ব্রহ্মপদার্থ – ৮
(৮)
গুরুদেব অপেক্ষা করছিলেন। রামানুজ একটু বেলার দিকে এল আজ।
“নিজেকে অস্থির মনে হচ্ছিল। একটু শান্ত সমাহিত হয়ে এলাম।”
গুরুদেব হাসলেন। বললেন, “বেশ করেছ। মন শান্ত থাকলে সব কাজ সঠিকভাবে হয়। পরিকল্পনা সম্পূর্ণ?
“হ্যাঁ। আপনি শুধু রথ সামলান। প্রতিপক্ষকে আমি দেখে নিচ্ছি।”
গুরুদেব শান্তভাবে তাকালেন। আজ রামানুজকে অন্যরকম লাগছে।
“তোমাকে একটু জঙ্গলে যেতে হবে।”
“কোন্ জঙ্গলে?”
“গন্দবেরুন্দা যে স্থানে পূর্বে অবস্থান করতেন, সেখানে যেতে হবে। সম্পূর্ণ হয়তো যেতে হবে না।”
“বেশ। কিন্তু কেন?”
“তুমি যাও। উত্তর পেয়ে যাবে। আমি আশ্রমে তোমার জন্য অপেক্ষা করব।”
রামানুজ দেখল আলো প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। এমতাবস্থায় জঙ্গলে ঢুকলে অতি তীব্র আলোর টর্চ প্রয়োজন। কালবিলম্ব না করে সে দাসবাবুকে ফোন করল। দাসবাবু কাছেই ছিলেন। কোয়ার্টার থেকে মিনিট সাতেকের মধ্যে টর্চ এনে দিলেন।
রামানুজ জঙ্গলের উদ্দেশে রওনা দিল। যাবার আগে জিজ্ঞেস করল, “কাল ওরা কখন আসছে?”
“আমরা বেলা বারোটায় সূর্য যখন ঠিক মাথার উপরে থাকবে, তখন যাত্রা করব। তার আগেই ওরা চলে আসবে।”
সময়ের আন্দাজ নিয়ে রামানুজ জঙ্গলে প্রবেশ করল। হাতে টর্চ আর একটা লাঠি। পকেটে বন্দুক সবসময়েই থাকে। ব্যাগ নিয়েছে। তাতে জল, শুকনো খাদ্য ইত্যাদি প্রয়োজনীয় সামগ্রী।
প্রথম এক কিলোমিটার বেশ ভালো গতিতেই পেরিয়ে গেল রামানুজ। দিনের আলো-ও ততক্ষণে অস্ত গেছে। এক কিলোমিটার হাঁটার পর রামানুজের গতি কমে এল। সে একের পর এক গাছগুলোকে পেছনে ফেলে এগোতে থাকল।
এই জঙ্গলের গভীরতা সম্পর্কে তার একটা ধারণা আছে। এই সন্ধেবেলায় বিভিন্ন পাখি ডাকছে। একত্রে সেই পাখিগুলোর ডাক কানে অসহ্য লাগছে। আর একটু ভেতরে ঢুকতেই শুরু হল একটানা ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ।
একটা দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে এগিয়ে চলেছে রামানুজ। কোথায় যেতে হবে কী করতে হবে কিছুই সে জানে না। শুধু জানে যে গুরুদেব তাকে জঙ্গলের ভেতরে যেতে বলেছেন।
আরও ঘণ্টাখানেক সে হাঁটল। এবার সে ক্লান্ত বোধ করছে। একটা গাছের গুঁড়ির উপর বসল। এতদিনের একটা ধকল যেন তাকে জড়িয়ে নিচ্ছে। দুই বাহু মেলে যেন নিদ্রাদেবী তাকে ডাকছেন। গাছের গুড়িতেই হেলান দিয়ে রামানুজ ঘুমিয়ে পড়ল। পাশে জ্বলতে থাকল টর্চটা।
তন্দ্রালু হয়ে রামানুজ দেখতে পেল একটা আলোক বলয়। সে এই বলয়ের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। চারদিক এই আলোক বলয়ের ছটায় আলোকিত। বলয়ের মধ্য থেকে আলোক ফুলকির বিচ্ছুরণ ঘটছে। এ এক অপরূপ দৃশ্য! রামানুজ এগিয়ে গেল। আর সেখানে যা দেখল তাতে সে বিমোহিত হয়ে পড়ল। সে দেখতে পেল একটি নদী কুল কুল শব্দে বয়ে চলেছে। আকাশে মেঘ নেই, সূর্য তার কিরণে ধরাভূমিকে সঞ্জীবিত করছে। নদীর পাশ ঘেঁষে এক বিরাট অরণ্য। সেই অরণ্যের একটি গাছে হেলান দিয়ে বাঁশি বাজাচ্ছেন স্বয়ং কৃষ্ণ। চারদিকে পশু-পাখি, জীব-জড় সমস্ত পদার্থ তন্ময় হয়ে সে বাঁশির মিষ্ট ধ্বনি শুনছে। রামানুজ বিহ্বল হয়ে পড়ল এই দৃশ্যে। সে-ও কখন তন্ময় হয়ে সেই ধ্বনি শুনতে লাগল সে নিজেই জানে না। আহা কী সুর, কী তার
লয়-কান ধন্য হচ্ছে এই শব্দ শ্রবণ করে। মৃদু মন্দ বাতাস বইছে। চারদিকে মনোরম একটা কান্তি বিরাজ করছে।
আর তখনই ঘটনা ঘটল। একটা তীর এসে সোজা আঘাত করল শ্রীকৃষ্ণের পায়ে।
শ্রীকৃষ্ণের পায়ে নয়, এ তির যেন সোজা এসে লেগেছে রামানুজের বুকে। সে ধপ করে বসে পড়ল মাটিতে। তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল জলকণা।
চারদিকের মনোরম পরিবেশ চোখের নিমেষে পালটে গেল। তাপমাত্রা বাড়তে লাগল। গলা খুশখুশ করতে লাগল। তাপমাত্রা আর অস্বস্তি এত বেড়ে গেল যে রামানুজ নিজের পরনের শার্টটা খুলে ফেলল। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার।
সে এখনও এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে শ্রীকৃষ্ণের দিকে। তিনি এখনও জীবিত। তাঁর হাতে বাঁশি, তাঁর মুখে হাসি। এটা অবশ্যই ইচ্ছামৃত্যু। নইলে এই ত্রিভুবনপতিকে মারতে পারে এরকম কে আছে। এই মুষলের আঘাতও তাঁর ইচ্ছেতেই হয়েছে। এই যুগে তাঁর লীলা শেষ। এবার অন্য যুগের শুরু হবে।
রামানুজ দেখল শ্রীকৃষ্ণ হাত উঁচিয়ে তাকে এগিয়ে যাবার নির্দেশ দিলেন। আর ঠিক তখনই রামানুজের ঘুমটা ভেঙে গেল।
সে ধড়ফড় করে উঠল। ঝিঁঝিঁ-র ডাকে কান পাতা দায় হয়েছে। গায়ে কিছু ডেয়ো পিঁপড়ে উঠেছে। কোনোক্রমে সে সব ঝেড়ে উঠে দাঁড়াল।
সে এ কী দৃশ্য দেখল! ধাতস্থ হতে সময় লাগে তার। ব্যাগ থেকে জল বের করে চোখে-মুখে ছিটিয়ে দিল।
কুয়াশা এখনও গাঢ় হয়নি। কিন্তু পড়তে শুরু করে দিয়েছে। আর কিছুক্ষণ পর এই পথে এগোতে যথেষ্ট বেগ পেতে হবে তাকে।
এসবই যখন তার মাথায় ঘুরছে তখনই সে শুনতে পেল, “পুলিশ কর্তা, এত রাতে এই জঙ্গলে।”
রামানুজ প্রথমটা কেঁপে উঠল। এই জঙ্গলে সে কোনো মানুষের শব্দ আশা করেনি।
“কে… কে ওখানে?”
হাত চলে গেল রিভলভারে।
“আমি সে, যে আপনাকে গত যাত্রায় উদয়পুরের মাতা বাড়িতে গিয়ে দেখা দিয়েছিলাম।”
মহিলা কণ্ঠস্বর। রামানুজ কণ্ঠস্বরের দিকে তাক করে টর্চ ধরল। ধীরে ধীরে সেই আলোক রেখা বরাবর এগিয়ে এলেন এক বৃদ্ধা। আর একটু কাছে আসতেই রামানুজ তাঁকে চিনতে পারল।
“আপনি?” রামানুজের চোখ বিস্ফারিত হল। সে আবার জিজ্ঞেস করল, “আপনি এই সময়ে কী করছেন এই জঙ্গলে?”
বৃদ্ধা শব্দ করে হাসলেন।
“এই জঙ্গলে কী করছি, কী না করছি সেটার চেয়েও বেশি জরুরি কথা আপনাকে বলতে এসেছি পুলিশ কর্তা।”
রামানুজ তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে।
“কী কথা?”
সেই রহস্যময়ী বৃদ্ধা মানুষটি রামানুজের থেকে একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন,
“সময় যাত্রা যখন আপনার ভাগ্যে লেখা হয়েই গেছে তখন খুব বুদ্ধি করে সে যাত্রা করতে হবে। দুষ্ট যখন আপনাদের দিয়ে প্রকৃতির নিয়ম ভাঙাচ্ছেই তবে দুষ্টদের দমনের জন্যেই হোক এই যাত্রা। শুনুন ২০৩৫ সালে আপনারা যাবেন ঠিকই, কিন্তু ফেরার পথে ২০২৪-এ নামবেন না। পেছনে চলে যান।”
রামানুজ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “তাতে কী হবে?”
বৃদ্ধা বললেন, “আপনি বেশ কয়েকটা অতীত যাত্রা করুন। প্রতিটায় বারো বছরের ব্যবধান রাখুন এবং প্রতিবার সেখানে এরকম কিছু করুন যা স্বাভাবিক নিয়মে ওখানে আগে ঘটেনি এবং যা ঘটার পর একটা অল্টারনেট ঘটনার সৃষ্টি হবে।”
রামানুজ বিরক্ত হল। বলল, “আমি সত্যি বুঝিনি। আপনি আমার মাথা খারাপ করে দিচ্ছেন।”
বৃদ্ধা হাসলেন। তারপর বললেন, “খুব সোজা কথা বলছি। অতীতে গিয়ে প্যারাডক্সের সৃষ্টি করে আসুন। এরকম প্যারাডক্স বানান যাতে কর্কট আর কৈটভের মধ্যে ঝামেলা বাধে।”
“প্যারাডক্স?”
“হ্যাঁ প্যারাডক্স। অতীতে গিয়ে কেউ আপনার ঠাকুরদাকে মেরে ফেললে বর্তমানে আপনার জন্মই হবে না। বরং শুরু হবে মাল্টিভার্স। প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধাচরণ যখন করবেন-ই তখন দুষ্টের অনিষ্টের জন্য করুন।”
এবার রামানুজের মাথাটা কাজ করতে শুরু করল।
“অসম্ভব ভালো একটা বুদ্ধি দিয়েছেন। অসংখ্য ধন্যবাদ।”
বৃদ্ধা হাসলেন।
“এই যুদ্ধে যখনই আপনার দরকার পড়বে আমি আছি। কিন্তু কাজ আপনাকেই করতে হবে। আমি শুধু দিশা দেখাতে পারি।”
কাছেই একটা শেয়াল খুব জোরে ডেকে উঠল। রামানুজ সেই দিকে একবার তাকাল। তাকাতে তাকাতেই বলল, “আপনি যেভাবে দু-বার সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন তা অনস্বীকার্য।”
কথা শেষ করে ঘাড় ঘুরিয়ে রামানুজ দেখল কেউ কোথাও নেই। রামানুজ তৎক্ষণাৎ এদিক-ওদিকে এগিয়ে দেখল টর্চের আলো দিয়ে। না, কেউ নেই।
রামানুজ মনে মনে ভাবল, “ওঁর কথা গুরুদেবকেই জিজ্ঞেস করতে হবে।” রামানুজ এটাও বুঝতে পারল জঙ্গলের কাজ সম্ভবত শেষ হয়েছে। এবার ফিরে যেতে হবে।
সে ফেরার রাস্তা ধরল।
গ্রামে যখন পৌঁছাল তখন নিশুতি রাত। সে আশ্রমে যাবার মনস্থই করল। আশ্রমের সদর দরজা ভাঙা। তাই ঢুকতে কোনো অসুবিধেই হল না।
ভেতরে কয়েকটা হ্যালোজেন বালব জ্বলছে। খানিক এগোতেই সে শুনতে পেল, “রামানুজ এসেছ?”
গুরুদেবের কণ্ঠ।
“হ্যাঁ গুরুদেব।”
সাধনা কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন তিনি। শ্বেত অঙ্গবস্ত্রে গুরুদেবকে অসাধারণ লাগছে। ভক্তিভাব জেগে ওঠে দেখলেই। রামানুজ হাত জোড় করে বলল,
“আমাকে দয়া করে বলুন যার সঙ্গে দেখা হল তিনি কে?”
গুরুদেব তার হাত জড়িয়ে ধরলেন, “তিনি আমাদের পথপ্রদর্শক। তিনি কে তা সঠিক সময়ে নিশ্চয়ই জানতে পারবে। আশাকরি এ যাত্রাতেও তিনি তোমাকে সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছেন।”
রামানুজ মাথা নেড়ে এই কথায় সম্মতি দিল।
“বেশ, তাহলে তো হয়েই গেল। রাত পোহাতে বেশি দেরি নেই। কাল অনেক কাজ। এখন তুমি একটু বিশ্রাম নাও। আশ্রমেই থেকে যাও আজকের রাতটুকু।”
রামানুজ বুঝল গুরুদেব বর্তমানে রহস্যময়ী বৃদ্ধা নিয়ে কিছুই বলবেন না। এতটা পথ হেঁটে সেও ক্লান্ত। তাই সে গুরুদেবের এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল।
আশ্রমের একটা ঘর খুলে রাখা হয়েছিল রামানুজের জন্য। সেখানে গিয়ে রামানুজ ঘুমিয়ে পড়ল।
কাল তাকে প্রকৃতির নিয়ম ভাঙতে হবে। আজ ঘুমে তলিয়ে যাওয়া দরকার।
