হলাহল বিষভাণ্ড – ১০
।। ১০।।
কলিযুগে ফিরে এল সবাই। এক প্রাচীণ অরণ্য। অরণ্যের যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে সবাই। অরণ্যে অবিরত একটা ঘণ্টাধ্বনি শোনা যাচ্ছে। আশেপাশে নিশ্চয়ই কোনো মন্দির আছে। এ যে পৃথিবীতেই অবস্থিত কোনো স্থান তা নিয়ে কেউ নিশ্চিত নয়! রামানুজ পকেট থেকে মোবাইল বের করল। নেটওয়ার্ক নেই। এটা যে অঞ্চলই হোক না কেন তাতে মোবাইল কাজ করছে না। ফলে বাকিদের ফোন করে নিজের অবস্থান জানানো সম্ভব নয়। বাকিরাও নিজের নিজের মোবাইল ব্যবহার করার চেষ্টা করে। কিন্তু কারও পক্ষেই সম্ভব হয় না।
গায়ের ধুলো ঝেড়ে সবাই উঠে দাঁড়ায়। অরণ্যের একেবারে উপরিভাগ থেকে একটা ইগল উড়ে যাচ্ছিল। ইগলের দৃষ্টি দিয়ে দেখলে বোঝা যাচ্ছে, একটা প্রাচীন মন্দিরকে ঘিরে রেখেছে এই অরণ্য। সে এক বিশালাকায় মন্দির। যেন কোনো এক গূঢ় রহস্য বুকে নিয়ে অবহেলায় দাঁড়িয়ে রয়েছে শতাব্দীর পর শতাব্দী। মন্দির গাত্রে শ্যাওলার পুরু আস্তরণ জমে থাকায় মন্দিরের আসল রং বোঝা যায় না বললেই চলে। আর মন্দিরের চারিদিকের গাছপালা শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে মন্দিরটিকে এমনভাবে ঢেকে রেখেছে যে খুব মন দিয়ে লক্ষ না-করলে বাইরে থেকে মন্দিরটির অস্তিত্ব বোঝা কষ্টসাধ্য কাজ।
এই মন্দিরের চারদিকেই অনতিদূরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে সবাই। কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছে না যদিও। শুধু বুদ্ধি করে ঘণ্টাধ্বনি শুনে এগিয়ে গেলে সবাই এক জায়গায় মিলিত হবে। অদৃশ্য-কৈটভ সবার আগে মন্দিরের উদ্দেশে রওনা দিল। বৃশ্চিক আর বিবস্বানও তাই করল। ক্লোন-কৈটভও নিজের অগ্রগতি জানান দিল চিৎকার করে। গুরুদেবের কষ্ট হচ্ছিল, যেহেতু এখন তাঁর পায়ে শেকল। রামানুজের দলও একই পথ অবলম্বন করল। সবাই নিজের নিজের মতো এগোতে লাগল। যত তারা এগোতে থাকল ততই ঘণ্টাধ্বনির শব্দ তীব্রতর হতে লাগল। সেই শব্দকে ব্রহ্ম হিসেবে জ্ঞান করেই পথ খুঁজতে লাগল সবাই। মাঝে মাঝে কেউ-না-কেউ একজন আর একজনের নাম ধরে ডাকছে।
“রামানুজদা।”
“দুর্গা।”
“দাসবাবু।”
“বিবস্বান।’
“বৃশ্চিক।”
“গুরুদেব।”
কৈটভকে সকলে এতই ভয় পায় যে তার আপনজন বলে কেউ নেই। সবাই জানে কেউ না-পৌঁছালেও কৈটভ সঠিক স্থানে ঠিক পৌঁছে যাবে। আর ঘটলও তাই। মন্দিরের সামনে ক্লোন-কৈটভ আর অদৃশ্য-কৈটভই সবার আগে পৌঁছাল। সেখানে পৌঁছে তারা যে দৃশ্য দেখল তাতে তাদের মতো ঠান্ডা মাথার শয়তানেরও চোখ বিস্ফারিত হল।
মহাবিষ্ণুর অবতার দাঁড়িয়ে আছেন মন্দিরের মাঝখানে। তাঁর পায়ের কাছেই রাখা আছে শেকলাবৃত হলাহল বিষভাণ্ড। শেকলে বাঁধা সেই বিষভাণ্ড থেকে গরম হলকা বেরোচ্ছে যেন। সেই বিষ এখন আয়তনে বেড়েছে। সেই বিষ রীতিমতো ফুটছে। মহাবিষ্ণুর অবতারের কটিদেশে শাড়ির ঝলকে মোহিনীকে মনে করায়। সেই মোহিনী যিনি দেবতাদের অমৃত পান করিয়েছিলেন। বিষ্ণুর মোহিনী রূপের ঝলকও রয়েছে এই অবতারের মধ্যে
কৈটভের পর এসে পৌঁছাল দুর্গা। কৈটভ সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না-করে এগিয়ে গেল হলাহল পান করতে। কিন্তু ক্লোন-কৈটভ মন্দিরের সিঁড়িতে পা রাখামাত্র সঙ্গে সঙ্গে গর্জনটা ভেসে এল। ক্লোন-কৈটভ সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে ট্রান্সপেরোমিটারে আবৃত করে নিল। ফলে সে স্বচ্ছ হয়ে গেল। এক অতিকায় বাঘ বেরিয়ে এল মন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে। তার গর্জনে পুরো অরণ্য কাঁপতে লাগল। সে তার সম্মুখভাগের পায়ের থাবায় জিভ বোলাচ্ছে। জিভের কাটাগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তার চোখে শুধু শিকারের নেশা। কৈটভ বাঘের সামনে দাঁড়িয়ে। তার পেছনে দুর্গা। বাঘটি এক লাফে কৈটভের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু কৈটভ ট্রান্সপারেন্ট অবস্থায় থাকায় বাঘ গিয়ে পড়ল দুর্গার সামনে। দুর্গা ভয় পেলেও নিজের রিফ্লেক্স ভুলে যায়নি। আশ্রমে প্রাপ্ত শিক্ষা কাজে লাগিয়ে চেষ্টা করল বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ করার। কিন্তু বাঘটি এতই বিশালাকার এবং শক্তিশালী যে, দুর্গা তার সঙ্গে পেরে উঠল না। তার গায়ে বাঘের থাবার দগদগে ক্ষত বাড়তে লাগল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে দুর্গা মাটিতে পড়ে ব্যথায় ছটফট করতে লাগল। চারদিক রক্তে ভরে গেল। বাঘ তার শিকারের ওপর শেষ থাবাটি মারতে উদ্যত হল। বাঘের খিদে পেয়েছে। জলজ্যান্ত মানুষকে সে খায়নি বহুকাল হয়েছে। ঠিক এমন মোক্ষম সময়ে রামানুজ এসে বাঘের ওপর লাফিয়ে পড়ল। ফরেস্টে বহুকাল কাটানোর ফলে বন্য প্রাণীদের সঙ্গে লড়াইয়ের একটা অভিজ্ঞতা তার আগেই ছিল। কিন্তু বাঘের সঙ্গে কোনোদিন মোকাবিলা হয়নি। আর অতিকায় এরকম কোনো প্রাণীর সঙ্গেও তো একেবারেই না। তবু নিজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাল সে।
বাঘের শক্তির সঙ্গে সাধারণ মানুষের পেরে ওঠার কথা নয়। তাই সে কিছু টেকনিকের সাহায্য নিল। কৈটভের এসবে মন নেই। সেস ইতিমধ্যে পৌঁছে গেল হলাহলের কাছে। তাকে আটকাবার কেউ নেই। ক্লোন-কৈটভ আগে শেকলগুলো ভাঙছে। এত অগুনতি শেকল লাগানো যে সেগুলো না-ভেঙে হলাহল পান করা সম্ভব নয়। চারদিকে শেকলের জাল। বাঘের সঙ্গে মহারণ লড়ছে রামানুজ। কিন্তু কোনোভাবেই পেরে উঠছে না। পেরে ওঠা সম্ভব নয়। রামানুজ ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। কাঞ্চন চলে এসেছে। কিন্তু তার পক্ষেও এই বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ সম্ভব নয়। সে চিৎকার করল, “রামানুজদা বাক্সের বৃদ্ধকে ডাকো।”
রামানুজ শুনতে পেল। কিন্তু বাঘকে কোনোক্রমে ঠেকিয়ে রাখার পাশাপাশি বাক্সকে ব্যবহার করা সম্ভব নয়। কিন্তু এটাও ঠিক যে তার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না এই যুদ্ধ। এ এক অসম যুদ্ধ। আর কিছুক্ষণ এভাবে চললে সে বাঘের হাতে নির্ঘাত মারা পড়বে। বাঘটা রামানুজের বাঁ হাত কামড়ে ধরল। রামানুজ আর্তনাদ করে উঠল। আর তখনই আগ্নেয়াস্ত্রের শব্দ হল। দাসবাবু গুলি চালিয়েছেন বাঘের ওপর। বাঘ গুলির আঘাতে ছিটকে পড়েছে। দাসবাবু দৌড়ে গেলেন রামানুজের দিকে।
“স্যার, স্যার? আপনি ঠিক আছেন?”
“আমি ঠিক আছি। আপনি আমাকে বাঁচিয়ে দিলেন এই যাত্রায়।”
“আরে এবার আমি বাঁচালাম, আগামিবার আপনি আমাকে বাঁচাবেন এভাবেই চলবে। নিন উঠুন।”
“ঠিক আছে। এখন ওদিকে গিয়ে তোমরা কৈটভকে আটকাও। আমি উঠতে পারছি না। তোমরা যাও তাড়াতাড়ি।”
বাঘটা তখনও রীতিমতো কাতরাচ্ছে। কৈটভ ভেঙে ফেলেছে বহু শেকল। বিবস্বান আর বৃশ্চিক সবেমাত্র পৌঁছেছে মন্দিরে। গুরুদেব এখনও আসেননি। তাঁর নিশ্চয়ই হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। কাঞ্চন আর দাসবাবু এগিয়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল কৈটভের ওপর। কিন্তু ট্রান্সপেরোমিটারের কারণে কৈটভকে কেউ ছুঁতেও পারল না। রামানুজ নিজে উঠতে না-পারলেও দুর্গার দিকে একটা টেস্টটিউব গড়িয়ে দিল।
“এটা কৈটভের ওপর ফেলো। তাতে ট্রান্সপেরোমিটার অকেজো হয়ে যাবে। কর্কট আমাকে এটা দেবার মুহূর্তে বলেছিলেন যে টেস্টটিউব যেন সরাসরি ট্রান্সপেরোমিটার যার ওপর ক্রিয়াশীল তার গায়েই ভাঙা হয়। তাড়াতাড়ি করো।”
দুর্গার সামনে এসে থেমেছে টেস্টটিউবটা। দুর্গা নিজেই ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়ে আছে। বাঘের আঁচড়ে ইতিমধ্যে রক্তপাত হয়েছে অনেক। তবু দেহের সমস্ত শক্তি একত্রিত করে উঠে দাঁড়ায় দুর্গা। এক মুহূর্ত দেরি না-করে টেস্টটিউবটা মাটি থেকে তুলে ক্লোন-কৈটভের দিকে দৌড়ায় সে। পথে একবার হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়, তবু টেস্টটিউবটা হাত থেকে ফেলে দেয় না। আবার উঠে দাঁড়ায়। ততক্ষণে বিবস্বান আর বৃশ্চিক, কাঞ্চন আর দাসবাবুকে ধরে ফেলেছে।
দুর্গা কালবিলম্ব না করে ক্লোন-কৈটভের গায়ে সরাসরি ছিটিয়ে দিল টেস্টটিউবের তরল। সঙ্গে সঙ্গে কৈটভ আবার সাধারণ রক্ত মাংসের মানুষ হয়ে গেল। স্বচ্ছতা দূর হয়ে গেল। দুর্গা এই কাজটি সেরে সেখানেই লুটিয়ে পড়ল। অদৃশ্য হয়ে আসল-কৈটভ সব দেখছিল। কিন্তু কোনো উচ্চবাচ্য করছিল না। চুপচাপ সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করছিল। ধূর্ত শেয়াল যেভাবে সময়ের জন্য অপেক্ষা করে সেভাবেই সে তক্কে তক্কে ছিল সঠিক সময়ের জন্য।
ট্রান্সপেরোমিটার অকেজো হয়ে গেলেও ক্লোন-কৈটভের উদ্যমে কোনো কমতি ছিল না। সে তার উদ্দেশ্যে অনড়। তার লক্ষ্য একমাত্র হলাহল বিষভাণ্ড। সেটা যতক্ষণ না করায়ত্ত হচ্ছে সে থামবে না।
দেখতে-দেখতে ক্লোন-কৈটভ অনায়াসেই হলাহলের কাছে পৌঁছে গেল। রামানুজ অসহায়ের মতো দেখছে সব। কিছুই করার নেই। রামানুজ শুধু ভাবছে কৈটভ যদি কোনোভাবে কলিপুরুষে রূপান্তরিত হয় তাহলে এই কলিযুগে ঠিক কী ঘটতে পারে? একটা যুগ সম্পূৰ্ণ হবার নির্দিষ্ট সময়ের আগে তার সংহারকের জন্ম হলে সৃষ্টির বিনাশ অবশ্যম্ভাবী। এবার কি সেটাই হতে চলেছে?
ক্লোন-কৈটভ হলাহল বিষভাণ্ডের কাছে পৌঁছে গেল। মহাবিষ্ণু মূর্তি স্বয়ং বসে আছেন সেখানে। তাঁর পায়ের কাছে টগবগিয়ে ফুটছে কলিপুরুষের ধাত্রী এই হলাহল বিষ। কৈটভ একটা পাত্র বের করল। এই পাত্র সেই পদার্থে তৈরি যে পদার্থ দিয়ে মেল্টারো ধারণ করার টেস্টটিউব তৈরি হয়। বৃশ্চিক তাকে এই পাত্রটি দিয়েছিল। সেই পাত্ৰ হলাহল বিষে পূর্ণ করতে লাগল। কিন্তু এই কাজ সে অতি সাবধানে করছে। সে জানে অর্ধনারীশ্বর মূর্তির সাবধানবাণী। এক ফোঁটাও যদি এখন মহাবিষ্ণু অবতারের ওপর পড়ে অনর্থ হয়ে যাবে। খুব ধীরেসুস্থে সে পাত্রে হলাহল নিচ্ছে। বৃশ্চিক আর বিবস্বান মিলে দাসবাবু আর কাঞ্চনকে রোখার চেষ্টা করছে। রীতিমতো হাতাহাতি হচ্ছে তাদের সঙ্গে। দুর্গা রক্তাক্ত অবস্থাতেও উঠে দাঁড়িয়েছে। দুর্গা ঝাঁপিয়ে পড়েছে তাদের ওপর। দুর্গার শারীরশিক্ষা পুরুষদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। তাই বিবস্বান আর বৃশ্চিক রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে দুর্গাদের সামলাতে। তবে দুর্গা যেহেতু বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ করে ক্লান্ত তাই তুলনামূলকভাবে দুর্বল।
রামানুজ কোনোক্রমে উঠে গুরুদেবের কাছে গেল। তার মুখের স্বয়ংক্রিয় বাঁধন খুলে দিল মেল্টারো ব্যবহার করে। বাঁধন গলে গেল মেল্টারোর প্রভাবে। ওদিকে দুর্গার কারণে এরকম এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হল যে বৃশ্চিক আর বিবস্বান দুজনেই দুর্গাকে আটকাতে লাগল। দুর্গার খেয়ালের জন্য কাঞ্চন রয়ে গেল। কিন্তু মুক্ত হয়ে গেলেন দাসবাবু। আর মুক্ত হয়েই মন্দিরের ভেতরে ছুটলেন। কৈটভ তখন হলাহল নিচ্ছে পাত্রে। এমন সময়ে দাসবাবু তাকে জাপটে ধরলেন। কৈটভের হাত গেল কেঁপে। আর তখনই পাত্র থেকে হলাহল ছলকে উঠল। ছিটকে পড়লও কয়েক ফোঁটা। আর গিয়ে পড়ল মহাবিষ্ণু মূর্তিতে। রামানুজ দূর থেকে দেখেই কপালে হাত দিল। অদৃশ্য-কৈটভও চিন্তায় পড়ল। চারদিকে এত দৌড়ঝাঁপ চলছে যে এটা হবারই ছিল। এবার কার জন্ম হবে? কী ঘটবে এই মন্দিরের গর্ভগৃহে?
কেউ কোনোকিছু ভাবার আগেই দড়াম করে একটা শব্দ হল। যে যেখানে ছিল চুপ করে দাঁড়িয়ে গেল। রামানুজ-সহ সবাই অপার বিস্ময়ে ওপরের দিকে তাকাল। পুরো মন্দির গাত্র ভীষণ জোরে কেঁপে উঠল যেন! এক বিশাল কম্পাঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে মন্দিরের ভিতরে।
মহাবিষ্ণু মূর্তিটি কাঁপছে। প্রথমে ধীরে ধীরে, তারপর রীতিমতো জোরে কম্পিত হচ্ছে মূর্তিটি। অল্প অল্প করে ফাটল ধরছে মূর্তির গায়ে। একসময় একেবারে সশব্দে ফেটে গেল মূর্তিটি। মাথাটা সবার প্রথমে ফাটল। যে যেখানে ছিল কয়েক পা পিছিয়ে এল। মহাবিষ্ণুর মাথাটা ভূ-পতিত হয়ে ভেঙে গেল। হলাহলের বিষের বিষবাষ্পের প্রভাবে সকলের চোখ-মুখ জ্বলছে। নেশাগ্রস্ত লাগছে। মূর্তিটি ভূ-পাতিত হওয়ায় আচমকাই ধুলোয় ঢেকে গেল চারদিক। সবাই চোখ ঢাকল। ঠিক এই সময়ে মস্তকহীন বাকি মূর্তিটা পদ্মফুলের মতো চারদিক দিয়ে ভাঙতে শুরু করল।
বিবস্বান চিৎকার করল, “বৃশ্চিক, কৈটভ পালাও। মূর্তি ভেঙে তোমাদের উপরে পড়বে।”
বৃশ্চিক ও কৈটভ তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে ঝাঁপ দিল। দাসবাবুও কাছেই ছিলেন। রামানুজ চিৎকার করল, “দাসবাবু, দূরে চলে আসুন।”
দুর্গা, কাঞ্চন, রামানুজ, গুরুদেব ইতিমধ্যে কিছুটা দূরেই ছিলেন। তবু যে যেখানে পারল দৌড়ে নিজের মাথাটা বাঁচাল। এত বিশাল মূর্তি ভেঙে মাথায় পড়লে কেউই বাঁচার কথা নয়। একটা বৃহদাকার কাঁটাওয়ালা লেজ সবার আগে বেরিয়ে এল সেই মূর্তির ভেতর থেকে। সকলেই দৌড়াচ্ছিলেন। রামানুজ আর গুরুদেব তফাতে ছিলেন বলে সমস্তটাই নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছিলেন। কাঁটাওয়ালা লেজটা সবার আগে এলোপাথাড়ি ছুটল চারিদিকে। আর তাতেই ঘটে গেল এক নিদারুণ অঘটন। লেজের তীক্ষ্ণ ফলা সোজা গিয়ে বিধল দাসবাবুর পিঠে। বেরিয়ে এল বুক দিয়ে। সেই লেজ দাসবাবুকে গেঁথে আবার পিছিয়ে গেল।
রামানুজ চিৎকার করে উঠল, “দাসবাবু।”
কিন্তু ততক্ষণে যা ঘটার ঘটে গেছে। দাসবাবু ছটফট করার সময় অবধি পেলেন না। তিনিও সিনহা সাহেবের মতো বুঝে উঠার আগেই ইহলোক ত্যাগ করলেন। একটু আগেই মানুষটা রামানুজকে বলেছিলেন যে তাঁর খারাপ অবস্থায় রামানুজ নিশ্চয়ই তাকে বাঁচাবেন। কিন্তু তাঁকে বাঁচাবার সময়টুকু রামানুজ পেল না। চোখের পলক পড়ার আগেই দাসবাবু নেই হয়ে গেলেন। রামানুজ দৌড়ে সেদিকে যেতে চাইল। গুরুদেব বাধা দিলেন, “এখন আবেগে কাজ করলে চলবে না। এই যুদ্ধে তোমার প্রয়োজন সর্বাধিক। অপেক্ষা করো।”
রামানুজ জিজ্ঞেস করল, “এ কী ধরনের জীব?”
গুরুদেব মাথা নাড়লেন, “জ্ঞানত এরকম কিছু আমি দেখিনি আগে।”
ওদিকে বৃশ্চিক বিবস্বানকে বলল, “আমি এই ভয়টাই পাচ্ছিলাম।”
বিবস্বান একটা থামের আড়ালে লুকিয়েছে, “প্ল্যান বি তৈরি আছে তো?”
বৃশ্চিকও থামের পেছনে লুকিয়ে পড়েছে। সে আশ্বস্ত করে বলল, “হ্যাঁ। এই কৈটভ আসল নয়, ক্লোন। আশা করছি ক্লোন-কৈটভ এই জীবকে রুখে দিতে সক্ষম হবে।”
ক্লোন-কৈটভ এভাবে পেছন ফিরে পালাতে চাইল না। সে একটু সময় দাঁড়িয়ে গেল। আর সেই লেজওয়ালা প্রাণীটির জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। ধীরে ধীরে সবাই দেখল তীক্ষ্ণ নখরযুক্ত বিশালাকার দুটো পা বেরিয়ে এল। তারপর ধীরে ধীরে ডিম ফুটে বাচ্চা হবার মতো মহাবিষ্ণু মূর্তির থেকে বেরোল এক ভয়ংকর জীব। তার নাম কেউ জানে না। সাধারণ মানুষের হাতের সাইজের যে নখর তার অঙ্গে বর্তমান তাতে মানুষ তো বটেই বাঘ ভাল্লুককেও চিরে ফেলা সম্ভব অনায়াসেই। সেই প্রাণীর মুখের অংশটি অদ্ভুত। ব্যাখ্যা করা যাবে না এত বীভৎস সেই মুখ। এ রাক্ষস না সরীসৃপ না কী তা এই মুহূর্তে কেউ ভেবে পেল না।
তার গর্জনে টেকা যাচ্ছিল না। কানের পর্দা ফেটে যাচ্ছে এত শব্দ। ক্লোন-কৈটভ এগিয়ে গেল। প্রাণীটি মন্দিরের গা ভেঙে এগিয়ে আসতে লাগল। ক্লোন-কৈটভ তার দেহের সমস্ত শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রাণীটির উপর। সেই রাক্ষস কৈটভকে প্রতিহত করার কথা ভাবেনি। ফলে ক্লোন-কৈটভ সজোরে তার পায়ের ওপর লাফিয়ে আঘাত করতে পারল। দেখে মনে হল না যে সেই প্রাণীর এতটুকু লেগেছে। প্রাণীটি ইতিউতি তাকাতে লাগল আর গর্জন করতে লাগল। কৈটভকে প্রাপ্য সম্মানটুকু পর্যন্ত দিল না।
রামানুজ নিজে ঠিকভাবে দাঁড়াতে পারছে না। গুরুদেব তার পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন। দুর্গা ও কাঞ্চন একদিকে লুকিয়ে রয়েছে। বিবস্বান আর বৃশ্চিকও লুকিয়ে পড়েছে স্তম্ভের পেছনে। অদৃশ্য কৈটভ সব দেখছে। এই মুহূর্তে প্রকট হবার প্রশ্ন তার মনে নেই। শুধু ক্লোন-কৈটভ প্রাণীটির সঙ্গে যুদ্ধ করার ব্যর্থ চেষ্টা করে চলেছে। ক্লোন-কৈটভ একটি টেস্টটিউব বের করল এবং তা ছিটিয়ে দিল পর্বতসম প্রাণীটির গায়ে। হিসেব মতো প্রাণীটির শরীর জ্বলে যাবার কথা। কিন্তু ছিটিয়ে দেবার বেশ কিছুটা সময় পরেও কিছুই হল না। প্রাণীটি মন্দিরের একদিক প্রায় ধসিয়ে দিল। এই মুহূর্তে কীভাবে হলাহল সংগ্রহ করে এই স্থান ত্যাগ করা উচিত তা কারও মাথায় আসছে না। মন্দির যদি আরও ধসে যায় সেক্ষেত্রে মন্দির সম্পূর্ণ মাথায় ভেঙে পড়বে। মন্দির ছেড়ে পালানো উচিত।
ক্লোন-কৈটভ একটি ভাঙা পাথরের বড়ো চাঁই তুলে ছুড়ে মারল প্রাণীটির দিকে। তা গিয়ে লাগল প্রাণীটির চোখের কাছে। এতে কিছুটা কাজ হল মনে হয়! অন্তত প্রাণীটি ক্লোন-কৈটভকে দেখতে পেল। প্রাণীটি দিগবিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে ধেয়ে এল ক্লোন-কৈটভের দিকে। কৈটভ এবার তৈরিই ছিল। প্রাণীটার মেরুদণ্ড খুবলে নেওয়ার চেষ্টায় লাফ দিল কৈটভ। প্রাণীটি তার তীক্ষ্ণ নখরযুক্ত হাতে কৈটভকে শূন্যতেই ধরে ফেলল। তারপর সবাইকে আশ্চর্য করে কৈটভকে দুই টুকরো করে ফেলে দিল। এক ভাগ পড়ল বৃশ্চিকের ওপরে, আর একভাগ পড়ল দুর্গাদের ওপরে। ক্লোন-কৈটভের এই পরিণতি দেখে উপস্থিত সকলে ভয়ে সিঁটিয়ে গেল। বিশেষত রামানুজরা এই ঘটনায় খুশি হবে নাকি দুঃখ পাবে তাই বুঝতে পারল না বেশ কিছুক্ষণ।
অদৃশ্য-কৈটভ এই ঘটনায় তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল। শত হোক তার ক্লোনকে কেউ এভাবে ছিঁড়ে ফেলে দেবে তা সে সহ্য করতে পারল না। কিন্তু তার মূল উদ্দেশ্য অনুযায়ী সে অদৃশ্যই থেকে গেল। রামানুজ বুঝল এই যাত্রায় বেঁচে ফিরতে হলে কার প্রয়োজন। সে সামনে পড়ে-থাকা একটি তীক্ষ্ণ পাথরে নিজের বাঁহাতের তর্জনী কেটে ফেলল। তারপর পকেট থেকে বের করল সেই বাক্স। বাক্সের ওপর কয়েক ফোঁটা রক্ত ফেলতেই বাক্সটি বড়ো হয়ে গেল। সেই বাক্স থেকে একটা টেস্টটিউব বের করে মাটিতে ফেলে ভেঙে দিল। আর তারপরেই সবাইকে আশ্বস্ত করতে সেখানে সৃষ্টি হল সেই অমিতশক্তিধর বৃদ্ধের, যার পীঠে রয়েছে অসংখ্য উপাঙ্গ।
রামানুজ আঙুল নির্দেশ করে প্রাণীটির দিকে দেখাল বৃদ্ধকে।
“এই প্রাণীটিকে হত্যা করো।”
প্রাণীটি এখন হলাহল বিষভাণ্ডের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। সে এই বিধ্বংসী বিষের রক্ষক। সময়ের আগে কলিপুরুষের সৃষ্টি সে হতে দেবে না। বৃদ্ধ এগিয়ে গেল প্রাণীটির দিকে। বৃদ্ধকে এগিয়ে আসতে দেখে প্রাণীটা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে দেখল। তারপর একটা বড়ো নিশ্বাস ত্যাগ করল বৃদ্ধের দিকে তাগ করে। বৃদ্ধ তৎক্ষণাৎ কয়েক হাত দূরে ছিটকে গিয়ে পড়ল। রামানুজ দেখল প্রাণীটির নিশ্বাসের সঙ্গে আগুন বেরোচ্ছে।
এই দৃশ্য দেখে রামানুজেরও মনে একটা ভয় ঢুকল। এবার কি হবে যদি এই বৃদ্ধ অবধি হেরে যায়? আর তো কিছুই বাকি নেই। হঠাৎ তার মনে পড়ল কর্কটের দেওয়া শঙ্খের কথা। সময় নষ্ট না-করে সে শঙ্খ বের করল। তাতে ফুৎকার দিল। কিন্তু কোনো শব্দ বেরোল না। পারিপার্শ্বিকের কম্পাঙ্ক আর শঙ্খের কম্পাঙ্ক সমান হচ্ছে না। এদিকে বৃদ্ধ কিন্তু কয়েক কদম পিছিয়ে গেলেও সজোরে লাফ দিয়ে ফিরে এল। নিজের তীক্ষ্ণ উপাঙ্গে ভর করে সোজা লাফ দিল প্রাণীটির গায়ে। এত জোরে আঘাত করল যে প্রাণীটি কয়েক কদম পিছিয়ে তো গেলই তীক্ষ্ণ উপাঙ্গের আঘাতে, ফালাফালাও হল তার শরীর। প্রাণীটি এই প্রথমবার হলাহল বিষভাণ্ড ফেলে বৃদ্ধের সঙ্গে সম্মুখ সমরে এল। শুরু হল এক মহাযুদ্ধ। কেউ কারও থেকে কম যায় না। দু-জনেই নিজেদের তীক্ষ্ণ অস্ত্রাদি যথা নখর ও উপাঙ্গ দিয়ে একে অপরকে ঘায়েল করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
রামানুজ গুরুদেবকে নিয়ে কোনোক্রমে দুর্গা আর কাঞ্চনের কাছে পৌঁছেছে। কাঞ্চন জিজ্ঞেস করল, “এখন কী করা যায় রামানুজদা?”
রামানুজ বলল, “আমাদের এবারের অভিযান কিন্তু সফল। কারণ কৈটভ আর নেই। কৈটভ ছাড়া কলিপুরুষ হবার মতো কেউই নেই আর। সুতরাং এবার সময়চক্রযানে চড়ে আমাদের এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়া উচিত।
দুর্গা জিজ্ঞেস করল, “বিবস্বান এবং বৃশ্চিককে নিয়ে কী করা উচিত? ওদের কি আমরা এভাবেই ছেড়ে দেব!”
রামানুজ বলল, “কৈটভ জীবিত না-থাকলে ওরা কখনও আমাদের কাছে থ্রেট নয়।”
গুরুদেবের স্মৃতি নষ্ট করা হয়েছে। তবু গুরুদেবের মনে হচ্ছিল এমন কিছু কথা এই মুহূর্তে তাঁর বলা দরকার যা তিনি মনে করতে পারছেন না। রামানুজ গুরুদেবকে জিজ্ঞেস করল, “তাহলে আমরা সময়চক্রযানকে আহ্বান করি গুরুদেব? আমাদের হাতে খুব বেশি সময় নেই। পবন কুমার প্রদত্ত সময়চক্রযান একটি নির্দিষ্ট কালের পর আর কাজ করবে না। আমরা যেহেতু যুগান্তরে যাত্রা করেছি তাই অতি অল্প সময়ের মধ্যেই অনেকটা সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। এবার যথা সময়ে যথাস্থানে ফেরা আশু প্রয়োজন।”
কাঞ্চন এরই মধ্যে একবার জিজ্ঞেস করল, “আর দাসবাবু?”
রামানুজ তাকাল সেই প্রাণীটার দিকে। সে এখনও বৃদ্ধ মানুষটির সঙ্গে যুদ্ধ করে চলেছে। কিন্তু তার লেজে এখনও গেঁথে আছেন দাসবাবু।
“দাসবাবুর আত্মার শান্তি কামনা করি। আমি পারলাম না আপনাকে বাঁচাতে। বন্ধুদের বাঁচাতে আমি বারবার ব্যর্থ হয়েছি।”
রামানুজের চোখ জলে ভিজে ওঠে। বাকিদেরও তাই। কাঞ্চন তার পিঠে হাত রাখে। চোখের জল মুছে রামানুজ জানায়, “হলাহল দিয়ে আমরা কী করব? থাকুক এখানেই। এখানে উপস্থিত অন্য কেউ হলাহল গ্রহণ তো দূর ছুঁয়ে টিকে থাকতেও পারবে না। প্রকৃত কলিপুরুষ সৃষ্টিতে হলাহল প্রয়োজন হবে। আর এই দুটো জীব এখানে লড়াই করুক।”
গুরুদেব বললেন, “বিবস্বান আর বৃশ্চিক যদি আবার ফিরে আসে?”
রামানুজ বলল, “তারা ফিরে আসলে আমরাও প্রস্তুত থাকব। কৈটভ যখন নেই তখন এদের নিয়ে আমি চিন্তার কিছু দেখছি না।”
গুরুদেবেরও মনে হল এই সময়ে এখানে থাকা নিরর্থক। বরং এখানে থাকলেই প্রাণহানির সম্ভাবনা বেশি। তিনি বললেন, “বেশ। সময়চক্রযানকে আহ্বান করো।”
রামানুজ সময়চক্রযানকে আহ্বান করল টেস্টটিউবের তরলের মাধ্যমে। সময়চক্রযান উপস্থিত হল। একে একে সকলে তার ভেতর ঢুকলেন। রামানুজ নিজেও ঢুকে গেল এর ভেতরে। বিবস্বান আর বৃশ্চিক এই ঘটনা দেখেও নিরুত্তাপ থাকল। ওরা তো চায়ই যে বাকি সবাই চলে যাক। তাহলে তাদের কাজে সুবিধা হবে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে একটা কাণ্ড ঘটল। বৃদ্ধকে এত জোরে ধাক্কা দিল প্রাণীটি যে সে উড়ে গিয়ে ধাক্কা খেল হলাহল বিষভাণ্ডের সঙ্গে। এত প্রবল জোরে ধাক্কা খাওয়ার পর বিষভাণ্ডে থাকা বিষ ছলকে উঠল। ভাণ্ডটিও নিজের জায়গা থেকে স্থানচ্যুত হল। অধিকাংশ বিষ ছড়িয়ে গেল মন্দিরের মেঝেতে। শেষমেষ নড়তে নড়তে ভাণ্ডটিও এক মুহূর্তে উলটে পড়ল মন্দিরের মেঝেতে।
এতক্ষণ ধরে অদৃশ্য-কৈটভ যে কাঙ্খিত বস্তুর জন্য অপেক্ষা করছিল সেই বস্তুর এরকম পরিণতিতে হাউহাউ করে উঠল তার মন! তাকে যে কলিপুরুষ হতেই হবে। এক্ষুনি পান করতে হবে এই অমূল্য হলাহল বিষ। নইলে এত ভীষণ যুদ্ধের পরিণাম যে শূন্য হয়ে যায়। সমস্ত পরিশ্রম বিফলে যাবে। কৈটভ আর অদৃশ্য থাকতে পারল না। সে তার আসল রূপে ফিরে এল এবং হলাহল যেখানে পড়েছে সেই দিকে দৌড় লাগাল। ইতিমধ্যে হলাহল মেঝেতে পড়ে চারদিক ধোঁয়া ধোঁয়া হয়ে গেছে। মেঝেতে যেখানে লাগছে সেখানটাই পুড়ে যাচ্ছে এতই তার তেজ। উপস্থিত সবার চোখ জ্বলছে।
কাঞ্চনই প্রথম কৈটভকে দৌড়োতে দেখল। সে আর্তনাদ করে উঠল, “রামানুজদা, কৈটভ? ওই দ্যাখো। সে বেঁচে আছে।”
রামানুজ-সহ বাকি সকলে দেখল কৈটভ দৌড়োচ্ছে।
“এটা কীভাবে সম্ভব?”
রামানুজ এর ব্যাখ্যা পেল না। দৃশ্যটি গুরুদেবের নজরেও পড়েছে। গুরুদেবের মস্তিষ্কে এক আলোড়ন চলছে। আর তখনই গুরুদেবের স্মৃতি অল্প অল্প ফিরে আসতে শুরু করেছে যেন। তিনি বললেন, “আগেরটা ক্লোন ছিল। বৃশ্চিকের আবিষ্কার। আসল-কৈটভ এটাই।
আমার আবছা আবছা মনে পড়ছে। ওরা সম্ভবত আমার ওপর কোনো আবিষ্কারের ব্যবহার করে আমাকে এসব ভুলিয়ে দিয়েছিল। সম্ভবত এই মেডিসিনের প্রকোপ কমে আসছে বলেই আমি আস্তে আস্তে মনে করতে পারছি সব।”
রামানুজ কালবিলম্ব না-করে সময়চক্রযান থেকে বেরিয়ে এল।
ততক্ষণে সময়চক্রযান তার যাত্রার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছে। গুরুদেব আর্তনাদ করলেন, “ফিরে এসো রামানুজ। তুমি একা পারবে না।” কাঞ্চন আর দুর্গা চিৎকার করে উঠল, “দাদা? যেয়ো না। চলে এসো।”
রামানুজ সোজা এক দৌড় লাগাল। যাবার সময় শঙ্খটা ছুঁড়ে দিল কাঞ্চনদের লক্ষ করে।
“উপায়ান্তর দেখলে শঙ্খটা বাজাস।”
রামানুজ ওদের দিকে না-তাকিয়েই কথাটা বলল দৌড়োতে দৌড়োতে। রামানুজ দেখতেও পেল না যে শঙ্খটা কাঞ্চনের হাতে পৌঁছায়নি। রামানুজের রোখ চেপেছে। এত পরিশ্রমের পর কৈটভকে এখন আটকাতেই হবে। ওদিকে কাঞ্চন সময়চক্রযান থেকে বেরোবার চেষ্টা করল শঙ্খটা ভূমি থেকে তুলে নেবার জন্য।। কিন্তু সেই চেষ্টা পূরণ হবার আগেই সময়চক্রযান সবাইকে নিয়ে অন্তর্হিত হল।
পুরোনো ভাঙা মন্দিরে একদল শত্রু, লোভী-কৈটভ আর এক নাম-না-জানা হিংস্র প্রাণীর মধ্যে ঘিরে একা কুম্ভ আগলে রয়ে গেল রামানুজ। রামানুজের কাছে কোনো অস্ত্র নেই, শস্ত্র নেই। তবু রামানুজের এই সত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই সততাকে অস্ত্র করে জারি থাকল।
একদিকে কৈটভ দৌড়াচ্ছে হলাহলের দিকে, অন্যদিকে রামানুজ দৌড়াচ্ছে কৈটভের দিকে। চারদিক হলাহল বিষের বিষাক্ত ধোঁয়ায় পরিপূর্ণ। পায়ের তলায় যেখানে যেখানে হলাহল লাগছে সেখানে তৎক্ষণাৎ পুড়ে যাচ্ছে। প্রাণী দুটো এখনও লড়াই করেই চলেছে। বিবস্বান আর বৃশ্চিক হলাহলের প্রকোপে অচৈতন্য প্রায়। রামানুজ কৈটভকে ধাক্কা দিল। দুজনে ছিটকে গিয়ে পড়ল হলাহল বিষের ওপর। দু-জনের শরীরে বিষ লাগল। বিষে মাখামাখি হল শরীর। দু-জনের মুখে বিষ ঢুকল প্রায় সমপরিমানে। দু-জনেই সংজ্ঞা হারাল। দুইদিকে পড়ে রইল কৈটভ আর রামানুজ। মাঝখানে উলটে পড়ে আছে হলাহল বিষভাণ্ড।
এবার দেখা যাক কে কলিপুরুষে পরিণত হয়? রামানুজ নাকি কৈটভ!
* * * * *
মন্দিরের বাইরে সূর্য অস্ত যেতে আর খুব বেশি সময় বাকি নেই। গোধুলি লগ্ন উপস্থিত। যে জঙ্গলটা এতক্ষণ ধরে আপাত নিরীহ ছিল সেই জঙ্গলের গাছগুলো ধীরে ধীরে নড়াচড়া করতে শুরু করেছে। এই জঙ্গলে প্রবেশ করা ইস্তক কোনো বন্যপ্রাণী দেখা যায়নি। কারণ এই জঙ্গলের গাছগুলো মাংসাশী। দিনের বেলায় সাধারণ গাছের মতো হলেও রাতের বেলায় গাছগুলো মাংসাশী গাছে পরিণত হয়। যদি তিনটি অস্ত্রের সমন্বয়ে ওরা না-পৌঁছাত তাহলে এই জায়গার হদিশ কখনোই পেত না। আর যদিও-বা পেত, তাহলে এই বিশাল ঘন জঙ্গলের ঠিক মাঝখানে মন্দিরের কাছে আসার আগেই কোনো এক রাতের বেলায় গাছের শিকারে পরিণত হত।
বাইরে যেখানে গাছগুলো মাংসাশী গাছে পরিণত হচ্ছে সেখানে মন্দিরের ভেতরের দৃশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। দুটো প্রাণী এতক্ষণে হলাহলের মারাত্মক প্রভাবে অচৈতন্য। ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কিছু মানুষ। তারাও মৃতপ্রায়। শুধু কৈটভ আর রামানুজ হলাহলের প্রভাব নিজেদের শরীরে নিতে পেরেছে। তাদের গায়ে গোল গোল চাক চাক দানার সৃষ্টি হচ্ছে। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে কলিপুরুষের গুণাবলি বিকশিত হচ্ছে। কিন্তু দু-জনের মধ্যে একজনই হতে পারবে কলিপুরুষ। এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে আর বিশেষ দেরি নেই।
চারদিক বিষাক্ত ধোঁয়ায় পরিপূর্ণ। সাধারণ মানুষ ধোঁয়ায় বাঁচতে পারবে না। বিবস্বান আর বৃশ্চিক নিজেদের গোলকে আবদ্ধ করেও এই ধোঁয়া থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারেনি। হলাহলের তেজ এতই বেশি যে গলে গেছে তাদের আত্মরক্ষাকারী গোলক। এরকম এক অন্ধকারাচ্ছন্ন গোধূলি লগ্নে হঠাৎ মন্দিরের গর্ভগৃহ আলোয় পরিপূর্ণ হতে লাগল। সমস্ত অন্ধকারকে দূর করে একটি উজ্জ্বল চক্রের আবির্ভাব হল। চক্রটি লম্বালম্বি ঘুরছে। সেই চক্রের ভেতর থেকে একটি উজ্জ্বল পথের সৃষ্টি হল। সেই চক্রের অন্তস্থল থেকে ধীরে ধীরে আবির্ভূত হলেন এক দিব্য পুরুষ। দিব্য পুরুষ মন্দিরে পা ফেলা মাত্র হলাহলের তীব্রতা, ঝাঁঝালো গন্ধ আর ধোঁয়া প্রশমিত হল। তিনি চারদিকের পরিস্থিতি জরিপ করলেন। ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে কিছু মানুষ। এই মানুষদের তিনি চেনেন। কুরুক্ষেত্রে দূর থেকে দেখেছিলেন।
দিব্য পুরুষ দেখলেন মাটিতে পড়ে আছে একটা শঙ্খ। মুখে স্মিত হাস্য নিয়ে তিনি এগিয়ে গেলেন শঙ্খটির কাছে। যত্ন সহকারে তুললেন শঙ্খটিকে। শঙ্খ তাঁর বড্ড প্রিয়। পেছনে এখনও চক্রটি ঘুরছে। মন্দিরজুড়ে আলোর রোশনাই। হলাহল বিষভাণ্ডটি পড়ে আছে মেঝেতে। দু-দিকে দুই কলিপুরুষের জন্ম হচ্ছে। কলির রাক্ষস কলিপুরুষ। যুগের নিয়ম বিঘ্নিত হয়েছে। কালের বিনাশ অবশ্যম্ভাবী রূপ ধারণ করছে। বিনাশ রুখতে হলে অন্তত একজনের কলিপুরুষ হওয়া আটকাতে হবে।
দণ্ড দেবার আগে তিনি প্রত্যেকটা মানব সন্তানকে ক্ষমা করলেন। তারপর এই কাহিনির পরবর্তী সূত্র নির্মাণে উদ্যোগী হলেন। নিজের ডান হাত ওপরে তুললেন। ঘূর্ণায়মান চক্রটি ধীরে ধীরে তাঁর কছে সরে আসতে লাগল। চক্র বেষ্টিত আলোক জ্যোতি ঘিরে ধরল তাঁকে। চক্র এসে অধিষ্ঠান করল হাতে। কক্ষের তাপমাত্রার পারদ বাড়তে লাগল। মন্দির গাত্রে কম্পনের সৃষ্টি হল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে তিনি কর্কট নির্মিত শঙ্খে দিলেন ফুৎকার। শঙ্খ আগে অনেকবারের চেষ্টাতেও ধ্বনির সৃষ্টি করেনি। কিন্তু এইবার শঙ্খধ্বনি হল। গমগম করে উঠল মন্দির চত্বর।
শ্রীকৃষ্ণ যেন রণক্ষেত্রে পাঞ্চজন্যে ফুৎকার দিচ্ছেন। মৃতকৈটভের কাহিনি ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে কলিপুরুষ পর্বে। শ্রীকৃষ্ণ তাঁর সুদর্শন চক্রটির একটি অংশ রেখে যাবেন এই যুগে। সভ্যতার বিনাশ রুখতে হলে খুঁজতে হবে সেই অংশ। ধীরে ধীরে জেগে উঠছে কৈটভ। সে আর মানুষ নয়। সে রাক্ষস। তার সঙ্গে মৃতকৈটভ রয়েছে। যোগ হচ্ছে অমিতশক্তিধর বহু অস্ত্রাদি।
ধীরে ধীরে জাগছে রামানুজ। সে-ও আর মানুষ নয়— কলির রাক্ষসে পরিণত হচ্ছে সে। শঙ্খনাদই পারে তাকে আবার মনুষ্যরূপে ফিরিয়ে আনতে। আজকের ঘটনা অনেক প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। রামানুজ কে? কীভাবে হলাহলের তীব্রতা সে সহ্য করতে পারল? এই উত্তর শ্রী কৃষ্ণ জানেন। তাই শঙ্খের নিরাময়ী শক্তিকে আহ্বান করেছেন
এই মন্দিরের উদ্দেশ্য সমাধা হয়েছে। বাইরে অরণ্য সম্পূর্ণ মাংসাশী গাছে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। আর কিছু মুহূর্তেই এই মন্দির ধ্বংস হয়ে পাতালে আশ্রয় নেবে। ধূলিসাৎ হবে মন্দির পুরী। শ্রীকৃষ্ণ মন্দিরের বাইরে এক কোণে বসলেন। কোমর থেকে বের করলেন তাঁর প্রিয় বাঁশি। বাজাতে শুরু করলেন প্রিয় সুর।
মৃতকৈটভ পর্বের পরিসমাপ্তি ঘটল। শুরু হতে চলল কলিপুরুষ পর্বের।
মন্দিরটি অল্প সময়ের মধ্যেই ধূলিসাৎ হয়ে গেল। জন্ম হল দুই রাক্ষসের। দুই কলিপুরুষ।
***
