতরে ঢুকেছিল চিৎকার করে এগিয়ে এল।
মুহূর্তের মধ্যে ওরা ঘিরে ফেলল রামানুজকে। ওদের প্রত্যেকের হাতে তীর ধনুক।
গোল বেষ্টনীর ঠিক মাঝখানে রাইফেল হাতে রামানুজ, তার পায়ে জড়িয়ে ধরা মোড়ল এবং কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দাসবাবু।
গোল বেষ্টনী করা উপজাতি যুবকের তীরের ফলা তাগ করে আছে রামানুজের মাথা।
মোড়ল চিৎকার করে বলল, “ওরে, তোরা কিছু করিস না।”
কে শোনে কার কথা।
“নিজের লোকেদের এভাবে লেলিয়ে দিয়ে ভালোমানুষি করার কী দরকার! অন ডিউটি অফিসারের গায়ে হাত দিচ্ছো তোমরা। পুরো গ্রাম জেলে পঁচবে।”
রামানুজের হুঙ্কারে যুবকদের একজন বললেন, “আমাদের গ্রামের হেমন্তাইয়ের জন্য আমরা প্রাণ অব্দি দিতে পারি, প্রাণ নেওয়া এমন আর কি!”
রামানুজ অবাক হল, “হেমন্তাই, মানে?”
মোড়ল বলল, “ওরে তিনি এসব কিছু জানেন না। তোরা থাম। অস্ত্র সংবরণ কর।”
কিন্তু মোড়লের কথাতে কোনো কাজ হল না। এ এক বিষম পরিস্থিতি।
একদিকে পাঁচ উপজাতি যুবক তীর তাগ করে আছে রামানুজের দিকে, অন্যদিকে রামানুজ রাইফেল তাগ করে আছে মোড়লের দিকে, মোড়ল পা আঁকড়ে বসে আছে আর দাসবাবু চারদিকে তাকাচ্ছেন চোখে মুখে ভয় নিয়ে।
ঠিক তখনই গুলির শব্দটা হল। ডুমুর গাছের মাথার উপর এক ঝাঁক পাখি বসেছিল, সবগুলো একত্রে উড়ে গেল। গ্রামবাসী চমকে উঠল।
দাসবাবুর হৃদস্পন্দন প্রায় থেমে গেল।
“তোমরা তীর ধনুক হাত থেকে ফেলে দাও। হেমন্তাই মহারাজ আপনি রামানুজবাবুর পা ছাড়ুন।”
এস পি রাকেশ সিনহা ফোর্স নিয়ে এসেছেন। পুলিশ ফোর্স এসে উপজাতিদের তীর ধনুক কেড়ে নিল।
মোড়ল লোকটাও এবার পা ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। রামানুজ রাইফেলটা পুনরায় কাঁধে চালান করল।
“সরি স্যর, আমার আসতে দেরি হয়ে গেল।”
রাকেশ সিনহা প্রথমেই ক্ষমা চাইলেন রামানুজের কাছে। তারপর বললেন, “এরা একটু স্পর্শকাতর নিজের দেবতা ও জঙ্গল নিয়ে। তাই এরকম ঘটনা আকছার ঘটে। তবে এভাবে আপনাকে ঘেরাও করবে জানলে আমি শুরু থেকেই ফোর্স মোতায়েন করে দিতাম। এক্সট্রিমলি সরি স্যর।”
রামানুজের জীবনে এরকম ঘটনা প্রথম নয়। সে সামলে নিয়েছে। বলল, “এসব ছাড়ুন। জঙ্গলে ঢোকার প্ল্যান করছিলাম। ফোর্সও যখন এসে গেছে, চলুন ঢুকে পড়ি।”
সিনহা সাহেব চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে রামানুজকে একটু কিনারে নিয়ে গেলেন, বাকিদের থেকে দূরে।
তারপর বললেন, “হুট করে ঢুকে যেতেই পারি ভিতরে। কিন্তু স্যর, আজ হোক বা কাল এই প্রোজেক্ট করতে
হলে গ্রামবাসীদের সাহায্য যে লাগবে আপনি তো জানেনই। আজকে এইরকম মারমুখী একটা ঘটনা ঘটে যাবার পর জঙ্গলের ভিতরে না-গেলেই ভালো।
তবুও আপনি যদি নেহাত যেতে চান তবে ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।”
রামানুজ কথাটা গুরুত্ব দিয়ে ভেবে দেখল। তারপর ভাবল সিনহা কথাটা মন্দ বলেননি। এমনিতেও এখানে অনেকটা সময়ই থাকতে হবে। তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই। যাওয়া যাবে আরেকদিন। সে বলল, “বেশ তবে আরেকদিনই যাবো না হয়।”
সিনহা খুশি হলেন। হাসিমুখে বললেন, “চলুন আগরতলাটা ঘুরে আসি। এই অঞ্চলটাও একটু ঘুরে দেখুন। স্থানীয় অভিজ্ঞতা প্রয়োজনে কাজে লাগবে।”
“চলুন।”
গ্রাম থেকে বের হবার পথে রামানুজ দেখল মোড়ল আর উপজাতি যুবকদের পুলিশ এক কোনায় আটকে রেখেছে। সেদিকে এগিয়ে গেল রামানুজ।
“ছেড়ে দিন ওদের। সব মিলিয়ে ঘটনাটা ঘটেছে। এক পক্ষকে দোষ দেওয়া উচিত হবে না।”
রামানুজের এহেন কথায় শুধু এস পি নন, অবাক হল মোড়লও।
সিনহা সতর্কবার্তা দিলেন, “স্যরের উপরে ভবিষ্যতে একটা ছোট আক্রমণও যদি হয় এই গ্রামের সবাইকে জেলে পুড়ব। কথাটা যেন মনে থাকে। তারপর সাধের জঙ্গল কে সামলাবে দেখব। কী হেমন্তাইজী, মনে থাকবে তো।”
মোড়ল লোকটাই যে হেমন্তাই রামানুজ এতক্ষণে বুঝে গেছে। সে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
রামানুজ শুধু তার দিকে তাকিয়ে একটি কথাই বলল, “যদি সাহায্য করেন আমার তরফ থেকে সমস্ত সাহায্যের হাত বাড়ানো থাকবে। আর যদি না করেন, সেক্ষেত্রেও আমাকে দায়িত্ব করতেই হবে। আপনারা ভাবুন।”
পরপর সমস্ত গাড়ি নিয়ে একে একে সবাই বেরিয়ে গেল। রামানুজ বেরোবার পথে দেখল গ্রামের এক কোনায় দাঁড়িয়ে আছে বাংলোর কেয়ারটেকার কাঞ্চন।
কাঞ্চনও তাকিয়ে রইল রামানুজের দিকে। ধুলো উড়িয়ে গাড়ি চলে গেল আগরতলার দিকে।
রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে কথা হচ্ছিল। সিনহা সাহেব জাতে মণিপুরি।
ঠোঁটের উপর হালকা গোঁফ ও সাবেকী কথাবার্তার ধরন জাতিগত পরিচয় বহন করে বৈকি। রামানুজ এটা খেয়াল করেছে।
সিনহা সাহেব হালকা চালে বললেন, “চলুন ত্রিপুরা ঘুরে দেখি আমরা। কাজের ফাঁকে ফাঁকে বেরিয়ে পড়া যাক।”
রামানুজ আগ্রহ দেখাল। বলল, “খুব ভালো হয়। আর কি বলুন তো, জায়গা শুধু দেখা নয়, আমার টান আছে সেই জায়গার ইতিহাস সম্পর্কে জানারও।
সেরকম যদি কিছু জায়গা থাকে যার স্থান মাহাত্ম্য বা ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায় তবে আমি সেইসব জায়গা ঘুরে দেখতে বেশি আগ্রহী।” দাসবাবুও এই গাড়িতেই উঠেছিলেন। বললেন, “তাহলে তো স্যর এখানে সেরকম অনেক জায়গাই আছে।
ধীরে ধীরে দেখা যাবে না হয়। আপনি তো আছেন ক-টা দিন।”
রামানুজ মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ, তা তো যদ্দিন না সরেজমিনে তদন্ত করে একটু হেস্তনেস্ত করতে পারছি আছিই। আজকেই যা হল, তারপর মনে হচ্ছে এ অঞ্চলে কাজ করাটা সমস্যার। ধরুন আমি জঙ্গল দেখে সার্টিফাই করে দিলাম যে এই জঙ্গল উপযুক্ত। তারপর যেসকল কন্ট্রাক্টর জঙ্গল সাফ করতে আসবে, এরও অনেক পরে যেসব ব্যবসায়ী আসবে তাদেরও তো এইসব আদিবাসীরা নিশ্চিন্তে কাজ করতে দেবে বলে মনে হয় না। আমি ত্রিপুরার প্রায় সমস্ত রবার বাগানের রিপোর্ট দেখেছি। এর চেয়ে নিরুপদ্রবে ব্যবসা আর কোথাও হয় না। কিন্তু এখানেই তো ব্যবসায়ীরা অতিষ্ঠ হয়ে যাবেন। ফলে আখেরে তো প্রোজেক্টটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অথচ মন বলছে এই অঞ্চল রবার চাষের অত্যন্ত
উপযোগী। এত হাজার হাজার
একর অরণ্য বছরের পর বছর নষ্ট হবে, নিদেনপক্ষে চাষবাসের উপযোগীও হবে না শুধুমাত্র অন্ধ কুসংস্কারের বশবর্তী হয়ে।
না এরকমটা ঠিক হতে দেওয়া যায় না। আপনাদের কী মতামত?”
রামানুজের বক্তব্য শেষে এস পি সিনহা মাথা নাড়লেন। বললেন, “আপনি যা বলছেন তা সর্বতোভাবেই সত্য। কিন্তু আমি আপনাকে বলি, সমগ্র ত্রিপুরায় শুধুমাত্র আমরা এই জঙ্গলটাতেই পেনিট্রেট করতে পারিনি। বাকি সমস্ত উপজাতিরা নিজেদের জায়গায় আমাদের সমস্ত সুবিধেসহ কাজ করতে দিয়েছে। কিন্তু এখানেই আমরা বাধা পেয়েছি। এরকম নয় যে বাধা পেয়ে আমরা দমে গিয়েছি। আমরা চোরাপথে জঙ্গলে ঢুকেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় যারা ঢুকেছিলেন তাদের কাউকে আমরা আর নিজের চোখে দেখতে পাইনি। আর এখানেই এই গ্রামবাসীদের বক্তব্যকে সমর্থন করার মতো যুক্তি পাওয়া যায়।”
রামানুজ কথার মাঝেই বললেন, “দাঁড়ান দাঁড়ান, এটা কীভাবে যুক্তি হতে পারে! যদি আমাদের ফোর্সের লোক নিখোঁজ হয়েই থাকেন তবে সেটা নিয়ে তদন্ত হল না কেন? এই গ্রামবাসীরাই তো খুনি সাব্যস্ত হতে পারে। তাই নয় কী!”
সিনহা মাথা নাড়লেন। বললেন, “অত কাঁচা কাজ কী আমরা করবো? এই জঙ্গলের প্রথম কিলোমিটার অবধি অঞ্চলে যাওয়া যায়। তারপর থেকে যে অঞ্চল শুরু হয় সে অঞ্চল ভয়াবহ। এই দেখুন মানচিত্র।”
সিনহা গাড়ির ভিতর থেকে একটা মানচিত্র বের করলেন। বড় গাড়ি। মানচিত্র মেলে ধরতে অসুবিধে হল না।
“এই দেখুন এটা হচ্ছে গ্রাম। এই হচ্ছে জঙ্গল। জঙ্গলের এক অংশ গিয়ে ঠেকেছে বাংলাদেশে। কিন্তু সেই অংশ এবং বাংলাদেশ বর্ডারের মধ্যে দূরত্ব পাঁচ কিলোমিটারের বেশি। অর্থাৎ বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে দেখলেও এই গ্রামের মতোই ব্যাপার। সাইডের অংশ স্বাভাবিক, ভয়-ডরহীন এলাকা। কিন্তু যেই জঙ্গলের গর্ভে আমরা প্রবেশ করি সঙ্গে সঙ্গে চারদিক দিয়ে
অন্ধকার জাপটে ধরে। বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, যারা এক কিলোমিটার অঞ্চল পার হবার পর ফিরে আসতে পেরেছিলেন তাদের বক্তব্য সেখানে টর্চ কাজ করে না।
মোবাইল অস্বাভাবিক আচরণ করে। তাই সমস্তটাই ধোঁয়াশা। সার্চ পার্টি যারা নিখোঁজ হয়েছিল তাদের খুঁজতে হলে একদম ভিতরে প্রবেশ করতে হতো।
সেখানে ঢোকার সাহস দ্বিতীয় দল দেখিয়েছিল। কিন্তু তারাও নিখোঁজ হবার পর তৃতীয় দল সাফ ভিতরে ঢুকতে অস্বীকার করে।
আর শুরুর এক কিলোমিটারে তাদের কোনো হদিশ আমরা পাইনি। গ্রামের লোক তখনও এক টানা বলে গিয়েছে যে অনর্থ হয়ে যাবে।
আপনারা ভিতরে ঢুকবেন না।”
সিনহা চুপ করল। রামানুজ মন দিয়ে মানচিত্র দেখছে। মাঝে জিজ্ঞেস করল, “এখান থেকে গ্রামবাসীরা কোনো অনৈতিক ব্যবসা বা কোনো র্যাকেট ইত্যাদি চালাতে পারে কি?
সিনহা পত্রপাঠ মাথা নেড়ে অস্বীকার করল, “অসম্ভব। এদের প্রত্যেকে জুমচাষের সঙ্গে যুক্ত। প্রত্যেকটা টিলা জমি আমাদের সরকারি বাংলোর আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ওদের যেন একটাই উদ্দেশ্য, এই জঙ্গলকে রক্ষা করা। নিজেরাও এই জঙ্গলে প্রবেশ করে না।”
“ওদের কি একটা দেবতার ব্যাপারে শুনছিলাম গতকাল। আজ দেখতে গিয়ে দেখতেও পেলাম না। সে ব্যাপারে কিছু জানেন।”
রামানুজের প্রশ্নে সিনহা বললেন, “জন্মেও নাম শুনিনি। এই অঞ্চলে এসেই প্রথম শুনেছিলাম- ‘গন্দবেরুন্দা’। দেবতা দেখতে গেলে ওরা দেখাবে না। প্রয়োজনে আজকের মতো সিন ক্রিয়েট করে ফেলবে, তবুও নিজেদের দেবতার ঘরে ঢুকতে দেবে না।”
দাসবাবু এরই মাঝে বললেন, “গতকাল স্যরকে ওরা বলছিল, দেবতার ভোগে পরিণত হবে সবাই।”
সিনহা হেসে বললেন, “ওদের বিশ্বাস জঙ্গলে ওদের দেবতা স্বয়ং অধিষ্ঠান করেন।”
গাড়িতে উপস্থিত সকলে একপ্রস্থ হেসে নিল। এরকম কুসংস্কারকে আজকের দিনে মান্যতা দেবার মতো নির্বোধ ওরা নয়।
গাড়ি এসে থামল আগরতলার প্রাণকেন্দ্র শকুন্তলা মার্কেটের কাছে। সিনহা বললেন, “চলুন আজকে আপনাকে আগরতলার অন্যতম প্রাচীন দোকানের মোঘলাই খাওয়াবো।”
রামানুজ সাগ্রহে রাজি হল। এতক্ষণে তার ক্ষিদেও পেয়ে গিয়েছিল। দুপুরের দিকে লাঞ্চ টাইমে মোঘলাই দিল্লিবাসীদের কাছে স্বাভাবিক ব্যাপার।
গাড়ি থেকে নেমে ওরা এগিয়ে গেল সামনে।
“এই হচ্ছে অশোকা রেস্টুরেন্ট।”
ভিতরে প্রবেশ করল ওরা। রামানুজ দেখল হোটেলটা বেশ বড় আকারের। সামনেও বসার জায়গা রয়েছে, পিছনেও। পিছনের অংশগুলোতে আবার দুই ভাগ।
সিঁড়ি দিয়ে উপরে গিয়েও চাইলে এখন বসা যায়। দিনের এই সময় খুব ভিড় না-হলেও মাঝামাঝি ভিড় লক্ষ্য করতে পারল রামানুজ।
পিছনের দিকের ঘরগুলোর একটায় বসে দাসবাবু বললেন, “একটা সময় ছিল যখন আগরতলাবাসী যেখান থেকেই আসুক না কেন এই অঞ্চলে কেনাকাটা করতে আসাকে বলতো টাউনে যাচ্ছি। অথচ দেখবেন কাছের কোনো এলাকা থেকেই এসেছে ওরা। অথচ এটাই ছিল ওদের টাউন। বিশ তিরিশ বছর আগের কথা। যা-ই হোক, তখন এই এলাকায় এসে কেনাকাটা করে যাবার পথে অশোকার মোঘলাই না খেয়ে কেউ ফিরতো না। দামও ছিল তখনকার হিসেবে কম। এখন যে মোঘলাই দুশো আড়াইশো টাকা সেটাই তখন ছিল তিরিশ টাকা বা পঞ্চাশ টাকা। তখন এত শত রেস্তোরাঁ, ক্যাফে এসব ছিল না।”
সিনহা সম্মতি দিলেন। তারপর বললেন, “তখন অশোকাই ছিল। বন্ধুবান্ধব নিয়েও কত এসেছি। এর বাইরে ছিল উজ্জ্বলা বিরিয়ানি। বটতলা সুপারমার্কেটে ঢোকার রাস্তার মুখে। সেটাও একদিন নিয়ে আসবোখন।”
অর্ডার দেওয়া হল। মোঘলাই চলে এল। রামানুজ খেয়ে বলল, “সত্যি
দারুণ খেতে। এত সুস্বাদু মোঘলাই লখনউ বা দিল্লির বাইরে কোথাও পাওয়া যায় জানতাম না। কলকাতার মোঘলাই পরোটা খেয়েছি।
ভালো লাগে না আমার।”
“যাক, এত যে গুণগান করলাম, নাকটা কাটতে দেয়নি ওরা।” সিনহা সাহেবের কথায় সবাই হেসে উঠল।
ফেরার পথে আগরতলা শহরের রাস্তাঘাট, নতুন তৈরি হওয়া ফ্লাইওভার, শহরের প্রাণকেন্দ্রের উল্লেখযোগ্য জায়গাগুলো ঘুরে উজ্জয়ন্ত প্রাসাদ দেখে বাংলোর পথ ধরল গাড়ি।
“আজ পুলিশ কর্তা সমস্ত ফেলে আমাকেই সময় দিলেন সারাদিন। শহরে আশা করি লুটপাট কিছু হয়নি।”
রামানুজের রসিকতা ধরতে পারলেন সিনহা। বললেন, “সরকারের আদেশ। আপনার সঙ্গে থাকার। এখন এটাই দায়িত্ব। বাকি শহর দেখার জন্য লোক তো রয়েইছে। সেরকম গুরুতর কিছু হলে না হয় আমিও যাবো।”
“তাহলে আর কি, বাংলোতেই চলে আসুন। কাল রাতের দিকটায় বেশ বোর হচ্ছিলাম। কথাবার্তায় কেটে যাবে সময়। আর তাছাড়া জঙ্গলে পেনিট্রেট করার প্ল্যানও ছকে ফেলা যাবে।”
রামানুজের প্রস্তাবে হাসলেন সিনহা। কিছু বললেন না। রামানুজ আন্দাজ করে বলল, “পরিবার! তা না হয় আমিও বাড়ি গিয়ে বউঠানদের সঙ্গে একটু আত্মীয়তা করে আসবো। আশা করি তারপর তিনি কয়েকদিনের জন্য আপনাকে এই অঞ্চলে পাঠাতে বারণ করবেন না।”
সিনহাবাবু এবার লাজুক হাসি হাসলেন। বললেন, “আচ্ছা আমি দেখছি।”
রামানুজ এবার একটা অন্য কথা বলল, “দাসবাবু, এই কাঞ্চন ছেলেটিকে আমার সুবিধের লাগছে না। আজকেও যখন গ্রাম থেকে আমরা বেরোলাম দেখলাম ও গ্রামে ঢোকার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে।”
দাসবাবু এই প্রশ্নের উত্তর দিলেন না। চুপ করে বসে রইলেন।
রামানুজের সন্দেহ হল। স্বভাবসুলভ মসকরা করা ঢঙে বলল, “দাসবাবু,
ও দাসবাবু, কিছু কইবা?”
ত্রিপুরায় ভাষাটা রামানুজের মুখে বেশ মিষ্টি শোনালো। দাসবাবু না হেসে পারলেন না।
তারপর আমতা আমতা করে বললেন, “নিজের পিতার গায়ে কেউ রাইফেল ঠেকালে পুত্র সেখানে উপস্থিত না হয়ে পারে? তবুও তো সে আপনাকে এসে আটকায়নি, এটা ভাবুন।”
রামানুজের মাথা এই এক কথাতেই ঘুরে গেল। সোজা টানটান হয়ে জিজ্ঞেস করল, “হোয়াট? কাঞ্চন ওই বুড়ো মোড়ল মানে ওই হেমন্তাই নাকি ওর ছেলে?”
দাসবাবু মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললেন।
“মাই গড! আর আপনি এরকম একটা মানুষকে আমার বাংলোর কেয়ার টেকার করে রেখেছেন? আপনার কি মাথায় দোষ আছে? আমার বিশ্বাস হচ্ছে না!”
দাসবাবু হাত নেড়ে বোঝাবার চেষ্টা করে, “আরে আপনি শুনুন না। ওকে গ্রামবাসীরা ভালো চোখে দেখে না।”
রামানুজ এসব শুনতে রাজি নয়। সে বেশ নির্দেশ সুলভ কণ্ঠে বলল, “আমি এসব জানতে চাই না। ও বাংলোতে থাকলে আমার প্রোজেক্ট কমপ্রোমাইজ হতে পারে। আমি আমার সুরক্ষার কথা ভাবছি না, সে আমার কিছুই করতে পারবে না। কিন্তু সে গ্রামে গিয়ে সরকারের প্ল্যান ফাঁস করতে পারে। এই রিস্ক আমি নিতে চাই না। এক্ষুনি বাংলোতে ফিরে আপনি ওকে বরখাস্ত করবেন। এটাই আমার অর্ডার।”
দাসবাবু আরও কিছু বলে হয়তো বোঝাতেন রামানুজকে। কিন্তু এরপর আর কথা চলে না। তিনি হতাশ সুরে শুধু বললেন, “ইয়েস স্যর।”
রামানুজ বাকি রাস্তায় আর বিশেষ কথা বলল না। গাড়িতে হঠাৎ করেই একটা থমথমে পরিবেশের সৃষ্টি হল।
সিনহা সাহেব এটা আন্দাজ করেই গাড়িতে একটা গান চালিয়ে দিলেন। বাইরে হালকা হালকা বৃষ্টিপাতও শুরু
হল। ঠান্ডাটা আজ জাঁকিয়ে পড়বে। গান বাজতে লাগল,
“ইয়ে রাতে ইয়ে মোসম নদী কা কিনারা ইয়ে চঞ্চল হাওয়া।”
লুপে চলতে লাগল গানটা।
গাড়ি এগোতে লাগল পাহাড়ি পথে বৃষ্টি কেটে কেটে।
বাংলোর গেটের সামনে যখন গাড়ি পৌঁছাল তখন মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। গানটা বন্ধ করলেন সিনহা সাহেব।
রামানুজ এতক্ষণে কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছেন এই পরিবেশ আর গান শুনে।
মজা করে বললেন, “খুব রসিক মানুষ আপনি। ‘দিল্লি কা ঠগ’ সিনেমার গান চলিয়েছিলেন আমার জন্য। আসলে সব ঠগ বসে আছে ত্রিপুরাতেই। আর এটা কোনো পলিটিক্যাল জোকস নয়।”
সবাই একত্রে হেসে উঠলেন। দাসবাবুর দমফাটা ভয়টাও উধাও হয়ে গেল নিমেষে। গাড়ি গেট দিয়ে ঢুকে লন বরাবর এগোতেই থেমে গেল।
সিনহা সাহেব ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলেন, “গাড়ি থামালে কেন এখানে? এখানে নামলে তো সবাই ভিজে যাবো।”
ড্রাইভার বলল, “মাটিতে কেউ একজন পড়ে আছে, সম্ভবত রক্তাক্ত অবস্থায়।”
এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে রামানুজ এবং সিনহা নেমে পড়লেন গাড়ি থেকে। পিছন পিছন দাসবাবুও দৌড়ালেন।
সবাই সামনে গিয়ে দেখল একজন মানুষ রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে লনের মেঝেতে। বৃষ্টিতে গায়ের রক্ত ধুয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।
সিনহা মানুষটাকে উপুড় অবস্থা থেকে চিৎ করলেন এবং উপরে রামানুজের দিকে তাকালেন।
রামানুজ বিস্ফারিত চোখে দেখতে পেল কেউ কাঞ্চনকে বেধড়ক মেরে বাংলোতে ফেলে দিয়ে গেছে। দেহে প্রাণ আছে কিনা কে জানে!
