হলাহল বিষভাণ্ড – ৮
।। ৮।।
‘পরিস্ফুটায়বর্ধনম সময় অতিশত ― হলাহল বিষভাণ্ড’
উদ্ভবলিঙ্গের অরণ্যে একটি ফুলের ওপর পবন কুমারের দেওয়া তরল ফেলতেই ফুলটি ধীরে ধীরে একটি চৌকো সময়চক্রযানে পরিবর্তিত হতে থাকে। রামানুজ, বিবস্বান, দুর্গা, কাঞ্চন, দাসবাবু অপেক্ষা করতে থাকেন। সময়চক্রযান সম্পূর্ণ হতেই সকলে এর ভেতরে প্রবেশ করলেন। তারপর রামানুজ পাঠ করলে মন্ত্র।
‘পরিস্ফুটায়বর্ধনম সময় অতিশত ― হলাহল বিষভাণ্ড”
মুহূর্তের মধ্যে যেন ঘূর্ণি ঝড় উঠল। সময়চক্রযান সবাইকে নিয়ে অদৃশ্য হল। প্রায় একই সময়ে খাদান থেকে কৈটভ, ক্লোন-কৈটভ, বৃশ্চিক আর গুরুদেব রওনা দিলেন। সময়চক্রযানে উঠার আগে বৃশ্চিক গুরুদেবকে একটা কাচের গ্লাস এগিয়ে দিলেন। তাতে একপ্রকার তরল ছিল।
“এটা পান করুন।”
গুরুদেব জিজ্ঞেস করলেন, “কী আছে এতে?”
বৃশ্চিক তাচ্ছিল্য ভরে বলল, “সেটা বলতে আমি বাধ্য নই। তবে আপনি পান করতে বাধ্য।”
গুরুদেব উপায়ান্তর না-দেখে সেটা পান করলেন। বৃশ্চিক কৈটভের কাছে গিয়ে ফিশফিশ করে বলল, “এ ক-দিন খাদানে যা যা ঘটেছে তা গুরুদেব সচক্ষে দেখেছিলেন। ক্লোন-কৈটভের রহস্য শত্রুদের বলে দিতে পারতেন। তাই সেই স্মৃতি মুছে দিলাম।”
গুরুদেব তরল পান করার পর নিজের মধ্যে কোনো পরিবর্তন বাহ্যিকভাবে দেখতে পেলেন না। তিনি জানতেও পারলেন না এই তরলের ক্রিয়ায় তাঁর মস্তিষ্ক থেকে ধীরে ধীরে বিগত নয়দিনের স্মৃতি মুছে যাচ্ছে। কৈটভ কর্কটের গবেষণাগার লব্ধ টেস্টটিউব ভেঙে সময়চক্রযানকে আহ্বান করল। গুহামুখ উপস্থিত হলে তাতে সকলে চড়ে বসলেন। তারপর সময়চক্রযান তাদের নিয়ে রওনা হয়ে গেল নিরুদ্দেশের পথে। হলাহল বিষভাণ্ডের খোঁজ শুরু হল।
প্রথমে যথাস্থানে পৌছোল রামানুজের দল। সময়চক্রযান যখন সবাইকে উন্মুক্ত করল জমিতে তখন চারদিকে বরফের শীতলতা। এ যে কোন্ যুগ বোঝা যাচ্ছে না। ঠান্ডায় সকলেই কাঁপছে। একটি নদীর ধারে অবতরণ করেছে তারা। নদীর জলের রং কালো। কাঞ্চন ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে জিজ্ঞেস করল, “এবার কোথায় যাব দাদা?”
রামানুজ বিবস্বানকে নির্দেশ দিল, “ঠাকুরদার দেওয়া টেস্টটিউবটি ব্যবহার করো।”
বিবস্বান মাথা নাড়ল। তারপর ঠাকুরদার দেওয়া টেস্টটিউবটি ভেঙে ফেলল। সবাইকে বলল, “আপনারা চোখ বন্ধ করে শুধু হলাহল বিষভাণ্ডের কথা ভাবুন।”
সবাই চোখ বন্ধ করে একাগ্র চিত্তে সমুদ্রমন্থনে প্রাপ্ত হলাহল বিষভাণ্ডের কথা ভাবতে লাগল। কিছু সময়ের মধ্যে ঠান্ডাটা কম অনুভূত হতে লাগল। সবার আগে দাসবাবু চোখ খুললেন, “আরে, এ কোথায় এসে পৌঁছেছি আমরা?”
সবাই চোখ মেলে তাকাল। একটি পুরোনো মন্দির। চারদিকে ঝুল কালি লেগে আছে। মাঝে জ্বলছে একটি অগ্নিকুণ্ড। সবাই এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল। একটা গুমোটভাব রয়েছে এই জায়গাটাতে। এরকম জায়গায় বিপদের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
“সবাই সচকিত থেকো। যে-কোনো সময় যা-কিছু ঘটতে পারে। আমি ভালো আভাস পাচ্ছি না। সবাই একত্র হয়ে থাকো।”
মন্দিরের গায়ে চারদিকে একটা অদ্ভুত শিল্পরীতির কাজ। রামানুজ বলল, “দক্ষিণের হয়শালা শিল্পরীতির বহু বহু আগে এই শিল্প রীতিতে এখানে কাজ হয়েছিল। ভাবা যায়!”
সকলেই মন্দিরের গায়ের কাজ দেখে মুগ্ধ। দাসবাবু এতই মুগ্ধ যে মন্দিরের স্তম্ভের গায়ে হাত দিয়ে দেখছিলেন। বিবস্বানের চোখে পড়তেই সে আঁতকে উঠল, “মন্দিরের গায়ে হাত দেবেন না। আমরা জানি না এখানে কী আছে? হয়তো মন্দিরে হাত দেওয়াটাই মন্দিরের প্রহরীর জন্য বিপদঘণ্টা।”
বিবস্বান কথাটা শেষও করতে পারল না। সারা মন্দির যেন কেঁপে উঠল। যে অগ্নিকুণ্ডে এতক্ষণ আগুন জ্বলছিল সেই অগ্নিকুণ্ডের আগুন গেল নিভে। আগুনের প্রকোষ্ঠ বন্ধ হয়ে খুলে গেল এক নতুন প্রকোষ্ঠ। কেউই এই ঘটনার আকস্মিকতায় সামলে উঠার সময় পেল না। কারণ এবার তাদের চোখের সামনে যা ঘটল তা যেরকম অপ্রত্যাশিত তেমনি ভয়াবহ। নিভে আসা অগ্নিকুণ্ড থেকে কুণ্ডলি পাকিয়ে এক ভয়ানক আকারের সাপ বেরিয়ে আসছে। ঘটনাটা চোখের নিমেষে ঘটে গেল। যে যেখানে আছে সেখানে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কী করা উচিত ঠাহর করার আগেই সাপটি প্রকোষ্ঠ থেকে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হল। তার লেজের আঘাতে দাসবাবু আর কাঞ্চন প্রথমেই পড়ে গেল। রামানুজ আগু পিছু কিছু না-ভেবে লাফ দিল সাপের মাথা বরাবর। বিবস্বান আর দুর্গা চেষ্টা করল সাপের লেজ ধরার। কিন্তু সাপটি এত জোরে লেজ আছড়াচ্ছিল যে কারওর পক্ষেই কাবু করা সম্ভব হচ্ছিল না। উপরন্তু সাপটি মাথা এরকমভাবে ঝাঁকাল যে রামানুজ সোজা গিয়ে ধাক্কা খেল মন্দিরের স্তম্ভের গায়ে। সাপটি সামনে পেল দাসবাবুকে। বিশাল মুখটি খুলে সর্পিলাকারে এগিয়ে যেতে লাগল তার দিকে। দাসবাবু ভয়ে সিঁটিয়ে গেলেন। তাঁর পকেটে থাকা আগ্নেয়াস্ত্রটির ব্যবহার করতেও তিনি ভুলে গেলেন। সকলেই এত জোরে চারদিকে ছিটকে পড়েছে যে কেউ যে গিয়ে তাঁকে রক্ষা করবে সেই অবস্থায় কেউ নেই। রামানুজ নিজে হাঁপাচ্ছে। আর কয়েক মুহূর্ত। সাপটি গিলে নেবে দাসবাবুকে। দাসবাবু প্রায় মূর্ছা যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে তিনি মাটিতে বসে পড়েছেন। ভয়ে পালাবার ক্ষমতাও হারিয়েছেন তিনি। বিবস্বান রামানুজকে বলল, “শঙ্খে ফুৎকার দিন। তাড়াতাড়ি করুন।”
রামানুজ কালবিলম্ব না-করে নিজের ঝোলা থেকে শঙ্খটি বের করল। তাতে ফুৎকার দিল। কিন্তু শব্দ বেরোল না। রামানুজ আবার চেষ্টা করতে অল্প শব্দ বেরোল ঠিকই কিন্তু তাতে কোনো কাজ হল না। আর তখনই রামানুজের এই মোক্ষম সময়ে মনে পড়ল কর্কটের দেওয়া বাক্সের কথা। কালবিলম্ব না-করে সে তার পকেট থেকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বাক্সটি খুঁজে বের করল। তারপর সামনে পড়ে থাকা সূঁচালো পাথর দিয়ে নিজের হাত কেটে বাক্সের উপর কয়েক ফোঁটা রক্ত ফেলল। মুহূর্তের মধ্যে বাক্সটি বড়ো হয়ে গেল। সেই বাক্স খুলে তার থেকে একটি টেস্টটিউব বের করল রামানুজ। সেই টেস্টটিউব মন্দিরের মেঝেতে আছড়ে ভেঙে ফেলল সে। আর তক্ষুনি মন্দির ধোঁয়ায় ভরে উঠল। একটা ঝাঁঝালো গন্ধ নাকে এল।
বিশালাকার সাপ তখন ইতিমধ্যে দাসবাবুকে জড়িয়ে ফেলেছে কুণ্ডলিতে। তিনি শ্বাস নিতে পারছেন না। আর একটু জোরে কুণ্ডলি কষলেই হাড়গোড় ভেঙে যাবে। দাসবাবু ব্যথায় আর্তনাদ করছেন। ঠিক এমনি সময় আবির্ভাব হল এক বৃদ্ধের। টেস্টটিউব ভাঙতেই তিনি আবির্ভূত হয়েছেন। তাঁর পিঠে অজস্র মজবুত উপাঙ্গ, ঠিক যেমন মাকড়সার থাকে। কিন্তু এগুলো অত্যন্ত তীক্ষ্ণ এবং ধাতব। কালবিলম্ব না-করে সেই বৃদ্ধ ডিগবাজি খেয়ে সাপের ওপরে গিয়ে পড়লেন। কুণ্ডলী থেকে দাসবাবুকে মুক্ত করতে কয়েক মুহূর্ত লাগল মাত্র। তারপর তাঁর পিঠে থাকা তীক্ষ্ণ উপাঙ্গ শলাকায় সাপটাকে বিদ্ধ করে শলাকাগুলোকে বড়ো করতে লাগলেন। তাতে শলাকা সাপকে বিদ্ধ তো করলই উপরন্তু সাপকে ছিঁড়ে ফেলে দিল কয়েক টুকরো করে। শেষ হল একটা আতঙ্ক। নিহত হল মন্দিরের প্রহরী।
নিজের কাজ শেষ করার পর সেই বৃদ্ধ এগিয়ে এলেন রামানুজের কাছে। “আমার প্রথম কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। শত্রুর বিনাশ করেছি। আর মাত্র দু-বার আমি আসতে পারব। এখন আমি আসি।”
রামানুজ কোনো প্রশ্ন করার আগেই তিনি ধোঁয়ায় মিলিয়ে গেলেন। কর্কট যে এক অমিত শক্তির অধিকারীকেই তার হাতে দিয়ে গেছেন তাতে আর কোনো সন্দেহ রইল না।
“দাসবাবু আপনি ঠিক আছেন তো?”
বিবস্বান এগিয়ে ধরেছে তাকে। কোনোক্রমে উঠে বসলেন তিনি। এখনও কাশির দমকে শরীর কাঁপছে তাঁর। তারপর বললেন, “সাপের মুখের ভেতরটা দেখছিলাম। কী নোংরারে বাবা! এর ভেতর দিয়ে ওর পেটে যেতে হবে ভেবেই অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিলাম।”
দাসবাবুর রসবোধে সবার মুখে হাসি ফুটল। কিন্তু সেই হাসি স্থায়িত্ব পেল না। অগ্নিকুণ্ডের প্রকোষ্ঠে আবার শব্দ হল। সকলে এবার পিছিয়ে গেল। আবার কোনো কিছু বেরোচ্ছে নাকি? নতুন প্রকোষ্ঠ থেমে ধীরে ধীরে আবির্ভূত হল এক অর্ধনারীশ্বর মূর্তি। রং তাদের সবুজ। গাছগাছালির শেকড়ে পূর্ণ তাঁদের শরীর। মুখে এক স্মিত হাস্য।
“ভয় নেই। আমরা তোমাদের ক্ষতি করব না। মন্দিরের প্রহরী যখন নিহত তখন আমাদের আর কিছুই করার নেই। তোমরা কী জানতে চাও বলো। আমি তোমাদের দিক প্ৰদৰ্শক।”
রামানুজ সাহস পেল। সে এগিয়ে এল। তারপর বলল, “হলাহল বিষভাণ্ডের খোঁজ চাই।”
অর্ধনারীশ্বর মূর্তি বললেন, “সেই পথ অতি দুর্গম। সেই পথে সাধারণ মানুষ যেতে পারবে না। সুতরাং সেখানে স্বাভাবিক পথ অতিক্রম করে পৌঁছানো যাবে না।
রামানুজ এবার হাতজোড় করল, “কোনো একটা উপায় দিন আমাদের। সৃষ্টিকে রক্ষা করতে হলে সেখানে আমাদের পৌঁছাতেই হবে।”
অর্ধনারীশ্বর মূর্তি কিছু সময় মৌনব্রত ধারণ করলেন। তারপর বললেন, “একটা উপায় আছে। কিন্তু তা করতে গেলে সময়চক্রের নিয়ম ভাঙতে হবে। যাত্রা করতে হবে সময়চক্রযানে।”
রামানুজ তড়িঘড়ি বলল, “আমাদের কাছে সেই যান আছে।”
অর্ধনারীশ্বর হাসলেন, “সেই যান না-থাকলে তো এখানেই পৌঁছাতে পারতে না। কিন্তু এবার যে শুধু সময়ের নয়, যুগের যাত্রা করতে হবে। অতীত আর ভবিষ্যতে যাওয়া এক বিষয়। এবার যেতে হবে অন্য যুগে। এখনও তোমরা আছ কলিযুগেই। একই যুগের বিভিন্ন সময়ে যাওয়া আসা করতে পেরেছ। কলি থেকে দ্বাপর আর ত্রেতা-তে যেতে পারবে কি?”
রামানুজ-সহ উপস্থিত বাকি সকলের চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেল। কী বলছেন অর্ধনারীশ্বর মূর্তি। যুগচক্রযান? বিবস্বান এগিয়ে এল। হাতজোড় করে বলল, “পারব। আমাদের কাছে সময়চক্রযানের পাশাপাশি যে-কোনো জায়গায় যাবার ফর্মূলা রয়েছে। দুটোকে মিশিয়ে দিলে আমার ধারণা আমরা যুগচক্রযান সৃষ্টি করতে পারব।”
অর্ধনারীশ্বর বললেন, “যদি যুগচক্রযান তোমাদের কাছে থেকে থাকে সেক্ষেত্রে একটা উপায় আছে।”
বিবস্বান জিজ্ঞেস করল, “কী সেই উপায়?”
অর্ধনারীশ্বর বললেন, “তিনটি অস্ত্রের টুকরো তোমাদের সংগ্রহ করতে হবে।”
রামানুজ ধন্দে পড়ল, “তিনটি অস্ত্রের টুকরো? কোন্ অস্ত্র।”
অর্ধনারীশ্বর বললেন, “হ্যাঁ। একায়ি বাণ, অঞ্জলিক অস্ত্র এবং ব্ৰহ্মাস্ত্র।”
মুখ হাঁ হয়ে গেল উপস্থিত সকলের। অর্ধনারীশ্বর উপস্থিত হবার পর থেকে যা যা বলেছেন সবই ভীষণ রকম অসম্ভব কথা
“আমরা ঠিক বুঝতে পারছি না। আমাদের বুঝিয়ে দিক নির্দেশ করুন। দয়া করুন।” বিবস্বান করুণ স্বরে বলল।
অর্ধনারীশ্বর বললেন, “দ্বাপর যুগে একাঘ্নি বাণের ব্যবহার করা হয় কুরুক্ষেত্রের চৌদ্দোতম দিনে।”
যুদ্ধের চৌদ্দোতম দিনে ঘটোৎকচ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সকালের যুদ্ধের সময়, অশ্বত্থামা যখন তাঁর পরাক্রমশালী পুত্র অঞ্জনপর্বকে হত্যা করেন তখন তিনি ক্রোধান্বিত হন। তাঁর জাদুকরী শক্তি ব্যবহার করে, তার মায়াশক্তি ব্যবহার করে কৌরব সেনাবাহিনীর উপর ব্যাপক বিপর্যয় ডেকে আনে। এমনকি দ্রোণ, দুর্যোধন, কর্ণ এবং দুঃশাসনের মতো মহান যোদ্ধাদেরও ভয় দেখান। অশ্বত্থামা পালিয়ে যাওয়া সৈন্যদের একত্রিত করার চেষ্টা করেন, ঘটোৎকচের মায়া দূর করেন, এবং রাক্ষসকে অজ্ঞান করে দেন। জ্ঞান ফিরে আসার পর, ঘটোৎকচ অশ্বত্থামার সঙ্গে দীর্ঘ দ্বন্দ্বযুদ্ধে লিপ্ত হন। যুদ্ধের সময়, উভয় যোদ্ধা তাঁদের জাদুকরি শক্তি এবং স্বর্গীয় অস্ত্র ব্যবহার করেন, যদিও অশ্বত্থামা তাঁর অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হন এবং ঘটোৎকচকে পিছু হটতে বাধ্য করেন।
চৌদ্দোতম দিনে জয়দ্রথের মৃত্যুর পর, সূর্যাস্তের পরেও যুদ্ধ চলতে থাকে, ঘটোৎকচ সত্যিই উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন— তাঁর শক্তি রাতে সবচেয়ে কার্যকর ছিল কারণ রাতে রাক্ষসদের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ঘটোৎকচ তার সৈন্যদের সঙ্গে অলৌধ এবং অলম্বুষকে হত্যা করেন। গদা দিয়ে অলম্বুষের মাথা ভেঙে দেন। ঘটোৎকচের তাণ্ডব চলতে থাকে যুদ্ধক্ষেত্রে। অশ্বত্থামা এবং ঘটোৎকচের মধ্যে আর একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। অশ্বত্থামা একাধিকবার ঘটোৎকচকে পরাজিত করতে সক্ষম হন, কিন্তু শক্তিশালী রাক্ষস তাঁর মোহ ব্যবহার করে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। অন্যদিকে, কর্ণ কিছু কঠিন যুদ্ধের পর যুদ্ধক্ষেত্রে দু-বার ঘটোৎকচকে পরাজিত করেন কিন্তু তবুও ঘটোৎকচকে কৌরব সেনাবাহিনীর ওপর ধ্বংসযজ্ঞ চালানো থেকে বিরত রাখতে অক্ষম হন। সেনাবাহিনী যখন তাকে ঘিরে ফেলে, এমনকি দুর্যোধনও তার পতাকা ছিন্ন করে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন, তখন কর্ণ শেষ পর্যন্ত শক্তিশালী রাক্ষসকে হত্যা করার জন্য শেষ অবলম্বন হিসেবে ইন্দ্র প্রদত্ত একাঘ্নি বাণ বা বাসবী শক্তিকে ব্যবহার করেন। এই অস্ত্রটি ভগবান ইন্দ্র প্রদত্ত করেছিলেন এবং শুধুমাত্র একবার ব্যবহার করা যেতে পারে। কর্ণ অর্জুনের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য এটি সংরক্ষিত করে রেখেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ তাই ঘটোৎকচকে কর্ণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে বলেছিলেন যাতে অর্জুন একাঘ্নি বাণের প্রকোপ থেকে বাঁচতে পারেন। সেই একাঘ্নি বাণের অংশ বা টুকরো তোমরা খুঁজে পাবে কুরুক্ষেত্রে। সেটা সংগ্রহ করতে হবে।
অর্ধনারীশ্বর থামলেন। সকলেই থ হয়ে শুনছে তাঁর কথা। কারও মুখে শব্দ ফুটছে না। দুর্গা-ই এবার প্রথম কথা বলল, “তার মানে আমাদের মহাভারতের সময়ে যেতে হবে?”
অর্ধনারীশ্বর স্মিত হেসে জানালেন, “হ্যাঁ, দ্বাপর যুগে।”
দুর্গা জিজ্ঞেস করল, “তারপর?”
অর্ধনারীশ্বর বললেন, “কুরুক্ষেত্রে গেলে’পর দুটো অস্ত্রের টুকরো সংগ্রহ করা সম্ভব। অঞ্জলিক অস্ত্রের প্রয়োগ হয় এর কয়েকদিন পরেই।”
কাঞ্চন সোৎসাহে বলে ওঠে, “কর্ণের মৃত্যু।”
অর্ধনারীশ্বর বললেন, “সঠিক। অর্জুনের বিরুদ্ধে কর্ণের শেষ যুদ্ধে কর্ণের পরাজয়ের বহু কারণ একত্রিত হয়েছিল। তাঁর রথ কাদায় আটকে গিয়েছিল। তিনি ব্রহ্মাস্ত্র ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পরশুরামের অভিশাপের কারণে তিনি এটি কীভাবে ব্যবহার করতে হবে তা ভুলে গিয়েছিলেন। ঘটোৎকচের ওপর ইন্দ্র প্রদত্ত একাি ব্যবহার করার কারণে তাঁর কাছে বাসবী অস্ত্র বা একাঘ্নি বাণ ছিল না। চাকা ঠিক করতে নেমে তিনি অর্জুনকে যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। তবে কৃষ্ণ অর্জুনকে আক্রমণ চালিয়ে যেতে রাজি করান এই বলে যে অভিমন্যুর বিরুদ্ধে আক্রমণের সময় কর্ণ যুদ্ধের নিয়ম ও শিষ্টাচার ভঙ্গ করেছেন।
যুদ্ধের সপ্তদশ দিনে দুই শত্রু মুখোমুখি হয়েছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রের যোদ্ধা এবং স্বর্গের দেবতারা এই মহান যোদ্ধাদের শক্তি ও দক্ষতা দেখে নির্বাক বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। ভীতসন্ত্রস্তভাবে যুদ্ধটি সবাই দেখছিলেন। কর্ণ বহুবার অর্জুনের ধনুকের সুতো কেটে ফেলেছিলেন। যুদ্ধ তীব্রতর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, অর্জুন তিরের শক্তিতে কর্ণের রথকে প্রতিবার ১০ পা পেছনে ঠেলে দিতেন, কিন্তু কৰ্ণ অর্জুনের রথকে মাত্র দুই পা পেছনে ঠেলে দিতে সক্ষম হন। এই দেখে শ্রী কৃষ্ণ কর্ণের প্রশংসা করেন এবং কর্ণের দক্ষতার প্রশংসা করেন। অর্জুনের জিজ্ঞাসাবাদে কৃষ্ণ বলেন, কোনো মানুষের পক্ষে তাঁর রথ পেছনে ঠেলে দেওয়া অসম্ভব, কারণ অর্জুনের রথের পতাকায় হনুমান এবং সারথী হিসেবে কৃষ্ণ উভয়ই রয়েছেন। তাই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমগ্র ভার ধরে রাখা এই রথে। এমনকি এই রথকে দুই পা পেছনে ঠেলে দেওয়াও একটি অসম্ভব কাজ ছিল।
মহাকাব্যে বলা হয়েছে যে, প্রথমে এই যুদ্ধ দুই শত্রুর মধ্যে সমানে সমানে ছিল। কিন্তু তারপর কর্ণের রথের চাকা কাদায় আটকে যায়, যা আগে একজন ব্রাহ্মণের কাছ থেকে পাওয়া অভিশাপের ফলে ঘটে। তিনি নিজেকে রক্ষা করেছিলেন, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তিনি ব্রহ্মাস্ত্র প্রার্থনার মন্ত্র ভুলে গিয়েছিলেন, যা তাঁর গুরু পরশুরামের অভিশাপের ফলে হয়েছিল। কর্ণ তাঁর রথ থেকে নেমে ঢাকা মুক্ত করার উদ্দেশ্যে অর্জুনকে যুদ্ধ থামাতে বললেন। অর্জুনকে যুদ্ধের শিষ্টাচারের কথা মনে করিয়ে দিলেন। কিন্তু কৃষ্ণ অর্জুনকে কর্ণের নিষ্ঠুরতার কথা মনে করিয়ে দিলেন – দ্রৌপদীর অপমান এবং তাঁর পুত্র অভিমন্যুর মৃত্যু। ক্রোধে উত্তেজিত অর্জুন কর্ণের ওপর আক্রমণ করলেন যখন তিনি তাঁর গেঁথে যাওয়া রথের চাকা তুলতে চেষ্টা করছিলেন। কর্ণ নিজেকে রক্ষা করলেন এবং রুদ্রাস্ত্র প্রার্থনা করলেন, অর্জুনের বুকে আঘাত করলেন। অর্জুন অজ্ঞান হবার আগে গাণ্ডীবের তাঁর আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করলেন, যা প্রথমবারের মতো তাঁর হাত থেকে পড়ে গেল। যুদ্ধের নিয়ম অনুসরণ করে, কর্ণ অজ্ঞান অর্জুনকে হত্যা করার চেষ্টা করেননি বরং তাঁর রথের চাকা কাদা থেকে বের করার জন্য সময় ব্যয় করার চেষ্টা করেছিলেন।
কিছু সময় পর অর্জুন সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং অঞ্জলিক অস্ত্র ব্যবহার করে অস্ত্রহীন কর্ণের শিরশ্ছেদ করেন, যিনি তখনও গেঁথে যাওয়া রথের চাকাটি তোলার চেষ্টা করছিলেন। যদিও যুদ্ধের নিয়ম অনুসারে অস্ত্রহীন যোদ্ধাকে আক্রমণ করা বা পেছন থেকে শত্রুকে আক্রমণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল, তবুও কৃষ্ণের পরামর্শ অনুসারে অর্জুন পেছন থেকে কর্ণকে আক্রমণ করেন এবং তাঁকে হত্যা করেন। সেই অঞ্জলিক অস্ত্রের ভাঙা অংশ তোমাদের খুঁজতে হবে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে।”
রামানুজ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর বলল, “আর ব্রহ্মাস্ত্র? মহাভারতে তো বহুবার ব্যবহার করা হয়েছে। সেখান থেকেই কি সেটার অংশ সংগ্রহ করতে হবে?”
অর্ধনারীশ্বর বললেন, “না। মহাভারতের ব্রহ্মাস্ত্র ব্যবহার হলেও আমাদের হলাহল বিষভাণ্ডের জন্য প্রয়োজনীয় ব্রহ্মাস্ত্রের টুকরো রয়েছে ত্রেতাযুগে।”
দাসবাবু কপালে হাত ঠেকালেন, “জয় শ্রী রাম।”
অর্ধনারীশ্বর বললেন, “রামায়ণে রয়েছে এই ব্রহ্মাস্ত্র। প্ৰয়োগ করেছিলেন শ্রী রামের ভাই লক্ষ্মণ।”
রামানুজ ভ্রু কোঁচকায়, “লক্ষ্মণ?”
অর্ধনারীশ্বর বললেন, “লক্ষ্মণ ব্রহ্মাস্ত্র চালাতে পারতেন। সেটা তিনি যুদ্ধে চালিয়েওছিলেন।”
বিবস্বান বলল, “আমাদের সেই কাহিনি বলুন। তাহলে ব্রহ্মাস্ত্র-র অংশ সংগ্রহ করতে আমাদের সাহায্য হবে।”
অর্ধনারীশ্বর বললেন, “অতিকায় ছিলেন রাক্ষসরাজ রাবণের অন্যতম পুত্র। অতিকায়ের মাতার নাম ধান্যমালিনী। ইনি রাবণের ন্যায় বলশালী। তিনি বয়স্কদের শ্রদ্ধা করেন, শ্রুতিধর এবং অস্ত্রচালনায় অত্যন্ত পারদর্শী। ইনি সাম, দাম ও ভেদ বিষয়ক রাজনীতি ও প্রয়োজনে মন্ত্রণাদানেও সুদক্ষ ছিলেন। তাঁর দেহ অতি বিশাল। বিভীষণের বর্ণনায়, “বিন্ধ্যাচল, অস্তাচল ও মহেন্দ্রপর্বতের মতো বিশাল তাঁর শরীর; অপ্রমেয় দেহ, অতিরথ; অতিবীর’। অতিকায় এবং তাঁর খুল্লতাঁত কুম্ভকর্ণ অসুরদ্বয় মধু কৈটভেরই পুণর্জন্ম বলে বিশ্বাস করা হয়।
যশ্চৈব বিন্ধ্যাস্তমহেন্দ্ৰকল্পো।
ধন্বী রথোস্থো তিরথো’তিবীর।
বিস্ফরয়ংশ্চাপমতুল্যমানং।
নাম্নাতিকায়ো তিবৃদ্ধকায়ো।।
তাঁর দেহ অতি বিশাল বলেই তাঁর নাম অতিকায়। মহামতি অতিকায় সুবিজ্ঞ, অস্ত্রবিদ্যায় সুনিপুণ, মায়াবিশারদ। তিনি কঠোর তপস্যা দ্বারা ব্রহ্মার আরাধনা করে বিবিধ অস্ত্রলাভ করেন। যার দ্বারা তিনি বহু শত্রু পরাজিত করেছেন। ভগবান ব্রহ্মা এনাকে দেব-অসুরের অবধ্য হবার বরও দিয়েছেন এবং যুদ্ধে ব্যবহার্থে দিব্য কবচ ও সূর্যের মতো দীপ্তিমান রথ দিয়েছেন। অতিকায় কর্তৃক দেব-দানবদের বহু বীর পরাজিত হয়েছেন। তিনি ঘোড়া বা হাতির পিঠে চড়ে যে-কোনো অস্ত্ৰ নিপুণভাবে অনায়াসে চালনা করতে পারতেন। অতিকায় যুদ্ধক্ষেত্রে শরজাল দিয়ে ইন্দ্রকে পরাজিত করেছেন। বরুণদেবের পাশকে প্রতিহত করেছেন। রামায়ণে অতিকায়কে দেব-দানবের দর্পনাশক বলা হয়েছে। তিনি অন্তরীক্ষে বিচরণ করতে পারতেন। মায়াযুদ্ধেও তিনি কৌশলী। দেবতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তিনি পিতামহ সুমালীকে সাহায্য করেছেন।
মহাবলী পিতৃব্য কুম্ভকর্ণের মৃত্যুতে শোকাতুর অতিকায় ত্রিশিরার বাক্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে ভ্রাতাদের সঙ্গে যুদ্ধযাত্রা করেন। নানা অলংকারে ভূষিত হয়ে, ব্রহ্মা প্রদত্ত দিব্য কবচ ও রথে আরোহণ করে রণক্ষেত্রে আসেন তিনি। কালমেঘের ন্যায় শব্দায়মান, পর্বতের মতো রথস্থ ধনুর্ধারী অতিকায়কে দেখে রামচন্দ্র বিস্মিত হয়ে বিভীষণের কাছে তাঁর পরিচয় জানতে চেয়েছিলেন। সিংহের মতো তাঁর চোখ। একহাজার ঘোড়া তাঁর রথ টানে; শান দেওয়া ত্রিশূল, সুতীক্ষ্ণ তরবারি, মুষল, মুদগর প্রভৃতি অস্ত্ররাজি পরিবেষ্টিত হয়ে তাঁকে দেখাচ্ছে যেন মহাদেব ভূতলে নেমে এসেছেন। রংধনু যেমন আকাশকে শোভিত করে, তেমনি তাঁর ধনুকগুলো তাঁর রথকে শোভিত করছে। যে দুইটি উজ্জ্বল খড়্গ তাঁর দুইপাশে রয়েছে তার হাতল চার হাত, সুতরাং তরবারির দৈর্ঘ্য হবে দশ হাত। তাঁর কণ্ঠে রক্তবর্ণের মালা। যাঁর মুখ যমের মতো, তাঁকে দেখে বানরেরা ভয়ে কম্পমান।
মৈন্দ, দ্বিবিধ, কুমুদ, নীল ও শরভ প্রভৃতি বানরগণ তাঁর হাতে পরাজিত হওয়ার পর লক্ষ্মণ তাঁকে যুদ্ধে আহ্বান করেন। অতঃপর লক্ষ্মণ ও অতিকায়ের মধ্যে ভীষণ সংগ্রাম হয়। যখন অনেক চেষ্টাতেও অতিকায়কে বধ করা যাচ্ছে না, তখন পবনদেব সহসা আবির্ভূত হয়ে লক্ষ্মণকে অতিকায় বধার্থে ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করতে বললেন। তখন লক্ষ্মণ ধনুকে ব্রহ্মাস্ত্র যোজনা করে অতিকায়ের ওপর প্রয়োগ করলেন। ব্রহ্মাস্ত্রের আঘাতে অতিকায়ের মস্তক ছিন্ন হয়ে গেল। হিমালয়শৃঙ্গের মতো সেই মস্তক ভূমিতে পতিত হল।”
কাহিনি শেষ করলেন অর্ধনারীশ্বর। দুর্গা হাতজোড় করে জিজ্ঞেস করল, “তাহলে যেখানে অতিকায়ের মাথা পতিত হয়েছিল সেখানে নিশ্চয়ই আমরা ব্রহ্মাস্ত্রের অংশ খুঁজে পাব!”
অর্ধনারীশ্বর বললেন, “তোমরা সেই তিনটি টুকরো খুঁজে পেলে তাদের পাশাপাশি রাখবে। একটা তীব্র বিস্ফোরণ ঘটবে। তারপর তোমরা সেই মন্দিরে উপস্থিত হবে যেখানে শ্রী বিষ্ণু স্বয়ং রক্ষা করে রেখেছেন হলাহল বিষ।”
রামানুজ জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু মহাদেব সেই বিষ পান করেছিলেন। শ্রী বিষ্ণু রক্ষা করছেন কেন?”
অর্ধনারীশ্বর স্মিত হাস্যে বললেন, “শ্রী বিষ্ণু যেমন মোহিনীর বেশে দেবতাদের অমৃত পান করিয়েছিলেন তেমনি কলিপুরুষকেও পান করাবেন বিষ। পালনকর্তা তিনি। সবাইকে পালন করেন।”
রামানুজ অর্ধনারীশ্বরকে প্রণাম করল। তারপর সে জিজ্ঞেস করে, “যদি কোনো অনিষ্টকারী শক্তি এসে আপনার থেকে সাহায্য প্রার্থনা করে তবে কি আপনি তাদেরও সাহায্য করবেন?”
অর্ধনারীশ্বর মূর্তি বলেন, “আমার কাজই হচ্ছে সবাইকে সাহায্য করা। মন্দিরের প্রহরী আর নেই। ফলে যে-ই আসবে, আমি তাকে সাহায্য করব।”
সকলেই অর্ধনারীশ্বরকে প্রণাম করল। অর্ধনারীশ্বর অন্তর্হিত হবার আগে বললেন, “খেয়াল রেখো। হলাহলের ছিটেফোঁটাও যেন বিষ্ণুর গায়ে না পড়ে। তাহলে অনর্থ হয়ে যাবে।”
অর্ধনারীশ্বর মূর্তি অন্তর্হিত হলেন। তিনি যে জায়গায় অধিষ্ঠান করছিলেন সেখানে কেবল শ্বেত শুভ্র ফুল পড়ে রইল। রামানুজ সেখান থেকে একটি ফুল তুলে প্রণাম করল। তারপর সেই ফুল এগিয়ে দিল বিবস্বানের দিকে। বিবস্বান সেই ফুল সামনে এক বেদিতে রাখল। তারপর সেই ফুলের ওপর একইসঙ্গে দুই ধরনের তরল ঢালল। প্রথম তরল যা কর্কটের বলিদানে উৎপন্ন হয়েছে। দ্বিতীয় তরল যা কর্কট যত্রতত্র গমনের জন্য দিয়ে গেছিলেন। দুই তরল মিলিত হবার পর মন্দিরে এক প্রবল ঘূর্ণিঝড় উঠল। তাপমাত্রার পারদ হুহু করে বাড়তে লাগল। টিকে থাকা সম্ভব হচ্ছিল না এরকম প্রবল ঝড় উঠল। আর তারপর দেখা দিল এক অতিকায় যান। যুগচক্রযান। ইগলের মুখাকৃতির মতো প্রকোষ্ঠ। দুইদিকে ঈগলের ডানার মতো সুবৃহৎ ডানা। যুগচক্রযান উপস্থিত হয়েছে।
বিবস্বানের মুখ ফুটে বেরোল, “যুগচক্রযান। রামানুজ আমরা পেরেছি। ঠাকুরদা সফল হয়েছেন।”
রামানুজ-সহ বাকিরা মুগ্ধ হয়ে দেখছিল। বিবস্বান আবার ডাকল, “রামানুজ! রামানুজ!
রামানুজের সংবিৎ ফিরল।
“হ্যাঁ হ্যাঁ। কী অসাধারণ দেখতে এই যুগচক্রযান!”
বিবস্বান জিজ্ঞেস করল, “আগে কোথায় যাবে?”
রামানুজ বলল, “দ্বাপরে দুটো অস্ত্র রয়েছে। আগে সেখানেই চলো।”
সকলে মিলে উঠে পড়ল যুগচক্রযানে।
“সবাই শ্রীকৃষ্ণের কথা ভাবুন। মহাভারতের কথা ভাবুন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের কথা ভাবুন।”
সকলেই চিন্তা করতে লাগল মহাভারতের সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের কথা। আবার ঝড় উঠল মন্দিরে। বাড়ল তাপমাত্রা। ধূলিঝড়ের মাঝেই যুগচক্রযান সকলকে নিয়ে রওনা দিল দ্বাপর যুগে।
*****
এই ঘটনা ঘটার কিছুক্ষণ পর সময়চক্রযানে চড়ে ক্লোন-কৈটভ-সহ বৃশ্চিক, গুরুদেব, অদৃশ্যরূপে প্রকৃত-কৈটভ এসে পৌঁছোল এই মন্দিরে। প্রকৃত-কৈটভ অদৃশ্য হয়ে দলের সঙ্গেই আছে। কোনো উচ্চবাচ্য করছে না। এরকমভাবে রয়েছে যেন সে নেই। শুধুই নিরীক্ষণ করা তার কাজ। সিদ্ধান্ত নেবে বৃশ্চিক। বৃশ্চিকের সঙ্গে মাঝে মাঝে সংযোগ স্থাপন করবে সে। অপ্রয়োজনীয় কথা সে বলতে যায় না। বৃশ্চিক মন্দিরে এসে দেখল মন্দিরের মৃত প্রহরীকে। বিশালাকার সাপের এহেন অবস্থা দেখে বৃশ্চিক বলল, “ভালোই প্রস্তুতি নিয়েছে রামানুজ আর কর্কট।”
অদৃশ্য থেকেই কৈটভ বলল, “তাতেও কিচ্ছু করতে পারবে না আমার। আমি মহাশক্তিমান কৈটভ।”
গুরুদেব কথাটা শুনে হাসলেন। এই তাচ্ছিল্যের হাসিতে মাথায় আগুন জ্বলে উঠল কৈটভের। যাত্রাপথে একবারের জন্যেও মুখ খোলেনি সে। কিন্তু গুরুদেবের এই হাসি তার সহ্য হল না।
“হাসবেন না গুরুদেব। তা হলে আমি হয়তো ভুলে যাব যে আপনি একদা আমার গুরুদেব ছিলেন।”
গুরুদেব আবার হাসলেন, “তুই আমার কিছুই করতে পারবি না রে। কিছুই করতে পারবি না।”
বৃশ্চিক জানে কৈটভ রেগে গেলে কী হতে পারে। সমস্ত পরিকল্পনা শেষ করে ফেলতে পারে কৈটভের ভুল পদক্ষেপ। বৃশ্চিক অগ্নিকুণ্ডের কাছে দাঁড়িয়ে তাঁদের বচসাতে বাধা দিল, “আপনার কী করা হবে সেটা আপনি দেখবেন পরে। আপাতত আমাদের হলাহলের সন্ধান চাই।”
ঠিক এই সময়েই অগ্নিকুণ্ড নিভে গেল। আর ঘরঘর শব্দ করে আর একটা প্রকোষ্ঠ খুলে গেল। বৃশ্চিক দুই কদম পিছিয়ে গেল। সেই প্রকোষ্ঠ থেকে আবির্ভূত হলেন অর্ধনারীশ্বর মূর্তি। তারপর কৈটভের দলও অর্ধনারীশ্বরের মাধ্যমে জানতে পারল হলাহল বিষভাণ্ডের ঠিকানা। জানতে পারল সেখানে পৌঁছাতে তিনটি অস্ত্র যথা একাি বাণ, অঞ্জলিকা অস্ত্র এবং ব্রহ্মাস্ত্রের টুকরো প্রয়োজন। অর্ধনারীশ্বর সমস্ত তথ্য জানিয়ে অদৃশ্য হলেন। বৃশ্চিক তার সময়চক্রযানের সঙ্গে মেশাল ক্লোন-কৈটভ সৃষ্ট তরল। তাদের জন্যেও তৈরি হল যুগচক্রযান। তবে এই যান রামানুজদের সৃষ্ট যানের চেয়ে অধিক শক্তিশালী। অনেক কম সময়ে এই যান পৌঁছে দিতে পারে উদ্দিষ্ট যুগে। এই যুগচক্রযান ও দেখতে ইগলের মতো। পার্থক্য শুধু একটাই। এই যুগচক্রযানের রং কালো।
অদৃশ্য কৈটভ জানাল, “আগে ত্রেতা যুগে যাব আমরা। আমার ধারণা ওরা আগে দ্বাপরে গেছে। যেহেতু ওখানে দুটো অস্ত্র আছে। আমরা ত্রেতায় গেলে মহামূল্যবান ব্রহ্মাস্ত্রের অংশের জন্য আমাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকবে ওরা। আর সেটা নিতে এলেই আমরা ছিনিয়ে নেব তাদের প্রাপ্ত দুটো অস্ত্রের ভগ্নাংশ।”
বলেই বিচ্ছিরি হাসল কৈটভ। বৃশ্চিক কৈটভের নির্দেশ পালন করল। যুগচক্রযান সবাইকে নিয়ে ত্রেতা যুগে রওনা দিতে উদ্যত হল। আর তখনই ঘটনাটা ঘটল। মন্দিরের নিহত প্রহরী বিশালাকার সর্প এক পক্ষকাল পর পুনরায় জীবন ফিরে পেল। এক পক্ষকালের অধিক তার মৃত্যু স্থায়ী নয়। বৃশ্চিক চিৎকার করল, “গুরুদেব উঠুন যুগচক্রযানে। এই সৰ্প বেঁচে উঠছে। যুগচক্রযান বিনষ্ট করতে এ একাই যথেষ্ট। আপনি নিজেও প্রাণে বাঁচবেন না।”
গুরুদেব স্মিত হাস্যে দাঁড়িয়ে রইলেন বাইরে। যেন তাঁর কোনো তাড়া নেই। এদিকে বিশালাকার সাপটি প্রাণ ফিরে পেয়েই দেখল এতগুলো অনুপ্রবেশকারীকে। মন্দিরের পাহারাদার তার কাজে উদ্যত হল। ক্লোন-কৈটভ চোখের নিমেষে গুরুদেবকে কাঁধে তুলে নিল। তারপর যুগচক্রযানের ভেতরে নিয়ে ফেলে দিল। বৃশ্চিক আর কালবিলম্ব না-করে যুগচক্রযান চালু করল। বিশালাকার সর্প তড়িৎগতিতে যুগচক্রযানের ওপর আঘাত করার শেষ মুহূর্তে অন্তর্হিত হল যুগচক্রযান। ব্যর্থ হল মন্দিরের প্রহরী।
পুনরায় মন্দিরের পাহারায় ন্যস্ত রইল এই প্রহরী।
