হলাহল বিষভাণ্ড – ১
।। ১।।
বাইরে অবিরাম বর্ষণ চলছে। দু-দিন ধরে চলছে এই বজ্র-বিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টিপাত। শহরের মানুষ বন্যায় ভেসে যাচ্ছে। চারদিকে শুরু হয়েছে ত্রাণ কার্য। বিগত একশো বছরেও এরকম বন্যা দেখেনি শহরবাসী। অথচ এরকম বন্যার কোনো আভাস ছিল না। এরকম বিপর্যয়ের কোনো আভাস কেন আবহাওয়া-দপ্তর আগে থাকতে দিতে পারেনি তার ব্যাখ্যায় সকলেই অবাক। আসলে এরকম বন্যা হবার কোনো কথাই ছিল না। কিন্তু হঠাৎই দুর্যোগ নেমে এল।
আসলে এ-দুর্যোগ যে কৈটভের অপ্রাকৃতিক সৃষ্টি কেউ তা জানতেও পারল না। এক পরিত্যক্ত খাদানে বসে আছে কৈটভ। চারদিকে বৃষ্টির জল পড়ছে। এখানে জল দাঁড়াচ্ছে না। কিন্তু ক্রমাগত বর্ষণে চারদিক জলে স্যাঁতসেঁতে হয়ে আছে। কৈটভ থেকে দূরত্ব বজায় রেখে জায়গাটা পাহারা দিচ্ছে কৈটভ-বাহিনী। ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কৈটভ-বাহিনী। তাদের হাতে অস্ত্র রয়েছে। কৈটভের ডানদিকে পড়ে রয়েছে কয়েকটা খালি টেস্টটিউব। কর্কটের পরীক্ষাগার থেকে চুরি করা রেইনোজ-এর মাধ্যমে এই বৃষ্টি ঘটিয়েছে কৈটভ। বন্যায় ভেসেছে শহর।
কৈটভের মন বড়োই অশান্ত। এতটাই তার আক্রোশ যে সে পুরো পৃথিবীকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দিতে চাইছে। কিন্তু সেটা যখন সম্ভব হচ্ছে না তখন বন্যায় ভাসিয়ে দিচ্ছে সকলকে। ঠিক যেন মৃত্যুর দেবতা কৈটভ। কৈটভের চোখ দিয়ে অবিশ্রান্ত ধারায় গড়িয়ে পড়ছে জল। এই বৃষ্টিতে যদিও কৈটভের চোখের জল বোঝা যাচ্ছে না। তার সামনে সাদা কাপড়ে জড়িয়ে শোয়ানো আছে তিনটে লাশ।
১৯৯৩ সালে কৈটভের মাতা-পিতাকে হত্যা করা হয়েছিল। তখন তাদের বিবাহ অবধি হয়নি। তার আগেই কৈটভ-সমস্যা সমূলে বিনাশ করার লক্ষ্যে এই অনিষ্ট করেছে রামানুজ। তারপর ২০১১ সালের কিশোর কৈটভের মৃতদেহও পড়ে আছে সামনে। সাদা কাপড় বৃষ্টিতে ভিজে মৃতদেহগুলোর গায়ের সঙ্গে সেঁটে আছে। বিকট শব্দে বাজ পড়লে হঠাৎ যখন দৃষ্টি যাচ্ছে সাদা কাপড়ের দিকে তখন বুকের রক্ত হিম হয়ে যাচ্ছে।
মা-বাবার হত্যায় যে-কোনো সন্তানই বিচলিত হয়ে উঠবে। কিন্তু নিজের মৃত্যুর শোক যেন ভুলতে পারছে না কৈটভ। সে এই ভেবে আরও বেশি রেগে যাচ্ছে যে আর কোনো নতুন কৈটভ হয়তো তৈরি হবে না, কিন্তু এই একটা কৈটভ যে বেঁচে থাকল তাকে সামলানোর কথা আদৌ ভেবেছিল হত্যাকারীরা? এরকম হীনকার্যের পর তার হাত থেকে আদৌ বাঁচতে পারবে কেউ?
ভাবনার মাঝেই সশব্দে বজ্রপাত হল। চারদিক আলোকিত হয়ে উঠল। দেখা গেল কৈটভ নিজের কোলে নিজের কাটা মাথাটা নিয়ে বসে আছে। এ এক বীভৎস দৃশ্য! নিজের মৃত্যুতে নিজেই শোক পালন করছে সে। নিজের কাটা মাথায় হাত বুলিয়ে নিজেকে প্রবোধ দিচ্ছে সে।
এভাবে আরও একটা দিন কেটে গেল। শহর ভেসে গেল বন্যায়। কৈটভের তখনও হুঁশ নেই। সে শোকাতুর হয়ে বসে আছে। তার জীবনের লক্ষ্যগুলো যেন এক লহমায় নড়ে গেছে। নষ্ট হয়েছে সমস্ত পরিকল্পনা। কোলে নিজের অতীতের কাটা মাথাটা নিয়ে রোজ সে শোকের উৎসব করছে। আর সেই উৎসবে সর্বশান্ত হচ্ছে শহর।
ঠিক এরকম এক সময়ে সেই বৃষ্টি-ভেজা খাদানে একজনের উপস্থিতি টের পাওয়া গেল। সে অনেকক্ষণ ধরেই দেখছিল সমস্ত কিছু। কিন্তু নিজেকে ধরা দেয়নি। এবার সশরীরে প্রকট হল সে। তার মনে হল এটাই তার উপস্থিতি জানাবার সর্বশ্রেষ্ঠ সময়। সে এগিয়ে গেল। একটা আলোর বলয় তাকে পূর্ণাঙ্গভাবে ঘিরে রয়েছে। যেন একটা আলোর গোলক। তাকে সামনে পেতেই কৈটভ-বাহিনীর দু-একজন সিপাহি আক্রমণে উদ্যত হল। কিন্তু সেই আলোর গোলকে হাত দিতেই তৎক্ষণাৎ ভস্মীভূত হল কৈটভ-বাহিনীর দুই সেপাই।
কৈটভ এসব দেখেও যেন দেখল না। এসব জাগতিক বিবাদে তার কোনো তাপ-উত্তাপ নেই। জন্ম আটকাতে যার মাতা-পিতাকে বিষ খাইয়ে হত্যা করা হয়, যার নিজের অতীত বলে কিছুই থাকে না তার তো যুদ্ধ করা মানায় না। নিজের কাটা মাথায় পরম মমতায় হাত বোলাতে লাগল সে। সেই আলোকিত গোলকে পরিবৃত হয়ে মানুষটা এবার সরাসরি কৈটভের সামনে এসে উপস্থিত হল। কৈটভ-বাহিনী এখনও ঘিরে রয়েছে তাকে। কিন্তু আগের দুজনের পরিণতি দেখে কেউই আর আলোকিত গোলকের একেবারে কাছে ঘেঁষছে না। দূরত্ব বজায় রেখেই পাহারা দিচ্ছে।
“কৈটভ। কৈটভ?”
লোকটা ডাকল কৈটভকে। কিন্তু কৈটভ এতটাই ভাবাবেগে পূর্ণ হয়ে রয়েছে যে সে এই ডাক শুনতেও পেল না। আবার ডাক এল। এবার রীতিমতো চিৎকার করতে হল,
“কৈটভ… শুনতে পাচ্ছো আমাকে। এই কৈটভ! কৈটভ!”
কৈটভের কানের গভীরে যেন সূচীসূক্ষ্ম একটা ডাক পৌঁছাচ্ছে। ভাবের গভীর সাগরে ডুব দিয়ে সে শুধু নিজেকে দোষ দিয়ে চলেছে। রামানুজ যেন আসামি নয়। আসামি সে নিজেই। তার জন্যেই ঘটেছে এই বিপদ।
“কৈটভ… কৈটভ… কৈটভ।”
বারংবার ডাকার পর সে যেন কিছুটা সংবিৎ ফিরে পেল এবার। একটা বড়ো দীর্ঘশ্বাস ফেলল কৈটভ। যেন গভীর সমুদ্রতল থেকে তাকে কেউ টেনে তুলল ওপরে।
“জাগো কৈটভ, জাগো।”
কৈটভ মাথা তুলল। খাদানে বজ্রপাত হল। দেখা গেল মুণ্ডিত মস্তক এক ক্ষুধিত রাক্ষস বসে আছে। রক্তবর্ণ চোখ নিয়ে যেন এক প্রতিহিংসাপরায়ণ মহারথী ভগ্ন হৃদয়ে বসে আছে।
“কে তুই?”
কৈটভ কেটে কেটে উচ্চারণ করল। তার স্বর বসে আছে। গলা ভাঙা।
“আমি তোমার বন্ধু। যদিও তুমি বন্ধুত্ব কী জিনিস জানো না, বিশ্বাসঘাতক হওয়াই তোমার ভবিতব্য। তবু আমি তোমার বন্ধু।” লোকটা উত্তর দিল।
“আমি তো কারও বন্ধুত্ব প্রার্থনা করিনি। আমাকে একা ছাড়ো।” কৈটভের হেঁয়ালি ভালো লাগছিল না।
উত্তর শুনে লোকটা বলল, “সব তো আমাদের হাতে থাকে না। তাই আমার বন্ধুত্ব তোমাকে গ্রহণ করতে হবে। আর করলে অবশ্যই যে তোমার লাভ হবে তা বলাই বাহুল্য। কৈটভ এখনও নিজের লাভ দেখতে জানে আশা করি।”
কৈটভের মাথায় আগুন ধরে যাচ্ছিল এসব শুনে। সে বলল, “আমার জন্য আমিই যথেষ্ট। আমি চাইলে তোমাকে এক্ষুনি মেরে ফেলতে পারি। আমার সামনে ঠিক এতটাই দুর্বল তুমি। তুমি আমাকে কী সাহায্য করবে? কী আছে তোমার!”
লোকটা এবার শব্দ করে হাসল। খাদানের এবড়ো-খেবড়ো দেওয়ালে সেই হাসির অনুরণন হতে থাকল।
“তোমার কৈটভ-বাহিনীর দুজন ইতিমধ্যে ভস্মীভূত। তুমিও চেষ্টা করবে নাকি!”
কৈটভ ভ্রু কোঁচকাল। কে তাকে এভাবে সরাসরি আহ্বান করছে? কার এত বড়ো সাহস? সাধারণ কারও তো এত দুর্মতি হবার কথা নয়! আর তাছাড়া এই পরিত্যক্ত খাদানের হদিশ আজকের দিনে কারও কাছেই নেই। কৈটভ কথা বলল না। সে শুধু তার ডান হাতে লাগানো একটি যন্ত্রে কিছু সংখ্যা লিখল— পাসওয়ার্ড। তৎক্ষণাৎ তার সামনে শূন্যে উপস্থিত হল একটা টেস্টটিউব। নীল রঙের তরল রয়েছে তাতে।
“মেল্টারো ব্যবহার করবে তাই তো? বেশ করো।”
লোকটা মেল্টারো সম্পর্কে জানে! লোকটা যে কে কৈটভ ধরতেই পারছে না। মেল্টারো সম্পর্কে জানার তো কোনো কথাই নয়। সে মেল্টারো ব্যবহার না-করে এবার সসম্ভ্রমে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কে?”
লোকটা সুন্দর করে হাসল।
“জয়গুরু! তুই থেকে তুমি হয়ে আপনিতে এলে। লাইনে আসছ তা হলে। ভালো কথা। তবে আমি কে সেটা মেল্টারো আমার ওপর নিক্ষেপ করার পরেই বলব।”
কৈটভ আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করতে চাইল না। মেল্টারো সোজা ছুঁড়ে মারল লোকটাকে আগলে রাখা আলোক বলয়ের দিকে। মেল্টারো গিয়ে পড়ল সেই গোলকের ওপর। ধীরে ধীরে তরল ছড়িয়ে পড়ল সম্পূর্ণ গোলকের ওপর। দু-এক ফোঁটা পড়ল খাদানের মাটিতে। জায়গাগুলো পুড়ে গেল। পৃথিবীর যত কঠিন পদার্থই হোক-না-কেন তা মেল্টারোর প্রভাবে গলে যাবার কথা। হিসেব মতো মেল্টারো গোলক সহকারে লোকটাকেই গলিয়ে ফেলবে প্লাস্টিকের মতো। চারদিক ধোঁয়া ধোঁয়া হয়ে গেল মেল্টারোর প্রভাবে। কৈটভ শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ধোঁয়ায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না।
কৈটভ তার কোল থেকে কাটা মাথাটিকে নামিয়ে পাশে রাখল সযত্নে। তারপর উঠে দাঁড়াল। মাটিতে পড়ে থাকা লাশগুলোর পাশ দিয়ে হেঁটে এগিয়ে গেল সেইদিকে যেদিকে লোকটা এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। চারদিকে ধোঁয়ায় কিছুই স্পষ্ট নয়। কৈটভ সেখানে গিয়ে উপস্থিত হল যেখানে লোকটা দাঁড়িয়ে ছিল। কৈটভ সত্যি অবাক হয়ে গেল। লোকটা যেখানে ছিল ঠিক সেখানেই আছে। তার গোলকের ওপর মেল্টারোর কোনো প্রভাবই হয়নি। সে গোলকের ভেতরে বসে বসে হাসছে।
“মেল্টারো গলাতে পারে না এরকম কোনো বস্তু নেই। এটা কীভাবে সম্ভব হল?”
কৈটভ সপ্রশ্ন তাকাল। লোকটা এবার গোলকের ভেতরে উঠে দাঁড়াল।
“ঠিক বলেছ কৈটভ। মেল্টারো গলাতে পারে না এরকম কোনো কিছু এই পৃথিবীতে নেই। কিন্তু যে টেস্টটিউবে সে আছে তা কেন গলে যায় না ভেবে দেখেছ?”
কৈটভ বুঝতে পারল। সে বলল, “তার মানে সেই টেস্টটিউব যা দিয়ে তৈরি এই গোলকও সেই পদার্থে তৈরি।”
লোকটা মাথা নেড়ে বলল, “একদম ঠিক ধরেছ। আর শুধু তাই নয়। যে লোকটা মেল্টারো বানিয়েছে তাকেই যদি তুমি মেল্টারো দিয়ে গলিয়ে দিলে তবে আবিষ্কর্তা হয়ে কী করলাম বলো তো?”
এবার কৈটভ ধন্দে পড়ে।
“আপনি মেল্টারো বানিয়েছেন? কীসব বলছেন? এটা তো কর্কটের সৃষ্টি।”
এতক্ষণে লোকটার হাসিমুখে যেন মেঘ নামল। চিবিয়ে চিবিয়ে উচ্চারণ করলেন, “ঠাকুরদা, দ্য গ্রেট সায়েনটিস্ট! একটা আস্ত শয়তান।”
কৈটভ এবার মজা পেল। সে বলল, “ব্যথা আছে নাকি ঠাকুরদাকে নিয়ে?”
লোকটা সেই একইরকমভাবে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “আমি যদি বলি মৃতকৈটভ তুমি একা নও, আরও পাঁচজন মিলে বানিয়েছে তুমি মেনে নেবে?”
“একদম মানব না। বরং তাকে শেষ করে দেব।”
“এবার যদি কোনো বাধ্যবাধকতায় তোমাকে মেনে নিতে হয় তাহলে তোমার মনের অবস্থা কী হবে?”
“যে এসব রটাচ্ছে সুযোগ পেলেই তার সর্বনাশ করা।”
“তাহলে ধরে নাও যে আমিও তাই করছি।”
কৈটভ এবার সরাসরি জিজ্ঞেস করে, “আপনি কে, আপনি কী, আপনি কী চান, আমি কী করতে পারি আপনার জন্য এটা এবার একলাইনে বলুন। মেল্টারো দিয়ে আপনাকে গলাতে পারিনি ঠিকই কিন্তু আর একবার আপনি হেঁয়ালি করলে আমি এই গোলককে নিজে হাতে দুমড়ে মুচড়ে ভেঙে ফেলে আপনাকে মেরে ফেলব। আমি সোজা কথার লোক। আপনাকে যতটা সম্ভব শ্রদ্ধা-ভক্তি দেখিয়েই কথাগুলো বললাম। কিছু মনে করবেন না। উদাহরণস্বরূপ এই দেখে নিন।” নিজের হাতে কিছুটা মৃতকৈটভ ঢেলে নিলো কৈটভ। তারপর একটা তীব্র ঘুসি মারল গোলকের দেওয়ালে। গোলক ভাঙলে না ঠিকই। কিন্তু জায়গাটা দুমড়ে ভেতরে ঢুকে গেল।
এই প্রথম লোকটা বুঝতে পারল কৈটভ কী জিনিস। সে আর মশকরা করার সাহস পেল না। শুধু বলল, “অবাক কাণ্ড। তুমি ভস্মীভূত অবধি হলে না।”
কৈটভ বলল, “মৃতকৈটভ প্রতিনিয়ত শক্তিশালী হচ্ছে। এর প্রভাব আমার ওপর খাটবে না। কারণ আমিই মৃতকৈটভের সৃষ্টিকর্তা। এর দ্বারা কী সম্ভব, এই ব্রহ্মাণ্ড তা জানে না। আরও সময় লাগবে। কিন্তু আমি মৃতকৈটভকে এই পৃথিবীর সর্বাধিক শক্তিশালী পদার্থে পরিণত করব।”
লোকটা এবার একটা স্প্রে ছিটিয়ে দিল দুমড়ে যাওয়া অংশে। গোলক পুনরায় আগের আকৃতি ফিরে পেল।
“বন্ধুত্ব যখন করতেই এসেছি তখন বর্মে থেকে করব না। আমি আমার কবচ থেকে বেরিয়ে আসছি। তুমি একটু পিছিয়ে যাও।”
কৈটভ কথা মতো পিছিয়ে এল। লোকটা একটা ছুরি বের করে নিজের হাতের আঙুলে চালিয়ে দিল। কয়েক ফোঁটা রক্ত একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে গোলকটি পদ্মফুলের পাপড়ির মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। লোকটা বেরিয়ে এল কবচের ভেতর থেকে। রক্তমাখা আঙুল একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ছোঁয়ানোর পর অন্তর্ধান হল কবচ। কৈটভ দেখল এই লোকটাও ঠাকুরদার নাতিদের মতোই দেখতে। শুধু সাদা ধুতি পাঞ্জাবির বদলে বর্তমানে সে পরে আছে কালো ধুতি পাঞ্জাবি।
“এবার আপনার পরিচয় পাওয়া যাবে আশা করি।”
লোকটা ইতিমধ্যে বৃষ্টিতে ভিজতে শুরু করেছে। সেই অবস্থাতেই লোকটা বলল, “আমি বৃশ্চিক। ঠাকুরদার পরীক্ষাগারের এক নম্বর বিজ্ঞানী। আমার সাহায্যেই ঠাকুরদা একে একে সমস্ত আবিষ্কার করেছেন। কিন্তু কোথাও আলাদাভাবে আমার নাম নেয়নি। সবাই জানত ঠাকুরদা মস্ত বড়ো লিডার। ঠাকুরদার সমস্ত নাতিরা সকলে মিলে পরীক্ষাগারে সমস্ত কিছু আবিষ্কার ইত্যাদি করে। পৃথিবীর কেউ ঘুণাক্ষরেও আলাদাভাবে আমার নাম নেয়নি। আমি ওইটুকু প্রাপ্তির জন্য বছরের পর বছর চেষ্টা করে গেছি। কিন্তু কখনও কেউ আলাদাভাবে আমার প্রশংসা করেনি। অথচ সমস্ত বড়ো বড়ো আবিষ্কারের ফর্মুলা আমার হাতে তৈরি। ঠাকুরদা নিজে যত বড়ো বিজ্ঞানী তার চেয়ে কোনো অংশে আমি কম কিছু ছিলাম না।”
কৈটভ ব্যাপারটা আন্দাজ করে নিয়েছে। সে বলল, “বুঝে গেছি তোমার আর কর্কটের সমীকরণ। তা এখানে কেন? আমি তো গোটা পরীক্ষাগার নষ্ট করে দিয়েছি। সমস্ত ফর্মুলা আমার কাছে। ফেরত চাইতে এসেছ?”
লোকটা সকৌতুকে উত্তর দিল, “তোমার এতক্ষণে তাই মনে হল?”
কৈটভ মুখে উপজাতিসুলভ মৌনতা বজায় রাখে। উত্তর দেয় না।
“না, বলো আমাকে।”
লোকটা আবার জিজ্ঞেস করলে কৈটভ উত্তরে বলে, “দেখুন। আমি নিজের সমস্যায় জর্জরিত। রামানুজসহ গুরুদেব, প্রত্যেককে হত্যার ছক কষব আমি। আমার মাথায় প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে। এ ক-দিন শোকে মুহ্যমান ছিলাম। আপনার ডাকে সংবিৎ ফিরল। যুদ্ধে আহ্বান করে আমাকে জাগ্রত করলেন আপনি। কিন্তু তবু মনের এই অবস্থায় এখন আমি নতুন বন্ধু কাউকে চাইছি না।
কৈটভের মুখের কথা কেড়ে লোকটা বলল, “দশ মিনিটে যদি আমি তোমায় জাগাতে পারি, যুদ্ধে অগ্রণী করতে পারি তাহলে ভাবো যে আমি তোমার কতটা কাজে আসতে পারি।”
কৈটভ তবু সায় দেয় না।
লোকটা আবার বলে, “আর আমি যদি তোমাকে প্রতিশোধ নিতে সাহায্য করি?”
কৈটভ উড়িয়ে দিল এই প্রস্তাব।
“আমার দরকার নেই সাহায্যের। আমি একক, আমি একা, আমি একমেবাদ্বিতীয়ম্। ওদের আমি ইঁদুরের মতো টিপে মেরে ফেলব।”
লোকটা কৈটভের সামনে এসে দাঁড়ায়। তাকে বোঝাবার চেষ্টা করে, “এতটাও সোজা হবে কি কাজটা? তার সঙ্গে গুরুদেব আর কর্কট দু-জনেই আছে।”
কৈটভ তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল, “তারা থেকেও কী হয়েছে? মেরে দিয়ে এলাম-তো পুলিশ অফিসার সিনহাকে। প্রায় সব্বাইকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে এসেছি। সিনহাকে যেভাবে মেরেছি রামানুজকে তার থেকে অধিক কষ্ট দিয়ে মারব।”
কৈটভের চোখে-মুখে প্রতিশোধের আগুন স্পষ্ট। বৃশ্চিক তবুও চেষ্টা করল, “তুমি এবার অতর্কিতে যে আঘাত হেনেছ তার জন্য ওরা প্রস্তুত ছিল না। কিন্তু এবার তারা প্রস্তুত থাকবে। তোমার কাছে যেসব অস্ত্র আছে সবগুলোর ব্যাপারে কর্কট সমস্ত কিছু জানে। সে সেইসব অস্ত্রের প্রতিকার করতে কয়েক মুহূর্ত সময় ব্যয় করবে মাত্র। ঠিক যেভাবে আমি মেল্টারোকে নিষ্ক্রিয় করে দিলাম।”
কৈটভ যুক্তি সাজায়, “আর মৃতকৈটভের প্রতিকার?”
বৃশ্চিক বোঝায়, “মৃতকৈটভ-কে তুমি এখনও তৈরি করছ। আপগ্রেড করছ আরও ভয়ংকরভাবে। কিন্তু সেটা এখনও সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত নয়। কৈটভ বাহিনীর মস্তক ছেদন করলে তারা বিনষ্ট হতে পারে। তার মানে তুমি এখনও সর্বশক্তিমান নও। মৃতকৈটভ-কে উন্নত করতে সময় লাগবে। অন্তত সেই সময়টা আমি তোমাকে অন্য সবকিছু থেকে সুরক্ষিত ও লোকচক্ষুর আড়ালে থাকতে সাহায্য করতে পারব।”
কৈটভ এখনও বুঝতে চাইছে না। সে বলে, “ব্রহ্মপদার্থ হাতে পেলেই জেগে উঠবে গন্দবেরুন্দা। টাইম-ট্রেকার ব্যবহার করে আমি সঠিক ব্রহ্মপদার্থের সন্ধান করবই।”
বৃশ্চিক বলল, “তাতে গন্দবেরুন্দা জেগে উঠবে। আর তুমি গন্দবেরুন্দার ওপরে নির্ভরশীল হবে। গন্দবেরুন্দাকে জাগাও। তাতে আপত্তি নেই। সেটাও তোমার শক্তি। কিন্তু তুমি নিজেও আগে স্বয়ংসম্পূর্ণ হও। আমি বলছি তোমার সর্বশক্তিমান হবার কথা। যখন তোমার আশেপাশে কেউ থাকবে না, তখনও তুমি সর্বশক্তিমান হয়ে থাকবে। মৃতকৈটভকেও তখন হয়তো এক লহমাতেই পরিণত করতে পারবে সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্রে। মৃতকৈটভকে আপগ্রেড করতে খুব বেশি সময় তোমার লাগবে না।”
বৃশ্চিক এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে থামল। কৈটভ তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। বৃশ্চিক এই চাহনির অর্থ বুঝতে পারল না। সে জিজ্ঞেস করল, “কিছু ভুল বললাম?”
কৈটভ মাথা নাড়ল।
“না, ভুল বলেননি। কিন্তু আমি একা সর্বশক্তিমান হব কীভাবে?” বৃশ্চিক এবার পরিতৃপ্তির হাসি হাসল। সাত কাণ্ড রামায়ণ পড়ানোর পর কৈটভ আসল প্রশ্নটাই করেছে। বৃশ্চিক দুই হাত ওপরে তুলে কলসের আকৃতি বানিয়ে বলল, “হলাহল বিষভাণ্ড খুঁজতে হবে।”
কৈটভের কপালে ভাঁজ পড়ল, “হলাহল বিষভাণ্ড?”
বৃশ্চিক জোরে হাসল, “কলিপুরুষের সৃষ্টি হবার আগে কৈটভকেই কলিপুরুষে রূপান্তরিত হতে হবে। এই সৃষ্টির চালিকাশক্তি তুমি নিজে হবে। কারও ওপরে আর নির্ভর করতে হবে না।”
বৃশ্চিক কথাটা বলার সময় অদ্ভুত মুখভঙ্গি করে। কৈটভ শুধু বারকয়েক উচ্চারণ করল—
“কলিপুরুষ… কলিপুরুষ? আমি কলিপুরুষ!”
