মৃত কৈটভ ১.৮
(৮)
রাত ক-টা বাজে সেদিকে আর খেয়াল নেই। গত বারো বছরের একটানা ধকল এবার শেষ হবার পথে।
শুধু বারো বছর বললে ভুল বলা হয়। জন্মাবধি শুধু এই লক্ষ্যেই কাজ করে গেছে সে। নিরলস পড়াশোনা, শারীরবিদ্যা, অস্ত্রশিক্ষা। আবাসনের ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ হবার দৌড়ে সবসময় এগিয়ে থাকার জেদ। স্বপ্ন পূরণের জন্য শুধু অধ্যবসায় থাকলে হয় না। প্রয়োজন জেদ আর আত্মবলিদানের। যখন তার বয়সীরা খেলাধূলায় মেতে উঠেছিল কিংবা প্রথম যৌবনে নারীর স্বাদ পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল, তখনও সে তার স্বপ্ন পূরণের পথ থেকে সরে আসেনি। ধীরে ধীরে সমস্ত ছাত্রদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা তার মাথাতেই উঠল। শুধু তাই নয়, ভাগ্যও তার সঙ্গে ছিল।
কে কোন বছর দেবতার সংস্পর্শে আসবে তা ঠিক করেন গুরুদেব।
গুরুদেব কোনো কারণে তাকে একদম শেষ বছরে দেবতার সংস্পর্শে আসার জন্য চয়ন করলেন।
ফলে আরও কিছু বছর জীবনের স্বাদ, গন্ধ নেওয়ার সুযোগটা পেয়েছিল সে।
আজ পরীক্ষাগারের বাইরে একটি চেয়ারে বসে সে সম্পূর্ণ জীবনটা নিয়ে ভাবছে। তার সামনে বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে বনভূমি। অল্প দূরে কারাগার থেকে ভেসে আসছে তার এগারো সঙ্গীর গোঙানির শব্দ। কিছু সময় আগে তাদের কাঁচা মুরগী দিয়ে এসেছিল। এতক্ষণে নিশ্চয়ই শেষ করে ফেলেছে তারা। আবার হয়ট ক্ষিদে পেয়েছে তাদের। আজ রাতের শেষ খাবারটা দিয়ে আসতে হবে।
মাঝে মাঝে তারও শরীরটা কীরকম যেন করছে। অনেক কষ্টে নিজেকে এখনও সামলে রাখা যাচ্ছে। তবে আর বেশিদিন নয়। সে বুঝতে পারছে যে সময় তো হয়ে এল।
গোঙানিটা বেড়েই চলেছে। চিন্তাসূত্র বারবার ছিন্ন করে দেয় এই রুক্ষ জান্তব গোঙানি। কত ছোটবেলায় মায়ের সঙ্গে পুকুরঘাটে যাবার কথা মনে পড়ছে তার। মনে পড়ছে বিকেলের দিকে সড়কের ওপাশের জঙ্গলে পাখি দেখতে যাবার কথা। ওদিকটায় নানারকম পাখি এসে বসত বিকেলে। ঝাঁকে ঝাঁকে রঙিন নাম না জানা পাখি। বাবা বেশিদিন বাঁচেনি। বাবা মারা যাবার পর পাখিরাও কোনো কারণে আসা বন্ধ করে দিল। বিকেলের একান্ত আপন অবকাশটুকুর প্রয়োজনও ফুরিয়ে গেল। আর কিছুদিন পর সাঁপের কামড়ে মা-টাও মরে গেল। গ্রামের লোক ঘরদোর জবরদখল করে নিল অল্প দিনের মধ্যেই। ততদিনে অবশ্য ঘরের প্রয়োজনও তার ফুরিয়েছে। আবাসনে পাকাপাকিভাবে জায়গা করে নিয়েছে সে।
মাঝে মাঝে যখন শরীরটা খিঁচুনি দিয়ে জানান দেয় যে হাতে আর বেশি সময় নেই, কেন জানি এখন শুধু মা আর বাবার মুখটার কথা মনে পড়ে তার।
মাঝে মাঝে ভাবে সবই তো হল, দেবতাকে প্রায় বারো বছর ধরে সামনে থেকে দেখা, বিগত এক বছর ধরে দেবতার সেবা করা, তাঁর নির্যাস সংগ্রহ করা, তাঁর সঙ্গে তাঁর মন্দিরে বসবাস করা সবই হল- শুধু আরেকবার যদি মা-বাবার সঙ্গে দেখা করা যেত! যদি বাবার হাত ধরে পাখি দেখতে যাওয়া যেত। পাখিরা কি আর আসে ওদিকের জঙ্গলটায়!
একটা জন্তু ভীষণভাবে গুঙিয়ে উঠে। নাহ, আর বসে থাকা যায় না। চেয়ার ছেড়ে উঠে বসে সে।
কারাগারের দিকে এগিয়ে যায় সে। নিশুতি রাতে কনকনে ঠান্ডা হাওয়া বইছে। এই অংশটায় ভাঙা চাঁদের আলো আজ অল্প পৌঁছাচ্ছে। কুয়াশায় ঢেকে আছে আকাশ। তবুও আলোর কোনোনকমতি নেই এখানে। গন্দবেরুন্দার দেহ নিঃসৃত পদার্থের আলোক ছটায় চারদিক উজ্জ্বল। কয়েক হাজার পাওয়ারের বালব জ্বালানো হয়েছে যেন। এই পদার্থের হাজার হাজার গুণ। শুধু একটাই দোষ। মানুষকে মানুষ থেকে সত্যিকারের শয়তানে পরিণত করে।
কারাগারের সামনে একটা বালতিতে ডাঁই করে রাখা আছে কাঁচা মুরগীর মাংস। বালতিটা তুলে এগিয়ে গেল সে। পরপর এগারোটা কারাগার।
দু-ফুট পুরু দেওয়াল দিয়ে দিয়ে একটা কারাগারকে অপরটা থেকে আলাদা করা হয়েছে। এই জানোয়ারের গায়ে অনেক জোর। পাঁচ ইঞ্চির দেওয়ালকে গায়ের জোরেরি ধসিয়ে দিতে পারে এরা। লোহার শিখগুলো একেকটা অসম্ভব রকমের মোটা। নিদেনপক্ষে পঞ্চাশ এম এম ব্যসের তো হবেই। তার পিছনের একেকটা জানোয়ারের বাসা। খাবারের গন্ধ পেয়ে দাঁড়িয়ে গেছে সকলে। গোঙানি হয়েছে তীব্র। প্রথম প্রথম তার একটু ভয় ভয় করত। কিন্তু এত বছরের সেই ভয় মরে গেছে। সে জানে আর কয়েকদিনে সেও পরিণত হবে এরকম জানোয়ারে, যার বোধ বিবেচনা, বুদ্ধি, মানবিকতা কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। শুধুমাত্র বন্য জিঘাংসা কাজ করবে মাথায়।
বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি ছিদ্রের মাধ্যমে প্রত্যেকটা কারাগারের ভিতর দু-টো করে আস্ত মুরগী ফেলতে থাকে সে।
সকলকে দেওয়া হয়ে গেলে বাইরে এসে দাঁড়ায়। বাইরে থেকে সবগুলো কারাগারের ভিতরে দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।
মানুষের মতো দেখতে একেকটা হিংস্র প্রাণী কাঁচা মুরগীগুলোকে খুবলে খাচ্ছে। কেউ বা খাচ্ছে সরাসরি চিবিয়ে। হাত গড়িয়ে রক্ত পড়ছে। কালো কালো দাঁটের মাড়িগুলো রক্তে ভরে উঠছে। কাঁচা মাংস চিবোচ্ছে তারা। চোখ বলে আলাদা করে কিছু নেই। সমস্তটাই ডিমের সাদা অংশের মতো হয়ে গেছে। শরীরের একটা হাড়ও আর আস্ত নেই। তবুও কারাগার খুলে দিলে এরা এগিয়ে হেলতে দুলতে এগিয়ে আসবে। যাকে পাবে তাকেই ছিড়ে খাবে এরা। এদের শুধু মাংস চাই। খাদ্য চাই এদের। অসীম ক্ষুধা ছাড়া আর কোনো অনুভূতি এদের শরীরে অবশিষ্ট নেই।
সে দেখতে দেখতে ভাবতে থাকে যে আর কিছুদিনের মধ্যে সেও পরিণত হবে এরকম বোধবুদ্ধিহীন ক্লীবে। ক্ষুধা ছাড়া আর কোনো অনুভূতি কাজ করবে না। সারা জীবনের পরীক্ষা নিরীক্ষা, গবেষণা, শারীরবিদ্যা, অস্তিশিক্ষা সমস্ত কিছুর পরিসমাপ্তি এরকম নিষ্ঠুর হবে ভেবে একবার কেঁপে উঠল সে।
তারপর মনে পড়ল তার তো এসব একদিনের বেশি সহ্য করতেও হবে না। শেষ মুহূর্তে যখন শরীর জবাব দিয়ে দেবে, সমস্ত সত্তায় চেপে বসবে এক অজ্ঞাত দানব তখন প্রথমেই সকলকে খুলে দিতে হবে কারাগার থেকে। ধীরে ধীরে ততক্ষণে সেও জানোয়ার হয়ে মিশে যাবে এই ভিড়ে। গ্রামে তখন চলছে যজ্ঞ। ক্রিয়ার প্রভাবে সেই অভিমুখেই হাঁটবে ওরা সবাই। আর সেখানে পৌঁছানো মাত্র একটাতীরের ফলা এসে বিধবে মাথায় কিংবা তলোয়ারের ধারালো কোপ এসে বসবে গলায়। ব্যস, খেলা শেষ।
হঠাৎ করেই তার মনে হতে লাগল এই পরিণতির জন্যই কি তিল তিল করে গড়ে তুলেছিল নিজেকে!
নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের পর, গ্রামের জন্য-মানবসভ্যতার জন্য সমস্ত বলিদানের পর শুধুমাত্র একটা তীরের ফলা প্রাপ্তি হবে তার!
নিজেকে প্রশ্ন করল সে- “একদিন এটাই তো তোর স্বপ্ন ছিল।”
নিজের ভিতর থেকেই উত্তর এল, “না না, এটা স্বপ্ন ছিল না। স্বপ্ন ছিল শ্রমিক শ্রেষ্ঠ হবার। গ্রামের জন্য, মানবসভ্যতার জন্য কাজ করার। যদি মরেই গেলাম, উহু ভুল “যদি হত্যাই করা হল আমাকে, তবে আমি কীসের শ্রেষ্ঠ!
দেবতা গন্দবেরুন্দা নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতেই এই অবতার নিয়েছিলেন। তবে আমি কেন আমার শ্রেষ্ঠত্ব বিসর্জন দিয়ে মৃত্যু বরণ করবো।
গ্রামের জন্য এত কিছু করার পর যদি ওরা আমাকে একটা তীরের ফলাই উপহার দেয়, তবে আজ থেকে সেই কাজ, সেই মনোভাব পরিবর্তন করলাম।”
কথাগুলো নিজের মনে ভাবতে ভাবতে হাতে ধরে রাখা লোহার বালতিটাকে মুচড়ে ফেলে সে। তার শরীরে কিছু পরিবর্তন হচ্ছে। সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। দুই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। ধাতব বালতি হাত থেকে খসে পড়ে শুনশান জঙ্গলে। অদ্ভুত ধাতব শব্দে কেঁপে উঠে জঙ্গল। মাটিতে বসে সে মাটি খামচে ধরেছে। তার শরীরে রক্তসঞ্চালন বেড়ে যাচ্ছে। পেশি ফুলে উঠছে। সে বুঝতে পারছে তার দেহ আর তার বশে
থাকতে চাইছে না। সে একবার উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না, শরীরের হাড়গুলো যেন ভিতরে নড়াচড়া শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু আজ যদি তার দেহে সম্পূর্ণ পরিবর্তন ঘটে যায়, তাহলে অনর্থ হয়ে যাবে। হাতে তো আরও কয়েকটা দিন বাকি ছিল।
সে নিজেকে যথাসম্ভব নিজের আয়ত্তে রাখার চেষ্টা করে। মাটিতে ঝিম ধরে বসে থাকার ব্যর্থ চেষ্টা চালায়।
তার মাথা ঘুরছে, জিভ শুকিয়ে এসেছে, চোখে ঝাপসা দেখছে সে। মণির পরিবর্তন হয়েছে কি হয়নি বোঝা যাচ্ছে না।
অবিরত সে আঙুল দিয়ে মাটি খুড়ে চলেছে সে। প্রথমাবস্থায় প্রায় তড়িদগতিতে নখরের বৃদ্ধি ঘটে। সেটা আটকায়াতেই সে মাটি খুড়ে চলেছে প্রাণপণে। মাটির সঙ্গে ঘষায় নখ বাড়লেও সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয় প্রাপ্ত হচ্ছে।
দাঁতের মাড়িতে অদ্ভুত একটা কিড়মিড় শুরু হয়েছে। গলার শিরা ফুলে ঢোল।
সে এবার প্রাণপণে চিৎকার করে উঠল, যেন নিজের সত্ত্বার সর্বশেষ সঞ্চিত শক্তিটাও খরচ করে ফেলল সে। তারপর ঝিমিয়ে পড়ল মাটিতে। বড় বড় শ্বাস ফেলতে লাগল সে। তার চিৎকার শুনে কারাগারের জানোয়ারগুলো অব্দি খাওয়া বন্ধ করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। গোঙানি বন্ধ করেছে তারা।
আর তখনই দেখা গেল প্রাণীটাকে। কারাগারে বন্দিরাই প্রথমে ঘ্রাণ পেল সেই প্রাণীর। ওরা ঘ্রাণের মাধ্যমে প্রাণীটার দিক নির্দেশনের চেষ্টা করল। কারাগারের চারদিকে শুঁকতে লাগল ওরা। তারপর সকলেই বুঝতে পারলো বিপদ আসছে ডানদিক ধরে।
যেখানে মাটিতে ঝিমিয়ে পড়ে আছে এক উপজাতি যুবক, তার থেকে দশ হাত দূরে জঙ্গলের উত্তর পশ্চিম কোন থেকে ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে প্রাণীটা।
এবার যুবকের কানেও শব্দটা এল। প্রাণীটা মুখে অদ্ভুত গর গর শব্দ করছে।
সে মাথা তোলার চেষ্টা করে কিন্তু মাথাটাকে খুব ভারী মনে হচ্ছে তার। সে কোনো মতে মাথাটা তুলে। তারপরেই আবার মাথাটা নেমে আসে নীচে। সে মাথা তুলে ধরে রাখতে পারে না।
মুহূর্তের মধ্যে তার মাথা নীচে নেমে এসেছে ঠিকই। কিন্তু এরই মধ্যে সে যা দেখার দেখে নিয়েছে।
তার দিকে খুব ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে একটা হিংস্র শৃগাল। দাঁতগুলো বের করে রেখেছে সে।
ঠান্ডায় শেয়ালের মুখ দিয়ে ধোঁয়া বেরুচ্ছে। গরর গরর শব্দ করতে করতে এগিয়ে আসছে প্রাণীটা।
আজকে রাতের জন্য নিশ্চিত শিকার পাওয়া গেছে। আর যেহেতু শেয়াল তাই সে কখনো একা আসবে না।
আপাতত সে এদিকে একা আছে। কিন্তু অচিরেই যে একটা আস্ত শেয়ালের দল এখানে চলে আসবে তা বলাই বাহুল্য।
এই একটা শিকারে আজকে দলের অর্ধেকের পেট আশাকরি ভরে যাবে। আপাতত একটাই এগিয়ে আসছে তার দিকে।
মাটিতে ঝিমিয়ে বসে রইল সে। উঠার শক্তিটুকু নেই, সেখানে পালাবার প্রশ্ন আসে না।
এভাবে শেয়ালের খাদ্যে পরিণত হতে সে আগ্রহী নয়। মাথা ধীরে ধীরে কাজ করা শুরু করে দিয়েছে তার।
পূর্বের দুর্বলতা ধীরে ধীরে কাটছে ঠিকই, কিন্তু সম্পূর্ণ সুস্থ বোধ ফিরে আসেনি।
হাতের কাছে কোনো অস্ত্র নেই যা দিয়ে প্রাণীটাকে ভয় দেখানো যায়। সে বসে বসেই ভাবতে লাগল।
মোক্ষম সময়ে বুদ্ধির চেয়ে বড় অস্ত্র আর কিছু নেই। শেয়ালটা আর পাঁচ কদম দূরে আছে। এক্ষুনি ঝাঁপিয়ে পড়বে।
পিছনে একটা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। আরও কিছু গরর গরর শব্দধ্বনি ভেসে আসছে এখন।
হয়ত অন্য শেয়ালেরা ইতিমধ্যে এসে পৌঁছে গেছে এখানে। আর দুয়েকটা সেকেন্ডের মধ্যেই যুবকের টুটি চেপে ধরবে শেয়ালটা।
ঠিক তখনই মাথা তুলে তাকাল যুবক। সে এক মায়াময় দৃষ্টি স্থাপন করল শেয়ালটার উপর।
এভাবে শিকার মাথা তুলে তাকানোতে শেয়ালটা ঝাঁপানোর আগে দাঁড়িয়ে পড়ল। অদ্ভুতভাবে দুই অসম বান্ধব প্রাণী একে অপরকে দেখছে।
তারপর যা হল তা একেবারেই অনভিপ্রেত ছিল। দু-হাত বাড়িয়ে সে শেয়ালটাকে কাছে ডাকল।
মুখ দিয়ে চুক চুক করে শব্দ করতে লাগল সে, যেন কত বছরের পোষ্য এই প্রাণী।
অদ্ভুত এক সম্মোহনী দৃষ্টি নিয়ে সে তাকিয়ে ছিল প্রাণীটার দিকে। প্রাণীটার চোখের মণির রঙটা ঈষৎ পালটে গেল কি! অন্ধকারে স্পষ্ট বোঝা গেল না। তবে যেটা হল সেটা ছিল আরও অদ্ভুত ও অনাকাঙ্ক্ষিত।
শেয়ালটার মুখের হিংস্র ভাব কমে গেল, সে মুখ দিয়ে চাপা গর্জন করা বন্ধ করল।
তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল যুবকের দিকে। এ এক অদ্ভুত দৃশ্য! যুবক কাছে ডেকে মাথায় হাত দিল শেয়ালটার।
পরম আদরে কাছে টেনে বসাল প্রাণীটিকে। প্রাণীটাও জিভ বের করে আনুগত্য প্রকাশ করল।
দূর থেকে অন্য শেয়ালগুলো ধীরে ধীরে এক অজানা সুরে শব্দ করতে শুরু করল। খুব চঞ্চল হয়ে উঠেছে শেয়ালের দল।
কিন্তু সামনের দৃশ্যে সমস্ত কিছু শান্ত। এক মানব সন্তান এক জন্তুকে পোষ মানাচ্ছে।
নীরবতা ভঙ্গ করে যুবক বলল, “কেন এলি এদিকে? এখানে তো বন্য প্রাণীদের আসা যাওয়া বারণ। খামোখা এলি। যা চলে যা।”
মাথায় বিলি কেটে কথাগুলো বলল যুবক। শেয়ালটাও নির্বিবাদে সেই স্নেহমাখা সম্ভাষণের পরিবর্তে লেজ নেড়ে আনুগত্য প্রকাশ করল।
“আমি এবার উঠব। অনেক কাজ বাকি। আমার হাতে আর বেশি সময় নেই রে। যাহ যাহ, চলে যা।”
যুবক উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করে। শরীরের দুর্বলতা তার প্রায় কেটে গেছে। কিন্তু উঠতে গিয়ে বাঁধা পায় সে।
শেয়ালটা তার গায়ের কাছে এসে ঘেঁষে বসেছে। নতুন মনিবকে ছেড়ে থাকার ইচ্ছে নেই তার।
ওদিকে শেয়ালের দল কোনো কারণে কান্না জুড়েছে। জঙ্গলের উপরে এক ফালি চাঁদ প্রমাদ কুয়াশার পাতলা চাদরে নিজের লজ্জা নিবারণে ব্যস্ত।
“কী হল, উঠতে দিবি না আমাকে!”
শেয়াল এবার এর উত্তরে একবার শুধু তীক্ষ্ণ দাঁতের রেখা দেখিয়ে অল্প গর্জন করার চেষ্টা করল।
হ্যাঁ চেষ্টাই করল, তার কারণ পরমুখাপেক্ষী সেই যুবক শেয়ালের দুটো চোয়াল হাতের মধ্যে ধরে চিড়ে ফেলল শেয়ালটাকে।
চোখের পলক পড়ার আগেই ঘটে গেল এই ঘটনা। যুবক মুহূর্তের ভগ্নাংশে শেয়ালের দুটো চোয়াল ধরে উঠে দাঁড়াল আর চিরে ফেলল তাকে।
দু-ভাগ হয়ে গেল প্রাণীটা। যুবকের সাদা কাপড় রক্তে লাল হয়ে গেল।
বর্তমানে তার এক চোখে মণি বর্তমান, অপর চোখ সম্পূর্ণ সাদা। গর্জন করছে সেই যুবক।
সেই গর্জনে শেয়ালের দল ভয় পেয়ে পিছিয়ে পড়ছে। সঙ্গীর এই পরিণতি তাদের মনেও ভয়ের সৃষ্টি করেছে।
গায়ে ছিটকে পড়া শেয়ালের কাঁচা রক্ত জিভ দিয়ে চেটে খেল সে।
শেয়ালের দল আর এক মুহূর্ত দেরি না করে সেই স্থান সদলবলে ত্যাগ করল। জঙ্গলে শুধু ঝিঁঝিঁর ডাক শোনা যাচ্ছে।
কারাগারের বন্দিরাও হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল।
কিছু মুহূর্তের ব্যাপার। তারপরেই যুবক মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গেল মাটিতে। জ্ঞান হারিয়েছে সে।
