মৃত কৈটভ ১.৫
(৫)
আগরতলার এক বেসরকারি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে কাঞ্চন। রামানুজ বেডের পাশের দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পাশে দাঁড়িয়ে আছেন মিঃ সিনহা। ডাক্তার দেখে জানিয়েছেন যে এ যাত্রায় বেঁচে গেছে।
রক্তক্ষরণ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মাথার ভিতরে বা শরীরের ভিতরে কোথাও রক্ত জমা হয়নি। এক বোতল রক্ত দেওয়া হয়েছে কাঞ্চনকে।
দাসবাবু হন্তদন্ত হয়ে কেবিনের ভিতরে ঢুকলেন। ঢুকে বললেন, “আমরা চলে আসার পর গ্রামবাসীরাই ওকে মেরেছে। আমাদের উপরের রাগটা গিয়ে পড়েছে ওর উপর।”
রামানুজ ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, “আর ওর বাবা নিজের ছেলেকে এভাবে মার খেতে দেখল?”
রামানুজের চোখ লাল। মিঃ সিনহা ওর পিঠে হাত দিয়ে বললেন, “ওদের কাছে জঙ্গল আর ওদের দেবতা আগে, সন্তান পরে। কাঞ্চন তো আপনার বাংলোতেই ঘুমোয়। নেহাত কাল খবর পেয়ে ওখানে ছুটে গেছিল। আমাদের লোক ভেবে ওকে একা পেয়ে পিটিয়েছে।”
রামানুজ বলল, “ওদের সবক-টাকে তোলা যায় না?”
“ভারতবর্ষে গণপ্রহারের এটাই সুবিধে। কাউকে তোলার নেই। ওখানে গেলে গ্রামবাসী ওর নামে চুরির অপবাদ দিয়ে দেবে। ব্যস, কেস ওখানেই শেষ।”
মুখ থেকে বিচ্ছিরি গালাগালি বের করল রামানুজ। বাকিরাও ফুঁসছে। কাঞ্চন ছেলেটাকে যেভাবে মারা হয়েছে তা চোখে দেখা যাচ্ছে না। ডাক্তার যদিও বলেছে দু-দিন রেখে ছেড়ে দেবে। ওষুধ চলবে।
দাসবাবু এগিয়ে এলেন। বললেন, “স্যর, বলেছিলাম না। ছেলেটা মন্দ
নয়। আমাদের খবরও ওর কাছে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। ওকে বাঁচার শেষ সুযোগ ওরা এভাবেই দিয়েছিল।
ও আপনার বা আমাদের ডিপার্টমেন্টের ব্যাপারে টু শব্দটি করেনি। তারপরেই…
রামানুজ এবার দাসবাবুর দিকে। নিজের উপরেই রাগ হল তার। বলল, “এই চাকরিটাই এমন। ভালো মন্দ সবাইকে সন্দেহ করতে হয়। প্রোটোকল সবার আগে।”
পরের দু-দিন রামানুজের ওখানেই কেটে গেল। সে নিজে হাসপাতালে থেকে বাকিদের চলে যেতে বলেছিল। কিন্তু রামানুজের মতো উচ্চপদস্থ অফিসারকে ফেলে কীভাবে আর যাওয়া যায়! সবার দু-দিন মোটামুটি হাসপাতালেই কাটল।
তৃতীয়দিন যখন ছুটি হল ততক্ষণে কাঞ্চন আগের থেকে অনেকটাই সুস্থ। সেলাই টানে শরীর তাজা। ওষুধও সময়ে পড়েছিল বলে অনেকটাই ভালো বোধ করছে সে। রামানুজ এগিয়ে গেল, তার পাশে বিছানায় বসল। “কেমন আছো?”
কাঞ্চন মাথা নেড়ে হাসল।
“সেদিন যদি গ্রামের কোনায় দাঁড়িয়ে না থেকে আমাদের সঙ্গে গাড়িতে উঠে পড়তে তাহলে এই মারটা খেতে হতো না। বদলে সিনহা সাহেবের অশোকার মোগলাই খেতে পারতে।”
ঘরে উপস্থিত সবাই হেসে উঠল। কাঞ্চনও হাসল।
“আচ্ছা কাঞ্চন, ওইদিন আমরা চলে যাবার পর ঠিক কী হয়েছিল?” রামানুজের প্রশ্ন শুনে কাঞ্চন এবার দাসবাবুর দিকে তাকাল। দাসবাবু বললেন, “তিনি সব জানেন। তুমি নির্দ্বিধায় বলো।”
কাঞ্চন বলল, “আপনারা চলে গেলেন। গ্রামবাসী ধীরে ধীরে নিজের কাজে মন দিল, ভিড় ফাঁকা হয়ে গেল। আমি বাবার সঙ্গে দেখা করতে ঘরে গেলাম। দেখলাম টানা হেঁচড়া করতে গিয়ে বাবার কিছু কিছু জায়গা কেঁটেছড়ে গেছে। বাবা ওখানে নিজের বানানো মলম লাগাচ্ছে। বাবা
আমাকে জিগ্যেস করেছিলেন, আমি আপনাদের সম্পর্কে কিছু জানি কিনা। সরকার কী প্ল্যান করছে ইত্যাদি।
আপনার সঙ্গেও তো আসার পর সেভাবে কথাই হয়নি, আর হলেও আমি কিছু বলতাম না।
আমি কথাটা ঘুরিয়ে অন্য কথায় চলে গেলাম। বাবার পায়ে মলম লাগিয়ে দিলাম। বাবা আমাকে খেতে দিলেন।
এভাবে কিছু সময় কাটার পর বাবার শিষ্যরা এল। ওরা আমাকে সহ্য করতে পারে না।
আর বাবার কাছেও আমার থেকে ওদের কদর বেশি। ওরা এসেও আমাকে আপনাদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে থাকল।
আমি যত বলি যে আমি কিছু জানি না তারা বিশ্বাস করতে চাইল না।
আমি তো গ্রামে যা-ই না, অনেকদিন পরে গেছিলাম। গ্রামবাসীও কোনো একটা কারণে আমাকে পছন্দ করে না।
এতদিন পর আমাকে একা পেয়ে, তার উপর আপনাদের সেবার কাজে আছি দেখে আমাকে ঘর থেকে বের করে হেনস্থা করল।
বাবাও চুপ করে থাকলেন। একসময় এই হেনস্থা থেকেই মারামারি। মূলত কিছু যুবক প্রহার শুরু করল, তারপর অনেকেই হাত দিয়েছিল।
একটা সময়ের পর খেয়াল নেই আমার কিছু। কয়েকজন মিলে একটা ঠেলাগাড়ি করে বাংলোর সামনে এনে ফেলে দিয়ে গেছিল সম্ভবত।
তখন বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। রাধামাধবদাকে ডাকার ক্ষমতাটুকুও আমার ছিল না। ওখানেই সম্পূর্ণ জ্ঞান হারাই।”
কাঞ্চনের কথা শেষ হওয়ার পরে হাসপাতালের কেবিনে পিন ড্রপ সাইলেন্স ছিল। কয়েক মুহূর্ত পর সিনহা বললেন, “স্যর চলুন।”
কাঞ্চনকে নিয়ে রামানুজ বেরল। এখনও কাঞ্চনের ঠোঁটের কাছে শুকিয়ে থাকা রক্তের দাগ।
গাড়ি যখন শহরকে পিছনে ফেলে পাহাড়ি রাস্তা ধরল তখনই রামানুজ বলল, “বাংলোয় ঢোকার আগে একবার গ্রামে ঢুকবো।”
সিনহা একবার বললেন, “ফোর্স নেই কিন্তু সঙ্গে।”
রামানুজ দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “লাগবে না।”
সাদা রঙের এক্স ইউ ভি গাড়িটা গিয়ে থামল গ্রামের ভিতরে। ড্রাইভার
এত গতিতে ভিতরে ঢুকল যে ধুলো উড়ল চারদিকে।
কাঞ্চনকে নিয়ে গাড়ি থেকে বেরুল রামানুজ। পিছনে সিনহা, দাসবাবু ও ড্রাইভার।
“তোমার ঘরটা কোনদিকে?”
কাঞ্চনকে জিজ্ঞেস করতেই কাঞ্চন আঙুল দিয়ে দেখাল দিকটা। কিন্তু সেদিকে যেতে হল না। হেমন্তাই বেরিয়ে এলেন মন্দিরের ভিতর থেকে।
কাঞ্চনের হাতটা ধরে তাকে নিয়ে রুদ্র বেগে এগিয়ে গেলেন রামানুজ। হেমন্তাইয়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তাঁর চ্যালারা।
সেদিকে দৃকপাত না করে রামানুজ সোজা হেমন্তাইকে বলল, “এ কেমন ভক্তি যেখানে সন্তানও গৌণ হয়ে যায়! খুব কৌতূহল হচ্ছে আমার এই ভক্তি, এই দেবতা আর এই জঙ্গলকে বোঝার। ঠিক বুঝে নেবো। আপাতত মাথায় পট্টি বাঁধা আপনার সন্তানকে দেখুন। বাঁচিয়ে নিয়ে ফিরেছি। আশা করি আপনার পাশেও দিনের শেষে এরকম কেউ রয়েছে।”
কথা শেষ করে কাঞ্চনকে নিয়ে ফিরে আসছিল রামানুজ। হেমন্তাই-র কথায় থামল।
হেমন্তাই বলছেন, “ধর্ম পালন করতে হলে সন্তানকেও মাঝে মাঝে ত্যাগ করতে হয়। নইলে অবস্থা কী হতে পারে তা মহাভারতের দ্রোণ কিংবা ধৃতরাষ্ট্রকে দেখলেই আমরা বুঝতে পারি। আমি শুধু আমার ধর্ম পালন করছি।”
রামানুজ উত্তর না দিয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। কাঞ্চনকে গাড়িতে উঠিয়ে নিজে উঠার সময় হেমন্তাইকে চিৎকার করে বলল, “আমাদের ব্যাপারটা ধর্ম না অধর্ম, সেই সংজ্ঞাটা আগে জেনে যাই, পরিস্থিতিটা আগে বুঝে ফেলি, তারপর এর উত্তর দেবো। আপাতত আপনি আপনার ধর্ম সামলান, আমি আমার।”
গাড়ি ঘুরিয়ে বাংলোর দিকে ফিরে গেল ওরা। হেমন্তাইকে কেন্দ্র করে গ্রামবাসী জমায়েত করে দাঁড়িয়ে রইল।
পরের কয়েকটা দিন রামানুজ নিজের মতো করে ছক কষল। দিল্লিতে ত্রিবেদীবাবুর সঙ্গে মত বিনিময় করল। এখানকার পরিস্থিতির সমস্ত ব্রিফ যা সে পেয়েছে বা অবিরত পাচ্ছিল তা সে দিল্লিতে ফোনের মাধ্যমে এবং অফিসিয়াল মেইলের মাধ্যমে পাঠাল।
ভিতরে ভিতরে বহু বছর পর সে এরকম উত্তেজিত হয়েছে। তাকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে চলেছে কী এমন কুসংস্কার হতে পারে যা এক পিতার কাছে সন্তানের চেয়েও অধিক প্রিয়।
এদিকে মিঃ সিনহা ডিউটি শেষে রাতের বেলায় বাংলোয় চলে আসছেন। দাসবাবু, ড্রাইভার অজিত, কাঞ্চন, রাধামাধব ওরা তো আছেই।
সঙ্গে যোগ হয়েছে বাংলোর সুরক্ষার জন্য তিনজন সশস্ত্র পাহারাদার। একদিনে কাঞ্চন অনেকটাই স্বাভাবিক। হাত-পায়ের ব্যথা বেদনাও অনেকটা কমে গেছে।
মাঝে একদিন হাসপাতালে গিয়ে মাথার পট্টিটাও খুলে এসেছে। এখন সে দিব্বি সুস্থই বলা যেতে পারে।
বাংলোর কাজকর্মও ধীরে ধীরে শুরু করে দিয়েছে।
এরকমই এক রাতে পাহাড়ি এলাকা কুয়াশায় ঢেকে গেল। রামানুজ গায়ে শাল জড়িয়ে নীচে এসে দেখল রাধামাধব রান্নাঘরে ব্যস্ত।
তাকে সাহায্য করছে কাঞ্চন। দাসবাবু পত্রিকা পড়ছিলেন, মিঃ সিনহা মোবাইলে কিছু একটা করছেন। অজিত বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে।
“আমার এখানে বিরক্ত লাগছে। এত বোরিং একটা জায়গা। এদিকে কাজও বিশেষ কিছু এগোচ্ছে না। আমি বরং ফিরে যাচ্ছি, আপনারা মোবাইল ঘাটুন, পত্রিকা পড়ুন আর রান্না করুন। হ্যাঁ কেউ কেউ সিগারেট টানতে থাকুন।”
রামানুজ হঠাৎ করে এসব কথা বলে উঠলে স্বাভাবিকভাবেই সবাই হতবাক হয়ে নিজের নিজের কাজ বন্ধ করল।
সিনহা বললেন, “কী মজা করছেন স্যর! বলুন না কী করতে পারি আমরা। আমরাও বোর হচ্ছি।”
দাসবাবু আর অজিতও এসে জুটল, “বলুন না কী করতে চাইছেন। আমরা আছি তো।”
রামানুজ গায়ের শালটা আরেকটু টেনে নিয়ে মেকি ক্রোধ দেখাল, “না
না, আমার চাই না। যা করছিলেন করুন।”
মিঃ সিনহা বললেন, “মাল খাবেন? বাইরে তো খুব ঠান্ডা আজ?” মেকি ক্রোধ গলে হয়ে গেল। মুখে ফুটে উঠল হাসি।
রামানুজ বলল, “আছে?”
মিঃ সিনহা মাথা উপর নীচ করে মুখে মিশুকে হাসি ফুটিয়ে বললেন, “আছে তো? দাসবাবু আপনার চলে? অজিত?”
দাসবাবু অমায়িক হাসি হাসলেন। অজিতও তাই। বড়বাবুর সঙ্গে বসে এসব করা যেতে পারে সে স্বপ্নেও ভাবেনি।
দাসবাবু হাঁক পাড়লেন, “রাধামাধব। ও রাধামাধব।” রাধামাধব রান্না ঘর থেকে ছুটে এল। “বলুন কত্তা।”
দাসবাবু বললেন, “মাংস আছে?”
রাধামাধব মাথা নেড়ে বলল, “আমি তো দুপুর থেকেই মেরিনেট করে রেখে দিয়েছি। ভাবলাম আজ আপনাদের কাবাব খাওয়াবো।”
রামানুজ বলল, “ওহ লাভলী। গরম গরম করে নিয়ে এসো। আমরা উপরে যাচ্ছি। আর শোনো সমস্ত কিছু সেরে তোমরাও উপরে চলে এসো। একসঙ্গে খানাপিনা সেরে তারপর ডিনার। ঠিক আছে?”
কাঞ্চন পাশেই ছিল। লাজুক হেসে বলল, “স্যর আমরা কীভাবে, মানে…”
রামানুজ বলল, “আমরা সবাই রাজা গানটা শোনোনি কখনো? যা বললাম সব কাজ সেরে এসে আমাদের জয়েন করো।”
হঠাৎই ঘরের মধ্যে একটা উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ল।
রামানুজ সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠার পথে সিনহাকে বললেন, “সিনহা সাহেব দেরি করবেন না। আপনার বন্দুকগুলো নিয়ে জলদি আসুন।”
সিনহা অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, “বন্দুক?”
রামানুজ হেসে বলল, “এই শীতের দিনে ওই পানীয় বন্দুকের কাজ করে, বোঝেন না নাকি!”
সিনহা বেশ বিগলিত হাসি হাসলেন।
বাংলোর দোতলায় একটা বড় ব্যালকনি আছে। ব্যালকনির বাইরে যতটা চোখ যাচ্ছে শুধুই গাঢ় কুয়াশা। ব্যালকনিতে বাহারি আলো জ্বলছে।
আধ ঘণ্টার মধ্যে সকলেই উপরে চলে এসেছেন। শুধু কাঞ্চন আর রাধামাধব এখনও রান্নাঘরে আছে।
রাধামাধব খবর পাঠিয়েছে রাতে আলাদা করে মাংসের ঝোল আর সাদা ভাত।
দাসবাবু তো আনন্দের আতিশয্যে একবার বলেই ফেলেছেন, “হঠাৎ করেই যেন পিকনিক হয়ে গেল আমাদের।”
সবাই বেতের মাঝারি আকারের চেয়ারে বসে আছেন। মাঝে একটা সেন্টার টেবিল, সেটাও বেতের তৈরি।
তার উপর রাখা আছে দামি স্কচের বোতল, প্রত্যেকের জন্য একটা করে কাঁচের বাহারি হুইস্কি গ্লাস, সোডার বোতল, ঠান্ডা জলের বোতল, বাদামের কুচো কুচো প্যাকেট, চিপসের প্যাকেট ইত্যাদি।
কাঞ্চন এইমাত্র এসে প্রথম লটের চিকেন কাবাবের প্লেটটা রেখে গেল সেন্টার টেবিলের উপর।
“তাড়াতাড়ি চলে আয় তোরা।”
দাসবাবু তাড়া দিলেন। মিঃ সিনহা পেগ বানাচ্ছেন।
“স্যর আপনাকে জল কতটা?”
রামানুজ বলল, “টু ইস টু ওয়ান। নো সোডা।”
সবার পেগ বানাতে বানাতে রামানুজকে সিনহা বললেন, “সেদিন আপনি ত্রিপুরার ইতিহাসের কথা জিজ্ঞেস করছিলেন না!”
রামানুজ মাথা নাড়ে, “হ্যাঁ, জানার খুব ইচ্ছে।”
সিনহা মুখে দু-টো বাদাম পুরে বললেন, “আমাদের মধ্যে একজন ইতিহাস বিশারদ আছেন?”
“কে সে?”
রামানুজের প্রশ্নে সিনহা আঙুল দিয়ে অজিতের দিকে ইশারা করল। “তাই?”
অজিত এতক্ষণ এমনিতেই কাঁচুমাচু হয়ে বসেছিলেন। বড়বাবুদের সঙ্গে পানীয়ের অভিজ্ঞতা তার এই প্রথম। এরকম ঠান্ডার দিনে সে বারণও করতে পারেনি।
কিন্তু এখন বড়বাবু যে কথাটা বললেন তাতে সে একেবারে মাটিতে মিশে গেল যেন।
আমতা আমতা করে বলল, “হ্যাঁ, স্যর মানে… আমি ইতিহাসে এম এ!”
রামানুজের চোখ কপালে উঠল। সে প্রশংসা করে বলল, “মাই গড! দারুণ ব্যাপার।”
অজিত হেসে বলল, “চাকরি নেই স্যর চাকরি নেই। সরকারি গাড়ি চালানোর চাকরিটা না জোটালে না খেয়ে মরতে হতো। পড়াশোনার মূল্য নেই।”
রামানুজ বিরোধ করল, “চাকরি নেই ঠিক, কিন্তু পড়াশোনার মূল্য নেই ভুল কথা। এই যে আজ আমি জানতে পারলাম আপনি ইতিহাসে এম এ, আমার চোখে আপনার সম্মান কয়েক গুণ বেশি বেড়ে গেল। পড়াশোনার মূল্য এখানেই। টাকা বিভিন্ন উপায়ে উপার্জন করা যায়, কিন্তু সম্মান উপার্জন করতে পড়াশোনার একটা ভূমিকা তো আছেই। নিন এবার এসব ছাড়ুন, আমাকে বলুন ত্রিপুরা কী, ত্রিপুরা কেন? ত্রিপুরা নিয়ে আমি কিছুই জানি না। শিক্ষিত করুন আমাকে।”
রামানুজ কথা শেষ করে সুন্দর হাসল। ওর কথায়, হাসিতে একটা কিছু তো আছে।
এভাবে কথা বললে যে কেউ সম্মানিত বোধ করে। অজিতবাবু মনে সেই সুন্দর অনুভূতিটা ছড়িয়ে পড়ল।
সিনহা সাহেব সবাইকে পেগ এগিয়ে দিলেন। সকলে মিলে সমবেত স্বরে বলে উঠল, “উল্লাস।”
রামানুজ প্রথম ঢোক নিয়েই সোল্লাসে বলল, “দারুণ বানিয়েছেন সিনহাবাবু। কই অজিত, শুরু করুন।”
বাকিরাও বললেন, “হ্যাঁ, অজিত শুরু করো। আমরাও ত্রিপুরার ইতিহাসটা একটু জানি।”
অজিত স্কচ খেতে খেতে শুরু করলেন, “ত্রিপুরার প্রাচীন ইতিহাস
আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই প্রশ্ন জাগে ত্রিপুরা নামের উৎপত্তি সম্পর্কে।
‘শ্রীরাজমালা’-র সম্পাদক শ্রীকালীপ্রসন্ন সেন মহাশয় বলেছেন, ‘কিরাত দেশের অন্তর্নিবিষ্ট গোমতী নদীর তীরবর্তী ভূভাগ যে অজ্ঞাত কারণেই হোক, ইতিহাসে অগোচর কাল হইতে ত্রিপুরা নাম প্রাপ্ত হইয়াছে।’
রাজমালার মতে পরাক্রমশালী রাজা ত্রিপুরের নামানুসারে কিরাত দেশের নাম হয় ত্রিপুরা এবং ত্রিপুরের স্বজাতীয়রা ত্রিপুর নামে পরিচিত হয়।
আধুনিক ঐতিহাসিকদের অনেকেই ত্রিপুরকে কিংবদন্তীমূলক এবং কাল্পনিক বলেছেন। সুতরাং এ যুক্তিটি খুব জোরালো বলে মনে হয় না।
কোনো কোনো লেখকের মতে উদয়পুরে অবস্থিত পীঠদেবী ত্রিপুরাসুন্দরীর নামানুসারে এ রাজ্যের নাম হয়েছে ত্রিপুরা।
ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দিরটি ১৫০১ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয়েছিল এবং তার এগারো বছর পূর্বে ১৪৯০ খ্রিস্টাব্দে উৎকীর্ণ এক মুদ্রায় ধন্যমাণিক্য নিজেকে ‘ত্রিপুরেন্দ্র’ অর্থাৎ ত্রিপুররাজ বলে অভিহিত করেছিলেন।
সুতরাং ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দির প্রতিষ্ঠার পূর্বেই ত্রিপুর বা ত্রিপুরা নামটি পরিচিত ছিল এবং দেবীর নাম থেকে এ রাজ্যের নামকরণ ত্রিপুরা হয়নি তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।
বরং ত্রিপুরা রাজ্যের নাম থেকে দেবীর নাম ত্রিপুরাসুন্দরী হওয়া অসম্ভব নয়।
কোনো কোনো লেখকের মতে ত্রিপুরায় মহাদেবের মন্দির ছিল এবং মহাদেব ত্রিপুরেশ্বর বা ত্রিপুরারি নামে পরিচিত।
এই ত্রিপুরেশ্বর বা ত্রিপুরারি নাম থেকে এই রাজ্যের নাম ত্রিপুরা হিসেবে পরিচিত লাভ করে।
শ্রী কৈলাসচন্দ্র সিংহের মতে ত্রিপুরা নামের উৎপত্তির পিছনে এ রাজ্যের তিপ্রা ভাষার প্রভাব রয়েছে।
তিনি বলেছেন, ‘যে অনার্য কিরাতদিগকে আমরা তিপ্রা (ত্রিপুরা) আখ্যায় পরিচিত করিয়া থাকি তাহাদের জাতীয় ভাষায় জলকে তুই বলে।
এই তুই শব্দের সহিত প্রা সংযুক্ত করিয়া তুইপ্রা শব্দটি নিষ্পন্ন হইয়াছে।
সেই তুইপ্রা হইতে তিপ্রা এবং তিপ্রা হইতে তৃপুরা, ত্রীপুরা ও ত্রিপুরা শব্দের উৎপত্তি।’
ত্রিপুরার উপজাতিদের মধ্যে ত্রিপ্রা বা ত্রিপুরা উপজাতিই সংখ্যাগরিষ্ঠ। ত্রিপুরা শব্দটি সম্ভবত ত্রিপ্রা নামক উপজাতির সংস্কৃত রূপ। তিপ্রা বা ত্রিপুরা উপজাতির নাম থেকেই এ রাজ্য ত্রিপুরা নামে পরিচিত হয়েছে, এই মতই বর্তমানে অধিক যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয়।
“মধ্যযুগে মাণিক্যবংশীয় রাজারা ত্রিপুরায় একটি স্বাধীন রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু প্রাকমাণিক্য যুগে প্রাচীনকালে ত্রিপুরায় কোনো সুসংগঠিত স্বাধীন রাজ্য গড়ে উঠেছিল কিনা জানা যায় না। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে জানা যায় যে ত্রিপুরার বেশ কিছুটা অংশ প্রাচীনকালে বিভিন্ন সময়ে পূর্ববাংলা ও সমতটের বিভিন্ন রাজবংশের রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
“ত্রিপুরা জেলার গুনাইঘর গ্রামে সমতটের গুপ্তবংশীয় রাজা বৈন্যগুপ্তের (৫০৭/৮ খ্রিস্টাব্দ) ভূমিদান বিষয়ক যে তাম্রশাসন পাওয়া গেছে তা থেকে প্রমাণিত হয় এ অঞ্চল সে সময় সমতটের অধীনে ছিল।
বৈন্যগুপ্তের পরবর্তী যে সমস্ত সমতটের রাজার নাম পাওয়া গেছে তাঁরা হলেন গোপচন্দ্র, ধর্মাদিত্য ও সমাচারদেব। এঁদের রাজত্বকাল মোটামুটি ৫২৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৫৭৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ধরা হয়। এঁদের প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন পূর্ব বাংলার রাজ্য চালুক্যরাজ কীর্তিবর্মনের আক্রমণে দুর্বল হয়ে যায়।
হিউয়েন সাঙ-এর বিবরণ থেকে জানা যায় যে সমতটে সপ্তম শতাব্দীর প্রথমার্ধে ব্রাক্ষ্মণ বংশীয় রাজারা রাজত্ব করতেন। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ শীলভদ্র এই বংশের বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সপ্তম শতাব্দীর ত্রিপুরা তাম্রশাসন থেকে জানা যায় যে সে সময় সুবঙ্গ বা ত্রিপুরা অঞ্চলে নাথ বংশীয় সামন্তরাজারা রাজত্ব করতেন। তাম্রশাসনে উল্লেখ করা হয়েছে যে এই বংশে লোকনাথ নামে এক সামন্তরাজা অন্যান্য সামন্তদের পরাজিত করেন ও নিজ প্রভুর কর্তৃত্ব অস্বীকার করেন। এই তাম্রশাসনে লোকনাথ ছাড়াও জীবধারণ ও জয়তুঙ্গবর্ষ নামে আরও দুইজন সামন্ত রাজের উল্লেখ পাওয়া যায়। এঁরা সম্ভবত খড়গ ও রাত বংশীয় ছিলেন। এই সকল রাজবংশ ত্রিপুরা ও আশেপাশে রাজত্ব করছিলেন। এঁরা পরমেশ্বর উপাধিধারী কোনো শক্তিশালী রাজার অধীনে থাকলেও কার্যত স্বাধীন ছিলেন। এই ‘পরমেশ্বর’ কামরূপের রাজা নাকি সমতটের রাজা ছিলেন,
তা অবশ্য সঠিকভাবে জানা যায় না।
“সপ্ত শতাব্দীর শেষার্ধের আস্রফরপুর লিপি থেকে জানা যায় ত্রিপুরার একটি বড়ো অংশ খড়গ বংশীয় রাজাদের অধীনে ছিল। চারজন খড়গ বংশীয় রাজার নাম পাওয়া যায়। এঁরা হলেন, খড়গোদ্যম, জাতখড়গ, দেবখড়গ ও রাজরাজখড়গ। দেবখড়গের তাম্রশাসন থেকে জানা যায় এঁদের রাজধানী ছিল কর্মান্তবাসক যার সঙ্গে ত্রিপুরা জেলার বড়কামতা নামক স্থানটি অভিন্ন বলে ঐতিহাসিকেরা মনে করেন। চৈনিক বিবরণ থেকে জানা যায় ত্রিপুরা ছাড়াও প্রায় সমগ্র পূর্ব এবং দক্ষিণ বঙ্গ এঁদের অধীনে ছিল। খড়গ বংশীয় রাজারা বৌদ্ধ ছিলেন। খড়গবংশ ছাড়াও সে সময় রাত বংশীয় রাজা জীবনধারণ ও তাঁর পুত্র শ্রীধারণ ত্রিপুরা অঞ্চলে রাজত্ব করেছেন। শ্রীধারণ নিজেকে সমতটের রাজা বলে প্রচার করেছেন। দেবপর্বতে এঁদের রাজধানী ছিল।
এই দেবপর্বত ক্ষীরদা নদীর তীরে অবস্থিত। ক্ষীরাদ বা ক্ষীরানদী গোমতী নদীর শাখা এবং কুমিল্লার পশ্চিমে অবস্থিত। রাত বংশের পর ভবদেব এবং কান্তিদেব নামে দু-জন বংশীয় রাজা এই অঞ্চলে রাজত্ব করেছেন। এঁদের কাছ থেকেই চন্দ্র-বংশীয় রাজারা সমতট অধিকার করে নেন। চন্দ্র-বংশীয় রাজারা ৮২৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১০৩৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। এখন পর্যন্ত সাতজন চন্দ্র উপাধিযুক্ত রাজার নাম পাওয়া গেছে।
এঁরা হলেন পূর্ণচন্দ্র, সুবর্ণচন্দ্র, ত্রৈলোক্যচন্দ্র, শ্রীচন্দ্র, কল্যাণচন্দ্র, লাহায়াচন্দ্র ও গোবিন্দচন্দ্র।
পূর্ণচন্দ্র ও সুবর্ণচন্দ্র বিশেষ কোনো রাজকীয় উপাধি ধারণ না করলেও ত্রৈলোকচন্দ্রের সময় থেকে চন্দ্র-বংশীয় রাজাদের প্রকৃত গৌরবময় যুগ আরম্ভ হয়।
ত্রৈলোকচন্দ্র মহারাজাধিরাজ উপাধি গ্রহণ করেন। চন্দ্র-বংশীয় রাজাদের রাজ্য পূর্ব ও দক্ষিণ বঙ্গব্যাপী হলেও প্রথম দিকে তাঁদের রাজধানী, হিল রোহিতগিরি অঞ্চলে।
ডক্টর নলিনীকান্ত ভট্টশালী এই রোহিতগিরি এবং কুমিল্লার লাল মাই অঞ্চল অভিন্ন বলে অভিহিত করেছেন।
পালবংশীয় রাজা প্রথম মহীপালের রাজত্বকালের বাঘউরা নামে বিষ্ণুমূর্তির উপর
খোদিত লিপি থেকে জানা যায় ত্রিপুরার একটি অংশ তখনও সমতটের অধীনে ছিল। প্রথম মহীপাল লাহায়াচন্দ্রের সমসাময়িক ছিলেন।
সম্ভবত লাহায়াচন্দ্রের কাছ থেকে তিনি পূর্ব বাংলার কিছুটা অংশ দখল করে নেন।
কিন্তু এই অধিকার খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি তা ভারেল্লা গ্রামের মূর্তির লিপি থেকে জানা যায়।
শ্রীচন্দ্রের শ্রীহট্ট জেলায় প্রদত্ত তাম্রলিপি থেকে মনে হয় যে শ্রীহট্ট জেলাও চন্দ্র-বংশের রাজাদের অধীনে ছিল।
সুবর্ণচন্দ্রের সময় থেকে এই বংশের রাজারা বৌদ্ধধর্মাবলম্বী হন। গোবিন্দচন্দ্রের রাজত্বকালে চোলরাজা রাজেন্দ্র চোল পূর্ব বাংলা আক্রমণ করেন এবং গোবিন্দচন্দ্রকে পরাজিত করেন।
কালচুরিরাজ কর্ণ পূর্ববাংলা আক্রমণ করলে চন্দ্র-বংশীয় রাজাদের পতন ঘটে। চন্দ্র-বংশের বিপর্যয়ের সুযোগে কর্ণের জামাতা ও বজ্রবর্মণের পুত্র জাতবর্মণ পূর্ববাংলায় বর্মণ বংশের রাজত্বের সূচনা করেন।
চন্দ্রবংশীয় রাজারা বৌদ্ধ হলেও বর্মণ রাজারা ব্রাহ্মণ্য হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছিলেন। বিক্রমপুরে এঁদের রাজধানী ছিল।
জাতবর্মণের পর তাঁর দুই ভ্রাতা হরিবর্মন ও সমালবর্মন যথাক্রমে রাজত্ব করেন। সমালবর্মনের পুত্র ভোজবর্মন সেনবংশীয় রাজা বিজয় সেনের সমসাময়িক ছিলেন।
পরাক্রমশালী সেন রাজাদের আক্রমণে বর্মনরাজ্য দুর্বল হয়ে যায়।
“বিভিন্ন গ্রন্থে পট্টিকেরা নামে একটি স্বাধীন রাজ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই পট্টিকেরা ত্রিপুরা জেলার ময়নমতী অঞ্চলে অবস্থিত টিলা ছিল। ব্রহ্মদেশীয় ইতিহাস থেকে জানা যায় ব্রহ্মরাজ অনিরুদ্ধ (১০৪৪-১০৭৭ খ্রিস্টাব্দ) আরাকান আক্রমণ করে জয় করেন। আরাকানের চন্দ্র-বংশীয় রাজারা সেখান থেকে বিতারিত হলে তাদেরই এক শাখা সম্ভবত পট্টিকেরায় একটি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। ব্রহ্মদেশের কাব্যে পট্টিকেরা রাজপুত্রের সঙ্গে ব্রহ্মদেশের রাজকন্যার প্রণয় কাহিনি বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। এই পট্রিকেরা রাজাদের সঙ্গে ব্রহ্মদেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত ছিল। ময়নামতী লিপিতে রণবন্ধমল্ল শ্রীহরিকেল দেব (১২০৩/০৪
খ্রিস্টাব্দ) নামে একজন পট্টিকেরা রাজার নাম পাওয়া যায়। তবে এখানে উল্লেখযোগ্য এই যে সেন রাজবংশ দুর্বলতার সুযোগে পূর্ব বাংলার দেব বংশীয় রাজারা শক্তশালী হয়ে ওঠেন এবং পট্টিকেরা অঞ্চলও এঁদের রাজ্যভুক্ত হয়ে যায়।”
এতটুকু বলে অজিতবাবু থামলেন। ইতিমধ্যে গ্লাস দুই রাউন্ড ঘুরে ফেলেছে। রাধামাধব আর কাঞ্চনও এসে যোগ দিয়েছে এবার।
রাধামাধব এসেই জানিয়েছিলেন, “ভাত-মাংস সব তৈরি হয়ে গেছে। এই নিন দ্বিতীয় রাউন্ডের কাবাব। আর কিন্তু কাবাব নেই এরপর।”
দাসবাবু অজিতকে বললেন, “এ তো এক অভূতপূর্ব ইতিহাস শোনালে হে অজিত। এত বছর ত্রিপুরায় আছি, মাণিক্য বংশের বাইরেও যে ত্রিপুরার এত বড় ইতিহাস আছে কিছুই জানতাম না। আমার বিশ্বাস অধিকাংশ ত্রিপুরাবাসীই এই ইতিহাস জানেন না। সেপ্লন্ড্রিড!”
সিনহা সাহেবের চোখে হালকা আমেজ এসেছে। তিনিও বললেন, “হ্যাঁ, আমাদের ত্রিপুরারও যে এত দীর্ঘ সময়ের ইতিহাস আছে তা আমি আজকে জানতে পারলাম।”
রামানুজ কিন্তু কিছুই বলল না। সে চুপ করে বসে রইল কিছুক্ষণ। তাকে আনমনা দেখে অজিতই জিজ্ঞেস করলেন, “স্যর, কিছু বলবেন!”
সম্বিত ফিরে পেল রামানুজ। বলল, “আপনার গল্প শুনতে শুনতে দেড় হাজার বছর পিছনে চলে গিয়েছিলাম। দারুণ লাগল এই ইতিহাস শুনে। আচ্ছা এই যে ওরা মাণিক্য বংশের কথা বলছেন এই রাজবংশ তো অতি বিখ্যাত। ওদের ইতিহাসটা সংক্ষেপে বলবেন না অজিতবাবু?”
অজিত এবার জিভ কাটলেন। বললেন, “স্যর আপনি আমাকে বাবু বলাটা বন্ধ করুন। অজিতই ঠিক আছে।”
রামানুজ হেসে বলল, “ঠিক আছে। বাকিটা বলুন, শুনে মুগ্ধ হই। কই এস পি, আমাকে তিন নম্বরটা দিন।”
সিনহা সাহেব আরেক গ্লাস রঙিন জল এগিয়ে দিলেন রামানুজর দিকে। সুস্বাদু কাবাব চিবোতে চিবোতে গল্পের গাড়ি ছুটল আবার। বাইরে হিম শীতল ঠান্ডার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিকন হাওয়া।
অজিত গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলতে লাগলেন, “ত্রিপুরার মাণিক্যবংশীয় রাজারা চন্দ্রবংশীয় ক্ষত্রিয় হিসেবে পরিচিত ছিলেন। রাজমালায় বলা হয়েছে যে এঁদের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন পুরাণ বর্ণিত উত্তর ভারতের বিখ্যাত চন্দ্রবংশীয় রাজা যযাতির পুত্র দ্রুহ্যর বংশধর। দ্রুহ্য পিতা কর্তৃক নির্বাসিত হয়ে ভারতের পূর্বদিকে ত্রিবেগে একটি রাজপাট স্থাপন করেন। শ্রীকালীপ্রসন্ন সেন সম্পাদিত শ্রীরাজমালায় এই ত্রিবেগের অবস্থান সাগর দ্বীপে বলে বর্ণনা করা হয়েছে। দ্রুহার বংশধর দৈত্য কিরাতভূমি অধিকার করে কপিল নদীর তীরে মানে বর্তমানে যেটা আসামের নওগাঁও সেখানে এক নতুন রাজপাট স্থাপন করেন এবং এই রাজ্যের নামও ত্রিবেগ রাখা হয়। শ্রীকৈলাসচন্দ্র সিংহের মতে দ্রুহাই কপিল নদীর তীরে ত্রিবেগে রাজপাট
স্থাপন করেছিলেন। রাজমালায় এই ত্রিবেগ রাজ্যের সীমা এইভাবে দেওয়া আছে ‘ত্রিবেগ রাজ্যের পূর্বে মেখলী দেশ, উত্তরে তৈড়ঙ্গ নদী, পশ্চিমে বঙ্গদেশ ও দক্ষিণে আচরঙ নামক রাজ্য।’
এই বর্ণনা অনুযায়ী দৈত্যের বা মতান্তরে দ্রুহ্যর পুত্র ত্রিপুর ছিলেন পরাক্রমশালী ও অত্যাচারী রাজা। তিনি নিজ নামানুসারে রাজ্যের নাম রাখেন ত্রিপুরা এবং তাঁর স্বজাতিরা ত্রিপুরি নামে পরিচিত হয়। ত্রিপুর শিবের হাতে নিহত হন।
ত্রিপুরের মহিষী হীরাবতী শিবের বরে ত্রিলোচন নামে এক পুত্র প্রাপ্ত হন। অর্থাৎ এখানে পুরাণকথা এসে মিশেছে ইতিহাসের সঙ্গে।”
এক টানে গ্লাসের তরল শেষ করে অজিত আবার বলতে শুরু করলেন, “এবার ইতিহাসে ফিরছি। অধিকাংশ পণ্ডিতের মতে মাণিক্যবংশীয় রাজারা তিপ্রা বা ত্রিপুরা জাতি থেকে উদ্ভুত হয়েছেন। শ্রীকৈলাসচন্দ্র সিংহ ত্রিপুরার রাজবংশকে তিপ্রা জাতির জ্ঞাতি বলে মনে করেছেন। হান্টার সাহেবের মতে ত্রিপুরার রাজারা হচ্ছেন তিব্বতি বর্মীয় গোষ্ঠীভুক্ত। ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তিপ্রা জাতিকে ভাষাগত দিক দিয়ে বোড়ো জাতিভুক্ত বলেছেন। প্রাচীনকালে এই বোড়ো জাতি ভারতের সমগ্র পূর্বাঞ্চল জুড়ে বাস করতো। এদেরই বলা হত কিরাত। জাতিতত্ত্বের দিক থেকে তিপ্রা, কাছাড়ি, মেচ, কোচ, গারো প্রভৃতি হল সমগোত্রীয়। এদের মধ্যে তিপ্রা ও কাছাড়ি জাতিদ্বয়ের ভাষা, অবয়ব, আচার-আচরণ প্রভৃতি বিষয়ে সামঞ্জস্য লক্ষ করে মেজর ফিশার তিপ্রা ও কাছাড়িদের
একই বংশোদ্ভূত বলে মনে করেন। কালক্রমে তিপ্রা ও কাছাড়িরা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভিন্ন স্থানে ভিন্ন নামে পরিচিত হয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলে বিভিন্ন পার্বত্য জাতির সঙ্গে একত্রে বসবাসে ফলে তিপ্রারা একটি ভিন্ন জাতিতে পরিণত হয়েছে। তিপ্রা ও কাছাড়িরা যে একই বংশোদ্ভূত তা রাজমালার বিবরণ থেকেও অনুমান করা যায়। রাজমালাতে বলা হয়েছে যে মাণিক্য রাজাদের পূর্বপুরুষ ত্রিলোচনের জ্যেষ্ঠপুত্র হেরম্ভ ফা কাছাড়ের রাজা হন এবং কনিষ্ঠপুত্রের বংশধররা বর্তমান ত্রিপুরার রাজা হন।
মাণিক্য বংশীয় ত্রিপুরার
রাজাদের আদি বাসস্থান সম্পর্কে শ্রী অলীন্দ্রনাথ ত্রিপুরা তাঁর ‘ত্রিপুরা সংহিতা’ কাব্যে বলেছেন যে ত্রিপুরিরা আরাকানের হুং অঞ্চল থেকে এসেছে এবং ত্রিপুরিদের আরাকানবাসীরা হুং বলে থাকে এবং রাজাকে বলে হুং মুংগ।
ঐতিহাসিক শ্রী কৈলাসচন্দ্র সিংহের মতে ব্রহ্মদেশের উত্তরভাগের শ্যানবংশীয় রাজাদের একটি শাখা কামরূপের পূর্বাংশে একটি স্বতন্ত্র রাজ্য স্থাপন করেছিলেন।
এই রাজবংশের জ্যেষ্ঠপুত্র হেরম্ব ফা বর্তমান কাছাড় রাজ্যে স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করেন এবং কনিষ্ঠ পুত্র কাছাড়ে উত্তরাংশে দ্বিতীয় রাজ্য স্থাপন করেন।
অর্থাৎ রাজমালার সঙ্গে এর হুবহু মিল রয়েছে। অর্থাৎ এই দ্বিতীয় রাজ্যটিই হল আমাদের প্রাচীন ত্রিপুরা।
অর্থাৎ ত্রিপুরার মাণিক্যবংশীয় রাজাদের পূর্বপুরুষেরা ব্রহ্মদেশের উত্তরভাগে শ্যান বংশীয়দের উত্তর পুরুষ এবং কাছাড়ের রাজারা একই বংশের তা প্রমাণ হল।
“এবার বাকি থাকে রাজাদের নাম ইত্যাদি। এগুলো আপনারা সাধারণ আন্তর্জাল ঘাটলেই পেয়ে যাবেন। তাই আমি সেসব বলছি না। সেগুলো বাদ রেখে আমি মাণিক্যবংশের সঙ্গে ত্রিপুরার সম্পর্কটা নিয়েই আলোচনা করছি। এখানে আর একটা কথাই বলা বাকি থাকে। সিনহা স্যর, আরেক পেগ দিন না। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল।”
মিঃ সিনহা হাসিমুখে বানিয়ে দিলেন পেগ। ত্রিপুরার অনালোকিত ইতিহাস শুনতে পেরে সবাই গোগ্রাসে শুনছে।
সিনহা স্যরের পেগ এক টানে বার গলায় ঢাললেন অজিত।
দাসবাবু বললেন, “নিজের আসল গুণটা আজকে দেখাচ্ছো বৎস। এতগুলো পেগ খেয়েও এভাবে গড়গড় করে নির্ভুল ইতহাস বলে চলেছো।”
রামানুজ ফোড়ন কাটল, “তাও আবার সন তারিখ সমেত।” অজিত জিভ কাটল।
অল্প জড়ানো গলায় বলল, “স্যর, ইতিহাস বিষয়টাকে ভালোবাসি। ভালোবাসি আমার রাজ্যটাকেও। এই ইতিহাস আমি ঘুমেও আপনাকে সঠিক বলবো। প্রয়োজনে সন তারিখ বইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখবেন।”
রামানুজ হালকা সুরে বলল, “সে বিশ্বাস তোমার উপর চলে এসেছে। শেষ পার্টটা বলো। তারপর মাংস ভাত অপেক্ষায় রয়েছে।”
অজিত শেষ অংশটা বলা শুরু করল, “মাণিক্যবংশীয় রাজারা ইন্দোমঙ্গোলীয় বা করাত ও ভাষাগত দিক থেকে বোরো জাতিভুক্ত তিপ্রা বা ত্রিপুরা উপজাতির অন্তর্ভুক্ত হলেও তাঁরা চন্দ্রবংশীয় ক্ষত্রিয় ছিলেন। ভারতে প্রাচীনকালে শক্তিশালী রাজারা ক্ষত্রিয় শ্রেণীভুক্ত হতেন এবং ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরাও তা সগৌরবে ঘোষণা করতে দ্বিধা করতেন না। রাজপুতানায় বহু খ্যাতনামা রাজবংশকে হুন প্রভৃতি বিদেশী জাতিভুক্ত হলেও ক্ষত্রিয় সমাজভুক্ত হয়েছিলেন এবং চন্দ্র ও সূর্য বংশীয় হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন। বিদেশ থেকে আগত গুর্জর প্রতিহাররা নিজেদের অযোধ্যার সূর্য বংশীয় বলে দাবী করতেন এবং দ্রাবিড় চালুক্যরা কখনো সূর্য কখনো চন্দ্র বংশীয়ও দাবী করতেন। সেদিক থেকে বিচার করলে ত্রিপুরার মাণিক্যবংশীয় রাজারাও ছিলেন ক্ষত্রিয় ও চন্দ্র বংশীয়। তাঁরা
ভারতীয় ঐতিহ্য ও হিন্দু সভ্যতার সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন।”
অজিত থামলেন। দীর্ঘ সময়ের ইতিহাস আলোচনার পরিসমাপ্তি ঘটল। রাতে সবাই কষা মাংস আর ভাত খেলেন তৃপ্তি করে। সকলেরই পা টলছে।
রাধামাধবদা আর কাঞ্চন টলতে টলতেই সবাইকে খাবার এনে দিলেন। বড়বাবু, মেজবাবু, ছোটবাবু সবাই ভেদাভেদ ভুলে একত্রে ভোজন শেষ করে শুতে গেল।
তারা কেউ জানতেও পারল না, একজন মানুষ এই কনকনে ঠান্ডায় কেবল একটা চাদর গায়ে দিয়ে তাদের বাংলোর আশেপাশে ঘুরছিল।
প্রহরীদের চোখ এড়িয়ে বাংলোতে ঢোকার রাস্তা খুঁজে পেল না সে।
