মৃত কৈটভ ১.৬
(৬)
সকাল থেকে কুয়াশায় ঢেকে আছে ত্রিপুরা রাজ্য। হেমন্তাইসহ গ্রামের অনেকেই সকাল থেকে বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট আগুনের কুণ্ড বানিয়ে হাত পা সেঁকে নিচ্ছেন।
সূর্যের দেখা মেলেনি সকাল থেকে। গ্রামবাসীদের কেউ কেউ আজ হেমন্তাইকে জিজ্ঞেস করছিল, “হেমন্তাই, জঙ্গলকে আমরা শেষ পর্যন্ত রক্ষা করতে পারবো তো?”
কেউ বলল, “ফরেস্ট অফিসারটা ভালো নয়। যা খুশি করতে পারে।”
হেমন্তাইয়ের চ্যালাদের মধ্যে একজন বলল, “কুঁপিয়ে ফেলব যদি জঙ্গলের ভিতরেও কেউ পা ফেলে।”
হেমন্তাই কোনো কথারই উত্তর দিচ্ছেন না। সেদিন অফিসারের হাত-পা ধরেও তিনি তাকে নিরস্ত্র করতে পারেননি। তারপর আবার কাঞ্চনের ব্যপারটা।
সব মিলিয়ে তার মাথা আর মন কাটাকুটি খেলায় ব্যস্ত। চারদিকে থেকে ভেসে আসা গুঞ্জনগুলো যেন শুনতেই পাচ্ছেন না তিনি।
এরই মাঝে কেউ একজন হাত ধরে ঝাঁকালো, “কী হল? কিছু ভাবলেন?
এবার গ্রামের হেমন্তাই জেগে উঠল যেন। তিনি হুঙ্কার দিলেন, “হেমন্তাই বেঁচে আছে তো এখনও, চিন্তা করো না কেউ। এই জঙ্গল আমাদের। কেউ এতে হাত দিতে পারেনি, ভবিষ্যতেও কেউ পারবে না।”
গ্রামবাসী যেন বুকে বল ফিরে পেল। তাদের সমবেত উল্লাস জানান দিল তাদের একতার।
এই সময়টায় গ্রামবাসীরা এক ধরনের মিষ্টি পিঠা খেতে পছন্দ করে।
এই পিঠের সঙ্গে ভাত পঁচানো মদ খেয়ে শীতের দিনগুলোতে এরা আমোদ করে। হাতে হাতে আজ পিঠে বিতরণ হচ্ছে।
প্রায় প্রতি ঘরেই এই পিঠে বানানো হচ্ছে। ভাত পঁচা সাদা মদ দিয়ে খাচ্ছে সবাই। ঝিম ঝিম ধরা
মাথায়, কনকনে ঠান্ডায় বসে আগুন পোহাচ্ছে সবাই।
এমন সময় গাড়িটা এসে থামল। সবাই চকিতে তাকাল সেদিকে। কুয়াশায় দশ পনেরো ফুট দূরের জিনিসও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না।
আন্দাজে গাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকল অনেকে। পিছন পিছন আরও একটা গাড়ি এসে থামলো।
প্রথম গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন মি সিনহা আর রামানুজ। পিছনের গাড়িতে থেকে বেরিয়ে এল সশস্ত্র পুলিশ।
দাসবাবু আজ অন্য কাজে গেছেন এদিকে আসতে পারেননি।
মিঃ সিনহাকে নিয়ে রামানুজ হেমন্তাইয়ের দিকে এগিয়ে এল। তারপর আসেপাশে একবার তাকাল। গ্রামবাসীদের অনেকেই খালি গায়ে আগুনের সামনে বসে আছে।
দেখে কষ্ট হল তার। কিন্তু এখন ডিউটির সময়। আবেগ নিয়ন্ত্রণ করাই কাজ।
গলা খাকারি দিয়ে সে বলল, “তিনদিন পর আমরা জঙ্গলে ঢুকব। আমাদের সঙ্গে আমাদের বিশাল ফোর্স ও সার্চ পার্টি থাকবে। আমরা চাইলে আপনাদের না জানিয়ে সরাসরিও এই কাজ করতে পারতাম। কিন্তু বিষয়টা আপনাদের ক্ষেত্রে স্পর্শকাতর, তাই আপনাদের মানসিক প্রস্তুরির জন্য আমরা তিনদিন সময় দিলাম।”
গ্রামবাসীদের মধ্যে কেউ একজন বলে উঠল, “কে মানছে আপনাদের কথা?”
কুয়াশায় দেখা গেল না কাউকে। রামানুজের মনে হল পিছন থেকে শব্দটা এসেছে।
সে তাই পিছনে ফিরে বলল, “জানি আপনারা মানবেন না। তাই সরকারি শিলমোহরওয়ালা কাগজ আনিয়েছি সরকার থেকে। এতে লেখা আছে যদি আপনারা আমাদের বাঁধা দেন, তাহলে যে বা যারা আমাদের বাঁধা দেবে তাদের তৎক্ষণাৎ গ্রেফতার করা হবে। যদি পুরো গ্রাম বাঁধা দেয় পুরো গ্রামকেই আমরা গ্রেফতার করবো। জঙ্গলের প্রয়োজনে সম্পূর্ণ গ্রামটাকে অধিগ্রহণও করা হতে পারে। সেক্ষেত্রে জঙ্গল তো যাবেই, গ্রামটাও হারাবেন আপনারা। অবশ্যই সেক্ষেত্রে আপনারা পুনর্বাসন পাবেন অন্য কোথাও। কিন্তু এত বছরের সাধের গ্রাম থেকে দূরে গিয়ে নিশ্চয়ই আপনারা থাকতে চাইবেন না। মন্দিরগুলোও সেক্ষেত্রে ভাঙা পড়বে।” কয়েকজন গ্রামবাসী রামানুজের কথা সম্পূর্ণ হবার আগেই তেড়ে এল তার দিকে। সশস্ত্র বাহিনী এগিয়ে এসে থামাল তাদের। চিৎকার শুরু করল সকলে। হইহল্লাসহ একটা গণ্ডগোল লাগার পরিস্থিতি সৃষ্টি হল।
রামানুজ দমল না। সে তার বাকি কথা সম্পূর্ণ করল। সে বলল, “আমাদের সুষ্ঠুভাবে আমাদের কাজ করতে দিলে আপনাদের পক্ষেই মঙ্গল। আমরা জঙ্গলে যাবো, ভিতরে ঢুকব, জঙ্গল পরিদর্শন করে বেরিয়ে যাব। আপনাদের কোনোভাবে বিরক্ত করব না আমরা। যদি আমরা জঙ্গলে যাবার ফলে কোনো ক্ষতি হয় সে গ্রামেরই হোক বা কোনো মানুষেরই হোক, তবে সেই ক্ষতিপূরণ দেবে সরকার। আপনারা নিশ্চিন্তে থাকুন।”
রামানুজ কথা শেষ করলেন। চারদিক থেকে আওয়াজ আসছে, “তোর জিভ ছিঁড়ে নেবো।”
“আমাদের দেবতার মন্দির ভাঙার কথা মুখে আনলি কীভাবে?”
“জঙ্গলে ঢুকলে কেউ ফেরত আসে না। যা গিয়ে মর।”
নানান কথা ভেসে আসছে। ফোর্স চারদিকের বিশৃঙ্খলা আয়ত্তে আনতে রাইফেল তাগ করে আছে।
মিঃ সিনহা অব্দি সার্ভিস রিভলভার বের করে রামানুজকে গার্ড করছেন। রামানুজ ভাবলেশহীনভাবে দাঁড়িয়ে আছে। হেমন্তাই এবার উঠে দাঁড়ালেন।
রামানুজ তার দিকেই এগিয়ে গেল। গিয়ে তাকে হাত জোর করে প্রণাম করল।
মুখে বলল, “নিন ধরুন। আর সেদিন আপনার উপর রাইফেল তাগ করেছিলাম বলে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। আপনি এই গ্রামের মাথা। পারলে সবাইকে বোঝাবেন। তিনদিন সময় রইল হাতে। আসি।”
হেমন্তাই নীচু স্বরে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তিন দিনে লারবো তো আমি এত বছরের সংস্কার থেকে সবাইকে মুক্তি দিতে!”
রামানুজ এবার হেমন্তাইয়ের চোখে চোখ রাখল। অদ্ভুত এই দৃষ্টি। তাকানো যাচ্ছে না হেমন্তাইয়ে চোখের দিকে। একইসঙ্গে তেজিয়ান অথচ
ভীষণ অসহায় এই দৃষ্টি। এরই মাঝে একজন রামানুজকে তাগ করে একটা ছোট পাথর ছুড়ল। তার বুকে এসে লাগল পাথরটা।
ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল সে। হেমন্তাই চিৎকার করে বললেন, “কেউ ওকে ছোঁবে না। কেউ পাথর মারবে না। ওদের সসম্মানে যেতে দাও।”
রামানুজ এবার অবাক হল। হেমন্তাই থেকে এই আচরণ সে আশা করেনি। আর দেরি করল না তারা।
মিঃ সিনহা এসে তাড়া দিলেন। “চলুন স্যর। এখানে দাঁড়িয়ে থাকা বিপজ্জনক। কুয়াশায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। এখন সুরক্ষিত নয় এখানে থাকা।”
গার্ড করে রামানুজকে গাড়িতে তুলে দু-টো গাড়িই বেরিয়ে গেল গ্রাম থেকে।
হেমন্তাইয়ের নির্দেশের পর আর কেউই ওদের উপর হামলা করল না।
ওরা চলে যাবার পর বাকিরা নিজেদের মধ্যে কথা বলাবলি শুরু করল। বেশিরভাগই আবার নিজের নিজের জায়গায় বসে পড়ল।
কিন্তু হেমন্তাই বসলেন না। তিনি হাতের কাগজটা নিয়ে সোজা হাঁটতে লাগলেন। তার গন্তব্যের অভিমুখ আবাসনের দিকে।
আবাসনের সামনে হেমন্তাই দেখলেন এই কুয়াশার মধ্যেই ছাত্ররা নিজের নিজের শিক্ষাবর্ষ অনুযায়ী পাঠাভ্যাস করছে। অনেকটা এলাকা জুড়ে এই আবাসন।
হেমন্তাই ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলেন সমস্ত ব্যবস্থাপনা। বেশ কিছুদিন পরে তিনি আবাসনে এসেছেন। আবাসনের গুরুদেব এখনও তাঁর আসার খবর পাননি।
পেলে নিশ্চয়ই তিনি ছুটে আসতেন।
হেমন্তাই জানেন, তাঁর সমস্ত কিছু নির্ভর করে এই আবাসনের উপর। এই জঙ্গলকে রক্ষা করতে এই আবাসনের গুরুত্ব সর্বাধিক।
তিনি একে একে আবাসনের প্রত্যেক শ্রেণীকক্ষে ঢুকতে লাগলেন।
এই গ্রামের গ্রামবাসীরা আলাদাভাবে কোথাও বিদ্যাভ্যাস করে না, কোনও সরকারি বিদ্যালয়ে যায় না। তারা নিজেদের মতো একটি বিদ্যালয় তৈরি করেছেন।
এই আবাসনই সেই বিদ্যালয়। এখানে সাধারণ সিলেবাসভিত্তিক
পড়াশোনা করানো হয় না। তবুও পরীক্ষা দিতে হয় সকলকেই। এই আবাসনের ছাত্রছাত্রীরা সমবয়সী শহরের বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে মেধার ভিত্তিতে পাল্লা দিতে পারবে, আবাসন সেভাবেই তৈরি করে একেকজন ছাত্রকে।
আর আবাসনের লক্ষ্য শুধু বিদ্যালয় থেকে পাশ থেকে চাকরি করার মতো তুচ্ছ ব্যপার নয়, আবাসনে লক্ষ্য মানবজাতিকে রক্ষা করা।
অনেক বেশি কঠিন এই শিক্ষাপ্রণালী।
ছোট বয়স থেকেই গ্রামের পিতা মাতারা তাদের বাচ্চাদের এই আবাসনে ভর্তি করে দেয়।
একেকটা বাচ্চাকে তৈরি করতে দশ থেকে পনেরো বছর সময় নেয় আবাসনের গুরুমশাইয়েরা।
প্রতি বারো বছর অন্তর এখান থেকেই বাছাই করা হয় সেরা বারোজনকে। এই বারোজনকেই সসম্মানে জঙ্গলে পাঠানো হয়।
জীবনকে বাজি রেখে ওরা জঙ্গলে জীবনের শেষ বারো বছর কাটিয়ে দেন।
হেমন্তাই দেখলেন, কিছু শ্রেণীকক্ষে ছাত্রদের বোঝানো হচ্ছে মানসিক দৃঢ়তা বৃদ্ধির উপায়। কিছু শ্রেণীকক্ষে বিভিন্ন পদার্থের ঔষধি গুণাগুণ শেখানো হচ্ছে।
কোনো শ্রেণীকক্ষে ডাক্তারি পড়ানো হচ্ছে। কোথাও বা দেওয়া হচ্ছে অঙ্কের শিক্ষা। শারীরবিদ্যায় পারদর্শী হবার কৌশল শেখানো হচ্ছে কোনো কক্ষে।
এগুলো সবই তুলনামূলকভাবে আঠারো বা তার চেয়ে বেশি বয়সের যুবকদের শেখানো হচ্ছে।
যারা ছোট তাদের পড়ানো হচ্ছে সাধারণ বাংলা, ইংরেজি, বিজ্ঞান। বয়সানুযায়ী একেক বয়সের বাচ্চা, কিশোর বা যুবকদের সেরকম পড়াশোনা করানো হচ্ছে।
যুগ যুগ ধরে এই গ্রামে চলে আসছে এই রীতি। এখানকার গুরুমশাইয়েরাও এই আবাসনেরই ছাত্র ছিলেন।
এই গ্রামের তুলনামূলক এই ছোট আবাসন পদার্থবিদ্যা থেকে শুরু করে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান, সমস্ত বিষয়ে কতটা উন্নত তা বহির্বিশ্বের কেউ বিশ্বাস করবে না।
উপজাতি হয়েও যে এত সুন্দরভাবে ওরা কথা বলতে পারে বাইরের লোকেদের সঙ্গে, সমস্ত বিষয়ে নিজেদের রক্ষা করতে পারে, অস্ত্র চালনা করতে পারে- এ সবই পুরাকাল থেকে
এই আবাসনের কক্ষগুলোতে শিক্ষালব্ধ ফলাফল। উপজাতি রীতি অনুসারে যে জঙ্গল থেকে আগত শয়তানদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়, সেই তীর ধনুক কিংবা তলোয়ার চালনা শেখানো হয় এই আবাসনেই।
আবাসনের ভিতরের দিকে রয়েছে বড় সর জায়গা। সেখানে মল্ল যুদ্ধ থেকে শুরু করে মুগুর ভাজা, তলোয়ার, বর্ষা সহ বিভিন্ন অস্ত্রশিক্ষা দেওয়া হয়।
হেমন্তাই হাঁটতে হাঁটতে এখন চলে এসেছেন সেই খোলা জায়গায়। আবহাওয়া প্রতিকূল বলে আজ কোনো অস্ত্র শিক্ষা হচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু বেশ কিছু ছাত্র এখানে শরীরচর্চাসহ বিভিন্ন কার্যকলাপ করছে।
এদের মধ্যেই কেউ ভবিষ্যতে জঙ্গলে প্রবেশ করার উপযুক্ত হয়ে উঠবে। হাঁটতে হাঁটতে এবার হেমন্তাই রওনা দিলেন আবাসনে অপর প্রান্তে।
ওই প্রান্তটি গ্রামের ছাত্রীদের জন্য বরাদ্দ। বিদ্যাশিক্ষা সবার একত্রে হলেও কিছু বিশেষ শিক্ষা শুধুমাত্র ছাত্রীদের দেওয়া হয়।
যেরকম ছাত্রদের জঙ্গলে অভ্যন্তরে প্রবেশ করার পর থেকে কীভাবে নিজেদের আত্মরক্ষাসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রদান করা হয় তেমনি ছাত্রীদের এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে প্রতি বারো বছর অন্তর হেমন্তাই পরিবর্তন করার প্রক্রিয়ায়।
এই গ্রামের পূর্বপুরুষেরা পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্যেই দু-টো আলাদা অথচ একই প্রকার জটিল কার্য নির্ধারণ করেছিলেন।
আজকের দিনেও সেই রীতি পালন করা হচ্ছে। পুরুষ বা নারী কেউই এই গ্রামে একে অপরকে বলতে পারে না যে এর কাজটা সহজ ওর কাজটা কঠিন।
দু-টো কাজই দিনের শেষে যুক্ত হলে পর গ্রামের কল্যাণ সাধন হবে। একা কেউ যথেষ্ট নয়।
কারণ হেমন্তাই ছাড়া গ্রামের অমাবস্যা রাতের ক্রিয়াদি, বারোজন যুবকের জঙ্গলে প্রবেশ ক্রিয়া সমস্ত অচল।
এদিকে হেমন্তাই নির্বাচনের ক্ষেত্রে সেরা ছাত্রীরা অংশগ্রহণ না করলে হেমন্তাই নির্বাচিত হবে না। সমস্তটাই একটা ক্রমাগত ঘটে-চলা ক্রিয়ার অংশ।
যেকোনো একটা অংশকে তার স্থানচ্যুত করলে সম্পূর্ণ সিস্টেমটা ধ্বংস হয়ে যাবে।
হেমন্তাই ছাত্রীদের অংশে প্রবেশ করে দেখলেন সেখানেও ছাত্রীরা নির্দিষ্ট
শারীরবিদ্যা অধ্যয়নে ব্যস্ত। হেমন্তাই নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে কাউকেই ব্যস্ত সমস্ত করলেন না।
কিন্তু ইতিমধ্যে একজন হেমন্তাইকে দেখে আবাসনের গুরুদেবকে জানিয়েছিলেন। গুরুদেব খুঁজতে খুঁজতে এসে উপস্থিত হলেন হেমন্তাইয়ের কাছে। এসেই প্রণাম করলেন।
“আপনি পরিদর্শনে আসবেন আগে জানালে আমি আপনাকে আনার জন্য কাউকে পাঠাতাম।”
হেমন্তাই হাসলেন। বললেন, “হঠাৎই এলাম। পূর্বপরিকল্পিত নয়। চারদিকে খুব নিষ্ঠা ভরে কাজ হচ্ছে দেখে মন শান্তিতে ভরে উঠল।”
গুরুদেব বললেন, “আপনি কার্যালয়ের দিকে চলুন। সেখানে বসে কথা হবে।”
হেমন্তাই এবার একটু গম্ভীর হলেন। বললেন, “দিন তো এগিয়ে এল। প্রস্তুতি কীরকম?”
গুরুদেব চিন্তিত হলেন না। বললেন, “ইতিমধ্যে বাছাই পর্ব সম্পূর্ণ। সেরা বারোজন ছাত্র আমরা পেয়ে গেছি।”
কিছুটা নিশ্চিন্ত হলেন হেমন্তাই। পরক্ষণেই ফুটে উঠল চিন্তার ভাঁজ, “আর ছাত্রী?”
গুরুদেব এবারেও তাঁকে নিশ্চিন্ত করে বললেন, “সেরা ছাত্রীর চয়নও সম্পূর্ণ।”
হেমন্তাই এবার তৃপ্তির হাসি হাসলেন। তারপর বললেন, “আমি কি তাদের সঙ্গে এখন একবার দেখা করতে পারি?”
“হ্যাঁ, নিশ্চয়ই পারেন। আমাকে কিছুক্ষণ সময় দিন। ওদের তৈরি করে আলাদা কক্ষে পাঠাচ্ছি।”
কথাটা বলেই গুরুদেব সহকারী একজন শিক্ষককে নির্দেশ দিলেন। হেমন্তাই কিছুটা আপন মনেই বলতে লাগলেন, “আসলে এবারের পরিস্থিতি খানিক জটিল। বন-দপ্তরের যে লোকটা এবার দায়িত্বে আছে সে লোক তার দায়িত্বের প্রতি যত্নবান। লোক মন্দ নয়। কিন্তু তাতে তো
আমাদের কাজে ব্যাঘাতের সৃষ্টি হচ্ছে বেশি। এদিকে বারো বছরও সম্পূর্ণ। অমাবস্যার আর দিন সাতেক বাকি।
সেই অফিসার একটু আগে এসে আমাকে এই কাগজটা দিল। সরকারি নোটিশ। তিনদিনের মাথায় জঙ্গল পরিদর্শন করবে বাহিনী নামিয়ে।
কীভাবে যে এদের আটকাই বুঝতে পারছি না। এদিকে মনটা হয়ে উঠেছে চঞ্চল।
হেমন্তাই হবার শেষ সাতটা দিন খুব ধকল যাবে মনের উপর।”
হেমন্তাই থামলে গুরুদেব বললেন, “আপনি শুধু ক্রিয়াদির কথা ভাবুন। তিনদিনের মাথায় ওরা আসবে তাই তো! আচ্ছা দেখছি।”
গুরুদেবের কথায় কিছুটা আশ্বস্ত হলেন হেমন্তাই। কিছুক্ষণের মধ্যে কক্ষে সকলে উপস্থিত হলে একজন সহকারী এসে গুরুদেবকে তা জানালো।
গুরুদেব বললেন, “চলুন। সবার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।”
একটা বড় কক্ষে উপস্থিত হল সবাই। একটা সরলরেখায় সকলে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে একটা ছোট মঞ্চ।
সেখানে হেমন্তাই আর গুরুদেব উঠে দাঁড়ালেন। ছাত্ররা সকলেই পরে আছে আবাসন অনুমোদিত সাদা থান বস্ত্র।
ছাত্রদের উদ্দেশে হেমন্তাই বললেন, “আপনারা সবাই সৌভাগ্যবান। আমাদের গ্রামের সকলে জীবনভর যে কার্য করার জন্য ছেলেবেলা থেকে প্রাণপাত করে আপনাদের সে কার্য সাধনের জন্য চয়ন করা হয়েছে। আপনাদের উপর গুরু দায়িত্ব থাকবে শুধু আমাদের গ্রাম নয়, সম্পূর্ণ মানবসভ্যতাকে রক্ষা করার। আপনাদের পূর্ববর্তী সকলেই যে কার্যে অসফল থেকেছেন আমি আশা করব আপনারা সে কার্যে সফল হবেন।”
ছাত্র তাঁদের ডান হাত তাঁদের বুকের বাঁ-দিকে ছুঁয়ে হেমন্তাইকে অভিবাদন জানাল। এবার হেমন্তাই কক্ষে উপস্থিত একমাত্র ছাত্রীর দিকে তাকালেন।
সেও এক খণ্ড থান বস্ত্র পরিহিতা। কিন্তু বিশেষ উপায়ে থান বস্ত্রটিকে শাড়ির আদলে পরিধান করেছে সেই ছাত্রী।
তারও ডান হাত উন্মুক্ত। কোনো বক্ষবন্ধনী সে পরেনি। ছাত্রীটির দিকে তাকিয়ে হেমন্তাই চোখ বন্ধ করলেন।
তারপর চোখ খুলে গুরুদেবের দিকে তাকালেন। গুরুদেব তাঁর
কানের কাছে মুখ এনে অতি নিম্ন স্বরে বললেন, “সে-ই ছাত্রীদের মধ্যে এই কার্য সম্পাদনে শ্রেষ্ঠ। আমি সর্বপ্রকার পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
হেমন্তাই নিজেকে যথাযথ সংযত করলেন। তারপর ছাত্রীটির উদ্দেশে বললেন, “সফলতার সঙ্গে এই উচ্চতায় উপনীত হবার জন্য আপনাকে অভিনন্দন। আপনিও সৌভাগ্যবতী। শুধু সৌভাগ্যবতী নন, আপনি নারীশ্রেষ্ঠা। আমাদের গ্রাম পুরুষ ও নারীতে ভেদাভেদ করে না। এই বারোজন পুরুষ বারো বছর ধরে অধ্যবসায়ের পর আগামী বারো বছর যে কার্যে ন্যস্ত থাকবে আপনাকে একদিনে সেই কার্যের আধার নির্মাণ করতে হবে। সে হিসেবে আপনি একাই এই বারোজন ছাত্রের সমকক্ষ। আপনার উপর নির্ভর করবে এই গ্রামের ভবিষ্যৎ। পরবর্তী হেমন্তাই চয়নের ক্রিয়া খুবই ভয়াবহ। আপনাকে আমি শ্রদ্ধা জানাই আপনি এই কর্মের জন্য নিজেকে মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রস্তুত করেছেন বলে।”
হেমন্তাই সকলের উদ্দেশে প্রণাম করে কক্ষ থেকে বেরিয়ে মন্দিরের দিকে রওনা দিলেন। তাঁর মনটা আবার চঞ্চল হয়ে উঠেছে।
সেদিন বিকেলের দিকে রামানুজ ভাবল আশেপাশের এলাকা একটু হেঁটে দেখবে।
সেই মতো অন্ধকার নামার আগেই সে বাংলো থেকে বেরিয়ে হাঁটতে লাগল। রক্ষীরা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে তার সঙ্গে থাকল।
সিনহা একটু থানায় গেছেন। দাসবাবু একটু রেস্ট করছেন। বললেই তিনি উঠে চলে আসবেন।
কিন্তু রামানুজের একটু একা হাঁটাহাঁটি করার ইচ্ছে ছিল। রক্ষীদের সে বারণ করল না কারণ একসঙ্গে সকল প্রোটোকল ভাঙাটা উচিত হবে না।
এদিকটায় রাস্তা আঁকা বাঁকা, পাহাড়ি পথে যেরকম হয় আর কি। একদিকে জঙ্গল অন্যদিকে খাদ। তবে খাদ এদিকটায় এতটা গভীর নয়।
যত এগোচ্ছে সড়ক খাদ তত গভীর হচ্ছে। টিলা জমিতে চাষবাসের ব্যবস্থা, জুম চাষ বলে এই পদ্ধতিকে।
টিলা জমিকে ভাগে ভাগে কেটে এই চাষের ব্যবস্থা করা হয়। কিছু গ্রামবাসী এখন ফসলে জল দিচ্ছে।
স্প্রিন্টার চালু করে দিয়েছে তারা। স্প্রিন্টার ঘুরছে আর প্রতিবার চারদিকের ফসলে জল ছিটে পড়ছে। সুন্দর ব্যবস্থা।
শীতের দিনের প্রায় সকল ফসলই চোখে পড়ছে। রামানুজ আল বেয়ে জুমের মধ্যে ঢুকে পড়ল।
সুন্দর নিটোল বাঁধা কপি, ফুলকপিদের দেখে এখনই সবজি বানিয়ে খেতে ইচ্ছে করছে তার।
একজায়গায় এক চাষি মুলো তুলে বড় বাক্সে রাখছে। সাদা সাদা মুলোগুলি এত তরতাজা আর নধর দেখতে যে জিভ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে যেন।
বিভিন্নরকম শাক সবজির চাষ হচ্ছে ভাগে ভাগে। আগামীকালকের বাজারের জন্য কিছু সবজি তোলা হচ্ছে। বাকিগুলোর পরিচর্যা করা হচ্ছে।
থরে থরে সাজানো সজনে ডাটা, ঝিঙা, বেগুন, মটরসুটি। ছোট ছোট ঠেলাগাড়ি করে সেগুলো গ্রামের দিকে নিয়ে যাচ্ছে ওরা।
রামানুজ এরকম এক চাষিকে বলল, “কিছু সবজি কেনা যাবে?”
গ্রামবাসী লোকটা রামানুজকে চিনতে পারল। সে কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করে বলল, “কী কিনতে চান?’
“যা যা আছে সবই কিনতে চাই। দু-দিনের হিসেবে আর দিনে সাত আটজনের হিসেবে বাংলোতে দিয়ে এসো।”
রামানুজের এই কথায় কিছুটা ক্ষেপে গেল লোকটা। বলল, “কিন্তু আমরা তো ঢুকি না বাংলো-তে? পাহারা বসিয়ে আমাদের বাংলোর যেতে বলছেন!”
রামানুজ বুঝল সে ভুল করে ফেলেছে। সে স্বর নরম করে বলল, “আরে সে সবার জন্য নাকি! আচ্ছা এক কাজ করো। ওই যে আমার রক্ষীরা ওখানে আছে। ওদেরকে ঝোলায় ভরে দিয়ে দাও। আর শুধু আজকে নয়, প্রতি দু-দিনে এরকম তাজা সবজি তুমি আমাকে দিয়ে আসবে।”
রামানুজ কথা বলতে বলতে ওয়ালেট বের করে দু-টো পাঁচশো টাকা তার হাতে দিল।
সে ভেবেছিল সবরকমের তরকারি, তার উপর দু-দিনের বাজার, সাত-আটজন খাবার লোক। লোকটা তার দিকে তাকিয়ে আবার ক্ষেপে গেল।
“ইয়ার্কি করছেন! নাকি আমাকে কিনতে চাইছেন?” রামানুজ এবার অবাক হয়ে বলল, “আরে কী মুশকিল, সবজি কিনতে চাইছি শুধু। এত রকমের তরকারি। তার উপর দু-দিনের বাজার।”
লোকটা বলল, “এটা একটা বাজার নাকি! দু-শো টাকাও তো হল না।”
রামানুজ আকাশ থেকে পড়ল, বলল, “ক… কী… কী! এত সবজি দু-শো টাকাও হয়নি।”
“না হয়নি।”
লোকটা এবার সবজি গোছাতে মন দিয়েছে। পাঁচ ছ-টা ছোট ছোট ব্যাগে সব সবজি গুছিয়ে বলল, “নিন, একশো পঁচিশ টাকা হয়েছে।”
রামানুজ এবার আশ্চর্য হওয়া ছেড়ে দিয়েছে। সে পকেটে থেকে খুচরো বের করে এগিয়ে দিল।
মুখ ফসকে একবার বলল, “এদিকে এত সস্তা!” লোকটা মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ, একটু সস্তা এদিকে। নাহলে আপনি আমাদের গ্রামের অকল্যাণ করতে এসেছেন, আপনাকে আরও কাটা উচিত ছিল। নেহাত সে বিদ্যে জানি না আমরা।”
রামানুজ দেখল প্রসঙ্গ অন্যদিকে যাচ্ছে। সে রক্ষীদের একজনকে ডেকে বলল, “বাজারগুলো কেউ বাংলোতে নিয়ে যাও।”
রক্ষী বলল, “কিন্তু আপনাকে একা ছাড়ার অনুমতি নেই। অন্তত দু-জনকে আপনার সঙ্গে থাকতে হবে।”
রামানুজ এসব প্রোটোকল জানে। সে বলল, “বেশ। একজন গিয়ে রেখে এসো বাজারটা।”
রক্ষী সমস্ত কিছু একটা বড় ব্যাগে ঢুকিয়ে চলে গেল। লোকটা বলল,
“নতুন ব্যাগ দিয়েছি। আমার নিজের ব্যাগ। বাংলোয় গিয়ে নিয়ে আসবো পরশু দিন। দেখবেন, আবার পুলিশ ছুঁইয়ে দেবেন না।”
রামানুজ হো হো করে হেসে উঠল। মুখে বলল, “নির্ভয়ে এসো।”
ওরা চলে যেতে রামানুজ এই পথ ধরে আরও কিছুটা এগিয়ে গেল। এবার ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে এসেছে।
আর এগোনো উচিৎ হবে না। তবু রামানুজ একটা অন্য উদ্দেশ্যে আরও খানিকটা এগোচ্ছে।
জঙ্গলটা এদিক দিয়ে কতটা গভীর অব্দি দেখা যায় দেখাটাই তার উদ্দেশ্য। এই জায়গাটা মূল সড়ক থেকে অনেকটাই উপরে।
আরেকটু এগিয়ে গেলে এই অংশের পাহাড়ি অঞ্চলের শেষ প্রান্ত। সেখান থেকে জঙ্গলের ভিতরের একটা গোটা দৃশ্য চোখে পড়ার কথা।
এখন আর আশেপাশে কেউ নেই। প্রায় সবাই ফিরে গেছে গ্রামের দিকে। এদিকটা জনশূন্য।
তবুও মাঝে মাঝে চোখ ঘুরিয়ে চারদিকে দেখে নিচ্ছে রামানুজ। উপজাতিদের বিশ্বাস নেই।
নলে ফুঁ দিয়ে বিষ-মাখা ফলা চালনাতেও ওরা সিদ্ধ হস্ত। এর থেকে বাঁচার জন্য প্রতি মুহূর্তে নিজের হাঁটা পথটা অল্প করে পালটে পালটে হাঁটছে সে।
মূলত ঘাড়ের অংশটাকে রক্ষা করতেই ক্রমাগত ঘাড় নাড়াচ্ছে সে। একসময় একদম শেষপ্রান্তে পৌঁছে গেল সে।
খাদের শেষ অংশ থেকে শুরু করে সামনে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বনভূমি।
এই সেই জঙ্গল যা ভিতরে প্রবেশ করে সমস্ত সমাধান করার জন্যেই তার ত্রিপুরা আগমন।
প্রথম কয়েক মুহূর্ত প্রাণ ভরে সবুজের সমারোহ দেখল রামানুজ। এত বড় এলাকা জুড়ে জঙ্গল যে যেখানেই চোখ যাচ্ছে সেখানেই আটকে যাচ্ছে।
অন্ধকার হয়ে এলেও সূর্য একেবারে ডুবে যায়নি। দিগন্তের শেষ প্রান্ত লাল আভায় ছেয়ে আছে।
বনভূমির উপরের ফাঁকা শূন্য স্থানে পেঁজা তুলো মেঘ এসে স্থান ভরাট করেছে। যেন বনভূমির লজ্জা নিবারণের চেষ্টার আছে এই মেঘ।
রামানুজের সামনেই এক খণ্ড মেঘের টুকরো ভাসছিল। বিভোর হয়ে রামানুজ তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল সেদিকে।
সে এমনিতেই দাঁড়িয়ে ছিল খাদের প্রান্তে। আরও দু-পা এগোতেই পায়ের নীচের পাথর কেঁপে উঠল। তাতে ভ্রুক্ষেপ করল না সে। বরং আরেকটু এগিয়ে যাবার চেষ্টা করল।
আর এক দু ইঞ্চি। তাহলেই মেঘ রূপী ঘন ঠান্ডা কুয়াশায় হাত লেগে হাত ভিজে উঠবে তার। আর এক ইঞ্চি।
অবশেষে মেঘের গায়ে আঙুল ঠেকল রামানুজের। আর তখনই পায়ের নীচের পাথরটা গেল ভেঙে। চেতনা ফিরল রামানুজের। সে টাল সামলাতে পারল না। নীচে তার জন্য অপেক্ষা করছে প্রায় কয়েক হাজার ফুট গভীর খাদ। নিশ্চিত মৃত্যু উপস্থিত।
হাঁটু ভেঙে সামনের দিকে পড়ার মুহূর্তেই কেউ যেন পাশ থেকে বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল তার দিকে। রামানুজকে নিয়ে গড়িয়ে গিয়ে পড়ল পিছনের দিকে।
“স্যর আপনি কি পাগল নাকি! এক্ষুনি মারা পড়তেন।” পাথরের শক্ত জমিতেও হালকা সবুজ ভেজা ঘাসের রাশি। পাথরের সঙ্গে যেখানে মাটি মিশেছে সেখানেই শিকড় খুঁজে নিয়েছে আশ্রয়। দু-জনের গায়ে হাতেও লেগে গিয়েছে সেই ভিজে সবুজ ঘাস।
রামানুজ এই অবস্থাতেও মুচকি হেসে বলল, “ফরেস্ট অফিসার হয়ে যদি জঙ্গল আর প্রকৃতির প্রেমে পাগলই না হলাম তবে ওদের রক্ষা করবো কীভাবে। আর এই দেখো, প্রকৃতি তোমাকে পাঠালো আমাকে রক্ষা করার জন্য।”
কাঞ্চন এসব কাব্যিক কথায় গলল না। সে নিজের হাতে পায়ের ছড়ে যাওয়া অংশ দেখতে দেখতে উঠে দাঁড়াল। বলল, “না এরকম করবেন না আর। আমাদের জঙ্গলের সম্মোহনী ক্ষমতা আছে। সে আপনাকে বশে নিয়ে এসব করাচ্ছে।”
রামানুজও এবার উঠে দাঁড়াল। শরীর ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, “সম্মোহনী ক্ষমতা না থাকলে কি আর দিল্লির এসি রুম ছেড়ে এই এখানে আমাকে টেনে নিয়ে আসে! যা-ই হোক, প্রাণ বাঁচানোর জন্য ধন্যবাদ। আসলেই অসাধারণ সৌন্দর্য, দেখে আত্মবিস্মৃত ঘটেছিল আমার।”
কাঞ্চন এবার জিজ্ঞেস করল, “এখানে কেন এসেছিলেন?”
রামানুজ জঙ্গলের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, “তোমরা তো ভিতরে ঢুকতে দিচ্ছ না। ভাবলাম এখান থেকেই একটু দেখি। কিন্তু সে গুড়েও তো বালি।”
কাঞ্চন এতক্ষণে হাসল। হেসে বলল, “প্রথমত আমি আর ওই গ্রামবাসীরা আলাদা। আমি আপনাকে জঙ্গলে ঢুকতে আটকাইনি। আর দ্বিতীয় উত্তর হল, আমাদের জঙ্গল নিজেকে প্রথম এক কিলোমিটারের পর এতটাই গভীর করে ফেলেছে যে আপনি ভিতরের কিছু দেখতে পাবেন না। শুধু গাছের মাথাগুলো দেখতে পাবেন, তাও সেভাবে কিছু বোঝা যায় না।”
রামানুজ মাথা নাড়ল। তারপর দু-জনেই ফেরার রাস্তা ধরল। ফেরার পথে কৌতূহলবশত রামানুজ কাঞ্চনকে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা কাঞ্চন, তুমিও তো এই গ্রামের মানুষ। তোমার বাবা এই গ্রামের প্রধান। হেমন্তাইয়ের ছেলে হয়েও তুমি গ্রামের বাইরের লোক হলে কীভাবে? এই গ্রামের কেউ চাষবাসের বাইরে কোনো কাজ করে না। সেখানে তুমি আমাদের সরকারি বাংলো রক্ষণাবেক্ষণের কাজ নিয়েছো। ব্যাপারটা আমায় বলবে? দেখো আমি তোমার বড় ভাইয়ের মতো। আমাকে তুমি নিঃসংকোচে বলতে পারো।”
কথাটা বলে কাঞ্চনের পিঠে হাত দিল রামানুজ। শুরুর দিকের কথাগুলোতে কাঞ্চনের ভ্রু জোড়া কুঁচকে থাকলেও শেষের কথাটায় কাজ হল। কাঞ্চনের মনে হল বহু বছর পর কেউ তার খোঁজ নিচ্ছে। রামানুজকে তার আত্মীয়ের মতো মনে হল।
সে বলল, “স্যর অনেক বড় গল্প। এত বড় গল্প বলার ধৈর্য্য নেই আমার।”
রামানুজ হেসে বলল, “সে না হয় আসল অংশগুলোই বলো। আর শোনো, তোমাকে এই একটু আগেই নিজের ছোটো ভাইয়ের মতো বললাম, ভাই ভাইকে স্যর কেন বলবে। তুমি আমাকে দাদা বলতে পারো।”
কাঞ্চনের মতো যারা পরিবারহীন, তাদের কাছে এসব কথা মূল্য অনেক। কাঞ্চনের চোখে জল আসত আরেকটু হলে। নেহাত শক্ত-পোক্ত হৃদয়ের মানুষ। সামলে নিল নিজেকে। হাসি মুখে বলল, “ঠিক আছে দাদা। ঘরে চলো। একটা দারুণ কফি বানিয়ে দিচ্ছি তোমাকে। খেতে খেতে বলছি।”
বাংলোয় ফিরে নিজের ঘরে অপেক্ষা করতে লাগল রামানুজ। কিছুক্ষণের মধ্যেই ধোঁয়া উঠা কফি মাগ নিয়ে হাজির হল কাঞ্চন।
কফি খেতে খেতে সে বলল, “দাদা, আমি সম্পূর্ণ কাহিনি জানলেও সম্পূর্ণ কাহিনি আপনাকে বলবো না। কারণ সেটা সঠিকভাবে বলার মতো যোগ্য লোক আমি নই। তবে আমি নিশ্চিত যে কেউ-না কেউ এর মধ্যেই জঙ্গলের ভিতরে লুকিয়ে থাকা রহস্যসহ আরও নানাবিধ ব্যাপারে আপনাকে জানাবে। আমি শুধু আমার অংশটাই আপনাকে বলছি যে কী কারণে আজ আমি গ্রামে ব্রাত্য।”
রামানুজ এসব ক্ষেত্রে খুব একটা কথা বলে না। সে জানে যা-ই সে জানতে পারবে তা-ই নতুন তথ্য।
সে মাথা নেড়ে নিজের কাহিনি বলতে বলে কাঞ্চনকে। কাঞ্চন শুরু করে, “আমাদের গ্রামে একটি আবাসন আছে। আমরা সকলে সেখানেই আমাদের শিক্ষা দীক্ষা সম্পূর্ণ করি। ছাত্র ছাত্রী সকলেই একই আবাসনের অন্তর্ভুক্ত। ছাত্রীদের বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কর্মের জন্য আলাদা একটা ভাগ রয়েছে, যদিও অন্যান্য শিক্ষাদান ছাত্রছাত্রী উভয়ের একত্রেই। আমরা কখনো বাইরের কোনো বিদ্যালয়ে বা কলেজে যাই না। আমাদের সমস্ত কিছুই এই আবাসনে। এই আবাসনের শিক্ষা ব্যবস্থা কোনো কোনো জায়গায় বাইরের পৃথিবীর সমস্ত শিক্ষাব্যবস্থার থেকেও উন্নত। আর তাছাড়া আমরা কোনো ডিগ্রি লাভের জন্য শিক্ষালাভ করতে চাইনি। তাই আমাদের এখানেই সমস্ত কিছুর ব্যবস্থা রয়েছে আমাদের রীতিনীতি মেনে। এবার এই আবাসনের একটা বড় ভূমিকা আছে যা আমাদের জঙ্গল রক্ষার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। আমাদের গ্রামে প্রতি বারো বছর অন্তর একটি ক্রিয়া সংঘটিত হয়। এই গ্রাম যতদিন ধরে এখানে আছে, গ্রামের মানুষ যতদিন
ধরে এখানে বাস করে এই ক্রিয়ার বয়সও ঠিক ততই। অনাদি-অনন্তকাল থেকে চলে আসছে এই রীতি। এই রীতি অনুসারে বারোজন যুবকের প্রয়োজন। এই যুবকেরা পড়াশোনা, চিন্তাশক্তি ইত্যাদিতে তো শ্রেষ্ঠ হবেই, এর বাইরেও এরা শারীরিকভাবে হবে সুঠাম দেহের অধিকারী। অস্ত্রবিদ্যা থাকবে এদের নখদর্পণে। এই বারোজনকে সমস্ত শিক্ষা-দীক্ষা দেওয়া হয় এই আবাসনের ভিতরে। ছোটবেলা থেকেই বাচ্চাদের এই আবাসনে পাঠানো হয়। বারো-পনেরো বছরের নিরলস সাধনার পর সমগ্র গ্রামের সমস্ত বাচ্চাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বারোজনকে আবাসনের গুরুদেব চয়ন করেন এই ক্রিয়ার জন্য।”
রামানুজ কাঞ্চনকে থামাল, জিজ্ঞেস করল, “ক্রিয়াটা ঠিক কী?”
কাঞ্চন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, “আগেই তোমাকে বলেছি দাদা, সব প্রশ্নের উত্তর আমি দেবো না। হ্যাঁ, তবে এই প্রশ্নের উত্তরে বলতে পারি এই বারোজনকে জঙ্গলে পাঠানো হয়। তারাই জঙ্গলকে তথা মানবসভ্যতাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে।”
রামানুজ এই উত্তরে বিরক্ত হয় বটে, কিন্তু আর কোনো কথা বলে না।
কাঞ্চন বলতে থাকে, “আমাকেও আমার বাবা এই আবাসনে পাঠিয়েছিল। তাঁর স্বপ্ন ছিল আমিও একদিন এই গ্রামের সেরা বারোতে পরিণত হবো। বাবা নিজে সবসময়ই হেমন্তাইদের সঙ্গ করতেন। হেমন্তাই হবের স্বপ্ন তার দীর্ঘকালীন। এই গ্রামে তার প্রভাব যে কম নয় তা তো তুমি দেখেছোই। হেমন্তাই হবার পর এই প্রভাব আরও বেড়েছে সঙ্গত কারণে। কিন্তু আগেও কম ছিল না। যা-ই হোক, এই কারণেই বাবা চেয়েছিলেন আমিও তার দেখানো পথে হাঁটি। আর এখানেই গোলমাল হল। আমি কখনোই নিজে ওই বারোজনের একজন হতে চাইনি। আমি জানি ওই বারোজন সর্ব বিষয়ে পণ্ডিতমণ্য হলেও ওদের নিজস্ব কোনো জীবন নেই। গ্রামের জন্য জীবন উৎসর্গ করাই ওদের জীবনের উদ্দেশ্য। আমার সেই উদ্দেশ্য ছিল না। আমি সুস্থ স্বাভাবিক সাধারণ মানুষের মতো বাঁচতে চেয়েছিলাম।
গ্রামের বা মানবসভ্যতার কল্যাণের জন্য নিজেকে শহীদ করার মতো বড় মানসিকতা আমার ছিল না। তাই অল্পকালের মধ্যেই আবাসনের গুরুদেব এবং আমার বাবা বুঝে গেলেন আমার দ্বারা এসব হবে না। প্রতিবছর বাছাই চলতে থাকে। আমি প্রথম বছরেই প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে গেলাম। ছিটকে গেলাম বটে, কিন্তু আবাসনে সাধারণ শিক্ষা আমার চলতে লাগল। সেই আবাসনে দুর্গা বলে একটি মেয়ে পড়তো। আমারই সমবয়সী। গ্রামে আমাদের ঘর থেকে দুর্গাদের ঘরের দূরত্বও খুব বেশি ছিল না। তাই আমি দুর্গাকে আগে থেকেই চিনতাম। আবাসনে আমাদের বন্ধুত্ব গাঢ় হল। আমরা ছোটবেলা থেকেই একসঙ্গে পড়াশোনা থেকে আরম্ভ করে সমস্ত খেলাধূলা একসঙ্গেই করতাম। ছোটবেলা এসব করলে কেউ কিছু করতো না। কিন্তু সমস্যা বাড়তে লাগল যখন আমরা বড় হতে শুরু করলাম। কিশোর বয়সে এসে মোটামুটি একটা জিনিস পরিষ্কার হয়ে গেল। প্রথমত আমি কোনোভাবেই সেরা বারোর আশেপাশেও নেই। এদিকে দুর্গা এই দৌড়ে রয়েছে।”
“দাঁড়াও দাঁড়াও, এক মিনিট। এই বারোজনের ব্যপারটা তো শুধু ছাত্রদের মধ্যে ছিল। এখানে দুর্গা এল কী করে?”
রামানুজ আবার কাঞ্চনকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করল। কাঞ্চন এবারে বেশ সপ্রতিভভাবে জানাল, “আমাকে সবটা বলতে দাও। সব বুঝে যাবে।”
রামানুজ মাথা নেড়ে ইশারায় তাকে কাহিনি চালু রাখতে বলে। কাঞ্চন বলতে থাকে, “ছাত্রদের ক্ষেত্রে বারোজনকে বাছাই করা হয় যে কাজের জন্যে সেই কাজের ক্ষেত্রে হেমন্তাইয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এবার হেমন্তাই ছাড়া কাজ হবে না, আবার একসময়ে দু-জন হেমন্তাইও হতে পারবে না। একজন হেমন্তাই প্রতি বারো বছর অন্তর যে ক্রিয়া হয় তা সমাপন করার পর পরবর্তী হেমন্তাইয়ের চয়ন হবে। যদি এর মাঝে কোনো হেমন্তাইয়ের কোনো কারণে মৃত্যু ঘটে, তবে সম্পূর্ণ ক্রিয়া সেখানেই শেষ। কারণ ততক্ষণে আর অন্য কোনো হেমন্তাই উপস্থিত নেই গ্রামে। একবার
ক্রিয়া সমাপ্ত হলেও নতুন হেমন্তাইকে সমস্ত কিছু শিখিয়ে দিতে পারবেন পরবর্তী হেমন্তাই। আর এখানেই আবাসনের শ্রেষ্ঠ ছাত্রীর ভূমিকা। প্রতিবার যিনি হেমন্তাই হবেন সেই হেমন্তাই নির্বাচনের সবচেয়ে কঠিন অংশটি পালন করে সেই ছাত্রী। আমাদের গ্রামে পুরুষ নারী সকলের সম্মান সমান। কোনো ভেদাভেদ নেই। এবার সমস্ত ক্রিয়ার কথা ভাবুন। আবাসন ছাড়া ছাত্রছাত্রীর শিক্ষা হবে না, বারোজন ছাত্র ছাড়া জঙ্গল রক্ষা হবে না, হেমন্তাই ছাড়া বারোজন ছাত্রের মধ্যে শক্তি সঞ্চালন হবে না আর শ্রেষ্ঠ ছাত্রী ছাড়া হেমন্তাই নির্বাচন হবে না। যেকোনো একটি অংশ কেটে দিলে সম্পূর্ণ ক্রিয়াটি সম্পন্নই হবে না। এবার বুঝলেন ব্যপারটা।”
কাঞ্চনের প্রশ্নে রামানুজ সপ্রশংস দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে, “যিনিই এই চক্রটি বানিয়েছিলেন তিনি অসম্ভব ক্ষুরধার মস্তিষ্কের মানুষ ছিলেন। সকলকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দিয়ে গেছিলেন।”
কাঞ্চন সহমত পোষণ করে বলল, “তা তো বটেই। এই চক্রের সাফল্যের উপরেই সমস্ত কিছু নির্ভর করে প্রতিবার। যাক, এবার আসি দুর্গার ব্যাপারে। এবার দুর্গা ছিল সেই শ্রেষ্ঠ ছাত্রীর দৌড়ে অন্যতমা। আর যারা এই দৌড়ে থাকত, তাদের আবাসন কর্তৃপক্ষ আলাদাভাবে রাখত। তাদের যত্ন আত্তি থেকে শিক্ষা সমস্তই হত আলাদাভাবে। বাইরের যে কেউ চাইলেই যে তাদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাত করতে পারবে সেরকম উপায় ছিল না। তাই আমরা যত বড় হলাম বিশেষত আমাদের কৈশোর যখন শুরু হল ততদিনে আবাসন আর আমার বাবা আমাদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করতে শুরু করে দিয়েছে। আর এখানে একটা মজার ব্যাপার ছিল, আমি যেরকম ঐ বারোজনের অংশ হতে মন থেকে চাইনি। দুর্গা কিন্তু ওই শ্রেষ্ঠ ছাত্রী হতে চেয়েছিল যে কিনা হেমন্তাই নির্বাচনের মতো কার্য সমাধা করতে চাইত। আর এইজন্যই সে প্রচুর পড়াশোনা করত, শারীরিকভাবে প্রচুর পরিশ্রম করত। বিভিন্ন রকম জটিল শারীরবিদ্যা সে করায়ত্ত করতে শুরু করে। তাই একটা সময়ের পর আমি অনেক কষ্টে সুযোগ বের করলেও
দুর্গা ধীরে ধীরে আমার থেকে দূরত্ব তৈরি করতে শুরু করল। এই সহজ সত্যটা আমি অনেক দেরিতে বুঝতে পারলাম। আমি ভাবতাম আবাসন আর আমার বাবার কড়া পাহারার জন্য সে দেখা করতে চাইছে না। গত বছর আমার ভুল ভেঙে গেল আর খুব বাজেভাবেই ভাঙল।”
এইটুকু বলে কাঞ্চন থামল। রামানুজের হাতে কফি ফুরিয়েছে অনেক্ষণ। সে অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল, “থামলে কেন? কী ঘটেছিল গত বছর?”
কাঞ্চন ম্লান মুখে বলল, “ক্ষতগুলোর কথা ভাবলে ক্ষতগুলো আবার তাজা হয়ে যায়।”
এসব কথার কোনো উত্তর হয় না। চুপ করে বসে থাকে রামানুজ।
কাঞ্চন আরও কিছুক্ষণ পর বলে, “আমাদের গ্রামে একটা ছোট খেলার মাঠ আছে। আবাসনের সেরা ছাত্রছাত্রীদের মাসে একদিন আবাসনে বাইরে ঘোরার অনুমতি দেওয়া হয়। আমি সেবার তক্কে তক্কে ছিলাম। সেরা ছাত্রীরা এই খেলার মাঠের পাশ দিয়ে হেঁটে ছোট ঝরনার দিকটায় চলে যায়। ওখানে ওরা সময় কাটায়। সেদিন যখন ছাত্রীরা মাঠ পেরিয়ে ঝরনার দিকে যাচ্ছিলো আমি পথের মাঝে রুখে দাঁড়ালাম। একেবারে দুর্গার সামনে গিয়ে বললাম, “চলো আমরা পালিয়ে যাই।”
দুর্গা স্বভাবতই চারদিকে তাকিয়ে বলল, “কী করছো এসব? রাস্তা ছাড়ো। সবাই দেখছে।”
আমি আশেপাশে তাকিয়ে দেখলাম সত্যি বাকি মেয়েরা দাঁড়িয়ে এদিকে তাকিয়ে আছে। বিব্রত বোধ করলাম তবুও সেদিন আমি নাছোড়বান্দা ছিলাম। মনে হচ্ছিল আর এমন সুযোগ পাবো না। সুর নরম করে বললাম, “ঠিক আছে। কিছুক্ষণ দাঁড়াও। কিছু কথা আছে তোমার সঙ্গে।”
দুর্গা কী ভাবল কে জানে, এগিয়ে গিয়ে তার বান্ধবীদের কী যেন বলল। ওরা আমার দিকে আড়চোখে তাকাতে তাকাতে ঝরনার দিকে হাঁটতে থাকল। আমি এসবকে খুব একটা পাত্তা না দিয়ে মাঠের এক অংশে গিয়ে দাঁড়ালাম। দুর্গাও আমার সঙ্গে এল। সেখানে আমরা খুব বেশি হলে পাঁচ
মিনিট কথা বলার সময় পেয়েছিলাম। সেই পাঁচ মিনিটেই দুর্গা আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে এই মুহূর্তে তার কাছে গ্রামের শ্রেষ্ঠা হওয়া ছাড়া আর কোনো স্বপ্ন নেই। আমি তখনও বিশ্বাস করিনি। বিভিন্নভাবে তাকে বোঝাবার চেষ্টা করেছিলাম যে আমরা একসঙ্গে সংসার করলে আমি তাকে কতটা ভালো রাখতে পারবো। আসলে আমি তখনও স্বপ্নের দুনিয়ায় ভাসছিলাম। স্বপ্নটা ভেঙে গেল যখন আগামী পাঁচ মিনিটের মধ্যে গ্রামের শত শত লোক এসে আমাদের ঘিরে ফেলল। আবাসনের গুরুদেব থেকে শুরু করে আমার বাবা কে আসেনি সেদিন। লজ্জায় আমি মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছিলাম যেন। বাবাই প্রথম জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কী হচ্ছে এখানে? কাঞ্চন তুমি দুর্গাকে নিয়ে এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন?’
আমি উত্তর দেবার আগেই দুর্গা ভয় পেয়ে গিয়েছিল। আসলে তার ভয় ছিল, এই কারণে না তাকে সেরা ছাত্রীর তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। সে আমার আগে উত্তর দিয়েছিল, ‘কাঞ্চন আমাকে জোর করে এখানে টেনে এনেছে।’
এই একটা কথাতেই আগুন ধরে গিয়েছিল জনতার মধ্যে। দুর্গার বান্ধবীরা এসে জানাল যে আমিই নাকি তাকে জোর করে এখানে টেনে এনেছি। পথ আগলে দাঁড়িয়ে তার অসম্মান করেছি। পবিত্র ক্রিয়ার জন্য চয়ন করা গ্রামের অন্যতম শ্রেষ্ঠাকে এভাবে অপমান করার জন্য গ্রামবাসী মারমুখী হয়ে উঠল। বাবা সে যাত্রায় আমাকে বাঁচিয়েছিলেন। সেদিনই গ্রামে আমার শেষ দিন ছিল। কয়েকদিন আগে আমার উপর দিয়ে যেটা গেল এটা আসলে এক বছর ধরে পুষে রাখা রাগের বহিঃপ্রকাশ। তুমি শুধু অনুঘটকের কাজ করেছিলে।”
এতটুকু বলে কাঞ্চন থামল। রামানুজ তার পিঠে স্নেহের পরশ রাখল। “আর দুর্গার কী হল?”
কাঞ্চন শুকনো হেসে বলল, “সেদিন বাস্তবের সম্মুখীন হবার পর থেকে আর দুর্গার সম্মুখীন হইনি। হয়তো এতদিনে সে শ্রেষ্ঠা হয়ে গেছে। জানি
না আমি। তবে হ্যাঁ, যে জেদ সে দেখিয়েছে তাতে তার পক্ষে শ্রেষ্ঠা হওয়া অসম্ভব কিছু নয়।”
“হুম। ভাই এসব জানতে চেয়ে খুব দুঃখ দিয়ে ফেলেছি তোমাকে।”
“না দাদা, মাঝে মাঝে রোমন্থন করা ভালো। তাতে মাথাটা, মনটা সঠিক কাজ করতে পারে।”
“তোমার বাবা আর যোগাযোগ করে না?”
“না সেভাবে যোগাযোগ প্রায় নেই। পুরো এক বছর পর সেদিনই প্রথম গ্রামে যাই। একসঙ্গে খেয়েছিলাম আমরা সেদিন। হেমন্তাইকে এতটা অশক্ত এর আগে দেখিনি।”
রামানুজ কাঞ্চনের শেষ কথাটায় তার দিকে ফিরে তাকাল। তারপর বলল, “আরেক কাপ কফি এনে দাও।”
কাঞ্চন চলে গেল। রামানুজ একটা সিগারেট জ্বালল। ধোঁয়া ছেড়ে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াল। বহু প্রশ্ন জমা হচ্ছে মনে। জঙ্গলে কেন যাচ্ছে ওই বারোজন যুবক। কী আছে জঙ্গলে যা থেকে বারবার মানবসভ্যতাকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে দাবি করছে গ্রামবাসীরা। এমনকি কাঞ্চনও তো তাই মনে করে। হেমন্তাই নির্বাচনের প্রক্রিয়াটাই বা কী? আবাসনে ভিতরে এত উন্নতমানের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, অথচ বহির্বিশ্বের কেউ কিছুই জানে না। নাহ, তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। আরও ডিটেইলে জানতে হবে এসব। কিন্তু কে তাকে বিশ্বাস করে এসব বলবে? গ্রামের কেউ তো তাকে বিশ্বাসই করে না। বিশেষ করে কাঞ্চনের বাবা, হেমন্তাই।
কিন্তু কথায় আছে সবচেয়ে জটিল প্রশ্নের সমাধানটাও হয় আচমকা। তেমনি এই সমস্ত প্রশ্নের সমাধানটা রামানুজ পেয়ে গিয়েছিল হঠাৎ করেই। একদম অপ্রত্যাশিতভাবে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর হাজির হয়েছিল একদিন পর, সঙ্গে জুটেছিল আরও অনেক প্রশ্ন।
