মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ১১
এগারো
টিভিটা নিজের মতো বকে চলেছে। মৃন্ময়ী পাথরের মতো বসে আছে। সোনাই মায়ের গায়ে গা ঠেকিয়ে খেলছে, দুষ্টুমি করছে, গালে গাল ঠেকিয়ে আদর করে যাচ্ছে। কিন্তু মৃন্ময়ীর সাড়া নেই। চোখে-মুখে ভয় নিয়ে মুনাই চুপ। সায়ন থানায় যাবার জন্য তৈরি হয়ে গেছে। আজ ভোরে ফিরেছে। দু-দণ্ড যে ঘুমোবে তার জো নেই। এখুনি তাকে দৌড়োতে হবে থানায়। মুনাই একরাশ অভিমান নিয়ে বলেই ফেলল, ‘কী দরকার ছিল তোমার দাদার ছবি চারপাশে ছড়িয়ে দেবার? আর দিলে তো দিলে ওই বীভৎস ছবিটাও দিলে? ও তো তোমারও রিলেটিভ সায়ন।’ সায়ন মুনাইয়ের পাশে বসল। শান্ত গলায় বলল, ‘অন্য কারওর কেস হলে আমি হয়তো এত তাড়াতাড়ি ছবিটা ছড়াতাম না মুনাই। কিন্তু দাদাভাইয়ের কেস বলেই এত তাড়াতাড়ি সেটা করলাম।’
মানে তুমি ইচ্ছে করে করেছ?
— হ্যাঁ।
— কেন?
— আমার মন বলছে দাদাভাই ভয়ংকর বিপদে আছে। যার নাগাল পাওয়াটা আমার খুব দরকার।
— এতে তো দাদাভাই-ই ভিলেন হয়ে গেল সায়ন। সকাল থেকে রিলেটিভদের কত ফোন এসেছে জানো? কতরকমের প্রশ্ন তাদের। লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে। মাথা ঠান্ডা করে একটা জিনিস ভাবো মুনাই। আত্রেয়ীর কেস বোলপুর থানার আন্ডারে। আত্রেয়ীর বাড়ি বালিগঞ্জ থানার আন্ডারে। ইচ্ছে করলেই আমি এই দুটো থানার কাজে নাক গলাতে পারব না। ঈশ্বরের কৃপায় একমাত্র ভানুর কেসটা আমার থানার আন্ডারে পড়েছে। এই কেসটা সলভ করার জন্য আমায় জানতে হবে আত্রেয়ীকে কেন খুন করার চেষ্টা হল। কারণ সেই ঘটনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ভানু। সবাই যখন দাদাভাইয়ের সঙ্গে আত্রেয়ীর অশান্তিটাকে শিখণ্ডী করে মিহির সরখেলকে সন্দেহ করছিল তখন একমাত্র ভাই বলেছে যে সে সবটা দেখেছে। কেউ মিথ্যে বলছে না। তাই এমন একটা তরতাজা সাক্ষীকে সরাতে মিহির সরখেল খুন করতেই পারে। আর সেটাই সহজভাবে বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু ভানু আরও কী এমন ঘটনার সাক্ষী যার কথা আলাদা করে কৃষ্ণপদবাবুকে বলবে বলে রাতে ফোন করেছিল? আর ঠিক তখনই তাকে মারা হয়। ভানু মরল কীসের জন্য? আত্রেয়ীর খুন দেখে ফেলার জন্য নাকি অন্য যে কথাটা কেউ জানে না তার সাক্ষী হয়েছে বলে তাকে মরতে হল?
মুনাই জিজ্ঞেস করল, ‘তাতে কী হল? এতে তো ভানুর কেস সলভ হবে। দাদাভাইয়ের কী হবে?’
— ভানু কেন মরল সেটা জানতে হলে আমায় জানতে হবে আত্রেয়ীকে কেন খুন করার চেষ্টা করা হল? কারণ একই শুটিঙের দুজন লোককে খুন করা হল। কেন? একটা সামান্য ঝগড়া হয়েছে বলে কেউ একজন কাউকে খুন করবে এটা অ্যাবসার্ড। এর পেছনে অন্য কোনো কারণ নিশ্চয়ই আছে। আর সেই কারণটা জানতে হলে আমায় জানতে হবে আত্রেয়ীর অতীত। অতীতে কি এমন কিছু আছে যার জন্য সে আজ মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে! আর সেই অতীত খুঁজতে হলে বালিগঞ্জ থানার আন্ডারে আত্রেয়ীর বাড়ি যাওয়াটা খুব প্রয়োজন। আত্রেয়ীর আত্মীয়-স্বজন সবার সঙ্গে কথা বলাটা ভীষণ জরুরি। আত্রেয়ী সেনের সঙ্গে তন্ময় হালদারের ঘনিষ্ঠতাই-বা কতটা? আত্রেয়ী তো নাকি বিবাহিত। শুনেছি তার বর নাকি নেই নেই মানেটা কী? মারা গেছে না নিরুদ্দেশ? যদি মারা যায় তাহলে কীভাবে? বয়সটা তো মারা যাবার নয়। আর যদি নিরুদ্দেশই হয়ে থাকে তাহলে সে কোথায়? এরকমই হাজারটা প্রশ্নের উত্তর জানতে হবে মুনাই। আর এখানে কৃষ্ণপদ ঘোড়ুই-ই হোক বা অন্য থানার রাম-শ্যাম-মধুই হোক। কেউ আমায় বাধা দিতে পারবে না। আমার থানার কেস সলভকে শিখণ্ডী করে বাকি থানার আন্ডারে যে এরিয়াগুলো পড়ছে সেখানে আমি অনায়াসেই যেতে পারব। নিয়মের মধ্যে থেকেই আমি আসল কারণটা খুঁজে নেব। এইসব কিছুর জন্য দাদাভাইকে খুঁজে পাওয়াটা ভীষণ জরুরি। অন্য কারও হাতে পড়ার আগে যেন সে আমার হাতে পড়ে। তাহলে দাদাভাইকে একটু হলেও আমি বিপদ থেকে বাঁচাতে পারব। তাই সব থানায় ছবি শেয়ার করেছি।
— আমার ফোনটা কোথায়?
এতক্ষণ পাথরের মতো নিশ্চুপ হয়ে বসেছিল মৃন্ময়ী। সায়নের কথা শেষ হতেই ফোনের কথাটা জিজ্ঞেস করল। ‘এখানেই তো রেখেছিলাম, কোথায় গেল বলো তো?’ মুনাই বলল, ‘ওই তো টিভির পাশে। দাঁড়াও দিচ্ছি।’ ‘কাকে ফোন করবে বউদি?’ সায়ন প্রশ্ন করল। মৃন্ময়ী চুপ করে টিভির দিকেই তাকিয়েছিল। সায়নের কথাটা কানে আদৌ পৌঁছোল কিনা বোঝা গেল না। মৃন্ময়ী উত্তর দিল না। মুনাই ফোনটা এনে দেবার পরেই তড়িঘড়ি কাকে যেন ফোন করার জন্য শশব্যস্ত হয়ে ওঠে মৃন্ময়ী। ফোনটা কানে দেয়। সায়ন লক্ষ করে মৃন্ময়ীর বাঁ-হাতটা তিরতির করে কাঁপছে। ছোট্ট সোনাই ঘর থেকে একটা টেডি বিয়ার এনে মায়ের গা ঘেঁষে নিজের মনে খেলতে থাকে। কয়েক সেকেন্ড পরেই মুখে বিরক্তিসূচক শব্দ করে ধমকে ওঠে মৃন্ময়ী, ‘আঃ! সোনাই সর না।’ ছেলেটাকে হালকা ঠেলা দিতেই মাটিতে পড়ে যাচ্ছিল। মুনাই ধরে নিল। কিন্তু মৃন্ময়ীর সেদিকে খেয়াল নেই। সে আবার নিজের মনে ডায়াল করে ফোন কানে দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকল ওপার থেকে হ্যালো শোনার জন্য। মৃন্ময়ী আর তার নিজের মধ্যে নেই। সায়ন আর মুনাই ভালোই বুঝতে পারল। আবার জিজ্ঞেস করল সায়ন, ‘কাকে ফোন করছ একটু বলো।’
— ফোনটা যাচ্ছেই না। খালি কুক কুক করে শব্দ করে যাচ্ছে।
খুব বিচলিত হয়ে উত্তর দিল মৃন্ময়ী। ‘ধ্যাত’ বলে সোফার ওপর ফোনটাকে ছুড়ে ফেলে বসে পড়ল। আকাশ-পাতাল ভেবে চলেছে সে। সায়ন আর মুনাইয়ের সাধ্য নেই সেই ভাবনার তল পাওয়ার। ‘আমি বেরোলাম মুনাই। তুমি ওদের দেখো’, সায়ন বলল। মুনাই সোনাইকে কোলে নিয়ে ঘাড় নাড়ল। সায়ন মৃন্ময়ীর কাছে এসে শান্ত গলায় বলল, ‘এত ভেবো না বউদি। দাদাভাইকে ঠিক ফিরিয়ে আনব। কিচ্ছু হবে না।’ কথাটা শুনে মৃন্ময়ী কেমন ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল সায়নের দিকে। তারপর বলল, ‘পারবে না।’ একটু ধাক্কা খেল সায়ন। বলল, ‘কেন? হঠাৎ এ কথা বলছ?’
— কারণ তোমরা কেউ সেই লোকটাকে দেখতে পাচ্ছ না।
— কোন লোক?
— লক আপের সেই লোকটা। যে অন্ধকারে মুখ ঢেকে আমাদের সব কথা শুনছিল।
সায়ন চোখটা বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপর সবে বলতে শুরু করেছিল, তুমি এখনও সেই ব্যাপারটা…।’ কথাটা শেষ হল না। মৃন্ময়ী পালটা প্রশ্ন করল সায়নকে, ‘বোলপুরের ওই বাড়িতে দোতলা থেকে যে লোকটা আমাদের দেখছিল তাকে তোমরা কেউ কেন দেখতে পেলে না বলতে পারো? শুধু আমি কেন পেলাম?’ সায়ন একদম চুপ। মুনাই এই ঘটনার সবটা জানে না বলে অবাক হয়ে দুজনের মুখের দিকে তাকাল। মৃন্ময়ী বলল, ‘আর কে-ই বা আমায় ওই বাড়িটার ঘরে নিয়ে গেল? আমি কেন অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম বলতে পারো? আমার তো কিচ্ছু মনে নেই।’ কথাগুলো সায়নের মনের মধ্যে একটু একটু করে দানা বাঁধতে শুরু করেছে। অ্যাটেম্পট টু মার্ডার আর মার্ডার কেসের চাপে এই ঘটনাগুলো ও বেমালুম ভুলে গিয়েছিল। ভুলে গিয়েছিল নাকি খুব একটা গুরুত্বই দেয়নি? ‘জানো সায়ন’ আবার বলতে শুরু করল মৃন্ময়ী, ‘আত্রেয়ী সেনকে নিয়ে শুটিং করবে বলে খুব লাফালাফি করেছিল ও। খুব খুশি ছিল। কিন্তু শুটিংয়ের ঠিক বেশ কয়েকদিন আগে থেকে হঠাৎ কী যে হল, ও না একদম মন মরা হয়ে গেল। আগে আত্রেয়ীর কথা উঠলেই কী উৎফুল্ল হয়ে উত্তর দিত। কিন্তু ওই ক-টা দিন আত্রেয়ীকে নিয়ে ও একটা কথাও বলেনি। বরং শুটিং আর আত্রেয়ীর কথা উঠলেই কেমন যেন গুম মেরে যেত। রেগে যেত। অন্য কথা বলে এড়িয়ে যেত। শুটিঙের আগের দু-দিন রাতে যখনই উঠেছি তখনই দেখেছি ও জেগে আছে। হঠাৎ করে ওকে ডাকলে চমকে উঠত। আমি জিজ্ঞেসও করেছিলাম, কী হয়েছে বলো। প্রথম-প্রথম খালি কিছু হয়নি বলে এড়িয়ে যেত। কিন্তু শুটিঙের ঠিক আগের দিন খেতে বসে ও হঠাৎ বলল, ধুস, আত্রেয়ীকে নিয়ে এই শুটিংটা না করলেই হত। আমার ভালো লাগছে না। আমি না খানিকক্ষণ অবাক হয়ে চুপ করে রইলাম। ওকে বললাম, কেন কী হয়েছে? ওই ক্যামেরাম্যান কি কিছু বলেছে? ও আর কিছু বলল না।’
— ক্যামেরাম্যান মানে তন্ময় হালদার?
মৃন্ময়ী ঘাড় নাড়ল। সায়ন জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার হঠাৎ তন্ময়ের কথা কেন মনে হল?’
— তোমার দাদাভাই-ই বলেছিল লোকটা নাকি খুব ওস্তাদ। সবজান্তা টাইপ। কোন অ্যাঙ্গেলে আত্রেয়ীর ছবি নেওয়া উচিত, কীভাবে শুট করবে সব নাকি ওই বলত। তাই ও খেপে গিয়েছিল। তবে ওদের কিছু বলেনি। তাই ভাবলাম, ওই তন্ময় বোধহয় কোনোভাবে পেছনে লাগছে।
— দাদাভাই আর কিছু বলেছিল? মানে কাজটা কেন করতে চাইছে না।
— না। শুধু বলেছিল, ওর খুব ভয় করছে। একদিন সোনাইয়ের সঙ্গেও… উফফফ! মুখে হাত চাপা দেয় মৃন্ময়ী।
— সোনাইয়ের সঙ্গে কী বউদি?
সায়ন কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে। একটা বড়ো নিশ্বাস নিয়ে একটু ছটফট করে মৃন্ময়ী বলে, ‘মিস বিহেভ করে। ওটা আমি মনে করতে চাই না সায়ন প্লিজ। বারবার কেন ওর সঙ্গেই এমন হচ্ছে বলো তো?
— দাদাভাইয়ের ভয় পাওয়ার মতো কী এমন ঘটল?
নড়েচড়ে বসল সায়ন। মুনাইও সোফার সামনের চেয়ারটায় বসে পড়ল। সায়ন বলল, ‘কীসের ভয়? আর বারবার ওর সঙ্গে কী হচ্ছে?’
— জানি না। ও আর কিচ্ছু বলেনি। তবে আমি এবার অনেকটাই নিশ্চিত।
— কী ব্যাপারে?
— ও খুন করতে পারে না। ওর পেছনে কেউ একজন আছে।
— কে আছে? তুমি চেনো তাকে?
মুনাইয়ের কথা শুনে মৃন্ময়ী বলল, ‘কেউ যাকে দেখতে পায় না। লক-আপের সেই লোকটা। ওই বাড়িটার সেই লোকটা।’
মৃন্ময়ী চুপ করে গেল। ঘরের মধ্যের চাপ-চাপ নীরবতা চেপে বসেছে মানুষগুলোর মস্তিষ্কে। মাঝেমাঝে এমন কিছু কথা আমাদের ঘিরে থাকে যাকে চট করে বিশ্বাস করা খুব কঠিন। তবু শত চেষ্টাতেও ফেলে দেওয়া সম্ভব নয়।
— তুমি ফোনটা কাকে করছিলে? নীলাম্বরবাবুকে?
সায়নের কথা শুনে চমকে উঠল মুনাই। না-বলা কথাটা যে সায়ন ধরে ফেলেছে সেটাতে বেশ অবাক হল মৃন্ময়ী। তার ঠোঁটের কোনে চলকে উঠল অসহায় এক হাসি। তারপর সায়নের হাতে হাত রেখে বলল, ‘আমায় একবার নীলাম্বরবাবুর কাছে যেতেই হবে সায়ন।’ সায়ন আশ্বাসের হাতটা রাখল মৃন্ময়ীর হাতের ওপর।
