মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ১২
বারো
— কাল রাতেই হয়েছে বোধহয়।
— হ্যাঁ দেখছ না পোকা হয়ে গেছে গায়ে। উমহ্! বাবা রে।
— গাড়িতে কাটা পড়ল?
— না না। ভালো করে দেখুন না, কে যেন ধড় থেকে গলাটাকে ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে গেছে।
— ইসসস! কী নৃশংস! এত বছর এ-পাড়ায় আছি। এমনটা কখনও হয়নি।
মহিলারা মুখে কাপড় চাপা দিয়ে উঁকিঝুঁকি মারছে। কেউ বাচ্চাদের স্কুল থেকে ফেরার পথে একবার দেখে নাক সিঁটকে চলে যাচ্ছে। হাত দিয়ে বাচ্চাদের চোখ ঢেকে দিচ্ছে। এই ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ এক বয়স্ক লোক ধানুয়াকে দেখে বলে উঠল, ‘ও ধানুয়া তুমি কাল দেখেছ কাউকে?’ ‘হাঁ কেয়া বোলা?’ ধানুয়া বেশ মন দিয়ে দেখছিল কুকুরটার দ্বিখণ্ডিত দেহ। কে যেন রাস্তার উলটো ফুট থেকে ছিঁড়ে যাওয়া মাথাটা এনে মৃত কুকুরটার পেটের কাছে ফেলে রেখেছে। তাতে ব্যাপারটা আরও বেশি ভয়ানক হয়ে উঠেছে। হঠাৎ করে যে উটকো একটা প্রশ্ন ওর দিকে ধেয়ে আসবে ভাবতে পারেনি। তাই প্রথম চোটে জবাব দিতে খানিক খাবি খেয়ে উঠল। পাড়ার বয়স্ক লোকটি আবার বলল, ‘বলছি তুমি তো রাতে আত্রেয়ী ম্যাডামের বাড়িতে পাহারায় থাকো। তুমি কাউকে দেখেছ সন্দেহজনক?’
— নাহি তো। মায়নে কিসি কো নাহি দেখা।
ভিড়ের মধ্যে এক মহিলা আর-এক মহিলার কানের কাছে বিড়বিড় করে বলল, ‘দেখলেও কী বলবে নাকি? ব্যাটা বিহারির বাচ্চা। গাঁটে গাঁটে বুদ্ধি।’
আরে ওর ম্যাডামকেই তো কে যেন খুন করতে গেছিল। তাকে নিয়ে তো এখন যমে-মানুষে টানাটানি।
— সে তো আর এখানে নয়। কিন্তু কুকুরটা তো ওর বাড়ির দশ হাতের মধ্যেই পড়েছে।
ভিড়ের মধ্যে এমনি করে যখন কথা চালাচালি চলছে। ঠিক তখনই আত্রেয়ীর বাড়ির পাঁচিল থেকে লাফিয়ে হাওয়ার বেগে সরে গেল একটা অবয়ব। ঝরঝর করে কেঁপে উঠল রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাছের পাতাগুলো। ঝরে পড়ল কিছু। কেউ জানতেও পারল না।
.
— এখানে একটা ডাল, আলুভাজা, ছ্যাঁচড়া আর মাছ।
গলা তুলে বলল তেঁতুল। দোকানের ভেতরে কাঠের তক্তপোশে বসে থাকা লুঙ্গি-পরা মালিক খসখস করে খাতায় লিখে নিল। সে-ও গলা তুলল, ‘সামনের অফিসের দুজনের খাবার দিয়ে এসেছিস?’
— না। এই যাব।
— এখনও যাসনি? সেই কখন বলে গেছে। ব্যাবসাটা এবার তোর জন্য লাটে না ওঠে।
— এক হাতে কত করব বলো দিকি? সব রেডি করা আছে। যাব আর আসব। চাপ নেই।
মুখে বলল বটে। তবে গতরাতে স্বচক্ষে দেখা ওই চোখ দুটো কাল থেকে তেঁতুলকে দু-চোখের পাতা এক করতে দেয়নি। আজ একদমই দোকানে আসতে ইচ্ছে করছিল না তেঁতুলের। মনে হচ্ছিল ঘরের এক কোণে ঘাপটি মেরে পড়ে থাকুক। কিন্তু চাকরিটা তো বাঁচাতে হবে। টেবিলের ওপর দুই থাক সাজানো থালা একটার ওপর আর-একটা বসিয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেল তেঁতুল। ফুটপাথ ঘেঁষে খুব সাবধানে হাঁটছে ছেলেটা। কয়েকটা ছেলে ফুটপাথে বসেই আড্ডা মারছিল। তাদের মধ্যে ফচকে মতন এক ছোঁড়া বলে উঠল, ‘এই তেঁতুল, ফেরার পথে একবার থানায় দ্যাখা করে যাস তো?’
— কেন বে?
প্যাংলা হাতটা মুঠো করে কিছু ঠুসে দেবার ভঙ্গিতে দু-বার সামনের দিকে নাড়িয়ে বলল, ‘কার নাকি মেরেছিস, তোর নামে নালিশ ঠুকে দেছে।’
— মারিনি রে। মারব, তোর। খাবারটা দে আসি, তারপর।
রোদে-পোড়া ছেলেগুলো খ্যাকখ্যাক করে হেসে উঠল। একজন বলল, ‘এ তেঁতুল, তোর এত খারাপ অবস্থা? শেষে কিনা মদনার পোঁদ মারবি?’ এবার ছেলেগুলোর সঙ্গে তেঁতুলের দাঁতগুলোও বেরিয়ে এল। মুখ ঘুরিয়ে ফুটপাথটা ধরে সোজা এগিয়ে চলেছে সে। এগোচ্ছে আর এপাশ-ওপাশ ভালো করে দেখে নিচ্ছে। কেউ আড়াল থেকে ফলো করছে না তো? সেই চোখ দুটো? সামনে গেলে একটা বাঁক। তারপর গাছের ছায়া ধরে বেশ খানিকটা গিয়ে রাস্তা ক্রস করে আবার ডানদিকে বাঁক। তার দুটো বাড়ি পরেই অফিস। হাঁটতে হাঁটতে তেঁতুলের মনে হচ্ছে তখন থেকে একটানা একইভাবে কেউ যেন তার পিছু নিয়েছে। হাঁটতে হাঁটতেই ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল তেঁতুল। অনেক দূরে একটা সাইকেল চলে গেল। বাইক ছুটিয়ে বেরিয়ে গেল দুজন। কিন্তু ওর পিছনে কেউ নেই। তেঁতুল মনে মনে ছেলেগুলোকে গাল দিল আচ্ছা করে। শালা ও যত পুলিশ, খুন এইসব ভুলে থাকতে চায় ওরা তত আজ ওর পেছনে লেগেছে। এসব মনের ভুল। চড়া রোদ এড়িয়ে দিব্যি ছায়ায় ছায়ায় এগোচ্ছিল। হঠাৎ সামনের গাছ থেকে একটা ডাল চোখের নিমেষে ভেঙে তেঁতুলের সামনে আছড়ে পড়ল। ডাল ভাঙার শব্দটাও পেল না সে। তার আগেই আচমকা ঘটে গেল ঘটনাটা। ঝড় নেই। এমনকি অন্যদিনের মতো ফুরফুরে হাওয়াটুকুও নেই। তাহলে ডালটা ভাঙল কী করে। গাছের ওপর তাকিয়ে ঘাড় বেঁকিয়ে এদিক-ওদিক ভালো করে দেখল তেঁতুল। গাছের পাতাগুলোর ফাঁক দিয়ে চড়া রোদের তীক্ষ্ণ আলো ঠিকমতো চেয়ে থাকতেও দিচ্ছে না। চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। মুখটা নামিয়ে চোখ বুজে একবার মাথাটা ঝাঁকিয়ে নিল তেঁতুল। আর-একটু হলেই ডালটা সোজা মাথায় পড়ে একটা কাণ্ড ঘটছিল। ফতুয়ার নীচে পাঁজর বের করা বুকটা এখনও ধুকপুক করছে। তেঁতুল রাস্তায় নেমে ডাল পেরিয়ে এগোতে থাকে। রাস্তা টপকে সামনেই ডানদিকের বাঁক। ঘুরলেই অফিস। রাস্তাটা অনায়াসেই পেরিয়ে গেল। কোথা থেকে চিড়চিড় করে একটা শব্দ কানে এল তার। আবার থামল। পেছন ঘুরল। এবারেও শূন্য ফুটপাথ। আর কিছু বোঝার আগেই মাথার ওপর থেকে কালো রঙের একটা তার চাবুকের মতো তেঁতুলের গায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। খাবারের থালাগুলো হাত থেকে ছিটকে গেল। দুপুরের ফাঁকা রাস্তায় ঝনঝন করে বেজে উঠল বাসনগুলো। মুহূর্তে সারা শরীরের হাড়গুলো ভেতর থেকে প্রচণ্ড কেঁপে একটার গায়ে আর-একটা উঠে গেল। বেঁকে দুমড়ে যেতে লাগল তেঁতুলের শরীরটা। গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোল না তেঁতুলের। বৈদ্যুতিক তরঙ্গের অভিঘাতে চোখ উলটে ফুটপাথেই ছটফট করতে লাগল সে। অনবরত চিড়চিড় করে একটা শব্দ হতেই থাকল। দূর থেকেই কেউ হয়তো দেখতে পেল তেঁতুলকে। চিৎকার করে লোক জড়ো করল। ততক্ষণে বুকের মধ্যে এক প্রবল বিস্ফোরণে ফেটে চৌচির হয়ে গেছে তেঁতুলের হৃদপিণ্ডটা। চোখ থেকে পৃথিবীর আলোটা এক্কেবারে নিভে যাবার আগে তেঁতুল দেখল সেই দুটো সাদা ভয়ানক চোখ। আর কিচ্ছু দেখল না সে। তারপর সব অন্ধকার। অমাবস্যার চেয়েও অন্ধকার।
.
স্যাঁতস্যাঁতে গভীর অন্ধকার। মুখটা কোথাও যেন ডুবে আছে। কোনো শব্দ নেই। গন্ধ নেই। শরীরে অনেক ব্যথা। চোখ বন্ধ করেই হাত ঝাপটাতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু হাত-পা দুটো যেন ভারী কিছুর নীচে চাপা পড়ে আছে। অন্ধকার থেকেই ঠ্যালা মারছে গায়ের জোরে। অন্তরাত্মার শক্তিও হার মানছে বাইরের শক্তির কাছে। চোখের পাতা নড়ল একটু। তাতে কিছু যেন ছায়া-ছায়া অনুভূতি হল। এটা কি একটা পাতকুয়ো? হ্যাঁ নিশ্চয়ই তাই। ওই তো ঝাপসা চোখে যতটুকু বুঝছে তাতে অনেক উঁচুতে একটা আলোর বলয়। ওটাই কুয়োর মুখ। কীভাবে পৌঁছোবে সে? এখানে আর থাকতে পারছে না। মনে হচ্ছে বহুকাল বাদে জেগে উঠছে সে। নিজের ভ্রূ দুটো টানটান করে চোখদুটোকে বড়ো করে খোলার চেষ্টা করে। অনেক চেষ্টার ফলে বহুদূরের আলোক বলয় এবার চোখের চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। কুয়ো থেকে উঠে এল কী করে? এসব কী হচ্ছে? শরীরে এত ব্যথাই-বা কেন? ক্লান্তির নাগপাশ আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে তাকে। চেতন-অবচেতনের মাঝামাঝি অবস্থায় এটুকু বুঝল যে, কোনো পাতকুয়ো নয়, নরম বিছানায় শুয়েছিল সে। কোনোরকমে শরীরটাকে হেঁচড়ে-হেঁচড়ে টেনে তুলল। মাথার মধ্যে অজস্র ঘূর্ণির পাক লেগেছে। চোখে অদ্ভুত ঘোর। পরিষ্কার করে দেখতে পাচ্ছে না কিচ্ছু। শুধু বুঝতে পারছে ওর চারপাশে অনেক আসবাব। ও একটা সাজানো ঘরে আছে। ঘাড়টা ঘোরাতেই সুসজ্জিত আয়না। সেইখানেই নিজের ঝাপসা চেহারাটা দেখে মিহির। নিজের নামটা মনে পড়ে। নিজেকে আরও স্পষ্ট, আরও পরিষ্কার করে দেখার লোভে বিছানায় বসেই এগিয়ে যেতে থাকে আয়নার দিকে। ঠিক তখনই মাথাটা ঘুরে আবার শুয়ে পড়ে। বিছানার ধারে একটা হাত আর-একটা পা ঝুলতে থাকে। শরীরের বাকি অংশ বিছানায় এলিয়ে আছে। মিহির বুঝতে পারে সে আবার, আবার কোনো একটা দমবন্ধ করা কালো পাতকুয়োর নিকষ অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে। তলিয়ে যেতে যেতে বুঝতে পারে কেউ যেন তার পায়ের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। ছড়িয়ে থাকা আলোটা চারপাশ থেকে ছোটো হতে হতে আবার দূরে, অনেক দূরে হারিয়ে যায়।
ফুটপাথে বেঁকে দুমড়ে পড়ে আছে তেঁতুল। ঘাড়টা ভেঙে মুখটা ওপর দিকে উঠে গেছে। যন্ত্রণায় হাঁ হয়ে দাঁতগুলো বেরিয়ে এসেছে। শরীরের থেকে দুটো হাত বেঁকে পিঠের দিকে চলে গেছে। বাঁ পা-টা সোজা আর ডান পা-টা হাঁটু থেকে ভাঁজ হয়ে পেছনের দিকে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় সারা গায়ে ইলেকট্রিক তার জড়ানো। এইরকম হাইটেনশন লাইনের তার ছিঁড়ে পড়ল কী করে? আর কী করেই-বা ছেলেটার গায়ে এরকম বীভৎসভাবে জড়িয়ে গেল সেটাই বুঝে উঠতে পারছে না সায়ন। কোনো মানুষ যদি তেঁতুলকে খুন করতেই চায় তাহলে হাইটেনশন লাইনের তার খুলে এইভাবে মারা অসম্ভব। দূরে থালা-বাসন এখনও ছিটকে পড়ে আছে। পরপর দু-দিনে বিধাননগর থানার আন্ডারে দুটো মৃত্যু। রিপোর্টাররা এখানেও ছুটে এসেছে। এরা যে এত তাড়াতাড়ি কী করে খবর পায় ভগবানই জানে। সরেজমিনে তদন্ত করতে করতে সায়নের কানে আসছে রিপোর্টারের বাইট। তারাই বলছে, ‘একই থানার আন্ডারে পরপর দুজন খুন। যদিও এই মৃত্যুটাকে খুন বলা যায় কতখানি সেটা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি হাইটেনশনের তার ছিঁড়ে ছেলেটার সারা গায়ে পেঁচিয়ে মৃত্যু হয়েছে। যা কোনো মানুষের পক্ষে করা সম্ভব নয়। আবার উলটোদিক থেকে অনেকেই মনে করছেন অভিনেত্রী আত্রেয়ী সেনের দুর্ঘটনার সাক্ষী বৃষভানু মণ্ডল, যার খুনের একমাত্র সাক্ষী ছিল এই ছেলেটি। লোকে তেঁতুল বলে ডাকত। তাই কি তাকে এইভাবে মরতে হল? আমরা জেনে নেব বিধাননগর থানার ওসি সায়ন মল্লিকের কাছ থেকে। স্যার’… বলে রিপোর্টার মেয়েটি সবে প্রশ্ন করতে যাবে সায়নকে, অমনি সায়ন বলে বসল, ‘শুনুন, আপনাদের সব কথাই আমি শুনেছি। এই মুহূর্তে পুরো ব্যাপারটাই তদন্তসাপেক্ষ। তাই আমি কিচ্ছু বলতে পারব না।’ কথাটা শেষ করেই ক্যামেরার সামনে থেকে সরে গেল সায়ন। রিপোর্টার মেয়েটি আবারও ক্যামেরার সামনে বলতে শুরু করল, ‘আপনারা দেখলেন বিধাননগর থানা থেকে এখন কিছু বলা সম্ভব হল না। কিন্তু এই মৃত্যু যে কেউ দেখে বলে দেবে যে এটা একজন মানুষের অসাধ্য। যদি সেটা সম্ভবও হয় তাহলে কী সে ম্যাজিক জানে? নইলে ঝড় নেই, বৃষ্টি নেই। হঠাৎ একটা তার ছিঁড়ে পড়ে ছেলেটির গায়ে আপনা থেকেই জড়িয়ে গেল আর…’ কথাগুলো সায়নের কান থেকে হারিয়ে যেতে থাকে। সায়ন পুলিশের গাড়ির পাশে দাঁড়ায়। ভ্রূ দুটো তার চিন্তায় একে অপরের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। সূর্য বলল, ‘স্যার, ওপরতলা থেকে ফোন এসেছিল। সামনে ইলেকশন তো। তাই চাপ আসবে এবার।’
— কী বলল?
— যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই কেসদুটো সলভ করতে। বলল, যদি আপনার একার পক্ষে সম্ভব না হয় তাহলে সেটা জানাতে। যেভাবে হোক অপরাধীকে ধরতেই হবে।
— সে যদি মানুষ হয় তবেই তাকে ধরা যাবে, নইলে…।
অন্য কোনো জগৎ থেকে যেন কথাগুলো সায়নের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল। সূর্য আকাশ থেকে পড়ল। ‘এর মানে স্যার?’
এবার কপালের ঘামটা মুছে নিয়ে সায়ন বলল, ‘আচ্ছা সূর্য, ধরে নিচ্ছি যে লোকটা বৃষভানুকে মেরেছে সেই এই ছেলেটিকে মেরেছে। কিন্তু তোমার কী মনে হয়? সে ঠিক কতটা শক্তিশালী! যে হাইটেনশনের তার ছিঁড়ে তেঁতুলকে পেঁচিয়ে মেরে ফেলল?’ সূর্য খানিক চুপ থেকে বলল, ‘বোলপুরের গ্রামগুলোতে ওই ভয়ানক ছবিটা দেখে সবাই অন্য কথা বলছে। বলছে এ নাকি ভয়ানক পিশাচ। ওখানে তো হোমযজ্ঞও শুরু হয়ে গেছে আপনার পাঠানো ছবি নিয়ে। তবে কী ধরে নেব স্যার? ওগুলোই সত্যি?’
— জানি না সূর্য। কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।
— এ কথা যদি আমরা মেনেও নিই স্যার, আইন তো মানবে না। ওপরমহলকে কী বোঝাব?
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সায়ন জিজ্ঞেস করল, ‘বালিগঞ্জ থানার ওসির কী যেন নাম!’
— অবনীশ রায়।
— রাইট রাইট। ওঁকে একটা ফোন করে একটু বলে দাও আমাদের আজ সকালের মিটিংটা ক্যানসেল করতে। এদিক্কার অবস্থাও জানিয়ে…
কথাটা শেষ হয় না। তার আগেই সায়নের পকেটে ফোন বেজে ওঠে। হাতে নিয়ে দেখে অচেনা নম্বর। ‘হ্যালো।’ ওপার থেকে ভারী একটা গলা, ‘বালিগঞ্জ পিএস থেকে অবনীশ বলছি সায়নবাবু।’
— আরে হ্যাঁ হ্যাঁ। এইমাত্র আপনাকে নিয়ে কথা হচ্ছিল। সরি, আসলে এদিকে এমন একটা ঘটনা ঘটেছে সেটার জন্য
— আরে আমি তো ওই জন্যেই ফোন করলাম। বুঝতে পেরেছি আপনি আসতে পারবেন না।
— অদ্ভুত ঘটনা। আমার তো মাথার ওপর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।
— সায়নবাবু কী বলব আপনাকে, আমাদের বালিগঞ্জেও একটা বিদঘুটে ঘটনা ঘটেছে।
— কী হয়েছে?
— একটা কুকুর মারা গেছে। মানে তাকে মারা হয়েছে নৃশংসভাবে। আমার থানা থেকে জাস্ট দেখে এল। আমি ছবি দেখলাম। মনে হচ্ছে কেউ যেন ধড় থেকে গলাটা ছিঁড়ে মাথাটাকে আলাদা করে ফেলে দিয়ে গেছে।
— কী বলছেন?
— রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো কেস। কোনো অস্ত্র দিয়ে মারার চিহ্ন নেই। গাড়িতে কাটা পড়লেও ওরকম হয় না।
— কিন্তু সামান্য একটা কুকুরকে কে ওইভাবে মারবে?
— শুধু এটাই নয়, কুকুরের বডিটা কোথায় পাওয়া গেছে জানেন?
— কোথায়?
— আত্রেয়ী সেনের বাড়ির সামনে।
— হোয়াট?
সূর্য স্পষ্ট বুঝতে পারল সায়ন একটু টলে গেল। ‘আত্রেয়ী সেনের বাড়ির ওই লোকটা দেখেনি?’
— না। কাউকে দেখেনি। ওকে তো আলাদা করে জিজ্ঞেস করলাম। ও বলল, শুধু কিছু সময়ের জন্য ওই এলাকাটার সব আলো নিভে গিয়েছিল।’
— পাওয়ার কাট?
— হ্যাঁ, তবে খানিক বাদে চলে আসে। সাপ্লাইয়ের কাছেও সেরকম খবর নেই। হঠাৎ লাইট কেন চলে গেল। কোথাও কোনো ফল্ট নেই। অলৌকিক মশাই, সব অলৌকিক।
কথাটা বলে অবনীশ ঠাট্টার ছলে হাসল। কিন্তু সায়নের মনে অন্য এক ভয়ানক কিছুর সন্দেহ শক্ত করে দানা বেঁধে বসল। আপনি তাহলে আমায় জানান কবে যাবেন দেখতে।’ অবনীশের কথাগুলো সায়নের কানের লতি ছুঁয়ে বাতাসে মিলিয়ে গেল। ওপার থেকে অবনীশ কোনো উত্তর না পেয়ে আবার বলল, ‘সায়নবাবু…
— হ্যাঁ হ্যাঁ বলুন। সরি একটু অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলাম।
— বলছি কবে যাবেন জানাবেন। আমিও থাকব আপনার সঙ্গে।
— শিয়োর।
কান থেকে ফোনটা নামিয়ে সায়ন বলে, ‘এই এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ জোগাড় করো সূর্য’।
— সরি স্যার। সেটা আপনি পাবেন না।
— মানে?
— এ জায়গার একটা সিসিটিভিও কাজ করছে না।
— হোয়াট দ্য ফাক! কবে থেকে?
— খবর যা পেলাম তাতে মনে হচ্ছে গত মাসে দুদিন ধরে যে খুব বৃষ্টি হল। তখনই বাজ পড়ে সবকটা অচল হয়ে গেছে।
— একসাথে সবকটা?
সূর্য কিছু বলতে পারল না। গাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে কপালে ভাঁজ ফেলে দাঁড়িয়ে রইল সায়ন
