মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ১০
দশ
মিহির যেখান থেকে আবার হাঁটা শুরু করেছে সেখান থেকে রাস্তার আলোগুলো সব ক-টা নিভে গেছে। এই সুচিভেদ্য অন্ধকারেও কুকুরগুলো বড্ড জ্বালাচ্ছে। শালাদের চোখে ঘুম নেই। ইচ্ছে করছে প্রত্যেকটার টুটি টিপে গলা থেকে ছিঁড়ে ফেলুক মুণ্ডুটাকে। নিকষ আঁধারে খানাখন্দ, ইট-পাথর টপকে অবলীলায় হেঁটে চলেছে সে। ডানহাতে লেগে থাকা রক্তটা শুকিয়ে চেপে বসে গেছে। নখের ডগায় লেগে থাকা মানুষের গলা থেকে খুবলে আসা মাংস শহরের অলিতে-গলিতে খসে পড়ে গেছে। কিছু উড়িয়ে নিয়ে গেছে হাওয়ায়। একবগগা লোকের মতো চোখদুটোকে স্থির ও সোজা রেখে এতক্ষণের হন্তদন্ত হাঁটা হঠাৎ করে থমকে গেল। যে গলি দিয়ে হাঁটছিল তার সামনেই একটা রাস্তা আর সেই রাস্তা পেরোলেই সাদা রঙের বিরাট বাড়িটা। কিন্তু সেখানে গেটে রাতের প্রহরী। বসে বসেই ঢুলছে। রাস্তার ওপারে একটা মানুষকে চেনার মতো আলো জ্বলছে। মিহিরের বন্ধ ঠোঁটদুটো অনেকক্ষণ বাদে নড়ে ওঠে। ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসে পান-গুটখা খাওয়া বিচ্ছিরি দাঁতগুলো। ওই ঢুলতে থাকা প্রহরীটা জানতেও পারে না ওর দিকে তাকিয়ে আস্ত একটা শয়তান হাসছে। হঠাৎ একটা কুকুর আবার ডেকে ওঠে। ঠিক মিহিরের পেছনে এসে দাঁড়িয়েই সে একবার করে ঘেউ ঘেউ করছে আর দু-পা পিছিয়ে যাচ্ছে। শুনশান রাতে হঠাৎ পাড়া-কাঁপানো কুকুরের ডাকে ঢুলতে ঢুলতে চমকে ওঠে দূরের প্রহরী। আগুন চড়ে যায় মিহিরের মাথায়। কুকুরটাকে এক মুহূর্তও সময় দেয় না। আচমকাই ঝড়ের বেগে ঘুরে একটা থাবা বসিয়ে দেয় কুকুরটার ঘাড়ে। ছুঁচোলো দাঁত বের করে গরগর শব্দ করতে থাকে কুকুরটা। তারপরেই চচ্চড়, খড়মড়, এমনই আরও কিছু মাংস-হাড়ের আলাদা হয়ে যাওয়ার শব্দ। কুকুরের ডাকও স্তব্ধ হয়ে গেল। ফুটপাথের একপ্রান্তে ছিটকে গেল কুকুরটার মাথা আর অন্য প্রান্তে চার-পা সমেত ধড়। সব কিছু আবার চুপচাপ। নিস্তব্ধ। প্রহরীও দু-বার ‘কৌন হ্যায় রে? কৌন হ্যায়’ বলে চুপ করে বসে পড়ল নিজের জায়গায়। সঙ্গে সঙ্গে সাদা বাড়িটার আলোগুলো সব নিভে গেল। আশেপাশে যত রাতবাতি ছিল সব্বাই মুহূর্তের মধ্যে বাধ্য শিশুর মতো ঘুমিয়ে পড়ল। নাকি ভয়ে চোখ বুজে ফেলল?
এখন নীল অন্ধকার। ছায়া নড়লে তার আভাসটুকু পাওয়ারও সম্ভাবনা নেই। মিহির সাদা বড়ো বাড়িটার গেটের দিকে গেল না। আঁধারের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে গেটের পাশ দিয়ে চলে গেল পেছনের পাঁচিলের দিকটায়। পাঁচিল যতই বড়ো হোক। মিহিরের কাছে সেটা টপকানো এখন আর খুব একটা কঠিন ব্যাপার নয়। ডান পা-টা পাঁচিলের গায়ে রেখে চাপ দিতেই শরীরটা ওপর দিকে উঠে গেল। পা তো ফসকালোই না। উপরন্তু বাঁ পা-টা পাঁচিলের ওপর দিকটায় রাখতেই এক্কেবারে মাথার ওপর উঠে গেল মিহির। এরপর একটা লাফ। সোজা পেছনের বাগানে।
.
ওদিকে পাঁচজন সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে সায়ন পৌঁছে গেছে তার শ্বশুরবাড়ি অর্থাৎ যেখানে মিহির আর মৃন্ময়ী এতকাল সুখেই বাস করছিল। এখন সেটা বন্ধ। কারণ মৃন্ময়ী আজ রাতে তার ছেলে নিয়ে সায়নের বাড়িতে আর মিহির নিরুদ্দেশ। লোকাল থানার পুলিশ আসার আগে সে নিজে একবার ভালো করে দেখতে চায় এই বাড়িটাকে। যদি মিহির তার নিজের বাড়িতেই গা-ঢাকা দিয়ে থাকে। আসলে খুব বুদ্ধিমান অপরাধীরা অনেক সময়ে সবার নাকের ডগাতেই থাকে। আর সবার পরিচিত এমন এক জায়গাতে সে নিজেকে লুকিয়ে রাখে যে, কেউ সেই জায়গাটাকে সন্দেহের তালিকাতেই রাখবে না। মিহিরের ক্ষেত্রেও এই বাড়িটা সেই সহজলভ্য জায়গা। মিহিরকে অপরাধী ভাবতে সায়নের নিজেরই খারাপ লাগছে। তাই তো আগেভাগে এসেছে সে। যদি এখানেই পায় তাহলে সারেন্ডার করতে বলবে সে। শাস্তি হয়তো কিছুটা কম হবে তাতে। সায়নের ওপর এতটুকু ভরসা রাখতে পারল না দাদাভাই? এ কী করে বসল? আবারও সায়নের মন বলল, এ অসম্ভব! অসম্ভব! দরজায় যথারীতি তালা ঝুলছে। আর অন্য কোনো দরজাও নেই এই বাড়িতে ঢোকার। তার মানে এখানে আসেনি। তাহলে গেল কোথায়? এভাবে রাতারাতি উবেই-বা যাচ্ছে কী করে?
.
সাদা বাড়িটার পেছনের দিকের বারান্দা দিয়ে সোজা দোতলার ঘরে উঠে এল মিহির। তরতর করে ওঠার জন্য পাইপটা খুব ভালো রাস্তা। ঘর আর বারান্দার মাঝে কাচের দরজাটা ভেতর থেকেই দেওয়া ছিল। সেটা গায়ের একটু জোর দিতেই ঘসঘস শব্দে খুলে গেল। এই শব্দ সামনের গেটের ধানুয়া প্রহরীর কানে পৌঁছোবে না। ঘরের মধ্যে মিশকালো অন্ধকার। তবু মিহিরের চোখে সব স্পষ্ট। আলো জ্বালার প্রয়োজন নেই তার। শূন্য থেকে নিজের শরীরটাকে বিলাসবহুল বিছানার ওপর ফেলে দিল। নরম তোশকের ওপর পড়তেই চিত হয়ে থাকা মিহিরের শরীরটা দু-বার লাফিয়ে উঠল। মনে মনে বলল, কত্তদিন পর! নিজের তৈরি সাম্রাজ্যে আবার ফিরে এলাম। এর চেয়ে শান্তি আর কিছুতে নেই। এই কথা মনে হওয়া মাত্রই মাথার মধ্যে একটা আগুনের ফুলকি চিড়িক করে জ্বলেই নিভে যায়। মনে পড়ে যায় সে এখনও বেঁচে আছে। এখনও তার বুকের খাঁচায় প্রাণপাখিটা ধুকপুক করছে। যা ওর নিজের জন্য ভীষণ রিস্ক। যদিও ওকে ধরা অত সহজ নয়। তড়াক করে লাফিয়ে উঠে পড়ে মিহিরের শরীরটা। দামি শো পিস, আলমারি, আয়না যেখানে যা ছিল সব একই আছে। মিহির ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। এপাশ-ওপাশ তাকিয়ে সিঁড়ির ধারে আসে। নীচ থেকে ওপরে ওঠার সিঁড়ির মাঝে বিশাল ছবিটাতে চোখ আটকে যায়। এবার আর ফুলকি নয়। মগজে আগুন জ্বলে ওঠে দাউদাউ করে।
বাঁ-হাতের আঙুলগুলো ঘাড়ের পাশে রেখে মাথাটা হেলানো। ভেজা চুলগুলো মাথার একপাশে ঝুলে পড়েছে। শুধু একখানি চুল মুখের ওপর পড়ে ঠোঁট অবধি নেমে এসেছে। সাদা সুন্দর সাজানো দাঁত দিয়ে নীচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরে আছে আত্রেয়ী সেন। মিহিরের চোখের সামনে ক্যামেরার ফ্ল্যাশের মতো চকাচক আলোর ঝলকানি। হ্যাভলকের হোটেলে স্নান সেরে বেরোনোর পর জোর করে ছবিটা তুলেছিল। আত্রেয়ী প্রথমে কিছুতেই তুলতে চায়নি। দু-একটা তোলার পর ছবিগুলো আত্রেয়ীর এত ভালো লেগে যায় যে, পরপর প্রায় তেত্রিশটা ছবি তুলেছিল সেদিন। আর তারপরেই শরীরের তোয়ালেটা নিজেই খসিয়ে দিয়ে মিহিরের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। মনে পড়ে গেল সব। বুকের ওপর পর্যন্ত ছবি। তাই শরীরের তোয়ালেটা দেখা যাচ্ছে না ছবিটাতে। গলা আর ঘাড়ের মসৃণ ত্বকে বিন্দু বিন্দু জলের ফোঁটা হিরের ফুল হয়ে ফুটে আছে। দেয়ালজুড়ে বাঁধানো সাদা-কালো ছবিটায় ভরা যৌবনের যৌন আবেগ। নীল রঙের অন্ধকারটা উলঙ্গ পুরুষের মতো উপুড় হয়ে জাপটে শুয়ে আছে ছবিটার ওপর। ঠিক তখনই মিহিরের গা-টা গুলিয়ে উঠল। বাইরে আবার আলো জ্বলে উঠেছে আগের মতো। তারই কিছু ছেঁড়া ছেঁড়া অংশ পাশের রঙিন কাচ গলে ঢুকছে। অনেক আগে এই ছবি দেখে সারা শরীরে আগুন জ্বলত। সেই আগুনে পুড়ে মরতে ভীষণ ভালোবাসত ওপরতলায় সিঁড়ির ধারে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষ মানুষটা। কিন্তু দিন যত এগোতে থাকল ওই আবেদনময়ীর শরীর থেকে পচা দুর্গন্ধ বেরিয়ে আসতে থাকল। এতদিন পরেও ঘেন্না করছে খুব। ওই অন্ধকারেও মিহির অনায়াসেই পাশের একটা ঘরে ঢুকে ঘড়ররর শব্দে একটা ড্রয়ার টেনে খুলে ফেলল।
.
সাপের মতো অজস্র নল ঘিরে রেখেছে আত্রেয়ী সেনকে। মনিটরে ধরা পড়ছে প্রাণপাখিটার গতিবিধি। লাইনটা সোজা হতে গিয়েও বেঁকে যাচ্ছে। মাথা থেকে মুখে ব্যান্ডেজ। হাতে ব্যান্ডেজ। ডান পায়ের পুরোটাই শক্ত সাদা পট্টিতে মোড়া। মুখে অক্সিজেন মাস্ক। ভ্রূ দুটোকে মাঝখানে জড়ো করে ঘরের বাইরে থেকে দেখছে তন্ময়। কিছুক্ষণ অন্তর ডাক্তার এসে দেখে যাচ্ছে। সদা-সর্বদা নার্সদের তত্ত্বাবধানে চুপ করে শুয়ে আছে আত্রেয়ী। পকেটে ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল তন্ময়ের। হাতে নিয়ে দেখে অমিতাভ মল্লিক।
— হ্যাঁ অমিতাভদা বলো।
— খবরটা পেয়েছ?
— কোন খবর?
— আরে বৃষভানু বলে ছেলেটার খবর।
আত্রেয়ীর দিকে আড়চোখে আর-একবার দেখে নিয়ে খুব গা-ছাড়াভাবেই বলল, ‘সেটা আবার কে? ‘
— সেটা কে মানে? আমাদের শুটিঙে যে খাবার দিত। আত্রেয়ীর পুরো ঘটনাটার সাক্ষী যে ছেলেটি। তোমার কথা যখন মিহির মিথ্যে বলে প্রমাণ করতে চাইছিল তখন তো ভানুই বলল
— হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে। কী হয়েছে তার?
গলায় এবার অল্প-অল্প আশঙ্কা। ধীরে ধীরে তন্ময়ের সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ল ভয়ের ছায়া। আত্রেয়ীর কেবিনের সামনে থেকে খানিক সরে এসে দাঁড়াল তন্ময়। অমিতাভ মল্লিক সবটা বলল তন্ময়কে।
— হ্যালো, হ্যালো তন্ময়।
ফোনটা কানে ধরে খানিকক্ষণের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল সে। বুকের ছাতিটা এবার একটু ঘন-ঘনই ওঠানামা করছে। অমিতাভর বারংবার ডাকে সংবিত ফেরে। হ্যাঁ হ্যাঁ শুনছি। বলছি পুলিশ কিছু করতে পারছে না? জেল ভেঙে একটা লোক পালায়ই-বা কী করে?’
— ওটাই তো রহস্য। জেলের গরাদগুলো নাকি দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছে। শালা মিহিরকে দেখে তো কখনোই তেমন কিছু মনে হয়নি। নিতান্ত সাধারণ নিপাট ভদ্রলোক। আজ সকালের নিউজে বলল পুলিশ মিহিরকে শুধু সন্দেহই করছে না। এবার নাকি তারাও এইট্টি পারসেন্ট নিশ্চিত যে মিহিরই খুনি। নিউজে যা বলছে আর লোকের মুখে যা শুনছি তাতে মিহিরের গায়ের জামাকাপড় নাকি সিসিটিভিতে দেখা ওই আগন্তুকের জামাকাপড়ের সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে। একটা বাচ্চা ছেলে নাকি মিহিরকে পালাতে দেখেছে। সেই তো শনাক্ত করেছে ছবি দেখে। আমার কিন্তু খুব ভয় করছে তন্ময়।
— এইবার বুঝলাম! ওই জন্যে নার্সিংহোমে কালকের চেয়ে আরও বেশি পুলিশ মোতায়েন করেছে। চার-পাঁচ খেপ ইন্টারভিউ দিয়ে তবে আত্রেয়ীকে দেখা যাচ্ছে।
— তুমি কি নার্সিংহোমে নাকি?
— হ্যাঁ। নইলে আর কোথায়? সকালে এরাই ফোন করেছিল। শালা আত্রেয়ীর বাড়ির একটা লোকও নেই? কোনো আত্মীয়-স্বজন কেউ এল না।
— কেন ওর বাবা মা?
— ধুস! সে তো কবেই সম্পক্কো ঘুচে গেছে। ওরা কোথায় থাকে তা-ও জানি না।
— ও বাবা! তাহলে নার্সিংহোম কি তোমার সঙ্গেই সব …
— হ্যাঁ। ওই বিল-টিল নিয়ে কথা বলবে। শোনো না, অমিতাভদা … কথাটা সম্পূর্ণ করার আগেই অমিতাভ মল্লিক বলে উঠল, ‘এই তন্ময়। আমি রাখছি বুঝলে। আমার একটা জরুরি ফোন আসছে।’ বাকি কথা শেষ করার জন্য তন্ময় প্রায় হাঁ করেই রইল। কিন্তু তার আগেই ফোনটা কেটে গেল। কান থেকে ফোনটা নামিয়ে বিরক্তিমুখে অমিতাভর উদ্দেশ্যে বলল, ‘শালা ঢ্যামনা। যেই বুঝেছে পয়সার কথা বলব অমনি …।’
.
আত্রেয়ীর ঘরের দিকে পেছন ফিরে এতক্ষণ কথা বলছিল তন্ময়। ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে ঘুরে তাকাতেই খানিক থমকে যায়। একজন বৃদ্ধ অচেনা লোক দরজা দিয়ে আত্রেয়ীকে দেখেই যাচ্ছে। রোগাপাতলা চেহারা, গায়ের রঙে দারিদ্রের ছাপ। চোখে হাই পাওয়ারের চশমা। তন্ময় দেখেনি কোনোদিন। লোকটার সারা মুখে উদাস-উদাস ভাব। চোখের পলক পড়ছে না তার। এত কড়াকড়ি টপকে এই লোকটা এই পর্যন্ত পৌঁছোল কী করে? তন্ময় এগিয়ে গিয়ে প্রশ্ন করল, ‘আপনি কে?’ বৃদ্ধ লোকটার কোনো হেলদোল হল না। তন্ময় আবার বলল, ‘শুনছেন, কোথা থেকে আসছেন?’ চোখের সামনে কেউ যেন পটকা ফাটাল, এমন করে চমকে উঠে তন্ময়ের দিকে তাকাল লোকটি। হাই পাওয়ারের চশমার জন্য বৃদ্ধের চোখের মণিগুলো মুখের তুলনায় বিশাল বড়ো বড়ো দেখাচ্ছে। তন্ময়ের মুখটা একটু ভালো করে পর্যবেক্ষণ করল বৃদ্ধ। তারপর বলল, তুমি বুঝি ঝুমার এখনকার বয়ফ্রেন্ড?’ তন্ময় অবাক। অস্বস্তিও হল। কথাটা কি খোঁচা মেরে বলল বুড়োটা? ‘ঝুমা? কে ঝুমা?’ তন্ময় জিজ্ঞেস করল। ঠোঁট-বাঁকানো তাচ্ছিল্যের হাসি সারা মুখে ছড়িয়ে বৃদ্ধ বলল, বুঝেছি, এই নামটা বলেনি তোমায়। তা তুমি তোমাদের আত্রেয়ীকে কী বলে ডাকো বাবা? আতু না পুতু?’
— হোয়াট দ্য হেল? কীসব বলছেন বলুন তো?
— ঠিকই বলেছ বাবা। হেলই বটে। নইলে বাপ হয়ে মেয়েকে এই অবস্থায় দেখতে হয়?
— আপনি আত্রেয়ীর বাবা?
হাতে যেন চাঁদ পেল তন্ময়। মনে মনে বলল, এই তো পাওয়া গেছে। এবার সবদিক থেকে তার নিস্তার। কঠিন হয়ে যাওয়া মুখটায় একটু পেলবতার আস্তরণ টেনে তন্ময় বলল, ‘ওহ সরি সরি। আমি ঠিক বুঝিনি। আসলে কোনোদিন পরিচয় হয়নি তো। আপনি চিন্তা করবেন না মেসোমশাই। আত্রেয়ী ভালো হয়ে যাবে। আসলে অনেক বড়ো—’ কথাটা শেষ হবার আগেই বৃদ্ধ বলল, ‘চাই না।’
— অ্যাঁ?
বৃদ্ধ এবার অত্যন্ত নির্লিপ্ত কণ্ঠে জানাল, ‘আমি চাই না ঝুমা মানে তোমাদের আত্রেয়ী সেন সুস্থ হয়ে যাক।’
— এ কী বলছেন মেসোমশাই? ও আপনার মেয়ে তো!
— দুর্ভাগ্যবশত। যবে থেকে খবরটা শুনেছি তবে থেকে প্রার্থনা করছি রাধামাধবের কাছে, ওকে তুলে নাও। অনেক হল।
তন্ময়ের ঠোঁটদুটো যেন নড়েও নড়ল না। এ কেমন বাবা? শুধু জিজ্ঞেস করল, আপনি থাকেন কোথায়?’ বৃদ্ধ বলল, ‘যমের বাড়ির একটু আগে ডানদিকের গলি।’
.
— তন্ময় হালদার।
বৃদ্ধের কথায় আবার নতুন করে অবাক হবার সুযোগ হল না তন্ময়ের। নিজের নামটা শোনামাত্রই তন্ময়ের চোখটা চলে গেল খানিক দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাটির দিকে। পরিপাটি করে নীল-সাদা শাড়ি পরা। তন্ময় নিজের পরিচয় দেয়। মহিলাটি বলে, ‘নমস্কার। বিদিশা শীল। এই নার্সিংহোমের সুপারভাইজার কাম অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার। আমিই সকালে আপনাকে ফোন করেছিলাম।’ ‘ও হ্যাঁ হ্যাঁ, বলুন’ বলে তন্ময়ও দু-পা এগিয়ে গেল। ‘কী বুঝছেন ম্যাডাম?’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল বিদিশা। বলল, ‘দেখুন মিথ্যে আশ্বাস দেব না। যতক্ষণ প্রাণ আছে ততক্ষণ আমরা জানপ্রাণ দিয়ে চেষ্টা করব। বাট লাক যদি ফেবার না করে তাহলে …।’ এরপর দুজনের মাঝেই কিছুটা নীরবতা। বিদিশা বলল, ‘যেহেতু নার্সিংহোমের খাতায় আত্রেয়ী সেনের রিলেটিভ হিসেবে আপনারই নাম আছে তাই আপনাকেই বলা। এখনও পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ বিল হয়ে গেছে। এবার একটা মানি ডিপোজিট করতেই হবে।’ তন্ময় তার শরীরের মধ্যে শশব্যস্ত ভাব নিয়ে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চই, আপনারা এমনিতেই অনেক ফেবার করেছেন। এই তো আত্রেয়ীর বাবা এসে গেছেন। আমার আর চিন্তা নেই। উনিই সব আপনাকে …’ কথাটা বলতে বলতেই পেছন ঘুরে তাকায় তন্ময় আর ঠিক তারপরেই চমকে ওঠে। করিডরের কোত্থাও বৃদ্ধ মানুষটা নেই ‘আরে কোথায় গেলেন, এই তো এখানেই ছিলেন।’ বিদিশা বলল, ‘হ্যাঁ আমিও তো দেখলাম আপনি কথা বলছেন। তাহলে বোধহয় আমাদের কথার মাঝখানে উনি চলে গেছেন। দেখুন ওঁর সঙ্গে কনট্যাক্ট করতে পারেন কিনা। তবে ডিপোজিটটা কিন্তু কাল সকালেই করে দেবেন প্লিজ।’ অত্যন্ত নম্রস্বরে কথাগুলো বলে চলে গেল বিদিশা।
যাশ্লা! বচন দিয়ে কেটে পড়ল? নামটাও বলে গেল না তো। ঠিকানাটাও হেঁয়ালি করে বলে গেল। যমের বাড়ির ঠিক আগেই ডানদিকের গলি! পাগল নাকি? সে পাগল-ছাগল যাইহোক, এখন কড়কড়ে দেড় লাখ টাকা কোত্থেকে দেবে তন্ময়? বোলপুরের নার্সিংহোমে প্রায় চল্লিশ হাজারের মতো তার গ্যাঁট থেকে খসেছে। গিল্ডের ইনসিয়োরেন্স থেকেও কত কী দেবে তার ঠিক নেই। চ্যানেলও সুযোগ বুঝে পিঠটান দিয়েছে। তন্ময়ের ফোনটা আবার ভাইব্রেট করে ওঠে। স্ক্রিনে অচেনা নম্বর। একটু বিরক্ত হয়েই ফোনটা ধরে, ‘হ্যালো … কে?’ চোখের নীচের চামড়াটা এবার একটু বেশিই কুঁচকে গেল। ‘ও শালা, এটা কার নম্বর? আরে বাবা আমি নার্সিংহোমে আছি তাই ধরতে পারিনি। আচ্ছা তোমার কী ধারণা বলো তো? আমি সারাদিনে কামকাজ কিছু করি না নাকি? সারাদিন তোমার ফোন রিসিভ করব বলে বসে আছি?’ গলাটা বেশ চড়ে যায় তন্ময়ের। সঙ্গে সঙ্গে পেছন থেকে একজন নার্স এসে বাইরে যেতে বলে। এইখানে ফোনে কথা বলা যাবে না। তন্ময় তরতরিয়ে সিঁড়ির দিকটায় চলে যায়। নামতে নামতে বলে, ‘আমি বারবার একটাই কথা বলছি তোমায়, তুমি আর ফোন কোরো না। প্লিজ। দেখছ তো পুলিশি ঝামেলা চলছে। কে বলতে পারে আমার ফোন ট্যাপ করা নেই? আর সবাই সব কিছু জানলে সেটা তোমার জন্যেও খুব একটা ভালো কিছু হবে না, তাই না? এখন রাখো। না না না। আর কোনো কথা নয়। সব সময়মতো পেয়ে যাবে। রাখছি।’ বলেই ফোনটা কান থেকে নামিয়ে কেটে দিল।
.
মুখটা ব্যাজার করে নীচে নেমে গেল তন্ময়। বেরোতে যাবে অমনি বেশ কিছু টিভি চ্যানেলের রিপোর্টার ঘিরে ধরল তাকে। এই ক-বছরে ক্যামেরাম্যান হিসেবে তন্ময়ের যত না পরিচিতি তার চেয়ে বেশি আত্রেয়ী সেনের বয়ফ্রেন্ড হিসেবে। তার ওপর আত্রেয়ী তার ইন্টারভিউতে তো বলেই ছিল, সে এখন তন্ময়ের ক্যামেরা ছাড়া আর অন্য কোনো ক্যামেরা ম্যানের সামনে দাঁড়িয়ে অভিনয় করবে না। কারণ একমাত্র তন্ময়ই জানে আত্রেয়ীর ফেসের প্রপার অ্যাঙ্গেল কোনটা। কোনদিক থেকে আত্রেয়ীকে দেখতে সবচেয়ে সুন্দর লাগে। সেই নিয়ে তো আর কম জলঘোলা হয়নি। অনেক বড়ো বড়ো ক্যামেরাম্যানই অসন্তুষ্ট হয় আত্রেয়ীর কথায়। তন্ময়ের মনে হল, এতকাল ক্যামেরার পেছনে থেকেই যত কারিগরি দক্ষতা দেখিয়েছে। এবার আত্রেয়ীর দৌলতে যদি প্রতিদিন ক্যামেরার সামনে আসা যায় তাহলে মন্দ কী? একটু রেলা নিয়েই রিপোর্টারদের মুখোমুখি হয় তন্ময়। এক-এর পর এক প্রশ্নবাণ আছড়ে পড়তে থাকে তন্ময়ের দিকে।
— আত্রেয়ী সেনকে কেমন দেখলেন?
— এখনও উনি আইসিসিইউতে।
— ডাক্তাররা কী বলছেন?
— ওঁরা যথাসাধ্য করছেন। বাট এবার ওই ওপরওয়ালা কী চান সেটাই দেখার।
— আপনাদের শুটিং টিমের আরও একজন কাল রাতে নৃশংসভাবে খুন হয়েছে। আপনার কী মনে হয় কে খুন করল?
.
এই রে! এটার কথা একদম মাথাতেই ছিল না তন্ময়ের। একটা খুন থেকে আর-একটা খুন, তার থেকে আরও কিছু …! না না, হট করে ক্যামেরার সামনে চলে আসা তার একদম উচিত হয়নি। খুব শান্ত স্বরেই উত্তর দিল তন্ময়, ‘দেখুন আপনারা যেখানে আমিও সেখানে। তবে নিউজ চ্যানেলগুলোই তো বলছে শুনছি যে মিহির সরখেলকেই নাকি সন্দেহ করছে সবাই।’
.
ক্ষয়ে যাওয়া দাঁতগুলো ছাড়িয়ে হাসছে সে। নারকীয় হাসিতে দুলে উঠছে মিহিরের শরীর। চোখের সামনে টিভি চলছে। আর টিভিতে লাইভ ইন্টারভিউ চলছে তন্ময় হালদারের। রিপোর্টার প্রশ্ন করছে, ‘আত্রেয়ী সেনকে খুন করার চেষ্টা কেন হল? আপনার কী মনে হয়?’
— শুটিংয়ের দিন মিহিরের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয় আত্রেয়ীর। নতুন পরিচালক কাজে ভুল করছিল। আত্রেয়ী তাকে শুধরে দিতে গিয়েছিল। সেই থেকেই ঝগড়া, রাগ, অশান্তি। চ্যানেল থেকেও আত্রেয়ীকে সাপোর্ট করা হয়। তাতে মিহির সরখেলের আঁতে লাগে। সেই থেকেই এই খুনের চেষ্টা।
.
রক্তবর্ণ চোখদুটোতে খুশির জোয়ার। ডানহাত দিয়ে নিজের বুকের বাঁ-দিকটা দু-বার চাপড়ে বলে ওঠে, ‘বেঁচে থাক মিহির। বেঁচে থাক। অনেক হিসেব মেলাতে হবে তোকে।’ বলেই থেমে গেল। নিমেষে পালটে গেল মুখের হাসি। কারণ টিভিতে সংবাদ-পাঠিকা বলে চলেছে তদন্ত থেকে উঠে আসা মিহিরের গোপন কথা, ‘তেঁতুল নামক ছেলেটির কথা অনুযায়ী আততায়ীর চোখ-দুটি ছিল অস্বাভাবিক। বলা যায় রীতিমতো ভয়ংকর। প্রতিটি থানায় মিহির সরখেলের দুটি করে ছবি পাঠানো হয়েছে। একটিতে আমরা দেখতে পাই সাধারণ মানুষের মতো চোখ আর অন্যটিতে, খুব আজব মনে হলেও এটা সত্যি যে, অন্যটিতে হাড়হিম করে দেওয়া দুটি সাদা চোখ। বোলপুরের গ্রামে-গঞ্জে এই ছবি ছড়ানো মাত্র হইচই পড়ে গেছে। সকলেই বলছে, এ মানুষ নয়। কোনো অশুভ পিশাচ। বলাই বাহুল্য, বিজ্ঞানের জয়যাত্রার যুগে এ কথা অত্যন্ত ক্লিশে এবং মানুষের কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনের প্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়।’ কথাগুলো বলাকালীন টিভির পর্দায় মিহিরের দুটো ছবিই ফুটে ওঠে। ঘরে বসে মিহিরের দু-চোখ বেয়ে তখন রক্ত গড়াচ্ছে। দাঁতে দাঁত লেগে কটমট শব্দ হচ্ছে। হাত-পায়ের নখগুলো কালো আর তীক্ষ্ণ হচ্ছে। এইভাবে যে বা যারা ওকে ভরা হাটের মাঝে টেনে নামিয়ে বাজারি করে দিল তাদের ও ছাড়বে না, কিছুতেই ছাড়বে না।
