মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ১৩
তেরো
শেষ বিকেলের আলোটা যাব যাব করেও দিগন্তের দুয়ারে দাঁড়িয়ে বলছে, ‘না না না।’ কিছুতেই যেতে চাইছে না আজ। ছাদের ওপর মুনাইয়ের সঙ্গে তার ভাইপো সোনাই খেলছে। আর সেই ফাঁকে এক চামচ করে সাদা সুজি মুখের মধ্যে ঠুসে দিচ্ছে মৃন্ময়ী। চুপচাপ বসে খাওয়ার ছেলে সোনাই নয়। একটা চামচ সোনাইয়ের মুখের সামনে ধরেছিল মৃন্ময়ী। সোনাইও হাঁ করেছিল। আচমকা ছাদের আলসের ওপর রাখা মোবাইলটা বেজে ওঠে। মৃন্ময়ী কীরকম হকচকিয়ে উঠেই সোনাইয়ের মুখের সামনে থেকে চামচটা সরিয়ে নিয়ে মোবাইলের দিকে দৌড়ে যায়। সায়ন ফোন করেছে। ‘হ্যাঁ সায়ন বলো।’ সায়ন বলে, ‘নীলাম্বর ব্যানার্জির বাড়িতে তালা। পাশের বাড়িতে জিজ্ঞেস করাতে জানিয়েছে প্রায় মাসখানেকের বেশি হয়ে গেল উনি বাইরে গেছেন। কোথায় গেছেন জানে না। তবে ব্যাগপত্তর গুছিয়ে ওঁকে বেরিয়ে যেতে দেখেছে।’ কথাগুলো শুনে মৃন্ময়ীর চোখের ওপর যেন আরও একটা কালো পর্দা পড়ে গেল। দিনের শেষ আলোটা বোধহয় এইবার পুরোপুরি চলে গেল। সায়ন ফোন রেখে দিয়েছে। আধ বাটি সুজি হাতে নিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল মৃন্ময়ী। মিহির নিরুদ্দেশ। তার ওপর খুনের অভিযোগ। জেলভাঙা কয়েদি। ভয়ানক দুটো চোখ। লকআপের রহস্যময় সেই লোক। সব কিছু এই মুহূর্তে মাথার মধ্যে তালগোল পাকাতে থাকে। পথ কোথায়? সূত্রই-বা কী? বউদিকে এমন অদ্ভুতভাবে আনমনা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মুনাই প্রশ্ন করে, ‘কী হয়েছে বউদি? কার ফোন?’ মৃন্ময়ীর দৃষ্টি দূর আকাশের কোনো এক সন্ধ্যামেঘের গায়ে জড়িয়ে ছিল। মুনাইয়ের গলা পেয়ে ঝট করে সেখান থেকে সরে আসে। ননদের দিকে তাকিয়ে মৃন্ময়ী বলে ওঠে, ‘ফিরতে হবে।’ মুনাই অবাক। ‘মানে?’
— আমায় বাড়ি যেতে হবে।
কী বলছ বউদি? একে দাদা নেই। এই দুরন্ত বাচ্চা নিয়ে তুমি একা বাড়ি ফিরবে?
— হুম। আমায় ফিরতেই হবে।
— কক্ষনো না।
মৃন্ময়ী কথা বলে না। সুজির বাটিটা ননদের হাতে ধরিয়ে ঝট করে ছেলেকে কোলে তুলে নেয়। তারপরেই সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামে। ‘বউদি কী পাগলামো করছ? এমন কোরো না। শোনো’— এইসব বলতে বলতে বউদির পেছন পেছন সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে আসতে থাকে মুনাই। কিন্তু কে শোনে কার কথা। ‘আয়া আছে তো। মাস গেলে অতগুলো টাকা দিয়ে রেখেছি। সে কি ছুটিতে থাকবে নাকি?’
— ক-টাদিন যাক না। তারপর যেয়ো।
— না গো মুনাই। আমার জন্য ভেবো না। প্রবলেম হলে তোমাদের ডাকব। কথা বলছে আর ব্যাগ গোছাচ্ছে। যদিও যা কিছু সব ছেলেরই। নিজে তো হুট করে চলে এসেছে। সেই বোলপুর থেকে ফেরার পর আর বাড়িমুখো হয়নি। মুনাই আবার বলল, ‘আচ্ছা বেশ। তাহলে তোমার নন্দাই ফিরুক তারপর না হয় যাবে।’ মুনাইয়ের শাশুড়িও একই কথা বলল। উনি একেবারেই শান্ত মানুষ। বড়ো একটা কথা বলেন না। এখন উনিও বেশ বিচলিত। কিন্তু মৃন্ময়ীর মাথায় যে হঠাৎ কী চাপল তা কেউ বুঝে পেল না। মোবাইল থেকে ঝট করে একটা ক্যাব বুক করে ব্যাগপত্তর সমেত গাড়িতে চেপে বসল।
.
রাত যতই গভীর হোক, ইট-কাঠ-পাথরের অট্টালিকা ঘেরা পিচরাস্তায় ঝিঁঝিপোকা ডাকে না একটাও। তবে কুকুরদের দৌরাত্ম্য চোখে পড়ার মতো। তাই আজ একটু বেশি করেই ধানুয়ার অবাক লাগছে। এগারোটা বেজে গেল। রাস্তায় মানুষ হাতে গোনা। তা-ও একটা কুকুরও ডাকছে না। কুকুর সাধারণত নির্ভীক প্রাণী। কিন্তু আজ তাদের এই চত্বরে পাত্তাই পাওয়া যাচ্ছে না। গতকালের ঘটনাটায় কি তবে তারাও ভয় পেল? গা-টা ছমছম করে উঠল ধানুয়ার। অন্যান্যদিন ও একা গেটে বসে থাকলেও আশেপাশে কয়েকটা কুকুর ঘোরাঘুরি করত। পান চিবোতে চিবোতে কখনও মোবাইল দেখত, আবার কখনও কুকুরগুলোর সঙ্গে নিজেই বকবক করত। মাঝে কয়েকটাকে খেতেও দিয়েছে। তারপর থেকে আর কেউ আসুক না আসুক ওই দু-চারটে চারপেয়ে ঠিক আসত। কিন্তু আজ তারাও আসেনি। এই বিশাল বাড়িটার সঙ্গে নিশুত রাতের প্রহরী হয়ে ধানুয়া যেন একাই পাহারা দিচ্ছে গোটা পাড়াটাকেও। কতদিন হয়ে গেল এই বাড়িটার ঝলমলে আলোগুলো জ্বালে না কেউ।
হঠাৎ একটা গাড়ি এসে থামল বাড়িটার গেটে। ধানুয়া ভ্রূ কুঁচকে উঠে দাঁড়াল। দেখল গাড়ি থেকে নেমে আসছে তার বিশেষ পরিচিত এক মানুষ। সে-ও এগিয়ে গিয়ে গেটটা খুলে দিল। ‘তন্ময় সাব, আপ ইস সময়?’
— কেন? এখন কি তোকে বলে আমায় এ বাড়িতে আসতে হবে নাকি?
এক হাত জিভ কাটল ধানুয়া। দু-হাতে কান মুলে বলল, ‘নাহি নাহি সাব। উস ঘটনাকে বাদ পুলিশ লোগ ইস ঘর মে সবকা আনা জানা বনধ করে দিয়েছে। ইস ঘরকা চাবি ভি হামার থেকে লিয়ে লিয়েছে। তাই বললাম।’
— পুলিশ-টুলিশ সব জানে। চিন্তা নেই তোর
— ওকে সাব। পুলিশ লোগ ঘর কা চাবি দে দিয়া আপকো?
বাড়ির দিকে এগোচ্ছিল তন্ময়। ধানুয়ার কথা খানিক থেমে ফিরে তাকাল। তারপর ঘাড় নেড়ে বলল, ‘হাঁ দে দিয়া। নইলে আর ঘরে কী করে ঢুকব?’
— হাঁ হাঁ জরুর জরুর। যাইয়ে সাব।
মাথার উশকো-খুশকো চুলগুলো দু-হাতে ঠিক করতে করতে বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল তন্ময়। বাড়িতে ঢোকার দরজার কাছে গিয়ে পকেট থেকে একটা বড়োসড়ো চাবির গোছা বের করল। বাইরের আলোর সুইচটা ভেতরে। তাই আলো জ্বালাবার কোনো উপায় নেই। আশপাশ থেকে ঠিকরে আসা অল্প আলোয় চোখ কুঁচকে একটি চাবি বের করে লকের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল। একবার ঘোরাতেই খট করে শব্দ হয়। হাতলে চাপ দিয়ে দরজা খুলে ফেলে তন্ময়। একরাশ অন্ধকার যেন ভেতর থেকে ঝাপটা মারল তন্ময়ের চোখে। আস্তে আস্তে ভেতরে পা চালাল। চোখ টেনে সারা ঘরে একবার দৃষ্টি চালিয়ে দিল। ধীরে ধীরে ভেতরের জিনিসপত্র দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। চোখটা সয়ে এসেছে। একটু এগিয়ে গিয়ে পটাপট সুইচগুলো টিপে দিতে অসুবিধে হল না তন্ময়ের। বাড়িতে ঢুকতেই বিশাল ডাইনিং। দামি সোফাসেট, চমৎকার সব শো-পিস দিয়ে সাজানো নীচের বসার ঘর। এর মধ্যে অজস্র ক্রিস্টালের জিনিস। আলো পড়লে ঘরটা বেশ ঝলমলে হয়ে ওঠে। হাত উলটে ঘড়ি দেখল তন্ময়। রাত সাড়ে এগারোটা বাজতে চলেছে। কেন যে নীচের আলোগুলো জ্বালাল ও নিজেই বুঝে উঠতে পারল না। গলাটা শুকিয়ে এসেছে। যাক, জ্বালিয়েছেই যখন, তখন ফ্রিজ থেকে কিছু একটা জুস বের করে খাওয়া যাক। আত্রেয়ী মদ খায়নি কোনোদিন। ফ্রুটজুসের নেশা আছে। নানান ফ্রুটজুসে ভরতি থাকে ওর ফ্রিজ। যথারীতি ফ্রিজটা খুলতেই সাজানো নানানরকম জুসের ক্যান। তার মধ্যে থেকে সবে একটা তুলেছে হঠাৎ একটা শব্দ। কোথা থেকে হল ঠিক বুঝতে পারল না। ফাঁকা বাড়ি। হবে হয়তো ইঁদুর-ফিদুর। পাত্তা দিল না তন্ময়। ফ্রিজের পাল্লা বন্ধ করে সোফায় গিয়ে বসল।
ছ্যাসসসস! ক্যানের মুখটা খুলতেই শব্দটা হল। দু-তিন ঢোক গলায় ঢেলে চোখটা সামনের ক্রিস্টাল সেটিং টেবিলটার ওপর পড়তেই চোখটা আটকে গেল। চকচক করছে একটা কাচের সুদৃশ্য বাহারি গ্লাস। নীচে ক্রিস্টালের ছোট্ট গোল চাকতি। তার ওপর প্রিজম কাটিং ক্রিস্টাল দিয়ে লম্বা একটা ডাঁটি। তার ওপর কাচের তৈরি লম্বাটে পাত্র। ‘ক্রিস্টালাইন টোস্টিং ফুটস, সোয়ারভস্কি’ নামটা মনে আসতেই আঁতকে ওঠে তন্ময়। নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলে, ‘এই গ্লাসটা এখানে এল কী করে? এটা কি তবে জোড়া গ্লাসের একটা? কিন্তু আত্রেয়ী তো বলেছিল আর-একটা পড়ে ভেঙে গেছে। তাহলে এটা!’ হঠাৎ খেয়াল হল গ্লাসের গা দিয়ে কিছু একটা গড়িয়ে পড়ছে। গ্লাসে হাত দিল না তন্ময়। শুধু চোখদুটোকে গ্লাসের খুব কাছে নিয়ে গিয়ে দেখল গাঢ় লাল রঙের একটা তরল ধারা কাচের গা বেয়ে নামছে। এ কী! এটা তো ছিল না। গ্লাসটা তো পরিষ্কার ছিল। তন্ময় ঝট করে সিলিঙে দিকে তাকায়। নাহ্! কিচ্ছু তো নেই। সুদৃশ্য ঝাড়টা আগের মতোই স্থির হয়ে ঝুলে আছে। তাহলে এখানে… ভাবতে ভাবতে আবার গ্লাসের দিকে তাকাতে বেশ বড়ো একটা ধাক্কা লাগে বুকে। টেবিল খালি। গ্লাসটা নেই। আজব ব্যাপার! স্পষ্ট সেই গ্লাসটাকে দেখল তন্ময়। অথচ নিমেষে উধাও কী করে হল? নিজের মাথাটাকে একবার ঝাঁকিয়ে নেয় সে। ড্রিংক করলে না হয় লোকে ভুল দেখে। কিন্তু ফ্রুট জুস খেয়ে ভুল দেখছে সে? হা হা করে নিজেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল তন্ময় হালদার। এই থ্রিলিং জীবনে এমন কমেডিও ঘটে! ঢকঢক করে ফ্রুট জুসের ক্যানটা খালি করে টেবিলেই রেখে দিল। মনে মনে স্থির করল, এবার দরকারি কাজটা সেরে ফেলতেই হবে। কিন্তু রাতটা কি এখানে কাটানো ঠিক হবে? একেই পুলিশ এ বাড়ির চাবি নিয়ে রেখে দিয়েছে। ব্যাটারা জানেই না যে, এ বাড়ির আরও একটা চাবি আত্রেয়ী সেনের নাগরের কাছে গচ্ছিত। বিশাল বড়ো একটা উপকার করেছিল বন্দনা। আজ তার করা উপকার তারই ভোগে লাগাব। এই ভেবে সোফা থেকে উঠে পেছনে ঘোরে তন্ময়। সেদিকেই ওপরের ওঠার সিঁড়ি। হঠাৎ সিঁড়ির চাতাল থেকে কে যেন সরে যায়। মুহূর্তে ভ্রূ দুটো কুঁচকে যায় তন্ময়ের ‘কে? কে ওখানে?’ একটুও অপেক্ষা না করে ঝট করে সিঁড়ির আলোর সুইচটা টিপে দেয়। জ্বলে ওঠে দুটো শৌখিন ঝাড়। বাহারি সিঁড়ি আবার আগের মতো কথা বলে ওঠে। কিন্তু সুইচটা অন করে সিঁড়ির সামনে আসতেই কথা বন্ধ হয়ে যায় তন্ময়ের। এ কী দেখছে সে?
.
মাত্র দুটোদিন বাড়িছাড়া ছিল মৃন্ময়ী। মনে হচ্ছে যেন কত্তদিন পর সে নিজের ঘরে ঢুকল। এর মধ্যে এত ঘটনা ঘটে গেছে যে, মৃন্ময়ীর মনের মধ্যে একটা দিন একটা সপ্তাহের মতো কেটেছে। আসার পর থেকেই ছেলের দৌরাত্ম্য বেড়েছে দ্বিগুণ এক মুহূর্ত চোখের আড়াল করলেই একটা না একটা অঘটন ঘটিয়ে বসছে। কোনোরকমে খাইয়ে-দাইয়ে এখন শুইয়েছে সোনাইকে। তবে ঘুমোতে দেরি করেনি আজ। ও নিজেও বোধহয় ক্লান্ত ছিল। ছেলে ঘুমোনো মাত্রই পাশের ঘরে গিয়ে নিজের কাঠের আলমারিটা খুলে ফেলল মৃন্ময়ী। খানিকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ভেবে নিল কাগজটা ঠিক কোথায় রেখেছে সে। বেশ কিছু শাড়ি, জামা-কাপড়, ফাইল বিছানায় ফেলে দেখল। নাহ্! ওটা তো কোত্থাও নেই। তাহলে গেল কোথায়? মিহির ঠিকই বলে, বেশি গুছিয়ে রাখো বলে সময়ে কিছু খুঁজে পাও না। মিহিরের কথা মনে হতেই চোখটা ভারী হয়ে এল মৃন্ময়ীর। মনে মনে একবার বলল, ‘কোথায় গেলে মিহির? একবারও আমার আর সোনাইয়ের কথা ভাবলে না?’ কথাটা মনে মনে আওড়াতেই নিজের প্রতি লজ্জা হল। না না, সে একদম ভুল ভাবছে। মিহিরের দুনিয়া জুড়ে শুধু মৃন্ময়ী, সোনাই আর ওর বড়ো ডিরেক্টর হবার স্বপ্ন। তাই তো সেদিন লক আপে অত কষ্টের মধ্যেও সে বিচলিত হয়ে উঠেছিল সোনাইয়ের জন্য। গারদের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা অসহায় মিহিরের যন্ত্রণাদীর্ণ মুখটা মনে পড়তেই আরও একটা দৃশ্য ঝলসে ওঠে চোখের সামনে। অন্ধকারে ঘাপটি মেরে মুখ ঢেকে বসে থাকা রহস্যময় সেই লোকটা। ওটা কে ছিল? কেন কেউ দেখতে পেল না তাকে। শুধু মৃন্ময়ীই দেখল! আলমারির পাল্লাটা দুম করে বন্ধ করে মাটিতে বসে পড়ল সে। খাটের নীচ থেকে টেনে বের করে আনল পুরোনো একটা ট্রাঙ্ক। ডালাটা খুলতেই অনেকগুলো কাঁসার বাসন বেরিয়ে এল। তার একদম নীচ থেকে একটা লাল রঙের ফাইল টেনে বের করল মৃন্ময়ী। চটপট ফাইলের দড়ি খুলে ওপরের কভারটা সরাতেই ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি নিয়ে একটা নিশ্বাস ছাড়ল সে। পেয়েছে। এই তো সেই কাগজটা। লাল ফিতের গিঁট তাড়াতাড়ি খুলে কাগজটা নিজের মুখের সামনে মেলে ধরল মৃন্ময়ী।
.
তন্ময়ের চোখদুটো পাথরের মতো স্থির হয়ে আছে। বশীভূত মানুষের মতো সিঁড়ি বেয়ে উঠে মাঝের চাতালটায় ঘাড় উঁচু করে দাঁড়ায়। মুখের সামনেই আত্রেয়ীর সেই বিশাল ছবিটা। যার প্রতিটা পরতে পরতে কামনার আগুন ঝরে পড়ছে। কিন্তু এখন সেই ছবিটার ওপরেই লাল রং দিয়ে বড়ো করে কাটা চিহ্ন দেওয়া। মানে কেউ কি আগেভাগে প্ল্যান করে আত্রেয়ীকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল? তাই এমন সংকেত? ভাবতেই মিহিরের নামটা মনে আসে তার। কিন্তু সে কখন করল? শুটিঙে যাবার আগের দিন আত্রেয়ীর সঙ্গে তো তন্ময়ই ছিল। তাহলে এ কাজ কে করল? কখন করল? কেউ তো নেই এই বাড়িতে। নাকি কেউ এসেছিল? নাহ্! ধানুয়াকে একবার জিজ্ঞেস করতেই হবে। তন্ময় সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে নেমে গেল। বাইরের দরজা খুলে একটা হাঁক দিল, ‘ধানুয়াআআআ, এ ধানুয়া?’ গেটের কাছ থেকে উত্তর এল, ‘জি সাব?’
— একবার ইধার আও।
বলে নিজে ঘরে ঢুকে এসে ছবিটার দিকে মুখ করে দাঁড়াল। চোখের মণিদুটো সারাবাড়িতে শ্যেনদৃষ্টি দিয়ে কিছু যেন খুঁজতে লাগল। ধানুয়া ঢুকে এল, ‘সাব ডাকছিলেন?’
— ইধার আও।
ধানুয়াও বাধ্য ভৃত্যের মতো তন্ময়ের পাশে এসে দাঁড়ায়। তন্ময় কোনো কথা বলল না। শুধু ছবিটার দিকে আঙুল তুলে দেখাল। ধানুয়ার চোখদুটোও তন্ময়ের আঙুল লক্ষ্য করে সেই দিকে গিয়ে থমে গেল। চমকে উঠল সে, ‘হায় রাম। ইয়ে কিসনে কিয়া?’ গম্ভীর গলায় তন্ময়ও বলল, ‘এই প্রশ্নটা তো আমারও। এটা কে করল?’
— হামকো মালুম নাহি সাব। আপলোগ শুটিং মে নিকল গয়ে। তব সে মকান বন্ধ পড়া হ্যায়। হামার কাছে তো চাবিভি থাকে না। উস ঘটনাকে বাদ মিতালি দিদি ভি নেহি আয়ে। সির্ফ পুলিশ লোগ আয়ে থে কাল। উনহোনে বোলা কি আপনার কাছ থেকে ইস মকানকা চাবি মিলা হ্যায়।’
— বন্দনা দিদি আয়ে থে ইধার?
— বন্দনা দিদি! নাহি তো। উও তো সেই যে গেল আর আসেনি।
তন্ময় এবার বেশ চিন্তায় পড়ল। ধানুয়া বলল, আওর আজ তো আপ পুলিশ সে ইয়ে চাবি মাঙ্গ কর…।’ কথাটা শেষ হবার আগেই তন্ময় বলে উঠল, ‘যা যা নিজের কাজে যা।’ ‘জি সাব’ বলেই বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেল। তন্ময় দরজার ছিটকিনি দিয়ে ওপরে উঠে যায়। ওপরটা এখনও অন্ধকার। যে বাড়িটায় শেষ দু-বছর ধরে মাঝেমধ্যেই নিজের বাড়ির মতো শোয়া, বসা, খাওয়া, ঘুম সব কিছু আজ সেই বাড়িটায় একা ঘুরে বেড়াতে কেমন যেন গা-ছমছম করছে। কেবল মনে হচ্ছে এই বাড়িতে তন্ময় একা নয়। হয়তো আরও কেউ নজর রাখছে তার গতিবিধির ওপর। দোতলায় উঠেই চৌকো মতো একটা জায়গা। সেখানকার আলোটা জ্বালল তন্ময়। পেছন ঘুরতেই বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। এই জায়গাটায় একটা বেতের দোলনা টাঙানো। অন্ধকারে আসতে গিয়ে তন্ময়ের গায়ের সঙ্গে কোনোরকম ধাক্কা লাগেনি সেখানে। কারণ আলো জ্বালাতে গেলে দোলনাটাকে ক্রস করার প্রয়োজন পড়ে না। অথচ সেটা এমন প্রবলভাবে নিজে থেকে দুলছে কী করে? হাওয়াও তো নেই কোত্থাও। তন্ময় দোলনাটাকে ঘিরে একপাক ঘুরে ভালো করে দেখল। তারপর হাত দিয়ে দুলুনিটা থামিয়ে দিল।
খটাস। শূন্য বাড়িতে শব্দটা রীতিমতো হাড়-কাঁপানো। কেউ যেন দরজার ছিটকিনি খুলল। পেছনের ঘরে দরজাটা ভেজানো। ‘কে? কে?’ তন্ময়ের প্রশ্নটা একা-একাই বাজল বাড়িটার দেয়ালগুলোতে। উত্তর দিল না কেউ। হাতের অল্প ঠেলাতেই ঘরের দরজাটা খুলে গেল। আবছা অন্ধকারে কাউকেই খুঁজে পেল না তন্ময়। কিন্তু বারান্দার দিকে চোখ পড়তেই আশ্চর্য হয়ে গেল সে। এক্কেবারে হাট করে খোলা কেন? আতঙ্কের দমকা বাতাস যেন বুকের মধ্যে সজোরে একটা ধাক্কা মেরে দিয়ে গেল। এক বছর অঝোর শ্রাবণে এই বারান্দাতে বসেই তো আত্রেয়ীর সঙ্গে বৃষ্টির ছাটে ভিজেছিল দুজনে। কত করে ছাদে গিয়ে একসঙ্গে বৃষ্টিতে ভেজার কথা বলেছিল। কিন্তু আত্রেয়ী যায়নি। এখানেই খ্যাপা শ্রাবণের জলকুচিতে ভিজে এই ঘরের বিছানায় একসঙ্গে তারা সারা শরীর মুছে নিয়েছিল। তারপর দুজনের উত্তাপে দুজনকে শুকিয়ে মেলে দিয়েছিল সুতোর নকশা আঁকা সাদা চাদরের বুকে। এখন সেই ঘরটাতে ঢুকতে এত ভয় কেন করছে নিজেই বুঝতে পারছে না তন্ময়। তাহলে কি এই বারান্দা দিয়ে কেউ এসে ঢুকে ঘাপটি মেরে আছে? খুব সন্তর্পণে পা ফেলে ফাঁকা ঘরটায় ঢুকল। দেয়াল হাতড়ে সুইচ টিপল। আলোটা ঝট করে জ্বলেই চিড়িক শব্দ করে নিভে গেল। শিরা দিয়ে রক্তের বদলে বরফগলা জল ছড়িয়ে পড়ল সারা শরীরে। সব ক-টা সুইচ টকটক করে অন করে দিল। একটা আলোও জ্বলল না। বাধ্য হয়েই অন্ধকারে পা ফেলে বারান্দার কাচের দরজাটার দিকে এগিয়ে গেল। বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে নীচে তাকাল। যদি কিছু সন্দেহজনক চোখে পড়ে। তেমন কিছুই দেখল না। ঘরে ঢুকে কাচের দরজাটা ভালো করে দিয়ে দিল। শুটিঙে যাবার আগে আত্রেয়ীর নতুন পিএ মিতালিই হয়তো দরজাটা দেয়নি। কাচের দরজার ওপর পর্দাটা টেনে দিল। ঘরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেল। শুধু বাইরের থেকে আলোর কিছু অংশ এই ঘরের দরজার কাছে এসে পড়েছে। সেই দিকে যেতে গিয়ে বিছানার কোণটা ঠকাস করে পায়ে লাগল।
‘আঃ!’ শব্দটা তন্ময়ের মুখফুটে বেরিয়ে এল। খানিকটা খুঁড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার জন্য এগোতে থাকে। আসল কাজটা আত্রেয়ীর ঘরে। অনেক রাত হয়ে গেল, এবার সেরে ফেলতেই হবে। তখনও ঘর ছেড়ে বেরোয়নি তন্ময়। মোবাইলটা ঝমঝম করে বেজে উঠল। এই যন্ত্রটার কথা মাথা থেকে বেরিয়েই গিয়েছিল তন্ময়ের। তাই নিজের ফোনের আওয়াজেই ছত্রিশ ইঞ্চি ছাতিটা কেঁপে উঠল। ফোন হাতে নিয়ে নিজেই বিড়বিড় করে উঠল, ‘এত রাতে নার্সিংহোম থেকে ফোন?’ বলেই ফোনটা রিসিভ করল তন্ময়। ‘হ্যালো… হ্যাঁ হ্যাঁ বলুন। কী বলছেন! আচ্ছা… ও রেসপন্স করছে? বাহ! বাহ!… মাত্র দু-দিনেই মেডিসিনে রেসপন্স করছে মানে তো ভালোই…বলতে হবে… আচ্ছা আচ্ছা। হ্যাঁ শুনেছি। গিল্ড থেকেও বাকি টাকাটা পে করে দেবে। ওকে ওকে থ্যাংক ইউ। রাখছি।’ ফোনটা পকেটে রাখতে রাখতে কী যেন একটা ভাবনায় ডুবে যায় তন্ময়। মুখে বিরক্তি ফুটে ওঠে। পেছন ঘুরে দেয়ালে ‘হট শালা’ বলে দড়াম করে একটা ঘুষি মারে। তারপর পাশের বড়ো ঘরটায় ঢুকে যায়। কিন্তু যে ঘর ছেড়ে তন্ময় গেল, সেই ঘরে দরজার সোজাসুজি রাখা ওয়ারড্রবের পাল্লাটা নিঃশব্দে খুলে যায়। হ্যাঙারে ঝুলিয়ে রাখা নানারকম শাড়ির মাঝখানে জ্বলে ওঠে ভয়ানক দুটো সাদা চোখ। প্রচণ্ড রাগে গুমরে-চলার শব্দটা সারা ঘরে পাক খেতে থাকে।
আলোটা জ্বালতেই ঘরটা শিশমহলের মতো ঝলমল করে ওঠে। ঘরের চারটে দেয়ালজুড়েই কাচ আর ক্রিস্টালের অপূর্ব সব শো-পিস। কোথাও সাজানো নানান মাপের বাহারি পেয়ালা। ‘এত পেয়ালা নিয়ে কী করো তুমি?’ প্রশ্নটা আত্রেয়ীকে করেছিল তন্ময়। প্রথম যেদিন এই ঘরে এসেছিল। আত্রেয়ী হেসে বলেছিল, ‘কী করি মানে? খাই। সাজিয়ে রাখি।’ তন্ময় অবাক হয়ে বলেছিল, ‘খাও? সে কী! ইন্ডাস্ট্রির সবাই তো জানে আত্রেয়ী সেন মদ ছুঁয়েও দেখে না।’ খিলখিল করে বালিকার মতো হেসে গড়িয়ে পড়েছিল আত্রেয়ী। বলেছিল, ‘পেয়ালায় ফলের রস খেলে কি খুব অপরাধ হয়?’ হাসবে না কাঁদবে ভেবে পেল না তন্ময়। ‘ফ্রুট জুস!’
— হ্যাঁ।
— ফ্রুট জুসসস!
— বাবা! ওরকমভাবে বলার কী আছে? জুসসসস!
— এইসব বাহারি দামি পেয়ালায় ফলের রস খাও চুকচুক করে?
— এই এক দেব। চুকচুক করে আবার কী?
তন্ময় হাসতে হাসতে বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে পড়েছিল। ‘তোমরা মোদো মাতাল বলে দুনিয়ার সবাইকে মোদো মাতাল হতে হবে নাকি?’ কথাটা শুনে তন্ময় আরও জোরে হেসে ওঠে। এই ফাঁকা ঘরে আজও সেই হাসির রোল ক্রিস্টালের গ্লাসগুলোর গায়ে লেগে আলোর মতো ঠিকরে পড়ছে।
.
তন্ময় কোমরের বেল্টের সামনের দিকটা খুলে ফেলে। সেখানটা আলগা হতেই বাঁ-দিক ঘেঁষে তলপেটের কাছে প্যান্টের মধ্যে হাত চালিয়ে দেয়। বেরিয়ে আসে একটি চাবির রিং। তাতে দুটো চাবি ঝুলছে। একটি দিয়ে আলমারিটা খুলে ফেলে। হঠাৎ কী খেয়াল হতে ঘরের দরজার দিকে তাকায় তন্ময়। মুহূর্তে ভ্ৰটা কুঁচকে যায়। বাইরে জ্বলতে থাকা হলদে আলোটার খানিকটা এই ঘরের দরজার কাছে পড়ছিল। কিন্তু এখন এই ঘরের আলো ছাড়া কিচ্ছু নেই। তন্ময় দরজার কাছে এসে দাঁড়াতেই চমকে ওঠে। অদ্ভুত তো! ও তো বাইরের আলোটা জ্বালিয়েই এ ঘরে আসে। কিন্তু এখন জায়গাটা অন্ধকার কেন? এই আলোটাও কি কেটে গেল নাকি? আর একসঙ্গে দুটো ঘরের আলোই কেটে যাবে এটা অবিশ্বাস্য। আর কিছু না ভেবে তন্ময় সজোরে পা চালিয়ে সুইচ আছে যে দেয়ালে সেদিকে যেতে যায়। সঙ্গে সঙ্গে অসাবধানতায় চাতালে ঝুলতে থাকা বেতের চেয়ারটায় ধাক্কা লাগে এবং মুহূর্তের মধ্যে তন্ময়ের মুখের সামনে সর্বনাশী বিজলির মতো ঝলসে ওঠে একটা মুখ। হাড়হিম করে দেওয়া বীভৎস মুখ। না না, মুখ নয়। একদলা রক্ত-মাংসের পিণ্ড বলাই ভালো। যেন কোনো আদিম দানব জেগে উঠেছে। সাংঘাতিক ভয় পেয়ে মুখ দিয়ে ‘আঁক’ শব্দ করে খানিকটা ছিটকে যায় তন্ময়। অন্ধকারে বেতের চেয়ারে বসে কে ওই ছায়ামূর্তি? মুহূর্তের ভগ্নাংশে বীভৎস ভয়ানক সাদা চোখদুটো তন্ময়ের মুখের সামনে জ্বলে উঠেই চেয়ারের সঙ্গে উলটোদিকে ঘুরে গেল। তারপরেই সব ভোঁ ভা। তন্ময় প্রচণ্ড ভয়ে দেয়ালে আনতাবড়ি হাত চালিয়ে পটপট করে সবক-টা সুইচ জ্বালিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চেয়ারটার দিকে ঘুরে তাকায়। জায়গাটা খালি। কেউ নেই সেখানে। তবে বেতের ঝুলন্ত চেয়ারটা দুলছে আপনা থেকেই। যদিও সেটা স্বাভাবিক। কারণ তন্ময়ের সঙ্গে ধাক্কা লেগেছে। কিন্তু ওই মুখটা কার? চোখদুটো! কী ভয়ানক! কার ওই চোখ? ঠিক তখনই মনে পড়ল আজ সকালে নিউজ চ্যানেলে দেখা মিহিরের মুখে ওই পিশাচের চোখের ছবি। এ কী করে সম্ভব? তাহলে কি মিহির এখানেই কোথাও আছে? ভাবতেই সারা গা শিরশির করে উঠল। গলা শুকিয়ে এল। কখন যে কপাল আর গলাটা ঘামে ভিজে গেছে তন্ময় টেরই পায়নি। রুমাল দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে এপাশ-ওপাশ দেখতে থাকে। কেউ নেই। একটা টিকটিকিও ডাকছে না। ওপরের সিঁড়ি থেকে নীচের দিকে তাকালে আত্রেয়ীর ছবির ওপর বিশাল ক্রস চিহ্নটা চোখ টেনে ধরছে। তন্ময়ের মনে হঠাৎ একটা প্রশ্ন ঝিলিক দিয়ে উঠল, ছবির ওপর ওটা কি লাল রং নাকি রক্ত? নাহ্! এখানে আজ রাতে থাকাটা বেশ রিস্ক। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাজ সেরে বেরিয়ে যেতে হবে। মনের মধ্যে আর কোনো ভাবনাকে প্রশ্রয় না দিয়ে দ্রুত পায়ে ঘরে চলে গেল। একবার শুধু পেছন ফিরে দেখে নিল, আলোটা সে জ্বেলেই যাচ্ছে কিনা। হ্যাঁ, আগের মতোই আলোটা জ্বলছে।
.
খোলা আলমারির পাল্লাতে চাবিটা লাগানোই ছিল। সেখান থেকে খুলে দ্বিতীয় চাবিটা দিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে আলমারির মাঝের সিন্দুকটা খুলে ফেলল। তারপর অন্ধকার খোপটার মধ্যে হাত চালিয়ে দিল তন্ময়। একবারের চেষ্টাতেই বের করে আনল একটি বড়ো চৌকো লাল বাক্স। গয়নার বাক্স। বাক্সটাকে হাতে নিয়ে দেখতেই ভয় পেয়ে থাকা মুখটায় হালকা হাসি খেলে গেল। খুলে ফেলল বাক্সটা। তার মধ্যে সাজানো বাইশটা হিরে বসানো প্ল্যাটিনামের হার। হাতে নিয়ে এদিক-ওদিক নাড়াতেই আলোকদ্যুতি ছিটকে বেরোচ্ছে যেন। লোকে কি আর এমনি এমনি বলে, গয়না হল লক্ষ্মী! বিপদে-আপদে ঠিক কাজে লেগে যায়।
ছিনিন। ছনাৎ।
কাচের টুকরোগুলো চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। চমকে উঠল তন্ময়। এক ঝটকায় পেছন ফিরে দেখে উলটোদিকের দেয়ালে সাজানো বেশ ক-টা কাচের পেয়ালা পড়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে। ধক করে ওঠে তন্ময়ের বুক। একের পর এক অসম্ভব ঘটনা কী করে সম্ভব হচ্ছে? কী হয়ে চলেছে বাড়িটার মধ্যে? গয়নাটাকে জামার ভেতরের পকেটে পুরে নিল। তারপর ফাঁকা বাক্সটা লকারের মধ্যে রেখে দিয়ে আলমারিটাকে বন্ধ করে দিল। ধীরে ধীরে ভেঙে থাকা কাচের টুকরোর কাছে গেল। মাটির দিকে চেয়ে অবাক হয়ে দেখল শুধু। সবক-টা জানলা বন্ধ। হাওয়া নেই। তাহলে কি টিকটিকিতে এই কাণ্ড ঘটাল? তন্ময়ের আর-একটা মন তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, অ্যাদ্দিন টিকটিকি কিছু করল না। আজকেই করল? কথাটা মনে হতেই শরীরটা আরও একবার কেঁপে উঠল। চোখটা মাটি থেকে তুলতেই ছিটকে দু-পা পিছিয়ে গেল তন্ময়। এ এসব কী হচ্ছে? দেয়ালে সাজিয়ে রাখা ক্রিস্টাল আর কাচের পেয়ালার গায়ে এত রক্তের দাগ কোথা থেকে এল? মনে হচ্ছে কাঁচা রক্ত কাচের গা দিয়ে গড়িয়ে নামছে। আর এখানে এক মুহূর্তও নয়। দৌড়ে বেরোতে গিয়ে আবার থমকে গেল। দমটা এবার বন্ধ হয়ে আসছে তন্ময়ের। বাইরের আলোটা আবার কে যেন নিভিয়ে দিয়েছে। বাইরের চাতালটায় মুখ বাড়াল সে। মনে মনে আতঙ্ক গ্রাস করছে তন্ময়কে। আবার কি সেই চোখটা মুখের সামনে এসে ওকে ভয় দেখাবে? নাহ্! এসব ওর দুর্বল মনের ভ্রম ছাড়া কিচ্ছু নয়। নিজের মনকেই নিজে সান্ত্বনা দিয়ে সুইচের দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করল। কিন্তু মাঝপথে পৌঁছেই হঠাৎ বেতের চেয়ারটা নিজে থেকে প্রচণ্ড জোরে দুলে উঠে তন্ময়ের গায়ে আছড়ে পড়ল। চিৎকার করে তন্ময় ছিটকে গেল আত্রেয়ীর ঘরের মধ্যে। মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা টুকরো-টুকরো প্রাণঘাতী কাচগুলোর ওপর ঘষটে যায় তার শরীর। এক নিমেষে শরীরের একটা পাশে ভীষণ জ্বালা আর যন্ত্রণা শুরু হল। নিজেকে কয়েকবার মাটি থেকে তোলার চেষ্টা করল তন্ময়। যতবার উঠতে গেল ততবারই নতুন করে কাচের টুকরোগুলো গা-হাত-পায়ের চামড়ায় গেঁথে গেল। তন্ময় বুঝল, এ বাড়িতে যে কেউ আছে সেটা নিশ্চিত। এবং সে তন্ময়কে মারতে চায়। মারতে চাওয়ার কারণ হিসেবে যেটা তার বারবার মনের আড়ালে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে সেটা অলৌকিক। তাই সেটা একশো শতাংশ অসম্ভব। মরিয়া হয়ে শরীরে আরও বেশ কিছু ভাঙা কাচের আঘাত সহ্য করে উঠে দাঁড়াল তন্ময়। শার্টের একটা পাশের বেশ কিছুটা অংশ রক্তের ছাপে ভরে গেছে। পায়ের তলায় কাচ ফুটে আছে। ওই অবস্থাতেই গলা খুলে বলে উঠল, ‘কে? কে আছ? সামনে এসো।’ সঙ্গে সঙ্গে বুকের ওপর যেন কোনো হিমশৈল ভেঙে পড়ল। আবার যদি ওই মুখটা সামনে আসে তাহলে কী করবে সে? কোনো উত্তর না পেয়ে এগিয়ে যেতে গেল। কিন্তু পা ফেললেই যন্ত্রণায় শিরা ছিঁড়ে যাচ্ছে। অগত্যা বাঁ-হাতে দেয়াল ধরে ডানহাত দিয়ে পায়ের নীচ থেকে কয়েকটা কাচ বের করতে চেষ্টা করল। ঝট করে কেউ যেন পাশ থেকে সরে ঘরের ভেতর ঢুকে এল।
হিঁইইইই! আঁতকে উঠে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল তন্ময়। ‘কে? কে?’ হাঁফাচ্ছে। কথা বলার শক্তিটা হারিয়ে ফেলছে আস্তে আস্তে। ঘর ফাঁকা। আলোতে কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। কোনোরকমে পায়ের তলা থেকে কয়েকটা কাচ বের করে খোঁড়াতে খোঁড়াতে বাইরের অন্ধকারে চলে এল। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে জ্বালল। বেতের চেয়ারও ফাঁকা। কেউ নেই। ওপাশের বারান্দা লাগোয়া ঘর থেকে আবারও একটা নীল আলোর হাতছানি। কষ্ট করে এগিয়ে গিয়েই দেখে আবারও বারান্দার দরজা হাট করে খোলা। গলায় এসে এবার দমটা আটকে গেল তন্ময়ের। না, শুধু বারান্দার দরজা খোলা দেখে তার দমটা আটকায়নি। খোলা বারান্দায় রেলিংয়ের ধারে লম্বা মতন একটি মানুষের অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে। মুখটা বাইরের দিকে। তন্ময়ের গলাটা ঘড়ঘড় করে উঠল। ‘কে আপনি? কে ওখানে?’ বলেই ‘ধানুয়াআআআ, ধানুয়াআআআ’ বলে চিৎকার করে ওঠে। কিন্তু তন্ময় তৃতীয়বার গলা দিয়ে স্বর বের করার আগেই মূর্তিটা উধাও হয়ে যায় হাওয়ায় ওড়া পর্দার আড়ালে। মনে হল, হাওয়া এসে তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। থরথর করে কাঁপতে থাকে তন্ময়। মন বলে এখানে আর-এক মুহূর্তও নয়। পেছন ঘুরতেই তন্ময়ের মনে হল ওর বুকের বাঁ-দিকটা কেউ খামচে ধরেছে। চোখের সামনে ওটা কে? চেনা মানুষের মুখে ক্ষত-বিক্ষত আর-একটা মুখের প্রতিফলন। তন্ময়ের মুখ দিয়ে প্রথমে বেরিয়েই এল, ‘মিহির তু…’ বলেই থেমে গেল। তারপরেই চোখদুটোকে আরও বিস্ফারিত করে কাঁপতে কাঁপতে বলে ওঠে, ‘এ অসম্ভব, ইম্পসিবল।’ মিহিরের মুখেই এখন কালো রক্তের ধারা। চোখদুটো ধবধবে সাদা। তাতে লাল বিদ্যুৎরেখার ফাটলের দাগ। বমি উঠে আসছে তন্ময়ের। এই মুখটাই কি দেখল খানিক আগে? না না, সে তো অন্য মুখ! চোখের পলক পড়ার আগেই মিহির এগিয়ে এসে তন্ময়কে পাঁজাকোলা করে তুলে নেয়। আচমকা ঝটকায় তন্ময়ের হাতের মোবাইলটা পড়ে যায়। তন্ময় চিৎকার করতে চাইছে কিন্তু পারছে না। প্রাণপণ চেষ্টায় শুধু মুখটা খুলে সে বলছে, ‘না না, প্লিজ। না। ছেড়ে দাও।’ নৃশংস মৃত্যুর দুই হাতের ওপর শুয়ে তন্ময় বুঝতে পারছে সে ক্রমে রেলিঙের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে। পিঠের তলা থেকে দুটো হাত সরে গেলেই সপাটে একতলার সিঁড়িতে গিয়ে পড়বে তার শরীরটা। তারপর গড়াতে গড়াতে নীচের ডাইনিঙে। রক্তের দাগ মাখানো ক্ষয়াটে দাঁতগুলো খ্যালখ্যাল করে হাসছে। মৃত্যুদূতের শরীরটা হাসির তরঙ্গে কাঁপছে। সে কী ভয়ানক উল্লাস। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না তন্ময়কে। অচিরেই দোতলা থেকে প্রায় সত্তর কেজির শরীরটা নীচের সিঁড়িতে আছড়ে পড়ল। সারা বাড়িময় ছড়িয়ে পড়ল তন্ময়ের গলাচেরা আর্তনাদ। সিঁড়িতে পড়ামাত্রই তন্ময় গড়িয়ে গেল নীচের দিকে। পা দুটো সিঁড়ির ওপর পড়ে রইল। দু-হাত ছড়িয়ে রইল দু-পাশে। মাথা আর কপাল ফেটে রক্তে ভেসে গেল দুটো চোখের পাতা। জ্ঞান আছে। কিন্তু কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছে না সে। শুধু বুঝতে পারছে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে বিকট দর্শন খুনিটা। দেহের মধ্যে শিরা-উপশিরাগুলো যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। আততায়ী অনেকটা কাছে চলে এসেছে। এবার এক্কেবারে মরণ আঘাত হানবে তন্ময়ের ওপর। কিন্তু তন্ময় বাঁচতে চায়। যেভাবে হোক তাকে বাঁচতে হবে। এত আঘাতের পরে ও চেতন-অবচেতনের মাঝামাঝি জগৎ থেকে হৃদপিণ্ডটা এখনও ধুকপুক করছে। পা দিয়ে সিঁড়ির ধাপে চাপ দিতেই তন্ময় খানিকটা সরে এল। সে-ও আরও দু-পা এগিয়ে এল তন্ময়ের দিকে। ঠিক তখনই বাইরে থেকে পুলিশের গাড়ির সাইরেন বেজে ওঠে। সেটা শোনামাত্রই আরও খেপে ওঠে মিহির। তন্ময় এখন মিহিরের রূপটাই চোখের ওপর দেখছে। মিহির দু-হাতে তন্ময়ের দেহটা তুলে ধরে। যেটুকু প্রাণশক্তি বেঁচে আছে সবটুকুকে এক করে চিৎকার করে ওঠে তন্ময়। দরজার বাইরে এসে হাজির হয় বালিগঞ্জ থানার ওসি অবনীশ রায় ও পুলিশবাহিনী। সঙ্গে সায়ন। প্রচণ্ড জোরে দরজায় ধাক্কা দিতে থাকে সবাই। তারা স্পষ্ট দেখতে পায় মিহির দু-হাতে মাথার ওপর তুলে ধরে আছে রক্তাক্ত তন্ময়কে। ‘মিহিরবাবু, ছেড়ে দিন ওঁকে। দরজা খুলুন।’ অবনীশ চিৎকার করে ওঠে। সায়নও বলে ওঠে, ‘দাদাভাই আইন নিজের হাতে নিয়ো না। দরজা খোলো।’ কে শোনে কার কথা? মিহিরের গায়ে এখন আসুরিক শক্তি। দেরি না করে মিহির মাথার ওপর তুলে ধরা তন্ময়কে সামনের দেয়ালের দিকে লক্ষ্য করে ছুড়ে মারে। দেয়ালে সাজানো ক্রিস্টাল, কাচ, মাটির শো-পিসগুলো ঝনঝন দুমদাম করে ভেঙে পড়ে তন্ময়ের শরীরটার আঘাতে। পুলিশরাও দরজা ভেঙে ঢুকে আসে। সবার চোখের সামনে দিয়ে মিহির ঝড়ের বেগে চার-পাঁচটা সিঁড়ি টপকে ওপরের দিকে উঠে যেতে থাকে। অবনীশ চিৎকার করে ওঠে, ‘দত্ত তোমরা তন্ময়বাবুকে নিয়ে যাও। সৃজিত, নন্দরা সবাই আমাদের সঙ্গে এসো। সায়ন নীচে এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করেনি। ‘দাদাভাই স্টপ, দাঁড়াও বলছি। আমি কিন্তু গুলি চালাতে বাধ্য হব।’ সায়নের হাতে তাক করাই ছিল রিভলবার। কিন্তু মিহির যেন শুনতেই পেল না। অবনীশ ও দলবল নিয়ে ধেয়ে গেল সায়নের পেছন-পেছন অন্ধকারের মধ্যে ওদের চোখ সইতে সময় লাগল। কয়েকজন সুইচগুলো পটাপট মারতে থাকল। কিন্তু একটাও আলো জ্বলল না। মিহির কোনদিকে গেল বুঝতেই পারল না সায়ন। টর্চটা জ্বালাও’ অবনীশ বলে উঠল। কোনো এক কনস্টেবল টর্চটা জ্বালিয়ে দিল। ঠিক সেই মুহূর্তে সায়ন ও অবনীশ এক ঝলক দেখল একটা মানুষ বারান্দার রেলিং টপকে নীচে ঝাঁপ দিল। চিৎকার করে যে সাবধান করবে সেই সময়টুকুও দিল না। সায়ন, অবনীশসহ আরও চারজন দৌড়ে গেল। কিন্তু তার আগে যা হবার হয়ে গেছে। দোতলার বারান্দা থেকে সবাই দেখল নীচের বাঁধানো চাতালটায় মিহির মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। রেলিংয়ের ওপর সজোরে একটা ঘুষি চালাল সায়ন। তাড়াতাড়ি সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছিল সবাই। সায়ন মাঝ সিঁড়িতে এসে একবার থমকাল। আত্রেয়ী সেনের অত বড়ো ছবিতে ক্রস চিহ্ন! ব্যাপারটা সায়নকে থামিয়ে দিলেও ধরে রাখতে পারল না। বাড়ির বাইরের আলোগুলো জ্বলে উঠল। সবাই দৌড়ে পেছনের দিকে গেল। উপুড় হয়ে পড়ে থাকা মিহিরের দিকে ছুটে গিয়েই সবাই থমকে গেল। মাথার নীচ দিয়ে গাঢ় লাল রক্ত ছড়িয়ে পড়েছে। বাঁ-হাতটা বেঁকে উলটো হয়ে পড়ে আছে। মুখটা খোলা। চোখ বন্ধ। সায়নের বুকের ভেতরটা তোলপাড় করে উঠল।
— অ্যাম্বুলেন্স ডাকো শিগগিরি।
চিৎকার করে উঠল সায়ন।
