মৃত কৈটভ ১.৯
(৯)
উদয়পুর থেকে ফেরার পরেরদিনটা কাটল সাধারণভাবেই। সরকারের কিছু অনুমতি নেওয়ার জন্য ছুটোছুটি করতে হল সবাইকে। আগামীকাল জঙ্গল সার্চ হবে।
কাজেই সুষ্ঠুভাবে এই কাজ সমাধা করতে চাই ফোর্স। দু-লরি বাহিনী আসবে। জঙ্গল অন্বেষণে এরা সিদ্ধহস্ত। সকলের কাছেই থাকবে আর্মস।
গ্রামবাসী এদের দেখলে বাপ বাপ করে জায়গা ছেড়ে দেবে। আপাতত প্ল্যান এটাই। তবে এক্ষেত্রে বেশ কিছু দপ্তরের অনুমতি লাগে।
সিনহা আর রামানুজ সকাল থেকে সেসবের পিছনেই ছুটছে।
দাসবাবু একবার কিছু রক্ষী নিয়ে গ্রামে এসেছিলেন। আগামীকাল যে সরকারিভাবে সার্চিং হবে এ বিষয়ে গ্রামবাসীকে আরেকবার জানাতে আসাই উদ্দেশ্য যাতে কোনো সমস্যার সৃষ্টি না হয়।
দাসবাবু আজ এসে অবাক হলেন। হেমন্তাইসহ কোনো গ্রামবাসী আজ কোনো প্রতিরোধ বা সেরকম উত্তেজিত কোনো কথাবার্তাই বলল না।
হেমন্তাই জিজ্ঞেস করলেন, “ক-টা নাগাদ আসবেন?”
“ফার্স্ট হাফের শুরুতেই এসে পড়ব আমরা।”
“বেশ বেশ। আসুন। গ্রামবাসী সকলের উদ্দেশ্যে বলছি, আগামীকাল সরকারিবাহিনী এলে সকলে সরকারকে সাহায্য করবেন।”
গ্রামবাসীরাও বেশ বাধ্য ছেলের মতো মাথা নেড়ে তাতে সম্মতি দিল। দাসবাবুর এসব ভালো লাগছিল না। তিনি বেশ অবাক হলেন।
একদিনে এ কেমন পরিবর্তন!
তিনি রক্ষীদের নিয়ে ফিরে আসার উপক্রম করলেন। আর তখনই তার চোখ গেল জঙ্গলের দিকে।
বড় বড় গাছগুলোতে কিছু গ্রামবাসী উঠে বসে কী যেন করছে। দাসবাবু কৌতূহলবশত এগিয়ে গেলেন। তার পিছন পিছন কিছু গ্রামবাসীও সেদিকে গেল। দাসবাবু দেখলেন প্রায় প্রত্যেকটা গাছের গায়ে ওরা কিছু একটা পদার্থ ঘষছে।
একজন এক গাছ থেকে কাজ সেরে নেমে অন্য গাছে উঠে কোমরে ঝোলানো কৌটো থেকে একটা তরল পদার্থ বের করে সেই গাছের গায়ে মাখাচ্ছে।
কালো রঙের পদার্থটা দূর থেকেও চকচক করছে।
দাসবাবু একজন গ্রামবাসীকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, “ওরা কী করছে?”
লোকটা হেসে বলল, “কিছু না। আমরা চাইছি কাল বৃষ্টি হোক।”
দাসবাবুর ভ্রু কুঁচকে গেল। বললেন, “কাল বৃষ্টি চাওয়ার সঙ্গে গাছের মাথায় উঠে এসব করার অর্থ কী?”
হেমন্তাই এগিয়ে এলেন। হেসে বললেন, “ও কিছু না। কাল বলব। আজ আসুন।”
রহস্যটা বোঝা গেল না। দাসবাবু আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে গ্রাম ছেড়ে বেরিয়ে এলেন। সন্ধেবেলায় রামানুজ শহর থেকে ফিরলে দাসবাবু ব্যাপারটা তাকে বললেন।
রামানুজ বলল, “ভগবান জানে এই গ্রামে কখন কী হয়!”
সিনহা বললেন, “এবার কি ওরা প্রাকৃতিকভাবে বৃষ্টিপাতও ঘটাবে! গ্রাম নাকি নাসা!”
রামানুজ বলল অন্য কথা, “উহু প্রশ্ন সেটা নয়, প্রশ্ন হল কেন ওরা বৃষ্টি চাইছে! নিশ্চয়ই এই উত্তরের মধ্যে লুকিয়ে আছে আমাদের সমাধান, যা এই মুহূর্তে আমরা বের করতে পারব না। চলুন কাল গিয়ে দেখা যাবে।”
পরেরদিন বেলা দশটার মধ্যে রামানুজ, দাসবাবু, সিনহা সকলেই পৌঁছে গেলেন গ্রামে। পিছনে বাহিনী দাঁড়িয়ে আছে। রামানুজের হাতে মাইক।
চারদিকে গ্রামবাসী নিজের নিজের উঠানে দাঁড়িয়ে আছেন। কেউ কেউ মন্দিরের সামনে এসে জমায়েত করেছেন। কিন্তু কেউই মারমুখী নয়।
সকলেই চুপচাপ বসে বা দাঁড়িয়ে আছে।
রামানুজ মাইকে ঘোষণা দিল, “এবার আমরা জঙ্গলে প্রবেশ করব। আমরা জানি এই জঙ্গল আপনাদের কাছে এক সংবেদনশীল বিষয়। কিন্তু যেহেতু এই গ্রাম সরকারের তাই সরকার যখন ইচ্ছে এই গ্রামে প্রবেশ করতে লোক পাঠাতে পারে। আমাদের সঙ্গে আপনাদের ব্যক্তিগত কোনো শত্রুতা নেই। আমরা শুধু সরকারি আদেশনামা পালন করছি। আপনারা আমাদের এই কাজে সাহায্য করুন। আগামীদিনে সরকারও আপনাদের বিভিন্নভাবে সাহায্য করবে।”
রামানুজ একটানা বলে থামল। ইচ্ছে করেই সে এক দুটো শব্দ এরকম বলেছে যাতে গ্রামবাসী উত্তেজিত হতে পারে।
কিন্তু সে দেখল প্রায় সবাই নীরব হয়ে বসে আছে। নিজেদের মধ্যে কথা বলছে তারা কিন্তু রামানুজকে কোনো হুমকি দিচ্ছে না।
রামানুজ বুঝল যে কিছু একটা ঘটতে চলেছে। সে সিনহা সাহেবের কাছে গেল। তিনি ফোর্সের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
“আমি প্রায় নিশ্চিত যে ওরা কিছু একটা ভেবে রেখেছে আমাদের জন্য। সেটা জঙ্গলে ঢোকার আগে আমরা ধরতে পারব না। বাহিনীকে বলুন খুব সতর্ক হয়ে জঙ্গলে প্রবেশ করার জন্য। যেকোনো দিক দিয়ে হামলা হতেই পারে। আমরা কাউকে হারাতে পারব না।”
সিনহা পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পারলেন। তিনি বাহিনীর সকলকে বুঝিয়ে দিলেন পরিস্থিতি।
হেমন্তাই ততক্ষণে এগিয়ে এসেছেন রামানুজের দিকে। বললেন, “গ্রামবাসী কেউ আপনাদের আটকাবে না। আপনি নির্দ্বিধায় ভিতরে জঙ্গলের প্রবেশ করুন।”
রামানুজ তাকে বলল, “কী জাল বিছিয়ে রেখেছেন তাই ভাবছি। আজ যে আমরা ভিতরে পৌঁছাতে পারব না তা আমি এতক্ষণে বুঝে গেছি। শুধু সরকারি আদেশনামার সম্মান রক্ষার্থে এগোতে হবে।”
হেমন্তাই হেসে বললেন, “আপনি আপনার কর্তব্য করছেন আর আমি আমার। তফাত নেই। এগিয়ে যান।”
রামানুজ আর কথা বাড়াল না। সে বাহিনীকে আদেশ দিল এগিয়ে যেতে। নিজেও এগিয়ে গেল। বাহিনীর সকলের হাতে অটোমেটিক বন্দুক ছিল। সিনহা নিলেন রাইফেল।
দাসবাবু আর রামানুজের হাতে চকচক করে উঠল পিস্তল। জঙ্গলের ভিতরে প্রবেশ করলেন তারা।
হেমন্তাইয়ের কাছে এসে একজন জিজ্ঞেস করলেন, “বৃষ্টি হবে তো!” হেমন্তাই আবাসনের গুরুদেবের দিকে তাকালেন। তিনিও এসেছিলেন আজ।
একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছেন। গুরুদেব ঘড়ি দেখলেন। তারপর মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন। হেমন্তাইয়ের বুকে এখন ঢাক বাজছে।
যদি আজ বৃষ্টি না হয় তাহলে অনর্থ হয়ে যাবে।
বাহিনী ভিতরে দ্রুত প্রবেশ করতে লাগল। অদ্ভুত ছন্দে জঙ্গলের গাছপালাকে এড়িয়ে ওরা এগোতে লাগল।
তাদের সঙ্গে রামানুজ আর সিনহা সাহেব পাল্লা দিয়ে এগোতে লাগলেন। তুলনায় দাসবাবু পড়লেন পিছিয়ে।
তিনি একসময় বন্দুকে তাগ ছেড়ে দিয়ে শুধু দৌড়াতে লাগলেন যাতে একেবারে দলছুট না হয়ে পড়েন।
আজ একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল। গ্রামবাসীদের কেউ রামানুজদের পিছন পিছন জঙ্গলে প্রবেশ করল না। রামানুজ এক আধবার পিছন ফিরে তাকাল।
কেউ তাদের পিছনে আসছে না দেখে সে নিশ্চিত হল যে সত্যিই তাদের জন্য জাল পাতা হয়েছে।
এবার শুধু বোঝার অপেক্ষা যে কী অপেক্ষা করছে অদৃষ্টে।
হেমন্তাইসহ সকল গ্রামবাসী তাকিয়ে আছেন উপরে। হেমন্তাই আবার তাকালেন গুরুদেবের দিকে।
গুরুদেব এবার ইশারা দিলেন, হেমন্তাই সেই ইশারা দেখে আবার উপরে তাকানোর আগেই বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা এসে পড়ল তার গায়ে।
মুখে খুশির ঝলক দেখা দিল তার। এবার জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। কাউকেই আর দেখা যাচ্ছে না সেখানে।
এতক্ষণে নিশ্চয়ই অনেকটা এগিয়ে গেছে ওরা।
রামানুজেরা এগোচ্ছিল ভালো গতিতে। হঠাৎ রামানুজের গায়েও বৃষ্টির ফোঁটা পড়ল। রামানুজ অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার দেখাদেখি সিনহাও দাঁড়িয়ে পড়লেন এবং বাহিনীকে দাঁড়াবার নির্দেশ দিলেন। আজ ঠান্ডা থাকলেও বৃষ্টির কোনো সম্ভাবনা ছিল না।
অন্তত আবহাওয়া দপ্তরের রিপোর্ট দেখে তাই জানা গিয়েছিল। কিন্তু সেই বৃষ্টি হল। কেন হচ্ছে এই বৃষ্টি?
উত্তর পেতে আর কয়েক মুহূর্ত শুধু অপেক্ষা করতে হল। প্রথম বিস্ফোরণটা ঘটল রামানুজ থেকে কয়েক ফুট দূরে। সে কেঁপে উঠল।
ধীরে ধীরে বৃষ্টির বেগ বাড়ছে। আরও একটা বিস্ফোরণ, এবার বাহিনীর পায়ের সামনে। রামানুজের মাথাটা তখন খুলে গেছে।
সে আন্দাজ করে ফেলেছে যে ঠিক কী হতে চলেছে। সে চিৎকার করে উঠল, “সকলে দৌড়াও। গ্রামের দিকে দৌড়াও। জঙ্গল থেকে বেরোও সবাই।”
সিনহা সাহেব বুঝলেন আর বেশি সময় নেই। তিনি ঘটনার গুরুত্ব বুঝতে পেরে দৌড়ালেন।
সকলের প্রতি চিৎকার করে বললেন, “জঙ্গল ছেড়ে বেরোও সবাই।”
ফোর্স আর দেরি করল না। আবার উলটো পথে দৌড় শুরু করল। ততক্ষণে ছোট ছোট কিছু বিস্ফোরণও ঘটা শুরু হয়ে গেছে।
দাসবাবু প্রমাদ গুনলেন।
রামানুজ তাকে ছাড়িয়ে উলটোদিকে দৌড়বার সময় বলে গেছে, “পিছনে ঘুরুন। গ্রামের অভিমুখে দৌড়ান।”
ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হল এবার। আর দেখতে দেখতে শান্ত জঙ্গল হয়ে উঠল অগ্নিগর্ভ।
আক্ষরিক অর্থেই অগ্নিগর্ভ কারণ এখন জঙ্গলের চারদিকে বিস্ফোরণ শুরু হয়ে গেছে। কোনো বিস্ফোরণ বড় কোনোটা ছোট।
কিন্তু পরপর চেইনের মতো চারদিকে বিস্ফোরণ ঘটছে। কোনোটা সাধারণ শব্দ বাজির মতো, কোনোটা অ্যাকশন মিনি বোমা।
গ্রামবাসী সকলে জঙ্গলের মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। তারা এখন পলায়মান বাহিনী দেখতে এসেছেন। বাহিনীর অনেকেই এখন দৃশ্যমান। সকলেই প্রাণপণে দৌড়াচ্ছেন।
বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন সকলে। বজ্রপাত সহ বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে।
জঙ্গলের ভিতরে বিস্ফোরণের বাণ ডেকেছে যেন। সকলে সেই বিস্ফোরণের আঘাত থেকে বাঁচতে দৌড়াচ্ছে।
কারো ডানদিকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ কারো বাঁ-দিকে, কারো একদম সামনে। বারবার দিকপথ পালটাতে হচ্ছে সকলকে। সোজা দৌড়ানো যাচ্ছে না।
কোথাও বা বৃষ্টির জমে থাকা জল অব্দি বিস্ফারিত হয়ে ছিটিয়ে পড়ছে। সঙ্গে ছোট ছোট অগ্নি স্ফুলিঙ্গ।
অদ্ভুত ভয়ংকর এক দৃশ্য, যেখানে এক দল মানুষ এর মজা নিচ্ছে অপরদল নিজেকে বাঁচাতে প্রাণপণ ছুটছে।
একে একে সকলে এসে ঝাঁপিয়ে জঙ্গলের বাইরে এসে পড়ল। রামানুজ এসে ছিটকে পড়ল হেমন্তাইয়ের পায়ের কাছে। একে একে বাকিরাও।
দাসবাবু সকলের শেষে। জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে তারা দেখল জঙ্গলের সমস্ত বিস্ফোরণের ফলে সাদা ধোঁয়ায় ছেয়ে গেছে।
জঙ্গলের অভ্যন্তরে আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। শুধু মাঝে মাঝে কিছু অগ্নিস্ফুলিঙ্গ আর বীভৎস শব্দ কানে আসছে।
এভাবে চলল আরও মিনিট পনেরো। তারপরেও বন্ধ হচ্ছে না।
সিনহা বৃষ্টির মধ্যেই এসে হেমন্তাইয়ের সামনে রক্তচক্ষু আস্ফালন করলেন।
“কী এসব? অন ডিউটি এতগুলো অফিসারকে মারার চক্রান্ত করেছিলেন আপনারা? এবার জেলে পঁচে মরুন।”
হেমন্তাই শান্ত ধীর স্থিরভাবে বলল, “আমরা তো কিছু করিনি। বৃষ্টি হলে আমাদের জঙ্গলে মাঝে মাঝে এরকম বিস্ফোরণ হয়।”
সিনহা রেগে বললেন, “কী ফালতু কথা বলছেন আপনি? আর এই বৃষ্টি তো আপনারাই করিয়েছেন।”
হেমন্তাই হাসল, “এই যুক্তি আদালত মানবে তো?”
সিনহার কপালের ভাঁজগুলো সোজা হয়ে গেল। সত্যিই, আদালত তো গাছের মাথায় উঠে কোনো পদার্থ লাগানোর ফলে বৃষ্টি হয়েছে এই যুক্তি মানবেই না।
আর এই বিস্ফোরণ তো বৃষ্টি হবার পরেই শুরু হয়েছে। গ্রামবাসীর প্রত্যক্ষ ভূমিকা এতে নেই।
রামানুজ উঠে দাঁড়িয়ে মুখ থেকে বৃষ্টির জল হাত দিয়ে পরিষ্কার করল। বৃষ্টি এখনও কমেনি, না কমেছে জঙ্গলের বিস্ফোরণ।
কোথাও কোথাও অল্প আগুনও লেগেছে। সেই আগুন আবার বৃষ্টির কারণেই নিভে যাচ্ছে। এ কেমন বৃষ্টি আগুন লাগাচ্ছে, আবার আগুন নেভাচ্ছেও।
এই মুহূর্তে যারা দৌড়াচ্ছে তাদের মাথায় এসব ঢুকছে না।
রামানুজ এগিয়ে গেল হেমন্তাই-এর দিকে। তাঁর পাশে গুরুদেব দাঁড়িয়ে। রামানুজ বলল, “বৃষ্টির আহ্বান করতে নিশ্চয়ই দেবতার দেহ নিঃসৃত পদার্থের পরীক্ষালব্ধ ফল ব্যবহার করেছেন। তাই বৃষ্টি হবার জন্য আপনাদের জেলে ঢোকানো যাবে না। কিন্তু জঙ্গলে সোডিয়াম ছড়িয়ে রাখার জন্য গ্রেফতার করতেই পারি। কিন্তু খুব মজা পেলাম এই বুদ্ধিদীপ্ত শত্রুতার জন্য। সিনহাবাবু চলুন।”
দাসবাবু এখনও হাঁপাচ্ছেন। সিনহা গিয়ে তাকে ধরলেন। ধরে ধরেই তাকে গাড়িতে তুললেন। বাহিনীও গিয়ে লরিতে চেপে বসল।
রামানুজ গাড়িতে গিয়ে উঠার আগে হেমন্তাই তাকে ডাকলেন। রামানুজ ফিরে তাকাল।
“আগামীকাল অমাবস্যা। আমাদের কাছে এই রাত প্রতি বারো মাসে একবার আসে। গ্রামের চৌহদ্দিতে আপনাকে আমন্ত্রণ জানাতে পারব না। তবে সড়ক থেকে সম্পূর্ণ ক্রিয়া সুন্দরভাবে দেখা যায়। পারেন তো সেখান থেকে দেখবেন, আমি যা যা বলেছি তার সমস্ত কিছু সত্য। ভুল বলেননি আপনি, গণ্ডবেরুণ্ডা দেবের নিঃসৃত পদার্থের নির্যাস থেকেই ঠিক এই বৃষ্টি আহ্বায়ক পদার্থ সৃষ্টি করেছিলেন কিছু ছাত্র। বাকিটা বিজ্ঞান। সোডিয়াম ধাতু ছড়িয়ে রেখেছিলাম আমরা। বৃষ্টি জলের সঙ্গে প্রতিক্রিয়ায় এই বিস্ফোরণ। আজ এত সব কিছু যে কারণে করছি সেই কারণটাই আগামীকাল জানতে পারবেন। চাক্ষুস দেখতেও পারবেন। আসবেন আগামীকাল।”
রামানুজ উত্তর দিল না। আজকে যা হল তাতে সে ভয়ানক রেগে গেছে।
এখন কিছু বললে ভুলভালই বলবে। তার থেকে আগামীকাল ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। সে গাড়িতে উঠে বসল।
গাড়ি ফিরে এল বাংলোতে।
দাসবাবুকে বিছানায় শুইয়ে ডাক্তারের ব্যবস্থা করা হল। বাকদেরও অল্প বেশি কাটা ছেড়া আছে হাতে পায়ে।
সরকারকে জানানো হল হঠাৎ জঙ্গলে দাবানল শুরু হওয়ায় আজকের তল্লাসি সম্পূর্ণ হয়নি। দাবানল যে খুব একটা সময় থাকেনি বৃষ্টির জন্য সেটাও জানানো হল। সঙ্গে খুব ভালোভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হল যে খুব শীঘ্রই আবার জঙ্গলে প্রবেশ করবে তারা।
রাতের বেলায় সকলে মিলিত হল ব্যালকনিতে। দাসবাবু এখন অনেকটাই সুস্থ। আজ আবার আসর বসল। গ্রামের আবাসনের বুদ্ধির তারিফ করল প্রায় সকলেই। এইটুকু একটা গ্রাম একটা জঙ্গলকে বাঁচাতে জান প্রাণ দিয়ে দিচ্ছে, এই ব্যপারটার প্রশংসা সকলের মুখে ছিল আজ।
তারপর রামানুজ তাদের জানালো, “আগামীকাল ক্রিয়াটা হবে। বারোজন বেরিয়ে আসবে জঙ্গল থেকে। লড়াইয়ের পর আবার নতুন বারোজন প্রবেশ করবে জঙ্গলে। সড়কের উপর দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ ক্রিয়া দেখার আহ্বান এসেছে। কী করা উচিত।”
দাসবাবু সবার আগে উত্তর দিলেন, “কী আবার! আমরা যাবো।” ভদ্রলোক আজকের ঘটনার পর যেন একটু বেশিই তেঁতে আছেন। এরকম সাহসী উত্তর আরও বেশ কয়েকবার দিয়েছেন তিনি।
সিনহা বললেন, “এখানে একা যাওয়া ঠিক হবে না। আমি একটা ফোর্সকে এখান থেকে আগে যে বস ক্যাম্প আছে সেখানে ডেকে রাখছি। যদি অবস্থা বেগতিক দেখি ওদের আসতে পনেরো মিনিট সময় লাগবে। এখানে এসে এত ফোর্স নিয়ে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকা যাবে না।”
রামানুজ চুপ করে নিজের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছিল। সে মনে মনে একটা ভীষণ যুদ্ধ দেখতে পাচ্ছে। এই যুদ্ধটা কাদের সঙ্গে হবে এটা সে বুঝতে পারছে না। আগামীকাল রাতে গ্রামের ক্রিয়া দেখার মনস্থ করল সে।
ওদিকে যুবক এখনও মাটিতে লুটিয়ে আছে। তার জ্ঞান ফেরেনি এখনও। তার থেকে অল্প দূরে পড়ে আছে মৃত শেয়ালটা। প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা হতে চলল। শেয়ালের রক্তের দাগ এই ঠান্ডায় জমে জঙ্গলের মাটিতে বসে গেছে।
জঙ্গলের এই অংশ মূল গ্রাম থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে রয়েছে। এদিকটায় বৃষ্টি হয়নি। এদিকের গাছের মাথায় নির্যাস লাগানো হয়নি, তাই এদিকে বৃষ্টিপাত হয়নি। হলে এসব রক্ত ধুয়ে যেত, হয়ত যুবকের জ্ঞানও ফিরে আসত।
এতক্ষণ ধরে খাবার না পেয়ে কারাগারের বন্দিরা একনাগারে গুঙিয়ে চলেছে। বীভৎস শব্দ হচ্ছে কারাগার থেকে। আর সবচেয়ে ভয়ানক ব্যপার হল, দেবতার জাগার সময় হয়ে এসেছে। আর একদিন মাত্র বাকি। যুবকের জ্ঞান ফেরাটা অত্যন্ত জরুরি।
রাত্রি আরও গভীর হলে একসময় যুবকের হাতের আঙ্গুল নড়ে উঠল। মরার মতো পড়ে থাকা শরীর ভাঁজ হল। শরীরে একটা অস্বস্তি নিয়ে জ্ঞান ফিরলো তার। নিজেকে এভাবে মাটিতে শুয়ে থাকা অবস্থায় আবিষ্কার করে প্রথমে খানিকটা অবাক হল। চারদিকে তাকিয়ে যখন মরা শেয়ালটাকে দেখতে পেল তখন স্মৃতি মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। কোনোক্রমে উঠে বসল সে।
দেহ অসাড়, কিন্তু চেতনা ফিরে এসেছে। দুর্বলতা আছে কিন্তু এখন আর সময় নষ্ট করার মতো সময় নেই। সে কোনোক্রমে হাঁটুতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল। দেবতার মন্দিরের দিকে এগিয়ে গেল সে। যাবার পথে শেয়ালের ছেঁড়া মাথাটা তার পায়ের চাপে ভেঙে গেল।
সারা শরীরে ঘাস লেগে আছে, লেগে আছে মাটি। ছেড়া ফাঁটা ময়লা লেগে থাকা সাদা বস্ত্রটি এখনও গায়ে ঝুলছে। বহু অংশে রক্তের দাগ শুকিয়ে বস্ত্রটাকে লাল করে তুলেছে। সে এসে দাঁড়াল দেবতার সামনে। গন্দবেরুন্দা নৃসিংহদেব। দেবতার খোলসটা ঔজ্জ্বল্য যেন এক রাতের দ্বিগুণ
বেড়েছে। বাড়বে নাই বা কেন। দেবতার জাগ্রত হবার সময় হয়েছে তো।
সে ভালো করে তাকাল দেবতার দিকে। দেবতা বসে আছে। তার দুই পা দু-দিকে সমান বিস্তৃত। পেশীবহুল শরীর গড়িয়ে পড়ছে তরল নির্যাস। উপরের দিকে তাকালো সে। ঘাড়ের উপরের অংশে দেবতার দুই মাথা। হঠাৎ দেখলে মনে ভয় জাগে। দু-টো বিকট ঈগলের মাথা। ভাবতে অস্বস্তি হয় যে প্রকৃত দেবতা একসময় এই খোলস ধারণ করতেন। কখনো কখনো মনে হয় এ যেন খোলস নয়, সত্যিই দেবতা এখানে বসে আছেন। আর সত্যিই তো, আর তো চব্বিশ ঘণ্টা। দেবতা জেগে উঠবেন। তাঁর চোখে যেন লাল আভার ছটা।
যুবক সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করল দেবতাকে। তারপর উঠে দাঁড়াল। এবার তার চেহারা স্পষ্ট বোঝা গেল। ইতিমধ্যেই একটি চোখ সাদা হয়ে গেছে তার। খুব বেশি সময় বাকি নেই। শরীরের রক্ত এখন চঞ্চল। শরীরে আর অল্প সময়ের মধ্যেই দ্রুতবেগে ভাঙন শুরু হবে। যুবক এবার এগিয়ে গেল পরীক্ষাগারের দিকে।
পরীক্ষাগারের ভিতর ধোঁয়াটে অন্ধকারময়। নানা জায়গায় নানারকমের যন্ত্রাংশ। কোনোটায় কিছু ফুটছে, কোনোটায় আগুন জ্বলছে, কোনোটায় রঙিন তরল ভর্তি। বৈজ্ঞানিক পরিচিত যন্ত্রাবলির বাইরেও রয়েছে কিছু যন্ত্রাংশ যা সভ্য মানুষ কখনো দেখেনি। এক দিকে রয়েছে অনেকগুলো খাঁচা। সেখানে নানা বন্য প্রাণীদের ধরে তাদের উপর পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়েছে। তাদের দেহে পাঠানো হয়েছে নিঃসৃত পদার্থের থেকে তৈরি বিভিন্ন প্রকার ওষুধ। বন্য ইঁদুর, গিনিপিগ, বাঁদুড়, জঙলি কুকুর, বানর থেকে শুরু করে কী নেই সেই খাঁচাগুলোতে। বেশিরভাগ প্রাণী নড়ছে না। হয়তো মরে গেছে আজ সকালেই। বিদঘুটে গন্ধ বেরোচ্ছে এখন। কিছু কিছু প্রাণী এখনও নড়ছে। লাশগুলোকে ফেলে যেগুলো বেঁচে গেল তাদের নিয়েই পরীক্ষা এগোবে।
খাঁচার এলাকা ছাড়িয়ে যুবক প্রবেশ করল পরীক্ষাগারের অন্দরমহলে।
একটা কক্ষে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। এই কক্ষ তুলনামূলকভাবে অধিক শীতল। একটা বড় বাক্সের ঢাকনা খুলে ফেলল সে। ঢাকনা খুলতেই একটা ঠান্ডা হাওয়া এসে ধাক্কা মারল। বোঝা গেল এটা একধরনের ফ্রিজার। যুবক সেখানে হাত ঢুকিয়ে বের করল একটা কাচের কৌটো। ভিতরে উজ্জ্বল সবুজাভ হলুদ বর্ণের পদার্থ দেখা যাচ্ছে। ঢাকনা দেওয়া কৌটোটা খুলে ফেলল সে। পাশে পড়ে থাকা একটা সিরিঞ্জ সেই পদার্থে ডোবালো। পদার্থ উঠে এল সিরিঞ্জের সূঁচ বেয়ে। একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে সিরিঞ্জের পদার্থ নিজের বাঁ-হাতের শিরায় চালান করে দিল যুবক।
কয়েক মুহূর্তের অপেক্ষা। তার শরীর কাঁপতে শুরু করল। শিরাগুলো দপ দপ করতে লাগল। বাইরে থেকেও দেখা যেতে লাগল যে তার শরীরের ভিতরের বিভিন্ন অংশে সবুজাভ হলুদ বর্ণের ছটার বাহার। গলার শিরাতে সেই বাহারি রঙ ছুটছে। হাতের পেশিগুলোর সঙ্কোচন প্রসারণ ঘটতে লাগল। শরীরের ভিতরের তাপমাত্রা বেড়ে গেল। এই ঠান্ডার মধ্যেও ঘেমে উঠল সে। আর সহ্য করতে না পেরে বিকট চিৎকার করে উঠল সে।
“আহ…হ…হ…হ”
মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। শরীরের ভিতরকার বিচ্ছুরণ বন্ধ হল। ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হল তার দেহ। উঠে দাঁড়াল সে। ফ্রিজারের কাছে রাখা কাচের কৌটোটা তুলে নিল হাতে। এবার স্পষ্ট দেখা গেল তাকে। তার যে চোখটা সম্পূর্ণ সাদা হয়ে গিয়েছিল সে চোখ এখন মণি ফিরে এসেছে। সে হাসিমুখে হাতের কৌটোটা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এত বছরের সাধনার ফসল স্বরূপ তৈরি হয়ে গেল সেই মহৌষধ।
সে চিৎকার করে উঠল, “মৃত কৈটভ… মৃত কৈটভ। উন্মাদ উচ্ছাসে ফেটে পড়ল সে। কিন্তু এখন শুধু উচ্ছাস দেখালেই হবে না। কিছু জরুরি কাজ বাকি আছে। সে কারাগারের উদ্দেশে হাঁটল। কারাগারের কাছাকাছি পৌঁছাতেই কানে এল বুভুক্ষু একদল জানোয়ারের গোঙানির তীক্ষ্ণ শব্দ। নিবিড় অরণ্যে এরকম শব্দ বুকে কাঁপন ধরানোর পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু যুবকের মধ্যে কোনো হেলদোল দেখা গেল না। সে এগিয়ে গেল কারাগারের প্রত্যেকটা কক্ষের সামনে।
হাতে ধরে রাখা উজ্জ্বল বস্তুটা সবাইকে দেখাল। তারপর বলল, “মুক্তি চাস তোরা, মুক্তি? এই দেখ আমার হাতে এক কৌটো মুক্তি রয়েছে। আমরা সবাই চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু সফল হলাম আমি। আর এই সাফল্যের সমস্ত কৃতিত্ব আমার।
বিচ্ছিরিভাবে হাসল সে। তারপর আবার বলল, “তোদের জন্যেও বরাদ্দ আছে এই মুক্তি। তোদের শরীরের রক্ত ছাড়া এই পরীক্ষা সম্পূর্ণ হতো না আমার। কিন্তু শর্ত একটাই। যদি এই মুক্তি তোরা চাস, তবে আমার জন্য কাজ করতে হবে।”
কথাটা বলেই তার মনে হল, ওরা তো কিছুই বুঝবে না এখন। ওদের
বোঝাতে হলে শরীরের ভিতর এই পদার্থ ঢোকাতে হবে। সে আর দেরি করল না।
ওদের খাওয়ার জন্য ঝুলিয়ে রাখা মুরগীগুলোর ভিতর পরিমাণ মতো মৃত কৈটভ মিশিয়ে সে ওদের খেতে দিল। কিছু সময়ের মধ্যেই মহৌষধীর কাজ শুরু হয়ে গেল। যে পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে সে নিজে গিয়েছিল ঠিক সেরকম পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গেল প্রত্যেকটা কারাবন্দি জানোয়ার। ওদের শরীরের শিরায় শিরায় দেখা গেল সবুজাভ হলুদের আভা, যেন বর্ণছটাসহ বিদ্যুৎ বয়ে যাচ্ছে একেকজনের শরীরে। অল্প সময়ের মধ্যেই শান্ত হল ওরা। আবার কিছুটা মনুষ্যত্ব দিতে এল ওদের চেতনায়। একটা চোখ স্বাভাবিক হয়ে গেল।
এবার যুবক তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল আর দেখাল তার আবিষ্কার। “বন্ধুরা, এই দিনটার জন্যেই তো আমাদের স্বপ্ন দেখা, এত পথ চলা। সুস্বাগতম, পুনরায় চেতনায় ফিরে এসেছ তোমরা। সুস্বাগতম।”
কারাগারের এগারো বন্দি তাদের বন্ধুর কথায় বেশ খুশি হল। তাদের শরীরে এখনও জীবানু রয়েছে। সেজন্যে তাদের অসুবিধেও হচ্ছে। একজন বলল, “এর চেয়ে ভালো কথা আর কি হতে পারে কৈটভ। কিন্তু তুমি আমাদের সম্পূর্ণ চেতনা ফেরালে না কেন?”
এই প্রশ্নে আবার শব্দ করে হাসল যুবক, যার নাম কৈটভ। তারপর বলল, “কারণ আমি চাই না তোমরা সম্পূর্ণ চেতনায় ফিরে আসো। আমি চাই তোমাদের মধ্যে জানোয়ার সত্বাটা বিরাজ করুক। আমি চাই তোমরা আমার সিপাহীর মতো হয়ে থাকো। আমি চাই এই পৃথিবীতে রাজত্ব করতে। আর এতে একমাত্র তোমরাই আমাকে সাহায্য করতে পারবে। আর দেখো শুধু তোমাদের নয়, আমি নিজেকেও অর্ধেক শয়তানে পরিণত করে ফেলব যাতে আমার ভালো গুণগুলো আর মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। অনেক হয়েছে মানবসভ্যতার জন্য নিজেদের বলিদান, এবার মানব সভ্যতা আমাদের জন্য কিছু করুক। বন্ধুরা, শুধুমাত্র তোমাদের মাথা আর চোখ যতে ভালোভাবে কাজ করে তাই অর্ধেক মানুষে পরিণত
করলাম তোমাদের। বাকি অর্ধেক আজীবন জানোয়ার থাকবে। মনে রেখো তোমাদের মধ্যে যদি কেউ আমার কথা না শোনো তবে চিরতরে জানোয়ারে পরিণত হবে তোমরা। সেক্ষেত্রে বারো বছরের বেশি আয়ু নেই। হ্যাঁ, এই জীবানু যদি কারো দেহে প্রবেশ করে সে কোনোভাবেই বারো বছরের বেশি বাঁচবে না। কিন্তু সে যদি মৃত কৈটভ গ্রহণ করে এবং পুনরায় জীবানুর দ্বারা সংক্রামিত না হয়, তাহলে অমর হয়ে থাকবে। মৃত্যু ছুঁতেও পারবে না। একমাত্র পুনরায় এই একই জীবানুর দ্বারা সংক্রামিত হলে তবেই তোমাদের মৃত্যু সম্ভব। এর বাইরে তোমাদের কেউ কেটে ফেললেও তোমরা বেঁচে থাকবে। তবে হ্যাঁ, সেক্ষেত্রে নিয়ম একটাই। পরিমাণ মতো প্রতিদিন মৃত কৈটভ গ্রহণ করতে হবে তোমাদের। নইলে আবার তোমরা পরিণত হবে জানোয়ারে। চিন্তা নেই, আমি তোমাদের পর্যাপ্তভাবে মৃত কৈটভের উপাদান সরবরাহ করবো।
কৈটভ থামল। বন্দিদের মধ্যে এই মুহূর্তে জানোয়ার প্রদত্ত মন্দ গুণের আধিক্যই বেশি। তারা গোঙাতে লাগল। কিন্তু তারা আনন্দিত। এই গোঙানি আসলে কৈটভের জয়ধ্বনীর প্রতীক।
একজন রুক্ষভাবে গোঙাতে গোঙাতে জিগ্যেস করল, “এই মহৌষধির নাম মৃত কৈটভ কেন রাখলি?”
কৈটভ হাসল, “অনেক কারণ। প্রথম কারণ দেবতা নিঃসৃত নির্যাসের সঙ্গে তোদের মৃত রক্ত মিশিয়েছিলাম। দ্বিতীয় কারণ পৌরাণিক। মৃত সঞ্জীবনী যেভাবে মৃতের শরীরে প্রাণ সঞ্চার করে তেমনি মৃত কৈটভ তোদের মতো জানোয়ারকে আবার মানুষে পরিণত করে। আমি, আমার নাম কৈটভ। আমার নামের উপরেই তাই এর নামকরণ করেছি ‘মৃত কৈটভ’। শতাধিক বছরের তপস্যার ফল এই মহৌষধি। এর নাম এর স্রষ্টার নাম ছাড়া কার নামেই বা মানাবে। তোরা মনে রাখিস, এই ওষুধ বানাবার সমস্ত ফর্মুলা আছে আমার মাথায়। আমিই ভবিষ্যতে বানাবো অমরত্বের দাওয়াই। সুতরাং এখন থেকে এই গ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি আমি।
হেমন্তাই আর গুরুত্বপূর্ণ লোক নয়। বরং হেমন্তাই আমাদের শত্রু। সে আমাদের হত্যার ছক কষতে বসবে আজ।”
কৈটভ কথা বলতে বলতে এগিয়ে এল বন্দিদের কাছে। তারপর একে একে সকলকে বন্দিদশা থেকে মুক্তি দিল। বেরিয়ে এল একেকটা আধা মানুষ আধা শয়তান। সবাইকে কারাগারের সামনের প্রাঙ্গণে জড়ো করল কৈটভ।
তারপর বলল, “এই মুহূর্তে আমাদের প্রথম কাজ, হেমন্তাই হত্যা।”
সকলের মুখে ফুটে উঠল ক্রুর হাসি। একসঙ্গে অদ্ভুতভাবে গর্জন করে উঠল সবাই।
